মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Benoy Kumar Sarkar (†1949) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন
একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষের পরিচয় আমি এখানে পাই। তখন হইতে তিনি আমার হৃদয়-সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হইয়া আছেন। তাঁহার চরিত্রই আমার জীবনের উজ্জ্বলতম আদর্শস্বরূপ রহিয়াছে। তাঁহার দৃষ্টান্ত সম্মুখে রাখিয়াই আমি কর্ম্মক্ষেত্রে সাহসভরে বিচরণ করিতেছি। সেই উদারস্বভাব বৃহৎপ্রাণ পরোপকারী মহাপুরুষের নাম সেনাপতি স্যামুয়েল সি আর্মষ্ট্রঙ্গ।
সৌভাগ্যক্রমে আমি ইউরোপ ও আমেরিকার বহু বিখ্যাত লোকের সংস্পর্শে আসিয়াছি। খাঁটি বড় লোক এবং তথাকথিত বড় লোক উভয় প্রকার নামজাদা লোকই আমি অনেক দেখিয়াছি। কিন্তু আমি আজ মুক্তকণ্ঠে বলিতেছি, সেনাপতি আর্মষ্ট্রঙ্গের ন্যায় চরিত্রবান্ ধর্ম্মভীরু মানবসেবক একজনও দেখি নাই। তিনিই আমার চিন্তারাজ্যের ‘একমেবাদ্বিতীয়ং’ মহাবীর, তাঁহাকে দেখিয়াই ত্যাগাবতার বৈরাগ্যাবতার প্রেমাবতার যীশুখৃষ্ট ও সাধু মহাত্মাদের পরিচয় কিছু কিছু পাইয়াছি বলিতে পারি। সেনাপতি আর্মষ্ট্রঙ্গকে আমি মূর্ত্তিমান ত্যাগধর্ম্মরূপে পূজা করিতাম।
গোলামাবাদের ঘৃণ্য জীবন এবং কয়লার খাদের দুঃখদারিদ্র্য ভোগ করিবার পরক্ষণেই এই মহা-পুরুষের সাক্ষাৎলাভ করিলাম। বহু পুণ্যফলেই আমার এরূপ ঘটিয়াছিল। যেই আমি তাঁহাকে প্রথম দেখিলাম তখনই আমার মনে হইল যে, ইনি একজন আদর্শ মানব। তখনই যেন বুঝিতে পারিলাম ইঁহার ভিতর অলৌকিক, অনন্যসাধারণ বীরসুলভ শক্তি রহিয়াছে। সেই প্রথম দর্শন হইতে সেনাপতি আর্মষ্ট্রঙ্গকে আমি অনেকবার নানা ভাবে, আপনার জন ভাবে, বন্ধুভাবে দেখিবার অবসর পাইয়াছি। তাঁহার মৃত্যুকাল পর্য্যন্ত তাঁহাকে আমি আত্মীয় বিবেচনা করিবার সুযোগ পাইয়াছি। ক্রমশই তিনি আমার জ্ঞানে মহৎ হইতে মহত্তররূপে অধিকতর শ্রদ্ধা, ভক্তি ও পূজার পাত্র হইয়াছিলেন।
যতই আমার বয়স বাড়িতেছে ততই আমি বিবেচনা করিতেছি যে, ‘মানুষ’ গড়িবার জন্য গ্রন্থপাঠের ব্যবস্থা করিবার আবশ্যকতা বেশী নাই। পুঁথি-কেতাব, খাতা-পত্র, লাইব্রেরী, কল-কব্জা, ল্যাবরেটরী ইত্যাদি সাজ-সরঞ্জাম—এ সব হইতে ছাত্রেরা বেশী কিছু শিখিতে পায় না। এই নির্জ্জীব পদার্থগুলি মানুষের মনুষ্যত্ব গজাইয়া দিতে, বিশেষ সমর্থ নয়। আমি হ্যাম্পটনে থাকিবার কালে ভাবিতাম যে, এই বিদ্যালয় হইতে বাড়ী-ঘর, হাতিয়ার-যন্ত্র, খাতা-পত্র, ইট-কাঠ, বেঞ্চ-টেবিল, ইত্যাদি সবই যদি সরাইয়া লওয়া হয়, তাহা হইলেও বিদ্যালয়ের কিছু মাত্র অঙ্গহানি হইবে না। কারণ এই বিদ্যালয়ের প্রাণদাতা, এই বিদ্যালয়ের প্রাণ-প্রতিষ্ঠাতা, এই বিদ্যালয়ের পিতা স্বরূপ পরিচালক, আর্মষ্ট্রঙ্গ মহোদয় একাকীই এই সমুদয় সাজসরঞ্জাম অপেক্ষা মূল্যবান্। তাঁহার নিকট নিগ্রো বালকেরা একবার করিয়া রোজ আসিতে পারিলেই তাহাদের সর্ব্বোচ্চ শিক্ষালাভের মুফল ফলিবে। আজও আমি সেই কথা বলিতেছি, প্রকৃত চরিত্রবান সমাজসেবক শিক্ষাপ্রচারকের সঙ্গে সহবাস করিতে পাইলে যতখানি চরিত্র গঠিত হয়, মনের তেজ বাড়িতে থাকে, চিত্তের শক্তি বিকশিত হয়, কর্ম্মক্ষমতার উন্মেষ হয়, সৌজন্য-শিষ্টাচার অর্জ্জিত হয়, অন্য কোন উপায়ে তাহা হইতে পারে না। আমা দের তথাকথিত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলি হইতে গ্রন্থ-পাঠের আড়ম্বর কমিয়া যাইবে না কি? আমাদের শিক্ষা-ক্ষেত্রের কর্ম্মীরা সমগ্র জগতের কাজ-কর্ম্মের মধ্যে রাখিয়া বালক-বালিকাদিগকে মানুষ করিয়া তুলিতে চেষ্টা করিবেন না কি?
সেনাপতি আর্মষ্ট্রঙ্গ মৃত্যুর পূর্ব্বে দুইমাস কাল আমার টাস্কেজী বিদ্যালয়ে কাটাইয়াছিলেন। তখন তিনি পক্ষাঘাতে ভুগিতে ছিলেন। সর্ব্বাঙ্গ শিথিল হইয়া গিয়াছিল। তথাপি শেষ মুহূর্ত্ত পর্য্যন্ত তিনি তাঁহার শিক্ষাপ্রচার-ব্রতে লাগিয়াই ছিলেন। কাজের মধ্যে নিজকে ডুবাইয়া ফেলিতে পারে—এরূপ লোক সংসারে বিরল। কিন্তু আর্মষ্ট্রঙ্গ নিজকে সম্পূর্ণ ভুলিতে পারিতেন—আত্মমুখী চিন্তা তাঁহার বিন্দুমাত্র ছিল না। পরসেবাই তাঁহার একমাত্র ধর্ম্ম ছিল। তিনি হ্যাম্পটন বিদ্যালয়ের জন্য এতদিন যাহা করিয়াছেন আমার টাস্কেজী বিদ্যালয়ের জন্যও সেইরূপ খাটিতে লাগিলেন। কেবল তাহাই নহে। আমাদের অঞ্চলে যেখানে যেখানে নিগ্রোসমাজে শিক্ষা-বিস্তারের প্রয়োজন, সেই সকল স্থানের জন্যও তিনি শক্তি প্রয়োগ করিতে আরম্ভ করিলেন। সকল কার্য্যেই তাঁহার সমান আনন্দ। তিনি নিজকে বিসর্জ্জন দিতে শিখিয়াছিলেন—আদর্শের মধ্যে তন্ময় হইতে পারিয়াছিলেন। এজন্য তাঁহার কর্ম্মক্ষেত্রের অভাব হইত না। যখন যেখানে থাকিতেন তখন সেইখানেই তাঁহার আত্মত্যাগী সাধনার কার্য্য চলিতে থাকিত। এখানে আমার কর্ম্মক্ষেত্র, ওটা তোমার কর্ম্মকেন্দ্র, এই আমার গণ্ডী, ঐ পর্য্যন্ত তোমার গণ্ডী—তাঁহার নিঃস্বার্থ চিত্তে এরূপ চিন্তা স্থান পায় নাই। সর্ব্বত্রই তিনি স্বার্থত্যাগের কর্ম্মক্ষেত্র খুঁজিয়া লইতেন।
সেনাপতি আর্মষ্ট্রঙ্গ নিউ ইংলণ্ড অঞ্চলের অধিবাসী ‘ইয়াঙ্কি’। বিগত সংগ্রামে তিনি এই প্রান্তের পক্ষে দক্ষিণ প্রান্তের বিরুদ্ধে লড়াই করিয়াছিলেন। সুতরাং অনেকেই মনে করিতে পারেন যে, তিনি হয়ত দক্ষিণ প্রান্তের শ্বেতকায়গণের সম্বন্ধে শত্রুভাব পোষণ করিতেন। আমি বলিতে পারি, তাহা সত্য নয়। তিনি সংগ্রামের পর একদিনও কোন দক্ষিণপ্রান্তবাসী শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি সম্বন্ধে নিন্দা বা তিরস্কারসূচক বাক্য ব্যবহার করেন নাই। বরং যথা সাধ্য তিনি তাহাদের উপকারের জন্য চেষ্টাই করিয়াছেন।
হ্যাম্পটন বিদ্যালয়ের ছাত্রেরা তাঁহাকে দেবতার মত ভক্তি করিত। আর্মষ্ট্রঙ্গের আরব্ধ কোন কর্ম্ম কৃতকার্য্য হইবে না—এরূপ আমরা ভাবিতেই পারিতাম না। তাঁহার যে কোন আদেশই আমরা পলকের মধ্যে সম্পন্ন করিতে প্রয়াসী হইতাম। তাঁহার আদেশ অনুসারে কাজ করিতে পাইলে আমরা কৃতার্থ বোধ করিতাম। একটা ঘটনার উল্লেখ করিতেছি। মৃত্যুর কিছুকাল পূর্ব্বে তিনি আমার টাস্কেজী বিদ্যালয়ে অতিথি হইয়া ছিলেন। তখন পক্ষাঘাতে ভুগিতেছিলেন—নাড়িবার ক্ষমতা ছিল না। তাঁহার চেয়ার গড়ান রাস্তা দিয়া একটা পাহাড়ের উপর তোলা হইতেছিল। তাঁহার একটি ভূতপূর্ব্ব ছাত্র তাঁহার চেয়ার টানিয়া তুলিতেছিল। রাস্তা ভাল ছিল না বলিয়া সহজে ঐ কার্য্য সাধিত হয় নাই। অবশেষে যখন পাহাড়ের উপরে উঠা গেল, ছাত্রটি বলিয়া উঠিলেন—“যাহা হউক, আজ আমার সৌভাগ্য, সেনাপতির জন্য মৃত্যুর পূর্ব্বে একটা কঠিন রকমের কাজ করিবার সুযোগ পাইয়াছি।”
যখন আমি হ্যাম্পটন বিদ্যালয়ে ছিলাম তখন প্রাই নূতন নূতন ছাত্র ভর্ত্তি হইত। আমাদের বড় স্থানাভাব ছিল। ছাত্রাবাসে আর ছাত্র লওয়া চলিত না। বাহিরে তাঁবু খাটাইয়া ঘর তৈয়ারি করিয়া লইতে হইত। সেই সময়ে আর্মষ্ট্রঙ্গ মহোদয় পুরাতন ছাত্রদের নিকট আসিয়া জিজ্ঞাসা করিতেন, “তোমাদের মধ্যে কেহ রাত্রে তাঁবুতে শুইয়া ঘরের ভিতর নূতন ছাত্রদের জন্য জায়গা করিতে প্রস্তুত আছ কি?” অমনি প্রত্যেক ছাত্রই ঘর ছাড়িয়া দিয়া তাঁবুতে কষ্টে রাত্রি কাটাইবার জন্য অগ্রসর হইত।
আমিও এইরূপ একজন স্বার্থত্যাগী ‘পুরাতন ছাত্র’ ছিলাম। আমার মনে আছে—অত্যন্ত কঠোর শীতকালে আমাদের কয়েক বার তাঁবুতে রাত্রি কাটাইতে হইয়াছিল। আমাদের যৎপরোনাস্তি কষ্টও হইয়াছিল। সেনাপতি আর্মষ্ট্রঙ্গের আদেশ, সুতরাং আমরা তাহা প্রাণপণে পালন করিবই। আমাদের কষ্টের কথা তাঁহাকে জানাইব কেন? আমরা একসঙ্গে দুইকাজ করিতেছিলাম—কারণ ইহাদ্বারা আর্মষ্ট্রঙ্গকে খুসী করিতাম, এবং নূতন নূতন ছাত্রের শিক্ষালাভের সুযোগ বাড়াইতে পারিতাম। এক এক রাত্রে মহা ঝড় বহিত—তাঁবু উড়িয়া যাইত—আমরা সেই কন্কনে শীতের মধ্যে খোলা মাঠে পড়িয়া থাকিতাম। সেনাপতি সকালে আসিয়া দেখিতেন—আমরা হাস্যমুখে প্রফুল্লচিত্তে শীত সহ্য করিতেছি।
আর্মস্ট্রঙ্গের কথা এত করিয়া বলিবার কারণ আছে। আমি সকলকে জানাইতে চাহি যে, এরূপ চরিত্রবলে বলীয়ান শিক্ষাপ্রচারকগণের প্রয়াসেই আমেরিকার নিগ্রোসমাজে জ্ঞানালোক প্রবেশ করিয়াছে। আর্মষ্ট্রঙ্গের আদর্শে বহু শ্বেতাঙ্গ শিক্ষিত নরনারী কৃষ্ণকায় সমাজে শিক্ষা প্রচারব্রত গ্রহণ করিয়া আমার স্বজাতিকে উন্নতির পথে তুলিয়াছেন। জগতে এই নীরব নিঃস্বার্থ কর্মবীরগণের জীবনচরিত এখনও প্রকাশিত হয় নাই।
হ্যাম্পটনে প্রতিদিনকার প্রতি কর্ম্মেই, প্রত্যেক উঠা-বসায় আমি একটা নূতন কিছু শিখিতেছিলাম। সেখানকার জীবনযাত্রা-প্রণালী এবং নিত্য কর্ম্ম-পদ্ধতি আমাকে নানা ভাবে শিক্ষিত করিতেছিল। যথাসময়ে নিয়মিতরূপে খাইতে হয়, এখানে আমি তাহা প্রথম উপলব্ধি করিলাম। টেবিলের উপর কাপড় বিছাইয়া তাহার উপর থালা বাটি রাখিতে হয়—ইহাও আমি জীবনে প্রথম শিখিলাম। খাইতে বসিয়া কিরূপ ব্যবহার করিতে হয়, কোন্ খাদ্যের পর কোন্ খাদ্য লওয়া উচিত—ইত্যাদি আরও অনেকানেক বিষয়ে আমার প্রথম অভিজ্ঞতা জন্মিল। বিছানার উপর চাদর দেওয়াও আমি পূর্ব্বে আর কোন দিন দেখি নাই। এইরূপে দৈনিক জীবন-যাপনের প্রায় সকল কর্ম্মেই হ্যাম্পটনে আমার ‘হাতে খড়ী’ হইল!
হ্যাম্পটনেই আমি আবার স্নান করিতেও শিখি। স্নান করিলে যে কত উপকার হয়, শরীর ও স্বাস্থ্যের কত উন্নতি হয়, চিত্তের প্রফুল্লতা বাড়িতে থাকে—তাহা আমি পূর্ব্বে বুঝিতাম না। তখন হইতে আমি প্রতিদিন স্নান করিয়া আসিতেছি। মাঝে মাঝে এমন অনেকের বাড়ীতে অতিথি হইতে হইয়াছে, যেখানে স্নান করিবার ব্যবস্থা নাই। আমি সেখানে নিকটবর্ত্তী কোন নদী বা ঝরণায় যাইয়া স্নান করিয়া পরিষ্কার হইয়াছি। নিগ্রোজাতিকে আমি সর্ব্বদাই বলিয়া থাকি, বাড়ী তৈয়ারী করিতে হইলেই স্নানাগারও যেন প্রস্তুত করা হয়।
হ্যাম্পটনে আমার দুইটি মাত্র গেঞ্জি ছিল—ময়লা হইয়া গেলে আমি রাত্রে সাবান দিয়া কাচিয়া আগুনে শুকাইয়া লইতাম। পরদিন সকালে তাহা ব্যবহার করিতাম।
হ্যাম্পটন বিদ্যালয়ের বোর্ডিংএ খাওয়া খরচ মাসিক ৩০৲ টাকা। অমি যে খান্সামার কাজে নিযুক্ত হইয়াছিলাম তাহাতে সমস্ত আয় হইত না—সুতরং আমাকে মাসে মাসে নগদ টাকাও কিছু কিছু দিতে হইত। প্রথমে যখন ভর্ত্তি হই, তখন হাতে ১৷৷৴৹ মাত্র ছিল। আমার দাদা ক্বচিৎ কখনও ২।৪৲ টাকা পাঠাইতেন। কিন্তু তাহাতে আমার খাই খরচের জন্য দেয় টাকা কুলাইত না।
কাজেই আমি খান্সামাগিরি এত ভাল করিয়া করিতে লাগিলাম যে, শেষে আমি খাইখরচের সমস্ত টাকাই বেতনস্বরূপ পাইতাম। বিদ্যালয়ের বেতন ছিল বার্ষিক ২১০৲ টাকা। এতটাকা আমার সংগ্রহ করা অবশ্যই অসম্ভব ছিল। আর্মষ্ট্রঙ্গ মহোদয় একজন ইয়াঙ্কি বন্ধুকে বলিয়া আমার বেতন দেওয়াইতেন। বন্ধুটির নাম এস্ গ্রিফিথ্স্ মরগ্যান্। শ্রীযুক্ত মরগ্যান্ আমার হ্যাম্পটনের পুরাপুরি বেতন দিয়া আসিয়াছেন। আমি পরে যখন টাস্কেজীতে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করি—তখন কয়েকবার এই সহৃদয় দাতার সঙ্গে দেখা করিয়া ধন্য হইয়াছি।
হ্যাম্পটনে পুস্তকাভাব ও বস্ত্রাভাব যথেষ্ট হইল। পুস্তক অবশ্য পরের নিকট ধার করিয়া লইলেই কাজ চলে। এই রূপেই আমার চলিত। কিন্তু পোষাক পাই কোথায়? সে থলের মধ্যে আমার যা কিছু সম্পত্তি তাহাতে ত এখানে চলা অসম্ভব। বিশেষতঃ সেনাপতি মহোদয় কাপড় চোপড়ের উপর বিশেষ দৃষ্টিই রাখিতেন কোন ছাত্রের জামার বুতাম নাই দেখিলে তিনি অসন্তুষ্ট হইতেন। জুতা বেশ কালী বা রং করা না দেখিলে তাঁহার বিরক্তি জন্মিত। কোটে কালীর দাগ থাকিলে কোন ছাত্র তাঁহার নিকট আসিতে ইতস্ততঃ করিত। আমার মাত্র একটি পোষাক। তাহা দ্বারাই খান্সামাগিরি ও ছাত্রগিরি করিতে হইবে। চব্বিশ ঘণ্টা এক পোষাক ব্যবহার করিয়া কি তাহা পরিষ্কার রাখা যায়? আমার অবস্থা দেখিয়া শিক্ষক মহোদয়গণের দয়া হইল। তাঁহারা আমাকে পুরাতন জামা পোষাকের বস্তা হইতে একটা পোষাক দান করিলেন। এই পুরাতন বস্ত্রগুলি যুক্তরাজ্যের ইয়াঙ্কি অঞ্চল হইতে হ্যাম্পটনের দরিদ্র ছাত্রগণের জন্য দানস্বরূপ পাওয়া যাইত। বস্ত্র দানের এইরূপ ব্যবস্থা না থাকিলে আমার মত অসংখ্য বালক বিদ্যালাভে বঞ্চিত হইত সন্দেহ নাই।
এইবার শয্যার কথা কিছু বলিব। এতদিন ত মাটিতে শুইয়া অথবা ন্যাক্ড়ার বস্তায় পড়িয়া রাত্রি কাটাইতে অভ্যাস করিয়াছি। হ্যাম্পটন-বিদ্যালয়ে আসিয়া দেখি—প্রত্যেকের বিছানার উপরে দুই দুইটা করিয়া চাদর বিস্তৃত রহিয়াছে। দুইটা চাদরের সমস্যা আমি কোন মতেই মীমাংসা করিতে পারিলাম না। প্রথম রাত্রিতে আমি দুইটা চাদরের নীচেই শুইলাম। দ্বিতীয় রাত্রে ভুল বুঝিতে পারিয়া—দুইটা চাদরের উপরেই শুইয়া পড়িলাম। আমার ঘরে আরও ছয় জন ছাত্র শুইত। তাহারা আমার দুরবস্থা দেখিয়া বোধ হয় মজা দেখিত এবং মনে মনে হাসিত। কেহই কিছু বলিত না। পরে তাহাদিগকে দেখিতে দেখিতে দুইটা চাদরের সার্থকতা বুঝিলাম। একটা গায়ে দিতে হয়—আর একটা পাতিয়া শুইতে হয়।
হ্যাম্পটনে বোধ হয় আমার অপেক্ষা ছোট ছেলে আর কেহ ছিল না। অনেক প্রবীণ পুরুষ ও স্ত্রী এখানে লেখাপড়া শিখিত। এই সময়ে এই বিদ্যালয়ে প্রায় চারি শত ছাত্র ও ছাত্রী ছিল। সকলকেই বিদ্যার্জ্জনে মহা উৎসুক দেখিতাম। অনেকেরই শিখিবার বয়স পার হইয়া গিয়াছে—অন্ততঃ বই মুখস্থ করিবার সময় আর তাহাদের ছিল না। তথাপি তাহারা চেষ্টা করিত। তাহাদের অকৃতকার্য্যতায় তাহারা ভ্রূক্ষেপ করিত না। তাহাদের আন্তরিকতার দৃষ্টান্ত বিরল। একে বেশী রয়স—তাহার উপর দারিদ্র্য, তাহার উপর অকৃতকার্য্যতা—তথাপি তাহারা বিচলিত হইত না। এরূপ কর্ম্মযোগ বেশী দেখা যায় কি?
এত আন্তরিকতা, এত উৎসাহ, এত অধ্যবসায়, এত কঠোর সাধনায় ব্রতী হইবার কারণ ছিল। তাহারা সকলেই স্বজাতিকে এবং স্বপরিবারকে উন্নত করিবার জন্য বদ্ধপরিকর। তাহারা কেহই নিজ জীবনের জন্য ভাবিত না। নিজের কষ্ট, নিজের অক্ষমতা, নিজের অকৃতকার্য্যতা—এ সকল দুর্ব্বলতা ও নৈরাশ্যের কারণ তাহাদের চিত্তে কোন প্রভাব বিস্তার করিতে পারিত না। সর্ব্বদা পরের কথা ভাবিত, ভবিষ্যৎ বংশধরগণের কথা ভাবিত, সমগ্র নিগ্রো সমাজের চিন্তায় বিভোর হইয়া থাকিত। এজন্য লাজ মান ভয় তাহাদিগকে স্পর্শ করিতে পারে নাই।
আর শ্বেতাঙ্গ শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রীদের কথা কি বলিব? তাঁহারা ত স্বর্গের দেবতাস্বরূপই ছিলেন। তাঁহারা নিগ্রোজাতির জন্য যে ত্যাগস্বীকার ও চরিত্রবল দেখাইয়াছেন, তাহা সভ্যতার ইতিহাস-গ্রন্থে অতি উজ্জ্বল স্থান অধিকার করিয়া থাকিবে। আমার বিশ্বাস, অনতিদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের দক্ষিণপ্রান্ত হইতে সেই স্বার্থত্যাগ, পরোপকার, মানবসেবা ও শিক্ষা প্রচারের পূণ্যকাহিনী প্রচারিত হইবে।
চতুর্থ অধ্যায়
হ্যাম্পটনে জীবন গঠন
দেখিতে দেখিতে হ্যাম্পটন-বিদ্যালয়ে আমার এক বৎসর কাটিয়া গেল। গরমের ছুটি আসিল। সকলেই নিজ নিজ বাড়ী চলিয়া যাইতে লাগিল। কিন্তু আমি বাড়ী যাই কি করিয়া? হাতে একটি পয়সাও নাই। অথচ তখনকার দিনে ছুটির সময়ে স্কুলে থাকিবারও সুবিধা ছিল না। মহা মুস্কিলে পড়িলাম। ওখান হইতে পড়িতে হইলেও ত কিছু খরচ আবশ্যক।
আমি ইতিমধ্যে একটা পুরাতন জামা সংগ্রহ করিয়াছিলাম। ভাবিলাম ঐটা বেচিয়া যদি কিছু পাওয়া যায়। আমি অবশ্য কোন লোককে জানিতে দিলাম না যে হাতে পয়সা নাই বলিয়া আমি বাড়ী যাইতে পারিতেছি না। ছেলেবেলায় ওরূপ অহঙ্কার ও লজ্জা সকলেরই থাকে। আমার কোট বেচিবার কারণ এক একজনকে এক একরূপ বুঝাইলাম। একটি নিগ্রো বালক আমার ঘরে জামাটা দেখিতে আসিল। সে ইহার এপীঠ ওপীঠ খুব ভাল করিয়া পরীক্ষা করিল এবং দাম জানিতে চাহিল! আমি বলিলাম, “৯৲ টাকার কমে কি ছাড়া যায়?” সেও বোধ হয় বুঝিল—দাম ঐরূপই হইবে। কিন্তু তাহারও অর্থাভাব। কালবিলম্ব না করিয়া সে অতি নির্লজ্জভাবে বলিয়া ফেলিল—“দেখ বাপু, কাজের কথা বলি, শুন। জামাটা ত আমি এখনই লইতেছি, এবং নগদ দশ পয়সা দিতেছি। বাকী দামটা যখন সুবিধা হয়, দিব।” বলা বাহুল্য আমি নিতান্তই হতাশ হইয়া পড়িলাম।
কোন মতে হ্যাম্পটন ছাড়িয়া যাইতে পাইলেই আমি নানাস্থানে কাজ খুঁজিয়া লইতে পারিব বিশ্বাস ছিল। কিন্তু হ্যাম্পটন হইতে বাহির হওয়াই অসম্ভব। এদিকে ছাত্র, শিক্ষক সকলেই একে একে চলিয়া গেলেন। আমি একাকী রহিলাম। আমার দুঃখের আর সীমা থাকিল না।
শেষ পর্য্যন্ত একটা হোটেলে চাকরী পাইলাম। কিন্তু বেতন বড় কম। যাহা হউক লেখা পড়ার সময় অনেক পাইতাম। ফলতঃ গরমের ছুটীটায় আমি বেশ খানিকটা শিখিয়া ফেলিলাম।
গরমের ছুটির সময়ে আমি বিদ্যালয়ের নিকট ৫০৲ ঋণী ছিলাম। ছুটিতে খাটিয়া টাকা পাইলে ঐ ধার শোধ করিব মনে করিয়াছিলাম। ছুটি ফুরাইয়া আসিল কিন্তু ৫০৲ কোন মতেই জমা হইল না।
একদিন হোটেলের একটা কামরায় টেবিলের নীচে ৩০৲ টাকার একখানা ‘নোট’ কুড়াইয়া পাইলাম। আমি হোটেলের কর্ত্তার নিকট উহা লইয়া গেলাম। ভাবিয়াছিলাম কিছু অন্ততঃ পাওয়া যাইবে। কিন্তু তিনি বলিলেন “ওখানে আমিই বসিয়া কাজ করি—সুতরাং উহা আমারই প্রাপ্য।” এই বলিয়া তিনি ৩০৲ টাকার নোট পকেটস্থ করিলেন। আমি কিছু পাইলাম না।
এত কষ্টে পড়িলে হতাশ হইবারই কথা। কিন্তু উহা কাহাকে বলে আমি তাহা জানিই না। জীবনের কোন অবস্থাতেই আমি এখন পর্য্যন্ত নৈরাশ্য আস্বাদ করি নাই। যখনই যে কাজ ধরিয়াছি, আমার বিশ্বাস থাকিত যে আমি তাহাতে কৃতকার্য্য হইবই। সুতরাং যাঁহারা বিফলতার আলোচনা করেন, তাঁহাদের সঙ্গে আমার কোন দিনই মতে মিলে না। কৃতকার্য্য কি উপায়ে হওয়া যায় একথা যিনি বুঝাইতে পারেন আমি তাঁহারই ভক্ত। বিফলতা কেন হয়—একথা যিনি বুঝাইতে আসেন আমি তাঁহার কাছে ঘেঁসি না।
ছুটির শেষে বিদ্যালয়ে গেলাম। কর্ত্তৃপক্ষকে বলিলাম—“ধার শোধ করিবার ক্ষমতা এখনও আমার হয় নাই—স্কুলে প্রবেশ করিতে পারি কি?” খাজাঞ্জি ছিলেন সেনাপতি মার্ণ্যাল। তিনি সাহস দিয়া বলিলেন, “তোমাকে এ বৎসর ভর্ত্তি করিয়া লইলাম। তুমি একদিন না একদিন আমাদের ঋণ শোধ করিতে পারিবে—আমার বিশ্বাস আছে।” দ্বিতীয় বৎসরও পূর্ব্বের ন্যায় আমি খান্সামাগিরি করিতে করিতে এখানে লেখাপড়া শিখিতে থাকিলাম।
হ্যাম্পটন-বিদ্যালয়ে বই পড়ানও হইত বটে, কিন্তু পুস্তক পাঠ অপেক্ষা অন্যান্য অসংখ্য উপায়েই আমি ওখানে বেশী শিক্ষা লাভ করিয়াছি। দ্বিতীয় বৎসরে আমি শিক্ষকগণের স্বার্থত্যাগ ও চরিত্রবত্তা দেখিয়া বিশেষ উপকৃত হইয়াছিলাম। তাঁহারা নিজের কথা না ভাবিয়া কেবল মাত্র পরের কথাই ভাবিতেন। তাঁহাদের জাতিমর্য্যাদা ছিল, বংশগৌরব ছিল, বিদ্যার সম্মান ছিল; সমাজে যথেষ্ট প্রতিপত্তিও ছিল। তাঁহারা ইচ্ছা করিলে নিজের আর্থিক উন্নতি যথেষ্ট করিতে পারিতেন—সংসারে নূতন নূতন যশোলাভের সুযোগও তাঁহাদের কম ছিল না। কিন্তু তাঁহারা সে সকল দিকে দৃষ্টিপাত করিতেন না—আমাদের অবনত কৃষ্ণকায় সমাজকে বিদ্যায়, ধনে ও ধর্ম্মে উন্নত করিবার জন্য জীবন সমর্পণ করিয়াছিলেন। এই কর্ম্মেই তাঁহাদের একমাত্র সুখ ছিল। দ্বিতীয় বৎসরের বসবাসের ফলে আমি শিখিলাম যে পরোপকারী ব্যক্তিই একমাত্র সুখী। যাঁহারা অন্য লোককে নানা উপায়ে সুখী ও কর্ম্মঠ করিয়া তুলিতেছেন তাঁহাদের অপেক্ষা সুখী লোক সংসারে আর নাই। এই শিক্ষা আমার জীবনে কখনও নষ্ট হইবে না।
হ্যাম্পটনে আমি পশুপক্ষী জীবজন্তু ইত্যাদি সম্বন্ধে খুব ভাল রকম জ্ঞান লাভ করি। এখানকার কৃষিবিভাগের জন্য অতি উত্তম জাতির পশুপক্ষী আমদানি করা হইত। ঐ গুলিকে পালন করিবার ব্যবস্থাও অতি উন্নত ধরণের ছিল। এই সকল কাজে আমরা অভ্যস্ত হইতাম—তাহাতে কৃষিকর্ম্ম, পশুপালন, জীব বিদ্যা, প্রাণি-তত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ে বেশ কার্য্যকরী শিক্ষা হইয়া গিয়াছিল। তাহার ফলে আজ পর্য্যন্ত আমি জীবজন্তুর ভাল মন্দ বাছিয়া লইতে সমর্থ। ছেলে বেলা হইতে ভাল ভাল জানোয়ার এবং তাহাদের গতিবিধি অভ্যাস স্বভাব, খাদ্যাখাদ্য, রোগ ঔষধ ইত্যাদি দেখিবার সুযোগ পাইলে প্রত্যেক লোকই ভবিষ্যতে পাকা ওস্তাদ হইয়া উঠিতে পারে।
দ্বিতীয় বৎসরের সর্ব্বাপেক্ষা প্রধান শিক্ষা হইয়াছিল—বাইবেল গ্রন্থের উপকারিতা। কেবল ধর্ম্মগ্রন্থ হিসাবেই নহে, উৎকৃষ্ট সাহিত্য হিসাবেও বাইবেল বিশেষরূপেই পাঠ করা উচিত—এই ধারণা জন্মিয়াছিল। ফলতঃ, আজকাল কাজের খুব ভিড় থাকিলেও আমি দুই এক অধ্যায় বাইবেল না পড়িয়া দিন যাইতে দিই না।
বাইবেলের উপকারিতা আমি কুমারী লর্ডের শিক্ষকতায় বুঝিতে পারিয়াছিলাম। তাঁহার নিকট আমি আর এক কারণেও ঋণী। আজ কাল আমি বক্তৃতা করিতে মন্দ পারি না—এমন কি, সাহিত্যজগতে আমি বাগ্মী বলিয়াই খ্যাত। এই বক্তৃতা করিবার ক্ষমতা আমাকে কুমারী লর্ডই শিখাইয়াছিলেন। শ্বাস প্রশ্বাসের নিয়ম, উচ্চারণ করিবার রীতি, জোর দিবার ভঙ্গী, দম লইবার কায়দা, ইত্যাদি বক্তৃতা করিবার আনুষঙ্গিক বিষয়গুলি আমি তাঁহার নিকট শিখিয়াছিলাম। এইগুলি শিখিবার জন্য আমি ইহাঁর নিকট বিদ্যালয়ের অবকাশকালে একাকী উপদেশ লইতাম।
আমি অবশ্য বক্তৃতা ও বাচালতার একেবারেই পক্ষপাতী নহি। কেবল ওজস্বিতা বা বাক্যযুদ্ধ ও কথার মারপ্যাচ দেখাইবার জন্য আমি বক্তৃতা অভ্যাস করি নাই—এবং কখনও বক্তৃতা দিই নাই। ছেলেবেলা হইতে আমি পরোপকার কর্ম্মে ব্রতী হইব স্থির করিয়াছিলাম। জগতের বিদ্যাভাণ্ডার ও কর্ম্ম-কেন্দ্রগুলিকে পুষ্ট করিবার জন্য আমার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়াছিল। আমি ভাবিতাম, যদি কোন উপায়ে সংসারের উপকার করিতে পারি তাহা হইলে সে সম্বন্ধে লোকজনকে বুঝানও আবশ্যক হইবে। আমি বুঝিয়াছিলাম,—একটা কোন অনুষ্ঠান আরম্ভ করিয়া তাহা সফল করিতে পারিলে লোকসমাজে তাহার প্রচারের জন্যও ব্যবস্থা করিতে হইবে। এই বুঝিয়া সদনুষ্ঠানের প্রচার, সৎকর্ম্মের বিস্তার এবং সদ্ভাবের প্রসার ইত্যাদি উদ্দেশ্যেই আমি বাগ্মিতার শিক্ষা লইতেছিলাম—ফাঁকা আওয়াজ করিয়া বাহবা লইবার জন্য নহে। আমার মতে “কার্য্য আগে করিব—তাহার পরে তাহা জগৎকে জানাইব”—এই আদর্শেই বাগ্মিগণের জীবন গঠন করা কর্ত্তব্য।
হ্যাম্পটন-বিদ্যালয়ে অনেকগুলি ডিবেটিং ক্লাব বা আলোচনাসমিতি ছিল। প্রতি শনিবার সন্ধ্যাকালে তাহাদের অধিবেশন হইত। এই অধিবেশনগুলির একটাও কখন বাদ দিয়াছি বলিয়া মনে পড়ে না। এদিকে এত ঝোঁক ছিল যে আমি এইগুলির অতিরিক্ত একটা নূতন সমিতিও প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলাম। আমাদের খাওয়া শেষ হইবার পর পড়া আরম্ভ করিবার পূর্ব্বে প্রায় ২০ মিনিট ফাঁক থাকিত। এই সময়টা ছেলেরা সাধারণতঃ গল্প গুজবে কাটাইত। আমার উদ্যোগে ২০।২৫ জন ছাত্র মিলিয়া এই সময়টায় আলোচনা বক্তৃতা ইত্যাদি করিবার জন্য একটা নূতন ব্যবস্থা করিয়া লইয়াছিল।
দ্বিতীয় বৎসরের গ্রীষ্মাবকাশ আসিল। এবার আমার আর্থিক অবস্থা মন্দ ছিল না। আমার মাতা ও দাদা কিছু টাকা পাঠাইয়াছিলেন, একজন শিক্ষকও কিছু দান করিয়াছিলেন। আমি ‘স্বদেশে’ চলিলাম। ওয়েষ্ট ভার্জ্জিনিয়ার ম্যাল্ডেনে এবার ছুটি কাটিল
বাড়ীতে আসিয়াই দেখি, নুনের কল বন্ধ, কয়লার খাদে কাজ চলিতেছে না, কুলীরা সব ‘ধর্ম্মঘট’ করিয়াছে। এই ধর্ম্মঘটের একটা রহস্য বলিতেছি। প্রায়ই দেখিতাম, যখন কুলী মহলের পরিবারে দুই তিন মাসের উপযুক্ত খরচের টাকা জমা হইয়া গিয়াছে তখনই তাহারা কাজ কর্ম্ম ছাড়িয়া মহাজনগণকে বিব্রত করিত। যখনই বসিয়া খাইতে খাইতে টাকা ফুরাইয়া আসিত তখনই আবার তাহারা দলে দলে কাজে ঢুকিত। এইরূপে অনেকে যথেষ্ট দেনাও করিয়া ফেলিত। তখন আর তাহারা তাহাদের পুরাতন অভাব অভিযোগ ইত্যাদির কথা তুলিতই না—কোন উপায়ে একটা কাজ পাইলেই খুসী থাকিত। মোটের উপরে দেখিতাম, যে ধর্ম্মঘটের ফলে কুলীদের সর্ব্বাংশেই ক্ষতি হইত। অনেক সময়ে কল ও খাদের কর্ত্তা তাহাদিগকে পুনরায় কাজ দিতে অস্বীকার করিতেন। তখন তাহারা যথেষ্ট ব্যয় ও কষ্ট স্বীকার করিয়া অন্যত্র চলিয়া যাইতে বাধ্য হইত। আমার যতদূর বিশ্বাস, কতকগুলি হুজুগপ্রিয় পাণ্ডাদিগের পাল্লায় পড়িয়া কুলীরা নিজের সর্ব্বনাশ নিজে ডাকিয়া আনিত। ধর্ম্মঘটের আমি আর কোন ব্যাখ্যা ত পাই না।
আমাকে দেখিয়া আমার পরিবারের সকলেই অবশ্য মহা খুসী। তাহার পর আমার নিমন্ত্রণের পালা পড়িল। পাড়ার প্রত্যেকেই আমাকে তাহাদের বাড়ীতে এক এক দিন খাইতে বলিত। আমি তাহাদিগকে হ্যাম্পটনের গল্প করিতাম। তাহা ছাড়া আমাকে ধর্ম্মমন্দিরে রবিবারের বিদ্যালয়ে এবং আরও কয়েক স্থানে বক্তৃতা করিতেও হইয়াছিল। দিন মন্দ কাটিতেছিল না—কিন্তু ধর্ম্মঘটের ফলে আমার স্বগ্রামে কাজ জুটিল না। তাহা হইলে পুনরায় হ্যাম্পটনে যাইব কি করিয়া? একদিন অনেক দূর পর্য্যন্ত চলিয়া গেলাম তথাপি কাজ পাইলাম না। ফিরিতে বেশী রাত্রি হইয়া পড়ে—রাস্তায় একটা ভাঙ্গা বাড়ীতে শুইয়া থাকিলাম। শেষে দেখি ভোর রাত্রি তিনটার সময় আমার দাদা আমাকে খুঁজিতে খুঁজিতে ঐ ‘পোড়ো’ বাড়ীতে আসিয়া উপস্থিত। আমাকে খবর দিলেন যে, রাত্রে মাতার মৃত্যু হইয়াছে।
মাতার মৃত্যুতে আমি যার পর নাই দুঃখিত হইলাম। তিনি বহু কাল হইতেই ভুগিতেছিলেন জানিতাম—কিন্তু হঠাৎ তাঁহার মৃত্যু হইবে ভাবিতে পারি নাই। আমার সাধ ছিল—অন্তিমকালে আমি তাঁহার সেবা করিব। কিন্তু সে সৌভাগ্যে আমি বঞ্চিত হইলাম। তাঁহার উৎসাহে ও সাহসেই আমি লেখাপড়া শিখিতে পারিয়াছি। তাঁহার অভাব আমার জীবনে একমাত্র দুঃখের কারণ হইল। ইহার পূর্ব্বে আমি কখনও যথার্থ দুঃখ অনুভব করি নাই। তাহার পরেও আমি কখন অন্যান্য দুঃখকে দুঃখ জ্ঞান করি নাই।
মাতার মৃত্যুর পর আমাদের গৃহস্থালী বিশৃঙ্খলতা পূর্ণ হইয়া গেল। ভগ্নীটি ছোট—সে সকল দিক দেখিয়া উঠিতে পারিত না। আমাদের কোন দিন খাওয়া জুটিত কোন দিন জুটিত না। তাহার উপর আবার আমার চাকরী নাই। এই দুঃখের দিনে রাফ্নার পত্নী আমাকে একটা কাজ দিলেন। তাহাতে কিছু পয়সা হইল। তাহার দ্বারা হ্যাম্পটনের পথ খরচের ব্যবস্থা হইয়া গেল। ইতিমধ্যে আমার দাদা একআধটা জামা সংগ্রহ করিয়া আনিলেন।
স্কুল খুলিতে আরও তিন সপ্তাহ বাকী। এমন সময়ে প্রধান শিক্ষয়িত্রী, কুমারী ম্যাকি আমাকে পত্র দ্বারা জানাইলেন যে, আমাকে সপ্তাহ মধ্যেই ফিরিতে হইবে, এবং ফিরিয়া বাড়ীঘর পরিষ্কার করিয়া রাখিতে হইরে। এই পত্র পাইয়া আমি যার পর নাই সন্তুষ্ট হইলাম। কারণ ইহাতে যে বেতন পাওয়া যাইবে তাহার দ্বারা স্কুলের খরচ অগ্রিম কিছু দেওয়া হইয়া থাকিবে। আমি দেরী না করিয়া হ্যাম্পটনে রওনা হইলাম।
পৌঁছিয়াই দেখি ইয়াঙ্কি রমণী নিজেই দরজা জানালা বেঞ্চ টেবিল ইত্যাদি পরিষ্কার করিতে আরম্ভ করিয়াছেন। তাঁহার কাজ কর্ম্ম দেখিয়া আমি দুইটি শিক্ষা লাভ করিলাম। প্রথমতঃ অতি সম্ভ্রান্ত বংশীয়া এবং উচ্চ শিক্ষিতা রমণীরাও দাসদাসীর ন্যায় শারীরিক পরিশ্রম করিতে কুণ্ঠিত নহেন। দ্বিতীয়তঃ, কোন প্রতিষ্ঠানের কর্ত্তা হওয়া মুখের কথা নয়। তাহার জন্য দায়িত্ব যথেষ্ট। কুমারী ম্যাকির দায়িত্ব জ্ঞান খুব বেশী ছিল। তিনি জানিতেন যে, ছুটির পর স্কুল খুলিবার সময়ে কোন বিষয়ে শৃঙ্খলা না থাকিলে তিনিই নিন্দিত হইবেন। সুতরাং তিনি সমস্ত ছুটিটা নিশ্চিন্তভাবে ভোগ করিতে পারেন না। অন্যান্য সকলে আসিয়া পৌঁছিবার পূর্ব্বে সকল ব্যবস্থা তাঁহাকেই করিয়া রাখিতে হইবে। কর্ত্তার ঝুঁকি তিনি বেশ ভালরকম বুঝিয়াছিলেন।
তখন হইতে আমি নেতার কর্ত্তব্য এবং নেতৃত্বের যোগ্যতা সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করি। দায়িত্ববোধহীন পরিচালককে আমি কোন সম্মান করি না। তাহা ছাড়া, যে বিদ্যালয়ে ছাত্রদিগকে শারীরিক পরিশ্রম শিক্ষা দেওয়া হয় না আমি তাহার প্রশংসা করিতে পারি না। ধনবান্ নির্ধন, উচ্চ, নীচ—সকলেরই হাতে পায়ে খাটিয়া কাজ করিতে শিক্ষা করা কর্ত্তব্য। প্রত্যেক বিদ্যালয়ে শারীরিক পরিশ্রম অভ্যাস করাইবার ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক। ম্যাকির দৃষ্টান্তে আমার এই ধারণা বদ্ধমূল হইয়াছিল।
হ্যাম্পটনে এবার আমার শেষ বৎসর। খুব বেশী খাটিয়া লেখা পড়া করিতে হইল। আমি ‘অনার’-পাশ করিলাম। এই পাশ বেশী গৌরবসূচক বিবেচিত হইত। ১৮৭৫ সালের জুন মাসে—অর্থাৎ প্রায় ১৬/১৭ বৎসর বয়সে আমি হ্যাম্পটন-বিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপ্ত করিলাম। আমার এই তিন বৎসরের শিক্ষার ফল নিম্নে বিবৃত করিতেছি:—
(১) প্রথমতঃ, আমি একজন প্রকৃত মানুষের মত মানুষের দর্শন পাইয়া তাঁহার প্রভাবে জীবন গঠন করিতে শিথিয়াছি। তাঁহার নাম সেনাপতি আর্মষ্ট্রঙ্গ। আমি পুনরায় বলিতেছি তিনি আমার চিন্তারাজ্যের ‘একমেবাদ্বিতীয়ম্' মহাবীর। তাঁহার ন্যায় সাধুপুরুষ আর আমি দেখি নাই।
(২) দ্বিতীয়তঃ, আমি বিদ্যালাভের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে নূতন ধারণা অর্জ্জন করিলাম। লোকে লেখাপড়া শিখে কেন? পূর্ব্বে নিগ্রোসমাজের সাধারণ লোকজনের কথাবার্ত্তা ও চালচলন দেখিয়া ধারণা জন্মিয়াছিল যে, শারীরিক পরিশ্রম হইতে মুক্তি পাইবার জন্য বিদ্যা শিক্ষা করিতে হয়। এবং লেখাপড়া শিখিয়া মানুষ বেশ সুখে স্বচ্ছন্দে বাবুগিরি করিয়া কাল কাটাইতে পারে। হ্যাম্পটনে আমার দিব্যজ্ঞান লাভ হইল। ওখানকার আব্হাওয়াতে হাতে পায়ে কাজ করা, খাটিয়া খাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম করা ইত্যাদি কার্য্য প্রত্যেক শিক্ষিত লোকের স্বাভাবিক ধর্ম্মের মধ্যেই পরিগণিত হইত। নিষ্কর্মা মানুষ কাহাকে বলে সেই বিদ্যালয়ের চতুঃসীমার মধ্যে জানিতে পারিতাম না। ছাত্র, শিক্ষক সকলেই পরিশ্রম করিতে ভাল বাসিতেন এবং পরিশ্রমী-লোককে সম্মান করিতেন। পরিশ্রম না করাটাই সেখানে একটা নিন্দনীয় ও গর্হিত কার্য্য ছিল এবং অশিক্ষিত লোকের লক্ষণ বিবেচিত হইত। কাজকর্ম্ম করিলে পয়সা পাওয়া যায়, অন্নের ব্যবস্থা হয়, আর্থিক দৈন্য ঘুচে, সংসার পালন নিরুদ্বেগে করা যায়। এ সকল কথা আমাদের ওখানে সকলেই বুঝিত। এই বুঝিয়া আমরা খাটিতাম–সন্দেহ নাই। কেবল তাহাই নহে, আমরা স্বাবলম্বী ও আত্মনির্ভর হইবার জন্যই এখানে নিজে খাটিতে শিখিতাম। কোন বিষয়ে পরের অধীন থাকিব না, নিজের সকল অভাব নিজেই মোচন করিয়া লইব—এই আদর্শেই আমরা শারীরিক পরিশ্রমকে আদর করিতে শিখিয়াছিলাম। ফলতঃ খাটিয়া খাওয়া এবং শিক্ষালাভে কোন বিরোধ নাই—এই জ্ঞান আমার হৃদয়ে বদ্ধমূল হইয়া গেল।
(৩) তৃতীয়তঃ স্বার্থত্যাগ ও পরোপকারের শিক্ষা আমি হ্যাম্পটনেই প্রথম পাই। ওখানেই শিখি, যাঁহারা নিজ উন্নতির আকাঙ্ক্ষা খর্ব্ব করিয়া অপরের উন্নতির পথ পরিষ্কার করিবার জন্য জীবন উৎসর্গ করেন সংসারে একমাত্র তাঁহারাই সুখী। পরোপকার ও লোকসেবা করিতে পারাই মানব জীবনের একমাত্র সুখ।
আমি হ্যাম্পটনের গ্রাজুয়েট হইলাম সার্টিফিকেটও পাইলাম। ইতিমধ্যে পয়সা ফুরাইয়া আসিয়াছে। একটা হোটেলে চাকরী সংগ্রহ করিলাম। কলেষ্টিকাট প্রদেশের একজনের নিকট কিছু ধার করিয়া পথ খরচের ব্যবস্থা করা গেল। যথা সময়ে সেই চাকরী স্থলে উপস্থিত হইলাম।
আমার বিদ্যা বুদ্ধি দেখিয়া হোটেলের কর্ত্তা আমাকে পরিবেষণের ভার দিয়াছিলেন, কিন্তু ও বিষয়ে আমার কিছুমাত্র জ্ঞান ছিল না। কয়েকজন বড়লোক টেবিলে খাইতে বসিয়াছেন। আমি পরিবেষণের নিয়ম জানি না দেখিয়া তাঁহারা আমাকে মারিতে উঠিলেন। আমি ভয়ে কাজ ছাড়িয়া দিলাম। তাঁহারা খাদ্যদ্রব্য আর পাইলেন না। এই ঘটনার পর আমাকে নিম্ন শ্রেণীর খান্সামার কাজ করিতে হইল। পরে পরিবেষণের কাজ শিখিয়া লইলাম। আবার সেই উচ্চ পদে উন্নীত হইয়াছিলাম।
যে হোটেলে আমি এই সময়ে খান্সামাগিরি করিতেছিলাম, এই হোটেলেই আমি ভবিষ্যতে পয়সা খরচ করিয়া অতিথিভাবে বাস করিয়া গিয়াছি। সংসারে এইরূপ পরিবর্ত্তন অহরহ ঘটিতেছে।
হোটেলের কাজ ছাড়িয়া আমার স্বদেশ ম্যাল্ডেন-নগরে ফিরিয়া গেলাম। তখন হইতে আমি আমাদের সেই নিগ্রো-বিদ্যালয়ের জন্য শিক্ষক নিযুক্ত হইলাম। আমার সুখের দিন আরম্ভ হইল—কারণ এতদিনে আমি নিগ্রোজাতির জন্য কর্ম্ম করিতে উপযুক্ত বিবেচিত হইয়াছি। এতদিন পরে আমার পল্লীবাসীদিগকে উন্নত করিবার সুযোগ পাইলাম।
প্রথম হইতেই বুঝিলাম যে নিগ্রোসমাজে কেবল পুঁথিগত বিদ্যা প্রচার করিলে আমাদের প্রকৃত উপকার সাধিত হইবে না। কতকগুলি পুস্তক পড়িতে শিখিলেই নিগ্রোরা মানুষ হইবে না। তাহাদের সমস্ত জীবনটা নূতন ভাবে গঠন করা আবশ্যক। আমি সকাল ৮টা হইতে রাত্রি ১০টা পর্য্যন্ত খাটিতে লাগিলাম। স্কুলে পড়ান ছাড়া পল্লী ভ্রমণ এবং গ্রাম পরিদর্শন আমার কাজের মধ্যে ছিল। আমি ছাত্রদের বাড়ীতে বাড়ীতে যাইতাম। তাহাদিগকে চুল পরিষ্কার রাখিতে শিখাইতাম, দাঁত মাজিতে বলিতাম। তাহারা স্নান করিতে, পোষাক ধুইতে এবং অন্যান্য নানা কাজ করিতেও উপদেশ পাইত। নিজ হাতে তাহাদের অনেক কাজ করিয়া দিতাম। এই সকল কাজের উপকারিতাও বুঝাইয়া দিতাম। নিগ্রো-পল্লীতে এই উপায়ে স্বাস্থ্যরক্ষার এবং শরীর পালনের সরল উপায় গুলি সহজেই প্রচারিত হইতে লাগিল। স্নান করা ও দাঁত মাজার প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে আমি সর্ব্বদাই বক্তৃতা করিতাম। যে দিন হইতে নিগ্রোরা দাঁত মাজা আরম্ভ করিল সেই দিন হইতে তাহারা যথার্থ সভ্যতার প্রথম স্তরে পদার্পণ করিল বলিতে পারি।
গ্রামের অনেক লোকেই স্ত্রী-পুরুষ সকলেই লেখা পড়া শিখিতে চাহিল। কিন্তু তাহারা দিবা ভাগে খাটিয়া অন্ন সংস্থান করে। কাজেই তাহাদের জন্য নৈশ বিদ্যালয় খুলিলাম। প্রথম হইতেই নৈশ বিদ্যালয়ে ছাত্র সংখ্যা খুব বেশী হইত। ৫০ বৎসরের বেশী বয়স্ক পুরুষ ও স্ত্রীলোকদিগের শিখিবার অধ্যবসায় দেখিয়া আশ্চর্য্য হইতাম।
পল্লীসেবার অন্যান্য অনুষ্ঠানও আমি এই সঙ্গে আরম্ভ করিলাম। গ্রামের মধ্যে একটা গ্রন্থশালা এবং একটা আলোচনাসমিতি প্রতিষ্ঠিত করিলাম। রবিবারের জন্য কয়েকটা নূতন কাজ নির্দ্দিষ্ট করিয়া রাখিয়া ছিলাম। ম্যালডেন-নগরে একটা রবিবারের বিদ্যালয় ছিল—এবং এখান হইতে তিন মাইল দূরে আর একটা রবিবারের বিদ্যালয় ছিল। প্রতি রবিবারে এই দুইটি স্কুলেই আমি পড়াইতাম। এতদ্ব্যতীত, আমি কয়েকজন যুবককে ঘরে পড়াইয়া হ্যাম্পটনে পাঠাইবার ব্যবস্থা করিতেছিলাম এই সকল কার্য্যের জন্য অবশ্য বিদ্যালয়ের তহবিল হইতে সামান্য কিছু বেতন পাইতাম। কিন্তু বেতনের লোভেই আমি ম্যাল্ডেনে খাটিতাম না। নিগ্রো সমাজের উন্নতির জন্য আমার আন্তরিক ব্যাকুলতাই আমার এই কর্ম্মতৎপরতার কারণ ছিল।
আমি যতদিন লেখা পড়া শিখিতেছিলাম, ততদিন আমার দাদা ‘জন’ আমাদের পরিবারের খরচ চালাইবার জন্য কয়লার খাদে কাজ করিয়াছেন। মাঝে মাঝে আমি তাঁহার নিকট অর্থ সাহায্যও পাইয়াছি। আমার শিক্ষা লাভের জন্য তিনি নিজের বিদ্যার্জ্জনের ইচ্ছা ত্যাগ করিয়াছিলেন। কাজেই আমি হ্যাম্পটন হইতে ফিরিয়া আসিয়া জনকে হ্যাম্পটনে পাঠাইতে কৃতসঙ্কল্প হইলাম। তিন বৎসরে তিনিও হ্যাম্পটনের বিদ্যা শেষ করিয়া আসিলেন। পরে তিনি আমার টাস্কেজী বিদ্যালয়ের শিল্প বিভাগের কর্ত্তা হইয়াছেন। জন যখন হ্যাম্পটন হইতে আসিলেন তখন আমরা দুই জনে মিলিয়া আমাদের পোষ্য ভাই জেম্স্কে হ্যাম্পটনে পাঠাইয়া ছিলাম। জেম্স্ও লেখা পড়া শিখিয়া আমার টাস্কেজী বিদ্যালয়ের ডাক ঘরের কর্ত্তা হইয়াছে।
১৮৭৬।১৮৭৭ সাল ম্যাল্ডেনে একরূপেই কাটিল। স্কুল পড়ান, পল্লীপর্য্যবেক্ষণ, লোকশিক্ষা ইত্যাদি নানাবিধ কাজে আমার সময় ব্যয় হইত। প্রায় এই সময়ে আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গ মহলে কয়েকটা সমিতি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। তাহারা নিগ্রোজাতির রাষ্ট্রীয় অধিকারলাভের আকাঙ্ক্ষায় বাধা দিবার জন্য বদ্ধপরিকর হইল। এই সমিতিগুলির নাম ছিল ‘কু ক্লুক্স’। গোলামীর যুগে এইরূপ কতকগুলি শ্বেতাঙ্গ সমিতি ছিল। তাহারা রাত্রিকালে নিগ্রোদিগের মহলে মহলে ঘুরিয়া পাহারা দিত। নিগ্রোরা কোন গুপ্ত পরামর্শ প্রভৃতি করিতেছে কি না ইহারা তাহার সন্ধান রাখিত। তাহাদের ন্যায় এই “কুক্লক্স”-সমিতিগুলিও রাত্রিকালে আমাদের উপর ডিটেকটিভের কাজ করিত। তাহারা আমাদের কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় উন্নতির বিরোধী ছিল তাহা নহে। তাহাদের দৌরাত্ম্যে আমাদের ধর্ম্মমন্দির, বিদ্যামন্দিরও টিকিতে পারিত না। তাহারা আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠানগৃহ পুড়াইয়া দিয়াছিল। আমাদের কোন কর্ম্ম কেন্দ্রই ইহাদের আমলে নিরাপদ ছিল না। বহু নিগ্রোর জীবনও নষ্ট হইয়াছিল। এই সূত্রে ম্যাল্ডেনে একবার একটা ছোট খাট লড়াই বাধিয়া যায়। সাদা চামড়া এবং কাল চামড়া উভয় পক্ষের লোক সর্ব্বসমেত প্রায় ২০০।২৫০ মিলিয়া মহা দাঙ্গা বাধাইয়া দিল। অনেক ভাল ভাল লোক আহত হইয়া পড়েন। আমার পূর্ব্বতন মনিব জেনারেল রাফ্নার নিগ্রোদিগের পক্ষ লইয়া প্রতিবাদ করিতে গিয়াছিলেন। এজন্য শ্বেতাঙ্গ কুক্লক্স সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁহাকে এমন জখম করিয়া দিয়াছিল যে তিনি আর সারিয়া উঠিলেন না। নিগ্রোসমাজের জন্য এই সহৃদয় শ্বেতাঙ্গ পুরুষের প্রাণ গেল।
কুক্লক্সদিগের যুগ চলিয়া গিয়াছে। আর দক্ষিণ প্রান্তের শ্বেতাঙ্গ এবং কৃষ্ণাঙ্গ সমাজে সদ্ভাব বাড়িয়াছে।
পঞ্চম অধ্যায়
‘যুক্ত-রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার যুগ
১৮৬৭ খৃষ্টাব্দে অর্থাৎ আমার ৮৯ বৎসর বয়সে আমেরিকার উত্তর দক্ষিণ প্রান্তে সন্ধি হয়। তাহার ফলে গোলামের জাতিকে স্বাধীন করিয়া দেওয়া হয়। তাহার পর হইতে ১৮৭৮ সাল পর্য্যন্ত দুই প্রান্তের শ্বেতকায় মহলে নানা বিষয়ে বুঝাপড়া চলিতে লাগিল। রাষ্ট্রশাসন সম্বন্ধে দুই অঞ্চলের লোকেরা মিলিয়া একটা রফা করিয়া লইলেন। যথার্থ ঐক্যবিশিষ্ট যুক্ত-রাষ্ট্র এই সময়ের মধ্যেই গড়িয়া উঠে। এই ১০।১১ বৎসর আমার ব্যক্তিগত জীবনের পক্ষেও অতি মূল্যবান সময়। কারণ এই সময়ের মধ্যে আমি আমার বাল্যজীবন অতিবাহিত করিয়া মানুষ হইবার পথে অনেক দূর অগ্রসর হইয়াছি। গোলামাবাদের আবহাওয়া ছাড়িয়া নব নব দুঃখ দারিদ্র্যের সংসারে বাড়িয়া উঠিয়াছি। হ্যাম্পটনে লেখা পড়া শিখিবার জন্য কঠোর সংগ্রাম করিতে হইয়াছে। তাহার পরে ম্যাল্ডেনে পরোপকার ও শিক্ষাপ্রচার কর্ম্মে ব্রতী হইয়াছি।
এই যুগ স্বাধীনতাপ্রাপ্ত নিগ্রোজাতির ইতিহাসেও স্মরণীয় কাল। ইহাকে তাহাদের নবজীবনের শৈশব কাল বলিতে পারি। এই সময়ের মধ্যে তাহাদের হৃদয়ে নব নব আশা জাগিয়াছে তাহারা নূতন চোখে পৃথিবী দেখিতে আরম্ভ করিয়াছে। তাহাদের চিত্তে প্রথম হইতেই দুইটি ইচ্ছা স্থায়ী ঘর করিয়া বসিল। প্রথমতঃ গ্রীক ও ল্যাটিন শিখিবার জন্য তাহারা অত্যধিক লালায়িত হইল। দ্বিতীয়তঃ লেখাপড়া শিখিয়া সরকারের চাকরী পাইবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিতে লাগিল।
বলাই বাহুল্য, যুগযুগান্তর ধরিয়া যাহারা গোলামী করিয়াছে তাহাদের পক্ষে বিদ্যালাভের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝা সহজ নয়। দক্ষিণ অঞ্চলের প্রত্যেক গ্রামেই অবশ্য অসংখ্য পাঠশালা খোলা হইতে লাগিল। দিবা-বিদ্যালয়, নৈশ-বিদ্যালয়, রবিবারের বিদ্যালয়, বালিকা বিদ্যালয় ইত্যাদি নানাবিধ বিদ্যালয়ে নিগ্রোসমাজ ভরিয়া গেল। স্কুলগুলি ছাত্র ছাত্রীতে পূর্ণ থাকিত। ৬০।৭০।৮০ বৎসর বয়সের বৃদ্ধেরাও লেখাপড়া শিখিতে ছাড়িল না। শিক্ষা লাভের জন্য এত আগ্রহ দেখিয়া কাহার না আনন্দ হয়? কিন্তু একটা আশ্চর্য্যের কথা এই যে নিগ্রোমাত্রেই ভাবিতে লাগিল যে, আর তাহাদের হাতে পায়ে খাটিতে হইবে না, লেখা পড়া শিখিয়া তাহারা আফিসের কেরাণী অথবা বড় সাহেব হইতে পারিবে। মাথায় তাহাদের আর একটা খেয়াল ঢুকিল যে, গ্রীক ল্যাটিন ভাষায় দুই চারিটা বুকুনি না দিতে পারিলে পণ্ডিত হওয়া যায় না। এই সকল ভাষায় যাহারা কথা বলিতে পারে, তাহারা না জানি কোন্ অপূর্ব্ব জগতের লোক! এমন কি, আমারও এইরূপই অনেক সময়ে মনে হইত।
লেখা পড়া শিথিয়া আমার স্বজাতিরা কেহ শিক্ষক, কেহ ধর্ম্মপ্রচারক হইতে লাগিলেন। কৃষিকর্ম্ম, শিল্প, ব্যবসায়, পশুপালন ইত্যাদি কার্য্যে মজুরের ন্যায় খাটিতে হয়। সুতরাং যথাসম্ভব সকলেই এই সকল কার্য্য বর্জ্জন করিতে প্রয়াসী হইল। বিদ্যাদানকেই জীবনের ব্রতস্বরূপ গ্রহণ করিতে অবশ্য খুব কম লোকই পারিত। প্রকৃত ভক্তভাবে ধর্ম্মগুরুর দায়িত্ব গ্রহণ করাও অনেকের পক্ষে অসম্ভব ছিল। তাহারা সহজে বিনা পরিশ্রমে বাবুগিরি করিয়া জীবন কাটাইবার জন্যই এই দুই দিকে ঝুঁকিয়া ছিল। যাহারা পণ্ডিতি করিতে চাহিত তাহাদের পেটে অনেক সময়ে তিল মাত্র বিদ্যা থাকিত কি না সন্দেহ। কেহ কেহ কোন উপায়ে নাম সহি করিতে শিখিয়াই মাষ্টারী খুঁজিত। আমার মনে আছে একবার এক ব্যক্তি একটা পাঠশালার চাকুরী চাহিতেছিল। তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইল,, “বল ত পৃথিবীর আকার কিরূপ? তুমি ছেলেদিগকে এ বিষয় কিরূপে বুঝাইবে?” সে তৎক্ষণাৎ উত্তর করিল, “কেন মহাশয়, পৃথিবী গোলাকার বা চ্যাপ্টা এ সব জানিয়া আমার প্রয়োজন কি? স্কুলের কর্ত্তাদের ও সম্বন্ধে যাহা মত আমি তাহাই ছাত্রদিগকে শিখাইতে প্রস্তুত আছি।”
এই গেল গুরুমহাশয়দিগের অবস্থা। ধর্ম্মপ্রচারকগণের অবস্থা আরও শোচনীয়। অত নিরেট মূর্খ ও কুসংস্কারপূর্ণ এবং চরিত্রহীন লোক বোধ হয় অন্য কোন ব্যবসায়ে দেখা যায় না। যোগ্যতা থাকুক বা না থাকুক সকলেই মনে করিত, “আমি ভগবান কর্ত্তৃক আদিষ্ট হইয়াছি।” ধর্ম্ম প্রচার বিষয়ে ‘আদেশ’ বহু লোকেই পাইতে লাগিল! দুই তিন দিন স্কুলে আসিবার পর দেখিতাম ছাত্রেরা চলিয়া যাইতেছে। অনুসন্ধান করিলে বুঝা যাইত—তাহারা ‘আদেশ’ পাইয়া ধর্ম্মগুরুর কার্য্যে ব্রতী হইয়াছে। এই ‘আদেশ’ পাওয়া ব্যাপারটা বড়ই রহস্যজনক। গির্জাঘরে লোকজন বসিয়া আছে এমন সময়ে একব্যক্তি হঠাৎ মেজের উপর পড়িয়া যাইত। বহুক্ষণ নিষ্পন্দ অসাড় ও বাক্শক্তিহীন অবস্থায় থাকিত। অমনি পাড়ায় সাড়া পড়িয়া যাইত, অমুক ব্যক্তির ‘আদেশ’ হইয়াছে। তাহার পর হইতেই সে ধর্ম্মগুরু! এইরূপ ‘দশায়’ পড়া প্রায় প্রত্যেক নিগ্রোপল্লীতে প্রতি সপ্তাহেই দুই চারিটা ঘটিত। আমি এই ‘দশায়’ পড়া ব্যাপারটাকে বুজরুকি মনে করিতাম। আমার ভয় হইত পাছে আমিও বা কোন দিন দশায় পড়িয়া ভগবানের আদেশ পাইয়া বসি। আমার সৌভাগ্য আমি সেরূপ আদেশ পাইবার অবস্থা কাটাইয়া উঠিয়াছি।
সমাজে ধর্ম্মগুরুর সংখ্যা যারপরনাই বাড়িতে থাকিল। একটা ধর্ম্মমন্দিরের কথা আমার মনে আছে—তাহার অন্তর্গত খৃষ্টধর্ম্মাবলম্বী লোক সংখ্যাই ছিল সর্ব্বসমেত ২০০ জন মাত্র। অথচ তাহার ধর্ম্মপ্রচারক সংখ্যাই প্রায় ২০। আজকাল নিগ্রোসমাজে ধর্ম্মের অবস্থা অনেকটা উন্নত হইয়াছে। দক্ষিণ অঞ্চলের কৃষ্ণাঙ্গ জাতি যথেষ্ট নৈতিক শক্তি লাভ করিতেছে। ‘দশায়’ পড়া এবং ‘আদেশ’ পাওয়ার হুজুগ অনেক কমিয়া আসিয়াছে। আর ৩০।৪০ বৎসর পরে আমাদের আরও উন্নতি হইবে আশা করিতেছি।
এখন ধর্ম্ম প্রচারের ব্যবসায়ে না লাগিয়া কৃষিকার্য্যে শিল্পকর্ম্মে ও পশুপালনে নিগ্রোরা মনোনিবেশ করিতে উৎসাহী হইতেছে। ইহা সুলক্ষণ। প্রকৃত চরিত্রবান্ সুশিক্ষিত ব্যক্তিগণ ধর্ম্মমন্দিরের কার্য্যে প্রবৃত্ত হইতেছেন। শিক্ষক-সমাজেও যোগ্য শিক্ষাপ্রচারকের সংখ্যা দিন দিন বাড়িতেছে।
পূর্ব্বেই বলিয়াছি ১৮৬৭ হইতে ১৮৭৮ সাল পর্য্যন্ত উত্তরে দক্ষিণে এক হইয়া জমাট বাঁধিতেছিল—প্রকৃত যুক্ত-রাষ্ট্র গড়িয়া উঠিতেছিল। এই যুক্তরাষ্ট্রের শাসনবিচার-বিষয়ক সর্ব্ব প্রধান কর্ত্তৃপক্ষের নাম “ফেডারেল সরকার” বা ‘যুক্ত দরবার’। এই যুক্ত দরবারের নায়কতায়ই আমেরিকার গৃহবিবাদ শীঘ্র শীঘ্র ঘুচিয়া গিয়াছে। এই ফেডারেল সরকারের চেষ্টায়ই গোলামের জাতি স্বাধীনতা পাইয়াছে। এই ফেডারেল সরকারই এখন যুক্তরাষ্ট্রের নূতন শাসন-প্রণালী, নূতন বিচারপ্রণালী, ইত্যাদির ব্যবস্থা করিয়া নবীন রাষ্ট্রগঠনে বিশেষ উদ্যোগী।
সুতরাং নিগ্রোরা এই যুক্ত দরবারের নিকট সকল অভাব অভিযোগের মীমাংসা আশা করিতে লাগিল। তাহারা ভাবিত যে ২০০ বৎসর নিগ্রোজাতি গোলামী করিয়া আমেরিকার ধন সম্পদবৃদ্ধির কারণ হইয়াছে। গোলামগণের রক্তেই যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বল, শিল্প বল, ব্যবসায় বল সকলই পরিপুষ্ট হইয়াছে। নিগ্রোজাতিই যুক্তরাজ্যের সকলপ্রকার ঐশ্বর্য্য, সকল প্রকার সুখভোগ, সকলপ্রকার প্রতিষ্ঠা লাভের মূল কারণ। নিগ্রোজাতিকে কেনা গোলাম করিয়া না রাখিলে আমেরিকার সভ্যতা গড়িয়া উঠিতে পারিত না। আজ তাহারা নিগ্রোজাতিকে স্বাধীনতা দিয়াছে সত্য। কিন্তু ইহা নিগ্রোজাতির দুইশতবর্ষব্যাপী কঠোর পরিশ্রম স্বীকারের মূল্য ছাড়া আর কিছুই নয়। এখনও তাহারা যুক্তরাষ্ট্রের নিকট অনেক দাবী করিতে অধিকারী। কেবল আব্দার মাত্র নয়, জননীর নিকট বালকের ক্রন্দন ও প্রার্থনা মাত্র নয়, প্রভুর নিকট ভিক্ষা চাওয়া নয়, নিগ্রোজাতি যুক্তদরবারের নিকট তাহাদের ন্যায্য অধিকারের দাবী করিতেছে—তাহারা এইরূপই ভাবিত। আমিও অনেক সময়ে ভাবিয়াছি—যুক্তদরবার আমাদিগকে স্বাধীন করিয়াই ক্ষান্ত হইলেন কেন? আমাদের প্রতি এই দরবারের কর্ত্তব্য, ইয়াঙ্কিজাতির কর্ত্তব্য, সমগ্র শ্বেতাঙ্গ সমাজের কর্ত্তব্য এই টুকুতেই কি শেষ হইয়া গেল—এই সামান্য কর্ম্মেই কি তাহারা আমাদের ঋণ শোধ করিয়া ফেলিল? আমি ভাবিতাম, যুক্তদরবারের আমাদিগকে স্বাধীন করিবার সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রীয় অধিকার ভোগের উপযুক্ত করিয়া তুলিবার ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। এজন্য আমাদিগের সমাজে শিক্ষাবিস্তারের আয়োজন করাও তাহার কর্ত্তব্য ছিল।
এইখানে আর একটা কথা বলিয়া রাখি। যুক্তরাষ্ট্রের শাসনবিচারাদি কার্য্য দুই দরবারে নিম্পন্ন হয়। কতকগুলি কার্য্য প্রত্যেক প্রদেশের দরবারই স্বাধীনভাবে নিজ নিজ প্রণালীতে সম্পন্ন করিয়া থাকে। প্রাদেশিক রাষ্ট্রের দরবারগুলি ঐ সকল বিষয়ে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করে। আর কতকগুলি কার্য্য আছে যাহার উপর প্রাদেশিক রাষ্ট্রের হাত নাই, সে গুলিকে প্রাদেশিক দরবার নিয়ন্ত্রি করিতে অনধিকারী। এই সব কার্য্য গুলিকে আমেরিকায় ‘জাতীয়’ বা ‘সার্ব্বপ্রাদেশিক’ নামে চিহ্নিত করা আছে। এই সমুদয় কার্য্যনির্ব্বাহের ভার ‘ফেডারেল সরকার’ বা যুক্তদরবারের উপর ন্যস্ত। যুক্তদরবার প্রাদেশিক রাষ্ট্রগুলির মত লইয়া একটা নূতন বিধি-ব্যবস্থা করিয়াছেন। সেই ব্যবস্থাকে “জাতীয়” বিধান বলা হইয়া থাকে।
আমি বলিতে চাহি নিগ্রোসমস্যা আমেরিকার অন্যতম “জাতীয়” সমস্যা—প্রাদেশিক সমস্যা মাত্র নহে। প্রাদেশিক রাষ্ট্রের হাতে নিগ্রোজাতির ভাগ্য রাখিয়া দেওয়া উচিত নয়। নিগ্রোজাতি এত দিন যে পরিশ্রম করিয়াছে তাহার ফলে সমগ্র শ্বেতাঙ্গজাতিই লাভবান্ হইয়াছেন—আমেরিকার সকল প্রদেশেই তাহার সুফল ফলিয়াছে। সুতরাং নিগ্রোজাতিকে মানুষ করিবার জন্য প্রাদেশিক দরবারগুলিকে উপদেশ দিয়াই যুক্তদরবারের নিশ্চিন্ত থাকা উচিত হয় নাই। প্রদেশিক দরবারগুলি আমাদের জন্য যাহা করিতেছেন করুন। কিন্তু আমেরিকার ‘জাতীয় বিধান’ হইতেও আমরা ন্যায়তঃ ও ধর্ম্মতঃ অনেক আশা করিতে পারি।
যুক্তদরবার আমাদিগের স্থাবর সম্পত্তি লাভ সম্বন্ধে সাহায্য করিতে পারিতেন। যুক্তদরবার আমাদের শিক্ষার জন্য “জাতীয়” কোষাগার হইতে বার্ষিক কিছু প্রদানের ব্যবস্থা করিতে পারিতেন। যুক্তদরবার আমাদিগকে রাষ্ট্রীয় অধিকারভোগের জন্য যথাবিধি উপযুক্ত করিয়া লইবার চেষ্টা করিতে পারিতেন। যুক্তদরবার সাদা কাল চামড়ার প্রভেদ ধীরে ধীরে তুলিয়া দিবার জন্য অবস্থানুসারে ব্যবস্থা করিতে পারিতেন। আমাদিগকে স্বাধীনতা দিবার পরক্ষণ হইতেই এই সকল সমস্যা যুক্তরাষ্ট্রে উঠিবে তাহা ফেডারেল সরকারের জানা উচিত ছিল। তাহা জানিয়া প্রথম হইতেই আমাদিগের ভবিষ্যতের জন্য কিছু কিছু কর্ম্ম করাও উচিত ছিল। কিন্তু যুক্তদরবার বেশী কিছু করিলেন না।
আমার স্বজাতিরা অবশ্য আশা করিতে ছাড়িল না। আমরা প্রাদেশিক রাষ্ট্রের নিকট যাহাই পাই না কেন, যুক্ত-দরবারের নিকটও আমরা সকল বিষয়েই সুবিচার এবং ন্যায়সঙ্গত অনুশাসন আশা করিতে লাগিলাম। আমার বয়স তখন বেশী নয়—প্রায় ২০।২১ বৎসর হইয়াছে। তখনই বুঝিতে পারিয়াছিলাম যুক্তরাষ্ট্রে যে নূতন “জাতীয় বিধান” প্রস্তুত করা হইতেছে তাহাতে নিগ্রোজাতি সম্বন্ধে ন্যায্য বিচার করা হয় নাই। নিগ্রোসমস্যা কর্ত্তৃপক্ষেরা যথাযথ বুঝিতে পারেন নাই অথবা পারিয়াও তাহার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা করেন নাই।
সহজে দুইটি জিনিষ লক্ষ্য করিতে পারিয়াছিলাম। প্রথমতঃ আমরা অশিক্ষিত এই আপত্তি তুলিয়া তাঁহারা সকল কাজকর্ম্মে আমাদিগকে ছাড়িয়া শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিগণকে নিযুক্ত করিতেন। দ্বিতীয়তঃ উত্তরপ্রান্তের শ্বেতাঙ্গেরা দক্ষিণপ্রান্তের শ্বেতাঙ্গদিগকে অপমান ও যন্ত্রণা দিবার জন্য তাহাঁদের উপর ‘কাল আদমী’ চাপাইতে চেষ্টা করিত। আমি দেখিলাম দুই দিকেই অন্যায় হইতেছে। আমি বুঝিলাম এ ব্যবস্থা বেশী দিন টিকিবে না। শীঘ্রই উহার পরিবর্ত্তন অবশ্যম্ভাবী।
জোর করিয়া আমাদিগকে দক্ষিণপ্রান্তের শ্বেতাঙ্গমহলে কর্ত্তামি করিতে দিলে আমাদের বর্ত্তমান অহঙ্কার বাড়িতে পারে কিন্তু ভবিষ্যতের পক্ষে আমাদের সমূহ ক্ষতি। কারণ এই লোভে পড়িয়া আমরা আমাদের যথার্থ উন্নতির ভিত্তি প্রতিষ্ঠা হইতে দূরে সরিয়া পড়িতে পারি আশঙ্কা আছে।
কৃষি শিল্প ও ব্যবসায়ে লাভবান্ হইয়া সম্পত্তির মালিক না হইলে কখনও কি প্রকৃত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ভোগ করা যায়? না রাষ্ট্রজীবনে প্রভাব বিস্তার করা যায়? টাকা পয়সা গৃহ-সম্পত্তি ইত্যাদির অধিকারী হইবার জন্য চেষ্টা করাই তখন আমাদের সর্ব্বপ্রধান কর্ত্তব্য ছিল। অধিকন্তু লেখা পড়া না শিখিলেই বা রাষ্ট্রীয় জীবনের কর্ত্তব্য পালন করিব কি করিয়া? রাষ্ট্রজীবনের জন্য দায়িত্ববোধ পুষ্ট করিবার পক্ষে বিদ্যালাভই প্রধান সহায়। সুতরাং শিক্ষালাভ ও সম্পত্তিলাভ এই দুই দিকে মন না দিয়া আমরা যদি হুজুগে পড়িয়া দক্ষিণপ্রান্তের শ্বেতাঙ্গসমাজে বড় বড় চাকরী করিতে থাকিতাম, তাহা হইলে আমাদের ভবিষ্যৎ উন্নতির মূলে কুঠারাঘাত হইত আমি ইহা বেশ বুঝিতাম। এই জন্যই উত্তর অঞ্চলের শ্বেতাঙ্গদিগের মেজাজ দেখিয়া আমি একেবারেই খুসী হই নাই। আর আমার মনে বেশ ধারণা জন্মিয়াছিল যে, নিগ্রোজাতিকে যে অস্বাভাবিক ভাবে চালাইবার চেষ্টা হইতেছে তাহা কোনমতেই টিকিতে পারে না।
তাহার উপর, আমাদের মূর্খতা ও অজ্ঞতার দোহাই দিয়া যুক্তরাষ্ট্র আমাদিগকে রাষ্ট্রীয় অধিকার হইতে বঞ্চিত করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। তাহাই কি চিরকাল টিকিতে পারে? আমি বুঝিয়াছিলাম তাঁহাদের এই ‘অছিলা’ শীঘ্রই ঘুচিয়া যাইবে। আমরা বেশী দিন অজ্ঞ থাকিব না। আমাদিগকে শিক্ষিত করিয়া লইতে তাঁহারা বাধ্য হইবেন।
আমি ত আমাদের ভবিষ্যতের স্থায়ী মঙ্গলের কথাই ভাবিতাম। কিন্তু নিগ্রোসমাজের সাধারণজনগণ ত অত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিল না। তাহারা শিল্প, শিক্ষা, কৃষি সম্পত্তি ইত্যাদি ভুলিয়া রাষ্ট্রীয় জীবনের দিকেই বেশী ঝুঁকিল। অতি সামান্য মাত্র বিদ্যা লইয়াই নিগ্রোরা রাজনৈতিক আন্দোলনের পাণ্ডা হইতে লাগিলেন। কত নিগ্রোই যে এইরূপে প্রাদেশিক দরবারের মন্ত্রণাসভায় ঢুকিয়াছিল তাহার ইয়ত্তা নাই। আমিও একবার এই হুজুগে পড়িবার মত হইয়াছিলাম। কিন্তু শীঘ্রই আমার ভুল বুঝিতে পারিয়া সামলাইয়া লইয়াছি।
রাষ্ট্রনৈতিক কর্ম্মক্ষেত্রে সমাজে বেশ সাময়িক নাম করা যায়। কিছুকাল হৈচৈ গণ্ডগোল হুজুগ আন্দোলন লাফালাফি ইত্যাদি সৃষ্টি করিয়া খ্যাতি অর্জ্জন করা যায়। দলপতি, জননায়ক ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত হইয়া গৌরব ও অহঙ্কার করা চলে। কিন্তু দেশের মাটির ভিতর জাতীয় উন্নতির বীজ বপন করিবার জন্য ওরূপ হুজুগে মাতিলে চলে না। স্থিরভাবে, সহিষ্ণুভাবে, দৃঢ়ভাবে লোকচরিত্র ও লোকমত গঠন করা আবশ্যক। জন গণের বিদ্যাবুদ্ধি মার্জ্জিত করা প্রয়োজন—তাহাদিগকে দায়িত্বপূর্ণ কর্ম্মে অভ্যস্ত করা প্রয়োজন—তাহাদিগকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করিবার সুযোগ দিয়া নানা উপায়ে গড়িয়া তোলা প্রয়োজন। তাহার উপর স্বাধীন অন্ন-সংস্থানের ভিত্তি স্বরূপ কৃষিবাণিজ্য ইত্যাদি সমাজের মধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া আবশ্যক। এই সকল কার্য্য সুচারুরূপে সম্পন্ন করিতে হইলে নীরবে নিঃশব্দে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকিয়া কর্ম্ম করা কর্ত্তব্য। কিন্তু এই কঠিন সাধনায় ব্রতী না হইয়া লোকেরা তরলমতি শিশুর ন্যায় রাষ্ট্রনৈতিক হুজুগে যোগ দিতেই বেশী ভালবাসে। আমার নিগ্রোসমাজেও প্রথম প্রথম এইরূপ ঘটিয়াছে।
আমার স্বজাতিরা দলে দলে রাষ্ট্র-জীবনে প্রবেশ করিতে লাগিল। কেহ কেহ অবশ্য বেশ যোগ্যতার সহিতই দায়িত্বপূর্ণ কর্ম্ম করিতে পারিলেন। মন্ত্রণা সভায়, বিচারালয়ে, শাসনকর্ম্মে নিগ্রোরা অনেকেই যথেষ্ট খ্যাতি অর্জ্জন করিতে লাগিলেন। কিন্তু গলদই বেশী বাহির হইত। অনেক ত্রুটি, অনেক অসম্পূর্ণতা আমাদের নিগ্রো কর্ম্মচারীদিগের মধ্যে দেখা যাইত। আজকাল সে অবস্থার অনেক উন্নতি হইয়াছে। এখন আমরা নিতান্তই অজ্ঞ ও মূর্খের ন্যায় কার্য্য করি না। বিগত ৩০ বৎসরের শিক্ষার ফলে, অভ্যাসের ফলে এবং অভিজ্ঞতার ফলে কৃষ্ণাঙ্গ সমাজ রাষ্ট্রকর্ম্মে যথেষ্ট পাণ্ডিত্যই অর্জ্জন করিয়াছে একথা বলিতে আমি দ্বিধা বোধ করি না।
আজ আমি বলিতে পারি যে সাদা ও কাল চামড়ার প্রভেদ এখন পূর্ব্বের ন্যায় রহিত হওয়া কোন মতেই উচিত নয়। যোগ্যতানুসারে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ সমাজের মধ্যে কর্ত্তব্য বিভাগ করা হউক, এবং সম্মান লাভের সুযোগগুলিও বিকিরণ করা হউক। জাতিনির্ব্বিশেষে সকলকে সকল কর্ম্মের অধিকার প্রদান করা হউক। নিগ্রোকে আর সকল বিষয়ে চাপিয়া রাখিবার প্রয়োজন নাই। প্রত্যেক প্রাদেশিক রাষ্ট্রেই যথার্থ ন্যায়সঙ্গত আইন প্রস্তুত করা বাঞ্ছনীয়। যদি শীঘ্র শীঘ্রই নূতন যুক্তিসঙ্গত বিধান প্রস্তুত করা না হয় নিগ্রোদিগকে বিরক্ত করিয়া তোলা হইবে। আমি বলিতেছি—নিগ্রোরা আর সহ্য করিবে না শ্বেতাঙ্গ সমাজেরও অমঙ্গল হইবে—যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অন্ধকার পূর্ণ হইয়া উঠিবে। ৩০ বৎসর পূর্ব্বে দাসত্ব প্রথা যেমন আমেরিকার প্রধান পাপ ছিল, আজ অবিচার অন্যায় আইন, সাদাকাল চামড়াভেদে রাষ্ট্রীয় অধিকার-বিতরণ ইত্যাদিও আমেরিকার রাষ্ট্রজীবনের ঠিক সেইরূপ গর্হিত ও পাপপূর্ণ লক্ষণ। পক্ষপাতশূন্য অনুশাসন প্রবর্ত্তন পূর্ব্বক এই পাপ দূর করিবার জন্য সকলেরই চেষ্টা করা কর্ত্তব্য।
১৮৭৮ সাল পর্য্যন্ত আমি ম্যাল্ডেনে শিক্ষকতার কর্ম্ম করিলাম। এই দুই বৎসরে আমি আমার দুই ভাইকে এবং আরও কয়েকজন বালক ও বালিকাকে অনেকটা তৈয়ারী করিয়া লইলাম। ইহারা ইতিমধ্যে হ্যাম্পটনে উচ্চ শিক্ষালাভের উপযুক্ত হইয়া উঠিল। তাহার পর আমি নিজে কলম্বিয়া প্রদেশের ওয়াশিংটন নগরে আট মাস লেখা পড়া শিখিতে যাই। এই বিদ্যালয়ে শিল্প শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল না—সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়েই গ্রন্থ পাঠ এখানে বেশী হইত। কিন্তু হ্যাম্পটনে কৃষি, পশুপালন, শিল্প ইত্যাদির দিকেই বেশী দৃষ্টি থাকিত।
আমি ওয়াশিংটনে থাকিতে থাকিতে এই দুই প্রকার শিক্ষালয়ের প্রভেদ বুঝিতে পারিলাম। ওয়াশিংটনের ছাত্রদের বেশ দুপয়সা আছে। তাহারা কিছু ‘বাবু’—তাহাদের পোষাক পরিচ্ছদ উচ্চ ধরণের—বিলাসের মাত্রাও যথেষ্ট। বোধ হয় ইহারা লেখাপড়া হিসাবেও মন্দ নয়। নিতান্ত গণ্ডমূর্খ আসিয়া ওয়াশিংটনে ঢুকিতে পায় না। কিন্তু হ্যাম্পটনের আবহাওয়া সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। ওখানকার চালচলন ভিন্ন রকমের। দাতারা ছাত্রদের বেতন দান করিতেন—সুতরাং উহা অবৈতনিক বিদ্যালয়। কিন্তু কাপড় চোপড়, কাগজ পত্র, পুস্তক সরঞ্জাম ইত্যাদি এবং খাওয়া পরার খরচ ছাত্রদিগকেই দিতে হইত। এই টাকা ছাত্রেরা খাটিয়া সংগ্রহ করিত। কেহ কেহ বাড়ী হইতেও কিছু আনিত।
ওয়াশিংটনের ছাত্রেরা একেবারেই স্বাবলম্বী নহে—তাহাদের খরচপত্র সম্বন্ধে তাহারা নিশ্চিন্তভাবে দিন কাটাইত। কিন্তু হ্যাম্পটনে স্বাবলম্বন এবং নিজের খরচ নিজে চালানই ছাত্রদিগের বিশেষ লক্ষণ। ওয়াশিংটনের ছেলেরা বাহিরের ‘চটকে’ বেশ দৃষ্টি রাখিত। জীবনের প্রকৃত ভিত্তি আত্মসম্মান, আত্মপ্রতিষ্ঠা, আত্মশক্তিতে বিশ্বাস ইত্যাদির প্রতি তাহাদের বিশেষ নজর ছিল না। জীবনের লক্ষ্য, মানবের কর্ত্তব্য, ভবিষ্যতের আদর্শ ইত্যাদি সম্বন্ধেও তাহারা বেশীকিছু শিখিত বলিয়া মনে হয় না। তাহারা গ্রীকল্যাটিন ইত্যাদি কত বিষয়ই শিখিত। কিন্তু প্রতিদিনকার জীবনযাত্রা প্রণালী সম্বন্ধে তাহাদের অজ্ঞতা দেখিয়া হাস্য সংবরণ করা কঠিন। লেখাপড়া শিখিয়া তাহারা যে সমাজে বাস করিবে তাহার উপযুক্ত কাজকর্ম্ম, চালচলন তাহারা আদৌ শিখিত না। বরং অনেক বিষয়ে তাহাদের ক্ষতিই হইত। কয়েক বৎসর বেশ ভাল বাড়ীতে বাস, ভাল খাওয়া দাওয়া ইত্যাদি করিয়া তাহারা অনেকটা অকর্ম্মণ্য, অসহিষ্ণু হইয়া পড়িত। পল্লীতে আসিয়া বাস করা তাহাদের পক্ষে অসম্ভব বোধ হইত। শারীরিক পরিশ্রমে নারাজ হইত। গৃহস্থালীর কর্ত্তব্য, চাষবাস, পশুপালন ইত্যাদি তাহারা একেবারেই ভুলিয়া যাইত। আফিসের কেরাণী, পরিবারের ম্যানেজার, হোটেলের বাবুরচি, অথবা খান্সামা, দ্বারবান্ ইত্যাদি হইয়া জীবন কাটাইতে তাহারা ভালবাসিত। কিন্তু মাঠে যাইয়া কষ্ট-স্বীকার পূর্ব্বক জমি চষিতে তাহারা অসমর্থ হইয়া পড়িত।
আমি যে কয় মাস ওয়াশিংটনে ছিলাম তখন ওখানে অনেক নিগ্রো বাস করিত। সকলেই পল্লী ত্যাগ করিয়া সহরে আসিয়াছে। গ্রামের কষ্ট তাহাদের সহ্য হয় না। সহরের বিলাস ছাড়িয়া তাহারা অন্যত্র বাস করিতে অসমর্থ। কেহ কেহ প্রাদেশিক রাষ্ট্রের নিম্নপদস্থ কর্ম্মচারী, কেহ বা যুক্তদরবারের বড় চাকরী পাইবার আশায় কাল কাটাইতেছে। কেহ কেহ মন্ত্রণা সভার এবং ব্যবস্থাপক সমিতিতে সদস্যগিরিও করিত। ফলতঃ কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের একটা বড় টোলা কলম্বিয়া প্রদেশের এই নগরে প্রতিষ্ঠিত হইয়া গেল। নিগ্রোদিগের জন্য তখন সেখানে কতকগুলি বিদ্যালয়ও খোলা হইতেছিল। সকল বিষয়ে আমি এই নগরটা পর্য্যবেক্ষণ করিতে লাগিলাম। আমাদে সমাজের গতিবিধি ও নৈতিক অবস্থা বুঝিতে চেষ্টা করিলাম।
বড় সহরের সুফল কুফল সবই আমার স্বজাতিকে আক্রমণ করিয়াছিল। কতকগুলি নিষ্কর্ম্মা লোকের আড্ডা অনেক স্থানেই দেখিতে পাইতাম। বিলাসের স্রোত প্রবল বেগেই বাড়িতেছিল। ৩৫৲ টাকা মাসিক বেতনে কর্ম্ম করিয়া কত নিগ্রো যুবক জুড়িগাড়ী চড়িয়া হাওয়া খাইতে বাহির হইতেন—আমি নিজ চোখে এসব দেখিয়া মর্ম্মাহত হইতাম। পেটে তাহাদের অন্ন জুটিত না কিন্তু সংসারকে তাহারা দেখাইতে চাহিত যে তাহারা নিতান্তই গরিব ও নগণ্য নয়। আরও কত নিগ্রোকে দেখিয়াছি যাহারা ২৫০।৩০০৲ মাসিক বেতনে সরকারের চাকরী করিত—অথচ প্রতি মাসেই তাহাকে ধার করিয়া সংসার চালাইতে হইত। অত টাকা পাইয়াও তাহারা স্বপরিবারের খরচ কুলাইয়া উঠিতে পারিত না! আরও অনেক নিগ্রোর সঙ্গে আলাপ হইয়াছিল। তাঁহারা কয়েক মাস পূর্ব্বে ‘জাতীয়’ মহাসমিতি কংগ্রেসে যাইয়া কর্ত্তামী ও দেশ-নায়কতা করিয়া আসিয়াছেন। কিন্তু পরক্ষণেই তাঁহাদের অর্থাভাব ও দুর্দ্দশার সীমা নাই। অধিকন্তু বহুলোক ফ্যাল্ ফ্যাল্ করিয়া ঘুরিয়া বেড়াইত। নিজে খাটিয়া অন্নের ব্যবস্থা করিতে তাহাদের চেষ্টা ছিল না। সরকারের একটা চাক্রীর আশায় বসিয়া থাকিয়া জীবন নিরানন্দময় করিতে থাকিত। তাহাদের বিশ্বাস যুক্তরাষ্ট্রের কর্ম্মচারীদের খোসামোদ করিলে দুএকটা চাকরী তাহাদের কপালে জুটিবে।
বড় সহরের নিগ্রোসমাজ দেখিয়া আমি সুখী হইতে পারি নাই। তাহারা নিজেদের প্রকৃত স্বার্থ ভুলিয়া সাময়িক উত্তেজনায় এবং অনর্থক বিলাসভোগে দিন অতিবাহিত করিতেছিল। আমার ইচ্ছা হইত যে, কোন যাদুমন্ত্রে তাহাদের ঐ মোহ কাটাইয়া দিই। আমার সাধ হইত যে, তাহাদিগকে সম্মোহনমন্ত্রে ভুলাইয়া জীবনের যথার্থ কর্ম্মক্ষেত্রে তাহাদিগকে প্রতিষ্ঠিত করিয়া দিই। আমি ভাবিতাম যে, আমার ক্ষমতা থাকিলে, আমি তাহাদিগকে সহর ছাড়াইয়া পল্লীগ্রামে বসাইতাম। সেখানে প্রকৃতি জননীর সুকোমল ক্রোড়ে বাস করিয়া তাহারা জীবনের যথার্থ উন্নতি সাধন করিতে পারিবে। দেশের মাটিতে তাহারা একবার বসিতে পারিলে প্রকৃত সুখভোগের উপায়গুলি তাহারা আবিষ্কার করিতে পারিবে। কৃষিক্ষেত্রেই শিল্পির জন্য কাঁচা মাল তৈয়ারী হইয়া থাকে—পল্লীজীবনেই সকল জাতির যথার্থ সভ্যতার, প্রধান উপাদান উৎপন্ন হইয়া থাকে। পল্লীগ্রামে কৃষিকর্ম্ম করিয়াই সকল দেশের জনসমাজ সভ্যতার প্রথম স্তরে পদার্পণ করিয়াছে। এই স্তরে ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হইবার পরে তাহারা শিল্প, বাণিজ্য, বিদ্যা, ধর্ম্ম, ইত্যাদি জাতীয় জীবনের সকল অঙ্গের পুষ্টিবিধান করিতে সমর্থ হইয়াছে। প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপন করা বড় কষ্ট-কল্পনাসাধ্য সন্দেহ নাই। কিন্তু একবার ঐ কার্য্য হইয়া গেলে ভবি ষ্যতের সকল উন্নতিই সহজসাধ্য হইয়া পড়ে। এই কথাগুলি আমি আমার ‘সহুরে’ নিগ্রোদিগকে বুঝাইতে ইচ্ছা করিতাম। কিন্তু তখন আমার সুযোগ ছিল না। ভবিষ্যতে এই সকল কথা আমি নানা ভাবে নানা স্থানে প্রচার করিয়া আসিয়াছি।
ওয়াশিংটনের নিগ্রোরমণীদিগের অবস্থা কিছু বলিতেছি। অনেকে ধোপার কার্য্য করিয়া অন্ন সংস্থান করিত। পারিবারিক ভাবে এই ব্যবসায়গুলি চলিত। মায়ে ঝিয়ে সকলে মিলিয়া কাপড় চোপড় পরিষ্কার করিত। এইরূপে সমস্ত পরিবারই কর্ম্ম করিয়া যৌথভাবে অর্থ উপার্জ্জন করিত। ইহার ফলে মেয়েরা অল্প বয়স হইতেই দেখিয়া দেখিয়া এবং কাজ করিয়া বস্ত্রধৌতি কর্ম্মে পটুত্ব অর্জ্জন করিত। কিন্তু ক্রমশঃ মেয়েরা স্কুলে ভর্ত্তি হইল। ওখানে ৭।৮ বৎসর কাল লেখা পড়া শিখিত। যখন বিদ্যাশিক্ষা শেষ হইয়া যাইত তাহারা ভাল ভাল পোষাক চাহিত। তাহাদের খরচ পত্র বাড়িয়া গেল—অথচ উপার্জ্জন করিবার ক্ষমতা কমিতে থাকিল। কারণ ইতিমধ্যে তাহারা গৃহস্থালী ভুলিয়া গিয়াছে ধোপার কর্ম্ম করিতেও অপারগ হইয়া পড়িয়াছে। পুঁথিবিদ্যার ফলে তাহাদের সর্ব্বনাশ উপস্থিত হইয়াছে। মা মাসীমা যে কাজ করিতে পারিত সে কাজে তাহাদের এখন লজ্জা ও অপমান বোধ হয়। পারিবারিক সুখ আর থাকিল না। মেয়েরা দুশ্চরিত্র হইতে লাগিল। সহুরে বিদ্যাশিক্ষায় আমাদের রমণীসমাজ ক্রমশঃ অবনত হইতে থাকিল।
ষষ্ঠ অধ্যায়
আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ ও
লোহিত জাতি
আমি যখন ওয়াশিংটনে পড়িতেছিলাম তখন ওয়েষ্ট ভার্জ্জিনিয়াপ্রদেশে একটা তুমুল আন্দোলন চলিতেছিল। একটা নূতন স্থানে প্রদেশের রাষ্ট্র-কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কথা উঠিয়াছিল। ঐ জন্য দুই তিনটি স্থানও নির্ব্বাচিত হইয়াছিল। সেই স্থানগুলির অধিবাসীরা নিজ নিজ নগরের জন্য প্রদেশময় আন্দোলন সৃষ্টি করিতে লাগিল। আমার ম্যাল্ডেনপল্লীর পাঁচ মাইল দূরেই চালর্ষ্টান-নগর অবস্থিত। এই নগরবাসীরাও রাষ্ট্র-কেন্দ্রের মর্য্যাদা লাভ করিবার জন্য চেষ্টা করিতে ত্রুটি করে নাই। আমি ওয়াশিংটনের ছুটির পর গৃহে ফিরিয়া আসিয়াছি, এমন সময়ে দেখি আমার নিকট চার্লষ্টনের শ্বেতাঙ্গ অধিবাসীরা দলবদ্ধভাবে একখানা পত্র লিখিয়াছেন। আমাকে তাঁহারা তাঁহাদের জন্য ভোট সংগ্রহ কার্য্যে আহ্বান করাই এই পত্রের উদ্দেশ্য। আমি তাঁহাদের হইয়া প্রদেশের নানা স্থানে ‘ক্যান্ভ্যাস’ করিয়া বেড়াইতাম। তিনমাস কাল পল্লীতে পল্লীতে বক্তৃতা দিয়া চার্লষ্টনের দিকে জনগণের সহানুভূতি আকৃষ্ট করিলাম। ফলতঃ শেষ পর্য্যন্ত চার্লষ্টনের অধিবাসিগণই জয়ী হইল। সেই সময় হইতে এখন পর্য্যন্ত চার্লষ্টন নগরই ওয়েষ্ট ভার্জ্জিনিয়া প্রদেশের রাষ্ট্র-কেন্দ্র এবং প্রধান নগর রহিয়াছে।
এই আন্দোলনে যোগদান করিয়া আমি বেশ একটু নাম করিয়া ফেলিলাম। অনেক স্থান হইতেই আমাকে লোকেরা রাষ্ট্রীয় আন্দোলনে জীবন উৎসর্গ করিতে অনুরোধ করিল। কত দলপতি ও জন-নায়ক আমাকে তাঁহাদের দলে ঢুকিতে আহ্বান করিলেন। আমি কিন্তু হুজুগে মাতিলাম না—সাময়িক যশোলাভের মোহে পড়িলাম না। বরং সেই প্রলোভন কাটাইয়া উঠিয়া আমার জাতির স্থায়ী উন্নতিবিধানের ভিত্তি প্রতিষ্ঠায়ই চিত্ত সমর্পণ করিলাম। আমি জানিতাম, যে রাষ্ট্রীয়-জীবনে যোগদান করিলে আমি কৃতকার্য্য হইয়া নামজাদা লোকই হইতে পারি। রাষ্ট্রীয় আন্দোলনের কর্ম্ম করিবার যোগ্যতা, প্রবৃত্তি ও উৎসাহ সবই আমার ছিল। কিন্তু উহাতে লাগিয়া গেলে আমার স্বার্থপরতাই প্রমাণিত হইত। আমার নিজ উন্নতির পথ উন্মুক্ত হইত বটে, কিন্তু আমার সমাজকে আত্মপ্রতিষ্ঠ করিয়া উঠিতে পারিতাম না।
আমি বুঝিয়াছিলাম সমাজকে আত্মপ্রতিষ্ঠ করিতে হইলে তিনটি কার্য্য করিতে হইবে। প্রথমতঃ সমাজের সকল স্তরে শিক্ষা বিস্তার করা আবশ্যক। দ্বিতীয়তঃ আমাদের কৃষি, শিল্প ও ব্যবসায় পুষ্ট করা আবশ্যক। তৃতীয়তঃ আমেরিকার সমাজে নিগ্রোদিগের জন্য সম্পত্তি, গৃহ, জমিদারী ইত্যাদি সঞ্চিত করা আবশ্যক। এই তিনটির কোনটিই তখন আমাদের কৃষ্ণাঙ্গ সমাজে ছিল না বলিলেই চলে। সুতরাং সমাজের এই তিনটি প্রাথমিক অভাব মোচন করাই আমার কর্ত্তব্য বিবেচনা করিলাম। তাহা না করিয়া আমি যদি প্রথমেই নিজ প্রবৃত্তি চরিতার্থ করিবার জন্য রাষ্ট্রীয় আন্দোলনে মাতিয়া যাই তাহা হইলে আমাকে স্বার্থপর এবং আত্মহিতাকাঙ্ক্ষী ভিন্ন আর কি বলা যাইতে পারে? কাজেই আমার নিজের সুযোগ, সুবিধা, ক্ষমতা, যোগ্যতা, পাণ্ডিত্য, যশোলাভ ইত্যাদি সকল কথা ভুলিয়া গেলাম। নিগ্রোসমাজকেই আমার জননীস্থানীয় বিবেচনা করিয়া একমাত্র তাহারই সুখবিধানে নিজকে নিযুক্ত করিলাম। আমার জীবনব্যাপিণী সাধনার কেন্দ্রস্থলে নিগ্রোসমাজকে রাখিয়া আমার ব্যক্তিগত আশা আকাঙ্ক্ষা বিসর্জ্জন দিলাম। এই সমাজ-সেবা ব্রত হইতে কোনরূপ প্রলোভনই আমাকে টলাইতে পারে নাই।
নিগ্রোজাতির অনেকেই রাষ্ট্রীয় আন্দোলনে যোগ দিলেন। অনেকেই যুক্ত-দরবারের ‘জাতীয়’ মহাসমিতি কংগ্রেসের সভ্যপদপ্রার্থী হইলেন। অনেকেই উকিল হইয়া আইন ব্যবসায় ধরিতে চেষ্টা করিলেন। কেহ কেহ ছোট বড় চাকরীর সন্ধান করিতে লাগিলেন। অনেকেই সঙ্গীত-শিক্ষকতার কর্ম্ম করিতে থাকিলেন। আমি বুঝিলাম নিগ্রোসমাজের উন্নতি এই কংগ্রেসওয়ালা উকিল, কেরাণী বা সঙ্গীত-শিক্ষকগণের দ্বারা সাধিত হইবে না।! তাহার জন্য অন্যরূপ তপস্যা আবশ্যক। এমন কি কংগ্রেসের কার্য্য, উকিলী ব্যবসায় এবং সঙ্গীত-শিক্ষকতার কর্ম্মের জন্য ও নিগ্রোদিগকে যোগ্য করিয়া তুলিবার জন্যই কঠোর সাধনা আবশ্যক। সেই তপস্যায় ও সেই সাধনায় ব্রতী না হইয়া কেবল উচ্চ আকাঙ্ক্ষা ও উচ্চ অভিলাষ পোষণ করিলে কি হইবে?
আমার স্বজাতিদিগের এই সময়কার হাব ভাব দেখিয়া আমাদের গোলামীযুগের একটা ঘটনা মনে পড়িত। এক নিগ্রো সেতার বাজান শিখিতে চাহিয়াছিল। তাহার একজন যুবক প্রভু সেতার বাজাইতে পারিতেন। তাঁহার নিকট সে মনোবাঞ্ছা জানাইল। প্রভু বুঝিলেন, নিগ্রোর ইহা সাধ্য নয়। মজা দেখিবার জন্য বলিলেন, “আচ্ছা, জ্যাক্ দাদা, তোমাকে আমি সেতার শিখাইতে রাজী আছি। কিন্তু দাদা একটা কথা বলি। এজন্য কত করিয়া আমাকে দিবে? আমার দস্তুর এই—প্রথম গৎ শিখাইবার জন্য আমি ৯৲ লইয়া থাকি, দ্বিতীয় শিক্ষার জন্য ৬৲ লইয়া থাকি এবং তৃতীয়টার জন্য আমি মাত্র ৩৲ লই। আর যেদিন তোমাকে ওস্তাদ করিয়া ছাড়িয়া দিব অর্থাৎ শেষ দিন মাত্র ৸১০ লইব। রাজী আছ কি?” নিগ্রো দাদা উত্তর করিল, “ছোট কর্ত্তা, কড়ারটা ত ভালই দেখিতেছি। তোমাকে আমি এইরূপই দিয়া যাইব। কিন্তু কর্ত্তা আমার একটা অনুরোধ রাখিতে হইবে। তুমি শেষ গৎটাই আমাকে প্রথমে শিখাও না কেন?”
আমি আমাদের স্বজাতিদিগের জন-নায়ক ও বড় বড় কর্ম্মচারী ইত্যাদি হইবার আকাঙ্ক্ষাকে এই গোলামের শেষ গৎটাই আগে শিখিবার ইচ্ছার ন্যায় সর্ব্বদা মনে করিয়া আসিয়াছি। এজন্য আমি ওসব ‘বড় কাজে’ না যাইয়া নীরব শিক্ষাপ্রচার কর্ম্মেই থাকিয়া গেলাম।
চার্লষ্টনে রাষ্ট্রকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হইল। আমি ম্যাল্ডেনে শিক্ষকতা করিতে লাগিলাম। এমন সময়ে একখানা হ্যাম্পটনের পত্র পাইলাম। সেনাপতি আর্মষ্ট্রঙ্গ আমাকে হ্যাম্পটনে একটা বক্তৃতা করিতে নিমন্ত্রণ করিয়াছেন। প্রতি বৎসর কার্য্য আরম্ভ হইবার পূর্ব্বে হ্যাম্পটনের পুরাতন গ্রাজুয়েটদের মধ্যে দুএকজন বক্তৃতা করিয়া থাকেন। এবার আমার উপর এই ভার পড়িল। আর্মস্ট্রঙ্গের পত্র পাইয়া এক সঙ্গে লজ্জিত ও আনন্দিত হইলাম। আমি এই সম্মানলাভের যোগ্য বিবেচিত হইয়াছি দেখিয়া আশ্চর্যান্বিতও হলাম। যাহা হউক, কিছু দিনের মধ্যেই বক্তৃতা প্রস্তুত করিয়া ফেলিলাম। আমার আলোচ্য বিষয় হইল “বিজয়লাভের সদুপায়।”
পাঁচ বৎসরের মধ্যে নূতন রেলপথ অনেক খোলা হইয়াছে। হ্যাম্পটনে যাইবার সময়ে এবার সমস্ত রাস্তা রেলপথেই গেলাম। পাঁচ বৎসর পূর্ব্বে কি কষ্টে আমি কত পথ হাঁটিয়া কত দিন না খাইয়া সেই একই রাস্তায় হ্যাম্পটনের বিদ্যামন্দিরে উপস্থিত হইয়াছিলাম! আজ আমি সেইখানে সম্মানজনক পদলাভ করিয়া বক্তৃতা দিতে চলিয়াছি। অতীত ও বর্ত্তমান তুলনা করিতে করিতে শরীর রোমাঞ্চিত হইতে লাগিল। পাঁচ বৎসরের মধ্যে কোন লোকের এরূপ ভাগ্য পরিবর্ত্তন ঘটিয়াছে কি না আমার জানা নাই।
হ্যাম্পটনে শিক্ষক ও ছাত্রগণ আমাকে খুবই আদর আপ্যায়িত করিলেন। আমি অনেক দিন পরে আসিয়াছি, বহু বিষয়ে পরি বর্ত্তন ও উন্নতি লক্ষ্য করিলাম। আমাদের সমাজের যে যে বিষয়ে অসম্পূর্ণতা ও অভাব রহিয়াছে বিদ্যালয়ে ঠিক সেইগুলি পূরণ করিবার জন্যই আর্মষ্ট্রঙ্গ মহোদয় এবং হ্যাম্পটনের শিক্ষক শিক্ষয়িত্রাগণ চেষ্টিত ছিলেন।
অনেক স্থলে দেখিয়াছি, শিক্ষা প্রচারকেরা সমাজের অবস্থা বুঝিয়া বিদ্যাদানের ব্যবস্থা করেন না। অবনত ও দরিদ্র লোকসমাজে শিক্ষাবিস্তার করিতে যাইয়া বহু সৎপ্রয়াসী কর্ম্মিগণ এজন্য সুফল সৃষ্টি করিতে পারেন নাই। অন্য এক সমাজে যে অনুষ্ঠানে সুফল লাভ হইয়াছে তাহাই অবনত সমাজে প্রবর্ত্তন করিতে যাইয়া তাঁহারা বিফল হইয়াছেন। তাঁহারা বুঝেন না যে, এক সমাজের যাহা শুভ, অন্য সমাজের তাহা অশুভও হইতে পারে। শ্বেতকায় সমাজে যাহাকে উন্নত শিক্ষাপ্রণালী বলি তাহাই যে কৃষ্ণাঙ্গ নিগ্রোসমাজেও সুফল প্রসব করিবে কে বলিতে পারে? এমন কি, পূর্ব্ববর্ত্তী কোন যুগে হয়ত একটা অনুষ্ঠানের দ্বারা সুফল পাওয়া গিয়াছে। কিন্তু তাহার দ্বারাই যে এখনও উপকার হইবে এরূপ বিশ্বাস করা যাইতে পারে কি? কিন্তু শিক্ষাপ্রচারকেরা দেশকালপাত্র বিবেচনা না করিয়াই অনেক ক্ষেত্রে কর্ম্মে অবতীর্ণ হইয়াছেন, দেখিতে পাই। ১০০০ মাইল দূরে কোন দেশে যে শিক্ষাপ্রণালী প্রবর্ত্তিত হইয়াছে তাহাই অন্ধের ন্যায় ইহাঁরা হয়ত কোন সমাজে প্রচার করিতে থাকেন। অথবা ১০০ বৎসর পূর্ব্বে যে বিদ্যা কার্য্যকরী ছিল এতদিন পরেও তাঁহারা তাহাই চালাইতেছেন। হ্যাম্পটন-বিদ্যালয়ের কর্ত্তৃপক্ষেরা এরূপ অনভিজ্ঞ ছিলেন না। তাঁহারা জানিতেন যে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে তাঁহারা রহিয়াছেন। তাঁহারা বুঝিতেন যে, নিগ্রোজাতির জন্য তাঁহারা ব্যবস্থা করিতেছেন। আর তাঁহারা মনে রাখিতেন যে, যুক্তরাজ্যের একটি প্রদেশের মধ্যেই তাঁহাদের কর্ম্মকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত।
শিক্ষাবিস্তার বিষয়ে আর একটা দোষও অনেক সময়ে লক্ষ্য করিয়াছি। শিক্ষকেরা মনে করেন যে, ছাত্রেরা সকলেই একরূপ, সকলকেই একই প্রণালীতে, একই আদর্শে, একই জীবনযাপন প্রথার ভিতর দিয়া মানুষ করা যায়। এজন্য সকলের উপর একটা ‘পেটেণ্ট’ ছাপ মারিয়া দিবার জন্য শিক্ষকেরা সাধারণতঃ চেষ্টা করিয়া থাকেন। তাঁহারা ভুলিয়া যান যে, মানুষ বিচিত্র, ছাত্রগণের স্বভাব বিভিন্ন, এক একজনের এক এক প্রকার মেজাজ, প্রবৃত্তি ও ধারণা। সুতরাং প্রত্যেকের অভাব বুঝিয়া শিক্ষা দিলেই সুফল ফলিতে পারে। সুখের কথা হ্যাম্পটনে ছাত্রদের বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতা বিষয়ে বেশ লক্ষ্য রাখা হইত। এক একজনকে এক এক প্রকার শিল্প, কৃষি ও পুঁথি শিখান হইত। ফলতঃ ছাত্রেরা সজীবভাবে মনের আনন্দে বাড়িয়া উঠিত। যাহার যে বিষয়ে অভাব তাহার ঠিক সেই বিষয়েই শিক্ষা হইত। লেখা পড়া শিখিয়া যে তাহাদের উপকার হইতেছে প্রতিদিন তাহারা ইহা নিজেই বুঝিতে পারিত।
হ্যাম্পটনে আমার বক্তৃতা দেওয়া হইয়া গেল। সকলে খুসী হইলেন। আমি ম্যাল্ডেনে ফিরিয়া আসিলাম। এখানে শিক্ষকতার জন্য পুনরায় ব্যবস্থা করিতেছি এমন সময়ে আর্মষ্ট্রঙ্গ মহোদয়ের আর একখানা পত্র পাইলাম। তিনি আমাকে হ্যাম্পটনে একটা শিক্ষকতার পদে নিযুক্ত করিয়াছেন।
ইতিমধ্যে আমি আমার দুইটি ভাই ও আমার পল্লীর অপর চারিজন সর্ব্বসমেত ছয় জন ছাত্রকে ম্যাল্ডেন হইতে হ্যাম্পটনে পাঠাইয়াছি। তাহাদিগকে আমি ঘরেই এতদূর তৈয়ারী করিয়া দিয়াছিলাম যে তাহারা হ্যাম্পটনে যাইয়া সকল বিষয়েই উচ্চ শ্রেণীতে ভর্ত্তি হইবার সুযোগ পাইয়াছিল। ইহাদের লেখাপড়া এবং স্বভাব চরিত্র দেখিয়া আর্মষ্ট্রঙ্গ আমার গুণপনায় মুগ্ধ হইয়াছিলেন এবং ভাবিয়াছিলেন, আমার দ্বারা বেশ ভালই শিক্ষকতার কার্য্য চলিতে পারে। এজন্যই তিনি উৎসুক হইয়া আমাকে হ্যাম্পটনে ডাকিয়া পাঠাইয়াছেন। আমি যে সকল ছাত্র পাঠাইয়াছিলাম তাহাদের মধ্যে একজন আজ কাল বোষ্টন নগরে প্রসিদ্ধ চিকিৎসা ব্যবসায়ী। তিনি ঐ নগরে শিক্ষা পরিষদেরও একজন সদস্য।
এই সময়ে আর্মষ্ট্রঙ্গ মহোদয় লোহিত জাতিকে শিক্ষা দিবার চেষ্টা করিতেছিলেন। তখনকার দিনে কেহই বিশ্বাস করিতে পারিত না, যে, লোহিতবর্ণ ইণ্ডিয়ান জাতির লোকেরা লেখাপড়া শিখিয়া সভ্য হইতে পারিবে। আর্মষ্ট্রঙ্গ কিন্তু পরীক্ষা করিতে কৃতসঙ্কল্প। তিনি ফেডারেল দরবারের সাহায্যে প্রায় ১০০ লোহিত শিশু ও যুবক হ্যাম্পটনে লইয়া আসিলেন। তাহাদিগকে বিদ্যালয়ের মধ্যেই রাখিলেন। আমি তাহাদিগের ভরণপোষণ রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদির ভার প্রাপ্ত হইলাম। এই কার্য্য আমায় খুব ভালই লাগিত সন্দেহ নাই। কিন্তু আমি আমার স্বজাতির জন্য কর্ম্ম ত্যাগ করিয়া এই নূতন এক লোকসম্প্রদায়ের সেবায় নিযুক্ত হইতে তত বেশী উৎসাহী ছিলাম না। কিন্তু আর্মষ্ট্রঙ্গের আদেশ শিরোধার্য্য করিয়া লইলাম।
প্রায় ৭৫ জন লোহিত ইণ্ডিয়ান্ আমার রক্ষণাবেক্ষণে থাকিল। আমি ছাড়া তাহাদিগের নিকট আমাদের স্বজাতীয় আর কেহ ছিল না। কাজেই দায়িত্ব আমার যথেষ্ট। একে ত ইণ্ডিয়ানেরা শ্বেতকায় দিগকেই সম্মান করে না। তাহারা শ্বেতাঙ্গ অপেক্ষা উন্নত ও সভ্য এইরূপই তাহাদের বিশ্বাস। কৃষ্ণাঙ্গ নিগ্রোরা তাহাদিগের কাছে উল্লেখযোগ্য জাতিই নয়। তাহার উপর আমরা এত কাল গোলামী করিয়াছি। ইণ্ডিয়ানেরা “যায় প্রাণ থাকে মান” ভাবিয়া কোন দিনই গোলাম হয় নাই। এমন কি তাহারাই তাহাদের দেশে অনেক ক্রীতদাস রাখিত। সুতরাং জাতিসমস্যা মীমাংসা করিবার জন্য আমাকে প্রথম প্রথম বড় বেশী ভাবিতে হইয়াছিল।
অধিকন্তু সকলেরই ধারণা জন্মিয়াছিল, আর্মষ্ট্রঙ্গের এই চেষ্টা ফলবতী হইবে না। তিনি একটা অসাধ্য সাধন করিতে প্রয়াসী হইয়াছেন।
যাহা হউক, অল্পকালের মধ্যেই আমি ইণ্ডিয়ান্দিগের বন্ধু হইয়া পড়িলাম। আমি তাহাদের তাহারা আমার এই ভাব বেশ জমিয়া গেল। আমাদের মধ্যে বেশ সদ্ভাব ও প্রীতি এবং ভালবাসার সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠিত হইল। আমি দেখিলাম, লোহিত ইণ্ডিয়ানেরাও মানুষ—তাহাদেরও হৃদয় আছে—তাহারাও ভালবাসিতে জানে—তাহারাও সদসৎ বুঝিয়া কর্ম্ম করিতে পারে। ক্রমেই দেখিলাম তাহারা আমাকে সুখী করিবার জন্য কত কি করিতে চাহিত।
তাহাদের একটা ‘গোঁ’ ছিল। তাহারা তাহাদের স্বজাতির চিহ্নস্বরূপ চুলগুলি কাটিতে দিত না। কম্বল মুড়ি দিয়া বেড়াইতেও তাহারা ভাল বাসিত—এ অভ্যাস তাহারা ছাড়িতে চাহিত না। ধূমপানের অভ্যাসও তাহাদের একটা জাতায় চরিত্রের অন্তর্গত ছিল। তাহাদিগকে কোন মতে ইহা বন্ধ করান যাইত না। কিন্তু দোষ কি? সকল জাতিরই কতকগুলি ‘গোঁ’ থাকে। শ্বেতাঙ্গ জাতিদেরই কি কতকগুলি খেয়াল নাই? তাঁহারা পৃথিবীর সকল জাতিকেই তাঁহাদের ধর্ম্ম, তাঁহাদের ভাষা, তাঁহাদের পোষাক, তাঁহাদের খানা ইত্যাদি ব্যবহার করিতে পীড়াপীড়ি করেন। যেন সাদা চামড়াওয়ালা লোকেরা যাহা যাহা করে অন্যান্য জাতির লোকেরা ঠিক সেইরূপ অনুকরণ না করিলে তাহারা সভ্য হইতে পারে না। সুতরাং লোহিত শিশু ও যুবকদিগের স্বাভাবিক অভ্যাসগুলিতে আমি বিশেষ বিরক্ত হইতাম না।
আমার বিশ্বাস—কৃষ্ণাঙ্গ ও লোহিত ছাত্রদিগের মস্তিষ্কে কোন প্রভেদ নাই। তাহারা বোধ হয় ইংরাজী শিখিতে কিছু বেশী সময় লইত। অন্যান্য সকল বিষয়ে দুইএরই প্রতিভা এক প্রকার। কৃষি, শিল্প, ব্যবসায় অথবা ভূগোল ইতিহাস ইত্যাদি শিক্ষা করিবার জন্য নিগ্রো ও ইণ্ডিয়ান দুই জাতিরই একপ্রকার যোগ্যতা ও অযোগ্যতাই ছিল।
হ্যাম্পটন বিদ্যালয়ের নিগ্রো ছাত্রেরা নানা উপায়ে ইণ্ডিয়ানদিগকে সাহায্য করিত। ইহাতে আমি বিশেষ সন্তুষ্টই হইতাম। নিগ্রোরা অনেক সময়ে লোহিতদিগকে নিজ ঘরে থাকিতে দিত। ইণ্ডিয়ানেরা এইরূপে উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত নিগ্রোদিগের সহবাসে থাকিয়া ইংরাজী ভাষা সহজে আয়ত্ত করিতে পারিত।
হ্যাম্পটনের কাল ছেলেরা এই লাল ছাত্রদিগকে যেরূপ বন্ধুভাবে গ্রহণ করিতেছিল, যুক্তরাজ্যের কোন অঞ্চলের শ্বেতাঙ্গ সন্তানেরা অন্য কোন জাতির ১০০ ছাত্রকে সেইরূপ হৃদ্যতার সহিত গ্রহণ করিতে পারে কি না সন্দেহ। আমি কতবার শ্বেতাঙ্গ যুবকদিগকে বলিয়াছি “যতই তোমরা অবনত জাতিকে উন্নত করিতে চেষ্টা করিবে ততই তোমরা নিজেই উন্নত হইবে। সেই অবনত জাতি যেই পরিমাণে অবনত ছিল তোমাদের উন্নতি ও সভ্যতা ঠিক সেই পরিমাণে বাড়িতে থাকিবে।”
এই উপলক্ষ্যে আমার একটা কথা মনে পড়িয়া গেল। মাননীয় শ্রীযুক্ত ফ্রেড্রিক্ ডগলাস এক সময়ে পেনসিল ভেনিয়া প্রদেশে রেলে বেড়াইতেছিলেন। তিনি কৃষ্ণবর্ণ নিগ্রো। রেল কোম্পানীকে তিনি পয়সা সমানই দিয়াছেন—কিন্তু তিনি শ্বেতাঙ্গদিগের সঙ্গে এক গাড়ীতে বসিতে পাইলেন না। তাঁহাকে মাল গাড়ীতে অন্যান্য নিগ্রোর সঙ্গে বসিয়া যাইতে হইল। একজন শ্বেতাঙ্গ বন্ধু সেই মালগাড়ীতে যাইয়া ডাগলাসকে বলিলেন “মহাশয়, আমরা আপনার এই অপমান দেখিয়া বড়ই দুঃখিত হইয়াছি।” ডাগলাস সোজা হইয়া বসিলেন এবং সদর্পে উত্তর করিলেন “ডাগলাসকে অপমান কে করিতে পারে? আমার আত্মাকে কোন বাহিরের লোক স্পর্শ করিতে পারে কি? আমি বলিতেছি, এই ব্যবহারে আমার বিন্দুমাত্র অসম্মান বা নিন্দা হয় নাই। যাহারা এইরূপ দুর্ব্ব্যবহার করিয়াছে তাহারাই যথার্থ নীচাশয় এবং নিন্দনীয় হইয়া পড়িয়াছে। তাহাদের হৃদয়েই কালিমা জমা হইতেছে।”