বেলুনে পাঁচ সপ্তাহ

মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Rajendralal Acharya (†1961) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন

বেলুনে পাঁচ সপ্তাহ

প্রথম পরিচ্ছেদ

সূচনা

১৮৬২ সালের জানুয়ারি মাসে একদিন রয়াল ভৌগোলিক সমিতির গৃহে এক বিরাট সভা বসিল। সমুৎসুক শ্রোতৃবৃন্দ সভাপতির উদ্দীপনাপূর্ণ বক্তৃতা শ্রবণ করিতে করিতে উত্তেজিত হইয়া উঠিল। ঘন ঘন করতালি ও প্রশংসাবাক্যে সভাগৃহ মুখরিত হইল। আসন পরিগ্রহণ করিবার পূর্ব্বে সভাপতি বলিলেন:

“ভৌগোলিক তত্ত্বানুসন্ধানে ইংলণ্ডই পৃথিবীমধ্যে শীর্ষস্থান অধিকার করিয়াছে। ইংলণ্ডের সেই গৌরব ডাক্তার ফাগুর্সন্ কর্ত্তৃক অচিরে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইবে। যদি তাঁহার চেষ্টা ফলবতী হয়—(শ্রোতাদিগের মধ্যে একজন কহিল ‘অবশ্যই হ’বে’) তাহা হইলে আফ্রিকার অসম্পূর্ণ মানচিত্র সত্বরেই পূর্ণাঙ্গ হইয়া দেখা দিবে। আর যদি তাঁহার উদ্যম ব্যর্থ হয়, তাহা হইলেও তাঁহার পরাজয় ইহাই প্রমাণিত করিবে যে, মনুষ্য বুদ্ধিকৌশলে একান্ত দুঃসাহসিক কার্য্যেও হস্তক্ষেপ করিতে পরাঙ্মুখ নহে।”

বক্তৃতা শেষ হইতে না হইতেই ফার্গুসনের জয়নিনাদ ধ্বনিত হইতে লাগিল। তৎক্ষণাৎ চাঁদা সংগৃহীত হইতে আরম্ভ হইল। দেখিতে দেখিতে তাঁহার অভিযানের জন্য ৩৭৫০০ মুদ্রা সংগৃহীত হইয়া গেল। ভৌগোলিক সমিতির একজন সদস্য সভাপতিকে কহিলেন:

“ডাক্তার ফার্গুসন্ কি একবার আমাদের সামনে বাহির হ’বেন না?”

“কেন হবেন না? সকলের ইচ্ছা হ’লে তিনি এখনই এখানে আসতে পারেন।”

সভাগৃহের চতুর্দ্দিকে হইতে সকলেই বলিতে লাগিল “আমরা ফার্গুসন্কে চাই।” একজন কহিল, “ফার্গুসন্ নামে কোন লোকই নাই—ওসব বাজে কথা।” আর একজন বলিল “বুঝ্তে পারছ না, এ সবই ফাঁকি।”

তখন সভাপতি বলিলেন, “ডাক্তার ফার্গুসন্ আপনি অনুগ্রহ করে’ একবার বাহিরে আসুন।”

অবিলম্বে চল্লিশবর্ষবয়স্ক ধীর স্থির গম্ভীর একজন ভদ্রলোক গৃহমধ্যে প্রবেশ করিলেন। শ্রোতৃবৃন্দ আনন্দে করতালি দিতে লাগিল। ফার্গুসন্ বক্তার মঞ্চোপরি আসিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। সকলে দেখিল তাঁহার দেহ সুগঠিত, শরীর সুদৃঢ়, নাসিকা দীর্ঘ, নয়নদ্বয় কোমল ও তীক্ষ্ণবুদ্ধিব্যঞ্জক। তাঁহার বাহুযুগল দীর্ঘ, চরণদ্বয় দেখিলেই বুঝিতে পারা যায় যে, তিনি পদব্রজে অতি দীর্ঘ পথ পর্য্যটন করিতেও কাতর নহেন। ফার্গুসন্ বক্তার মঞ্চোপরি আরোহণ করিবামাত্রই আনন্দকোলাহল বাড়িয়া উঠিল। তিনি হস্তদ্বারা ইঙ্গিত করিয়া সকলকে শান্ত হইতে বলিলেন এবং পরক্ষণেই দক্ষিণ হস্তের তর্জ্জনি উর্দ্ধে উত্তোলন করিয়া কহিলেন—“ভগবানের ইচ্ছা পূর্ণ হোক।”

তাঁহার এই একটা কথায় শ্রোতৃমণ্ডলী যেরূপ উত্তেজিত হইয়া উঠিল, কব্ডেন বা ব্রাইটের শত বক্তৃতাতেও সেরূপ কখনো হয় নাই। যিনি এক মুহূর্ত্তে সহস্র লোকের হৃদয় অধিকার করিয়া ফেলিলেন, তিনি কে? ফার্গুসনের পিতা ইংরাজ-নৌসেনা-বিভাগের একজন সাহসী সেনাধ্যক্ষ ছিলেন। বালক পুত্রকে লইয়া তিনি সাগরে সাগরে পরিভ্রমণ করিতেন। তাহাকে লইয়াই জলযুদ্ধে গমন করিতেন—শত বিপদের মধ্যেও পুত্রকে সর্ব্বদা সঙ্গে রাখিতেন। পুত্র তখন হইতেই বিপদ্কে তুচ্ছ জ্ঞান করিতে শিখিয়াছিল। বালক ফার্গুসন্ বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়া দিবারাত্রি ভ্রমণকাহিনী পাঠ করিতেন। পর্যটকদিগের শত-সহস্র বিপদ্ মানস-নয়নে দর্শন করিয়া উৎকণ্ঠিত হইতেন, আবার তাঁহাদিগের অপূর্ব্ব উদ্ধার-কৌশল দেখিয়া পুলকিত হইতেন। ভাবিতেন তেমন অবস্থায় পতিত হইলে তিনিও নিশ্চয়ই আরো সহজ উপায়ে উদ্ধার লাভ করিতে পারিতেন। পুত্রের মনোগত ভাব বুঝিয়া পিতা তাহাকে বল-বিজ্ঞান, জলতত্ত্ব, পদার্থবিদ্যা, জ্যোতিষ, ভৈষজ্যতত্ত্ব প্রভৃতি শিক্ষা দিয়াছিলেন।

পিতার মৃত্যুর পর ফার্গুসন্ সৈনিকের ব্রত গ্রহণ করিয়া বাঙ্গালায় আসিলেন, কিন্তু উহা তাঁহার ভাল লাগিল না। তিনি অল্পকাল মধ্যেই তরবারি পরিত্যাগ করিয়া পর্য্যটক হইলেন এবং ভারতবর্ষ-ভ্রমণে বাহির হইলেন। তাঁহার পর্য্যটন-স্পৃহা এতই প্রবলা ছিল যে, একদিন প্রভাতে উঠিয়া কলিকাতা হইতে পদব্রজে সুরাট যাত্রা করিলেন এবং ক্রমে ক্রমে অষ্ট্রেলিয়া, রুষিয়া ও আমেরিকা পরিভ্রমণ করিয়া আসিলেন। কিছুতেই তাঁহার ক্লেশ হইত না। অল্পাহারে বা অনাহারে তিনি কষ্টানুভব করিতেন না। নিদ্রাদেবী তাঁহার দাসী হইয়াছিল। সময়ে হউক অসময়ে হউক, সুবিধায় হউক অসুবিধায় হউক—সঙ্কীর্ণ স্থানে হউক কিংবা প্রশস্ত স্থানে হউক, যখন যতটুকু আবশ্যক তিনি ততটুকু নিদ্রা যাইতে পারিতেন।

ফার্গুসন্ কোনো সমিতির সদস্য ছিলেন না বটে, কিন্তু “ডেইলি টেলিগ্রাফ” নামক সুবিখ্যাত সংবাদপত্রে সর্ব্বদাই তাঁহার কৌতূহলপূর্ণ ভ্রমণকাহিনী লিখিতেন বলিয়া সকলের নিকট সুপরিচিত ছিলেন। তিনি কোনো সভা-সমিতির সহিত যোগদান করিতেন না। ভাবিতেন যতক্ষণ সভায় বসিয়া বৃথা তর্ক বিতর্ক করিব, ততক্ষণ কোনো একটা তথ্য আবিষ্কারের চেষ্টা করিলে কাজ হইবে। পর্য্যটক ফার্গুসন্ যাহা দেখিতেন, তাহার অন্তস্তল পর্য্যন্ত না দেখিয়া ছাড়িতেন না। তিনি অদৃষ্টলিপির উপর আস্থাবান্ ছিলেন। এবং সর্ব্বদাই বলিতেন, ‘দেশভ্রমণ আমার কপালের লেখা—সে লেখা মুছিয়া দিবার সাধ্য কাহারো নাই।’

একদিন ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’ পত্র লিখিল:—

“নির্জ্জন আফ্রিকার নীরবতা এতদিনে ভঙ্গ হইবে। ছয় সহস্র বর্ষেও যে সন্ধান লাভ ঘটে নাই, এখন তাহা ঘটিবে। নীলনদীর জন্মস্থান আবিষ্কারের চেষ্টা এতদিন একান্ত অসম্ভব ও বাতুলের চেষ্টা বলিয়া পরিচিত ছিল। দীর্ঘ দিনের পরিশ্রমে অন্ধকার অরণ্যতুল্য আফ্রিকার তিনটিমাত্র প্রবেশ-পথ মুক্ত হইয়াছিল। ডেন্‌হাম্ ও ক্ল্যাপার্টনের আবিষ্কৃত পথে ডাক্তার বার্থ সুদানে গমন করিয়াছিলেন, ডাক্তার লিভিংস্টোন বহু আয়াসে উত্তমাশা অন্তরীপ হইতে জেম্বেজী পর্য্যন্ত গিয়াছিলেন এবং কাপ্তান গ্রাণ্ট ও কাপ্তান স্পিক্ একটি ভিন্ন পথ অবলম্বন করিয়া আফ্রিকার কয়েকটি হ্রদ আবিষ্কার করিয়াছিলেন। এই তিনটি পথ যে স্থানে মিলিত হইয়াছে, তাহাই আফ্রিকার কেন্দ্রস্থল। ফার্গুসন্ সত্বরই আফ্রিকার এই ত্রিবেণী-সঙ্গমে যাত্রা করিবেন। তিনি স্থির করিয়াছেন যে, ব্যোমযানে আরোহণ করিয়া আফ্রিকার পূর্ব্ব প্রান্ত হইতে পশ্চিম প্রান্ত পর্য্যন্ত গমন করিবেন। আমাদের সংবাদ সত্য হইলে, তিনি জান্‌জিবার দ্বীপে বেলুনে উঠিয়া বরাবর পশ্চিম মুখে গমন করিতে মনস্থ করিয়াছেন। এই যাত্রা যে কোথায় এবং করূপে শেষ হইবে, একমাত্র ভগবান্‌ই তাহা বলিতে পারেন।”

‘ডেইলি টেলিগ্রাফে’র প্রবন্ধ প্রচারিত হইবামাত্র দেশমধ্যে একটা বিষম হৈ চৈ পড়িয়া গেল। অনেকেই বলিল “এ অসম্ভব কথা—এমন করে’ কি কখনো বেলুনে যাওয়া যায়! ফার্গুসন্ টার্গুসন্ কেহই নাই। ‘ডেইলি টেলিগ্রাফে’র সম্পাদক অমনি একটা হুজুগ তুলে’ একবার আমেরিকার মাথা খেয়েছিলেন, আবার দেখছি ইংলণ্ডেরও মাথা খেতে বসেছেন!” তখন অন্যান্য সংবাদপত্রে ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’কে বিদ্রূপ করিয়া নানাবিধ প্রবন্ধ বাহির হইতে লাগিল। ফার্গুসন্ নীরব রহিলেন।

কিছুকাল পর যখন সকলে শুনিল যে, সত্য সত্যই লায়ন্‌ কোম্পানী ফার্গুসনের বেলুন-প্রস্তুতের ভার লইয়াছেন এবং ইংরাজ-গবর্ণমেণ্ট ‘রেজলিউট’ নামক অর্ণবপোতখানি ফার্গুসনের ব্যবহারের জন্য নিযুক্ত করিয়াছেন, তখনই সকল সন্দেহ দূর হইয়া গেল। চতুর্দ্দিকে ধন্য ধন্য রব উঠিল।

ইংলণ্ডের নানাস্থানে তখন বাজী ধরা আরম্ভ হইয়া গেল। সত্য সত্যই ফাুর্গুসন্ নামে কেহ আছেন কি না, সে জন্য বাজী ধরা হইল; এমন একটা অসম্ভব ও দুঃসাহসিক পর্য্যটন ব্যাপারে সত্যই কেহ প্রবৃত্ত হইবে কি না, তাহার উপর বাজী চলিল; পর্য্যটন সফল হইবে কি না, ফার্গুসন্ আর ইংলণ্ডে ফিরিতে পারিবেন কি না, তাহার জন্যও বাজী ধরা হইতে লাগিল।

প্রতিদিন দলে দলে লোক আসিয়া ফার্গুসন্কে নানাবিধ প্রশ্ন করিতে লাগিল, কেহ কেহ বা তাঁহার সহযাত্রী হইবার জন্যও ইচ্ছা প্রকাশ করিল। তিনি প্রত্যেক প্রশ্নের সদুত্তর দিয়া সকলকে ফিরাইয়া দিলেন। কাহাকেও সঙ্গে লইতে সম্মত হইলেন না।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

দুই বন্ধু

ডাক্তার ফার্গুসনের একজন বন্ধু ছিল—নাম ডিক্ কেনেডি। উভয়ের মতি-গতি ও স্বভাব যদিও এক ছিল না, কিন্তু সে জন্য বন্ধুতার কোনো অভাব ছিল না। ডিক্ কেনেডি দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ ও সরল ছিলেন। যাহা ধরিতেন তাহাই করিতেন। শিকার করিতে, মৎস্য ধরিতে এডিন্‌বরা-প্রদেশে তাঁহার সমকক্ষ আর কেহ ছিল না। তিনি লিথে বাস করিতেন। তাঁহার সন্ধান এমন অব্যর্থ ছিল যে, দূরে একখানি ছুরি রাখিয়া তিনি বন্দুকের এক গুলিতে উহাকে দুই সমান খণ্ডে ভাঙ্গিয়া দিতে পারিতেন। তাঁহার সবল দেহে সবল মাংসপেশী ছিল। তিনি দেখিতে যেমন সুপুরুষ ছিলেন, তাঁহার চলনভঙ্গীও তদ্রূপ সুন্দর ছিল। রৌদ্রদগ্ধ বদন, চঞ্চল কৃষ্ণতার নয়ন, অদম্য উৎসাহ, অসুরের ন্যায় শক্তি—এ সমস্তই কেনেডির ছিল।

তিব্বত-ভ্রমণের পর ফার্গুসন্ দুই বৎসর পর্য্যন্ত আর কোনো স্থানে যান নাই। ইহা দেখিয়া কেনেডি মনে করিয়া ছিলেন যে, বন্ধুর পর্য্যটন-স্পৃহা বোধ হয় শেষ হ‍ইয়াছে। তিনি মনে মনে তুণ্টই হইয়াছিলেন। সাক্ষাৎ ঘটিলেই কেনেডি তাঁহার বন্ধুকে বলিতেন “আর ছুটা-ছুটি করে কাজ নাই, বিজ্ঞানের জন্য অনেক করেছ—এখন দু’দিন ঘর-সংসারে মন দাও।” ফার্গুসন্‌ সর্ব্বদাই চিন্তাযুক্ত থাকিতেন, বন্ধুর কথায় কোনো উত্তর দিতেন না।

জানুয়ারি মাসে ফার্গুসনের সহিত সাক্ষাৎ হইবার পর কেনেডি বিশেষ ভাবে তাঁহার ভাবান্তর লক্ষ্য করিলেন এবং ফার্গুসন্কে‌ বিদায় দিয়া ভাবিতে লাগিলেন,ফার্গুসনের কি হয়েছে? তাকে অত চিন্তাযুক্ত দেখছি কেন? ব্যাপার কি? অকস্মাৎ এক দিন এক খণ্ড ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’ হস্তগত হওয়ায় কেনেডির আর কিছু বুঝিতে বাকী রহিল না। তিনি টেবিলে সজোরে করাঘাত করিয়া বলিয়া উঠিলেন—

“দেখেছ, কি পাগল! কি বোকা! বেলুনে চড়ে’ আফ্রিকা ভ্রমণ করতে চায়। দু’বচ্ছর ধরে’ ফার্গুসন বুঝি এই চিন্তাতেই নিযুক্ত আছে!” নিকটেই কেনেডির ভৃত্য ছিল। সে কহিল, “ও কিছু নয়—নিশ্চয়ই সব ফাঁকি!”

“তুমি বলছো ফাঁকি! কখনো ফাঁকি নয়। আমি কি আর তাঁকে চিনি না? এমন একটা অসম্ভব প্রস্তার ঠিক তাঁরই উপযুক্ত। দেখছ, আকাশে উড়ে’ বেড়াতে চায়! উঃ কি দুরাকাঙ্ক্ষা! কি দাম্ভিকতা! ঈগল পাখীকেও পরাস্ত, করতে চায়! যাতে তার না যাওয়া হয়, তাই করতে হবে। দেখ্ছি আমি যদি বাধা না দি, তা’ হ’লে ফার্গুসন্‌ কবে বা চন্দ্রলোকেই যাত্রা করবে!”

কেনেডি আর বিলম্ব করিলেন না। বন্ধুর জন্য একান্ত চিন্তিত হইয়া সেই রজনীতেই লণ্ডন যাত্রা করিলেন। প্রভাতে ফার্গুসন্‌ যখন নিজের কক্ষে চিন্তামগ্ন ছিলেন, কেনেডি তখন অতিমাত্র ব্যস্ত হইয়া দ্বারে ঘন ঘন করাঘাত করিতে লাগিলেন।

রুদ্ধ দ্বার মুক্ত করিয়া ফার্গুসন্‌ বিস্মিত হইয়া কহিলেন, “এ কি! ডিক্ যে?” ফার্গুসন্‌ বন্ধুকে ডিক্ বলিয়াই ডাকিতেন। মস্তকের টুপি খুলিয়া কেনেডি কহিলেন,

“হাঁ আমিই।”

“এখন ত শিকারের সময়। শিকার ছেড়ে লণ্ডনে যে?”

“কি করি! একজন পাগলকে ঠাণ্ডা করতে এসেছি।”

“পাগল? কে সে? ব্যাপার কি?”

এক খণ্ড ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’ পত্রিকা ফার্গুসনের সম্মুখে ধরিয়া কেনেডি কহিলেন:—

“এতে যা লেখা আছে তা’ কি সত্য?”

“ও তুমি ওই কথা বলছ? কাগজে রোজ রোজ কত আজগুবি খবরই বেরুচ্চে! তা দাঁড়িয়ে রইলে যে! অত ব্যস্ত কি—বসো না।”

“না আমি বোস্‌ব না। সত্যই কি তুমি বেলুনে যাবে?”

“নিশ্চয়ই যাব। যাত্রার সব বন্দোবস্তও বেশ ধীরে ধীরে হচ্ছে। আমি—” বাধা দিয়ে কেনেডি বলিলেন “তোমার বন্দোবস্ত চুলোয় যাক্‌।”

“আগে তোমাকে খবরটা দিই নাই বলে’ দেখছি তুমি রাগ করেছ। আমি বড় বাস্ত ছিলাম। কাজের অন্ত নাই, চিন্তার শেষ নাই। তাই বলে তোমাকে না জানিয়ে আমি কখনই যেতাম না।”

“না জানিয়ে যেতাম না! আমি যেন সে জন্য বড় বেশী ব্যস্ত হয়ে ব’সে আছি আর কি!”

“তা নয়—তোমাকেও যে আমি সঙ্গে নিতে চাই।”

কেনেডি বিস্ময়ে বিদ্যুৎপৃষ্টবৎ একটা লম্ফ প্রদান করিলেন। বলিলেন, “তোমার কি ইচ্ছা যে, আমরা দু’জনেই বেডলেমের পাগলা গারদে আটক থাকি।”

“ডিক্, তুমি যে যাবে তাতে আমার কোনো সন্দেহই নাই। আমি অনেক সঙ্গী পেয়েছিলেম, কিন্তু তোমার জন্যই তাদের নিতে স্বীকৃত হই নাই।”

কেনেডি একেবারে হতবুদ্ধি হইয়া গেলেন। ফার্গুসন্ বলিতে লাগিলেন, “তুমি যদি দশ মিনিট স্থির হ’য়ে আমার কথা শোন, তা’হলে নিশ্চয়ই আমাকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারবে না।”

“তুমি ঠাট্টা করছ না ত?”

“না—ঠাট্টা কেন।”

“আচ্ছা মনে কর, আমি যদি না যাই।”

“তুমি নিশ্চয়ই যাবে।”

“যদি না যাই—”

“তা’ হ’লে আমি একাই যাব।”

“কথাটা ক্রমেই গুরুতর হ’য়ে উঠছে দেখছি। এ যদি তোমার ঠাট্টা না হয়, তা’ হ’লে বিশেষ বিবেচনা করে’ দেখতে হচ্ছে।”

“বেশ ত—এস না প্রাতর্ভোজন করতে করতেই সব শুনবে।”

দুই বন্ধু তখন একখানি ক্ষুদ্র টেবিলের পার্শ্বে বসিয়া প্রাতর্ভোজন করিতে লাগিলেন। কতকগুলি স্যাণ্ডউইচ্ এবং বড় পাত্রে চা টেবিলের উপর সজ্জিত ছিল। আহার করিতে করিতে কেনেডি কহিলেন,— “ফার্গুসন্, তোমার প্রস্তাবটি পাগলেরই উপযুক্ত। এ ঘে কোন দিন সম্ভব হ’বে, তা’ত বোধ হয় না।”

“চেষ্টা করে’ না দেখলে কেমন করে বলা যাবে যে, সম্ভব হ’বে কি না।”

“আরে ভাই! সেই চেষ্টাই ত করা সম্ভব নয়!”

“কেন?”

‘এতে যে কত বিপদ্ আছে তা’ জান? তার উপর বাধাবিঘ্ন ত আছেই।”

“বাধা!” ফার্গুসন্ গম্ভীর হইয়া কহিলেন, “বাধা! সে ত মুহূর্ত্তে দূর হ’বে। বাধা কি চিরদিন থাকে। দূর হ’বার জন্যই তার জন্ম। আর বিপদের কথা বল্‌ছ? কোথায় বিপদ নাই ভায়া? এই খানার টেবিলে বসে থাকতে থাকতেই কত বিপদ্ ঘটতে পারে। ওই টুপিটা তুলে মাথায় দিতে দিতেই কত বিপদ্ আসতে পারে। ভাই, এটা জেনো যে, যা‍’ ঘটবার তা’ ঘটেই রয়েছে—কেউ তা’ বারণ কর্‌তে পার্‌বে না। ভবিষ্যৎটা এই বর্ত্তমানেরই ছায়া—ছায়াটা একটু দূরে আছে বৈ ত নয়?”

“ব্যস্, এই ত তোমার বক্তব্য? দেখছি তুমি এখনো বড় অদৃষ্টবাদীই আছ।”

“চিরদিনই ত তাই। অদৃষ্টবাদের যতটুকু ভাল, আমি সর্ব্বদা তার পক্ষপাতী। বিধাতা কপালে কি লিখে রেখেছেন, সে চিন্তায় আমাদের কাজ নাই। তবে লোকে কথায় বলে, ফাঁসীকাঠে যার মৃত্যু লেখা আছে, সে কখনও জলে ডুবে মরে না। এ কথাটা খুবই সত্য।”

এ কথার যদিও কোনো সদুত্তর ছিল না, কিন্তু কেনেডি নানাবিধ তর্ক করিতে লাগিলেন। প্রায় এক ঘণ্টা ধরিয়া তর্কবিতর্কের পর কহিলেন—“আচ্ছা যদি আফ্রিকা ভ্রমণ করাই তোমার উদ্দেশ্য হয়, তা’ হ’লে এ বিদ্‌ঘুটে উপায়টা ছেড়ে দিয়ে প্রচলিত পন্থা ধর না কেন?”

“কেন ধরি না জান? আজ পর্য্যন্ত যিনি সে পথে অগ্রসর হয়েছেন, তাঁর চেষ্টাই বিফল হয়েছে। মাঙ্গোপার্ক থেকে আরম্ভ করে’ ভোগেল্ পর্য্যন্ত কেউ সফলকাম হ’তে পারেন নাই। মাঙ্গোপার্কের দশা জান? নাইগারের তীরে তিনি নৃশংসভাবে নিহত হয়েছিলেন। আর ভোগেল্? তিনি ওয়াদেই-এর অতল সলিলে চিরদিনের মত অন্তর্হিত হয়েছেন। জান ত আউদ্নির মৃত্যু ঘটেছিল মুর্মুরে, ক্ল্যাপার্টনের সমাধি হয়েছিল সাকাটুতে! শোননি কি যে, ফরাসী-পর্য্যটক মৈজান্কে আফ্রিকার অসভ্য লোকেরা টুক্‌রা টুক্‌রা করে’ কেটে ফেলেছিল—মেজর ল্যাং, রোসার প্রভৃতির শোণিতে আফ্রিকার ভূমি সিক্ত হয়েছিল। তোমাকে অমন কত জনের নাম করবো—শত শত পর্য্যটক আফ্রিকায় জীবন দান করেছেন। দারুণ ক্ষুধা, নিদারুণ শীত, ভীষণ জ্বর, হিংস্র পশু, পশু অপেক্ষাও অধিক হিংস্র অসভ্য বর্ব্বর মনুষ্য—আফ্রিকায় এদের হাত থেকে কারো নিস্তার নাই! যে পথে অগ্রসর হ’য়ে সকলেরই এক দশা ঘটেছে, সেই পথ পরিহার করে’ নূতন পথে যাওয়াই কি সঙ্গত নয়? আমরা যখন আফ্রিকার ভিতর দিয়ে কিছুতেই যেতে পারব না—তখন তার উপর দিয়েই উড়ে’ যেতে হবে।”

কেনেডি কহিলেন “ভায়া শুনলেম ত সব—কিন্তু এ যে পাখীর মত উড়ে’ যাবার কথা—”

বাধা দিয়া ফার্গুসন্ কহিলেন,

“তাতে ভয় কি? বেলুনটা উড়তে উড়তে যাতে আকাশ থেকে না পড়ে’ যায় তার ব্যবস্থা করেছি। আর ধর নিতান্তই যদি পড়ে’ যায় তা’ হ’লে অন্যান্য পর্য্যটকদের মত আমাদেরও পদব্রজেই যেতে হ’বে। কিন্তু ঠিক জেনো যে, আমার বেলুন কখনো পড়বে না।”

“পড়তেও ত পারে।”

“কখনো না। আফ্রিকার পূর্ব্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্য্যন্ত না যেয়ে আর আমি বেলুনটাকে ছাড়ছি না। বেলুন থাকলে সবই সম্ভব হ’বে। আর না থাকলে, বুঝতেই পারছ—অন্যের দশাও যা’ হয়েছে আমাদেরও তাই হ’বে। বেলুনে গেলে সুবিধা কত। ঝড় বৃষ্টি পশু পক্ষী, এমন কি নরখাদক মানুষ— কিছুতেই ভয় নাই। এই ধর না—যখন খুব গরম বোধ হ’বে, বেলুন নিয়ে উপরে উঠে যাব। যদি উপরে বেশী শীত লাগে নেবে আসব। সম্মুখে যদি দুরারোহ গিরিশৃঙ্গ বাধে অনায়াসে তার চূড়ার উপর দিয়ে উড়ে চলে’ যাব। দুরতিক্রম্য নদনদীই বল, আর দারুণ ঝড়-তুফানই বল—কিছুতেই আমাদের গতি রোধ করতে পারবে না। কত সুবিধা দেখ দেখি। ভ্রমণে ক্লান্তি নাই, বিশ্রামের জন্যও চিন্তা নাই। আমরা কত কত নূতন জনপদের উপর দিয়ে অনায়াসে ভেসে চলে যাব—বেগশালী বায়ুপ্রবাহে গা ঢেলে দিয়ে নক্ষত্রবেগে অগ্রসর হ’ব। ভাবো দেখি একবার—কখনো মেঘের আড়ালে, কখনো বা ভূপৃষ্ঠ থেকে দু’চার হাত মাত্র উপর দিয়ে—যখন যেমন সুবিধা, তখন তেননি করে’ চলে’ যাব—আর অপরিজ্ঞাত আফ্রিকার নগ্ন দৃশ্যাবলী যেন সজীব হ’য়ে আমাদের চরণতলে নেচে বেড়াবে।

ফার্গুসনের উৎসাহ ও উদ্দীপনা ক্রমেই কেনেডির হৃদয় অধিকার করিতেছিল বটে, কিন্তু যখনই তিনি মানস-নয়নে নীল—আকাশ-গাত্রে মেঘমালার অন্তরালে উড্ডীয়মান বেলুন দর্শন করিতেছিলেন, তখনই তাঁহার মস্তক ঘুরিয়া উঠিতেছিল। তিনি যুগপৎ বিস্ময়-বিমিশ্রিত গৌরব ও ভীতির সহিত বন্ধুর দিকে চাহিতে লাগিলেন। তাঁহার যেন মনে হইতে লাগিল তিনি অনন্ত শূন্য বায়ুরাশির মধ্যে চলিতেছেন! কিছুক্ষণ পর কেনেডি কহিলেন—

“বেলুনকে চালিয়ে নিয়ে যাবার কোনো একটা উপায় তা’ হ’লে তুমি আবিষ্কার করেছ?”

“তা’ কি কখনো সম্ভব। সে একটা আকাশ-কুসুম মাত্র।”

“তা’ হ’লে তুমি—”

“ভগবান্ যেখানে নিয়ে যাবেন সেইখানেই যেতে হ’বে। তবে পূর্ব্ব থেকে পশ্চিমে যে যেতে পারে তা’তে আর সন্দেহ নাই।”

“কেমন করে?”

“বাণিজ্য-বায়ুর নাম শোননি কি? আফ্রিকার পূর্বাঞ্চলে পশ্চিমে সমান ভাবে বয়ে চলেছে—বিরাম নাই—বিচ্ছেদ নাই—মার্গচ্যুতিও নাই। সেই বাণিজ্য-বায়ুর আশ্রয় নিলেই হবে।”

“হাঁ হাঁ, ঠিক বলেছ। বাণিজ্য-বায়ুর স্রোতে বেলুনটাকে ছাড়তে পারলে পূর্বব থেকে পশ্চিমে যাওয়া যেতে পারে বটে।”

ইংরাজ গভর্ণমেণ্ট আমাদের জন্য একখানা জাহাজ ছেড়ে দিয়েছেন। যে সময় আমাদের আফ্রিকার পশ্চিম তীরে পৌঁছানোর কথা, সেই সময়ের তিন চার খানি জাহাজ আমাদের সন্ধানে পশ্চিম উপকূলে সমুদ্রের মধ্যে ঘুরে বেড়াবে। আমরা বোধ হয় তিন মাসের মধ্যেই জান্‌জিবারে যেতে পারব। সেখানেই বেলুনে গ্যাস পূর্ণ করে’ যাত্রা করা যাবে।”

কেনেডি চমকিত হইয়া কহিলেন, “আমরা! তুমি আর কে?”

“কেন, আমি আর তুমি। তোমার যেতে কিছু আপত্তি আছে না কি?”

“কিছু কেমন? আমার সহস্র আপত্তি আছে। তার একটা বলি শোন। যদি দেশটা দেখতে চাও, তা’ হ’লে ত তোমাকে অনেকবার উঠা-নামা করতে হ’বে। গ্যাস ছেড়ে না দিলে ত আর নাম্তে পারবে না। উঠা-নামা করতেই ত বেলুনের সব গ্যাস ফুরিয়ে যাবে।”

“তোমার ভুল হয়েছে ডিক্—আমার এক বিন্দু গ্যাসও নষ্ট হবে না!”

“গ্যাস না ছেড়ে তুমি নামতে পারবে? পারলে আর কি?”

“পারবো বৈ কি?”

“কেমন করে?”

“ওই খানেই ত আমার গুপ্ত কৌশল আছে। ভায়া, আমার উপর ভরসা রাখ, আমারই মত বল—“ভগবানের ইচ্ছা পূর্ণ হোক।” কেনেডি যন্ত্রচালিতবৎ বলিলেন,—“ভগবানের ইচ্ছা পূর্ণ হোক।”

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

পথ-নির্ব্বাচন

ডাক্তার ফাগুর্সন্ অনেক চিন্তা করিয়াই জান্‌জিবার হইতে যাত্রা করিতে মনস্থ করিয়াছিলেন। নীল নদীর উৎপত্তিস্থান আবিষ্কার করিবার জন্য শেষবার যে আয়োজন হইয়াছিল, তাহাও জান্‌জিবার হইতেই। ফার্গুসন্ স্থির করিয়াছিলেন যে, তাঁহার পূর্ব্ববর্ত্তী পর্য্যটক ডাক্তার বার্থ এবং বার্টন্ ও স্পিক্‌ যে পথ অবলম্বন করিয়াছিলেন তাহাই গ্রহণ করিতে হইবে।

বার্টন্ এবং স্পিক্ নানাবিধ কষ্ট সহিয়াও নাল নদীর জন্মক্ষেত্রে উপনীত হইতে পারিয়াছিলেন না। তাঁহাদের পরও বহু পর্য্যটক নানা ক্লেশ স্বীকার করিয়াও বাঞ্ছিত স্থানে যাইতে পারেন নাই। ফার্গুসন্ এই সকল পর্য্যটকদিগের ভ্রমণ-কাহিনী বিশেষ মনোযোগের সহিত পাঠ করিয়াই নিজের পথ নির্দিষ্ট করিয়াছিলেন। তিনি যাত্রার আয়োজন করিতে লাগিলেন এবং অল্পদিন মধ্যেই আরবী—ও মাণ্ডিন্গুইয়ান্ ভাষা শিক্ষা করিলেন।

ডিক্‌ কেনেডি তাঁহার সঙ্গ ছাড়িলেন না। তিনি দিনের পর দিন বন্ধুকে প্রতিনিবৃত্ত করিতে চেষ্টা করিলেন। যখন সকল যুক্তি, সকল তর্ক বৃথা হইল; তখন ডিক্ বন্ধুর দুইখানি হস্ত ধরিয়া কাকুতি মিনতি করিলেন। ফার্গুসনের সঙ্কল্প তাহাতেও টলিল না। ডিক্ ক্রমেই বন্ধুর জন্য চিন্তিত হইতে লাগিলেন। তিনি প্রতিদিন ঘুমঘোরে স্বপ্ন দেখিতে লাগিলেন যেন বেলুন বহু উচ্চে উঠিয়াছে, তিনি সেই মহাশূন্য হইতে ভূমিতলে পতিত হইতেছেন! এইরূপ স্বপ্ন দেখিতে দেখিতে সত্য সত্যই তিনি দুইবার শয্যা হইতে কক্ষতলে পতিত হইয়া কপালে আঘাত প্রাপ্ত হইলেন।

ফাগুসন্ বন্ধুর পতন-কাহিনী শুনিয়াও অবিচলিতই রহিলেন এবং গম্ভীরভাবে বলিলেন,

“তোমার ভয় নাই ডিক্, আমরা বেলুন থেকে কিছুতেই পড়বো না।”

“কিন্তু যদি পড়ি।”

“আমরা পড়বই না।”

কেনেডি নিরুত্তর হইলেন। ফার্গুসন যে তাঁহার কথা আদৌ গ্রাহ্য করিলেন না, সে জন্য দুঃখিত হইলেন। বেলুনযাত্রার কথা বলিতে হইলেই ফাগুসন্ সবর্বদা বলিতেন, “আমরা যাব”, “আমাদের বেলুন” “আমাদের আয়োজন” ইত্যাদি। তিনি কখনই একবচনান্ত “আমি” বা “আমার” পদ ব্যবহার করিতেন না। চিন্তাক্লিষ্ট কেনেডি সে জন্যও ক্রমেই ভীত হইয়া উঠিতে লাগিলেন। ভাবিলেন, বুঝি ফার্গুসনের সঙ্গে আমাকেও শেষে যাইতে হইবে। কিন্তু তাঁহার হৃদয় বলিল—'কিছুতেই না।’

একদিন তিনি কহিলেন, “নীল নদীর জন্মস্থান আবিষ্কার করে’ কি লাভ হ’বে ভাই? এতে কি মনুষ্য— সমাজের কোনো উপকার হ’বে? মনে কর, এমনি করে’ না হয় আফ্রিকার অসভ্য জাতিগুলিকে সুসভ্যই করে’ তোলা গেল, তাতেই বা লাভ কি? ইউরোপীয় সভ্যতাই যে আদর্শ সভ্যতা তা’ কে বলেছে? আফ্রিকার সভ্যতাই যে ভাল নয়, তারই বা প্রমাণ কি?

ফাগুসন্ কোনো উত্তর দিলেন না। ডিক্ বলিতে লাগিলেন, “এমন দিন নিশ্চয়ই আসবে, যে দিন অতি সহজে আফ্রিকার যেখানে সেখানে যাওয়া যাবে। ছ’ মাস হোক্, ন’ মাস হোক, একজন না এক জন আবিষ্কারক তোমাদের লক্ষ্য স্থলে যাবেই যাবে। অনেকেই ত নীল নদীর উৎপত্তি-স্থান দেখতে বেরিয়েছেন, তবে আর তোমার এত তাড়াতাড়ি কি?”

“আর একজন সেই আবিষ্কারের গৌরবটা গ্রহণ করবে, এটা কি ভাল ডিক্? ভীরুর মত নানা রকম আপত্তি তুলে’ তুমি কি আমাদের সেই গৌরবের জয়মাল্য থেকে বঞ্চিত করতে চাও?

“কিন্তু”

“তুমি কি বুঝতে পারছ না যে, যাঁরা এখন আফ্রিকা পর্য্যটন করে’ বেড়াচ্ছেন, যাঁরা ভবিষ্যতে সে দেশে যাবেন—আমাদের ভ্রমণ-কাহিনী তাঁদের কত উপকারে আসবে।

“কিন্তু—”

ফার্গুসন্ বাধা দিয়া বলিলেন, “আগে আমাকে বল্তেই দাও। আফ্রিকার এই মানচিত্রখানা দেখ দেখি।”

কেনেডি পুত্তলিকাবৎ অবস্থান করিতেছিলেন। মন্ত্রমুগ্ধবৎ সেই বিস্তৃত মানচিত্রের দিকে চাহিলেন। ফার্গুসন্ বলিতে লাগিলেন,—

“নীল নদী থেকে গণ্ডোরোকো নগর কতটা পথ দেখ।”

“দেখেছি।”

“এই কম্পাশটা নাও। কম্পাশের একটা কাঁটা গণ্ডরোকোর উপর বসাও। অতি বড় সাহসী পর্য্যটকও আজ পর্য্যন্ত গণ্ডরোকো নগরের ত্রিসীমানায় পৌঁছিতে পারেন নাই। গণ্ডরোকো থেকে জান্‌জিবার কত পথ দেখ। পেয়েছ?”

“হাঁ পেয়েছি।”

“আচ্ছা, এখন কাজে নগরটা খুঁজে দেখ।”

“এই যে, সেটাও পেয়েছি।”

“এখন ৩৩ ডিগ্রীর দ্রাঘিমা ধরে’ বরাবর উপরে ওঠো। উঠছ?”

“হাঁ।”

“বরাবর এগিয়ে এসে, আউকেরিউ হ্রদের কাছ পর্য্যন্ত যাও।”

“এই ত হ্রদটা পেয়েছি। আর একটু হ’লে আমি হ্রদের মধ্যে পড়ে’ যেতাম আর কি! তার পর?”

“ওই হ্রদের তীরে যারা বাস করে, তাদের কথা থেকে কি বুঝা যায় জান?”

“না—ওসব খোজ-খবর রাখি না।”

“এই হ্রদের উত্তর মাথা থেকে একটা জলধারা বেরিয়ে নীল নদীতে এসে পড়েছে। সেইটাই নিশ্চয় নীল নদী।”

“সে ত বড় আশ্চর্য্য কথা!”

“তোমার কম্পাশের আর একটা কাঁটা আউকেরিউ হ্রদের উত্তর মাথায় লাগাও। এখন দেখ দেখি কম্পাশের দুই কাঁটার মধ্যে কত ডিগ্রী আছে।”

“প্রায় দুই ডিগ্রী হ’বে।”

“দুই ডিগ্রীতে কত মাইল পথ জান?”

“না ভায়া, তার ধার ধারি না।”

“এই ধর না প্রায় ১২০ মাইল হ’বে। ১২০ মাইল আর কতটুকু পথ। আর কিছু খবর জান কি?”

“কি?”

“ভৌগোলিক সমিতি মনে করেন এই হ্রদটা আবিষ্কৃত ও পরীক্ষিত হওয়া বিশেষ আবশ্যক। কাপ্তান স্পিক্ কাপ্তান গ্রাণ্টের সঙ্গে এই কার্য্যে নিযুক্ত হয়েছেন। একখানা ষ্টিমার খার্টুম্ থেকে তাঁদের গণ্ডরোকো পর্য্যন্ত নিয়ে গেছে। তাঁরা সেখানে অবতরণ করে’ হ্রদের সন্ধানে যাবেন। যতদিন ফিরে না আসেন, ষ্টিমারখানা থাকবেই।”

“এ ত বেশ বন্দোবস্ত।”

“তুমি বুঝতে পারছ না যে, এই আবিষ্কার-ব্যাপারে কিছুমাত্র সাহায্য করতে হ’লেও, আমাদের তাড়াতাড়ি যাত্রা করা প্রয়োজন।”

“অনেকেই যখন বেরিয়েছেন, তখন আমরা না হয় আর নাই গেলাম।”

ফার্গুসন্ এবারও কোনো উত্তর দিলেন না, কেবল গম্ভীর ভাবে একবার মস্তক নাড়িলেন! ডিক্ কেনেডির আকণ্ঠ শুষ্ক হইয়া উঠিল!

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

ভৃত্য জো

ফার্গুসনের একটী ভৃত্য ছিল, তাহার নাম জো। আহারে বিহারে শয়নে ভ্রমণে, জো ছায়ার ন্যায় প্রভুর অনুগমন করিত। বলিতে গেলে জো-ই ফার্গুসন্ গৃহের কর্ত্তা ছিল। জোর নিকট ফার্গুসনের কিছুই গোপনীয় ছিল না। ফার্গুসন্ যে দিন জোর নিকট বেলুনে আফ্রিকা-ভ্রমণের প্রস্তাব করিলেন, জো সে দিন ভাবিল প্রভু যখন বলিতেছেন, তখন ইহাতে আশঙ্কা বা বিঘ্নের কোনই কারণ নাই।

আফ্রিকা-ভ্রমণ লইয়া জোর সহিত কেনেডির অনেক আলোচনা হইত। একদিন জো কহিল—

“মিঃ কেনেডি, কাল কেমন অগ্রসর হচ্ছে দেখুন। এমন দিন নিশ্চয়ই আসবে যখন আমরা অনায়াসে চন্দ্রলোকে যেতে পারবো।”

“তুমি বুঝি আফ্রিকার সেই চন্দ্ররাজ্যের কথা বল্‌ছ? সে ত আর বেশী দূর নয়—কিন্তু চন্দ্রে যাবার মতই বিপজ্জনক বটে!”

“বলেন কি? বিপজ্জনক? ডাক্তার ফার্গুসন্ সঙ্গে থাকলে আবার বিপদ্?”

“তোমার অগাধ বিশ্বাস নিয়ে তুমি বেশ সুখে আছ। সে সুখ-স্বপ্ন আমি ভেঙ্গে দিতে চাই না। কিন্তু ঠিক জেনো, ফার্গুসন্ এবার যে কাজে হাত দিয়েছে, সেটা পাগলামি ভিন্ন আর কিছুই না। কখনো তার যাওয়া হ’বে না!”

“যাওয়া হ’বে না! হ’তেই পারে না। আপনি কি মিচেলের দোকানে তাঁর বেলুনটা দেখেন নি?”

“না দেখি নাই—দেখতে চাইও না।”

“যদি একবার না দেখেন, তা’ হ’লে জানবেন যে একটা খুব ভাল জিনিষ আপনার দেখা হলো না। বেলুনটা বড় সুন্দর হয়েছে। আকৃতিই কেমন সুন্দর।”

“তুমি তা’ হ’লে ফার্গুসন্ সঙ্গে নিশ্চয়ই যাচ্ছ?”

“নিশ্চয়ই। যেখানে প্রভু, ভৃত্যও সেইখানে। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে আমি সমস্ত পৃথিবীটা ঘুরে এসেছি, আজ কি তাঁকে একা যেতে দিতে পারি? ক্লান্ত হ’য়ে পড়লে কে তাঁকে দেখবে?

পাহাড়ের একটা উঁচু যায়গা থেকে নামতে হ’লে, কে তাঁকে সাহায্য করবে? যদি তাঁর অসুখই হয়, কে-ই বা তা’ হ’লে শুশ্রূষা করবে?”

“ধন্য তুমি—তোমার মত ভৃত্য বিরল।”

“আপনিও ত আমাদের সঙ্গেই আসছেন?”

“হা, আপাততঃ যাচ্ছি বৈ কি। অন্ততঃ শেষ মুহূর্ত্তেও যদি ফার্গুসন্কে ফিরিয়ে আনতে পারি, তার চেষ্টা করবো। আমি জান্‌জিবার পর্য্যন্ত যাব। দেখি, যদি সেখান থেকেও ফার্গুসন্কে দেশে ফিরিয়ে আনতে পারি।” জো দৃঢ়স্বরে কহিল, “কিছুতেই তা পারবেন না। কাজে প্রবৃত্ত হ’বার আগেই তিনি সকল দিক ভেবে নিয়েছেন। আগে না ভেবে-চিন্তে তিনি কখনো কোনো কাজে হাত দেন না। কিন্তু একবার হাত দিলে কেউ তাঁকে ফিরাতে পারে না!”

“আচ্ছা দেখা যাক।”

“সে আশা ছাড়ুন। আপনাকেই শেষে সঙ্গে যেতে হ’বে। আফ্রিকা ত আপনার মত বিখ্যাত শিকারীরই উপযুক্ত স্থান। আজ শুনেছি আমাদের সকলকে ওজন হ’তে হ’বে।”

“সে কি! আমরা বাজীর ঘোড়—সওয়ার না কি? ওজন হ’তে যাব কেন? আমি ওজন-টোজন হ’ব না।”

“তা’ না হ’লে ত চলবে না। শুনেছি বেলুনটার জন্যই ওজন আবশ্যক।”

“আমাদের ওজন না নিলেও বেলুন উড়বে।”

“তা’ হ’তেই পারে না। কতটা ভার বহন করতে হ’বে, তা’ ত জানা চাই। তা’ না হ’লে যে বেলুন চলবেই না।”

“আমিও ত তাই-ই চাই!”

“ওই দেখুন, প্রভু নিজেই এদিকে আসছেন।”

“আসতে দাও—আমি কিছুতেই যাব না!”

জোর সহিত যখন কেনেডির এইরূপ কথা-বার্ত্তা হইতেছিল, তখন ফাগুসন্ তথায় আসিয়া উপনীত হইলেন এবং স্থির দৃষ্টিতে একবার বন্ধুর দিকে চাহিলেন, কেনেডির নিকট সে দৃষ্টি ভাল বলিয়া বোধ হইল না। ফার্গুসন্ কহিলেন, “ডিক্, জোর সঙ্গে একবার এস। তোমাদের দু’জনের ওজনটা নিতে হ’বে।”

“কিন্তু —”

কেনেডির কথায় কর্ণপাত না করিয়া ফার্গুসন্ কহিলেন—“এই যে, তোমার টুপিটা এখানেই আছে—এস—দেরি হ’য়ে যাচ্ছে।” কেনেডি আর বাধা দিতে পারিলেন না, নীরবে বন্ধুর অনুগমন করিলেন। জো মনে মনে কহিল, আমি আগেই জানি, উনি কাছে এলে আর কোন আপত্তিই খাটবে না।

মিচেলের কর্ম্মশালায় যাইয়া ডাক্তার সকলের ওজন লইতে প্রবৃত্ত হইলেন। যখন কেনেডির পালা আসিল, তখন তিনি মনে মনে বলিলেন, আচ্ছা ওজন হই না কেন—ওজন হ’লেই ত আর আমার যেতে স্বীকার করা হ’লো না। কেনেডি তুলাদণ্ডের উপর উঠিলেন। ফার্গুসন্ বলিলেন—“এক মণ সাড়ে একত্রিশ সের।”

কেনেডি কহিলেন “আমি কি খুব ভার?”

জো কহিল, “না—আর ভার হ’লেই বা কি! আমি পাতলা আছি।” সে এক লম্ফে তুলাদণ্ডের উপর আরোহণ করিল।

ফার্গুসন্ কহিলেন, “এক মণ বিশ সের। এইবার আমার পালা।” তিনি ওজনে একমণ সাড়ে সাতাইশ সের হইলেন।

ওজন খাতায় লিখিয়া লইয়া ফার্গুসন্ কহিলেন, “আমরা মোটের উপর পাঁচ মণের বেশী নই।”

জো কহিল, “আবশ্যক হ’লে আমি আমার ওজন সের দশেক কমিয়ে ফেল্তে পারি। কয়েকদিন আহারটা কমালেই হবে!”

ফার্গুসন্ হাসিয়া কহিলেন, “তার দরকার নাই জো— তোমার যত ইচ্ছা খাও।” তিনি জোর হস্তে কয়েকটি রজতমুদ্রা প্রদান করিলেন এবং বন্ধুকে লইয়া গৃহে প্রত্যাগমন করিলেন।

যতই দিন যাইতে লাগিল, ডাক্তার ততই চিন্তাযুক্ত হইতে লাগিলেন। কিরূপে বেলুনটাকে যথোপযোগী করা যাইতে পারে সেই চিন্তাই তাঁহাকে বিশেষ ব্যস্ত করিয়া তুলিল। তিনি হিসাব করিয়া দেখিলেন, বেলুনকে সর্ববসমেত ৫০ মণ ভার লইয়া উড়িতে হইবে। অপেক্ষাকৃত লঘু বলিয়া, তিনি হাইড্রোজেন গ্যাসেই বেলুনটাকে পূর্ণ করিবার ব্যবস্থা করিলেন। বেলুনে ৩ মণ ৩৮ সের গ্যাসের স্থান করা হইল। তিনি জানিতেন যে, ৫০ মণ ভার লইয়া উড়িতে হইলে বেলুনকে ৪৪৮৪৭ ঘন ফিট বাতাস সরাইয়া দিয়া, বায়ুমণ্ডলে নিজের স্থান করিতে হইবে। নতুবা উহা উড়িবেই না। ফার্গুসন্ দেখিলেন বেলুনে ৩ মণ ৩৮ সের গ্যাস পূর্ণ করিলে উহা সম্পূর্ণরূপে ফুলিয়া উঠিবে, কিন্তু যতই ঊর্দ্ধে উঠিবে, উহার উপর বায়ুমণ্ডলের চাপও ততই হ্রাস প্রাপ্ত হইবে। গ্যাসের ধর্ম্ম, বিস্তার লাভ করা। সুতরাং বাহিরের চাপ কমিয়া গেলেই ভিতরের গ্যাস ক্রমেই বিস্তৃত হইবার চেষ্টা করিবে এবং শেষে বেলুনের আবরণটাকে ছিন্ন করিয়া অনন্ত আকাশে মিলাইয়া যাইবে। ডাক্তার তাই স্থির করিলেন বেলুনের অর্দ্ধাংশ গ্যাসে পূর্ণ করিবেন।

একটা অপেক্ষা একসঙ্গে দুইটী বেলুন ব্যবহার করিতে পারিলে যে ভাল হয়, ইহা বুঝিতে ডাক্তারের বিলম্ব হইল না। সেরূপ করিতে পারিলে, অকস্মাৎ একটীতে ছিদ্র হইলে আবশ্যক মত ভার নিক্ষেপ করিয়া অপরটীর সাহায্যেও যে উড়িতে পারা যাইবে তাহাতে সন্দেহ ছিল না। কিন্তু দুইটী বেলুনকে সমভাবে পরিচালিত করিবার কোনো কৌশল তিনি আবিষ্কার করিতে পারিলেন না। অনেক চিন্তার পর একটা বৃহৎ এবং আর একটী অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র বেলুন প্রস্তুত করিবার বন্দোবস্ত করিলেন। স্থির করিলেন, বড় বেলুনের গর্ভস্থ গ্যাসের মধ্যে ছোট বেলুন ভাসাইয়া রাখিবেন। উভয় বেলুনের মধ্যে সংযোগ—স্থাপনের জন্য একটা মুখ রাখিবার ব্যবস্থা হইল। উহা ইচ্ছামত খুলিবার ও বন্ধ করিবার বন্দোবস্ত করিয়া ডাক্তার মনে মনে বলিলেন—আরোহণ কি অবরোহণকালে আর গ্যাস নষ্ট হইবে না। ছোট বেলুনের গ্যাস বড় বেলুনের মধ্যে ছেড়ে দিতে পারবো।

আরোহীদিগের থাকিবার জন্য বেলুনের সঙ্গে একটী গোলাকার ‘দোলনা’ সংযুক্ত হইল। উহা যদিও বেত্র এবং নলদ্বারা নির্ম্মিত হইয়াছিল, কিন্তু চতুর্দ্দিকে লৌহনির্ম্মিত পাতলা পাত থাকায় বেশ সুদৃঢ় হইল। দোলনার তলদেশে ভাল স্প্রিং বসাইয়া আরোহীদিগের শয়ন বা উপবেশনের সুবিধা করিতে ডাক্তার ত্রুটি করিলেন না। তিনি লৌহপাতের ৪টা বাক্স প্রস্তুত করাইয়াছিলেন। বাক্সগুলি নলদ্বারা পরস্পর সংযুক্ত হইয়াছিল। প্রত্যেক নলের মুখ খুলিবার বা বন্ধ করিবার বন্দোবস্ত ছিল। দুই ইঞ্চি বেধের দুইটী দীর্ঘ নল বাক্সের সহিত লাগাইয়া, তিনি সকলগুলিকে দোলনার গাত্রে দৃঢ়রূপে আবদ্ধ করিলেন। একটা বাক্সে জল রাখিবার ব্যবস্থা হইল। তিনটী দৃঢ় নোঙ্গর, প্রায় ১৮ হস্ত দীর্ঘ রেশম রজ্জুর একগাছি মই, বায়ুমান-যন্ত্র, তাপমান-যন্ত্র, ক্রনোমিটর প্রভৃতি কয়েকটী অত্যাবশ্যক দ্রব্য, ভোজনের নিমিত্ত চা, কফি, বিস্কুট, লোণা মাংস এবং অন্যান্য খাদ্য—সামগ্রী, কিছু ব্রাণ্ডি এবং পানীয় জল রাখিবার জন্য দুইটী পাত্র, বন্দুক, গুলি, বারুদ এসমস্তই বেলুনে চলিল। সঙ্গে সঙ্গে চলিল একটী ক্ষুদ্র পট্টাবাস এবং শয্যা রচনা করিবার জন্য কয়েকখানি কম্বল। যাহা কিছু আবশ্যক ফার্গুসন্ তাহার কিছুই ছাড়িলেন না। সকল জিনিষ একত্র করিয়া যখন ওজন করিলেন তখন দেখিলেন তাঁহার অভিনব বেলুনকে সর্ববসমেত ৫০ মণ ভারি বোঝা লইয়া আকাশ-পথে উড়িতে হইবে!

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

জাহাজে

১০ই ফেব্রুয়ারী যাত্রার আয়োজন শেষ হইয়া গেল। ১৬ই তারিখে ইংরাজ সরকারের ‘রেজলিউট’ জাহাজ যাত্রীদিগকে জান্‌জিবারে লইয়া যাইবার জন্য প্রস্তুত হইল। ডাক্তার অতি সাবধানে বেলুনটী জাহাজে তুলিলেন। হাইড্রোজেন গ্যাসে বেলুনের শূন্য গর্ভ পূর্ণ করিবার জন্য গ্যাস প্রস্তুত করিবার নিমিত্ত যথেষ্ট পরিমাণে পুরাতন লৌহখণ্ড এবং সাল্‌ফিউরিক য়্যাসিড জাহাজে উঠিল।

রয়াল ভৌগোলিক সমিতি ২০শে তারিখ সায়ংকালে বেলুনযাত্রীদিগের সংবর্দ্ধনার জন্য একটী নৈশ-ভোজের বন্দোবস্ত করিলেন। নৈশভোজ যখন মহাসমারোহের সহিত সুসম্পন্ন হইতেছিল, ভোজনগৃহ যখন ডাক্তার ফার্গুসন্‌ এবং তাঁহার বন্ধু কেনেডির প্রসংশাবাক্যে প্রতিধ্বনিত হইতেছিল, কেনেডি তখন একান্ত সঙ্কুচিত হইতে লাগিলেন। তিনি জানিতেন যে, রেজলিউট জাহাজে তাঁহার যাত্রার কারণ বেলুনে আফ্রিকা অতিক্রম করিবার জন্য নহে, বরং সম্ভব হইলে অন্ততঃ শেষ মুহূর্তেও ফার্গুসন্কে ফিরাইয়া আনিবার জন্য। কেনেডির বদনমণ্ডল রক্তাভ হইয়া উঠিল। আমন্ত্রিত ভদ্রমণ্ডলী মনে করিলেন উহা তাঁহার বিনয়ই সূচিত করিতেছে! তাঁহারা অধিকতর প্রীত হইয়া কেনেডির সৎসাহস ও অতিবিনয়ের প্রশংসা করিতে লাগিলেন। এমন সময় তারযোগে সংবাদ আসিল যে, স্বয়ং ইংলণ্ডেশ্বরী ভিক্টোরিয়া ফার্গুসন্ এবং কেনেডিকে অভিনন্দিত করিয়া জানাইয়াছেন যে, তাঁহাদের যাত্রার উদ্দেশ্য সফল হইবে। অমনি চতুর্দ্দিকে সম্রাজ্ঞীর জয় বিঘোষিত হইতে লাগিল। কেনেডি প্রমাদ গণিলেন।

রেজলিউট জাহাজ নোঙ্গর তুলিয়া জান্‌জিবার অভিমুখে যাত্রা করিল। সমুদ্রপথে উল্লেখযোগ্য বিশেষ কোনও ঘটনা ঘটিল না। ফার্গুসন্ অবসরমত নাবিকদিগের নিকট পূর্ব্ববর্ত্তী পর্য্যটক বার্থ, বার্টন, স্পিক্ প্রভৃতির আফ্রিকা-ভ্রমণের অদ্ভুত কাহিনী বর্ণনা করিয়া সকলের চিত্ত বিনোদন করিতে লাগিলেন। একদিন তিনি বলিলেন,—

“যদি আপনারা মনে করে’ থাকেন যে, আমাকে অনেকদিন ধরে’ আকাশে উড়ে বেড়াতে হ’বে, তা’ হ’লে আপনারা ভুল বুঝেছেন। জান্‌জিবার থেকে সেনেগাল নদী বড় বেশী হ’লেও ৪০০০ হাজার মাইল হ’বে। এ পথটুকু যেতে বেলুনের ৭ দিনের বেশী লাগবে না।”

“তা’ হ’তে পারে, কিন্তু অতদ্রুত গেলে দেশটার ত কিছু দেখা হ’বে না।”

“যদি বেলুন আমার আজ্ঞাকারী হয়। যদি আমি আপন ইচ্ছা মত আরোহণ অবরোহণ করতে পারি, তা’ হ’লে আর ভাবনা কি! যেখানে দরকার নামবো—যেখানে আবশ্যক, নীল আকাশ ভেদ করে’ উপরে উঠে পড়বো। উপরে যখন বড় বেশী জোরে বাতাস চল্‌বে তখন ত নেমে আসতেই হ’বে।”

জাহাজের অধ্যক্ষ কহিলেন, “উপরে উঠলে প্রায়ই প্রবল বায়ু-স্রোতই পাবেন। শুনেছি কখনো কখনো এত জোরে ঝড় বয় যে, ঘণ্টায় প্রায় ২৪০ মাইল চলে। কিন্তু বেলুন কি অত ঝড়ের মুখে টিকে থাক্‌তে পারে?”

“কেন পারবে না? খুব পারে। নেপোলিয়নের রাজ্যাভিষেকের সময়—সেই ১৮০৪ সালেই—এমন হয়েছিল। রাত্রি ১১টার সময় প্যারিসে বেলুন ছেড়ে পর্য্যটক ভার্গোরিন্ পরদিন প্রভাতেই ব্রাসিয়ানা হ্রদে পতিত হয়েছিলেন।”

কেনেডি কথা শুনিয়া ক্রমেই ভীত হইতেছিলেন। শুল্ক কণ্ঠে কহিলেন, “বেলুনের যেন ঢের সয়, তাই বলে’ কি আর বেলুন— যাত্রীরও ততটা সইবে! হাড়-গোড় ভেঙ্গে চূরমার হ’য়ে যাবে না?”

“ভয় নাই ভায়া—ভয় নাই। বেলুনটা ত আর বাস্তবিক বাতাসে নড়ে না—চারিদিকের বাতাসই বেগে অগ্রসর হয়, আর সেই সঙ্গে সঙ্গে স্রোতের মুখে কুটার মত বেলুনও ভেসে চলে। বেলুন যখন চলে, তখন বাতি জ্বাল্‌লেই দেখা যায় যে, দীপ-শিখা কাঁপে না। আমরা অবশ্য অত দ্রুত যাব না। আমাদের দু’মাসের খাবার সঙ্গে আছে। তা’ছাড়া যখনই দরকার হ’বে, তখনই বন্ধু কেনেডি কিছু শিকার ধরে’ আনবেনই।”

জাহাজের ছোট কর্ম্মচারী কহিলেন, “মিঃ কেনেডি, আপনার সৌভাগ্য দেখে হিংসা হচ্ছে। এ ভ্রমণে দেখছি গৌরব এবং শিকারের আনন্দ দুই-ই আপনার লাভ হ’বে।” বাধা দিয়া কেনেডি কহিলেন, “আপনাদের অভিনন্দনের জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমি তা’ গ্রহণ করতে পারি না।” নাবিকগণ সমস্বরে কহিল। “কেন? কেন? আপনি কি তবে যাচ্ছেন না?”

“না।”

“ডাক্তার ফার্গুসনের সঙ্গে যাবেন না?”

“আমি যে নিজে যাব না শুধু তাই নয়—যদি পারি তাঁকেও যেতে দিব না।”

সকলের বিস্ময়-বিস্ফারিত চক্ষু ডাক্তারের উপর নিপতিত হইল। তিনি কহিলেন, “ও’র কথা শুনবেন না। ভায়া মনে মনে বেশ জানেন যে, আমার সঙ্গে নিশ্চয়ই যাবেন।”

কেনেডি গম্ভীর স্বরে কহিলেন, “আমি শপথ করে বলতে পারি—”

বাধা দিয়া ফার্গুসন বলিলেন, “বন্ধু, শপথ করা ভাল নয়। তোমার নিজের ওজন নিয়েছি, বন্দুক-গুলি-বারুদ—তোমার সব ওজন করে’ নিয়েছি। বেলুনও সেই হিসাবে প্রস্তুত হয়েছে। এখন আর যাব না বললে চলবে না।”

কেনেডি কিং-কর্ত্তব্য-বিমূঢ় হইয়া নীরব রহিলেন।

* * *

জো ইতিমধ্যে জাহাজের নাবিকদিগের নিকট বেশ সুপরিচিত হইয়াছিল। সাধারণ নারিকগণ অতিমাত্র বিস্মিত হইয়া জোর বক্তৃতা শুনিত। একদিন সে কহিল “আজ এঁরা বেলুনে যেয়ে সুবিধা-অসুবিধাটা বুঝে নিচ্ছেন। কিন্তু একবার বেলুনে চড়লে হয়, তা’ হ’লে আর ছাড়তে ইচ্ছা হ’বে না। কিছুদিন পরই তোমরা শুনতে পাবে যে, আমরা বেলুন নিয়ে ঠিক সোজা উপরে উঠে চলে’ যাচ্ছি।”

“তা’ হ’লে যে আপনারা একেবারে চন্দ্রে যেয়ে পড়বেন।” জো কহিল, “চন্দ্র ত একটা ছোট কথা। যে কেউ সেখানে যেতে পারে। শুনেছি সেখানে বাতাসও নাই—জলও নাই। আমরা যখন যাব তখন বোতলে জল আর বাতাস বেশী করে’ না নিলে সেখানে চলবে না।”

জিন্-মদ্যের ভক্ত একজন নাবিক কহিল “জল নাই বা থাকলো—যতদিন জিন্ আছে ততদিন ভাবনা কি?”

“সেখানে যে জিন্ও নাই।”

“আমাদের কপালে তা’ হ’লে চন্দ্রলোক-দর্শন লেখা নাই। তা’ না-ই বা থাকলো—আমরা ঐ ঝক্‌ঝকে নক্ষত্রলোকে একবার বেড়াতে যাব।”

জো কহিল “নক্ষত্রলোকে? ও সব গ্রহ-নক্ষত্রের কথা আমি ঢের জানি। আমরা একবার স্যাটার্নটা দেখতে যাব ভাবচি।”

“স্যাটার্ণ কোনটা? ওই যার চারিদিকে একটা গোলাকার আংটী আছে!”

“ওকে আমরা কি বলি জান? বিয়ের আংটী, কিন্তু স্যাটার্ণের স্ত্রীর কখনো কোনো খোঁজ-খবর পাইনি।”

“আপনারা অত উঁচুতে যাবেন? আপনার মুনিব তা’ হ’লে দেখচি একজন দৈত্যবিশেষ।”

“বল কি? দৈত্য? তাঁর মত ভাল মানুষ কি আর আছে?”

“আচ্ছা স্যাটার্ণ থেকে আপনারা কোথায় যাবেন?”

“কেন তারপর জুপিটারে। সে দেশ বড় সুন্দর। সেখানকার দিনগুলো মোট ৯ ১ / ২ ঘণ্টা! অলস যারা তাদের বড় সুবিধা সেখানে—কেমন নয়? সেখানকার এক একটা বৎসর আমাদের ১২ বৎসরের সমান। এখানে মনে কর যারা আর ছ’ মাসের মধ্যেই মরবে, তারা যদি সেখানে যায়, তা’ হ’লে আরো কিছুদিন বেঁচে যেতে পারে।”

একটি বালক ভৃত্য অতি নিবিষ্ট চিত্তে নক্ষত্রলোকের কাহিনী শুনিতেছিল। সে আশ্চর্য্যান্বিত হইয়া কহিল।

“বার বছরে এক বছর!”

“কেন? তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না? আমাদের বার বছরে তাদের এক বছর। এখানে তুমি অত বড় দেখাচ্ছ, কিন্তু জুপিটারে গেলে এখনো তোমাকে অনেকদিন মা’র দুধ খেতে হ’বে। আর ওই যে তুমি ওকে দেখছো—এই পৃথিবীর পঞ্চাশ বছরের বুড়ো—সেখানে ওর বয়স কতই ধরবে? এই মনে কর না, সেখানে উনি ৩।৪ বছরের খোকা বৈত ন’ন।”

“আপনি আমাদের বোকা বোঝাচ্ছেন না ত?”

“আরে তাও কি হয়। শুধু এই ছোট-খাটো পৃথিবীটার খবর রাখলে অমনি ঠেকে বটে। একবার জুপিটারে চল না, তা’ হ’লেই দেখতে পাবে। কিন্তু সেখানে যেতে হ’লে বেশভূষা ভাল চাই। জুপিটারের লোকদের কিন্তু সে দিকে বড় তীব্র দৃষ্টি।”

নাবিকগণ হাস্য করিতে লাগিল দেখিয়া জো আরো গম্ভীর ভাবে বলিতে আরম্ভ করিল—

“তোমরা বুঝি নেপচুনের খবর রাখ না? উঃ সেখানে নাবিকদের কত আদর। আহা নৌবিদ্যার মর্ম্ম নেপচুনের লোকেই জানে। এই দেখ না, মার্সে কেবল সৈনিকদিগেরই সম্মান। সে সম্মান এতই বেশী যে, অন্যের পক্ষে অসহ্য হ’য়ে উঠে। মার্কারিতে ত জানি চোর-ডাকাতের উপদ্রব বড় বেশী। সেখানে বণিকের অভাব নাই—লোকেরও অভাব নাই। চোরে আর বণিকে সে দেশে বড় তফাৎ দেখা যায় না।”

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

ডাক্তারের কৌশল

জো যখন এইরূপে সরলচিত্ত নাবিকদিগের সহিত নানারূপ কাল্পনিক বিষয়ের আলোচনা করিতেছিল, ডাক্তার ফার্গুসন্ তখন জাহাজের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদিগের নিকট নিজ বেলুনের কল-কৌশল বর্ণনা করিতে করিতে কহিলেন—

“আপন ইচ্ছামত যে বেলুনকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে, তা’ আমি বিশ্বাস করি না।”

“বেলুন ত অনেকাংশে জাহাজেরই মত। জাহাজ ত যেদিকে সেদিকে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে— জলে তিল মাত্রও বাধা হয় না।”

“মাপ করবেন কাপ্তান—ওইটা ভুল। জল এক জিনিষ, বাতাস আর এক জিনিষ। এ দু’য়ের ধর্ম্ম কি এক? বাতাস জলের চেয়ে সহস্রগুণ লঘু। জলের মধ্যে জাহাজখানার খুব বেশী হলেও ধরুন অর্দ্ধেকটা ডুবে থাকে, কিন্তু সম্পূর্ণ বেলুনটাই বাতাসের সমুদ্রের মধ্যে ডুবে আছে। বেলুনের উপরে নিম্নে দক্ষিণে বামে চারিদিকেই বায়ুস্তর। বাতাস যেন দশ হাতে বেলুনকে আলিঙ্গন করে’ ধরে’ রেখেছে। বেলুন তাই এক হাতও নড়তে পারে না। জলের স্রোত একদিকে চলে—বাতাস চলে নানাদিকে। ভূপৃষ্ঠেই পর্ব্বত গহ্বর প্রান্তর কন্দর-নির্ম্মক্ত মরুভূমি বা নিবিড় বনশ্রেণীর অবস্থান। বাতাসের স্রোত তাই শত স্থানে শত বাধা পেয়ে নানাদিকে ফিরে ঘুরে নানা পথে চলে। অন্তরীক্ষে এ সব উৎপাত নাই। অনন্ত উদার নীলাকাশ বাধাবন্ধহীন। তাই যতই উপরে যাওয়া যায় বায়ুপ্রবাহেও ততই একটা সমতা লক্ষিত হয়। উপরের বায়ুস্রোত কদাচিৎ দিক পরিবর্ত্তন করে। আকাশপথে কোন্ স্থানে বাতাসের গতি কিরূপ সেটা ঠিক করতে পারলেই আর চিন্তা নাই—বায়ুমণ্ডলের যে স্তরে আবশ্যক সেই স্তরে বেলুনকে ছেড়ে দিলেই হ’লো।”

জাহাজের অধ্যক্ষ কহিলেন, “বাতাসের কোন্ বিশেষ স্তরটী আপনার চাই, সেটা খুঁজতে হ’লে আপনাকে ত অনেকবার উঠা-নামা করতে হ’বে। আর যতবার নামবেন ততবারই খানিকটা করে’ গ্যাস ছেড়ে দিতে হ’বে। আবার উপরে উঠতে হ’লে ভার ফেলে দিয়ে বেলুনকে হালকা করে’ নিতে হ’বে!”

“এইবার আপনি আসল কথাটা ধরেছেন। বেলুনকে চালানো শক্ত নয়—কিন্তু গ্যাস রক্ষা করাই শক্ত।”

“আজ পর্য্যন্তও এ সমস্যার মীমাংসা হয় নাই।”

“হয়েছে বৈ কি!”

“হয়েছে? কে করেছে?” “আমি করেছি।”

অধ্যক্ষ সবিস্ময়ে কহিলেন, “আপনি করেছেন?”

“যদি না করতে পারতেম, তা’ হ’লে বেলুনে চড়ে’ আফ্রিকা অতিক্রম করতে সাহসী হতেম না।”

“ইংলণ্ডে ত আপনি এ কথা প্রকাশ করেন নাই।”

“না, তা করি নাই বটে। দশ জনে এ কথাটা নিয়ে-প্রচণ্ড উত্তাপ সৃষ্টি করার সাধারণ কৌশল মাত্র।”

“এ পর্য্যন্ত বুঝলেম, তারপর?”

“বেলুনের নীচের মুখ এমন করে’ বন্ধ করে দিয়েছি যে, বেলুনের মধ্যে এক বিন্দুও বাতাস যেতে পারবে না। বেলুনের মধ্যে দু’টো নল বসানো আছে। একটা নলের মুখ বেলুন-গর্ভের হাইড্রোজেনের উপরাংশের মধ্যে থাকবে, আর একটা নলের নিম্নাংশে। বেলুন যতই কেন না নড়ুক, গাটাপার্চ্চা দিয়ে যোড়া থাক্‌বে বলে কিছুতেই নলে আঘাত লাগবে না। এই দু’টো নল বরাবর বেলুন থেকে নেমে এসে বাহিরে একটা গোলাকার বাক্সর উপরকার ঢাকনার সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। এটা হ’লো গ্যাসের উত্তাপ দিবার যন্ত্র। সেই গোল বাক্সটা বেশ শক্ত করে’ দোলনার সঙ্গে বাঁধা থাকবে।”

“ঠিক বুঝতে পারছি না—গ্যাসে তাপ দিতে হ’বে কেমন করে’?”

“বেলুনের উপরাংশ থেকে যে নল নেমে আসবে সেটা এই গোলাকার বাক্সের মধ্যে কুণ্ডলাকারে ঘুরতে ঘুরতে বাক্সের তলদেশে এসে উপস্থিত হ’বে। শেষে প্লাটিনাম ধাতুর আবরণের ভিতর দিয়া বাহিরে আসবে। এই নলের মধ্যে যে হাইড্রোজেন গ্যাস থাকবে, তা’তে উত্তাপ দিলেই, গ্যাস লঘু হয়ে’ উপরে উঠবে। গ্যাসের ধর্ম্ম এই যে, উত্তাপ দিলেই, গ্যাস লঘু হয় এবং বিস্তার লাভ করে। নলের মধ্যের গ্যাস লঘু হওয়া মাত্রই বেলুনের উপর দিকে উঠে যাবে, আর সঙ্গে সঙ্গে বেলুনের অপেক্ষাও শীতল, কাজেই ভারি, গ্যাস নিচে নেমে আসবে। মুখের কাছে এলেই তাপ লেগে উপরে উঠে যাবে। অমনি আবার শীতল গ্যাস নেমে আসবে।”

“তারপর—তারপর? এখন দেখছি এটা কত সহজ!”

“গ্যাসের ধর্ম্ম হচ্ছে এই যে, এক ডিগ্রী উত্তাপ পেলে ১ / ৪৮০ গুণ বিস্তার লাভ করে। যদি আমি ১৮ ডিগ্রী তাপ দি, তা’ হ’লে বেলুনের গ্যাস ১৮ / ৪৮০ গুণ বিস্তার লাভ করবে অর্থাৎ ১৬৭৪ ঘন ফিট বাড়বে। কাজেই বেলুনও ফুলে উঠে ততটা বাতাসের স্থান জুড়ে’ বসবে— সুতরাং উপরে উঠবে।”

“আপনাকে সহস্র ধন্যবাদ—আপনি বুদ্ধিবলে একটা আলোচনা করে—”

“সেটা আমার ইচ্ছা ছিল না। আমি অতি গোপনে এ সব পরীক্ষা করে’ দেখেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে যে, আমি কৃতকার্য্য হ’তে পারবো।”

শ্রোতৃমণ্ডলী বিশেষ উৎসুক হইয়া ডাক্তারের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। তিনি ধীরভাবে বলিতে লাগিলেন—

“অনেকদিন পর্য্যন্তই লোকে চেষ্টা করছে যে, কি করলে গ্যাস নষ্ট না করে’ ভার ফেলে না দিয়ে বেলুনকে ইচ্ছামত নামাতে কি তুলতে পারা যায়।”

“এর আগেও তবে এ চেষ্টা হয়েছে?”

“হাঁ হয়েছে বৈ কি! একজন ফরাসী এবং একজন বেলজিয়মবাসী চেষ্টা করে’ বিফল—মনোরথ হয়েছিলেন। আমি তাঁদের পথ ছেড়ে অন্য পথ ধরেছি। ভারের ব্যবহার আমি অনেকটা কমিয়ে দিয়েছি। সামান্য কিছু থাকবে বটে, কিন্তু বিশেষ আবশ্যক না হ’লে ফেলতে হবে না।”

“এ বড় বিস্ময়কর আবিষ্কার।”

“এতে কিছুমাত্র বিস্ময়ের কারণ নাই। বেলুনে যে গ্যাস থাকবে, যদি আমি ইচ্ছামত সেই গ্যাসকে সঙ্কুচিত কি বিস্তৃত করতে পারি তা’ হ’লেই হ’বে। গ্যাস যখন সঙ্কুচিত হ’বে, বেলুন তখন ভারি হয়ে উঠবে আর অমনি নামবে। আবার বিস্তৃত হ’লেই বেলুন উপরে উঠে যাবে।”

“তাই ত—এর মধ্যে কঠিন ত কিছু দেখছি না। আচ্ছা, কি করে’ করবেন?”

“আপনারা বোধ হয় দেখেছেন যে, আমার সঙ্গে পাঁচটা লোহার বাক্স আছে। তার একটাতে থাকবে জল। জলের মধ্যে বৈদ্যুতিক প্রবাহ চালিয়ে দিলেই হাইড্রোজেন আর তাক্সিজেন (অম্লজান ও যবক্ষারযান) গ্যাস প্রস্তুত হবে। যাতে সমানে সমানে গ্যাস হয় সে জন্য জলের সঙ্গে খানিকটা সল্‌ফিউরিক য়্যাসিড মিশিয়ে দিব।” “তার পর?”

“প্রথম বাক্সে গ্যাস প্রস্তুত হ’বে আর নল দিয়ে দু’টো স্বতন্ত্র বাক্সে জমা হ’বে। এই তিনটা বাক্সের উপর আর একটা বাক্স থাকবে, সেখানে গ্যাস দু’টো ভিন্ন ভিন্ন নলের মুখে ফেলিয়ে দিয়ে মিশিয়ে নেবো।”

“এটা আর কিছুই নয় অক্সিজেন আর হাইড্রোজেন মিশিয়ে একটা অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন।”

“এতে যোগ্যতার কিছুই নাই। শীতের দিনে ইংলণ্ডের কক্ষগুলি যে উপায়ে গরম করা হয়, আমি সেই উপায় অৱলম্বন করেছি মাত্র। মনে করুন আমি যদি বেলুনের গ্যাসে ১৮০ ডিগ্রী উত্তাপ দিতে পারি, তা’ হ’লে গ্যাসের বিস্তার হ’বে ১৮০ / ৪৮০ গুণ, সুতরাং সেই অতি বিস্তৃত গ্যাস বেলুনকে ফুলিয়ে তুলে’ ১৬৭৪০ ঘন ফুট বাতাসের স্থান অধিকার করবে। তার ফলে এই হ’বে যে, বেলুন থেকে ২০ মণ ভার ফেলে দিলে বেলুন যত দ্রুত উপরে উঠতো, তত দ্রুত উঠবে। আমার বেলুনে যে পরিমাণ গ্যাস ধরে, আমি তার অর্দ্ধেক সঙ্গে নিয়ে যাব। কাজেই বেলুন উপরে উঠতে পারবে না, শুধু বাতাসের মধ্যে ভেসে থাকবে। আমি যতই উত্তাপ দিব গ্যাসও ততই বিস্তৃত হ’বে, বেলুন ততই উপরে উঠবে। আবার যখনই নামতে ইচ্ছা হ’বে, তাপ কমিয়ে দিলেই গ্যাস শীতল হ’য়ে কুঞ্চিত হ’য়ে যাবে, বেলুনও নেমে পড়বে।”

যাত্রা

রেজলিউট জাহাজ জান্‌জিবারের বন্দরে আসিয়া নোঙ্গর করিল। হস্তিদন্ত, গোয়ানো, গাম্‌ প্রভৃতি দ্রব্যের বাণিজ্যের জন্য জান্‌জিবার প্রাচ্য ভূখণ্ডে পরিচিত। আফ্রিকার আন্তর্জ্জাতিক সমরে যে সকল লোক বন্দীকৃত হয়, তাহারা জান্‌জিবারের বিপণিতে কৃতদাসরূপে বিক্রীত হইয়া থাকে।

জান্‌জিবারের ইংরাজ কন্‌সাল সসম্ভ্রমে বেলুনযাত্রীদিগকে স্বগৃহে অতিথি হইবার নিমিত্ত নিমন্ত্রণ করিলেন। তাঁহাদিগের জিনিষপত্র ধীরে ধীরে নামানো হইতে লাগিল। এদিকে গৃহে গৃহে প্রচারিত হইযা গেল যে, একজন খ্রীষ্টান আসিয়া শূন্যে উড়িতে চাহিতেছে। শুনিবামাত্র দ্বীপবাসিগণ চঞ্চল হইয়া উঠিল। তাহারা মনে করিল এই নবাগত খ্রীষ্টান নিশ্চয়ই চন্দ্র এবং সূর্য্য দেবতার অকল্যাণ করিবার জন্যই আকাশ-ভ্রমণে যাইতেছে। তাহাদিগের অন্ধ ধর্ম্ম-বিশ্বাসে আঘাত লাগিল, কারণ সূর্য্য এবং চন্দ্রই তাহাদিগের উপাস্য দেবতা। কাফ্রিরা স্থির করিল যেরূপেই হউক বাধা দিবে এবং বলপ্রয়োগে এই অভিযান বন্ধ করিবে। ইংরাজ কন্‌সাল চিন্তিত হইলেন। জাহাজের অধ্যক্ষ কহিলেন “কিছুতেই আমরা স্থান ত্যাগ করবো না, কাফ্রির এতদূর ধৃষ্টতা! দেখা যা’ক: কি হয়। আবশ্যক হ’লে আমরা লড়াই করবো।”

ডাক্তার বলিলেন, “যুদ্ধ করলে যে আমাদেরই জয় হ’বে তা’তে আর সন্দেহ কি? কিন্তু হঠাৎ যদি বেলুনটা আক্রান্ত হয় তা’ হ’লেই ত সবর্বনাশ ঘটবে। এতদূর এসেও আফ্রিকা-দর্শন ঘটবে না!”

কিছুক্ষণ বাদানুবাদের পর স্থির হইল যে, পূরোবর্ত্তী দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে কোন একটাতে বেলুন নামাইয়া পাহারা দিতে হইবে। জাহাজের অধ্যক্ষ নোঙ্গর তুলিয়া যে দ্বীপাভিমুখে যাত্রা করিলেন তাহার নাম কুম্বেনী। ফার্গুসন্ অতি সতর্কতার সহিত বেলুনটি নামাইয়া উহাতে গ্যাস পূর্ণ করিবার ব্যবস্থা করিলেন।

কাফ্রিগণ দূর হইতে চীৎকার করিতে লাগিল, কেহ বা অঙ্গভঙ্গী করিতে লাগিল। কেহ কেহ মন্ত্র পাঠ করিয়া বজ্রকে আহ্বান করিল। কাফ্রি যাদুকরগণ কত রকম কলকৌশল যে অবলম্বন করিল, তাহার ইয়ত্তা নাই; কিন্তু তাহাতেও যখন বেলুনের কোনো অনিষ্ট ঘটিল না, বরং উহা গ্যাসে পূর্ণ হইয়া ধীরে ধীরে দুলিতে লাগিল, তখন তাহারা আরও উত্তেজিত হইয়া উঠিল।

বিদায়ের সময় ক্রমেই নিকট হইতেছিল। সকলেই হৃদয় মধ্যে বেদনা বোধ করিতে লাগিলেন। সকলেই ভাবিলেন অসভ্য বর্ব্বর জাতিতে পরিপূর্ণ অজ্ঞাত দেশে এই দুঃসাহসিক পর্য্যটকদিগের অদৃষ্টে না জানি কত বিপদ্ই লিখিত রহিয়াছে। যদি বেলুন না চলে, তাহাদের হস্তে নিপতিত হইলে না জানি কি দর্দশাই ঘটিবে। ডাক্তার ফার্গুসনের ললাটে চিন্তার রেখা পর্য্যন্ত ছিল না। তিনি নিশ্চিন্ত চিত্তে নানা বিস্ময়কর কাহিনী বর্ণনা করিয়া বন্ধুদিগকে প্রফুল্ল করিতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। সবই বৃথা হইল—সান্ধ্য বিদায়ভোজের আনন্দ কেহই অনুভব করিতে পারিলেন না।

পরদিন প্রভাতে যখন তাঁহারা জাহাজ হইতে কুম্বেনী দ্বীপে অবতরণ করিলেন, তখন মন্দপবনে দুলিয়া দুলিয়া বেলুন বায়ুমধ্যে ভাসিতেছিল। নাবিকগণ বেলুনের বন্ধন-রজ্জু ধরিয়া টানিয়া রাখিয়াছিল। যাত্রার কাল আগত হইল। কেনেডি তখন অগ্রসর হইয়া বন্ধু ফার্গুসনের করমর্দন পূর্বক কহিলেন—

“ভাই তবে তুমি নিশ্চয়ই যাবে।”

“এখনো কি সন্দেহ আছে ডিক্? আমি নিশ্চয়ই যাব।”

“তোমাকে প্রতিনিবৃত্ত করিতে আমার যতদূর সাধ্য তা’ করেছি।”

“করেছ বৈ কি।”

“তবে আর আমার দোষ নাই। হয়েছে। আমার মন এখন স্থির হয়েছে। চল আমিও তোমার সঙ্গেই যাব।”

ফার্গুসনে্র মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। তিনি হর্ষোৎফুল্ল হইয়া কহিলেন, “আমি আগেই জানতেম যে তুমি যাবে।” বিদায়ের শেষ মুহূর্ত্ত আসিয়া উপস্থিত হইল। জাহাজের অধ্যক্ষ এবং নাবিকগণ সস্নেহে কর মর্দ্দন করিয়া বিদায় লইলেন। যাত্রিগণ বেলুনে আরোহণ করিলেন। ফার্গুসন্ অবিলম্বে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিয়া গ্যাসে উত্তাপ দিতে লাগিলেন। বেলুন ক্রমেই ফুলিয়া উঠিতে লাগিল—ক্রমেই দুলিতে লাগিল—শেষে ধীরে ধীরে ঊর্দ্ধে উঠিতে লাগিল। ফার্গুসন্ তখন সহযাত্রীদিগের মধ্যস্থলে দণ্ডায়মান হইয়া টুপী খুলিয়া কহিলেন—

“বন্ধুগণ, আমাদের এই ব্যোমযানকে একটী মাঙ্গলিক আখ্যায় অভিহিত করা যাক। আসুন আমরা এর নামকরণ করি। আজ থেকে এই বেলুনের নাম ভিক্টোরিয়া।”

সমেবত জননণ্ডলী উল্লাসে জয়ধ্বনি করিয়া উঠিল। নাবিকগণ তখনো রজ্জু ধরিয়া বেলুনকে টানিয়া রাখিয়াছিল, কিন্তু আর পারিতেছিল না। ফার্গুসন্, কেনেডি এবং জো শূন্য হইতেই পুনরায় সকলের নিকট বিদায় লইলেন। গ্যাস ক্রমেই বেলুন মধ্যে বিস্তার করিতেছিল। ফার্গুসন চীৎকার করিয়া কহিলেন—

“ছাড়ুন—ছাড়ুন—দড়ি ছাড়ুন—হুসিয়ার।”

নাবিকগণ বন্ধনরজ্জু ছাড়িয়া দিল। মুহূর্ত্তমধ্যে ভিক্টোরিয়া শূন্যপথে যাত্রা করিল। রেজলিউট জাহাজ হইতে তৎক্ষণাৎ চারিবার কামান নিনাদিত হইয়া যাত্রীদিগকে শেষবার অভিনন্দিত করিল। বেলুন ক্রমেই উপরে উঠিতে লাগিল। উপরের বাতাস শীতল ও আকাশ পরিচ্ছন্ন ছিল। বেলুন ১৫০০ ফিট উর্দ্ধে উত্থিত হইয়া দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ধাবিত হইল। তখন পদনিম্নে জান্‌জিবার দ্বীপ একটী মসিবর্ণ বিপুল প্রান্তরের ন্যায় দেখা যাইতেছিল। কর্ষিত শস্যহীন ও কোন স্থানে শস্যসমাচ্ছন্ন বিস্তৃত ভূমি সেই মসিবর্ণ প্রান্তর মধ্যে বর্ণবৈচিত্র্য ঘটাইতেছিল। জান্‌জিবারের অধিবাসিগণ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পিপীলিকাবৎ দৃষ্ট হইতে লাগিল। নাবিকদিগের জয়োল্লাসধ্বনি ক্রমেই অনন্তশূন্যে মিলাইতে লাগিল। কেবল রেজলিউট জাহাজের কামান-গর্জ্জনের প্রতিধ্বনি তখনো অস্পষ্টভাবে কর্ণে আসিয়া পৌঁছিতেছিল। জো পুলকিত হইয়া কহিল—

“আহা, কি সুন্দর!”

ভিক্টোরিয়া ২৫০০ ফিট উর্দ্ধে উঠিল। রেজলিউট অর্ণবপোত তখন একখানি ক্ষুদ্র ধীবরতরণীর ন্যায় দৃষ্ট হইতে লাগিল। সাগরবিধৌত আফ্রিকার পশ্চিম তীর শুধু ফেনপুঞ্জ বলিয়া মনে হইতে লাগিল। ভিক্টোরিয়া তখন ঘণ্টায় ৮ মাইল বেগে সমুদ্র অতিক্রম করিতেছিল। উহা দুই ঘণ্টার মধ্যে আফ্রিকার নিকটবর্ত্তী হইল। ফার্গুসন্ গ্যাসের উত্তাপ হ্রাস করিলেন। দেখিতে দেখিতে ভিক্টোরিয়া অনেক নিম্নে নামিয়া পড়িল। অদূরে ঘনসন্নিবিষ্ট বনশ্রেণী তখন বেশ সুস্পষ্টরূপে নয়নগোচর হইতেছিল। তাঁহারা ফাগুলি গ্রামের উপর আসিলেন। গ্রামবাসীরা দেখিল কি যেন একটা অদ্ভুত পদার্থ রাক্ষসের মত আকাশপথে বিচরণ করিতেছে। তাহারা প্রথমে ভয়ে এবং শেষে ক্রোধে চীৎকার করিতে লাগিল। তাহাদিগের সুদৃঢ় কার্ম্মুক হইতে মুহুর্মুহুঃ বিষবাণ নিক্ষিপ্ত হইয়া আকাশ ছাইয়া ফেলিল। কিন্তু ভিক্টোরিয়া অনেক উপর দিয়া যাইতেছিল বলিয়া কাফ্রির শর বৃথা গেল। ডাক্তার ইহাদিগের জন্য তিলমাত্র চিন্তিত হইলেন না। পর্যটক বার্টন্ এবং স্পিকের যাত্রাপথ অনুসরণ করিয়া অগ্রসর হইতে পারিতেছেন বলিয়া তিনি প্রফুল্ল হইলেন।

কেনেডি পুলকিত হইয়া কহিলেন, “কি সুন্দর যান! এর কাছে ঘোড়ার গাড়ী!”

জো কহিল, “ঘোড়ার গাড়ী ত দূরের কথা— ষ্টীমারেও কি কখনো এত আনন্দ হয়?”

ডাক্তার বলিলেন, “আমি ত রেল অপেক্ষা বেলুনে যেতেই বেশী পছন্দ করি। রেল হু হু করে’ চলে’ যায়—যে দেশের ভিতর দিয়ে যায় তা’র কিছুই দেখা ঘটে না।”

জো অল্পকাল মধ্যেই কিছু আহার্য্য প্রস্তুত করিল। তিনজনে সেই মহাশূন্যে আনন্দে আহার করিতে করিতে অগ্রসর হইলেন। ক্রমেই তাঁহারা উর্বর ভূমির উপর দিয়া যাইতে লাগিলেন। দেখিলেন নিম্নে শীর্ণকায় দীর্ঘ পথ আঁকিয়া বাঁকিয়া বিস্তৃত রহিয়াছে। অদূরে তামাক, ভূট্টা, ছোলা প্রভৃতির ক্ষেত্র ফলে পত্রে সুশোভিত হইয়া রহিয়াছে। স্থানে স্থানে সুবিস্তৃত ধান্যক্ষেত্র নয়নের তৃপ্তি সাধন করিতেছে। ধান্যক্ষেত্র সমুদ্রের ন্যায় বিস্তৃত—পবন-স্পর্শে ধান্যশীর্ষ দুলিতেছে—ধান্যক্ষেত্র তরঙ্গায়িত হইতেছে। তাঁহারা যখনই কোন গ্রামের উপর দিয়া যাইতে লাগিলেন, তখনই গ্রামবাসীরা দৈত্য মনে করিয়া তাঁহাদিগকে আক্রমণ করিতে লাগিল। তাহাদিগের বিকট চীৎকারে অন্তরীক্ষ পর্য্যন্ত আলোড়িত হইতে লাগিল। ফার্গুসন্ বেলুনটীকে অপেক্ষাকৃত উচ্চে রক্ষা করিলেন। শত্রুর গুণমুক্ত তীর বেলুন স্পর্শ করিতে পারিল না।

বেলা দ্বিপ্রহর হইল। সূর্যকিরণ প্রখর বলিয়া অনুভূত হইতে লাগিল। নির্ম্মল আকাশতলে ভিক্টোরিয়া নির্বিঘ্নে ভাসিয়া যাইতে লাগিল। তাঁহারা আউজ্‌রামো প্রদেশ অতিক্রম করিলেন।

ডাক্তার কহিলেন, “দেখ দেশের মূর্ত্তি কেমন পরিবর্ত্তিত হ’য়ে যাচ্ছে। এখন আর অত ঘন ঘন গ্রাম দেখা যাচ্ছে না, আম্রবণও আর চোখে পড়ছে না। এই খানেই বোধ হয় আফ্রিকার অরণ্যের শেষ। ভূপৃষ্ঠ ক্রমেই কঙ্করময় প্রস্তরবহুল বলে’ বোধ হচ্ছে। বোধ হয় নিকটেই কোথাও শৈলমালা আছে।”

চারিদিক ভাল করিয়া দেখিয়া কেনেডি কহিলেন “আমার বোধ হচ্ছে পশ্চিম দিকের ওই মেঘমালা আর কিছুই নয়, উন্নত শৈলশ্রেণী।”

‘ফার্গুসন্ দূরবীক্ষণ লইয়া দেখিলেন। দেখিয়া কহিলেন, “তুমি ঠিক বলেছ ডিক। ওগুলি আউরিজারা শৈলমালা। সম্মুখে যে পর্ব্বত দেখছো ওর নাম ডুথুমি। আজ রাত্রে আমরা ডুথুমির পর পারে যেয়ে বিশ্রাম করবো। ৫০০।৬০০ ফিট উপরে না উঠিলে পর্ব্বত শিখর পার হওয়া যাবে না।”

বেলুন অগ্রসর হইতে লাগিল। জো চীৎকার করিয়া কহিল “ওই দেখুন একটা কি বিরাট বৃক্ষ। এমন বারটা গাছ এক যায়গায় থাকলেই মস্ত একটা বন হ’তে পারে।” ফার্গুসন্ বলিলেন, “ও গাছের নাম বাওবাব্—ওই দেখ, গাছের একটা কাণ্ড দেখ। কি বিশাল! প্রায় ১০০ ফিট ব্যাস হ’বে— কেমন না? কে বলতে পারে যে, এই বৃক্ষতলেই ফরাসী পর্য্যটক মেইজান ১৮৪৫ সালে মৃত্যুমুখে পতিত হননি। ওই যে দূরে একখানা গ্রাম দেখা যাচ্ছে ওর নাম জিলামোরা। মেইজান একাকী ওখানে যাবার চেষ্টা করেছিলেন। গ্রামের সর্দ্দার তাঁকে বন্দী করে’ একটা বাওবাব্ গাছের শিকড়ের সঙ্গে বেঁধে ধীরে ধীরে টুকরা টুকরা করে’ কেটেছিল! কণ্ঠার্দ্ধ কেটে স্কন্ধ থেকে মস্তক টেনে ছিঁড়ে ফেলেছিল। উঃ কি নৃশংস নরহত্যা! হতভাগ্য পর্য্যটক ২৬ বৎসর বয়সে এমনি নিষ্ঠুর ভাবে নিহত হয়েছিলেন।”

ফার্গুসন্ গ্যাসের উত্তাপ বৃদ্ধি করিলেন। বেলুন প্রায় ৮ সহস্র ফিট উপরে উঠিল। তাঁহারা অবলালাক্রমে ডুথুমি শৈল অতিক্রম করিয়া পর্ব্বতের অপর পারে নামিলেন। বেলুন হইতে একটা নোঙ্গর নিক্ষিপ্ত হইল। অল্পক্ষণ মধ্যেই উহা একটা বৃহদাকার বৃক্ষের শাখার সহিত আবদ্ধ হইয়া গেল।

জো রজ্জু-মই বাহিয়া বৃক্ষোপরি অবতরণ করিল এবং বৃক্ষশাখার সহিত নোঙ্গরটী দৃঢ়রূপে বাঁধিয়া দিল।

তখন সন্ধ্যা হইয়াছিল। রাত্রে নিয়মিতরূপে বেলুন পাহারা দিবার বন্দোবস্ত করিয়া তিন জনে আহারে বসিলেন।

অষ্টম পরিচ্ছেদ

কাফ্রির আক্রমণ

রজনী নির্ব্বিঘ্নে অতিবাহিত হইল। কিন্তু প্রভাতে কেনেডি অত্যন্ত অসুস্থ হইলেন। তাঁহার ভয়ানক জ্বর হইল। দেখিতে দেখিতে আকাশ নিবিড় মেঘে সমাচ্ছন্ন হইল। মনে হইতে লাগিল যেন প্রলয়ের বারি বর্ষিত হইবে। ভিক্টোরিয়া তখন জাঙ্গেমেরো জনপদের উপর উড়িতেছিল। জানুয়ারি মাসের এক পক্ষ ভিন্ন সে দেশে সর্ব্বদাই বৃষ্টি হইয়া থাকে। সকলেই গন্ধকের গ্যাসের ন্যায় এক প্রকার গ্যাসের গন্ধ পাইতে লাগিলেন। ফার্গুসন্ কহিলেন—

“বার্টন্ ঠিকই বলেছেন, এ প্রদেশে প্রত্যেক ঝোপের আড়ালেই যেন মানুষ মরে’ আছে বলে’ বোধ হয়। এখানকার বাতাস এমনি বিষাক্ত। তোমার ভয় নাই ডিক। আমি এখনই উপরে উঠে যাচ্ছি। বিষাক্ত হাওয়া থেকে উপরে গেলেই তোমার অসুখ সারবে।”

ভিক্টোরিয়া ক্রমেই উচ্চে উঠিতে লাগিল। ঊর্দ্ধে ঊর্দ্ধে আরও উর্দ্ধে উঠিয়া মেঘলোকের অন্তরালে লুক্কায়িত হইল। দূরে রুবেহো পর্ব্বতের সমুজ্জ্বল উচ্চ শিখরাবলী তখন তপনকিরণে ঝলসিতেছিল। এইরূপে তিন ঘণ্টা কাল গমন করিবার পর কেনেডি সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হইয়া উঠিলেন। কহিলেন, “ফার্গুসন্ তোমার এ ঔষধ দেখছি কুইনাইনের চেয়ে ঢের ভাল।”

বেলা দশটার সময় মেঘ অল্পে অল্পে কাটিতে লাগিল। একস্থান হইতে সম্পূর্ণই সরিয়া গেল। পর্য্যটকগণ দেখিলেন পৃথ্বিতল দেখা যাইতেছে। পদনিম্নে শত শত পর্ব্বতচূড়া রৌদ্রে জ্বলিতেছে। ফার্গুসন্‌ বিশেষ সতর্কতার সহিত ভিক্টোরিয়াকে পরিচালিত করিতে করিতে বলিলেন—

“যদি জঙ্গেমেরোর কর্দ্দমাক্ত সিক্ত ভূমি পদব্রজে অতিক্রম করে’ আসতে হতো, তা’ হ’লে এতক্ষণ কষ্টের অবধি থাকতো না। আমাদের ভারবাহী পশুগুলির অর্দ্ধেক হয় ত এতক্ষণ মরে’ যেত। আমরাও জীবন্মত হ’য়ে পড়তেম। নিরাশা, শ্রান্তি, ক্ষুধা, পিপাসা, জ্বর এতক্ষণ আমাদের বুক ভেঙ্গে দিত। পথ-প্রদর্শকেরা সুযোগ পেয়ে লুণ্ঠন করতে আরম্ভ করতো। তাদের সে নিষ্ঠুরতা অবর্ণনীয়। দিবসে সূর্যকিরণ অসহা জ্বালাময়—রাত্রে নিদারুণ শীত। সে শীতে যেন অস্থি পর্য্যন্ত, চূর্ণ হ’য়ে যায়। এ দেশে এমন কতকগুলি পোকা মাকড় আছে যে, যতই কেন মোটা কাপড় পর না, সে সব ভেদ করে’ তারা তোমাকে কামড়াবেই কামড়াবে। উঃ সে দংশনের কি দুঃসহ জ্বালা! মানুষ যেন পাগল হয়। তা’ ছাড়া হিংস্র পশু,আরণ্য মনুষ্য—এ সব ত আছেই! এ অঞ্চলে যাঁরা ভ্রমণ করে’ গেছেন তাঁদের কাহিনী যদি পড়, তা’ হ’লে চোখের জল রাখতে পারবে না!”

তখন অদূরে বহু উচ্চে রুবেহো শৈলমালা দেখা যাইতেছিল। আফ্রিকার ভাষায় রুবেহো অর্থে বাতাসের গতি বুঝায়। এই পর্ব্বতমালা এত উচ্চ যে, বায়ুপ্রবাহ এখানে প্রতিবাহিত হ’য়ে অন্য দিকে ধাবিত হয়। ফার্গুসন্ কহিলেন, “হুসিয়ার, আমরা রুবেহো পর্ব্বতের আতি নিকটে এসেছি। পর্ব্বতাশখর ছেড়ে অনেকটা উঁচু দিয়ে যেতে হ’বে।” বেলুনের গ্যাস উত্তপ্ত হইয়া ক্রমেই বিস্তার লাভ করিতে লাগিল, বেলুন ক্রমেই উপরে উঠিতে আরম্ভ করিল। কেনেডি জিজ্ঞাসা করিলেন,

“এত উপরে কি বেশীক্ষণ থাকা চলে?”

“বেলুন বড় হ’লে খুব উপরেও যাওয়া যেতে পারে। পর্য্যটক ব্রিয়োসি এবং গেফুসাকের নাম কি শোন নি? তাঁরা এত উপরে উঠেছিলেন যে, কান দিয়ে নাক দিয়ে রক্ত বেরিয়েছিল। আমরা এখন প্রায় ছ’হাজার ফিট উঠেছি। দেখছ না কোন জিনিষ আর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।”

বাতাস প্রবল বেগে বহিতেছিল। ভিক্টোরিয়া অল্পকাল মধ্যেই তুষার-মণ্ডিত শৈলশৃঙ্গ অতিক্রম করিল। ফার্গুসন্ পর্ব্বতের চিত্র অঙ্কিত করিয়া লইলেন। রুবেহো পর্ব্বতের পর পারে পৃথ্বিতল কানন-সমাচ্ছন্ন—পত্রবহুল বৃক্ষলতায় সুশোভিত। তাহার পরই একটি মরুভূমি। দূরবিস্তৃত তপ্ত বালুকারাশির মধ্যে স্থানে স্থানে নৃত্যশীলা পার্ব্বত্যতরঙ্গিণী প্রবাহিতা। আরও দূরে ঘন কণ্টক বন ও লবণাক্ত বৃক্ষলতা। কেনেডি ধীরে ধীরে নিম্নে নামিতে লাগিলেন। অল্পক্ষণ মধ্যেই একটা প্রকাণ্ড বৃক্ষের সুদৃঢ় শাখার সহিত বেলুনের নোঙ্গর আবদ্ধ হইল। জো অবিলম্বে রজ্জু-মই বাহিয়া বৃক্ষোপরি অবতরণ করিল এবং শাখার সহিত নোঙ্গর দৃঢ়রূপে বন্ধন করিয়া দিল।

ফার্গুসন্ কহিলেন, “তোমরা দুইজনে বন্দুক নিয়ে নাম। দেখ যদি কিছু পাও।”

মৃগয়ালোলুপ কেনোড বিপুল আনন্দে অবতরণ করিলেন। জো সঙ্গে সঙ্গে চলিল। ফার্গুসন্ বন্ধুকে সতর্ক করিয়া দিয়া কহিলেন; “বেশী বিলম্ব করো না। আমি উপর থেকে অনেক দূর পর্য্যন্ত দেখতে পাচ্ছি। যদি কোনো বিপদের সম্ভাবনা দেখি, বন্দুক আওয়াজ করবো।”

সানুচর কেনেডি শিকারের সন্ধানে বন মধ্যে প্রবেশ করিলেন। দেখিলেন সেই পথে বহুদিন পূর্ব্বে কোনো যাত্রীর দল গিয়াছে। কোথাও মৃত মনুষ্যের কঙ্কাল, কোথাও পশুর কঙ্কাল তাহার চিহ্নস্বরূপ পড়িয়া রহিয়াছে। তাঁহারা একটা অপেক্ষাকৃত নিবিড় বনের মধ্যে প্রবেশ করিলেন এবং অল্পক্ষণ মধ্যেই অব্যর্থ-সন্ধান কেনেডির গুলি একটী মৃগের বক্ষ ভেদ করিয়া দিল। তখন জো মৃগমাংস দগ্ধ করিতে করিতে কহিলেন—

“আমার মনটা বড় অস্থির হয়েছে।”

“কেন?”

“ভয় হচ্ছে, আমরা ফিরে যেয়ে যদি বেলুন দেখতে না পাই।”

“পাগল আর কি! তুমি কি মনে কর ফার্গুসন্ আমাদের এখানে ফেলেই চলে’ যাবে?”

“না তা’ নয়। মনে করুন যদি কোন কারণে নোঙ্গরটা খুলে যায়।”

“সেটা সম্ভব নয়—অমন শক্ত করে বাঁধা আছে। আর ধরই না যদি খুলে যায়, ফার্গুসন্ ইচ্ছা করলেই নামতে পারবে।”

“নামতে পারবেন—তা’ ঠিক। কিন্তু যদি প্রবল বাতাসে বেলুনটা ভাসিয়ে নিয়ে যায়—তা’ হ’লে ত আর তিনি এদিকে ফিরতে পারবেন না।”

“ও সব অশুভ কথায় কাজ নাই—”

বাধা দিয়া জো কহিল, “সকল বিপদের জন্যই প্রস্তুত থাকতে হয়।”

কেনেডি চমকিয়া কহিলেন, “ওই না ফার্গুসনের বন্দুকের শব্দ?”

“হাঁ তাই ত! বুঝি কোন বিপদ্ ঘটেছে!” জো আর কাল বিলম্ব করিল না। দগ্ধ মাংসখণ্ডগুলি ক্ষিপ্রহস্তে সংগ্রহ করিয়া উর্দ্ধশ্বাসে ভিক্টোরিয়ার দিকে ছুটিল। কেনেডিও দৌড়াইলেন। ঘন বন—তাঁহারা বেলুন দেখিতে পাইতেছিলেন না। আবার বন্দুকের শব্দ হইল। তাঁহারা আরও দ্রুত দৌড়াইলেন। কাননপ্রান্তে উপস্থিত হইয়াই দেখিলেন, বেলুন স্থানভ্রষ্ট হয় নাই। কেনেডি তখন বিস্মিত হইয়া কহিলেন,

“ব্যাপার কি! বেলুন ত ঠিকই আছে।”

ইতস্ততঃ চাহিয়া জো বলিয়া উঠিল “সর্বনাশ!”

“কি! কি! কি হয়েছে?”

“ওই দেখুন কাফ্রিরা এসে বেলুন আক্রমণ করেছে।”

ভিক্টোরিয়া তখনো অনেক দূর ছিল। তাঁহারা দেখিলেন প্রায় ৩০টী প্রাণী উহার তলদেশে নৃত্য করিতেছে—চীৎকার করিতেছে—অঙ্গভঙ্গী করিতেছে। কেহ বা বৃক্ষের উপর আরোহণ করিয়া সর্বোচ্চ শাখায় উঠিয়াছে। এমন সময় আবার বন্দুকের শব্দ হইল। তাঁহারা দেখিলেন আক্রমণ-কারীদিগের মধ্যে যে বেলুনের বন্ধনরজ্জু বাহিয়া উপরে উঠিতেছিল, সে আহত হইয়া পড়িতে পড়িতে ভূমি হইতে প্রায় ১০।১২ হস্ত উপরে বৃক্ষশাখায় ঝুলিয়া রহিল।

জো কহিল, “কি আশ্চর্য্য, কাফ্রিটা পড়ছে না কেন—গুলি বুঝি লাগে নাই।”

পরক্ষণেই সে উচ্চহাস্য করিয়া কহিল “দেখেছেন ওটা কেমন করে’ লেজ দিয়ে গাছের ডাল জড়িয়ে ধরেছে। আমরা ভেবেছিলাম কাফ্রি-কিন্তু এখন দেখছি তা নয়! সবগুলোই হনুমান!”

আশ্বস্ত হইয়া কেনেডি কহিলেন, “যাক, বাঁচা গেল! কাফ্রি না হ’লেই ভাল।”

গোটাকতক পিস্তলের আওয়াজেই শাখামৃগের দল পলায়ন করিল। জো এবং কেনেডি বেলুনে উঠিলেন। জো কহিল, “কি ভয়ানক আক্রমণ!”

“ফার্গুসন্, আমরা মনে করেছিলাম তোমাকে বুঝি কাফ্রিরাই আক্রমণ করেছে!”

“আমাদের সৌভাগ্য যে ওগুলো সব হনুমান—কাফ্রি নয়। দেখতে বড় বেশী তফাত নাই! যদি নোঙ্গরটা হঠাৎ ছিড়ে দিত তা’ হ’লেই বিপদে পড়েছিলাম আর কি!”

জো তখন গম্ভীর ভাবে কহিল, “কেমন মিঃ কেনেডি, মাংস পোড়াতে পোড়াতে এ কথা আমি বলেছিলাম কি না।”

বেলুন নির্ব্বিঘ্নে চলিতে লাগিল। সন্ধার পূর্ব্বে মাবুংগুরু নামক পার্ব্বত্য প্রদেশ অতিক্রম করিয়া তাঁহারা জিহোলামোরা গিরিশ্রেণীর পশ্চিম পারে রাত্রি যাপন করিলেন। প্রভাতে মানচিত্র দেখিয়া ফার্গুসন্ কহিলেন——

“ডিক, কাজে নগর এখান থেকে প্রায় ১০০ মাইল হইবে। বাতাস যদি ঠিক থাকে, তা’ হ’লে আমরা আজই সেখানে যেতে পারবো।”

নবম পরিচ্ছেদ

কাজে

মধ্য আফ্রিকায় কাজে একটি বিখ্যাত নগর। নগর বলিতা আমরা যাহা বুঝি, কাজে সেরূপ ছিল না। ছয়টা প্রকাণ্ড গহ্বরের মধ্যে কতকগুলি কুটীর লইয়া কাজে নগর। সুবৃহৎ গৃহগুলির পার্শ্বে কৃতদাসদিগের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুটীর, গৃহের সম্মুখে বিস্তৃত প্রাঙ্গণ ও মুক্ত উদ্যান এবং উদ্যান-মধ্যে পলাণ্ডু, আলু, কুষ্মাণ্ড প্রভৃতির ক্ষেত্র কাজে নগরকে সুশোভিত করিয়া রাখিয়াছিল।

সে কালে কাজেই আফ্রিকাবিহারী বণিক্‌দিগের একটী অন্যতম প্রধান মিলনকেন্দ্র ছিল। দক্ষিণ হইতে কৃতদাস ও হস্তিদন্ত লইয়া বণিক্গণ তথায় আগমন করিত। পশ্চিমের বণিক্গণ তথা হইতে তুলা ও কাচনির্ম্মিত দ্রব্যাদি লইয়া যাইত। তাই তখন কাজের বিপণী সর্ব্বদা কোলাহলচঞ্চল থাকিত, শিঙ্গা দামামা প্রভৃতির ধ্বনিতে সর্বদা মুখরিত হইত—এখানে খচ্চর ও গর্দভের পৃষ্ঠে পণ্য বোঝাই করিয়া এক দল বণিক্ অপেক্ষা করিতেছে, সেখানে কেহ বা দাস-ব্যবসায়ে লিপ্ত, স্থানান্তরে কাচের বিনিময়ে হস্তিদন্ত বিক্রীত হইতেছে।

ধনাঢ্য বণিক্গণ পুত্র-কলত্র ও কৃতদাস লইয়া তথায় সুখে স্বচ্ছন্দে বাস করিত। ইহারাই আফ্রিকার অন্তর্বাণিজ্যে লিপ্ত হইয়া জীবিকা অর্জ্জন করিত। কেহ কেহ বা পণ্যাদি লইয়া আরবে পর্য্যন্তও গমন করিত।

অকস্মাৎ সেই কোলাহলচঞ্চল বিপণী নীরব হইল। ক্রেতা বিক্রেতা সকলেই ঊদ্ধশ্বাসে পলায়ন করিয়া কুটীর মধ্যে আশ্রয় লইল—পণ্য পৃষ্ঠে করিয়া অশ্ব গর্দভ বা খচ্চর মুক্ত প্রান্তরে পড়িয়া রহিল। সকলেই বিস্মিত হইয়া দেখিল কি একটা বিরাট পদার্থ স্বর্গ হইতে ধীরে ধীরে নামিয়া আসিতেছে।

ভিক্টোরিয়া ক্রমেই নিম্নে আসিল। শেষে একটী বৃহৎ বৃক্ষের শাখায় নোঙ্গর আবদ্ধ করা হইল। নাগরিকগণ সশঙ্কচিত্তে একে একে, দুইয়ে দুইয়ে অদূরে সমবেত হইতে লাগিল। কেহ বা যাদুমন্ত্র উচ্চারণ করিতে লাগিল। কেহ বা যোদ্ধার ন্যায় দৃঢ় মুষ্টিতে অস্ত্র ধারণ করিল। কেহ বণিক্—পণ্যসম্ভার রক্ষায় নিযুক্ত হইল। স্ত্রীলোক বালক বৃদ্ধ সকলেই বিস্মিত হইয়া বেলুন ও বেলুনযাত্রীদিগকে দেখিতে লাগিল। দামামাগুলি বিপুল নিনাদে বাজিয়া উঠিল। নাগরিকগণ শেষে উর্দ্ধে হস্ত উত্তোলন করিয়া নবাগত যাত্রীদিগকে সম্মান প্রদর্শন করিতে লাগিল।

ফার্গুসন্ বলিলেন, “ওই দেখ ওরা আমাদের পূজা করছে। ওদের পূজা-পদ্ধতিই এই রকম।”

অকস্মাৎ একজন যাদুকরের নির্দেশে বাদ্যধ্বনি থামিয়া গেল। যাত্রীদিগের উদ্দেশে সে কি যেন বলিল। কেহই তাহার কথা বুঝিতে পারিলেন না। ফার্গুসন্ তখন দুই চারিটী আরব্য শব্দ উচ্চারণ করিলেন। যাদুকরও তখন আরব্য ভাষায় একটী নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা করিল। ফার্গুসন্ সঙ্গীদিগকে কহিলেন—

“ওরা মনে করেছে বেলুনটা চন্দ্র। আমরা তিন জন চন্দ্রের তিনটা ছেলে। ওদের দেশে সূর্য্যের পূজা হয়। চন্দ্র যে অনুগ্রহ করে’ সূর্য্যের দেশে এসেছেন তা’তে ওরা নিজেদের কৃতার্থ মনে করছে।”

নীরব থাকা উচিত নহে বিবেচনায় ফার্গুসন্ও আরব্য ভাষায় কহিলেন,— “সহস্র বৎসর পর চন্দ্র একবার করে’ তাঁর রাজ্য দেখতে আসেন। তাঁকে যারা পূজা করে, তাদেরও দেখে যান। তোমাদের যদি কোন বর থাকে প্রার্থনা কর।”

যাদুকর কহিল, “আমাদের সুলতান অনেকদিন থেকে পীড়ায় শয্যাশায়ী। আপনারা তাঁকে রক্ষা করুন।”

ফার্গুসন্ কহিলেন, “তথাস্তু।”

কেনেডি বিস্মিত হইয়া বলিলেন, “তুমি কি তবে সেই সুলতানকে দেখতে যাবে?”

“হাঁ যাব। লোকগুলো ভাল বলেই বোধ হচ্ছে। কোন বিপদের আশঙ্কা নাই।”

“কি জানি ভাই—বলা যায় কি!”

“কোন ভয় নাই ডিক্। বার্টন্ এবং স্পিক্ এখানে এসেছিলেন। তাঁরা লিখে গেছেন যে, এরা খুব যত্ন করে’ অতিথি সৎকার করেছিল।”

“তুমি যেয়ে কি করবে?”

“একটু ঔষধ সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি।” এই বলিয়া ফার্গুসন সেই চঞ্চল জনসঙ্ঘকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন—

“সুলতানের উপর চন্দ্রের দয়া হয়েছে; চল, পথ দেখাও।”

মুহূর্ত্তমধ্যে চতুর্দ্দিকে বিপুল উল্লাসের চিহ্ন দেখা গেল। চীৎকার, গীত-বাদ্য প্রভৃতি মুহূর্ত্তে সেই নীরব স্থানকে ধ্বনিত করিয়া তুলিল। নাগরিকগণ পিপীলিকাশ্রেণীবৎ অগ্রসর হইল।

ফার্গুসন্ বন্ধুকে কহিলেন, “যে কোন বিপদ্ মুহূর্ত্তে আসতে পারে। চক্ষের নিমেষে যাতে আমরা যেতে পারি তা’র জন্য প্রস্তুত থাক। তুমি গ্যাস-নলে অল্পে অল্পে তাপ দাও যেন বেলুন নিমেষে বহু উচ্চে উঠতে পারে। নোঙ্গরটা শক্ত করে’ই বাঁধা আছে—গ্যাস উত্তপ্ত হ’বে বলে’ ভয় নাই। জো নীচে নেমে যাও। তুমি মইটার কাছে থাকবে।”

কেনেডি কহিলেন, “ফার্গুসন, সেই বুড়ো কাফ্রিটাকে দেখতে তুমি তবে একাই যাবে?”

জো কাতর কণ্ঠে কহিল, “আমাকেও কি সঙ্গে নেবেন না?” “আমি একাই যাই। আমার জন্য ভেব না। তোমরা ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে আমার উপদেশ মত সব ঠিক রাখ।”

কাফ্রিদিগের চীৎকার ক্রমেই উচ্চ হইতে উচ্চতর হইতেছিল। তাহারা যেন ক্রমেই অধৈর্য্য হইতে লাগিল। ফার্গুসন্ আর বিলম্ব না করিয়া ঔষধের বাক্সটী লইয়া বেলুন হইতে অবতরণ করিলেন। রাজ-কুটীর নগর হইতে একটু দূরে অবস্থিত ছিল বেলা তখন ৩টা বাজিয়াছিল। ফার্গুসন্ গম্ভীর পাদবিক্ষেপে চলিতে লাগিলেন। কিছুদূর অগ্রসর হইতে না হইতেই সুলতানের পুত্র আসিয়া তাঁহাকে ভূলুণ্ঠিত হইয়া প্রণাম করিল। ফার্গুসন্ ললিত অঙ্গভঙ্গী করিয়া তাহাকে ভূমিতল হইতে উঠিতে বলিলেন।

শোভাযাত্রা ছায়াচ্ছন্ন পথে ঘুরিতে ঘুরিতে অবশেষে রাজপুরীর নিকটবর্ত্তী হইল। উহা শৈলপার্শ্বে নির্ম্মিত। গৃহপ্রাচীর রক্তাভ মৃত্তিকায় চিত্রিত সর্প ও মনুষ্যের মূর্ত্তিতে সুশোভিত। গৃহের ছাদ প্রাচীরের উপর ন্যস্ত ছিল বলিয়া গৃহমধ্যে উপর দিয়া বাতাস খেলিতেছিল। কক্ষমধ্যে বায়ুপ্রবেশের আর অন্যপথ ছিল না।

রাজরক্ষিগণ, রাজপরিষদবর্গ এবং রাজাত্মীয়গণ ও সমবেত জনমণ্ডলী ফার্গুসন্কে সসম্মানে অভ্যর্থনা করিল। তিনি দেখিলেন তাহাদিগের কেশদাম বেণীর ন্যায় অংসোপরি পতিত হইয়া দুলিতেছে। গণ্ডদেশ কালো লাল প্রভৃতি বিভিন্ন বর্ণে রঞ্জিত। তাহাদিগের কর্ণ অতি বৃহৎ। সেই বৃহৎ কর্ণের ছিদ্রে কাষ্ঠের চাকতি ঝুলিতেছে। উজ্জ্বলবর্ণের বসন পরিধান করিয়া কেহ বা সসম্ভ্রমে দূরে দণ্ডায়মান রহিয়াছে। সৈনিকগণ তীক্ষ্ণ বিষবাণ এবং অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র তরবারি লইয়া সগর্ব্বে দণ্ডায়মান রহিয়াছে। কাহারো বক্র দীর্ঘ তরবারি এবং সুশোভিত কুঠার তপন-কিরণে জ্বলিতেছে। ফার্গুসন্‌ গৃহমধ্যে প্রবেশ করিলেন।

তাঁহাকে প্রবেশ করিতে দেখিয়া সকলে জয়ধ্বনি করিয়া উঠিল। রাজরমণীগণ তাঁহাকে অভিবাদন করিল। পিত্তল-নির্ম্মিত বাদ্যযন্ত্র ‘উপাতু’ অর্মান ঝন্ ঝন্ করিয়া বাজিতে লাগিল। জয়ডঙ্কা ‘কিলিন্দো’র গভীর নিনাদে দিঙ্‌মণ্ডল পূর্ণ হইয়া উঠিল। রমণীগণ দেখিতে সুশ্রী। তাহারা দীর্ঘ নলে ধূমপান করিতে করিতে হাসিতেছিল। ছয়টী রমণী অন্যান্য রমণীদিগের নিকট হইতে একটু দূরে স্বতন্ত্রভাবে বসিয়াছিল। সুলতানের মৃত্যুর পর তাহার সহিত ইহারাও জীবন্ত সমাহিত হইবে বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়াছিল। মৃত্যুর পর পরলোকেও সুলতানের তৃপ্তির জন্য এইরূপ ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল!

ফার্গুসন্‌ রোগকাতর সুলতানের নিকটবর্তী হইলেন। দেখিলেন ৪০ বর্ষ বয়স্ক একটী অতিরুগ্ন লোক কাষ্ঠনির্ম্মিত একখানি অতি সাধারণ পালঙ্কে শয়ন করিয়া আছে। ফার্গুসন্‌ দেখিয়াই বুঝিলেন দীর্ঘকালের ব্যসনে ও অপরিমিত সুরাপানে তাহার জীবনীশক্তি ফুরাইয়া আসিয়াছে। তাহার সে শক্তিহীন দেহে নব বল দিতে পারে এমন সাধ্য কাহারো ছিল না। সুলতানকে যে শীঘ্রই মরিতে হইবে সে বিষয়ে আর তিলমাত্র সন্দেহ ছিল না। ফার্গুসন্ তাহাকে তীব্র ঔষধ পান করাইলেন। অল্পক্ষণের জন্য তাহার চৈতন্য ফিরিয়া আসিল। সুলতান দুই একবার হস্তপদ সঞ্চালন করিল দেখিয়া রাজপরিবারের আনন্দের সীমা রহিল না। ফার্গুসন্ আর অপেক্ষা না করিয়া ত্বরিতপদে কক্ষ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন।

জো এতক্ষণ পর্য্যন্ত বেলুনের রজ্জু-মইয়ের নিকট অবস্থিত থাকিয়া কৌতূহলী কাফ্রিদিগের নিকট দেবপূজা লাভ করিতেছিল। যুবতীরা তাহাকে ঘিরিয়া নৃত্য করিতে লাগিল। কেহ বা গান গাহিতে আরম্ভ করিল। স্বর্গের নৃত্য নরলোকে দেখাইবার মানসে জো-ও সেই তালে তালে নাচিতে লাগিল। তাহার হস্তভঙ্গী, চরণবিক্ষেপ, মুখভঙ্গী ও অঙ্গসঞ্চালন দেখিয়া কাফ্রিগণ মনে করিল আহা! স্বর্গের নৃত্য কি সুন্দর! তাহারাও জো’র অনুকরণ করিয়া নৃত্য করিতে লাগিল।

অকস্মাৎ চতুর্দ্দিকে ভীষণ কোলাহল শ্রুত হইল। জো দেখিল নাগরিকগণ ও যাদুকরগণ উত্তেজিত হইয়া উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করিতে করিতে বেলুনের দিকে অগ্রসর হইতেছে। ফার্গুসন্ সকলের অগ্রে অতিশয় ক্ষিপ্রচরণে আগমন করিতেছেন। জো প্রমাদ গণিল।

ফার্গুসন্ ও জো অবিলম্বে বেলুনে উঠিলেন। কুসংস্কারসঞ্জাত ভীতি সেই উত্তেজিত নাগরিকদিগকে তখনো বেলুন হইতে দূরে রাখিয়াছিল। কেনেডি ব্যগ্র হইয়া কহিলেন—

“ফার্গুসন্ ব্যাপার কি? সুলতান মরেছে না কি?”

“না মরে নাই। ডিক্, আর মুহূর্ত্ত বিলম্ব নয়— নোঙ্গর খোলার আর সময় নাই—বেলুন ছাড়—নোঙ্গর কেটে দাও।”

“কেন? হয়েছে কি?”

কেনেডি আপন বন্দুক তুলিয়া লইলেন।

ফার্গুসন্ কহিলেন “রাখ—রাখ— বন্দুক রাখ।” তিনি আকাশের দিকে অঙ্গুলি নির্দ্দেশ করিয়া বলিলেন, “ওই দেখ।”

“কি দেখব?”

“আকাশে চন্দ্র দেখছ না?”

চন্দ্রদেব তখন নির্ম্মল আকাশতল আলোকিত করিয়া ধীরে ধীরে উঠিতেছিলেন।

কাফ্রিগণ গর্জ্জন করিয়া উঠিল। আকাশে কখনো দুইটা চন্দ্র দেখা যায় না। সুতরাং তাহারা যে প্রতারিত হইয়াছে, ইহা বুঝিতে তাহাদের আর বিলম্ব হইল না। পলায়মান প্রতারকদিগকে শাস্তি দিবার জন্য তাহারা রোষদীপ্ত হইয়া উঠিল। কেহ ধনুকে শর সংযোগ করিল, কেহ বা বন্দুক উঠাইল। একজন যাদুকর ইঙ্গিতে সকলকে শান্ত হইতে বলিয়া বেলুনের নোঙ্গরটি ধরিবার জন্য বৃক্ষোপরি আরোহণ করিতে লাগিল।

জো দড়ি কাটিবার জন্য অস্ত্র উঠাইল।

ফার্গুসন্ কহিলেন- “থাম।”

“কাফ্রিটা যে উঠছে—”

“উঠতে দাও। নোঙ্গরটা বাঁচাতে পারি কি না দেখি। কাটার ঢের সময় পাওয়া যাবে। ঠিক—হুসিয়ার! গ্যাস ঠিক আছে?”

এআই অনুবাদ · মূল