নিগ্রোজাতির কর্ম্মবীর

মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Benoy Kumar Sarkar (†1949) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন

নিগ্রোজাতির কর্ম্মবীর

প্রথম অধ্যায়

গোলামাবাদের আব্‌হাওয়া

আমি কেনা গোলাম—জাতিতে নিগ্রো। ভার্জ্জিনিয়া প্রদেশের ফ্রাঙ্কলিন জেলার কোন গোলাম-খানায় আমার জন্ম। ঠিক কবে কোথায় জন্মিয়াছিলাম, তাহা বলিতে পারি না। শুনিয়াছি একটা ডাকঘরের নিকটে আমার জন্মস্থান; এবং বোধ হয় ১৮৫৮ কিম্বা ১৮৫৯ সালে আমি ভূমিষ্ঠ হই। কিন্তু জন্মের মাস, তারিখ ইত্যাদি কিছুই জানি না। নিতান্ত ছেলেবেলার কথার মধ্যে গোলামাবাদের কাজকর্ম্ম ও চালচলনগুলিই মনে পড়ে। আর স্মরণ হয় সেই আবাদের গোলাম মহাল্লার কুঠুরিগুলি—যেখানে আমার স্বজাতিরা তাহাদের দাসজীবন কাটাইত।

নিতান্ত ঘৃণ্য, অবনত, দারিদ্র্যদুঃখময়, নৈরাশ্যপূর্ণ অবস্থার মধ্যেই আমার বাল্য-জীবন কাটিয়াছে। অবশ্য এই দুঃখ দৈন্যক্লেশের জন্য আমার মনিবদের বিশেষ কোন দোষ ছিল না। তাঁহারা অন্যান্য প্রভুগণের তুলনায় সহৃদয় ও দয়ালুই ছিলেন। তবে কেনা গোলামমাত্রের যে শোচনীয় দশা তাহাই আমাকেও ভোগ করিতে হইয়াছে। একটা ১৬ ফিট লম্বা এবং ১৪ ফিট চৌড়া কাঠের কামরার মধ্যে দাস-জাতির সকলকেই বসবাস করিতে হইত। এইরূপ একটা কুঠুরিতে আমি, আমার মাতা, এবং এক ভাই ও ভগ্নী এই চারিজন আমাদের দাস-জীবন কাটাইতাম। পরে,“যুক্তরাজ্যে”র গৃহবিবাদের ফলে দাসজাতির স্বাধীনতা ঘোষিত হয়। তখন হইতে আমরা স্বাধীন হইয়া গোলামখানা পরিত্যাগ করিয়াছি।

আমার পূর্ব্বপুরুষদের কথা কিছুই জানি না। গোলামাবাদের লোকজনেরা মাঝে মাঝে কাণাঘুষা করিত। তাহা হইতে অল্প-বিস্তর কিছু অনুমান করিয়া লইয়াছি মাত্র। আমরা আফ্রিকাবাসী। আফ্রিকা হইতে আমেরিকায় চালান দিবার সময়ে জাহাজে আমাদের পূর্ব্বপুরুষদিগকে মনিব-সম্প্রদায়ের লোকজনেরা যথেষ্ট কষ্ট দিয়াছিল। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের বৃত্তান্ত এইটুকু মাত্র জানা যায়। বলা বাহুল্য সেই যুগে গোলামজাতির বংশতালিকা, পুরাতত্ত্ব, পিতামহের জীবন-কাহিনী ইত্যাদি সংগ্রহ করিবার কোন প্রয়োজনই বোধ হইত না।

কোন উপায়ে এক ব্যক্তি আমার মাতাকে হয়ত কিনিয়া আনিয়াছিলেন। তাহার পর হইতে তিনি আমাদের প্রভু হর্ত্তাকর্ত্তা-বিধাতা। একটা নূতন গরু, ঘোড়া বা শূকর কিনিলে তাঁহার পরিবারে যেরূপ সাড়া পড়ে, আমার মাতা তাঁহাদের গোলামাবাদে প্রবেশ করিলে তাহা অপেক্ষা বেশী কিছু হৈ-চৈ পড়ে নাই।

আমার পিতার সংবাদ আমি একেবারেই কিছু জানি না। বোধ হয় তিনি কোন শ্বেতকায় পুরুষ—সম্ভবতঃ নিকটবর্ত্তী কোন আবাদের প্রভু-জাতীয় একব্যক্তি। তাঁহাকে আমি কখন দেখি নাই—তাঁহার নাম পর্য্যন্ত শুনি নাই, তিনি আমাকে মানুষ করিবার জন্য কোনরূপ চেষ্টাও কোন দিন করেন নাই। এইরূপ পিতা বা জন্মদাতা গোলামীর যুগে আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ-সমাজে অসংখ্যই ছিলেন।

আমাদের কামরাটিতে কেবল মাত্র আমাদেরই গৃহস্থালী চলিত না। এই কুঠুরিটিতে সমস্ত গোলামাবাদের জন্য রন্ধনকার্য্য সম্পন্ন হইত। আমার মাতা আবাদের সকল কুলীর জন্যই রান্না করিতেন। ঘরটা নিতান্তই জীর্ণ-শীর্ণ অতিশয় অস্বাস্থ্যকর এবং পীড়াজনক। ইহার ভিতর আলোক বা বাতাস বেশী আসিত না। কিন্তু মাঝে মাঝে ফাঁকের ভিতর দিয়া শীতকালের ঠাণ্ডা বাতাস যথেষ্ট প্রবেশ করিত। তাহার উপর, মেজেতে অনেকগুলি গর্ত্ত ছিল—তাহার মধ্যে একাধিক বিড়াল আসিয়া আশ্রয় লইত। মেজের উপর কোন কাঠের আবরণ ছিল না। মাটির উপরেই সকল কাজ-কর্ম্ম চলিত। মেজের মধ্যস্থলে একটা বড় গর্ত্ত করা হইয়াছিল। শীতকালে তাহার মধ্যে শকরকন্দ আলু রাখিয়া একটা কাঠের তক্‌তা দিয়া ঢাকা হইত। এই আলুগুদামের কথা আমার বেশ মনে আছে। এখান হইতে নাড়াচাড়া করিবার সময় দুই চারিটা আলু আমার হস্তগত হইত। সেইগুলি পরে নির্জ্জনে পুড়াইয়া খাইতাম।

রন্ধনাদির সরঞ্জাম অতি কদর্য্য রকমেরই ছিল। ‘ষ্টোভ’ দেওয়া হইত না। খোলা উননে রান্না করিতে হইত। ফলতঃ শীতকালে যেমন ঠাণ্ডা বাতাসের দৌরাত্ম্যে প্রাণে বাঁচা কঠিন হইত, তেমনি গ্রীষ্মকালে এই খোলা উননের উত্তাপ আমাদের জীবনধারণ অসম্ভব করিয়া তুলিত।

আমার বাল্যজীবনে এবং অন্যান্য হাজার হাজার গোলামের বাল্যজীবনে কোন প্রভেদই ছিল না। আমাকে এবং আমার ভাই ও ভগ্নীকে দিবাভাগে কখনই মাতা দেখিতে শুনিতে সময় পাইতেন না। খুব সকালে সরকারী কাজে হাত দিবার পূর্ব্বে এবং রাত্রে সকল কাজ সারিবার পর আমার মাতা আমাদিগের জন্য কিছু সময় করিয়া লইতেন। মনে পড়ে কোন কোন দিন রাত্রে আমার মাতা আমাদিগকে জাগাইয়া কিছু মাংস খাওয়াইতেন। কোথায় যে তিনি তাহা পাইতেন কিছুই জানিতাম না। অবশ্য আমার মনিবেরই পশুশালা হইতে জন্তুটি লইয়া আসা হইত। এই কার্য্যকে আপনারা ‘চুরি’ বলিবেন। আমিও আজকাল ইহাকে চুরিই বলিয়া থাকি। তবে যখনকার কথা বলিতেছি, তখন ইহাকে কোন দিনই চুরি ভাবিতে পারি নাই, এবং কেহ আমাকে বুঝাইতেও পারিত না যে আমার মাতা চোর। গোলামী করিলে এইরূপই ঘটিয়া থাকে। দাস-জাতির ইহা স্বধর্ম্ম।

ছেলে-বেলায় আমরা কোন দিন বিছানায় শুইয়াছি বলিয়া মনে হয় না। আমরা তিন ভাই বোন মাটিতে পড়িয়া থাকিতাম। কতকগুলি ছেঁড়া ময়লা ন্যাক্‌ড়ার বস্তার উপরে রাত্রি কাটাইতাম।

সম্প্রতি কেহ কেহ আমার বাল্যজীবনের খেলা-ধূলার কথা শুনিতে চাহিয়াছেন। খেলা-ধূলা কাহাকে বলে ছেলে-বেলায় আমি তাহা জানিতাম না। যতদূর স্মরণ করিতে পারি—প্রথম হইতে এখন পর্য্যন্ত চিরকাল খাটিতে খাটিতেই আমার জীবন চলিয়াছে। কিছু খেলিতে পাইলে বোধ হয় আজকাল বেশী কাজই করিতে পারিতাম।

মিগ্রোজাতির গোলামীর যুগে আমার বয়স নিতান্তই অল্প ছিল। আমার দ্বারা বেশী কাজ হইতে পারিত না। তথাপি আমাকে আবাদের অনেক কাজই করিতে হইত। আমি উঠান ঝাড়িতাম—এবং কৃষিক্ষেত্রের চাষীদের কাজের জন্য জল যোগাইতাম। অধিকন্তু কলে পিষিবার জন্য সপ্তাহে একবার করিয়া শস্যাদি বহিয়া লইয়া যাইবার ভার আমার উপর ছিল। এই কার্য্য বড়ই কষ্টদায়ক হইয়া উঠিত। আবাদ হইতে কল তিন মাইল দূরে। একটা ঘোড়ার পীঠের উপরে শস্যের প্রকাণ্ড বোঝা চাপান হইত—বোঝাটা ঘোড়ার দুই পার্শ্বে ঝুলিতে থাকিত। আমি মধ্যস্থলে বসিতাম। মাঝে মাঝে দুর্দ্দৈবক্রমে বোঝাটা ঘোড়ার পীঠ হইতে পড়িয়া যাইত—আমিও চীৎপাত হইয়া পড়িতাম। আমার সাধ্য ছিল না যে আমি একা সেই বোঝা অশ্বপৃষ্ঠে তুলি। একাকী নির্জ্জন রাস্তায় বহুক্ষণ বসিয়া থাকিতাম—কাঁদিয়া কাটাইতাম। হঠাৎ কোন লোক সেই দিক দিয়া গেলে তাহার সাহায্যে মাল ঘোড়ায় চড়াইয়া কলে পৌঁছিতাম। ইহাতে সময়ে সময়ে এতক্ষণ লাগিত যে কলে কাজ সারিয়া গৃহে ফিরিতে বেশ রাত্রি হইয়া যাইত। অন্ধকারপথে বড়ই ভয় পাইতাম। স্থানে স্থানে ঘন জঙ্গল ছিল—তাহার মধ্যে না কি চাকুরী ত্যাগ করিয়া শ্বেতাঙ্গ সৈন্যাদি বাস করিত। শুনিয়াছিলাম—একা পাইলেই তাহারা নিগ্রো বালকের কাণ কাটিয়া রাখিত। সুতরাং ঐ রাস্তায় যাওয়া-আসা আমার পক্ষে বিষম উৎপাত বোধ হইত। বিশেষতঃ বেশী রাত্রে ঘরে ফিরিলে আবার জুতা লাথি গালি খাওয়ার সুব্যবস্থাও ছিল।

গোলামী করিতে করিতে আমি কখনও শিক্ষালাভের জন্য বিদ্যালয়ে যাই নাই। অবশ্য বিদ্যালয়-গৃহের ফটক পর্য্যন্ত অনেকবারই গিয়াছি। আমার মনিবদের সন্তান-সন্ততিরা স্কুলে যাইত। আমি তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে পুস্তকাদি বহিয়া লইতাম। দূর হইতে দেখিতাম বিদ্যালয়ের ঘরগুলিতে ছেলে-মেয়েরা দলে দলে লেখা পড়া শিখিতেছে। সেই দৃশ্য আমার চিত্তে কি অপূর্ব্ব ভাবই না সৃষ্টি করিত! ঐরূপ একটা গৃহে প্রবেশ করিয়া লেখাপড়া করিতে পারা আমার নিকট স্বর্গ-প্রবেশের ন্যায় সুখকর মনে হইত।

আমরা যে গোলাম বা ক্রীতদাস তাহা আমি অনেকদিন পর্য্যন্ত জানিতাম না। আমাদিগকে স্বাধীন করিয়া দিবার জন্য দেশব্যাপী যে আন্দোলন চলিতেছিল তাহাও বুঝিতে পারি নাই। একদিন সকালে জাগিয়া দেখি আমার মাতা আমাদিগকে সম্মুখে রাখিয়া ভগবানের নিকট প্রার্থনা করিতেছেন:—“হে জগদীশ্বর, সেনাপতি লিঙ্কল্‌নের সৈন্যদল যেন জয়লাভ করে। হে অনাথের নাথ, আমরা সপরিবারে এবং সদলবলে যেন স্বাধীন হই। হে পতিত-পাবন, এই অবনত দাসজাতিকে বন্ধন-মুক্ত কর।”

বলা বাহুল্য, গোলামাবাদের আমার স্বজাতিরা সকলেই নিরক্ষর ছিল। কেহই লেখাপড়া, পুস্তক, গ্রন্থালয়, সংবাদপত্র ইত্যাদির ধার ধারিত না। তথাপি দেখিতাম প্রায় সকলেই দেশের কথা বেশ জানিত ও বুঝিত। যুক্তরাজ্যের মধ্যে যে একটা বিরাট বিপ্লব উপস্থিত হইয়াছে তাহা কাহারই অজানা ছিল না। কবে কোথায় কি ঘটিতেছে দাসজাতির সকলেই তাহা বুঝিতে ও শুনিতে পাইত। আমাদিগকে স্বাধীন করিবার জন্য যুক্তরাজ্যের উত্তরপ্রান্তবাসী গ্যারিসন, লাভজয় ইত্যাদি মানবসেবকগণ যে দিন হইতে আন্দোলন শুরু করেন,—আশ্চর্য্যের বিষয় সেইদিন হইতেই দক্ষিণপ্রান্তের গোলামাবাদের মহলে মহলে সংবাদ রটিয়া গেল। স্বাধীনতার আন্দোলনের দৈনিক ঘটনাগুলি গোলাম-সমাজে সুপ্রচারিত হইত।

উত্তর প্রান্তে এবং দক্ষিণ প্রান্তে এই বিষয় লইয়া লড়াই হইবার উপক্রম হইল। দক্ষিণ প্রান্তের মনিবেরা গোলামের জাতিকে স্বাধীনতা দিতে নিতান্তই নারাজ। শেষ পর্য্যন্ত দুই প্রান্তে সংগ্রাম বাধিল। এ সকল কথা গোলামেরা—আমার আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবগণ—অতি সহজেই বুঝিতে পারিত। তাহারা এই আন্দোলন ও সংগ্রামের যুগে কত রাত্রিই যে কাণাঘুষায়, গল্পগুজবে ও গুপ্ত পরামর্শে কাটাইয়াছে তাহার ইয়ত্তা নাই।

আমাদের গোলামাবাদ রেলের রাস্তা হইতে বহুদূরেই অবস্থিত ছিল—ইহার নিকট কোন বড় সহরও ছিল না। কিন্তু আমরা খবর পাইতাম যে, উদারহৃদয় সেনাপতি লিঙ্কল্‌ন্‌ যুক্তরাজ্যের সভাপতি হইবার জন্য চেষ্টা করিতেছেন। সেই সঙ্গে সঙ্গে ইহাও বুঝিতাম যে তিনি সভাপতি হইলে আমরা স্বাধীন হইব। তাহার পর যখন যুদ্ধ বাধিল, তখনও বুঝিতে পারিয়া ছিলাম যে, এই যুদ্ধের ফলের উপর আমাদেরই ভাগ্য নির্ভর করিতেছে। বুঝিতে পারিয়াছিলাম যে, লিঙ্কল্‌ন্‌ এবং তাঁহার উত্তরপ্রান্তবাসী জনগণ যদি দক্ষিণপ্রান্তবাসীদিগকে যুদ্ধে পরাস্ত করিতে পারেন, তাহা হইলে দাসজাতির গোলামী ঘুচিয়া যাইবে। এজন্য এই সংগ্রামের জয়-পরাজয়ের খবর, পাইতে আমরা অতিশয় আগ্রহান্বিত হইতাম।

ভগবানের কৃপায় আমরা সকল সংবাদই পাইতাম। এমন কি, আমাদের প্রভুরা খবর পাইবার পূর্ব্বেই অনেক সময়ে ব্যাপার বুঝিয়া লইতাম। কথাটা কিছু হেঁয়ালির মত বোধ হইবে বটে, কিন্তু রহস্য আর কিছুই নয়। শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের পরনির্ভরতাই আমাদের এ বিষয়ে বিশেষ উপকার করিত। আমরা তাঁহাদের গোলাম সত্য, কিন্তু আমাদের মনিবেরাও অনেক বিষয়ে আমাদেরই গোলাম ছিলেন। আমাদের সাহায্য না পাইলে তাঁহাদের এক পাও চলিবার ক্ষমতা ছিল না। গোলামেরাই ডাকঘর হইতে চিঠিপত্র লইয়া আসিত। সপ্তাহে দুই বার করিয়া ডাকঘরে যাওয়া-আসা করিতে হইত। সেই সুযোগে ডাকঘরের নিকট জটলা ও মজলিশ এবং খোসগল্প ইত্যাদি হইতে দাস-পত্রবাহক সকল অবস্থা বুঝিয়া লইত। ফলতঃ, প্রভুরা চিঠিপত্র পাঠ করিয়া বৃত্তান্ত জানিতে পারিবার পূর্ব্বেই গোলামমহল্লায় সংবাদ প্রচারিত হইয়া পড়িত।

মায়ে ভায়ে সকলে এক সঙ্গে বসিয়া কখনও আমি আহার করিয়াছি—এরূপ মনে হয় না। গোলামখানার খাওয়া কোন উপায়ে নাকে চোখে গোঁজা মাত্র। তাহাকে আহার বলে না। গরু ছাগল ইত্যাদি যেরূপ চরিয়া বেড়ায় এবং যেখানে যাহা পায় তাহাই খায়, আমাদেরও ভোজনব্যাপার সেইরূপই ছিল। কোন সময়ে কাজ করিতে করিতে হয়ত একটুকরা মাংস খাইলাম। কখনও বা দুই একটা পোড়ান আলু হাঁটিতে হাঁটিতে চিবাইতে হইত। মাঝে মাঝে উননের কড়া হইতেই তুলিয়া কোন দ্রব্য মুখে দিতাম। কাঁটা চামচ ইত্যাদির প্রয়োজন হইবে কোথা হইতে? ঠিক নিয়মিতরূপে যথাবিধি পানভোজনেরই যে ব্যবস্থা ছিল না! যখন কিছু বড় হইলাম, তখন বড় কুঠির সাহেব প্রভুর আহারের সময়ে পাখা টানিতে নিযুক্ত হইয়াছিলাম। এই উপায়ে মাছি তাড়াইতে তাড়াইতে মনিবপরিবারের কথোপকথন শুনিতে পাইতাম। অনেক সময়ে গুপ্তকথাও বাহির হইয়া পড়িত। লড়াই সম্বন্ধে তাঁহাদের মতামত বুঝিতে পারা যাইত। সময়ে সময়ে তাঁহাদের খানা দেখিয়া যথেষ্ট লোভও হইত। আর মনে হইত কোনও দিন ঐরূপ এক থালা অন্নব্যঞ্জন যদি আমার ভাগ্যে জুটে, তাহা হইলে আামার স্বাধীনতার চূড়ান্ত ফললাভ হইবে!

সংগ্রাম চলিতে লাগিল। আমার শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের খাওয়াপরার বড়ই কষ্ট হইল। দূরদেশ হইতে চা, কাফি, চিনি ইত্যাদি আসিলে তবে মনিবদের গৃহস্থালী চলে। কিন্তু ক্রমশঃ এ সব দুর্ল্লভ হইল। তাঁহাদের দুঃখের আর সীমা রহিল না। গোলামজাতির কিন্তু বিশেষ কোন অসুবিধা হয় নাই। কারণ আমরা অত পরমুখাপেক্ষী ত ছিলাম না। আমাদের আবাদেই যে সব শস্য জন্মিত তাহাতেই আমাদের ভরণ-পোষণ স্বচ্ছন্দে চলিত। আর শূকর পালন ত সহজেই আমরা নিজ মহাল্লায় করিতাম। কাজেই লড়াই বাধিবার পর প্রভুদের দুর্গতি দেখিয়া আমরা বিব্রত হইলাম। আমাদের অবস্থা ‘যথাপূর্ব্বং তথাপরং’। তাঁহারা অনেক সময়ে বাধ্য হইয়া চিনির পরিবর্ত্তে ময়লা গুড় দিয়াই চা খাইতেন। অনেক সময়ে আবার সেই গুড়ও যোগাইতে পারিতাম না। মিষ্ট না দিয়াই তাঁহাদিগকে অনেক দিনে চা পান করিতে হইয়াছে। আবার যখন প্রকৃত চা বা কাফিও থাকিত না, তখন তাঁহারা মুড়ি বা চিঁড়ে ভাজা অথবা অন্য কোন শস্যের গুঁড়া ভিজাইয়া ‘দুধের সাধ ঘোলে’ মিটাইতেন।

আমি জীবনে সর্ব্বপ্রথম যে জুতা পরি, তাহা কাঠের তৈয়ারী। উপরিভাগে কিছু চামড়া ছিল। তাহা পরিতে পায়ের তলায় বড়ই লাগিত। কাঠের জুতা তবুও ভাল—কিন্তু গোলামীর আমলে আমাদিগকে যে জামা পরিতে হইত তাহা অতি ভয়ঙ্কর। বোধ হয় দাঁত টানিয়া তুলিতে যে কষ্ট হয় এই জামা পরিতে তাহা অপেক্ষা কম কষ্ট হইত না। ভার্জ্জিনিয়ার গোলামাবাদে খুব মোটা খড়্‌খড়ে চটের শার্ট পরিতে দেওয়া হইত। ইহার নূতন অবস্থায় অসংখ্য কাঁটা বাহির হইয়া থাকিত। গায়ের চামড়ায় কাঁটাগুলি বিঁধিয়া অসহ্য যন্ত্রণা দিত। আমার চামড়া কিছু নরম—সেজন্য কষ্ট অত্যধিকই বোধ করিতাম। কি করিব?—বাদবিচারের অবসর ছিল না। তাহাই পরিতে হইবে নতুবা অন্য কোন গাত্রাচ্ছাদন পাইব না। আমার দাদা ‘জন’ একবার দাসমহলের পক্ষে অসামান্য উদারতা দেখাইয়াছিল। চটের নূতন জামা পরিতে আমার কষ্ট দেখিয়া সে নিজেই ১০।১৫ দিন সেটা পরিল। যখন ভিতরকার কাঁটাগুলি তাহার গায়ে লাগিয়া ঘষিয়া গেল, তখন হইতে আমি সেই জামাটা ব্যবহার করিতে লাগিলাম। এই জামাই আমার গোলামী যুগের বহুকাল পর্য্যন্ত একমাত্র পোষাক ছিল।

আমাদের দুরবস্থার এই শোচনীয় কাহিনী শুনিয়া আপনারা ভাবিতে পারেন—বোধ হয় দক্ষিণপ্রান্তের কাল গোলামেরা তাহাদের শ্বেতাঙ্গ মনিবদের উপর বড়ই বিরক্ত ছিল। সত্য কথা বলিতে পারি যে, আমরা তাঁহাদের সম্বন্ধে কখনই বেশী তীব্রভাব পোষণ করি নাই। আমরা জানিতাম যে তাঁহারা আমাদিগকে চিরকাল গোলামের অবস্থায় রাখিবার জন্যই উত্তরপ্রান্তের শ্বেতাঙ্গ মহোদয়দিগের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যাপৃত। আমরা জানিতাম যে, আমাদের মনিবেরা জিতিলে আমরা চিরজীবন গোলামীই করিতে থাকিব। তথাপি আমরা আমাদের প্রভুদের প্রতি শত্রুতাচরণ করি নাই—বরং সকল সময়ে তাঁহাদের সুখে সুখী ও দুঃখে দুঃখী হইয়াছি। আমরা কোনদিনই তাঁহাদের প্রতি সহানুভূতি ও সমবেদনার ত্রুটি করি নাই। যুদ্ধে আমার একজন যুবক মনিব মারা যান, এবং দুইজন আহত হন। ইঁহাদের পরিবারের যতটা দুঃখ হইয়াছিল—এই ঘটনায় গোলামখানায় তদপেক্ষা কম দুঃখ হয় নাই। আমার আহত প্রভুদ্বয়কে প্রাণপণে সেবাশুশ্রূষা করিয়াছি। কত রাত্রি তাঁহাদের রোগশয্যার পার্শ্বেও কাটাইয়াছি। তাহা ছাড়া, যখন আমাদের প্রভুপরিবারের পুরুষেরা সকলেই লড়াই করিতে বাহির হইয়া যাইতেন তখন আমরাই তাঁহাদের গৃহের প্রহরী থাকিতাম,— তাঁহাদের স্ত্রীপুত্রদিগকে রক্ষা করিতাম। সমস্ত পরিবারের ‘ইজ্জৎ’ এবং সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ আমাদের হাতেই থাকিত। নিগ্রোজাতির সত্যনিষ্ঠা, হৃদয়বত্তা এবং কর্ত্তব্যপরায়নতার আর কোন প্রমাণ আবশ্যক কি?

অধিক কি, নিগ্রোরা অনেকক্ষেত্রে তাঁহাদের পূর্ব্ব মনিবদিগকে অন্নবস্ত্র দিয়া মানুষও করিয়াছে। চিরদিন সকলের সমান যায় না। আজ যে রাজা কাল সে গোলাম, আজ যে দাস কাল সে প্রভু। সুখদুঃখ চক্রের মত ঘুরিতেছে। দক্ষিণপ্রান্তের শ্বেতাঙ্গ প্রভুসম্প্রদায়ের অনেকেই যুদ্ধের ফলে নিঃস্ব হইয়া পড়িয়াছিলেন। আমি জানি সেই দুঃখের সময়ে তাঁহাদের পূর্ব্বর্তন গোলামেরা তাঁহাদিগকে অর্থ সাহায্য করিত। আমি জানি এইরূপে গোলামজাতির দানে মনিব-সন্তানসন্ততিরা লেখাপড়া শিখিয়াছে। একজন মনিব-পুত্র চরিত্রহীনতার ফলে ঋণগ্রস্ত হইয়া পড়ে। আমি জানি গোলামেরা নিজেদের দারিদ্র্য সত্ত্বেও চাঁদা তুলিয়া এই পাপাত্মা প্রভু-সন্তানকে বাঁচাইয়া রাখিতে কুণ্ঠিত হয় নাই। কেহ তাঁহাকে কাফি পাঠাইয়া দেয়, কেহ বা চিনি কেহ বা মাংস দেয়। এই দানের উপর নির্ভর করিয়া সেই ব্যক্তি এখনও জীবন ধারণ করিতেছে। পুরাতন মনিবের পুত্ত্র বা দূর আত্মীয় বলিয়া যদি কোন ব্যক্তি নিগ্রোর নিকট আসিয়া উপস্থিত হয় এবং নিজের কষ্ট জ্ঞাপন করে, তাহা হইলে, আমি সদর্পে বলিতে পারি, দক্ষিণপ্রান্তে এমন কোন নিগ্রো নাই যে, তাহাকে যথাসাধ্য সাহায্য না করিবে। নিগ্রোজাতির কি হৃদয় নাই?—নিগ্রোজাতির কি কৃতজ্ঞতা নাই? কাল চামড়ার ভিতর কি পরমাত্মার সিংহাসন নাই?

আমি বলিলাম নিগ্রোরা কখনও অবিশ্বাসী ও বিশ্বাসঘাতক হয় নাই। তাহারা ধর্ম্মভীরু, কৃতজ্ঞ, কর্ত্তব্যনিষ্ঠ। তাহারা কথার দাম বুঝে, কোন প্রতিজ্ঞা করিলে তাহা ধর্ম্মবৎ পালন করে। একটি দৃষ্টান্ত দিতেছি। ভার্জ্জিনিয়া প্রদেশের একটি কাল গোলাম তাহার মনিবের সঙ্গে একটা চুক্তি করিয়া লইয়াছিল। তাহার সর্ত্তে সে নিজে মনিবের আবাদে না খাটিয়া তাহার পরিশ্রমের মূল্যস্বরূপ কিছু টাকা বৎসর বৎসর মনিবকে দিতে প্রতিশ্রুত হয়। সেই টাকা সংগ্রহ করিবার জন্য এইব্যক্তি ওহায়ো প্রদেশে স্বাধীনভাবে মজুরি করিত। বৎসর বৎসর ভার্জ্জিনিয়ায় যাইয়া, প্রভুর হাতে তাঁহার প্রাপ্য টাকা গুণিয়া দিত। ইতি মধ্যে লড়াই বাধে—লড়াইয়ের ফলে সমগ্র দাস জাতিকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়। পুরাতন চুক্তি, প্রতিজ্ঞা, বন্দোবস্ত ইত্যাদি সবই ভাঙ্গিয়া ফেলা হয়। কোন প্রভুই তাঁহার পূর্ব্বর্তন কোন গোলামকে কোন বিষয়ের জন্যই ধরিয়া বাঁধিয়া রাখিতে বা খাটাইতে পারিবেন না—এই আইন যুক্তরাজ্যের মন্ত্রণাসভা হইতে জারি হয়। সুতরাং এই গোলামটি যদি এই সুযোগে তাহার পুরাতন চুক্তি অমান্য করিত এবং প্রভুকে বাকী টাকা দিতে অস্বীকার করিত, তাহা হইলে কোন আইনে তাহাকে দোষী সাব্যস্থ করা যাইত না। কিন্তু আপনারা শুনিয়া আশ্চর্য্য হইবেন যে এই ব্যক্তি যত দিন পর্য্যন্ত তাঁহার ঋণ পরিশোধ করিতে না পারিয়াছিল, ততদিন পর্য্যন্ত পূর্ব্বেকার প্রতিজ্ঞা মত ভার্জ্জিনিয়ায় যাইয়া প্রভুর নিকট টাকা দিয়া আসিত। এমন কি, সুদের শেষ কপর্দ্দক পর্য্যন্তও সে দিয়া আসিয়াছিল। প্রতিজ্ঞার মূল্য নিগ্রোরা বুঝে না কি? এই কৃষ্ণকায় নিগ্রো বুঝিয়াছিল যে, সে স্বাধীন হইয়াছে বটে, প্রতিজ্ঞা ভাঙ্গিলে এখন তাহার কোন দোষই হইবে না। কিন্তু সে শারীরিক স্বাধীনতা অপেক্ষা চিত্তের ও আত্মার স্বাধীনতাকেই বেশী সম্মান করিল। সমাজে স্বাধীনভাবে বিচরণ করিবার পূর্ব্বে সে আধ্যাত্মিক মুক্তি অর্জ্জন করিয়া লইল।

তবে কি নিগ্রোরা স্বাধীনতা চাহিত না? গোলামের জাতি গোলামীগিরিতেই কি তন্ময় হইয়া গিয়াছিল? গোলামী ছাড়াইয়া উঠিতে কি আমার স্বজাতিরা ইচ্ছাই করিত না? প্রকৃত প্রস্তাবে তাহাদের হৃদয়ে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা অতিশয় বলবতীই ছিল। আমি এমন একজন নিগ্রোকেও জানি না যে স্বাধীন হইতে ইচ্ছা করিত না। আমি এমন একজন গোলামেরও কথা শুনি নাই যে গোলামীতেই লাগিয়া থাকিতে চাহিয়াছিল।

দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ দুর্ভাগ্য জাতি মাত্রেরই দুঃখ দেখিয়া আমি মর্ম্মে মর্ম্মে কষ্ট অনুভব করি। এইরূপে শৃঙ্খলিত জাতির অশেষ দুরবস্থা। কোন কারণে একবার পরাধীন হইয়া গেলে সে জাতি শীঘ্র সেই অবস্থা কাটিয়া উঠিতে পারে না। তাহাদের সমাজ-বন্ধন, তাহাদের পারিবারিক জীবন সকলই এই পরাধীনতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়াইয়া যায়। অন্নসংস্থানের উপায়গুলিও এই দাসত্বের সর্ব্বমুখী প্রভাবের অধীন হইয়া পড়ে। চলিতে ফিরিতে গেলেও সেই প্রভাব ভুলিয়া থাকা যায় না। কাজেই দাসজাতির পক্ষে স্বাধীনতা লাভকরা বড় সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। আমি এই কারণে আমার প্রভুদের সম্বন্ধে কখনও কোন শত্রুভাব পোষণ করি নাই। দাসত্ব অনেকটা জীবনযাপনের স্বাভাবিক আবহাওয়ার মধ্যেই দাঁড়াইয়া গিয়াছিল। দাসত্ব প্রথা বাদ দিয়া সেই যুগের যুক্তরাজ্যে কোন অনুষ্ঠানই চলিতে পারিত না। যুক্ত রাজ্যের কৃষি-শিল্প-বাণিজ্য, সমাজ, ধর্ম্ম সবই গোলামী-প্রতিষ্ঠানকে অবলম্বন করিয়া গড়িয়া উঠিতেছিল। ফলতঃ এই গোলামীগিরিকে দোষ দেওয়া সত্যসত্যই বড় অবিচারের কার্য্য।

এমন কি, আমি এ কথা বলিতেও বাধ্য যে, গোলামীর ফলে নিগ্রোজাতির যথেষ্ট উপকারই সাধিত হইয়াছে। দাসত্বের আবহাওয়ায় আমাদের অতি উচ্চ অঙ্গের শিক্ষালাভ হইয়াছে। আমাদের শরীর ও স্বাস্থ্য অনেকটা পুষ্ট হইয়াছে—আমরা নিয়মিতরূপে প্রণালীবদ্ধভাবে কাজ করিতে শিখিয়াছি। আমাদের কর্ম্মপটুত্ব জন্মিয়াছে। আমরা অনেকটা চিন্তাশীল হইয়াছি। কৃষি ও শিল্পবিদ্যার আমাদের ‘হাতে-কলমে’ শিক্ষালাভ হইয়াছে। আমাদের নৈতিক চরিত্রও কিছু গঠিত হইয়াছে—ধর্ম্মভাবও জাগিয়াছে। আমেরিকার গোলামাবাদগুলির-আব্‌হাওয়া আমাদের পক্ষে প্রকৃত প্রস্তাবে একটি বিদ্যালয়স্বরূপই ছিল। আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ মনিবদিগকে এজন্য আমি সর্ব্বদা সম্মান করিয়াই আসিয়াছি।

আমি গোলামী-প্রথার পক্ষপাতী নহি—দাসত্ব-প্রথা ভাল এ কথা আমি বলিতে চাহি না—সংসারে গোলামীগিরির আবশ্যকতাও আমি স্বীকার করিতে পারিব না। আমি জানি আমার প্রভুরা আমাদিগকে ধর্ম্মভাবে অনুপ্রাণিত হইয়া দাসত্ব-শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেন নাই। আমি জানি যে তাঁহারা নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্যই আমাদিগকে গোলাম করিয়া রাখিয়াছিলেন। আমি জানি—আমরা যে কোন দিন মানুষ হইয়া উঠিব তাহা ইঁহারা স্বপ্নেও ভাবেন নাই—এবং মানুষ করিয়া তুলিবার জন্য সজ্ঞানে কোন চেষ্টাও করেন নাই। আমি কেবল এই মাত্র বলিতে চাহি যে, ভগবানের কর্ম্মকৌশল বিচিত্র। জগদীশ্বর যাহা করেন সবই মঙ্গলের জন্য। প্রথম দৃষ্টিতে যাহা তিক্ত ও কঠোর, পরিণামে তাহাই মধুময় ফল প্রসব করে। আমাদের অজ্ঞাতসারে এই উপায়ে জগতের মহৎকর্ম্মগুলি নিষ্পন্ন হইয়া যায়। ভগবানের অপার করুণায় বিশ্বে কত অসম্ভব সম্ভব হইতেছে। মানুষ, অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি বিধাতার মঙ্গলহস্তে যন্ত্রের ন্যায় চালিত হইয়া তাঁহারই ইচ্ছা পূর্ণ করিতেছে। এই আশাতত্ত্ব প্রচার করিবার জন্য এত কথা বলিলাম।

আজ কাল লোকেরা আমার জিজ্ঞাসা করে—“তুমি এই ঘোরতর দৈন্য, অজ্ঞতা, ও কুসংস্কাররাশির মধ্যে থাকিয়াও নিগ্রোজাতির ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে কিরূপে এত আশান্বিত?” আমার একমাত্র উত্তর এই যে, আমি ভগবানের মঙ্গলবিধানে বিশ্বাসবান্। যাঁহার করুণায় নানা দুর্দ্দৈবের ভিতর দিয়া আমরা এতদূর উঠিয়াছি তাঁহারই করুণায় আমরা আরও উন্নত হইব। নিগ্রো-জাতি জগতের বিরাট কর্ম্মক্ষেত্রে তাহার স্বকীয় কৃতিত্ব দেখাইয়া জগদীশ্বরের অসীম ক্ষমতার পরিচয় দিবে।

আমি বলিলাম গোলামীর ফলে আমাদের যথেষ্ট উপকার হইয়াছে। অবশ্য অপকারও কম হয় নাই। কিন্তু আমার বিশ্বাস—আমাদের শ্বেতাঙ্গ প্রভু মহোদয়গণেরই ক্ষতি বেশী হইয়াছে। মনিব মহাশয়েরা বিলাসে ডুবিতে লাগিলেন। শারীরিক পরিশ্রম তাঁহাদের কষ্টকর বোধ হইত। বড় মহলে খাটিয়া খাওয়া একটা নিন্দনীয় কার্য্য বিবেচিত হইত। ক্রমশঃ তাঁহারা সকল বিষয়ে স্বাবলম্বন, এবং আত্মশক্তিতে বিশ্বাস হারাইলেন। প্রভুগণের সন্তানেরা কেহই কোন কৃষি বা শিল্পের পটুত্ব লাভ করিতে শিখিল না। মনিবের কন্যারা কেহই রাঁধিতে, শেলাই করিতে অথবা ঘর ঝাড়িতেও শিখিল না। সকল কাজই দাসেরা করিত। কিন্তু গোলামদিগের স্বার্থ আর কতটুকু? তাহারা কোন উপায়ে কাজ সারিয়া মনিবকে সন্তুষ্ট করিতে চেষ্টা করিত মাত্র। সুচারুরূপে বুদ্ধি খাটাইয়া কাজ করিতে দাসেরা শিখিত না। ফলতঃ, প্রভুপরিবারে কোন শৃঙ্খলা দেখিতে পাইতাম না। লক্ষ্মীশ্রী যাহাকে বলে মনিবমহলের গৃহস্থালীতে তাহার পরিচয় পাওয়া যাইত না। ঘর ভালরূপ পরিষ্কৃত থাকিত না। জানালার খড়খড়িগুলি ভগ্নাবস্থায় বহুদিন পড়িয়া থাকিত। জানালার খিল না থাকিলে তাহা লাগাইবার জন্য কেহই মাথা ঘামাইত না। যাহা যেখানে পড়িত তাহা সেখানে সেই অবস্থাতেই পচিত। খাওয়া দাওয়ারও সুখ মনিব-মহলে দেখি নাই। কোন দিন ঝাল বেশী পড়িত—নুন কম পড়িত। কখনও তাঁহারা মাংস আধ কাঁচাই খাইতেন—কোন দিন বা বেশী পোড়া খাদ্যই তাঁহাদের কপালে জুটিত। অর্থব্যয় কম হইত না—সকল বিষয়েই অপব্যয় যৎপরোনাস্তি হইত। পূর্ব্বেই বলিয়াছি লক্ষ্মীশ্রী মনিব-মহল হইতে বিদায় লইয়াছিল।

ক্রমশঃ দেখা গেল যে, গোলামেরাই মনিবসমাজ অপেক্ষা বেশী সুখে আছে। যে সময়ে মনিবেরা বিলাসসাগরে ভাসিয়া অকর্ম্মণ্য ও নিস্তেজ হইয়া পড়িতেছিলেন, সেই সময়ে গোলামেরা সকলেই কর্ম্মনিষ্ঠা, পরিশ্রম-স্বীকার, ইত্যাদি সদ্‌গুণ অর্জ্জন করিতেছিল। যখন তাহারা স্বাধীনতা পাইল তাহাদের পক্ষে নবজীবন আরম্ভ করিতে বিশেষ কোন কষ্ট হইল না। গোলামীর যুগের শিক্ষাই স্বাধীনতার যুগের কাজকর্ম্মের জন্য তাহাদিগকে প্রস্তুত করিয়া তুলিয়াছিল। কেবলমাত্র পুঁথিগত বিদ্যারই তাহাদের অভাব ছিল। তাহা ছাড়া অনেক বিষয়েই তাহাদের চরিত্র ও বুদ্ধি মার্জ্জিত হইয়াছিল। বিশেষতঃ তাহারা কোন না কোন কৃষিকর্ম্মে বা শিল্পকার্য্যে অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু মনিব মহাশয়দের অবস্থা বড়ই শোচনীয় হইল। তাঁহারা গোলামদিগকে খাটাইতে খাটাইতে নিজেরাই সকল বিষয়ে যথার্থ গোলাম, পরমুখাপেক্ষী ও পরনির্ভর হইয়া পড়িয়াছিলেন।

দেখিতে দেখিতে লড়াই শেষ হইয়া গেল। আমরা মুক্তি পাইলাম। গোলামাবাদে মহা আনন্দের রোল উঠিল। আমরা যে স্বাধীন হইতে পারিব সংগ্রামের অবস্থা দেখিয়া ইতিপূর্ব্বেই অনুমান করিতে পারিয়াছিলাম। কারণ প্রায়ই দেখিতাম দক্ষিণপ্রান্তের মনিবেরা হারিয়া গৃহে ফিরিতেছেন— কেহ পলাইতেছেন—কেহ ঘরবাড়ী সামলাইবার ব্যবস্থা করিতেছেন। উত্তরপ্রান্তের ইয়াঙ্কি সৈন্যেরা দলে দলে গোলামাবাদগুলি দখল করিতে আসিবে—এইরূপ ভাবিয়া আমাদের প্রভুগণ টাকা-কড়ি মাটির মধ্যে পুঁতিয়া রাখিতে আরম্ভ করিলেন। আমরাই এই লুক্কায়িত ধনের পাহারায় নিযুক্ত হইলাম। আমরা ইয়াঙ্কি সৈন্যগণকে অন্ন বস্ত্র জল ইত্যাদি সকল জিনিসই দিতাম—কিন্তু সেই লুক্কায়িত ভাণ্ডার কাহাকেও দেখাই নাই। কারণ আমাদিগকে বিশ্বাস করিয়া প্রভুরা নিশ্চিন্ত হইয়াছেন।

যতই দিন অগ্রসর হইতে লাগিল আমরা গলা ছাড়িয়া গান সুরু করিলাম। আগে গুন্ গুন্‌ করিয়া গাহিতাম মাত্র। ক্রমশঃ আওয়াজ বাড়িল—সন্ধ্যার আমোদ গভীর রাত্রে শেষ হইতে লাগিল। স্বাধীনতা পাইবার পূর্ব্বেই অনেকটা স্বাধীনতা ভোগ করিতে লাগিলাম। এই আনন্দ-উৎসবের সময়ে আমরা স্বাধীনতার গানই গাহিতাম। পূর্ব্বেও আমরা অনেক সময়ে স্বাধীনতার গান গাহিয়াছি। কিন্তু তখন যদি কেহ স্বাধীনতার অর্থ জিজ্ঞাসা করিত আমরা তাহাকে বুঝাইয়া দিতাম যে তাহা পরলোকের স্বাধীনতা মাত্র— আত্মার মুক্তি মাত্র। এক্ষণে আমরা আর সেই আবরণ রাখিলাম না। এক্ষণে আমরা সোজাসুজি বলিতাম যে স্বাধীনতার অর্থ এই জগতেরই স্বাধীনতা—এই ভৌতিক শরীরেরই মুক্তি—অন্নবস্ত্র, চলা-ফেরা ইত্যাদি সকল বিষয়ের বন্ধনহীনতা।

সেই মহা আনন্দের দিনের পূর্ব্ব রাত্রে গোলামখানার মহলে মহলে সংবাদ পাঠান হইল “কাল সকালে প্রভুদের বড় কুঠিতে একটা বিশেষ সম্মিলন হইবে। তোমরা সকলেই উপস্থিত হইও।” সেই রাত্রে আমাদের আর ঘুম হইল না। সকালে উঠিয়াই আমরা প্রভুর গৃহে সমবেত হইলাম। দেখিলাম মনিব-পরিবারের সকলেই বারান্দায় দাঁড়াইয়া বা বসিয়া আছেন। সকলকেই যেন কিছু চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন দেখিলাম—কিন্তু কাহাকেও বিশেষ দুঃখিত বলিয়া বোধ হইল না। বরং মনে হইতে লাগিল যে তাঁহারা আর্থিক ক্ষতির জন্য বেশী চিন্তা করিতেছেন না—তাঁহারা যে এতদিনের সঙ্গী ও আত্মীয়গণকে একদিনে বিদায় দিবেন সেই দুঃখেই তাঁহাদের চিত্ত ভরিয়া রহিয়াছে। আর দেখিলাম একখন নূতন পুরুষকে, ইনি বোধ হয় যুক্তরাজ্যের কোন কর্ম্মচারী। তিনি একটা লম্বা কাগজ হাতে করিয়া একটা ক্ষুদ্র বক্তৃতা করিলেন। তার পর সেই কাগজ হইতে পাঠ করিলেন—স্বাধীনতার ঘোষণা।

পড়া শেষ হইয়া গেল, আমাদিগকে বলা হইল যে আমরা স্বাধীন হইয়াছি। যাহার যেখানে ইচ্ছা যাইতে পারি। এখন হইতে যাহার যে কাজ ভাল লাগে সে সেই কাজই করিতে পারে। আমার মাতা আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তাঁহার চক্ষু হইতে আনন্দাশ্রু ঝরিতে লাগিল। তার পর তিনি বলিলেন যে, এই দিনের জন্যই তিনি এত কাল প্রার্থনা করিয়াছেন। তাঁহার বিশেষ দুঃখ এই ছিল যে, বোধ হয় তিনি এই সুখের দিন দেখিবার পূর্ব্বেই মারা যাইবেন।

কিয়ৎকাল সর্ব্বত্র নাচানাচি এবং ধন্যবাদের পালা পড়িল। আনন্দের আর সীমা নাই—বিকট উল্লাসে সকলেই যেন অধীর। কিন্তু প্রতিহিংসা বা মনিবদের প্রতি বিরুদ্ধতাচরণ করিবার প্রবৃত্তি কোথায়ও লক্ষ্য করি নাই।

আনন্দের ধ্বনি ক্রমশঃ মন্দ হইতে লাগিল। পরে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত গোলাম মহলে চিন্তা আসিয়া জুটিল। স্বাধীন ত হইলাম। কিন্তু স্বাধীনতার দায়িত্ব ত বড় কম নয়? স্বাধীন ভাবে চলিতে ফিরিতে হইবে—স্বাধীন ভাবে অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করিতে হইবে। নিজে মাথা খাটাইয়া নিজ নিজ অভাব মোচন করিতে হইবে—নিজ বাহুবলে ও নিজ চরিত্রবলে গৃহস্থালী, পরিবার-পালন, সস্তানরক্ষা, সমাজ-ব্যবস্থা, ধর্ম্ম-কর্ম্ম সকলই চালাইতে হইবে। এ যে বিষম দায়িত্ব। দশ বৎসরের একটি বালককে যেন তাহার বাপ মা বলিলেন যে “বাছা তুমি নিজ শক্তিবলে যাহা পার কর—চরিয়া খাও—আমাদের কোন সাহায্য, পাইবে না!” আমাদের পক্ষেও ঠিক যেন এইরূপ আদেশ হইল। ইহা অনুগ্রহ কি নিগ্রহ ভুক্তভোগী ভিন্ন কে আর তাহা বুঝিবে?

সমগ্র য়্যাংগ্লো-স্যাক্‌সন জাতি হাজার বৎসরেও যে সকল সমস্যার মীমাংসা এখনও সুন্দররূপে করিয়া উঠিতে পারে নাই, নিগ্রোজাতির ঘাড়ে সেই সমস্যার সমাধান করিবার ভার হঠাৎ চাপাইয়া দেওয়া হইল! কাজেই দেখিতে দেখিতে স্বাধীনতালাভের আনন্দ গোলামাবাদের মহলে মহলে গভীর দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগে পরিণত হইবে তাহাতে আর আশ্চর্য্য কি? যে স্বাধীনতারত্নের জন্য তাহারা অনেকে এতদিন অশ্রু ফেলিয়াছে, আজ যখন তাহা সত্য সত্যই তাহাদের করতলগত হইল, তখন যেন তাহারা ভাবিতে লাগিল—“ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি।” অনেকের বয়স প্রায় ৭০/৮০ বৎসর। তাহারা নূতন করিয়া জীবন আরম্ভ করিতে সম্পূর্ণ অপারগ। ইহাদের পক্ষেই কষ্ট সর্ব্বাপেক্ষা বেশী। অধিকন্তু, তাহারা এত কাল মনিবদের সেবা করিয়া তাঁহাদের প্রতি সত্য সত্যই অনুরক্ত হইয়া পড়িয়াছিল— তাঁহাদের সঙ্গে আত্মীয়তার নিবিড় বন্ধন জন্মিয়াছিল। তাঁহারা যে ইহাদের আপন হইতেও আপন। তাঁহাদের পারিবারিক সুখে ইহারা যে কতই না সুখ অনুভব করিয়াছে এবং দুঃখে কতই না কষ্ট ভোগ করিয়াছে। যাঁহাদের সঙ্গে বসবাস করিয়া অর্দ্ধ শতাব্দী কাটিয়াছে, তাঁহাদের মায়া যে কোন মতেই ছাড়ে না। সমস্ত গোলামাবাদের আব্‌হাওয়াতেই তাহাদের জীবন পুষ্ট হইয়াছে। তাহাদের হৃদয়ের শিকড়গুলি প্রভুর পুত্র-কন্যায় এবং মনিবের সম্পত্তিতে দৃঢ়ভাবেই প্রবেশ করিয়াছে। সেই হৃদয়ের সম্বন্ধ একদিনে ছিঁড়িয়া ফেলা কি সম্ভবপর? সেই প্রেমের বন্ধন ছিন্ন করিলে কি তাহারা বাঁচিতে পারে?

দ্বিতীয় অধ্যায়

আমার বাল্য-জীবন

স্বাধীনতা লাভের পর দক্ষিণ প্রান্তের গোলামেরা তাহাদের কর্ত্তব্য স্থির করিতে লাগিল। প্রথম সাব্যস্থ হইল যে তাহাদের নামগুলি পরিবর্ত্তন করা আবশ্যক। গোলামী যুগের নাম রাখা আর কোন মতেই যুক্তি সঙ্গত নয়। আর একটা প্রস্তাবেও সকলেরই যথেষ্ট আগ্রহ দেখা গেল। তাহারা স্থির করিল যে কিছু দিনের জন্য গোলামাবাদের বাহিরে যাইয়া তাহাদের বাস করা আবশ্যক। তাহা হইলেই তাহারা সত্য সত্য স্বাধীন হইয়াছে কিনা সহজে বুঝিতে পারা যাইবে। বিশষতঃ গোলামখানার গণ্ডীর বাহিরে যাইতে পারাটাই তাহাদের নব প্রাপ্ত স্বাধীনতার প্রথম লক্ষণ বিবেচিত হইবে।

গোলামীর যুগে দাসগণের নামগুলিও গোলামীসূচক ছিল। তাহাদের নামের আগে পিছে কোন পদরী বা সম্মান বা জাতি বা ব্যবসায় বা ধর্ম্মবাচক কোন শব্দ সংযুক্ত থাকিত না। একটি মাত্র শব্দেই তাহাদের নাম প্রকাশিত হইত। কেহ ‘জন,’ কেহ বা ‘সুসান,’ কেহ ‘হরা,’ কেহ বা ‘পদা,’ ইত্যাদি। বড় জোর প্রভুর উপাধি বা পদবী এই সকল নামের সঙ্গে সংযুক্ত হইত। প্রভুর পদবী ‘হ্যাবরে’ থাকিলে, তাঁহার দাসেরা ‘হ্যাবারের জন’ বা ‘জন হ্যাবার’ ইত্যাদি নামে অভিহিত হইত। ‘জন’ ত হ্যাবারের সম্পত্তি বিশেষ। হ্যাবারের কুকুর বলিলে কুকুরে হ্যাবারে যেরূপ সম্বন্ধ বুঝায় এবং কুকুরকে যেরূপ সহজে চিনিয়া লওয়া যায়, ‘হ্যাবারের সুসান’ এই নামেও সুসানের সঙ্গে হ্যাবারের সেইরূপ সম্বন্ধই বুঝাইত এবং সেইরূপ সহজেই দাস মহল হইতে সুসান গোলামকে চিনিয়া লওয়া যাইত। বলা বাহুল্য এরূপ নামকরণে স্বাধীনতার গন্ধ মাত্র নাই—ব্যক্তি একটি নির্জ্জীব পদার্থ স্বরূপ, কেনা গোলাম মাত্র। প্রভু যেন তাহার কপালে একটা দাগ দিয়া নিজ সম্পত্তির হিসাব ও চিহ্ন রাখিয়াছেন মাত্র।

সুতরাং পুরাতন নাম বর্জ্জন এবং নূতন নাম গ্রহণই স্বাধীন নিগ্রোর সর্ব্ব প্রধান কর্ত্তব্য নির্দ্ধারিত হইল। প্রভুদের নাম নিজ নিজ নাম হইতে তুলিয়া দেওয়া হইল। তাহার পরিবর্ত্তে কেহ ‘জন এস্‌লিঙ্কল্‌ন’ কেহ ‘জন এস্ শার্ম্মান’ ইত্যাদি নাম গ্রহণ করিতে লাগিল। মধ্যস্থলের ‘এস্’ শব্দের কোন অর্থই থাকিত না। তিন শব্দের নাম রাখিতেই হইবে—সুতরাং প্রথম শব্দে প্রকৃত নাম, তৃতীয় শব্দে উপাধি বা পদবী, দ্বিতীয় শব্দে যা হয় কিছু বুঝান হইত।

তাহার পর গোলামাবাদ ছাড়িয়া সকলেই কিছু দিনের জন্য এদিক ওদিক ঘুরিতে ফিরিতে লাগিল। পরে কেহ কেহ ফিরিয়া জাসিয়া পুরাতন মনিবের সঙ্গে স্বাধীনভাবে কারবার করিবার জন্য নূতন নূতন চুক্তি বা বন্দোবস্ত করিয়া লইল। বাস্তুভিটা পরিত্যাগ করা কঠিন। যাহারা এইরূপে পুরাতন মনিবের সঙ্গেই বসতি করিতে চাহিল, তাহাদের মধ্যে বৃদ্ধদের সংখ্যাই বেশী।

পূর্ব্বেই বলিয়াছি আমি আমার জনককে কখনও দেখি নাই। আমার মাতার দ্বিতীয় পক্ষের স্বামী ছিলেন। তাঁহাকেও বড় বেশী দেখি নাই। আমরা যে মনিবের গোলাম ছিলাম তিনি সেই মনিবেরই গোলাম ছিলেন না। তাঁহার গোলামীর কর্ম্মক্ষেত্র কিছু দূরে ছিল। স্বাধীনতা পাইবার পূর্ব্বেই তিনি পলাইয়া একটা নবগঠিত প্রদেশে আশ্রয় লইয়াছিলেন। প্রদেশের নাম ওয়েষ্ট ভার্জ্জিনিয়া। সেই সময়ে লড়াই চলিতেছিল—এজন্য তাঁহার পলায়নের বিশেষ বিঘ্ন ঘটে নাই। যখন সকল দাসেরই স্বাধীনতা ঘোষিত হইল, তিনি আমার মাতাকে আমাদিগকে সঙ্গে লইয়া তাঁহার নূতন বাসভবনে আসিতে আদেশ করিলেন। ভার্জ্জিনিয়া প্রদেশে যাইতে হইলে পার্ব্বত্য প্রদেশ পার হইয়া যাইতে হয়। দূরও বড় কম নয়—প্রায় ৭০০। ৮০০ মাইল। আমাদের জামা কাপড় ইত্যাদি কিছুই ছিল না। যাহা হউক গরুর গাড়ীতে চড়িয়া আমরা সকলে যাত্রা করিলাম। অবশ্য বেশী পথ হাঁটিয়াই চলিয়াছিলাম।

আমরা পূর্ব্বে কোনদিনই এক প্রদেশ ছাড়িয়া অন্য প্রদেশে যাই নাই। এমন কি, গোলামাবাদ ছাড়িয়া বেশী দূর যাইবার অবসর বা কারণও কখন উপস্থিত হয় নাই। এইবার কাজেই আমাদের বিদেশযাত্রার সমারোহ মনে হইয়াছিল! পুরাতন মনিবগণের নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিলাম। সে দৃশ্য অতিশয় হৃদয়বিদারক। সেই চির-বিদায়ের কথা সর্ব্বদা আমার মনে আছে। তাঁহাদের সঙ্গে এখন পর্য্যন্ত আমি চিঠি-পত্রের আলাপ রক্ষা করিয়া আসিয়াছি। এখনও তাঁহাদিগকে ভুলিতে পারি নাই।

রাস্তায় কয়েক সপ্তাহ কাটিয়া গেল। খোলা মাঠে শুইতাম, গাছতলায় রাঁধিয়া খাইতাম। এক রাত্রে একটা পুরাতন ভাঙ্গাবাড়ী পাইয়া আমার মাতা তাহার মধ্যে রন্ধনের আয়োজন করিতে লাগিলেন। সেই বাড়ীতে একটা ‘ষ্টোভ’ ছিল। ষ্টোভের ভিতর আগুন জালিবা মাত্র উহার নলের ভিতর হইতে একটা প্রকাণ্ড কাল সাপ বাহির হইয়া আসিল। আমরা ‘ত্রাহি ত্রাহি’ ডাক ছাড়িয়া সেই গৃহে ভোজন-শয়নের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করিলাম। এইরূপে নানা সুখদুঃখের অভিজ্ঞতা লাভ করিতে করিতে আমাদের গন্তব্য স্থানে পৌঁছিলাম। নগরটি ক্ষুদ্র—নাম ম্যাল্‌ডেন। ইহার পাঁচ মাইল দূরেই ওয়েষ্ট ভার্জ্জিনিয়াপ্রদেশের রাজধানী বা প্রধান নগর চার্লষ্টন।

এই সময়ে ওয়েষ্ট ভার্জ্জিনিয়ায় নুনের কারবার বেশ চলিতেছিল। আমাদের নগরের ভিতরেই এবং আশেপাশে অনেকগুলি নুনের কল ছিল। এইরূপ একটা কলে আমার মাতার স্বামী একটা চাকরী পাইয়াছিলেন। তাহার নিকটেই তিনি একটা কামরাও সংগ্রহ করিয়াছিলেন। এই কামরা আমাদের পুরাতন গোলামখানার কুঠুরী অপেক্ষা খারাপই হইবে, কোন অংশেই ভাল নয়। গোলামাবাদের কুঠুরিগুলি যেরূপই থাকুক না কেন, তাহার বাহিরে আসিলে নির্ম্মল বাতাস যথেষ্টই পাইতাম। কিন্তু এই স্বাধীন বাসভবনে ইহার অভাব যৎপরোনাস্তি। কামরাগুলি এত লাগালাগি এবং চারি ধারে এত ময়লা জমিয়া থাকে যে একটা প্রকাণ্ড নরকের মধ্যে আমরা বাস করিতেছি মনে হইত।

আমাদের প্রতিবেশীদের মধ্যে সাদা কাল দুই প্রকার লোকই ছিল। সাদা চামড়ার লোকেরা অবশ্য শ্বেতাঙ্গ-সম্প্রদায়ের অতি নিম্নশ্রেণীর অন্তর্গত। তাহাদের না ছিল বিদ্যাবুদ্ধি, না ছিল পরিচ্ছন্নতা, না ছিল ধর্ম্ম-ভয়। বরং অধর্ম্ম, অস্বাস্থ্য, অজ্ঞতা এবং কুসংস্কার যেন সেই আবহাওয়ার মধ্যে অপ্রতিহতগতিতে বিরাজ করিত।

পাড়ার প্রায় সকলেই নুনের কলে কাজ করিত। আমার বয়স অত্যন্ত অল্পই ছিল। তথাপি আমার মাতার স্বামী আমাকে একটা কাজে লাগাইয়া দিলেন। আমার দাদাও একটা কাজে লাগিয়া গেল। আমাকে প্রত্যূষে চারিটা হইতে কাজ করিতে হইত।

এই নুনের কলে কাজ করিতে করিতে আমার প্রথম কেতাবীশিক্ষা লাভ হয়। নুন বস্তাবন্দি করিবার পর বস্তার গায়ে একটা করিয়া নম্বর বসাইবার নিয়ম ছিল। আমার অভিভাবকের চিহ্ন ছিল ১৮। প্রতিদিন কলের কাজ শেষ হইবার সময়ে কলের একজন বড় সাহেব আসিয়া আমার অভিভাবকের বস্তাগুলির উপর ১৮ এই চিহ্ন লিখিয়। যাইত। আমি আর কোন চিহ্ন চিনিতাম না। অনবরত দেখিতে দেখিতে ১৮ চিহ্নটি আমার সুপরিচিত হইয়া গেল।

আমার প্রথম হইতেই লেখা পড়া শিখিবার বড় সাধ ছিল। শৈশবেই আমি সঙ্কল্প করিয়াছিলাম যে জীবনে যদি আর কিছুই না করিতে পারি অন্ততঃ যেন কিছু বিদ্যালাভ করিয়া মরিতে পারি। আর কখনও যদি আমি লেখাপড়া শিখি তাহা হইলে অন্ততঃ সাধারণ খবরের কাগজ এবং সাদাসিধা পুস্তকাবলী পড়িয়া বুঝিতে পারিলেই কৃতার্থ হইব। এখানে আসিবার পর আমার মাতাকে অনুরোধ করিয়া একখানা পুস্তক আনাইয়া লইলাম। ওয়েব্‌স্টারের ‘বর্ণ-পরিচয়’ বই আমার হস্তগত হইল। আমি অতি মনোযোগ সহকারে পড়িতে লাগিলাম। কোন শিক্ষকেরই সাহায্য পাই নাই। যাহা হউক, যেন তেন প্রকারেণ অক্ষরগুলি চিনিয়া ফেলিলাম। আমার মাতাই আমার এই প্রাথমিক শিক্ষালাভের চেষ্টায় একমাত্র সহায় ছিলেন। তাঁহার পুঁথিগত বিদ্যা কিছুই ছিল না সত্য—কিন্তু তাঁহার সাংসারিক জ্ঞান, অবস্থা বুঝিয়া ব্যবস্থা করিবার ক্ষমতা, সৎসাহস, দৃঢ় সঙ্কল্প, উন্নতির আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি অশেষ গুণ ছিল। কাজেই আমার উচ্চ অভিলাষে তিনি যথেষ্টই সাহায্য করিতে পারিয়াছিলেন। তাঁহার নিকট উৎসাহ না পাইলে আমার জীবনের গতি হয়ত অন্যরূপ হইত।

ইতিমধ্যে একটি নিগ্রো বালক ম্যাল্‌ডেনে আসিল। সে ওহায়ো প্রদেশের কোন বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শিখিত। তাহাকে পাইয়া আমার নিগ্রো স্বজাতিরা যেন চাঁদ হাতে পাইল। তাহার আদর দেখে কে? প্রতিদিন সন্ধ্যাকালে কাজ-কর্ম্ম সারিয়া আমাদের আবালবৃদ্ধবনিতা সকলে মিলিয়া তাহাকে ঘিরিয়া বসিতাম। সে একটা খবরের কাগজ পড়িয়া আমাদিগকে শুনাইত ও বুঝাইয়া দিত। সে আমাদের পাড়ার গুরু মহাশয় হইয়া পড়িল। তাহার এই সম্মান ও ক্ষমতা দেখিয়া আমি সত্যসত্যই তাহাকে হিংসা করিতাম। মনে হইত তাহার সমান বিদ্যার অধিকারী হইতে পারিলে আমি আর কিছু চাহি না।

ক্রমশঃ আমাদের পল্লীতে নিগ্রোদের জন্য একটা পাঠশালা খুলিবার প্রস্তাব চলিতে লাগিল। মহা ধূমধাম আরম্ভ হইল। কৃষ্ণকায়-সমাজে একটা বিদ্যালয়ের কথা এ অঞ্চলে আর পূর্ব্বে কখনও উঠে নাই। সর্ব্বত্রই আন্দোলন পৌঁছিল। প্রধান সমস্যা হইল—শিক্ষক পাওয়া যায় কোথায়? ওহায়োর সেই বালকের নামই সকলের মুখে মুখে রহিয়াছে। কিন্তু সে যে নিতান্তই চ্যাংড়া। যাহা হউক, ওহায়ো হইতে আর একজন শিক্ষিত যুবক ম্যাল্‌ডেন নগরে হঠাৎ আসিয়া দেখা দিল। তাহার বয়স সম্বন্ধে কোন আপত্তি হইল না। সে কিছুকাল সেনাবিভাগেও কাজ করিয়াছে। সুতরাং তাহাকেই শিক্ষকপদে নিযুক্ত করা হইল।

পাঠশালার খরচ চালাইবার জন্য নিগ্রোরা সকলেই মাসিক কিছু কিছু চাঁদা দিতে স্বীকৃত হইল। শিক্ষকের বেতন জোগান কঠিন। কাজেই বন্দোবস্ত হইল যে, সে প্রত্যেক পরিবারে একদিন করিয়া শয়ন ভোজন করিবে। এইরূপে চাঁদা করিয়া খাওয়ানব্যবস্থা শিক্ষকের পক্ষে মন্দ নয়। কারণ যেদিন যে পরিবারের পালা সেদিন তাহারা শিক্ষককে যথাসম্ভব ‘চর্ব্য চোষ্য লেহ্য পেয়’ না দিয়া থাকিতে পারে কি? আমার মনে আছে—আমি আমাদের পরিবারের সেই ‘মাষ্টারের দিন’ কবে আসিবে ভাবিয়া সুখী হইতাম। সেই দিন ফাঁকতালে আমারও বেশ ভাল খাদ্যই জুটিত!

এই প্রণালীতে আর কোথায়ও বিদ্যালয় হইয়াছে কি? আমি জানি না। সমস্ত জাতিটাই যেন একটা পাঠশালা—সমস্ত গ্রামটাই যেন বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অঙ্গ—পাড়ার সকল লোকই যেন বিদ্যালয়ের ছাত্র, অভিভাবক, পরিচালক। সমগ্র জাতির পক্ষে বিদ্যারম্ভ ও “হাতে খড়ী” হইল। এই উপায়ে আর কোন জাতি জগতের ইতিহাসে গড়িয়া উঠিয়াছে কি?

নিগ্রো-সমাজের কেহই এই শিক্ষার আন্দোলনে যোগদান করিতে পশ্চাৎপদ রহিল না। বৃদ্ধ, বালক, যুবা সকলেই আগ্রহের সহিত লেখাপড়া শিখিতে লাগিল। “মরিবার পূর্ব্বে যেন অন্ততঃ বাইবেল-গ্রন্থ পড়িতে পারি”—এই আকাঙ্ক্ষায় আশী বৎসরের বৃদ্ধ লোকেরাও বিদ্যালয়ে ভর্ত্তি হইল। কোনরূপে শিক্ষক পাইলেই পাঠশালা খোলা হইত। দিবাবিদ্যালয়, নৈশবিদ্যালয়, রবিবারের বিদ্যালয় ইত্যাদি নানাবিধ পাঠশালার সাহায্যে নিগ্রোপল্লীতে বর্ণ-জ্ঞান, বানান, সরল ধর্ম্ম-ব্যাখ্যা ইত্যাদি প্রচারিত হইতে লাগিল।

যাহা হউক, আমাদের জাতীয় বিদ্যালয় ত প্রতিষ্ঠিত হইল। কিন্তু আমার কপাল ফিরিল না। আমি বিদ্যালয়ে ভর্ত্তি হইতে পাইলাম না। আমার অভিভাবক আমাকে নুনের কলে খাটাইয়া অর্থ সঞ্চয় করিতে লাগিলেন। বড়ই অনুতাপের বিষয় হইত যখন আমি কল হইতে দেখিতাম যে, আমারই সমানবয়স্ক নিগ্রোবালকেরা সকালে সন্ধ্যায় স্কুলে যাওয়া আসা করিতেছে। অবশ্য আশা ছাড়িলাম না। আমি আমার সেই ওয়েব্‌ষ্টারের ‘প্রথম ভাগ’ই পূর্বের ন্যায় পড়িতে থাকিলাম।

পরে পাঠশালার গুরুমহাশয়ের সঙ্গে একটা বন্দোবস্ত করিয়া লইলাম। রাত্রে যাইয়া তাঁহার নিকটে কিছু কিছু শিখিয়া আসিতাম—এই উপায়েই আমি অনেকটা শিখিয়া ফেলিলাম। আমি নৈশবিদ্যালয়ের উপকারিতা নিজ জীবনে যেরূপ উপলব্ধি করিয়াছি আর কেহ তাহা বোধ হয় করেন নাই। এইজন্য আমি আজকাল নৈশবিদ্যালয়-প্রতিষ্ঠার এত পক্ষপাতী। এই অভিজ্ঞতার সাহসেই আমি পরে হ্যাম্পটনে এবং টাস্কেজীতে নৈশবিদ্যালয় স্থাপন করিয়াছি।

কিন্তু কেবলমাত্র নৈশবিদ্যালয়ের শিক্ষা পাইয়াই আমি কোন মতে স্থির থাকিতে পারিলাম না। আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করিলাম—দিবাভাগের বিদ্যালয়ে ভর্ত্তি হইবই হইব। কান্নাকাটি করিতে করিতে অভিভাবকের অনুমতি পাইলাম। স্থির হইল যে, আমি খুব সকালে ঘুম হইতে উঠিয়াই নয়টা পর্য্যন্ত কলে কাজ করিব। পরে বিদ্যালয়ে যাইব এবং বিদ্যালয়ের ছুটির পরেই আরও দুই ঘণ্টা কলে কাজ করিব।

আমি হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিলাম। কিন্তু বড় কঠিন ব্যাপার। পাঠশালা নয়টার সময়েই বসে অথচ আমার বাড়ী হইতে ইহার দূরত্বও কম নয়। কাজেই নয়টা পর্য্যন্ত কলে কাজ করিয়া স্কুলে পৌঁছিতে রোজই আমার দেরী হইতে লাগিল। এ অসুবিধা এড়াইবার জন্য আমি একটা ফিকির করিলাম। আপনারা আমার দুষ্টামী দেখিয়া চটিবেন। কিন্তু কি করিব? সত্য কথা বলিতেছি। আমাকে বাধ্য হইয়াই অসত্যের পথ ধরিতে হইয়াছিল। কলের আফিসে একটা ঘড়ি ছিল। সেই ঘড়ি দেখিয়া সকলে কাজ-কর্ম্মের সময় ঠিক করিত। আমি রোজ সকালে যাইয়া সেই ঘড়ির কাঁটা সরাইয়া দিতাম। ঠিক ৮॥০ সময়ে ৯টা বাজিয়া যাইত। আমি কল ছাড়িয়া যথাসময়ে পাঠশালায় পৌঁছিতাম। পরে বড় সাহেব ব্যাপার বুঝিয়া অফিস ঘরে চাবি লাগাইয়া দিলেন। আমি আর ঘড়ির কাঁটা সরাইতে পারিতাম না।

পাঠশালায় ত ভর্ত্তি হইলাম। হইয়াই বিপদ। সকল ছাত্রের মাথায়ই একটা করিয়া টুপি। কিন্তু আমার মাথায় কোন আবরণই ছিল না। মাথার টুপি দিবার প্রয়োজন আছে কি না তাহা অবশ্য আমি পূর্ব্বে কখনও চিন্তা করিতেই পারি নাই। পাঠশালায় যাইবামাত্রই আমার অভাব বুঝিতে পারিলাম। তখন আমাদের অঞ্চলে নূতন ফ্যাশনের এক টুপি উঠিয়াছে। ছেলে বুড়ো সকলেই সেই টুপি ব্যবহার করে। আমার মাতার অত পয়সা নাই। তিনি দুই টুকরা কাপড় দিয়া ঘরেই একটা টুপি শেলাই করিয়া দিলেন। আমি টুপি মাথায় দিলাম!

আমি এই ঘটনায় একটা বড় শিক্ষা পাইয়াছিলাম। তাহা আমি চিরজীবন কাজে লাগাইতে চেষ্টা করিয়াছি। আমার মাতা কখনও লোক-দেখান বাবুগিরি বা সামাজিকতা অথবা লৌকিকতার ধার ধারিতেন না। সর্ব্বদাই নিজের আর্থিক অবস্থানুসারে তিনি গৃহস্থালী চালাইতেন। অন্যান্য অনেক নিগ্রোকে দেখিয়াছি—যাহাদের পেটে অন্ন জুটে না—কিন্তু নূতন ফ্যাশনের টুপি মাথায় দিয়া বেড়াইতে না পারিলে ঘুম হয় না! এজন্য তাহারা ঋণগ্রস্ত পর্য্যন্ত হইয়া থাকে। আমার মাতার সৎসাহস দেখিয়া মোহিত হইয়াছিলাম। তিনি ধার করিয়া বাবুগিরি ও ফ্যাশনের দাস হইলেন না। তৎকালীন নিগ্রোসমাজের পক্ষে এরূপ চরিত্রবত্তা নিতান্তই বিরল। আজ অতীতের ঘটনাবলী স্মরণ করিয়া বুঝিতে পারিতেছি যে আমার সমপাঠীদের ভিতর যাহারা বাবুগিরি ও বিলাসের নূতন নূতন অনুষ্ঠানগুলি ব্যবহার করিত তাহারা পরে অনাহারে দুঃখে দারিদ্র্যে জীবন কাটাইয়াছে।

পাঠশালায় ভর্ত্তি হইবার সময়ে আমাকে আর একটা বিপদ উত্তীর্ণ হইতে হইয়াছিল। এতদিন আমাকে লোকে ‘বুকার’ বলিয়া ডাকিত। তাহাই আমার নাম জানিতাম। স্কুলে যইবা মাত্রই নাম লইয়া মহা গোলযোগে পড়িলাম। প্রত্যেক ছাত্রেরই দুইটা শব্দে নাম ডাকা হইতেছে। কাহারও বা তিন শব্দে নাম সম্পূর্ণ। আমার মাথা ঘুরিতে লাগিল। শিক্ষক মহাশয় যখন আমার নাম খাতায় তুলিবেন তখন কি বলিব? ভাবিতে ভাবিতে একটা ঠিক করিয়া লইলাম। যেই শিক্ষক আমার গোটানাম শুনিতে চাহিলেন, আমি গম্ভীর স্বরে বলিয়া দিলাম ‘বুকার ওয়াশিংটন’ যেন চিরদিন আমাকে লোকে এই নামেই জানে। পরে শুনিয়াছি, আমার মাতা আমাকে ‘বুকার ট্যালিয়াফারো’ নাম দিয়াছিলেন। কিন্তু ‘ট্যালিয়াফারো’ শব্দ কোন কারণে আমার মনে ছিল না। যখন ইহা জানিলাম তখন হইতে আমি তিন তিনটা শব্দের নাম ব্যবহার করিয়া আসিতেছি। সুতরাং আজ আমি বুকার ট্যালিয়াফারো ওয়াশিংটন।

অনেক সময়ে আমি নিজকে কোন বড় লোকের সন্তানরূপে কল্পনা করিতে চেষ্টা করিয়াছি। যেন আমার পূর্ব্বপুরুষেরা ধনীসচ্চরিত্র, সুপণ্ডিত ইত্যাদি ছিলেন। যেন উত্তরাধিকারের সূত্রে আমি বংশ গৌরব, সামাজিক কীর্ত্তি, জমিদারী ইত্যাদির অধিকারী হইয়া জন্মিয়াছি। যেন আমি একটি বনিয়াদি ঘরের সন্তান। কিন্তু এইরূপ কল্পনায় আমি বিশেষ সুখী হইতাম না। আমি বুঝি, পূর্ব্বপুরুষের গৌরবের দোহাই দিয়া যদি আমি বড় হইতে যাই তাহা হইলে আমার নিজের কৃতিত্ব কি হইল? পরের ঘাড়ে চড়িলে সকলকেই বড় দেখায়। নিজ ব্যক্তিগত চরিত্রের প্রভাব তাহাতে কিছু বুঝা যায় কি? তাহা ছাড়া উন্নতির পথে একটা বড় অসুবিধা বোধ হয় আসিয়া জুটে। সকল বিষয়ে পরের উপর নির্ভর করিবার প্রবৃত্তি জন্মে, পরের ধনে পোদ্দারি করিতে ইচ্ছা হয়। নিজে খাটিয়া নিজের কাজ নিজে সম্পন্ন করিতে সুযোগ বেশী পাওয়া যায় না। নিজের দায়িত্বজ্ঞান এবং কর্ত্তব্যবোধও কমিতে থাকে।

এই সঙ্গে আর একটা কথা বলিয়া রাখি। নিগ্রোদের পূর্ব্বগৌরব কিছুই নাই। অতীত ইতিহাসের নজির আনিয়া তাহাদের কীর্ত্তিকলাপ প্রচার করিবার কোন উপায় নাই। এমন কি, তাহাদের অতীত নাই বলিলেই চলে—যাহা আছে তাহা অন্ধকারময়, হয়ত ঘৃণ্য, নিন্দনীয়। কিন্তু তাহা বলিয়া আপনারা তাহাকে অবজ্ঞা করিতে পারেন না—তাহাদের বর্ত্তমান কার্য্যকলাপ বিচার করিতে যাইয়া নাসিকা কুঞ্চিত করিবেন না। তাহারা জাতীয় জীবন আরম্ভ করিতেছে মাত্র, সমগ্র নিগ্রোজাতির এখন শৈশব অবস্থা। কাজেই তাহাদের বিঘ্ন অনেক, অসুবিধা অনেক, অকৃতকার্য্যতার কারণ অনেক। আপনারা বহুদিন হইতে জীবন আরম্ভ করিয়াছেন, আপনারা প্রারম্ভিক যুগের নৈরাশ্য, অকৃতকার্য্যতা ইত্যাদি অতিক্রম করিয়া সফলতার পথে অনেকটা অগ্রসর হইয়াছেন। কিন্তু আমাদের এখন ‘হাতে খড়ী’র অবস্থা। আপনাদের আজকালকার কাজ-কর্ম্ম দেখিবার পূর্ব্বে সকলে ধরিয়া রাখে যে আপনারা কৃতকার্য্য হইবেন। কিন্তু আমরা কাজ আরম্ভ করিলে লোকেরা ভাবিয়া থাকে যে আমাদের অকৃতকার্য্যতাই সুনিশ্চিত। আমাদের সফলতা ‘হাতের পাঁচ’ স্বরূপ। কারণ আর কিছুই না—পৃথিবীর কর্ম্মক্ষেত্রে আপনারা প্রবীণ, আমরা নবীন, আপনাদের এখন জীবন-মধ্যাহ্ণের যুগ চলিতেছে, আমাদের জীবন-প্রভাতও বোধ হয় আরব্ধ হয় নাই।

সুতরাং অতীত ইতিহাসের সুবিধাও আছে। পূর্ব্বপুরুষগণের চরিত্র-সম্বল বর্ত্তমান কালে ব্যক্তির ও জাতির মূলধন স্বরূপ কার্য্য করে। অতীতের স্মৃতি মানুষকে বর্ত্তমানে কর্ত্তব্য দেখাইয়া দেয়, ভবিষ্যতের জন্য দায়িত্ব শিখাইয়া দেয়। আর বাপ দাদার দোহাই অত্যধিক না দিলেই আত্মসম্মান-বোধ বজায় থাকে। পূর্ব্বকীর্ত্তি খানিকটা মনে রাখিয়া চলিলেই বিশেষ উপকার পাওয়া যায়। আজকাল আপনারা কথায় কথায় শ্বেতাঙ্গ বালকবালিকা এবং নিগ্রো বালকবালিকার চরিত্র তুলনা করিয়া আমাদিগকে অবনত সপ্রমাণ করিয়া থাকেন। আমরা অনেক বিষয়ে যে হীন সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। কিন্তু একবার আপনারা কল্পনা করিয়া দেখিবেন যে আপনাদের কোন পিতামহ মাতামহ ইত্যাদি ছিল না, আপনাদের বংশকথা নাই, আপনাদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, বাস্তুভিটা ইত্যাদি কিছুই নাই। তাহা হইলে আমাদের নৈতিক চরিত্রের অবস্থা বুঝিতে পারিবেন।

যাহাদের আত্মীয়-স্বজন কেহ নাই, তাহাদের কি চরিত্র গঠিত হইতে পারে? যাহাদের পারিবারিক বন্ধন কিছু নাই, তাহারা কি চক্ষুলজ্জার ভয় করে? তাহাদের সমাজই যে নাই! যাহারা পূর্ব্বপুরুষদের কথা ভাবিতে শিখে নাই, যাহারা বর্ত্তমানে রক্তের সম্পর্ক স্বীকার করে না, যাহাদের মামা খুড়ী দিদি শ্বশুর ইত্যাদি সম্পর্কবিশিষ্ট গুরুজন নাই, যাহাদের সন্তানসন্ততির জন্য মায়া বিকশিত হইতে পারে না, তাহারা কি মানুষের ধর্ম্ম, মানুষের বিবেক, মানুষের সদসদ্‌জ্ঞান, ইত্যাদি অর্জ্জন করিতে পারে? নিগ্রোজাতির এই অবস্থা। সমাজের বা আত্মীয়গণের মুখ চাহিয়া তাহাদিগকে কোন কাজ করিতে হয় না। কাহারও গৌরব নষ্ট হইয়া গেলে সমাজে পরিবারের কলঙ্ক রটিবে, সে ভয় তাহাদের নাই। নিজে কোন কীর্ত্তির কর্ম্ম করিয়া গেলে পরিবারের দশজন এবং ভবিষ্যৎ বংশধরেরা তাহা লইয়া গৌরব করিবে—কোন নিগ্রোই এইরূপ ভাবিতে শিখে না।

আমার কথা বলিলেই সকলে বিষয়টা বুঝিতে পারিবেন। আমার মাতামহী কে ছিলেন কখনও জানি না। আমি শুনিয়াছি আমার মামা মামী, পিসা পিসী, কাকা কাকী এবং মাস্‌তুত পিসতুত খুড়তুত ভাইবোন ইত্যাদি আছেন। কিন্তু তাঁহারা কে কোথায় কি করিতেছেন কিছুই জানি না। আমাদের নিগ্রোজাতির সকলেরই পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থা এইরূপ। কিন্তু শ্বেতকায়দিগের কথা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। প্রতিপদবিক্ষেপেই তাহাদিগকে পশ্চাতে ফিরিয়া তাকাইতে হয়। তাহারা যদি একটা অন্যায় কার্য্য করিয়া ফেলে, তাহা হইলে তাহার চৌদ্দপুরুষের মুখে চুণ-কালি পড়িবে। এই জ্ঞান তাহাদের সর্ব্বদা থাকে। কাজেই প্রলোভন, অসংযম ইত্যাদি তাহারা সহজে কাটাইয়া উঠিতে পারে। যখনই কোন শ্বেতকায় ব্যক্তি কর্ম্ম আরম্ভ করে, তখনই তাহার মনে বিরাজ করিতে থাকে যে, তাহার পূর্ব্বপুরুষেরা নানা সৎকর্ম্ম করিয়া প্রসিদ্ধ হইয়াছেন, সুতরাং সেও যে সিদ্ধিলাভ করিবে তাহা ত সুনিশ্চিত। পূর্ব্বপুরুষদের কৃতকার্য্যতা বর্ত্তমান প্রয়াসের একটা মস্ত সহায়।

আমার অভিভাবক বেশী দিন আমাকে পাঠশালায় যাইতে দিলেন না। কিছুকাল পরেই আমার নাম কাটা হইয়া গেল। তখন হইতে আমি আবার সেই নৈশ-বিদ্যালয়ের শিক্ষাকেই জীবনের সম্বল করিলাম। আমার বাল্য-জীবনের সকল শিক্ষাই আমি নৈশ-বিদ্যালয়ে লাভ করিয়াছি—এ কথা বলিলে কোন অত্যুক্তি হইবে না। দিবাভাগে আমি লিখিবার পড়িবার অবসর কিছুমাত্র পাই নাই বলিলেই চলে।

অনেক সময়ে কার্য্য শেষ করিয়া নৈশশিক্ষার চেষ্টায় রত হইয়া দেখিতাম—শিক্ষক নাই। উপযুক্ত শিক্ষকের অভাবে আমাকে খুব ভুগিতে হইয়াছে। অনেক শিক্ষক এমন জুটিয়াছেন যাঁহাদের বিদ্যা প্রায় আমারই সমান! বহুকাল এরূপও কাটিয়াছে যখন রাত্রিকালে শিক্ষালাভের জন্য ৫।৬ মাইল দূরে হাঁটিয়া যাইতাম। আমার বাল্যজীবনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ছিল—যেমন করিয়াই হউক আমি শিক্ষালাভ করিব। এই জন্য নৈরাশ্য আমাকে কখনও আক্রমণ করিতে পারে নাই।

ওয়েষ্ট-ভার্জ্জিনিয়ায় বসতি করিবার সময়ে আমার মাতা একটি পিতৃমাতৃহীন অনাথ শিশুকে পোষ্যপুত্র গ্রহণ করিলেন। “নিজে শুতে ঠাঁই পায় না—শঙ্করাকে ডাকে!” আমাদের আর্থিক অবস্থা শোচনীয়—অথচ একজন নূতন লোক পরিবারে প্রবেশ করিল। আমরা তাহাকে ভাইএর ন্যায় গ্রহণ করিলাম। তাহার নাম দিলাম জেম্‌স্‌ বি ওয়াশিংটন।

নুনের কলের কাজ ছাড়িয়া একটা কয়লার খনিতে কাজে নিযুক্ত হইলাম! এই খনি হইতে কলের কয়লা জোগান হইত। কয়লার খনিতে কাজ করিলে স্বাস্থ্য একেবারে নষ্ট হইয়া যায়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কাহাকে বলে তাহা জানা যায় না। সমস্ত দিন খাটিতে খাটিতে শরীরে এত ময়লা আসিয়া জমে যে তাহা আর উঠে না। এইজন্য আমি এই কাজে বিশেষ নারাজ ছিলাম। তাহার উপর, খনির মুখ হইতে কয়লার স্তর পর্য্যন্ত এক মাইল দূর। সেই রাস্তায় অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়া চলিয়া গেলে তবে কয়লার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। সেই খানে আবার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কয়লার কামরা বা পাড়া। সেইগুলিকে অন্ধকারের মধ্যে চিনিয়া বাহির করা বড় সোজা কথা নয়। সেখানকার উত্তর-দক্ষিণ পূর্ব্ব-পশ্চিম আমি কিছুই বুঝিতে পারিতাম না। কয়লার কামরাগুলিও আমি কোন দিনই খুঁজিয়া লইতে পারি নাই। অধিকন্তু হঠাৎ যদি লণ্ঠনের আলো নিবিয়া যাইত, তাহা হইলে “ছিদ্রেষ্বনর্থা বহুলীভবন্তি” হইত। এদিক ওদিক অন্ধের ন্যায় ঘুরিয়া বেড়াইতাম—দৈবাৎ অন্য কোন কুলীর দেখা পাইয়া পথ বাছিয়া লইতাম। মৃত্যুভয়ও কম ছিল না। খনির ভিতর দুর্দ্দৈব প্রায়ই ঘটিত। কোন সময়ে একচাপ কয়লা ধসিয়া পড়িয়া অসংখ্য লোকের মৃত্যুর কারণ হইত। কখনও বা বারুদ যথাসময়ের পূর্ব্বে ফাটিত। তাহাতে অসতর্ক কুলীরা মারা যাইত।

ছেলেবেলায় যখন আমি নুনের কলে অথবা কয়লার খাদে কাজ করিতাম, তখন আমি শ্বেতাঙ্গ বালকদের মনের অবস্থা এবং হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা কল্পনা করিতে চেষ্টা করিতাম। যৌবনকালেও অনেকবার শ্বেতাঙ্গ যুবকদের অন্তরের চিন্তারাশি অনুমান করিতে চেষ্টা করিয়াছি। ভাবিতাম তাহাদের উচ্চ অভিলাষকে বাধা দিবার কিছুই নাই—সংসারের সকল পদার্থ ই তাহাদিগকে বড় বড় কর্ম্মের দিকে উৎসাহিত করিতেছে। ভাবিতাম তাহারা অনন্ত প্রেম, অনন্ত কর্ম্ম, অনন্ত জ্ঞান লইয়া নাড়াচাড়া করিবার সুযোগ পায়। কোন বিষয়ে ক্ষুদ্রত্ব, পঙ্গুত্ব, নীচত্ব তাহাদিগের চিন্তা ও কর্ম্মরাশিকে স্পর্শ করিতে পারে না। বড় বড় কারবার লইয়াই তাহারা ব্যাপৃত। তাহারা চেষ্টা করিলে যুক্তরাজ্যের সভাপতি হইতে পারিতেছে—বড় বড় অনুষ্ঠানের প্রবর্ত্তক হইতেছে—বিশাল কর্ম্মকেন্দ্রের পরিচালক হইতেছে। তাহারা ধর্ম্মমন্দিরের গুরুর পদে অধিষ্ঠিত হইতে পারে, দেশশাসকের মর্য্যাদা পাইতে পারে। কেহই তাহাদিগের উদ্যম আকাঙ্ক্ষা ও আশার সম্মুখে একটা সীমা-রেখা টানিয়া দিয়া হৃদয় ভাঙ্গিয়া দিতে পারে না। আমি ভাবিতাম যদি আমার এই সকল সুযোগ থাকিত তাহা হইলে আমি সামান্য পল্লীর নগণ্য কুটিরে জন্মিয়াও ক্রমে ক্রমে সহরের নেতা, জেলার কর্ত্তা, প্রদেশের নায়ক, সাম্রাজ্যের শাসনকর্ত্তার পদে উন্নীত হইতাম। হায় আমি নিগ্রো—এই কল্পনা আমার পক্ষে উন্মত্তের প্রলাপ, মরুভূমির মরীচিকা।

ও সব বাল্যজীবন ও যৌবনের মনোভাব। আজ কিন্তু সত্য বলিতেছি—আমার ওরূপ কল্পনা বা আকাঙ্ক্ষা হয় না। আমি শ্বেতাঙ্গ মানবের সঙ্গে ঠিক ঐরূপ তুলনা করিয়া নিজের অবস্থা বুঝিতে চেষ্টা করি না। আমি শ্বেতাঙ্গ মানবের সুযোগ সুবিধা সাহায্যগুলি আদৌ হিংসা করি না। আজ প্রৌঢ় অবস্থায় আমি অতীতের ঘটনাবলী পর্য্যবেক্ষণ করিয়া বুঝিতেছি, মান, মর্য্যাদা, কীর্ত্তি, প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি মনুষ্যত্বের সত্য মাপকাঠি নয়। কোন লোক জগতে বিখ্যাত হইলেই সে কৃতকার্য্যতা লাভ করিল, আমি তাহা স্বীকার করি না, অথবা তাহার সাধনা সিদ্ধি প্রাপ্ত হইল—আমি এরূপ ভাবি না। আমি সফলতা অন্য প্রণালীতে মাপিতে শিখিয়াছি। আমি কৃতকার্য্যতার মূল্যস্বরূপ সাংসারিক যশোলাভ দেখিতে চাহি না। আমার মতে সেই ব্যক্তিই যথার্থ সফল যে অসংখ্য বাধা-বিপত্তি, বিঘ্ন-দুর্দ্দৈবের সঙ্গে সংগ্রাম করিয়াছে। কার্য্য উদ্ধার করিতে যাইয়া কোন ব্যক্তি যদি বিফল হয় তাহাতে আমি দুঃখিত হই না। তাহার প্রয়াস, তাহার সাধনা, তাহার দৃঢ়তা, তাহার কর্ত্তব্যনিষ্ঠা ইত্যাদির পরিচয় পাইলেই আমি তাহাকে কৃতকার্য্য, সফল ও সার্থকতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বলিব। হয়ত সে জগতে যশস্বী হইল না—হয়ত তাহার নাম সর্ব্বত্র প্রচারিত হইল না—হয়ত ভবিষ্যসমাজে তাহার কোন স্মৃতি থাকিবে না। তথাপি সে কৃতকার্য্য, কারণ সে দুঃখের সঙ্গে লড়াই করিয়াছে, দারিদ্র্যের বোঝা মাথায় বহিয়াছে—নৈরাশ্যের ভীতিকেই জীবনের এমকাত্র সহায় করিয়া কঠোর কর্ম্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছে।

ইহাই আমার মতে মনুষ্যত্বের কষ্টিপাথর—সফলতার মাপকাঠি। এই দিক হইতে বিচার করিয়া দেখি নিগ্রোজাতির মধ্যে জন্মিয়া আমার উপকারই হইয়াছে। আমি প্রকৃত জীবন-সংগ্রাম দেখিয়াছি—যথার্থ জীবনের আস্বাদ পাইয়াছি। নিগ্রোজীবনের আব্-হাওয়া দুঃখ-দারিদ্র্যপূর্ণ, নিগ্রোর পক্ষে বিশ্বশক্তি একটা প্রকাণ্ড সয়তান, নিগ্রোর সংসার হতাশ্বাসের লীলানিকেতন। আমি বলি মনুষ্যত্ব-বিকাশের পক্ষে, প্রকৃত জীবনগঠনের পক্ষে এই অবস্থাই অতি হিতকর। কারণ, কষ্টই মানুষের পরীক্ষক, কষ্টই মানুষের বিচারক।

এই কষ্টের জগতে যাহাকে বাস করিতে হয় তাহারই সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ পরীক্ষা হইয়া থাকে। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলেই যথার্থ মানুষ হওয়া যায়। তাই বলিতেছিলাম, আমি শ্বেতাঙ্গকে আজকাল হিংসা করি না—নিগ্রো জীবনই আমার শ্রেয়ঃ।

শ্বেতাঙ্গের কার্য্য উচ্চ অঙ্গের না হইলেও তাহার দোষ বেশী লোক ধরে না। কিন্তু নিগ্রোর কর্ম্মে যদি সামান্যমাত্র ত্রুটিও থাকে তবে তাহার জন্যই সমস্ত পচিয়া যায়। কাজেই নিগ্রো সর্ব্বদা অগ্নি-পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকিতে বাধ্য। খুব ভাল করিয়া না খাটিলে তাহার কাজ বাজারে মনোনীত হইবে না। ইহা কি তাহার উন্নতির পক্ষে কম সুযোগ? কিন্তু শ্বেতাঙ্গের “সাত খুন মাপ।” ফলতঃ তাহার তত বেশী পরিশ্রমী এবং সহিষ্ণু না হইলেও চলে।

অমি নিগ্রোই থাকিতে চাই। দুঃখের সংসারই আমার শিক্ষালয় থাকুক—জগতের সর্ব্বাপেক্ষা কঠোর সাধনাই আমার জীবনের ব্রত হউক।

আজকাল নিগ্রোজাতির অনেকেই রাষ্ট্রীয় অধিকারের দাবী করিতে শিখিয়াছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাহারা ব্যক্তিগত যোগ্যতা বাড়াইবার চেষ্টা করে না। কেবলমাত্র শ্বেতাঙ্গদিগের সঙ্গে আড়া-আড়ি করিয়া তাহাদের সমান হইতে চায়! আমি তাহাদিগকে বলি “ভাই নিগ্রো, তুমি সাদা কাল চামড়ার প্রভেদ মনে রাখিও না। নিজ কর্ত্তব্যবোধে কর্ত্তব্য করিয়া যাও। যদি শক্তি অর্জ্জন করিতে পার তোমাকে কেহই অস্বীকার করিয়া থাকিতে পারিবে না। বিশ্বের মধ্যে সেই শক্তির স্থান আছেই আছে। গুণ কখনই চাপা থাকিবে না। তাহার সম্মান হইবেই হইবে। তোমরা আজ নির্য্যাতিত পদদলিত, কিন্তু ভগবানের এই সনাতন ধর্ম্মে বিশ্বাস স্থাপন কর। দেখিবে, যথাকালে তোমার শক্তি মানবসমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করিবে।”

তৃতীয় অধ্যায়

বিদ্যার্জ্জনে কঠিন প্রয়াস

কয়লার খাদে কাজ করিতেছি, এমন সময়ে একদিন দুইজন কুলীর কথাবার্ত্তা শুনিতে পাইলাম। ইঙ্গিতে বুঝিলাম ভার্জ্জিনিয়া প্রদেশের কোন স্থানে একটা বড় রকমের নিগ্রোবিদ্যালয় আছে। আমার নিজের পল্লীর পাঠশালা অপেক্ষা বড় স্কুল-কলেজের কথা ইহার পূর্ব্বে আর শুনি নাই।

আমার আগ্রহ বাড়িল। খনির অন্ধকারের মধ্যে চুপি চুপি হামাগুড়ি দিয়া লোক দুইটির নিকটবর্ত্তী হইলাম। তাহারা বলাবলি করিতেছে যে, ভার্জ্জিনিয়ার ঐ বিদ্যালয়টি নিগ্রোদের জাতীয় বিদ্যালয়। নিগ্রো ছাড়া আর কেহ ঐ বিদ্যালয়ে ভর্ত্তি হইতে পায় না। গরিব নিগ্রো সন্তানদের জন্য বিশেষ সুবিধাও আছে। যাহারা বাপ-মার নিকট হইতে টাকাপয়সা আনিতে অসমর্থ, তাহারাও লেখাপড়া শিখিবার সুযোগ পায়। এরূপ নির্ধন ছাত্রেরা খাটিয়া পয়সা রোজগার করে। পরিশ্রম করিতে পারিলে যে কোন বালকই যথেষ্ট উপার্জ্জন করিয়া নিজের ভরণ-পোষণের খরচ নিজেই জোগাইতে পারে। বিদ্যালয়ের কর্ত্তারা এজন্য একটা নূতন কৌশল অবলম্বন করিয়াছেন। তাহা ছাড়া তাঁহারা সকল ছাত্রকে অন্যান্য বিষয় শিখাইবার সঙ্গেসঙ্গেই দুটা একটা কৃষি-শিল্পকর্ম্ম বা ব্যবসায়ও শিখাইয়া থাকেন। এই সুযোগেও ছাত্রেরা নিজের খরচ নিজেই চালাইয়া লয়। অধিকন্তু ভবিষ্যতের জন্যও তাহাদের অন্ন-সংস্থানের উপায় জানা হইয়া থাকে।

এই বিদ্যালয়ের নাম “শিক্ষক ও শিল্পবিদ্যালয়”। ভার্জ্জিনিয়ার হ্যাম্পটন নগরে ইহা অবস্থিত।

আমি তৎক্ষণাৎ স্থির করিলাম আমি ঐ পাঠশালায় ভর্ত্তি হইব। আমার পক্ষে উহা অপেক্ষা সুবিধার স্থান আর কি হইতে পারে? নিজে খরচ চালাইয়া লইব। সুতরাং অভিভাবকের আপত্তি থাকিবে কেন?

আমি হ্যাম্পটনের নাম জপিতে লাগিলাম। হ্যাম্পটন কোথায়, আমার ম্যান্‌ডেন হইতে কোন্ দিকে বা কতদূর আমি কিছুই জানি না। দিবারাত্রি শুধু সেই বিদ্যালয়ের ধ্যান করিতে লাগিলাম। আমার মনে আর কোন চিন্তা আসিল না।

কয়লার খনিতে আরও কিছুকাল কাজ করিলাম। এই সময়ে একটা নূতন চাকরীর সন্ধান পাইলাম। আমাদের এই খনি এবং নুনের কল একজনেরই সম্পত্তি ছিল, তাঁহার নাম জেনারেল লুইস্ রাফ্‌নার। রাফ্‌নারপত্নী বড় কড়া মেজাজের মনিব ছিলেন। তাঁহার চাকর কেহই টিকিত না। দুই তিন সপ্তাহের মধ্যেই সকলে পলাইয়া আসিত। দেখিলাম কয়লার খনিতে কাজ করা অপেক্ষা একটা পরিবারের চাকর হওয়া শতগুণে ভাল। আমি চেষ্টা করিয়া ১৫ টাকা মাসিক বেতনে রাফ্‌নার-পত্নীর ভৃত্য নিযুক্ত হইলাম।

রাফ্‌নার-পত্নীর নিকটে যাইতে প্রথম প্রথম আমার বড় ভয় হইত, আমি কাঁপিতে থাকিতাম। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মনিবের ‘রাশ’ বুঝিয়া লইলাম। তাঁহার বাপের বাড়ী ছিল যুক্তরাজ্যের সর্ব্ববিখ্যাত বিভাগ নিউইংলণ্ড প্রদেশে। সে অঞ্চলের লোকদিগকে “ইয়াঙ্কি” বলে। ইয়াঙ্কিরা আমেরিকার কিছু “চালে” চলেন। তাহাদের দেখিয়া শুনিয়াই যুক্তরাজ্যের অন্যান্য বিভাগের লোকেরা কায়দা-কানুন, চাল-ফ্যাশন ইত্যাদি শিখিয়া থাকেন। কাজেই ইঁহাদের মন জোগাইয়া কাজ করা যে-সে চাকরের সাধ্য নয়। রাফ্‌নার-পত্নী সকল বিষয়ে পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতা ভাল বাসিতেন। সময়-নিষ্ঠাও তাঁহার একটা বড় গুণ ছিল, তাঁহার লোকজনের মধ্যে এই গুণের অভাব দেখিলে তিনি চটিয়া যাইতেন। বাড়ী-ঘর, টেবিল-চেয়ার, থালাবাটী সবই ঝাড়া-পুছা ফিট-ফাট চাই। তাঁহার নিকট পান হইতে চূণ খসিবার জো নাই। অধিকন্তু কুঁড়েমি এবং ফাঁকি দিবার প্রবৃত্তিও তিনি দেখিতে পারিতেন না। কাজেই নিয়মিতরূপে যখনকার যাহা কর্ত্তব্য ঠিক তাহা করিলে দাসদাসীরা তাঁহার আদর পাইত।

তাঁহার নিকট আমি প্রায় দেড় বৎসর চাকরী করিলাম। এই মনিবের পরিবারে থাকিয়া আমার খুব উপকার হইয়াছে। এখানে যেরূপ শিক্ষা পাইয়াছি, তাহা অন্যান্য স্থানের শিক্ষা অপেক্ষা কোন অংশেই হীন নয়। এখানে চাকরী করিতে করিতেই অনেক দিকে আমার চরিত্র গঠিত হইয়াছে। আমি আজ কাল পল্লী বা সহরের কোনস্থানে ময়লা জমা দেখিলে তৎক্ষণাৎ নিজ হাতে পরিষ্কার করিয়া ফেলি। ঘরের কোন কোণে ছেঁড়া কাগজ বা ন্যাক্‌ড়া থাকিলে তাহা আমার নিকট বিষবৎ বোধ হয়। ঘরের বা বাড়ীর বেড়া নড়িয়া বা ভাঙ্গিয়া গেলে তাহা মেরামত করিবার জন্য এক মুহূর্ত্তও বিলম্ব করি না। কাপড় জামা ইত্যাদি পরিষ্কার করিতে আমি সর্ব্বদাই মনোযোগী। এই সকল সদ্‌গুণ আমি রাফ্‌নার-পত্নীর নিকট চাকরী করিয়াই লাভ করিয়াছি। সকল বিষয়ে শৃঙ্খলা-জ্ঞান, স্বাস্থ্যরক্ষার নিয়মপালন, এবং যখনকার যা ঠিক তখন তাহা করা এবং নানা সদভ্যাস এই পরিবারেই অর্জ্জিত হইয়াছে। এই চাকরীই আমার কিয়ৎকালের জন্য শিক্ষালয়, শিক্ষাদাতা এবং গ্রন্থপাঠস্বরূপ ছিল এরূপ বলিলে অন্যায় হইবে কি?

রাফ্‌নার-পত্নী আমার কাজ-কর্ম্ম দেখিয়া আমায় ভাল বাসিতে লাগিলেন। এমন কি, দিবাভাগের বিদ্যালয়ে যাইবার সুযোগও আমি পাইলাম। এতদিন কেবল নৈশবিদ্যালয়েই পড়িতেছিলাম। রাফ্‌নার-পত্নীর কৃপায় এক ঘণ্টা করিয়া দিনের স্কুলেও যাইতে থাকিলাম। তিনি আমার রাত্রের পড়ায়ও যথেষ্ট উৎসাহ দিতেন। তাঁহার বাড়ীতে থাকিতে থাকিতেই আমি একটা কেরোসিনের বাক্‌স আনিয়া নিজ হাতে আলমারী তৈয়ারী করিয়াছিলাম। তাহার মধ্যে দুই তিনটা থাক করিয়া লইলাম এবং এখান ওখান হইতে কতকগুলি খাতা পত্র, পুঁথি-পুস্তক সংগ্রহ করিয়া তাহাতে সাজাইয়া রাখিলাম। উহাই আমার প্রথম লাইব্রেরী বা “গ্রন্থশালা”!

সুতরাং রাফ্‌নার পরিবারে আমার দিন সুখেই কাটিতে লাগিল। আমি কিন্তু হ্যাম্পটনকে ভুলি নাই। আমার মাতা অতদূরে কোন্ অজানা স্থানে যাইব শুনিয়া ভাবিয়া আকুল হইলেন। শেষ পর্য্যন্ত যাওয়াই স্থির হইল। হাতে এক পয়সাও নাই। এত দিন আমি ও আমার দাদা যাহা কিছু রোজগার করিয়াছি, সবই গৃহস্থালীতে খরচ হইয়া গিয়াছে—এবং আমার অভিভাবক উড়াইয়াছেন। যাহা হউক, কোন উপায়ে যাইবই যাইব।

ভগবান্ সহায় হইলেন। দেখিলাম আমার পল্লীর নিগ্রোরা এই সংবাদে সকলেই আন্তরিক সুখী। তাঁহারা আমাকে আশীর্ব্বাদ করিতে লাগিলেন “নিগ্রোজাতির মুখ উজ্জ্বল কর।” তাঁহাদের আনন্দের বিশেষ কারণ ছিল। তাঁহাদের চির জীবন গোলামীতে কাটিয়াছে। কখন সুদিন আসিবে ইহা তাঁহারা স্বপ্নেও ভাবিতে পারেন নাই। অথচ কেহ বৃদ্ধ বয়সে কেহ বা প্রবীণ বয়সে একে একে নবযুগের নূতন নূতন লক্ষণগুলি দেখিতে পাইলেন। তাঁহারা স্বাধীনতা পাইয়াছেন—তাঁহাদের গ্রামে একটা জাতীয় বিদ্যালয় পর্য্যন্ত খোলা হইয়াছে। কেবল তাহাই নহে, আজ তাঁহাদের এক সন্তান ঘর বাড়ী ছাড়িয়া একটা মহাবিদ্যালয়ে লেখাপড়া শিখিতে চলিল। আজ গ্রামের এক শিশু পরিবারের স্নেহ হইতে দূরে থাকিয়া একটা উচ্চশ্রেণীর পাঠশালায় বিদ্যার্জ্জন করিতে প্রয়াসী। তাঁহাদের পক্ষে ইহা একটা সত্যযুগ বৈ কি? কাজেই কেহ আমাকে একটা রুমাল, কেহ বা একটা ডবল পয়সা, ইত্যাদি উপহার দিতে লাগিলেন।

আমি যাত্রা করিলাম। মাতাকে অত্যন্ত অসুস্থ ও রুগ্ন অবস্থায় দেখিয়াই যাইতে হইল। সঙ্গে একটা থলে। তাহার মধ্যে কাপড় চোপড় ভরিয়া লইলাম। তখন ওয়েষ্ট ভার্জ্জিনিয়া হইতে ভার্জ্জিনিয়ায় যাইবার রাস্তায় খানিকটা রেলপথ ছিল। অবশিষ্ট রাস্তা ভাড়াগাড়ী করিয়া যাইতে হয়।

ম্যাল্‌ডেন হইতে হ্যাম্পটন ৫০০ মাইল। অতদূর যাইবার পথ-খরচ আমার নাই। একদিন পাহাড়ের রাস্তায় ভাড়াগাড়িতে করিয়া যাইতেছিলাম। সন্ধ্যার পর গাড়ী একটা সাদা বাড়ীর নিকট থামিল। বুঝিলাম এটা হোটেল, আমার সহযাত্রীরা সকলেই শ্বেতকায়, আমিই একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ নিগ্রো। তাঁহারা সকলেই একে একে নামিয়া এক একটা কামরা দখল করিয়া বসিলেন। হোটেলের কর্ত্তা তাঁহাদের জন্য আয়োজন করিতে লাগিলেন। তাঁহাদের আহারের ব্যবস্থা হইতেছে এমন সময়ে ভয়ে ভয়ে আমি হোটেলের কর্ত্তার নিকট উপস্থিত হইলাম। আমার হাতে এক আধ্‌লাও ছিল না। ভাবিয়াছিলাম গৃহস্বামীর নিকট ভিক্ষা করিয়া রাত কাটাইয়া দিব। সেই সময়ে ভার্জ্জিনিয়ার পার্ব্বত্য প্রদেশে হাড়ভাঙ্গা শীত। ভাবিয়াছিলাম নিশ্চয়ই হোটেলের এক কোণে আশ্রয় পাইব। কিন্তু আমার কাল চাম্‌ড়া দেখিবামাত্রই আমার প্রতি কঠোর আদেশ হইয়া গেল—“তোমার এখানে ঠাঁই নাই।” পয়সার অভাবই আমেরিকায় একমাত্র কষ্ট নয়। সাদা চামড়ার অভাবও বড় বিষম পাপ—এই ধারণা সেই রাত্রে আমার প্রথম জন্মিল।

সারারাত্রি সেই হোটেলের সম্মুখে হাঁটিয়া গা গরম রাখিলাম। গৃহস্বামীর দুর্ব্ব্যবহারে আমি কিছুমাত্র বিচলিত হই নাই। হ্যাম্পটনের স্বপ্নই আমার সমস্ত হৃদয় ভরিয়া রাখিয়াছিল।

পথের কষ্ট আরও অসংখ্য প্রকার ভুগিয়াছিলাম। খানিকটা পদব্রজে চলিয়া, খানিকটা গাড়ীওয়ালার হাতে পায়ে ধরিয়া বিনা পয়সায় গাড়িতে চড়িয়া, খানিকটা সহযাত্রীদের নিকট পয়সা ভিক্ষা করিয়া, শেষ পর্য্যন্ত ভার্জ্জিনিয়া প্রদেশের একটা সহরে পৌঁছিলাম। তাহার নাম রিচ্‌মণ্ড, এখান হইতে আমার গন্তব্যস্থান আরও ৮২ মাইল।

রিচ্‌মণ্ডে পৌঁছিতে বেশী রাত্রি হইয়া গিয়াছিল। হাতে পয়সা নাই—তাহার উপর ছেঁড়া ময়লা পোষাক ও কাল রং। ক্ষুধায় পেট জ্বলিতেছে। কত গৃহস্থের বাড়ীতে স্থান পাইবার জন্য ভিক্ষা করিলাম। কেহই একটা ভালকথাও বলিল না। সকলেই পয়সা চায়। পয়সা দিলে তাঁহাদের বাড়ীতে শয়নভোজনের ব্যবস্থা হইতে পারে। শ্বেতাঙ্গ গৃহস্থেরা এইরূপেই অতিথিসৎকার করিয়া থাকেন! আমি নিরুপায় হইয়া রাস্তায় হাঁটিতে লাগিলাম। হাঁটিতে হাঁটিতে রুটি মাংসের দোকানে কত খাদ্যদ্রব্য সাজান রহিয়াছে দেখিতে পাইলাম। তাহা হইতে একটুকু পাইলেই আমি কৃতকৃতার্থ হইতাম। ভাবিতেছিলাম যদি এক টুকরা মাংসও আজ উহারা আমাকে ধার দেয়, তাহা হইলে ভবিষ্যতে চিরজীবন আমি যাহা কিছু উপার্জ্জন করিব সমস্তই উহাদিগকে মূল্য-স্বরূপ দিব প্রতিজ্ঞা করিতে পারি। কিন্তু আমার প্রতি কাহারও দয়া হইল না। একটা আলু বা এক টুকরা মাংস কেহই আমাকে দিল না। আমি অনাহারে কাটাইলাম।

রিচ্‌মণ্ডের প্রথম রজনীতে আমার এই অভিজ্ঞতা। আমি ক্ষুধার্ত্ত, দুর্ব্বল ও অবসন্ন ভাবে রাস্তায় ঘুরিতে ফিরিতে থাকিলাম। কিন্তু তথাপি হতাশ হই নাই—জীবনের ধ্রুব-তারাকে ভুলি নাই—হ্যাম্পটনে বিদ্যার্জ্জনের সঙ্কল্প ত্যাগ করি নাই। তার পর যখন আর পায়ে হাঁটা অসম্ভব বোধ হইল, তখন রাস্তার পার্শ্বে একটা কাঠের বড় তক্‌তার নীচে শুইয়া পড়িলাম। কোন লোক দেখিতে পাইল না। সেই রাত্রিতে কত লোক তক্তার উপর দিয়া চলাফেরা করিল। আমি মাটিতে শরীর রাখিয়া থলেটাকে বালিশ করিয়া হ্যাম্পটনের নাম জপিলাম। সকালে উঠিয়া দেখি, আমি একটা জাহাজের নিকটে রহিয়াছি। অসহ্য ক্ষুধার জ্বালা। জাহাজের কাপ্তেনের নিকট কিছু প্রার্থনা করিলাম। তাঁহার অনুমতিক্রমে জাহাজ হইতে মাল নামাইতে লাগিলাম। তারপর যথাসময়ে মজুরির মূল্য পাইয়া খাবার খাইতে বসিলাম। ওরূপ সুখের খাওয়া বোধ হয় আর কখনও আমি খাই নাই।

কাপ্তেন সাহেব আমার প্রথম কাজেই প্রীত হইয়াছিলেন। তিনি আমাকে আরও কাজ দিতে চাহিলেন। আমি রাজী হইলাম। যে মূল্য পাইতাম তাহা দিয়া দৈনিক আহারের খরচ চলিত—কিন্তু ঘরভাড়া কুলাইত না। কাজেই অল্প খাইয়া থাকিতাম—এবং রাত্রে আসিয়া সেই কাঠের তলায় মাটির উপরে শুইয়া থাকিতাম। এই উপায়ে কিছু পয়সা বাঁচিল। তাহার দ্বারা রিচ্‌মণ্ড হইতে হ্যাম্পটনে যাইবার খরচ সংগ্রহ করিলাম।

এই ঘটনার বহুকাল পরে রিচ্‌মণ্ডের নিগ্রো-অধিবাসিগণ আমাকে নিমন্ত্রণ করিয়া সম্বর্দ্ধনা করিয়াছে। সম্বর্দ্ধনা-উৎসবে অন্ততঃ দুই হাজার কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ ও রমণী যোগদান করিয়াছিল। ঘটনাচক্রে সেই কাঠের তক্তার সমীপবর্ত্তী এক গৃহে এই অভ্যর্থনা ও সাদরসম্ভাষণাদি নিষ্পন্ন হয়। সকলে অতি আন্তরিকতার সহিতই আমাকে অভিবাদন করিলেন। কিন্তু এই আনন্দের দিনে আমি সম্বর্দ্ধনা অভিবাদন প্রভৃতিতে একেবারেই যোগ দিতে পারি নাই। আমি আমার রিচমণ্ডে প্রথম পদার্পণের কথাই মনে করিতেছিলাম। সেই রজনীর অভিজ্ঞতাই আমার চিত্তে অন্যান্য সকল চিন্তার স্থান অধিকার করিয়া বসিয়াছিল। আমি সেই রাস্তার পার্শ্বের কাঠের তক্তা এক মুহূর্ত্তের জন্যও ভুলিয়া থাকিতে পারিলাম না।

কাপ্তেন মহাশয়কে যথেষ্ট ধন্যবাদ দিয়া আমি আমার তীর্থযাত্রায় আবার বাহির হইলাম। হ্যাম্পটনে পৌঁছিবার পথে এবার কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে নাই, পৌঁছিবার সময় হাতে ১৷৷৴০ পুঁজি থাকিল।

বিদ্যামন্দিরের বহির্ভাগ দেখিয়াই আমি রোমাঞ্চিত হইলাম। বড় বাড়ী যেন রাজ প্রাসাদ। বিদ্যালয়ের এই ত্রিতল ইষ্টক নির্ম্মিত গৃহ আমার হৃদয়ে একটা নব জগতের বার্ত্তা আনিয়া দিল। ধনি-সমাজ, আপনারা যদি একবার বুঝিতে পারিতেন যে, নূতন শিক্ষার্থীর চিত্তে বিদ্যালয়-গৃহের দৃশ্য কি অপরূপ ভাবলহরী সৃষ্টি করে, তাহা হইলে আপনারা বোধ হয় আপনাদের সর্ব্বস্ব উৎসর্গ করিয়া দেশের বিদ্যামন্দিরগুলিকে নানা উপায়ে সুন্দর সুশ্রী ও অলঙ্কৃত করিতে প্রবৃত্ত হইতেন। আপনারা শিশুহৃদয়ের কোমল চিন্তাগুলি কখনও কল্পনা করিয়া দেখিয়াছেন কি? নবশিক্ষার্থীর অন্তরের কথা বুঝিতে চেষ্টা করিয়াছেন কি? আমি হ্যাম্পটনের বিদ্যালয় গৃহটি দেখিয়া নূতন জীবন লাভ করিলাম—সবই যেন নূতন বোধ হইতে লাগিল—আমার চোখ একটা নূতন দৃষ্টি-শক্তি পাইল। জগতের সকল পদার্থই এক নবভাবে আমার নিকট দেখা দিল—আমি সত্যসত্যই সেই চিরবাঞ্ছিত স্বর্গ-রাজ্যে আসিয়া পড়িয়াছি।

আমি বাহিরে কাল বিলম্ব না করিয়া বিদ্যালয়ের কর্ত্তৃপক্ষের নিকট হাজির হইলাম। প্রধান শিক্ষয়িত্রী আমার বেশভূষা ইত্যাদি দেখিয়া তাঁহাদের যোগ্য ছাত্র বিবেচনা করিলেন বলিয়া রোধ হইল না। বোধ হয় বুঝিয়াছিলেন—এ একটা সঙ্, ছেলে খেলা করিতে আসিয়াছে। অবশ্য একবারে তাড়াইয়াও দিলেন না। আমি তাঁহার আশে পাশে ঘুরিতে লাগিলাম। নানাভাবে আমার যোগ্যতা, বুদ্ধিমত্তা এবং শিখিবার আকাঙ্ক্ষার পরিচয় দিতে চেষ্টা করিলাম। ইতিমধ্যে কত নূতন নূতন ছাত্র আসিয়া ভর্ত্তি হইল। আমার মনে হইতে লাগিল—আমাকে ভর্ত্তি করিলে ইহাদের কাহারও অপেক্ষা আমি নিন্দনীয় ফল দেখাইব না।

কয়েক ঘণ্টা পর শিক্ষয়িত্রী আমার উপর সদয় হইলেন। তিনি বলিলেন, “ওখানে ঝাঁটা আছে, ওটা লইয়া পার্শ্বের ঘরটা ঝাড় দাও ত।”

আমি বুঝিলাম—ইহাই আমার পরীক্ষা। রাফ্‌নার-পত্নীর গৃহে আমি যে শিক্ষা পাইয়াছি এইবার তাহার যাচাই হইতেছে। ভাল কথা—আমি মহা আনন্দে ঘর পরিষ্কার করিতে গেলাম।

ঘরটা একবার দুইবার তিনবার ঝাড়িলাম। একটা ন্যাকড়ার ঝাড়ন ছিল—তাহা হইতে ধূলিরাশি বাহির করিয়া ফেলিলাম। দেওয়ালের আশে পাশে অলি গলিতে যেখানে যে টুকু ময়লা জমিয়াছিল সমস্তই পরিষ্কার করিলাম। বেঞ্চ, টেবিল, চেয়ার, ডেস্ক ইত্যাদি কাঠের সমস্ত আস্‌বাবই ঝাড়িয়া চক্‌চকে করিয়া রাখিলাম। শিক্ষয়িত্রীকে জানাইলাম ঝাড়া হইয়াছে। তিনিও ‘ইয়াঙ্কি’রমণী। তিনি খুঁটিনাটি সর্ব্বত্রই তন্ন তন্ন করিয়া দেখিলেন। টেবিলের উপর আঙ্গুল দিয়া বুঝিলেন ময়লা কিছুই নাই। নিজের রুমাল বাহির করিয়া পরীক্ষা করিলেন—চেয়ারের কোণ হইতেও কিছু ধূলা বাহির হয় কি না। পরে আমার দিকে তাকাইয়া বলিলেন, “দেখিতেছি, ছোকরা বেশ কাজের।” আমি ‘পাশ’ হইলাম।

বোধ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করিবার সময়েও কোন বালককে এত কঠিন পরীক্ষা দিতে হয় না। হার্ভার্ড ও ইয়েল বিশ্ব-বিদ্যালয়ে ভর্ত্তি হইতে হইলে শুনিয়াছি ছাত্রদের যথেষ্ট, ‘বেগ’ পাইতে হয়। যাহারা ‘প্রবেশিকা’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া হার্ভার্ড ও ইয়েলের কলেজে লেখাপড়া শিখিবার জন্য সার্টিফিকেট পায়, তাহারা বোধ হয় আমার এই দিনের আনন্দ কিছু কিছু অনুমান করিতে পারিবে। আমিও পরে অনেক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছি। কিন্তু এই পরীক্ষার উপরই আমার ভাগ্য নির্ভর করিতেছিল। ইহার ফলেই আমার জীবনের গতি নির্দ্ধারিত হইল। এরূপ অগ্নিপরীক্ষায় আর আমি কখনও পড়ি নাই।

হ্যাম্পটনের প্রধান শিক্ষয়িত্রী, আমার পরীক্ষাকর্ত্রীর নাম ছিল কুমারী মেরী এফ্ ম্যাকি। আমাকে নিজের খরচ নিজেই চালাইতে হইবে শুনিয়া তিনি আমাকে বিদ্যালয়ের একটা খান্সামার কাজ করিতে দিলেন। আমাকে ঘরগুলি দেখিতে শুনিতে হইত, খুব সকালে উঠিয়া বাড়ীর আগুন জ্বালিয়া দিতে হইত। উনন ধরাইয়া দিতে হইত। খাটুনী যথেষ্ট ছিল, কিন্তু ইহাতে আমার ভরণপোষণের প্রায় সমস্ত খরচই পাইতাম।

হ্যাম্পটন বিদ্যালয়ের বহির্দৃশ্য পূর্ব্বে বর্ণনা করিয়াছি। এক্ষণে ভিতরকার কথা কিছু বলি। মিস্ ম্যাকি আমার জননীর ন্যায় স্নেহশীলা ছিলেন। তাঁহার সাহায্যে ও উৎসাহে আমি সেখানে অনেক উপকার পাইয়াছি। তাঁহাকে আমার জীবনের অন্যতম গঠনকর্ত্রী বিবেচনা করিয়া থাকি।

এআই অনুবাদ · মূল