মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Rajendralal Acharya (†1961) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন
“আছে।”
যাদুকর নোঙ্গরের নিকটবর্ত্তী হইল দেখিয়া কাফ্রিগণ উল্লাসে জয়ধ্বনি করিতে লাগিল। সে উৎসাহিত হইয়া নোঙ্গরটি বন্ধনমুক্ত করিল। মুক্ত হইবামাত্র ভিক্টোরিয়া একবার কম্পিত হইল, তাহার পর কাফ্রিকে লইয়াই শূন্যে উঠিল। যাহারা রোষে গর্জ্জন করিতেছিল, তাহারা সঙ্গীর অবস্থা দেখিয়া কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় হইয়া গেল।
ভিক্টোরিয়া যতই উচ্চে উঠিতে লাগিল, জো ততই আনন্দে করতালি দিতে দিতে হাসিতে লাগিল— হি হি হি।
কেনেডি কহিলেন “লোকটা ত নোঙ্গর ধরে’ বেশ ঝুলে আছে দেখছি।”
জো বলিল, “আর কেন, ওকে ছেড়ে দেওয়া যাক—দড়িটা কেটে দি।”
বাধা দিয়া ফার্গুসন্ বলিলেন, “না— না—কাজ নাই, আর কিছু দূর গিয়া ওকে নামিয়ে দিলেই চলবে, স্বজাতিদের মধ্যে তা’ হ’লে ওর জহুরা বেড়ে যাবে।”
দেখিতে দেখিতে ভিক্টোরিয়া কাজে নগর অতিক্রম করিল। কাফ্রি তখনো নোঙ্গর ধরিয়া ঝুলিয়া ছিল। ফার্গুসন্ যখন দেখিলেন নিকটে আর গ্রাম বা মনুষ্যবাসের কোন চিহ্ন পর্য্যন্ত নাই, তখন ধীরে ধীরে উত্তাপ হ্রাস করিতে লাগিলেন। বেলুনের গ্যাস ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হইতে লাগিল। বেলুন অল্পে অল্পে নামিতে আরম্ভ করিল—শেষে ভূপৃষ্ঠ হইতে ১৫।১৬ হস্ত মাত্র উপরে আসিয়া দাঁড়াইল। কাফ্রি যাদুকর তখন নোঙ্গর ছাড়িয়া ভূতলে লম্ফ প্রদান করিল এবং ভূমিস্পর্শ করিবামাত্র উর্দ্ধশ্বাসে পলায়ন করিল।
দশম পরিচ্ছেদ
অনল-মধ্যে
আকাশ ক্রমেই মেঘাচ্ছন্ন হইতেছিল। বাতাস প্রবলবেগে বহিতে লাগিল। বায়ুতাড়িত হইয়া ভিক্টোরিয়া ঘণ্টায় ৩৫ মাইল পথ অতিক্রম করিতেছিল। ফার্গুসন্ কহিলেন—
“আমরা এখনো চন্দ্ররাজ্যেই আছি। এ দেশে চন্দ্র পূজিত হ’য়ে থাকেন বলে’ দেশের নামও চন্দ্ররাজা। এমন উর্বর ভূমি পৃথিবীতে বিরল।”
জো দুঃখ করিয়া কহিল, “ভগবানের কি বিচার! এমন অসভ্য দেশেও এমন স্থান থাকে!”
ফার্গুসন বলিলেন “কে জানে যে এই দেশ একদিন শিক্ষায় সভ্যতায় পৃথিবীর সকল সুসভ্য দেশের সমান হ’বে না!”
কেনেডি হাসিয়া বলিলেন “তুমি কি তাই বিশ্বাস কর?”
“করি বৈ কি! কালের স্রোত কেমন করে’ বয়ে’ যাচ্ছে দেখ। পৃথিবীর আদি থেকে আজ পর্য্যন্ত চেয়ে দেখ—মানুষ কেমন করে’ এক দেশ থেকে আর এক দেশে এক রাজ্য থেকে রাজ্যান্তরে ভ্রমণ করে’ বেড়াচ্ছে। এসিয়াই কি একদিন সমগ্র মানবজাতির আবাসভূমি ছিল না? চার হাজার বৎসর ধরে’ এসিয়াই কি সমগ্র মানবজাতিকে পুত্রের মত স্নেহে লালন পালন করে নাই? এসিয়ার অরণ্য এসিয়ার উষর ক্ষেত্র কি একদিন এই মানবজাতিই উর্বর করে’ তোলে নি? কিন্তু এসিয়ার সুবর্ণখনি যখন নিঃশেষে ফুরিয়ে গেল——যখন সেখানে সোণা তুলতে পাথর উঠতে লাগল, তখন এসিয়ারই বড় আদরের সন্তান-সন্ততি ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ল। এখন দেখ ইউরোপও দিন দিন উষর ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে—আর সেখানে আগেকার মত শস্য ফলে না। তার বৃক্ষে আর এখন আগেকার মত মধু-ফল হয় না—তার বুকে আর এখন আগেকার মত মাণিক জ্বলে না। ইউরোপের জীবনী-শক্তি ফুরিয়ে আসছে দেখে গতিশীল মানবজাতি আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়েছে। আমেরিকারও আবার এই দশাই ঘটবে। আর অরণ্য উর্ব্বর শস্যক্ষেত্র হ’বে—তার বক্ষ চিড়ে মানুষ এখন যে ক্ষীর পান করছে, তা এক সময়ে ফুরিয়ে যাবেই যাবে! আজ তার যে ক্ষেত্রে বৎসরে দু’বার শস্য ফলে, কালে সেখানে তৃণও জন্মাবে না। তখন দেখো আফ্রিকাই মানবের আশ্রয়স্থল হ’বে। আজ আফ্রিকার জলে বিষ, স্থলে বিষাক্তবাণ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে— আজ তার বিপুল অরণ্যে সিংহ ব্যাঘ্র ভল্লুক অবাধে বিচরণ করছে, কিন্তু কালে সেই বিষ অমৃত হ’বে, অরণ্য সুসংস্কৃত নগরে পরিণত হ’বে, মরুভূমে উর্বর শস্যক্ষেত্র হাসবে। এখন আমরা যে জনপদের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছি, কে জানে কালে সেখানে এমন মানুষ আসবে না যে, তাদের নব নব আবিষ্কারের কাছে বর্ত্তমান যুগের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার শিশুর খেলার মত বোধ হ’বে না?”
উত্তেজিত কণ্ঠে জো কহিল, “হায়, সেদিন যদি দেখে যেতে পারি!”
“এখনো তার অনেক দেরি আছে জো—অনেক দেরি।” পর্য্যটকদিগের মধ্যে যখন এইরূপ কথাবার্ত্তা হইতেছিল, তখন উজ্জ্বল তপন-কিরণে মেঘমণ্ডল স্তরে স্তরে আলোকিত হইতেছিল। মেঘরাশির প্রান্তদেশ আলোক-সম্পাতে সমুজ্জ্বল হইতেছিল। সুবৃহৎ বৃক্ষ, বৃক্ষের ন্যায় বৃহৎ লতা মসৃণ গালিচার ন্যায় সুবিস্তৃত শৈবালাচ্ছন্ন ভূমিতল সবই যেন কি এক অভিনব শোভা ধারণ করিয়াছিল। স্থানে স্থানে উচ্চ ভূপৃষ্ঠ, ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পর্ব্বতবৎ প্রতীয়মান হইতে লাগিল। দুর্ভেদ্য কানন, দুরতিক্রম্য কণ্টকময় বনভূমি, মধ্যে মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রামসমূহ যন্ত্রচালিত চিত্রের পর চিত্রের ন্যায় চক্ষের সম্মুখ দিয়া ভাসিয়া যাইতেছিল।
জগানিকা হ্রদ হইতে জন্মলাভ করিয়া যে মালাগাজারি নদী কত ক্ষেত্র ধৌত করিয়া, কত প্রান্তরের পার্শ্ব দিয়া, কত অরণ্যের চরণ চুম্বন করিয়া খরবেগে অগ্রসর হইয়াছে, তাহা যেন প্রবহমান জল-প্রপাতের ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। তাহারই তীরে শত সহস্র স্থূলকায় গো-মেষ-মহিষাদি নিঃশঙ্কচিত্তে বিচরণ করিতেছিল, কখনো বা সুদীর্ঘ তৃণের মধ্যে লুক্কায়িত হইতেছিল। কোথাও আবার সুগন্ধময় বৃক্ষ-লতাপরিপূর্ণ বিস্তৃত ক্ষেত্র, ক্ষুদ্র কুসুমস্তবকের ন্যায় দৃষ্ট হইতেছিল। তাহার মধ্যে নানাস্থানে কোথাও সিংহ, কোথাও ব্যাঘ্র, কোথাও হায়েনা প্রভৃতি অনায়াসে গমনাগমন করিতেছিল। কোন স্থানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৃক্ষাদি চূর্ণ করিয়া, লতাগুল্মাদি পদ-দলিত করিয়া, সুবৃহৎ বৃক্ষের সুদৃঢ় শাখা-প্রশাখাগুলি অবনত করিয়া, কম্পিত করিয়া করিযূথ আহারান্বেষণে ভ্রমণ করিতেছিল।
কেনেডি উল্লাসভরে কহিলেন “মৃগয়ার উপযুক্ত দেশ। এখানে শিকার করলে হয় না ফার্গুসন্?”
“না ডিক্ আজ কাজ নাই। রাত্রি হ’য়ে আসছে। মেঘের অবস্থা দেখে বোধ হচ্ছে ঝড়ও হ’বে। এদেশের ঝড় বড় ভয়ানক। এখানকার ভূমি যেন বৈদ্যুতিক প্রবাহের আকর। বায়ুস্তরও বৈদ্যুতিক প্রবাহে পূর্ণ হয়েছে!”
“নিচে নামলে হয় না?”
“নিচে নামলেই বিপদ্ বেশী। বরং উপরে যাওয়াই ভাল। আমার কেবলই শঙ্কা হচ্ছে, প্রবল বাতাস এলে পথ-ভ্রষ্ট হ’য়ে না যাই।”
“তবে কি করবে?”
“যদি পারি, আরো উপরে উঠব।”
প্রকৃতি ক্রমেই স্তব্ধ হইতেছিল দেখিয়া ফার্গুসন্ বুঝিলেন অবিলম্বে ঝড় হইবে। নিষ্কম্প বৃক্ষপত্র, নিশ্চল মেঘমালা, নিস্তব্ধ প্রকৃতি তাঁহাকে একান্ত শঙ্কান্বিত করিয়া তুলিল। বিমান-বিহারী পক্ষিগণ দেখিতে দেখিতে বৃক্ষকোটরে আশ্রয় লইল। রাত্রি নয়টার সময় দেখা গেল বেলুন আর চলিতেছেই না।
উদ্বিগ্ন হইয়া ফার্গুসন্ কহিলেন, “ডিক্, ঝড় ত আসবেই, এখন কি করি?”
জো বলিল, “এখনো মেঘ উঁচুতে আছে, আমার মনে হয় আজ রাত্রে ঝড় হ’বে না।”
“মেঘেরই চেহারা ভাল নয়। হয়ত ঘূর্ণী বাতাসও হ’তে পারে। তা’ হ’লে দেখছি এই মহাশূন্যে আমাদের বন্ বন্ করে’ ঘুরতে হ’বে। মেঘে বিদ্যুৎ ভরা। বেলুনে আগুনও লেগে যেতে পারে! যদি গাছের সঙ্গে নোঙ্গর বাঁধি, তা’ হ’লে বাতাসের বেগে হয় ত গাছের উপরই আছাড় খেয়ে পড়বো!”
ভিক্টোরিয়া তখন মেনে হ্রদের উপর নিশ্চল ভাবে অবস্থান করিতেছিল। নিকটবর্ত্তী গ্রামসমূহ মৃতবৎ সুপ্ত বলিয়া মনে হইতে লাগিল। সেই বিপুল অন্ধকার ভেদ করিয়া কদাচিৎ দুই একটা আলোকরশ্মি হ্রদের মধ্যে জলের সহিত ক্রীড়া করিতেছিল।
কেনেডি চিন্তিত হইয়া কহিলেন, “তবে উপায়?”
“ভিক্টোরিয়াকে এখন মাঝামাঝি পথে রাখতে হ’বে। তোমরা ঘুমাও। আমিই জেগে আছি।”
“আমরাও তোমার সঙ্গে সঙ্গে জেগে থাকি। কি জানি হঠাৎ যদি কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয়।”
জো কহিল “এখনো তো কোনো বিপদ্ আসে নাই, আমি বেলুন পাহারা দি—আপনারা বিশ্রাম করুন।”
ফার্গুসন্ তাহাতে স্বীকৃত হইলেন না। বলিলেন, “আমাকে পাহারা দিতেই হ’বে। তোমরা নিদ্রা যাও। আবশ্যক হ’লেই ডেকে তুলবো।”
কেনেডি এবং জো শয়ন করিলেন, ফার্গুসন্ একাকী প্রহরার কার্য্যে নিযুক্ত হইলেন। অল্পক্ষণ পর ঊর্দ্ধে সঞ্চিত মেঘরাশি ধীরে ধীরে নিম্নে নামিতে লাগিল। অন্ধকার আরও গভীর হইয়া উঠিল। আঁধার—আঁধার—আঁধার! সূচীভেদ্য অন্ধকারে বিশ্ব ছাইল। ফার্গুসন্ আরো চিন্তিত হইলেন।
অকস্মাৎ আকাশের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্য্যন্ত বিদ্যুৎ ঝলসিল। সঙ্গে সঙ্গে বিপুল গর্জ্জনে দিঙ্মণ্ডল কম্পিত হইয়া উঠিল।
ফার্গুসন্ ডাকিলেন, “ওঠো—হুসিয়ার হও।”
কেনেডি ত্রস্তে শয্যা ত্যাগ করিয়া কহিলেন, “আমরা কি তবে বেলুন ছেড়ে নিচে নামবো?”
“না—না—তা’ হ’লে বেলুন টিকবে না, ঝড় বৃষ্টি সঙ্গে নিয়ে মেঘ নামতে না নামতে চল আমরা উপরে উঠি।”
ফার্গুসন্ অবিলম্বে গ্যাস-নলে তাপ দিতে আরম্ভ করিলেন। আবার বিদ্যুৎ খেলিল। আবার গভীর শব্দে মেঘ ডাকিল। ঐ আবার—ঐ আবার—ঐ আবার! মুহূর্ত্তে ২01২৫ বার বিদ্যুৎ জ্বলিল-গগন বিদীর্ণ করিয়া বিপুল নিনাদে মেঘ গর্জ্জিল! পর্য্যটকগণ প্রমাদ গণিলেন। বৃষ্টি নামিল—মুষলধারে বৃষ্টি। এক একটা ফোঁটা যেন শিলার ন্যায় পতিত হইতে লাগিল। সমস্ত আকাশ জুড়িয়া দারুণ অগ্নিকাণ্ড উপস্থিত হইল!
ফার্গুসন্ বলিলেন,“আমাদের অনেক আগেই উপরে যাওয়া উচিত ছিল। এখন দেখছি এই অগ্নিস্তর ভেদ করে’ উঠতে হ’বে। বেলুন ত দাহ্য পদার্থে পরিপূর্ণ—মুহূর্ত্তে আগুন ধরে’ যেতে পারে—”
“তবে চল ফার্গুসন্, নামি।”
“তা’তে কি ভাই বজ্রাঘাতের ভয় যাবে? গাছের ডালে লেগে কেবল বেলুনটা ছিঁড়বে।”
অবিলম্বে ভীম বেগে বায়ু বহিতে লাগিল। মনে হইতে লাগিল যেন সেই ঘনকৃষ্ণ মেঘরাশি বায়ুতাড়িত হইয়া কেবল অগ্নি উদ্গীরণ করিতেছে। বেলুন ক্রমে উর্দ্ধে উঠিতে লাগিল। কখনো ঘুরিতে আরম্ভ করিল—কখনো বা ঘুরিতে ঘুরিতে ঊর্দ্ধে উঠিতে লাগিল, বাতাস প্রবলবেগে বেলুনগাত্রে প্রহত হইয়া ফিরিতে লাগিল। বোধ হইল যেন বেলুনের সে রেশমের আবরণ এখনই ছিন্ন হইয়া যাইবে। উহা দমিতে লাগিল—কুঞ্চিত হইতে লাগিল—স্থানে স্থানে চাপিয়া বসিতে লাগিল! তখন শিলাবৃষ্টি আরম্ভ হইল। ফার্গুসন্ তখনো গ্যাসে তাপ দিতেছিলেন—ভিক্টোরিয়া তখনো উপরে উঠিতেছিল। বেলুনের ঊর্দ্ধে নিম্নে দক্ষিণে বামে তখনো লকলক করিয়া বিদ্যুৎ জ্বলিতেছিল। দশদিক্ কম্পিত করিয়া তখনো বজ্র ডাকিতেছিল!
ফার্গুসন্ ক্ষান্ত হইলেন না। কহিলেন, “এখন ভগবান্ ভরসা। তিনি রাখেন বাঁচিব—নহিলে আর কোনো উপায় নাই।”
ফার্গুসনের সঙ্গীদ্বয় তখন একেবারেই হতবুদ্ধি হইয়াছিলেন। তাঁহার কথা কাহারো কর্ণে প্রবেশ করিল না। বেলুন উর্দ্ধে উঠিতেছিল। সেই অন্ধকারের ভিতর দিয়া দারুণ শিলাবৃষ্টি কর্ত্তৃক প্রহত হইয়া ভিক্টোরিয়া অগ্নি-রাজ্যের ভিতর দিয়া ক্রমেই উচ্চে—আরো উচ্চে উঠিতেছিল।
পনের মিনিটের মধ্যেই উহা ঝড়ের সীমা অতিক্রম করিল। আহা কি সুন্দর দৃশ্য! মস্তকের উপর উজ্জ্বল নক্ষত্রখচিল নির্ম্মল আকাশ, আর পদতলে প্রলয়ের বায়ুপ্রবাহ সহস্র মুখে অগ্নি ঢালিতে ঢালিতে দিক্ হইতে দিগন্তে ছুটিয়া চলিয়াছে! চন্দ্রের শীতল উজ্জ্বল কনক কিরণরাশি কালো মেঘের উপর পতিত হইয়া আলো করিয়া তুলিয়াছে। এ দৃশ্য মানব-নয়নের অতীত।
তাঁহারা নির্ব্বাক হইয়া চাহিয়া রহিলেন।
একাদশ পরিচ্ছেদ
নবীন বাহন
রজনী নির্ব্বিঘ্নে কাটিয়া গেল। প্রভাতে মেঘনির্ম্মুক্ত পরিচ্ছন্ন আকাশে সূর্য উদিত হইল। মন্দ মন্দ পবন বহিল। ফার্গুসন্ নিম্নে অবতরণ করিয়া উত্তরমুখগামী বায়ুপ্রবাহের সন্ধান করিতে লাগিলেন। কখনো উচ্চে উঠিয়া কখনো নিম্নে নামিয়া, তিনি কিছুতেই অভীপ্সিত প্রবাহের সন্ধান পাইলেন না। বাতাস তাঁহাকে পশ্চিম মুখে লইয়া যাইতে লাগিল। ক্রমে দূরে চন্দ্র-পর্ব্বতের ধূসরবর্ণ শৃঙ্গ দেখা দিল। এই পর্ব্বতমালা টাঙ্গনিকা হ্রদ বেষ্টন করিয়া অবস্থিত।
ফার্গুসন্ কহিলেন—
“এখন আমরা আফ্রিকার যে স্থানে এসে পড়েছি কোনো দিন সেখানে কেউ আসেনি।”
ডিক্ কেনেডি বলিলেন, “আমরা কি চন্দ্র-পর্ব্বতমালা অতিক্রম করবো?”
“না—বোধ হয় দরকার হ’বে না। আমরা যাতে আবার ফিরে বিষুবরেখার দিকে যেতে পারি, তারই চেষ্টা করতে হ’বে। যদি আবশ্যক হয়, নোঙ্গর করে’ এখানেই সুবাতাসের অপেক্ষা করা যাবে।”
সত্বরেই ফার্গুসনের আশা পূর্ণ হইল। তিনি যে বায়ুপ্রবাহের সন্ধানে ফিরিতেছিলেন, তাহা মিলিল। ভিক্টোরিয়া দ্রুতগতি অগ্রসর হইল। ফার্গুসন্ হৃষ্টচিত্তে বলিলেন, “আমরা এখন ঠিক পথেই চলেছি। বেশ হয়েছে। এই অপরিজ্ঞাত জনপদটা দেখতে দেখতে যাওয়া যাবে।”
“আমরা কি দীর্ঘকাল ধরে’ এমনি করে উড়ে উড়েই যাব?”
“ডিক্, নীল নদীর জন্মস্থান ত দেখতেই হ’বে। সেই তীর্থদর্শনের জন্যই ত আমাদের এত আয়োজন। আমার বোধ হয়, আরো ছয় শ’ মাইল যেতে হ’বে।”
“তা’ যাও না-ছয় শ’ কেন ছ’ হাজার মাইল চল না। কিন্তু ধরার ধূলায় দু’একবার কি নামবে না? হাত পা সব আড়ষ্ট হয়ে গেল!”
ফার্গুসন্ হাসিয়া বলিলেন, “নামতে ত হ’বেই, হাওয়ায় ত পেট ভরে না—রসদ সংগ্রহ করা চাই। তোমার হাতে বন্দুক, আর কাননপথে নিঃশঙ্ক বন্যপশু। কিছু মাংসের যোগাড় হবে না?”
“কেন হবে না? আমি ত প্রস্তুত।”
“কিছু জলও নিতে হ’বে।”
দ্বিপ্রহর কালে বেলুম কতকগুলি গ্রাম অতিক্রম করিয়া চলিয়া গেল। এ স্থানের কাফ্রিরা কতকাংশে সভ্য। তাহাদের মধ্যে রাজতন্ত্রশাসনপ্রণালী প্রচলিত। রাজার ক্ষমতা অসীম। ফার্গুসন্ ধীরে ধীরে বেলুনের উত্তাপ কমাইলেন এবং নোঙ্গর নিক্ষেপ করিলেন। ভাবিলেন কোনো অপেক্ষাকৃত উচ্চ ভূমিতে অথবা বৃক্ষশাখায় নোঙ্গর অবশ্যই আবদ্ধ হইবে। উহা সুদীর্ঘ তৃণের ভিতর লুক্কায়িত হইল। তৃণের শির স্পর্শ করিয়া বেলুন দুলিয়া ভাসিয়া চলিল।
কেনেডি ক্রমেই অধীর হইতে লাগিলেন। শেষে হতাশভাবে বলিলেন, “নোঙ্গর ত ধরে না দেখছি, শিকার করা আর হ’লো না।”
যোজনের পর যোজনবিস্তৃত সুদীর্ঘ শ্যামতৃণাকীর্ণ ভূমি যেন বাতান্দোলিত শ্যামসাগরের ন্যায় শোভা পাইতেছিল। কোথাও বা নানা বর্ণের বিহঙ্গমগণ কলরব করিয়া উড়িয়া পলায়ন করিতে লাগিল। কোথাও গুচ্ছ গুচ্ছ প্রস্ফুটিত পুষ্পরাশি ছিন্ন করিয়া বেলুনের সঙ্গে সঙ্গে নোঙ্গর চলিতেছিল, অকস্মাৎ একটী ধাক্কা লাগিল। জো কহিল, “পাহাড়ের গায়ে নোঙ্গর ধরেছে।” কেনেডি বলিলেন, “মই ফেল।”
কেনেডির কথা মুখে থাকিতে থাকিতেই তাঁহারা একটী গভীর চিৎকারধ্বনি শুনিলেন। সকলেই সমস্বরে বলিয়া উঠিলেন, “ব্যাপার কি?”
“কি ভয়ানক চিৎকার—এমন ত কখনো শুনি নাই!”
কেনেডির কথায় বাধা দিয়া জো বলিল, “এ কি আমরা যে আবার চলতে আরম্ভ করলেম।”
“নোঙ্গরটা বুঝি খুলে গেছে।”
জো রজ্জু ধরিয়া টানিয়া কহিল, “না—খোলে নাই।”
“তবে কি পাহাড়টাই চলছে?”
নিম্নের তৃণরাশি তখন যেন মথিত হইতেছিল। অকস্মাৎ জো দেখিল তাহার মধ্যে কি যেন একটা নড়িয়া উঠিল। সে ভীত কণ্ঠে কহিল, “বাপরে! প্রকাণ্ড সাপ!”
কেনেডি বন্দুক তুলিলেন। কহিলেন, “সাপ! কৈ দেখি।” ফার্গুসন্ বলিলেন, “সাপ নয়—সাপ নয়—হাতীর শুঁড়!”
“হাতী?” কেনেডি পুনরায় লক্ষ্য করিয়া বন্দুক উঠাইলেন।
“ডিক্, থাম থাম। একটু অপেক্ষা কর।”
“হাতীটা যে আমাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে!”
“ভয় কি তাতে। আমরা যেদিকে যাব, সেই দিকেই ত নিয়ে যাচ্ছে।”
হস্তী দ্রুতবেগে অগ্রসর হইল এবং সত্বরেই তৃণের বন পার হইয়া একটি পরিচ্ছন্ন স্থানে আসিয়া উপনীত হইল। ফার্গুসন্ দেখিলেন উহার শ্বেত দত্তদ্বয় প্রায় পাঁচ হস্ত পরিমিত দীর্ঘ, তাহাদের মধ্যে নোঙ্গরটী বাধিয়া গিয়াছে!
নোঙ্গর খুলিয়া ফেলিবার জন্য হস্তী নানারূপ চেষ্টা করিল। শুণ্ড আস্ফালন করিতে লাগিল। কিন্তু নোঙ্গর খুলিল না।
জো হি হি করিয়া হাসিতে লাগিল। বলিল, “এ অবাার এক নূতন বাহন! আর ঘোড়া চাই না—এখন হাতীতেই যাতায়াত চলবে।”
কেনেডি বড়ই ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। তিনি বারংবার বন্দুক নাড়িতে লাগিলেন।
হস্তী ক্ষিপ্র চরণে যাইতেছিল, দৌড়াইতে আরম্ভ করিল। দক্ষিণে ও বামে শুণ্ডদারা আঘাত করিতে লাগিল। আবশ্যক মাত্রেই যাহাতে নোঙ্গরের দড়ি কাটিয়া দিতে পারেন, ফার্গুসন্ সেইজন্য কুঠার হস্তে দণ্ডায়মান হইলেন। কহিলেন, “নিতান্ত দায়ে না ঠেকলে আর নোঙ্গরের আশা ছাড়ছিনে।”
প্রায় দেড় ঘণ্টা চলিয়া গেল। হস্তী ছুটিল, সেই সঙ্গে সঙ্গে বেলুনও ছুটিল। ফার্গুসন্ দেখিলেন দূরে একটা নিবিড় বন দেখা যাইতেছে, সুতরাং বেলুনটা রক্ষার নিমিত্তই হস্তিদন্ত হইতে নোঙ্গর মুক্ত করা প্রয়োজন হইয়া পড়িল।
কেনেডি আর অপেক্ষা করিলেন না—পলায়মান হস্তীকে লক্ষ্য করিয়া বন্দুক ছুড়িলেন। গুলি উহার শিরে লাগিয়া অন্যদিকে ছুটিয়া গেল, শির ভেদ করিল না। বন্দুকের শব্দ শুনিয়া হস্তী অধিক বেগে দৌড়াইতে লাগিল।
কেনেডি উহার স্কন্ধদেশে আঘাত করিলেন। হস্তীর আর্ত্ত্নাদে প্রান্তর কম্পিত হইয়া উঠিল। উহা আরো বেগে ধাবিত হইল।
জো কহিল—“আপনি একা পারবেন না, আমিও মারি।” তখন উভয়ে হস্তীকে আহত করিলেন। দুইটী গুলি উহার দুই পার্শ্ব ভেদ করিল।
হস্তী মুহূর্ত্তের জন্য থামিল এবং পরক্ষণেই শুণ্ড উত্তোলন করিয়া উর্দ্ধশ্বাসে বনের দিকে দৌড়াইল। উহার ক্ষতমুখে হুহু করিয়া রুধিরস্রোত ছুটিল।
ফার্গুসন্ দেখিলেন বনভূমি, সন্নিকট হইয়াছে, এখনই হয় ত বেলুন যাইয়া কোন বৃক্ষশাখায় প্রহত হইবে। তবেই সর্ব্বনাশ! তিনি উৎকণ্ঠিত হইয়া কহিলেন, “মার মার—আরো গুলি লাগাও। আমরা যে বনের কাছে এসে পড়েছি!”
কেনেডি এবং জো হস্তীকে পুনঃ পুনঃ আঘাত করিতে লাগিলেন। দশটী গুলি উহার দেহ বিদ্ধ করিল। চীৎকারে বনভূমি কাঁপিতে লাগিল। শির ও শুণ্ড সঞ্চালনে মনে হইতে লাগিল, বেলুন হইতে দোলনাটী ছিঁড়িয়া পড়িবে—বেলুন টুকরা টুকরা হইয়া যাইবে। মধ্যে মধ্যে প্রবল ধাক্কা লাগিতেছিল। হঠাৎ একটা ধাক্কায় ফার্গুসনের হস্ত হইতে কুঠারখানি ভূপৃষ্ঠে পতিত হইল। তখন তিনি ছুরি দিয়া নোঙ্গরের বন্ধন-রজ্জু কাটিতে চেষ্টা করিলেন। চেষ্টা বিফল হইল। বেলুন তখন অতিবেগে বনের দিকে চালিত হইতেছিল।
কেনেডি পুনরায় বন্দুক ছুড়িলেন। একটি গুলি হস্তীর নয়ন বিদ্ধ করিল। এইবার উহা থামিল। কোন্ দিকে যাইবে স্থির করিতে না পারিয়া ইতস্ততঃ করিতে লাগিল। কেনেডির গুলি তখন হস্তীর হৃদয় বিদ্ধ করিল।
অসহ্য যন্ত্রণায় হস্তী চীৎকার করিয়া উঠিল এবং মুহূর্ত্তমাত্র দণ্ডায়মান থাকিয়াই শৈলচ্যুত বিশাল প্রস্তরখণ্ডের ন্যায় ভূতলে পতিত হইল। সেই পতনেই উহার বৃহৎ দত্ত দুইটী দ্বিধাভগ্ন হইয়া গেল। হস্তীর জীবলীলা ফুরাইল।
সকলেই বেলুন হইতে অবতরণ করিলেন। জো হস্তিশুণ্ডের কোমল অংশ কাটিয়া লইয়া রন্ধন করিতে আরম্ভ করিল কিছুক্ষণ পর কেনেডি যখন কতকগুলি পক্ষী শিকার করিয়া ফিরিলেন, তখন জো’র রন্ধন-কার্য্য সমাপ্ত হইয়াছে। ফাগু সন্ ততক্ষণ বেলুনটী পরীক্ষা করিতেছিলেন। সেই মুক্ত আকাশতলে, অজ্ঞাত দেশের নীরব প্রান্তর পার্শ্বে, সেই মনুষ্য-সমাগমবিরহিত অরণ্য-পরিবেষ্টিত পরিচ্ছন্ন ভূমিতলে বসিয়া তিনজনে তখন আহার করিতে লাগিলেন।
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
নীল নদী
প্রভাতে জো ফার্গুসনের হস্তমুক্ত কুঠার-খানি খুঁজিয়া বাহির করিল। ফার্গু সন্ বেলুন ছাড়িলেন। উহা ঘণ্টায় ১৮ মাইল বেগে চলিতে লাগিল। তিনি আজ বড় চঞ্চল হইলেন। ক্ষণে ক্ষণেই দূরবীক্ষণ দ্বারা চতুদিক্ দেখিতে লাগিলেন। ভিক্টোরিয়া রুবেমি-পর্ব্বত-শৃঙ্গ অতিক্রম করিয়া কারাগোয়া শৈলমালার প্রথম পর্ব্বত টেঙ্গার সমীপবর্ত্তী হইল। প্রাচীন কাহিনী পাঠে ফার্গুসন্ জানিয়াছিলেন যে, কারাগোয়া শৈলমালাই নীল নদীর প্রথম ক্রীড়া-ক্ষেত্র। তাঁহার মনে হইতে লাগিল এ কাহিনী সত্য, কারণ এই সকল পর্ব্বতই ইউকেরিউ হ্রদ পরিবেষ্টিত করিয়া রাখিয়াছে। আরো কিছুদূর অগ্রসর হইতেই ফার্গুসনের বোধ হইল যেন দূরে দিগ্বলয়ের নিকটে সেই বিশ্ববিশ্রুত হ্রদের উজ্জল বারিরাশি দেখা যাইতেছে!
ফার্গুসন্ বিশেষ মনোযোগ সহকারে সেই প্রদেশ পর্য্যবেক্ষণ করিতে লাগিলেন। তিনি দেখিলেন চরণনিম্নে অনুর্বর ক্ষেত্র। কয়েকটা গিরিসঙ্কটে সামান্য কিছু শস্য জন্মিয়াছে। ক্রমেই উচ্চভূমি পর্বত-শিখরবৎ ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত রহিয়াছে।
দেখিতে দেখিতে কারাগোয়ার প্রধান নগর নিকটবর্ত্তী হইল। ৫০ খানি কুটীর লইয়া নগর। পীত ও পিঙ্গল বর্ণের কাফ্রিগণ বিস্মিত হইয়া ভিক্টোরিয়ার দিকে চাহিয়া রহিল। সে দেশের রমণীগণ অস্বাভাবিক রূপে স্থূলাঙ্গী। তাহারা কোন প্রকারে আপন আপন স্থূল দেহ বহন করিয়া উপনিবেশ মধ্যে ভ্রমণ করিতেছিল। ফার্গুসন্ সঙ্গীদিগকে কহিলেন, “স্থূলাঙ্গই এ দেশের রমণী-কুলের লাবণ্যের লক্ষণ। রমণীদিগকে স্থূলাঙ্গী করিবার নিমিত্ত এক প্রকার ঘোল পান করিতে দেওয়া হয়।”
বেলুন ভিক্টোরিয়া-নায়াঞ্জা হ্রদের নিকট দিয়া উত্তরদিকে যাইতেছিল। পর্য্যটকগণ দেখিলেন সেদিকে জন-মানবের চিহ্ন পর্য্যন্তও নাই। হ্রদের তীর কণ্টকবনে সমাকীর্ণ। কোটী কোটী পিঙ্গল বর্ণের মশক সেই সকল কণ্টক বৃক্ষ ও লতাদি আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছে। শত শত সিন্ধুঘোটক হ্রদের মধ্যে ক্রীড়া করিতেছে। হ্রদ পশ্চিমদিকে সমুদ্রতুল্য বিস্তৃত।
সন্ধ্যা-সমাগমে ফার্গুসন্ একটী দ্বীপের উপর নোঙ্গর করিয়া বলিলেন, “এই হ্রদের মধ্যে যে সকল দ্বীপ দেখা যাচ্ছে, সে সমস্তই হ্রদগর্ভস্থ পর্ব্বতের চূড়া। আমাদের সৌভাগ্য যে, আমরা একটা পাথরের গায়ে নোঙ্গর বাঁধতে পেরেছি। হ্রদের তীরে যে সকল জাতি বাস করে, তারা বন্য পশুর চেয়েও হিংস্র। এখন তোমরা নির্বিবাদে নিদ্রা যাও রাত্রে আর কোনো বিপদের আশঙ্কা দেখছিনে।”
কেনেডি বলিলেন, “তুমি ঘুমুবে না?”
“আমার ঘুম আসরে না ডিক্। চিন্তায় আমার মস্তিষ্ক আলোড়িত হচ্ছে। যদি সুবাতাস পাই, তা’ হ’লে নিশ্চয় কালই নীল নদীর জন্মক্ষেত্র দেখতে পাব। যে তীর্থ দর্শন করতে বেরিয়েছি, তার সিংহদ্বারের নিকট এসে কি আর আমার ঘুম আসবে।”
কেনেডি এবং জো নীল নদীর জন্মস্থান দেখিবার জন্য কিছুমাত্র ব্যস্ত ছিলেন না। ফার্গুসনকে প্রহরী কার্য্যে নিযুক্ত করিয়া তাঁহারা স্বচ্ছন্দে নিদ্রিত হইয়া পড়িলেন।
ভোর চারিটার সময় বেলুন আবার চলিতে লাগিল। বাতাস তখন প্রবল বেগে উত্তর মুখে বহিতেছিল। বেলুন ঘণ্টায় ৩০ মাইল বেগে চলিতে লাগিল। তখন পদনিম্নে বায়ুতাড়িত নায়াঞ্জা হ্রদে বিপুল তরঙ্গোচ্ছ্বাস হইতেছিল। তরঙ্গশিরে ফেনপুঞ্জ তপন কিরণে বড় উজ্জল দেখাইতেছিল। বেলুন বেলা ৯টার সময় হ্রদের পশ্চিম তীরে উপনীত হইল। সেদিকে কেবল মরুভূমি ও কোন স্থানে ঘন বন ভিন্ন আর কিছুই ছিল না। বেলুন আরো অগ্রসর হইল। তখন দূরে নায়াঞ্জা হ্রদের প্রান্তদেশে উচ্চ গিরিমালার শুষ্ক কঠিন চূড়াগুলি দেখা যাইতে লাগিল। বোধ হইল যেন তথা হইতে একটী বেগশালী নদী বক্রপথে প্রবাহিত হইয়াছে। ফার্গুসন্ বলিলেন “দেখ—দেখ। আরবরা যা বলছে তা’ ঠিক। তারা বলেছে একটা নদী আছে, ইউকেরিও হ্রদের বারিরাশি সেই নদী দিয়ে উত্তরমুখে বয়ে যায়। ওই ত সে নদী। নিশ্চয়ই এই নদী নীল নদী।”
“নীল নদী!” কেনেডি বিস্মিত হইয়া কহিলেন, “নীল নদী।”
বেলুন তখন নদীর উপর দিয়া শূন্য-পথে ভাসিয়া যাইতেছিল। বিশাল পর্ব্বতশ্রেণী স্থানে স্থানে নদীর মুক্ত পথ রুদ্ধ করিয়া দণ্ডায়মান ছিল। প্রহৃত বারি-রাশি ফুলিয়া ফাঁপিয়া গর্জ্জন করিয়া কখনো ভীম জলপ্রপাতবৎ কখনো বা পর্ব্বতরন্ধের ভিতর দিয়া সহস্র ধরে’ বহিয়া যাইতেছিল। পর্ব্বত হইতে শত সহস্র ধারা নামিয়া সেই বেগশালী বারিপ্রবাহের সহিত মিলিত হইতেছিল।
ফার্গুসন্ বলিলেন, “এইটাই নীল নদী। নদীর নাম নিয়েও যেমন গোলযোগ, উৎপত্তি-স্থান নিয়েও তেমনি গোলযোগ।”
কেনেডি বলিলেন, “এটা যে সত্যই নীল নদী তার প্রমাণ কি?”
“তার অভ্রান্ত প্রমাণ আছে।”
“এখানে অবতরণ করা সম্ভব হ’বে না। ওই দেখ কাফ্রিরা বেলুন দেখে কেমন কুপিত হয়েছে।”
“তা’ হো’ক্। আমাকে নামতেই হ’বে।”
“এখানে নামলে বিপদ্ ঘটিতে পারে।”
“যদি ঘটে, তার উপায় নাই। যদি বন্দুকের মুখে শত্রু তাড়িয়েও নামতে হয়, তাও স্বীকার।”
ফার্গুসন্ বেলুনকে ঊর্দ্ধে তুলিলেন। ২৫০০ ফিট উপরে উঠিয়া তাঁহারা দেখিলেন যে, চতুদ্দিক্ হইতে শত সহস্র ক্ষুদ্রশরীরা তরঙ্গিণী আসিয়া নীল নদীর সহিত মিলিত হইয়াছে। তাহাদের অধিকাংশই পশ্চিমদিকের শৈলমালা হইতে বহির্গত হইয়াছে। ফাগুসন্ মানচিত্র আলোচনা করিয়া বলিলেন “উত্তর থেকে যাঁরা এ দিকে এসেছিলেন, আমরা এখনো তাঁদের আবিষ্কৃত স্থানে যেতে পারিনি। গণ্ডরোকা এখান থেকে ৯০ মাইল হ’বে। এখন ধীরে ধারে নামা যাক। তোমরা সাবধান হও।”
বেলুন নামিতে লাগিল। এখানে নীল নদীর বিস্তার অধিক ছিল না। পার্শ্ববর্ত্তী গ্রামসমূহের অধিবাসিগণ বেলুনকে একটা দৈত্য মনে করিয়া চঞ্চল হইয়া উঠিল। ফার্গুসন্ দেখিলেন অল্প দূরেই নীল নদী ৭/৮ হস্ত মাত্র গভীর জল-ধারা বহিয়া অগ্রসর হইয়াছে।
তিনি হর্ষোৎফুল্ল হইয়া বলিলেন, “ওই তো সেই জলপ্রপাত! পর্য্যটক ডিবোনা ওর কথাই বলে গেছেন।”
বেলুন যতই অগ্রসর হইতে লাগিল, নদীর বিস্তার ততই অধিক হইতে লাগিল। ক্রমেই নদীমধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ-পুঞ্জ দেখা যাইতে লাগিল। ফার্গুসন্ বিশেষ মনোযোগের সহিত দ্বীপগুলি দেখিতে লাগিলেন। কতকগুলি কাফ্রি একখানি ডোঙ্গায় আরোহণ করিয়া বেলুনের তলদেশে আসিবামাত্র কেনেডি বন্দুকের গুলি চালাইয়া তাহাদিগের অভ্যর্থনা করিলেন। তাহারা প্রাণভয়ে পলায়ন করিল।
ফার্গুসনের দৃষ্টি এদিকে ছিল না। তিনি দূরবীক্ষণ লইয়া নদীর ঠিক মধ্যস্থলে স্থিত একটা ক্ষুদ্র দ্বীপ বিশেষ অভিনিবেশ পূর্ব্বক দেখিতেছিলেন। দেখিতে দেখিতে কহিলেন,
“ওই না চারটা গাছ দেখা যাচ্ছে? ওই দ্বীপের নাম বেঙ্গল দ্বীপ। আমাদের ওইখানে নামতে হবে।”
“কতকগুলো কাফ্রিদের ওখানে বাস আছে ব’লে বোধ হচ্ছে না?”
“তা’ হো’ক ডিক্। ওরা দেখছি জন কুড়ি হ’বে। বন্দুক থাকতে কুড়ি জন কাফ্রি তাড়িয়ে দিতে কত সময় লাগবে!”
তখন মধ্যাহ্ন-সূর্য্য ঠিক মস্তকোপরি অগ্নি বর্ষণ করিতেছিল। বেলুন দ্বীপের সমীপবর্ত্তী হইতেছে দেখিবামাত্রই কাফ্রিগণ চীৎকার করিতে আরম্ভ করিল। তাহাদের মধ্যে এক জন বৃক্ষ ত্বকে নির্ম্মিত টুপী আপন মস্তক হইতে লইয়া নাড়িতে লাগিল। কেনেডি টুপী লক্ষ্য করিয়া গুলি করিলেন। উহা শতখণ্ডে চূর্ণ হইয়া গেল। কাফ্রিগণ ক্ষিপ্রচরণে পলায়ন করিল। কতক বা নদী মধ্যে ঝম্প প্রদান করিল। নদীর উভয় তীর হইতে শত সহস্র গুণমুক্ত শর বৃষ্টির ধারার ন্যায় পতিত হইতে লাগিল।
কেনেডি ও ফার্গুসন্ অবতরণ করিলেন।
দ্বীপের প্রান্তদেশে কয়েকটী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পর্ব্বত ছিল। ফার্গুসন্ বন্ধুকে সেই দিকে টানিয়া লইয়া গেলেন। তথাকার কণ্টকময় লতা-গুল্মাদি সরাইতে সরাইতে ক্ষত বিক্ষত হইয়া ফার্গুসন্ একবার হর্ষে চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন—
“এই দেখ ডিক্—প্রমাণ দেখ।”
“তাই ত পাথরের গায়ে লেখা দেখছি।”
“দেখ, দেখ। দু’টী অক্ষরই ইংরাজী!”
ডিক্ অপেক্ষাকৃত উচ্চ কণ্ঠে পাঠ করিলেন—“এ, ডি।”
ফার্গুসন্ বলিলেন, “এ ডি আর কিছুই নয়, আন্দ্রিয়া ডিবোনো। ইনিই নীল নদীর সর্ব্ব উত্তর সীমা দেখে গেছেন।”
দুই বন্ধু আনন্দে কর মর্দ্দন করিলেন।
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ
রাক্ষসের রাজ্য
নির্বিঘ্নে দুই দিবস অতিবাহিত হইল। পর্য্যটকগণ নির্বিঘ্নে অগ্রসর হইতে হইতে তৃতীয় দিবসে একটী গ্রামের নিকটে আসিয়া উপনীত হইলেন। গ্রামটী বৃত্তাকার। তাহার মধ্যস্থলে একটী বিরাট বৃক্ষ আকাশে মস্তক ঠেকাইয়া দণ্ডায়মান ছিল। তাহার পত্র-বহুল অগণিত শাখাৱ নিম্নে কতকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুটীর নির্ম্মিত ছিল।
জো কহিল, “দেখুন দেখুন—গাছের ডালে ডালে কত সাদা ফুল ফুটেছে।”
মনোযোগপূর্ব্বক দেখিয়া ফার্গুসন্ বলিলেন, “ও সব ফুল নয় জো—ফুল নয়। নর-কঙ্কাল! মানুষের মাথা! ছোরা দিয়ে গাছের গায়ে বিদ্ধ করে রেখেছে!”
জো শিহরিয়া উঠিল।
দেখিতে দেখিতে সে গ্রামখানি চক্ষুর অন্তরাল হইল বটে, কিন্তু পরক্ষণেই আর একখানি দেখা দিল। ফার্গুসন্ দেখিলেন অর্দ্ধভুক্ত নরদেহ, ছিন্ন নরবাহু,খণ্ডিত চরণ-সমূহ, শুভ্র নরকঙ্কাল গ্রামের চতুর্দ্দিকে বিক্ষিপ্ত রহিয়াছে! দেখা দিল। বন্য জন্তুগণ সেই সকল নরদেহ লইয়া টানাটানি করিতেছে। ফার্গুসন্ বলিলেন—
“ওই যে নরকঙ্কাল দেখছ, ও সমস্তই দণ্ডিত অপরাধীদের শেষ চিহ্ন। বন্দীদের ধরে’ এনে বনে ছেড়ে দেয়। অমনি হিংস্র পশুরা এসে তাদের আক্রমণ করে। আফ্রিকার দক্ষিণাংশে কি করে জান? অপরাধীদের ধরে’ একটা ঘরে বন্ধ করে। তারপর তাদের স্ত্রী পুত্র পরিবার—এমন কি পালিত পশুপক্ষী পর্য্যন্ত সেই ঘরের ভিতর বন্ধ করে’ আগুন জ্বালিয়ে দেয়।”
কেনেডি বলিলেন, “কি নিষ্ঠুর প্রথা! এও ফাঁসীর মতই নৃশংস ব্যাপার।”
জো এতক্ষণ নীরবে আকাশের দিকে চাহিয়াছিল। কতকগুলি পক্ষী দেখাইয়া বিস্ময়ের সহিত কহিল—“ওগুলো কি পাখী? কত উপরে উঠছে দেখুন।”
কেনেডি দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়া দেখিয়া কহিলেন— “ও সবই ঈগল পাখী। কি সুন্দর পাখী। আমারাও যেদিকে যাচ্ছি ঈগলও সেই দিকেই যাচ্ছে।”
ফার্গুসন্ ব্যস্ত হইয়া বলিলেন, “ভগবান্ যেন ওদের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করেন। নরমাংসভুক্ কাফ্রিদের হাতে পড়লেও আমাদের তত চিন্তার কারণ নাই। কিন্তু ঈগলের কাছে আমাদের নিস্তার নাই, ডিক্!”
“পাগল আর কি!” হাসিয়া কেনেডি বলিলেন, “পাগল আর কি! আমাদের হাতে বন্দুক থাকতে আবার ভয়!”
কেনেডি বন্দুক উঠাইলেন।
বাধা দিয়া ডাক্তার বলিলেন, “থাম ডিক্, থাম, তুমি খুব শিকারী তা’ জানি। ঈগলের ঠোট কত ধারালো তা’ জান? একবার ঠোকর দিলেই বেলুন ছিঁড়ে যাবে।”
জো হাসিয়া কহিল, “বেলুনের সঙ্গে কতকগুলো ঈগল পাখী বেঁধে দিলে হয়। আমাদের টেনে নিয়ে যেতে পারে।”
জো’র কথা শুনিয়া ফার্গুসন্ এবং কেনেডি উভয়ে হাস্য করিয়া উঠিলেন। কেনেডি বলিলেন—
“তোমার প্রস্তাবটা বেশ ভাল বটে, কিন্তু ঈগল কি আর পোষ মানবে!”
“মান্বে না? শিখিয়ে নিতে হ’বে। ঘোড়ার যেমন লাগাম থাকে, তার বদলে ঈগলের চোখে ঠুলি দিয়ে দিলেই হয়। যখন যে চোখ খোলা থাকবে, ঈগল নিশ্চয়ই সেই দিকে যাবে।”
যখন এইরূপ কথাবার্ত্তা হইতেছিল তখন বেলা প্রায় দ্বিপ্রহর হইয়াছিল। বাতাস মৃদু ছিল বলিয়া ভিক্টোরিয়া অপেক্ষাকৃত ধীরে ধীরে যাইতেছিল। হঠাৎ বংশীধ্বনি শ্রুত হইল। সকলে বিস্মিত হইয়া নিম্নে চাহিয়া দেখিল, দুই দলে ভীষণ যুদ্ধ হইতেছে। উভয় পক্ষের শরজালে তখন আকাশ সমাচ্ছন্ন হইয়াছিল। যুদ্ধে মত্ত ছিল বলিয়া কাফ্রিগণ বেলুন দেখিতে পাইয়াছিল না। বেলুনের উপর দৃষ্টি পতিত হইবা মাত্র কিছুক্ষণের জন্য যুদ্ধ থামিয়া গেল। চীৎকার প্রবল হইল। অবিলম্বে বেলুন লক্ষ্য করিয়া তীর নিক্ষিপ্ত হইল। একটা তীর বেলুনের এত নিকটে আসিয়াছিল যে, জো ক্ষিপ্র করে উহা ধরিয়া ফেলিল।
ফার্গুসন্ বলিলেন—“চল আরো উপরে উঠি। যুদ্ধ দেখতে যেয়ে নিজেদের সর্ব্বনাশ ঘটা’তে পারি না।”
তখন পুনরায় যুদ্ধ আরম্ভ হইয়াছিল। পূর্ববৎ শোণিতস্রোত ছুটিতেছিল। একজনের অস্ত্রাঘাতে পূর্ব্ববৎ অপরের ছিন্নশির ভূতলে পড়িতেছিল। একজন ধরাশায়ী হইবামাত্র তাহার শত্রু আসিয়া শির কাটিয়া লইতেছিল। রমণীগণও যুদ্ধে যোগ দিয়াছিল। তাহারা সেই সকল ছিন্নশির আহরণ করিয়া সমর-প্রাঙ্গণের উভয় পার্শ্বে রক্ষা করিতেছিল। একজন অপরের নিকট হইতে ছিন্ন নরশির সবলে কাড়িয়া লইতেছিল। আবশ্যক হইলে তাহার জন্য অস্ত্রাঘাত করিতেও কুণ্ঠিত হইতেছিল না।
কেনেডি কহিলেন—“কি ভয়ানক দৃশ্য!”
ফার্গুসন্ বলিলেন—“ওদের যদি একটা করে’ পোষাক থাকতো, তা’ হ’লে এই অসভ্য কাফ্রি আর অন্য দেশের সুসভ্য সৈনিকের মধ্যে প্রভেদ কোথায়?”
বন্দুক তুলিয়া কেনেডি বলিলেন, “আমার ইচ্ছা হচ্ছে যুদ্ধে বাধা দি।”
বাধা দিয়া ফার্গুসন্ বলিলেন—“সে সবে কাজ নাই ডিক্। এস, আমরা নিজের পথ দেখি। এ দৃশ্য—এ নরহত্যা—আর দেখা যায় না। যারা যুদ্ধ-ব্যবসায়ী, তারা যদি এমনি করে’ বেলুনে উঠে’ নরহত্যা দেখতো, তা হ’লে বোধ হয় তাদের শোণিত-তৃষ্ণা, রাজ্যজয়ের স্পৃহা সবই মুহূর্ত্তে দূর হ’য়ে যেত।”
যুদ্ধরত দুই দলেরই নেতা ছিল। তাহাদের মধ্যে একজন অতিশয় বলশালী ও স্থুল। যে দিকে শত্রুসংখ্যা অধিক, সে ক্ষিপ্ত হস্তে সেই দিকেই তীক্ষ্ণ বর্শা চালিত করিতেছিল এবং অপর হস্তে ক্ষুরধার কুঠারের আঘাতে শত্রু নিপাত করিতেছিল। কখনো বা রুধিরাক্ত দেহে আহত শত্রুর উপর পতিত হইয়া কুঠারের আঘাতে তাহার বাহু ছিন্ন করিয়া সে সগর্ব্বে চর্ব্বণ করিতে লাগিল।
কেনেডি এই দৃশ্য দেখিয়া বলিয়আ উঠিলেন—”রাক্ষস! রাক্ষস! ওই দেখ ফার্গুসন্! মানুষ খাচ্ছে!”
তন্মুহূর্ত্তেই কেনেডির বন্দুকের গুলিতে সেই নরখাদক সর্দ্দারের মস্তক বিচূর্ণিত হইয়া গেল।
অকস্মাৎ সর্দ্দারকে নিহত হইতে দেখিয়া যোদ্ধাদিগের বিস্ময়ের পরিসীমা রহিল না। বিপক্ষদলের উৎসাহ ও উত্তেজনা আরো বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইল। অপর পক্ষ ভয়ে পলায়ন করিতে লাগিল।
ফার্গুসন্ তখন বেলুন লইয়া উর্দ্ধে উঠিতেছিলেন। উঠিতে উঠিতে দেখিলেন বিজয়িগণ অপর পক্ষের আহত ও নিহত যোদ্ধৃগণের হস্ত পদ প্রভৃতি লইয়া নিজেদের মধ্যেই বিবাদ বাধাইয়াছে এবং রুধিরসিক্ত নরদেহ পরমানন্দে ভক্ষণ করিতেছে।
চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ
“রক্ষা কর, রক্ষা কর”
রজনী ভীষণ অন্ধকার। কিছুই নয়নগোচর হইতেছিল না। ফার্গুসন্ একটী বৃক্ষ-শিরে বেলুন আবদ্ধ করিলেন!
রাত্রি বারটার সময় যখন কেনেডি শয্যা ত্যাগ করিয়া প্রহরীর কার্য্যে নিযুক্ত হইলেন তখন ফার্গুসন্ কহিলেন—
“ডিক্, বেশ সাবধানে থাক—বড় অন্ধকার।”
“কেন? কিছু বিপদের আশঙ্কা আছে কি?”
“এখনো কিছু নাই বটে—কিন্তু হ’তে কতক্ষণ! আমার বোধ হয়, কি একটা গুণ্ গুণ্ ধ্বনি হচ্ছে। বাতাসে আমাদের কোথায় যে টেনে এনেছে অন্ধকারে তা’ কিছুই বুঝতে পাচ্ছিনে।”
“ও সব কিছু নয়। বোধ হয় বন্যপশুর দূরাগত হুঙ্কার মাত্র।”
“তা’ যা’ হোক—খুব সাবধানেই পাহারা দিও। সামান্য শঙ্কার কারণ দেখলেই আনার ডেকে তুলো।”
“আচ্ছা। তুমি নিশ্চিন্তে নিদ্রা যাও।”
আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হইয়াছিল। বাতাসের চিহ্নমাত্রও ছিল না। কেনেডি সেই নীরব অন্ধকার মধ্যে বিশেষ মনোযোগের সহিত ইতস্ততঃ দেখিতে লাগিলেন। চিত্ত যখন উৎকণ্ঠিত থাকে, তখন মানুষ কত কি দেখে—তাহাদের কোনোটার অস্তিত্ব থাকে—কাহারো কিছুই থাকে না। হঠাৎ একবার বোধ হইল কেনেডি যেন একটা ক্ষীণ আলোক-রেখা দেখিতে পাইলেন। তিনি বিশেষ মনোযোগপূর্ব্বক চাহিয়া রহিলেন। আলোক-রশ্মি আর দেখা গেল না। কেনেডি ভাবিলেন, এ কি তবে মায়া?
তিনি উৎসুক হইয়া চাহিয়া রহিলেন। কিছুক্ষণ গেল। আলোক-রেখা আর দেখা গেল না। কেনেডি তখন নিচিন্ত হইলেন।
ও কি—ও? কেনেডি চমকিয়া উঠিলেন। এ বংশীধ্বনি কোথা হইতে হইল? নিশ্চয়ই বংশীধ্বনি। তাই কি? এ কি কোন নিশাচর পক্ষীর কণ্ঠ? বন্যপশুর চিৎকার নয় ত? আবার মনে হইল, এ বুঝি মনুষ্যের কণ্ঠ! কেনেডি বন্দুকটা পরীক্ষা করিয়া হাতের কাছে রাখিলেন। ভাবিলেন পশু হোক, পক্ষী হোক, মনুষ্য হোক, বেলুন অনেক উপরে আছে। চিন্তা কি?
মুহূর্ত্তের জন্য মেঘমুক্ত চন্দ্রালোকে তিনি দেখিলেন, কতক গুলি অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি নড়া-চড়া করিতেছে! ভাল করিয়া দেখিতে না দেখিতেই মেঘে চন্দ্র ঢাকিয়া গেল। কেনেডি আর বিলম্ব না করিয়া ফার্গুসনের গাত্র স্পর্শ করিয়া তাঁহাকে জাগ্রত করিলেন। কহিলেন, “চুপ, ধীরে কথা কও।”
“কি হ’য়েছে, ডিক্?”
“জোকে ডেকে তোল।”
জো উঠিল! কেনেডি সকল কথা প্রকাশ করিলেন। জো বলিল, “ও কিছু নয়। সেই যে একবার বানর দেখেছিলাম, বোধ হয় তাই।”
কেনেডি গম্ভীর ভাবে বলিলেন,—“হ’তে পারে। কিন্তু সাবধান হওয়াই ভাল। আমি আর জো মই ব’য়ে নীচে নামি। গাছের উপর গেলেই বোঝা যাবে!”
ফার্গুসন্ কহিলেন, “আচ্ছা নাম। আমি গ্যাসটা ঠিক করে’ নি। নিতান্ত দরকার না হ’লে বন্দুক আওয়াজ করো না।”
উভয়ে বৃক্ষোপরি অবতরণ করিয়া একটা সুদৃঢ় শাখার উপর বসিলেন। কিছুক্ষণ পরই জো ধীরে ধীরে কহিল—
“শুনছেন?”
“হাঁ—শুন্ছি। কিসে যেন গাছটা আঁচড়াচ্ছে না?”
“শব্দটা নিকটে আসছে না? বোধ হয় বড় একটা সাপ!”
“সাপ! না―তা’ নয়। ওই শোন শব্দটা বেশী হচ্চে। বোধ হয় মানুষ!”
জো মনোযোগপূর্ব্বক শুনিয়া কহিল, “আমারও তাই সন্দেহ হচ্ছে। কে যেন গাছে উঠছে।”
“তুমি গাছের ওদিকটা দেখ—আমি এদিক্ দেখি।”
উভয়ে বন্দুক হস্তে নীরবে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। একেই মেঘের জন্য চতুর্দ্দিক্ অন্ধকার ছিল। ঘন বৃক্ষপত্র সে অন্ধকারকে আরও বাড়াইয়া তুলিয়াছিল। কিছুক্ষণ যাইতে না যাইতেই জো বেশ দেখিল যে, কয়েকজন কাফ্রি গাছে উঠিতেছে। জো কেনেডির বাহু টিপিয়া সঙ্কেত করিল। তখন কাফ্রিদিগের মৃদু কণ্ঠধ্বনি শুনা যাইতেছিল। জো বন্দুক তুলিয়া সন্ধান করিল।
কেনেডি কহিলেন—“থাম।”
কতকগুলি কাফ্রি সত্যই বৃক্ষারোহণ করিতেছিল। ধীরে—অতি ধীরে—ঠিক যেন সরিসৃপের ন্যায় তাহারা উঠিতেছিল। অল্পক্ষণ মধ্যেই অন্ধকার ভেদ করিয়া দুইটী মনুষ্যমূর্ত্তি দেখা দিল। জো বৃক্ষের সেইদিকে বসিয়াছিল।
কেনেডি হাকিলেন—“মার!”
উভয়ের বন্দুক বজ্রের ন্যায় একসঙ্গে ধ্বনিয়া উঠিল। আহত কাফ্রিদিগের আর্ত্তনাদের সহিত মিশিয়া সেই ধ্বনি কাঁপিতে কাঁপিতে আকাশে মিলাইয়া গেল। অন্যান্য কাফ্রিগণ হুঙ্কার করিয়া উঠিল এবং বোধ হইল যেন পলায়ন করিল। কিন্তু সেই হুঙ্কার ও আর্ত্তনাদের মধ্যে জো এবং কেনেডির কর্ণে এ কার কণ্ঠ বাজিল? তাঁহাদের সন্দেহ হইল, বুঝি শুনিতে ভ্রম হইয়াছে! নতুবা ইহাও কি সম্ভব? আফ্রিকার মহারণ্যে—এই নরখাদক অসভ্যদিগের মধ্যে— সুসভ্য ফরাসীর কণ্ঠ! ইহাও কি সম্ভব? না-ভ্রম নয়! ওই যে আবার সেই ঘোরতর আর্ত্তনাদ শ্রুত হইল—“রক্ষা কর-রক্ষা কর!”
কেনেডি এবং জো ক্ষিপ্র চরণে মই বহিয়া বেলুনে উঠিলেন। ফার্গুসন্ কহিলেন—
“ডিক্, শুনলে?”
“ফার্গুসন্ এ কি সত্য? যেন কোন ফরাসী ডাকছেন—রক্ষা করা—রক্ষা কর।”
“নিশ্চয়ই কোনো ফরাসী পাদরী। বোধ হয় কাফ্রিরা তাকে হত্যা করছে!”
কেনেডি রোষে জ্বলিয়া উঠিলেন। কহিলেন, “ফার্গুসন্ বল কি! যাতে তাঁ’র রক্ষা হয় তাই কর। আমরা তোমার আদেশের অপেক্ষায় আছি।”
“ওরা যেমন করে’ পালালো তা’ দেখে মনে হয়, কখনো বন্দুকের শব্দ শোনেনি। কিন্তু কি করি—দিন না হ’লে ত কোনো উপায় হয় না!”
“পাদরী যে বড় বেশী দূরে আছেন তা’ত বোধ হচ্ছে না। কারণ—”
ও কি! আবার সেই করুণ কণ্ঠের কাতর প্রার্থনা—“রক্ষা কর—রক্ষা কর।” সে ধ্বনি আকাশে বাতাসে কম্পিত হইতে লাগিল। স্বর শুনিয়া মনে হইতে লাগিল তাঁহার দেহ যেন ক্রমেই অবসন্ন হইয়া আসিতেছে!
জো দন্তে দন্তে ঘর্ষণ করিয়া কহিল—“যদি এই রাত্রেই কাফ্রিরা তাঁকে হত্যা করে—”
ফার্গুসনের হস্ত সজোরে ধরিয়া কেনেডি কহিলেন—
“ফার্গুসন্ শোন—শোন। যদি আজ রাত্রেই তিনি নিহত হন!”
“সেটা সম্ভব নয় ডিক্। কাফ্রিরা উজ্জ্বল সূর্য্যালোকেই বন্দীদের হত্যা করে’ থাকে। বধ করার সময় সূর্য্য চাই-ই চাই।”
কেনেডি উত্তেজিত হইয়া কহিলেন, “আমি যদি এখনই বন্দুক নিয়ে যাই—”
জো কহিল, “আমিও যাব—আমিও যাব।”
ফার্গুসন্ বাধা দিয়া কহিলেন “তোমরা থাম—অত উত্তেজিত হ’য়ো না। তোমরা গেলে ফল ত কিছুই হ’বে না, বরং আমরা যে এখানে আছি তা’ প্রকাশ হ’য়ে পড়বে। আমাদের ত বিপদ্ হ’বেই, আর যাঁকে বাঁচাতে চাও—তাঁরও বিপদ্ হবে।”
“কেন? কাফ্রিরা ত ভয়ে পালিয়েছে। তা’রা কি আর ফিরবে?”
“ডিক্ একটিবার দয়া করে’ আমার কথা মান। তোমরা যদি বন্দী হও, তবেই ত সর্বনাশ!”
“কিন্তু ভাব দেখি ফার্গুসন্—একবার পাদরীর কথা ভাব দেখি। তিনি যে সাহায্যের আশায় ব্যাকুল হ’য়ে আছেন। আমরা এখানে মরার মত নীরব হয়ে পড়ে’ থাকবো? তাঁর করুণ রোদন বিফল হ’বে? তিনি ভাববেন মরার আগে পাগল হয়েছেন—যাকে বন্দুকের শব্দ মনে করে’ আশান্বিত হয়েছিলেন, সেটা বন্দুকের শব্দ নয় তাঁর বিকৃত মস্তকের—”
বাধা দিয়া ফার্গুসন্ কহিলেন, “আমরা এখনই তাঁকে অভয় দিচ্ছি।”
মুখের উভয় পার্শ্বে করতল স্থাপিত করিয়া তিনি উচ্চকণ্ঠে কহিলেন—“আপনি যিনিই হউন, ধৈর্য্য ধরুন। তিনজন বন্ধু আপনার রক্ষার নিমিত্ত প্রাণপণ করেছে। সাহস হারাবেন না!”
ফার্গুসনের কণ্ঠ ডুবাইয়া দিয়া কাফ্রিগণের গর্জ্জন সেই বনভূমি আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল।
কেনেডি অস্থির হইয়া কহিলেন—ফার্গুসন্—ফার্গুসন— ওই বুঝি তাঁকে হত্যা করছে! আমরা সাড়া দিয়েই আরো সর্ব্বনাশ করলেম। যা’ হয় এখনই কর।”
জো একান্ত হতাশ হইয়া বলিল, “হায়, এটা যদি দিন হতো—”
ফার্গুসন্ অস্বাভাবিক কণ্ঠে কহিলেন, “তা হ’লেই বা কি করতে?”
কেনেডি আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। বন্দুক লইয়া বলিলেন “আমি নামি ফার্গুসন্। এই বন্ধুকের মুখে শত্রু তাড়াবো।”
“”দি তুমি না পার তা হ’লে তোমার মৃত্যু ত সুনিশ্চিত! তখন তোমাকে আর পাদরীকে, দু’জনকে বাঁচাবার চেষ্টা করতে হ’বে! সেটা কত কঠিন, ভাব দেখি। অন্যপথ অবলম্বন করলে হয় না?”
“যাতে হয়—তাই কর। এখনই কর—দেরি আর সয় না!”
“আচ্ছা ভালো—”
ফার্গুসন্কে বাধা দিয়া জো কহিল, “আপনি কি কোন উপায়ে এই অন্ধকারটা দূর করতে পারেন না। তা’ হ’লে একবার দেখি—
ফার্গুসন্ কিছুক্ষণের জন্য নীরব রহিলেন। তিনি চিন্তামগ্ন হইলেন। কিছুক্ষণ পরে বন্ধুদিগের দিকে চাহিয়া কহিলেন—
“শোন বলি। আমাদের উপযুক্ত পরিমাণ ভার আছে। মনে কর পাদরীর ওজন আমাদেরই একজনের সমান হ’বে। কিছু কম হওয়ারই কথা, কারণ অনাহারে, যন্ত্রণায় তিনি নিশ্চয়ই শুকিয়ে উঠেছেন। যা হোক আমাদের সমান ওজন ভার ফেলে দিলেও আরো প্রায় ৩০ সের থাকবে। সেটাও যদি ফেলে দি, তা’ হ’লে সাঁ করে’ উপরে উঠতে পারবো।”
“তোমার মতলব কি?”
“শোন। যদি বেলুনটা বন্দীর কাছে নিয়ে যেতে পারি, আর তাঁর ওজনের সমান ভার ফেলে দিয়ে তাঁকে তুলে নি, তা’ হলেও বেলুন বাতাসে ভাসবে। বাকী ভারটাও তখন ফেলে দেওয়া চাই, নইলে কাফ্রিদের হাতে পড়তে হ’বে। সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসে তাপ দিয়ে উপরে উঠতে হ’বে।”
“ঠিক উঠতে পারা যাবে—আর দেরি নয় ফার্গুসন্।”
“একটা অসুবিধা আছে, ডিক্। যখন আবার নামতে হ’বে, তখন খানিকটা গ্যাস ছেড়ে না দিলে আর নামা যাবে না। ৩০ সের ভারের মত গ্যাস ছাড়তেই হ’বে। জ্ঞান ত ভাই, গ্যাস তোমার বেলুনের প্রাণ! যাক অত ভাবলে আর চলবে না।”
“ঠিক বলেছ ফার্গুসন্। বন্দীর প্রাণ আমাদের হাতে—যেমন করে’ই হোক তাঁকে বাঁচাতেই হবে।”
“ভার গুলো হাতের কাছে রাখ। একসঙ্গে ফেলা চাই।”
“অন্ধকারটার কি হবে?”
“অন্ধকার! বেশ ত এখন থাকুক না। আমাদের সব আয়োজন হ’য়ে যাক, তার পর দেখা যাবে। এখন ত অন্ধকার আমাদের ঢেকে রেখে উপকারই করেছে। বন্দুক ঠিক করে’ -রাখ জো,—তোমরা প্রস্তুত হও।”
জো এবং কেনেডি ক্ষিপ্র হস্তে সকল বন্দোবস্ত করিলেন।
ফার্গুসন বলিলেন—“জো, তুমি ভার ফেলবে। ডিক্, তোমার উপর গুরুতর কার্য্যভার। তুমি বন্দীকে মুহূর্তে বেলুনের উপরে তুলে নেবে। এইটিই তোমার প্রধান কাজ। জো কাছে থাক। বেলুনের নোঙ্গর খুলে দাও।”
নোঙ্গর খোলা হইল। অতিশয় ধীরে বাতাস বহিতেছিল বলিয়া বেলুন ধীরে ধীরে অগ্রসর হইতে লাগিল। জলকে গ্যাস করিবার নিমিত্ত জলের মধ্যে যে দুইটি বৈদ্যুতিক তার ছিল, ফার্গুসন্ তাহা বাহির করিলেন এবং ব্যাগের ভিতর হইতে দুই খণ্ড কয়লা লইয়া উহাদের অগ্রভাগ তীক্ষ্ণ করিলেন। আবশ্যক মত তীক্ষ্ণ হইলে পর কয়লা দুইখানি তার দুইটিতে বাঁধিলেন। কয়লার দুইটা তীক্ষ্ণ অগ্রভাগ মিলিত হইবামাত্র মুহূর্ত্তে তীব্র আলোকরাশি বিচ্ছুরিত হইয়া চতুর্দ্দিক্ উদ্ভাসিত করিয়া দিল— অন্ধকারের লেশমাত্র রহিল না।
জো বিস্মিত হইয়া কহিলেন—“ধন্য কৌশল, ধন্য আপনি—”
গম্ভীরকণ্ঠে ফার্গুসন্ বলিলেন—“চুপ।”
তিনি হস্ত ঘুরাইয়া সেই আলোকরাশি চারিদিকে সঞ্চালিত করিতে লাগিলেন এবং যেদিক্ হইতে আর্ত্তনাদ সমুত্থিত হইয়াছিল সেইদিকে পরিচালিত করিলেন।
বৈদ্যুতিক আলোকে তাঁহারা দেখিলেন যে, যে বৃক্ষচূড়ায় বেলুনটি আবদ্ধ ছিল, উহা একটি মুক্ত প্রান্তর মধ্যে অবস্থিত। নিকটবর্ত্তী ইক্ষু-ক্ষেত্র মধ্যে প্রায় ৪০খানি কুটীর দেখা যাইতেছিল। সেই কুটীরগুলি ঘিরিয়া অসংখ্য কাফ্রি দণ্ডায়মান ছিল। বেলুনের প্রায় ৫০।৬০ হস্ত নিম্নে প্রান্তর মধ্যে একটা শূল প্রোথিত ছিল। সেই শূলের পাদমূলে খ্রীষ্টের ক্রুশ বক্ষে ধরিয়া একজন ত্রিংশৎবর্ষীয় অর্দ্ধ-নগ্ন ফরাসী ধর্ম্মযাজক নিপতিত ছিলেন। তাঁহার দেহ রুধিরাপ্লুত। অসংখ্য ক্ষতমুখে শোণিত ঝরিতেছিল।
কাফ্রিগণ দেখিল এক বিপুল ধূমকেতু যেন অগ্নিতুল্য উজ্জ্বল পুচ্ছ বিস্তার করিয়া আকাশ হইতে নামিতেছে! তাহারা ভয়ে চিৎকার করিতে লাগিল। তাহাদিগের চিৎকার শুনিয়া সেই মরণোন্মুখ পাদরী একবার মস্তক উত্তোলন করিলেন। ফার্গুসন্ বলিয়া উঠিলেন—“আছে—আছে—এখনো বেঁচে আছে। তোমরা প্রস্তুত হয়েছ?”
“হা প্রস্তুত।” ডিক্ কেনেডি ও জো সমস্বরে বলিয়া উঠিলেন “হাঁ প্রস্তুত।”
“জো গ্যাস নিবিয়ে দাও।”
গ্যাস নির্ব্বাপিত হইল। বেলুন তখন ধীরে ধীরে বন্দীর দিকে অগ্রসর হইতেছিল। কাফ্রিগণ ভীতচিত্তে কুটীর মধ্যে পলায়ন করিল—শূলের নিকট কেহই রহিল না।
বেলুন যথাসম্ভব নীচে নামিল। কয়েকজন সাহসী কাফ্রি দেখিল বন্দী পলায়ন করিতেছে—তাহারা চিৎকার করিতে করিতে অগ্রসর হইল। কেনেডি বন্দুক হস্তে লইলেন। ফার্গুসন্ বলিলেন—“মের না—থাম।”
ফরাসী পাদরী তখন বহু কষ্টে জানুর উপর ভর করিয়া বসিয়াছিলেন। তাঁহার দাঁড়াইবার শক্তি আর ছিল না। কেনেডি বন্দুক রাখিয়া চক্ষের নিমিষে পাদরাকে বেলুন মধ্যে তুলিয়া লইলেন, জো অমনি আড়াই মণ ভার নিক্ষেপ করিল।
বেলুন উপরে উঠিল না।
কেনেডি অতিমাত্র ব্যস্ত হইয়া কহিলেন—“বেলুন ত উঠে না!”
জো কহিল, “একটা কাফ্রি আমাদের টেনে ধরেছে!”
“ডিক্—ডিক্—জলের বাক্স—”
কেনেডি পরক্ষণেই জলপূর্ণ একটা বাক্স ভূমিতলে নিক্ষেপ করিলেন।
বেলুন চক্ষের নিমিষে প্রায় দুই শত হস্ত উর্দ্ধে উঠিয়া গেল।
জো এবং কেনেডি উল্লাসে জয়-ধ্বনি করিয়া উঠিলেন।
বেলুন অকস্মাৎ আরো ৬’৭ হস্ত উপরে উঠিয়া পড়িল।
কেনেডি পড়িতে পড়িতে বাঁচিয়া গেলেন! কহিলেন “এ আবার কি?”
ফার্গুসন্ বলিলেন “রাক্ষস কাফ্রিটা বেলুন ছেড়ে দিয়েছে!”
সকলে দেখিলেন সে চিৎকার করিতে করিতে, বাতাসে ঘুরিতে ঘুরিতে ভূতলে পতিত হইল।
ফার্গুসন্ বৈদ্যুতিক তার দুইটি পৃথক্ করিলেন। মুহূর্ত্তে সকল আলোক অন্তর্হিত হইয়া গেল। বিরাট অন্ধকার মধ্যে বেলুনের চিহ্ন পর্য্যন্ত কেহ আর দেখিতে পাইল না।
* * * *
মূর্চ্ছিত ফরাসী যখন চক্ষু চাহিলেন তখন রাত্রি একটা। ফার্গুসন্ ফরাসী ভাষায় কহিলেন—“আপনি এখন মুক্ত। আর ভয় নাই।”
পাদরী ক্ষীণকণ্ঠে কহিলেন—“আপনাদের অনুগ্রহে আমি আজ অতি নিষ্ঠুর মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি। ভ্রাতৃবৃন্দ, তজ্জন্য অশেষ ধন্যবাদ। কিন্তু আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। আমি আর অধিকক্ষণ বাঁচবো না!” তিনি পুনরায় মূর্চ্ছিত হইলেন।
তাঁহারা অতি যত্নে অতি সাবধানে পাদরীকে শয়ন করাইলেন। তাঁহার দেহে প্রায় ২০|২৫টি অগ্নি-ক্ষত ও বর্শার চিহ্ন বর্ত্তমান ছিল। ক্ষতমুখে তখনো রুধির ঝরিতেছিল। ডাক্তার ফার্গুসন্ ক্ষতগুলি ধৌত করিয়া ঔষধ প্রয়োগ করিলেন।
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
সব শেষ
প্রভাত। বিপদের রজনীশেষে অতি সুন্দর উজ্জ্বল প্রভাত। প্রভাতে পাদরীকে পরীক্ষা করিয়া ফার্গুসন্ কহিলেন—
“এখনো ভরসা আছে। খুব যত্ন চাই ডিক্।”
পাদরী নিরুদ্বেগে নিদ্রা যাইতেছিলেন। ফার্গুসন্ তাঁহাকে জাগরিত করিলেন না। জো এবং ডিক্ পাদরীর শুশ্রূষায় নিযুক্ত হইলেন। এইরূপে সে রজনী অতিবাহিত হইল। পরদিন প্রভাতে ফার্গুসন্ জিজ্ঞাসা করিলেন—
“এখন কেমন বোধ হচ্ছে?”
“একটু ভাল। আমার মনে হচ্ছে যেন আমি স্বপ্ন দেখছি। যেন স্বপ্নঘোরেই আপনাদের দেখছি। আপনারা কে? ভগবানের কাছে আমার শেষ প্রার্থনার সময়েও যেন আপনাদের কথা নিবেদন করতে পারি।”
“আমরা তিন জন ইংরাজ-পর্যটক। বেলুনে চড়ে’ আফ্রিকা অতিক্রম করছি। পথে আসতে আসতে ভগবানের কৃপায় আপনাকে রক্ষা করেছি। অনুমান হয় আপনি একজন পাদরী।”
“হাঁ। ভগবান্ আপনাদের আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! আমার জীবন শেষ হয়েছে। আপনারা ত য়ুরোপ থেকে এসেছেন? আমাকে য়ুরোপের কথা বলুন—ফ্রান্সের কথা বলুন। আমি পাঁচ বৎসর ফ্রান্সের নাম শুনি নাই।”
“আপনি এতদিন ধরে’ এই রাক্ষসদের মধ্যে বাস করছেন?”
“ওদেরও ত মুক্তির উপায় করতে হ’বে। ওরা অজ্ঞ অসভ্য বর্ব্বর। কিন্তু ওরাও আমাদের ভাই।”
ফার্গুসন্ পাদরীর নিকট ফ্রান্সের গল্প করিতে লাগিলেন। জো তাঁহার জন্য চা প্রস্তুত করিয়া দিল। বহুদিন পর চা পান করিয়া মুক্ত পবনে মুক্ত গগনে ভাসিতে ভাসিতে তাঁহার মনে হইতে লাগিল যেন শরীরে শক্তি ফিরিয়াছে। তিনি শয়ন করিয়াছিলেন, উঠিয়া বসিলেন এবং সকলের সহিত কর মর্দ্দন করিলেন। কহিলেন—
“আপনারা খুব সাহসী পর্য্যটক। এমন অসম্ভব পর্য্যটনকেও আপনারা সম্ভব করে’ তুলতে পেরেছেন। আবার আপনারা হর্ষে গৌরবে স্বদেশের মুখ দেখতে পাবেন। আত্মীয়-স্বজনদের সহাস্যবদন দেখে পরিতৃপ্ত হ’তে পারবেন, আপনাদের—”
পাদরী আর কথা কহিতে পারিলেন না। এতই দুর্ব্বল হইয়া পড়িলেন যে, সকলে ধরাধরি করিয়া তাঁহাকে সাবধানে শয্যার উপর স্থাপন করিলেন। ফার্গুসন্ বুঝিলেন, সেই শীর্ণ দেহের ভিতর যে প্রাণ স্পন্দিত হইতেছিল, তাহার শেষ সময় নিকটবর্ত্তী হইতেছে। তিনি পুনরায় রোগীর ক্ষতগুলি ধৌত করিয়া দিলেন, তাঁহার উষ্ণদেহে শীতল বারি সিঞ্চন করিলেন; সঙ্গে যে অধিক জল ছিল না সেদিকে ভ্রূক্ষেপও করিলেন না। বহুক্ষণ পর পাদরীর জ্ঞান-সঞ্চার হইল। তিনি ধীরে ধীরে আত্মকাহিনী বর্ণনা করিতে লাগিলেন। বলিলেন—
“ব্রিটানি প্রদেশের আরাডন নামক ক্ষুদ্র গ্রামে আমার বাস। আমরা বড় দরিদ্র। বিশ বৎসর বয়সের সময় আমি গৃহ ত্যাগ করে’ এই বান্ধবহীন আফ্রিকায় এসেছি। কতবার বাধার পর বাধা এসে আমার যাত্রাপথ রোধ করে’ দাঁড়িয়েছে। তৃষ্ণা ক্ষুধা শ্রান্তি রোগ কিছুতেই আমাকে নিবৃত্ত করতে পারে নাই। ধীরে ধীরে অগ্রসর হ’তে হ’তে আমি এতদূর পর্যন্ত এসেছি।” পাদরী একটি দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিতে লাগিলেন—
“ন্যাম্বরা জাতির কাফ্রিগণ বড় নিষ্ঠুর। তাদের কাছে আমি অপরিসীম যাতনা পেয়েছি। গ্রাম্যকলহে লিপ্ত হ’য়ে ন্যাম্বরাগণ যখন আমাকে ত্যাগ করেছিল, তখন আমি প্রত্ত্যাবর্তন করলে করতে পারতেম। কিন্তু মনে হলো এদের মধ্যে ধর্ম্ম প্রচার করাই আমার কর্তব্য। তাই আর ফিরলেম না, ক্রমেই সম্মুখে অগ্রসর হ’তে লাগলেম। কাফ্রিরা মনে করলে আমি একটা পাগল। যতদিন তাদের এ ধারণা ছিল, ততদিন আমি অনেকটা শান্তিতেই ছিলাম। আমি এদের ভাষা শিখেছি। বারাফ্রি সম্প্রদায় ন্যাম্ন্যাম্ জাতির মধ্যে সর্ব্বাপেক্ষা নিষ্ঠুর ও হিংস্র। আমি অনেকদিন থেকে এদের মধ্যেই কাটাচ্ছিলেম। ওদের সর্দ্দার কয়েকদিন হ’লো মরে’ গেছে। ওরা মনে করলে আমি কোন মন্ত্র-তন্ত্র করে’ তাকে মেরে ফেলেছি! আমার বধাজ্ঞা প্রচার হ’লো। রজনী প্রভাতেই আমর দেহ শূলে বিদ্ধ হ’তো—দেবদূতের ন্যায় এসে আপনারা আমাকে বাঁচিয়েছেন।”
“আমি যখন বন্দুকের শব্দ শুনলেম তখনিই ‘রক্ষা কর’ বলে’ চিৎকার করেছিলাম। তার পর অনেকক্ষণ গেল, যখন আর কোন সাড়া পেলেম না, তখন মনে করলেম, ওটা বন্দুকের শব্দ নয়—ও আমার জাগ্রত স্বপ্ন মাত্র! আমি যে এখনো বেঁচে আছি, এ—ই আশ্চর্য্য।”
ফার্গুসন্ বলিলেন—
“চিন্তা কি। ধৈর্য্য ধরুন—সাহস করুন। আমরা ত কাছেই আছি। কাফ্রিদের কবল থেকে যখন আপনাকে রক্ষা করতে পেরেছি, মৃত্যুর হাত থেকে কি পারবো না?”
“আমি অত দূর আশা করি না। ভগবানের কাছে আমি অতটা চাই না। মৃত্যুর পূর্ব্বে যে বন্ধুর করস্পর্শ করতে পারলেম—স্বদেশের মধুর কথা শুনতে পেলেম এ-ই যথেষ্ট।”
পাদরী ক্রমেই দুর্ব্বল হইতে লাগিলেন। তাঁহার অবস্থা ক্রমেই শঙ্কটাপন্ন হইতে লাগিল।
বেলুন যেমন চলিতেছিল, তেমনি চলিল।
সন্ধ্যার প্রাক্কালে দেখা গেল, পশ্চিমে ভীষণ অগ্নিকাণ্ড উপস্থিত হইয়াছে! সমস্ত আকাশ আরক্তিম হইয়া উঠিয়াছে!
মনোযোগ পূর্ব্বক দেখিয়া ফার্গুসন্ কহিলেন—“ওটা আগ্নেয়গিরির অগ্নিশিখা!”
কেনেডি ব্যস্ত হইয়া কহিলেন—“বাতাস যে আমাদের ওই দিকেই নিয়ে যাচ্ছে।”
“ভয় নাই ডিক্। আমরা অনেক উপর দিয়ে চলে’ যাব। আগুন আমাদের স্পর্শ করিতে পারবে না।”
তিন ঘণ্টার পর ভিক্টোরিয়া সেই অগ্নিশিখার নিকটবর্ত্তী হইল। পর্ব্বতগর্ভ হইতে গলিত গন্ধকরাশি উৎসের ন্যায় উত্থিত হইয়া ভীষণ শব্দে চতুর্দ্দিকে পতিত হইতেছিল। মধ্যে মধ্যে উত্তপ্ত প্রস্তরখণ্ড বহু ঊর্দ্ধে উৎক্ষিপ্ত হইতেছিল। ফার্গুসন্ বেলুনের গ্যাসে তাপ দিতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে ভিক্টোরিয়া ছয় সহস্র ফিট উচ্চে উঠিল এবং অনায়াসে আগ্নেয় পর্ব্বত অতিক্রম করিল।
পাদরীর প্রবল প্রতাপ তখন নির্ব্বাণোন্মুখ হইয়াছিল। তিনি দুই চারিটী অসংলগ্ন বাক্য উচ্চারণ করিলেন। তাঁহার নিশ্বাস ক্রমেই তীক্ষ্ণ হইয়া আসিতে লাগিল।
তখন মস্তকোপরি বিমল গগনে অসংখ্য তারকা জ্বলিতেছিল। পাদরী সেই তারকাখচিত আকাশের দিকে চাহিতে চাহিতে অতিশয় ক্ষীণকণ্ঠে কহিলেন—“বন্ধুগণ, আমি বিদায় হই। ভগবান্ যেন আপনাদের বাঞ্ছিত স্থানে নিয়ে যান। তিনিই যেন আমার ঋণ পরিশোধ করেন।”
কেনেডি কহিলেন, “এখনো ভরসা আছে। এমন সুন্দর রাত্রে কি কেউ মরতে পারে?”
“মৃত্যু আমার শিয়রে এসে বসেছে—আমি তা’ ঠিক বুঝেছি। আর কেন? বীরের মত মৃত্যুর মুখের দিকে চাইতে দিন। মৃত্যুই এ জন্মের শেষ—আবার সেইখান থেকেই অনন্তের আরম্ভ। বন্ধুগণ, দয়া করে’ আমাকে আমার জানুর উপর বসিয়ে দিন।”
কেনেডি তাহাই করিলেন। পাদরীর দুর্ব্বল শরীর কম্পিত হইতে লাগিল। তিনি ধীরে ধীরে কহিলেন—“হে ভগবান, দয়া কর—দয়া কর—তোমার কাছে টেনে নাও।”
তাঁহার বদনমণ্ডল উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। তিনি তখন পৃথিবীর মায়ালোক ত্যাগ করিয়া স্বর্গের সিংহদ্বারের দিকে অগ্রসর হইতেছিলেন। বন্ধুদিগকে শেষবার আশীর্ব্বাদ করিয়াই পাদরী কেনেডির বাহুর উপর ঢলিয়া পড়িলেন! ফার্গুসন্ গভীর দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন—“সব শেষ ডিক্, সব শেষ!”
তাঁহারা রোদন করিতে লাগিলেন।
রজনী প্রভাত হইল। ভিক্টোরিয়া তখন একটী শৈলচূড়ার উপর দিয়া ধীরে ধীরে যাইতেছিল। নিম্নে কোথাও মৃত আগ্নেয়-পর্বত বদন ব্যাদন করিয়া অবস্থিত ছিল, কোথাও বা বিশুষ্কা পার্ব্বত্যতরঙ্গিণীর শেষ রেখা দেখা যাইতেছিল। নিকটবর্ত্তী শৈলমালা বারিহীন শুষ্ক ও একান্ত কঠিন বলিয়া প্রতীয়মান হইতে লাগিল। কোথাও স্তূপীকৃত প্রস্তরখণ্ড, কোথাও অতি বৃহৎ শিলা প্রতি মুহূর্ত্তেই বলিয়া দিতে লাগিল, এ প্রদেশ একান্ত নীরস, নিতান্ত ঊষর। তথায় বৃক্ষ লতা গুল্ম কিছুই ছিল না। যতদূর চক্ষু চলে কেবল শুষ্ক কঠিন নীরস প্রস্তর রৌদ্র-কিরণে ঝক্ ঝক্ করিতেছিল।
দ্বিপ্রহরে ফার্গুসন্ একটী অতি প্রাচীন গিরিশঙ্কট-মধ্যে অবতরণ করিতে চাহিলেন—ইচ্ছা, তথায় পাদরীকে সমাহিত করিবেন। গ্যাসের উত্তাপ কমিল। বেলুন ধীরে ধীরে নীচে নামিয়া প্রস্তর স্পর্শ করিল। জো এক লম্ফে নিম্নে অবতরণ করিয়া এক হস্তে বেলুন ধরিয়া অপর হস্তে কতকগুলি প্রস্তরখণ্ড তুলিয়া বেলুন-মধ্যে স্থাপিত করিল। বেলুন স্থির হইল। জো আরও প্রস্তর তুলিল। বেলুন অচল হইল। কেনেডি এবং ফার্গুসন্ অবতরণ করিলেন।
গিরিশঙ্কট-মেধ্য অত্যন্ত গরম অনুভূত হইতেছিল। মধ্যাহ্ণতপন তখন মস্তকোপরি অনল বর্ষণ করিতেছিল। তিন জনে চেষ্টা করিয়া পাদরীকে সমাহিত করিলেন।
ফার্গুসন্কে চিন্তান্বিত দেখিয়া কেনেডি কহিলেন—
“কি ভাবছ, ফার্গুসন্?”
“ভাবছি, অক্লান্ত পরিশ্রম করে’ ধৈর্য্যেরসঙ্গে সমস্ত বিপদ্ মাথায় নিতে পারলে, কি পুরস্কারই না মিলতে পারে! প্রকৃতির কি বিসংবাদী ব্যবস্থা। যেখানে কেবল আরাম সেখানে পুরস্কার নাই। যেখানে অগণিত বিপদ্ সেইখানেই সব আছে—ধন, সম্পদ্, মান, যা’ চাও। আজ আমরা কোথায় এই বীর ধর্ম্মযাজককে সমাহিত করলেম, জান?”
“কেন?”
“এই গিরিশঙ্কট যে স্বর্ণক্ষেত্র! যে পাদরী জীবন–কালে দারিদ্র্য ভিন্ন আর কিছুই জানতেন না, জীবনান্তে তিনি একটা বিপুল স্বর্ণক্ষেত্রে সমাহিত হয়েছেন!”
“স্বর্ণক্ষেত্রে! এ কি তবে স্বর্ণের খনি?”
“এই যে সব প্রস্তরখণ্ড তোমরা মূল্যহীন মনে করে’ চরণে দলিত করছ, এর মধ্যেই বিশুদ্ধ স্বর্ণ বর্ত্তমান আছে।”
জো বলিয়া উঠিল— “অসম্ভব! অসম্ভব!”
“অসম্ভব নয়, জো। একটু অনুসন্ধান করলেই দেখতে পাবে।”
জো উন্মত্তের ন্যায় ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত প্রস্তরখণ্ডগুলি অপসৃত করিতে লাগিল।
ফার্গুসন্ বলিলেন
“জো ঠাণ্ডা হও—ঠাণ্ডা হও। কি করছ? এই অনন্ত সম্পদ্ তোমার কোন্ কাজে আসবে, জো? আমরা ত আর এ সব নিয়ে যেতে পারবো না।”
“কেন? কেন?”
“বেলুন অত ভার সইবে কেন?”
“আপনি বলেন কি! এত সোণা এখানে রয়েছে—আর আমরা কিছু সঙ্গে নিব না!—নিলে বড় মানুষ হ’য়ে যাব!”
জো উত্তেজিত হইয়া উঠিল।
“সাবধান, জো। স্বর্ণমোহ ক্রমেই তোমায় আছন্ন করে ফেলছে। মনুষ্য-জীবন যে অসার, তা’ কি পাদরীর সমাধি দেখে বুঝতে পারছ না?”
জো বিরক্ত হইয়া কহিল—
“ও সব কথা বক্তৃতায় ভাল শুনায়। এ ত আর শুধু কথা নয়—ভারি ভারি সোণার দলা! আসুন মিঃ কেনেডি, আমরা দু’জনে দু’চার কোটী টাকার সোণা তুলে নি।”
কেনেডি হাসিতে হাসিতে বলিলেন—
“ও দিয়ে আমরা কি করবো, জো! আমরা ত অর্থের কাঙ্গাল হ’য়ে এখানে আসি নাই। তোমার দুই পকেটে কত টাকারই সোণা ধরবে?”
“ভার ত আমাদের নিতেই হ’বে। বালির ভারের বদলে কিছু সোণাই নি না কেন?”
ফার্গুসন্ কহিলেন—
“হাঁ, তা’ নিতে পার। আগেই কিন্তু বলে রাখি, যখনই দরকার হবে, তখনই বিনা ওজরে ভার ফেলতে হ’বে।”
“এ সবই কি সোণা?”
“সবই সোণা। প্রকৃতিরাণী আফ্রিকার এই অতিনিভৃত অজ্ঞ।ত অনধিগম্য প্রদেশে তাঁর সঞ্চিত স্বর্ণরাশি লোকলোচনের অন্তরাল করে’ লুকিয়ে রেখেছেন। কালিডোনিয়া এবং অষ্ট্রেলিয়ার সমস্ত সুবর্ণখনি একত্র করলেও এর তুলনা হয়
“হায় এত সোণা বৃথা নষ্ট হ’বে! কেউ এর কণামাত্রও পাবে না?”
“ভগবানের রাজ্যে এমন কত আছে, জো। যা’ হোক্, তোমার তুষ্টির জন্য আমি—”
বাধা দিয়া জো উচ্চৈঃস্বরে কহিল—“আমার তুষ্টি! কিছুতেই তা’ হবে না—হায় হায় এত সোণা!”
“আগে শোনই। এ স্থানটার ঠিক পরিচয় আমি লিখে নিচ্ছি। ইংলণ্ডে ফিরে গিয়ে তুমি এই স্বর্ণ-খনির কথা প্রচার করো। দেশের লোক যদি আবশ্যক মনে করে, অবাধে নিয়ে যেতে পারবে।”
“ভারের বদলে তবে সোণা তুলে নি। যাত্রা-শেষে যা’ অবশিষ্ট থাকবে, তাই নিয়েই তুষ্ট হ’বো।”
জো বিশেষ আগ্রহের সহিত বেলুনে সোণার ভার তুলিতে লাগিল।
ফার্গুসন্ মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিলেন।
এক মণ, দুই মণ, তিন মণ! জো ক্রমেই ভার তুলিতে লাগিল এবং প্রায় দ্বাদশ মণ তুলিয়া ফেলিল। ফার্গুসন্ বাঙ্নিষ্পত্তি না করিয়া বেলুনে উঠিলেন। কেনেডি আপন স্থানে আসিয়া বসিলেন।
জো তখনো ভারই তুলিতেছিল!
ফার্গুসন্ গ্যাসে কিছুক্ষণ তাপ দিয়া জোকে ডাকিয়া কহিলেন—“বেলুন ত আর চলে না!”
জো উত্তর দিল না। তাহার দেহ মন সব এক হইয়া তখন স্বর্ণরাশিতে তন্ময় হইয়াছিল। ফার্গুসন্ আবার ডাকিলেন, “জো—”
একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও বেলুনে উঠিয়া জো কহিল, “আজ্ঞা করুন।”
“কিছু ভার ফেলে দাও।”
“আপনিই ত নিতে বল্লেন!”
“বলেছি বৈ কি! কিন্তু অত ভার নিলে কি বেলুন চলবে?”
“অত! অত কৈ?”
“তোমার কি ইচ্ছা যে, আমরা জীবনান্ত কাল পর্য্যন্ত আফ্রিকার এই পাষাণ-স্তূপের মধ্যে আবদ্ধ থাকি?”
জো কাতর দৃষ্টিতে কেনেডির দিকে চাহিল। সে দৃষ্টির অর্থ, উপস্থিত বিপদে সাহায্য-ভিক্ষা। কেনেডি নীরব রহিলেন।
ফার্গুসন্ আবার কহিলেন—
“জো, ক্রমেই দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমাদের জল ফুরিয়ে এসেছে। চারিদিকে প্রস্তর-প্রাচীর। কিছু তার ফেলে দাও—”
“হা—তা—দেখুন দেখি—বেলুনের কলটা খারাপ হয় নি ত?”
“কৈ না। দেখ না—কল ত চল্ছে—গ্যাসও উত্তপ্ত হয়েছে, বেলুন কত বড় হয়েছে!”
জো মাথা চুলকাইতে লাগিল এবং নিতান্ত অনিচ্ছা-সহকারে সর্ব্বাপেক্ষা ক্ষুদ্র এক খণ্ড স্বর্ণপ্রস্তর তুলিয়া লইয়া তাহার ওজন অনুমান করিল এবং বেলুন হইতে দূরে নিক্ষেপ করিল। বেলুন নড়িল না। জো কহিল—“নিশ্চয়ই কল খারাপ হয়েছে। এই ত ভার ফেলেছি। বেলুন নড়ে না কেন?”
“হয় নাই, জো—আরো ফেলে দাও।”
জো আরও পাঁচসের ফেলিয়া দিল। বেলুন তবুও নড়িল না! সাত সের—দশ সের—বিশ সের—! কি সর্ব্বনাশ! তবুও যে বেলুন নড়ে না!
ফার্গুসন্ বলিলেন—“আমরা তিন জনে প্রায় পাঁচ মণ। পাঁচ মণ ভার ত ফেল!”
“পাঁ-চ-ম-ণ!” জো বিবর্ণ হইয়া উঠিল।
নিরুপায় হইয়া আরও কিছু ভার ফেলিয়া কহিল —
“এই নিন, ঢের ফেলেছি। এই ত বেলুন উঠছে!”
“কৈ? যেমন ছিল তেমনি আছে।”
“এই ত নড়ছে—না? একটু নড়ছে বৈ কি!”
“ফেল—ফেল—আরও ভার ফেলে দাও।”
জো ফেলিতে লাগিল। সে যেন তাহার পঞ্জর চূর্ণ করিয়া নিক্ষেপ করিতেছিল। এতক্ষণে বেলুন নড়িয়া—প্রায় শত ফিট উপরেও উঠিল। ফার্গুসন্ কহিলেন—
“এখনো যে পরিমাণ ভার আছে জো, যদি আর ফেলতে না হয়—”
“সে কি! আরো ফেলবেন? তবে আমাকেই ফেলে দিন!”
ফার্গুসন্ ও কেনেডি জোর কথা শুনিয়া হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। জো আর কথা কহিল না। তাহার বুক ভাঙ্গিয়া যাইতেছিল। সে নির্ব্বাক্ হইয়া সেই ভারের উপর শুইয়া পড়িল!
বেলুন ধীরে ধীরে চলিতে লাগিল।
ষোড়শ পরিচ্ছেদ
মরুভূমে
পরদিন ফার্গুসন্ বলিলেন, “আমরা বড়ই ধীরে যাচ্ছি। দশ দিনে মাত্র অর্দ্ধেক পথ এসেছি। কিন্তু এখন যে ভাবে যাচ্ছি, বাকি পথটা যেতে যে কতদিন লাগবে তা’ কে জানে। জল যে ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে, সেইটাই বড় চিন্তার কথা।”
কেনেডি কহিলেন, “জলের ভাবনা কি। পথে যেতে এতদিন যেমন পেয়েছি, এখনো তেমনি পাব।”
কেনেডির আশ্বাস-বাণীতে ফার্গুসনের চিন্তা দূর হইল না। তিনি দূরবীক্ষণ লইয়া সম্মুখে বিস্তৃত সেই জলহীন প্রদেশের অবস্থা নিরীক্ষণ করিতেছিলেন। দেখিলেন, কোথাও নিম্ন ভূমির চিহ্ন পর্য্যন্ত নাই, বরং তাঁহার মনে হইতে লাগিল, দূরে মরুভূমি থাকিবারই কথা। নিকটে বা দূরে তিনি কোথাও গ্রামের চিহ্ন দেখিতে পাইলেন না। বোধ হইতে লাগিল, বৃক্ষ লতা প্রভৃতি ক্রমেই যেন বিরল হইতেছে। মধ্যে মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পর্ব্বত দৈত্যের ন্যায় দণ্ডায়মান রহিয়াছে। ক্বচিৎ দুই চারিটী বিশুষ্ক তরু বা কণ্টকময় গুল্ম মাত্র দেখা যাইতে লাগিল। ফার্গুসন্ ক্রমেই চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। দিন শেষে হিসাব করিয়া দেখিলেন, স্বর্ণক্ষেত্র হইতে মাত্র ৩০ মাইল পথ আসিয়াছেন, অথচ জল ফুরাইয়া ১৫ সেরে দাঁড়াইয়াছে। ফার্গুসন্ পাঁচ সের জল ভবিষ্যতের জন্য সাবধানে সরাইয়া রাখিলেন। কলের জন্য দশ সের থাকিল। দশ সের জলে ৪০০ ঘন ফুট গ্যাস হয়। প্রতি ঘণ্টায় ভিক্টোরিয়ার ৯ ঘন ফুট গ্যাসের প্রয়োজন। তিনি সঙ্গীদিগকে কহিলেন—
“আর আমরা ৪৪ ঘণ্টা মাত্র যেতে পারি। রাত্রে যাওয়া হ’বে না। কোথায় যে খাল বিল নদী বা ঝরণা আছে, রাত্রে গেলে কিছুই দেখা যাবে না। জল চাই-ই চাই। এখন খুব কম জল খেয়ে কাটাতে হবে।”
কেনেডি কহিলেন, “তার জন্য ভাবনা কি। খুব কমই খাওয়া যাবে। এখনো ত প্রায় তিন দিন যেতে পারবো। এর মধ্যে কি আর জলই মিলবে না।”
রাত্রি নির্বিঘ্নে কাটিল। উজ্জ্বল নক্ষত্রখচিত অতি সুন্দর রজনী। ফার্গুসন্ চাহিয়া চাহিয়া সেই নক্ষত্ররাশি দেখিলেন। আকাশের অবস্থা দেখিয়া বুঝিলেন, বাতাসের বেগ বর্দ্ধিত হইবে না। তিনি বিচলিত হইলেন।
প্রভাতে বেলুন ছাড়া হইল। ভিক্টোরিয়া অতি ধীরে অগ্রসর হইল। ক্রমেই সূর্য্যের উত্তাপ প্রখর হইতে প্রখরতর হইতে লাগিল। ফার্গুসন্ ইচ্ছা করিলে আরও উর্দ্ধে উঠিয়া শীতল স্থানে যাইতে পারিতেন, কিন্তু অনেকটা জল গ্যাস করিতে হইবে দেখিয়া সে সঙ্কল্প ত্যাগ করিলেন। দ্বিপ্রহরে দেখা গেল, ভিক্টোরিয়া মাত্র দ্বাদশ মাইল পথ আসিয়াছে। তিনি কহিলেন—
“আমরা আর এর চেয়ে বেগে যেতে পারছি না। আগে বেলুন আমাদের দাস ছিল, এখন আমরাই বেলুনের দাস হ’য়ে পড়েছি!”
কপালের ঘাম মুছিয়া জো কহিল, “উঃ কি গরম—”
“এখন যদি আমাদের জল থাকতো, তা’ হ’লে সূর্য্যের উত্তাপেই হাইড্রোজেন গ্যাস বিস্তার লাভ করতো—কলে তাপ দিতেই হ’তো না। সে দিন পাদরীকে বাঁচাতে এক মণ দশ সের জল ফেলে দিতে হয়েছে! থাকলে এখন কত উপকার হতো।”
“জলটা যে গেছে সে জন্য কি তোমার অনুতাপ হচ্ছে, ফার্গুসন্?”
“অনুতাপ! না ডিক্, তা’ নয়। জল ফেলে দিয়ে যে আমরা পাদরীকে নিষ্ঠুর রাক্ষসদের হাত থেকে বাঁচাতে পেরেছিলেম, সেই জন্যই আনন্দ হচ্ছে।”
ক্রমে ভূমি নিম্ন হইতে নিম্নতর বলিয়া প্রতীয়মান হইতে লাগিল। স্বর্ণপর্ব্বতরাশির পাদমূল ক্রমেই সরিয়া গেল এবং অপেক্ষাকৃত সমতল ক্ষেত্র দেখা দিল। কদাচিৎ দুই একটী অর্দ্ধশুষ্ক লতা বা রসহীন বৃক্ষ নয়নপথে পতিত হইতে লাগিল। ফার্গুসন্ বলিলেন—“আফ্রিকার নগ্ন মূর্ত্তি দেখ। আমি তোমাদের কাছে এই আফ্রিকার কথাই বলেছি।”
“এ আর বেশী কি! উত্তাপ আর বালু—এ ত হ’বেই! যেখানে যেমন, সেখানে তেমন। এতদিন বন-জঙ্গল মাঠ-ঘাট শস্যক্ষেত্র এই সব দেখে মনে হচ্ছিল বুঝি ইংলণ্ডেই আছি। এতক্ষণে মনে হচ্ছে যে, আমরা আফ্রিকায় এসেছি।”
সমস্ত দিবস অগ্নি বৃষ্টি করিয়া সূর্য অস্ত গেল। ফার্গুসন্ দেখিলেন তাঁহারা কুড়ি মাইলের অধিক আসিতে পারেন নাই।
পরদিন আবার তপন উদিত হইল, আবার পূর্ববৎ অনলবৃষ্টি হইতে লাগিল। বাতাস পূর্ববৎই মন্দ বহিল। ফার্গুসন্ দূরবীক্ষণ লইয়া দেখিলেন সম্মুখে অনন্ত বিস্তৃত মরুভূমি! তপন কিরণে সমুজ্জ্বল ধূ ধূ বালুকারাশি জ্বলিতেছিল।
তিনি একেবারে হতাশ হইলেন। ভাবিতে লাগিলেন, ‘কেনই বা কেনেডিকে আনিলাম, কেনই বা জোকে আসিতে দিলাম! আমিই এদের প্রাণনাশের কারণ হয়েছি!’ কখনো ভাবিলেন, ‘কেন এদেশে আসিলাম। যা’ কখনো সম্ভব নয়, কেনই বা তাই করতে প্রবৃত্ত হলেম! এখনো সময় আছে —ফিরে যাই। ফিরতে কি পারবো না? উপরে উঠলে বুঝি বেগশালী বায়ু-প্রবাহ পেতে পারি। কি করি? উপরে উঠবো জল যে ফুরিয়েছে——’ ফার্গুসনের চিত্ত এত অস্থির হইয়াছিল যে, তিনি মনের ভাব গোপন করিতে পারিলেন না। সঙ্গীদিগকে সকল অবস্থা জানাইলেন। জো কহিল, “ভৃত্য আমি। প্রভুর যা’ ইচ্ছা, আমারও তাই।”
“কেনেডি, তোমার মত কি?”
“ফার্গুসন্, তুমি ত জান হতাশ হ’বার লোক আমি নই। আমাদের যাত্রাপথ যে নিতান্ত বিপদসঙ্কুল তা’ আমি জানতেম। কিন্তু যখন দেখলেম যে, তুমি একা সেই বিপদের মধ্যে মাথা দিয়েছ, অমনি বিপদ্ তুচ্ছ জ্ঞান করে’ আমি তোমার সহযোগী হয়েছি। আমি ছায়ার মত তোমার সঙ্গে সঙ্গে থাকবো। ধৈর্য্য ধর। এখন ফিরে যেতে হ’লেও আবার হয় ত এই সব বিপদেই পড়বো। আমি বলি চালাও—যা’ থাকে কপালে—চালাও।”
“বন্ধুগণ, ধন্যবাদ! তোমরা যে আমাকে এত বিশ্বাস কর, তা’ আমি জানি।”
তিন জনে তখন করমর্দ্দন করিলেন। ফার্গুসন্ বলিলেন— “শোন বলি। গিনি উপসাগর থেকে আমরা বোধ হয় তিনশ’ মাইলের অধিক দূরে নাই। সুতরাং এই যে মরুভূমি, এটা খুব বড় নয়। উপসাগরের তীরে অনেক দূর পর্য্যন্ত মনুষ্যের বসতি আছে বলে’ জানা গেছে। যদি দরকার হয়, আমরা সেই দিকে যাব। সে দিকেও কি একটু জল মিলবে না! কিন্তু ভাই, এখন বাতাসও যে নাই! বাতাসের অভাবেই যে বেলুন চলছে না।”
“যদি না চলে, বাতাসের জন্য অপেক্ষা করাই মঙ্গল। যখন পাব তখন যাব।”
তাহাই হইল। নির্বিঘ্নে নিস্তব্ধ রজনী কাটিয়া গেল। প্রভাতে ফার্গুসন্ দেখিলেন, তিন সের মাত্র জল আছে। তখন নির্মেঘ আকাশে মরুসূর্য্য তক্ তক্ করিতেছিল। ভিক্টোরিয়া ৫০০ ফিট উঠিল। কিন্তু নীচেও যেমন উপরেও তেমন—বাতাস ছিল না। ফার্গুসন্ একটি দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করিয়া কহিলেন—
“আমরা এখন মরুভূমির ঠিক মধ্যে। দেখ, বালুকারাশির কি বিপুল বিস্তার! কি বিস্ময়কর দৃশ্য চোখের সামনে ভাসছে, দেখ। প্রকৃতির কি আশ্চর্য্য লীলা! কে এর রহস্য ভেদ করতে পারে! আফ্রিকার এক দিকে কত নিবিড় বন, সরস প্রান্তর, বিপুলা তরঙ্গিণী, বিশাল হ্রদ—আর এদিকে যোজনের পর যোজন বিস্তৃত উত্তপ্ত বালুকারাশি! বৃক্ষ নাই, লতা নাই, গুল্ম নাই—সামান্য আশ্রয় পর্যন্ত নাই! শীতল বারির পরিবর্ত্তে এখানে জ্বালাময় অগ্নি ছুটছে। কেন এমন হয়েছে বলতে পার, কেনেডি?”
“না ভাই, ও সব কেনর আমি ধার ধারি না। তবে অবস্থাটা যে, ওই রকমই’ তার জন্যই চিন্তা হয়েছে। দেখছ না, বেলুন ত দাঁড়িয়ে গেল!”
এমন সময় জো বলিয়া উঠিল—“আমার যেন বোধ হচ্ছে, পূর্বের দিকে একটু মেঘ দেখা দিয়েছে।” “হাঁ হাঁ ঠিক—জোর কথা ঠিক। ফার্গুসন্, দেখ—দেখ।”
“এতক্ষণে তবে মেঘ দেখা দিয়েছে। একটু বৃষ্টি আর বাতাস—ব্যস্।”
“দেখা যাক।”
“আজ বুঝি শুক্রবার?”
“কেন জো? তাতে কি?”
“আমি শুক্রবারকে বড় ভয় করি। ওটা বড় অলক্ষণে বার।”
“আজ তোমার সে ভুল ভাঙ্গবে, জো।”
“হোক হোক—তাই হোক। এ গরম আর সহ্য হয় না।”
ফার্গুসন্কে সম্বোধন করিয়া কেনেডি বলিলেন—
“এত গরমে বেলুনের ত কিছু খারাপ হ’বে না?”
“না, সে ভয় নাই। রেশমের উপর গাটাপার্চা দেওয়া আছে। খুব বেশী উত্তাপেও কিছু হবে না।”
জো আনন্দে করতালি দিয়। কহিল—“ওই যে মেঘ—ওই যে মেঘ—আর ভয় নাই।”
দুই বন্ধু চাহিয়া দেখিলেন, সত্যই বহুদূরে আকাশের প্রান্তদেশে একখণ্ড মেঘ দেখা যাইতেছে। উহা ধীরে ধীরে উপরে উঠিতেছিল। ফার্গুসন্ মেঘের দিকে চাহিয়া রহিলেন। বেলা ১১টার সময় উহা সূর্য্যকে ঢাকিয়া ফেলিল; কিন্তু পরক্ষণেই দেখা গেল, মেঘের প্রান্তভাগ দিগ্বলয় ছাড়াইয়া উঠিয়াছে। ফার্গুসন্ গম্ভীরভাবে বলিলেন—— “ও মেঘের উপর কোনো আস্থা স্থাপন করা যায় না। সকালেও যেমন ছিল, এখনো তেমনিই আছে।”
“তোমার কথাই ঠিক, ফার্গুসন্। আমাদের অদৃষ্টে বাতাসও নাই, বৃষ্টিও নাই।”
“আমারও ত তাই বোধ হচ্ছে। মেঘখানা যত উপরে উঠছে—”
বাধা দিয়া কেনেডি বলিলেন—
“আচ্ছা, মেঘ যদি কাছে না আসে, আমরা ত মেঘের কাছে যেতে পারি।”
“তা’তে বড় বেশী ফল হ’বে না। কেবল খানিকটা গ্যাস নষ্ট হ’বে। কিন্তু আমরা যেমন সঙ্কটে পড়েছি, তা’তে আর চুপ করে’ থাকা যায় না। চল উঠি।”
বেলুন উর্দ্ধে উঠিতে লাগিল। ভূমিতল হইতে ১৫০০ ফিট ঊর্দ্ধে উঠিয়া ভিক্টোরিয়া সেই মেঘের ভিতরে প্রবেশ করিল। সেখানেও বাতাস ছিল না। সে মেঘেও বারি ছিল না। ফার্গুসন্ চিন্তান্বিত হইলেন।
অকস্মাৎ জো চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল—
“দেখুন—দেখুন—আমরাই যে শুধু এ দেশে এসেছি তা’ নয়। ওই দেখুন, আর একটা বেলুনেও মানুষ আছে।”
কেনেডি বলিলেন—“জো পাগল হ’ল না কি?”
জো আকাশের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া কহিল—“ওই দেখুন—” কেনেডিও জোর ন্যায় বিস্মিত হইয়া কহিলেন——“ফার্গুসন্, সত্যই ত—দেখ দেখ—”
ফার্গুসন্ ধীরভাবে বলিলেন, “বুঝেছি। ওটা মায়া।”
“মায়া! বল কি! ওই দেখ না, বেলুনে কয়েকজন যাত্রীও আছে। আমরাও যে দিকে যাচ্ছি ও বেলুনটাও সেই দিকেই যাচ্ছে।”
ফার্গুসন্ বলিলেন—“ওদের নিশান দেখাও।”
কেনেডি যখন পতাকা হস্তে সঙ্কেত করিলেন, তখন সে বেলুনের যাত্রীরাও পতাকা নাড়িল।
ফার্গুসন্ বলিলেন, “কেমন ডিক্, এখন বিশ্বাস হয় যে ওটা মায়া। ও বেলুন তোমাদেরই ছায়া মাত্র।”
জো বলিল, “এ কথা বিশ্বাস হয় না। আকাশের গায়ে বেলুনের ছবি। আকাশ ত আর দর্পণ নয়।”
“আচ্ছা, তুমি হাত নেড়ে সঙ্কেত কর।”
জো তাহাই করিল।
“কি দেখলে?”
“ও বেলুন থেকেও ঠিক আমারই মত হাত নাড়ছে। ওটা মায়াই বটে।”
“তোমার চোখের ভুল মাত্র। মরুভূমিতে অমন হয়। বাতাস লঘু হ’লেই অমন দেখা যায়।”
মরুভূমির মায়া-ছবি মুহূর্ত্তে অন্তর্হিত হইল। মেঘখণ্ড দেখিতে দেখিতে আরো উপরে উঠিয়া গেল। যতটুকু বাতাস ছিল, সেই সঙ্গে তাহাও গেল। ফার্গুসন্ অনন্যোপায় হইয়া নিম্নে নামিলেন।
বেলুন অতি ধীরে অগ্রসর হইতেছিল। অপরাহ্ণে জো কহিল—“দূরে দু’টো তাল গাছ দেখা যাচ্ছে।”
“যদি সত্যই গাছ হয়, তা’ হ’লে ওখানে নিশ্চয়ই জল আছে।” ফার্গুসন্ দূরবীক্ষণ দ্বারা দেখিলেন যে, সত্যই তাল বৃক্ষ দেখা যাইতেছে। তিনি হৃষ্টচিত্তে বলিলেন—“পেয়েছি—জল পেয়েছি। আর ভাবনা নাই।”
জো তখন বলিল, “তবে একটু জল খেতে দিন। বড়ই গরম বোধ হচ্ছে। পিপাসায় কণ্ঠ শুকিয়েছে।”
নিকটেই জল পাওয়া যাইবে দেখিয়া, ফার্গুসন্ জোকে জল পান করিতে দিলেন।
ছয়টা বাজিল। ভিক্টোরিয়া তখন সেই পূর্বদৃষ্ট তাল বৃক্ষের সন্নিকটে আসিল। সে ত বৃক্ষ নয়—বৃক্ষের প্রেতছায়া! শুষ্ক শীর্ণ পত্র-বিরহিত! আসন্ন মৃত্যুর হস্ত হইতে যেন কোন প্রকারে আত্মরক্ষা করিতেছে। ফার্গুসন্ ভীত চিত্তে বৃক্ষের দিকে চাহিলেন। বৃক্ষনিম্নে একটা কূপের রৌদ্রদগ্ধ প্রস্তরখণ্ডগুলি পতিত ছিল। সেখানে জলের চিহ্নমাত্রও ছিল না। ফার্গুসন্ বন্ধুদিগকে সেই নিদারুণ সংবাদ শুনাইতে যাইতেছিলেন, কিন্তু তাঁহাদিগের চীৎকারে বিস্মিত হইয়া চাহিয়া দেখিলেন, যতদূর চক্ষু চলে মৃত মনুষ্যের কঙ্কাল সেই উত্তপ্ত অগ্নিতুল্য বালুরাশির উপর পতিত আছে। শুষ্ক কূপে চতুরদ্দিকে আরো কতকগুলি কঙ্কাল বিক্ষিপ্ত রহিয়াছে। কঙ্কালের সারি দেখিয়া ফার্গুসন্ মুহূর্ত্তে বুঝিলেন যে, পর্য্যটকগণ এই পথে আসিতে আসিতে দূরে কূপ দেখিয়া জলের আশায় শুষ্ক কণ্ঠে উহার দিকে ছুটিয়াছিল। যাহারা দুর্ব্বল তাহারা কূপ পর্য্যন্ত পৌঁছিতেও পারে নাই—পথিমধ্যেই পড়িয়া মরিয়াছে! সবল যাহারা তাহারা কূপের নিকট যাইয়াই মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে। তিন বন্ধু এই দৃশ্য দেখিয়া পরস্পর পরস্পরের মুখের দিকে চাহিলেন। কেনেডি বলিলেন—
“আর জলে কাজ নাই ফার্গুসন্, চল পালাই। এ দৃশ্য আর দেখা যায় না।”
“না ডিক্, পালালে হ’বে না। জল আছে কি না দেখতেই হ’বে। কূপের তল পর্য্যন্ত পরীক্ষা না করে’ যাওয়া হ’বে না।”
জো এবং কেনেডি বেলুন হইতে অবতরণ করিয়া এক দৌড়ে কূপের নিকটবর্ত্তী হইলেন। কূপের তলদেশেও বিন্দু মাত্র বারি ছিল না। তাঁহারা বালু সরাইতে লাগিলেন, কিন্তু জল মিলিল না। দারুণ শ্রমে ক্লান্ত হইয়াও তাঁহারা খনন করিতে বিরত হইলেন না। প্রবল বেগে স্বেদ ঝরিতে লাগিল—শরীর অবসন্ন হইয়া আসিল—চক্ষু অন্ধকার হইল—মস্তক ঘুরিতে লাগিল—জল মিলিল না।
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
জল—জল—একটু জল
পরদিন প্রভাতে ফার্গুসন্ যখন বেলুন ছাড়িলেন, তখন কহিলেন—“আর ছ’ঘণ্টা মাত্র যাওয়া যা’বে। যদি এর মধ্যে জল না পাই, তবে মৃত্যু নিশ্চিত।”
ফার্গুসন্কে একান্ত চিন্তাক্লিষ্ট দেখিয়া জো কহিল—
“যদিও এখন বাতাস তেমন নাই, কিন্তু হ’বে বলে’ বোধ হচ্ছে।”
বৃথা আশা। বাতাস উঠিল না। তাম্বুর অভ্যন্তরস্থ তাপমান-যন্ত্রে দেখা গেল, উত্তাপ ১০৯ ডিগ্রী। জো এবং কেনেডি শয্যা গ্রহণ করিলেন।
যতই বেলা বাড়িতে লাগিল, ততই তৃষ্ণা বৃদ্ধি হইতে আরম্ভ হইল। জলের পরিবর্ত্তে তাহারা ব্রাণ্ডি পান করিলেন। কিন্তু উহা অগ্নিতুল্য। তৃষ্ণা নিবারণ করিল না, বরং আরো বাড়াইয়া তুলিল। তখন এক সের মাত্র জল সম্বল ছিল। তাহাও অত্যন্ত উত্তপ্ত হইয়াছিল। প্রত্যেকেই সেই তপ্ত জলের দিকে সতৃষ্ণ নয়নে চাহিতে লাগিলেন, কিন্তু উহা স্পর্শ করিতে সাহসী হইলেন না। বিস্তৃত মরুভূমির মধ্যে মাত্র এক সের জল। কে সাহস করিয়া তাহা পান করিয়া সম্বলহীন হইতে পারে।
ফার্গুসন্ ভাবিতে লাগিলেন, বেলুনকে হাওয়ায় ভাসিয়ে রাখতে যেয়ে খানিকটা জল কেন নষ্ট করলেম। জলটা গ্যাস না করে’ খাবার জন্য রাখলেই কি ভাল হ’তো না। মোটেই ত সর্ব্বশুদ্ধ ৬০ মাইল পথ এসেছি। যদি না আসতেম, তা’ হ’লেই বা কি হ’তো। সেখানেও জল ছিল না—এস্থানেও নাই। যদি বাতাস আসে, সেখানেও যেমন বয়ে’ যাবে, এখানেও ঠিক তেমনি যাবে। তবে কেন এলেম, কেন জল নষ্ট করলেম। আর এক সের জল থাকলে অন্ততঃ ৮।৯ দিন মরতে হ’তো না। ন’ দিনে কত কি ঘটতে পারে। পৃথিবী ওলোট-পালট হয়ে যেতে পারে। বেলুন নিয়ে উপরে উঠতেও জল লেগেছে। তখন ভার ফেলে দিয়েও ত উঠতে পারতেম। হায়, কেনই বা তা’ করলেম না! না হয় বেলুনের গ্যাস ছেড়ে দিয়ে নীচে নামা যেত।
তা’ কি যেত? না—কখনো যেত না। গ্যাসই যে বেলুনের প্রাণ। সে প্রাণই যদি না থাকলো তবে আর বেলুন থেকে লাভ কি!
ফার্গুসন্ এইরূপে চিন্তা করিতে লাগিলেন। কোন্ দিক্ দিয়া যে সময় কাটিয়া গেল, তাহা বুঝিতেই পারিলেন না।
শেষে মনে মনে কহিলেন, ‘একবার শেষ চেষ্টা করে’ দেখতে হ’বে। আর একবার উপরে উঠে চেষ্টা করে’ দেখি, যদি বায়ুপ্রবাহ পাই। তার জন্য যথাসর্ব্বস্ব পণ করতে হ’বে!’
জো এবং কেনেডি তখন ঝিমাইতেছিলেন। ফার্গুসন্ তাঁহাদিগকে কিছু জিজ্ঞাসা করিলেন না। ডাকিলেনও না। কলে উত্তাপ দিতে লাগিলেন। বেলুন উপরে উঠিল— আরো উপরে—আরো উপরে। কোথাও বাতাস ছিল না। কোথাও বায়ুপ্রবাহ মিলিল না! ফার্গুসন্ ৫ মাইল পর্য্যন্ত উপরে উঠিয়াও বেগশালী বায়ুপ্রবাহের সন্ধান পাইলেন না।
জল ফুরাইল! মরুভূমে শেষ সম্বল এক সের জল— তাহাও ফুরাইল! গ্যাসের অভাবে কলের অগ্নি নির্বাপিত হইল। বৈদ্যুতিক যন্ত্র আর চলিল না। ভিক্টোরিয়া ধীরে ধীরে নামিয়া পড়িতে লাগিল। অবশেষে যে স্থান হইতে উঠিয়াছিল, ঠিক সেই স্থানেই আসিয়া বালুরাশি স্পর্শ করিল।
তখন মধ্যাহ্ন। ফার্গুসন্ হিসাব করিয়া দেখিলেন, চ্যাড-হ্রদ তথা হইতে ৫০০ মাইলের কম নহে। আফ্রিকার পশ্চিম তীরও তখন প্রায় ৪০০ মাইল ছিল। বেলুন ভূমি স্পর্শ করিবামাত্র জো এবং কেনেডির মোহ ভঙ্গ হইল। কেনেডি জিজ্ঞাসা করিলেন—“আমরা কি এখানেই থাকবো?”
“না থেকে আর উপায় কি। কলের সব জলটুকু শেষ হয়েছে”
তিন জনে বেলুন হইতে অবতরণ করিয়া আপন আপন ওজনের সমান বালুকা তুলিয়া বেলুন মধ্যে রাখিলেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাইতে লাগিল। কেহ কাহারও সহিত বাক্যালাপ করিলেন না। রাত্রে জো মাখন এবং বিস্কুট বাহির করিল। কেহ আহার করিলেন না। মাত্র এক গণ্ডুষ করিয়া উষ্ণ বারি পান করিয়া নৈশ ভোজন শেষ করিলেন!
সমস্ত রজনী কাহারো নিদ্রা হইল না। এতই গরম বোধ হইতেছিল যে, এক একবার নিশ্বাস রুদ্ধ হইয়া আসিতেছিল পরদিন প্রভাতে দেখা গেল পান করিবার জন্য আর অর্দ্ধ সের মাত্র জল আছে। ফার্গুসন্ উহা একপার্শ্বে সরাইয়া রাখিলেন তিন জনেই স্থির করিলেন যে, শেষ সময় ভিন্ন উহা পান করিবেন না।
অল্পক্ষণ পরেই জো কহিল, “বাপরে! ১২০ ডিগ্রী উত্তাপ! আমার দম বন্ধ হচ্ছে। গা জ্বলে’ যাচ্ছে।”
কেনেডি বলিলেন, “বালু এত তেতেছে, যেন আগুনে ভাজা! আকাশে বিন্দুমাত্রও মেঘ নাই। এমন অবস্থায় পড়লে মানুষ মূহূর্ত্তে পাগল হয়।”