মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Rajendralal Acharya (†1961) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন
বন্ধুদিগকে সাহস দিয়া ডাক্তার কহিলেন—“হতাশ হ’য়ো না। মরুভূমে খুব বেশী গরম হ’লে তার পর নিশ্চয়ই ঝড় বৃষ্টি হয়।”
“তার ত কোন লক্ষণ দেখি না, ফার্গুসন্।”
“এখন তেমন কিছু নাই বটে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে বায়ুমান যন্ত্রের পারা যেন নিম্নগামী হ’বার মত হয়েছে।”
“ও তোমার ভ্রম, ফার্গুসন্।”
“না ডিক্। সাহস কর। ধৈর্য্য ধর।”
কেনেডি যতই সেই মেঘশূন্য পরিচ্ছন্ন উজ্জ্বল আকাশ ও দিগন্তবিস্তারি উত্তপ্ত বালুকারাশির দিকে চাহিতেছিলেন, ততই শঙ্কিত হইতেছিলেন। তাঁহারা ক্রমে বিকারগ্রস্ত হইতে লাগিলেন।
রাত্রি আসিল। ফার্গুসন ভাবিলেন দ্রুতপদে ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিলে হয় ত কষ্টের অনেকটা লাঘব হইবে। তিনি সঙ্গীদিগকে ডাকিলেন।
কেনেডি বলিলেন,
“আমি এক পা-ও চলতে পারি না।”
জো কহিল, “আমার ঘুম পাচ্ছে।”
ফার্গুসন্ পুনরায় কহিলেন, “এ অবসাদ দূর করতেই হ’বে। ঘুমিয়ে পড়লে বড় খারাপ হ’বে। এস বেড়াই।”
তাঁহারা ভ্রমণ করিতে চাহিলেন না। ফার্গুসন্ একাকী যাত্রা করিলেন। ঊর্দ্ধে নক্ষত্রখচিত আকাশ, নিম্নে সুদূরবিস্তৃত মরুভূমি। পশু নাই—পক্ষী নাই—জন-প্রাণীর সাড়া শব্দ নাই! চতুর্দ্দিকে ভীষণ নীরবতা। ফার্গুসন একাকী যাত্রা করিলেন। প্রথমে হাটিতে পারিলেন না—চরণ চলিতে চাহিল না। কিছুক্ষণ পাদচারণ করিতে করিতেই লুপ্তশক্তি যেন অল্পে অল্পে ফিরিয়া আসিতে লাগিল। তিনি বহুদূর পর্য্যন্ত গমন করিলেন। কতদূর গেলেন, তাহা বুঝিতে পারিলেন না। চলিতে চলিতে অকস্মাৎ মস্তক ঘুরিয়া উঠিল—চক্ষু অন্ধকার হইল—শরীর অবসন্ন হইয়া গেল। চরণদ্বয় কম্পিত হইতে লাগিল। সেই ভীষণ নীরবতা যেন তাঁহাকে একান্ত ভীত করিয়া তুলিল। পশ্চাতে ফিরিয়া দেখিলেন ভিক্টোরিয়ার আর চিহ্ন পর্যন্ত দেখা যাইতেছে না। ফার্গুসন্ প্রত্যাবর্তন করিবার চেষ্টা করিলেন, পারিলেন না। বন্ধুদিগকে উচ্চকণ্ঠে ডাকিলেন। কাহারো উত্তর পাইলেন না। প্রতিধ্বনি পর্য্যন্ত হইল না। ফার্গুসন্ তখন সেই তপ্ত বালুকারাশির মধ্যে মুর্চ্ছিত হইয়া পড়িলেন।
তাঁহার যখন মূর্চ্ছা ভঙ্গ হইল, তখন রজনী দ্বিতীয় প্রহর। ফার্গুসন্ চক্ষু চাহিয়া দেখিলেন, তিনি ভূশয্যায় পতিত রহিয়াছেন। জো ব্যাকুল দৃষ্টিতে তাঁহার দিকে চাহিয়া আছে।
জো কহিল, “আপনার কি হয়েছে?”
“কিছু নয় জো। অকস্মাৎ বলশূন্য হয়েছিলাম।”
“আমার কাঁধের উপর ভর করে’ চলুন। ভিক্টোরিয়ায় ফিরে যাই।”
ফার্গুসন্ তাহাই করিলেন।
যাইতে যাইতে জো কহিল—“এমন করে কি একাকী আসতে আছে। এ ভাবে আর ক’দিন কাটবে? যদি বাতাস না উঠে, তবে ত আমরা তিন জনে একত্রে মারা যাব।”
ফার্গুসন নীরব রহিলেন। জো কহিল—
“আপনাদের মঙ্গলের জন্য আমি জীবন পণ করেছি। দু’জনের জন্য এক জনের আত্ম-বিসর্জ্জন করাই উচিত। আমি তাই করবো।”
“তাতে কি হ’বে জো? প্রাণ দিলে কি বাতাস এনে দিতে পরবে?”
“কিছু খাবার নিয়ে আমি পদব্রজে যাত্রা করতে চাই। হয় ত কোথাও একটা আশ্রয় খুঁজে পেতে পারি। কোন একটা গ্রাম পেলে মনের কথা গ্রামবাসীদের এক রকম করে’ বুঝিয়ে দিতেই পারবো। আমি সেখান থেকে আপনাদের জন্য জল আনবো। যদি এর মধ্যে বাতাস উঠে, আমার জন্য আপনারা তাপেক্ষা করবেন না।”
“এ অসম্ভব, জো। তুমি আমাদের ছেড়ে যেও না।”
“একটা ত উপায় করতে হবে। আমি গেলে ক্ষতি কি?”
“না জো, তা’ হ’বে না। এ বিপদের সময় আমরা এক, সঙ্গেই থাকবো। যদি মরতে হয়, একত্রেই মরবো। ধৈর্য্য ধরে’ অপেক্ষা করা ভিন্ন আর উপায় কি?”
“বেশ—আমি আর একদিনমাত্র দেখবো। যদি মঙ্গলবারেও বাতাস না উঠে আমি পদব্রজে যাত্রা করবো। কোন বাধাই মানবো না।”
কথা কহিতে কহিতে উভয়ে বেলুনের নিকটে আসিলেন। রাত্রি একরূপে কাটিয়া গেল।
প্রভাত হইতেই ফার্গুসন্ বায়ুমান-যন্ত্র পরীক্ষা করিতে লাগিলেন। কোনো পরিবর্ত্তন লক্ষিত হইল না। তিনি তখন নিম্নে অবতরণ করিয়া ভাল করিয়া আকাশের অবস্থা পর্য্যবেক্ষণ করিতে লাগিলেন। দেখিলেন, সূর্য্য তেমনি প্রখর —বালুকারাশি তেমনি তপ্ত—আকাশ তেমনি পরিচ্ছন্ন। তিনি আপন মনে বলিলেন, “তবে কি আমাদের শেষ সময়, সত্যই এসেছে!”
জো কোন কথা কহিল না। নীরবে বসিয়া তাহার যাত্রার কথা ভাবিতে লাগিল। কেনেডি অত্যন্ত উত্তেজিত হইয়া উঠিলেন। পিপাসায় তাঁহার কণ্ঠ জিহ্বা তালু সমস্তই শুষ্ক হইয়াছিল। সেই শুষ্ক কণ্ঠে ও জিহ্বায় এমন ক্ষত হইয়াছিল যে, কথা কহিবার শক্তিও তাঁহার ছিল না। বেলুনে যে, তখনো একটু জল ছিল, তাহা তিন জনেই জানিতেন। সেই কয়েক বিন্দু বারি নিঃশেষে পান করিয়া অন্ততঃ মুহূর্ত্তের জন্য কষ্টের লাঘব করিতে তিন জনেরই ইচ্ছা হইতেছিল। পরস্পর পরস্পরের দিকে তীব্র দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন। একটা পাশবিক ভাব মধ্যে মধ্যে তাঁহাদিগকে উত্তেজিত করিতে লাগিল।
কেনেডি আহত সিংহের ন্যায় হইলেন। তিনি সমস্ত দিন ধরিয়া প্রলাপ বকিলেন। জল—জল—একটু জল। কণ্ঠ পুড়িয়া গেল—বক্ষ ফাটিয়া গেল—এক বিন্দু জল। কেনেডি এক স্থানে স্থির থাকিতে পারিলেন না। কখনো সেই অগ্নিতুল্য বালুরাশির মধ্যে অবতরণ করিতে লাগিলেন, কখনো বেলুনে উঠিতে লাগিলেন। যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া নিজের অঙ্গুলি দংশন করিলেন! নিকটে ছুরি থাকিলে—তিনি হয়ত শিরা কাটিয়া আপন রুধির পান করিতেন!
কেনেডি অল্পকাল মধ্যেই দুর্ব্বল অবসন্ন দেহে শয্যা লইলেন এবং অপরাহ্ণেই উন্মত্তবৎ হইয়া উঠিলেন। জো-ও সেই সময় বুদ্ধি হারাইল! বিকারের ঘোরে সে দেখিল সম্মুখেই দিগন্তবিস্তৃত শীতল সলিল রৌদ্রকিরণে ঝকমক করিতেছে। জে কাল বিলম্ব না করিয়া উহা পান করিবার জন্য বেলুন হইতে ঝম্প দান করিল এবং পরক্ষণেই রৌদ্রতপ্ত বালুরাশি কর্তৃক দগ্ধ হইয়া যন্ত্রণায় ছটফট করিতে করিতে বেলুনমধ্যে পলায়ন করিল। আবার সেই ভ্রম—আবার জো সলিল বলিয়া বালুকার মধ্যে মুখ গুঁজিল! পরক্ষণেই বিরক্ত হইয়া কহিল— “এ জল কে খাবে——বড় লোণা।”
ফার্গুসন্ এবং কেনেডি তখন মৃতবৎ পড়িয়াছিলেন। জো আর পারিল না। কোনক্রমে জানুতে ভর করিয়া নিজের শক্তিহীন দেহকে টানিয়া লইয়া বেলুনে উঠিল এবং ক্ষিপ্র হস্তে জলের বোতলটী লইয়া পান করিতে আরম্ভ করিল। কেনেডি ইহা দেখিতে পাইয়াছিলেন। তিনিও কোন প্রকারে জোর নকটে উপস্থিত হইয়া ভীষণ কণ্ঠে কহিলেন—
“দাও—দাও—আমাকে দাও।”
জো তখন বিশ্ব-সংসার বিস্মৃত হইয়া জলপান করিতেছিল। কেনেডি পুনরায় কহিলেন—
“জো, তোমার চরণে ধরি—মিনতি—করি—একটু দাও। বেশী নয় এতটুকু জল। দাও জো দাও—প্রাণ যায়—রক্ষা কর—”
জো কাঁদিতে কাঁদিতে জলের বোতলটী—তাহার শেষ আশা, শেষ সম্বল কেনেডির হস্তে অর্পণ করিল।
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
মরু ঝটিকা
রাত্রি কিরূপে অতিবাহিত হইল, তাহা কেহ জানিল না। প্রভাতে প্রখর সূর্য্যের তাপে যখন হস্তপদ দগ্ধ হইতেছিল, তখন জো এবং কেনেডির মূর্চ্ছা ভঙ্গ হইল। তাঁহাদের মনে হইতে লাগিল, যেন পাদাঙ্গুলি হইতে ক্রমেই শুষ্ক হইয়া উঠিতেছে— দেহ পুড়িয়া ছাই হইতেছে। জো উঠিতে চেষ্টা করিল, পারিল না। ফিরিয়া চাহিয়া দেখিল, ফার্গুসন্ বেলুন মধ্যে পুত্তলিকাবৎ স্থির হইয়া বসিয়া একদৃষ্টে সুদূর আকাশ প্রান্তে চাহিয়া রহিয়াছেন। তাঁহার বাহুযুগ বক্ষোপরি স্থাপিত, চক্ষু পলকহীন, নিশ্চল।
কেনেডিকে তখন অতিশয় ভীষণ দেখাইতেছিল। পিঞ্জরাবদ্ধ সিংহের ন্যায় তিনি ইতস্ততঃ মস্তক নাড়িতেছিলেন। অকস্মাৎ বন্দুকের উপর তাঁহার দৃষ্টি পড়িল। কেনেডি উন্মত্তের ন্যায় উহা তুলিয়া লইলেন এবং নলটী মুখের ভিতর দিয়া যেই আত্মহত্যা করিবেন, অমনি জো তাঁহাকে ধরিয়া ফেলিল। চীৎকার করিয়া কহিল—“মিঃ কেনেডি করেন কি— করেন কি?
“ছেড়ে দাও—ছেড়ে দাও—দূর হও।”
কেনেডি জোকে সজোরে ধাক্কা দিলেন।
জো তাঁহাকে ছাড়িল না।
তখন উভয়ের মধ্যে মল্লযুদ্ধ আরম্ভ হইল। কেনেডি পণ করিয়াছিলেন আত্মহত্যা করিবেনই। তাহা নিবারণের জন্য জো প্রাণপণে চেষ্টা করিতেছিল। ফার্গুসন্ এ সব কিছুই দেখিতেছিলেন না। তখনো তিনি প্রস্তরগঠিতবৎ বসিয়া আকাশ-প্রান্তে চাহিয়াছিলেন।
মল্ল-যুদ্ধ করিতে করিতে কেনেডির বন্দুক হস্ত-চ্যুত হইল এবং ভূতলে পতিত হইবামাত্র সশব্দে আওয়াজ হইয়া গেল।
বন্দুকের শব্দে ফার্গুসনের চমক ভাঙ্গিল। তিনি হস্ত প্রসারণ পূর্ব্বক আকাশ দেখাইয়া বজ্রকণ্ঠে কহিলেন—
“দেখ—দেখ—ওই দূরে চেয়ে দেখ।”
ফার্গুসন্ এরূপ উত্তেজিতভাবে এই কথা কয়েকটা বলিলেন যে, জো এবং কেনেডি পরস্পর পরস্পরকে ছাড়িয়া দিয়া সেই দিকে চাহিলেন। দেখিলেন মরুক্ষেত্র যেন সহসা সজীব হইয়া উঠিয়াছে। বিশাল ঝটিকার সময় সমুদ্র যেমন পর্ব্বতপ্রমাণ তরঙ্গ তুলিয়া ছুটিতে থাকে, মরুসমুদ্রও তখন যেন তেমনি ছুটিয়া আসিতেছিল। বায়ুতাড়িত বালুকারাশি ভীষণ তরঙ্গের ন্যায় অগ্রসর হইতেছিল। দেখিতে দেখিতে ধূলিপটলে সমগ্র আকাশ সমাচ্ছন্ন হইয়া গেল—সূর্য্য আবৃত হইল।
ফার্গুসনের নয়নদ্বয় তখন অগ্নির ন্যায় ধক্ ধক্ জ্বলিতেছিল। তিনি উচ্চকণ্ঠে কহিলেন— “মরু ঝটিকা আস্ছে।”
জো চীৎকার করিয়া উঠিল—“ওই—ওই—মরুঝটিকা।”
কেনেডি কুপিত কণ্ঠে কহিলেন “বেশ হয়েছে! বেশ হয়েছে! আমাদের যম আস্ছে!”
ফার্গুসন্ ক্ষিপ্রহস্তে বেলুনের ভার ফেলিতে ফেলিতে বলিলেন—“যম নয় ডিক্—যম নয়! আমাদের পরম বন্ধু! আমাদের রক্ষার জন্যই বুঝি আজ মরুঝটিকা উঠেছে। এস—সত্বর হও। ভার ফেল।”
ফার্গুসন্ কহিলেন—“জো পঁচিশ সের।”
জো এবার বিনা বাক্যব্যয়ে পঁচিশ সের সোণার ভার নিক্ষেপ করিল! দেখিতে দেখিতে সেই প্রবল বালুকা-তরঙ্গ নিকটে আসিল—দেখিতে দেখিতে বাতাহত বেলুন কাঁপিয়া উঠিল, দুলিল এবং পরক্ষেণেই বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে উল্কার ন্যায় ছুটিতে লাগিল।
“জো—ফেল—ফেল—আরও ভার ফেল।”
ফার্গুসনের আদেশ মাত্র জো অনেকটা ভার ফেলিয়া দিল। বেলুন মুহূর্ত্তে সেই উত্তপ্ত বায়ুস্তরের উপরে উঠিল এবং বাত্যাতাড়িত বালুকার উপর দিয়া নক্ষত্রবেগে চলিতে লাগিল!
ফার্গুসন্, কেনেডি এবং জো নির্ব্বাক্ হইয়া বিস্ময়-বিস্ফারিত নেত্রে পরস্পরের মুখের দিকে চাহিতে লাগিলেন। আশায় ও উৎসাহে তিন জনেরই বদনমণ্ডল উজ্জ্বল হইয়া উঠিল।
বেলা ৩টার সময় ঝড় থামিল। আকাশ শান্ত মূর্ত্তি ধারণ করিল। ভিক্টোরিয়া তখন অচল হইয়া একটী উর্ব্বর ক্ষেত্রের শত হস্ত উপরে ভাসিতেছিল। তাঁহারা দেখিলেন বায়ুতাড়িত বালুকারাশি নানাস্থানে পুঞ্জীভূত হইয়া বেলুনের দক্ষিণে, বামে ও সম্মুখে শত সহস্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পর্ব্বতের সৃষ্টি করিয়াছে। অদূরে পত্রে পুষ্পে শোভিত বৃক্ষাদি পরিপূর্ণ উর্বর ক্ষেত্রগুলি সমুদ্র মধ্যে দ্বীপবৎ দেখা যাইতেছে।
ফার্গুসন্ কহিলেন—“নিশ্চয়ই এখানে জল আছে।”
তিনি খানিকটা গ্যাস ছাড়িয়া দিয়া বেলুনকে নামাইলেন। কেনেডি এবং জো মূহূর্ত্তে লম্ফ দিয়া নিম্নে অবতরণ করিলেন। ফার্গুসন্ কহিলেন—“মরু-ঝটিকার কি দারুণ বেগ! আমরা ৪ ঘণ্টায় প্রায় ২৪০ মাইল পথ এসেছি!”
কেনেডি এবং জো জলের সন্ধানে যাইতেছিলেন দেখিয়া ফার্গুসন কহিলেন—“বন্দুক নিয়ে যাও! খুব সাবধানে যেও, ডিক্। চারিদিকে চোখ রেখো।”
তাঁহারা উভয়ে ঊর্দ্ধশ্বাসে দৌড়িলেন। জল— জল—একবিন্দু জল। সম্মুখে বৃক্ষ-লতা-পরিবেষ্টিত স্থান দেখিয়াই তাঁহারা বুঝিয়াছিলেন, এখানে জল আছে। পিপাসায় কণ্ঠনালী পর্য্যন্ত তখন শুষ্ক, জিহ্বায় ক্ষত হইয়াছে—শরীর জ্বলিয়া যাইতেছে। তখন কি আর ধীর বিবেচনার সময় থাকে। কেনেডি এবং জো প্রাণপণে দৌড়াইলেন! যদি তাঁহারা ধীরে যাইতেন, তাহা হইলে দেখিতেন যে, সেই সিক্ত ভূমির উপর বৃহৎ বৃহৎ পদচিহ্ন বর্তমান রহিয়াছে।!
ও কিসের গর্জ্জন? তাঁহারা থমকিয়া দাঁড়াইলেন। সে ভীষণ গর্জ্জনে বৃক্ষ লতা গুল্ম সমস্তই যেন কম্পিত হইয়া উঠিল আবার—আবার—সেই ভীষণ গর্জ্জন!
জো কহিল—“নিকটেই সিংহ ডাকছে!”
কেনেডি তখন মরিয়া হইয়াছিলেন। আর একটু অগ্রসর হইলেই যথেচ্ছা শীতল বারি পান করেন, অথচ এ কি বিঘ্ন উপস্থিত হইল! তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে কহিলেন—
“বেশ হয়েছে—চল—এগিয়ে চল!”!
“মিঃ কেনেডি আপনি একজন বিখ্যাত শিকারী, মনে রাখবেন আপনার উপরেই আমাদের জীবন নির্ভর করছে। একটু সাবধানে চলুন।”
কেনেডি সে কথায় কর্ণপাত করিলেন না।
দুই চারি পদ অগ্রসর হইয়াই তাঁহারা দেখিলেন, একটী তাল-বৃক্ষের নিম্নে প্রকাণ্ড একটা সিংহ লাঙ্গুল আস্ফালন করিতেছে। তাহার কৃষ্ণ বর্ণ কেশরগুলি দুলিতেছে, চক্ষু অগ্নিপিণ্ডবৎ জ্বলিতেছে, রসনা রসনা লক্লক্ করিতেছে! পলক ফেলিতে না ফেলিতে সিংহ তাঁহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া লম্ফ প্রদান করিল!
গুড়ুম্—কেনেডির বন্দুকের ধ্বনি হইল গুড়ুম্!
তাঁহার গুলির আঘাতে পশুরাজ একটী বিকট চিৎকার করিয়া ভূপৃষ্ঠে পতিত হইল এবং তম্মুহূর্ত্তেই প্রাণ ত্যাগ করিল।
কেনেডি সেদিকে ভ্রূক্ষেপও করিলেন না। একদৌড়ে নিকটস্থ কূপের নিকট গমন করিলেন এবং পিচ্ছিল প্রস্তর সোপানাবলী বহিয়া নিম্নে নামিয়াই প্রাণ ভরিয়া জল পান করিতে লাগিলেন। জোও তদ্রূপ করিল।
জল পান করিতে করিতে নিশ্বাস লইবার জন্য মুখ তুলিয়া জো কহিল—“সাবধান! অত খাবেন না। এখনই অসুখ করবে।”
কেনেডি শুনিলেন না। যদৃচ্ছা জল পান করিতে লাগিলেন। জলে হস্ত পদ ডুবাইলেন। মস্তক ধুইয়া ফেলিলেন—সর্ব্বাঙ্গ সিক্ত করিলেন।
জো কহিল— “ডাক্তার ফার্গুসন্ জলের আশায় বসে আছেন। চলুন—চলুন জল নিয়ে যাই।”
কেনেডি তাড়াতাড়ি বোতল পূর্ণ করিয়া জল লইলেন এবং সোপান বহিয়া উপরে উঠিতে লাগিলেন।
ও কি? কেনেডি অর্দ্ধ পথে থামিয়া গেলেন।
দেখিলেন আর একটা প্রকাণ্ড সিংহ কূপের মুখে দণ্ডায়মান রহিয়াছে!
সিংহ একটা বিকট গর্জ্জন করিয়া উঠিল!
কেনেডি কহিলেন—“এটা সিংহিনী! দাঁড়াও—দেখাচ্ছি!” তাঁহার নয়নদ্বয় জ্বলিয়া উঠিল। তিনি বন্দুকে গুলি পূরিলেন। চক্ষের পলক ফেলিতে না ফেলিতে আওয়াজ করিলেন। সিংহিনী আহত হইয়া সরিয়া গেল।
কেনেডি অগ্রসর হইলেন। কহিলেন—“পালিয়েছে জো, চলে এস।”
“না—না—যাবেন না। সিংহিনী মরে নাই। নিশ্চয়ই মুখের কাছে লুকিয়ে আছে। যিনি আগে উঠবেন তাঁর ঘাড়েই লাফিয়ে পড়বে।”
“ফার্গুসন্ যে এক ফোঁটা জলের জন্য পথ চেয়ে আছে! তার প্রাণ যে যায়! চল—যেতেই হ’বে।”
“সিংহিনীটাকে বধ করে’ এখনি যাচ্ছি চলুন।”
এই বলিয়া জো তাহার জামা খুলিয়া বন্দুকের নলের সঙ্গে বাঁধিয়া তুলিয়া ধরিল। বলিল—“মিঃ কেনেডি, আপনি প্রস্তুত থাকুন—”
মুহূর্ত্ত মধ্যে কুপিতা সিংহিনী বন্দুকের উপর লাফাইয়া পড়িল। কেনেডি প্রস্তুত ছিলেন, গুলি করিলেন। সিংহিনী চীৎকার করিতে করিতে কূপ মধ্যে গড়াইয়া পড়িল। ধাক্কা লাগিয়া জোও পতিত হইল। তাহাকে আঘাত করিবার জন্য সিংহিনী তাহার বৃহৎ ‘থাবা’ তুলিল। জো চক্ষু মুদিল!
পরক্ষণেই আর একটী বন্দুকের শব্দ হইল। সিংহিনী শেষ আর্ত্তনাদ কূপের ভিতরে ঘুরিয়া ঘুরিরা ফিরিতে লাগিল। জো পলক মধ্যে লম্ফ দিয়া উঠিল এবং সেই বারিপূর্ণ বোতলটা ফার্গুসনের হস্তে প্রদান করিল!
ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ
অজ্ঞাত জনপদ
রজনী নির্ব্বেঘ্নে অতিবাহিত হইল। প্রভাতেই মরুসূর্য্য প্রখর কিরণজাল বিস্তার করিয়া উদিত হইল। ফার্গুসন্ সুবাতাসের অপেক্ষায় রহিলেন। সমস্ত দিবস কাটিয়া গেল। দুর্ব্বল শরীর ধীরে ধীরে সুস্থ ও সবল হইয়া উঠিল। লুপ্ত-শক্তি ফিরিয়া আসিল। শক্তির সঙ্গে সঙ্গে ভরসা এবং ভরসার সঙ্গে সাহস আসিয়া দেখা দিল। মানুষ অল্পেই অতীতের কথা বিস্মৃত হয়। ক্রমে সন্ধ্যা হইল। উজ্জ্বল নক্ষত্রখচিত আকাশের দিকে চাহিয়া চাহিয়া পর্যটকত্রয় কত কি চিন্তা করিতে লাগিলেন।
পরদিন প্রভাতেও আকাশের কোনো পরিবর্ত্তন লক্ষিত হইল না। বাতাস অতি ধীরে বহিতেছিল। ফার্গুসন্ ক্রমেই চঞ্চল হইতে লাগিলেন। ভাবিলেন, জলের অভাবে মরিতে বসিয়াছিলাম। জল যদি পাইলাম, তবে কি খাদ্যের অভাবে মরুপ্রান্তরে প্রাণ যাইবে!
মধ্যাহ্নে ফার্গুসন্ যাত্রার আয়োজন করিলেন। আবশ্যক মত জল তুলিয়া লওয়া হইল। খানিকটা ভার ফেলিয়া দিয়া বেলুনকে আরো হাল্কা করা হইল। এবার সোণার ভার ফেলিতে জো’র বড় কষ্ট হইতেছিল! কিন্তু উপায় ছিল না। ভার না ফেলিলে বেলুনের উঠিবার সম্ভাবনা ছিল না।
যাত্রার আয়োজন করিয়া ফার্গুসন্ বসিয়া রহিলেন। রজনী শেষে প্রবল ঝটিকা দেখা দিল। ঝড়ের মুখে বেলুন ছুটিতে লাগিল। প্রভাতে স্থানে স্থানে বৃক্ষলতাদির অস্তিত্ব সূচিত হইতে লাগিল। কোন কোন স্থানে শরবণ দেখা যাইতে লাগিল। দূরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পর্ব্বতগাত্রে গুল্মাদি দেখিয়া ফার্গুসন্ কহিলেন—
“আমরা মরুভূমি পার হয়েছি।”
সঙ্গীরা আনন্দে করতালি দিল। ভিক্টোরিয়া তখন একটা ক্ষুদ্র হ্রদের উপর দিয়া যাইতেছিল। হ্রদের তীরে সবলকায় ষণ্ডগুলি ঘন ঘাসের মধ্যে বিচরণ করিতেছিল। ধূসর, কালো এবং কপিশ বর্ণের বৃহদাকার হস্তিগণ দলবদ্ধ হইয়া বৃক্ষাদি ভগ্ন করিয়া ইতস্ততঃ বিচরণ করিতেছিল।
কেনেডি আনন্দে অধীর হইয়া কহিলেন—“দেখ, দেখ, কি সুন্দর হাতী। যদি নামতে পারতেম——এমন শিকার চলে’ যাচ্ছে!”
বেলুন চলিতে লাগিল। পর্ব্বতের কানন-সমাকুল অংশে অগণিত ক্ষুদ্র বৃহৎ জলধারা প্রবাহিত হইয়া হ্রদ মধ্যে পতিত হইতেছিল। হরিৎ, পীত, নীল, লাল, সবুজ, শ্বেত, নানাবর্ণের বিহঙ্গমগণ কলরব করিতে করিতে বৃক্ষ হইতে বৃক্ষান্তরে, শৈল হইতে শৈলান্তরে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়িয়া যাইতেছিল।
দ্বাদশ ঘণ্টা অতিবাহিত হইল। ভিক্টোরিয়া তখন একটী নদীবিধৌত জনপদে আসিয়া উপনীত হইয়াছিল। বহু দূরে অলণ্টিকা পর্ব্বতের চূড়া তখন দৃষ্টিগোচর হইতেছিল। ফার্গুসন্ বলিলেন—
“কোন য়ুরোপীয় এ পর্য্যন্ত ওই পর্ব্বতের উপর যেতে পারে নাই। শুনা যায় অলণ্টিকা পর্ব্বতের গা থেকেই আফ্রিকার পশ্চিমাংশের নদ নদী জন্মলাভ করেছে।”
বেলুন ক্রমেই সম্মুখে অগ্রসর হইতেছিল। সন্ধ্যার প্রাক্কালে মিনিক্ পর্ব্বতের দুইটি শৃঙ্গ দেখা গেল। ফার্গুসন্ একটি উচ্চ বৃক্ষশিরে বেলুন আবদ্ধ করিলেন। প্রবল ঝড়ে উহা এমন দুলিতে লাগিল যে, মনে হইতে লাগিল তাঁহারা বেলুন হইতে নিশ্চয়ই ভূতলে নিক্ষিপ্ত হইবেন। বেলুনে অবস্থান তখন একান্ত বিপজ্জনক ও কষ্টকর হইয়া উঠিয়াছিল।
পরদিন পর্য্যন্ত অল্প ঝড় ছিল। বেলুন নিরাপদে চলিতে লাগিল। বায়ুপ্রবাহ বেলুনকে মিনিক্ পর্ব্বতের দিকে লইয়া যাইতেছিল। ফার্গুসন্ কিছুতেই বেলুনের গতি ফিরাইতে পারিলেন না! চ্যাড-হ্রদ এবং নাইগার নদীর মধ্যস্থলে মিনিক্ পর্ব্বত একটি দূরতিক্রম্য প্রাকারের ন্যায় অবস্থিত। অল্পকাল মধ্যেই ভিক্টোরিয়া মিনিক্ শৈলের নিকটবর্ত্তী হইল। ফার্গুসন্ গ্যাসে তাপ দিতে লাগিলেন। বেলুন ৮০০০ ফিট উপরে উঠিল। দারুণ শীত বোধ হইতে লাগিল। তাঁহারা কম্বলে শরীর আচ্ছাদন করিয়া বসিলেন। পর্ব্বত অতিক্রম করিয়া ফার্গুসন্ সন্ধ্যার পূর্ব্বে একটি মুক্ত প্রান্তর মধ্যে নোঙ্গর করিলেন।
পরদিন যখন তাঁহারা মোসেইয়া নগরের নিকটবর্ত্তী হইলেন, তখন প্রভাত হইয়াছে।
দুইটি উচ্চ পর্ব্বতের মধ্যে মোসেইয়া নগর অবস্থিত! একদিকে কানন ও অপর দিকে কর্দ্দমপূর্ণ বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র। এতদুভয়ের মধ্য দিয়া মোসেইয়া নগর প্রবেশের একটি মাত্র পথ ছিল। মোসেইয়ার প্রধান শেখ তখন সদলবলে সেই পথে নগরে প্রবেশ করিতেছিলেন। তাঁহার শরীররক্ষক অশ্বারোহিগণ নানা বর্ণে সুরঞ্জিত পরিচ্ছদ পরিধানপূর্ব্বক অগ্রবর্ত্তী হুইয়াছিল। তাহাদিগের পুরোভাগে একদল বাদক বংশীবাদন করিতে করিতে যাইতেছিল। বংশীবাদকদিগের অগ্রে আর একদল শস্ত্রধারী পুরুষ পথিপার্শ্বে অবস্থিত বৃক্ষাদির শাখাপ্রশাখা কাটিয়া পথ পরিষ্কার করিতে করিতে চলিয়াছিল।
এই শোভাযাত্রা দেখিবার জন্য ফার্গুসন্ অনেকটা নীচে নামিলেন। নিগ্রোগণ যখন দেখিল যে, বেলুনটি ক্রমেই বৃহদাকার হইতেছে, তখন ভয়ে পলায়ন করিল! শেখ নড়িলেন না। তাঁহার সুদীর্ঘ বন্দুকে গুলি পূরিয়া স্থিরভাবে অবস্থান করিলেন।
ফার্গুসন্ ১৫০ ফিট উপরে থাকিয়া আরব্য ভাষায় শেখকে অভিনন্দন করিলেন। স্বর্গ হইতে আহ্বান-ধ্বনি আসিতেছে শুনিয়া, শেখ সসম্ভ্রমে আপন অশ্ব হইতে অবতরণ করিলেন এবং ভূলুণ্ঠিত হইয়া প্রণাম করিলেন।
কেনেডি জিজ্ঞাসা করিলেন—“এখানে কি কোনো দিন কোনো ইংরাজ এসেছিলেন?”
ফার্গুসন্ কহিলেন—“এসেছিলেন বৈ কি! মেজর ডেনহাম এসেছিলেন। এখানে তিনি অত্যন্ত বিপদগ্রস্ত হয়েছিলেন। তাঁর যথাসর্ববস্ব লুণ্ঠিত হয়েছিল। একটা ঘোড়ার পেটের নীচে লুকিয়ে তিনি কোনো প্রকারে জীবন রক্ষা করেছিলেন।”
“আমরা এখন কোন্ দিকে যাচ্ছি, ফার্গুসন্?”
আমরা বার্ঘিমি রাজ্যের দিকে অগ্রসর হয়েছি। ভোগেল সেখানে গিয়েছিলেন। কেউ বলে, তিনি সেখানেই নিহত হয়েছিলেন, কেউ বলে, বন্দী অবস্থায় ছিলেন।”
“সম্মুখে যে উর্ব্বর প্রদেশটা দেখছি, এটা কোন্ দেশ? বাঃ কি সুন্দর ফুল ফুটেছে! এখানে দেখছি তুলার আবাদ হয়। নীলও দেখতে পাচ্ছি।”
“এর নাম মাণ্ডারা। ডাক্তার বার্থ এ প্রদেশের যে বর্ণনা করেছেন, তা’ দেখছি অক্ষরে অক্ষরে সত্য। ওই যে নদী দেখছ—কতকগুলি ঢোঙ্গা ভেসে আসছে—ওর নাম সারি নদী।”
অল্পকাল মধ্যেই বায়ুর বেগ মন্দীভূত হইয়া আসিল দেখিয়া ফার্গুসন্ কহিলেন—“আমরা কি এখানে আট্কে যাব না কি?”
“জলের ত আর অভাব নাই। যদি আট্কাই, তবেই বা এত ভয় কি?”
“জলের জন্য নয় ডিক্, মানুষের ভয় আছে!”
অদূরে একটী নগর দেখিয়া জো বলিল—“ওই যে নগর দেখা যাচ্ছে, ওর নাম কি?”
“ওটা কান্যাক্। এই খানেই হতভাগ্য পর্য্যটক টুলির বলি হয়েছিল! এ দেশকে য়ুরোপের সমাধিক্ষেত্র বল্লেও চলে।”
বেলুন কার্ন্যাকের উপর আসিল। পর্য্যটকগণ দেখিলেন, নিগ্রো তন্তুবায়গণ বৃক্ষশাখায় নবনির্ম্মিত বস্ত্র ঝুলাইয়া পিটিতেছে। নগরের বিস্তৃত রাজপথ এবং পথিপার্শ্বে নাগরিকদিগের শ্রেণীবদ্ধ গৃহাদি বেশ সুস্পষ্ট দেখা যাইতেছিল। একটী স্থানে দাসগণ বিক্রীত হইতেছিল। বেলুন দেখিয়া নিগ্রোগণ বিকট চীৎকার করিয়া উঠিল এবং পরক্ষণেই পলায়ন করিল।
ফার্গুসন্ আরো নিম্নে বেলুন নামাইলেন। দেখিলেন, নগরকোতোয়াল একটি নীল পতাকা হস্তে গৃহের বাহিরে আসিলেন। বাদকগণ ভীমনাদে বাদ্য করিতে লাগিল। শিঙ্গার শব্দে দিঙ্মণ্ডল প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিল। কতকগুলি নিগ্রো আসিয়া তাঁহাকে ঘিরিয়া দণ্ডায়মান হইল। নাগরিকদিগের ললাট উচ্চ, কেশদাম কুঞ্চিত, নাসিকা সুদীর্ঘ। তাহাদিগকে দেখিয়া বুদ্ধিমান্ এবং গর্ব্বিত বলিয়া মনে হইতে লাগিল। দেখা গেল, সৈন্যসমাবেশ হইতেছে। ফার্গুসন্ বুঝিলেন, বেলুনের সঙ্গে যুদ্ধ করাই তাহাদের উদ্দেশ্য।
জো নানা বর্ণের রুমাল লইয়া নানা ভাবে নাড়িতে লাগিল। তাহার ইচ্ছা সঙ্কেতে সন্ধির প্রস্তাব করে। উহারা সে সঙ্কেত বুঝিল না। কান্যাক-কর্ত্তা সমবেত জনমণ্ডলীকে কি যেন বলিলেন। ফার্গুসন্ এইটুকু মাত্র বুঝিলেন যে, নিগ্রোগণ তাঁহাদিগকে স্থান ত্যাগ করিতে বলিতেছে।
দুর্জ্জনের সঙ্গ ত্যাগ করিবার জন্য ফার্গুসন্ সর্বদাই প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু তাঁহাকে বহিবার মত বাতাস ছিল না। বেলুন চলিল না!
কাফ্রিরা অত্যন্ত কুপিত হইয়া উঠিল! কোতোয়ালের পারিষদবর্গ রোষে গর্জ্জন করিতে আরম্ভ করিল।
পারিষদদিগের পরিচ্ছদ অভিনব। তাহারা প্রত্যেকে পাঁচ ছয়টি করিয়া জামা গায়ে দিয়াছিল। ফার্গুসন্ বলিলেন—
“বৃহৎ উদর এবং পরিহিত জামার সংখ্যাই পারিষদদিগের ভিন্ন ভিন্ন রাজপদ সূচিত করে। যাহার উদর বৃহৎ নহে, সে নানাবিধ কৌশল অবলম্বনে বৃকোদররূপে সকলের সম্মুখে উপস্থিত হয়!”
তাহারা যখন দেখিল যে, ভয়-প্রদর্শনেও দৈত্য নড়িল না, তখন কাফ্রি তীরন্দাজগণ শ্রেণীবদ্ধ হইয়া দণ্ডায়মান হইল। বেলুন তখন অল্পে অল্পে উপরে উঠিতেছিল। কোতোয়াল স্বয়ং একটি বন্দুক লইয়া বেলুন লক্ষ্য করিতেছে দেখিয়া, কেনেডি অব্যর্থ সন্ধানে গুলি চালনা করিয়া তাহার বন্দুক ভাঙ্গিয়া দিলেন। এই আকস্মিক বিপদ্ দর্শনে যুদ্ধার্থী কাফ্রিগণ ঊর্দ্ধশ্বাসে পলায়ন করিল।
রাত্রি আসিল। তখনো বায়ুর বেগ বর্দ্ধিত হইল না। ফার্গুসন্ নগরের ৩০০ ফিট উচ্চে ভাসিতে লাগিলেন। নগরে আলোক মাত্র জ্বলিল না—শব্দমাত্র হইল না।
রজনী দ্বিপ্রহর হইল। অকস্মাৎ তাঁহারা দেখিলেন, সমগ্র কার্ন্যাক্ নগরে একটা বিপুল অগ্নিকাণ্ড উপস্থিত হইয়াছে। চারিদিক্ হইতে অসংখ্য অগ্নিমুখ খধূপ ঊর্দ্ধে উঠিতেছে। ভীষণ চিৎকার ও ঘন ঘন বন্দুকের ধ্বনির মধ্যে খধূপগুলি যেন বেলুন লক্ষ্য করিয়াই উপরে উঠিতেছিল।
অল্পক্ষণ মধ্যেই ফার্গুসন্ বুঝিলেন, যাহা তিনি খধূপ মনে করিয়াছিলেন, তাহা খধূপ নহে—পারাবত। শত সহস্র পারাবতের পুচ্ছে দাহ্য পদার্থ বাঁধিয়া দিয়া কাফ্রিরা বেলুন আক্রমণ করিবার জন্য উড়াইয়া দিয়াছিল। পারাবতগণ বেলুন দেখিয়া ভীত হইয়া তীর্য্যগ্ ভাবে উড়িতেছিল। মনে হইতেছিল, অন্ধকার আকাশ গাত্রে শত সহস্র অগ্নিরেখা তীর্য্যগ্ ভাবে ঘুরিতেছে। পারাবতগুলি ক্রমে বেলুনের চতুদ্দিক্ ঘিরিয়া ধরিল। বেলুন সেই অনল-সমুদ্রে ভাসিতে লাগিল।
ফার্গুসন্ তন্মুহূর্ত্তেই কিছু ভারা নিক্ষেপ করিয়া অনেক উপরে উঠিয়া গেলেন। পারাবতগুলি প্রায় দুই ঘণ্টা পর্য্যন্ত শূন্যে ভ্রমণ করিয়া শেষে নামিয়া পড়িল।
ফার্গুসন্ বলিলেন—“এখন আর চিন্তা নাই। এস, ঘুমানো যাক। এদের কৌশলটা বেশ। যুদ্ধের সময় ওরা অমনি করে’ শত্রুর গৃহে অগ্নি সংযোগ করে।”
নির্বিঘ্নে রজনী প্রভাত হইল। প্রভাতে ফার্গুসন্ বলিলেন—
“আমাদের কপাল ফিরেছে, ডিক্। আমরা বোধ হয়, আজই আবার চ্যাড হ্রদ দেখতে পাব।”
“এতদিন পাহাড়, প্রান্তর, কানন, মরুভূমির উপর দিয়ে এসেছি। এখন জলের উপর দিয়ে গেলে একটু নূতন হ’বে বটে।”
“আমরা ১৮ই এপ্রিল জান্জিবার ছেড়েছি। আজ ১২ই মে। বেলুনের উপরই ত এ কয়দিন কেটে গেল! আর দশ দিনেই আমরা পৌঁছে যাব।”
“কোথায়?”
“তা’ জানি না।”
ভিক্টোরিয়া তখন সারি নদীর উপর দিয়া যাইতেছিল। নদীর উভয় তীর বৃক্ষসমাচ্ছন্ন। নানা বর্ণের নানা রকমের লতা সেই সকল বৃক্ষ আশ্রয় করিয়া উঠিয়া নদীতীর অতি মনোরম করিয়া তুলিয়াছিল। যে দিকে দৃষ্টি চলে সেই দিকেই বন—সেই দিকেই গন্ধ, সেই দিকেই শোভা। স্থানে স্থানে দুই একটা কুম্ভীর গা ভাসাইয়া রৌদ্র পোহাইতেছিল—কোথাও বা তীব্র জলোচ্ছ্বাস করিয়া ডুব দিতেছিল।
বেলা নয়টার সময় বেলুন চ্যাড হ্রদের দক্ষিণ তীরে আসিয়া উপনীত হইল।
বিংশ পরিচ্ছেদ
বিরাট আত্মত্যাগ
চ্যাড হ্রদের সমীপবর্ত্তী হইবার পর হইতেই ভিক্টোরিয়া পশ্চিম মুখে চালিত হইতেছিল। বেলা ১টার সময় অদূরে কৌফা নগর দেখা গেল। নগরের শ্বেতাভ মৃন্ময় প্রাচীর, মসজেদ এবং গৃহাদি দেখা যাইতে লাগিল। গৃহাঙ্গনে সুদীর্ঘ তরুগুলি ফলে পত্রে সুশোভিত হইয়া অতি সুন্দর দেখাইতেছিল।
কৌফা নগর দুই ভাগে বিভক্ত। একাংশের গৃহগুলি অপেক্ষাকৃত বৃহৎ ও সুসজ্জিত। দেখিলেই মনে হয়, ধনীর আবাসগৃহ। অপরাংশের গৃহাদি ক্ষুদ্র এবং অপরিচ্ছন্ন। ফার্গুসন্ ভাবিয়াছিলেন, বেশ ভাল করিয়া নগরটা দেখিবেন। কিন্তু তাহা ঘটিল না। অকস্মাৎ একটা বিপরীতগামী বায়ু-প্রবাহ বেলুনকে স্পর্শ করিল। ফার্গুসন্ বেলুনের গতি রোধ করিতে পারিলেন না। উহা চ্যাড হ্রদের উপর দিয়া চলিতে লাগিল।
হ্রদের মধ্যে কতকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ ছিল। তাহাদের একটীতে জলদস্যুগণ বাস করিত। উহারা তীর ও ধনুক লইয়া বেলুন আক্রমণ করিল।
বেলুন যেরূপ বেগে যাইতেছিল, তাহাতে দ্বীপপুঞ্জ অল্পকাল মধ্যেই দূরে পড়িয়া রহিল।
জো তখন কেনেডিকে কহিতেছিল, “আপনার কত শীকার জুটেছে—ওই দেখুন।”
“কি জো?”
“দেখছেন না, কতকগুলো বৃহদাকার পক্ষী এই দিকেই উড়ে আসছে।”
ফার্গুসন্ দূরবীক্ষণ লইয়া কহিলেন—“পক্ষী! কৈ দেখি।”
কেনেডি বলিলেন—“আমি দেখেছি। প্রায় দশ বারটা হবে।”
ফার্গুসন চিন্তিত হইয়া কহিলেন—“পাখীগুলো তফাতে গেলেই ভাল হ’তো, ডিক্। ও গুলো এক রকমের গিরবাজ! এক একটা মস্ত হয়। ওরা যদি দলবদ্ধ হ’য়ে বেলুন আক্রমণ করে—”
বাধা দিয়া কেনেডি বলিলেন—“ভয় কি, ফার্গুসন্। আমাদের বন্দুক আছে—গুলি বারুদ আছে।”
অল্পক্ষণ মধ্যেই পক্ষীগুলি নিকটে আসিল। উহাদের কর্কশ কণ্ঠ চতুর্দ্দিকে ধ্বনিত হইতে লাগিল। বেলুন দেখিয়া উহারা কিছু মাত্র ভীত হইল না, বরং কুপিত হইল।
জো কহিল—“পাখীগুলো কি চীৎকারই কচ্ছে! ওদের রাজ্য আমরা দখল করে’ নিয়েছি বলে’ বুঝি বড় রেগেছে।”
কেনেডি কহিলেন—“ওদের চেহারা ত বড় ভীষণ। দেখলেই ভয় হয়। ভাগ্যে ওদের বন্দুক নাই!”
ফার্গুসন্ আরো চিন্তিত হইয়া কহিলেন—“ওদের বন্দুক লাগে না।”
পক্ষীগুলি শূন্যে বৃত্তাকারে ভিক্টোরিয়ার চতুর্দ্দিকে ঘুরিতে লাগিল। বৃত্ত ক্রমেই ক্ষুদ্র হইতে লাগিল।
ফার্গুসন আরো উপরে উঠিলেন।
পক্ষীরাও ঊর্দ্ধে উঠিতে লাগিল।
কেনেডি কহিলেন—“মারি।”
“না না কেনেডি—মের না। তা’ হ’লে ওরা নিশ্চয়ই বেলুনের উপর পড়বে।”
“তাতে ক্ষতি কি! আমার গুলির অভাব নাই। সব গুলো পাখীই মেরে দিচ্ছি। একটু দাঁড়াও না।”
“ধৈর্য্য ধর, ডিক্। গুলি করার জন্য প্রস্তুত হ’য়ে থাক। আমি না বল্লে মের না।”
পক্ষীগণ ততক্ষণ বেলুনের নিকটে আসিয়াছিল। উহাদের রঞ্জিত চূড়া, শ্বেত পক্ষ রৌদ্রে অতিশয় উজ্জ্বল দেখাইতেছিল। ফার্গুসন্ বলিলেন—“দেখছ না, ওরা অনুসরণ কচ্ছে।”
কেনেডি হাসিয়া কহিলেন—
“১৪ টা ত পাখী দেখছি। তুমি অত ভাবছ কেন, ভাই! ওদের যদি মারতে না পারি, তবে আমার শিকারী নাম বৃথা!”
“তোমার সন্ধান যে অব্যর্থ তা’ জানি। মনে কর, ওরা যদি বেলুনের মাথা আক্রমণ করে, তুমি ত তা’ হ’লে দেখতেই পাবে না। মারবে কেমন করে? ধারালো ঠোট দিয়ে ওরা বেলুনের রেশমের আবরণটা ছিঁড়ে ফেলবে। ভাব দেখি একবার! আমরা যে ৮০০০ ফিট উপরে আছি ডিক্!”
ঠিক সেই সময়ে একটা বাজ মুখ ব্যাদান করিয়া বেলুনের দিকে অগ্রসর হইল।
ফার্গুসন্ হাঁকিলেন— “মার—”
গুড়ুম্। কেনেডির বন্দুক ডাকিল। পরক্ষণেই একটী পক্ষী মরিয়া ঘুরিতে ঘুরিতে পড়িতে লাগিল। জো বন্দুক তুলিয়া লইল।
মুহূর্ত্তের জন্য পক্ষীগুলি ভীত হইল—মুহূর্ত্তের জন্য স্থির হইল। পরক্ষণেই বর্দ্ধিত বিক্রমে বেলুন আক্রমণ করিল।
আবার কেনেডি একটী পক্ষী নিহত করিলেন। জো আর একটীর পক্ষ ভাঙ্গিয়া দিল।
উহারা আক্রমণ-প্রণালী পরিবর্ত্তিত করিল এবং সকলে একসঙ্গে ভিক্টোরিয়ার উপর উড়িয়া উঠিল।
কেনেডি ফার্গুসনের দিকে চাহিলেন। তাঁহার মুখ তখন বিবর্ণ হইয়া গেল।
ফর্—ফর্—ফর্—! পর মুহূর্ত্তেই শব্দ হইল ফর্—ফর্— ফর্! কেনেডির মুখের কথা মুখেই রহিল। মনে হইল বেলুন চরণ-তলে নামিয়া পড়িতেছে।
ফার্গুসন্ চীৎকার করিয়া উঠিলেন—
“সর্ব্বনাশ হলো! রেশম ছিঁড়েছে! ভারা ফেল—ভারা ফেল!” মুহূর্ত্তে বেলুনের সমস্ত ভারা—জো’র বহু যত্নে সঞ্চিত স্বর্ণরাশি চ্যাড-হ্রদ মধ্যে নিক্ষিপ্ত হইল।
বেলুন নামিতেই লাগিল।
জো জলের বাক্স ফেলিয়া দিল। বেলুন থামিল না। ফার্গুসন্ সেই বিপুলকায় হ্রদের দিকে চাহিলেন। মনে হইতে লাগিল যেন তাঁহাদিগকে গ্রাস করিবার জন্য চ্যাড হ্রদের বারি—রাশি প্রতিমুহূর্ত্তে উর্দ্ধে উঠিতেছে। তিনি ব্যস্ত হইয়া কহিলেন—
“জো খাবারগুলো ফেল—তাড়াতাড়ি— তাড়াতাড়ি!”
যে বাক্সে খাদ্য-সামগ্রী ছিল, তাহা পরমুহূর্ত্তেই হ্রদ মধ্যে নিক্ষিপ্ত হইল। বেলুনের পতন-বেগ কমিল বটে, কিন্তু থামিল না।
ফার্গুসন্ হাঁকিলেন—“যা কিছু আছে, সব ফেলে দাও—সব ফেলে দাও!”
কেনেডি ব্যাকুল হইয়া বলিলেন—“আর ত কিছু নাই!”
জো গভীর কণ্ঠে কহিল—“নাই কেন? এখনো আছে—”
পরমুহূর্ত্তেই সে বেলুন হইতে লম্ফ প্রদান করিল।
ফার্গুসন্ ভীত কণ্ঠে ডাকিলেন—“জো—জো—”
জো তখন ভীম বেগে হ্রদ মধ্যে পতিত হইতেছিল। বেলুন পলকে সহস্র ফিট উপরে উঠিয়া গেল। বেলুনের ছিন্ন প্রথম আবরণের মধ্যে বায়ু প্রবেশ করিয়া, উহাকে হ্রদের উত্তর তীরে লইয়া চলিল।
একান্ত হতাশ হইয়া বাষ্পনিরুদ্ধ কণ্ঠে কেনেডি বলিলেন—
“যাঃ—সব গেল!”
“আমাদের বাঁচাবার জন্যই গেল!”
উভয়ের চক্ষু জলে ভরিয়া উঠিল। জো’কে একবার দেখিবার জন্য তাঁহারা বারংবার নিম্নে চাহিতে লাগিলেন।
তাহাকে আর দেখা গেল না!
একবিংশ পরিচ্ছেদ
অনুসন্ধান
কেনেডি কহিলেন— “এখন কি করবে, ফার্গুসন্?”
“চল, কোথাও নামি। নেমে জো’র জন্য অপেক্ষা করবো।”
প্রায় ৬০ মাইল পথ বায়ুতাড়িত হইয়া ফার্গুসন্ অনেক চেষ্টায় চ্যাড হ্রদের উত্তর তীরে একটা জনপ্রাণীহীন স্থানে নোঙ্গর করিলেন।
অল্পক্ষণ পরই রাত্রি আসিল। জল স্থল অন্ধকারে ঢাকিল। মুক্ত পবন হ্রদের উপর দিয়া বহিতে লাগিল। জলকল্লোলরব মধ্যে ফার্গুসনের কাতর কণ্ঠের “জো—জো—” ধ্বনি মিশিয়া গেল!
প্রভাত হইতে না হইতেই তাঁহারা দেখিলেন, একটা কর্দ্দমময় বিশাল প্রান্তর মধ্যে সামান্য একটু দৃঢ় ভূমির উপর অবতরণ করিয়াছেন। বিপুলকায় বৃক্ষরাশি চতুর্দ্দিক্ অন্ধকার করিয়া তথায় দণ্ডায়মান রহিয়াছে।
ফার্গুসন্ বুঝিলেন, কর্দ্দমময় প্রান্তর পার হইয়া বেলুনের নিকট আগমন করা কাহারো পক্ষে সম্ভব নহে। তিনি হ্রদের দিকে চাহিলেন। দেখিলেন, যতদূর দৃষ্টি চলে কেবল জল থৈ থৈ করিতেছে! দূরে দিগ্বলয় চুম্বন করিয়া সেই অস্থির বারিরাশি রৌদ্র কিরণে ঝলসিয়া নৃত্য করিতেছে।
এতক্ষণ জো’র নামোচ্চারণ করিতেও তাঁহাদের সাহস হয় নাই—কি জানি পাছে শুনিতে হয় যে, জো নাই—জো মরিয়াছে! অবশেষে কেনেডি কহিলেন—“জো বোধ হয় জলে ডুবে’ মরে নাই, সে বেশ সন্তরণ-পটু। আমার মন বল্ছে, তাকে আবার ফিরে’ পাব।”
“ভগবান্ করুন যেন তাই হয়, কেনেডি। জো’কে যথাসাধ্য খুঁজতে হ’বে। বেলুনের ছিন্ন আবরণটা খুলে ফেলা যাক্। তা’ হ’লে প্রায় সাড়ে আট মণ ভারও কমে যাবে।”
প্রায় ৪ ঘণ্টা চেষ্টা করিয়া উভয়ে বহিরাবরণটী খুলিয়া ফেলিলেন। দেখিলেন ভিতরের আবরণ অক্ষতই আছে।
বেলুনের কার্য্য শেষ করিয়া বিশ্রাম করিতে করিতে ফার্গুসন্ বলিলেন—“জো যখন লাফিয়ে পড়ে, তখন আমরা একটা দ্বীপের কাছে ছিলাম।”
“সাঁতার দিয়ে জো হয়ত সে দ্বীপে উঠতে পারবে।”
“তা’ পারবে বটে—কিন্তু ও সব দ্বীপ জলদস্যুর আবাসভূমি। তাদের হাতে পড়লে কি জো আত্মরক্ষা করতে পারবে।”
“জো যেরূপ চতুর—তা’ সে পারবে।”
কেনেডি বন্দুক লইয়া খাদ্য সংগ্রহ করিবার জন্য বাহির হইলেন, ফার্গুসন্ সেই অবসরে বেলুনটীকে কার্য্যক্ষম করিয়া তুলিলেন।
সে রজনী সেইখানে কাটিয়া গেল।
প্রভাতে ফার্গুসন্ বলিলেন—“কেমন করে’ জো’র সন্ধান করতে হ’বে, তা’ আমি ভেবে ঠিক করেছি।”
“কি করতে চাও?”
“আমরা যে কোথায় আছি, আগে সেইটা তাকে জানিয়ে দিতে হ’বে।”
“তা হ’লে ত ভালই হয়। আমাদের না দেখে সে হয় ত ভাবতে পারে, আমরা তাকে মৃত মনে করে’ ছেড়ে চলে গেছি।”
“এমন কথা সে ভাববে না, ডিক্। জো আমাদের খুব ভাল জানে।”
“কেমন করে’ তাকে জানাবে?”
“বেলুনে উঠে উড়বো।”
“যদি বাতাসে ঠেলে নিয়ে যায়!”
“অন্যদিকে নিবে না। দেখছ না, বাতাসটা হ্রদের দিকেই বয়ে যাচ্ছে। আমরা সারা দিন হ্রদের উপরেই থাকবো। তা’ হ’লে জো নিশ্চয়ই দেখতে পাবে। সে যে কোথায় আছে, তাও আমাদের জানিয়ে দিতে পারবে।”
“যদি সে বন্দী হ’য়ে থাকে?”
“তা’ হ’লেও পারবে। এ দেশে বন্দীদের আবদ্ধ করে’ রাখে না। যেমন করে’ই হোক, আমরা জো’র সন্ধান না করে ফিরবো না।”
নোঙ্গর তুলিয়া তাঁহারা জো’র সন্ধানে বাহির হইলেন। ফার্গুসন্ বেলুনকে ভূমি হইতে অল্প উপরে রাখিলেন; কেনেডি মধ্যে মধ্যে বন্দুক আওয়াজ করিতে লাগিলেন। যখন দ্বীপের নিকটবর্ত্তী হইলেন, তখন এত নিম্নে নামিলেন যে, দ্বীপের ক্ষুদ্র ঝোপ পর্য্যন্ত বেলুন স্পর্শ করিতে লাগিল। এইরূপে তাঁহারা কত কানন কত প্রান্তর কত শৈলগুহা সন্ধান করিলেন, কিন্তু জো’র দেখা মিলিল না!
এইভাবে দুই ঘণ্টা গেল। কেনেডি বলিলেন—
“এদিকে আর খুঁজে ফল নাই।”
“অধৈর্য্য হ’য়ো না, ডিক্। যেখানে জো পড়েছিল, আমরা সেখান থেকে বড় বেশী দূরে নাই।”
বেলা ১১টার সময় দেখা গেল, বেলুন প্রায় ৯০ মাইল পথ অতিক্রম করিয়াছে। তখন বাতাস অপেক্ষাকৃত বেগে বহিতেছিল। বেলুন সেই পবন-প্রবাহে ফারম-নামক দ্বীপের নিকটবর্ত্তী হইল। তাঁহাদের ভরসা ছিল, জো নিশ্চয়ই কোন ঝোপের অন্তরালে লুকাইয়া রহিয়াছে, বেলুন দেখিবামাত্র দৌড়াইয়া, আসিবে।
হায় দুরাশা!
বেলা ২টা বাজিল। বাতাসের গতি তখনো ফিরিল না দেখিয়া ফার্গুসন চিন্তিত হইলেন। আবার কি তবে বেলুন সেই ভীষণ মরুমধ্যে চলিয়া যাইবে, তবেই ত সর্বনাশ!
ফার্গুসন বলিলেন—
“কেনেডি, আর আমাদের অগ্রসর হওয়া উচিত নয়। কোথও নেমে বিপরীত বাতাসের জন্য অপেক্ষা করাই উচিত। পুনরায় যাতে হ্রদে ফিরে যেতে পারি, তাই করতে হ’বে।”
ক্রমে উপরে উঠিতে উঠিতে ভিক্টোরিয়া যখন ভূমি হইতে প্রায় সহস্র ফিট উপরে উঠিল, তখন ফার্গুসন্ দেখিলেন, উত্তরপশ্চিমগামী বায়ুস্রোত প্রবল বেগে বহিতেছে। বেলুন সেই বাতাসে ভাসিয়া যাইতে লাগিল।
জোর কোন সন্ধানই পাওয়া গেল না।
রজনী সমাগমে একস্থানে নোঙ্গর করিয়া তাঁহারা প্রভাতের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। নিরাশায় বুক ভাঙ্গিয়া গেল। চক্ষু ফাটিয়া ঝর ঝর করিয়া জল পড়িতে লাগিল। দুই বন্ধু সমস্ত রজনী জাগিয়া কাটাইলেন।
রাত্রি ৩টার সময় বাতাসের বেগ অত্যন্ত প্রবল হইল। নলবনের উপর বেলুন ভাসিতেছিল। প্রতিমুহূর্ত্তেই নলের আঘাত লাগিতে লাগিল। বেলুনের তখন একটী মাত্র আবরণ ছিল। কোনক্রমে ছিন্ন হইলেই সর্বনাশ! ফার্গুসন্ বলিলেন—
“ডিক্, এখানে আর থাকা যায় না। বেলুন ছাড়।”
“জো যে থাকলো!”
“আমি তাকে ছেড়ে যাব না। যদি এই ঝড়ে আমি একশ’ মাইল উত্তরেও চলে’ যাই, তা’ হ’লেও আবার ফিরব। এখানে থাকলে যে বেলুন পর্য্যন্তও যাবে।”
কেনেডি বেলুনের নোঙ্গরটা টানিয়া তুলিতে চেষ্টা করিলেন, পারিলেন না। উহা নড়িল না। বায়ুতাড়িত বেলুনের টানে টানে নোঙ্গরটী এত দৃঢ়রূপে ভূপ্রোথিত হইয়াছিল যে, উহা উঠিল না। ফার্গুসন্ দড়ি কাটিয়া দিলেন। বেলুন এক লম্ফে ভূমি হইতে ৩০০ ফিট উপরে উঠিয়া উত্তরদিকে ছুটিতে লাগিল। বায়ুপ্রবাহ ফিরাইবার সাধ্য ফার্গুসনের ছিল না। তিনি নীরবে বসিয়া রহিলেন।
কেনেডি বলিলেন—
“ফার্গুসন্ ফিরতেই হ’বে।”
“নিশ্চয়। বেলুন ছেড়ে যদি পদব্রজেও চ্যাড-হ্রদের কাছে আসতে হয়, তা’ও স্বীকার —তবুও ফিরতে হ’বে।”
“আমি ছায়ার মত তোমার অনুবর্ত্তী হ’ব। আমাদের জন্য জো আত্মবলি দিয়েছে—আমরাও তার জন্য তাই করব।”
ঝড় এমন প্রবল হইয়াছিল যে, বেলুন গুণমুক্ত সায়কের ন্যায় বোনাদ্-উল্-জেরিদ নামক মরুভূমির উপর দিয়া যাইতেছিল। এ প্রদেশে সর্ব্বদাই ঝড় হয়—তখনো হইতেছিল। দেখিতে দেখিতে বৃক্ষলতাদির চিহ্ন বিলুপ্ত হইয়া গেল।
ফার্গুসন্ বলিলেন—
“ডিক্, প্রকৃতির পরিহাস দেখ! আর আমাদের নামার উপায় নাই, আমারও উপায় নাই—যেতেই হ’বে। যতদূর চক্ষু চলে, সব বালু—নীরস—তপ্ত—জ্বালাময়! আমরা সাহারা মরুভূমির উপর দিয়ে চলেছি।”
ফার্গুসন্ যখন এইরূপে হতাশ হৃদয়ে কেনেডির সহিত কথা কহিতেছিলেন, তখন দেখিলেন, মরুভূমির উত্তর দিকে বালুকারাশি উড়িতে আরম্ভ হইয়াছে। উহা উড়িতে উড়িতে ঘুরিতেছে, ঘুরিয়া ঘুরিয়া উড়িতেছে। সেই উৎক্ষিপ্ত ঘুর্ণ্যমান বায়ুতাড়িত বালুরাশির তরঙ্গমধ্যে তখন একদল পথিকের জীবন্ত সমাধি ঘটিতেছিল! উষ্ট্রগণ যন্ত্রণায় চীৎকার করিতে লাগিল।
মুহূর্ত্তে সব শেষ হইয়া গেল! উষ্ট্র আরোহী বণিকগণ সমস্তই বালুকা-গর্ভে সমাহিত হইল! কেবল উন্মত্ত পবন তখনো সেই স্থানে সাহারার বালু লইয়া ক্রীড়া করিতে লাগিল—ঘুরাইতে লাগিল—ইতস্ততঃ চালিত করিতে আরম্ভ করিল! যে স্থান সমতল ক্ষেত্র ছিল, তাহা মুহূর্ত্তমধ্যে বালুকার উচ্চ পর্ব্বতে পরিণত হইল। সেই পর্ব্বতের পাদমূলে জীবন্ত মানব জীবন্ত পশু চিরদিনের জন্য সমাহিত হইয়া গেল!
এই লোমহর্ষণ দৃশ্য দেখিয়া ফার্গুসন ও কেনেডির হৃদয় স্তব্ধ হইল! বেলুন তখন তাঁহাদের আয়ত্তের বাহিরে গিয়াছিল। বিপরীতগামী বায়ুরাশি কর্ত্তৃক প্রহত হইয়া উহা ঘুরিতে লাগিল, উড়িতে লাগিল, প্রবল বেগে ধাবিত হইতে লাগিল!
বেলুন এত দুলিতে লাগিল যে, উহার ভিতর বসিয়া থাকা অসম্ভব হইল। জলের বাক্স নড়িতে লাগিল, গ্যাস-নল বক্র হইয়া গেল। দোলনাটী কখন বা ছিঁড়িয়া পড়ে, তাঁহারা সেই চিন্তায় আকুল হইলেন!
অকস্মাৎ বেলুন থামিল। বাতাসের গতি ফিরিল। প্রবল বেগে বিপরীতগামী বায়ু বহিতে লাগিল। বেলুন নক্ষত্র-বেগে ছুটিতে আরম্ভ করিল।
কেনেডি জিজ্ঞাসা করিলেন—
“আমরা আবার কোন্ দিকে যেতে আরম্ভ করলেম?”
“যে দেশ আর দেখতে পাব না বলে’ ভয় হয়েছিল, সেই দিকেই চলেছি।”
বেলা ৯টা বাজিল। তখনো তাঁহারা চ্যাড-হ্রদের নিকটবর্ত্তী হইতে পারিলেন না। অঙ্গুলী-সঙ্কেতে কেনেডি দেখাইলেন, দূরে মরুভূমি ধূ ধূ করিতেছে! ফার্গুসন্ বলিলেন—
“তা’ হোক্। প্রধান কথা দক্ষিণ দিকে যাওয়া। তা’ আমরা যাচ্ছি। আমরা বোর্ণোউ, কৌফা প্রভৃতি নগর নিশ্চয়ই দেখতে পাব। তুমি দূরবীক্ষণ নিয়েই বসে’ থাক। দেখো, যেন তোমার চোখে কিছু বাদ যায় না।”
কেনেডি সতর্ক হইয়া চতুর্দ্দিক্ দেখিতে লাগিলেন।
দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ
বিপদের উপর বিপদ্
বেলুন হইতে ঝম্প প্রদান করিয়া জো প্রথমে চ্যাড হ্রদের অগাধ বারিরাশির মধ্যে নিমজ্জিত হইয়া গেল। কিন্তু মুহূর্ত্ত পরেই উপরে ভাসিয়া উঠিয়া বেলুনের সন্ধানে আকাশের দিকে চাহিয়া কহিল— “আঃ বাঁচলেম! ওই ত বেলুন ক্রমেই উপরে উঠে যাচ্ছে।”
বেলুন ক্রমেই ক্ষুদ্র হইতে ক্ষুদ্রতর বোধ হইতে লাগিল এবং শেষে একেবারে অদৃশ্য হইয়া গেল।
বন্ধুদিগকে সম্পূর্ণ নিরাপদ্ দেখিয়া জো’র মন স্থির হইল। সে তখন আত্মরক্ষার উপায় চিন্তা করিতে লাগিল। যতদূর দৃষ্টি চলে, সীমাহীন বিস্তৃত শান্ত স্থির জলরাশি প্রখর সূর্যকিরণে জ্বলিতেছিল।
জো হৃদয়ে সাহস আনিল। বেলুন হইতে সে হ্রদের মধ্যে একটী ক্ষুদ্র দ্বীপ দেখিয়াছিল। এখন তাহারই সন্ধানে চারিদিকে চক্ষু ফিরাইল।
ওই না বহুদূরে একটা বিন্দুবৎ কি যেন দেখা যাইতেছে। জো ভাবিল, উহা নিশ্চয়ই একটা দ্বীপ। সে ধীরে ধীরে আপনার পরিচ্ছদাদি যথাসম্ভব ত্যাগ করিল এবং সন্তরণ করিয়া সেই বিন্দুর দিকে অগ্রসর হইল।
প্রায় দেড় ঘণ্টা সন্তুরণের পর জো যখন দ্বীপের সমীপবর্ত্তী হইল, তখন তাহার হৃদয় কম্পিত হইয়া উঠিল। বেলুন হইতেই সে দেখিয়াছিল, শালবৃক্ষ সম দীর্ঘ এক একটি কুম্ভীর সেই দ্বীপের চতুর্দ্দিকে ভাসিয়া বেড়ায়— তীরে শয়ন করিয়া নির্ব্বেবাদে রৌদ্র পোহায়! জলে কুম্ভীর, স্থলে নরখাদক মনুষ্য, কিন্তু তখন আর চিন্তা করিবার অবসর ছিল না। জো অতি সাবধানে অগ্রসর হইতে লাগিল।
অকস্মাৎ বায়ু-সঞ্চালিত কস্তুরির গন্ধ আসিয়া তাহার নাকে লাগিল।
জো আপন মনে বলিল—‘সাবধান! কাছেই কুমীর আছে!’
জো ডুব দিল। ভাবিল, অনেক দূর যাইয়া উঠিবে। কিন্তু পরক্ষণেই দেখিল, কি যেন একটা তাহার অতি নিকট দিয়া ভীম বেগে চলিয়া গেল। জো বুঝিল, কুম্ভীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হইয়া বেগে ধাবিত হইয়াছে। জো আবার জলের উপর ভাসিয়া উঠিল এবং প্রাণপণে অন্যদিকে সন্তরণ দিতে আরম্ভ করিল। উন্মত্তের ন্যায় সন্তরণ দিতে দিতে তাহার মনে হইল, কি যেন তাহাকে পশ্চাৎ হইতে ধরিয়াছে। জো চক্ষু মুদিল।
এ কি! কুম্ভীরে ধরিলে জলের নীচে টানিয়া লয়! জো ত তখনো জলের উপরেই ভাসিতেছিল। তবে কি তাহাকে কুম্ভীরে ধরে নাই? জো চক্ষু চাহিল। দেখিল, ঘোর কৃষ্ণবর্ণ দুইটী কাফ্রি তাহাকে বজ্রমুষ্টিতে ধরিয়া বিপুল চীৎকার করিতেছে। এতক্ষণে জো একটু শান্ত হইল এবং আপন মনে বলিল— “যা” হোক, কুম্ভীর নয়—নরখাদক কাফ্রি!”
উহাদিগের হস্ত হইতে ত্রাণ পাইবার জন্য জো কোনোরূপ চেষ্টা করিল না। উহারা জো’কে তীরের দিকে টানিয়া লইয়া চলিল। জো মনে মনে ভাবিল, ‘আমি যখন বেলুন থেকে পড়ি, এরা আমাকে নিশ্চয়ই তখন দেখেছিল। আমি ত এদের কাছে স্বর্গের লোক—আকাশ থেকে নেমে এসেছি। আমায় দেখে এরা একটু ভয় করবেই।’
তীরের নিকটে আসিয়া জো দেখিল, স্ত্রী পুরুষ, বালক বালিকা সকলেই তথায় সমবেত হইয়া ঘোর রবে চীৎকার করিতেছে। জ়ো উপরে উঠিবামাত্র সকলে তাহাকে ভক্তিভরে প্রণাম করিল এবং তাহারা পূজা অন্তে মধু-মিশ্রিত দুগ্ধ এবং তণ্ডুল-চূর্ণ ভোগ দিল।
জো অবিলম্বে দুগ্ধ পান করিল দেখিয়া, ভক্তগণ আনন্দে নৃত্য করিতে লাগিল। সন্ধ্যা-সমাগমে গ্রামের যাদুকরগণ সসম্ভ্রমে জোকে একটি কুটীর-মধ্যে লইয়া গেল। সে কুটীরের নানা স্থানে বহুবিধ কবচ ঝুলিতেছিল। নিকটেই স্তূপীকৃত নরকঙ্কাল কাফ্রিদিগের নরমাংস-লোলুপতার পরিচয় প্রকাশ করিতেছিল। জো সেই কুটির-মধ্যে বন্দী হইল! কিছুক্ষণ পরেই কাফ্রিদিগের তাণ্ডব নৃত্যে ও সঙ্গীতে সে স্থান চঞ্চল হইয়া উঠিল। গৃহ-প্রাচীর নলদ্বারা নির্ম্মিত ছিল বলিয়া জো ঘরের ভিতর হইতে সমস্তই দেখিতে পাইতেছিল। ভাবিল, এদেশে ভক্তেরা পূজা অন্তে দেবতাকেই প্রসাদ-জ্ঞানে আহার করে।
জো নিতান্ত শ্রান্ত হইয়াছিল। কিছুক্ষণ বসিয়া থাকিতে থাকিতেই নিদ্রিত হইয়া পড়িল। অকস্মাৎ শীতল বারি স্পর্শে তাহার ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। জো দেখিল, কাফ্রিদিগের চিহ্ন পর্যন্ত নাই—তাহার সর্ববাঙ্গ জলে ভিজিয়াছে। বারিরাশি হু হু করিয়া গৃহ মধ্যে প্রবেশ করিতেছে।
এই আকস্মিক পরিবর্ত্তনের কারণ চিন্তা করিতে না করিতেই গৃহটি জলপূর্ণ হইয়া গেল। পদাঘাতে গৃহপ্রাচীর ভাঙ্গিয়া বাহিরে আসিয়া জো দেখিল, দ্বীপটী জলমগ্ন হইয়া হ্রদের সহিত এক হইয়াছে। মুহূর্ত্ত মধ্যে এত অধিক জল হইল যে, জো পুনরায় সন্তরণ করিতে বাধ্য হইল। সেই প্রবল জলস্রোত যেদিকে টানিল, জো সেই দিকেই যাইতে লাগিল।
ও কি ভাসিয়া আসিতেছে? কুম্ভীর নয় ত? জো তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হইয়াছিল। সে পরমুহূর্ত্তেই দেখিল, কাফ্রিদের একটা দীর্ঘ ডোঙ্গা জলতাড়িত হইয়া তীরবেগে ভাসিয়া চলিয়াছে। জো বহু আয়াসে উহার উপর উঠিয়া বসিল। প্রবল জলস্রোত তাহাকে ভাসাইয়া লইয়া চলিল। বহুক্ষণ এইভাবে কাটিয়া গেল। ধ্রুব নক্ষত্র দেখিয়া সে বুঝিল, হ্রদের উত্তর তীরাভিমুখে তাড়িত হইয়াছে।
আকাশ পরিচ্ছন্ন। চারিদিকে অন্ধকার। ঊর্দ্ধে অসংখ্য ভাস্কর নক্ষত্ররাশি তখন জ্বলিয়া জ্বলিয়া নিবিতেছিল, কদাচিৎ দুই একটি বৃহৎ উল্কা তাহার যাত্রা-পথটি আলোকিত করিয়া আকাশের এক প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্তে ছুটিয়া যাইতেছিল। বিপুল জল-ভঙ্গরব চারিদিকের ভীষণ নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিতেছিল। জো পুত্তলিকাবৎ ডোঙ্গার উপর বসিয়া রহিল। গভীর রাত্রে ডোঙ্গা অকস্মাৎ তীরে প্রহত হইবামাত্র জো এক লম্ফে নামিল। নামিয়াই দেখিল, একটি প্রকাণ্ড বৃক্ষ ইতস্ততঃ শাখা-প্রশাখা বিস্তার করিয়া প্রেতের ন্যায় দণ্ডায়মান রহিয়াছে। জো বৃক্ষারোহণ করিল।
প্রভাতে সে যাহা দেখিল, তাহাতে তাহার দেহের শোণিত জল হইয়া গেল—হস্তপদ অবসন্ন হইয়া আসিল। সর্ববশরীর কণ্টকিত হইয়া উঠিল। জো দেখিল, বৃক্ষের শাখায় শাখায় শত শত সর্প দুলিতেছে! পত্রে পত্রে অসংখ্য জলৌকা ও অন্যান্য কীট নির্ব্বিবাদে অবস্থান করিতেছে। জো’কে দেখিয়া সর্পগুলি দুলিয়া দুলিয়া গর্জ্জন করিতে লাগিল— কখনো বা ফণা বিস্তার করিয়া চতুর্দ্দিকে চাহিতে লাগিল। জো কাল বিলম্ব না করিয়া নিম্নে লম্ফ দিয়া পড়িল। দেখিল, অগণিত সরিসৃপ কিল্ বিল্ করিয়া চলা ফেরা করিতেছে—কতক বা তখনো কুণ্ডলাকারে ঘুমাইতেছে।
অজ্ঞাত অপরিচিত বনাকীর্ণ দেশ। পথহীন। জো ধীরে অতি সাবধানে অগ্রসর হইতে লাগিল। ক্রমে মধ্যাহ্ন হইল—মধ্যাহ্নের রবি পশ্চিম গগনে ঢলিয়া পড়িল। জো ক্ষুৎপিপাসায় একান্ত কাতর হইল। অজ্ঞাত ফল ও কন্দ যাহা পাইল, তাহাই আহার করিয়া সে কিয়ৎপরিমাণে ক্ষুন্নিবৃত্তি করিয়া আবার অগ্রসর হইল। তাহার মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, বন্ধুগণ কিছুতেই তাহাকে ত্যাগ করিয়া যাইবেন না। ভিক্টোরিয়া দর্শনের আশায় তাই সে এক একবার কাতর নয়নে আকাশের দিকে চাহিতে লাগিল।
ক্রমেই কণ্টকে বিদ্ধ হইয়া তাহার দেহ বহু স্থানে ক্ষত বিক্ষত হইয়া উঠিল। চরণতল রুধিররঞ্জিত হইল। জো তখনো অগ্রসর হইতে লাগিল। সে বনের অন্ত ছিল না—সে অজ্ঞাত পথের শেষ ছিল না। সমস্ত দিন এইরূপে চলিয়া সন্ধ্যার প্রাক্কালে জো হ্রদের তীরে আসিয়া দাঁড়াইল। শত সহস্র মশক ও নানাবিধ কীট পতঙ্গ তাহাকে আক্রমণ করিল। অর্দ্ধ ইঞ্চি দীর্ঘ এক একটা ভীষণ পিপীলিকা তাহাকে দংশন করিতে লাগিল। দুই ঘণ্টার মধ্যেই উহারা জো’র কোট ও প্যাণ্টালুন কাটিয়া টুকরা টুকরা করিয়া দিল! জো দংশন-জ্বালায় উন্মত্তবৎ ইতস্ততঃ ভ্রমিতে লাগিল। রজনী যতই গভীর হইতে লাগিল, হিংস্র জন্তুদিগের ভয়াবহ গর্জ্জন ততই শ্রুত হইতে আরম্ভ করিল। অস্ত্রহীন সহায়হীন ক্ষুৎপিপাসিত শ্রান্ত জো রজনীর মত একটি বৃক্ষশিরে আশ্রয় লইল।
প্রভাতে সে হ্রদে অবগাহন করিয়া স্নান করিল এবং কতকগুলি বৃক্ষপত্র আহার করিয়া পুনরায় পথ চলিতে লাগিল। ক্রমে তাহাও অসম্ভব হইয়া উঠিল। জো অবসন্ন দেহে একটি বৃক্ষমূলে বসিয়া উদ্ধারের উপায় চিন্তা করিতে করিতে অকস্মাৎ দেখিল, সেই নিবিড় বনের মধ্যে কতকগুলি কাফ্রি বিষ-বাণ প্রস্তুত করিতেছে। জো নিঃশব্দে একটা নিকটবর্ত্তী ঝোপে অন্তরালে লুকাইল। পরক্ষণেই দেখিল, চ্যাড-হ্রদের ৭০।৮০ হস্ত মাত্র উপরে ভিক্টোরিয়া ভাসিতেছে। জো কাফ্রিদিগের ভয়ে চীৎকার করিতে সাহস পাইল না—ঝোপের ভিতর হইতে বাহির হইয়া আত্মপ্রকাশও করিতে পারিল না। তাহার গণ্ড বহিয়া ঝর ঝর করিয়া অশ্রুধারা পড়িতে লাগিল। সে অশ্রু নিরাশার অশ্রু নহে—কৃতজ্ঞতার অশ্রু।
অল্পক্ষণ পরই কাফ্রিগণ সে বন ত্যাগ করিল। জো ঝোপ হইতে বাহির হইয়া হ্রদের তীরে দৌড়াইয়া গেল। ভিক্টোরিয়া তখন অনেক ঊর্দ্ধে উঠিয়া গিয়াছে। জো ভাবিল উহা নিশ্চয়ই আবার নিকটে আসিবে। সে চঞ্চল হৃদয়ে অপেক্ষা করিতে লাগিল। কিছুক্ষণ পর বেলুন আবার সেই দিকে দেখা দিল বটে, কিন্তু প্রবল বায়ুকর্ত্তৃক তাড়িত হইয়া বেগে পূর্ব্বদিকে চলিয়া গেল।
জো উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়াইতে লাগিল—চিৎকার করিয়া কত ডাকিল। কিন্তু বেলুন হইতে কেহ তাহা শুনিতে পাইল না। হতভাগ্য জো তখন দুই হস্তে বক্ষ চাপিয়া হতাশ হৃদয়ে বসিয়া পড়িল। সে পুনরায় দৌড়াইতে লাগিল। তখন রজনী প্রায় সমাগত হইয়াছিল। জো দৌড়াইতে দৌড়াইতে অকস্মাৎ কর্দ্দম মধ্যে পতিত হইল।
কত চেষ্টা করিল, কিন্তু জো কিছুতেই কর্দ্দম হইতে মুক্তি লাভ করিতে পারিল না। ক্রমেই তাহার চরণদ্বয় কর্দ্দম মধ্যে প্রোথিত হইতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে কটি পর্য্যন্ত ডুবিয়া গেল। জো তাহার আসন্ন মৃত্যু বুঝিতে পারিল। সে আর্তনাদ করিয়া উঠিল—“কোথায় তুমি প্রভু— এস—রক্ষা কর! আমি যে জীয়ন্তে সমাহিত হচ্ছি!”
জো’র কাতর কণ্ঠ শূন্যে মিলাইয়া গেল। সে ধীরে ধীরে সেই ভীষণ কর্দ্দম মধ্যে প্রোথিত হইতে লাগিল। তিমির-ময়ী নিশা মুহূর্ত্তে জল স্থল আবৃত করিয়া ফেলিল।
ত্রয়োবিংশ পরিচ্ছেদ
মনুষ্য মৃগয়া
কেনেডি অতি সাবধানে চতুর্দ্দিক দেখিতেছিলেন। বলিলেন—“আমার বোধ হচ্ছে দূরে কতকগুলো সৈনিক যাচ্ছে। যেমন ধূলো উড়িয়ে যাচ্ছে তাতে মনে হয়, বেশ, বেগেই চলেছে।”
“ঘূর্ণি বাতাসও হ’তে পারে।”
“ঘূর্ণি বাতাস? না—তা’ বোধ হয় না।”
“কতদূর?”
“এখনো ৮।৯ মাইল দূরে। সৈন্যেরা এসে পড়েছে—অশ্বারোহী—তার আর সন্দেহ নাই।”
ফার্গুসন্ দূরবীক্ষণ লইয়া দেখিয়া কহিলেন—
“আমার বোধ হচ্ছে ওরা আরব। টিব্বুসও হ’তে পারে। আমরাও যে দিকে যাচ্ছি, ওরাও সেই দিকেই যাচ্ছে দেখছি। আমরা এখনই ওদের ধরে’ ফেলবো।”
কেনেডি দূরবীক্ষণ লইলেন। বেলুন চলিতে লাগিল। তিনি দেখিতে দেখিতে কহিলেন—
“ঘোড়-সওয়ারেরা দুই দল হয়েছে। বোধ হচ্ছে—কারো পশ্চাদ্ধাবন করছে। ব্যাপারটা কি! ওরা কার অনুসরণ করছে?”
“ব্যস্ত হ’ও না ডিক্। আমরা ঘণ্টায় ২০ মাইল যাচ্ছি। কোন ঘোড়ার সাধ্য নাই যে, আমাদের সমান যায়।”
“দেখ—দেখ—আরবগুলো যথাশক্তি দ্রুত চলেছে। প্রায় ৫০ জন হ’বে। বাঃ! ওদের অঙ্গবস্ত্র বাতাসে কেমন উড়ছে।”
“আমাদের ভয় কি ডিক্। আমরা মুহূর্ত্তে বহু উচ্চে উঠে যাব।”
“ফার্গুসন্—ফার্গুসন্ এ-ত বড় আশ্চর্য্য ব্যাপার দেখছি! ওরা কি যেন শিকার করছে!”
“মরুভূমির মধ্যে শিকার?”
“ঠিক তাই—ওরা—দেখি দেখি—ঠিক—ওরা একটা মানুষ, শিকার করছে! উঃ লোকটা প্রাণের ভয়ে কত বেগে ঘোড়া চালিয়েছে!”
“বল কি, ডিক্! মনুষ্য-মৃগয়া! ওদের উপর চোখ রাখ।”
কেনেডি এবং ফার্গুসন্ ব্যস্ত হইলেন। ভাবিলেন বেলুন নিকটে গেলে যদি সম্ভব হয় হতভাগ্যের জীবন রক্ষা করিবেন।
কেনেডি একমনে দূরবীক্ষণ লইয়া দেখিতেছিলেন। কম্পিত কণ্ঠে চিৎকার করিয়া ডাকিলেন—
“ফার্গুসন্—ফার্গুসন্—”
“কি! কি! কি হ’য়েছে?”
“না—না—এ কখনো সম্ভব নয়। এ কখনো—”
“কি ডিক্? কি?”
“এ যে সে—ই—
“সে—ই?”
“নিশ্চয় সে-ই! দেখ দেখ তুমি একবার দেখ। ওই দেখ জো প্রাণপণে ঘোড়া ছুটিয়েছে! শত্রুরা এখনো ৮০।৯০ হাত দূরে আছে ফার্গুসন—ফার্গুসন্—!”
ফার্গুসনের বদনমণ্ডল পাংশুবর্ণ ধারণ করিল। তিনি বাষ্পনিরুদ্ধ কণ্ঠে কহিলেন—
“জো—”
তাঁহার আর বাক্যস্ফূর্ত্তি হইল না। কেনেডি বলিলেন—“জো আমাদের দেখতে পায় নাই। তার ঘোড়াটা যেন উল্কার মত ছুটেছে—”
গ্যাসের উত্তাপ কমাইতে কমাইতে ফার্গুসন্ বলিলেন— “জো এখনই আমাদের দেখতে পাবে। আমরা পনর মিনিটের মধ্যেই জোর মাথার উপর চলে’ যাব—”
“আমি বন্দুক আওয়াজ করি।”
“না না—তাতে বরং বিপদ্ হ’তে পারে। শত্রুরা সাবধান হয়ে যাবে। তুমি খুব ভাল করে’ গতিবিধি লক্ষ্য কর।”
অল্পক্ষণ পরই কেনেডি আর্ত্তনাদ করিয়া উঠিলেন। কহিলেন —ফার্গুসন্—সর্বনাশ উপস্থিত!”
“কেন— কি দেখছ?”
“এই—এই—জো ঘোড়া থেকে পড়ে’ গেল! ঐ যাঃ—ঘোড়াটাও পায়ের তলায় মরে’ পড়লো! কি হ’বে, ফার্গুসন্— কি হবে?”
ফার্গুসন্ দুরবীক্ষণ লইয়া দেখিয়া কহিলেন—“ওই দেখ জো আবার উঠেছে। ওই দেখ উঠে দাঁড়ালো। আমাদের দেখতে পেয়েছে, ডিক্। ঠিক দেখতে পেয়েছে। এই যে হাত নেড়ে সঙ্কেত করলে—”
“হাঁ হাঁ ঠিক ঠিক। আমিও দেখেছি।”
“জো চুপ করে দাঁড়িয়েছে কেন? এখনই যে আরবরা ধরে ফেলবে!”
“বাঃ বাঃ জো—বেস—বেস খুব বাহাদুর”—কেনেডি আনন্দে চীৎকার করিতে লাগিলেন।
জো তখন আক্রমণকারী আরবদিগের আগমন-প্রতীক্ষায় কুপিত সিংহের ন্যায় অবস্থান করিতেছিল। একজন আরব দস্যু নিকটে আসিবা মাত্র জো তাহার অশ্বের উপর লম্ফ দিয়া উঠিল এবং মুহূর্ত্ত মধ্যে কণ্ঠ টিপিয়া তাহাকে বধ করিল। আরবের মৃত দেহ অশ্ব হইতে ভূতলে পতিত হইবা মাত্র অশ্ব আরও ঊর্দ্ধশ্বাসে ছুটিতে লাগিল। আরবগণ গর্জ্জন করিয়া উঠিল।
ভিক্টোরিয়া তখন ভূমি হইতে ২০।২৫ হস্ত উপর দিয়া যাইতেছিল। একজন আরব জো’র অশ্বের নিকটবর্ত্তী হইল। সে জোকে লক্ষ্য করিয়া বর্শা উঠাইল। কিন্তু অব্যর্থ-সন্ধান কেনেডির বন্দুকের গুলি মুহূর্ত্তে তাহার হৃদয় ভিন্ন করিয়া দিল। আরব ধরাশায়ী হইল। জো নক্ষত্র বেগে ধাবিত হইতে লাগিল।
আরবগণ মুহূর্ত্তের জন্য থামিল। তাহারা তখন মস্তকোপরি সেই বিপুলকায় বেলুন দেখিয়াছিল। তাহারা স্তম্ভিত হইল এবং পরক্ষণেই সকলে ভূলুণ্ঠিত হইয়া প্রণাম করিল। একদল আরব ইতি পূর্ব্বেই অগ্রগামী হইয়াছিল। তাহারা এ সব দেখিতে পাইল না। বিপুল বেগে জো’র অনুসরণ করিল। কেনেডি বলিলেন—
“জো যে চলেই যাচ্ছে। থামছে না কেন?”
“জো ঠিকই করছে। আমরা যে দিকে যাচ্ছি জো-ও সেই দিকেই যাচ্ছে। আর কতটুকু! একশ’ হাত গেলেই জো’র কাছে বেলুন পৌঁছিবে। প্রস্তুত হও।”
“কি করবো?”
“বন্দুক রাখ। আমি বল্লেই দেড় মণ ভার ফেলে দিও। তোমার হাতেই জো’র প্রাণ! ভারটা আগে ফেল্লে, কিন্তু জো’কে বাঁচানো যাবে না—বেলুন উপরে উঠে পড়বে!”
“আচ্ছা—”
বেলুন তখন আরবদিগের মস্তকের উপর দিয়া উড়িয়া যাইতেছিল। ফার্গুসন্ রজ্জু-মই লইয়া প্রস্তুত রহিলেন। বেলুন যেই জো’র নিকট আসিল, ফার্গুসন চীৎকার করিয়া বলিলেন— “হুসিয়ার কেনেডি!”
“আমি ঠিক আছি।”
“জো—সাবধান—মই ধর।”
ফার্গুসন মই ছাড়িলেন—
জো সে কথা শুনিতে পাইয়াছিল। অশ্বের বেগ সংযত না করিয়াই মই ধরিল। ফার্গুসন্ কহিলেন—
“ডিক্, ভার ফেল—”
আদেশ মাত্রেই কেনেডি ভার ফেলিয়া দিলেন। মুহূর্ত্ত মধ্যে জোকে লইয়া বেলুন উচ্চে উঠিয়া গেল জো যথাশক্তি সেই দোদুল্যমান রজ্জু-মইএর উপর আশ্রয় লইল। পরক্ষণেই দেখা গেল, সে আরবদিগকে লক্ষ্য করিয়া একটী অঙ্গভঙ্গি করিল এবং মার্জ্জারের ন্যায় সুকৌশলে মই বহিয়া বেলুনে উঠিল। আরবগণ রোষে গর্জ্জন করিতে লাগিল। জো বেলুনে উঠিয়াই আবেগপূর্ণ কণ্ঠে কহিল—
“প্রভু এসেছেন—মিঃ ডিক্—“
আর তাহার কথা ফুটিল না। জো মুচ্ছিত হইয়া ফার্গুসনের ক্রোড়ে পতিত হইল।
জোর তখন প্রায় নগ্নাবস্থা। বহু ক্ষত-মুখে রুধির ঝরিয়া তাহার বাহু ও দেহ সিক্ত করিতেছিল। ফার্গুসন্ জো’র চিকিৎসায় নিযুক্ত হইলেন। সমস্ত রজনী বিশ্রাম ও শুশ্রূষার পর প্রভাতে জো যখন সুস্থ হইল, তখন তাহার আত্মকাহিনী বর্ণনা করিতে লাগিল। আমরা সে কাহিনীর অনেকটা জানি। কর্দ্দম মধ্যে পতিত হইয়া জো যখন ক্রমেই প্রোথিত হইতেছিল, আমরা সেই সময় তাহাকে ত্যাগ করিয়াছিলাম। সেই পর্য্যন্ত বর্ণনা করিয়া জো বলিতে লাগিল—
“আমি যখন ক্রমেই ডুবে’ যেতে লাগলেম, তখন সকল আশা ভরসা দূর হ’লো! মৃত্যু যে সুনিশ্চিত, এটা বেশ বুঝতে পারলেম! উঃ—কি ভয়ানক মৃত্যু! অকস্মাৎ দেখলেম, আমার নিকটেই এক গাছি রজ্জু পড়ে’ আছে। আমি প্রাণের দায়ে তাই ধরলেম। টেনেই দেখি তার অপর প্রান্ত দৃঢ় রূপে আবদ্ধ। একটা অবলম্বন পেয়ে প্রাণপণ শক্তিতে সেই রজ্জু ধরে’ টানতে লাগলেম। শেষে অনেক পরিশ্রমের পর তারই সাহায্যে শুষ্ক কঠিন ভূমির উপর উঠলেন। তখন দেখি যে, রজ্জুর সঙ্গে আমাদের বেলুনের নোঙ্গর বাঁধা।”
কেনেডি বলিলেন—“সেই নোঙ্গর, ফার্গুসন্! সেই যে আমরা টেনে তুলতে না পেরে কেটে দিয়াছিলাম। তারপর—তারপর?”
“বেলুনের নোঙ্গর আমার হৃদয়ে সাহস এনে দিল। শরীরে যেন শক্তি আবার ফিরে এল। আমি বেশ বুঝলেম এ বিপদ্ থেকে মুক্তি পাব। আমি সেই রাত্রেই পদব্রজে যাত্রা করলেম। নিবিড় বন। শ্বাপদ-সঙ্কুল। কণ্টকে চরণ বিদ্ধ হ’তে লাগলো। অবশিষ্ট পরিচ্ছদ ছিন্ন হয়ে গেল, দেহ ক্ষত বিক্ষত হতে লাগলো। এক একবার মনে হ’তে লাগলো আর বুঝি যেতে পারবো না। এমনি করে’ রাত্রি প্রভাত হ’লো। প্রভাতে দেখি যে নিকটেই একটা স্থানে কতকগুলো ঘোড়া ঘাস খাচ্ছে। কাল বিলম্ব না করে’ আমি তারই একটার পিঠে লাফিয়ে, উঠলেম। অশ্ব নক্ষত্র বেগে উত্তর মুখে ছুটতে লাগলো। কোথায় যাচ্ছি—কোথায় পথ কিছুই জানি না। দেখতে দেখতে কত গ্রাম কত প্রান্তর কত কানন পার হ’য়ে এলাম। আমার তখন দিগ্বিদিক্ জ্ঞান ছিল না। ঘোড়াটা আমাকে নিয়ে একটা মরুভূমির মধ্যে এলো। মরুক্ষেত্র দেখে ভয় হ’লো, ভরসাও হ’লো। ভাবলেম, এই মুক্ত মরুর মধ্যে যদি বেলুন আসে ত সাক্ষাৎ হবে।”
“সকাল থেকে প্রায় ৩ ঘণ্টাকাল ঘোড়ায় এসে, যখন মরুভূমির ভিতর দিয়ে যাচ্ছি, তখন অকস্মাৎ একদল আরবের সঙ্গে সাক্ষাৎ। আমাকে দেখেই তারা মনে করলে মস্ত এ একটা শিকার জুটেছে। আমার অনুসরণ করলে। কেউ বা বর্শা ছুঁড়ে আমাকে আঘাত করলে। মিঃ কেনেডি, আপনি একজন শিকারী —কিন্তু সে যে কি ভীষণ মৃগয়া, তা’ আপনি বুঝতে পারবেন না!”
“আমি প্রাণপণে ঘোড়া চালাচ্ছি—ঘোড়ার শক্তিও শেষে ফুরিয়ে এল! ঘোড়াটা হঠাৎ মরে’ পড়ে গেল! আমি তখন একেবারে নিরুপায়। শত্রুর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইলেম। এক জন আরব কাছে আসতেই এক লম্ফে তার ঘোড়ার উপর উঠে বসলেম। আরবটার কণ্ঠরোধ করতে দুহূর্ত্তমাত্র সময় লাগলো! আরব ধরাশায়ী হ’লো। তারপর যা যা ঘটেছিল সে সবই ত আপনারা জানেন।”
চতুর্ব্বিংশ পরিচ্ছেদ
বেলুনের দুর্দ্দশা
দুই তিন দিন অতিবাহিত হইল। বেলুন নির্ব্বিঘ্নে নানা জনপদের উপর দিয়া টিম্বাক্টু নগরের নিকটবর্ত্তী হইল। পর্য্যটক বার্থ টিম্বাক্টুর যে মানচিত্র অঙ্কিত করিয়াছিলেন, ফার্গুসন্ তাহা মিলাইয়া লইলেন দেখিলেন, শ্বেতবর্ণ বালুকারাশির উপর ত্রিকোণাকৃতি টিম্বাক্টু নগর। নগরোপকণ্ঠে বৃক্ষলতাদি অধিক নাই। রাজপথ অপ্রশস্ত। পথের উভয় পার্শ্বে অদগ্ধ ইষ্টকে গ্রথিত একতল গৃহের সারি। স্থানে স্থানে নলের ও খড়ের কুটীর বর্ত্তমান রহিয়াছে। ঘরগুলি চূড়ার আকারে নির্ম্মিত। কোনো কোনো, গৃহের ছাদের উপর গৃহস্বামী বন্দুক বা বর্শা হস্তে ভ্রমণ করিতেছে। তাহাদের পরিচ্ছদ সমুজ্জ্বল। বিচিত্র বর্ণে রঞ্জিত।
ফার্গুসন্ বলিলেন—
“এ দেশের রমণীরা না কি সুন্দরী। ওই দেখ, তিনটী মসজেদ কোনো প্রকারে দাঁড়িয়ে আছে। ওখানে এক কালে বহু মসজেদ্ ছিল।”
কেনেডি কহিলেন—“ওই না একটা ভগ্ন দুর্গ-প্রাকার?”
“হাঁ, দুর্গ-প্রাকারই বটে। একাদশ শতাব্দী থেকে আজ পর্য্যন্ত অনেকেই টিম্বাক্টু নগর করায়ত্ত রাখার চেষ্টা করে’ আসছেন। ষোড়শ শতাব্দীতে এই জনপদ সুসভ্য ছিল। আহহ্মদ বাবার পুস্তকালয়ে তখন যে ১৬০০ খানি হস্তলিখিত পুঁথি ছিল, তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়। আজ সেই স্থানের অবস্থা দেখ।”
বেলুনের আবরণের উপর যে গাটাপার্চা ছিল, তাহা উত্তাপের জন্য স্থানে স্থানে সামান্য গলিয়া গিয়াছিল। বেলুন হইতে অল্পে অল্পে গ্যাস বাহির হইতেছিল। কেনেডি বলিলেন—
“এখানে কি কোন সংস্কার করা সম্ভব?”
“না ডিক। এখন আমাদের তাড়াতাড়ি যেতে হ’বে। এই ক’দিনেই অনেকটা গ্যাস কমে’ গেছে। দেখছ না, বেলুন আর বেশী উপরে উঠতে পারে না। আমরা সমুদ্রতীর পর্য্যন্ত যেতে পারব কি না, তাই বা কে জানে। খানিকটা ভার ফেল; বড় ভার হয়েছে।”
প্রভাতে তাঁহারা টিম্বাক্টুর ৬০ মাইল উত্তরে নাইগার নদীর তীরে আসিয়া উপনীত হইলেন। দেখিলেন, অনেকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ নাইগারকে বহু শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত করিয়া রাখিয়াছে। বেলুন প্রবল বায়ুর প্রভাবে ক্রমেই দক্ষিণমুখে যাইতে লাগিল। উপরে উঠিয়া নিচে নামিয়া ফার্গুসন্ অনেক চেষ্টা করিলেন, কিন্তু অনুকূল বায়ু পাইলেন না। কেবল খানিকটা গ্যাস নষ্ট হইল। এইরূপে আরো দুই দিন কাটিল। জেল্লে, ফেগো প্রভৃতি নগর পার হইয়া তাঁহারা নাইগার ও সেনেগালের মধ্যবর্ত্তী প্রদেশে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। মাঙ্গোপার্কের সঙ্গীদিগের মধ্যে অনেকেই এই স্থানে মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছিল। ফার্গুসন্ স্থির করিলেন, কিছুতেই এই শত্রুপূর্ণ অস্বাস্থ্যকর স্থানে নামিবেন না—অনেক উপর দিয়া ভাসিয়া যাইবেন। কিন্তু বেলুন নামিতে লাগিল।
ফার্গুসন্ বেলুন হইতে নানাবিধ অনাবশ্যক এবং কিছু কিছু আবশ্যক দ্রবাদি নিক্ষেপ করিয়া উহাকে হালকা করিলেন। বেলুন উপরে উঠিল বটে, দুই চারিটি গিরিশৃঙ্গও অতিক্রম করিল বটে, কিন্তু আবার নামিতে লাগিল।
কেনেডি ব্যস্ত হইয়া বলিলেন—“বেলুনে কি ছিদ্র হয়েছে?”
“না ডিক্, ছিদ্র নয়। উত্তাপে গাটাপার্চা গলে গেছে। রেসমের আবরণের ভিতর দিয়া গ্যাস বেরিয়ে যাচ্ছে। জিনিষপত্র ফেলে দিয়ে বেলুনকে হাল্কা করতে না পারলে গিরিশৃঙ্গগুলি অতিক্রম করার আর উপায় দেখি না।”
“অনেক জিনিষই ত ফেলা হয়েছে।”
তাম্বুটা ফেলে দাও। অনেক পাতলা হ’বে।”
তাম্বু ফেলিবার পর কিছুক্ষণের জন্য বেলুন উপরে উঠিল। কিন্তু আবার নামিতে লাগিল।
কেনেডি বলিলেন—“নিচে নেমে বেলুন মেরামত করা যাক্।”
“অসম্ভব, ডিক্।”
“তবে কি করবে?”
“যে সব জিনিষ না হ’লেই চলবে না, তাই রাখ—আর সব ফেলে দাও! এদেশের মানুষ আর বনের হিংস্র পশু একই রকম। এখান থেকে পালাতেই হ’বে।”
“ওই বুঝি একটা পর্ব্বত দেখা যাচ্ছে না?”
“মেঘের ভিতর মাথা লুকিয়ে একটা বিশাল পর্ব্বত সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ওটা যে পার হ’তে পারব এমন ভরসা হয় না!”
কেনেডি বন্ধুর নিকট হইতে দূরবীক্ষণ লইয়া পর্ব্বতমালা দেখিতে লাগিলেন। শৈলপ্রাচীর ক্রমেই নিকটবর্ত্তী হইতে লাগিল। ফার্গুসন্ কহিলেন—
“একদিনের মত জল রেখে বাকিটা ফেলে দাও।”
জো জল ঢালিয়া ফেলিল। বলিল—
“বেলুন কি উঠছে?”
“একটু উঠেছে। ৫০।৬০ ফিট হ’বে। আমাদের যে আরো ৫০০ ফিট উঠতে হ’বে।কলের জল ফেলে দাও জো!” সে জলও ফেলা হইল—কোন ফল হইল না।
“জলের পাত্রগুলো সব ফেল!”
জো সে গুলিও নিম্নে নিক্ষেপ করিল।
ফার্গুসন্ বলিলেন—“জো শপথ কর যে, যাই কেন না ঘটুক, তুমি বেলুন থেকে আর লাফিয়ে পড়বে না। তুমি না থাকলে আমরা আরো নিরুপায় হ’ব।”
জো শপথ করিল। তখনো পর্ব্বত-শৃঙ্গ অনেক উচ্চে ছিল। ফার্গুসন্ কম্পিত কণ্ঠে কহিলেন—“সাবধান হও। আর দশ মিনিটের মধ্যেই পর্ব্বতের সঙ্গে বেলুনের ধাক্কা লাগবে। কিছু কিছু খাদ্য সামগ্রী ফেলে দাও।”
কেনেডি ২৫ সের পেমিকান ফেলিয়া দিলেন। বেলুন খানিকটা উঠিল বটে, কিন্তু পর্ব্বতশৃঙ্গের অনেক নিম্নে রহিল। ফার্গুসন চাহিয়া দেখিলেন ফেলিবার মত আর কিছু নাই! কহিলেন—“ডিক্, আর ত কিছু নাই। তোমার বন্দুক ফেল।”
“না—না—ফার্গুসন, বন্দুক কি ফেলতে পারি!”
“তা’ না হ’লে সকলকেই যে আজ মরতে হ’বে! আর পাঁচ মিনিট—ডিক্—ডিক্—”
জো চিৎকার করিয়া উঠিল—“আমরা যে পাহাড়ের গায়ে এসে পড়লেম!”
সে তাড়াতাড়ি কম্বলগুলি ফেলিল। বেলুন উঠিল না। সে তখন কতগুলি কার্ত্তুস্ ফেলিয়া দিল। বেলুন শৈলশৃঙ্গের উপরে উঠিল বটে, কিন্তু দোলনা নীচে রহিল। ফার্গুসন্ একান্ত ভীত হইয়া কহিলেন—
“কেনেডি, বন্দুকগুলো ফেল— দেখছ না আমাদের মৃত্যু নিকট!” জো গম্ভীর কণ্ঠে বলিল—“মিঃ কেনেডি, একটু অপেক্ষা করুন।” পরমুহূর্ত্তেই সে দোলনা হইতে নিম্নে শৈলশিরে অবতরণ করিল! আর্ত্তনাদ করিয়া ফার্গুসন ডাকিলেন—“জো—জো!”
দোলনা তখন আর একটু উঠিয়া শৈলশৃঙ্গ ঘর্ষণ করিতে করিতে চলিল! জো করতালি দিয়া বলিয়া উঠিল—
“এই ত আমরা পর্ব্বত অতিক্রম করেছি।”
জো যে স্থানে অবতরণ করিয়াছিল, তাহা প্রায় ২০ ফিট প্রশস্ত। তাহার পরই ভীষণ গহ্বর—পথহীন তলহীন অন্ধকার! জো বেলুনের সঙ্গে সঙ্গে দৌড়াইয়া চলিল এবং উহা যাহাতে উড়িয়া না যায়, সেই জন্য এক হস্তে দোলনা ধরিয়া রাখিল।
পলক মধ্যেই বেলুন ও দোলনা গহ্বরের উপরে আসিল। জো দোলনার রজ্জু ধরিয়া সেই মহাশূন্যে ঝুলিতে ঝুলিতে উহার উপর উঠিয়া কহিল—
“মিঃ ডিকের বন্দুক একবার আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিল—সেই বন্দুকটা রক্ষা করে ঋণ শোধ দিলাম!”
জো বন্দুকটী লইয়া কেনেডির হস্তে প্রদান করিল।
বেলুন আবার ৩।৪ শত ফিট্ নামিয়া আসিল। সম্মুখে শৈলশ্রেণী দেখিয়া ফার্গুসন্ ইচ্ছা সত্ত্বেও অগ্রসর হইলেন না। ভাবিলেন, প্রভাতে যাত্রা করিবেন।
পঞ্চবিংশ পরিচ্ছেদ
অগ্নি কুণ্ডে
রাত্রিতে নক্ষত্রাদি পরীক্ষা করিয়া ফার্গুসন্ দেখিলেন, তাঁহারা সেনেগাল নদী হইতে প্রায় ২৫ মাইল দূরে অবস্থান করিতেছেন। তিনি কহিলেন—
“যেমন ক’রেই হোক্ নদীটা পার হতেই হবে। নদী তীরে নৌকা পাওয়ার সম্ভাবনা নাই—বেলুনেই নদী পার হ’তে হবে। বেলুনটাকে আরো হাল্কা ক’রে নিতে হচ্ছে।”
কেনেডি বলিলেন—
“কেমন ক’রে হাল্কা করবে? আমি’ত কোনো উপায় দেখি না। তবে আমাদের মধ্যে একজন নেমে থাকলে হয়।”
জো তাড়াতাড়ি বলিল—
“সে হ’বে না, মিঃ কেনেডি। বেলুন থেকে নেমে নেমে আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। আমি নামি।”
বাধা দিয়া কেনেডি বলিল—
“এবার হ্রদের মধ্যে লাফিয়ে পড়া, নয় জো। আফ্রিকার ভিতর দি’য়ে পদব্রজে যেতে হ’বে! আমি তোমাদের চেয়ে বেশী হাঁটতে পারি।”
“তা হবেই না। আমি নেমে থাকবো।”
ফার্গুসন্ কহিলেন—
“তোমাদের কা’রো নামতে হবে না। যদি নামতেই হয় তবে তিন জনেই নামবো।”
জো কহিল—“এ কথা ভাল। একটু হাঁটা মন্দ নয়, বেলুনে বসে থেকে থেকে পা ধরে গেছে!”
“একবার দেখা যাক এস, কি ফেলে দেওয়া যেতে পারে।”
কেনেডি গম্ভীর ভাবে বলিলেন—
“আমার বন্দুক ভিন্ন ত ফেলার আর কিছু দেখি না।”
“কেন? গ্যাসে তাপ দিবার যন্ত্রটা ফেলে দাও। তা’ হ’লে প্রায় সাড়ে তিন মণ ভার কমে যাবে।”
“সর্বনাশ! তা’ হ’লে গ্যাসে তাপ দিবে কি করে ফার্গুসন্?”
“উপায় কি ভাই। বিনা যন্ত্রেই যেতে হ’বে। বেলুনটা আমাদের তিনজনকে নিয়ে উড়তে পারবে। যন্ত্রটা খুলে ফেল।”
কার্য্যটী অতীব কঠিন ও সময় সাপেক্ষ ছিল বটে, কিন্তু জো সাবধানে যন্ত্র খুলিতে লাগিল। কেনেডির শক্তি জো-র কৌশল এবং ফার্গুসনের বুদ্ধি একত্র মিলিত থাকায় অনায়াসে যন্ত্রটী বেলুন হইতে বিচ্ছিন্ন হইল। যন্ত্রের নলগুলি বেলুনের ঊর্দ্ধদিকে লোহার তার দ্বারা আবদ্ধ ছিল। বেলুন দুলিতেছিল। অকুতোভয় জো নগ্নপদে রজ্জু বহিয়া উপরে উঠিল এবং রেশমের আবরণ ছিন্ন না করিয়া অতি সাবধানে নলগুলি খুলিয়া দিল।
আহারান্তে ফার্গুসন্ কহিলেন, “বন্ধুগণ, তোমরা অত্যন্ত শ্রান্ত হয়েছ। নিশ্চিন্তে নিদ্রা যাও। রাত্রি দু’টার সময় আমি কেনেডিকে ডেকে তুলবো। কেনেডি, দু’ঘণ্টা পাহাড়া দিয়ে জোকে তুলে দিও।”
কেনেডি এবং জো মুক্ত আকাশতলে নিদ্রা গেলেন। চিন্তাক্লিষ্ট ফার্গুসন্ বেলুনের প্রহরী-কার্য্যে নিযুক্ত হইলেন। অজানিত অসভ্য বর্বর দেশ। দেশের অধিবাসিগণ রাক্ষসতুল্য। পদে পদে কানন কান্তার শৈল! বেলুন আজ দাস নহে, প্রভু! ফার্গুসন্ তাই অত্যন্ত ভীত হইলেন।
প্রকৃতি সুষুপ্তা। মেঘাচ্ছাদিত চন্দ্রের ক্ষীণালোকে বনভূমি মধ্যে মধ্যে আলোকিত হইতেছিল। ক্বচিৎ কোনো পক্ষীর পক্ষবিধূনন-শব্দে সেই নৈশ নিস্তব্ধতা ভঙ্গ হইতেছিল, দূরে নিশাচর প্রাণীর হুঙ্কার শুনা যাইতেছিল।
অকস্মাৎ ফার্গুসন্ চমকিয়া উঠিলেন। মনে হইল বনমধ্যে কি একটা অস্পষ্ট শব্দ হইল। বৃক্ষ-শ্রেণার ভিতর দিয়া যেন ক্ষীণ একটী আলোক-ধারা দেখা গেল। ফার্গুসন্ কান পাতিয়া রহিলেন— বিশেষ মনোযোগের সহিত অন্ধকারের ভিতর চক্ষু চাহিয়া রহিলেন।
কৈ কিছুইত শুনা যায় না—কিছুইত দেখা যায় না!
ফার্গুসন্ ধীরভাবে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন।
রাত্রি দুইটা বাজিল। তিনি কেনেডিকে জাগরিত করিলেন এবং বিশেষ সতর্কতার সহিত পাহারা দিতে বলিয়া শয়ন করিলেন।
কেনেডি চুরুট ধরাইয়া গম্ভীর ভাবে বসিয়া রহিলেন। সমস্ত দিবসের অশেষ পরিশ্রমে তাঁহার শরীর অত্যন্ত ক্লান্ত হইয়াছিল। এক একবার নিজের অজ্ঞাতে চক্ষু মুদ্রিত হইয়া আসিতে লাগিল। কেনেডি চক্ষু মুছিলেন, আবার চুরুট ধরাইলেন। বেলুন ধীর বাতাসে ধীরে ধীরে দুলিতেছিল। শ্রান্ত কেনেডির চক্ষু আবার মুদ্রিত হইয়া আসিল।
কেনেডি পুনঃ পুনঃ চক্ষু চাহিলেন, পুনঃ পুনঃ চক্ষু মুছিলেন। ঘন ঘন ধূম পান করিতে লাগিলেন। কিছুতেই ঘুম গেল না। কেনেডি আপনার অজ্ঞাতে ঘুমাইয়া পড়িলেন।
হঠাৎ কেনেডির কর্ণে গেল—পট্ পট্ পট্! তিনি চমকিয়া উঠিলেন। দেখিলেন, চারি দিকে অগ্নিকুণ্ড! অনলের লোল জিহ্বা বৃক্ষ লতা গুল্ম সমস্তই গ্রাস করিতেছে। তীব্র জ্বালাময় বায়ু বহিতে আরম্ভ করিয়াছে। ধূমে চতুর্দ্দিক সমাচ্ছন্ন হইয়াছে। সেই অনলসমুদ্রের গর্জ্জন দূর সমুদ্রগর্জ্জনবৎ বোধ হইতেছে। কেনেডি চীৎকার করিয়া উঠিলেন— “আগুন! আগুন!”
ফার্গুসন ও জো উঠিয়া বসিলেন। তখন বনমধ্যে কাফ্রিদিগের আনন্দধ্বনি শ্রুত হইতেছিল।
ফার্গুসন বলিলেন—“ওরা আমাদের পুড়িয়ে মারতে চায়, দেখছি—!”
ভিক্টোরিয়ার চতুর্দ্দিকে তখন একটা তীব্র অগ্নিবৃত্ত হু হু করিতেছিল। শুষ্ক কাষ্ঠের দাহন-শব্দ, অগ্নিরাশির ভীম গর্জ্জন, তালিবা দস্যুদিগের বিকট নিনাদ মুহূর্ত্তের জন্য ফার্গুসনের হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করিল। কেনেডি দেখিলেন, একটা অগ্নিজিহ্বা বেলুন স্পর্শ করিতে আসিতেছে। তিনি উচ্চ কণ্ঠে কহিলেন—
“এস এস— নীচে লাফিয়ে পড়ি। তা’ ছাড়া আর গতি নাই!”
ফার্গুসন্ তাঁহাকে বজ্রমুষ্টিতে ধরিয়া ফেলিলেন এবং নোঙ্গরের বন্ধন-রজ্জু কাটিয়া দিলেন। বেলুন এক লম্ফে সহস্র ফিট উচ্চে উঠিয়া পড়িল।
তখন ভোর হইয়াছে। বেলুন পশ্চিমদিকে ধাবিত হইতে লাগিল।
ফার্গুসন বলিলেন—
“এখনো আমাদের বিপদের শেষ হয় নাই।”
কেনেডি বলিলেন—
“আর ভয় কি! বেলুন ত আর নামবে না। যদি নেমেই পড়ে —” বাধা দিয়া ফার্গুসন্ অঙ্গুলী-নির্দ্দেশে দেখাইলেন, প্রায় ২০ জন অশ্বারোহী বেলুনের পশ্চাতে ধাবিত হইয়াছে। তাহাদের বর্শা ও মাস্কেট্ বন্দুক—দেখা যাইতেছে।
ফার্গুসন্ বলিলেন—
“ওরা কে জান?”
“না। কে ওরা?”
“তালিবা দস্যু। হিংস্রপশু-পরিবেষ্টিত কাননও বরং ভাল,— এদের হাতে যেন পড়তে না হয়!”
“আমরা যত উপরে আছি, ওদের সাধ্য কি যে ধরতে পারে! একবার যদি আমরা নদীটা পার হ’তে পারি—”
“তা ঠিক, ডিক্। কিন্তু বেলুন যদি নামে —!”
“ভয় কি ভাই! বন্দুক হাতে আছে।”
“আমাদের সৌভাগ্য যে, বন্দুকগুলো ফেলে দি নাই।”
কেনেডি কয়েকটি বন্দুকেই কার্ত্তুজ পুরিয়া কহিলেন—
“আমরা কত উঁচুতে আছি ফার্গুসন্?”
“প্রায় ৭৫০ ফিট। এখন ত বেলুনই আমাদের প্রভু। যখন ইচ্ছা আর নামতেও পারি না, উঠতেও পারি না।
“আমরা যদি একবার বন্দুকের পাল্লার মধ্যে আসতে পারতেম—”
“তুমিও মারতে ডিক্ ওরাও ছাড়ত না। ওদের গুলি আমাদের গায়ে না লেগে বেলুনে লাগলে আমদের কি দশা হ’বে তাই ভাব!”
ষড়্বিংশ পরিচ্ছেদ
তালিবা দস্যু
বেলা প্রায় ১১টা বাজিল। দস্যুগণ তখনো বেলুনের সঙ্গে সঙ্গেই চলিতেছিল। আকাশে একটু সামান্য মেঘ দেখিলেই প্রতিকূল বায়ুর আগমন-শঙ্কায় ফার্গুসন্ চিন্তিত হইতেছিলেন।
বেলুন অল্পে অল্পে নিম্নগামী হইতেছিল। তখনো সেনেগাল তীর প্রায় ১২ মাইল দূরে ছিল। বেলুন যেরূপ ধীরে ধীরে যাইতেছিল, তাহাতে আরো ৩ ঘণ্টার কমে নদীতীরে উপনীত হইবার সম্ভাবনা ছিল না।
তালিবাদিগের জয়ধ্বনি ফার্গুসনের কর্ণে আসিয়া পৌঁছিবামাত্র তিনি তাহার কারণ বুঝিতে পারিলেন।
কেনেডি জিজ্ঞাসা করিলেন—“আমরা ক্রমেই নেমে যাচ্ছি না?”
“হাঁ, নামছি।”
পনের মিনিটের মধ্যেই বেলুন প্রায় ৬০০ ফিট নামিয়া আসিল। নিম্নে অপেক্ষাকৃত প্রবল বায়ু থাকায় উহা বেগে চলিতে লাগিল। গুড়ুম্ গুড়ুম্! তালিবাগণ আপন অপান অশ্বের জিনের উপর দণ্ডায়মান হইয়া একসঙ্গে গুলি করিল।
জো বিদ্রূপ করিয়া কহিল—“তালিবার গুলি এতদূর আসে না।” সে আপন বন্দুক তুলিল এবং নিমেষে সর্ব পূরোবর্ত্তী তালিবাকে নিহত করিল। সঙ্গীর এই আকস্মিক মৃত্যু-দর্শনে অন্যান্য তালিবাগণ অশ্বের বেগ সংযত করিয়া কিয়ৎক্ষণের জন্য স্থির হইয়া দাঁড়াইল। বেলুন সেই অবসরে খানিকটা দূর অগ্রসর হইল।
ফার্গুসন্ বলিলেন—“যদি বেলুন নেমে পড়ে, ওদের হাতে পড়তেই হ’বে। যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ! ফেল—পেমিকান্ “ফেল!”
ইতোমধ্যেই বেলুন অনেক নামিয়া গিয়াছিল, পেমিকান্ নিক্ষিপ্ত হইলে পর কিছুদূর উপরে উঠিল।
তালিবাগণ ভীমনাদে গর্জ্জন করিতে লাগিল।
অর্দ্ধ ঘণ্টা গেল। ভিক্টোরিয়া পুনরায় দ্রুতবেগে নিম্নগামী হইল। রেশমের বহিরাবরণ দিয়া তখন সোঁ সোঁ করিয়া গ্যাস বাহির হইতেছিল।
বেলুন নামিল। আরো নামিল। আরো—আরো——শেষে দোলনা আসিয়া ভূমি স্পর্শ করিল!
উত্তেজিত উল্লসিত তালিবাগণ বেগে বেলুনের দিকে ধাবিত হইল।
ভূমি স্পর্শ করিবামাত্রই বেলুন এক লম্ফে আবার খানিকটা উপরে উঠিল এবং প্রায় এক মাইল দূরে গিয়া পুনরায় ভূপৃষ্ঠে আশ্রয় লইল।
ফার্গুসন্ হাঁকিলেন—
“ব্রাণ্ডিটুকু ফেলে দাও, জো—যন্ত্রগুলো ফেল। যা কিছু পার সব ফেলে নোঙ্গরটাও ফেলে দাও।”
বায়ুমান-যন্ত্র তাপমান-যন্ত্র প্রভৃতি সমস্তই নিক্ষিপ্ত হইল বটে, কিন্তু কোন ফল হইল না। বেলুন কয়েক হস্ত উঠিয়াই নামিয়া পড়িল।
তালিবাগণ ভীম বেগে অগ্রসর হইতেছিল। ফার্গুসন্ বলিলেন——“ফেল ফেল—এবার বন্দুক ফেলে দাও!”
কেনেডি আপন বন্দুক লইয়া কহিলেন—
“না মেরে ফেলছি না।”
দেখিতে দেখিতে কেনেডির গুলিতে ৪ জন তালিবা মৃত্যুমুখে পতিত হইল। অন্যান্য তালিবাগণ রোষে হুঙ্কার করিয়া উঠিল।
বেলুন আবার উঠিল— কিছুদূর গিয়া আবার পড়িল। রবারের গোলা যেমন সজোরে ভূপৃষ্ঠে পতিত হইবা মাত্রই লাফাইয়া লাফাইয়া চলে, ভিক্টোরিয়াও কিছুদূর তেমনি করিয়া চলিতে লাগিল।
পুনঃ পুনঃ আঘাতে সোঁ সোঁ করিয়া গ্যাস বাহির হইতে লাগিল। বেলুনের বহিরাবরণ নানাস্থানে টোল খাইল।
কেনেডি কহিলেন—
“আর উপায় নাই। বেলুন ছাড়া যাক।”
জো নির্ব্বাক্ হইয়া ফার্গুসনের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। তিনি কহিলেন— “এখনি ছাড়বে? এখনো আমরা একমণ পঁয়ত্রিশ সের ভার ফেলতে পারি।”
কেনেডি ভাবিলেন ফার্গুসনের হঠাৎ বুদ্ধিভ্রংশ হইয়াছে। নহিলে সে বলে কি!
তাই তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন—
“কি বল্লে, ফার্গুসন্?”
“একমণ পঁয়ত্রিশ সের ভার! দোলনাটা ফেলে দাও! বেলুনের রশি ধরে ঝুলে থাক। ফেল— ফেল —”
তাঁহারা অবিলম্বে বহিরাবরণের বাহিরের জাল বাহিয়া উঠিলেন। জো কৌশলে বন্ধন কাটিয়া দিল। বেলুন তখন নীচে নামিতেছিল, কিন্তু দোলনাটা খুলিয়া পড়ায় প্রায় ৩০০ ফিট উপরে উঠিয়া গেল।
উপরে বায়ু-প্রবাহ প্রবল ছিল। ভারমুক্ত বেলুন অতিশয় বেগে ধাবিত হইল। তালিবাদিগর অশ্ব ক্রমেই পশ্চাতে পড়িতে লাগিল। নিকটেই একটা অনুচ্চ পর্ব্বত ছিল। বেলুন উহার শৃঙ্গের উপর দিয়া অনায়াসে পার হইয়া গেল। কিন্তু উহা তালিবা অশ্বারোহিদিগের গতি রোধ করিল। পর্ব্বতটী বেড়িয়া না আসিলে তাঁহাদিগের আসিবার আর উপায় ছিল না। তাঁহারা তাই উত্তর মুখে ধাবিত হইলেন।
পর্ব্বত অতিক্রম করিয়াই ফার্গুসন্ বলিলেন—
“ওই যে নদী—ওই যে নদী দেখা যায়।”
সত্যই তাঁহারা নদীর নিকটবর্ত্তী হইয়াছিলেন। দুই মাইল মাত্র দূরে সেনেগালের স্থির বারিরাশি মধ্যাহ্নতপন-কিরণে ঝক্ মক্ করিতেছিল।
ফার্গুসন্ কহিলেন—
“বেশী নয়—আর ১৫ মিনিট—তা’ হ’লেই আমরা রক্ষা পাব!” বেলুন ১৫ মিনিট চলিল না! উহা ধীরে ধীরে নামিয়া পড়িল। নামিবা মাত্রই ধাক্কা খাইয়া আবার ঊর্দ্ধে উঠিল। আবার পড়িল—আবার একটু উঠিল। শেষে নিকটস্থ বৃক্ষের শাখায় বেলুনের জাল জড়াইয়া গেল।
বন্ধুত্রয় অবিলম্বে অবতরণ করিলেন এবং বেগে নদীর দিকে ধাবিত হইলেন। তাঁহারা যতই নিকটে আসিতে লাগিলেন, ততই একটী গুরুগম্ভীর জলোচ্ছ্বাস-রব কর্ণগোচর হইতে লাগিল। ফার্গুসন্ বলিলেন—
“আমরা গুইনা প্রপাতের নিকট এসেছি।”
নদীতীরে কোন প্রকার তরণী, মান্দাস কি ডোঙ্গা কিছুই ছিল না।
দেড় মাইল বিস্তৃত জলধারা কিয়দ্দূর ভীমবেগে অগ্রসর হইয়া প্রায় ১৫০ ফিট নিম্নে পতিত হইতেছিল। কাহার সাধ্য উহা অতিক্রম করে!
কেনেডি হতাশ হইয়া বসিয়া পড়িলেন। ফার্গুসন্ তাঁহাকে উৎসাহিত করিয়া কহিলেন—
“এখনো ভরসা আছে— এখনো উপায় আছে!”
তিনি সঙ্গীদ্বয়কে সেই পরিত্যক্ত বেলুনের নিকট লইয়া গেলেন। তথায় কতকগুলি শুষ্ক তৃণ পড়িয়াছিল। ফার্গুসন্ কহিলেন—“দস্যুরা এখানে আসতে এখনো প্রায় এক ঘণ্টা লাগবে। যত পার তৃণ কুড়াও। তা’ হ’লেই আমরা বাঁচবো!”
“তৃণ? ঘাস? ঘাস কি হ’বে?”
“বেলুনেতে গ্যাস নাই! গ্যাসের বদলে গরম বাতাস পূরে নদী পার হ’ব!”