মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Benoy Kumar Sarkar (†1949) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন
আমার স্বজাতির প্রতি কর্ত্তব্য আছে। তাহা পালন করিতেই হইবে। আমাদের দক্ষিণ অঞ্চলের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেই হইবে—অথচ তাহাদের দোষের কথা উল্লেখ না করিলেই বা চলিবে কেন? এদিকে উত্তর অঞ্চলের ইয়াঙ্কিগণ তাঁহারাও আমার বক্তৃতা শুনিয়া সমগ্র আমেরিকার নিগ্রোসমস্যা বুঝিতে চেষ্টা করিবেন। দক্ষিণপ্রান্তের নিগ্রোয় ও শ্বেতাঙ্গে সম্বন্ধ কিরূপ দাঁড়াইয়াছে তাঁহারা আমার বক্তৃতা হইতেই তাহার পরিচয় লইবেন। সুতরাং আমার দায়িত্ব অতি গুরুতর—সমগ্র আমেরিকাজাতি আমার পরীক্ষক ও বিচারক। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইবার উপযুক্ত শিক্ষা আমি এতদিন লাভ করিয়াছি কি? এই সময়ে আমার বয়স ৩৫। ৩৬ বৎসর।
আমার মাথায় কত কথাই আসিতে লাগিল। আমি নানা উপায়ে সমস্যাটা তলাইয়া মজাইয়া বুঝিতে চেষ্টা করিলাম। ইতিমধ্যে সমগ্র আমেরিকার সংবাদপত্রগুলি আমাকে প্রকাশ্যভাবে পরামর্শ দিতে লাগিল। কেহ লিখিল—“আমার অমুক অমুক বিষয় আলোচনা করা উচিত, অমুক অমুক প্রশ্নের উত্থাপন না করাই ভাল।” কোন সম্পাদক মহাশয় পরামর্শ দিলেন—“ওয়াশিংটন এই এই কথা যেন বলেন।” ইত্যাদি। আমার স্বজাতিগণ এবং দক্ষিণ প্রান্তের শ্বেতাঙ্গেরাও আমাকে উপদেশ দিতে ছাড়িলেন না। যাহা হউক আমার নিজের বক্তব্য স্থির করিয়া ফেলিলাম। ১৮ই সেপ্টেম্বর সভা হইবে—তাহার পূর্ব্বেই আমার বক্তৃতা লেখা হইয়া গেল। টাস্কেজীর শিক্ষকগণকে আমার প্রবন্ধ পড়িয়া শুনাইলাম। তাঁহাদের আলোচনা অনুসারে বক্তৃতার কিয়দংশ মার্জ্জিতও করাইয়া লইলাম।
১৭ই সেপ্টেম্বর তারিখে টাস্কেজী হইতে আটলাণ্টার সম্মিলনে রওনা হওয়া গেল। টাস্কেজীতে রেলে চড়িতে যাইতেছি, এমন সময়ে একজন শ্বেতাঙ্গ চাষী আমাকে ঠাট্টা করিয়া বলিল,—“কিহে ওয়াশিংটন ভায়া এতদিন তুমি উত্তর অঞ্চলের ইয়াঙ্কি মহলে বক্তৃতা মারিয়াছ। অথবা তোমার স্বজাতিগণকে তাহাদের কর্ত্তব্য শিখাইয়াছ এবং কখনও কখনও দক্ষিণের শ্বেতাঙ্গ মহলেও আমাদের উপর গলাবাজী করিয়াছ। কিন্তু এবার তোমাকে এক সঙ্গে সকল মহলেই কথা বলিতে হইবে। দেখিতেছি তুমি এবার শক্ত পাল্লায় পড়িয়াছ। এবার উদ্ধার পাইলে বুঝিব ওয়াশিংটন সত্যসত্যই একজন মানুষ।” চাষী আমার মনোভাব ঠিক বুঝিতে পারিয়াছিল—সত্যই আমার তখনকার অবস্থা বড় কঠিন।
আমি রেলে চলিলাম। ষ্টেসনে ষ্টেসনে কত শ্বেতাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গ আমার সম্মুখে দাঁড়াইয়াই আমার সম্বন্ধে আলোচনা করিতে লাগিল। আমার দিকে অনেকে আঙ্গুল দিয়া অন্যকে দেখাইয়া দিল। গাড়ী হইতে আটলাণ্টায় পদার্পণ করিবামাত্র এক বৃদ্ধ নিগ্রো আর একজনকে বলিল “ঐ লোকটা কালকার সভায় আমাদের স্বজাতির পক্ষ হইতে বক্তৃতা করিবে। আমি সভায় শুনিতে যাইবই স্থির করিয়াছি।”
আটলাণ্টায় সেদিন লোকে লোকারণ্য হইয়া গিয়াছে। আমেরিকার ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশ হইতে প্রতিনিধি, দর্শক, ব্যবসায়ী ও শিল্পীর সমাগম হইয়াছে। সেনাবিভাগের লোকজন আসিয়াছে। ভিন্ন ভিন্ন দেশের কর্ম্মচারী এবং রাষ্ট্রীয় দূতগণও সমবেত হইয়াছে। আটলাণ্টায় সেদিন বিশ্বের মহাবাজার বসিয়াছে বোধ হইল।
সমস্ত রাত্রি আমার ঘুম হইল না। সকালে উঠিবামাত্র ভগবানের নিকট আমার বক্তৃতার সফলতার জন্য প্রার্থনা করিলাম। সকল বক্তৃতার পূর্ব্বেই আমি ভগবানের করুণা ভিক্ষা করিয়া থাকি।
তারপর আমাকে সভামণ্ডপে লইয়া যাইবার জন্য কয়েকজন লোক আমার গৃহে আসিলেন। সভাস্থলে যাইবার পূর্ব্বে এক বিশাল শোভাযাত্রা বাহির হইল। এই শোভাযাত্রায় কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ এবং কয়েক দল কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্যও যোগ দান করিয়াছিল। তিন ঘণ্টা ক্রমাগত চলিয়া সেই লোকপ্রবাহ প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে আসিয়া উপস্থিত হইল। গরমে আমার শরীর ঘর্ম্মাক্ত হইয়া গেল। একে আমার মানসিক উদ্বেগ তাহার উপর এই ক্লান্তি। আমি ভাবিলাম—আমার বক্তৃতা দেওয়া হইবে না। অবশেষে সম্মিলন-গৃহে প্রবেশ করিলাম।
সভামণ্ডপ অতি সুবিস্তৃত ও গোলাকার। নীচ হইতে উপরিভাগ পর্য্যন্ত কোথায়ও নূতন লোক বসিবার বিন্দুমাত্র স্থান নাই—সকল আসনই পূর্ণ। আমি গৃহে প্রবেশ করিবামাত্র কৃষ্ণাঙ্গেরা জয়ধ্বনি করিতে লাগিল। কোন কোন শ্বেতাঙ্গও সেই ধ্বনিতে যোগদান করিলেন। আমি শুনিয়াছিলাম যে অনেক শ্বেতাঙ্গই আমার বক্তৃতা শুনিতে আসিবেন। কাহারও উদ্দেশ্য কেবল শুনা মাত্র। কেহ কেহ অবশ্য আমার প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন। আর অধিকাংশ লোকই মজা দেখিতে আসিয়াছে। তাহাদের বিশ্বাস আমি সকল অনুষ্ঠানটা পণ্ড করিয়া ফেলিব। তাহা হইলে আমাকে লইয়া হাসি ঠাট্টা করিতে পারিবে।
আমার একজন সহৃদয় শ্বেতাঙ্গ বন্ধু ব্যাপার দেখিয়া সভাগৃহেই প্রবেশ করিলেন না। আমি যদি সুফল লাভ না করি তাহা হইলে বড়ই লজ্জা ও নিন্দার বিষয় হইবে। এই ভাবিয়া তিনি অস্থিরভাবে সভাগৃহের বাহিরে ‘পায়চারি’ করিতে লাগিলেন। বাস্তবিক পক্ষে, আমার এই বক্তৃতা সম্বন্ধে পূর্ব্ব হইতে নানা লোকের মনে নানা সন্দেহ উঠিয়াছিল।
চতুর্দ্দশ অধ্যায়
আটলাণ্টা-সম্মিলনে অভিভাষণ
জর্জ্জিয়া-প্রদেশের রাষ্ট্র-শাসক বুলক একটি ক্ষুদ্র বক্তৃতা করিয়া প্রদর্শনী খুলিলেন। পরে ধর্ম্মগুরু নেল্সন স্তোত্র পাঠ করিলেন এবং একটি ‘প্রদর্শনী-মঙ্গল’ কবিতাও পঠিত হইল।
এই সকল আনুষ্ঠানিক কার্য্য শেষ হইবার পর সম্মিলনের কার্য্য আরম্ভ হইল। প্রদর্শনীর সভাপতি তাঁহার অভিভাষণ পাঠ করিলেন। রমণী-বিভাগের সভাপতির বক্তৃতাও হইয়া গেল। তাহার পর বুলক মহোদয় আমাকে সমবেত জনমণ্ডলীর নিকট পরিচিত করিয়া দিলেন। তিনি বলিলেন “ইনি বুকার ওয়াশিংটন—নিগ্রোসমাজের একজন শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। ইনি আমাদিগকে নিগ্রোজাতির কৃতিত্ব ও সভ্যতার বিবরণ প্রদান করিবেন।”
আমি বক্তৃতা করিতে আরম্ভ করিলাম—অমনি চারিদিক হইতে জয়ধ্বনি উঠিল। নিগ্রোমহল হইতেই বিশেষ উৎসাহ পাওয়া গেল—এবং হাজার হাজার লোকের দৃষ্টি আমার দিকে পড়িল। নিম্নে আমার বক্তৃতা উদ্ধৃত করিতেছি।
“সভাপতি মহাশয়, প্রদর্শনী ও সম্মিলনের ধুরন্ধরগণ, এবং বন্ধুগণ,
দক্ষিণ অঞ্চলের ১/৩ অংশ লোক নিগ্রো সমাজের অন্তর্গত। নিগ্রোসমাজকে বাদ দিয়া কর্ম্ম করিলে কোন অনুষ্ঠানই এ অঞ্চলে সুফল প্রদান করিতে পারে না। এ অঞ্চলের আর্থিক, রাষ্ট্রীয় ও নৈতিক উন্নতি বিধানের জন্য কৃষ্ণাঙ্গ জাতির সহযোগিতা গ্রহণ করা অবশ্যকর্ত্তব্য।
আপনারা এই প্রদর্শনী উপলক্ষ্যে নিগ্রোজাতিকে উপেক্ষা করেন নাই, বরং সকল অবস্থায়ই কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের সাহায্য গ্রহণ করিয়া অগ্রসর হইয়াছেন। এইরূপে প্রতি পদে আপনারা স্বজাতির চরিত্রবত্তা এবং বুদ্ধিমত্তার যথোচিত সম্মান করিয়াছেন। এজন্য আমার স্বজাতিগণ আপনাদের নিকট আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছে। আমি তাহাদের মুখপাত্র স্বরূপ এই প্রদর্শনীর কর্ম্মকর্ত্তাদিগকে তাঁহাদের উদারতার জন্য ধন্যবাদ প্রদান করিতেছি।
আপনারা আমাদিগকে এই উপায়ে সম্মানিত করিয়া শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের ঐক্যবন্ধন দৃঢ় করিলেন। আমাদের স্বাধীনতালাভের পর এরূপ ভ্রাতৃভাব, সহৃদয়তা এবং পরস্পর সাপেক্ষতা আর দেখা যায় নাই।
কেবল তাহাই নহে। আমরা এই সুযোগে শিল্প ও ব্যবসায় হিসাবে এক নবজীবন লাভ করিতে থাকিব। এতদিন আমরা রাষ্ট্রীয় ও শিল্পকর্ম্মে অনেকটা অনভ্যস্ত ছিলাম। গোড়ার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হইবার পূর্ব্বে আমরা উচ্চ অধিকারলাভের আকাঙ্ক্ষা রাখিতাম। সম্পত্তির মালিক না হইয়াই প্রদেশ-রাষ্ট্রের এবং যুক্ত-রাষ্ট্রের মন্ত্রণা-সভার পদলাভের আশা করিতাম। কৃষিকর্ম্মে, শিল্পে ও ব্যবসায়ে পরিশ্রম স্বীকার করিতে কুণ্ঠিত হইয়া রাষ্ট্রীয় আন্দোলনে এবং গলাবাজীতে সময় ব্যয় করিতাম। এরূপ অস্বাভাবিক আশা, আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়াসের যথেষ্ট কারণ আছে। আমরা যে সময়ে স্বাধীনতা পাই তখন আমরা সকল বিষয়ে নিতান্ত শিশু ছিলাম—কোনদিকেই আমাদের কোনরূপ অভিক্ষতা অভিক্ষতা ছিল না। এজন্য সংসারের লোভনীয় পদ ও সম্মানগুলির প্রতি আমরা প্রথমেই অনুরক্ত হইয়া পড়িয়াছিলাম। এগুলিকে লাভ করিবার উপায় ও কৌশলের প্রতি দৃষ্টি পড়ে নাই। আমরা ফললাভের জন্যই বেশী ব্যগ্র হইয়াছিলাম—ফললাভের প্রণালীগুলি আয়ত্ত করিতে যত্ন লই নাই।
বহুদিন ধরিয়া একটি জাহাজ সমুদ্রে পথ হারাইয়া এদিক ওদিক ঘুরিতেছিল। হঠাৎ এক দিন একটি নূতন জাহাজের সঙ্গে তাহার সাক্ষাৎ হইল। পথভ্রান্ত জাহাজের মাস্তুল হইতে তাহার দিকে নিশান তোলা হইল—“জল চাই জল চাই, আমরা তৃষ্ণায় মরিতেছি।” নূতন জাহাজ হইতে তৎক্ষণাৎ উত্তর আসিল “যেখানে তোমাদের জাহাজ রহিয়াছে সেই খানেই ভাল জল পাইবে। ঠিক সেই খানেই বাল্তি ফেল।”
পথভ্রান্ত জাহাজ আবার জানাইল “জল, জল, শীঘ্র ভাল জল পাঠাও।” নূতন জাহাজ আবার উত্তর করিল “ঐখানেই সুস্বাদু পানীয় জল পাইবে। বাল্তি ফেলিলেই ভাল জল উঠিবে।” এইরূপে তিন চারিবার দুই জাহাজে প্রার্থনা ও উত্তর চলিতে লাগিল। শেষে সেই পথভ্রান্ত জাহাজের কর্ত্তা বাল্তি ফেলিয়া দেখিলেন—অতি নির্ম্মল ও মিষ্ট জল উঠিয়া আসিল। তাঁহাদের জাহাজ সমুদ্র ছাড়িয়া অনেকক্ষণ আমাজন নদে পড়িয়াছে।
আমাদের নিগ্রোসমাজকেও আমি সেইরূপ বলি—“যেখানে আছ সেই খানেই বাল্তি ফেল। ভাল জল পাইবে। তৃষ্ণায় অধীর হইতে হইবে না।”
তোমরা ভাবিতেছ আমেরিকা ছাড়িয়া গেলে সুখী হইবে? তোমরা ভাবিয়াছ তোমাদের সঙ্গে শ্বেতাঙ্গসমাজের সদ্ভাব কোনদিনই জন্মিবে না? তোমরা ভুল বুঝিতেছ— সেই পথভ্রান্ত জাহাজের নাবিকদের মত পুরাতন মোহে মজিয়া রহিয়াছ।
চক্ষু খুলিয়া দেখ—দেখিবে স্বাস্থ্যকর সুমিষ্ট জল তোমার সম্মুখেই রহিয়াছে। বুঝিবে শ্বেতাঙ্গ তোমার ভাই—দেখিবে আমেরিকাই তোমার স্বদেশ। দূরে যাইবার প্রয়োজন নাই—শ্বেতাঙ্গ প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভাব-বিনিময় ও কার্য্য-বিনিময় কর। যে দেশের আব্হাওয়ায় বাস করিতেছ সেই আব্হাওয়া হইতেই নিঃশ্বাস গ্রহণ কর। সত্বরেই এক হৃষ্টপুষ্ট ও চরিত্রবান্ জাতি রূপে গড়িয়া উঠিতে পারিবে।
কৃষিকর্ম্মে মনোনিবেশ কর। শিল্প ও ব্যবসায়ে মনোযোগী হও। অন্যান্য নানাপ্রকার চাকরী, কেরাণীগিরি ইত্যাদিতে লাগিয়া যাও। বিদেশে যাইবার প্রয়োজন নাই। “যেখানে আছ সেইখানেই বাল্তি ফেল।”
দক্ষিণ অঞ্চলের শ্বেতাঙ্গদিগের অনেক দোষই আছে স্বীকার করি। কিন্তু এ কথাও মুক্তকণ্ঠে আমি বলিতেছি যে, এখানে নিগ্রোজাতি ব্যবসায় হিসাবে কোন অসুবিধাই ভোগ করে না। বরং আমাদের আর্থিক উন্নতির যথেষ্ট সুযোগই আমার স্বজাতিগণ এখানে পাইয়াছে। কোন নিগ্রোই তাহা ভুলিয়া থাকিতে পারিবে না।
আমরা অল্পকাল হইল স্বাধীন হইয়াছি। বলা বাহুল্য, অন্যান্য স্বাধীনজাতির যে অবস্থা আমাদেরও সেই অবস্থাই হইবে। পুরাতন লব্ধপ্রতিষ্ঠ-জাতির মধ্যে ব্যক্তিমাত্রকেই খাটিয়া খাইতে হয়। সংসারের কাজকর্ম্মে বিদ্যাবুদ্ধি ও চরিত্রবলের প্রয়োগ করিয়াই তাহারা জগতে বিরাজ করিতেছে। নিগ্রোজাতিকেও সেইরূপ পরিশ্রম স্বীকার করিতে হইবে। আমাদের অন্নের গ্রাস আমাদিগকে নিজহাতেই মুখে তুলিতে হইবে। তাহার জন্য শারীরিক পরিশ্রম অত্যাবশ্যক।
“গোলামীর যুগে পরিশ্রম করিতাম—কিন্তু এখন স্বাধীন হইয়াছি পরিশ্রম করিব কেন?”—কোন চিন্তাশীল ব্যক্তিই এরূপ ভাবিতে পারেন না। কারণ স্বাধীনতার অর্থ পরিশ্রম হইতে মুক্তিলাভ নয়! স্বাধীনতার যুগেও হাতে পায়ে খাটিতে হইবে—মাথার ঘাম পায়ে ফেলিতে হইবে।
গোলামীযুগে পরের স্বার্থে খাটিতাম, পরের নেতৃত্বে খাটিতাম, পরকে সুখী করিবার জন্য খাটিতাম। সে খাটায় কিছুমাত্র নিজস্ব ছিল না, নিজের লাভ দেখিতাম না, নিজের আনন্দ পাইতাম না। কিন্তু স্বাধীনতার যুগে খাটিব—নিজের জন্য, নিজ আনন্দের জন্য, নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য—সকল বিষয়ে নিজের কর্ত্তৃত্ববোধ জাগাইবার জন্য—সর্ব্বত্র নিজকে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য। কিন্তু খাটা বন্ধ হইবে না। যতদিন মানুষ থাকিব ততদিন খাটিতেই হইবে।
আমার নিগ্রো ভ্রাতারা সর্ব্বদা একথা মনে রাখিয়া চলিবেন। স্বাধীন হইয়াছি বলিয়া বাবুগিরি ও বিলাসের সুযোগ পাইয়াছি—একথা যেন আমরা না বুঝি! বরং এখন হইতে আমাদিগকে কঠোর সংযম পালন করিতে হইবে। সৌখীন ও চকচকে পদার্থের প্রলোভন ছাড়াইয়া যথার্থ টেকসই, স্থায়ী এবং কার্য্যোপযোগী জিনিষপত্রের আদর করিতে হইবে। অলঙ্কার বেশভূষা ইত্যাদির আকাঙ্ক্ষা এখন কিছু বর্জ্জন করা আবশ্যক। সকল বিষয়েই আমাদের এখন কষ্টকর সাধনার যুগ।
সকল স্বাধীন জাতিই বিবেচনা করেন যে, কবিতারচনায় যে কৃতিত্ব, জমি চাষেও সেই কৃতিত্ব। সুতরাং যাঁহারা সমাজকে ধনে সম্পদে উন্নত করিতেছেন তাঁহাদের সম্মান বড় কম নয়। এই বুঝিয়া আমাদেরও এই ধনসম্পদ্বৃদ্ধির কর্ম্মে মনোযোগী হইতে হইবে। আমরা এই গোড়ার কথা ভুলিয়া গেলে উন্নতির উচ্চ স্তরগুলিতে উঠিতে পারিব না।
তারপর আমরা যেন সর্ব্বদা মনে রাখি যে, আমাদের সুযোগ ও সুবিধা, বর্ত্তমানে অনেকই রহিয়াছে। অবশ্য কতকগুলি বাধা ও বিঘ্ন আমাদের চরম উন্নতির প্রতিবন্ধক হইয়া আছে—তাহা আমি অস্বীকার করিতেছি না। কিন্তু সর্ব্বদা সেই অসুবিধার কথা ভাবিবার প্রয়োজন নাই, এবং ভাবিয়া ভাবিয়া সেইগুলিকে বাড়াইয়া তুলিবার প্রয়োজন নাই। আমাদের হাতের কাছে যে সকল সুবিধা পাইতেছি সেইগুলিকে বুদ্ধিমানের ন্যায় ব্যবহার করিব না কেন? বর্ত্তমান অবস্থায় আমরা যদি জগতের শক্তিগুলি যথাসম্ভব সদ্ব্যবহার করিয়া নিজেদের কাজে না লাগাই, তাহা হইলে ভবিষ্যতের জন্য আমরা কি করিয়া গেলাম? আমাদের বংশধরগণের উচ্চতর কর্ম্ম ও চিন্তার জন্য আমাদের এক্ষণে সুদৃঢ় ভিত্তি গঠন করিয়া রাখা আবশ্যক নহে কি? এজন্য বর্ত্তমানের সুযোগ যাহা কিছু পাইতেছি সকলই আমাদের প্রাণপণে নিগ্রোসমাজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করা কর্ত্তব্য।
আমার শ্বেতাঙ্গ দেশবাসীদিগকেও আমি বলিতেছি—‘আপনারাও যেখানে আছেন, ঠিক সেইখানে বাল্তি ফেলুন’—আপনাদের অভাবেরও পূরণ হইবে। বিদেশ হইতে লোক আমদানী করিবার প্রয়োজন নাই। স্বদেশের কৃষ্ণাঙ্গসমাজের মধ্যে বাল্তি ফেলুন—আমেরিকার নিগ্রোজাতির সঙ্গে সকল বিষয়ে মিলিয়া মিশিয়া কাজ করুন। আমেরিকাজননী প্রবল পরাক্রান্ত হইয়া উঠিবেন।
এই নিগ্রোরা আপনাদের যমজ ভ্রাতা। ইহারা আপনাদের সুখে-দুঃখে উৎসবে-ব্যসনে সকল অবস্থায়ই সঙ্গী রহিয়াছে। আপনারা কি ইহাদের নিকট ঋণী নহেন?
“নিগ্রোজাতির স্বভাব চরিত্র আপনাদের অজানা নাই। ইহাদের প্রভুভক্তি এবং চরিত্রবত্তার পরীক্ষা আপনারা বহুবার করিয়াছেন। আপনারা ইহাদিগকে বিশ্বাস করিয়া আপনাদের স্ত্রীপুত্ত্রপরিবার ও ধনসম্পত্তি সম্বন্ধে কতবার নিশ্চিন্ত হইয়াছেন—সে সকল কথা আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। ইহারা যে বিশ্বাসঘাতক নয় তাহার সাক্ষ্য আপনারাই সর্ব্বোৎকৃষ্টরূপে দিতে পারিবেন।
অধিকন্তু, এই কৃষ্ণাঙ্গ-সমাজ আপনাদের আর্থিক উন্নতির প্রধান অবলম্বন। ইহারাই মূকভাবে এতদিন আপনাদের জমি চষিয়াছে। ইহারা কখনও ধর্ম্ম-ঘট করে নাই —আপনাদিগকে জব্দ করিয়া, নিজেদের বেতন বা অন্যান্য অধিকার বাড়াইবার জন্য চেষ্টিত হয় নাই। বিনাবাক্যব্যয়ে ইহারা আপনাদের জঙ্গল পরিষ্কার করিয়াছে—রেলপথ তৈয়ারী করিয়াছে—নগর নির্ম্মাণ করিয়াছে। নিগ্রো কুলীরাই পৃথিবী খুঁড়িয়া অন্ধকারময় খাদ হইতে ধাতুরত্ন তুলিয়া আনিয়াছে—ইহাদের সাহায্যেই আমেরিকার দক্ষিণ অঞ্চলের সকল সুখ ও শ্রী পুষ্ট হইয়াছে।
আপনারা এই সমাজের প্রতি কি কৃতজ্ঞ হইবেন না? আপনারা কি আপনাদের পারিবারিক, সামাজিক ও আর্থিক গৌরবের মূলকারণ স্বরূপ নিগ্রোজাতিকে অবজ্ঞা করিয়া থাকিতে পারেন? আমি প্রার্থনা করিতেছি—শ্বেতাঙ্গ-সমাজের অগ্রণীগণ, আপনারা কৃষ্ণাঙ্গ-সমাজের মধ্যেই আপনাদের বাল্তি ফেলুন। প্রতিকার্য্যে ইহাদিগের সহযোগিতা গ্রহণ করুন।
আপনারা ঠিক পথেই চলিয়াছেন আপনারা নিগ্রোশ্বেতাঙ্গের মিলন পথই ধরিয়াছেন তাহা আমি বেশ বুঝিতেছি। আজকার এই প্রদর্শনীই তাহার সাক্ষ্য। এই সম্মিলনে আমি যে বক্তৃতা দিবার সুযোগ পাইয়াছি—ইহাই তাহার সাক্ষ্য। আপনারা নিগ্রোসমাজকে সম্মান করিতেছেন।
আপনারা এক্ষণে আমার স্বজাতিদিগকে উন্নতির নব নব পথে চালিত করুন। তাহাদের উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করুন—তাহাদের হৃদয়ের উৎকর্ষসাধনের জন্য চেষ্টিত হউন। তাহাদিগকে কৃষি, শিল্প, কলা, সাহিত্য, চিত্র, স্থাপত্য ইত্যাদি সভ্যতার বিবিধ বিভাগে প্রতিষ্ঠিত হইবার সুযোগ প্রদান করুন। দেখিবেন,—দেশের মাটি উর্ব্বর হইতে থাকিবে—ধরণী ফলেফুলে ভরা হইয়া আপনাদের আনন্দ বিধান করিতে থাকিবে। আমেরিকার পল্লীগুলি উদ্যানে পরিণত হইবে—নগরগুলি নব নব ফ্যাক্টরী বক্ষে ধারণ করিয়া সমৃদ্ধ হইবে।
আর জানিয়া রাখিবেন, যখন প্রয়োজন হইবে, আপনাদের স্বাধীনতা রক্ষা করিবার জন্য আমরা আমাদের রক্তের শেষবিন্দু পর্য্যন্ত দান করিব। এরূপ প্রভুভক্ত বিশ্বাসী এবং কৃতজ্ঞ জাতি আপনারা বিদেশ হইতে আমদানী করিতে পারিবেন না। “ অপনারা যেখানে আছেন সেইখানেই বাল্তি ফেলুন।”
অতীতের কথাগুলি স্মরণ করুন, সেই গোলামীর যুগ স্মরণ করুন—সেই গোলামী যুগের শেষ অবস্থা, সেই উত্তরপ্রান্তে ও দক্ষিণপ্রান্তে লড়াইয়ের কথা স্মরণ করুন। অতীতে আমরা আপনাদের সন্তান সন্ততি পালন করিয়াছি, বৃদ্ধ মাতাপিতার সেবা করিয়াছি। আপনাদের রোগে ও শোকে আমরাই অসুখ ও রোগের ক্লেশ সহ্য করিয়াছি। আপনাদের শয্যাপার্শ্বে কত দিনরাত্রি আমরা অনশনে কাটাইয়াছি। আপনাদের অভিভাবকগণের মৃত্যুকালে আমরা কত আঁখিজল ফেলিয়াছি। আমরা আমাদের রক্তদিয়া আপনাদিগকে মানুষ করিয়াছি। নূতন কোন্ জাতি আসিয়া আপনাদিগের সেরূপ সেবাশুশ্রূষা করিবে?
এতকাল আমরা আপনাদের জন্য যাহা করিয়া আসিয়াছি ভবিষ্যতেও আমরা ঠিক সেইরূপই করিব। আমরা আপনাদের ধর্ম্ম, সমাজ, শিল্প, শিক্ষা, রাষ্ট্র, ইত্যাদি সকল কর্ম্মক্ষেত্রেই আপনাদের সহযোগী এবং কনিষ্ঠ ভ্রাতা হইয়া থাকিব। আমরা শ্বেতাঙ্গের স্বার্থকে নিজ স্বার্থ বিবেচনা করিয়া সকল বিষয়ে এক পরিবারভুক্তরূপে জীবন যাপন করিব। আবশ্যক হইলে এই ৮০ লক্ষ নিগ্রোজাতি প্রাণপাত করিয়া আমেরিকার গৌরব রক্ষা করিবে। প্রত্যেক নিগ্রোর জীবন সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও ‘ইজ্জতে’র জন্য উৎসর্গীকৃত জানিয়া রাখিবেন।
জানিয়া রাখিবেন—নিগ্রো ও শ্বেতাঙ্গ লেন-দেন—খাওয়া, পরায় পাঁচ আঙ্গুলের মত স্বতন্ত্র থাকিলেও থাকিতে পারে। কিন্তু এই দুই সমাজ যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয়’ মঙ্গলের জন্য আমার এই বাহুর মত ঐক্য বিশিষ্ট। আমরা পরস্পর-সাপেক্ষ—আমাদের একতা মানবদেহের ন্যায় স্বাভাবিক গ্রন্থিপ্রসূত। দুইএর স্বার্থ সম্পূর্ণ এক।
আমেরিকাবাসী এক অঙ্গকে ছাড়িয়া অন্য অঙ্গকে পুষ্ট ও উন্নত করিতে পারিবে না। আমাদের প্রত্যেকের সম্মান ও স্বাধীনতা অপরের সম্মান ও স্বাধীনতার উপর সম্পূর্ণরূপেই নির্ভর করিতেছে। আপনারা নিগ্রোজাতিকে দাবিয়া চাপিতে এবং পঙ্গু করিয়া রাখিতে চেষ্টা করিলে সত্য সত্যই আত্মহত্যা করিয়া ফেলিবেন। তাহা না করিয়া আপনারা নিগ্রোকে আমেরিকার উপযুক্ত-সন্তানে পরিণত করিতে চেষ্টিত হউন, অভিভাবকের ন্যায় তাহাকে উৎসাহিত করুন, তাহাকে সাহায্য করুন, তাহার শিশুসুলভ চিন্তাশক্তিরাশিকে সংরক্ষিত, পরিপুষ্ট করুন, তাহার অনুন্নত কর্ম্মশক্তিগুলিকে নানা উপায়ে বাড়াইয়া তুলিবার চেষ্টা করুন। এই “সংরক্ষণে”র জন্য আপনাদের যথেষ্ট পরিশ্রম স্বীকার করিতে হইবে, এবং যথেষ্ট অর্থব্যয় এবং সময়-ব্যয় করাও আবশ্যক হইবে। কিন্তু বর্ত্তমানে আপনারা এই সংরক্ষণ ও পরিপোষক কার্য্যের জন্য যে ক্ষতি সহ্য করিবেন তাহা সমস্তই অল্পকালের মধ্যে সুদে আসলে উঠিয়া আসিবে। আপনাদের এই প্রয়াস অতি সত্বর সুফল প্রসব করিতে থাকিবে— যুক্তরাষ্ট্র ধন্য হইবে।
ভাবিয়া দেখুন আপনাদের কার্য্যফল কি হইবে। যদি আপনারা নিগ্রোজাতিকে এক্ষণে তুলিয়া ধরিতে চেষ্টা করেন, তাহা হইলে অনতিদূর ভবিষ্যতে ৮০ লক্ষ নূতন কণ্ঠ হইতে আমেরিকার যশোগান উত্থিত হইবে—৮০ লক্ষ নূতন কণ্ঠে জননী জন্মভূমির বন্দনা গীত হইবে। আর যদি এক্ষণে আপনারা স্বার্থত্যাগ করিয়া এই অবনত সমাজকে উন্নত করিতে চেষ্টিত না হন, তাহা হইলে, এই ৮০ লক্ষ কণ্ঠ আপনাদের বিরুদ্ধে সমস্ত সংসারময় নিন্দা রটাইতে থাকিবে। আজ যদি আপনারা নিগ্রোজাতির বাহুবল সংরক্ষিত করিবার প্রয়াসী হন, অনতিদূর ভবিষ্যতেই দেখিতে পাইবেন—১৬০ লক্ষ নূতন হস্তে আপনাদের মাতৃভূমির বোঝা তুলিয়া ধরা হইয়াছে—আপনাদের নিজের ঘাড় অনেকটা হাল্কা হইয়াছে। আর যদি আজ ইহাদের বাহুতে শক্তি পুষ্ট করিবার জন্য আপনারা সচেষ্ট না হন, তাহা হইলে দেখিবেন, আপনাদের বিপৎকালে ও দুঃসময়ে এই ১৬০ লক্ষ হাত আপনাদিগকে ধরিয়া পশ্চাতে টানিয়া রাখিতেছে। হয়, আমরা যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অঞ্চলের অংশ শক্তি, না হয় আমরা ইহার ১/৩ অংশ দুর্বলতা। হয় আমাদের দ্বারা এই প্রান্তের কার্য্যক্ষমতা, চরিত্রবত্তা, বুদ্ধিমত্তা ১/৩ অংশ বাড়িবে, না হয় ইহার ১/৩ অংশ অপটুত্ব, চরিত্রহীনতা এবং অজ্ঞতা বাড়িবে। হয় আমরা দক্ষিণপ্রান্তের আর্থিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নতির যন্ত্র স্বরূপ হইয়া থাকিব, না হয় আমাদের প্রভাবে আর্থিক ও রাষ্ট্রীয় অবনতির দিকে এই অঞ্চলকে নামিতে হইবে।
তার পর প্রদর্শনীর কর্ম্মকর্তাদিগের নিকট আমার নিবেদন। আজ আমরা আপনাদের এই বিরাট আয়োজনে আমাদের ক্ষুদ্র শক্তির পরিচয় প্রদান করিবার সুযোগ পাইয়াছি। কিন্তু আমরা বেশী কিছু প্রদর্শন করিতে পারিলাম না। আপনারা নিগ্রোজাতির নিকট এত শীঘ্র বেশী কিছু আশা করিতে পারেন না।
ত্রিশবৎসর পূর্ব্বে আমরা কেনা গোলাম ছিলাম। যখন স্বাধীনতা পাই, তখন দুটা একটা কম্বল, দুটা চারটা মুরগীর ছানা অথবা দুটা চারিটা শাকশব্জী মাত্র আমাদের সম্বল ছিল। সেইটুকুই আমাদের মূলধন জানিয়া রাখিবেন। সে সব কথা আর মনে করিয়া দিতে হইবে কি? এই নিঃসম্বল অবস্থায়ই ত্রিশবৎসরের মধ্যে আমাদিগকে নানা কর্ম্মক্ষেত্রে দাঁড়াইতে হইয়াছে। কৃষিকর্ম্মের যন্ত্র হাতিয়ার বলুন, গাড়ীজুড়ি বলুন, এঞ্জিনষ্টীমার বলুন, সংবাদপত্র পুস্তকাদি বলুন, চিত্রকলা, মূর্ত্তিগঠনই বা বলুন, অথবা দোকানদারী এবং ব্যাঙ্ক পরিচালনাই বলুন—সকলই আমাদিগকে শিশুর মত আরম্ভ করিতে হইয়াছে। বিনা মূলধনে ও বিনা অভিজ্ঞতায়, আমরা এই সকল কর্ম্মে প্রবেশ করিয়াছি। ত্রিশবৎসরের ভিতর কত ফলই বা পাইতে পারি? তথাপি যে আপনাদের বিরাট কাণ্ডের এক কোণে আমরা আমাদের ক্ষুদ্র সভ্যতার নিদর্শনগুলি দেখাইতে পারিয়াছি ইহাই বিস্ময়ের কথা।
এই সঙ্গে আমি শ্বেতাঙ্গ-সমাজকে আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা অবশ্য কর্ত্তব্য বিবেচনা করিতেছি। দক্ষিণ প্রান্তের শ্বেতাঙ্গ জনগণ হইতে আমরা গত ত্রিশবৎসর অশেষ সাহায্য ও পরামর্শ পাইয়াছি। উত্তর অঞ্চলের ধনী মহাত্মারাও আমাদিগকে ধনদান করিয়া নানা উপায়ে কর্ম্মজীবনে অগ্রসর করিয়া দিয়াছেন। আজ আমরা আপনাদের সম্মুখে যাহা উপস্থিত করিতে পারিয়াছি তাহার জন্য শ্বেতাঙ্গ-সমাজের নিকট আমরা সত্যসত্যই ঋণী। আপনাদের সাহায্য না পাইলে এত অল্পকালের ভিতর নিগ্রোজাতি এই উন্নতি দেখাইতে পারিত না।
পুনরায় আমি দক্ষিণ প্রান্তের জননায়কগণকে বলিতেছি—এই প্রদর্শনী ও সম্মিলনের ন্যায় শুভ অবসর আমাদের দুই সমাজের পক্ষে আর আসে নাই। কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ সমাজের সৌহার্দ্দ্য ও মিলনের সূত্র এইবার যেরূপ দৃঢ়ভাবে গ্রন্থিত হইল আমাদের স্বাধীনতা লাভের পর আর কখনও সেরূপ হয় নাই। আজ এই মিলনমন্দিরে দাঁড়াইয়া ভগবানের কৃপা ভিক্ষা করিতেছি, এবং নিবেদন করিতেছি, য়ে, নিগ্রোসন্তান অতীতের ন্যায় ভবিষ্যতেও শ্বেতাঙ্গকে ভাই বলিয়া জানিবে। আপনারাও ভগবানের কৃপায় আমাদিগকে বিশ্বাস করিতে প্রবৃত্ত হউন, আমাদের উন্নতিকে আপনাদের উন্নতি বিবেচনা করিতে শিখুন এবং দুই জাতিকে অচ্ছেদ্য প্রেম-বন্ধনে সম্মিলিত করিয়া যুক্তরাষ্ট্রে যুগান্তর সৃষ্টির সহায়তা করুন। ভ্রাতৃভাবের বৃদ্ধি হইলেই এই প্রদর্শনীর সার্থকতা হইবে।
এইরূপে পরজাতিবিদ্বেষ ও পরজাতিপীড়ন আমেরিকা হইতে লুপ্ত হইলেই এবং জাতিনির্ব্বিশেষে ন্যায্য বিচারের প্রবর্ত্তন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বিভাগের ব্যবস্থা করিলেই এখানে নবজীবন আসিবে। সেই নবজীবনের আবির্ভাবেই আজকার এই কৃষি, শিল্প, চিত্র, মূর্ত্তি, ও ব্যবসায়ের প্রদর্শন যথার্থ ফলপ্রসূ হইবে। সেই নূতন ‘জাতীয়’ ধর্ম্ম প্রতিষ্ঠিত হইলেই এবং সেই নবীন আধ্যাত্মিক দৃষ্টির বিকাশ হইলেই, এই লোহালক্কড় ইট কাঠ ছবি ছাপার প্রচার সার্থক হইবে।”
পঞ্চদশ অধ্যায়
নানা কথা
আমার বক্তৃতা শেষ হইবামাত্র জর্জ্জিয়ার শাসনকর্ত্তা বুলক মঞ্চের উপর দৌড়াইয়া আসিয়া আবেগভরে আমার হাত ধরিলেন। এইরূপে অসংখ্য লোক আমাকে সুখ্যাতি করিতে লাগিল। সভাস্থল আমার জন্য জয়ধ্বনিতে মুখরিত হইয়া উঠিল।
আমি আটলাণ্টা হইতে টাস্কেজীতে ফিরিয়া আসিলাম। রাস্তায় লোকজন আমাকে দেখিয়া অভিবাদন করিয়া কৃতার্থবোধ করিতেছিল। তিনমাস ধরিয়া যুক্তরাজ্যের উত্তর দক্ষিণ সকল প্রান্তের সংবাদপত্রই আমার প্রশংসা চালাইতে লাগিল। দেশের প্রসিদ্ধ পত্রিকাসম্পাদকগণ একবাক্যে বক্তৃতার সাধুবাদ করিতে থাকিলেন।
টাস্কেজীতে আমার নিকট কত পত্র আসিল সকলে আমাকে রাষ্ট্রীয় আন্দোলনের জন্য বক্তারপদে নিযুক্ত করিতে চাহেন। এক সম্প্রদায় আমাকে লিখিলেন—“আপনি যদি আমাদের জন্য নানাস্থানে বক্তৃতা করিবার ভার গ্রহণ করেন তাহা হইলে এককালীন ১৫০,০০০৲ দিতে প্রস্তুত আছি। অথবা প্রত্যেক রাত্রে ৬০০৲ করিয়া আপনার পারিশ্রমিক দিতে পারি।” আমি এই সকল সম্প্রদায়কে নম্রভাবে উত্তর দিতাম, “আমি আমার জীবনব্রত টাস্কেজী বিদ্যালয়েই উদযাপন করিব। সুতরাং আপনাদের অনুরোধ রক্ষা করিতে আমি নিতান্তই অসমর্থ। অধিকন্তু বক্তৃতা করাকে জীবনের ব্যবসায়রূপে গ্রহণ করিতে আমি পারিব না। আপনারা আমায় মাপ করিবেন।”
এই সময়ে ক্লীভল্যাণ্ড যুক্ত-রাষ্ট্রের সর্ব্বোচ্চ শাসনকর্ত্তা বা সভাপতি ছিলেন। তাঁহার নিকট ওয়াশিংটনদরবারে আমার বক্তৃতার একটা নকল পাঠাইয়াছিলাম। তিনি স্বহস্তে পত্র লিখিয়া আমাকে জানাইলেন, আটলাণ্টা প্রদর্শনীতে যদি অন্য কোন কাজও না হইত, এবং কেবলমাত্র আপনার বক্তৃতার জন্যই যদি এই সম্মিলনের অধিবেশন হইত, তাহা হইলেও ঐ অনুষ্ঠানের অঙ্গহানি হইত না। আপনার বক্তৃতায় কৃষ্ণাঙ্গ শ্বেতাঙ্গ উভয়েরই যথেষ্ট উপকার হইবে।”
তাহার পর ক্লীভল্যাণ্ড প্রদর্শনী দেখিতে আটলাণ্টায় আসেন। সেই সময়ে আমি তাঁহার সঙ্গে দেখা করি। আমার অনুরোধে তিনি নিগ্রোবিভাগে প্রদর্শিত দ্রব্যগুলি যত্নসহকারে দেখিলেন। এই সুযোগে অনেক নিগ্রো পুরুষ ও রমণী তাঁহার সঙ্গে করমর্দ্দন করিল। বহুলোকে তাঁহার নিজ হাতের সহি নাম লইয়া রাখিতে উৎসুক হইল। তিনি তাঁহাদের খাতায় বা কাগজে বেশ আদরের সহিত স্বীয় নাম লিখিয়া দিলেন।
এইবার আমার স্বজাতিগণের কথা বলি। তাহারা প্রথম প্রথম আমার বক্তৃতার বেশ সুখ্যাতিই করিল। আমার প্রতিপত্তিতে তাহারা গৌরববোধ করিতে লাগিল। ক্রমশঃ তাহাদের মত বদলাইয়া গেল। তাহারা ভাবিল—আমি বড়ই সাদাসিধা লোক—আমার রাষ্ট্রীয় মতগুলি নিতান্তই নরম সুরের। তাহাদের মনে হইল, আমি শ্বেতাঙ্গদিগের প্রশংসা অত্যধিক করিয়াছি। তাহাদের বিচারে আমার আর কিছু গরম গরম কথা বলা উচিত ছিল—নিগ্রোদিগের অধিকার এবং দাবীদাবা বেশ জোরের সহিত প্রচার করা উচিত ছিল। তাহারা ক্রমশঃ কাগজে আমার নিন্দা শুরু করিল। তাহাদের বিশ্বাস, আমি আমার কর্ত্তব্যপালনে ত্রুটি করিয়াছি। আমি ভীরু ও দায়িত্ববোধ হীন, আমি সুযোগ পাইয়াও নিগ্রোজাতির কার্য্য উদ্ধার করিতে পারিলাম না।
নিগ্রোসমাজে আমার দুর্নাম রটিতে থাকিল। এই সঙ্গে আমার আর একটা কথা মনে পড়িতেছে। টাস্কেজীবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দশ বৎসর পরে, অর্থাৎ এই বক্তৃতার প্রায় ৫ বৎসর পূর্ব্বে কোন সম্পাদকের অনুরোধে আমি একটি প্রবন্ধ লিখিয়াছিলাম। তাহাতে নিগ্রো সমাজের ধর্ম্মগুরুদিগের নৈতিক চরিত্র সম্বন্ধে আলোচনা করিয়াছিলাম। অনেক স্পষ্ট কথা লিখিতে হইয়াছিল। সুতরাং আমার প্রদত্ত চিত্র নিগ্রোসমাজের পক্ষে রুচিকর হয় নাই। ধর্ম্মগুরুরা আমার উপর ক্ষেপিয়া গেলেন—আমার স্কুল ভাঙ্গিবার জন্য কত চেষ্টা করিলেন। এমন কি, এজন্য তাঁহাদের ‘আড়কাটি’ও নিযুক্ত হইল। তাহারা আমার বিদ্যালয়ের ছাত্রদিগকে ভাগাইবার জন্য প্রাণপণ করিতে থাকিল। অনেক সংবাদপত্রও আমার বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে যোগ দিল। কেহ কেহ আমাকে কৈফিয়ৎ দিবার জন্য আহ্বান করিল।
আমি কোন কথা বলিলাম না—চুপ করিয়া রহিলাম। আমার উপর দিয়া ঝড় বহিয়া গেল। আমি নিজের কথা সপ্রমাণ করিতে কিছুমাত্র চেষ্টিত হইলাম না—আমার বাক্যের ও চরিত্রের তীব্র সমালোচনাগুলিতেও কর্ণপাত করিলাম না। আমি বুঝিতাম, আমি কর্ত্তব্য করিয়াছি—যথাসময়ে আমার কৈফিয়ৎগুলি লোকেরা আপনাআপনিই বুঝিতে পারিবে। আমার আত্মরক্ষার জন্য এখন বাজারে নামিয়া প্রতিবাদ বা কথা কাটাকাটির প্রয়োজন নাই।
সত্যই, তাহা হইল—ক্রমশঃ লোকেরা আমার মতই মানিয়া লইতে বাধ্য হইল। ধর্ম্মগুরুগণের চরিত্র সম্বন্ধে নানা স্থান হইতে নানা আপত্তি উঠিতে লাগিল, আমি ধীরভাবে দেখিতে লাগিলাম—কাল প্রভাবেই আমার কৈফিয়ৎ সমাজে পৌঁছিয়াছে।
এই আটলাণ্টা বক্তৃতা সম্বন্ধেও তাহাই করিলাম। নিগ্রোসমাজের প্রতিকূল সমালোচনায় চুলমাত্র বিচলিত হইলাম না। সংবাদপত্রে আমার নিজের মত খোলসা করিয়া বলিবার প্রয়োজন বোধও করিলাম না।
ইতিমধ্যে হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি শ্রীযুক্ত গিলম্যান পত্র লিখিলেন, “মহাশয়, আটলাণ্টা প্রদর্শনীর পুরস্কার নির্ব্বাচনব্যাপারে আপনাকে একজন পরীক্ষক মনোনীত করা হইয়াছে। আপনাকে শিক্ষা-বিভাগের প্রদর্শিত দ্রব্যগুলি পরীক্ষা করিতে হইবে। আপনার সময় হইবে কি? টেলিগ্রাফে উত্তর দিবেন।”
আমি নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিলাম। নিগ্রো ও শ্বেতাঙ্গ উভয় প্রকার বিদ্যালয়ের ছাত্রদিগের কার্য্যই আমাকে পরীক্ষা করিতে হইল। বড় বড় বৈজ্ঞানিক, শিক্ষাতত্ত্বজ্ঞ পণ্ডিত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকগণের সঙ্গে একত্র হইয়া আমি কার্য্য করিলাম।
আমি বিচক্ষণ ব্যবসায়ীদিগের সভায় বক্তৃতা করিতে পাইলে সুখী হই। বোষ্টন, নিউ-ইয়র্ক, শিকাগো এবং বাষ্ণেলো ইত্যাদি নগরের ব্যবসায়িগণ অত্যন্ত ধীরবুদ্ধি সম্পন্ন এবং সহজেই প্রতিপাদ্য বিষয়ের সার কথা বুঝিয়া লইতে পারেন। ইহাঁদিগকে বেশী কথা বলিতে হয় না। ইহাঁরা অল্প কথার মানুষ। এই মহলে বক্তৃতা করিয়াই আমি সর্ব্বাপেক্ষা বেশী আনন্দ পাইয়াছি।
তাহার পর আমি দক্ষিণ অঞ্চলের লোকজনকে শ্রোতৃমণ্ডলীরূপে পাইলে আনন্দিত হই। ইহারা বেশ উৎসাহশীল—সামান্য মাত্র উত্তেজনা পাইলেই বক্তাকে মাথায় করিয়া রাখিতে চায়।
আমি এই হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদিগকে তৃতীয় স্থান দিয়া থাকি। হার্ভার্ড, ইয়েল, উইলিয়ম্স্, আমহার্ষ্ট, ফিস্ক, পেনসিলভেনিয়া, ওয়েলেস্লি, মিচিগান, ইত্যাদি আমেরিকার সর্ব্বশ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও অধ্যাপকগণের সভায় আমার বক্তৃতা দিতে হইয়াছে। ছেলে মহলে বক্তৃতা দিয়া আমার বেশী সুখ হয় না। আমি কাজের লোক পাইলেই খুসী হই।
বাজারে একটা গুজব রটিয়াছে যে, নিগ্রো-রমণীদিগের মধ্যে শতকরা ১০ জনের চরিত্রও সৎ কি না সন্দেহ। এরূপ মিথ্যা অপবাদ প্রচার করা নিতান্তই অন্যায়। কোন সমাজ সম্বন্ধেই চরিত্রবিষয়ক মত প্রকাশ করা বড় কঠিন। আমি যদি নিউ ইয়র্ক নগরে জঘন্য মহল্লার লোক সংখ্যা গণনা করিয়া স্বপ্রমাণ করিতে চাহি যে, শ্বেতাঙ্গ সমাজে সচ্চরিত্রা রমণী একজনও নাই তাহাও এইরূপ দায়িত্বহীন মত প্রচার হইবে না কি?
আমেরিকার সঙ্গে স্পেনের যুদ্ধ সমাপ্ত হইবার পর যুক্তরাজ্যের নানাস্থানে শান্তি উৎসব অনুষ্ঠানের জন্য নানা উদ্যোগ হয়। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি আমাকে এক উৎসবে বক্তৃতা করিতে আহ্বান করেন। ১৬ই অক্টোবর রবিবার সন্ধ্যাকালে সভা হয়। এত বড় সভায় আমি আর কখনও বক্তৃতা দিই নাই। ১৬০০০ লোক সভায় উপস্থিত ছিল।
এই সভায় যুক্তরাষ্ট্রের সভাপতি উইলিয়ম ম্যাক্ কিন্লিও উপস্থিত ছিলেন। আমি তাঁহাকে ধন্যবাদ দিতে যাইয়া বলিয়াছিলাম, “আপনার উদারতায় নিগ্রোজাতি স্বদেশের জন্য যুদ্ধ করিবার সুযোগ পাইয়াছিল। কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকা-সন্তান তাহার শ্বেতাঙ্গ ভাইএর সঙ্গে একক্ষেত্রে দাঁড়াইয়া শত্রুর বিরুদ্ধে কর্ম্ম করিয়াছিল। এজন্য আমরা আপনার নিকট কৃতজ্ঞ।” এই কথা শুনিবামাত্র সভামণ্ডপ মুখরিত করিয়া সভাপতি মহোদয়ের জয়ধ্বনি উত্থিত হইল। কিন্লি জনমণ্ডলীকে অভিবাদন করিবার জন্য আসন হইতে উঠিয়া দাঁড়াইলেন—অমনি আবার গভীরতর জয়ধ্বনি উঠিতে লাগিল!
সভাসমিতিতে বক্তৃতা করিতে গেলে একটা বিপদে প্রায়ই পড়িতে হয়। কতকগুলি হুজুগের পাণ্ডাদিগের পাল্লা এড়ান বড়ই মুস্কিল। ইহারা ‘রাতারাত’ বড়লোক করিবার উপায় প্রচার করিয়া বেড়ান। বিনা ক্লেশে নিগ্রোজাতির উদ্ধার সাধনের পথ আবিষ্কার করিয়াছেন বলিয়া ইহাঁরা হাটে বাজারে লোক জমা করেন। ইহারা ধৈর্য্য সহিষ্ণুতা ইত্যাদির একেবারেই পক্ষপাতী নন। ইহাঁরা অনেক সময় কেবল তর্কের খাতিরেই তর্ক করেন। যুক্তিতে পরাস্ত হইলেও ইহাঁরা তাহা স্বীকার করিতে কুণ্ঠিত হন। এই সকল ভবঘুরে তার্কিকদিগকে আমি দূর হইতে নমস্কার করি। তথাপি আমাকে বহুবার ইহাদের সঙ্গে বাক্যুদ্ধে শক্তির অপব্যয় করিতে হইয়াছে।
আর এক জাতীয় লোক আছে। তাহারা নামজাদা লোকের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরিয়া আনন্দ পায়। ইহারা একপ্রকার উৎপাত বিশেষ। কোন কাজ কর্ম্ম নাই—লোকের সময় নষ্ট করাই ইহাদের স্বধর্ম্ম। একদিন সন্ধ্যাকালে বোষ্টন-নগরের এক বড় সভায় বক্তৃতা করিয়াছি। পরদিন সকাল হইবার পূর্ব্বেই দেখি আমার নিকট এক কার্ড উপস্থিত। আমি তাড়াতাড়ি বিছানা হইতে উঠিয়া বৈঠকখানায় ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করিতে বাহির হইলাম। যাইয়া দেখি একটি লোক বসিয়া আছে। সে বলিল, “কাল রাত্রে আপনি বেশ ভাল কথা বলিয়াছিলেন। আমার ভাল লাগিয়াছে। তাই আজ সকালে আরও কিছু সৎকথা শুনিতে আসিলাম।”
আমার বন্ধুগণ আমাকে অনেক সময়ে জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, “ওয়াশিংটন, তুমি এত সময় পাও কোথায়? সর্ব্বদা ত তুমি বাহিরে বাহিরে দেশভ্রমণ করিয়াই বেড়াইতেছ? বক্তৃতা দিতেই তোমার সকল সময় চলিয়া যায়! তোমার টাস্কেজীর কাজকর্ম্ম চলে কিরূপে? অথচ টাস্কেজী ত দিন দিন উন্নতির পথেই অগ্রসর হইতেছে দেখিতেছি।”
এই সকল প্রশ্নের আমি সাধারণ উত্তর দিয়া থাকি—“দেখ, একটা মামুলি কথা আছে যে, ‘নিজে যে কাজ করিতে পার অপরকে সেই কাজ করিতে বলিও না।’ আমি কিন্তু এই প্রবাদ বাক্য মানি না। আমি আর একটা নূতন নিয়ম করিয়াছি। আমার মত এই যে, ‘অন্য লোকে যে কাজটা বেশ ভাল করিয়া করিতে পারে, তাহার জন্য তুমি মাথা ঘামাইও না। তাহাকেই সেই কাজ করিতে দাও। তুমি নিশ্চিন্ত হইয়া অন্যান্য কাজ করিতে থাক।’ এই নিয়ম অনুসারে চলি বলিয়া আমার টাস্কেজী বিদ্যালয়ের কাজও কম হয় না, অথচ আমিও প্রায়ই টাস্কেজীর বাহিরে বাহিরে নানা কাজ করিয়া কাটাই।”
টাস্কেজী বিদ্যালয় আজকাল বেশ পাকা বন্দোবস্তের উপর দাঁড়াইয়া গিয়াছে। ইহার পরিচালনার নিয়ম অতি সুন্দর ও শৃঙ্খলাযুক্ত রূপে গড়িয়া উঠিয়াছে। কোন একজন লোকের অভাব হইলে ওখানকার কার্য্যের বিশেষ ক্ষতি হয় না। কোন একজন ব্যক্তিকেই সর্ব্বদা এখানে লাগিয়া না থাকিলেও চলে। আজ আমাদের কর্ম্মচারীদিগের সংখ্যা ৮৬। শ্রমবিভাগ এবং দায়িত্ব বিভাগ এত সুন্দর ভাবে করা হইয়াছে যে, কলের মত কাজ চলিতে থাকে। অধিকাংশ শিক্ষক ও কর্ম্মচারীই অনেক দিন হইতে এই কার্য্যে নিযুক্ত আছেন। আমার মত ইহাঁরাও এই বিদ্যালয়ের জন্য দায়িত্ব বুঝিয়া চলেন। ইহাঁরা সকলেই নিজের কাজ স্বরূপ বিদ্যালয়ের কাজগুলি করিয়া থাকেন।
অধিকন্তু, আমি পৃথিবীর যেখানেই থাকি না কেন, টাস্কেজীর সকল খবর রোজই আমার নিকট পৌঁছিয়া থাকে। আমি এজন্য দৈনিক কার্য্যাবলীর হিসাব রাখিবার এক অতি সহজ নিয়ম বাহির করিয়াছি। এই কার্য্যতালিকা ও হিসাব-বহি দেখিয়া আমি প্রতিদিনকার আয়, খরচ পত্র, ছাত্র সংখ্যা কার খানাগুলির অবস্থা, কৃষি ক্ষেত্রের আমদানী রপ্তানী, দেনা পাওনা, শিক্ষক ও ছাত্রদের সম্বন্ধ ইত্যাদি সকল কথাই বুঝিয়া লই। এমন কি, কোন্ ছাত্র কি কারণে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হইতে পারিল না, তাহা পর্য্যন্ত এই দৈনিক কার্য্যতালিকা হইতে জানিবার উপায় আছে। অধিক কি বলিব, মাংস আজ কাঁচা রান্না হইয়াছে কি পুড়িয়া গিয়াছে, এবং আজকার শাক শব্জীগুলি বাজার হইতে কিনিয়া আনা হইয়াছে কি আমাদের বাগান হইতেই আনিয়াছে তাহাও আমি ৪০০০ মাইল দূরে থাকিয়া জানিতে পাই!
আমি প্রতিদিনই আমার দৈনিক কাজ শেষ করিয়া ফেলি। সুবিধা হইলে পর দিনের কাজও খানিকটা করিয়া রাখি। অবশ্য সর্ব্বদাই আমি দুর্ঘটনার জন্য প্রস্তুত থাকি। সকালের কার্য্য আরম্ভ করিবার সময়েই আমি ধরিয়া রাখি—আজ হয়ত কোন ঘরে আগুন লাগিবে, অথবা ছাত্রদের কোন দুর্ঘটনা ঘটিবে, অথবা কোন সংবাদপত্রে আমার বিরুদ্ধে আন্দোলন হইতেছে দেখিতে পাইব, অথবা বাজারে আমার নিন্দা রটিতেছে শুনিতে পাইব। আমি প্রথম হইতেই এইরূপ দুর্ঘটনা, লোকনিন্দা, অপমান ও বিফলতার জন্য বুক বাঁধিয়া রাখি। এজন্য যখন আমার উপর দিয়া বিপদ বহিয়া যায় আমি বিচলিত হই না—গম্ভীর ভাবে স্থিরচিত্তে সকল যাতনা ও নৈরাশ্য ও বেদনা সহ্য করিতে থাকি। চিত্তকে প্রশান্ত রাখিবার জন্য আমি পূর্ব্ব হইতেই এইরূপ বিফলতার কথা ভাবিয়া রাখি। কাজেই বিফলতা আমাকে কাবু করিতে পারে না।
আমি অবকাশ কাহাকে বলে জানি না। বিগত ১৯ বৎসরের মধ্যে আমি একদিনও কাজ হইতে ছুটি লই নাই। তবে ১৮৯৯ সালে কয়েক জন বন্ধু জোর করিয়া আমাকে ইউরোপ ভ্রমণে পাঠাইয়াছিলেন। তাঁহারাই সমস্ত ব্যয় বহন করিয়াছিলেন। এই জন্য তিন মাস আমার পূরাপূরি ছুটি ঘটিয়াছিল। তাহা ছাড়া বিশ্রাম, আরাম, বিদায় আমি কখনই ভোগ করিতে চেষ্টা করি নাই। আমি প্রতিদিন সুখে ঘুমাইবার আয়োজন করি। যথারীতি ঘুমাইতে পাইলে আমার কোন ক্লান্তির কারণ থাকে না। এখন শরীরকে এমন স্ববশ করিয়া ফেলিয়াছি যে, ২০ মিনিট মাত্র ঘুমাইতে পাইলেই নূতন উদ্যমে নূতন কাজে লাগিয়া যাইতে পারি।
আমি কখনও কিছু পুস্তকাদি পাঠ করি কি? রেলগাড়িতে চলিতে চলিতেই যেটুকু পড়িবার সুযোগ পাই তাহা ছাড়া আমার ভাগ্যে আর পড়িবার সময় জুটে না। সংবাদপত্র পাঠ করিতে আমি বড়ই ভালবাসি। এ সব যত পাই তত পড়ি—ভাল মন্দ বিচার করিয়া দেখি না—এগুলি পড়া আমার একটা নেশা। উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি আমি চোখে দেখিতে পারি না। অনেক সময়ে ‘সভ্যতার খাতিরে’ মহাবিখ্যাত দুই একটা উপন্যাস পড়িতে বাধ্য হইয়া থাকি! তাহা না হইলে বন্ধুমহলে এবং ভদ্রসমাজে মুখ দেখান কঠিন হইয়া পড়ে। গ্রন্থের মধ্যে জীবন চরিতগুলি আমার অতি প্রিয় বস্তু। আমি কোন কাল্পনিক ঘটনা বা ব্যক্তির জীবন আলোচনা করিতে পছন্দ করি না। রক্তমাংসের মানুষ সংসারে যাহা যাহা করিয়াছে আমি সেই সমুদয়ের যথার্থ বৃত্তান্ত জানিতে উৎসুক। মহাপ্রাণ সভাপতি আব্রাহাম লিঙ্কলন সম্বন্ধে আমেরিকার সংবাদপত্রে, সমালোচনাপত্রে এবং গ্রন্থে ও পুস্তিকায় যে কোন রচনা প্রকাশিত হইয়াছে বোধ হয় আমি তাহার কোনটাই পড়িতে ছাড়ি নাই। সাহিত্য-সংসারের তিনি আমার ধ্রুবতারা। তাঁহার জীবনী আলোচনা করিয়াই আমি আমার কর্ম্মজীবন নিয়ন্ত্রিত করিয়া থাকি।
বৎসরে বোধ হয় প্রায় ছয় মাস আমি টাস্কেজীর বাহিরে কাটাই। ইহাতে আমার অনেক উপকার হয়। প্রথমতঃ কার্য্য পরিবর্ত্তনই একটা বিশ্রাম স্বরূপ। নূতন নূতন লোকের সঙ্গে মিলিয়া মিশিয়া অভিনব কর্ম্মক্ষেত্রে আসিয়া নবজীবন লাভ করি। দ্বিতীয়তঃ একস্থানে থাকিলে সেই ক্ষেত্রের খুটিনাটিগুলি লইয়া দিন কাটাইতে হয়। একটা সঙ্কীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে জীবন ঘুরিতে থাকে। কর্ম্ম ও চিন্তাশক্তির বিকাশ বন্ধ হইয়া যায়। ফলতঃ চিত্তে স্ফূর্ত্তি ও আনন্দের অভাব ঘটিতে থাকে। কিন্তু তফাতে থাকিলে সেখানকার দোষ ও অসম্পূর্ণতাগুলি সর্ব্বদা চোখে পড়ে না। খানিকটা দূর ও বিস্তৃত দৃষ্টির সহিত সেই প্রতিষ্ঠানকে দেখিবার সুযোগ আসে। তৃতীয়তঃ, নূতন নূতন প্রতিষ্ঠান ও কর্ম্মকেন্দ্রের কার্য্যপ্রণালী দেখিয়া নানা বিষয়ে জ্ঞান বাড়িতে থাকে। বিদ্যাদানের বিচিত্র নিয়মগুলি নিজ চোখে দেখিয়া অভিজ্ঞতা লাভ হয়। এতদ্ব্যতীত বড় বড় পণ্ডিত, অধ্যাপক, বিজ্ঞানবীর, শিক্ষাপ্রচারক ও সাহিত্যরথীদিগের সঙ্গে আলাপ পরিচয় এবং ভাব বিনিময় হইতে থাকে। তাহাতেও বিশেষ লাভবান্ হওয়া যায়।
ষোড়শ অধ্যায়
ইউরোপে তিনমাস
১৮৯৯ সালে, আমার ৩৯।৪০ বৎসর বয়সে আমি ইউরোপে বেড়াইবার সুযোগ পাই। এই সুযোগ অতি অভাবনীয়রূপে আসিয়াছিল। ইহার পূর্ব্বে আমার ইউরোপ-ভ্রমণের সামান্য মাত্র আকাঙ্ক্ষা বা চেষ্টা ছিল না।
একদিন সন্ধ্যাকালে বোস্টননগরের কয়েকজন ইয়াঙ্কি রমণী টাস্কেজীবিদ্যালয়ে অর্থসাহায্যের জন্য একটা সভা আহ্বান করিয়াছিলেন। ধূমপানের সহিত ঐ সভার কার্য্য সম্পন্ন হয়। আমিও সভার উপস্থিত ছিলাম। একজন আমাকে দেখিয়া বলিলেন, “ওয়াশিংটন মহাশয়, আপনাকে বড়ই দুর্ব্বল ও ক্লান্ত বোধ হইতেছে। আপনি খাটিয়া খাটিয়া অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছেন। আপনার কিছুকাল কাজকর্ম্ম হইতে সম্পূর্ণরূপে বিদায় লওয়া আবশ্যক। অন্ততঃ মানসিক উদ্বেগ নিরারণের জন্য চেষ্টিত হওয়া উচিত।” অমনি আর একজন বলিলেন, “এদেশ ছাড়িয়া বাহিরে যাইতে পারিলেই আপনার উদ্বেগ কমিবে। দূরদেশে থাকিলে টাস্কেজীর জন্য চিন্তা কম করিতে হইবে। মনে শান্তি সর্ব্বদাই থাকিবে। ২৪ ঘণ্টা ভাবিয়া কাটাইবার প্রয়োজন হইবে না।” সেই সঙ্গে একজন তৃতীয় শ্বেতাঙ্গ রমণী জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি কখনও ইউরোপ দেখিয়াছেন কি?” আমি অপর দুইজনকে বিশেষ কিছু বলিলাম না—আমার জন্য তাঁহারা চিন্তিত, এজন্য তাঁহাদিগকে ধন্যবাদ প্রদান করিলাম। এই রমণীকে বলিলাম “ইউরোপ যাইবার কথা এতদিন কখনও আমার মনেই আসে নাই।”
কিছুদিন পরে একখানা পত্র পাইলাম, “বোষ্টনের কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ ও রমণী আপনার জন্য অর্থ সংগ্রহ করিতেছেন। আপনার স্বাস্থ্যোন্নতির জন্য আপনি কিছুকাল ইউরোপ ভ্রমণ করুন—এইরূপ তাঁহাদের ইচ্ছা। আপনাকে যাইতেই হইবে। এ অনুরোধ অগ্রাহ্য করিবেন না। আমরা আপনার কাজের জন্য, আপনাদের বিদ্যালয়ের জন্য, আপনার জাতির জন্য এই অনুরোধ অথবা আজ্ঞা করিতেছি। আশা করি, আপনি নিগ্রোসমাজের ভবিষ্যৎ ভাবিয়া আমাদিগের এই আজ্ঞা শিরোধার্য্য করিবেন।”
আমি আমার শ্বেতাঙ্গ বন্ধুগণকে জানাইলাম, “আপনাদের অনুগ্রহপত্র পাইয়া যার পর নাই কৃতার্থ হইয়াছি। কিন্তু আমার পক্ষে আমেরিকা ত্যাগ করা সম্প্রতি অসম্ভব। বৎসর খানেক পূর্ব্বে কথাচ্ছলে আমার একজন ধনী বন্ধু আমাকে এজন্য সমস্ত খরচ দিতে চাহিয়াছিলেন। তখন আমি তাঁহাকে অমান্য করিয়াছি। আমি আমার কাজে একেবারে ডুবিয়া আছি বলিলেই চলে। সে কথা আমার মন হইতে এত দূরে চলিয়া গিয়াছে, যে আপনাদের এই পত্র পাইবার পূর্ব্বে তাহা ভুলিয়াই গিয়াছিলাম। যাহা হউক, আমি আপনাদের সম্মান করিতে পারিলাম না। আমি আমেরিকা ছাড়িয়া গেলে, টাস্কেজীর অন্যান্য ক্ষতি কিছু হইবে না। কিন্তু আজকাল খরচ এত বাড়িয়াছে যে, সে সমুদয় আমি ব্যতীত আর কেহ সংগ্রহ করিতে পারিবে না। সুতরাং আমার ইউরোপ ভ্রমণ এবং টাস্কেজীর সর্ব্বনাশ এক কথা।”
আমার পত্র পাইয়া একজন লিখিলেন,—“টাস্কেজীর খরচপত্রের জন্য ভাবিবেন না। আমরা তাহার সমস্ত দায়িত্ব লইতেছি। শ্রীযুক্ত হিগিনসন এবং তাহার বন্ধুবর্গ আপনার অনুপস্থিতিকালে বিদ্যালয়ের ব্যয়ের জন্য আবশ্যক টাকা দিবেন। তাঁহারা নিজেদের নাম প্রকাশ করিতে অনিচ্ছুক। সুতরাং আর আপত্তি করিবার আপনার অধিকার নাই।”
কাজেই আমি ইউরোপ যাইতে বাধ্য হইলাম। আমার মনে অনেক কথা আসিতে লাগিল। আমার শৈশবের গোলামাবাদ, গোলামখানার অনশন ও অনিদ্রা, যৌবনের কঠোর জীবনসংগ্রাম—সর্ব্বদা দারিদ্র্য ও নৈরাশ্যের সহিত পরিচয়—সকল চিত্রই সম্মুখে উপস্থিত হইতে লাগিল। প্রৌঢ় বয়সের পূর্ব্বে আমি কখনও টেবিলে বসিয়া খানা খাইবার সুযোগ পাই নাই। ইউরোপ, লণ্ডন, প্যারি,—এ সকল স্থানকে আমি মানবদুর্ল্লভ স্বর্গরাজ্য বিবেচনাই করিতে শিখিয়াছি। আজ আমি সেই স্বর্গ রাজ্যে বেড়াইতে চলিলাম! আজ আমি সুন্দর পোষাকে, সুখাদ্য ও সুপেয় উপভোগ করিতে করিতে ইউরোপ ভ্রমণে বাহির হইব! আমার নিকট সবই স্বপ্নের ন্যায় অলীক বোধ হইতে লাগিল।
আরও দুইটি চিন্তায় আমি কষ্ট পাইতে লাগিলাম। মনে হইল—আমার জাতিরা আমাকে কি বলিবে? তাহারা ত বুঝিবে না যে, আমি বাধ্য হইয়া ইউরোপ যাইতেছি। তাহারা সহজেই ধরিয়া লইবে, আমার ‘চাল’ বাড়িয়াছে—আমি আজকাল বড় লোকের সঙ্গে মিশি, বড়মহলে চলাফেরা করি, সুখে স্বচ্ছন্দে দেশ বিদেশ ঘুরিয়া বেড়াই, এবং নানা উপায়ে নামজাদা লোক হইতে চেষ্টা করি। তাহারা আমার হৃদয়ের কথা ত বুঝিবে না—তাহারা আমাকে ক্ষমা করিবে না। তাহারা বলিবে, ‘জানি জানি খানিকটা কাজ করিবার পর সকলেরই মাথা বিগ্ড়াইয়া যায়—সকলেই ‘ধরাকে সরা’ জ্ঞান করে। ঐ সেদিন দেখিলে না, আর একজন নিগ্রো অধঃপাতে গেল। ভাবিয়াছিলাম সেই লোকটার দ্বারা নিগ্রো সমাজের উপকার হইবে। কিন্তু অল্পদিনের ভিতরই, সে সকলকে অগ্রাহ্য করিতে শুরু করিল। সে যেন কি অপরূপ জীব স্বর্গ হইতে মর্ত্ত্যে নামিয়া আসিয়াছে। সে আজ আমাদের পূজা চায়! ওয়াশিংটনও দেখিতেছি সেই বাবুগিরি ও ‘নেতা’-গিরির পথ ধরিল। ভাই, কথায় বলে, প্রতিষ্ঠা ও যশের আকাঙ্ক্ষা সাধু পুরুষদেরও ছাড়ে না। আর, একবার প্রতিষ্ঠার দিকে নজর গেলে কোন লোকের দ্বারা সংসারের উপকার হয় না। সুতরাং ওয়াশিংটনকেও খরচের খাতায় লেখ।”
এই ত গেল লোক-নিন্দার ভয়, তাহা ছাড়া আমার নিজের মনকে প্রবোধ দিতেও অনেক সময় লাগিল। আমি না হয় টাস্কেজী বিদ্যালয়ের জন্য ৩।৪ মাসের খরচ পত্র পাইলাম। না হয় ধরিয়া লইলাম, আমার অভাবে এ কয়দিনে টাস্কেজীর কোন ক্ষতিই হইবে না। কিন্তু আমি এতকাল না খাটিয়া, না ভাবিয়া থাকিব কি করিয়া? আমার কর্ত্তব্যজ্ঞান কি নাই? আমি কি ভগবানকে ফাঁকি দিতে বসিয়াছি? আমি এইরূপ বিদায় লইয়া কি স্বার্থপরতা দেখাইতেছি না? কাজ ছাড়িয়া থাকা আমার পক্ষে অসম্ভব—জীবনে আর কোন দিন অবকাশ ভোগ ত করি নাই।
যাহা হউক, যাইতে বাধ্য হইলাম। ১০ই মে তারিখে রওনা হওয়া গেল। শ্রীযুক্ত গ্যারিসন এবং অন্যান্য ইয়াঙ্কি বন্ধুগণ ফ্রান্সে এবং ইংলণ্ডে তাঁহাদের কয়েকজন বন্ধুর নিকট আমাকে পরিচয়-পত্র দিলেন। তাঁহারা নানা স্থানে লিখিয়া আমার জন্য থাকিবার ও অন্যান্য ব্যবস্থা ইত্যাদি করিয়া রাখিলেন। নিউইয়র্কে জাহাজে উঠিলাম। জাহাজে থাকিতে থাকিতে একখানা পত্র পাইলাম। লেখা আছে দুইজন রমণী টাস্কেজী বিদ্যালয়ের স্ত্রীশিক্ষাবিভাগের জন্য গৃহনির্ম্মাণের ব্যয়ভার বহন করিবেন।
আমাদের জাহাজের নাম ফ্রিস্ল্যাণ্ড। রেড্ষ্টার লাইন কোম্পানীর ইহা একখানা বৃহৎ ও সুন্দর জাহাজ। পূর্ব্বে আমি কখনও এত বড় সমুদ্র-পোতে চড়ি নাই। সুতরাং এদিক ওদিক ঘুরিয়া জাহাজ দেখার কৌতুহল মিটাইয়া লইলাম। ভাবিয়াছিলাম, জাহাজে নিগ্রো বলিয়া আমাদের যথেষ্ট অসম্মান ভোগ করিতে হইবে। কিন্তু আমাদের সেরূপ কিছু ভোগ করিতে হইল না। জাহাজের কাপ্তেনেরা আমাকে চিনিতেন বুঝিতে পারিলাম।
জাহাজ ছাড়িবার পর হইতে বহুদিনের বোঝা যেন একসঙ্গে আমার ঘাড় হইতে নামিয়া গেল। আমি আমার কামরার মধ্যে রোজ ১৫ ঘণ্টা করিয়া ঘুমাইতাম। তখন বুঝিলাম, সত্য সত্যই আমার শারীরিক ক্লান্তি ও দুর্ব্বলতা কত বেশী ছিল। এই কয়দিন একস্থানে এক বিছানায় এতক্ষণ ঘুমাইতাম, অথচ দিনে রাত্রের মধ্যে কোন সময় নির্দ্দিষ্ট কোন কাজই ছিল না। আমার জীবনে এইরূপ অভিজ্ঞতা আর কখনও পাই নাই। আমি সেই বাল্যকথাগুলি স্মরণ করিলাম—সেই যখন আমি একরাত্রে তিন পল্লীর মেজেতে শুইয়া অনশনে কাটাইয়াছি।
দশদিন জাহাজ চলিয়া বেলজিয়াম দেশের য়্যাণ্টোয়ার্প নগরে পৌঁছিল। সেদিন ওদেশে একটা ছুটির দিন ছিল। সকলেই আনন্দে উৎসবে মগ্ন। বেলজিয়ামের লোকেরা বৎসরে এইরূপ অনেক আনন্দের দিন সুখে কাটাইয়া থাকে। সহরের বড় মাঠের সম্মুখেই আমাদের হোটেল। আমরা কামরা হইতে সেই উদ্যানের সকল দৃশ্যই দেখিতে পাইলাম। পল্লী হইতে নগরে কত লোক আসিয়াছে। নানা রংয়ের ফুল বিক্রী হইতেছে। স্ত্রীলোকেরা দুধের ভাঁড় আনিয়াছে। ভাঁড়গুলি খুব বড় বড় ও চক্চকে। কুকুরে এই সকল বহিয়া আনে। লোকজন গির্জ্জার মধ্যে প্রবেশ করিতেছে। এই দৃশ্য আমার চোখে সম্পূর্ণ নূতন জগতের বার্ত্তা আনিয়া দিল।
কিছুকাল এই সহরে কাটাইলাম। পরে কয়েকজন বন্ধুর নিমন্ত্রণ পাইয়া তাঁহাদের সঙ্গে হল্যাণ্ডদেশ দেখিতে গেলাম। আমাদের দলে কয়েকজন ইয়াঙ্কি পুরুষ ছিলেন। আমাদের জাহাজেই ইহাঁরা আমেরিকা হইতে আসিয়াছেন। ইহাঁদের মধ্যে কেহ কেহ চিত্রকর—ছবি আঁকিতে বেশ নিপুণ এই ভ্রমণটা অতিশয় সুখকরই হইয়াছিল। একটা পুরাতন ধরণের নৌকায় করিয়া হল্যাণ্ডের খালে খালে বেড়াইতে পাইয়াছিলাম। এই উপায়ে এদেশের পল্লী-জীবন অনেকটা বুঝিতে পারিলাম। খাল দিয়া পল্লীগ্রামগুলি দেখিতে দেখিতে আমরা রটার্ডামে পৌঁছিলাম। তার পর হেগ দেখিতে গেলাম। সেখানে তখন জগতের রাষ্ট্রনীতিবিশারদেরা শান্তি-সম্মিলনে ব্যাপৃত। আমাদের স্বদেশীয় প্রতিনিধিরাও এ সভায় যোগ দিতে আসিয়াছেন। তাঁহারা আমাদিগকে দেখিয়া আপ্যায়িত করিলেন।
হল্যাণ্ডের কৃষিকার্য্য আমার পক্ষে যথেষ্ট শিক্ষাপ্রদ হইয়াছিল। এখানকার পশুপালনও বেশ দক্ষতার সহিত হইয়া থাকে। হলষ্টাইন-নগরের গাভী বলদ ইত্যাদি জগতে সর্ব্বোৎকৃষ্ট মনে হইল। হল্যাণ্ডবাসী কৃষকেরা অতি সামান্য মাত্র ভূমি হইতে অত্যন্ত বেশী পরিমাণ ফসল উৎপাদন করিয়া থাকে। কৃষিকার্য্যে ইহাদের ক্ষমতা দেখিয়া আমি বিস্মিত হইয়াছিলাম। পূর্ব্বে আমি কখন ভাবিতে পারিতাম না যে অত কম জমি চষিয়া অত বেশী ফল পাওয়া যায়। দেখিয়া বোধ হইল হল্যাণ্ডের এক ছটাক জমিও বাজে পড়িয়া নাই—সর্ব্বত্রই সুন্দর চাষ আবাদ হইতেছে। আর চারিদিকেই শস্যশ্যামল প্রান্তর তাহার মধ্যে ৪০০।৫০০ বলিষ্ঠ গাভী আনন্দে বিচরণ করিতেছে। এরূপ গোচারণের মাঠ এবং সুন্দর কৃষিকার্য্য দেখিবার জন্য সকলেরই একবার হল্যাণ্ড যাওয়া উচিত।
হল্যাণ্ড হইতে আবার বেলজিয়ামে ফিরিয়া আসিলাম। এবারে য়্যাণ্টোয়ার্পে গেলাম না। ব্রসেল্সে অল্পক্ষণ ছিলাম। এখানে ওয়াটার্লুর যুদ্ধক্ষেত্র দেখিয়া আসিলাম। পরে ফ্রান্সে চলিলাম—প্রথমেই প্যারিনগরে নামিলাম। পৌঁছিবামাত্রই এক নিমন্ত্রণ পাওয়া গেল। প্যারির ইউনিভার্সিটি-ক্লব আমাদের আমেরিকাবাসী কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে নিমন্ত্রণ করিয়াছেন। ফ্রান্সের যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি এই নিমন্ত্রণ-সভায় সভাপতি হইয়াছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব্বর্তন সভাপতি শ্রীযুক্ত হ্যারিসনকেও এই নিমন্ত্রণে যোগদান করিতে আহ্বান করা হইয়াছিল। তিনিও উপস্থিত ছিলেন।
ভোজনান্তে যথাবিধি বক্তৃতা হইল। হ্যারিসন মহোদয় আমার কথা এবং টাস্কেজীবিদ্যালয়ের কথা সভামধ্যে প্রচার করিলেন। আমার দ্বারা নিগ্রোসমস্যার কিরূপ মীমাংসা হইতেেছে তাহাও তিনি কিছু বুঝাইলেন।
প্যারিনগরে আমেরিকার একজন নিগ্রো চিত্রকরের সুখ্যাতি ছড়াইয়া পড়িয়াছে। তিনি ফ্রান্সে বেশ নাম করিয়াছেন বুঝিতে পারিলাম। সকল শ্রেণীর ফরাসীরাই ইহাঁর কারুকার্য্যের প্রশংসা করিয়া থাকেন। এমন কি লাক্সেমবার্গ প্যালাসের চিত্রভবনে তাঁহার হাতের কাজ রক্ষিত হইয়াছে। এত বড় চিত্রশালায় নিগ্রোর স্থান হইয়াছে শুনিয়া ফ্রান্সের ইয়াঙ্কিরা আশ্চর্য্যান্বিত হইলেন। এই নিগ্রো চিত্রকরের নাম হেন্রি ট্যানার। তাঁহার সঙ্গে আমাদের আলাপও হইল। তাঁহাকে দেখিয়া আমার মনে হইল, ‘রূপেতে কি করে বাপু গুণ যদি থাকে?’ জগৎ গুণের দাস। বিদ্যাবুদ্ধি থাকিলে সংসারের সকলকেই বশে আনা যায়। একথা আমি আমার নিগ্রো ভ্রাতাদিগকে সর্ব্বদাই বলিয়া আসিয়াছি। ফ্রান্সে ট্যানারের প্রতিপত্তি দেখিয়া সেই কথা আমার বার বার মনে হইতে লাগিল। ইউরোপের ও আমেরিকার কত শত লোক ট্যানারের অঙ্কিত চিত্রগুলি দেখিয়া গিয়াছেন। কিন্তু কেহ ত কখনও জিজ্ঞাসা করেন নাই—“ও গুলি কাহার তৈয়ারী? সে ব্যক্তির চামড়া সাদা কি কাল, সে কি ইংরাজ না জার্ম্মাণ, না আমেরিকার নিগ্রো?” যে ব্যক্তিই কোন কাজ ভাল করিয়া করিতে পারিবে সে মানবসংসারে প্রতিষ্ঠালাভ করিবেই। তাহাকে ছাড়িয়া দিলে মানবজাতি দরিদ্র হইবে।
ফরাসীজাতিটাকে বড় হুজুগপ্রিয় বোধ হইল। ইহারা সুখভোগে ও বিলাসে যেন হাবুডুবু খাইতেছে। ইহাদের নৈতিক চরিত্র বড় বেশী উচ্চ অঙ্গের ভাবিতে পারিলাম না। আমাদের কৃষ্ণাঙ্গসমাজ অপেক্ষা ফরাসীজাতির এ বিষয়ে কোন উৎকর্ষ লক্ষ্য করা গেল না। অবশ্য ইহারা আমাদের অপেক্ষা পুরাতন জাতি। ইউরোপের বিশাল মানবসমাজের মধ্যে থাকিতে থাকিতে ইহাদের বিদ্যাবুদ্ধি খানিকটা বেশী মার্জ্জিত হইয়াছে। জীবনসংগ্রামের অত বড় আবর্ত্তের মধ্যে পড়িয়া বাঁচিয়া থাকিতে হইলে নানা প্রকার সামর্থ্যের প্রয়োজন হয়। আর সংগ্রাম করিতে করিতে নানাবিধ শক্তি নূতন অর্জ্জিতও হইয়া থাকে। আমার স্বজাতিও কালে এইরূপ শক্তিসম্পন্ন হইয়া উঠিবে—সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। ফরাসীরা জীবন কিছু আগে আরম্ভ করিয়াছে—আমরা সংসারে কিছু পরে আসিয়া দেখা দিয়াছি। এই যা প্রভেদ। ফরাসীদিগকে সত্যবাদী মনে হইল না। তাহারা কথার মূল্যও বেশী স্বীকার করে না। এ সকল বিষয়ে উহারা আমেরিকার নিগ্রোর অপেক্ষা উচ্চ স্তরের লোক কোন মতেই নয়। কোন কোন বিষয়ে নিগ্রোরাই উহাদের অপেক্ষা বোধ হয় উন্নত। কারণ জীবে দয়া ইহাদের নাই বলিলেই চলে। ইহারা গো-বলদ ইত্যাদি জীবজন্তুর প্রতি বড়ই নির্ম্মম। মোটের উপর, ফ্রান্স ছাড়িয়া যাইবার সময়ে আমার স্বজাতির ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে অতি উজ্জ্বল আশাই আমার চিত্ত অধিকার করিল।
প্যারি হইতে লণ্ডনে পৌঁছিলাম। তখন জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ। ইংলণ্ডের রাজধানীতে মহা সমারোহ চলিতেছে। পার্ল্যামেণ্ট মহাসভার অধিবেশন শুরু হইয়াছে। আমার ইয়াঙ্কি বন্ধুগণ প্রথম হইতেই ইংলণ্ডে অনেকের নিকট পত্র দিয়া রাখিয়াছিলেন। আমি পৌঁছিবামাত্র সকলেই আমাকে বক্তৃতা দিতে অনুরোধ করিলেন। আমি স্বাস্থ্যের জন্য বেড়াইতে আসিয়াছি এই আপত্তি তুলিয়া অনেকগুলি এড়াইতে পারিলাম। কিন্তু দুই একস্থলে আমি বক্তৃতা করিতে বাধ্য হইয়াছিলাম। লণ্ডনে, বার্ম্মিংহামে, ব্রিষ্টলে বড় বড় লোকেরা আমাকে অতিথি হইতে নিমন্ত্রণ করিয়াছিলেন।
ইংলণ্ডের অনেক স্থানেই গোলামী নিবারণ সমিতির বন্ধু ও সভ্যগণের সঙ্গে আলাপ হইয়াছিল। তাঁহারা আমেরিকার দাসত্বপ্রথার বিরুদ্ধে যথেষ্ট সাহায্যই করিতেন বুঝিতে পারা গেল।
ব্রিস্টলে এক মহাসভার অধিবেশনে যোগদান করি। সেখানে রাণী ভিক্টোরিয়া উপস্থিত ছিলেন। তাঁহার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়।
পার্ল্যামেণ্টের কমন্স-ভবনে একদিন ষ্ট্যান্লি মহোদয়ের সঙ্গে কথাবার্ত্তা হয়। তিনি আফ্রিকার অনেক গল্প করিলেন। তাহাতে বুঝিলাম, আমেরিকার নিগ্রোরা মাতৃভূমি আফ্রিকায় ফিরিয়া গেলে বড় সুখী হইতে পারিবে না। আমেরিকাকেই তাহাদের জন্মভূমি ও মাতৃভূমি বিবেচনা করা কর্ত্তব্য। আমেরিকাই তাহাদের এক্ষণে স্বদেশ, সুতরাং ভূস্বর্গ।
আমরা দুই চারিজন সম্ভ্রান্ত ইংরাজের পল্লী-গৃহে বাস করিবার সুযোগ পাইয়াছিলাম। তাঁহাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবন দেখিয়া বোধ হইয়াছিল, আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ অপেক্ষা ইংলণ্ডের শ্বেতাঙ্গেরা বেশী সভ্য ও সুখী। ইহাঁদের পারিবারিক প্রথা ও গৃহস্থালী আমার নিকট আদর্শ জীবনযাপন প্রণালী মনে হইত। ইহাঁরা সুখে স্বচ্ছন্দে থাকিতে জানেন। কলের মত ইহাঁদের কাজকর্ম্ম সম্পন্ন হয়।
এদেশের চাকরেরাও বেশ ভদ্রতা জানে। আমেরিকায় ভৃত্য ত পাওয়াই যায় না। আর তাহারা মনিবগণকে সম্মান আদৌ করে না। আমেরিকার চাকরেরা বুঝে যে, তাহারা দুই চারি বৎসরের ভিতরই হয় ত মনিব হইয়া পড়িবে! ইংলণ্ডের চাকরেরা চিরজীবন চাকরই থাকিবে, সুতরাং বড় আকাঙ্ক্ষা তাহাদের নাই। কোন্ নিয়ম ভাল? তাহার উত্তর এ যাত্রায় আর দিলাম না।
ইংলণ্ডের লোকেরা আইন ও শাসনের নিয়মগুলি সম্মান করিয়া চলে। অতি সহজেই এখানে বড় বড় কাজ নিষ্পন্ন হইয়া যায়। ইংরাজজাতি কিছু বেশী ধীর—সকল কাজেই ইহারা সময় অধিক লইয়া থাকে। ইহাদের খানা খাইতে খুব বেশী সময় লাগে। স্থিতিশীল ইংরাজের উল্টা আমাদের আমেরিকার ইয়াঙ্কি। ইয়াঙ্কিরা বড়ই তড়বড়ে—২৪ ঘণ্টা চলাফেরা করিতেছে—সর্ব্বদাই উদ্বিগ্ন, শশব্যস্ত—চুপ করিয়া অথবা সময় বেশী খরচ করিয়া কোন কাজ ইহারা করিতে জানে না। কিন্তু স্থিতিশীল ইংরাজেরা গতিশীল ইয়াঙ্কি অপেক্ষা মোটের উপর কম কাজ করে কি?
ইংরাজেরা আমেরিকাবাসীর তুলনায় গম্ভীর ও চিন্তাশীল। ইহারা কথায় কথায় হো হো করিয়া হাসে না বা কোন কিছু প্রস্তাবে হঠাৎ উত্তেজিত হইয়া যায় না। ইহারা শান্তভাবে বিষয়টা তলাইয়া দেখিবার ও বুঝিবার চেষ্টা করে।
ইউরোপে তিনমাস কাটিয়া গেল। পরে ‘সেণ্টলুই’ জাহাজে ইংলণ্ডের সাদাম্পটন বন্দর হইতে আমেরিকা যাত্রা করিলাম।
ফ্রান্সে থাকিতে থাকিতে আমি ওয়েষ্ট-ভার্জ্জিনিয়া প্রদেশ হইতে দুইখানা পত্র পাই। এই প্রদেশের ম্যাল্ডেন নগরে আমার বাল্যজীবন কাটিয়াছে। একখানা পত্র প্রদেশরাষ্ট্রের কর্ত্তা চার্লষ্টন-নগরের শাসন-কর্ত্তারা লিখিয়াছেন। আর একখানা চার্লষ্টনের নিগ্রো ও শ্বেতাঙ্গ সমাজদ্বয়ের গণ্যমাণ্য ব্যক্তিবৃন্দ ও জনসাধারণ লিখিয়াছেন। দুইটাতেই আমাকে ইউরোপ হইতে ফিরিবার সময়ে চার্লষ্টন হইয়া যাইবার অনুরোধ ছিল। আমি আমার বাল্য-লীলার নিকেতন হইতে এই নিমন্ত্রণ অগ্রাহ্য করিতে পারিলাম না।
যথা সময়ে চার্লষ্টনে গাড়ী হইতে নামিলাম। প্রদেশরাষ্ট্রের ভূতপূর্ব্ব শাসন কর্ত্তা এবং অসংখ্য লোক আমাকে অভ্যর্থনা করিলেন। তারপরদিন বর্ত্তমান শাসন-কর্ত্তার গৃহে দরবার হইল। সেইখানে আমাকে লইয়া যথেষ্ট আদর আপ্যায়নের ব্যবস্থা হইয়াছিল।
সপ্তদশ অধ্যায়
উপসংহার
অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, “ওয়াশিংটন মহাশয়, আপনার জীবনের কোন্ ঘটনায় আপনি সর্ব্বাপেক্ষা বেশী আশ্চর্য্যান্বিত হইয়াছেন?” এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে নিতান্তই অসম্ভব। কারণ আমার জীবনের সমস্ত ঘটনাই বিস্ময়কর। তবে সকল কথা মনে মনে গভীর ভাবে আলোচনা করিলে মনে হয়, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি শ্রীযুক্ত চার্লস্ উইলিয়ম এলিয়ট আমাকে যে পত্র লিখেন তাহাতেই বোধ হয় আমি সর্ব্বাপেক্ষা বেশী বিস্মিত হইয়াছিলাম।
আমার ইউরোপ ভ্রমণের দুই তিন বৎসর পূর্ব্বে এলিয়ট আমাকে পত্র লিখিয়াছিলেন। ১৮৯৬ সালের মে মাসে অর্থাৎ আমার ৩৬।৩৭ বৎসর বয়সে এই পত্র পাই। তাহার কিছুকাল পূর্ব্বে আমি আটলাণ্টা-সম্মিলনে বক্তৃতা দিয়া সমগ্র আমেরিকায় প্রসিদ্ধ হইয়াছি।
এলিয়ট আমাকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ হইতে একটি অনারারি উপাধি দিতে চাহিয়াছেন। সেই উপাধি গ্রহণ করি বার জন্য আমাকে জুন মাসে তাঁহাদের উৎসবে যোগদান করিতে হইবে। ইহাই তাঁহার পত্রের মর্ম্ম।
আমেরিকার সর্ব্বশ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়! তাহার কর্ত্তার নিকট হইতে সম্মানের দান লাভ! যে সম্মানের দান আমেরিকার শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানবীর ও সাহিত্য বীরগণ মাত্র পাইবার যোগ্য! আমি সত্য বলিতেছি এলিয়টের এই পত্র পাইয়া আমি যতদূর বিস্মিত হইয়াছিলাম এরূপ আর কখনও হই নাই।
হার্ভার্ডের এম, এ উপাধি গ্রহণ করিতে যথাসময়ে ম্যাসাচুষ্টেট্স্ প্রদেশের কেম্ব্রিজ-নগরে উপস্থিত হইয়াছিলাম। সমারোহের সহিত আমার হস্তে এম্, এ উপাধিসূচক প্রশংসাপত্র প্রদত্ত হইল। পরে এলিয়ট-মহোদয় আমাকে এবং অন্যান্য যাঁহারা আমার মত ‘সম্মানের দান’ পাইয়াছেন তাঁহাদিগকে একটা ভোজ দিলেন। সেই ভোজে অন্যান্য সকলের বক্তৃতার পর আমি বলিলাম,—
“আজ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে সম্মানিত করিয়া নিগ্রোজাতিকে সম্মানিত করিলেন। আপনারা আমাকে এই সম্মানের উপলক্ষ্য কেন করিয়াছেন তাহার জন্য আপনারাই দায়ী। আমিই ইহার উপযুক্ত হইলে যারপর নাই সুখী হইতাম সন্দেহ নাই।
যাহা হউক, আপনারা এই উপায়ে আমেরিকায় একটি প্রধান সমস্যার মীমাংসায় হস্তক্ষেপ করিয়াছেন। কারণ যুক্তরাজ্যের শিক্ষিত ও ধনবান্ ব্যক্তিগণ কিরূপে অশিক্ষিত ও দরিদ্র জন সাধারণের সঙ্গে মিলিয়া মিশিয়া এক হইতে পারিবে তাহাই এক্ষণে সকল আমেরিক-সন্তানের একমাত্র ভাবিবার বিষয়। ঐ যে অনতিদূরে বীকনস্ট্রীটের সুরম্য প্রাসাদ সমূহ দাঁড়াইয়া রহিয়াছে, উহাদের অধিবাসিগণ কি আলাবামা প্রদেশের তুলার জমির চাষাদিগের এবং লুসিয়ানা প্রদেশের ইক্ষুর আবাদের কুলীগণের তপ্ত নিঃশ্বাস অনুভব করিতে পারিতেছেন? যুক্তরাষ্ট্রের স্বদেশ-সেবকগণের এক্ষণে আর কোন কর্ত্তব্য নাই। তাঁহারা আলোচনা করুন—কি উপায়ে লক্ষ লক্ষ দরিদ্র, অবনত ও পদদলিত নরনারীর ক্রন্দন উন্নত, শিক্ষিত ও ধনবান্ ব্যক্তিগণের কর্ণে পৌঁছিবে?
সেই সমস্যার মীমাংসা করিবার জন্য হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ব্রতী হইয়াছেন বুঝিতে পারিতেছি। আমেরিকার সর্ব্বশ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় আমার ন্যায় কৃষ্ণাঙ্গ, উচ্চ শিক্ষাহীন নিগ্রোকে সম্মান করিয়া এদেশের নিম্নজাতিদিগকে উর্দ্ধে ভুলিবার পথ প্রদর্শন করিলেন। ইহাতে হার্ভার্ড অবনত হইলেন না, অথচ আমাদের দরিদ্রের হৃদয়ে আশার সঞ্চার হইল।
আমি এই ক্ষুদ্র জীবনে আমার অবনত স্বজাতিকে নানা উপায়ে উন্নত করিতে চেষ্টিত হইয়াছি! আমার নগণ্য শক্তির দ্বারা কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গসমাজে ভ্রাতৃভাব বর্দ্ধনেরও যথাসাধ্য চেষ্টা করা গিয়াছে। এত দিন আমার নিকট আমেরিকাজননী যাহা লাভ করিয়াছেন, আজকার এই গৌরবে ভূষিত হইবার পরও আমার সেইরূপ কর্ম্ম ও চিন্তাই আপনারা আশা করিতে পারিবেন।
আমি আমেরিকার জাতীয় আদর্শকে নিজ জীবনের আদর্শ স্বরূপ গ্রহণ করিয়াছি। আমি আমেরিকার সকল জাতিকে সেই জাতীয় আদর্শেই গঠিত দেখিতে চাহি। আমি শ্বেতাঙ্গের লক্ষ্য ও কৃষ্ণাঙ্গের লক্ষ্য দুইটা স্বতন্ত্র ভাবে দেখি না। আমার বিবেচনায় দুইএর লক্ষ্যই এক—দুই জাতিকেই আমেরিকার এক আদর্শে গড়িয়া তুলিতে হইবে। দুইএর উন্নতি—অবনতি এক মাপকাঠিতেই বিচার করিতে হইবে।
আগামী ৫০ বৎসরের ভিতর আমার স্বজাতি সেই আমেরিকার ছাঁচে ঢালা হইয়া উন্নত হইতে থাকিবে—সকল বিষয়ে শ্বেতাঙ্গের সঙ্গে ঐক্য রক্ষা করিয়া বিকাশ লাভ করিবে। সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সাধনার ভিতর দিয়া নিগ্রো সমাজ শিল্পে, সাহিত্যে, সেবায়, ব্যবসায়ে, চরিত্রে ও ধর্ম্মে পরীক্ষিত হইতে হইতে কালে আমেরিকা-জননীর অন্যতম সুদক্ষ অঙ্গে পরিণতি লাভ করিবে।”
আমি টাস্কেজীতে বিদ্যালয় স্থাপনকালে দৃঢ় বিশ্বাস করিয়াছিলাম যে, ভবিষ্যতে আমার বিদ্যালয় চূড়ান্ত উন্নত হইয়া উঠিবে। যুক্ত-দরবারের সভাপতিকে এই বিদ্যালয় দেখাইবার অযোগ্য হইবে না। আমার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হইয়াছিল। ১৮৯৮ সালে সভাপতি ম্যাক্ফিন্লি আটলাণ্টায় আসিয়াছিলেন। সেই উপলক্ষে তিনি এবং তাঁহার কর্ম্মচারিগণ টাস্কেজীতে পদার্পণ করিয়া যান। ১৬ই ডিসেম্বর ক্ষুদ্র টাস্কেজী নগর মহা আনন্দে পূর্ণ হইয়া গেল! শ্বেতাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গ উভয় সমাজই সভাপতি মহাশয়ের অভ্যর্থনায় যোগদান করিল। আমার বিদ্যালয়ও যথেষ্ট সজ্জিত করা হইয়াছিল। সভাপতি মহোদয় বক্তৃতাকালে বলিলেন, “টাস্কেজীর প্রতিষ্ঠাতা বুকার ওয়াশিংটন নিগ্রোজাতির অন্যতম জননায়ক। ইনি স্বদেশে ও বিদেশে যথেষ্ট খ্যাতি লাভ করিয়াছেন। ইহাঁর শিক্ষাপ্রচার, বাগ্মিতা এবং মানব-সেবা সর্ব্বত্র সুবিদিত।”
প্রায় ১৯ বৎসর ব্যাপী কার্য্যের পর টাস্কেজী বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সভাপতি প্রথম পদার্পণ করিলেন। বিশ বৎসর পূর্ব্বে একটা পোড়ো বাড়ীতে আমাদের কার্য্য আরম্ভ হইয়াছিল। তখন টাস্কেজীর ছাত্র সংখ্যা ৩০ এবং শিক্ষক মাত্র একজন। আজ আমাদের ৬৯০০ বিঘা জমি। তাহার ৩০০০ বিঘা ছেলেরা চাষ করে। আমাদের এক্ষণে ৬৬টা বড় বড় ইমারত—ইহাদের ৬২টা ছাত্রদের নিজ হাতে গড়া। আজ এই বিদ্যালয়ে ৩০ প্রকার কৃষি ও শিল্পবিষয়ক কাজ কর্ম্ম শিখান হইতেছে। আমাদের পাশ করা গ্রাজুয়েট আমেরিকার প্রদেশে প্রদেশে শিক্ষকতা ও ব্যবসায় বা শিল্পের কর্ম্মে নিযুক্ত। প্রতিদিন আমার নিকট এইরূপ পাশকরা লোকের জন্য এত তাগিদ আসে যে, অনেককেই আমি নিরাশ করিতে বাধ্য হই।
গৃহ সম্পত্তি ইত্যাদির মূল্য সম্প্রতি ২,১০০,০০০৲। এতদ্ব্যতীত নগদ টাকা আছে ৩,০০০,০০০৲। বার্ষিক ব্যয় আজকাল ১৫০,০০০৲। এই টাকার অধিকাংশই গৃহে গৃহে ভিক্ষা করিয়া হইয়া থাকে। এক্ষণে আমাদের ছাত্র সংখ্যা ১৪০০। আমেরিকার ২৭ প্রদেশ হইতে ছাত্র আসিয়া থাকে। এতদ্ব্যতীত আফ্রিকা, কিউচা, পোর্টো রিকো, জামেকা ইত্যাদি দূর বিদেশ হইতেও আমরা ছাত্র পাই। আজকাল আমাদের কর্ম্মচারী ও শিক্ষকগণের সংখ্যা সর্ব্বসমেত ১১০। ইহাঁরা স্বপরিবারে বাস করেন। বিদ্যালয়ের চতুঃসীমার মধ্যে এইরূপে অন্ততঃ ৭০০ জন লোকের বসতি।
১৮৯০ সালে টাস্কেজীতে প্রথম “নিগ্রো-মহাসম্মিলনের” প্রবর্ত্তন করি। তাহার পর হইতে প্রতিবৎসর নিগ্রোসম্মিলনের অধিবেশন হইয়া আসিতেছে। প্রায় ৮০০।৯০০ পুরুষ ও স্ত্রী নিগ্রো যুক্তরাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশ হইতে টাস্কেজীতে বৎসরে একদিন করিয়া কাটাইয়া যান। এই দিন নিগ্রোজাতির আর্থিক, সামাজিক, শিক্ষাসম্বন্ধীয়, নৈতিক ও অন্যান্য সকল প্রকার উন্নতির উপায় আলোচিত হয়। এই সম্মিলনকে নিগ্রোদিগের জাতীয় সম্মিলন বলা যাইতে পারে।
এই একদিবসব্যাপী নিগ্রো-মহা-সম্মিলনের দৃষ্টান্তে বিগত ১০ বৎসরের মধ্যে নিগ্রোসমাজের ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্রে ছোট বড় নানা প্রাদেশিক বা পল্লী-সম্মিলনের অনুষ্ঠান আরব্ধ হইয়াছে এইরূপ সম্মিলনের সাহায্যে নিগ্রোজাতির কর্ম্মশক্তি এবং চিন্তাশক্তি অসীম প্রভাব লাভ করিতেছে।
টাস্কেজীতে প্রতিবৎসর ‘নিগ্রো-মহা-সম্মিলনের পর দিবস আর একটা সমিতির অধিবেশন হইয়া থাকে। ইহার নাম “কর্ম্মীসমিতি”। ইহাতে নিগ্রোসমাজের নানা কেন্দ্রে যাঁহারা শিক্ষা প্রচার কর্ম্মে ব্রতী আছেন তাঁহারা পরামর্শ করিয়া পর বৎসরের জন্য কর্ত্তব্য স্থির করেন। সুতরাং ইহাকে নিগ্রোসমাজের শিক্ষাসম্মিলন বলা যাইতে পারে। নিগ্রো-মহা-সম্মিলন যে কার্য্য ব্যাপকভাবে ও বৃহৎভাবে করেন কর্ম্মীসমিতি তাহার ‘কার্য্যনির্ব্বাহক’ সভা স্বরূপ হইয়া সেই কার্য্যই কথঞ্চিৎ ক্ষুদ্রতর গণ্ডীর মধ্যে সমাধা করেন। ১৯০০ সালে আমি নিগ্রোজাতির “ব্যবসায়-সম্মিলনে”র প্রবর্ত্তন করিয়াছি। এই সম্মিলনের প্রথম অধিবেশন বোষ্টননগরে অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্থানে যে সকল নিগ্রো ব্যবসায়ে ও বাণিজ্যে লিপ্ত আছেন তাঁহারা এই সম্মিলনে সমবেত হইয়া ভাব-বিনিময় করিবার সুযোগ পাইয়া থাকেন। এই বৃহৎ অনুষ্ঠান হইতেই ছোট ছোট “প্রাদেশিক ব্যবসায়-সম্মিলনে”র জন্ম হইয়াছে।
এই গ্রন্থ আমি আমার জন্মভূমি ভার্জ্জিনিয়া প্রদেশের রিচ্মণ্ডে বসিয়া সমাপ্ত করিলাম। আজ ১৯০১ সাল। ৩৫ বৎসর পূর্ব্বে এই রিচ্মণ্ড-নগর গোলামী প্রথার প্রধান কেন্দ্র ছিল। ২৫ বৎসর পূর্ব্বে, আমাদের স্বাধীনতালাভের কয়েক বৎসর পর, এই রিচ্মণ্ড-নগরে আমি প্রথম রাত্রি অনাহারে থাকিয়া রাস্তার পার্শ্বে কাঠের তক্তার নীচে মাটিতে শুইয়া কাটাইয়াছি। আর সেই রিচ্মণ্ডে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ সমাজদ্বয়ের সমবেত শ্রোতৃমণ্ডলীর নিকট আমি গত রাত্রে আমার আশার বাণী প্রচার করিলাম। যে স্থানে ২৫ বৎসর পূর্ব্বে একব্যক্তিও আমাকে একটি আলু মাত্র দান করিয়া ক্ষুধা নিবৃত্তি করিতে দেয় নাই, আজ সেই স্থানের সহস্র সহস্র নরনারী, শিক্ষিত সম্প্রদায় এবং প্রদেশরাষ্ট্রের সকল কর্ম্মচারীই আমাকে আদর আপ্যায়ন ও সম্বর্দ্ধনা করিতে ব্যগ্র। কালের কি বিচিত্র গতি!
সম্পূর্ণ।