নিগ্রোজাতির কর্ম্মবীর

মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Benoy Kumar Sarkar (†1949) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন

আমি বিশ্বাস করি, গুণ যাহার মধ্যেই থাকুক না কেন, সমস্ত জগৎ‍ই তাহাকে সম্মান করিতে বাধ্য। দুদিন আগে কিম্বা দুদিন পরে—এই যা। গুণ, যোগ্যতা, প্রতিভা, চরিত্রবত্তা এ সকল জিনিষ চাপিয়া রাখা যায় না। কেহ এ গুলিকে কোনদিন ঢাকিয়া রাখিয়া দাবিয়া ফেলিতে পারিবে না। আর একটা কথাও আমি সর্ব্বদা মনে রাখি এবং সকলকে বলিয়া থাকি,—“কথা অপেক্ষা কাজের মূল্য শতগুণ বেশী। একশত জন লোক ঐক্য-বিধান, সুবিচার, অধিকার বিভাগ ইত্যাদি বিষয়ে বক্তৃতা করিয়া সমাজের যে উপকার করিতে না পারে, একজন লোক একটা সুন্দর শিল্প সৃষ্টি করিয়া সেই উপ কার করিতে পারে। যখনই শ্বেতাঙ্গেরা রাস্তায় হাঁটিতে হাঁটিতে নিগ্রোনির্ম্মিত একখানা সুন্দর গৃহ দেখিবে তখনই তাহারা নিগ্রোর ক্ষমতায় বিশ্বাস করিবে। সৌন্দর্য্য সৃষ্টি করিবার পরক্ষণ হইতেই কৃষ্ণাঙ্গ শ্বেতাঙ্গের বন্ধু ও পূজার পাত্র হইয়া পড়িবে। কেবল গৃহনির্ম্মাণে কৃতিত্ব কেন, সকল বিষয়েই কৃতিত্ব দর্শক, ও শ্রোতৃমণ্ডলীর শ্রদ্ধা ও ভক্তি আকৃষ্ট না করিয়া যায় না। তখন তাহারা কে গান করিতেছে, কে চিত্র আঁকিতেছে, বা কে মূর্ত্তি গড়িতেছে, বা কে বাগান তৈয়ারী করিতেছে—এ সকল কথা ভুলিয়া গিয়া কৃতিত্বের দাস হইয়া পড়ে। গুণপনার ক্ষমতা অসীম। সুতরাং শ্বেতাঙ্গদিগকে সকল কর্ম্মক্ষেত্রে এখন আমাদের গুণপনা দেখান আবশ্যক। গুণমুগ্ধ হইলে শীঘ্রই তাহারা আমাদিগকে আদর করিতে বাধ্য হইবে। আমাদের কাল চামড়ার জন্য বেশী বাধা পাইব না।”

ছাত্রেরাই টাস্কেজীর গৃহগুলি নির্ম্মাণ করিয়াছে ঠিক সেই আদর্শের বশবর্ত্তী হইয়াই আমি তাহাদিগের দ্বারা আমাদের বিদ্যালয়ের জন্য গাড়ী জুড়ি ইত্যাদি তৈয়ারী করাইয়াছি। আজ কাল আমাদের এইরূপ গাড়ীর সংখ্যা প্রায় ১২টা। সকল গুলিই ছাত্রদের নিজ হাতে প্রস্তুত। তাহা ছাড়া আরও অনেক গাড়ী তৈয়ারি করিয়া আমরা বাজারে বেচিয়াছি। আমাদের গাড়ীর কারখানার সাহায্যেও শ্বেতাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গে সদ্ভাব অনেক বাড়িয়াছে। আমাদের শিক্ষিত ছাত্রেরা যে অঞ্চলে গাড়ীর কারবার করে তাহারা সেই অঞ্চলের শ্বেতাঙ্গমহলে বিশেষ প্রতিপত্তিই অর্জ্জন করিয়াছে দেখিতে পাই।

সংসারে লোকের যাহা অভাব তাহা তুমি যদি মোচন করিতে পার, তোমার প্রভুত্ব সেখানে সুনিশ্চিত জানিয়া রাখিও। লোকে চায় শাক শব্জী, ইট কাঠ, লোকে চায় স্বাস্থ্য ও আর্থিক উন্নতি, লোকে চায় বাড়ী ঘর আসবাব গাড়ী ইত্যাদি। তোমরা যদি সেখানে তোমাদের গ্রীকভাষার ব্যাকরণ লইয়া হাজির হও তাহা হইলে তোমাদিগকে তাহারা সম্মান করিবে কেন? বাজারের কাট্‌তি বুঝিয়া মাল জোগান দিতে থাক, দেখিবে সংসার তোমার গোলাম।

আমার নূতন আদর্শের শিক্ষাপ্রণালী ত প্রবর্ত্তিত হইল। ধনী নির্দ্ধন বিচার না করিয়া সকল ছাত্রকেই শারীরিক পরিশ্রম করিতে বাধ্য করিলাম। সকলকেই শিল্পে, কৃষিকর্ম্মে, গৃহস্থালীতে লাগাইয়া দিলাম। আমার নিয়মগুলি টাস্কেজীময় রাষ্ট্র হইয়া গেল। সকলেই ভাবিতে লাগিল আমি একজন কিম্ভূতকিমাকার লোক। যা খুসী তাই করি। আমার বিদ্যাবুদ্ধি কিছুই নাই। ছেলেগুলির মাথা খাইতে বসিয়াছি। ছাত্রদের অভিভাবকেরা পত্র দিলেন—তাঁহাদের সন্তানদিগকে যেন হাতে পায়ে খাটিতে না বলা হয়। এইরূপ অসংখ্য আপত্তি আসিল। অনেকের বাপ মা স্কুলে স্বয়ংই আসিয়া হাজির। তাঁহারা চাহেন পুস্তকশিক্ষা! যত পুস্তকের সংখ্যা ততই তাঁহাদের ধারণায় পাণ্ডিত্য বৃদ্ধি।

দেখিতে দেখিতে আমার বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে, আমার শিক্ষাপ্রণালীর বিরুদ্ধে এবং আমার নিজের বিরুদ্ধে বেশ একটা বিদ্রোহ বাধিয়া উঠিল। পাড়ার লোকেরা, সহরের লোকেরা, জেলার লোকেরা, ছাত্রদের অভিভাবকেরা এবং ছাত্রেরা একাকী বা দলবদ্ধভাবে আমার নিন্দা ও অপমান করিতে লাগিল। তাহারা আমার ঐরূপ নূতন নিয়মে শিক্ষাপ্রচার চাহে না। আমি কিন্তু অটল অচল ও গম্ভীরভাবে রহিলাম। আমার মত পরিবর্ত্তন করিলাম না। অনেক ছাত্র নাম কাটাইয়া চলিয়া গেল। অনেকে বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন সৃষ্টি করিল। তথাপি আমি নড়িলাম না—আমার মত ধীরভাবে সকলকে বুঝাইতে চেষ্টা করিলাম। আমি নানাস্থানে যাইয়া অভিভাবকগণকে ডাকিয়া পরামর্শ করিলাম। ক্রমশঃ লোকজনেরা কিছু কিছু বুঝিতে পারিল। দুই বৎসরের মধ্যে আমার ছাত্রসংখ্যা ১৫০ হইল। দেখা গেল আলাবামা প্রদেশের সকল জেলা হইতেই টাস্কেজীতে ছাত্র আসিয়াছে। অন্যান্য প্রদেশ হইতেও দুই চারিজন আসিয়াছে। মোটের উপর টাস্কেজী বিরোধ কাটাইয়া উঠিয়া উন্নতির পথে দাঁড়াইল। আমার একটা অগ্নিপরীক্ষা হইয়া গেল। আমার শিল্পশিক্ষা-নীতির জয় হইল।

“পোর্টার হল” নির্ম্মিত হইয়া গেল। সম্পূর্ণরূপে ব্যবহারের উপযোগী হইবার কিছু বাকি থাকিল। তথাপি আমরা শীঘ্র শীঘ্র গৃহপ্রবেশ উৎসব সম্পন্ন করিয়া লইলাম। উত্তর অঞ্চলের একজন শ্বেতাঙ্গ ধর্ম্মগুরুকে এই উপলক্ষ্যে সভাপতির আসনে নিমন্ত্রণ করা হইয়াছিল। তাঁহার নাম রেভারেও রবার্ট সি বেড্‌ফোর্ড। তিনি আমার নাম পূর্ব্বে কখনও শুনেন নাই। যাহা হউক তিনি একজন অতিশয় সহৃদয় ব্যক্তি—আমাদের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিয়া নিগ্রোজাতিকে উৎসাহিত করিলেন। তাহার পর হইতে তিনি আমাদের বিদ্যালয়ের অন্যতম ট্রাষ্টী বা অভিভাবক ও রক্ষকরূপে কার্য্য করিতেছেন।

ইহারই কিছুকাল পরে টাস্কেজী বিদ্যালয়ে একজন কর্ম্মী পুরুষ হ্যাম্পটন হইতে আসিলেন। তখন হইতে বিগত ১৭ বৎসর কাল তিনি আমাদের হিসাব রক্ষকের কার্য্য করিতেছেন। ইহাঁর নাম ওয়ারেণ লোগান। এই অধ্যবসায়ী ও বিচক্ষণ যুবকের সাহায্যে আমাদের আর্থিক অবস্থা যৎপরোনাস্তি উন্নত হইয়াছে।

আমরা “পোর্টার হলে” কাজ কর্ম্ম আরম্ভ করিয়া দিলাম। এইবার আমরা ছাত্রাবাস সম্বন্ধে সবিশেষ উদ্যোগী হইলাম। দেড় বৎসর হইল টাস্কেজীর কার্য্য আরম্ভ হইয়াছে। ইতিমধ্যে বহুদূর দেশ হইতেই ছাত্র আসিতে আরম্ভ করিয়াছে। ছাত্রসংখ্যাও দিন দিন বাড়িয়াই চলিয়াছে। সুতরাং ইহাদিগের গতিবিধি স্বভাব চরিত্র বুঝিবার জন্য বড় রকমের ছাত্রাবাসের আয়োজন করা অত্যন্ত আবশ্যক। এই বুঝিয়াই আমরা এত বৃহৎ গৃহনির্ম্মাণে উৎসাহী হইয়াছিলাম। এতদিনে তাহার সুযোগ সত্যসত্যই আসিল।

পোর্টার হল তৈয়ারী করিবার সময়ে তাহাতে রান্নাঘর এবং ভোজন শালার কামরা রাখা হয় নাই। কাজেই নূতন করিয়া প্রস্তুত করিতে হইল। আবার ছাত্রদিগকে ডাকিয়া পরামর্শ করা গেল। স্থির করিলাম যে, গৃহের নীচে একটা গর্ত্ত করিতে হইবে। মেজে কাটিয়া মাটি তোলান হইল। একটা বড় গর্ত্তের মত জায়গা প্রস্তুত করিলাম। সেই স্থানেই রন্ধন ও ভোজনের ব্যবস্থা হইবে।

এখন ছাত্রাবাস চালান যায় কি করিয়া? কাজ আরম্ভ করিতে পয়সার প্রয়োজন। থালা বাটি টেবিল চেয়ার ইত্যাদি না হইলে ছাত্রদিগকে শৃঙ্খলা ও ভোজনের রীতি শিখাইব কি করিয়া? বাজারে ধার পাওয়া সহজ নয়। স্টোভও নাই যে ভাল রান্না করা যাইবে। অগত্যা বাহিরেই কাঠ জ্বালাইয়া সেকেলে নিয়মে রান্না করান যাইতে লাগিল। বাড়ী তৈয়ারী করিবার সময়ে যে সকল বেঞ্চের উপর রাখিয়া কাঠ পালিশ করা হইত সেই বেঞ্চগুলিকে খানা খাইবার টেবিল করা গেল। আর থালা, বাটি বেশী সংগ্রহ করিয়া উঠা গেল না।

গৃহস্থালী চালাইতে কেহই জানে না বুঝিলাম। নিয়মিত সময়ে খাইতে হয় তাহাই ছাত্রদের জানা নাই। তারপর সকল দিক দেখিয়া শুনিয়া সকল ছাত্রের সুখ সুবিধা বুঝিয়া কাজ করা সেত আরও কঠিন। প্রথম দুই তিন সপ্তাহ সকল বিষয়েই হট্টগোল চলিল—কেহ খাইতে পাইল, কেহ পাইল না। কেহ এক তরকারী কম, কেহ বা বেশী পাইল। কোন খাদ্যে নুন বেশী, কোন খাদ্য বেশী পুড়িয়া গিয়াছে। বিশৃঙ্খলার চূড়ান্ত।

আমি এই সব দেখিতাম তথাপি উন্নতির জন্য চেষ্টিত হইতাম না। ভাবিতাম দেখা যাউক, আপনা আপনি শৃঙ্খলা গড়িয়া উঠে কি না। এক দিন সকাল বেলার খাওয়া চলিতেছে। আমি ঘরের কোণে দাঁড়াইয়া চুপি চুপি শুনিতে লাগিলাম। ছাত্রছাত্রীরা মহা হাল্লা আরম্ভ করিয়াছে। সকলের মুখেই বিরক্তির ভাব। কারণ সে বেলা কাহারই কপালে খাওয়া জুটিল না সমস্ত রান্নাটাই পুড়িয়া অখাদ্য হইয়া গিয়াছে। একজন ছাত্রী বকিতে বকিতে কূপের নিকট গেল। ভাবিয়াছিল কূপ হইতে জল তুলিয়া খাইবে এবং জল পান করিয়াই সকাল বেলার ভোজন শেষ করিবে। যাইয়াই দেখে কূপের দড়ি ছেঁড়া। তাহার জল পান করা হইল না। মহা বিরক্ত হইয়া বলিতে লাগিল “আঃ, এই স্কুলে একটুকু জল খাইতেও পাই না!” আমি নিকটেই ছিলাম সে আমাকে দেখিতে পায় নাই।

একসময়ে আমাদের নূতন বন্ধু বেড্‌ফোর্ড টাস্কেজী বিদ্যালয়ের অতিথি হইয়াছিলেন। ভোর রাত্রে তিনি শুনিতে পাইলেন তাঁহার নীচের ঘরে মহা গোলযোগ হইতেছে। ব্যাপার কি? ছাত্রদের প্রাতরাশ চলিতেছে। দুইজনের মধ্যে ঝগড়া বাঁধিয়াছে পেয়ালায় কাফি খাওয়া আজ কা’র পালা? আগেই বলিয়াছি আমাদের তখনও বাসন কোসন থালা বাটি বেশী জুটে নাই। কাফি পান করিবার জন্য পেয়ালা সকলেই রোজ পাইত না। তিন চারিদিন পর এক এক জনের ভাগ্যে পেয়ালা পড়িত।

ছাত্রাবাসের এই দুর্দ্দশা অবশ্য বেশী দিন ছিল না। ক্রমশঃ আমাদের শৃঙ্খলা আসিল। এই সকল অসুবিধা, বিরক্তি, এবং দুঃখ ভোগের পর আমরা এখন অনেকটা সুখের মুখ দেখিতে পাইয়াছি। পূর্ব্ব হইতে এইরূপ কষ্টের মধ্যে না পড়িয়া উঠিলে আজ কি এত নির্ম্মল আনন্দ উপভোগ করিতে পারিতাম?

আজ সেই পুরাতন ছাত্রেরা টাস্কেজীতে আসিয়া কি দেখে? অনেকগুলি বড় বড় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন গৃহ। চক্‌চকে টেবিল চেয়ার আস্‌বাব পত্র। পরিপাটি গৃহস্থালী রন্ধন ও ভোজনের সুব্যবস্থা। যথাসময়ে ভোজন শয়ন। এইসব দেখিয়া অনেকেই আমাকে বলিয়াছে—“আমরা পূর্ব্বে এই বিদ্যালয়ে দুঃখে কাটাইয়াছি। তাহারই স্বাভাবিক ক্রমবিকাশে দেখিতেছি এই সুন্দর প্রতিষ্ঠান গড়িয়া উঠিয়াছে। আজ বুঝিতেছি, অগ্রগ্রামীদিগের দুঃখ স্বীকারেই ভবিষ্যৎ সমাজের সুখের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ইহাই টাস্কেজীর নিকট আমাদের শেষ শিক্ষা।”

একাদশ অধ্যায়

শিক্ষালয়ে বিশ্বশক্তি

আমি সমগ্র জগতকেই মানুষের বিদ্যালয় মনে করি। এজন্য টাস্কেজী বিদ্যালয়ের ছাত্রদিগকে সংসারের সকল প্রকার কাজ কর্ম্ম করিতে বাধ্য করিতাম। আমাদের বিদ্যালয়টা এইরূপে একটা ছোট খাট পৃথিবীর মত হইয়া পড়িয়াছিল। সমস্ত বিশ্বের সকল প্রকার শক্তিই এই শিক্ষালয়ের আবহাওয়ায় স্থান পাইত। উৎসব আমোদের ভিতর দিয়া, পশুপালন, অতিথিসেবার ভিতর দিয়া, লোকহিত পরোপকারের ভিতর দিয়া টাস্কেজী বিদ্যালয়ের ছাত্রেরা মানুষ হইতে থাকিত। এজন্যই আমি ছাত্রাবাসের সকল গৃহস্থালীর কাজই ছাত্র ও ছাত্রীদিগকে দিয়া করাইতাম।

ছাত্রাবাস খোলা হইবার অল্পকালের মধ্যেই বিদ্যালয়ের ছাত্র সংখ্যা অভাবিতরূপে বাড়িয়া গেল। ইহাদের ভোজন শয়নের ব্যবস্থা করিবার জন্য আমরা বিব্রত হইয়া পড়িলাম। পূর্ব্বেই বলিয়াছি আমাদের কাহারই গৃহস্থালীজ্ঞান ছিল না, সকল বিষয়েই বিশৃঙ্খলা চলিতেছিল। তাহার উপর অর্থাভাব। এখন স্থানাভাবও বেশ ভোগ করিতে হইল। কাজেই স্কুলের নিকটে নূতন ছাত্রদের জন্য কতকগুলি কাঠের কামরা ভাড়া করিয়া লইলাম। এ গুলির বড়ই জীর্ণ অবস্থা। শীতকালের ঠাণ্ডা বাতাসে ছেলেরা অত্যন্ত কষ্ট পাইতে লাগিল।

আমরা ছেলেদের নিকট মাসিক ২৪৲ টাকা করিয়া লইতাম। ঘরভাড়া, খাওয়া, স্নানের জল, ঘর গরম করিবার জন্য কয়লা ইত্যাদি সকল খরচই এই টাকায় চলিত। এই সঙ্গে বলা আবশ্যক যে, মাত্র ২৪৲ টাকায় কুলাইত না। খরচ আরও বেশী পড়িত। কিন্তু অনেক ছাত্রই স্কুলের নানা কাজ করিয়া দিত। এজন্য তাহাদের বেতন না দিয়া আবশ্যক খরচ হইতে কাটিয়া রাখিতাম। বিদ্যালয়ে পড়িবার খরচ বার্ষিক ১৫০৲ টাকা। এই টাকাটা আমরা নানা স্থান হইতে সংগ্রহ করিয়া দিতাম। সুতরাং এই বিদ্যালয়কে ছাত্রদের পক্ষে অবৈতনিক বলা যাইতে পারে।

দেখা গেল, ছাত্রদের নিকট মাস মাস নগদ ২৪৲ টাকা মাত্র আদায় হইত। সকলের টাকা একত্র করিয়া একসঙ্গে খরচ চালাইতে কিছু সুবিধাই পড়িত সন্দেহ নাই। কিন্তু হাতে কিছুই বাঁচিত না। অথচ পুঁজি বা মূলধন না থাকিলে ছাত্রাবাসের হোটেলখানা ভাল করিয়া চালান কঠিন। আমরা শুইবার ঘরে খাট, গদি, তোষক ইত্যাদি কিছুই জোগাইতে পারিতাম না। শীতকালের রাত্রে ছেলেরা কষ্ট পাইত। রাত্রে উঠিয়া, অনেক সময়ে আমি তাহাদিগকে সান্ত্বনা দিতে যাইতাম। দুশ্চিন্তায় আমার ঘুম হইত না। কোন কোন ঘরে যাইয়া দেখিতাম—তিন চারিজন ছাত্র জড়াজড়ি করিয়া আগুন পোহাইতেছে। সকলের পীঠের উপর দিয়া একটা কম্বল ফেলা আছে। কেহই ঘুমাইতে পায় নাই। একদিন রাত্রে খুব বেশী শীত পড়িয়াছিল। পরদিন সকালে ধর্ম্ম মন্দিরে যাইয়া ছাত্রদিগকে জিজ্ঞাসা করিলাম “কাল রাত্রে তোমাদের কার কার হাত পা জমিয়া গিয়াছিল?” অমনি তিন জন ছাত্র হাত তুলিয়া বুঝাইল। এত কষ্ট স্বীকার করিয়াও ছাত্রেরা কখন বিরক্তির ভাব দেখায় নাই। তাহারা দেখিত যে আমরা যথাসাধ্য তাহাদিগকে সুখে রাখিতেই চেষ্টা করিতেছি। বরং তাহারা শিক্ষকদিগেরই কষ্ট যাহাতে না হয় তাহার জন্য উদ্‌গ্রীব হইত। শীত সহ্য করা তাহাদের ছাত্রজীবনের অন্যতম ব্রত স্বরূপ হইয়াছিল।

আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ মহাশয়েরা সর্ব্বদা বলিয়া থাকেন, “নিগ্রোজাতি শাসন কর্ম্মে স্বায়ত্ত বিধান চাহে কেন? আমরা উহাদের উপর কর্ত্তৃত্ব করি বলিয়া উহাদের মধ্যে সংযম, শান্তি, শৃঙ্খলা থাকে। আমরা ছাড়িয়া দিলে উহাদের সমাজে অশান্তি, অত্যাচার, ব্যভিচার ইত্যাদি বিরাজ করিবে। এক নিগ্রো অন্য নিগ্রোর অধীন থাকিতেই চাহে না। উহারা কখনই নিজে মিলিয়া মিশিয়া কাজ কর্ম্ম করিতে পারিবে না। আমাদের শাসনেই উহারা সুখে আছে।” আমি পূর্ব্বে এ কথা কিছু কিছু বিশ্বাস করিতাম। কিন্তু টাস্কেজী বিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতায় একথা আর আমি স্বীকার করিতে প্রস্তুত নহি।

টাস্কেজী বিদ্যালয়ের পরিচালনা একটা রাষ্ট্রশাসন অপেক্ষা নিতান্ত কম ব্যাপার নয়। অথচ এখানে একজন শ্বেতাঙ্গেরও কিঞ্চিন্মাত্র আধিপত্য নাই। ইহা একটা পূরাপূরি নিগ্রোজাতির কর্ম্ম-কেন্দ্র। কৃষ্ণাঙ্গসমাজে স্বায়ত্ত শাসন অসম্ভব নয়—এই প্রতিষ্ঠানে তাহার জ্বলন্ত প্রমাণ পাওয়া যায়। বিগত ১৯ বৎসরের ভিতর এখানকার কোন ছাত্র শিক্ষক বা অন্য কর্ম্মচারীকে অপমান বা নিন্দা করিয়াছে বলিয়া মনে হয় না। অবশ্য ছেলে মানুষীগুলি ধরা উচিত নয়। আমাদের অধ্যাপক, কেরাণী এবং পরিচালকেরাও কখন অত্যাচারী হইয়াছেন—একথা শুনি নাই। বরং ছাত্রে শিক্ষকে, কেরাণীতে পরিচালকে সর্ব্বদা প্রীতি, সৌহার্দ্য এবং ঐক্যের বন্ধনই লক্ষ্য করিয়াছি। পরস্পর পরস্পরকে সম্মান করিয়া চলে। একজনের সুখ দুঃখে অভাব-অভিযোগে অন্যান্য সকলেই সাড়া দেয়। এই প্রকাণ্ড নিগ্রোসংসারের সকল কাজই সুশৃঙ্খলার সহিত চলিতেছে। কৃষ্ণাঙ্গ সমাজ কি সত্য সত্যই স্বায়ত্ত শাসনের এবং ঐক্যগ্রন্থনের অনুপযুক্ত? টাস্কেজী বিদ্যালয়ের পরিচালনা দেখিলে কেহই নিগ্রো জাতি সম্বন্ধে আর মিথ্যা অপবাদ রটাইতে পারিবেন না। আজ আমি সাহসভরে একথা জগতে প্রচার করিতেছি।

নিগ্রো যুবকেরা ভক্তি জানে—গুরুজনকে শ্রদ্ধা করিতে পারে। আমি কতবার দেখিয়াছি—কোন শিক্ষক বা পরিচালক স্বহস্তে পুস্তক, ছাতা বা আর কিছু বহিয়া লইতেছেন দেখিলে ছাত্রেরা তাঁহাদিগের নিকট আসিয়া সেইগুলি লইয়া সঙ্গে সঙ্গে যাইতে চাহে। শিক্ষকগণকে সুখী রাখিতে তাহারা কি যত্নই না করে? বৃষ্টি পড়িতেছে এমন সময়ে কোন শিক্ষক যদি ঘরের বাহিরে থাকেন, ছাত্রেরা তৎক্ষণাৎ ছাতা লইয়া তাঁহার মাথায় ধরিতে আসে। নিগ্রো-সন্তানও মানুষ—তাহাদেরও হৃদয় আছে—তাহারা গুরুকে ভক্তি করিতে পারে।

আজকাল শ্বেতাঙ্গ মহলে নিগ্রো সম্বন্ধে মনোভাব পরিবর্ত্তিত হইতে আরম্ভ করিয়াছে। শ্বেতাঙ্গেরা আমাদিগকে বর্ব্বর পশু অসভ্য কিছু কম মনে করিতে শিখিতেছেন। টাস্কেজীর শ্বেতাঙ্গেরা সকলে আজকাল আমাকে সম্মান করিয়া থাকেন। অনেক সময়ে গায়ে পড়িয়াও শ্রদ্ধা দেখাইতে কুণ্ঠিত হন না। টাস্কেজীর বাহিরেও নিগ্রোজাতির প্রতি সুদৃষ্টি পড়িয়াছে। আমি এখন নানাস্থানে শ্বেতাঙ্গসমাজ হইতে আদর আপ্যায়ন পাইয়া থাকি। সেদিন টেক্সাস প্রদেশে রেলগাড়ীতে যাইতেছিলাম। প্রত্যেক স্টেশনেই দেখি কত শ্বেতাঙ্গ পুরুষ ও রমণী আসিয়া আমার সঙ্গে “যেচে” আলাপ করিলেন। আমি তাঁহাদিগকে কখনও দেখি নাই। কিন্তু তাঁহারা আমার নাম শুনিয়াছেন। সকলের মুখেই এক কথা “আপনি আমাদের দক্ষিণ অঞ্চলে যে সৎকার্য্যে ব্রতী হইয়াছেন তাহার জন্য আমরা সকলেই গৌরবান্বিত। আপনাকে আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাইতেছি।”

আমি আর একবার শ্বেতাঙ্গদিগের “ভালবাসার অত্যাচারে” পড়িয়াছিলাম। ইহাঁরা আমার সঙ্গে জনেক সময়ে গায়ে পড়িয়া আলাপ করেন, সম্মান করেন, ভোজ দেন। আমি তাহাতে বড়ই বিব্রত বোধ করি। একদিন উত্তর অঞ্চলে রেলে যাইতেছিলাম। অত্যন্ত ক্লান্ত থাকায় বেশী পয়সা দিয়া শুইবার কামরার জন্য টিকিট করিয়াছিলাম। রেলগাড়ীর এই কামরাগুলিকে “পুলম্যান শ্লীপার” বলে। গাড়ীতে উঠিয়াই দেখি দুইজন ইয়াঙ্কি রমণী। ইহাঁদিগকে আমি চিনিতাম। ইহাঁরা বোষ্টন-নগরের বড়ঘরের মেয়ে। ইহাঁরা আমাকে তাঁহাদের কামরায়ই জায়গা দিলেন। আমি ভাবিলাম—ইহাঁরা বোধ হয় দক্ষিণ অঞ্চলের আদব কায়দা জানেন না। যাহা হউক, তাঁহাদের উপরোধে সেই কামরাতেই গেলাম। পরে দেখি, ইহাঁদের আদেশ অনুসারে গাড়ীর হোটেলওয়ালা খানা আনিয়া হাজির করিল। আমি বড়ই লজ্জিত হইতেছিলাম। গাড়ীর মধ্যে অনেক শ্বেতাঙ্গ পুরুষ ছিলেন। তাঁহারা আমাদের দিকে দেখিতে লাগিলেন এবং কাণাঘুষা করিতে লাগিলেন। আমি রমণীদ্বয়ের নিকট বিদায় চাহিলাম। তাঁহারা কোন মতেই ছাড়িলেন না। আমাকে তাঁহাদের সঙ্গে এক টেবিলে নৈশভোজন করিতে হইল!

কেবল তাহাই নহে। তাঁহাদের একজনের ব্যাগে নূতন ফ্যাসানের একপ্রকার উৎকৃষ্ট চা ছিল। তিনি জানিতেন হোটেলের বাবুরচি সে চা কখনও দেখে নাই। সুতরাং তাহারা উহা ভাল করিয়া তৈয়ারী করিতে পারিবে না। এজন্য তিনি নিজেই উঠিয়া গিয়া হোটেল হইতে চা তৈয়ারী করিয়া আনিলেন। আমার জন্য শ্বেতাঙ্গদিগের এত আয়োজন! প্রায় ১॥-২ ঘণ্টা ধরিয়া গল্প করিতে করিতে খানা খাওয়া শেষ হইল। জীবনে আর কখনও আমি এতক্ষণ ধরিয়া খানা খাই নাই। খাওয়ার পরই আমি ধূমপান করিবার জন্য ওখান হইতে অন্য ঘরে উঠিয়া গেলাম। হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচা গেল। কিন্তু সেইখানে গিয়াই দেখি শ্বেতাঙ্গ পুরুষেরা আমাকে চিনিয়া ফেলিয়াছে। সকলেই আমার সঙ্গে আলাপ করিল। আমার টাস্কেজীর কথা তুলিয়া সকলেই আমার প্রশংসা করিতে লাগিল।

আমার ছাত্রদিগকে আমি সর্ব্বদাই বুঝাইয়া থাকি, “দেখ, এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা আমি সত্য। ইহার শিক্ষক ও পরিচালকগণ সকলেই আমার বন্ধু বা পুরাতন ছাত্র এবং নিজ হাতে তৈয়ারী করা লোক, ইহাও সত্য। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটি আমাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। আমরা সকলেই ইহার সেবক ও ভৃত্য মাত্র। বাস্তবিক পক্ষে, এই বিদ্যালয় তোমাদের, তোমরাই ইহার সুনাম কুনামের জন্য দায়ী। ইহার উন্নতি অবনতিতে তোমাদেরই ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বা অনুজ্জ্বল। তোমরা আমাকে তোমাদের শাসন-কর্ত্তা মনে করিও না। তোমাদের একজন প্রবীণ বন্ধু বা অভিজ্ঞতা বিশিষ্ট পরামর্শদাতারূপে গ্রহণ করিও। কিন্তু বিদ্যালয়ের পরিচালনা সম্বন্ধে সকল বিষয়ে তোমাদিগকেই দৃষ্টি রাখিয়া চলিতে হইবে।” আমি এগুলি কেবল কথার কথা বলিতাম না—নানা উপায়ে ছাত্রদিগকে দায়িত্বের মধ্যে ফেলিতাম। এমন সব ঘটনাচক্র সৃষ্টি করিয়া তুলিতাম যাহাতে ছাত্রেরা নিজ নিজ কর্ত্তৃত্ব ফলাইবার সুযোগ পাইত। তাহারা বুঝিতে পারিত যে, সত্যসত্যই তাহারা বিদ্যালয়ের জন্য দায়ী।

আমি সরলভাবে ছাত্রদিগের সঙ্গে মিশি। তাহাদের সঙ্গে পরামর্শ করি—তাহাদের মতানুসারে কার্য্যও করি। তাহাদের সঙ্গে আলোচনা না করিয়া বিদ্যালয়ের ছোট বড় কোন কাজেই আমি হাত দিই না। বৎসরে ৩।৪ বার ছাত্রেরা আমার নিকট পত্র দ্বারা বিদ্যালয়ের উন্নতির জন্য প্রস্তাব লিখিয়া পাঠায়। এই নিয়ম আমিই করিয়া দিয়াছি। এই সকল প্রস্তাব পড়িয়া আমার নিজের অনেক গলদ বুঝিতে পারি—এবং বিদ্যালয়ের পরিচালনা সম্বন্ধে আরও সতর্ক হই। তাহা ছাড়া মাঝে মাঝে আমি তাহাদিগকে ডাকিয়া পাঠাই। খোলাখুলি অনেক বিষয় আলোচিত হয়। আমাদের ভুল এবং অসম্পূর্ণতাগুলি সংশোধন করিবার উপায় নির্দ্ধারিত হয়—পরে সেইগুলি কার্য্যে পরিণত করিয়া থাকি। অধিকন্তু, ছাত্রদিগের অনেক আলোচনা-সমিতি আছে। সেখানেও বিদ্যালয় সম্বন্ধে নানা তর্ক প্রশ্ন উঠে। তাহাতে আমি যোগদান করিয়া অনেক নূতন কথা শিখিতে পারি।

ছাত্রদের পরামর্শ অনুসারে কাজ যখন হইতে থাকে তখন তাহারা যার পর নাই আনন্দিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বজ্ঞানও বাড়িতে থাকে। তখন আবোল তাবোল বকিতে অথবা বিশেষ চিন্তা না করিয়া যাহা তাহা বলিয়া ফেলিতে তাহারা পারে না। যাহাদের কথার দাম নাই তাহারা অনর্থক বাক্যব্যয় করিতে অভ্যস্ত। কিন্তু টাস্কেজীতে ছাত্রেরা যে কথা বলে সেই কথা অনুসারে সত্য সত্যই কাজ হইয়া থাকে। কাজেই তাহারা সংযত ধীর ও গম্ভীরভাবে সকল বিষয়ের মীমাংসা করিতে বাধ্য হয়। এইরূপে দায়িত্বপূর্ণ কার্য্য করিতে করিতে ভবিষ্যতের জন্য দায়িত্বজ্ঞান সঞ্চিত হয়। ক্রমশঃ তাহারা বড় বড় কাজ করিবার শক্তি অর্জ্জন করিতে পারে।

যত লোকের মধ্যে এই কর্ত্তৃত্ববোধ জাগান যায় ততই সমাজের মঙ্গল। সকল মানুষকেই বুঝান উচিত “তুমি মানুষ। তোমার নিজের মাথা খাটাইয়া কাজ করিবার ক্ষমতা আছে, তোমার স্বাধীনভাবে চিন্তা করিবার শক্তি আছে। তুমি পরের সাহায্য না লইয়া কাজ ও চিন্তা করিতে থাক। তুমি কর্ত্তারূপে নানা অনুষ্ঠানের সৃষ্টি করিতে লাগিয়া যাও। তুমি কি সর্ব্বদা অপর লোকের কেরাণীমাত্র থাকিবে? তুমি কি পরকীয় চিন্তার অনুবাদক মাত্ররূপে জীবন কাটাইবে? না। তুমিও লোকজন খাটাইতে শিখ, তুমিও দশজনকে কাজে নামাইতে চেষ্টা কর। তুমি মানুষ, তুমি কর্ম্মকর্ত্তা হইবার আকাঙ্ক্ষা কর, ভিন্ন ভিন্ন কর্ম্মকেন্দ্র গড়িয়া তুলিবার জন্য উদ্যোগী হও।”

আমার বিশ্বাস, কুলী ও মজুর মহলে যদি এইরূপে কর্ত্তৃত্ববোধ এবং দায়িত্বজ্ঞান জাগান যায় তাহা হইলে সমাজে বহু ধর্ম্মঘট, কুলীবিভ্রাট, অপব্যয়, উৎপীড়ন ইত্যাদি হইতে রক্ষা পাওয়া যায়। ধনবান্ মহাজনেরা এবং কলকারখানার মালিক মহাশয়েরা তাঁহাদের কর্ম্মচারী কেরাণী এবং শ্রমজীবীদিগকে এই কথা বলিতে অভ্যস্ত হইবেন না কি? একবার যদি তাঁহারা নিজেদের অহঙ্কার ত্যাগ করিয়া কুলী মজুর কেরাণী ও কর্ম্মচারীদিগের সঙ্গে মিশিতে পারেন তাহা হইলে সমস্ত কারবার ও কারখানার মধ্যে একটা নূতন প্রাণ সৃষ্টি হয়। মালিকেরা বেতনপ্রাপ্ত কর্ম্মীদিগের পরামর্শ গ্রহণ করিলে আপনা আপনিই ইহারা কারবারটিকে কৃতকার্য্য করিয়া তুলিতে চেষ্টিত হইবে। তাহারা ইহাকে আপনার নিজের বলিয়া জ্ঞান করিবে।

এই আত্মবোধ জাগাইবার উপায় আর কিছুই নয়। কেরাণী কুলী সকলেরই কর্ত্তৃত্ববোধ ও দায়িত্বজ্ঞান জন্মিলে এই কার্য্য সহজেই সিদ্ধ হইবে। এজন্য ইহাদের সঙ্গে মালিক মহাশয়দিগের সরল আলোচনা, কথাবার্ত্তা, পরামর্শ গ্রহণ এবং ভাবের আদান প্রদান আবশ্যক। অজস্র টাকা খরচ করিয়া যে ফললাভ না হয় সহৃদয়তার দ্বারা তাহা অপেক্ষা বেশী কাজ হয়, মুখের কথায় তাহা অপেক্ষা বেশী কাজ হয়, বিশ্বাস করিলে তাহা অপেক্ষা বেশী কাজ হয়। আমি যদি কখনও কাহাকে বিশ্বাস করি সে কখনই আমাকে বিপদে ফেলিতে পারিবে না। সে যদি বুঝে যে তাহার উপর নির্ভর করিয়া আমি কোন কাজে নামিয়াছি, সে যথাসাধ্য সেই কাজে লাগিয়া থাকিবে। বিশ্বাস সর্ব্বত্রই জয়লাভ করে—অবিশ্বাস ও সন্দিগ্ধ চিত্ততায় কখনও কাজ হয় না। বিশ্বাসের ক্ষমতা সকল সমাজেই দেখা যায়। নিগ্রোকে বিশ্বাস কর, তাহার দ্বারা অসাধ্য সাধন করিতে পারিবে। কুলী মজুরদিগের উপর যথার্থভাবে নির্ভর কর, তোমার কারবার কখনই বিফল হইবে না। এই বুঝিয়াই আমি আমার ছাত্রগণকে এত বিশ্বাস করিতাম—তাহাদের উপর সকল বিষয়ে নির্ভর করিতাম—তাহাদিগকেই বিদ্যালয়ের কর্ত্তা বিবেচনা করিতাম। তাহাদের কর্ত্তৃত্বে আমরা সুফলই পাইয়াছি।

পূর্ব্বেই বলিয়াছি, আমার ছাত্রেরা বিদ্যালয়ের বাড়ীঘর সবই প্রস্তুত করিয়াছে। এখন বলিতেছি যে তাহারা তাহাদের ব্যবহারোপযোগী টেবিল চেয়ার আলমারি ডেস্ক ইত্যাদিও প্রস্তুত করিয়া লইয়াছে। প্রথমে আমাদের ছাত্রাবাসে খাট ছিল না। একখানা করিয়া খাট ছাত্রেরা তৈয়ারী করিতে লাগিল। ততদিন তাহারা মাটিতেই শুইয়া থাকিত। এদিকে গদি বা তোষকও ছিল না। তাহাও নিজ হাতে তাহারাই করিয়া লইল। কতকগুলি সস্তা কাপড়ের বস্তা কিনিয়া আনা হইয়াছিল। তাহার মধ্যে সালপাতা ভরিয়া গদি তৈয়ার হইত। প্রথম প্রথম এগুলি বড় অপরিষ্কার ভাবে প্রস্তুত হইয়াছিল। গদির ভিতর হইতে গোঁজ বাহির হইয়া থাকিত। শুইতে গেলে এগুলি গায়ে লাগিত। ক্রমশঃ গদি তৈয়ারী ব্যবসায় আমরা বেশ দক্ষতালাভ করিয়াছি। আজকাল টাস্কেজী বিদ্যালয়ে গদি তোষক তৈয়ারীর কাজ খুব ভাল রকমই চলে। আমাদের গদির কারখানার সুনামও বেশ প্রচারিত হইয়াছে। ফলতঃ আমাদের একটা বড় আয়ের উপায় এই গদি খানা হইতে দেখিতে পাইতেছি।

এইরূপে ছাত্রাবাস, বোর্ডিং গৃহ, ভোজনালয়, রন্ধনশালা ইত্যাদি সকল ঘরের জন্য সকল প্রকার আস্‌বাবই আমাদের ছাত্রেরা নিজ হাতে প্রস্তুত করিয়া লইল—প্রথম অবস্থায় প্রায় সবই বিশ্রী ও কদাকার হইত। পরে কারিগরিতে উন্নতি হইয়াছে। এখন সব জিনিষেই উচ্চ অঙ্গের শিল্প জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়। সুতরাং বিদ্যালয়ের আবহাওয়ার মধ্যে সৌন্দর্য্য বেশ আছে। অধিকন্তু এই সকল কারবার হইতে ব্যবসায়ও চলিতেছে—তাহাতে বিদ্যালয় চালাইবার খরচ কিছু কিছু উঠিয়া থাকে।

আমি ছাত্রাবাসের প্রথম অবস্থায় ছাত্রদিগের স্বাস্থ্য সম্বন্ধে বিশেষ দৃষ্টি রাখিতাম। তাহাদিগকে প্রায়ই বলিতাম, “আমরা গরিব—থালাবাটি পর্য্যাপ্ত পরিমাণে নাই। আমাদের চেয়ার টেবিল, গদি খাট ইত্যাদি সবই বিশ্রী ও কোন রকমে চলনসই। লোকে এগুলি দেখিয়া দুঃখিত হইতে পারে—কিন্তু কেহই নিন্দা করিবে না। তাহারা জানে, পয়সা থাকিলেই আমরা বেশী দামে চক্‌চকে জিনিষ তৈয়ারী করিতে বা কিনিতে পারিতাম। কিন্তু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা ত পয়সার জিনিষ নয়। উহা আমাদের যার যার নিজের হাতে! ইহার জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী। আমরা যদি অপরিষ্কারভাবে গৃহস্থালী চালাই, বা চলিফিরি তাহার জন্য লোকেরা আমাদিগকে নিন্দা করিবে, তিরস্কার করিবে। এ-নিন্দা ও তিরস্কার এড়াইবার কোন উপায় থাকিবে না। আমাদের স্বভাবই ইহার জন্য দায়ী। অতএব লোকে যেন আমাদিগকে সর্ব্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দেখে।”

এই শরীর পালন ও স্বাস্থ্য বিধান সম্পর্কে আর একটা কথা বলিব। আমি দাঁত মাজার গুণ সম্বন্ধে ছাত্রদিগকে সর্ব্বদা উপদেশ দিয়া থাকি। আমি আমার গুরুদেব আর্মস্ট্রঙ্গের নিকট দাঁত মাজার উপকারিতা সম্বন্ধে বিশেষ শিক্ষা পাইয়াছি। তিনি বলিতেন ‘দাঁত মাজা একটা ধর্ম্মবিশেষ’। আমি টাস্কেজীর ছাত্রাবাসে এই ধর্ম্ম প্রচারে কোন ত্রুটি করিতাম না। তাহার পর দুইটা চাদরের মধ্যে কেমন করিয়া শুইতে হয় ছাত্রদিগকে তাহাও শিখাইতাম। আমার ছাত্রাবস্থায় এ বিষয়ে যে দুর্দ্দশা হইয়াছিল আমার বেশ মনে আছে। তাহা ছাড়া জামা পরিষ্কার রাখা, কোটে বোতাম লাগান ইত্যাদি বিষয়ও ছাত্রদিগকে শিখাইতে হইত। এইরূপে উৎসব আমোদ কষ্টস্বীকার শীত ভোগ, খাওয়া পরা চলা ফেরা লেন দেন ইত্যাদি জীবনের নিত্যকর্ম্ম পদ্ধতির ভিতর দিয়া ছাত্রেরা গড়িয়া উঠিতে লাগিল।

দ্বাদশ অল্যায়

আমার টাকা আসে কোথা হ’তে?

পোর্টার হল নির্ম্মিত হইবার পর ছাত্র ও ছাত্রী সংখ্যা খুব বাড়িতে লাগিল। এজন্য আমাদের চতুঃসীমার বাহিরে কতকগুলি কাঠের কুঠুরী ভাড়া নিতে বাধ্য হইয়াছিলাম। তাহাতেও কুলাইল না। অগত্যা আমরা আর একটা গৃহ নির্ম্মাণের জন্য উদ্‌গ্রীব হইলাম।

এই গৃহের আনুমানিক ব্যয় স্থির করা গেল। দেখিলাম ৩০,০০০৲ টাকার কমে কোন মতেই এ ঘর তৈয়ারী হইতে পারে না। সুতরাং এবার পোর্টার হল অপেক্ষা বৃহত্তর ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করিতে হইল।

প্রথমেই আমরা বাড়ীটার নাম ঠিক করিয়া লইলাম। সকলে মিলিয়া সাব্যস্থ করিলাম—‘আলাবামা-ভবন’ নাম দিলে ঐ প্রদেশের সকল অধিবাসীর সাহানুভূতি আকৃষ্ট করা যাইবে। সুতরাং আলাবামা-ভবনের জন্য আমরা উঠিয়া পড়িয়া লাগিলাম। ছাত্রেরা মাটী খুঁড়িয়া জমি পরিষ্কার করিতে লাগিল—দেওয়ালের জন্য ভিত্তির গর্ত্ত খুঁড়া হইতে থাকিল। অথচ আমাদের হাতে তখনও পয়সা নাই। শ্রীমতী ডেভিড্‌সন আবার টাস্কেজীর পাড়ায় পাড়ায় ভিক্ষার ঝুলি লইয়া বাহির হইলেন।

অর্থাভাবে আমি বড়ই চিন্তিত হইয়াছি এমন সময়ে আমার গুরুদেব মহাপ্রাণ আর্মষ্ট্রঙ্গের একখানা টেলিগ্রাম পাইলাম। তিনি লিখিয়াছেন “আমার সঙ্গে উত্তরপ্রান্তের ইয়াঙ্কিমহলে অর্থ সংগ্রহের জন্য বাহির হইতে পারিবে? একমাস লাগিবে। যদি পার শীঘ্রই হ্যাম্পটনে চলিয়া এস।” তৎক্ষণাৎ আমি হ্যাম্পটনে চলিয়া গেলাম। যাইয়াই দেখি আমাদের ভিক্ষা আদায়ের জন্য আর্মষ্ট্রঙ্গ সকল ব্যবস্থাই করিয়া রাখিয়াছেন। তিনি উত্তর প্রান্তের স্থানে স্থানে সংবাদ পাঠাইয়াছেন যে আমরা টাস্কেজী বিদ্যালয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহে সেই সকল স্থানে উপস্থিত হইব। হ্যাম্পটনের গায়কদলের দুই চারিজন আমাদের সঙ্গে শফরে বাহির হইল। এই অভিযানের সমস্ত খরচ হ্যাম্পটনের বিদ্যালয় হইতে বহন করা হইবে তাহাও বুঝিতে পারিলাম।

আর্মষ্ট্রঙ্গের দুইটি উদ্দেশ্য ছিল। তিনি এই উপায়ে আমাকে ইয়াঙ্কিমহলে সুপরিচিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত করিতে পারিবেন ভাবিয়াছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে আলাবামা ভবনের জন্যও টাকা উঠাইবেন স্থির করিয়াছিলেন। আর্মষ্ট্রঙ্গের উদারতা ও ত্যাগশীলতা আমাদের জন্য আরও কতবার দেখিয়াছি।

উত্তর প্রান্তে বক্তৃতা করিবার সময়ে আমষ্ট্রঙ্গের একটা উপদেশ আমি সর্ব্বদা মনে রাখিতাম। তিনি বলিতেন “ফাঁকা কথা কখনও বলিবে না। প্রত্যেক শব্দেই যেন একটা নূতন বস্তু, নূতন ভাব মনের মধ্যে আসে। শ্রোতারা যেন বুঝে যে কতকগুলি কাজের কথা বলিতেছ।” বক্তৃতা করিবার নিয়ম ইহা অপেক্ষা আর কি ভাল হইতে পারে?

নিউ-ইয়র্ক, ব্রুকলিন, বোষ্টন, ফিলাডেল্‌ফিয়া এবং অন্যান্য বড় সহরে টাস্কেজীর জন্য সভা হইল। সভায় অনেক লোক আসিত। আমরা দুই জনেই বক্তৃতা করিতাম। টাস্কেজী বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ও কার্য্যপ্রণালী বিবৃত হইত। সঙ্গে সঙ্গে আলাবামাভবনের জন্যও ভিক্ষা করা হইত। লোকেরা সন্তুষ্টই হইত বুঝিতাম। একমাস এইরূপ সভা করিয়া মন্দ টাকা উঠে নাই। আমাদের প্রচার কার্য্যও খুব ভাল হইয়াছিল।

পরে আমি অনেকবার একাকী ভিক্ষার ঝুলি লইয়া উত্তর অঞ্চলে বাহির হইয়াছি। বলিতে কি, গত ১৫ বৎসরের ভিতর অধিকাংশ কালই আমি টাস্কেজীর বাহিরে বাহিরে কাটাইয়াছি। বিদ্যালয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ-সম্বন্ধ বেশী রাখিতে পারি নাই। আমাদের নূতন নূতন বিভাগের উন্নতি করিবার জন্য অর্থাভাবে যুক্ত-রাজ্যের প্রদেশে প্রদেশে ঘুরিয়া বেড়াইতে হইয়াছে। এই বার আমরা অর্থসংগ্রহের অভিজ্ঞতা পাঠকগণকে কিছু বলিব।

পরোপকারী এবং লোক-হিত-ব্রতধারী ব্যক্তি মাত্রেরই অর্থ সংগ্রহে বাহির হইতে হয়। বিদ্যাদানের জন্য, অথবা দরিদ্রের অভাব নিবারণের জন্য—যে জন্যই হউক, ভিক্ষা না করিলে বড় কাজ কখনই সমাধা হয় না। এরূপ বহু “ভিক্ষুকে”র সঙ্গে কার্য্যক্ষেত্রে আমার দেখা হইয়াছে। তাঁহারা অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করিয়া থাকেন, “মহাশয়, আপনি এত টাকা পান কোথা হইতে? লোকেরা আপনার কথায় কাণ দেয় কেন? তাহাদিগকে বুঝাইবার জন্য আপনি কিরূপ চেষ্টা করিয়া থাকেন? আপনার অর্থসংগ্রহ কার্য্যের কোন নিয়ম বা প্রণালী আছে কি? আমাদিগকে পরামর্শ দিলে বড়ই উপকৃত ও বাধিত হইব। কারণ আমরাও দুই একটা কাজের ভার লইয়া বিব্রত হইয়া পড়িয়াছি। লোকের সহানুভূতি কোন মতেই আকৃষ্ট করিতে পারিতেছি না। আপনার সঙ্গে দৈবক্রমে দেখা হইল ভালই হইয়াছে। আপনার প্রদর্শিত পথে চলিতে পারিলে আমাদের অর্থ-দৈন্য বোধ হয় ঘুচিতে পারিবে।”

পরোপকার ও মানবসেবার উদ্দেশ্যে ভিক্ষা বৃত্তির জন্য কোন নিয়ম আছে কি না বলিতে পরি না। আমি সংসারে ঘুরিয়া “ভিক্ষা বিজ্ঞানের” দুইটি সূত্র মাত্র আবিষ্কার করিয়াছি। প্রথমতঃ তুমি যে কাজটা করিতেছ তাহা জগতে প্রচার করা আবশ্যক। এই প্রচার কার্য্যে তন্ময় হইয়া যাওয়া প্রয়োজন। নিজের সমগ্র চিন্তা এই প্রচারে প্রয়াগ করা কর্ত্তব্য। অধিকন্তু কেবল মাত্র কয়েকজন ব্যক্তি বিশেষের নিকট কার্য্যের পরিচয় দিলে চলিবে না। সাধারণ জনগণও যেনন তোমার আরব্ধ অনুষ্ঠান সম্বন্ধে জানিতে ও শুনিতে পায়। এজন্য দেশের মধ্যে যতগুলি কর্ম্মকেন্দ্র, সভা সমিতি, পরিষৎ, প্রতিষ্ঠান বা সঙ্ঘ বর্ত্তমান আছে সকলগুলির ভিতরই তোমার কর্ম্মের আন্দোলন পৌঁছাইবার চেষ্টা করা উচিত।

দ্বিতীয়তঃ, প্রচারের ফল কি হইতেছে তাহার জন্য উদ্বিগ্ন হইও না। ধর্ম্মভাবে প্রচারকার্য্যে লাগিয়া যাও। টাকা না পাইলেও দুঃখিত হইবার প্রয়োজন নাই। উদ্বেগে শরীর অবসন্ন হয়, চিত্তবিক্ষিপ্ত হয়—কার্য্য করিবার ক্ষমতা কমিয়া আসে।

ভিক্ষাবিজ্ঞানের এই দ্বিতীয় সূত্র কার্য্যে পরিণত করা বড়ই কঠিন। অনেক সময়ে ধার করিয়া কাজ আরম্ভ করিয়াছি। পাওনাদারের বিল উপস্থিত—টাকা দিবার ক্ষমতা নাই। সেই সময়ে রাত্রে বিছানায় পড়িয়া এপাশ ওপাশ না করিয়া থাকা অসম্ভব। আমি অনেক স্থলেই আমার চিত্তের শান্তিরক্ষা করিতে পারি নাই—বহুরাত্রি না ঘুমাইয়া কাটাইয়াছি। রাস্তায় বা বারান্দায় পাগলের মত ছুটাছুটি করিতে হইয়াছে। অবশ্য এত দুরবস্থার মধ্যেও আমার ধীরতা এবং গাম্ভীর্য্য অনেকটাই ছিল। তাহা না হইলে এতদিন সহ্য করিয়া এককাজে লাগিয়া থাকিতে পারিতাম কি?

সংসার দেখিয়া আমার জ্ঞান জন্মিয়াছে যে, জগতের যত বড় বড় কাজ সবই এইরূপ স্থিরচিত্ত সহিষ্ণুতাসম্পন্ন গাম্ভীর্য্যবিশিষ্ট কর্ম্মবীরগণের দ্বারা সম্পন্ন হইয়াছে। তাঁহাদের মাথার বোঝা বড় কম থাকে না। অসাধ্যসাধনেই তাঁহারা ব্রতী হইয়াছেন—নিতান্ত ‘না’কেও তাঁহাদের ‘হাঁ’তে পরিণত করিতে হইয়াছে। নৈরাশ্য বিফলতা এবং দৈন্যদারিদ্র্যের মধ্যে থাকিয়াই তাঁহাদিগকে বহু ব্যয়সাপেক্ষ বিশালকর্ম্মে হস্তক্ষেপ করিতে হইয়াছে। তথাপি তাঁহারা শান্ত গম্ভীর, এবং লোকপ্রিয় ও সৌজন্যবান্ রহিয়াছেন। এই চরিত্রবলেই জগৎকে পদানত করা যায়—বিশ্বশক্তিকে স্ববশে আনা যায়।

যখনই কোন মহৎকর্ম্ম আরম্ভ কর, তখনই উহাতে তন্ময় হইয়া যাইবে—সেই কর্ম্মের মধ্যে নিজকে ডুবাইয়া ফেলিবে। নিজকে এই উপায়ে ভুলিতে না পারিলে অর্থাৎ কার্য্যকে তোমার কৃতিত্ব অপেক্ষা বেশী ভাল না বাসিলে তুমি সুখ পাইবে না— চিত্তের উদ্বেগও কমিবে না। তোমার জীবনের লক্ষ্যকে আন্তরিকভাবে ভালবাস, নিজের অহঙ্কার ভুলিয়া যাও, দেখিবে কর্ম্মের সুফলাভাবেও তুমি দুঃখিত না হইয়া থাকিতে পারিতেছ। কিন্তু যদি নিজকে সম্পূর্ণরূপে ভুলিতে না পার, তাহা হইলে তোমার কর্ম্মের বিফলতায় তুমি পাগল হইয়া পড়িবে।

অতএব নিজকে ভুলিতে শিখ—নিজের অহঙ্কার বিসর্জ্জন দাও। যে ব্রত গ্রহণ করিয়াছ তাহাকে ধ্যান করিতে করিতে নিজের অস্তিত্ব বিস্মৃত হইয়া যাও। তবেই দেখিবে, অল্পমাত্র ফললাভেও চিত্তে শান্তি থাকিবে। চোখের সম্মুখে তোমার আরব্ধ কর্ম্ম নষ্ট হইয়া গেলেও তুমি আনন্দে থাকিতে পারিবে, এবং প্রয়োজন হইলে নূতন উৎসাহে নব নব কর্ম্ম আরম্ভ করিতে পারিবে।

আমি টাস্কেজীর জন্য ভিক্ষায় বাহির হইয়া দেখিয়াছি অনেক লোকে ধনী লোকদিগকে তিরস্কার করেন। তাঁহারা বলেন “কি বলিব মহাশয়, এই বড় লোকগুলা যদি মানুষ হইত তাহা হইলে আমাদের একটা দুইটা অনুষ্ঠান কেন, একসঙ্গে ৫০টা কর্ম্মই অনায়াসে চলিতে পারিত। ইহাঁরা বিলাসসাগরে সাঁতার কাটিতেছেন—নিজ সুখভোগে অর্থের অপব্যয় করিতেছেন—অথচ দশের কাজে এক পয়সাও দিতে নারাজ।” ইহাঁরা সকলেই মহাদুঃখে এরূপ কথা বলিয়া থাকেন। ইহাঁদের উদ্দেশ্য ভালই—কারণ ইহাঁরা লোকহিতব্রতে বাহির হইয়াছেন। কিন্তু আমার বিশ্বাস, ইহাঁদের বিষয়টা একটুকু গভীরভাবে না বুঝিবার দোষ আছে।

আমি এইরূপ পরোপকার ব্রতধারী লোকসেবক ভিক্ষুকগণকে বলিয়া থাকি, “মহাশয়, মনে করুন, দেশে একজনও ধনী লোক নাই। মনে করুন বড়লোকদিগের টাকাকড়ি সবই সংসারের সকল লোকের মধ্যে বিভক্ত করিয়া দেওয়া হইল। ভাবিয়া দেখুন ত, তখন দেশের অবস্থা কি হইবে? এই যে এত বড় বড় কারবার, কারখানা, ফ্যাক্টরী, জাহাজ কোম্পানী, চাষ বাস ইত্যাদি কত কি দেখিতেছেন—এই সমুদয়ের একটাও থাকিবে কি? এইগুলি না থাকিলে এত কুলীমজুর কেরাণী কর্ম্মচারীর অন্নসংস্থান হইবে কি? দেশময় দারিদ্র্য দুঃখ ছড়াইয়া পড়িবে যে! দেশের কৃষি শিল্প, বাণিজ্য সবই লুপ্ত হইয়া যাইবে যে! সমাজের লক্ষ্মীশ্রী কোথায়ও থাকিবে না। বড় লোকেরা কি সত্য সত্যই সমাজের পাপ ও কলঙ্কস্বরূপ?”

ধনীলোক সম্বন্ধে আমার আরও অনেক বক্তব্য আছে। আমি আমার ‘ভিক্ষুক’ বন্ধুগণকে বলিয়া থাকি, “কত শত লোক ধনী মহাত্মাদের দ্বারা প্রতিপালিত হয় আপনারা তাহার খবর রাখেন? প্রত্যেক ধনী ব্যক্তিরই গুপ্তদান অসংখ্য আছে। সকল দানের খবরই সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় না। আপনি হয়ত একজনের নিকট কিছু পাইলেন না। কিন্তু তাহা বলিয়াই তাঁহাকে আপনি নির্দ্দয়, বিলাসী বা স্বার্থপর বিবেচনা করেন কেন? আপনার অজ্ঞাতসারে তিনি হয়ত কত দরিদ্রের অন্ন বস্ত্র সংস্থান করিতেছেন!”

আমি সত্য কথা বলিতে পারি, আমেরিকার ধনী ব্যক্তিগণকে প্রতিদিন অন্ততঃ ২০।২২ জন নূতন নূতন লোকের সাহায্য করিতে হয়। আমি বড় বড় সহরের নামজাদা লোকদের বাড়ীতে সাহায্য প্রার্থী হইয়া দেখিয়াছি—আমার মত আরও ১২ জন লোক তাঁহাদের নিজ নিজ প্রস্তাব লইয়া হাজির হইয়াছেন। এই ত গেল সাক্ষাতে ভিক্ষার কথা। তাহা ছাড়া চিঠিপত্রের দ্বারা কত দূর দূর স্থান হইতে লোকেরা বড় লোকের নাম শুনিয়া ভিক্ষাপ্রার্থী হয় তাহার সন্ধান কে রাখে?

তার পর সৎকর্ম্মের নীরব বন্ধু আমেরিকায় কত আছেন তাহার সংখ্যা করা অসম্ভব। তাঁহাদের নাম জগতে কেহই জানিতে পায় না। অথচ লক্ষ লক্ষ টাকা দান করিয়া তাঁহারা দরিদ্রের সুখবিধান করিতেছেন। আমি ১০।১২ ব্যক্তির সন্ধান পাইয়াছি—তাঁহারা লোকসমাজে বড়ই অর্থপিশাচ, লোভী, হৃদয়হীন বলিয়া খ্যাত। অথচ প্রতি বৎসর লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকিয়া তাঁহারা অজস্র টাকার সদ্ব্যয় করিতেছেন। নিউ ইয়র্কেই এইরূপ পরদুঃখে দুঃখী অথচ নীরব দাতা দুই জনকে আমি জানি। ইহাঁরা ইয়াঙ্কি রমণী। তাঁহারা গত ৮ বৎসর ধরিয়া আমাকে টাস্কেজী বিদ্যালয়ের গৃহ-নির্ম্মাণ-তহবিলে এবং অন্যান্য কাজে অর্থসাহায্য করিয়া আসিতেছেন। এতদ্ব্যতীত তাঁহাদের অন্যান্য দানও আছে।

আজ আমি একটা কথা খোলাখুলি বলিব। অনেক কোটি টাকা আমার হাত দিয়া টাস্কেজীর জন্য জলের মত খরচ হইয়াছে—একথা কাহারও অজানা নাই। কিন্তু আমি বলিতে চাহি ইহা আমার “ভিক্ষা”লব্ধ টাকা নহে! আমি কখনও ‘ভিক্ষা’ করি নাই—আমি ‘ভিক্ষুক’ নহি! আমার অর্থসংগ্রহ কার্য্যকে আমি কোন মতেই ‘ভিক্ষা,’ ‘ভিক্ষুকবৃত্তি’ ইত্যাদি নামে অভিহিত করিতে পারিব না।

আমি জানি, ‘ভিক্ষা’ করিলে টাকা পাওয়া যায় না। দিনরাত্রি বড় লোকের দরবারে বসিয়া অর্থ সাহায্যের কথা পাড়িলে অর্থ সংগ্রহ হয় না। যাঁহারা ঐরূপ করিয়া থাকেন তাঁহারা আত্মসম্মান-বোধহীন—সত্য সত্যই ভিক্ষুক। কিন্তু আমার আত্মসম্মানবোধ সর্ব্বদাই থাকে—আমি নিজকে কখনও কাহার নিকট ছোট করি না। আমি বুঝি, মানুষ মাত্রেরই কর্ত্তব্য জ্ঞান আছে, মানুষ মাত্রেরই সেবা-প্রবৃত্তি আছে, মানুষ মাত্রেই লোকের উপকার করিতে পারিলে সুখী হয়। সুতরাং কোন স্থানে একটা ভাল কাজ হইতেছে, একথা জানিতে পারিলেই সকলে সেদিকে দৃষ্টি দেয়। যাহার যে ক্ষমতা সে সেই উপায়ে তাহার সাহায্য করে। ধনী ধন দান করিতে উৎসাহী হন। বিদ্বান্ তাহার জন্য লোক-সমাজে সহানুভূতি সৃষ্টি করিয়া আত্ম প্রসাদ লাভ করেন। যাহাদের শারীরিক শক্তিই একমাত্র সম্বল তাহারা সেই কর্ম্মের জন্য হাতে পায়ে খাটিয়া আনন্দিত হয়। আমি আরও বুঝি যে, দাতা সংসারে অনেকেই আছেন, কিন্তু দান গ্রহণ করিবার উপযুক্ত লোকই খুব অল্প। টাকা পাওয়া খুব সহজ—কিন্তু টাকা পাইয়া তাহার সদ্ব্যবহার করাই বড় কঠিন। হায়, যাঁহারা বড় লোকের নিকট টাকা আদায় করিতে যান তাঁহারা যদি এই কথাগুলি মনে রাখিতেন তাহা হইলে তাঁহারাও হতাশ হইতেন না, এবং বড়লোকদিগকেও তিরস্কার করিতেন না।

আমি অর্থসংগ্রহের দায়িত্ব মর্ম্মে মর্ম্মে বুঝিয়াছি। টাকার কথা লোকজনকে বেশী বলি না—কার্য্যের কথাই বেশী বলি। কোন কার্য্যের সুফল কুফল, এদিক ওদিক, কর্ম্ম প্রণালী, সমাজের অন্যান্য কার্য্য ও চিন্তার সঙ্গে আমার আরব্ধ কর্ম্ম ও চিন্তার সম্বন্ধ, আমার জীবনের লক্ষ্য, ইত্যাদি বিষয়েই আমি লোকজনের সঙ্গে আলোচনা করি। এই উপায়ে ধনী নির্দ্ধন সকল সমাজেই আমি প্রচারকের কার্য্য করিয়া থাকি। এইরূপ নানাবিধ কথাপ্রসঙ্গে আমাদের মধ্যে হৃদ্যতা ও বন্ধুত্বের সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠিত হয়। আমি ভিক্ষা করিতে বড়ই নারাজ। আমি কোন দিনই ভিক্ষা করি নাই। আমি ভিক্ষুক নহি। আমি কর্ম্মের উপাসক—আমি কর্ম্মের প্রচারক আমি সর্ব্বত্র সদ্ভাবের বিস্তারই করিয়াছি—আমি সকল মহলেই শিক্ষা-প্রচারক রূপে পরিচিত। আমার অর্থসংগ্রহ এই লোক-শিক্ষা-বিস্তারের আনুষঙ্গিক ফল মাত্র।

অর্থসংগ্রহকার্য্যে ব্যাপৃত থাকিলে পরোক্ষ ভাবে একটা মস্ত লাভ হয়। সাংসারিক জ্ঞান খুব বাড়িয়া যায়—লোকচরিত্র বুঝিতে পারা যায়। অনেক লোকের সংশ্রবে আসিতে হয়—নানা কথা বুঝা যায়—নানা বিষয়ে অভিজ্ঞতা জন্মে। তাহা ছাড়া জগতের অনেক গুপ্ত মহাপুরুষ এবং চরিত্রবান্ নরনারীর সাক্ষাৎ লাভ হয়। যাঁহাদের নাম খবরের কাগজে উঠে না অথচ যাঁহারা পরহিত করিতে পারিলেই সুখী হন এরূপ অনেক মহাত্মার পরিচয় পাওয়া যায়। এই সকল লোকের সঙ্গে দুদণ্ড কথা বলিতে পারাও মহা সৌভাগ্যের বিষয়। আমি এরূপ দাতা ব্যক্তির সংশ্রবে আসিয়া বহুবার জীবন ধন্য করিয়াছি। আমি বোষ্টন-নগরের দুই একটি ঘটনা উল্লেখ করিতেছি। এক বাড়ীতে গৃহস্বামী বাহিরে গিয়াছিলেন। তাঁহার পত্নীর নিকট আমার সংবাদ পাঠান হইল। ইতিমধ্যে স্বামী আসিয়া উপস্থিত। আমাকে দেখিয়াই বিরক্ত ভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন “কি চাই?” আমি আমার উদ্দেশ্য বুঝাইতে গেলাম। তিনি আরও ক্ষেপিয়া উঠিলেন। আমি আস্তে আস্তে সরিয়া পড়িলাম। এই বাড়ীর নিকটেই আর একজন ভদ্রলোকের কাছে গেলাম। আমার কথা শুনিবামাত্রই তিনি বেশ মোটা টাকার জন্য একটা চেক্‌ সহি করিয়া দিলেন। আমি তাঁহাকে ধন্যবাদদিবারও অবসর পাইলাম না। তিনি বলিতে লাগিলেন “আপনি আমাদেরই কার্য্য করিতেছেন। মহাশয়, আপনাকে সাহায্য করিবার সুযোগ পাইয়া আমি কৃতার্থ হইলাম।”

আমি বলিতে পারি যে, সংসার হইতে প্রথম শ্রেণীর লোক কমিয়া আসিতেছে, দ্বিতীয় শ্রেণীর লোক সংখ্যাই বাড়িতেছে। ধনী লোকেরা পরহিতব্রতধারী ব্যক্তিগণকে আর ‘ভিক্ষুক’ বা উৎপাত স্বরূপ মনে করেন না। তাঁহারা আমাদের মত লোককে সৎকর্ম্মের যন্ত্র ও উপলক্ষ্য স্বরূপ শ্রদ্ধা করেন। তাঁহাদেরই কর্ত্তব্য কর্ম্মের কিয়দংশ আমরা করিতেছি—এইরূপই আজকাল কার ধনী মহাত্মাগণের ধারণা জন্মিতেছে।

বোষ্টন-নগরে যাঁহারই বাড়ীতে আমি প্রার্থী হইয়াছি তিনিই আমাকে বলিয়াছেন, “আপনার এই মহৎকর্ম্মের জন্য আমার নিকটেও আসিয়াছেন, এইজন্য আমি আপনাকে বিশেষ ধন্যবাদ দিতেছি। আপনার অনুগ্রহে আমিও একটা সৎকার্য্যে আমার ক্ষুদ্রশক্তি প্রয়োগের সুযোগ পাইলাম। এ অঞ্চলে ভবিষ্যতে আসিলে যেন আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়।” ধনী ব্যক্তিরা ধনদানের উপযুক্ত সুযোগ খুঁজিয়া থাকেন—এই বিশ্বাসই আমার দিন দিন বাড়িতেছে।

প্রথম প্রথম অর্থসংগ্রহে বাহির হইয়া বড় কষ্টেই পড়িতাম। মনে আছে তখন উত্তর অঞ্চলের সহরে সহরে পল্লীতে পল্লীতে দিনরাত খাটিয়াও একটাকা মাত্র পাইতাম না। অনেক লোকের নিকট বড় আশা করিয়া যাইতাম কিন্তু তাঁহারা এক পয়সাও না দিয়া বিদায় করিতেন। এইরূপে নিষ্ফল ভাবে সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাটিত। হঠাৎ দেখিতাম, যাহার নিকট কখনও কিছুমাত্র আশা করিতে পারি নাই সেই ব্যক্তিই সাহায্য দান করিয়া ভগ্নহৃদয়ে আশার আলোক বিকিরণ করিতেন।

একদিন নানা লোকের পরামর্শে কনেষ্টিকাট প্রদেশের এক পল্লীতে ধনী ব্যক্তির শরণাপন্ন হইলাম। সহর হইতে প্রায় দুই মাইল দূরে তাঁহার গৃহ। সেইখানে শীতে ঝড়ে হাঁটিয়া গিয়া দেখা করিলাম। তিনি কত কথাই পাড়িলেন—অনেক গল্প হইল। কিন্তু একটি পয়সাও দিলেন না। আমি বুঝিলাম ইহাঁর নিকট প্রচার করাও কর্ত্তব্য ছিল। তাহাই করিয়াছি। নাই বা পাইলাম কিছু সাহায্য।

কিন্তু দুই বৎসর পর এই ব্যক্তি আমার নিকট টাস্কেজীর ঠিকানায় পত্র লিখিলেন; “মহাশয়, এই পত্রের সঙ্গে নিউ ইয়র্ক ব্যাঙ্কের উপর আপনার নামে একখানা চেক্‌ সহি করিয়া দিলাম। চেকের মূল্য ৩০,০০০৲। আমি এই টাকা আপনার বিদ্যালয়ের জন্য উইল করিয়া রাখিয়াছিলাম। শেষে ভাবিয়াছি বাঁচিয়া থাকিতে থাকিতেই ইহা দিয়া যাওয়া ভাল। আপনি দুই বৎসর পূর্ব্বে আমার বাড়ীতে অনুগ্রহ পূর্ব্বক পদার্পণ করিয়াছিলেন সে কথা আপনার মনে থাকিতে পারে। সেদিনকার কথোপকথন আমি বেশ মনে রাখিয়াছি।”

এই ৩০,০০০৲ টাকা আমার নিকট এক অতি দুঃসময়ে পৌঁছিয়াছিল। ইহা না পাইলে আমাদের যথেষ্ট ক্ষতিই হইত। পাইয়া আমাদের ঘাড়ের বোঝা অনেকটা হালকা হইয়াছিল।

শ্রীযুক্ত কলিস্ হাণ্টিংডনকে রেল-বিভাগের কে না চিনে? তিনি আজ সমগ্র আমেরিকায় সুপ্রসিদ্ধ। তিনি আমাকে প্রথম সাহায্য করেন মাত্র ৬৲ দিয়া। মৃত্যুকালে আমাদিগকে ১৫০,০০০৲ দিয়া গিয়াছেন। এই দুই দানের মধ্যে আমরা ইহাঁর নিকট ক্ষুদ্র বৃহৎ আরও অনেক সাহায্য পাইয়াছি।

অনেকে বলিয়। থাকেন “টাস্কেজীর বরাত ভাল—তাই ১৫০,০০০৲ পাইয়াছে।” আমি তাঁহাদিগকে বলি “তাহা নহে—কপালের গুণে টাকা একবার আসিতে পারে, দুইবার আসিতে পারে। কিন্তু বার বার আসে না। স্থিরভাবে নিয়মিতরূপ কর্ম্ম করিয়া উন্নতি না দেখাইতে পারিলে সংসারের লোক মজে না।” হাণ্টিংডনের কথা বলিলেই বুঝা যাইবে। তিনি প্রথমে ৬৲ দিয়াই মনে করিয়াছিলেন—“টাস্কেজীওয়ালারা আর বেশী পাইবার যোগ্য নয়।” আমি তাঁহার নিকট এত কম কোন মতেই আশা করি নাই। যাহা হউক আমি তখনই স্থির করিলাম যে, আমাদের কার্য্যফলে ইহাঁকে খুসী করিবই, এবং তখন তিনি উদারতার সহিতই দান করিতে বাধ্য হইবেন। সত্যই তাহা ঘটিয়াছিল। তিনি ক্রমশঃ দেখিতে লাগিলেন যে, টাস্কেজীর কাজ কর্ম্মে উন্নতি হইতেছে, ইহার মধ্যে নিত্য নূতন ব্যবস্থা করা হইতেছে—ইহারা কোন এক জায়গায় বসিয়া নাই। ঠিক সেই রূপই তিনি তাঁহার দানের মাত্রা বাড়াইয়াছিলেন। এই অনুপাতে ৬৲ হইতে শেষ পর্য্যন্ত এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্য্যন্ত পাইয়াছি।

একবার সাহস করিয়া বোষ্টন-নগরের ট্রিনিটি-ধর্ম্মমন্দিরের প্রচারক রেভারেণ্ড উইন্‌চেষ্টার ডোনাল্ড মহোদয়কে টাস্কেজীতে নিমন্ত্রণ করিয়াছিলাম। তাঁহার নিকট ধর্ম্মোপদেশ পাইবার ইচ্ছায় এইরূপ করা হইয়াছিল। তাঁহার সঙ্গে লোক জন অনেক আসিবে বুঝিতে পারিয়াছিলাম। তাহা ছাড়া বিদ্যালয়ের মধ্যেই মহাসমারোহ পড়িয়া গেল। কাজেই আমাদের ক্ষুদ্র ধর্ম্মমন্দিরে বক্তৃতার স্থানাভাব বিবেচনা করিয়া সামিয়ানা খাটাইয়া একটা ঘর তৈয়ারী করা হইল। লতাপাতা ফুলপত্রে গৃহ সুসজ্জিত করাও হইল। বক্তৃতা আরম্ভ হইবার পরক্ষণ হইতেই মহা বৃষ্টি পড়িতে লাগিল। ডোনাল্ড মহোদয় ভিজিতে লাগিলেন। আমাদের একজন আসিয়া তাঁহার মাথায় ছাতা ধরিল। অনেকক্ষণ পর বৃষ্টি থামিলে আবার বক্তৃতা হইল। শেষে সভা হইয়া গেলে পোষাক পরিবর্ত্তন করিতে করিতে ডোনাল্ড মহোদয় বলিলেন—“ওয়াশিংটন মহাশয় টাস্কেজীর যে বিরাট ব্যাপার দেখিতেছি, এখানে একটা বড় ধর্ম্মমন্দির থাকা আবশ্যক।”

একথা অবশ্য প্রচারিত হইবার সময় ছিল না। মহা বিস্ময়ের কথা—পরদিন সকালেই ইটালী হইতে একখানা পত্র পাইলাম। দুই জন রমণী লিখিয়াছেন তাঁহারা আমাদের ধর্ম্মমন্দিরের জন্য সকল অর্থব্যয়ের ভার বহন করিবেন।

সম্প্রতি য়্যাণ্ড্রু কার্ণেজি মহোদয়ের নিকট আমি ৬০,০০০৲ টাকা পাইয়াছি। এই টাকার দ্বারা গ্রন্থশালা নির্ম্মাণ করিতে হইবে—তাঁহার এইরূপ ইচ্ছা। এতদিন আমাদের গ্রন্থশালা ছিল না বলিলেই চলে। সেই পোড়োবাড়ীর এক কোণে কতক গুলি আলমারী ছিল। তাহাকেই গ্রন্থশালা বলিতাম। ইহার আয়তন অতি ক্ষুদ্র—১২ ফিট লম্বা এবং পাঁচ ফিট চৌড়া। আজি কার্ণেজির কৃপায় আমাদের এক প্রকাণ্ড গ্রন্থশালা নির্ম্মিত হইতে চলিয়াছে। কিন্তু কার্নেজি মহোদয়ের অনুগ্রহ পাইলাম কি করিয়া? একদিনে তিনি আমাদের প্রতি কৃপা করেন নাই। তাঁহার অনুগ্রহ লাভ করিবার জন্য আমাকে দশ বৎসর অপেক্ষা করিতে হইয়াছে। ১৮৯০ সালে আমি তাঁহার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ করি। তখন তিনি আমার কার্য্যে কিছুই সহানুভূতি দেখাইলেন না। দশ বৎসর কঠোর পরিশ্রমের পর আমি তাঁহার নিকট নিম্নলিখিত পত্র লিখি:—

“টাস্কেজী আলাবামা,” ১৫ই ডিসেম্বর, ১৯০০।

সবিনয় নিবেদন,

কয়েকদিন পূর্ব্বে আপনার ভবনে আমার সঙ্গে আপনার যে কথাবার্ত্তা হয়, তদনুসারে আপনার নিকট এই পত্র পাঠাইতেছি। আপনি আমাদের গ্রন্থশালার আবশ্যকতা বুঝিতে চাহিয়াছিলেন। এজন্য জানাইতেছি যে,—

১। আমাদের বিদ্যালয়ে সম্প্রতি ১১০০ ছাত্র এবং ৮৬ জন শিক্ষক ও কর্ম্মচারী এই গ্রন্থশালা ব্যবহার করিবেন। অধিকন্তু শিক্ষক ও কর্ম্মচারিগণের পরিবারস্থ লোকজন এবং আমাদের বিদ্যালয়ের সমীপস্থ প্রায় ২০০ নিগ্রো পুরুষ ও রমণী এই গ্রন্থশালা হইতে উপকার লাভ করিতে পারিবেন।

২। আমাদের এক্ষণে ১২,০০০ গ্রন্থ, সংবাদপত্র ইত্যাদি রহিয়াছে। এগুলি বন্ধুগণের দানে সংগৃহীত। স্থানাভাবে ইহাদিগকে রক্ষা করা যাইতেছে না। পাঠাগার না থাকায়ও গ্রন্থ-ব্যবহারের অসুবিধা ঘটিতেছে।

৩। আমাদের বিদ্যালয় হইতে গ্রাজুয়েট হইয়া অনেক ছাত্র বাহির হইয়াছেন। ইহাঁরা দক্ষিণ অঞ্চলের প্রত্যেক প্রদেশেই কর্ম্ম করিয়া থাকেন। গ্রন্থশালা প্রতিষ্ঠিত হইলে ইহাঁদের সাহায্যে সমগ্র নিগ্রোসমাজে সৎসাহিত্য প্রচারিত হইতে পারিবে।

৪। আমাদের প্রয়োজনীয় গৃহ-নির্ম্মাণ করিতে ৬০,০০০৲ টাকা লাগিবে। ইট গড়া, মিস্ত্রির কাজ, সূত্রধর ও কর্ম্মকারের কার্য্য ইত্যাদি গৃহ-নির্ম্মাণ বিষয়ক সকল ব্যাপারই আমাদের ছাত্রগণ স্বহস্তে নিষ্পন্ন করিবে।

৫। সুতরাং আপনার দানে এক সঙ্গে তিন কার্য্য হইবে। প্রথমতঃ গ্রন্থশালা ত নির্ম্মিত হইবেই। দ্বিতীয়তঃ, ছাত্রেরা গৃহ নির্ম্মাণের সুযোগ পাইয়া কতকগুলি নূতন শিল্প শিখিয়া ফেলিবে। অধিকন্তু, এই কার্য্যে যোগদান করিয়া তাহারা যে পারিশ্রমিক পাইবে তাহার দ্বারা তাহাদের বিদ্যাশিক্ষার ব্যয় সংগ্রহ হইবে। এক দানে এত সুফল ফলিবার সুযোগ সাধারণতঃ উপস্থিত হয় না।

অন্যান্য সংবাদ আবশ্যক হইলে পরে দিতে পারি।

ইতি নিবেদক— বুকার টি ওয়াশিংটন , পরিচালক, টাস্কেজী শিল্প-বিদ্যালয়।

ঠিকানা:— য়্যাণ্ড্রু কার্ণেজি ৫, ওয়েষ্ট ৫১নং ষ্ট্রীট, নিউইয়র্ক।

যথা সময়ে উত্তর আসিল “আমি আপনার মহৎ উদ্দেশ্যে আন্তরিক সহানুভূতি প্রকাশ করিতেছি। আপনার সৎকার্য্যে আমি যোগদান করিবার সুযোগ পাইয়া পুলকিত হইলাম। গৃহনির্ম্মাণ ব্যাপারে যে খরচ পড়িবে তাহার বিলগুলি আমার নিকট পাঠাইবেন। আমি ৬০,০০০৲ পর্যন্ত আপনার পাওনাদারদিগকে টাকা শোধ করিয়া দিব।”

এতক্ষণ বড় বড় দানের কথাই বলিলাম। কিন্তু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাহায্যের মাহাত্ম্য কম নয়। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত লোকসমাজ হইতে ছোট ছোট দান টাস্কেজীর জন্য আমি অসংখ্য পাইয়াছি। এই ক্ষুদ্র দানগুলির প্রভাবেই টাস্কেজীর নাম সর্ব্বত্র সুপ্রচারিত হইয়াছে। এই সমুদয়ের সাহায্যেই সহস্র সহস্র নরনারীর সহানুভূতি এবং অনুরাগ আমার শিক্ষাসমিতির প্রতি আকৃষ্ট হইয়াছে। আমার মতে, এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুষ্টিলাভেই অনুষ্ঠানগুলি ‘জাতীয়’ এবং সর্ব্বজনপ্রিয় হইয়া উঠে। ইহার দ্বারাই প্রতিষ্ঠান ও কর্ম্মকেন্দ্রগুলি গণশক্তির উপর দাঁড়াইয়া যায়—দেশের জনসাধারণ এইগুলিকে আপনার নিজের সম্পত্তি বলিয়া গৌরব অনুভব করিতে পারে।

দরিদ্র লোকেরা এক পয়সা, দুই আনা, চৌদ্দপয়সা, বা একটা জামা, দুটা আলু, একটা শূকর বা খানিকটা চিনি ও নুন মাত্র দান করিতে পারে সত্য। কিন্তু এইগুলির সমবায়ে কম অর্থ সঞ্চিত হয় না। অধিকন্তু, এই নগন্য দানের অন্যবিধ মূল্যও অসীম। কারণ ইহাতে নিরন্ন, বিদ্যাহীন, অশিক্ষিত, অর্দ্ধশিক্ষিত অথবা নিতান্ত দরিদ্র লোকের পূর্ণ হৃদয়ই থাকে। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানের সঙ্গে আমরা অনেকগুলি হৃদয় ও প্রাণ আমাদের কর্ম্মকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য লাভ করি। এতগুলি হৃদয়ের রাজা হইতে পারা কি কম সৌভাগ্যের কথা? এই মূল্যবান্ হৃদয়গুলিকে ভবিষ্যতে সৎকর্ম্মের জন্য চালিত করিতে পারিলে কি সমাজের কম মঙ্গল সাধিত হইতে পারে?

এই জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানগুলিকে আমি চিরকাল ভক্তিভাবে গ্রহণ করিয়া আসিয়াছি। এই গুলিকেই আমি টাস্কেজী-বিদ্যালয়ের ভিত্তি বিবেচনা করিয়া থাকি। ইহাদের সাহায্যে ‘চটক্’ দেখাইবার উপযুক্ত, বা লোক দেখান বড় কিছু গৃহ বা আসবাব ইত্যাদি সৃষ্টি করিতে পারি নাই সত্য। কিন্তু জন সমাজের অগোচরে থাকিয়া,—আমাদের অন্তর্য্যামীভাবে জন সাধারণের এই হৃদয়বত্তা ও এই সহানুভূতি আমাদের বিদ্যালয়ের জীবনীশক্তিরূপে কর্ম্ম করিতেছে। ইহারই ফলে টাস্কেজী-বিদ্যালয়ের শিকড়গুলি আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গমহলের অন্তরে অন্তরে প্রবিষ্ট হইয়াছে।

এই ক্ষুদ্র দান উপলক্ষ্যে আমার আর একটা কথা বলাও আবশ্যক। আমাদের বিদ্যালয় হইতে যাহারা বাহির হইয়া গিয়াছে তাহারা সময়ে সময়ে অথবা নিয়মিতরূপে আমাদিগকে সাহায্য করিয়া থাকে। আমাদের পুরাতন ছাত্রেরা এইরূপে আমাদের সঙ্গে জীবনব্যাপী সম্বন্ধ রক্ষা করিয়া চলে।

প্রথম তিন বৎসরের কার্য্যফলে আমরা আলাবামা প্রদেশের রাষ্ট্র হইতে বর্দ্ধিত হারে সাহায্য পাইয়া আসিতেছি। প্রথমে আমরা ৬০০০৲ টাকা মাত্র বার্ষিক পাইতাম। ইহাঁরা এক্ষণে ৯,০০০৲ করিয়া দিতে লাগিলেন। তাহার পরে ইহাঁরা ১৩,৫০০৲ করিয়া দিয়া আসিতেছেন।

আর একটা মোটা সাহায্য আমরা “শ্লেটার ভাণ্ডার” হইতে পাইয়া আসিতেছি। প্রথম প্রথম এই ভাণ্ডারের কর্মকর্ত্তারা ৩০০০৲ করিয়া দিতেন—ক্রমশঃ আমাদের কাজে সন্তুষ্ট হইয়া দানের হার বাড়াইয়া দিয়াছিলেন। সম্প্রতি ৩৩,০০০৲ করিয়া পাইতেছি।

তৃতীয়তঃ, “পীবতি-ভাণ্ডার” হইতেও আমরা সাহায্য পাইয়া থাকি। প্রথমতঃ ১৫০০৲ পাইতাম—এক্ষণে বার্ষিক ৪৫০০৲ পাইতেছি।

এই দুই ধন-ভাণ্ডার হইতে সাহায্য পাইবার উপলক্ষ্যে আমি কয়েকজন সহৃদয় শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির পরিচয় পাইয়াছি। ইহাঁরা বড় বড় ব্যবসায়ের ধুরন্ধর অথবা প্রকাণ্ড কর্ম্মকেন্দ্রসমূহের পরিচালক। এত দায়িত্বপূর্ণ কর্ম্মে লিপ্ত থাকিয়াও ইহাঁরা কি দরিদ্রের ক্রন্দনে কর্ণপাত করিতে সময় পান! নিগ্রোসমাজের হিতাকাঙ্ক্ষায় ইহাঁরা আমার সঙ্গে কত সময়ে কত আলোচনা করিয়াছেন!

ত্রয়োদশ অধ্যায়

২০০০ মাইল দূরে ৫ মিনিটের বক্তৃতা

পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে ‘পোর্টার হল’ নির্ম্মিত হইবার পর টাস্কেজী বিদ্যালয়ে প্রবেশ করিবার জন্য অনেক ছাত্র ও ছাত্রী দরখাস্ত করিতে লাগিল। এই সকল নূতন ছাত্রদের জন্য ‘আলাবামা-ভবন’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগী হইলাম। কিন্তু নিঃস্ব ছাত্রও অনেক ভর্ত্তি হইতে চাহিল। তাহারা নিজ খরচের কিয়দংশও ঘর হইতে আনিতে পারিত না। এজন্য আমরা ১৮৮৪ খৃষ্টাব্দে অর্থাৎ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তিন বৎসরের মধ্যেই একটা নৈশবিভাগ খুলিতে বাধ্য হইলাম।

আমি ইতিপূর্ব্বে হ্যাম্পটনে একটা নৈশবিদ্যালয় খুলিয়া আসিয়াছি। সেই নিয়মেই টাস্কেজীতেও নৈশশিক্ষা প্রবর্ত্তিত হইল। ১২ জন ছাত্র লইয়া কার্য্য আরম্ভ করা গেল। তাহাদিগকে দিনে ১০ ঘণ্টা করিয়া আমাদের কোন কৃষিকার্য্যে বা শিল্পে খাটিতে হইত। রাত্রিকালে মাত্র দুই ঘণ্টা করিয়া ইহাদিগকে পড়ান হইত। কাজের বেতনস্বরূপ খাওয়া খরচের অতিরিক্ত কিছু নগদ টাকা তাহাদিগকে দিতাম। এই টাকা তাহারা বিদ্যালয়ে জমা রাখিত। এইরূপে দুইবৎসর নৈশ বিদ্যালয়ে থাকিবার পর তাহাদিগকে দিবাবিদ্যালয়ে ভর্ত্তি করা যাইত। তখন তাহাদিগের পুঁজি টাকা হইতে খাওয়া খরচ চলিত। এই উপায়ে নৈশবিদ্যালয়ের কার্য্য গত ১৫ বৎসর চলিয়াছে। আজ ইহার ছাত্রসংখ্যা ৪৫৭।

আমি নৈশবিদ্যালয়ের খুব পক্ষপাতী। কারণ ইহার নিয়মে ছাত্রের অগ্নি-পরীক্ষা হইয়া যায়। বিদ্যাশিক্ষার জন্য আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা না থাকিলে কেহ এত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করিয়া এইরূপে জীবন চালাইতে পারে না।

দিবা-বিদ্যালয়ে ভর্ত্তি হইবার পরও এই ছাত্রদিগকে কোন ব্যবসায়ে লাগাইয়া রাখিতাম। সপ্তাহে অন্ততঃ দুই দিন তাহাদিগকে কাজ করিতে হইত। সপ্তাহের অপর ৪ দিন তাহারা সাধারণ ছাত্রের ন্যায় লেখাপড়া শিখিত। তাহা ছাড়া গরমের ছুটির সময়ে তিন মাস পুরাপুরি তাহাদিগকে খাটিতে হইত। এইরূপে নৈশবিদ্যালয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া এবং পরে দিবাবিদ্যালয়ের শিক্ষা পাইয়া অনেক নিগ্রো পুরুষ ও রমণী ‘মানুষ’ হইয়া গিয়াছে। আজ নিগ্রোসমাজে বহু লব্ধপ্রতিষ্ঠ শিল্পী ও ব্যবসায়ী দেখিতে পাই। তাঁহাদের অনেকেই এই নৈশবিদ্যালয়ের অগ্নি-পরীক্ষার ভিতর দিয়া জীবন আরম্ভ করিয়াছেন। আমাদের নৈশবিদ্যালয়ে জীবন যাপন করিলে কেহই ভবিষ্যতে কর্ম্মঠ চাষী বা কারিগর না হইয়া যায় না।

কৃষি শিল্প ব্যবসায়ের কথা এত বলিতেছি! কেহ যেন না ভাবেন যে আমরা আধ্যাত্মিক বিষয়ে নিতান্ত অমনোযোগী। খৃষ্ট ধর্ম্মের প্রচার টাস্কেজীতে যথেষ্টই হইয়া থাকে। আমরা কোন দলের বা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নহি—কিন্তু সাধারণ ভাবে খৃষ্টমত নানা উপায়ে আমাদের শিক্ষালয়ে প্রচারিত হইয়া থাকে। আমাদের ধর্ম্ম-বক্তৃতা, ধর্ম্মসভা, রবিবারের বিদ্যালয়, খৃষ্টপ্রচারসমিতি, খৃষ্টান যুবক সমিতি, ইত্যাদি নানা অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই ইহার প্রমাণ।

অনেকেই আমাকে আমার বাগ্মিতার কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছেন। আমি কি উপায়ে বক্তৃতা দিতে শিখিলাম কেহ কেহ জানিতে চাহেন। সত্য কথা, আমি বক্তৃতা করিয়া জীবন যাপন করিব উদ্দেশ্য আমার কোন দিনই ছিল না। আমার জীবনের সাধ—কার্য্য, কথা নহে। কথা বলিয়া কর্ম্মের প্রচার করা আপক্ষা নিজে কর্ম্ম করিয়া প্রয়োজন হইলে অন্যকে তাহা প্রচারের ভার দেওয়া—এই রূপই আমার ইচ্ছা চিরকাল রহিয়াছে।

পূর্ব্বেই বলিয়াছি আমার গুরুদেব আর্মষ্ট্রঙ্গের সঙ্গে আমি উত্তর অঞ্চলের ইয়াঙ্কি মহলে টাস্কেজী বিদ্যালয়ের “আলাবামা ভবনে”র জন্য প্রচারকার্য্য করিতে গিয়াছিলাম। এই সূত্রে সর্ব্বত্র আমার খ্যাতি রটে—আমার বক্তৃতা করিবার ক্ষমতা দেখিয়া লোকেরা আনন্দিত হয়।

যুক্ত-রাষ্ট্রের জাতীয়শিক্ষাপরিষদের সভাপতি অনারেবল শ্রীযুক্ত টমাস বিক্‌নেল মহোদয় আমার কোন বক্তৃতা শুনিয়াছিলেন। তাহার কিছুদিন পরেই তিনি আমাকে উইস্কন্সিন প্রদেশের ম্যাডিসন-নগরে একটা বক্তৃতা দিতে আহ্বান করেন। সেই শিক্ষাপরিষদের এক অধিবেশনে আমাকে বক্তৃতা দিতে হইল। প্রায় ৪০০০ লোক উপস্থিত ছিল। আলাবামা প্রদেশেরও কোন কোন শ্বেতাঙ্গ, এমনকি টাস্কেজী নগরেরও কেহ কেহ সভায় আসিয়াছিলেন। এই শ্বেতাঙ্গেরা বক্তৃতার শেষে আমাকে বলিলেন “ওয়াশিংটন মহাশয়, আপনার উদারতা দেখিয়া আমরা বড়ই প্রীত হইয়াছি। ভাবিয়াছিলাম, আপনি উত্তর অঞ্চলে আদর আপ্যায়ন পাইয়া আমাদের দক্ষিণ অঞ্চলের শ্বেতাঙ্গদিগকে যার পর নাই গালি দিবেন। কিন্তু আপনার বক্তৃতায় বিদ্বেষের লেশ মাত্র নাই। আপনার চরিত্রবত্তায় আমরা অনেক শিক্ষা পাইলাম।”

আমি দক্ষিণ অঞ্চলের শ্বেতাঙ্গদিগকে তিরস্কার করিব কেন? আমি যে তাঁহাদিগের নিকট সত্য সত্যই ঋণী। আমার বক্তৃতার সারমর্ম্ম একটি শ্বেতাঙ্গ রমণী কোন সংবাদ পত্রে পাঠাইয়াছিলেন। তিনি প্রকাশ করিয়াছেন “ওয়াশিংটনের বক্তৃতা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী এবং উদারতার পরিচায়ক। তিনি দক্ষিণ প্রান্তের শ্বেতাঙ্গদিগকে কিছুমাত্র গালি দেন নাই—বরং টাস্কেজী বিদ্যালয়ের পক্ষ হইতে তাঁহাদিগকে কৃতজ্ঞতা জানাইয়াছেন।”

আমার এই ম্যাডিসন বক্তৃতায়ই সর্ব্বপ্রথম কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ সমস্যার আলোচনা করি। ইহার পূর্ব্বে এ সকল কথা কোন প্রকাশ্য সভায় কখনও তুলি নাই। শিক্ষাবিষয়ক বক্তৃতাই এতদিন দিয়া আসিয়াছি, এবং টাস্কেজী বিদ্যালয়ের কার্য্যপ্রণালীই সকলকে জানাইয়া আসিয়াছি। এইবার সত্যসত্যই রাষ্ট্রীয় আন্দোলনে যোগ দিলাম। আমার আলোচনার রীতি দেখিয়া প্রায় সকলেই খুসী হইয়াছিলেন। আমার রাষ্ট্রীয় মতগুলি প্রচারিত হইলে জাতি-বিদ্বেষ অনেকটা কমিবার সম্ভাবনা—কেহ কেহ ইহাও বুঝিলেন।

আমি জানি, গালি দিয়া কখনও কাহাকে ভাল করা যায় না, অথবা তাহার চরিত্র পরিবর্ত্তন করা যায় না। বরং তাহারা যতটুকু প্রশংসাযোগ্য কর্ম্ম করিয়াছে সেই টুকুর জন্য সর্ব্বদা কৃতজ্ঞ থাকাই উচিত। এজন্য উত্তর অঞ্চলে বক্তৃতা করিতে যাইয়া আমি কখনই দক্ষিণ অঞ্চলের নিন্দা করি নাই। আমি দক্ষিণ অঞ্চলের লোকদিগকে মুখের উপর যে সকল কথা বলিতে না পারি সে কথা তাহাদের পশ্চাতে আমি কখনই বলিতে ইচ্ছা করিতাম না। অমি সরলতা ভালবাসি।

আমি অবশ্য ন্যায্য তিরস্কার করিতেও ছাড়ি না। যখন সত্যসত্যই বুঝি যে শ্বেতাঙ্গেরা অন্যায় করিতেছে তাহা আমি তাহাদিগকে সাম্‌না সাম্‌নি বলিতে ভয় পাই না। বরং আমি দেখিয়াছি, যে, অনেক লোক এইরূপ স্পষ্টবক্তাদিগকে ভালবাসে। নিরপেক্ষ ও স্বাধীন সমালোচনার প্রভাব অস্বীকার করা কঠিন। আমার সমালোচনা অনুসারে দক্ষিণ প্রান্তের লোকেরা কার্য্য আরম্ভ করিতে অনিচ্ছুক থাকিতে পারেন। কিন্তু স্পষ্ট করিয়া বলিতে পারিলে আমার কথাগুলি এবং যুক্তিগুলি তাঁহারা মানিয়া লইতে বাধ্য।

এজন্য আমি নিয়ম করিয়াছি যে, দক্ষিণের দোষগুলি আমি দক্ষিণবাসীদিগকেই বলিব। তাহাদের দোষ উত্তর অঞ্চলে রটাইয়া লাভ কি? দক্ষিণের লোকজন লইয়াই আমাদের কারবার। সুতরাং তাহাদের মতিগতি পরিবর্ত্তন করিবার জন্য তাহাদের সঙ্গেই সর্ব্বদা বুঝাপড়া, বাক্‌বিতণ্ডা ইত্যাদি হওয়া আবশ্যক।

ম্যাডিসনের বক্তৃতায় আমার প্রধান কথা ছিল—“নিগ্রোয় ও শ্বেতাঙ্গে সদ্ভাব বৃদ্ধি করা অত্যন্ত আবশ্যক। যত উপায়ে সম্ভব এই দুই সমাজে বন্ধুত্বের সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠিত করিতেই হইবে।” নিগ্রোদিগের কর্ত্তব্যও আমি বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছিলাম। আমার মতে কেবল ক্ষমতা বা অধিকার পাইবার জন্য চেষ্টা করিলে চলিবে না। নিগ্রোরা সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিতে স্বার্থপর ভাবে কেবলমাত্র নিজ সমাজের কথা ভাবিলেই চলিবে না। তাহাদিগকে নিরপেক্ষতা এবং ‘জাতীয়তা’ অর্জ্জন করিতে হইবে। সমগ্র আমেরিকার স্বার্থ তাহাদিগকে বিচার করিয়া দেখিতে হইবে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয়’ স্বার্থ সিদ্ধির জন্য কেবলমাত্র শ্বেতাঙ্গ বা কেবলমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের কথা ভাবিলে চলিবে না। এক সঙ্গে উভয় সম্প্রদায়ের কথা যিনি ভাবিতে অক্ষম তিনি তাঁহার কর্ত্তব্য পালনের অযোগ্য। এই সকল কথা বলিয়া আমি আমার স্বজাতিগণকে তাহাদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করাইয়া দিয়াছি।

এই গেল আমার বক্তৃতার রাষ্ট্রীয় অংশ। সঙ্গে সঙ্গে নিগ্রোসমাজের উন্নতির উপায়ও আলোচনা করিয়াছিলাম। আমি বলিলাম আমাদের উন্নতির প্রধান উপায় দুইটি—প্রথম শিক্ষা, দ্বিতীয় শিল্প, কৃষি ও ব্যবসায়। আমার বক্তৃতার খানিকটা নিম্নে উদ্ধৃত করিতেছি,—“ভাই নিগ্রো, মনে রাখিও তুমি আমেরিকা-জননীর কনিষ্ঠ সন্তান। মনে রাখিও তোমাকে শ্বেতাঙ্গ ভ্রাতার সমান হইবার জন্য বর্ত্তমানে কঠোর সাধনায় ব্রতী হইতে হইবে। তোমার বিদ্যা বুদ্ধি মার্জ্জিত হওয়া আবশ্যক—তোমার চরিত্র গঠিত হওয়া আবশ্যক। নানা সদ্‌গুণ অর্জ্জন করিয়া তুমি আমেরিকার জনসমাজের অত্যাবশ্যক অঙ্গে পরিণত হও—দেখিবে কেহ তোমাকে এই স্থান হইতে বিতাড়িত করিতে পারিবে না। দেখিবে কেহই তোমাকে অবনত পদদলিত করিয়া রাখিতে পারিবে না।

আমি বলিতেছি তোমার চরিত্র গঠিত হইয়া গেলে তুমি অসাধ্য সাধন করিতে পারিবে। তুমি নানা উপায়ে তোমার ক্ষমতা দেখাইতে থাক—শ্বেতাঙ্গ তোমাকে সম্মান করিতে বাধ্য হইবে। তোমার কার্য্যকরী শক্তির পরিচয় দাও তোমাকে ছাড়িয়া থাকিতে শ্বেতাঙ্গের কষ্ট হইবে। তুমি যে আমেরিকার অভাব মোচন করিতে পার, তুমি যে আমেরিকাকে ধনে ধান্যে ভরিয়া ফেলিতে পার—তাহা শ্বেতাঙ্গকে বুঝাইবার জন্য কি করিতেছ? যখনই তাহারা বুঝিবে যে, তোমাদের বিদ্যায় বুদ্ধিতে ও চরিত্রে আমেরিকার ঐশ্বর্য্য বাড়িতেছে এবং আমেরিকা জগতে উন্নত হইতেছে তখনই তাহারা তোমাদিগকে মাথায় করিয়া রাখিবে। আমি বলিতেছি তোমার কাল চামড়া ও তোমার বাপদাদার গোলামী তোমার ভবিষ্যৎ সম্মান লাভের কিছুমাত্র বিঘ্ন হইবে না।

আমি জানি একজন কৃষ্ণাঙ্গ নিগ্রো নিজ বিদ্যাবলে তিন বিঘা জমি চষিয়া ৬৬ বুশেল শকরকন্দ আলু পাইয়াছিলেন। অথচ তাঁহার পল্লীর অন্যান্য শ্বেতকায় চাষীরা ৪ বুশেল মাত্র পাইত। তিনি উন্নত কৃষিবিজ্ঞানে পণ্ডিত ছিলেন এবং নূতন কৃষি-প্রণালী জানিতেন—শ্বেতাঙ্গেরা জানিত না। কাজেই পল্লীসমাজে এই কৃষ্ণাঙ্গ নিগ্রো সকলেরই পূজার পাত্র হইয়া পড়িলেন। বুঝিয়া দেখ—কেন? শ্বেতাঙ্গেরা বুঝিত যে, এই ব্যক্তি সমাজের একটা সমৃদ্ধির উপায় বাহির করিয়া ফেলিয়াছেন। অতএব তোমরা কৃষিকর্ম্মে অভ্যস্ত হইতে থাক, মনোযোগের সহিত শিল্প কর্ম্মে লাগিয়া যাও, এবং এইরূপ কার্য্য করিতে করিতেই চরিত্র ও বুদ্ধি গঠিত কর, তোমাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হইবে।”

আমার এই সকল মত আমি আজীবন পোষণ করিয়াছি। এইবার প্রথম প্রচার করিলাম। পরেও আমি কখন এইমত পরিবর্ত্তন করি নাই।

যৌবনকালে আমি নিগ্রোজাতির নিপীড়নকারী ব্যক্তিদিগকে বড়ই ঘৃণা করিতাম। আজকাল ইহাদিগকে আর ঘৃণা বা নিন্দা করি না—ইহাদিগকে দেখিয়া দুঃখিত হই মাত্র।

অন্যলোককে দাবিয়া রাখিতে পারিলে অনেকে খুসী হয়। নিজের ক্ষমতার বড়াই করিবার জন্য বহু ব্যক্তি অপর ব্যক্তি বা জাতিকে চাপিয়া রাখিতে চাহে। অপর লোকের যশোলাভে ও উন্নতিতে ইহাদের বুক চড় চড় করে এবং চোখ টাটায়। কিন্তু ইহারা কি মুর্খ! ইহারা একসঙ্গে সঙ্কীর্ণতা এবং বুদ্ধিহীনতার পরিচয় দিতেছে। এইরূপ স্বার্থপর, পরশ্রীকাতর, চরিত্রহীন লোকদিগকে উপলক্ষ্য করিয়া আমি অনেকসময়ে স্বগত বলিয়া থাকি,—

“ওহে ক্ষুদ্রচেতা পরপীড়নকারী ব্যক্তিগণ, তোমরা কি মনে করিয়াছ যে, যে সকল সুযোগ পাইয়া তোমরা খানিকটা উন্নত হইয়াছ, সেই সকল সুযোগ সংসারের অন্য কোন লোক কখনই পাইবে না? তুমি আমাকে বা উহাকে বা দশজন ব্যক্তিকে চাপিয়া রাখিয়া কি করিবে? তুমি কি সংসারের সকল কর্ম্মক্ষেত্রগুলিই একচেটিয়া করিয়া রাখিয়াছ? দেশের সর্ব্বত্রই কি তুমি একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করিতে পারিয়াছ? অত ক্ষমতা তোমার নাই। এই বিশাল মানবজগতের মধ্যে তুমি এক নগণ্য কীট মাত্র। বিরাট কর্ম্মক্ষেত্রের এক কণামাত্রে দাঁড়াইয়া তুমি আস্ফালন করিতেছ!

বিশ্বে প্রতিদিন কত নূতন নূতন শক্তির সৃষ্টি হইতেছে—কত নূতন নূতন সুযোগ পাইয়া কত নূতন নূতন কর্ম্মবীরের অভ্যুদয় হইতেছে—জগৎ প্রতিদিন বাড়িয়াই চলিয়াছে। এই নিত্যনূতন বিকাশকে রুদ্ধ করিবার ক্ষমতা কাহারও নাই। যে নিয়মে তুমি বড় হইয়াছ, ঠিক সেই নিয়মেই সংসারের লক্ষ লক্ষ নরনারী বড় হইতেছে ও হইবে। তাহাদের উন্নতি দেখিয়া তোমার কষ্ট হয়—তুমি নির্ব্বোধ। তুমি তাহাদিগকে তোমার সমান যশস্বী হইতে দিতে চাহ না—তুমি মুর্খ। ঐ দেখ, তোমার অজ্ঞাতসারে তোমাকে অবজ্ঞা করিয়াই নূতন নূতন কর্ম্মী ও চিন্তাবীর জগতে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইতেছেন। চিরউন্নতিশীল সংসারের প্রবল প্রবাহের মধ্যে তোমার মত কত কীট তৃণের ন্যায় অহরহ ভাসিয়া যাইতেছে।

যদি চক্ষু থাকিত, তাহা হইলে দেখিতে পারিতে। যদি বুদ্ধি থাকিত, তাহা হইলে লজ্জিত হইতে। যদি মানুষ হইতে, তাহা হইলে নিজের অহঙ্কার খর্ব্ব করিতে শিখিতে, এবং নিজ জীবনকে সমগ্র সমাজের উন্নতিবিধানের অন্যতম ক্ষুদ্র যন্ত্রস্বরূপ বিবেচনা করিতে পারিতে; তখন আপামর জনসাধারণের পরিপূর্ণ বিকাশলাভের সাহায্য করিতে যত্নবান হইতে। যদি ধর্ম্মজ্ঞান থাকিত, তাহা হইলে অপরকে তোমা অপেক্ষা প্রসিদ্ধ করিবার সুযোগ সৃষ্টি পূর্ব্বক জীবন ধন্য করিতে উৎসাহী হইতে।”

আমার ম্যাডিসনের বক্তৃতায় উত্তর মহলে একটা হৈ চৈ পড়িয়া গেল। এই তোলাপাড়ার হুজুগে বহুস্থান হইতে বক্তৃতা করিবার জন্য নিমন্ত্রণ আসিতে লাগিল। আমি বোষ্টননগরে থাকিয়া ইয়াঙ্কি মহলের নানা স্থানে আমার মত প্রচার করিবার সুযোগ পাইলাম। কিন্তু আমার বিশেষ ইচ্ছা—দক্ষিণ প্রান্তে যাইয়া এই কথাগুলি প্রকাশ্যসভায় বলিয়া আসি। আমি এজন্য সুযোগ খুঁজিতে লাগিলাম। সৌভাগ্যক্রমে একটা সুবিধা পাওয়া গেল।

১৮৯৩ খৃষ্টাব্দে জর্জ্জিয়া প্রদেশের আট্‌লাণ্টা নগরে একটা বিরাট খৃষ্টান মহাসভার আয়োজন হইতেছিল। এই সময়ে বোষ্টনেও আমার অনেক কাজ ছিল। তথাপি জর্জিয়ার কর্ম্ম কর্ত্তাদিগের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিলাম। বোষ্টন হইতে আট্‌লাণ্টা ২০০০ মাইল। এতদূর যাইতে হইবে। অথচ বক্তৃতা করিবার মাত্র ৩০ মিনিট পূর্ব্বে সভাস্থলে আমার গাড়ী পৌঁছিবে। এখানে ৫ মিনিট মাত্র বক্তৃতা করিতে সময় পাইব। আলাণ্টায় সর্ব্বসমেত একঘণ্টা মাত্র থাকিয়া পুনরায় আমাকে বোষ্টনে আসিতে হইবে। আমার কাজের ভিড় এত। যাহা হউক দক্ষিণ অঞ্চলের এই মহাসম্মিলনে বক্তৃতা করিবার সুযোগ ছাড়িলাম না।

এখানে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ উভয় সমাজেরই গণ্যমান্য লোক উপস্থিত ছিলেন। সর্ব্বসমেত ২০০০ লোকের সমাগম হইয়াছিল। আমার শিক্ষাপ্রণালীর বিবরণ দিলাম—শিল্পশিক্ষানীতি বুঝাইয়া দিলাম এতদ্ব্যতীত নিগ্রোসমাজের কর্ত্তব্য ও দায়িত্বের কথা বলিলাম। অধিকন্তু শ্বেতাঙ্গদিগের যথোচিত সমালোচনা করিতেও ছাড়িলাম না। আট্‌লাণ্টার সংবাদপত্রগুলি আমার বক্তৃতার খুব তারিফ করিতে লাগিল। আমার কার্য্যোদ্ধার হইয়া গেল—দক্ষিণ প্রান্তের শ্বেতাঙ্গ মহলে আমি সুপ্রতিষ্ঠিত হইলাম।

ইহার পর হইতে কৃষ্ণাঙ্গ ও শেতাঙ্গ সকলেই আমার বক্তৃতা শুনিবার জন্য পীড়াপীড়ি করিতেন। টাস্কেজীর কাজকর্ম্ম হইতে বিদায় লইয়া আমাকে এই বক্তৃতাকার্য্যে লাগিয়া থাকিতে হইত। উত্তর অঞ্চলে আমি টাস্কেজীর জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিতাম। নিগ্রোমহলে আমার স্বজাতির বর্ত্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ উন্নতির উপায় আলোচনা করিতাম।

এইবার আমি আমার জীবনের একটা বিশেষ স্মরণীয় দিনের উল্লেখ করিব। সেই দিন হইতে আমি সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রে সুপরিচিত হইয়াছি। তখন হইতে আমার যশ কেবল মাত্র নিগ্রোসমাজে অথবা আমার সাহায্যকারী শ্বেতাঙ্গ বন্ধু মহলেই আবদ্ধ থাকিল না। আমার নাম জেলা হইতে জেলায়, প্রদেশ হইতে প্রদেশে সর্ব্বত্র ছড়াইয়া পড়িল। আমি কোন প্রদেশ বা সম্প্রদায়ের কর্ম্মবীর মাত্র থাকিলাম না। সকল প্রদেশের লোকই আমাকে সমগ্র ‘জাতির’ অন্যতম নেতারূপে গ্রহণ করিল। আমেরিকা ভূখণ্ডের একজন জন-নায়ক বা কর্ম্মীপুরুষ অথবা একজন যুক্তরাষ্ট্র-বীররূপে আমি সম্মান পাইতে লাগিলাম।

১৮৯৫ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর আমার জীবনের এই স্মরণীয় দিন। এদিন আটলাণ্টা নগরে এক বিপুল প্রদর্শনী খোলা হয়। এই প্রদর্শনীতে আমি আমার শিক্ষানীতি এবং রাষ্ট্রীয় মত প্রচার করিবার জন্য বক্তৃতা করিতে সুযোগ পাই।

এই প্রদর্শনীর বিষয় সবিশেষ বলা আবশ্যক। আটলাণ্টার খৃষ্টান মহাসভায় বক্তৃতা করার ফলে ঐ অঞ্চলে আমার খ্যাতি প্রতিষ্ঠিত হয়। তাহার কিছু কাল পরে ১৮৯৫ সালে ঐ নগরের কয়েকজন বিশিষ্ট ভদ্রলোক আমার নিকট টেলিগ্রাম করেন, “আট্‌লাণ্টায় এক বিরাট প্রদর্শনী ও সম্মিলনের আয়োজন হইতেছে। এইজন্য যুক্তরাষ্ট্রের ধনসচিবের নিকট হইতে অর্থসাহায্য আবশ্যক। আমাদের নগরবাসী কয়েকজন এই কার্য্য উপলক্ষ্যে ওয়াশিংটনের যুক্তদরবারে যাইয়া আবেদন করিবেন। ‘জাতীয়’-মহাসমিতি কংগ্রেসের সম্মুখে ইহাঁরা আমাদের অভাব জানাইবেন। আপনাকে এই প্রতিনিধিগণের সঙ্গে আমাদের পক্ষ হইতে যোগদান করিতে হইবে।”

জর্জ্জিয়া প্রদেশের ২৩জন বিচক্ষণ শ্বেতাঙ্গ এই উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্ব্বাচিত হইয়াছিলেন। এতদ্ব্যতীত এই প্রতিনিধি সভায় তিনজন নিগ্রোর স্থানও ছিল। আমি তাঁহাদের একজন হইলাম। যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয়’-দরবারে তিন চারিজন বক্তৃতা করিলেন—আমাকেও বক্তৃতা করিতে হইল। আমি আটলাণ্টার পক্ষ হইতে সেই জাতীয়-মহাসমিতিতে নিবেদন করিলাম, “দক্ষিণপ্রান্তের শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গসমাজে ভ্রাতৃভাব বর্দ্ধন করা অত্যাবশ্যক। এজন্য আপনারা বদ্ধপরিকর হউন। শীঘ্রই ঐ অঞ্চলের সর্ব্ববিধ শ্রীবৃদ্ধি সাধনের ব্যবস্থা করুন। কৃষি, শিল্প, ও ব্যবসায়ের দ্বারা উহাদের আর্থিক ও মানসিক উন্নতির সাহায্য করিলে এই কার্য্য সহজেই সিদ্ধ হইবে। সম্প্রতি আটলাণ্টার প্রদর্শনী উপলক্ষে মহাসুযোগ উপস্থিত। ইহাতে গোলামীনিবারণের যুগ হইতে বিগত বিশবৎসরের মধ্যে উভয়জাতির উন্নতির পরিচয় পাওয়া যাইবে। এই প্রদর্শনীর দ্বারাই আবার উভয়ের ভবিষ্যৎ উন্নতির পথও উন্মুক্ত হইয়া পড়িবে।”

আমি প্রায় ১৫।২০ মিনিট কংগ্রেসের সম্মুখে বক্তৃতা করিলাম। আমার বক্তব্যের শেষ অংশ এই—“নিগ্রোরা রাষ্ট্রীয় অধিকার পাইতেছে সত্য; কিন্তু কেবল মাত্র ভোট দিয়া প্রতিনিধি নির্ব্বাচনের ক্ষমতা থাকিলে কি হইবে? তাহাদের ধনসম্পত্তি নাই। এক্ষণে তাহাদের সম্পত্তির মালিক হওয়া আবশ্যক। এজন্য তাহাদের কৃষিকর্ম্মে শিল্পে ও ব্যবসায়ে নিযুক্ত হওয়া কর্ত্তব্য। এই সকল বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাহাদের সহায় হইতে পারেন। তাহাদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করিলে অচিরেই তাহাদের চরিত্র গঠিত হইবে—এবং তাহারা বিষয় সম্পত্তির অধিকারী হইয়া যথার্থ দায়িত্বের সহিত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করিতে পারিবে। আটলাণ্টার সম্মিলনে কংগ্রেস এক মহাসুযোগ পাইবেন। উত্তরপ্রান্তে ও দক্ষিণপ্রান্তে সন্ধি স্থাপিত হইবার পর কংগ্রেস এরূপ সুযোগ আর পান নাই। তাঁহারা ইচ্ছা করিলে এইবার আমেরিকার নবজীবন প্রবর্ত্তনের সূত্রপাত করিতে পারেন।”

আমার কথা বলা হইয়া গেলে আমার প্রতিনিধি বন্ধুগণ আমার খুব সুখ্যাতি করিলেন। কংগ্রেসের সভ্য মহোদয়গণও আমার প্রশংসা করিলেন। কংগ্রেসের মহাসভা হইতে আমাদের আবেদন মঞ্জুর করা হইল। আটলাণ্টা প্রদর্শনীর ব্যয় যুক্ত-রাষ্ট্রের ‘জাতীয়’ কোষাগার হইতে পাওয়া যাইবে—আশা পাইলাম।

তারপর প্রদর্শনী সাজাইবার ব্যবস্থা চলিতে লাগিল। কর্ম্মকর্ত্তারা স্থির করিলেন নিগ্রোসমাজের জন্য বিশেষ এক বিভাগ খোলা আবশ্যক। স্বাধীনতা লাভের পর ২০ বৎসরের মধ্যে নিগ্রোরা শিল্পে, কৃষিকর্ম্মে, শিক্ষায়, নানা কৃতিত্বের পরিচয় দিয়াছে। সেই গুলি একস্থানে জমা করিয়া দেখান কর্ত্তব্য। আটলাণ্টার প্রতি প্রদর্শনীতে তাহার জন্য স্বতন্ত্র আয়োজন করিবার প্রস্তাব হইল। নিগ্রোবিভাগের ঘরবাড়ী সাজসজ্জা আসবাব পত্র সবই নিগ্রোরা নিজেদের দ্বারাই করিয়া লইবে—ইহাও স্থির হইয়া গেল।

প্রদর্শনীর নিগ্রো-বিভাগের জন্য একজন কর্ত্তা নির্ব্বাচিত হইল। জর্জ্জিয়া প্রদেশবাসী আমাকেই চাহিলেন। কিন্তু টাস্কেজীর কাজে আমি ব্যস্ত—এজন্য সেই পদ গ্রহণ করিতে পারিলাম না। আমার প্রস্তাবে অন্য একজন নিগ্রোকে এই কার্য্যে নিযুক্ত করা হইল।

নিগ্রো-বিভাগের মধ্যে দুইটা কামরাই সকলের দৃষ্টি সর্ব্বাপেক্ষা বেশী আকৃষ্ট করিয়াছিল। প্রথমতঃ হ্যাম্পটন বিদ্যালয়ের ছাত্রদের কাজকর্ম্ম, দ্বিতীয়তঃ টাস্কেজী বিদ্যালয়ের ছেলেদের হাতের কাজ। বলা বাহুল্য, সর্ব্বাপেক্ষা বেশী বিস্মিত হইয়াছিল, দক্ষিণপ্রান্তের শ্বেতাঙ্গগণ।

আটলাণ্টা-মহাপ্রদর্শনীর দিন অগ্রসর হইতে লাগিল। এই প্রদর্শনী উন্মুক্ত করিবার জন্য কার্য্যপ্রণালী আলোচিত হইল। এই প্রদর্শনীতে নিগ্রোদিগকে আহ্বান করা হইয়াছে। তাহাদের বিদ্যা বুদ্ধির নিদর্শন স্বরূপ কাজ কর্ম্ম প্রদর্শিত হইবার ব্যবস্থা হইয়াছে। দুই তিন জন নিগ্রো ওয়াশিংটন পর্য্যন্ত যাইয়া ‘জাতীয়’ মহাসমিতির নিকট আবেদন করিয়া আসিয়াছেন—এবং নিগ্রোদিগকে প্রদর্শনীর কার্য্যে ও নেতৃত্বের পদে নিযুক্ত করা হইয়াছে। কাজেই প্রদর্শনী খুলিবার উৎসবে যে সম্মিলন হইবে তাহাতে নিগ্রোর আসন থাকাও বাঞ্ছনীয়। নিগ্রোর পক্ষ হইতে একজন প্রতিনিধির সেই সম্মিলনে বক্তৃতা করা আবশ্যক। কোন কোন শ্বেতাঙ্গ আপত্তি করিলেন; বলিলেন “অতবড় বিরাট ব্যাপারে কৃষ্ণাঙ্গের স্থান দিবার প্রয়োজন নাই।” শেষ পর্য্যন্ত সাব্যস্থ হইল, একজন নিগ্রো প্রতিনিধিকে বক্তৃতার জন্য নিমন্ত্রণ করা হইবে। কয়েকদিন পরে আমিই সেই নিমন্ত্রণ পাইলাম।

আমি বিষম সমস্যায় পড়িলাম। কয়েক বৎসর পূর্ব্বে আমি গোলাম ছিলাম। আমার মনিবেরা কেহ কেহ হয়ত এই সম্মিলনে উপস্থিত থাকিবেন। তাঁহাদের সম্মুখে আমি স্বাধীন ভাবে কেমন করিয়া বক্তৃতা করিব?

তারপর নিগ্রোজাতির পক্ষে শ্বেতাঙ্গের সম্মুখে দাঁড়াইয়া বক্তৃতা করিবার সুযোগ এই প্রথম পাওয়া গেল। এই ঘটনার উপর নিগ্রোসমাজের ভবিষ্যৎ অনেকটা নির্ভর করিতেছে। এই সভাস্থলে, আবার, কৃষ্ণাঙ্গও অনেক থাকিবেন এবং উত্তর অঞ্চলের শ্বেতাঙ্গও অনেক আসিবেন। সমগ্র যুক্তরাজ্যের ইহা মহাসম্মিলন বলিলে কোন অত্যুক্তি হয় না। এই সর্ব্বজন সমাগমের আসরে, এই “জাতীয়” সভামণ্ডপে দাঁড়াইয়া সকল প্রদেশ ও সকল সম্প্রদায়ের মান্য রক্ষা করিয়া কথা বলা কি সহজ?

এআই অনুবাদ · মূল