নিগ্রোজাতির কর্ম্মবীর

মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Benoy Kumar Sarkar (†1949) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন

আমি রেলপথের আর একটা নিগ্রোসমস্যার ঘটনা উল্লেখ করিতেছি। একজন নিগ্রোর সমস্ত শরীর অতিশয় সাদা ছিল। তাহাকে কৃষ্ণাঙ্গ নিগ্রোদিগের সঙ্গে তুলনা করিয়া কেহই তাহার জাতি স্থির করিতে পারিত না। সে এক সময়ে কৃষ্ণাঙ্গদিগের গাড়ীতে বসিয়া যাইতেছে। টিকেট-সংগ্রাহক তাহাকে সেইখানে দেখিয়া থম্‌কাইয়া দাঁড়াইল। সে কি নিগ্রো না ইয়াঙ্কি? তাহার মনে এই সন্দেহ উপস্থিত হইল। যদি সে নিগ্রো হয়, ভালই। কিন্তু যদি সে শ্বেতাঙ্গ হয় তাহা হইলে তাহাকে কি করিয়া জিজ্ঞাসা করা যায় যে সে নিগ্রো কি না? ইহাতে শ্বেতাঙ্গের অপমান হইবারই সম্ভাবনা। টিকেট সংগ্রাহক সেই ব্যক্তির আপাদ মস্তক পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পরীক্ষা করিল। তাহার চুল, চোখ, হাত, কান কিছুই বাকী রাখিল না। কোনমতেই বুঝা গেল না যে ঐ লোক নিগ্রো কি সত্য সত্যই শ্বেতাঙ্গ। শেষে উপায় না দেখিয়া লোকটা মাথা হেঁট করিয়া তাহার পায়ের দিকে দেখিতে থাকিল। আমি সেই গাড়ীতে বসিয়াছিলাম এবং রেলের কেরাণীর ঐ পরীক্ষা দেখিয়া মনে মনে ভাবিলাম “যাহাহউক, এইবার সন্ধান পাওয়া যাইবে।” সত্যই তাহার পা দেখিয়া সে বুঝিল যে ঐ ব্যক্তি নিগ্রোই বটে এবং তাহাকে কিছু না বলিয়া চলিয়া গেল। আমি সুখী হইলাম যে গোলমালে আমার একজন স্বজাতি কমিয়া গেল না!

আমি ভদ্রতা সম্বন্ধে একটা নিয়ম স্থির করিয়াছি। কোন লোক সভ্য ও ভদ্র কিনা তাহা বিচার করিবার জন্য আমি কোন নীচ জাতির লোকের সঙ্গে তাহার আচার ব্যবহার পরীক্ষা করিয়া থাকি। পূর্ব্বে গোলামীর যুগে দক্ষিণ প্রান্তের শ্বেতাঙ্গ প্রভুরা তাঁহাদের ক্রীতদাসগণের সঙ্গে যেরূপ আচরণ করিতেন তাহাতে তাঁহাদের মধ্য হইতে ভদ্র ও অভদ্র, সভ্য ও অসভ্য খুঁজিয়া বাছা সহজ ছিল। এখনও পুরাতন মনিবের সন্তানেরা পুরাতন গোলামবংশীয়দিগের সঙ্গে কিরূপ ব্যবহার করিয়া থাকে তাহাই ভদ্রতা বিচারের প্রকৃষ্ট মাপকাঠি।

জর্জ্জ ওয়াশিংটন একদিন রাস্তায় হাঁটিতে ছিলেন এমন সময়ে একজন কৃষ্ণাঙ্গ নিগ্রো তাঁহাকে টুপি তুলিয়া নমস্কার করিল। তিনি তৎক্ষণাৎ নিগ্রোকে তাঁহার টুপি খুলিয়া নমস্কার করিলেন। তাঁহার শ্বেতাঙ্গ বন্ধুরা এজন্য তাঁহাকে পরে নিন্দা করিতেন। তিনি উত্তর দিতেন:—“তোমরা কি বলিতে চাহ যে, একটা অশিক্ষিত অসভ্য নিগ্রো আমাকে ভদ্রতায় হারাইয়া দিবে?”

আমেরিকায় জাতি ভেদের দুই একটা দৃষ্টান্ত দিতেছি। আমি যখন হ্যাম্পটনে লোহিত ছাত্রদিগের অভিভাবকতা করিতেছিলাম সেই সময়ে আমার অধীনস্থ একজন ছাত্রের অসুখ হয়। আমি তাহাকে সঙ্গে লইয়া “ফেড্‌রাল দরবারে”র কর্ম্মচারীর নিকট ওয়াশিংটনে যাইতেছিলাম। তিনি ইহাকে যথা স্থানে তাহার স্বদেশে পাঠাইয়া দিবেন। ওয়াশিংটনে যাইবার পথে খানিকটা একটা ষ্টীমারে যাইতে হয়। উহাতে হোটেল ছিল। সকলের খাওয়া দাওয়া হইয়া যাইবার পর আমি সেখানে খাইতে গেলাম। আমার লোহিত ছাত্রও আমার সঙ্গে ছিল। ষ্টীমারের হোটেলওয়ালা বলিল “লোহিত যুবক খানা পাইবে, তুমি পাইবে না।” আমি অবশ্য বিস্মিত হইলাম—কারণ আমাদের দুইজনের রঙ্গে বড় বেশী তফাৎ ছিল না। কিন্তু সে এত ওস্তাদ যে দেখিবা মাত্রই কৃষ্ণ লোহিত সহজেই চিনিয়া ফেলিয়াছে!

তাহার পর আর একটা হোটেলেও এইরূপ ঘটিল। আমি হ্যাম্পটন হইতে আসিবার সময় সেই হোটেলে থাকিতে আদিষ্ট হইয়া ছিলাম। কিন্তু তাহারাও আমাকে জায়গা দিল না।

জাতিভেদের আর একটা দৃষ্টান্ত দিতেছি। একবার একটা সহরে মহাগোলযোগ পড়িয়া যায়। একজন লোককে “লিঞ্চ” বা সজ্ঞানে মারিয়া ফেলিবার যোগাড় হইয়া উঠিল। ব্যাপার কি অনুসন্ধানে জানা গেল যে কাল চামড়ার একটা লোক স্থানীয় হোটেলে খাইতে গিয়াছে। কিন্তু সে নিগ্রো নয় সে মরক্কো দেশের একজন অধিবাসী, আমেরিকায় বেড়াইতে আসিয়াছে। তাহার রং কাল এবং ইংরাজীতে সে কথা বলিতে পারিত। কাজেই লোকেরা তাহাকে নিগ্রো ভাবিয়া লইয়াছিল। যখন রটিয়া গেল যে, সে নিগ্রো নয় আর কোন গোলযোগ থাকিল না। তাহার পর হইতে মরক্কোবাসী ব্যক্তিটি ইংরাজীতে কথা না বলাই শ্রেয়জ্ঞান করিয়াছিল।

লোহিত ছাত্রদের লইয়া হ্যাম্পটনে এক বৎসর কাটাইলাম। এই সময়ে আমার ভবিষ্যৎ উন্নতির আর একটা সুযোগ জুটিল। তাহার ফলে আমার টাস্কেজির কর্ম্মে যথেষ্ট সাহায্য হইয়াছে। আর্মষ্ট্রঙ্গ দেখিলেন, নূতন নূতন নিগ্রো পুরুষ ও রমণীরা দলে দলে শিক্ষালাভের জন্য তাঁহার নিকট আবেদন করিতেছে। কিন্তু তাহাদের বড়ই দুরবস্থা। পয়সা দিয়া স্কুলে থাকা কঠিন, এমন কি, দুই চারি খান কেতাব কিনিবার ক্ষমতাও তাহাদের নাই। সেনাপতি মহাশয় ইহাদিগের জন্য একটা নৈশবিদ্যালয় খুলিবার আয়োজন করিলেন।

ব্যবস্থা হইল যে তাহারা দিনে ১০ ঘণ্টা করিয়া খাটিবে এবং রাত্রে ২ ঘণ্টা মাত্র স্কুলে পড়িবে। এই কাজের জন্য তাহাদিগকে বিদ্যালয় হইতে খোরাক দেওয়া হইবে। তাহা ছাড়া নগদও কিছু তাহাদিগকে দেওয়া যাইবে। এই নগদ টাকাটা সম্প্রতি তাহারা বিদ্যালয়ের ধনভাণ্ডারে জমা রাখিবে। ভবিষ্যতে তাহাদিগকে দিবাভাগের বিদ্যালয়ে ভর্ত্তি করিয়া লওয়া যাইবে। তখন ঐ পুঁজি হইতে তাহাদের খোরাক পোষাক চলিতে পারিবে। অবশ্য এইরূপে অন্ততঃ দুই বৎসর কাল নৈশ-বিদ্যালয়ে না থাকিলে তাহারা দিবা-বিদ্যালয়ের উপযুক্ত বিবেচিত হইবে না—এবং দিবা-বিদ্যালয়ের জন্য নিজ নিজ অভাবমোচনোপযোগী টাকাও জমা হইয়া উঠিবে না। অধিকন্তু এই দুই বৎসরব্যাপী জীবনযাপনের ফলে তাহারা কতকগুলি শিল্প ও কৃষিকর্ম্ম শিখিয়া ফেলিবে। তাহাদের পুঁথিবিদ্যাও কিছু কিছু হইয়া থাকিবে। এদিকে হ্যাম্পটন-বিদ্যালয়ের ও কৃষিবিভাগ এবং শিল্পবিভাগ সবিশেষ পুষ্টিলাভ করিবে। সুতরাং এই নৈশবিদ্যালয়ের দ্বারা অশেষ উপকার হইবার সম্ভাবনা।

আর্মষ্ট্রঙ্গ মহোদয় তাঁহার এই নব প্রস্তাবিত বিদ্যালয়ের ভার আমায় দিলেন। প্রায় ১২ জন উৎসাহী ও কর্ম্মঠ ছাত্র ও ছাত্রী লইয়া নৈশবিদ্যালয়ের কার্য্য আরম্ভ করা গেল। দিবাভাগে পুরুষেরা বিদ্যালয়ের করাতখানায় কাজ করিত এবং মেয়েরা ধোপার কর্ম্ম করিত। দুই কাজই অত্যধিক কঠিন ছিল। কিন্তু তাহারা বেশ ভাল করিয়া করিত। এদিকে নৈশবিদ্যালয়ের জন্য পড়া প্রস্তুতও তাহারা মনোযোগের সহিত করিত। লেখাপড়া শেষ করিবার ঘণ্টা বাজিয়া গেলেও তাহারা উহাতে লাগিয়া থাকিত। ঘুমাইতে যাইবার সময় হইয়া যাইবার পরেও তাহারা আমাকে তাহাদিগের পড়া বুঝাইয়া দিতে অনুরোধ করিত।

ইহাদিগের দিনের ও রাত্রের কাজ দেখিয়া আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়াছিলাম। ইহাদের পরিশ্রম স্বীকার এবং বিদ্যাভ্যাসে মনোযোগের জন্য ইহাদিগকে আমি একটা নূতন নাম দিয়াছিলাম। তাহাদিগকে “কর্ম্মঠ সমিতির” সদস্য বলিয়া ডাকিতাম। ক্রমে হ্যাম্পটন বিদ্যালয়ের মধ্যে তাহাদের সুনাম ছড়াইয়া পড়িল—হ্যাম্পটনের বাহিরেও এই নামের আদর হইতে লাগিল। নৈশবিদ্যালয়ের ছাত্রদিগকে আমি ছাপান সার্টিফিকেটও দিতে আরম্ভ করিলাম। তাহাতে এইরূপ লেখা থাকিত—

সপ্তম অধ্যায়

টাস্কেজীতে পল্লীপর্য্যবেক্ষণ

এবার হ্যাম্পটনে আমার অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা এক সঙ্গে চলিয়াছিল। আমি প্রকৃত প্রস্তাবে একজন ছাত্র-শিক্ষকভাবে জীবন যাপন করিয়াছিলাম।

লোহিত ‘ইণ্ডিয়ান’ ছাত্রদিগের পরিদর্শন আমার হাতে ছিল। নবপ্রতিষ্ঠিত নৈশবিদ্যালয়ের শিক্ষকতাও আমি করিতাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার নিজের উচ্চশিক্ষালাভও চলিতেছিল। আমি হ্যাম্পটন-বিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের সাহায্যে কতকগুলি নূতন বিষয় শিখিতে লাগিলাম। তাঁহার নাম রেভারেণ্ড ডাক্তার এইচ, বি, ফ্রিমেল। আর্মস্ট্রঙ্গের মৃত্যুর পর ইনি হ্যাম্পটনের পরিচালক হইয়াছেন।

নৈশবিদ্যালয়ে একবৎসর “কর্ম্মঠসমিতি” কে পড়াইলাম। দৈবক্রমে তাহার পর আমার একটা অভাবনীয় সুযোগ আসিল। তাহাতেই আমার জীবন-কর্ম্ম আবদ্ধ হয়—সেই কাজেই আমি এখনও লাগিয়া আছি।

১৮৮১ খৃষ্টাব্দ অর্থাৎ আমার যখন প্রায় ২২।২৩ বৎসর বয়স সেই সময়কার কথা বলিতেছি। একদিন সন্ধ্যাকালে গির্জ্জার কার্য্য শেষ হইবার পর সেনাপতি আর্মষ্ট্রঙ্গ আমাকে বলিলেন; “দেখ, আমি আলাবামা প্রদেশ হইতে একখানা চিঠি পাইয়াছি। কয়েক জন লোক সেখানে একটা শিক্ষক-বিদ্যালয় খুলিতে চাহেন। এই বিদ্যালয়ে নিগ্রোজাতিরই শিক্ষার ব্যবস্থা হইবে। সম্ভবতঃ টাস্কেজী নামক একটি ক্ষুদ্র নগরে তাঁহাদের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হইবে। কিন্তু তাঁহাদের একজন পরিচালক আবশ্যক। তাঁহারা আমার নিকট লোক চাহিয়াছেন।”

আলাবামার পত্রলেখকগণ ভাবিয়াছিলেন, তাঁহাদের প্রস্তাবিত বিদ্যালয়ের জন্য নিগ্রোজাতীয় শিক্ষক পাওয়া যাইবে না। তাঁহাদের বিশ্বাস ছিল সেনাপতি মহাশয় তাঁহাদিগকে একজন শ্বেতকায় লোকেরই নাম করিবেন।

পরদিন সকালে সেনাপতি আমাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। আমি ঐ কাজ লইতে প্রস্তুত আছি কি না জিজ্ঞাসা করায় আমি বলিলাম “চেষ্টা করিতে পারি।” তিনি আলাবামায় উত্তর দিলেন “আমি একজন নিগ্রোকে পছন্দ করিয়াছি তাঁহার নাম বুকার ওয়াশিংটন। কোন শ্বেতাঙ্গের সন্ধান আমি দিতে পারিলাম না। যদি এই নিগ্রো যুবককে আপনারা গ্রহণ করিতে প্রস্তুত থাকেন পত্রপাঠ লিখিবেন। ইহাঁকে পাঠাইয়া দিব।”

কয়েক দিন পরে আর্মষ্ট্রঙ্গের নিকট একটা তার আসিল। তিনি ছাত্রদের সঙ্গে রবিবারে সন্ধ্যা উপাসনা করিতেছিলেন। কার্য্য শেষ হইয়া গেলে তিনি তারের খবর ছাত্রদিগকে দিলেন। তাঁহাতে লেখা ছিল:—“বুকার ওয়াশিংটনের দ্বারা কাজ বেশ চলিবে। শীঘ্রই তাঁহাকে পাঠাইয়া দিন।”

বিদ্যালয়ের মধ্যে আনন্দ উৎসব হইল। শিক্ষক ও ছাত্রগণ মিলিয়া আমাকে বিদায়ভোজ দিলেন। আমি টাস্কেজী যাত্রা করিলাম। পথে কয়েকদিন আমার পল্লী ম্যাল্‌ডেনে কাটাইয়া গেলাম।

আলাবামায় টাস্কেজী একটি ক্ষুদ্র নগর। ইহার লোক সংখ্যা মাত্র ২০০০। তাহার মধ্যে ১০০০ নিগ্রো! দক্ষিণপ্রান্তের “কৃষ্ণবিভাগে” এই জনপদ অবস্থিত। আলাবামা প্রদেশের অনেকগুলি “কাউণ্টি” বা জেলা। তাহার কয়েকটিতে নিগ্রোসংখ্যা খুব বেশী। কোন জেলায় শতকরা ৬০, কোন জেলায় শতকরা ৭৫ জন, কোন জেলায় এমন কি শত করা ৯০ জন নিগ্রোর বাস। যে জেলায় টাস্কেজী নগর সেই জেলায় শ্বেতাঙ্গদিগের সংখ্যা নিতান্তই অল্প। এই জন্যই বোধ হয় ঐ অঞ্চলকে কৃষ্ণ-বিভাগ বলা হইত

শুনিয়াছি ঐ অঞ্চলের মাটি কাল বলিয়া উহার নাম কৃষ্ণবিভাগ হইয়াছিল। কাল মাটিই উর্ব্বর। এজন্য চাষাবাদের সুবিধা এই সকল স্থানে বেশী। কাজেই এ অঞ্চলে গোলাম খাটাইলে লাভ হইবার আশা যথেষ্ট। এই সকল কারণে গোলামীর যুগে গোলামখানা, গোলামাবাদ ইত্যাদি এই বিভাগকে ছাইয়া ফেলিয়াছিল। একে কাল মাটি তাহার উপর কাল লোকের বাস। সুতরাং কৃষ্ণ-বিভাগ নাম শীঘ্রই সমাজে প্রচারিত হইয়া গেল। আমাদের স্বাধীনতালাভের পর হইতে কৃষ্ণ-বিভাগ বলিলে প্রদেশ বিশেষ বুঝায়। আজকাল যেসকল স্থানে নিগ্রোর সংখ্যা বেশী সেই সকল স্থান কৃষ্ণ-বিভাগের অন্তর্গত বুঝিতে হইবে।

টাস্কেজীতে পৌঁছিবার পূর্ব্বে মনে করিয়াছিলাম যে, ওখানে বাড়ীঘর সাজসরঞ্জাম ইত্যাদি সকলই বোধ হয় আছে। আমাকে যাইয়াই শিক্ষকতার কর্ম্ম আরম্ভ করিতে হইবে। আমি পৌঁছিয়া দেখি কিছুই নাই বাড়ী ঘর আস্‌বাব পত্রত নাইই, এমন কি বিদ্যালয়ের জন্য কোন স্থানও নির্ব্বাচিত হয় নাই। সবই আমাকে নিজ হাতে করিয়া লইতে হইবে। তবে একথা আমি বলিতে বাধ্য যে, এখানে ইট কাঠ, চূণ শুরকি, খাতাপত্র ইত্যাদি নির্জ্জীর পদার্থ ছিল না সত্য। কিন্তু এই সমুদয় অপেক্ষা সহস্রগুণ মূল্যবান্ এবং প্রয়োজনীয় পদার্থ ছিল। সে ওখানকার নিগ্রো সন্তানগণের শিখিবার আকাঙ্ক্ষা, মানুষ হইবার ব্যাকুলতা, জ্ঞানার্জ্জনের জন্য আন্তরিক পিপাসা। তাহাদের বিদ্যালাভের নিমিত্ত আগ্রহ দেখিয়া আমি বুঝিলাম এবং মনে মনে বলিলাম যে “ইহাই বিদ্যালয়, এই ক্ষুধা ও পিপাসাই বিদ্যালয়ের প্রাণ। এই ব্যাকুলতা হইতেই বিদ্যালয়ের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হইবে। এই প্রাণ হইতেই শরীর আসিবে। জায়গাজমি বাড়ীঘর আলমারী চেয়ার ইত্যাদির অভাব এই আন্তরিকতাই পূরণ করিয়া লইবে। যেখানে আত্মা আছে সেখানে দেহের অভাব থাকিবে না।”

টাস্কেজী সহরটা নিগ্রো-বিদ্যালয়ের পক্ষে একটি অতি উপযুক্ত স্থান মনে হইল। ইহার চারিদিকেই অনেকগুলি নিগ্রো-পল্লী। স্থানও কিছু নির্জ্জন—বড় রেল রাস্তা হইতে প্রায় ৫।৬ মাইল দূরে। অথচ তাহার সঙ্গে একটা ছোট রেল লাইনের যোগ ছিল। তাহা ছাড়া আর একটা সুবিধাও দেখিলাম। এই পল্লীর শ্বেতাঙ্গগণ বিদ্যার আদর করিতেন। গোলামীর যুগ হইতে এখন পর্য্যন্ত এখানে শ্বেতাঙ্গেরা একটা বিদ্যালয় চালাইয়া আসিতেছিলেন। সুতরাং লেখা পড়ার একটা আব্‌হাওয়া এই অঞ্চলে মানসিক ও নৈতিক স্বাস্থ্যের সৃষ্টি করিত। অধিকন্তু নিগ্রোরাও নিতান্ত দুশ্চরিত্র ছিল না। তাহারা লিখিতে পড়িতে পারিত না বটে, কিন্তু শ্বেতাঙ্গদিগের সংস্পর্শে আসিয়া অনেক বিষয়ে তাহারা উন্নত হইয়া ছিল। দুই জাতির মধ্যে সদ্ভাবও মন্দ বুঝিলাম না। একটা দৃষ্টান্ত দিতেছি। এই সহরে একটা ধাতুর কারখানা ছিল। একজন শ্বেতাঙ্গ ও একজন নিগ্রো দুই জনে মিলিয়া ইহার যৌথ মালিক ও স্বত্ত্বাধিকারী ছিলেন। শ্বেতাঙ্গ মালিকের মৃত্যুর পর ইহা সর্ব্বাংশে নিগ্রোর সম্পত্তি হয়।

আমি এক বৎসর পূর্ব্বেকার বৃত্তান্ত অবগত হইলাম। হ্যাম্পটনের সুনাম এ অঞ্চলে বেশ কাজ করিতে ছিল বুঝিতে পারিলাম। টাস্কেজীর নিগ্রো সমাজ হ্যাম্পটনের আদর্শে এখানে একটি শিক্ষক বিদ্যালয় খুলিতে চাহিয়াছিলেন। এজন্য তাঁহারা আলাবামার প্রাদেশিক রাষ্ট্রের নিকট আবেদন করিয়া বার্ষিক ৬০০০৲ পাইবার আশা পাইয়াছেন। রাষ্ট্রের কর্ত্তারা নিয়ম করিয়াছেন যে, এই টাকা হইতে শিক্ষকগণের বেতনাদি দেওয়া যাইবে মাত্র। জমি, বাড়ী আস্‌বাব লাইব্রেরী ইত্যাদির জন্য এই টাকা হইতে কিছু মাত্র খরচ করিতে পারা যাইবে না।

আমাকে পাইয়া নিগ্রোরা যারপরনাই সন্তুষ্ট হইল। সকলেই নানা উপায়ে আমার কার্য্যে সাহায্য করিতে আসিল।

আমি প্রথমেই স্থান খুঁজিতে বাহির হইলাম। একটা জায়গা পাওয়া গেল। সহরের মধ্যে নিগ্রোদিগের একটা ধর্ম্মমন্দির ছিল তাহারই পার্শ্বে একটা ভাঙ্গা বাড়ী দেখিতে পাইলাম। এই “পোড়ো বাড়ী”-টাতেই বিদ্যালয় খোলা হইল। বিশেষ বিশেষ উৎসবাদি বা বক্তৃতা ও সম্মিলনের জন্য গির্জ্জাঘরটি ব্যবহার করিতাম।

ঘর দুইটাই অতি জীর্ণ অবস্থায় ছিল। বর্ষাকালে ঘরের ভিতর বৃষ্টির জল চুঁইতে থাকিত। অনেক দিন ছাত্রেরা আমার মাথায় ছাতা ধরিয়া বসিত—আমি ছেলেদের পড়া শুনিতাম। কোন কোন সময়ে আমি যখন খাইতে বসিতাম আমাদের বাড়ীর মালিক আমার মাথায় ছাতা ধরিয়া দাঁড়াইতেন।

আলাবামার নিগ্রোরা এসময়ে রাষ্ট্রনৈতিক হুজুগে খুব মাতিয়া গিয়াছিল। তাহাদের ইচ্ছা, আমিও তাহাদের আন্দোলনে যোগ দিয়া তাহাদের কার্য্যে সাহায্য করি। তাহারা অন্য জাতীয় লোককে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে বেশী বিশ্বাস করিত না। এজন্য তাহারা আমাকে রাষ্ট্রীয় আন্দোলনে যোগ দিতে বড় পীড়াপীড়ি করিল। এক বৃদ্ধ আসিয়া আমার কাণে প্রায়ই জপিত—“ভায়া, তুমি এবার কাহাকে ভোট দিবে স্থির করিয়াছ? আমার ইচ্ছা আমরা যাঁহাকে দিব মনে করিয়াছি তাঁহাকেই তুমিও দিও। অনুরোধটা রাখিবে কি? আমরা কাগজ পত্র পড়িতে জানি না, জানইত। কিন্তু তাহা হইলে কি হয়? আমরা ভোট দিতে শিখিয়াছি। আমাদের ইচ্ছা তুমিও আমাদের মতানুসারেই ভোট দাও।” আর একজন বলিল, “আমরা কেমন করিয়া ভোট দিয়া থাকি জান? সাদা চামড়া ওয়ালারা কি করে আগে দেখি। দূরে দূরে থাকিয়া খবর লই তাহারা কাহাকে ভোট দিল। যখন আমাদের ভোট দিবার পালা আসে আমরা চোখ কাণ বুঁজিয়া ঠিক তাহাদের উল্টা করি। কি বল, ভায়া, আমরা মন্দ করি কি?”

এই ছিল বিশ বৎসর আগেকার নিগ্রো রাষ্ট্রনীতি, আজ আমি আনন্দের সহিত বলিতে পারি যে, এরূপ মনোভাব আমাদের সমাজ হইতে চলিয়া গিয়াছে। আমরা এখন কর্ত্তব্য বুঝিয়াই কাজ করিয়া থাকি। শ্বেতাঙ্গ যাহা করে কৃষ্ণাঙ্গের ঠিক তাহার বিপরীত করা উচিত—এরূপ ভাবনা আমাদের নিগ্রো মহলে অনেকটা কমিয়াছে।

১৮৮১ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে আমি টাস্কেজীতে পৌঁছি। প্রথম মাসেই আমি বিদ্যালয়ের জন্য স্থান বাছিয়া লইলাম এবং আলাবামা প্রদেশের জেলায় জেলায় ভ্রমণ করিলাম। লোক জনের আর্থিক অবস্থা, নৈতিক অবস্থা, সামাজিক অবস্থা সবই তন্ন তন্ন করিয়া বুঝিতে যত্ন লইলাম। সঙ্গে সঙ্গে জেলাগুলির ভিন্ন ভিন্ন পল্লীতে টাস্কেজী বিদ্যালয়ের কথা প্রচার করিয়া বেড়াইলাম। অভিভাবকগণের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করিয়া ছাত্র সংগ্রহেও নিযুক্ত রহিলাম!

আমি অধিকাংশ সময়টা পল্লীতে পল্লীতে ভ্রমণ করিয়া কাটাইতাম। একটা গরুর গাড়ীতে অথবা একটা খচ্চরে চড়িয়া আমার এই ‘সফর’ হইত। দরিদ্র পল্লীবাসীদিগের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কামরায় আতিথ্য গ্রহণ করিতাম। তাহাদের সঙ্গেই খাওয়া দাওয়া এবং সুখ দুঃখের গল্প চলিত। তাহাদের বাগান আবাদ পাঠশালা মন্দির ইত্যাদি সবই দেখিতাম। অবশ্য তাহাদিগকে আগে কোন খবর পাঠাইতাম না। হঠাৎ যে গ্রামে যাইয়া উপস্থিত হইতাম তাহার কোন গৃহস্থের ঘরে অতিথি হইয়া পড়িতাম। এ জন্য তাহারা আমাকে আদর অভ্যর্থনা ইত্যাদি করিবার সুযোগ পাইত না। ইহাতে আমার লাভই হইত। কারণ এই উপায়ে তাহাদের স্বাভাবিক “আটপৌরে” চাল চলন বেশ ভাল রকম বুঝিতে পারিতাম

এইরূপে আলাবামা প্রদেশের পল্লীতে পল্লীতে ভ্রমণ করিয়া নিগ্রোসমাজের পূর্ব্বাপর সকল অবস্থাই আমি জানিতে পারিলাম। আমি শেষে এই অঞ্চলের জেলা, নগর, গ্রাম, রাস্তাঘাট, অলিগলি ইত্যাদি আমার নখদর্পণে দেখিতে পাইতাম।

নিগ্রো সমাজে দারিদ্র্যের প্রকোপ অত্যধিক দেখিলাম। তাহাদের বাড়ীঘর ছিলই না বলিলে অন্যায় হইবে না। একটা ছোট কামরার মধ্যে সমস্ত পরিবার শুইয়া থাকিত। আত্মীয় স্বজন কুটুম্ব বন্ধুবান্ধব অতিথি সকলেরই সেই কামরায় স্থান হইত। আমাকে এইরূপ সকলের সঙ্গে একই কামরায় এবং এমন কি একই বিছানায় বহু রাত্রি কাটাইতে হইয়াছে। স্নানের সুবিধা প্রায় কোন বাড়ীতেই থাকিত না। এমন কি মুখ হাত ধুইবারও জায়গা ছিল না। তবে ঘরের বাহিরে উঠানের কোন স্থানে হাত পা ধুইবার জন্য জল রাখা হইত।

রুটি ও শূকরের মাংস প্রধান খাদ্য ছিল। রুটি ও ডাল ছাড়া অনেক পরিবারে আর কোন খাদ্য জুটিত না। নিকটবর্ত্তী কোন সহরের দোকান হইতে পল্লীবাসীরা বেশী দামে মাংস ও রুটি ইত্যাদি কিনিয়া আনিত। বড়ই আশ্চর্য্যের কথা, তাহারা নিজে জমি চষিয়া শাকশব্জী ফলমূল ইত্যাদি তৈয়ারী করিয়া লইতে চেষ্টা করিত না। এমন কি, এ বিষয়ে তাহাদের কেন ধারণাই ছিল না। দুনিয়ায় যাহা কিছু কিনিতে পাওয়া যায় তাহার সমস্তই যে ঘরের সম্মুখবর্ত্তী জমিতে উৎপন্ন করিয়া লওয়া যাইতে পারে এ কথা তাহারা ভাবিতে পারিত না। সহর হইতে মামুলি ডাল, আটা ও মাংস বেশী পয়সায় কিনিয়া আনিতেও তাহারা প্রস্তুত। অথচ অল্প ব্যয়ে সুখে খাইবার পরিবার সুযোগ যে তাহাদের বাড়ীতেই রহিয়াছে তাহা এই সকল পল্লীর অধিবাসীরা জানিতই না! ঘরে তাহারা শস্য যে একেবারে বুনিতই না—তাহা নয়। তাহারা কেবলমাত্র তূলার চাষই করিতে শিখিয়াছিল। এদিকে তাহারা এতই মজিয়াছিল যে, ঘরের দুয়ার পর্য্যন্ত তাহাদের তূলার ক্ষেত আসিয়া পৌঁছিত। তথাপি দুই চারি হাত জমি স্বতন্ত্র করিয়া দৈনিক আহারের জন্য ফসল তৈয়ারী করিতে তাহারা যত্ন লইত না।

দুঃখের কথা আর কি বলিব? এই সকল দরিদ্রের কুটীরে অনেক স্থলে আমি মহামূল্য শেলাইয়ের কলও দেখিয়াছি। প্রায় ২০০৲ দিয়া কল কেনা হইয়াছে কিন্তু ব্যবহার করিবার যোগ্যতা খুব কম লোকেরই দেখিতে পাইতাম। মাস মাস আংশিকভাবে, ৫৲ বা ১০৲ করিয়া তাহারা অতি কষ্টে কলের দাম শোধ করিত কিন্তু কল ঘরের এক কোণে পড়িয়াই থাকিত। আবার সৌখীন ঘড়িও অনেক পরিবারের আস্‌বাবের মধ্যে দেখিতাম। জিজ্ঞাসা করিয়া জানিয়াছি—এই সকল ঘড়ির মূল্য প্রায় ৫০৲! এ দিকে ত এত সভ্যতা, বিলাস ও বাবুগিরির লক্ষণ। কিন্তু সামান্য গ্রাসাচ্ছাদনের নিয়মই তাহারা শিখে নাই। তাহারা খাইতেই জানিত না। আমি এক গৃহস্থের বাড়ীতে অতিথি হইয়াছিলাম। তাহার ঘরে ঐ সকল হাল ফ্যাশনের আস্‌বাব পত্র কিছু কিছু ছিল। কিন্তু খাইতে বসিয়া দেখি—একটা টেবিলে আমরা পাঁচ জন খাইতেছি অথচ একটি মাত্র চামচ! এবং একটি মাত্র কাঁটা! ঐ একটির দ্বারাই পাঁচ জনের কাজ চালাইতে হইল! অথচ সেই কামরারই এক কোণে একটা প্রকাণ্ড টেবিল হারমনিয়াম শোভা পাইতেছে। তাহার মূল্য ২০০৲। দেখিয়া অবাক্ হইলাম আর ভাবিলাম ইহাদের কি কাণ্ডজ্ঞান নাই! ‘অর্গ্যান’ বাজাইয়া সভ্য হইতে শিখিয়াছে—অথচ এখনও আহারের নিয়মই জানে না।

অবশ্য বলা বাহুল্য প্রায়ই দেখিতাম মালিকেরা কেহই অর্গ্যান বাজাইতে জানে না। ঘড়ি দেখিয়া সময় বলিবার বিদ্যা কাহারও নাই। ঘড়ি মেরামত করা ত দূরের কথা, কাঁটা চালাইয়া সময় ঠিক রাখিতেই কেহ জানিত না। ব্যবহারাভাবে উহার চাবি নষ্ট হইয়া গিয়াছে। আর শেলাইয়ের কলও যত্নাভাবে এবং লোকা ভাবে ধ্বংসের পথে যাইতেছে। অথচ অত দামী জিনিষের মূল্য একবারে দিবার ক্ষমতা নাই বলিয়া তখনও মাসিক ৫।৭৲ হিসাবে দাম শোধ করা হইতেছে!

এক বাড়ীতে আমি পরিবারের সকলের সঙ্গে টেবিলে খাইতে বসিলাম। তাহারা যে টেবিলে খাইতে শিখিয়াছে আমার বিশ্বাস হইল না। অতটা সৌন্দর্য্য জ্ঞান তাহাদের জন্মে নাই। অনুসন্ধানে বুঝিতে পারিলাম যে, আমি একজন ভদ্রলোক তাহাদের গৃহে অতিথি হইয়াছি, কাজেই আমার খাতিরে তাহারা টেবিলে খানা পরিবেষণের আয়োজন করিয়াছে।

সাধারণতঃ তাহাদের ভোজন-ব্যাপার নিতান্তই পশুজনোচিত। ঘুম হইতে উঠিয়া নিগ্রোরমণী উনানে কড়া চাপাইয়া দেয় তাহাতে মাংস, ডাল, যাহা হউক ভাজা হইতে থাকে। দশমিনিট পরেই উহা নামাইয়া লওয়া হয়। খানা প্রস্তুত হইয়া গেল! বাড়ীর কর্ত্তা কাজে বাহির হইবার সময়ে হাতে একটা রুটি আর কিছু তরকারী লইয়া যায়। পথে খাইতে খাইতে কর্ম্মক্ষেত্রে উপস্থিত হয়। স্ত্রী ঘরের এক কোণে বসিয়া হয়ত খাইতে থাকে অথবা উননের কড়া হইতেও খানিকটা মুখে দিয়া চিবাইতে থাকে। আর ছেলেপিলেরা উঠানে দৌড়াদৌড়ি করিতে করিতে রুটি ও মাংস যাহা পায় তাহাই গলাধঃকরণ করে। অবশ্য ছেলেদের কপালে মাংস প্রায়ই জুটিত না। মাংসের দাম খুব বেশী।

সকালবেলার খাওয়া এইরূপে সমাপ্ত হইত। পরমুহূর্ত্তে সকলে সপরিবারে তূলার ক্ষেতে হাজির। ছেলে বুড়া কেহই বাড়ীতে থাকিত না। সকলকেই যে যেমন পারে খাটিতে হইত। খোকা পর্য্যন্ত মাঠে যাইত। তূলার বস্তার পাশে তাহাকে বসাইয়া রাখা হইত। মা কাজ করিতে করিতে মাঝে মাঝে তাহাকে দেখিয়া আসিত। মধ্যাহ্ন-ভোজন এবং নৈশভোজন ব্যাপারও সকালবেলার আহারেরই মত ছিল।

তাহাদের নিত্যকর্ম্মপদ্ধতি এইরূপ। শনিবার ও রবিবারের জীবনযাপন প্রণালী কিছু স্বতন্ত্র। শনিবার নিগ্রোরা সপরিবারে সহরে আসিত। সমস্ত দিনটাই প্রায় সহরে কাটাইত। সহরে যাইত ‘বাজার করিতে’! অথচ তাহাদের যা অবস্থা তাহাতে দশ মিনিটের বেশী বাজার করিবার জন্য কোন মতেই লাগিতে পারে না। আর একজন লোক গেলেই চলিতে পারে। কিন্তু তাহা হইবে না। সমস্ত পরিবারই বাজারে যাইবে! ৮।১০ ঘণ্টা সহরে থাকিয়া বাড়ীতে ফিরিত। দিনটা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরিয়া বেড়াইত। মেয়ে পুরুষ জায়গায় জায়গায় জটলা করিয়া নাকে নস্যি গুঁজিত অথবা ধূমপান করিত। এই গেল শনিবারের পালা।

রবিবার তাহারা একটা বড় সভা করিত। সেই সভায় খোসগল্প বেশ চলিত।

তাহাদের আর্থিক অবস্থা বড়ই শোচনীয় দেখিতাম। প্রায় জেলারই পল্লীবাসীরা ঋণগ্রস্ত। শস্য যাহা উৎপন্ন হইত সমস্তই পূর্ব্ব হইতে পাওনাদারদিগের নিকট ‘বন্ধকি’ থাকিত।

পাঠশালা গ্রামে গ্রামে দেখিয়াছি সত্য কিন্তু প্রাদেশিক রাষ্ট্র তাহাদের জন্য বাড়ী ঘর জায়গা জমির কোন ব্যবস্থা করেন নাই। কোন গির্জ্জাঘরে অথবা মামুলি কাঠের কুঠুরীতে স্কুল বসিত। শীতকালে ঘরগুলি গরম রাখিবার কোন বন্দোবস্তই ছিল না। ছেলে ও মাষ্টারেরা বড় কষ্ট ও অসুবিধা ভোগ করিত। উঠানের এক স্থানে কাঠের আগুন জ্বালান হইত। আগুন পোহাইবার জন্য ঘর হইতে ছাত্র ও শিক্ষকেরা প্রয়োজন মত বাহিরে আসিত। এদিকে শিক্ষকদের যেমন বিদ্যা তেমন চরিত্র।

পাঁচ মাস করিয়া বৎসরে স্কুল খোলা থাকিত। একটা চোঁথা কাল বোর্ড ছাড়া বিদ্যালয়ের আবাব কিছুই কোথায়ও দেখি নাই। পুস্তকাদি সাজসরঞ্জাম ছিল না। একবার একটা ‘পোড়ো’ কাঠের কামরায় ঢুকিয়া দেখি—পাঁচজন ছাত্র জড়াজড়ি করিয়া একখানা বই পড়িতেছে! প্রথম দুইজন সম্মুখে বসিয়া পুস্তকখানা ধরিয়া আছে। ইহাদের পশ্চাতে আর দুইজন দাঁড়াইয়া প্রথম দুইজনের ঘাড়ের উপর দিয়া দেখিতেছে। এই চারিজনের পশ্চাতে একটি ছেলে উঁকি মারিয়া, যাহা হয়, পড়া বুঝিতেছে।

বিদ্যালয়ের যেরূপ অবস্থা ধর্ম্মমন্দিরগুলির অবস্থা তাহা অপেক্ষা ভাল নয়। গির্জ্জাঘরগুলি জীর্ণশীর্ণ। ধর্ম্মপ্রচারকগণও বিদ্যায় এবং চরিত্রে শিক্ষক মহাশয়গণেরই অনুরূপ।

আলাবামা প্রদেশে বেড়াইতে বেড়াইতে আমি কয়েকটি লোকের সাক্ষাৎ পাইয়াছিলাম। তাহাদের সঙ্গে কথা বার্ত্তায় নিগ্রোজাতির চিন্তার ধারা বুঝিতে পারিলাম। একটি দৃষ্টান্ত দিতেছি। তাহাতেই আপনারা বুঝিবেন ইহাদের মনের গতি কিরূপ ছিল। একজনকে আমি তাহার বংশ-কথা ও পরিবারের ইতিহাস সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। তাহার বয়স ৬০ বৎসর। সে বলিল তাহার জন্ম ভার্জ্জিনিয়ায়। ১৮৪৫ সালে, সে বিক্রি হইয়া আলাবামায় আসিয়াছে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম “তোমার সঙ্গে কয়জন বিক্রি হইয়া আলাবামা প্রদেশে আসিয়াছিল?” সে বলিল, “আমরা সর্ব্বসমেত পাঁচজন ছিলাম—আমি, আমার ভাই এবং তিনটি খচ্চর।”

জানোয়ার ও মানুষ যে একই শ্রেণীর অন্তর্গত নয় এই বৃদ্ধ গোলামের চিন্তায় তাহা আসিত না। প্রকৃতপক্ষে গোলামী করিতে করিতে মানুষে আর পশুতে কোন প্রভেদই থাকে না। মনিবেরাও মানুষে এবং পশুতে কোন প্রভেদ রাখেন না। পশু ও যেমন তাঁহার সম্পত্তি, গোলামও অঁহার ঠিক সেইরূপই সম্পত্তি বিশেষ।

অষ্টম অধ্যায়

আস্তাবলে বিদ্যালয়

আলাবামা প্রদেশের পল্লী-সমাজগুলি দেখিয়া আমার কার্য্যের দায়িত্ব বেশ বুঝিতে পারিলাম। আমি কর্ম্মক্ষেত্রে একাকী, অথচ সমাজের সর্ব্বত্রই অভাব, দুঃখ, দারিদ্র্য ও অজ্ঞতা! এই সমুদয় নিবারণ করা কি একজনের পক্ষে সম্ভবপর? আমার বোধ হইতে লাগিল যেন আমি অসাধ্য-সাধনে ব্রতী হইয়াছি।

নিগ্রো-পল্লীগুলির মধ্যে একমাস কাল ছিলাম। তাহাতে আমার কার্য্যপ্রণালী সম্বন্ধে অনেক ইঙ্গিত লাভ করিলাম। মোটের উপরে বুঝিয়া লইলাম যে, নিউ ইংলণ্ড অঞ্চলের ইয়াঙ্কি মহলে যে নিয়মে বিদ্যাদান করা হইয়া থাকে, এ অঞ্চলে ঠিক সেই নিয়মে শিক্ষাবিস্তার করিলে সুফল পাওয়া যাইবে না। এখানে একটা সম্পূর্ণ নূতন ধরণের পঠনপাঠনের রীতি চালান আবশ্যক। আমি ভাবিলাম যে, বোধ হয় সেনাপতি আর্মষ্ট্রঙ্গ হ্যাম্পটন বিদ্যালয়ের জন্য যে নিয়ম আবিষ্কার করিয়াছেন টাস্কেজীর বিদ্যালয়ে সেই নিয়ম প্রয়োগ করা চলিতে পারে। কেবলমাত্র পুঁথিগত বিদ্যায় পণ্ডিত করিয়া ছাড়িয়া দিলে নিগ্রোদিগের উপকার করা হইবে না। নিগ্রো বালকের সমগ্রজীবনই তৈয়ারী করিবার ব্যবস্থা করা কর্ত্তব্য।

১৮৮১ সালের ৪ঠা জুলাই তারিখে সেই পোড়ো বাড়ীতে স্কুল খুলিলাম। কৃষ্ণাঙ্গ-সমাজ খুব উৎসাহের সহিত আমার কার্য্যে সাহায্য করিল। শ্বেতাঙ্গ-সমাজের অনেকেই আমার উপর বিরক্ত হইলেন। তাঁহারা নিগ্রোমহলে শিক্ষাবিস্তারের বিরোধী। তাঁহাদের বিশ্বাস নিগ্রোরা লেখা পড়া শিখিলে ক্ষেতের জন্য কুলী পাওয়া যাইবে না—গৃহস্থালীর জন্য চাকর জুটিবে না। নিগ্রোরা আর শারীরিক পরিশ্রম করিতে অস্বীকার করিবে—তাহাদের মধ্যে বিলাস ও বাবুগিরি প্রবেশ করিবে। ফলতঃ দেশময় আর্থিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিপ্লব উপস্থিত হইবে।

শ্বেতাঙ্গদের এরূপ বিশ্বাসের যথেষ্ট কারণও ছিল। এতদিন যে সকল নিগ্রো লেখা পড়া শিখিয়াছে তাহারা সকলেই বাবু! আজ কাল মাথায় লম্বা টুপি, চোখে সোণার চস্‌মা, হাতে গিল্টি করা ছড়ি, পায়ে সৌখীন বুট—ইত্যাদি আমাদের “শিক্ষিত” নিগ্রোর লক্ষণ হইয়া পড়িয়াছে। কাজেই আরও শিক্ষার প্রসার হইলে নিগ্রোরা যে ক্রমশঃ কিম্ভূতকিমাকার জানোয়ার হইয়া পড়িবে এরূপ সন্দেহ করা অন্যায় নহে। কিন্তু বিদ্যাশিক্ষার আদর্শ বদলান যায়, এবং আদর্শ বদলাইতে পারিলে শিক্ষিত লোকের মতি গতি, ভাব ভঙ্গী ইত্যাদিও বদলান যায়। যথার্থ শিক্ষাপ্রচার করিতে পারিলে প্রকৃত ‘মানুষ’ই গড়িয়া তোলা সম্ভব। এই শ্বেতাঙ্গগণ তাহা বুঝিতেন না। এজন্য তাঁহারা আমার কর্ম্মের বিরুদ্ধেও দাঁড়াইলেন।

যাহ। হউক, টাস্কেজীতে শিক্ষাপ্রচার-কর্ম্মে আমার দুইজন বন্ধু মিলিয়াছিল। একজন শ্বেতাঙ্গ, আর একজন কৃষ্ণাঙ্গ। ইহাঁরাই সেনাপতি আর্মষ্ট্রঙ্গকে লোকের জন্য লিখিয়াছিলেন। ইহাঁরা বিগত বিশবৎসর ধরিয়া আমার কার্য্যে সাহায্য করিয়া আসিতেছেন।

শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির নাম জর্জ্জ ক্যাম্পবেল। ইনি পূর্ব্বে অনেক ক্রীতদাসের মালিক ছিলেন। এক্ষণে ইনি একজন বড় সওদাগর। শিক্ষাপরিচালনা সম্বন্ধে ইহাঁর অভিজ্ঞতা যৎসামান্য। কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির নাম লুইস য়্যাডাম্‌স্‌। ইনি পূর্ব্বে গোলামী করিয়াছেন, এক্ষণে চামড়ার কাজ ও লোহা পিত্তল দস্তার কাজ করিয়া অন্ন সংস্থান করেন। গোলামীর যুগে ইনি জুতা তৈয়ারী, জুতা মেরামত, ঘোড়ার লাগাম তৈয়ারী, এবং কর্ম্মকার ও সূত্রধরের কার্য্য ইত্যাদি নানাবিধ কারিগরি শিক্ষা করিয়াছিলেন। ইনি কোনদিন বিদ্যালয়ে যাইয়া লেখা পড়া শিখেন নাই কিন্তু দেখিয়া শুনিয়া সামান্যরকমের কেতাবী-শিক্ষা লাভ করিয়াছেন।

বুঝিলাম, এই দুই ব্যক্তির জীবনে কর্ম্মেরই প্রাধান্য। ইহাঁরা কতকটা ‘আটপীঠে’ কর্ম্মঠ ও ‘করিতকর্ম্মা’ লোক। কাজেই আমার শিক্ষাপ্রণালী ইহাঁরা খুবই পছন্দ করিলেন।

এইসঙ্গে একটা কথা অবান্তরভাবে বলিতে চাহি। য়্যাডাম্‌সের বিচক্ষণতা এবং চিন্তাশীলতা দেখিয়া আমি বড়ই মুগ্ধ হইয়াছিলাম। চিরজীবন শৃঙ্খলার সহিত শিল্পে, কৃষিকার্য্যে অথবা ব্যবসায়ে লাগিয়া থাকিলে বুদ্ধিশক্তি যথেষ্টই মার্জ্জিত হয়। কর্ম্ম করিতে করিতে চিন্তা করিবার ক্ষমতা আপনা আপনি বাড়িতে থাকে। গ্রন্থপাঠ না করিয়াও সকল বিষয়ে স্বাধীনভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিবার যোগ্যতা জন্মে। আমার নিগ্রো বন্ধু য়্যাডাম্‌স্ এই কথার জীবন্ত দৃষ্টান্ত। তিনি গোলামীর যুগে শিল্পকর্ম্মে জীবনযাপন করিয়া উচ্চ অঙ্গের চিন্তাশক্তি অর্জ্জন করিয়াছিলেন। গোলামীযুগের শিক্ষা বাস্তবিক পক্ষে এই উপায়ে অনেক লোককে কর্ম্মঠ ও চিন্তাশীল করিয়া তুলিয়াছে। গোলামীর এই সুফল উল্লেখ করা আমি অবশ্য কর্ত্তব্য বিবেচনা করিতেছি। এমন কি, আমি এরূপও বলিতে চাহি যে, আজকাল দক্ষিণ অঞ্চলের লোকসমাজে কর্ম্মক্ষম ও বিচক্ষণ ব্যক্তিগণের মধ্যে নিগ্রোদের সংখ্যা নিতান্ত অল্প নয়। নিগ্রোদের এরূপ চিন্তাশীলতার কারণ গোলামীযুগের কৃষিকর্ম্মে অথবা শিল্পকার্য্যে অভ্যাস।

ত্রিশজন ছাত্র লইয়া পাঠশালা খোলা হইল। আমিই একমাত্র শিক্ষক। ছাত্রদের মধ্যে মেয়ে পুরুষ দুই-ই প্রায় সমান ভাবে ছিল। ইহারা সকলেই টাস্কেজীর সমীপবর্ত্তী পল্লীসমূহের অধিবাসী। আরও অনেক ছাত্র ভর্ত্তি হইতে চাহিল। কিন্তু আমরা নিতান্ত শিশু ছাত্র গ্রহণ করিলাম না। পনরবৎসর বয়সের কম কোন ছাত্র আমরা লই নাই। যাহারা পূর্ব্বে কিছু শিক্ষা পাইয়াছে এবং শিক্ষকতার কর্ম্মে নিযুক্ত আছে তাহাদিগকে লইয়া কার্য্য আরম্ভ করিলাম।

আমরা যে সকল ছাত্র গ্রহণ করিলাম তাহারা অনেকেই ৪০ বৎসরের হইবে। তাহাদের সঙ্গে কয়েকজন ছাত্রও আসিয়াছিল। দেখিতাম, অনেক ছাত্র তাহাদের শিক্ষকগণ অপেক্ষা বেশীই জানে। বিদ্যার্জ্জনের উদ্দেশ্য ও উপায় সম্বন্ধে এই শিক্ষক ও ছাত্রগণের মামুলি ধারণাই ছিল। তাহারা বড় বড় বই পড়িয়াছে—খুব কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার করিতে শিখিয়াছে। লম্বা চৌড়া নামওয়ালা বিষয়ের নাম করিতে পারিলেই তাহারা খুসী হয়। তাহারা ল্যাটিন ও গ্রীক ভাষায় কিঞ্চিৎ জ্ঞানের অধিকারী। তাহারা এই সকল ‘বড় কথা’র জাহির করিয়া বেড়াইতে অত্যধিক লালায়িত।

বিদেশীয় ভাষা শিখিবার ইচ্ছাটা নিগ্রোসমাজে একটা নেশায় পরিণত হইয়াছিল। আমি আলাবামা প্রদেশে পল্লীপর্য্যবেক্ষণ কালে দেখিতে পাই যে, একটি যুবক অতি কদর্য্য ঘরে অপরিষ্কার কাপড় চোপড় পরিয়া বসিয়া আছে, অথচ তাহার হাতে একখানা ফরাসী ভাষার ব্যাকরণ-গ্রন্থ।

আমার এই প্রথম ছাত্রদিগের পুঁথিগত বিদ্যার বড়াই দেখিয়া সত্যসত্যই লজ্জিত হইতাম। তাহারা ব্যাকরণের লম্বা লম্বা সূত্র আওড়াইয়া মনে করিত তাহারা কতবড়ই না পণ্ডিত। অথচ ভাষাজ্ঞান তাহাদের কিছুমাত্র হয় নাই। অনেকে গণিতের ফর্ম্মুলাগুলি মুখস্থ করিয়া ফেলিয়াছে—সুদকষা, ডিস্কাউণ্ট, ষ্টক সব বিষয়েরই সূত্রগুলি তোতাপাখীর মত বলিতে শিখিয়াছে। অথচ ব্যাঙ্ক কাহাকে বলে চোখে দেখে নাই—এমন কি নামও শুনে নাই। ব্যবসা বাণিজ্যের খাতাপত্র কেমন করিয়া লিখিতে হয় তাহা জানে না। টাকা পয়সার হিসাব রাখিবার নিয়ম কখনই দেখে নাই। বলা বাহুল্য তাহারা সংসারের কাজকর্ম্মের মধ্যে গণিতশাস্ত্রের প্রয়োগ সম্বন্ধে নিতান্তই অনভিজ্ঞ। কাজেই অঙ্কে তাহাদের মাথা একেবারেই খোলে নাই।

যাহা হউক এজন্য ইহাদিগকে দোষ দিয়া লাভ নাই। তাহারা যে নিয়মে শিখিয়াছে তাহার ফল আর কত ভাল হইতে পারে? তবে তাহাদের আন্তরিকতা, শিখিবার ইচ্ছা, মানুষ হইবার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণমাত্রায়ই বর্ত্তমান ছিল। এ জন্যই আমি হতাশ হইতাম না।

তাহারা যে বই মুখস্থ করিয়া এবং কতকগুলি সূত্র ও শব্দ আওড়াইতে আওড়াইতে নিতান্ত কাণ্ডজ্ঞানহীন হইয়া পড়িয়াছে তাহা বেশ বুঝিতে পারিলাম। তাহাদের সাংসারিক জ্ঞান একেবারেই জন্মে নাই। একজন ছাত্র মানচিত্রের কোন্ স্থানে আফ্রিকার শাহারা মরুভূমি অবস্থিত বিনা ক্লেশেই দেখাইয়া দিল। এমন কি চীন দেশের রাজধানী পর্য্যন্ত সেই মানচিত্রের মধ্যে খুঁজিয়া বাহির করিল। কিন্তু জমির উত্তর দক্ষিণ ভাল করিয়া নির্দ্দেশ করিতে সে শিখে নাই। টেবিলে খাইতে বসিয়া দেখি কোন্ দিকে বাটি কোন্ দিকে গ্লাস রাখিতে হয় তাহার ইহা জানা নাই! কেতাবী শিক্ষার ফলে সত্যসত্যই তাহারা নিরেট মূর্খ হইয়া পড়িয়াছে।

দেখিতে দেখতে একমাসের মধ্যে ৫০ জন ছাত্র হইয়া গেল। সপ্তাহ ছয়েক পরে আমি আমার কর্ম্মে একজন নূতন সহায়ক পাইলাম। শ্রীমতী ওলিভিয়া ডেভিড্‌সন নামে একজন শিক্ষিতা রমণী বিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় নিযুক্ত হইলেন। শিক্ষা ও সেবা কার্য্যে তাঁহার যথেষ্ট পটুত্ব ও অভিজ্ঞতা ছিল। নিগ্রো-সমাজের নানা স্থানে তিনি ইতিপূর্ব্বে শিক্ষাবিস্তার কর্ম্মে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি হ্যাম্পটন-বিদ্যালয়ের একজন গ্রাজুয়েট। জাতিতে তিনি নিগ্রো।

নানা স্থানে বসবাসের ফলে এবং নানা কর্ম্মক্ষেত্রে কার্য্য করিয়া তিনি বিদ্যাদানের অনেক নূতন নূতন প্রণালীর পরিচয় পাইয়াছিলেন। তাঁহার মাথায় সর্ব্বদা কর্ম্মের নব নব উপায় আসিত। তাঁহার উদ্ভাবিত কার্য্যপ্রণালীর সাহায্যে আমার টাস্কেজী বিদ্যালয়ের যথেষ্ট উন্নতি সাধিত হইয়াছে।

তিনিও আমারই মত পুঁথি বিদ্যার আদর করিতেন না। আমরা দুই জনে দেখিলাম, আমাদের ছাত্রেরা লেখাপড়ায় মন্দ ফল দেখাইতেছে না। কিন্তু স্বাস্থ্যরক্ষা, শরীরপালন ইত্যাদি বিষয়ে তাহারা কোন যত্নই লয় না। তাহাদের গৃহে এ সম্বন্ধে কোন চেষ্টা নাই। কাজেই বিদ্যালয়েও তাহারা অপরিষ্কার ভাবেই থাকিত। আমরা বুঝিলাম—ইহাদের মধ্যে কেতাবী শিক্ষা বেশী প্রচার করিয়া কোন লাভ নাই। আমরা স্থির করিলাম—প্রথমতঃ ইহাদের শরীর গঠন করিবার ব্যবস্থা করিতে হইবে। দাঁতমাজা, হাত পা ধোয়া, কাপড় পরিষ্কার করা, খাওয়া পরা, ঘর ঝাড়া ইত্যাদি বিষয় ইহাদিগকে প্রথমেই শিখান আবশ্যক। গৃহকর্ম্মে অভ্যস্ত হইতে থাকিলে ইহাদিগের স্বাস্থ্যজ্ঞান ও সাংসারিক জ্ঞান জন্মিতে পারিবে। তাহার পর এক আধটা অন্নসংস্থানের উপায়ও ইহাদিগকে দেখাইয়া দেওয়া আবশ্যক। কেবল দেখান নহে—হাতে কলমে শিখান আবশ্যক। তাহা হইলে ভবিষ্যতের খাওয়া পরার সংস্থানও হইতে থাকিবে। সঙ্গে সঙ্গে কম খরচে ও কম সময়ে বেশী কাজ করিবার চেষ্টা, পরিশ্রমের উপকারিতা, সময়নিষ্ঠা ইত্যাদি নানা সদ্‌গুণেরও ইহারা অধিকারী হইতে পারিবে।

আমরা দেখিলাম ইহাদের পল্লীতে কৃষিকার্য্যই অন্নসংস্থানের প্রধান উপায়। শতকরা প্রায় ৮৫ জন নিগ্রো চাষাবাদের উপর বাঁচিয়া থাকে। কাজেই আমরা চাষাবাদের উপযোগী করিয়া আমাদের ছাত্রগণের জন্য বিদ্যাদানের ব্যবস্থা করিতে চেষ্টিত হইলাম। যাহাতে তাহারা সহুরে বাবু না হইয়া পড়ে তাহার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখিলাম। লেখাপড়া শিখিবার পর যেন তাহারা আবার জমি চষিতে পারে এবং পশুপালন করিতে প্রবৃত্ত হয়—এই লক্ষ্য সম্মুখে রাখিয়াই আমরা শিক্ষার প্রণালী স্থির করিতে লাগিলাম। তাহারা বিদ্যালয়ের গুরুমহাশয়ও হইতে পারিবে—অথচ কৃষিকর্ম্মেও লজ্জা বোধ করিবে না—এই আদর্শে আমরা টাস্কেজী বিদ্যালয়ের নিয়ম ও কার্য্যপ্রণালী উদ্ভাবন করিতে কৃতসঙ্কল্প হইলাম।

এক কথায়, অর্দ্ধশিক্ষিত কুশিক্ষিত এবং চরিত্রহীন বাবুসমাজের পরিবর্ত্তে আমরা সুশিক্ষিত চরিত্রবান্ চাষী ও শিল্পীর পরিবার গঠন করিবার জন্য সকল উদ্যোগ করিতে প্রয়াসী হইলাম। আমরা স্থির করিলাম গ্রন্থপাঠকে অতি নিম্ন স্থানে রাখিব। তাহার পরিবর্ত্তে আমরা সংসারের কাজকর্ম্মের সাহায্যেই নিগ্রোপুরুষ ও রমণীগণকে গড়িয়া তুলিব। এই নূতন শিক্ষাপ্রণালী কার্য্যে পরিণত করিবার ইচ্ছা হৃদয়ে পোষণ করিতে লাগিলাম।

কিন্তু কার্য্য উদ্ধার করা যায় কি করিয়া? আমাদের স্থানাভাব ত যথেষ্ট। কয়েকজন নিগ্রো অনুগ্রহ করিয়া বিনাপয়সায় সেই পোড়ো বাড়ীটা বিদ্যালয়ের জন্য ব্যবহার করিতে দিয়াছেন এই যা রক্ষা। ছাত্র সংখ্যা দিন দিন বাড়িতেছিল। ইহারাই ত আমাদের নূতন আদর্শ পল্লীতে লইয়া যাইয়া ভবিষ্যতের পল্লীসেবক, পল্লী-শিক্ষক, ও পল্লী-সংস্কারক হইবে। এই ছাত্রগণই ত আমাদের যন্ত্র স্বরূপ থাকিয়া সমাজে সকল প্রকার উন্নতির আকাঙ্ক্ষা ও বীজ বপন করিবে। কিন্তু ইহা দিগকে এখন স্থান দিই কোথায়?

তিন মাস আমাদের বিদ্যালয়ের কার্য্য চলিল। প্রতিদিনই সকল দিকে উন্নতির লক্ষণ দেখিতে পাইতাম। আলাবামার ভিন্ন ভিন্ন জেলা হইতে কত ছাত্র আসিতে চাহিল। বুঝিতাম আমাদের নামও প্রদেশময় ছড়াইয়া পড়িয়াছে।

এই সময়ে একটা জমির সন্ধান পাওয়া গেল। টাস্কেজীর প্রায় দেড়মাইল দূরে একটা পুরাতন গোলামাবাদ বিক্রী হইবে জানিতে পারিলাম। মূল্য ১৫০০৲। জমির মালিক আমাদের নিকট দুই কিস্তীতে টাকা লইবেন। একে জমিটা সস্তা তাহার উপর এই অনুগ্রহ। কিন্তু হাতে যে আমাদের এক পয়সাও নাই—৭৫০৲ প্রথমেই দিব কিরূপে? বিপদ বুঝিয়া হ্যাম্পটনের ধন রক্ষক মার্ণ্যালের নিকট ধার চাহিলাম। তিনি লিখিলেন “হ্যাম্পটন বিদ্যালয়ের তহবিল হইতে টাকা ধার দিবার নিয়ম নাই। তবে আমি আমার নিজের ৭৫০৲ পাঠাইলাম।”

৭৫০৲ পাইলাম। ইতিপূর্ব্বে আমি এক সঙ্গে ২৫০/৩০০৲ টাকাও দেখি নাই। জমিটা কেনা হইয়া গেল। একবৎসরের মধ্যে বাকি ৭৫০৲ দিব স্বীকার করিলাম।

নূতন স্থানে স্কুল উঠাইয়া লওয়া হইল! জমিতে সর্ব্বসমেত চারিটা পুরাতন ঘর ছিল। গোলামীর যুগে যখন বড় সাহেব এই কুঠিতে থাকিতেন তখন ইহাদের একটা ঘরে রান্না হইত ও একটা খাবার ঘর ছিল। আর দুইটা ঘরে ঘোড়া ও মুরগী থাকিত। কয়েক দিনের মধ্যে কুঠরীগুলি মেরামত ও পরিষ্কার করিয়া লইলাম। আস্তাবল ও মুরগীশালায় পাঠশালা বসিতে লাগিল।

আস্তাবলেই প্রথমে কাজ চলিতেছিল। পরে ছাত্রসংখ্যা বাড়িয়া যায়। এজন্য মুরগীখানায়ও ছাত্রদের জন্য ‘ক্লাশ’ খুলিতে হইয়াছিল। একদিন সকালে একজন নিগ্রোকে বলিলাম, “মুরগীশালাটা পরিষ্কার করা আবশ্যক। আমাদের ছেলে বাড়িয়াছে। ঐ ঘরটায় নূতন ক্লাশ বসিবে।” সে তৎক্ষণাৎ বলিয়া উঠিল, “কি বলেন মহাশয়, আপনি দিবাভাগে লোক জনের সম্মুখে ঐ ঘর পরিষ্কার করিবেন? সকলে নিন্দা করিবে যে?” চক্ষুলজ্জা এবং লোকনিন্দার ভয় নিগ্রোসমাজে এতদূর পৌঁছিয়াছিল।

এই নূতন স্থানে ও নূতন গৃহে স্কুল বসান কাজটার মধ্যে কতকটা বিষয় লক্ষ্য করিবার প্রয়োজন। আমরা একজনও বাহিরের কুলী এজন্য নিযুক্ত করি নাই। আমরা নিজেই স্বহস্তে সূত্রধরের কর্ম্ম, কর্ম্মকারের কার্য্য, ঝাড়ুদারের কাজ, ইত্যাদি করিয়াছিলাম। বিকালে স্কুলের ছুটির পর ছাত্রেরা এই সকল কার্য্যে সাহায্য করিত। মেরামত করা, পরিষ্কার করা, ধোয়া, ঝাড়া, যথাস্থানে সাজান—সকলই আমরা সমবেত হইয়া সম্পন্ন করিয়াছিলাম।

যখন এই আস্তাবলে ও মুরগীশালায় স্কুল বেশ নিয়মিতরূপে চলিতে লাগিল তখন আমাদের জমির সম্মুখের খানিকটা অংশ পরিষ্কার করিয়া লইলাম। ইহাতে শাকশব্জী, ফুল ফল ইত্যাদি বুনিবার জন্য ইচ্ছা ছিল। ছাত্রেরা এ কাজ করিতে প্রথম প্রথম বেশী রাজি হইত না। তাহারা মাটি কোদ্‌লাইতে অপমান ও লজ্জা বোধ করিত। লেখাপড়া শিখিতে আসিয়া কোদাল ধরিতে হইবে—স্বপ্নেও তাহারা পূর্ব্বে ভাবে নাই। লেখা পড়া শিখিবার সঙ্গে মাটি কাটার সম্বন্ধই বা কি—তাহারা বুঝিত না। তাহারা মনে করিত তাহাদিগকে মজুরের কাজ করাইয়া লইয়া স্কুলের পয়সা বাঁচান হইতেছে। পূর্ব্বেই বলিয়াছি, আমাদের ছাত্রগণের মধ্যে অনেকেই অন্যান্য পাঠশালার গুরুমহাশয়গিরি করিয়া আসিয়াছেন। তাঁহারা এরূপ নিন্দাকর ও অপমানজনক কাজে একেবারেই নারাজ। তাঁহাদের মনে হইতে লাগিল—সময় বৃথা নষ্ট করা হইতেছে মাত্র।

কিন্তু আমার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা আমি লোক লাগাইয়া জমি পরিষ্কার করিব না। আমার সুচিন্তিত শিক্ষা প্রণালী কোন মতেই অর্জ্জন করিব না। শারীরিক পরিশ্রম করা আমার মতে উচ্চ শিক্ষার প্রধান অঙ্গ। যাহারা হাতে পায়ে খাটিয়া কাজ করিতে অনিচ্ছুক তাহারা আমার বিবেচনায় অশিক্ষিত, এমন কি কুশিক্ষিত। আমি সকল ছাত্রকেই এই নূতন শিক্ষার আদর্শ বুঝাইতে লাগিলাম। কথায় বেশী উপকার হইল না। আমি নিজে একাকী মাটি কাটিতে আরম্ভ করিলাম। জমি অনেকটা পরিষ্কার হইয়া আসিল। তাহাদের সাহায্য না লইয়াই বিদ্যালয়ের চারি পাশ যথেষ্ট সুন্দর করিয়া ফেলিলাম। ছাত্রেরা দেখিল আমার অপমান কিছুই হইতেছে না। ক্রমশঃ তাহারাও আমার কাজে সাহায্য করিতে আসিল। এইরূপে ৬০ বিঘা জমি সকলে মিলিয়া চষিয়া ফেলিলাম।

এদিকে শ্রীমতী ডেভিড্‌সন জমির দাম শোধ করিবার জন্য নানা কৌশলে টাকা তুলিতে থাকিলেন। তিনি আমাদের বিদ্যালয়ে কএকটা প্রদর্শনী বা মেলা খুলিলেন। এজন্য কৃষ্ণাঙ্গ শ্বেতাঙ্গ দুই মহলেই তিনি সর্ব্বদা ঘুরিয়া বেড়াইতেন। মেলার উদ্দেশ্য ও কার্য্য-প্রণালী সর্ব্বত্র প্রচারিত হইল। টাস্কেজীর লোকেরা কেহ কিছু আলু, কেহ কয়েকটা রুটি, কেহ কোন ফল ইত্যাদি দান করিলেন। এইগুলি বেচিয়া পয়সা আসিল। এইরূপ গোটাকয়েক মেলার ফলে টাকা মন্দ জমা হইল না।

তাহার পর নগদ টাকার জন্যও চাঁদার খাতা খোলা গেল। কোন নিগ্রো দশ পয়সা, কেহ বা চৌদ্দ পয়সা দান করিতে লাগিল। কেহ একটা রুমাল, কেহ বা খানিকটা চিনি, কেহ বা একখানা সতরঞ্চি দান করিল। একদিন এক বুড়ি ছেঁড়া কিন্তু পরিষ্কার কাপড়-চোপড় পরিয়া খোঁড়াইতে খোঁড়াইতে আমাদের স্কুলে হাজির হইল। সে বলিতে লাগিল, “মহাশয় আপনি ও ডেভিড্‌সন যে কাজ করিতেছেন তাহার জন্য ভগবান্ আপনাদিগকে সাহায্য করুন। নিগ্রোজাতিকে তুলিবার জন্য আপনারা জীবন উৎসর্গ করিয়াছেন। আপনাদের ধন্য! আর আমিও ধন্য যে এতকাল গোলামী করিবার পর আপনাদের ন্যায় নিঃস্বার্থ সমাজসেবকদিগকে দেখিয়া মরিতে পারিলাম। আপনাদের ন্যায় কর্ম্মবীর যখন তন্ময় হইয়া সমাজ-সেবায় লাগিয়াছেন, তখন নিগ্রোজাতি অতি সত্বরই জগতে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইতে পারিবে। আজ আমার জীবনের অন্তিম দশায় সেই আশার আলোক দেখিতে পাইতেছি।” এই বলিতে বলিতে বৃদ্ধার চক্ষু জলে ভরিয়া গেল। তাহার পর সে আবার বলিল, “দেখুন, আমি নিতান্ত দরিদ্র। কাঁচা পয়সা আমি চোখে দেখিতে পাই না। আপনারা পাঠশালার জন্য চাঁদা চাহিয়াছেন। আমি আপনাদিগকে আমার ক্ষুদ্র জীবনের কৃতজ্ঞতা জানাইবার জন্য এই ছয়টি ডিম দান করিতেছি। আশা করি, এইগুলি বেচিয়া আপনারা কাজ চালাইতে পারিবেন।”

এইরূপ মুষ্টিভিক্ষার ফলে আলু, চিনি, কম্বল, জামা, ডিম ইত্যাদি পাইতাম। পরে, সেইগুলি বাজারে বেচিয়া টাস্কেজীর ধনভাণ্ডারে অর্থ সংগ্রহ করিতে লাগিলাম। এই উপায়ে সরিষা কুড়াইয়া বেল তৈয়ারী করিতে প্রয়াসী হইলাম। বৃহৎ ব্যাপারেও খুদ কণার সাহায্য কম কার্য্য করে না!

নবম অধ্যায়

অর্থচিন্তা ও বিনিদ্র যামিনী

টাস্কেজীবিদ্যালয়ের কার্য্য অগ্রসর হইতে লাগিল। প্রথম বৎসরের উৎসবে আমি নিগ্রো সমাজকে আরও ভাল করিয়া চিনিবার সুযোগ পাইলাম। আমাদের বাড়ীতে বড়দিনের সময়ে রোজ প্রায় ১০০।১৫০ ছেলে মেয়ে আসিত। তাহারা আমাদের নিকট টাকা পয়সা বক্‌শিষ উপহার ইত্যাদি পার্ব্বণী চাহিত। রাত্রি দুইটা হইতে সকাল পাঁচটা পর্য্যন্ত বালক বালিকাদিগের ভিড় কমিত না। আজও দক্ষিণ অঞ্চলে বড়দিনের আগমনী উপলক্ষ্যে শিশুরা এইরূপ করিয়া থাকে।

গোলামীর যুগে বড়দিনের উৎসবের জন্য নিগ্রোরা সপ্তাহকাল ছুটি পাইত। সেই সময়ে পুরুষেরা মদ খাইয়া পড়িয়া থাকিত। টাস্কেজীতেও দেখিলাম, বড়দিনের একদিন পূর্ব্ব হইতেই নিগ্রোরা কাজ ছাড়িয়াছে। নববর্ষ আরম্ভ না হওয়া পর্য্যন্ত তাহারা কাজে আর ফিরিল না। যাহারা বৎসরে অন্য কোন দিন মদ খাইত না তাহারাও ধর্ম্মের দোহাই দিয়া এ কয়দিন বেশ মাতলামী করিল। পল্লীময় উৎসব, আনন্দ, নৃত্যগান;—কোথায়ও সংযম বা শ্লীলতা কিছুই দেখিলাম না। কেহ কেহ বন্দুক পিস্তল লইয়া শিকারেও বাহির হইল। হায়, ভগবানের জন্মতিথি কি এইরূপ উদ্দামতা উচ্ছৃঙ্খলতা, এবং নির্দ্দয়তার অভিনয়ে উপলক্ষ্যমাত্রে পরিণত হইয়াছে!

সহর ছাড়িয়া জেলার ভিতরকার পল্লীগ্রামের মধ্যে ‘বড়দিন’ দেখিতে গেলাম। এই দরিদ্র সমাজ যীশুর শুভাগমনে কিরূপ উৎসবের অনুষ্ঠান করিয়া থাকে জানিতে ইচ্ছা হইল। কোন কামরায় যাইয়া দেখি কতকগুলি ভূঁই পট্‌কা ছেলেদের মধ্যে ভাগ করিয়া দেওয়া হইয়াছে। তাহারা সেইগুলি মাটিতে আছড়াইয়া আওয়াজ করিতেছে। কোন কামরায় গোটা কয়েক কলা ঝোলান আছে। সেইগুলি আট দশ জনে মিলিয়া খাইতে বসিবে। কাহারও ঘরে কয়েকটা আখ দেখিতে পাইলাম। আর এক গৃহস্থ সস্তায় এক বোতল মদ কিনিয়া আনিয়াছে। স্বামী ও স্ত্রী দুই জনে এক সঙ্গে বসিয়া উহা পান করিতেছে। অথচ সেই ব্যক্তি ঐ পল্লীর একজন ধর্ম্মগুরু! কোন কোন গৃহে ছেলেরা নানারংএর ছাপান “কার্ড” লইয়া খেলা করিতেছে। সেই কার্ডগুলি বিশেষ কিছু মূল্যবান্ জিনিষ নয়। বড় বড় সহরের ব্যবসাদারেরা নিজেদের মাল প্রচার করিবার, জন্য ঐরূপ কার্ড ছাপাইয়া নানা স্থানে বিলি করিয়া থাকে। কেহ বা একটা নূতন পিস্তল কিনিয়া পাড়ার মধ্যে তাহা জাহির করাইয়া বেড়াইতেছে।

মোটের উপরে, বুঝিলাম, ইহারা সকলেই কাজ বন্ধ করিয়াছে। যাহার যেরূপ প্রবৃত্তি এবং আর্থিক অবস্থা সে সেইরূপ পান-ভোজন ও আনন্দ উৎসবের উদ্যোগ করিতেছে। রাত্রিকালে সকলে মিলিয়া একটা বাড়ীতে নাচ গান করিবে। সেখানে মদ খাওয়ারও সবিশেষ আয়োজন আছে। শুনিয়াছি এই উদ্দামনৃত্যগীতের আসরে অনেক সময়ে মারপিট এবং রক্তারক্তি পর্য্যন্ত ঘটিয়া থাকে।

বড়দিনের সফর করিতে করিতে এক বৃদ্ধ স্বজাতির সঙ্গে দেখা হইল। সে বলিল, “বুঝিলেন, ইডন উদ্যানে আদমের জীবন লক্ষ্য করিলেই জানা যায় যে, ভগবান্ কাজ কর্ম্ম ভালবাসেন না। এইজন্য আজকাল বড়দিনের সময় সর্ব্বত্রই দিবসব্যাপী উৎসব। কোথায়ও কাজ কর্ম্ম কিছুই দেখিতে পাইবেন না। বাঁচিয়াছি, এ কয়দিন খাটিতে হইতেছে না, হাড় জুড়াইল।” সে আরও বলিল “এক বৎসর কি পাপেই না জীবন কাটিয়াছে—কেন না একদিনও যথার্থ বিশ্রাম পাই নাই। আজ আমার কি পুণ্যের দিন—কিছুই কাজ করিবার ভাবনা নাই।”

নিগ্রোসমাজের ধর্ম্মমত এবং লোকচরিত্র দেখিয়া শুনিয়া আমার কর্ত্তব্য স্থির করিয়া লইলাম। আমার স্কুলে ছাত্রদিগকে বড়দিনের সার্থকতা বুঝাইতে চেষ্টা করিলাম। আমাদের চেষ্টায় পল্লীতে পল্লীতে যথেষ্ট সুফল ফলিয়াছে। আজ ১৫।২০ বৎসর কার্য্যের ফলে দেখিতে পাইতেছি যে, নিগ্রোরা বড়দিনের উৎসবে যথেষ্ট সংযম, শৃঙ্খলা, চরিত্রবত্তা এবং ধর্ম্মভাব রক্ষা করিয়া চলে।

টাস্কেজীবিদ্যালয়ের ছাত্রেরা আজকাল বড়দিনের সময়ে বিশেষভাবে সমাজ-সেবা লোক-হিত এবং পরোপকারের কর্ম্মে লাগিয়া যায়, দুঃখী ও দরিদ্র লোকদিগকে সুখ দিতে তাহারা যথাসাধ্য চেষ্টা করে। সেদিন তাহারা একজন দরিদ্র বৃদ্ধা নিগ্রোরমণীর কামরা নিজ হাতে তৈয়ারী করিয়া দিয়াছে। একজন লোক শীতে জামা অভাবে কষ্ট পাইতেছিল। একথা আমি আমার ছাত্রদিগকে জানাইবামাত্র তাহাদের নিকট দুইটা জামা-পাইলাম।

পূর্ব্বে একবার বলিয়াছি যে, টাস্কেজীর শ্বেতাঙ্গেরাও আমাদের অর্থসংগ্রহের চেষ্টায় সাহায্য করিতেন। আমাদের মুষ্টি ভিক্ষা তাঁহাদের নিকটও আদায় হইত। নগদ টাকাও মাঝে মাঝে তাঁহারা দিতেন। তাহা ছাড়া কুমারী ডেভিড্‌সন যখনই তাঁহাদের নিকট ভিক্ষার ঝুলি লইয়া হাজির হইতেন তখনই কিছু না কিছু পাইতেন।

আমি প্রথম হইতেই বিদ্যালয়টিকে সমগ্র পল্লীর জীবন-কেন্দ্ররূপে গড়িয়া তুলিতেছিলাম। পল্লীর সকল কাজ কর্ম্মেই বিদ্যালয়ের সম্বন্ধ রাখিতাম। গ্রামের লোকেরা সহজেই বুঝিতে পারিত যে, বিদ্যালয়ের সাহায্যে তাহাদের নানা বিষয়ে উপকার হইতেছে। তাহা ছাড়া উহা সকলেরই সম্পত্তি—টাস্কেজীর সাদা কাল সকলেই উহার মালিক ও কর্ত্তা। সাধারণ জনগণের সৎপ্রবৃত্তিতেই উহার ভিত্তি। কেহই যেন না বুঝিতে পারে যে, কয়েকজন বাহিরের লোক আসিয়া গ্রামের উপর একটা বোঝা চাপাইয়াছে। এই ভাব মনে রাখিয়া আমি বিদ্যালয় চালাইতাম। গ্রামের লোকের উৎসাহ, কর্ত্তব্যজ্ঞান, কর্ত্তৃত্ব ও দায়িত্ববোধ আমি সর্ব্বদাই নানা উপায়ে জাগাইয়া রাখিতাম। জমির মূল্য দিবার জন্য সকলের নিকটই চাঁদার খাতা লইয়া যাইতাম। ইহাতেও তাহারা বিদ্যালয়কে নিজের জিনিষ বলিয়া আদর করিতে অভ্যস্ত হইত। জমির দাম শোধ করিবার জন্য তাহাদিগকেই চেষ্টা করিতে হইবে ইহা জানিবামাত্র তাহারা বিদ্যালয়ের জন্য নূতনভাবে আত্মীয়তার সম্বন্ধ পোষণ করিতে লাগিল। সাদা কাল চামড়ার ভেদ ভুলিয়া যাইয়া সকলেই বিদ্যালয়কে সমস্ত টাস্কেজীর যৌথ প্রতিষ্ঠানরূপে ভাবিতে থাকিল।

শ্বেতাঙ্গদিগের মধ্যে আজ টাস্কেজীর অনেক বন্ধু রহিয়াছেন। আমি প্রথম হইতেই ইহাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্বন্ধ রক্ষা করিয়া আসিয়াছি। দক্ষিণ প্রান্তের নিগ্রোগণকেও আমি এই বন্ধুত্বের সম্বন্ধে শ্বেতাঙ্গদিগের সঙ্গে ব্যবহার করিতে চিরকাল উপদেশ দিয়াছি।

আমরা টাকা তুলিতে লাগিলাম। মেলা, প্রদর্শনী, মুষ্টিভিক্ষা, চাঁদা ইত্যাদি নানা উপায়ে আমরা তিন মাসের মধ্যেই মার্শালের ৭৫০৲ দেনা শোধ করিলাম। তার পর দুই মাসের ভিতর অবশিষ্ট ৭৫০৲ জোগাড় করিয়া জমির মালিককে দিয়া ফেলিলাম। জমিটা সম্পূর্ণরূপেই আমাদের সম্পত্তি হইয়া গেল। সুখের কথা এই সমস্ত টাকাই টাস্কেজী নগরের শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ লোকদের নিকট হইতেই উঠিয়াছিল।

এখন আমরা জমি চষিবার সুব্যবস্থা করিতে প্রবৃত্ত হইলাম। আমাদের উদ্দেশ্য ত্রিবিধ। প্রথমতঃ, এই চাষবাস করিলে বিদ্যালয়ের জন্য কিছু লাভ হইবে। দ্বিতীয়তঃ, ছাত্রেরা ক্ষেতে কাজ করিয়া কৃষিকর্ম্মে অভিজ্ঞতা লাভ করিবে। তৃতীয়তঃ, আমাদের নিত্যনৈমিত্তিক খাওয়ার সুখও বেশ হইবে।

আমরা সব কাজই এক সঙ্গে আরম্ভ করিতাম না। ভাল কাজ হইলেও তাহা যখন তখন আমাদের কর্ম্মকেন্দ্রে প্রবর্ত্তন করিতে চেষ্টিত হইতাম না। আমাদের যখন যেরূপ অভাব হইত তখন ঠিক সেইরূপ ব্যবস্থাই করিতাম। আমাদের সর্ব্বপ্রথম অভাব হইয়াছিল—বিদ্যালয়ের ছাত্রদিগের জন্য ভাল শাক শব্জীর। এইজন্য সর্ব্বপ্রথমেই আমরা চাষে লাগিয়া গেলাম।

ক্রমশঃ দেখিতে পাইলাম, আমাদের ছাত্রেরা এতই দরিদ্র যে বৎসরে তিন মাসের বেশী পয়সা খরচ করিয়া স্কুলে থাকিবার ক্ষমতা তাহাদের নাই। তাহাদের অন্যান্য মাসের খরচ চালাইবার জন্য আমাদের নূতন ব্যবস্থা করিবার প্রয়োজন হইল। এজন্যও চাষের ব্যবস্থা ভাল করিয়াই করা গেল। সঙ্গে সঙ্গে সূত্রধরের কার্য্য, কর্ম্মকারের কার্য্য ইত্যাদি নানাবিধ শিল্প-কর্ম্ম খুলিবার আয়োজন করিতে লাগিলাম।

আমাদের টাস্কেজীতে একটা কাণা ঘোড়া লইয়া পশু পালন আরম্ভ হয়। ঘোড়াটা একজন শ্বেতাঙ্গ আমাদিগকে দান করিয়া ছিলেন। আজকাল আমাদের বিদ্যালয়ের পশুশালায় ২০০ ঘোড়া, খচ্চর, গরু, বাছুর, বলদ ইত্যাদি, ৭০০ শূকর এবং কতকগুলি মেষ ও ছাগল রহিয়াছে।

ছাত্রসংখ্যা বাড়িয়াই চলিল। পুরাতন বাড়ীতে আর কোন মতেই কাজ চলে না। তখন একটা নূতন গৃহ নির্ম্মাণের প্রস্তাব করিলাম। প্রায় ২০,০০০৲ টাকার আনুমানিক ব্যয়ে এই গৃহ নির্ম্মিত হইবে হিসাব করিয়া দেখিলাম। এত টাকা আমাদের চিন্তার অতীত বোধ হইল। কিন্তু আমরা যে অবস্থায় আসিয়া পৌঁছিয়াছি তখন হয় আমাদিগকে ঐরূপ গৃহ নির্ম্মাণ করিতেই হইবে, না হয় পুরাতন অবস্থায়ই পচিতে হইবে। বিশেষতঃ আমরা ছাত্রদিগকে এক সঙ্গে এক জায়গায় রাখিয়া আমাদের আদর্শ অনুসারে গড়িয়া তুলিতে চাহিয়াছিলাম। সে উদ্দেশ্যে অতি সত্বরই কার্য্য আরম্ভ করা আবশ্যক। এজন্য বিলম্বের আর সময় ছিল না। কাজেই এত ব্যয়ে প্রকাণ্ড বাড়ীর ব্যবস্থা করা আমাদের অবশ্য কর্ত্তব্যের মধ্যে পরিগণিত হইয়া পড়িল।

ক্রমশঃ সংবাদ রটিয়া গেল যে, এক বৃহৎ ব্যাপার টাস্কেজীর কর্ত্তারা আরম্ভ করিয়াছেন। এক দিন সকালে দক্ষিণ প্রান্তের একজন শ্বেতকায় কাঠের সওদাগর আসিয়া আমায় বলিলেন, “শুনিতেছি, আপনারা নূতন বিদ্যালয় গৃহের প্রস্তাব করিয়াছেন। আমি আপনাদিগকে সমস্ত কাঠ জোগাইতে প্রস্তুত আছি। এক্ষণেই মূল্য দিতে হইবে না। আপনাদের যখন সুবিধা হয় তখন দিবেন।” আমি বলিলাম “আমাদের হাতে কিন্তু সম্প্রতি এক কড়িও নাই।” তিনি বলিলেন “তাহা আমি জানি। তথাপি আমি আপনাদের জমিতে কাঠ পৌঁছাইয়া দিব।” আমি বলিলাম “মহাশয়, কিছু অপেক্ষা করুন। আগে আমাদের হাতে কিছু টাকা জমা হউক। তাহার পর আপনাকে জানাইব।”

এই ঘটনায় আমি অতিশয় আশান্বিত হইলাম। ভাবিলাম— সৎকার্য্যে অর্থাভাব হয় না।

কুমারী ডেভিড্‌সন আবার নানা কৌশলে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ সমাজ হইতে টাকা তুলিতে চেষ্টিত হইলেন। নিগ্রোরা এই গৃহের কথা শুনিয়া সর্ব্বাপেক্ষা অধিক আনন্দিত হইয়াছিল। আমরা একদিন টাকা তুলিবার জন্য একটা সভা আহ্বান করিয়াছিলাম। সভার কার্য্য চলিতেছে, এমন সময়ে এক প্রৌঢ় নিগ্রো দাঁড়াইয়া উঠিল। সে প্রায় ১২ মাইল দূর হইতে আসিয়াছে—সঙ্গে একটা বড় শূকর বহিয়া আনিয়াছে। সে বলিতে লাগিল, “ভাই সকল আমার টাকা পয়সা নাই। আমার সম্পত্তির মধ্যে দুইটা বড় শূকর আছে। তাহাদের একটি আমি এই বিদ্যালয়ের গৃহনির্ম্মাণ-তহবিলে দান করিবার জন্য আনিয়াছি। আমি আপনাদিগকে করুণভাবে নিবেদন করিতেছি যে, যদি স্বজাতির জন্য আপনাদের হৃদয়ে বিন্দুমাত্র ভালবাসা থাকে, অথবা আপনাদের চিত্তে যদি বিন্দুমাত্র আত্মসম্মান ও আত্ম-গৌরব বোধ থাকে, তাহা হইলে আপনারা সকলেই একটি করিয়া শূকর এই বিদ্যালয়ের জন্য দান করুন। আমার বিশ্বাস আপনারা আমার এই অনুরোধ অগ্রাহ্য করিবেন না।” আর কয়েক জন নিগ্রো এই সঙ্গে দাঁড়াইয়া উঠিয়া বলিল, “আমি আমার স্বজাতির সম্মুখে প্রতিজ্ঞা করিতেছি, যে এই বিদ্যালয়ের গৃহনির্ম্মাণ কার্য্যে আমি দুই সপ্তাহ শারীরিক পরিশ্রম করিয়া সাহায্য করিব!”

দক্ষিণ অঞ্চল হইতেই ২০,০০০ টাকা উঠা অসম্ভব। কুমারী ডেভিড্‌সন উত্তর প্রান্তের ইয়াঙ্কি মহলে চাঁদা আদায় করিতে বাহির হইলেন। সেখানে নানা গির্জ্জায় যাইয়া এজন্য বক্তৃতা করিতে হইল। বিভিন্ন বিদ্যালয়-গৃহে এবং সভা সমিতির সম্মুখেও তিনি টাস্কেজীর বৃত্তান্ত জানাইলেন। বড়ই কঠিন কার্য্য। কেহই উহার নাম পর্য্যন্ত শুনে নাই। এদিকে লোকের উৎসাহ আকৃষ্ট করা অল্প পরিশ্রমের ব্যাপার নহে। যাহা হউক, ডেভিড্‌সন ধীরে ধীরে উত্তর প্রান্তের ভালবাসা পাইতে লাগিলেন।

ডেভিড্‌সন একদিন এক ষ্টীমারে নিউইয়র্ক যাইতেছিলেন। সেখানে একটি ইয়াঙ্কি রমণীর সঙ্গে তাঁহার আলাপ হয়। রমণী ষ্টীমার ত্যাগ করিবার সময়ে ডেভিসনকে ১৫০৲ টাকার একটা ‘চেক্‌’ লিখিয়া দিলেন।

ডেভিড্‌সনকে অর্থসংগ্রহের জন্য যারপর নাই খাটিতে হইয়া ছিল। এজন্য তিনি এত দুর্ব্বল ও ক্লান্ত হইয়া পড়িতেন যে অনেক সময় তাঁহার চলিবার ক্ষমতা থাকিত না। একদিন বোষ্টন নগরে একটি রমণীর সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইয়া ডেভিড্‌সন তাঁহার ‘কার্ড’ পাঠাইলেন। কার্ড পাইয়া রমণী বৈঠকখানায় আসিলেন। আসিয়াই দেখেন ডেভিড্‌সন ক্লান্ত হইয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন।

ডেভিড্‌সন যে সময়ে অর্থসংগ্রহ করিতেছিলেন সেই সময়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার কার্য্যও তাঁহার ছিল। তাহা ছাড়া তিনি টাস্কেজীর রমণী মহলে ঘুরিয়া ঘুরিয়া শিক্ষা দিতেন, এবং শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের মধ্যে সদ্ভাব বর্দ্ধনের চেষ্টা করিতেন। অধিকন্তু একটি রবিবারের বিদ্যালয়ের ভারও তিনি লইয়াছিলেন।

তিনি আমাদের সাহায্যকারী বন্ধুগণের সঙ্গে সর্ব্বদা চিঠিপত্রের সাহায্যে আলাপ রাখিতেন। সময়ে সময়ে তাঁহাদিগকে বিদ্যালয়ের অবস্থা জানাইতে চেষ্টাও করিতেন। এইরূপে টাস্কেজীর জন্য নানা স্থানে স্থায়ী বন্ধুর সৃষ্টি হইয়াছিল।

গৃহনির্ম্মাণ আরম্ভ হইয়া গেল। ঘরের নাম রাখা হইয়াছিল “পোর্টার হল”। পোর্টার নিউইয়র্কের ব্রুক্‌লিন নগরের একজন সহৃদয় ইয়াঙ্কি। ইনি কিছু বেশী টাকা দিয়াছিলেন—এজন্য গৃহের নাম ইহাঁর সঙ্গে সংযুক্ত রাখিয়াছিলাম। এই ঘর তৈয়ারী করিবার সময়ে টাকার অভাব খুব বোধ করিতে লাগিলাম। একজন পাওনাদারকে কথা দিয়াছিলাম, অমুক তারিখে তাঁহার প্রাপ্য ১২০০৲ দিব। সেই তারিখ আসিল। সকালে একটিমাত্র টাকাও হাতে নাই দেখিলাম। দশটার সময়ে ডাক পাইলাম। সেই সঙ্গে কুমারী ডেভিড্‌সনের একখানা চিঠি ছিল। তাহার মধ্যে একটা ১২০০৲ টাকার চেক্! আমি অবাক্ হইয়া গেলাম। আরও অনেক সময়েই এইরূপ অবাক্ হইয়াছি। এই ১২০০৲ বোষ্টনের দুই জন রমণী দান করিয়াছিলেন। এই দুই রমণী এক বৎসর পরে আরও ১৮,০০০৲ দান করিয়াছিলেন। বিগত ১৪ বৎসর ধরিয়া এই দুইটি রমণী ১৮,০০০৲ করিয়া প্রতি বৎসর দিয়া আসিতেছেন।

গৃহ নির্ম্মাণ করিবার পূর্ব্বে মাটি কাটা আরম্ভ হইল। ছাত্রেরাই এই কাজ করিল। অবশ্য এখন পর্য্যন্ত তাহারা নবভাবে সম্পূর্ণরূপে মজিয়া উঠে নাই। এখন ত তাহাদের সেই পুরাতন বাবুগিরির ভাব কিছু কিছু ছিল। “আমরা লেখা পড়া শিখিতে আসিয়াছি, মাটি কাটিব বা ইট গড়িব কেন?”— অনেকেরই এই ভাব! যাহা হউক, ক্রমে ক্রমে শারীরিক পরিশ্রমের উপকারিতা ইহারা বুঝিতে পারিয়াছে।

মাটি কাটা হইয়া গেলে—দেওয়ালের ভিত্তি গুলি প্রস্তুত হইয়া গেল। এখন সমারোহ করিয়া প্রকাশ্যভাবে ‘ভিত্তি প্রতিষ্ঠা’ উৎসবের আয়োজন করিলাম।

১৬ বৎসর পূর্ব্বে আমরা কেনা গোলাম ছিলাম। দক্ষিণ প্রান্তের এই অঞ্চলেই গোলামাবাদ বেশী ছিল। এই বিভাগের নামই “কৃষ্ণ বিভাগ।” গোলামী যুগে এই বিভাগে নিগ্রোকে লেখাপড়া শিখান মহাপাপের কার্য্য বিবেচিত হইত। যে শিক্ষক নিগ্রোকে শিখাইতে চাহিত সমাজে তাহার কুখ্যাতি রটিত, আইনেও সে দণ্ডনীয় হইত। আজ ১৬ বৎসরের ভিতর সেই গোলামাবাদের আবহাওয়ার মধ্যে বিদ্যালয় গৃহের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা, এবং ভিত্তি প্রতিষ্ঠার উৎসব! সর্ব্বত্র আনন্দের মহা কোলাহল—সকলের চিত্তেই স্ফূর্ত্তি। যেন কি এক দেবভাবে টাস্কেজীর শ্বেতাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গ সকলেই সংসার দেখিতে লাগিল।

আলাবামা প্রদেশের শিক্ষাপরিষদের তত্ত্বাবধায়ককে উৎসবের সভাপতি নির্ব্বাচিত করা হইয়াছিল। তিনিই প্রধান বক্তৃতা করিলেন। গৃহের যে কোণে ভিত্তি প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা হইয়াছিল সেখানে শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক, বন্ধু, আত্মীয়, প্রদেশ-রাষ্ট্রের কর্ম্মচারী, মহাজন, ব্যবসাদার সকলেই সমবেত হইয়াছিলেন। পূর্ব্বে যাঁহারা গোলামখানার মালিক ছিলেন আজ তাঁহারা গোলাম জাতির হাত ধরিয়া এই শিক্ষা মন্দিরের ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করিলেন। শ্বেতাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গ সকলেই সেই ভিত্তি-প্রস্তরের নীচে কিছু না কিছু চিহ্ন রাখিতে উৎসুক হইল।

গৃহ-নির্ম্মাণের কার্য্য যখন অগ্রসর হইতে ছিল সেই সময়ে বহুবার আমাদের বড়ই দুশ্চিন্তায় দিনরাত্রি কাটাইতে হইত। হাতে পয়সা থাকিত না—অথচ পাওনাদারদিগের টাকা দিবার দিন চলিয়া আসিত। ভুক্তভোগী ভিন্ন এই উদ্বেগ আর কে বুঝিবে? কত রাত্রি বিছানায় পড়িয়া এপাশ ওপাশ করিয়াছি তাহার সংখ্যা নাই।

আমি জানিতাম যে, আমি অসাধ্যসাধনে ব্রতী হইয়াছি। এখন আমাকে কেহই সাহায্য করিবে না। বরং সকলেই বাধা দিবে। আমি বুঝিয়াছিলাম যে, এই অবস্থায় আমাকে একাকীই সকল কার্য্য করিতে হইবে। আমি কষ্টভোগ করিয়া, নীরবে দুঃখ সহিয়া, লোকজনের উপহাসে বিচলিত না হইয়া, দৃঢ়ভাবে কাজ করিতে করিতে যদি সফল হইতে পারি, তবে ভবিষ্যতে আমি সমাজের সাহায্য পাইব। সাধারণ লোকেরা আগে কোন কাজ করিতে চাহে না—তাহারা যখন দেখে যে অন্যের আরব্ধ অনুষ্ঠানটা কৃতকার্য্য হইতে চলিল তখন তাহারা উহার প্রতি অনুরক্ত হয়। সুতরাং সকল দুঃখ নৈরাশ্য ও দুশ্চিন্তার বোঝা এক্ষণে আমাকেই নিজ মাথায় বহন করিতে হইবে। আমার কবরের উপরই নিগ্রোসমাজের জাতীয় বিদ্যামন্দির প্রতিষ্ঠিত হউক।

দশম অধ্যায়

অসাধ্য সাধন

প্রথম হইতেই-টাস্কেজী-বিদ্যালয়ের ছাত্রদিগকে আমি আমার নূতন আদর্শে তৈয়ারী করিতে চেষ্টা করিয়াছিলাম। আমার মতে বিদ্যালয়ের সকল প্রকার কাজই ছাত্রদের নিজ হাতে করিতে চেষ্টা করা কর্ত্তব্য। বোর্ডিং-গৃহের ঘরঝাড়া, কাপড় ধোয়া, রান্নাকরা ইত্যাদি সকল কাজই ছাত্রদের করা উচিত। তার পর স্কুলঘরের টেবিল চেয়ার মেজে পরিষ্কার রাখা, এবং আসবাবপত্র সাজান এ সবও ছাত্রদেরই কর্ত্তব্য। অধিকন্তু বিদ্যালয়ের উঠান মাঠ ও জমির শ্রীবিধান সম্বন্ধে ছাত্রদেরই দৃষ্টি থাকা বাঞ্ছনীয়। তাহা ছাড়া পশুপালন, কৃষিকার্য্য, চাষবাস, মাটিকাটা ইত্যাদি কর্ম্মের জন্যও বাহিরের মজুর লাগান উচিত নয়। বিদ্যালয়ের ছাত্রদেরই এই সকল কাজ সম্পন্ন করা আবশ্যক। কেবল তাহাই নহে—বাড়ীঘর মেরামত, নূতন নূতন গৃহ-নির্ম্মাণ, করাতে কাঠ চেরা, ইঁট তৈয়ারী করা, চূণ শুরকি প্রস্তুত করা—এই সমুদয় ঘরামি ও মিস্ত্রিগিরির কাজও ছেলেদেরই করা প্রয়োজন।

সকল প্রকার গৃহস্থালী, কৃষি ও শিল্পকর্ম্মে অভ্যস্ত হইতে থাকিলে ছাত্রেরা বেশ পাকা মানুষ হইয়া উঠিতে পারে। নানাবিধ কারিগরি এবং শিল্পিমহলের নূতন নূতন আবিষ্কারগুলি তাহাদের ‘হাতে কলমে’ শিক্ষা হইয়া যায়। অধিকন্তু তাহারা শারীরিক পরিশ্রমের ফলে স্বাস্থ্য অর্জ্জন করে ও কর্ম্মঠ হইতে থাকে; এবং নৈতিক চরিত্র বিষয়েও যথেষ্ট উন্নতি লাভ করে। খাটিয়া খাওয়া নিন্দনীয় কাজ নয়। লেখা পড়া শিখিলেই ‘বাবু’ হইয়া যাইতে হয় না। শিক্ষিত লোকদেরও স্বহস্তেই চাষ করা উচিত এবং নিজের ঘর বাড়ী নিজেই প্রস্তুত করিতে চেষ্টা করা কর্ত্তব্য। এক কথায়, সকলেরই নিজ অভাবগুলি যথাসম্ভব নিজেই মোচন করিয়া লওয়া উচিত। খাওয়া দাওয়া, চলা ফেরা ইত্যাদি কোন বিষয়েই পরের উপর নির্ভর করা শিক্ষিত ও সভ্য লোকের লক্ষণ নয়। এই সকল ধারণা আমার শিক্ষাপ্রণালী অনুসারে ছাত্রদের মাথায় সহজেই বসিতে পারে।

শারীরিক পরিশ্রম এবং স্বাবলম্বন এই দুইটি গুণই আমি প্রকৃত শিক্ষালাভের চিহ্ন মনে করি। যথার্থ শিক্ষিত ব্যক্তি শারীরিক পরিশ্রমকে কখনই অগ্রাহ্য করিতে পারেন না। নিজে খাটিলে অনেক বিষয়ে খরচ কম হয়—তাহা সকলেরই জানা আছে। শিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রেই তাহাও বুঝেন। কিন্তু একমাত্র এই জন্যই তাঁহারা শারীরিক পরিশ্রমের আদর করেন না। তাঁহারা খাটিয়া খাওয়াকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য ও ধর্ম্মের মধ্যে গণ্য করেন। পরিশ্রমের অন্য কোন মূল্য থাকুক বা না থাকুক, তাঁহারা পরিশ্রম করিতে পারিলেই সুখী ও আনন্দিত হন। পরিশ্রম করিতে পারাটাই একটা মহাগুণ—পরিশ্রমী ব্যক্তিমাত্রই গুণবান্ এবং সকলের প্রশংসাযোগ্য। যথার্থ শিক্ষিত ব্যক্তি এইরূপ ভাবিয়া থাকেন।

এই ধর্ম্মভাবে পরিশ্রম করিতে আরম্ভ কর, দেখিবে খাটিয়া খাওয়ায় কোন অপমান, কষ্ট ও লজ্জাবোধ হইতেছে না। কারণ পরিশ্রম করা তখন অপর লোকের কোন উদ্দেশ্য সাধনের উপায় মাত্র মনে হইবে না। উহার দ্বারা নিজেরই উপকার হইতেছে ভাবিতে পারিবে। উহা নিজ জীবনেরই সার্থকতা লাভের অঙ্গস্বরূপ বিবেচিত হইবে। পরিশ্রমের ফলে তুমি প্রকৃত মানুষ হইতেছ এই জ্ঞান থাকিবে। কাজেই পরিশ্রম গৌরবজনক পুণ্যের কাজরূপেই আদর পাইতে পারিবে—কোন মতেই ঘৃণ্য বা কষ্টকর বোধ হইবে না। নিজের আত্মার যাহাতে উন্নতি হয় তাহাতে কেহ কখনও কষ্টবোধ করে কি?

আমার নূতন আদর্শের শিক্ষাপ্রণালী অনুসারে ছাত্রেরা শারীরিক পরিশ্রমের এইরূপ মর্য্যাদা ও গৌরব দান করিতে শিখে। তাহা ছাড়া বিদ্যালয় চালাইবার পক্ষেও খুব সুবিধা হয়। কারণ এই উপায়ে প্রায় সকল খরচই কমাইয়া ফেলান যায়। ছাত্রদের পরিশ্রমেই ঝাড়ুদার ধোপা নাপিত মিস্ত্রী ছুতার কামার কুমার চাষী ইত্যাদি সকল প্রকার মজুরের কাজ চলিয়া থাকে। এজন্য অর্থব্যয় প্রায় হয়ই না বলিলে চলে। সঙ্গে সঙ্গে, পূর্ব্বেই বলিয়াছি, ছাত্রেরা নূতন নূতন শিল্পবিদ্যা শিখিতে থাকে। জল, বায়ু, বাষ্প, তড়িৎ, জীবজন্তু ইত্যাদি জগতের সকল শক্তি মানুষকে নানা উপায়ে সাহায্য করিতেছে। কৃষিকর্ম্মে এবং শিল্পকার্য্যে লাগিয়া থাকিলে অতি সহজেই এ বিষয়ে ধারণা জন্মে। বস্তুজ্ঞান, ব্যবহারিক বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয় ছাত্রদিগকে আর নূতন করিয়া শিখাইতে হয় না। তাহারা বিশ্বশক্তিগুলি প্রতিদিনকার নানা কাজে লাগাইতে লাগাইতে উদ্ভিদ্‌বিজ্ঞান, জীববিদ্যা, পদার্থ তত্ত্ব ইত্যাদি আয়ত্ত করিয়া ফেলে।

আমার প্রবর্ত্তিত নূতন শিক্ষা প্রণালীর সুবিধাগুলি বর্ণনা করিলাম! এই আদর্শে আমি টাস্কেজী বিদ্যালয় চালাইতে চেষ্টা করিয়াছিলাম। সুতরাং যখন নবগৃহ নির্ম্মাণের সুযোগ আসিল আমি ছাত্রদিগকেই এই কাজে লাগাইতে চাহিলাম। কেহ কেহ বলিলেন “ছাত্রেরা এখন মিস্ত্রীর কাজ জানেই না। কাঠ কাটিতেও তাহারা তত পটু নয়। ঘরামিগিরি করিবে কিরূপে? এত বড় ইমারত তৈয়ারী করা কি ইহাদের সাধ্য? পারিলেও যে, বাড়ীটা অতি বিশ্রী ও কদাকার দেখাইবে! আপনার এ পরামর্শ ভাল হয় নাই। সহর হইতে পাকা মিস্ত্রী ডাকিয়া আনাই উচিত। ছাত্রেরা না হয়, ইহাদের কাজে সাহায্য করিবার জন্য জল, হাতিয়ার, চূণ, সুরকি ইত্যাদি বহিয়া দিবে।”

আমি আমার বন্ধুগণকে বলিতাম, “দেখুন, আমি বুঝিতেছি যে আমাদের বাড়ীটা ছেলেরা প্রস্তুত করিলে নিতান্তই কদাকার দেখাইবে। কিন্তু গৃহের সৌন্দর্য্যবিধানই কি আমাদের একমাত্র কর্ত্তব্য? নাই বা হইল বাড়ীটা দেখিতে সুশ্রী! কিন্তু ছেলেরা ত এতগুলি কাজ শিখিয়া ফেলিবে। তাহারা স্বাবলম্বী হইতে অভ্যস্ত হইবে। আর, এত বড় ইমারতের জন্য মাটি খুঁড়া হইতে আরম্ভ করিয়া চূণকাম ও রংকরা পর্য্যন্ত সকল কাজ নিজহাতে সম্পূর্ণ করিবার সুযোগ পাইবে। তাহাতে শিল্পশিক্ষা ও নৈতিক চরিত্রগঠন যথেষ্টই হইতে থাকিবে। অধিকন্তু, আনুষঙ্গিকভাবে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের অশেষবিধ উৎকর্ষ এবং সাধারণ সভ্যতা বিষয়েও ইহাদের ধারণা পরিষ্কার হইবে। এইগুলি কি কম লাভ? আমার বিবেচনায় এজন্য ঘরবাড়ীগুলি যদি অতি বিশ্রী ভাবেই তৈয়ারী হয় তাহাতেও দুঃখ করা উচিত নয়।”

আমি আরও বলিতাম, “আমাদের ছেলেরা সকলেই গরিব। ইহারা পল্লীগ্রামে বাস করে। ইহাদের গৃহসম্পত্তির মধ্যে একটা করিয়া কাঠের কামরা আছে মাত্র। তূলা, চিনি ও চাউলের আবাদে ইহাদিগকে সারা দিন খাটিতে হয়। বলা বাহুল্য, ইহারা যদি আমাদের বিদ্যালয়ে প্রথমেই একটা প্রকাণ্ড রাজপ্রাসাদের মত বাড়ীতে থাকিতে পায় তাহাহইলে ইহাদের আনন্দের ও গৌরবের সীমা থাকিবে না। ইহা স্বাভাবিক, কারণ কষ্টের পর সকলেই সুখ আশা ও ইচ্ছা করে। কিন্তু আমরা যদি এই অবস্থায় ইহাদিগকে কিছু নূতন আদর্শ ও জীবনের নূতন লক্ষ্য না দিতে পারি তাহা হইলে আমরা ইহাদের জন্য কি করিলাম? পূর্ব্বে ইহারা যে চিন্তা ও যে ধারণা লইয়া লেখা পড়া শিখিতে আসিয়াছিল গৃহে ফিরিবার সময়েও ইহাদের সেই চিন্তাও ধরিয়া থাকিয়া যাইবে না কি?

এইজন্যই আমি মনে করিয়াছি যে, ইহারা ইটের ঘরে থাকিয়া সুখভোগ করিবার পূর্ব্বে নিজ হাতে ইট তৈয়ারী করিতে শিখুক। তারপর সেই ইট দিয়া ইহারাই ঘর প্রস্তুত করিবে। নিজ বসবাসের জন্য নিজহস্তে গৃহনির্ম্মাণ করাও মানুষের স্বাভাবিক লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়? আর ছাত্রগণ ইহাতে গৌরব এবং আনন্দও কি কম পাইবে? অধিকন্তু নিজহাতে গড়া জিনিষ সর্ব্বদা চোখের সম্মুখে থাকিলে তাহাই শিক্ষালাভের একটি প্রধান উপায় হইবে। কারণ তাহা দেখিয়াই ছাত্রেরা অতীতের ভুলগুলি বুঝিতে পারিবে। তাহারা সেইগুলি সহজেই সংশোধন করিবার উপায় বুঝিয়া লইবে, এবং ভবিষ্যতের জন্য উন্নতি বিধানের পথও খুলিতে থাকিবে। ছাত্রেরা এইরূপে নিজেই নিজেদের শিক্ষক হইয়া পড়িবে। এই ‘আত্মশিক্ষা’র সুযোগ আর কোন উপায়ে পাওয়া যাইতে পারে কি?”

টাস্কেজী বিদ্যলয়ের প্রথম গৃহ ছাত্রেরাই নির্ম্মাণ করিয়াছিল। তাহার পর হইতে আজ পর্য্যন্ত এই ১৯ বৎসরের ভিতর বিদ্যালয়ের জন্য যতগুলি গৃহ নির্ম্মিত হইয়াছে প্রায় সকলগুলিই আমাদের ছাত্রগণের প্রস্তুত। আমি আমার শিক্ষাপ্রণালী কোন সময়েই বর্জ্জন করি নাই। আজ আমাদের সর্ব্বসমেত ছোট বড় ৪০ টা গৃহ। এইগুলির মধ্যে কেবলমাত্র ৪ টার জন্য ছাত্রদের খাটান হয় নাই। অবশিষ্ট ৩৬ টা গৃহই ছাত্রেরা নিজহাতে তৈয়ারি করিয়াছে। বাহিরের মিস্ত্রির সাহায্য একেবারেই লওয়া হয় নাই বলা যাইতে পারে।

এই বিশ বৎসরের কার্য্যফলে দেখিতে পাই, যে আমেরিকার দক্ষিণ প্রান্তের জেলায় জেলায় লোকেরা আজকাল সকলেই ঘরবাড়ী তৈয়ারী করিতে শিখিয়াছে। টাস্কেজী বিদ্যালয়ের জন্য প্রায় ৪০ টা গৃহ নির্ম্মাণে সাহায্য করিয়া ছাত্র ও শিক্ষকগণ ঘরামি মিস্ত্রী ও ছুতারের কাজে ওস্তাদ হইয়া গিয়াছে। তাহাদের সংস্পর্শে আসিয়া অন্যান্য লোকেরাও কিছু কিছু গৃহনির্ম্মাণ কার্য্য শিখিয়া ফেলিয়াছে। আর আমাদের বিদ্যালয়ের উপকারই কি হইয়াছে কম? বৎসরের পর বৎসর ছাত্র আসে যায়—কিন্তু গৃহনির্ম্মাণ বিদ্যা আমাদের স্কুলের স্থায়ী আবহাওয়ার মধ্যে দাঁড়াইয়া গিয়াছে। পূর্ব্বতন ছাত্রদের উত্তরাধিকারের সূত্রে নূতন নূতন ছাত্রেরা মাটি কাটা, গর্ত্ত খুঁড়া, কাঠ চেরা, ইট গড়া, গৃহের চিত্র অঙ্কন করা, এবং আনুমানিক ব্যয়ের হিসাব করা হইতে আরম্ভ করিয়া গ্যাসের কল লাগান ইলেক্টিক বাতীর ব্যবস্থা করা সবই শিখিয়া লয়, এখন আমরা গৃহনির্ম্মাণ সংক্রান্ত কোন বিষয়েই বাহিরের লোকের সাহায্য চাই না।

কোন সময়ে একজন নূতন ছাত্র ছেলেমানুষী করিয়া দেওয়ালে পেন্সীলের দাগ দিতে থাকে অথবা টেবিলে ছুরি দিয়া নাম লিখিতে থাকে, অমনই পুরাতন ছাত্রেরা তাহাকে সাবধান করিয়া দেয়। তাহাদের তিরস্কার আর কিছুই নয়—এইমাত্র “ওহে, ও দেওয়ালটা আমরাই প্রস্তুত করিয়াছি, এই টেবিলটাও আমাদের হাতে গড়া। নষ্ট করিলে আমাদিগকেই সারিতে হইবে।”

সর্ব্বপ্রথম গৃহনির্ম্মাণ সময়ে ইট প্রস্তুত করিতেই আমাদিগকে বিশেষ ভুগিতে হইয়াছিল। আমাদের নিজের প্রয়োজন ছাড়া ইট তৈয়ারী করিবার আর একটা কারণও ছিল; আমাদের টাস্কেজী অঞ্চলে সেই সময়ে ইট গড়িবার কোন কারখানা ছিল না। অথচ বাজারে ইটের কাট্‌তি যথেষ্ট। কাজেই ইটের ব্যবসায় বেশ লাভ করা যাইত। এই লাভের আশায়ও আমি বিদ্যালয়ে ইটের কারবার খুলিতে ইচ্ছা করিলাম।

বাইবেলে পড়িয়াছি—ইজবেলদের শিশুরা বিনা খড় কূটায় ইট তৈয়ারী করিতে বাধ্য হইয়াছিল। আমি দেখিলাম আমাদের কাজ তাহা অপেক্ষা কম কষ্টকর নয়। কারণ প্রথমতঃ এ বিষয়ে আমাদের কাহারও কিঞ্চিৎ মাত্র অভিজ্ঞতা নাই। দ্বিতীয়তঃ তহবিলে এই ব্যবসা চালাইবার জন্য এক পয়সাও মজুত নাই।

তার পর, ইট গড়া কাজটাও নেহাত সোজা নয়। কাদামাটির গর্ত্তের মধ্যে ২। ৪ ঘণ্টা দাঁড়াইয়া কাজ করা বড়ই দুঃখ জনক। হাঁটু পর্য্যন্ত কাদা লাগিয়া থাকে। ছাত্রদিগকে এ কার্য্যে ব্রতী করিতে বড়ই বেগ পাইতে হইত। এতদিন তাহাদিগকে বুঝাইতে বুঝাইতে জমি চষিবার কাজে লাগান গিয়াছে। কিন্তু যখন এই কাদামাটি ঘাঁটিবার কাজ আসিল তখন তাহাদিগের সহিষ্ণুতা ও ধৈর্য্য রক্ষা করা অসম্ভব হইয়া পড়িল। লেখাপড়া শিখিতে আসিয়া শারীরিক পরিশ্রম করাই ত তাহারা আদৌ পছন্দ করিত না। তাহার উপর এইরূপ জঘন্য ও কষ্টকর কাজ করিতে তাহারা সম্পূর্ণরূপে নারাজ। কষ্টে দুঃখে অপমানে ও লজ্জায় অনেক ছাত্র আমাদের স্কুল ছাড়িয়া গেল।

আমি পূর্ব্বে ভাবিয়াছিলাম ইট তৈয়ারী করিতে গেলে বেশী বিদ্যা বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। কিন্তু কাজে নামিয়া দেখিলাম, খুব পাকা হাত না হইলে ইট গড়া বড় কঠিন। প্রথমতঃ কাদামাটি প্রস্তুত করিতেও বিশেষ অভিজ্ঞতা চাই। আমরা এজন্য এক জায়গা হইতে অন্য জায়গায় আমাদের মাটির গর্ত্ত সরাইতে বাধ্য হইয়াছিলাম। শেষে একস্থানে বেশ ভাল মাটি পাওয়া গেল। সেইখানে ইট প্রস্তুত হইতে লাগিল। দ্বিতীয়তঃ ইট পোড়ান কাজ খুবই কঠিন। ২৫,০০০ ইট মাটি দিয়া প্রস্তুত করা হইল। কিন্তু এই গুলি পোড়াইতে যাইয়াই মহা বিপদ। আমরা একটা, দুইটা, তিনটা পাঁজা প্রস্তুত করিয়া তিন তিনবার অকৃতকার্য্য হইলাম। আমার কয়েক জন শিক্ষক হাম্পটনে ইট প্রস্তুত করিতে শিখিয়া ছিলেন। তাঁহারা তৃতীয় পাঁজাটা বিশেষ দক্ষতার সহিতই প্রস্তুত করিলেন। এক সপ্তাহ আমাদের ইটগুলি বেশ পুড়িতে লাগিল। ভাবিলাম এ যাত্রায় সফল নিশ্চয়ই হইব। কিন্তু সাত দিন পর রাত্রি ১২। ১ টার সময় পাঁজাটা ভাঙ্গিয়া গেল। আমরা তৃতীয়বার বিফল হইলাম।

সকলেই বলিতে লাগিলেন, “আর চেষ্টা করিয়া কাজ নাই। ইট গড়া আমাদের দ্বারা হইবে না।” তাহার উপর আমার পয়সাও ফুরাইয়া আসিয়াছে। চতুর্থবার এক্‌স্‌পেরিমেণ্ট বা পরীক্ষা করিতে হইলেও টাকার প্রয়োজন। একে নৈরাশ্য তাহাতে দারিদ্র্য। পুনরায় চেষ্টা করা অসম্ভব মনে হইতে লাগিল। আমার একটা পুরাতন ঘড়ি ছিল। এই সময়ে সেটা একটা দোকানে বাঁধা রাখিয়া ৫০৲ ধার লইয়া আসিলাম। এই টাকার সাহায্যে ইটের পাঁজা তৈয়ারী করিতে যাওয়া গেল। এইবার কৃতকার্য্য হইলাম। এতদিন পর ২৫,০০০ ইট আমাদের কারখানায় তৈয়ারী হইল।

আজ ইটের কারবার টাস্কেজী বিদ্যালয়ে খুব জোরের সহিতই চলিতেছে। গত বৎসর আমাদের ছাত্রেরা ১,২০০,০০০ ইট গড়িয়াছিল। এগুলি এত সুন্দর ও নিরেট যে আমি যে কোন বাজারে ফেলিয়া সর্ব্বোচ্চ মূল্য আদায় করিতে পারি। তাহা ছাড়া বিগত বিশ বৎসরের শিক্ষার ফলে, আজ আমেরিকার দক্ষিণ অঞ্চলে গণ্ডায় গণ্ডায় নিগ্রোযুবক ইটের ব্যবসায় করিয়া অন্নসংস্থান করিতেছে।

ইটের কারবার করিতে করিতে আমার একটা নূতন দিকে দৃষ্টি পড়িল। আমাদের বিদ্যালয়ে বহু শেতাঙ্গ ব্যক্তি ইট খরিদ করিতে আসিত। তাহারা পূর্ব্বে আমাদের সঙ্গে বিশেষ কোন কথাবার্ত্তা বলিত না। কিন্তু অন্যত্র ইট পাওয়া যায় না। কাজেই ইহারা কৃষ্ণাঙ্গের সাহায্য লইতে বাধ্য হইল।

আর পূর্ব্বে অনেক শ্বেতাঙ্গই ভাবিত যে, লেখা পড়া শিখিয়া নিগ্রোরা বাবু হইয়া পড়িবে। তাহারাও এখন বুঝিল যে, নিগ্রোরা এই জাতীয় বিদ্যালয় খুলিয়া সত্য সত্যই নিজেদের উন্নতি করিতেছে। এবং সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত সহরেরই উপকার হইতেছে। এই উপায়ে কৃষ্ণাঙ্গ সম্বন্ধে শ্বেতাঙ্গের ধারণা বদলাইতে লাগিল।

ফলতঃ আমাদের দুই সমাজে কর্ম্মবিনিময় ও ভাব-বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হইল। আজ দক্ষিণ অঞ্চলে নিগ্রোয় ও শ্বেতাঙ্গে যে সদ্ভাব রহিয়াছে তাহার অন্যতম কারণ আমাদের টাস্কেজীর এই ইটগড়া এবং ইটের কারবার। বহু বক্তৃতা দ্বারা যে কার্য্য করিতে পারিতাম কি না সন্দেহ, ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে তাহা নীরবে ও সহজে সিদ্ধ হইয়া গেল।

শ্বেতাঙ্গ যে কৃষ্ণাঙ্গকে বাদ দিয়া সংসারে চলিতে পারিবে না—এই ব্যবসায় হইতে তাহারা বেশ বুঝিয়া লইল। কাজেই আজ দুই সমাজই এক বৃক্ষের ফলের ন্যায় পরস্পরসাপেক্ষ। পরস্পর পরস্পরের কথা না ভাবিয়া থাকিতে পারে না। শ্বেতাঙ্গের কার্য্যে কৃষ্ণাঙ্গের উপকার হয়, এবং কৃষ্ণাঙ্গের বিদ্যায় শ্বেতাঙ্গের অভাব মোচন হয়। শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ আজ আমেরিকা জননীর যমজ সন্তানের ন্যায় চলাফেরা করিয়া থাকে। শিল্প ও ব্যবসায় শিক্ষার মূল্য কি কম?

আমি আমার স্বজাতিগণকে সর্ব্বদা বলিয়া থাকি, “দেখ, গলাবাজী করিয়া কখনও একটা বড় কিছু করা যায় না। তোমরা ভাবিয়াছ যে চেঁচাচেঁচি করিলেই তোমাদিগকে শ্বেতাঙ্গেরা ভাই বলিয়া ডাকিবে, এবং তাহাদিগের সমান ক্ষমতা তোমাদিগকে দিতে থাকিবে? ইহা কখনই সম্ভবপর নয়। কাজ করিতে লাগিয়া যাও। কৃষিকর্ম্মে লাগিয়া যাও, শিল্পকার্য্যে লাগিয়া যাও, ব্যবসায় বাণিজ্যে লাগিয়া যাও। বাড়ী, গাড়ী, রেল জাহাজ, ষ্টীমার তৈয়ার করিতে থাক। এ সকল বিষয়ে তোমাদের ‘হাত’ দেখাও। তাহাদিগকে তোমাদের বিদ্যা বুদ্ধির দৌড় দেখাও। তাহারা বুঝুক যে তোমরাও মানুষ, তোমরাও মাথা খাটাইয়া একটা জিনিষ দাঁড় করাইতে পার। তাহা হইলেই তাহারা তোমাদিগকে সম্মান করিবে—তোমাদের সঙ্গে বসিতে চাহিবে—তোমাদের সঙ্গে খাইতে চাহিবে। দেখিতে পাও না—যে যে অঞ্চলে নিগ্রো শিল্পী ও ব্যবসায়ীরা বেশ দক্ষতার সহিত কারবার চালাইতেছে সেই সকল স্থানে শ্বেতাঙ্গে কৃষ্ণাঙ্গে বিরোধ বড় বেশী নাই? সেখানে কালচামড়া সাদা চামড়ায় প্রভেদ অল্প মাত্রই দেখা যায়!”

এআই অনুবাদ · মূল