মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Muktaram Vidyabagish (†1860) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন
রাজকুমারী একাকিনী অরণ্য বাসিনী হইলে কোন মেষপালক ভ্রমণ করিতে২ হঠাৎ সমীপে উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে দেখিতে পাইল এবং দয়ালু স্বভাব বশতঃ তাদৃশী দুরবস্থা দর্শনে করুণার্দ্রচিত্ত হইয়া হস্ত দ্বারা উথাপন পুরঃসর তাঁহাকে ক্রোড়ে লইল। তদনন্তর স্বীয় গৃহে গমন পূর্ব্বক গৃহিণীকে আহ্বান করত তদীয় অঙ্কে সেই সুকুমারী কুমারী সমর্পণ করিল। তাহার বনিতা কন্যার অপরূপ রূপ লাবণ্য মহামূল্য বসন ভূষণ সন্দর্শনে সাতিশয় প্রীত হইল এবং পরম স্নেহে স্তন্য দান পুরঃসর পালন করিতে লাগিল। মেষজীবী অতিসুদীন এপ্রযুক্ত কষ্টে সংসার যাত্রা নির্বাহ করিত, কন্যার গাত্রে যথেষ্ট বহু মূল্য রত্নালঙ্কার প্রাপ্ত হওয়াতে আপনার অকস্মাৎ বিপুল বিত্তাগম গোপন মানসে বাসস্থলীর পরিবর্ত্তন পূর্ব্বক দেশের অন্য খণ্ডে গিয়া বসতি করিল। এবং রাজকুমারীর আভরণ বিক্রয় করিয়া ধন সঞ্চয় পূর্ব্বক বহু২ মেষ ক্রয় করত অবিলম্বে ধনবান্ মেষপালক হইল। পরন্তু পরিদিতার প্রতি আপন সন্তান নির্বিশেষে স্নেহ করত পরম যত্নে স্ত্রী পুরুষে প্রতি পালন করিতে লাগিল তাহাতে ঐ কন্যা চৈতন্যোদয়ে মেষপালক ভিন্ন অন্য কাহার দুহিতা কি না জানিতে পারিলেন না, অবিজীবিকেই আপন জনক বলিয়া নিশ্চয় করিলেন।
বালিকা পরিদিতা দিন২ শশিকলার তুল্য বর্দ্ধমানা হইতে লাগিলেন এবং তাঁহার স্বাভাবিক কান্তি স্বতঃ সমুদিত হওয়াতে পরম সৌন্দর্য্য হইল। কুমারী মেষজীবির তনয়াপেক্ষা যদিও সদুপদেশ প্রাপ্ত হইলেন না তথাপি জননী রাজমহিষীর বিনয়ৌদার্য্য ধৈর্য্য গাম্ভীর্য্যাদি গুণ নিকর স্বভাব বশে সংক্রান্ত হওয়াতে তাঁহার মানসিক সংস্কার এবম্প্রকার পরিষ্কার ও উজ্জ্বল হইল যে তাঁহার আচরণ দর্শনে হঠাৎ কেহ মনে করিতে পারিতেন না তিনি রাজ সভায় সুশিক্ষা বা সদুপদেশ প্রাপ্ত হন নাই।
বোহিমিয়াধিরাজ পলিক্সেনিসের একটী পুত্র ছিল, তাঁহার নাম ফ্লোরাইজেল্। যুবরাজ এক দিবস মৃগয়ার্থ বহির্গত হইয়া অবিজীবির আবাসের সন্নিধানে উপস্থিত হইলে দৈবাৎ তাঁহার ও মেষপালক তনয়া পরিদিতার চারি চক্ষু একত্র হইল। রাজকুমার কামিনীর রূপ লাবণ্য অবলোকন মাত্রে মদন বাণাহত হইলেন। সেই নবীনা তরুণীর কেশ কলাপ সুদীর্ঘ ঘন তিমির চামরাপেক্ষাও অধিক চমৎকার, মুখশশী মেঘোন্মুক্ত শরন্নিশাকরবৎ পরম মনোহর, দশন পংক্তি সুমার্জ্জিত মুক্তাহার সমান, নয়ন যুগল এণ বিলোচনাপেক্ষা রমণীয় এবং কুচকুম্ভ করিকুম্ভ বিভ্রমকরী। এবম্বিধ সর্ব্বাবয়ব সৌষ্ঠব সহকারে বিনয়ৌদার্য্য গাম্ভীর্য্য সুশীলতাদি গুণ নিকর প্রকাশমান থাকাতে রাজকন্যার তুল্য প্রকৃতি দর্শনে নৃপনন্দন তদুপরি অত্যন্ত আসক্ত হইয়া পড়িলেন। এবং বেশ পরিবর্ত্তন পুরঃসর আপন নাম গোপন করিয়া দোরিক্লিস্ সংজ্ঞায় পরিচয় প্রদান পূর্ব্বক সেই দিন হইতে মেষপালকের আলয়ে যাতায়াত করিতে আরম্ভ করিলেন।
নৃপনন্দন রাজসদনে অনুক্ষণ অদর্শন হইতে আরম্ভ করিলে বোহিমিয়াধিপতি পলিক্সেনিস্ সাতিশয় শঙ্কাকুল হইলেন এবং পুত্র প্রতি মুহূর্ত্ত কোথায় গমন করে সবিশেষ বিবরণ বিদিত হইবার নিমিত্ত চর দিগকে প্রহরি নিযুক্ত করিলেন। তাহাতে অনতি বিলম্বে প্রকাশ পাইল যুবরাজ অবিজীবির পরম রমণীয়া কুমারীর প্রণয় নিগড়ে পতিত হইয়া তদাসক্ত হইয়াছেন।
অনন্তর রাজা এক দিন লিয়নিতিসের অকারণ বিদ্বেষ জনিত রোষ হইতে জীবন রক্ষক পরম প্রত্যয় নিকেতন কেমিলো মন্ত্রি সমভিব্যাহারে সেই মেষপালকের নিলয়ে গমন করিলেন যাহার নন্দিনী নৃপনন্দনের মনে বিমোহন পুরঃসর তাঁহাকে আত্ম প্রেমের বশম্বদ করিয়াছিল।
ভূপাল এবং কেমিলো উভয়ে স্ব২ পরিচ্ছদ পরিবর্ত্তন পূর্ব্বক ছদ্মবেশে বৃদ্ধ অবিজীবির ভবনে উপস্থিত হইয়া অবলোকন করিলেন তথায় মেষমুণ্ডন নামক মহোৎসব প্রবর্ত্তমান। অতএব তাঁহারা যদিও অপরিচিত তথাপি সেই পর্ব্বে প্রত্যেক অভ্যাগত ব্যক্তির প্রতি যথোচিত সম্মান দান পুরঃসর অভ্যর্থনা করণের প্রথা থাকাতে পুরবাসিগণ পরম সমাদর পূর্ব্বক তাঁহাদিগকে সেই উৎসবে লিপ্ত হইতে নিমন্ত্রণ করিল।
মেষমুণ্ডন পর্ব্বে কেবল আমোদ প্রমোদ ভিন্ন অন্য কোন বিষয়ের প্রসঙ্গ হইত না সুতরাং ভবন সকল সুসজ্জিত ও তৌর্য্যত্রিকের আয়োজন হইতেছিল এবং সদনের সমীপবর্ত্তি দূর্ব্বাদল শ্যামল চত্বরে বালক বালিকাগণ পরম কৌতুকে নৃত্য করিতেছিল আর উৎসবোপলক্ষে স্থাপিত পণ্যবীথি মধ্যে প্রসারিত বিবিধ ক্রীড়ার দ্রব্য ও পট্ট বস্ত্র নির্ম্মিত কটি বন্ধনী এবং অঙ্গুলিত্রে শোভমান পুত্তলিকা সকল বিক্রীত হইতেছিল। যুবক বৃন্দ মহানন্দে সে সমস্ত ক্রয় করিতেছিলেন।
পরন্তু পর্ব্বোপলক্ষে আমোদ প্রমোদ নিমিত্ত এবম্বিধ বিবিধ সমারোহ হইলেও রাজনন্দন ফ্লোরাইজেল এবং মেষপালকের বালিকা পরিদিতা দুই জনে কোণে বসিয়া এক মনে কথোপকথন করিতেছিলেন তাঁহাদের পরস্পর বাক্যালাপে এতাদৃশ সন্তোষ জন্মিতেছিল যে চতুর্দ্দিকে নানা প্রকার ক্রীড়ার বস্তু এবং আমোদ প্রমোদের আয়োজন দর্শনে তাদৃশী তুষ্টি লাভের সম্ভাবনা বোধ হয় নাই কেননা তাঁহারা ঐ সমস্ত ব্যাপারে লিপ্ত হইতে এক বারও অভিলাষুক হইলেন না।
ভূপতি বেশ পরিবর্ত্তন দ্বারা সম্পূর্ণরূপে আপনার আকার গোপন করিয়াছিলেন সুতরাং তদীয় তনয় তাঁহাকে চিনিতে পারিলেন না অতএব রাজা যুবক যুবতীর কথোপকথন শ্রবণ মানসে তাঁহাদের নিকট কিঞ্চিৎ সরিয়া বসিলেন। পরিদিতা মধুর স্বরে রাজপুত্রের প্রতি যে সমস্ত বচনোপন্যাস করিতে ছিলেন নৃপতির কর্ণ কুহরে প্রবিষ্ট হইলে আশ্চর্য্য বোধ হইল এবং মহীপতি তৎক্ষণাৎ কেমিলো মন্ত্রির প্রতি নেত্র পাত করিয়া মৃদুস্বরে কহিতে লাগিলেন মিত্র নীচ কুলে এতাদৃশ মনোহর রূপ লাবণ্য সম্পন্না ও আর্য্যগুণান্বিতা কামিনী কদাপি মদীয় দৃষ্টিপথ বর্ত্তিনী হয় নাই। এই যুবতীর বচন শ্রবণ ও বিনয় দর্শনে অনুমান করি ইহার রীতি প্রকৃতি এস্থানের যোগ্যা নহে।
কেমিলো উত্তর করিলেন মহারাজ আমার বোধে এই তরুণী দধি নবনীতোৎপন্না নৃপসুতার ন্যায় প্রকাশ পাইতেছেন।
অনন্তর মহীপাল মেষপালকে সম্বোধন পূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন ওহে বন্ধো তোমার তনয়ার সহিত যে তরুণ পুরুষটী কথোপকথন করিতেছেন ইহাঁর কি নাম? অবিজীবী উত্তর করিল মহাশয় ইহাঁর নাম দোরিক্লিস্। আমার তনয়ার সৌন্দর্য্য দর্শনে তৎপ্রতি ইহাঁর সাতিশয় প্রীতি জন্মিয়াছে পরন্তু উভয়ে পরস্পর এতাদৃশ অনুরক্ত যে অন্যোন্যের চুম্বন অবলোকন করিয়া স্পষ্ট বুঝিতে পারি না কে অধিক অনুরাগী। যাহা হউক। যদিস্যাৎ এই যুবা আমার কন্যার পাণি গ্রহণ করেন তাহা হইলে অপর যে কি লাভ করিবেন তাহা স্বপ্নেও কখন অবলোকন করেন নাই। এ কথার তাৎপর্য্য এই যে মেষপাল পরিদিতার গাত্রাভরণের কিয়দংশ যদিও বিক্রয় দ্বারা আপনার অর্থ সঞ্চয় করিয়াছিল তথাপি তনয়ার পরিণয় নিমিত্ত অনেক ভাগ রক্ষা করিয়াছিল।
পরে পলিক্সেনিস্ পুত্রকে কহিলেন ওহে যুবক তোমার হৃদয় যেন কোন অপূর্ব্ব পদার্থে পরিপূর্ণ প্রায় বোধ হইতেছে কেননা এই মহোৎসবের আমোদে তোমার ঔৎসুক্য মাত্র দেখিতে পাই না। আমরাও তরুণ সময়ে প্রণয়িনী সমভিব্যাহারে বিহার রসে রসিক হইতাম তাহাতে নায়িকাকে অনেক২ দ্রব্য সামগ্রী প্রদান করিতে হইত এস্থলে এত ক্রীড়া সাধন পরম রমণীয় দ্রব্যজাত বিক্রয় হইতেছে তুমি আপন মনোমোহিনী বিলাসিনীর নিমিত্ত কিছুই ক্রয় করিলে না?
যুবরাজ কোন প্রকারে জানিতে পরেন নাই যে জনকের সহিত কথা কহিতেছেন অতএব অবাধে প্রতিবচন প্রদান করত কহিলেন হে বৃদ্ধ আমার প্রেয়সী সমান্য দ্রব্যের প্রয়াসিনী নহেন। ইনি আমার নিকট যে বস্তুর অভিলাষ করেন আমার হৃদয় মধ্যে তাহা জাগরূক হইতেছে। তদনন্তর পরিদিতার প্রতি নেত্রপাত করিয়া কহিলেন প্রিয়ে আমার বোধ হয় এই প্রাচীন প্রাজ্ঞ পুরুষ কোন সময় প্রেমরসে রসিক ছিলেন অতএব প্রণয়ের মর্ম্মজ্ঞ প্রযুক্ত ইহাঁকে সাক্ষি করিয়া মুক্তকণ্ঠে একটী কথা বলি শ্রবণ কর। তৎপরে পরিদিতার পাণি গ্রহণাঙ্গীকারে প্রত্যক্ষ সাক্ষী হইবার নিমিত্ত সম্মুখবর্ত্তি অপরিচিত পুরুষকে কহিলেন মহাশয় আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হইয়া অকপট বচনে অঙ্গীকার করিতেছি যথাবিধি পাণি গ্রহণ পুরঃসর এই সুন্দরীকে স্বীয় পরিণীতা বনিতা করিব আপনি স্বকর্ণে মদীয় অঙ্গীকার শ্রবণ পূর্ব্বক এতদ্বিষয়ে সাক্ষী হউন।
রাজা আত্ম তনয়ের এবম্বিধ নীচ প্রবৃত্তির কথা আকর্ণন মাত্রে রোষ পরীত হইয়া তৎক্ষণাৎ কল্পিত বেশ পরিত্যাগ পূর্ব্বক সাতিশয় সন্তাপ প্রকাশ করিতে২ কহিলেন অরে কুলাঙ্গার আমি যেন তোর এই কামিনী পরিত্যাগের প্রত্যক্ষদর্শী হই। তদনন্তর নিকৃষ্টবংশ জাতা কন্যার পরিণয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞতা নিমিত্ত পুত্রকে যৎপরোনাস্তি তিরস্কার করিতে লাগিলেন এবং পরিপেলবাঙ্গী পরিদিতাকে অবিপালিনী বলিয়া সাপমান বচনে আহ্বান পূর্ব্বক ভর্ৎসনা করত ভয় প্রদর্শন করিলেন যদিস্যাৎ বারান্তর যুব রাজকে স্বসন্নিধানে আগমন করিতে দাও তাহা হইলে তদ্দণ্ডে তোমার ও তোমার তাত প্রাচীন মেষপালকের প্রাণ দণ্ড করিব।
ভূপতি এতদ্রূপে নবানুরাগি তরুণ তরুণীর তিরস্কার করণানন্তর কোপ ভরেই নিজ মন্দিরে প্রত্যাগমন করিলেন কিন্তু সহচর কেমিলোকে আজ্ঞা করিয়া গেলেন তুমি এই নীচ প্রকৃতি ফ্লোরাইজেলকে সঙ্গে করিয়া লইয়া আইস।
নৃপতির তিরস্কারে পরিদিতা ক্রোধ পূরিতান্তরা হইয়া অন্তঃস্ফীত হইতেছিলেন অতএব রাজা সে স্থান হইতে প্রস্থান করিলে কোপভরে গভীর স্বরে কহিতে লাগিলেন যদিস্যাৎ আমাদের সকলের বিনাশ উপস্থিত হয় তথাপি আমি সাতিশয় ভীত হই না, এই নিমিত্ত একবার নয়, দুই বার বাক্য প্রয়োগ করিতে উদ্যত হইয়াছিলাম। আমি মহীপতিকে এই কথা বলিতে বাসনা করিয়াছিলাম মহারাজ দিবাকর তোমার প্রাসাদোপরি কর প্রদান করিয়া আমাদিগের দরিদ্র কুটীরে পরাঙ্মুখ হন না, উভয় স্থানই সমানরূপে অলোকময় করেন। তদনন্তর মহা বিষাদ প্রকাশ করত কহিতে লাগিলেন এখন আমার নিদ্রাবিগমে চৈতন্যোদয় হইল, আমি রাজমহিষীর স্বপ্ন আর সন্দর্শন করিব না। হে তরুণ পুরুষ তুমি আমাকে পরিত্যাগ কর। আমি ছাগীর দুগ্ধ দোহন করত রোদন করিব।
রাজসমভিব্যাহারী কেমিলো পরিদিতার এবম্প্রকার তেজস্বি বচন শ্রবণ ও মহৎ প্রকৃতি দর্শন করিয়া সাতিশয় বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন এবং কিয়ৎক্ষণ পরে বিবেচনা করিলেন যুবরাজ অনুরূপা প্রেয়সীর প্রেম নিগড়ে বদ্ধ হইয়াছেন। পিতার আদেশানুসারে এই মনোরমা রামা পরিত্যাগ পূর্ব্বক প্রণয় বন্ধন ছিন্ন করিতে সমর্থ হইবেন বোধ হয় না। অতএব নায়ক নায়িকার সঙ্গে সৌহৃদ্যাচরণ পুরঃসর আপনার অভিপ্রেত কৌশল দ্বারা তাঁহাদিগকে চরিতার্থ করিতে মনস্থ করিলেন।
কেমিলো ইতিপূর্ব্বে সংবাদ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন শিশিলীর মহারাজ অকারণ শঙ্কাপিশাচীর বশম্বদ হইয়া অকৃত্রিম প্রণয় পবিত্র মিত্রের প্রতি অকারণ যে বিদ্বেষ করেন তন্নিমিত্ত সাতিশয় অনুতাপান্বিত হইয়াছেন। অপর যদিও আপনি বোহিমিয়া দেশে পলিক্সেনিসের সহিত পলায়ন করিয়া আসিয়া রাজানুগ্রহে তদীয় পরম প্রিয়তম বয়স্য হইয়াছিলেন তথাপি স্বদেশে চির সেবিত পুরাতন প্রভুর দর্শন নিমিত্ত মধ্যে২ উৎকলিকাকুল হইতেন। অতএব নবপ্রণয়ি যুবক যুবতীর নিকট এই প্রসঙ্গ করিলেন তোমাদের পরস্পর বিজাতীয় অনুরাগ দেখিতেছি তোমরা রাজশাসনে এই প্রণয় প্রত্যাহরণ করিতে পার ঈদৃশী সম্ভাবনা দেখি না। অথচ পরিণয়ের কথায় রাজা খড়্গ হস্ত অতএব আমি এক উপায় বলি যদি তাহাতে সম্মত হইতে পার তবেই আশু পরিত্রাণ এবং পরে কৃতকার্য্য হইবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা। তোমরা আমার সমভিব্যাহারে শিশিলী রাজ্যে পলায়ন করিয়া চল তত্রত্য ভূপতি লিয়নিতিস্ অবশ্য তোমাদিগকে আশ্রয় প্রদান পূর্ব্বক রক্ষা করিবেন এবং তিনি মধ্যস্থতা করিলে অসংশয় পলিক্সেনিস্ রাজ সকাশাৎ ক্ষমা ও বিবাহের সম্মতি প্রাপ্ত হইতে পারিবে।
অভিনব প্রেমরসাভিষিক্ত রাজনন্দন ও তদীয় প্রণয়িনী এতৎ প্রস্তাবে পরমানন্দিত হইয়া তৎক্ষণাৎ সম্মত হইলেন। পরে কেমিলো প্রস্থান দিনাবধারণ পুর্ব্বক প্রাচীন মেষপালককে সমভিব্যাহারী হইতে উপদেশ দিলেন।
মেষপালক পরিদিতাকে আশৈশব লালন পালন করাতে ঔরসী কন্যা নির্বিশেষে স্নেহ করিতেন অতএব তদণ্ডে তাঁহাদের সঙ্গী হইতে সম্মত হইয়া কুমারীর শৈশবকালের পরিচ্ছদ তৎসংলগ্ন ক্ষুদ্র লিপি এবং অবশিষ্ট রত্নালঙ্কার সমভিব্যাহারে লইলেন।
তদনন্তর ফ্লোরাইজেল্ পরিদিতা কেমিলো এবং বৃদ্ধ অবিজীবী এই চারি ব্যক্তি অর্ণবপোতারোহণ পুরঃসর সমুদ্র পথে যাত্রা করিয়া কিয়দ্দিন মধ্যে শিশিলী দ্বীপে লিয়নিতিস্ রাজার রাজধানীতে উত্তীর্ণ হইলেন। লিয়নিতিস্ মিত্রদ্রোহ ও পুত্র কলত্র শোকে সাতিশয় কাতর ছিলেন সখার সন্তান ও প্রাচীন কৃতজ্ঞ ভৃত্য রাজ্য মধ্যে আগমন করাতে পরম সমাদর পুরঃসর তাঁহাদের যথোচিত অভ্যর্থনা করিলেন। অনন্তর রাজকুমার সমভিব্যাহারিণী পরিদিতাকে আপনার বনিতা বলিয়া পরিচয় দিলে রাজা সেই সুলক্ষণা সর্ব্বাঙ্গ সুন্দরী বালিকার প্রতি নেত্রপাত করিবামাত্র মনোমধ্যে স্বাভাবিক সন্তান স্নেহের হঠাৎ উদ্রেক হওয়াতে সাতিশয় পরিতৃপ্ত হইলেন। তৎপরে তদীয় অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ও রূপ লাবণ্য বিশেষ নিরীক্ষণে অবয়ব সৌসাদৃশ্যে স্বীয় মহিষী হারমিয়নী স্মৃতিপথ বর্ত্তিনী হওয়াতে আক্ষেপ করত কহিতে লাগিলেন অহি আমি দুরাত্মতা পূর্ব্বক আত্ম তনয়ার জীবন বিনষ্ট না করিলে তিনিও ঈদৃশী সুরূপা হইতেন। তদনন্তর ফ্লোরাইজেল্কে কহিলেন হে যুবরাজ আমি আপন দোষে তোমার মহানুভব জনকের সৌহৃদ্যে বঞ্চিত হইয়া নিরন্তর অনুতাপ করিতেছি, তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আমার অবিরত বাসনা হয়।
বৃদ্ধ মেষপালক পরিদিতার প্রতি নৃপতির অকস্মাৎ এবম্প্রকার স্বাভাবিক স্নেহ প্রবৃত্তি দর্শন এবং রাজ প্রমুখাৎ রাজকিশোরীর বনবাস বিবরণ শ্রবণ করিয়া ক্ষুদ্রা পরিদিতাকে যে সময় যে প্রকারে মহামূল্য রত্নালঙ্কার ও মহাধনাঢ্য বংশের পরিচ্ছদ সহকারে প্রাপ্ত হইয়াছিল তৎসমুদায়ের বৃত্তান্ত আপনার অন্তঃকরণ মধ্যে স্মরণ পুরঃসর অন্দোলন করত অসংশয় নির্ণয় করিল এই কুমারী এতন্মহীপতিরই নির্বাসিতা তনয়া।
তদনন্তর প্রাচীন অবিপালক সময়ক্রমে রাজপুত্র ফ্লোরাইজেল্ আপন তনয়া পরিদিতা এবং শিশিলী রাজের কৃতজ্ঞ ভৃত্য কেমিলো ও তদীয় মহিষীর প্রিয়সখী পালিনার সমক্ষে আপনি যে প্রকারে পরিদিতাকে শৈশব সময় প্রাপ্ত হয় ও ঐ কুমারীর নির্বাসন কারী আন্তিগোনস্ যদ্রূপে করাল নখর ঋক্ষ সম্মুখে পতিত হইয়া পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হয় সমস্ত বৃত্তান্ত আনুপূর্ব্বিক ব্যক্ত করিল এবং রাজবালার ক্ষুদ্র লিপ্যঙ্কিত সেই বহু মূল্য বসন বহিষ্করণ পুরঃসর সকলকে দেখাইল। তাহাতে পালিনার মনে পড়িল নৃপরমণী হারমিয়নী সেই বসনে আপন নন্দিনীকে মণ্ডিত করিয়াছিলেন। অপর বৃদ্ধের প্রদর্শিত একটা রত্ন নিরীক্ষণে স্মরণ হইল রাণী তাহা কন্যার গলায় বন্ধন করিয়া দিয়াছিলেন। পরিশেষে পরিচ্ছদ সংলগ্ন ক্ষুদ্র লিপি পর্য্যালোচন করিতে২ আপনার স্বামির হস্তাক্ষর স্পষ্টরূপে দৃষ্টি গোচর হওয়াতে সন্দেহ নিরাসে নিশ্চয় বোধ হইল পরিদিতা লিয়নিতিস্ রাজার নির্বাসিত দুহিতা কিন্তু এই সময় পালিনার অন্তঃকরণ অনির্ব্বচনীয় হর্ষ বিষাদে সমাকুল হইতে লাগিল। তাঁহার পতি বিয়োগের অসহ্য শোক উদ্ভূত হইল এবং চির প্রনষ্টা নৃপনন্দিনীর পুনঃপ্রাপ্তি ও তদ্দ্বারা রাজবংশ রক্ষা বিষয়ক দেববাণী ফলিতা হওয়াতে বাক্পথাতীত আনন্দ জন্মিল সুতরাং ঐ অবলার মনোমধ্যে এই প্রবল হর্ষ বিষাদ স্ব২ পরিসর বিস্তার নিমিত্ত ক্ষণকাল তুমুল সংগ্রাম করাতে তদীয় হৃদয় বিক্ষিপ্ত প্রায় হইল। তদনন্তর রাজা লিয়নিতিস্ যখন শ্রবণ করিলেন পরিদিতা তাঁহার দুহিতা তখন তদীয় অন্তঃকরণে সাতিশয় করুণ রসের উদয় হইল এবং নন্দিনীকে সন্নিধানে আনয়ন পরঃসর খেদ করিতে কহিতে লাগিলেন হায়, হারমিয়নী জীবিত নাই, আপনার প্রনষ্ট নিধি পুনর্ব্বার নয়নগোচর করিতে পাইলেন না। এইরূপ বিলাপ পূর্ব্বক শোকে ক্ষণকাল নিস্তব্ধ হইয়া তনয়ার অধর ধারণ করত গদ্গদ বচনে বলিলেন হায় তোমার মাতা নাই, হায় তোমার মাতা নাই।
পালিনা মহারাজের নষ্ট নিধি লাভে পরমাহ্লাদের সময় এতাদৃশ বিষাদোদয় দর্শনে ক্ষুণ্ণান্তঃকরণে নৃপতিকে কহিলেন অধিরাজ আমি ইটালি দেশীয় জুলিও রোমানো নামা বিখ্যাত ভাস্কর দ্বারা মহারাণীর অবিকল প্রতিমূর্ত্তি নির্মাণ করাইয়াছি মহারাজ যদিস্যাৎ মদীয় ভবনে আগমন পুরঃসর অবলোকন করেন অসংশয় বোধ করিবেন রাজ্ঞী অক্ষত সর্ব্বাবয়বে জীবিত রহিয়াছেন। পালিনার এতদ্বচন শ্রবণে রাজা যৎপরোনাস্তি ব্যগ্র হইয়া তত্রস্থ সমস্ত জন সমভিব্যাহারে তদীয় সদনে গমন করিলেন। পরিদিতাও আপন জ্ঞানাবচ্ছেদে জননী নিরীক্ষণ না করাতে মাতার আকৃতি অবলোকন নিমিত্ত সাতিশয় উৎসুকা হইলেন।
অনন্তর পালিনা আপন নিকেতনে গিয়া প্রতিমূর্ত্তির আবরণ অপসরণ করিলে রাজা স্বীয় মহিষীর অবিকৃত আকৃতি ও অনপচিত রূপ লাবণ্য অবলোকন করত তদীয় শোকের পুনর্ব্বার আবির্ভাবে অভিভূত প্রায় হইয়া অনেক ক্ষণ নির্ব্বাক নিস্পন্দ হইয়া রহিলেন।
পালিনা রাজার ভাব বিলোকনে মনোমধ্যে হর্ষে প্রফুল্লা হইয়া নিবেদন করিলেন মহারাজ আপনকার এই বিস্ময় দর্শনে আমার অপরিসীম সন্তোষ জন্মিতেছে, অধিরাজ এই প্রতিমূর্ত্তি মহারাণীর অনুরূপ কি না?
পরে নরপতি লব্ধসংজ্ঞ হইয়া কল্পিত প্রতিমায় নেত্র পাত পূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন আহা হারমিয়নী এই ভাবে দণ্ডায়মানা হইতেন। আমি প্রথমতঃ প্রেমাকাঙ্ক্ষায় যখন তাঁহার পশ্চাদ্গামী হইয়াছিলাম তখন তাঁহার অবিকল এই ভঙ্গি ছিল। তদনন্তর পালিনাকে বলিলেন এই মূর্ত্তির যত বয়ঃক্রম প্রকাশ পাইতেছে রাণীর তত বয়স হয় নাই। পালিনা উত্তর করিলেন মহারাজ ইহাতে ভাস্করের অধিক শিল্পনৈপুণ্য সপ্রমাণ হইল। মহারাণী জীবদ্দশায় থাকিলে এসময় তাঁহার এতাবৎ বয়ঃক্রম হইত। মহারাজ আজ্ঞা হউক, আবরণ দ্বারা প্রতিমূর্ত্তি পিধান করি অধিক ক্ষণ নিরীক্ষণ করিতে২ আপনকার এবম্প্রকার ভ্রম হইবে মূর্ত্তির চলৎ শক্তি আছে।
রাজা ভাবে গদ্গদ হইয়া সবিলাপ বচনে বলিলেন পালিনা প্রতিমা আবৃতা করিও না, বারম্বার নিরীক্ষণ করিয়াও আমার পর্য্যাপ্ত তৃপ্তি হইতেছে না। আহা আমি কেন মরি নাই। কেমিলো অবলোকন কর প্রতিমূর্ত্তি যেন সজীবা, এক্ষণে যেন শ্বাস বহিতেছিল ইহার নেত্রদ্বয় এই মুহূর্ত্তে যেন নিমেষোন্মেষ ক্রিয়া করিতেছিল। পালিনা সবিনয়ে নিবেদন করিলেন প্রভো অনুমতি করুন পূর্ব্ববৎ আবরণাবৃতা করি আপনাকে এতদ্দর্শনে উত্তরোত্তর প্রবল বিহ্বল দেখিতেছি এখনি আপনি ইহাকে সজীব কহিবেন। নৃপতি কহিলেন এখন কি? আরো বিংশতি বৎসর এই প্রতিমূর্ত্তি সজীবা জ্ঞান করিব। আমার বোধ হইতেছে ইহার শ্বাস বহিতেছে। যাহহউক ভাস্করের শিল্প নৈপুণ্য অতি চমৎকার। আহা এমন খুদিয়াছে যেন বায়ু অবিকল বহমান। ওহে তোমরা উপহাস করিও না আমি প্রতিমূর্ত্তিকে একবার চুম্বন করি। পালিনা এতচ্ছ্রবণে সাকূতান্তঃকরণ হইয়াও মৌখিক সাশঙ্ক বাক্যে কহিল মহারাজ এমন করিবেন না। প্রতিমূর্ত্তির বর্ণ এখনও আর্দ্র আছে মুখার্পণ করিলে আপনকার ওষ্ঠ তৈলাক্ত রঙ্গে অঙ্কিত হইবেক। অতএব আজ্ঞা হউক আচ্ছাদন করি। রাজা বলিলেন তাহা হইবে না, বিশ বৎসর এই রূপ করিয়া রাখ।
পরিদিতা পতিতজানু হইয়া উপবেশন পুর্ব্বক এতাবৎ ক্ষণ পর্য্যন্ত মনে২ প্রশংসা করত জননীর অপ্রতিম প্রতিমা নিরীক্ষণ করিতেছিলেন জনকের উক্তরূপ বাক্য কর্ণগোচর হইলে সাদর বচনে বলিলেন হাঁ পিতঃ তাবৎ পরিমিত কাল এই ভাবে প্রিয়তরা মাতার আকৃতি অবলোকন না করিলে আমারও নয়নের পরিতৃপ্তি হইবেক না।
তদনন্তর পালিনা সগর্ব্ব বচনে নরপতিকে বলিলেন মহারাজ হয় আপনি এই আনন্দ দমন করুন আমি প্রতিমা আবৃত করিয়া ক্ষান্ত হই, নচেৎ এতদপেক্ষা চমৎকার প্রদর্শন করি আজ্ঞা হউক। হে নরনাথ আমি এ প্রতিমূর্ত্তিতে গতিশক্তি প্রদান করিতে পারি। অনুমতি করুন এই দণ্ডে বেদী হইতে অবরোহণ পুরঃসর আপনকার কর গ্রহণ করাই। আপনি মনে করিতে পারেন কোন প্রকার দুষ্ট ক্ষমতা বা কুহক সহকারে ঐ কার্য্য সম্পন্ন করিব কিন্তু হে দেব আমি সেরূপ নারী নহি।
রাজা এ কথায় বাক্পথাতীত চমৎকারান্বিত হইয়া কহিলেন পালিনা তুমি প্রতিমাকে যাহা করাইতে পার তাহা প্রত্যক্ষ দেখিলে পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইব। যদি ইহাকে বাক্ শক্তি ও গতি শক্তি প্রদান পূর্ব্বক কথা কহাইতে ও চলাইতে পার তবে তদ্দর্শনে আমার আনন্দ ও সন্তোষের পরিসীমা থাকিবে না।
পালিনা পূর্ব্বাবধি বিবিধ বাদ্য যন্ত্র প্রস্তুত করিয়া রাখিয়া ছিলেন। অতএব রাজাদেশ সম্পাদন নিমিত্ত মৃদু গভীর ভাবে বাদ্যোদ্যমের ইঙ্গিত করিলে প্রতিমূর্ত্তি চলৎ শক্তি ধারণ পুরঃসর বেদি হইতে অবরোহণ করিল এবং তদীয় বাহুলতা লিয়নিতিসের গল দেশে সংলগ্ন হওত দৃঢ় ধারণে পীড়ন করিতে লাগিল অপর বাক্ শক্তি ধারণ পূর্ব্বক স্পষ্ট বাক্যে স্বামির প্রতি মঙ্গল প্রশ্ন এবং নবাধিগতা পরিদিতার প্রতি আশীর্বচন প্রয়োগ করিল। ইহাতে তত্রস্থ সমস্ত ব্যক্তি যৎপরোনাস্তি বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া সাশ্চর্য্য চিত্ত হইল।
পরন্তু ঐ মূর্ত্তির রাজগলে করার্পণ পূর্ব্বক আশ্লেষ করিয়া মঙ্গল প্রশ্ন ও সন্ততির প্রতি আশীঃপ্রয়োগ অসম্ভব বা বিচিত্র নয় কেননা সে প্রতিমা নহে মহারাণী হারমিয়নী জীবিত থাকাতে তাঁহার দ্বারাই এই নাট্যাভিনয় হইল।
পালিনা পূর্ব্বে রাজকন্যার বনবাস অবলোকনে মহারাণী হারমিয়নীর প্রতি নরপতির অনিবার্য্য ক্রোধ অনুমান করিয়া বিবেচনা করিয়াছিলেন রাজা রাণীরও প্রাণ সংহার করিবেন, গোপনে রক্ষণ ব্যতিরেকে তাঁহার প্রাণ রক্ষার উপায় নাই। অতএব ভূপতির নিকট মিথ্যা করিয়া মহিষীর মরণ সংবাদ জ্ঞাপন করেন। হারমিয়নীও তদবধি তদীয়ান্তঃপুরে আত্মগোপন পূর্ব্বক তাঁহার সহিত একত্র অবস্থিতি করিতেছিলেন আপনার কোন কথা নরপতির গোচর করেন নাই এক্ষণে নির্বাসিত কন্যা পুনর্ব্বার স্বদেশে আগতা হওয়াতে আপনাকে প্রকাশ করিলেন। রাজা তাহার প্রতি যে২ নৃশংসাচরণ করিয়াছিলেন পাতিব্রত্য পরতন্ত্রতা প্রযুক্ত তাহা তৎক্ষণে ক্ষমা করিয়াছিলেন কিন্তু অব্রুবাণা কন্যার উপর যে নৈষ্ঠুর্য্য হয় তজ্জন্য দুঃখ বিস্মরণে সমর্থ হন নাই।
রাজা লিয়নিতিস্ মৃতা প্রিয়তমা পুনর্জ্জীবিত ও হৃতা দুহিতাকে পুনঃ প্রাপ্ত হওয়াতে মনের বহুকালীন শোকশল্য উন্মোচন পুরঃসর অপার সুখসাগরে নিমগ্ন হইলেন।
এই সমস্ত ব্যাপার অবলোকনে সকলে পরমেশ্বরের ধন্যবাদ প্রদান পূর্ব্বক মহা২ আনন্দ প্রকাশ করিতে লাগিল। রাজা এবং রাজ্ঞী পরম হর্ষে পুলকিত হইয়া তনয়ার প্রতি দয়া বিস্তার পূর্ব্বক আশ্রয় দান ও লালন পালন নিমিত্ত বৃদ্ধ মেষপালকের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিলেন এবং রাজকুমার ফ্লোরাইজেল্ তাঁহার প্রতি প্রণয়ী হওয়াতে তাঁহাকে যথোচিত অশীর্ব্বিধান করিলেন। পালিনা ও কেমিলো রাজার উপাসনায় নিবিষ্ট ছিলেন সুতরাং পরিণামে নৃপতির এই আনন্দ দর্শনে নিরতিশয় সন্তোষ প্রাপ্ত হইলেন।
তদনন্তর এই অদ্ভুত আনন্দ সর্ব্বাঙ্গ শুদ্ধরূপে পরিপূর্ণ করণ নিমিত্ত কোন বিষয়ের অভাব হইল না। বোহিমিয়াধিরাজ পলিক্সেনিস্ অচিরে স্বয়ং শিশিলী রাজধানীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন।
বোহিমিয়াধিপতি আপনার তনয় অদৃশ্য হইবার পূর্ব্বাবধি বিদিত ছিলেন প্রাণপ্রদ কেমিলো স্বদেশ প্রত্যাগমন নিমিত্ত নিতান্ত অভিলাষুক অতএব রাজ্যমধ্যে আত্মজের ও কেমিলোর অনুসন্ধান না পাওয়াতে অনুমান করিলেন সকলে শিশিলীতে পলায়ন করিয়াছে সুতরাং তাহাদের পশ্চাৎ২ ধাবমান হওয়াতে শিশিলী রাজ্যে লিয়নিতিসের এই সুখাবহ সময়ে অসিয়া উত্তীর্ণ হইলেন।
বোহিমিয়ারাজ শিশিলীতে উপস্থিত হইয়া আনন্দোৎসবে মিলিত হইলেন। তাঁহার চির মিত্র লিয়নিতিস্ অকারণ ঈর্ষা পরবশ হইয়া যে দ্রোহাচরণ করিয়াছিলেন তন্নিমিত্ত ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন তাহাতে উভয়ের মনোমালিন্য দূর হইল এবং পুনর্ব্বার অকৃত্রিম মিত্রতা জন্মিল। এক্ষণে পলিক্সেনিস্ আপন নন্দন ফ্লোরাইজেলের পরিদিতার সহ পরিণয়ে প্রতি বন্ধক হইলেন না। এখন পরিদিতা মেষপালী নহে অধুনা শিশিলীয় সম্রাটের রাজ সিংহাসনের উত্তরাধিকারিণী সুতরাং যুবক যুবতীর শুভ বিবাহ অবিলম্বে পরমানন্দে সম্পন্ন হইল।
তদনন্তর সকলের দৃষ্টিগোচর হইল হারমিয়নী রাণী বহুকাল দুঃখশোকে সন্তপ্ত থাকিয়া ধৈর্য্যাবলম্বনের নিমিত্ত পরিণামে পুরস্কৃতা হইলেন এবং সুদীর্ঘ কাল স্বামি দুহিতৃ জামাতৃ সহ পরম সুখে লোক যাত্রা নির্ব্বাহ করিতে লাগিলেন ইতি।
অলীক কর্ম্মে আড়ম্বর।
সেক্সপিয়র।
অলীক কর্ম্মে আড়ম্বর।
মেসিনা নগরীর অধিপতি লিয়নেত নামক রাজার হীরো নাম্নী কুমারী এবং বিয়েত্রিশ্ নামিকা একটী ভ্রাতৃতনয়া ছিল। এই দুই কন্যা মেসিনাস্থ নৃপনিকেতনে পরস্পর সৌহৃদ্য ভাবে একত্র বাস করিত।
বিয়েত্রিশ্ স্বীয় প্রকৃতির চাঞ্চল্য প্রযুক্ত গভীর স্বভাবা হীরোর কৌতূহল নিমিত্ত সর্ব্বদা ক্রীড়া কৌতুক করিতেন এবং রসিকতা প্রকাশ করত সকল বিষয়ে হাস্য পরিহাস পূর্ব্বক আমোদ প্রমোদ করিতে ভাল বাসিতেন।
যৎকালে এই দুই কুমারীর খ্যাতি প্রচার হইতে আরম্ভ হয় সে সময় কতিপয় তরুণ সেনানায়ক কোন সমরে গমন করিয়া শৌর্য্য বীর্য্য প্রকাশ পুরঃসর রণ সমাপনানন্তর পথ ঘটিত মেসিনা নগর দিয়া প্রত্যাগমন করিতেছিলেন অতএব তত্রত্যাধিপতি লিয়নেতের সহিত সাক্ষাৎ করিবার মানসে সকলে তাঁহার আগারে গিয়া উত্তরিলেন। এই যুবক সম্প্রদায় মধ্যে এরাগন দেশীয় দন্প্রিদ্রু নামা রাজনন্দন এবং তদীয় বয়স্য ফ্লোরেন্স নগরীয় ক্লাদিও এই দুই ব্যক্তি মহাসম্ভ্রান্ত এবং তাঁহাদিগের সমভিব্যাহারী পাদুয়া নগরের বেনিদিক্ নামা এক জন বিশেষ মর্য্যাদাবান ও রসিক চূড়ামণি ছিলেন।
উক্ত তরুণ সেনানায়ক গণ যদিও বিদেশীয়, তথাপি পূর্ব্বে আর এক বার মেসিনা নগরে আগমন করাতে লিয় নেতের সহিত তাহাদের আলাপ হইয়াছিল অতএব তাঁহারা সময়ান্তরে পুনর্ব্বার আলয়ে আসিয়া উপস্থিত হইলে আতিথেয় রাজা যথোচিত সৎকার করণানন্তর স্বীয় তনয়া ও ভ্রাতৃপুত্রীর নিকট তাঁহাদের পরিচয় দিলেন ইহাঁরা আমার পুরাতন মিত্র।
বেনিদিক্ বাচাল প্রকৃতি বশতঃ গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়াই লিয়নেত ও নৃপনন্দন দন্পিদ্রুর সহিত কৌতুকাবহ বচন প্রয়োগ পুরঃসর সম্ভাষা করিতে আরম্ভ করিলেন। বিয়েত্রিশ্ স্বীয় বাগ্মিত্বাভিমানে পরিপূর্ণা ছিলেন সুতরাং স্বভাবতঃ অন্যের কথোপকথনে অসন্তুষ্টা হইতেন, আগন্তুক ব্যক্তিকে হঠাৎ পরিহাস পূর্ব্বক বক্তৃতা করিতে দেখিয়া বৈরক্তি প্রকাশ করত পরুষ ভাষায় কহিলেন মহাশয় কি আশ্চর্য্য আপনকার কথায় কেহ আমোদ করিতেছেন না তথাপি আপনি স্বয়ং বাগাড়ম্বর করিতেছেন। বিয়েত্রিশের ন্যায় বেনিদিক্ও প্রগল্ভ্যান্বিত ছিলেন অতএব কামিনীর কর্কশ বাক্যে সাতিশয় বিরক্ত হইলেন এবং মনে২ বিবেচনা করিলেন স্ত্রীলোকের এপ্রকার ধৃষ্টতা ও পরুষোক্তি সুশীলতার লক্ষণ নহে। অপর স্মরণ করিয়া তাঁহার চমৎকার বোধ হইল গত যাত্রায় যখন লিয়নেতের নিকেতনে বাস করেন তৎকালে বালা বিয়েত্রিশ্ তাঁহার সহিত নানাপ্রকার হাস্য পরিহাস করিয়া কথোপকথন করিয়াছিলেন অথচ এবার তাঁহার কৌতুকে বিরাগ প্রকাশ করিলেন। যে সকল ব্যক্তিরা স্বয়ং পরিহাস রসে রসিক, এবং তাদৃশ বাক্য প্রয়োগ করিতে অধিক রত, তাহারা প্রায় অন্যের হাস্য কৌতুকে কুতূহলান্বিত হয় না। বেনিদিক্ ও বিয়েত্রিশ্ উভয়ে হাস্য রসে রসিক ছিলেন, এবং তৎ প্রযুক্ত দুই জনেরই মাৎসর্য্য স্বভাব জন্মে, কিন্তু পরস্পরের আত্ম প্রকৃতি বিদিত ছিল না। তাঁহাদের উভয়ের ইতিপূর্ব্বে যখন সাক্ষাৎ হইয়াছিল সে সময়েও অন্যোন্যের কৌতুকামোদে পরস্পর অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং পরিহাস মধ্যে বিস ম্বাদ উপস্থিত হওয়াতে পরস্পর ভিন্ন২ স্থানাবলম্বন পূর্ব্বক পৃথক হইয়াছিলেন। যাহাহউক, বিয়েত্রিশ্ বেনিদিকের বক্তৃতা কালে মাৎসর্য্য প্রকাশ পুরঃসর যাহা কহিলেন তাহাতে কেহ মনোযোগ করিলেন না। যুবা বেনিদিক্ বিয়েত্রিশের বচনে অপ্রতিভম্মন্য হইয়া ঘৃণা দ্বারা বৈরশুদ্ধির মানসে সঙ্কেত বাক্যে ব্যঙ্গ করত কহিলেন অশ্রদ্ধে অদ্যাপি জীবিতা আছ? এই ইঙ্গিতে উভয়ের মধ্যে তুমুল বাক্কলহ আরব্ধ হইল। যদিও বিয়েত্রিশের বিশিষ্টরূপে বিদিত ছিল ঐ যুবা যুদ্ধে মহাবল বিক্রম প্রকাশ পুরঃসর সুখ্যাতি প্রাপ্ত হইয়া আসিয়াছেন তথাপি ব্যঙ্গোক্তি করত কহিলেন তুমি শোর্য্য বীর্য্য প্রদর্শন পূর্ব্বক যাবৎ সংখ্যক মানবকে সমর শায়ী করিয়াছ অমি অবলা বটে কিন্তু তাবৎ সংখ্যক ব্যক্তিকে একেবারে কবলীকৃত করিতে পারি। তদনন্তর ঐ মুখরা রামা রাজনন্দনকে বেনিদিকের কথায় আমোদ করিতে অবলোকন করিয়া ঈর্ষান্বিত বচনে বলিলেন ওহে তরুণ পুরুষ তুমি নৃপকুমারের তোষামোদী প্রকৃত ভণ্ড। বিয়েত্রিশের সকল কথাতেই বেনিদিকের মনে বিরাগ জন্মিতেছিল কিন্তু এই অবজ্ঞা বাক্যে তাঁহার অন্তঃকরণ অসন্তোষে আচ্ছন্ন হইল। গর্ব্বিতা বালা তাঁহার প্রতি ইঙ্গিতে ভীরুতার অপবাদ আরোপ পূর্ব্বক কহিলেন মহাবীর কর্ত্তৃক সমর মস্তকে শোর্য্য প্রকাশ পুরঃসর যত মানব নিহত হইল আমি তাহাদিগকে এক গ্রাসে ভোজন করিতে পারি সে কথা গ্রাহ্য করিলেন না কেননা আত্ম প্রত্যয়ে আপনাকে সাহসিক বলিয়া নিশ্চয় জানিতেন। কিন্তু যে সকল ব্যক্তি স্বভাবতঃ কৌতুকামোদী হয় তাহাদিগকে ভণ্ড বলিলে বিশেষ অধিক্ষেপ হয় কারণ তাহারা কখন২ ঐপ্রকার আচরণ যথার্থতঃ করিয়া থাকে অতএব বেনিদিক্ কামিনীর শেষোক্ত তিরস্কার বচনে মনোমধ্যে সাতিশয় ক্ষুব্ধ হইলেন এবং তাঁহাকে নিতান্ত নিন্দক স্বভাব জ্ঞান করিতে লাগিলেন।
রাজকুমারী হীরো অতি সুশীলা ও লজ্জান্বিতা, এপ্রযুক্ত অভ্যাগত সম্ভ্রান্ত সেনানী গণ মধ্যে মৌনাবলম্বন পূর্বক উপবিষ্টা ছিলেন। তাঁহার রূপ লাবণ্য ও বয়োধর্ম্মে স্বতঃ প্রকাশমান হাব ভাব অতিশয় মনোহারী ছিল। ক্লাদিও তাহাকে নিরীক্ষণ করিয়া অবধি আপনার মনোমধ্যে তদীয় সৌন্দর্য্য অনুধ্যান করিতেছিলেন। রাজপুত্র প্রথমাবধি বেনিদিক্ ও বিয়েত্রিশের সাহঙ্কার কৌতুকালাপ মনোযোগ পূর্ব্বক শ্রবণ করিলেন অতএব উক্ত যুবক যুবতীর বাক্কলহে কুতূহলান্বিত হইয়া লিয়নেতের কর্ণমূলে মৃদুস্বরে বলিলেন এই তরুণী যেমন রসবতী বেনিদিক্ও তদ্রূপ রসিক, ইহাঁদের দাম্পত্য ভাব উপযুক্ত হয়। লিয়নেত উপহাস করত সহাস্য বচনে উত্তর করিলেন হাঁ ইহাঁদের উভয়ের পরস্পর পতিপত্নীভাব হইলে অবিশ্রান্ত জল্প করিয়া সপ্তাহের মধ্যে দুই জনেই উন্মত হয়। লিয়নেতের এই কথায় যদিও স্পষ্ট প্রকাশ হইল ঐ যুবক যুবতীর জায়াপতি ভাব অত্যন্ত অনুপযুক্ত, তথাপি রাজকুমার পরিণয় দ্বারা উক্ত রসিক রসিকাকে পরস্পর সংযুক্ত করিবার মানস পরিত্যাগ করিলেন না।
পরে রাজতনয় স্বীয় বয়স্য ক্লাদিও সমভিব্যাহারে মেসিনাধিপতির নিকট বিদায় গ্রহণ পুরঃসর প্রত্যাগমনের উদ্যোগ করিবেন এতদবসরে পরম্পরায় অবগত হইলেন তাঁহাদিগের সম্প্রদায়ের মধ্যে বিয়েত্রিশের সহিত বেনিদিকের বিবাহ ভিন্ন অন্য এক বিবাহের কল্পনা হইয়াছে। অধিকন্তু প্রিয়মিত্র ক্লাদিও তাঁহার সাক্ষাতে হীরোর ভূরি২ প্রশংসা করিতেছিলেন তাহাতে সেই মহিলার প্রতি বন্ধুর যাদৃশ মনোভিলাষ তাহাও বুঝিতে পারিলেন। অতএব রাজনন্দন গমনের আয়োজনে ক্ষান্ত হইয়া বয়স্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন সখে হীরোর প্রতি তোমার অন্তঃকরণ কি প্রণয় প্রবণ হইয়াছে? ক্লাদিও উত্তর দিলেন মহাশয় গতবারে যখন এতন্নগরে আগমন করিয়াছিলাম সে সময় আমি যোদ্ধার নয়নে তাঁহাকে নিরীক্ষণ করি সুতরাং সে বার তৎপ্রতি আমার প্রণয় সঞ্চার কিঞ্চিন্মাত্র হয় নাই কিন্তু সেই সুলোচনার লোচন কি শুভক্ষণে আমার উপরে পতিত হয় তিনি নয়ন গোচর করিবামাত্র আমার প্রতি স্পৃহয়ালুতা প্রকাশ করেন। এবার বিপক্ষ পক্ষ নিরাকৃত হওয়াতে আমার চিত্তে সমর চিন্তা নাই একারণ ঐ কোমলাঙ্গীর রূপ লাবণ্যানুধ্যান মদীয় মানসে প্রবেশ করিয়া আমাকে যেন কহিল হীরোর সৌন্দর্য্য মাধুর্য্য বিবেচনা কর অধিকন্তু যেন স্মরণ করাইয়া দিল যে ঐ লাবণ্যবতী বিগ্রহ যাত্রার অগ্রে আমার মনোনীত হইয়াছিলেন। ক্লাদিও এবম্প্রকারে হীরোর প্রতি আপনার প্রেমানুবন্ধ প্রকাশ করিলে রাজকিশোর অবিলম্বে মেসিনাধিপতির সম্মুখবর্ত্তী হইয়া বিনয় পুরঃসর কহিতে লাগিলেন মহাশয় আপনি আমার বয়স্য ক্লাদিওকে জামাতৃত্ব রূপে বরণ করণে যদি স্বীকার করেন তাহা হইলে আমি আপনকার চির বাধিত হই। মেসিনাধিরাজ রাজনন্দনের আগ্রহ দর্শনে তাঁহার অনুরোধে অঙ্গীকার করিলেন। তদনন্তর রাজতনয় ক্লাদিওর নিবেদন শ্রবণ নিমিত্ত সহজেই সুধীরা হীরোর প্রবৃত্তি জন্মাইয়া দিলেন যেহেতু ঐ ব্যক্তি সর্ব্বগুণান্বিত ছিলেন। পরে ক্লাদিও রাজকুমারের আনুকূল্যে আপন মনোহারিণী হীরোর সহিত পরিণয় ত্বরায় সম্পাদন নিমিত্ত লিয়নিতের মত করিয়া দিলেন।
মনোমোহিনী কামিনীর পাণিগ্রহণ সম্পাদন নিমিত্ত ক্লাদিওকে কতিপয় মাত্র দিবস প্রতীক্ষা করিতে হইল কিন্তু সেই কএক দিন তাঁহার পক্ষে তাবৎ সংখ্যক বৎসর তুল্য দুর্যাপনীয় বোধ হইতে লাগিল। ফলতঃ যুবা পুরুষেরা যখন কোন বিষয়ে উৎসাহান্বিত হন্ তখন তাহা সম্পন্ন করিবার নিমিত্ত অধৈর্য্য হইয়া থাকেন সুতরাং অত্যল্প কাল বিলম্বও অসহ্য হইয়া উঠে। অতএব রাজতনয় অন্য মনস্কতা দ্বারা বয়স্যের সময় ক্ষেপ মানসে তাঁহার নিকট একটা কৌতুকাবহ ব্যাপারের প্রসঙ্গ করিলেন অর্থাৎ তাঁহাকে কহিলেন এক্ষণে বেনিদিক্ ও বিয়েত্রিশ্ এই দুই জনের মনে প্রণয়োৎপাদন নিমিত্ত কৌশলে কোন উপায় করা যাউক। নৃপনন্দনের এতৎ প্রস্তাবে ক্লাদিও কুতূহলাক্রান্ত হইয়া আমোদ করিতে লাগিলেন এবং চতুরতা প্রকাশ পূর্ব্বক কৃতকার্য্য হইবার নিমিত্ত ব্যগ্র হইলেন। অপর মেসিনাধিপতি লিয়নেতও তদ্বিষয়ে সাধ্যানুসারে আনুকূল্য করিতে অঙ্গীকার করিলেন। অধিকন্তু হীরো প্রতিজ্ঞা করিয়া কহিলেন আমি ভগিনীর নিকট বেনিদিকের অনুপম গুণের বিষয় প্রসঙ্গতঃ বর্ণনা করিয়া তাহার প্রতি অনুরাগ জন্মাইয়া দিতে সর্ব্বতোভাবে যত্ন করিব।
তদনন্তর রাজকুমার বিবেচনা করিয়া এই উপায় স্থির করিলেন সম্প্রদায়স্থ ব্যক্তিদিগের দ্বারা কোন কৌশলে বেনিদিকের মনে বিশ্বাসাধান করা যাউক বিয়েত্রিশ্ তাঁহার অঙ্গসৌষ্ঠব ও বাঙ্মাধুর্য্যে বিমুগ্ধা হইয়া তৎপ্রতি সাতিশয় অনুরাগবতী হইয়াছেন এবং হীরো নিজ ভগিনী বিয়েত্রিশের হৃদয়ে এতাদৃশ প্রত্যয় উৎপাদন করুন বেনিদিক্ তাঁহাকে অবলোকন করিয়া অবধি মনোমধ্যে তদীয় প্রেমাভিলাষ করত তাঁহার নিমিত্ত উৎকলিকাকুল আছেন।
পরে রাজকিশোর, লিয়নেত এবং ক্লাদিও তিন জনে সংকল্পিত সিদ্ধির নিমিত্ত আদৌ উদ্যোগ করিলেন। যে সময় বেনিদিক্ উদ্যানে গমন পূর্ব্বক নির্জ্জনে উপবেশন করিয়া গ্রন্থালোচনা করিতে ছিলেন তৎকালে প্রচ্ছন্ন ভাবে তথায় উপস্থিত হইয়া তরুপংক্তির অন্তরালে তাঁহার সন্নিকট দণ্ডায়মান হইলেন। সে স্থলে রাজকুমার স্বীয় দুই সহচর সহিত যে কথোপকথন করিলেন তাহা বেনিদিকের কর্ণগোচর হইল। নৃপতনয় উচ্চস্বরে লিয়নেতকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন মহাশয় সে দিবস আমাকে বলিতে ছিলেন না, আপনকার ভ্রাতৃকন্যা বেনিদিকের প্রতি অনুরাগিণী হইয়াছেন? কি আশ্চর্য্য, আমার কখন মনেও হইত না যে সেই কামিনী কাহারো প্রতি প্রণয়িনী হইবেন। লিয়নেত উত্তর দিলেন সত্য বটে, আমিও পূর্ব্বে ঐরূপ অনুমান করিতাম, এখনও তাঁহার বাহ্য ব্যবহার দর্শন করিলে বোধ হয় বেনিদিক্কে অবজ্ঞা করেন কিন্তু অন্তঃকরণ মধ্যে তাঁহার প্রতি সাতিশয় অনুরাগবতী। পরে ক্লাদিও সাক্ষ্য দিয়া কহিলেন হীরো আমার সাক্ষাতে সে দিন বলিতেছিলেন বটে বিয়েত্রিশ্ বেনিদিকের ভাবে এপ্রকার আসক্ত হইয়াছেন যদিস্যাৎ ঐ যুবা তাঁহার সহিত প্রণয় না করেন তাহা হইলে মনস্তাপে তরুণীর তনুত্যাগ হইবার সম্ভাবনা। কিন্তু অব্যবহিত পরেই লিয়নেতের সহিত ক্লাদিও একবাক্য হইয়া বলিতে লাগিলেন কেবল কামিনীর অনুরাগে কি হইবেক বেনিদিকের মনে অঙ্গনা প্রণয় উৎপন্ন হওয়া দুর্ঘট। তিনি যাবতীয় বিলাসিনী বিশেষতঃ বিয়েত্রিশের সঙ্গে সর্ব্বদা নীরস পরিহাস করিয়া থাকেন।
রাজপুত্র যেন বিয়েত্রিশের প্রতি সাতিশয় সদয়, এতাদৃশ ভাব প্রকাশ পূর্ব্বক ঐ কথোপকথন শ্রবণ করিতেছিলেন অতএব তাঁহাদের কথাবসানে বলিলেন তবে বিয়েত্রিশের অনুরাগ বেনিদিকের জ্ঞানগোচর করিলে ভাল হয়। ক্লাদিও এতদ্বাক্য আকর্ণনে আক্ষেপ করত উক্তি করিলেন তাঁহার নিকট এ বিষয় প্রকাশ করিলে কি হইবে, তিনি একথা শুনিলে সুন্দরীকে পরিহাস করিবেন তাহাতে কামিনীর অধিক মনোদুঃখ হইবার সম্ভাবনা। রাজকুমার কিঞ্চিৎ কোপাবেশে বলিলেন কি, বেনিদিক্ এবম্প্রকার কৌতুক করিলে তাঁহার প্রাণদণ্ড করা উচিত, আহা বিয়েত্রিশ্ কি ভ্রান্তা, তাঁহার বুদ্ধি কি একেবারে উৎসন্না হইয়া গিয়াছে, কি আস্বাদে বেনিদিক্কে সপ্রণয় নয়নে নিরীক্ষণ করিলেন ও তাহার প্রতি অন্তঃকরণ প্রেম প্রবণ হইল। এই কথা কহিয়া সঙ্গিগণকে ইঙ্গিতে বলিলেন এক্ষণে এস্থান হইতে প্রস্থান করা যাউক আমাদের কথোপকথন বেনি দিকের কর্ণগোচর হইয়াছে এখন মনোমধ্যে আন্দোলন করুক।
বেনিদিক্ মনোযোগ পুরঃসর ঐ সকল কথা বার্ত্তা শ্রবণ করিতেছিলেন। বিয়েত্রিশ্ তাঁহার প্রেমাভিলাষিণী হইয়াছেন এ কথা কর্ণগোচর হইবামাত্র মনে২ কহিলেন ইহা কি সম্ভব? ঐ কোণে কি বায়ু অবস্থিতি করিতেছে? কিন্তু নৃপনন্দন সঙ্গিগণ সমভিব্যাহারে গমন করিলে পর পুনর্ব্বার অন্তঃকরণে তর্ক করিতে লাগিলেন তাঁহারা যাহা কহিতেছিলেন তদ্বিষয়ে প্রতারণা অনুমান করিতে পারাযায় না, কেননা অকপট মুখে পরস্পর কথোপকথন করিতে ছিলেন। অপর আমার প্রতি ঐ কামিনীর প্রেমানুরাগের বিবরণ হীরোর নিকটেও শ্রবণ করিতে তাঁহাদের চিত্ত যেন দুর্ভাবনায় ব্যাকুল হইয়াছে এমত বোধ হইল। কি আশ্চর্য্য বিয়েত্রিশ্ আমার প্রতি অনুরাগিণী হইলেন, তবে তো আমারও প্রেম প্রতিদান করা উচিত হয়। বিবাহের ভাবনা নাই, পূর্ব্বে কহিয়াছিলাম বটে দার পরিগ্রহ করিয়া গলগ্রহ করিব না, অবিবাহিতাবস্থাতেই দেহপাত করিব, তখন এতাদৃশ বোধ হয় নাই যে আমার পরিণয় হইবেক। এক্ষণে তাঁহাদের প্রমুখাৎ শুনিলাম সেই সুন্দরী সুধীরা ও রূপ গুণে মনোহারিণী, বস্তুতঃ এপ্রকার বটেন, কিন্তু সর্ব্বগুণ ধারণ করিলেও আমার প্রতি প্রণয়িনী হওয়াতে অতিশয় নির্গুণের কার্য্য করিয়াছেন, ইহাতে তাঁহার বুদ্ধির অভাব অথবা বিকৃতি প্রকাশ পাইল। যাহা হউক, আমার পক্ষে এতদ্বিষয়ে ঔদাস্য করা শ্রেয়স্কর নহে, আপনিও স্নেহ প্রদর্শনের পন্থা দেখি। এই প্রকার চিন্তা করিয়া জাতানুরাগ হওত পরিক্রমণ করিবার উপক্রম করিতেছেন, ইত্যবসরে অদূরে দেখিতে পাইলেন বিয়েত্রিশ্ আগমন করিতেছেন। তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিয়াই আপনাআপনি কহিতে লাগিলেন অদ্য তরুণীর মধুর রূপ দেখিতেছি এবং ইহাঁতে প্রেমের চিহ্নও দৃষ্ট হইতেছে। অনন্তর বিয়েত্রিশ্ তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়া স্বীয় স্বভাব বশতঃ পরুষ ভাষায় বলিলেন আমার ইচ্ছা ছিল না তোমার নিকট আসি কিন্তু কি করি ভোজনার্থ আহ্বান করিতে আমাকেই পাঠাইলেন। বেনিদিক্ ইতি পূর্ব্বে কামিনীর সহিত মিষ্টালাপ করেন নাই কিন্তু এক্ষণে মৃদু মধুর ভাষায় সম্বোধন করত বলিলেন হে সুকুমারাঙ্গি তুমি এতন্নিমিত্ত ক্লেশ স্বীকার পূর্ব্বক কেন আগমন করিলে? তোমার এই সদ্ভাব নিমিত্ত বাধিত হইলাম। বিয়েত্রিশ্ স্বভাবতঃ কর্কশা এপ্রযুক্ত তাদৃশ সদালাপে কর্ণপাত না করিয়া নীরস ভাষায় অপর কএকটী কথা কহিলেন এবং পূর্ব্ববৎ পরুষ প্রকৃতি প্রকাশ করত অবিলম্বে চলিয়া গেলেন। বেনিদিক্ এক্ষণে কামিনীর কর্কশ বাক্য মধ্যেও গূঢ় স্নেহরস বোধ করিতে ছিলেন অতএব মুক্তকণ্ঠে ব্যক্ত করিয়া বলিলেন এখন যদি তাঁহার প্রতি স্নেহান্বিত না হই তবে দুরাত্মতা প্রকাশ হইবেক, যদি প্রেম না করি তবে আমা অপেক্ষা নরাধম নাই, অতএব আমি গমন করি এবং তাঁহার চিত্তানুবৃত্তি করিতে সত্বর হই।
রাজনন্দন আপন মানস সফল করণাশয়ে সঙ্গিগণের সহিত পরামর্শ করিয়া যে বাগুরা বিস্তীর্ণ করিলেন তাহাতে বেনিদিক্ আবদ্ধ হইলেন। এক্ষণে হীরো বিয়েত্রিশ্কে প্রতারণা জালে নিক্ষেপ করিবার নিমিত্ত সুযোগ করিতে লাগিলেন। অর্সুলা ও মার্গেরেত্ নাম্নী দুই সহচরীকে আহ্বান করিয়া মার্গেরেত্কে কহিলেন প্রিয়সখি তুমি ত্বরায় সভাগারে গমন কর সেখানে আমার ভগিনী বিয়েত্রিশ্ রাজকুমার ও ক্লাদিওর সহিত কথোপকথন করিতেছেন, তাঁহার কর্ণকুহরে অনুচ্চস্বরে কহিয়া আইস হীরো স্বীয়া প্রিয়সখী অর্সুলার সহিত উদ্যানে ভ্রমণ করিতে২ কেবল তোমারই কথা কহিতেছেন যদি প্রত্যয় না হয় নিকুঞ্জের যে স্থলে তরুলতাবলীর পত্র পল্লব দ্বারা দিনকরের কর প্রবেশ হয় না তথায় গোপনে গমন পূর্ব্বক বরং স্বকর্ণ শ্রবণ কর। মার্গেরেত্ এতৎ শ্রবণে সহর্ষা হইয়া কহিল আমি এখনি যাইতেছি তাঁহাকে প্রবৃত্তি দিয়া নিশ্চয় সেখানে প্রেরণ করিব। হীরো যে স্থানে বিয়েত্রিশ্কে আনয়ন করিবার নিমিত্ত এই কৌশল করিলেন কিয়ৎ ক্ষণ পূর্ব্বে বেনিদিক্ সেই স্থলে রাজনন্দন ও তদীয় সমভিব্যাহারিগণের কথোপকথন শ্রবণ করিয়াছিলেন।
অনন্তর হীরো স্বীয় সহচরী অর্সুলা সমভিব্যাহারে নির্দ্দিষ্ট উদ্যানে উপস্থিত হইয়া সখীকে কহিলেন দেখ অর্সুলা, বিয়েত্রিশ্ এখানে আগমন করিলে আমরা এই ক্ষুদ্র বর্ত্ম দিয়া যাতায়াত করিতে২ কেবল বেনিদিকের কথা কহিব। আমি যখন২ তাঁহার নাম গ্রহণ করিব তখন তুমি সমস্ত পুরুষাপেক্ষা তাঁহার প্রতিষ্ঠা করিও। তোমার সঙ্গে কথোপকথন করিতে২ কহিব বেনিদিক্ বিয়েত্রিশের ভাবে মুগ্ধ হইয়া তাহার প্রতি আসক্ত হইয়াছেন। তৎপরে চারি দিক্ অবলোকন করিয়া বলিলেন হে সখি আইস ত্বরায় কথা আরম্ভ করি ঐ দেখ বিয়েত্রিশ টিট্টিভী প্রায় ভূমিতে মিশাইয়া গোপনে আমাদের কথোপকথন আকর্ণন করিবার নিমিত্ত দ্রুতগতি আগমন করিতেছেন। পরে তাঁহারা পরস্পর কথা কহিতে আরম্ভ করিলেন। হীরো যেন অর্সুলার কথার উত্তর দিতেছেন এবম্প্রকার ভঙ্গি করত কহিলেন বিয়েত্রিশ্ সাতিশয় অহঙ্কৃতা, পর্ব্বতীয় পক্ষির ন্যায় তাঁহার প্রকৃতি অতি প্রগল্ভ। অর্সুলা বলিল ঠাকুরাণি আপনি কি নিশ্চয় অবগত আছেন বেনিদিক্ বিয়ত্রিশের প্রেমাভিলাষী? হীরো উত্তর দিলেন রাজকুমার এবং ক্লাদিওর প্রমুখাৎ শুনিয়াছি বেনিদিক্ তন্নিমিত্ত অন্তঃকরণ মধ্যে সাতিশয় উৎকণ্ঠান্বিত। তাঁহারা দুই জনে আমাকে ঐ বিষয় বিয়েত্রিশের নিকট প্রকাশ করণার্থ অনুরোধ করিয়াছিলেন কিন্তু আমি তাঁহাদিগকে বিনতি করিয়া কহিলাম তোমরা যদিস্যাৎ বেনিদিকের স্নেহান্বিত বন্ধু হও তবে এ কথা কখন বিয়েত্রিশের কর্ণগোচর করিও না। অর্সুলা বলিল সত্য বটে কামিনীর যাদৃশ স্বভাব তাহাতে বেনিদিকের আসক্তির কথা তাঁহার জ্ঞানগোচর করা যুক্তি সিদ্ধ হয় না। কি জানি যদি পরুষভাষায় কৌতুক করিয়া বসিলেন।
হীরো বলিলেন কিন্তু আমি এপর্য্যন্ত কখন কামিনীর মুখে কোন রূপবান্ যুবা বিশেষতঃ বিজ্ঞ পুরুষের কুৎসার কথা শ্রবণ করি নাই। অর্সুলা বলিল তাহাও সত্য, গুণি ব্যক্তির গ্লানি করাতে যে আপনার অপ্রতিষ্ঠা হয় ইহা কি তিনি বুঝেন না? অবশ্য বুঝিতে পারেন। হীরো উত্তর করিলেন যাহা হউক আমার সাধ্য নাই যে এ কথা তাঁহাকে বলি। আমি কহিতে গেলে পরিহাস করিয়া উড়াইয়া দিবেন। অর্সুলা বলিল ঠাকুরানি আপনি অন্যায় উক্তি করিতেছেন তিনি কি এমনই অর্বাচীন যে বেনিদিকের তুল্য সুশ্রী সুরূপ সর্ব্বগুণান্বিত পাত্র পরিত্যাগ করিবেন? হীরো বলিলেন বেনিদিকের যথেষ্ট সুখ্যাতি শ্রুত আছে বটে, প্রিয় ক্লাদিও ব্যতীত ইটালি দেশের মধ্যে তিনি অতি প্রধান এবং সকল লোকের মান্য ও অগ্রগণ্য। পরে সখীকে সঙ্কেত করিয়া বলিলেন এক্ষণে আমরা এ বিষয় পরিত্যাগ পূর্ব্বক অন্য কোন প্রসঙ্গ করিয়া কথোপকথন করি আইস। তাহাতে অর্সুলা তাঁহাকে সম্বোধন পুরঃসর সস্নেহ বচনে জিজ্ঞাসা করিল ঠাকুরাণি আপনকার বিবাহ কবে হইবেক? হীরো উত্তর করিলেন আগামি দিবসে ক্লাদিওর সহিত আমার পরিণয় হইবেক। পরে তাহাকে অনুরোধ করত বলিলেন তুমি আমার নূতন পরিচ্ছদ দেখিবে আইস। চল দেখি গিয়া দুই জনে বিবেচনা করি কল্য কোন বসন পরিধান করিব। এই কহিয়া সে স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন। বিয়েত্রিশ্ লতা ব্যবহিতা হইয়া তাঁহাদের সমস্ত কথোপকথন মনোযোগ পুরঃসর শ্রবণ করিতেছিলেন অতএব তাঁহারা তথা হইতে গমন করিলে পর সোদ্বেগ মনে আপনা আপনি বলিতে লাগিলেন আমার কর্ণ কুহরে এ কি হুতাশন প্রবেশ করিল? যাহা শুনিলাম সত্য না কি? যাহা হউক, হে ঘৃণা দেবি, হে তাচ্ছীল্য মহাশয়, হে কৌমারাভিমান, তোমরা বিদায় হও। কি আশ্চর্য্য, বেনিদিক্ আমার প্রণয়াভিলাষী হইয়া অনুরাগী হইয়াছেন। আমি আপনার অশিষ্ট স্বান্ত শান্ত করত অবশ্য তাঁহার প্রতি প্রেম করিব।
সুচতুর রসিক রাজকিশোরের বুদ্ধি কৌশলে এই প্রকারে চির বিরোধি যুবক যুবতীর অন্তঃকরণে বৈরিতাপসরণ পুরঃসর অনুরাগের অবির্ভাব হইলে তাঁহাদের উভয়ের প্রথম সন্দর্শনের সপ্রণয়ালাপ সাতিশয় আনন্দ জনক হইবার সম্ভাবনা হইল। কিন্তু কোন খলের দুরাত্মতায় হীরোর অদৃষ্টে দৈবাৎ একটা দুর্ঘটনা ঘটাতে তিনি সমস্ত আহ্লাদে বঞ্চিতা হইলেন। যে দিবস প্রাতঃকালে তাঁহার পাণিগ্রহণ হইত সেই দিন তাঁহার এবং তদীয় জনকের মনে মহাসন্তাপের শঙ্কু নিখাত হইল।
রাজনন্দনের দঞ্জন্ নামা এক জন সাপত্ন ভ্রাতা ছিল। সে ব্যক্তিও সমরাবসানে তাহাদের সমভিব্যাহারে মেসিনা নগরে আগমন করিয়াছিল। সে সর্ব্বদা ঈর্ষা বিমর্ষে পরীত থাকাতে কুতর্ক ও কুৎসিত কল্পনা করত অসন্তোষে কাল হরণ করিত। রাজ তনয়ের প্রতি তাহার আন্তরিক সদ্ভাব ছিল না, তাঁহাকে মনে২ দ্বেষ করাতে তদীয় অকৃত্রিম মিত্র ক্লাদিওরও হিংসা করিত। সে আপনার খল প্রকৃতির পরবশতা প্রযুক্ত মৎসরী হইয়া হীরোর সহিত ক্লাদিওর বিবাহ নির্ব্বাহে ব্যাঘাত উত্থাপন পূর্ব্বক রাজতনয় ও তাঁহার পরম প্রণয়াস্পদ বয়স্যকে অসুখী করিবার মানস করিল কেননা তাহার বিদিত হইয়াছিল এই পরিণয় সম্পাদন নিমিত্ত রাজকুমার ও তাঁহার সখা ক্লাদিও উভয়ে সাতিশয় ব্যগ্র। ঐ দুরাত্মা আপনার দুষ্ট অভিপ্রায় সুসিদ্ধি করিবার নিমিত্ত আত্মবৎ দুঃশীল বোরাকিও নামা এক ব্যক্তিকে পুরস্কারের লোভ প্রদর্শন পূর্ব্বক সহকারিতা করণে নিযুক্ত করিল। হীরোর সহচরী মার্গেরেতের সহিত বোরাকিওর সাতিশয় প্রণয় ছিল। দুরাত্মা দঞ্জন্ তাহা বিলক্ষণ জানিত। অতএব বোরাকিওকে কহিল বন্ধো তুমি মার্গেরেতের নিকট গমন পূর্ব্বক তাহাকে অনুরোধ কর অদ্য নিশাভাগে হীরো আপনার আগারে নিদ্রাগতা হইলে তদীয় পরিচ্ছদ পরিধান পুরঃসর সেই গৃহের গবাক্ষ হইতে যেন তোমার সহিত কথোপকথন করেন, তাহা হইলে ক্লাদিও বিশ্বাস করিবেন হীরোই কথা কহিতেছে তবেই আমার অভিলষিত সফল হইবে।
দুরাত্মা দঞ্জন্ এই রূপ পরামর্শ প্রদান পুরঃসর বোরাকিওকে প্রেরণ করিয়া আপনি রাজনন্দন ও ক্লাদিওর নিকট গমন করিল এবং হীরোর সহিত ক্লাদিওর বিবাহের প্রসঙ্গ করত কহিল আমি সটীক শুনিয়াছি সেই যুবতীর চরিত্র পবিত্র নহে। তিনি রজনীযোগে আপন ভবনের গবাক্ষ দ্বার দিয়া পুরুষের সঙ্গে আলাপ কৌশল করেন। সে যে সময় তাঁহাদিগের সন্নিধানে গমন করিয়াছিল সে সময় পরিণয়ের অগ্রিম দিনের সায়ংকাল, অতএব কহিল তোমরা যদিস্যাৎ দেখিতে চাহ চল অদ্য যামিনীযোগে একত্র হইয়া তাহার আলয়ের নিকট গমন পুর্ব্বক প্রত্যক্ষ করত চক্ষু কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করি। নৃপনন্দন এবং ক্লাদিও এতৎ শ্রবণে বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন, এবং অবিলম্বে তাহার সমভিব্যাহারে গমন করিতে চাহিলেন। অপর ক্লাদিও মুক্তকণ্ঠে কহিলেন যদিস্যাৎ অদ্য রাত্রিতে কিছু দেখিতে পাই তাহা হইলে কি নিমিত্ত কামিনীর করগ্রহণ করিব না কল্য বিবাহের সভায় সকলের সমক্ষে বিস্তারিত করিয়া কহিব এবং সেই দুঃশীলাকে যৎপরোনাস্তি লজ্জা দিব। রাজকুমারও কহিলেন মিত্র তোমার সহিত তাহার বিবাহ হয় এতদর্থ আদ্যাবধি আমি যথেষ্ট যত্ন পাইয়াছি অতএব আমিও তোমার সহিত মিলিত হইয়া তাহার অপমান করিব।
অনন্তর কিঞ্চিৎ রজনী হইলে দঞ্জন্ তাঁহাদের দুই জনকে সমভিব্যাহারে লইয়া গোপনে হীরোর আগারের সন্নিকটে আসিল। সে সময় ঐ দুরাত্মার উপদেশানুসারে বোরাকিও হীরোর গৃহের গবাক্ষ তলে দণ্ডায়মান ছিল এবং মার্গেরেত্ হীরোর বসন পরিধান পূর্ব্বক গবাক্ষ দ্বারে মুখ দিয়া তাহার সহিত বিরলে কথাবার্তা কহিতেছিল। রাজনন্দন ও ক্লাদিও হীরোর গবাক্ষ দ্বারে তদীয় পরিচ্ছদ ধারিণী রমণী নয়ন গোচর করিবা মাত্র জাত প্রত্যয় হইলেন হীরোই নির্জনে পুরুষান্তর সহ বিশ্রম্ভালাপ করিতেছেন।
এই ব্যাপার স্বচক্ষুতে অবলোকন করিবা মাত্র ক্রোধে ক্লাদিওর অন্তর্দাহ হইতে লাগিল এবং তাঁহার যে অন্তঃকরণে নির্দোষা হীরোর প্রতি পরম প্রীতি জন্মিয়াছিল তাহা ঘৃণায় পরিপূর্ণ হইল। তিনি কহিলেন কল্য প্রভাতে সভা মধ্যে এই সমস্ত বিষয়ের বর্ণন করিয়া দুঃশীলাকে বিলক্ষণ লজ্জা দিব। রাজকুমারও কামিনীর এই চরিত্র প্রত্যক্ষ করিয়া অশ্রদ্ধান্বিত হইলেন অতএব বয়স্যের সহিত এক মত হইয়া তাহাই কর্ত্তব্য বলিয়া ধার্য্য করিলেন এবং সাশ্চর্য্য চিত্তে বিস্ময় প্রকাশ করিতে লাগিলেন রমণীর কি সাহস, এক জন সম্ভ্রান্ত পুরুষের সহিত প্রভাতে পরিণয় হইবেক নিশাভাগে শয়নাগারের গবাক্ষ হইতে পরপুরুষের সঙ্গে এই ব্যাপার।
পর দিবস পূর্ব্বাহ্নে পূর্ব্ব সংকল্পিতানুসারে বিবাহের সভা সুসজ্জিতা হইল এবং ভূরি২ ধন্য মান্য সভ্য ভব্য ব্যক্তি আসিয়া অধ্যাসীন হইলেন। পুরোহিত বরকন্যাকে সম্মুখে দণ্ডায়মান করত পাণিগ্রহণের মন্ত্র উচ্চারণ করিবেন ইত্যসরে ক্লাদিও সকোপ বচনে নির্দোষা হীরোর চরিত্রে কলঙ্কারোপ করিতে লাগিলেন। দোষলেশের সম্পর্ক শূন্যা হীরো সেই অদ্ভুত বাক্য আকর্ণনে বিস্ময়ান্বিতা হওত ক্ষণকাল স্তব্ধ হইয়া রহিলেন পরে মৃদুস্বরে প্রাণেশ্বরের প্রতি উক্তি করিলেন অয়ি নাথ আপনি কি প্রকৃতিস্থ হইয়া এই সমস্ত নিদারুণ দূষণ বচন প্রয়োগ করিতেছেন?
লিয়নেত ক্লাদিওর উক্তি শ্রবণ করিয়া চমৎকৃত হইলেন এবং সাতিশয় বিমনস্কতা প্রকাশ পূর্ব্বক রাজতনয়কে বলিলেন আপনি কি নিমিত্ত মৌনাবলম্বন করিতেছেন কোন কথা কহেন না কেন? রাজনন্দন উত্তর দিলেন আমি কি কহিব স্বয়ং যৎপরোনাস্তি লজ্জিত হইতেছি, কি ঘৃণার বিষয়, ঈদৃশী অযোগ্যা ঘোষার সহিত প্রিয় বয়স্যের পরিণয় নিমিত্ত যত্ন করিয়াছিলাম। ওহে লিয়নেত যথার্থ কহিতেছি গত রাত্রিতে আমি আমার বৈমাত্রেয় এবং ক্লাদিও এই তিন জন আপন নয়নে অবলোকন করিয়াছি। কামিনী স্বীয় শয়নাগারের গবাক্ষ দ্বার হইতে একটা যুবা পুরুষের সহিত প্রণয়ালাপ করিতেছিলেন স্ব কর্ণে শুনিয়াছি।
বেনিদিক্ এতদ্বচনে সাতিশয় চমৎকার প্রকাশ করত কহিলেন এ পরিণয়ের আচার নয়।
হীরো এ সমস্ত কথা শ্রবণে বিস্ময়ে সংজ্ঞা শূন্য হইলেন কিঞ্চিচ্চৈতন্যোদয় হইলে মনঃপীড়া প্রকাশ পুরঃসর কহিলেন সত্য কি, হা পরমেশ্বর। কিন্তু এই শব্দটী বদন হইতে বিনির্গত হইবামাত্র মূর্চ্ছান্বিত হইয়া ভূমিতে পড়িলেন ও তাঁহার প্রাণ বিনির্গমনানন্তর মৃত্যু হইল এমত বোধ হইল। রাজনন্দন এবং ক্লাদিও ঘৃণায় সাতিশয় বিরক্ত হইয়াছিলেন এবং তাঁহাদের চিত্ত সুকঠিন হইয়াছিল অতএব অবলার মূর্চ্ছা ভঙ্গ দর্শনের অপেক্ষা না করিয়া তৎক্ষণাৎ সে স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন সুতরাং লিয়নেত অপার বিষাদার্ণবে নিমগ্ন হইলেন।
বিয়েত্রিশ্ ব্যস্ত সমস্ত হইয়া হীরোর মূর্চ্ছাপনয়ন করিতে লাগিলেন। বেনিদিক্ তাঁহার সাহায্য করিয়া কিয়ৎ ক্ষণ পরে জিজ্ঞাসা করিলেন সুকুমারী কুমারী কিঞ্চিৎ সুস্থ হইলেন কি না? বিয়েত্রিশ্ ভগিনীর প্রতি অত্যন্ত স্নেহান্বিতা ছিলেন অতএব, বিষণ্ণ বদনে উত্তর দিলেন এখনও স্পন্দ হইল না, বোধ হয় প্রাণ বিয়োগ হইয়াছে। ভগিনীর সৎপ্রকৃতি এবং সুশীলতা তাহার বিলক্ষণরূপে বিদিত ছিল সুতরাং এই অলীক কলঙ্কারোপে কোন প্রকারে বিশ্বাস করিলেন না কিন্তু বৃদ্ধ লিয়নেত কন্যার কুৎসাকর কথা কর্ণগোচর করিয়া তাহাঁতে জাতপ্রত্যয় হইয়াছিলেন অতএব সম্মুখে দুহিতা মৃতপ্রায় হইয়া মূর্চ্ছায় ধূল্যবলুণ্ঠিত হইলে অপত্যস্নেহ বশতঃ বিলাপ করিতে লাগিলেন বটে কিন্তু লোকলজ্জা ভয়ে মনে২ তাঁহার এই প্রার্থনা হইল তনয়া যেন আর নয়নোন্মীলন না করে।
সভাস্থ প্রাচীন পুরোহিত অতিশয় প্রাজ্ঞ, স্বীয় সদ্বিবেক বলে মানব জাতির বাহ্যাকৃতি নিরীক্ষণ করিয়া রীতি প্রকৃতি নির্ণয় করিতে পারিতেন। কামিনীর প্রতি যৎকালে কলঙ্কারোপ হয় তদবধি মনোনিবেশ পূর্ব্বক তদীয় চন্দ্রানন অবলোকন করিতেছিলেন তাহাতে তাঁহার বোধ হইল অবলার বদনে লজ্জার লোহিত লক্ষ্ম প্রকাশানন্তর শোকের শ্বেতচ্ছবি করণক যেন আচ্ছাদিত হইল। অপর সুলোচনার লোচন দ্বয় হইতে কোপানল তুল্য যে জ্যোতিঃ নির্গত হইল তাহা যেন এই ব্যক্ত করিল যে রাজপুত্র তদীয় কৌমার ভ্রংশে অমূলক অপবাদ দিতেছেন অতএব ঋত্বিক্ শোকাকুল হইয়া লিয়নেতকে কহিতে লাগিলেন মহাশয় আপনকার এই সর্ব্বাঙ্গ সুন্দরী দুহিতা দোষলেশের সম্পর্কমাত্র শূন্যা, ইহাঁর চরিত্র সাতিশয় পবিত্র, কেবল নিদারুণ ভ্রান্তি বশতঃ ঈদৃশী দুর্দশায় পতিত হইয়াছেন, দেখিবেন শেষে আমার এই কথা সর্ব্বাংশে সপ্রমাণ হইবেক যদি না হয় আমাকে নির্ব্বোধ কহিবেন আমার যে বিদ্যা ও মানব প্রকৃতি পরিজ্ঞানে পাণ্ডিত্য আছে তাহাতে বিশ্বাস করিবেন না, অপর স্থবিরতা ও সদ্ব্যবসায় নিমিত্ত যে গৌরব ধারণ করি তাহাও রহিত করিয়া দিবেন।
অনন্তর হীরোর মূর্চ্ছা ভঙ্গ হইলে পুরোহিত সস্নেহ বচনে, সম্বোধন করত জিজ্ঞাসা করিলেন বৎসে কোন্ পুরুষের নামে এই অপবাদ রটিয়াছে তোমার বিদিত আছে? হীরো ভগ্নচিত্তে উত্তর করিলেন যাহারা কলঙ্ক কল্পনা করিল তাহারাই জানে, আমি কিঞ্চিন্মাত্র অবগতা নহি। তৎপরে তাত লিয়নেতের প্রতি কহিলেন পিতঃ আমি অসময়ে পর পুরুষের সহিত কথোপকথন করিয়া থাকি এবং গত নিশাতে কাহারো সহিত বাক্যালাপ করিয়াছি যদি সপ্রমাণ হয় এই মুহূর্ত্তে আমাকে পরিত্যাগ করুন, অথবা যথেচ্ছ ভর্ৎসনার সহিত ঘৃণা করিয়া জ্বলন্ত হুতাশনে নিক্ষেপ পূর্ব্বক বিবিধ যন্ত্রণা দিয়া আমার প্রাণ দণ্ড করুন।
অনন্তর পুরোহিত কহিলেন রাজকুমার ও ক্লাদিও উভয়েই অদ্ভুত ভ্রমে পতিত হইয়াছেন সন্দেহ নাই। পরে লিয়নেতকে পরামর্শ দিলেন মহারাজ আপনি প্রচার করুন যে সুকুমারী কুমারী কলঙ্কের বার্ত্তা আকর্ণনে মূর্চ্ছাগতা হইয়া অচেতনাবস্থায় পঞ্চত্ব প্রাপ্তা হইলেন এবং স্বয়ং শোক বসন পরিধান পূর্ব্বক অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার আয়োজন করুন। হে রাজন্ ক্লাদিও এবং নৃপনন্দন স্ব২ নয়নে ললনার মৃত্যু তুল্য মোহ নিরীক্ষণ করিয়া গিয়াছেন এই জনপ্রবাদে বিনা অনুসন্ধানে অসংশয় জাতপ্রত্যয় হইবেন। লিয়নেত বলিলেন এবম্প্রকার করিলে কি ফল দর্শিবে? পুরোহিত কহিলেন হীরোর মরণের কথা প্রচার হইলে আরোপিত কলঙ্ক লীন এবং তাঁহার প্রতি সকলের করুণোদয় হইবার সম্ভাবনা। এতদ্ব্যতীত অপর একটা গুরুতর শ্রেয়ঃ হইতে পারিবেক, ক্লাদিওর যখন কর্ণগোচর হইবেক তদীয় নিদারুণ অপবাদ বচনে সুতনু তনু ত্যাগ করিয়াছেন তখন তাঁহার মনোমধ্যে নায়িকার জীবদ্দশার ভাব অবশ্য আবির্ভূত হইবেক তাহাতে যদিস্যাৎ তাঁহার অন্তঃকরণে প্রণয়াঙ্কুর উৎপন্ন হইয়া থাকে তবে অবলার প্রতি যে অপবাদারোপ করিয়াছেন তাহার অলীকতায় জাতপ্রত্যয় হইয়া অনুতাপ করিবেন হায় কেন তাদৃশ নিষ্ঠুর বচন প্রয়োগ করিয়াছিলাম।
বেনিদিক্ও ঋত্বিকের সহিত একবাক্য হইয়া কহিলেন মহারাজ এ অতি সৎ পরামর্শ বটে আপনি গ্রহণ করুন। আপনকার বিদিত আছে ক্লাদিও এবং রাজকুমার আমার পরম প্রিয়মিত্র কিন্তু আমি সত্য করিয়া কহিতেছি এ রহস্য তাঁহাদিগের নিকট কদাপি ব্যক্ত করিব না।
লিয়নেত এবম্বিধ প্ররোচক বচনে পরিশেষে ঐ পরামর্শানুরূপ করিতে সম্মত হইলেন কিন্তু পরম স্নেহাস্পদ কন্যার কলঙ্কে সাতিশয় কাতর থাকাতে ব্যাকুলতা প্রকাশ পূর্ব্বক কহিলেন আমি যৎপরোনাস্তি সন্তাপিত ও নৈরাশ্য নীরধির গভীর নীরে পতিত হইয়াছি, কোন উপায় দেখি না যে তদবলম্বনে আশ্বাসান্বিত হই। হীরোও তদ্রূপে বিষাদ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। অতএব দয়াশীল যাজক শান্ত্বনা করণার্থ তাঁহাদের দুই জনকে স্বালয়ে লইয়া গেলেন। সকলে সে স্থান হইতে প্রস্থান করিলে বিয়েত্রিশ্ ও বেনিদিক্ এই দুই জনের বিরলে পরস্পর আলাপ হইতে লাগিল। কিন্তু ইহাঁদের উভয়ের প্রথম সম্মিলনে আত্মীয় স্বজন যে আমোদ বা কৌতুকের আশা করিয়াছিলেন তাহা তৎ কালের আকস্মিক বিষাদে আচ্ছন্ন হইয়া গেল। ফলতঃ কান্ত কামিনীর মনোমধ্যে যদিও পরস্পর প্রণয় সঞ্চার হইয়াছিল তথাপি তাঁহাদের চিত্ত অতিশয় দুঃখে নিমগ্ন থাকাতে তদানীং তাহাতে প্রমোদ চিন্তা হইল না।
বেনিদিক্ কোমল সম্বোধন পূর্ব্বক বিয়েত্রিশের প্রতি প্রশ্ন করিলেন সুন্দরি তুমি কি এখন পর্যন্ত রোদন করিবে? বিয়েত্রিশ্ উত্তর করিলেন আমার অশ্রু নিবারিত হয় না, হাঃ চিরকাল ক্রন্দন করিতে হইবেক। বেনিদিক্ বলিলেন অয়ি মুগ্ধে আমার নিশ্চয় বোধ হইতেছে তোমার ভগিনী নিতান্ত অনপরাধিনী। বিয়েত্রিশ্ সবিষাদ বচনে বলিলেন অয়ি ভগিনীর প্রতি আরোপিত অপবাদ বিমোচন করিতে সক্ষম এতাদৃশ কি কোন ব্যক্তি আছেন? যদি কেহ অপরাধ ভঞ্জন করিতে পারেন আমি তাঁহার নিকট চিরক্রীতা হইয়া থাকি। বেনিদিক্ এতদ্বাক্য শ্রবণে প্রীতি প্রদর্শন পূর্ব্বক ঈষদ্ধাস্য করত কহিলেন হে কোমলাঙ্গি এ কি অঙ্গীকার করিলে? এতদ্ভূমণ্ডল মধ্যে তোমা অপেক্ষা আমার প্রিয়তর কোন বস্তু নাই আমি যদিস্যাৎ এ কর্ম্ম করিতে পারি তবে কি আমারও ক্রীত স্বরূপ হইবে? কি আশ্চর্য্য। বিয়েত্রিশ্ তাঁহার প্রণয় সঞ্চার বুঝিয়া ভঙ্গি দ্বারা স্বীয় প্রেম প্রকাশ পূর্ব্বক কহিলেন ত্রিভুবন মধ্যে তোমা অপেক্ষা আমারও প্রিয় সামগ্রী নাই, হে তরুণ আমি মিথ্যা কহিতেছি না, কিন্তু আমার এ কথায় ত্বরায় প্রত্যয় করিও না ফলতঃ সংপ্রতি আমি কোন বিষয় স্বীকার বা অস্বীকার করিতেছি না, ইদানী ভগিনীর নিমিত্ত সন্তাপিতা আছি। বেনিদিক্ কামিনীর এই কথা শ্রবণমাত্রে হর্ষোৎফুল্ল হইয়া মুক্তকণ্ঠে ব্যক্ত করিলেন প্রেয়সি তুমি যাদৃশ আমার প্রতি অনুরাগিণী আমিও তদ্রূপ তোমার সহিত প্রণয়াকাঙ্ক্ষী। যাহা আজ্ঞা করিবে সর্ব্বান্তঃকরণে সম্পন্ন করিতে প্রস্তুত আছি। বিয়েত্রিশ্ বলিলেন তবে ক্লাদিওর প্রাণ সংহার করিয়া আইস দেখি। বেনিদিক্ এতদাদেশে বিমর্ষ প্রকাশ পুরঃসর সবিনয় বচনে কহিলেন সুন্দরি ক্লাদিও আমার সুস্নিগ্ধ বন্ধু, দ্বিতীয় জীবন স্বরূপ, যদি ত্রিভুবনাধিপত্য লভ্য হয় তথাপি আমি তাঁহাকে বধ করিতে পারিব না। বিশেষতঃ তাঁহার অপরাধ নাই, আমার নিশ্চয় বোধ হইতেছে কেবল ভ্রমে পতিত হইয়া সুশীলা হীরোর প্রতি কলঙ্কারোপ করিয়াছেন। বিয়েত্রিশ্ কোপে কম্পিত কলেবরা হইয়া কহিলেন আঃ ক্লাদিও অতি দুরাত্মা, সে আমার প্রিয়তমা ভগিনীর পরম পবিত্র চরিত্রে কৃত্রিম কলঙ্ক অঙ্কন পুরঃসর তাঁহার মর্মান্তিক অপমান করিয়াছে। হাঃ বিধাতঃ আমাকে কেন পুরুষ করিয়া সৃষ্টি কর নাই, এই দণ্ডে গমন করিয়া সে পাপাত্মার প্রাণ সংহার করিতাম। বেনিদিক্ শান্ত্বনা করত কহিতে লাগিলেন প্রেয়সি আমার কথা শ্রবণ কর। কিন্তু কামিনী তাঁহাকে ক্লাদিওর পক্ষপাতি বোধ করিয়া তদুক্ত বাক্যে কর্ণপাত করিলেন না, ভগিনীর প্রতি আরোপিত অপবাদের প্রতিক্রিয়া নিমিত্ত পুনঃ২ অনুরোধ করিতে লাগিলেন অবশেষে অধীরা হইয়া পরিতাপ করত কহিলেন গবাক্ষ দ্বার হইতে পুরুষের সহিত আলাপ করিয়াছেন, এ কথা কি সত্য? হা প্রিয়তমা হীরো, বিনা দোষে মনঃপীড়া পাইলে, তোমার চরিত্রে বৃথা কলঙ্কারোপ হইল। আঃ ক্লাদিওর নিমিত্ত আমি কেন পুরুষ হই নাই? আহা এক জন পুরুষও আমার সুহৃদ্ নাই। মনুষ্যজাতির শৌর্য্য শীলতায় গলিত হয়, ইচ্ছা মাত্রে পুরুষ হইতে পারি না, অতএব অবলার তুল্য শোকে বিকল হইয়া প্রাণত্যাগ করিতে হইল। বেনিদিক্ বিবিধ প্রকারে প্রবোধ প্রদান পুরঃসর বলিতে লাগিলেন অয়ি কোমলাঙ্গি ধৈর্য্যাবলম্বন পূর্ব্বক শোকাবেগ কিঞ্চিৎ সহিষ্ণুতা কর। এই কর প্রসারণ করত শপথ করিয়া কহিতেছি আমি তোমার পরম সুহৃদ্ এবং আপনার প্রাণ তুল্য তোমাকে ভাল বাসি। বিয়েত্রিশ্ বলিলেন হে প্রিয় তবে এই দোর্দণ্ডকে দিব্য করণে নিয়োগ না করিয়া আ মরি প্রণয়ানুরোধে মদাদেশিত ব্যাপারে প্রয়োগ কর দেখি। বেনিদিক্ জিজ্ঞাসা করিলেন হে সুলোচনে তোমার কি নিশ্চয় প্রত্যয় হইয়াছে ক্লাদিও বিনা ভ্রমে দুরাত্মতা পূর্ব্বক হীরোর চরিত্রে কলঙ্কারোপ করিয়াছেন? বিয়েত্রিশ্ উত্তর করিলেন আমার জীবাত্মা ও চিন্তাশক্তির সত্তায় যদ্রূপ সংশয় নাই এতদ্বিষয়েও তদ্রূপ সন্দেহমাত্র হয় না। বেনিদিক্ বলিলেন তবে আমি তোমার অভীষ্ট সাধনে প্রবৃত্ত হইলাম এই মুহূর্তে ক্লাদিওর সমীপে গমন পুরঃসর যুদ্ধ যাচ্ঞা করিতেছি। তোমার এই কর চুম্বন পূর্ব্বক যাত্রা করি অবিলম্বে আপনার দোর্দণ্ড দ্বারা প্রতিফল প্রদান পুরঃসর দৌরাত্ম্যের পরিশোধ লইয়া আসিব। প্রিয়ে এক্ষণে আমার প্রমুখাৎ যদ্রূপ শ্রবণ করিতেছ প্রত্যাগমন করিলে তদ্রূপ কর্ম্ম সমাধা প্রত্যক্ষ করিবে, যাও, অধুনা প্রবোধ প্রদান করিয়া প্রিয়া ভগিনীর শোক সান্ত্বনা কর।
যৎকালে বিয়েত্রিশ্ সরোষ বচনে বাদানুবাদ করত বেনিদিকের বীরত্ব স্বভাব উষ্মান্বিত করিলেন এবং হীরোর পক্ষ হইয়া ক্লাদিওর সহিত সমরে প্রবৃত্ত হইতে তাঁহার প্রবৃত্তি জন্মাইয়া দিলেন সেই সময় লিয়নেত কন্যার কলঙ্কে ক্রুদ্ধ হইয়া রাজকুমার ও ক্লাদিওর নিকট গমন পূর্ব্বক তাঁহাদের সহিত অসি যুদ্ধ যাচ্ঞা করিতেছিলেন এবং কোপে কহিতেছিলেন তোমাদের আরোপিত অপবাদে আমার নির্দোষ দুহিতা প্রাণ ত্যাগ করিয়াছেন। নৃপনন্দন এবং ক্লাদিও বৃদ্ধের শোকে সাতিশয় ক্ষোভ প্রকাশ করিতেছিলেন এবং সম্মান প্রদর্শন পুরঃসর মৃদুস্বরে বলিতেছিলেন হে বর্ষিষ্ঠ আর কেন অনর্থক কলহ উত্থাপন করেন? ইত্যবসরে বেনিদিক্ তথায় গিয়া উপস্থিত হইলেন এবং হীরোর প্রতি অহিতাচরণ নিমিত্ত ক্লাদিওর নিকট সমর প্রার্থনা করিলেন। রাজতনয় এবং ক্লাদিও আপনাদের বন্ধু বেনিদিক্কে অকস্মাৎ এবম্প্রকার বিপক্ষ দেখিয়া পরস্পর কহিতে লাগিলেন বিয়েত্রিশের বচনে বেনিদিক্ ঈদৃগ্ভাবাপন্ন হইয়াছেন সন্দেহ নাই। তদনন্তর ক্লাদিও বেনিদিকের প্রার্থনায় সম্মত হইয়া সমরে প্রবৃত্ত হন্ ইতিমধ্যে ধর্ম্মের সূক্ষ্মা গতি দ্বারা হীরোর সতীত্ব হঠাৎ সপ্রমাণ হইল সুতরাং বাদি প্রতিবাদি উভয়ের মধ্যে কাহাকেও রণের অনিশ্চিত সৌভাগ্যের উপর নির্ভর করিতে হইল না।
নৃপকুমার এবং ক্লাদিও যে সময় আপনাদের পরম প্রণয় ভাজন বন্ধু বেনিদিকের যুদ্ধ যাচ্ঞায় বিস্ময় প্রকাশ পূর্ব্বক কথোপকথন করিতেছিলেন দৈবাৎ তৎকালে এক জন বিচারপতি বোরাকিওকে ধারণ করিয়া নৃপতনয়ের সন্নিধানে আনয়ন করিলেন। ঐ ব্যক্তি দঞ্জনের নিয়োগে উৎপাত উথাপন করিয়া তদ্বিষয়ে এক জন সঙ্গির সহিত কথোপকথন করিতেছিল বিচারক তাহা স্বকর্ণে আকর্ণন করিয়াছিলেন।
বোরাকিও রাজকুমারের সম্মুখে দণ্ডায়মান হইয়া অকপটে ব্যক্ত করিল মার্গেরেত্ নাম্নী হীরোর সহচরী ঠাকুরাণীর পরিচ্ছদ পরিধান পূর্ব্বক তাঁহার শয়নাগারের গবাক্ষ দ্বার হইতে সেই নিশাভাগে আমার সহিত প্রণয়ালাপ করিতে ছিল আপনারা তদবলোকনে ভ্রান্ত হন এবং সেই অমূলক ভ্রমবশতঃ নির্দোষা হীরোর সতীত্বে সন্দেহ করেন। ক্লাদিও সমনস্ক শ্রবণেন্দ্রিয় সংযোগ পূর্ব্বক তাঁহার কথা শ্রবণ করিতেছিলেন দঞ্জনের অধম ব্যবহারে আপনাদের মতিভ্রম জানিতে পারিলেন। দুরাত্মা দঞ্জন এই রহস্য প্রকাশ হইবামাত্র বৃদ্ধ ও বেনিদিকের কোপ হইতে পরিত্রাণ নিমিত্ত মেসিনা নগর হইতে পলায়ন করিল অতএব হীরোর চরিত্রে সকলের মনে যে সংশয় জন্মিয়াছিল তাহা একেবারে দূরীভূত হইল।
ক্লাদিও যখন জানিতে পারিলেন নিরপরাধ হীরোর পবিত্র চরিত্রে অলীকাপবাদ আরোপ করিয়াছেন তখন অনুতাপে ব্যাকুল হইলেন এবং শোকে তাঁহার বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ হইতে লাগিল। মনে করিলেন সুলোচনা আমার নিষ্ঠুর বচন বাণে বিদারিত হৃদয়া হইয়া জীবন বিসর্জ্জন করিয়াছেন। অপর সেই বরবর্ণিনীর অপরূপ রূপ লাবণ্য তাঁহার স্মৃতিপথে প্রকাশমান হইল তাহাতে বিষমশরের প্রখর শরে অন্তঃকরণ মধ্যে জর্জ্জরিত হইতে লাগিলেন। রাজনন্দন বোরাকিওর বাক্য শ্রবণাবধি আপনাদের অসদ্ব্যবহারের বিষয় ভাবিতেছিলেন, ক্লাদিওকে জিজ্ঞাসা করিলেন সখে যে কথা কর্ণগোচর হইল তাহাতে কি তোমার হৃদয় শল্য বিদ্ধ তুল্য হইল না? ক্লাদিও উত্তর দিলেন মহারাজ বর্বর বোরাকিও যখন কথা কহিতেছিল তৎকালে আমার বোধ হইল যেন স্বহস্তে কালকূট পান করিয়াছি।
তৎপরে ক্লাদিও পশ্চাত্তাপ করিতে২ লিয়নেতের নিকট পুনর্ব্বার গমন করিলেন এবং তাঁহার তনয়ার প্রতি অকারণে অলীক কলঙ্কারোপ নিমিত্ত আপন অপরাধের মার্জ্জনা প্রার্থনা করত কহিলেন মহাশয় আমি পত্নীর প্রতি অসত্য অপবাদ আরোপ করিয়া মহাপরাধ করিয়াছি আপনি আমার উপর যে দণ্ডাজ্ঞা করিবেন প্রেয়সীর নিমিত্ত এই দণ্ডে তাহা গ্রহণ করিতে প্রস্তুত আছি।
লিয়নেত তাঁহার অনুতাপে দয়ার্দ্র হইলেন এবং তাঁহার উপর উত্থিত বৈর বিস্মরণ পূর্ব্বক এই স্নেহান্বিত বচন কহিলেন ক্লাদিও আমি তোমার এই দণ্ড করিতে চাহি হীরোর অনুরূপ একটী অনুজা আছে, এক্ষণে সেই কুমারী আমার উত্তরাধিকারিণী, তুমি কল্য প্রাতঃকালে তাহার পাণিগ্রহণ কর। ক্লদিও এই কথায় আপনাকে অনুগৃহীত বোধ করিয়া সত্য করত অঙ্গীকার করিলেন মহাশয় সেই রমণী আমার পরিচিতা নহে কিন্তু যদি কুৎসিত ও নির্গুণ হয় তথাপি আপনকার আদেশে বিনা আপত্তিতে তাহার কর গ্রহণ করিব। এই কথা বলিয়া স্বীয় মনো মধ্যে হীরোর নিমিত্ত যৎপরোনাস্তি বিষাদ করিতে লাগিলেন এবং সেই দিন নিশাভাগে শ্মশান স্থানে গমন পূর্ব্বক প্রেয়সীর চিতার নিকট উপবেশন করত সজল নয়নে সমস্ত বিভাবরী বিলাপ করিলেন।
তদনন্তর রজনী প্রভাতা হইলে ক্লাদিও রাজকুমার সমভিব্যাহারে পরিণয়ের সভায় প্রবেশ পূর্ব্বক অবলোকন করিলেন সুবিজ্ঞ পুরোহিত লিয়নেত এবং তদীয় ভ্রাতৃতনয়া শুভ কর্ম্ম সম্পাদন নিমিত্ত উপস্থিত আছেন। পরে লিয়নেত সভাস্থ সকলের সমক্ষে যথা বিধি কন্যা সম্প্রদান করিলেন এবং ক্লাদিও অঙ্গীকারানুসারে কুমারীর কর গ্রহণে সত্বর হইলেন। কিন্তু কামিনী কপট বেশ ধারণ পূর্ব্বক আপনার প্রকৃত আকার গোপন করিয়া রাখাতে তদীয় বদন সুধাকর অকলোকন করিতে পাইলেন না। অতএব সন্দিগ্ধচিত্তে তাঁহার প্রতি কহিলেন এই ধর্ম্মিষ্ঠ যাজকের সাক্ষাৎ আমাকে কর প্রদান পুরঃসর বিবাহ করিতেছ অদ্যাবধি আমি তোমার পতি এবং তুমি আমার পত্নী হইলে। কন্যা অবগুণ্ঠন মধ্যে থাকিয়া উত্তর করিলেন জীবিতাবস্থায় আমি তোমার প্রথমা ভার্য্যা ছিলাম এই কহিয়া বদনাবরণ উন্মোচন করিলে প্রকাশ হইল তিনি লিয়নেতের ভ্রাতৃতনয়া নহেন তাঁহারই হীরো নাম্নী কন্যা। অতএব ক্লাদিও সাতিশয় চমৎকৃত হইয়া চিত্ত মধ্যে পরমাপ্যায়িত হইলেন কেননা নিশ্চয় বোধ হইয়াছিল হৃদয়বল্লভা বনিতা বচন বাণে বিদ্ধা হইয়া জীবন বিসর্জ্জন করিয়াছেন সুতরাং জীবিতেশ্বরীকে পুনর্জীবিতা প্রাপ্ত হওয়াতে আনন্দে গদ্গদ হইয়া নয়নের অবিকৃত কার্য্যে ক্ষণকাল অপ্রত্যয় করিতে লাগিলেন এবং মনে২ কহিলেন ইনি কি সেই হীরো? নৃপনন্দনও এই ব্যাপার অবলোকনে বন্ধুর ন্যায় বিস্ময়াকুল হইলেন পরে সংশয় প্রকাশ করত জিজ্ঞাসা করিলেন এই যুবতী কি কালধর্ম্মগতা সেই হীরো নহে? লিয়নেত উত্তর করিলেন হে রাজকুমার যাবৎ তাঁহার কলঙ্ক ছিল তাবৎ পর্য্যন্ত মৃতাবস্থায় ছিলেন। পরে পুরোহিত কহিলেন শুভকর্ম্ম সম্পাদনান্তে এই আশ্চর্য্য বিষয়ের বিবরণ ব্যক্ত করা যাইবেক সংপ্রতি পরিণয়ের ইতিকর্ত্তব্যতার সমাধা হউক, এই বলিয়া তৎকার্য্য নির্ব্বাহে প্রবৃত্ত হন্ ইত্যবসরে বেনিদিক্ বাধক স্বরূপ হইয়া কহিলেন হে বিজ্ঞ পুরোহিত বিয়েত্রিশের সহিত আমার বিবাহ দিয়া দুই কর্ম্ম এককালীন সমাধা করিতে আজ্ঞা হউক। পরে বিয়েত্রিশকে পাণি দানে বিলম্ব করিতে দেখিয়া স্পর্দ্ধা করত কহিলেন প্রিয়ে আমি সবিশেষ শুনিয়াছি তুমি আমার প্রণয়াকাঙ্ক্ষিণী, তবে আর কেন কালক্ষেপ কর? তাঁহার এই কথায় এক্ষণে অনুসন্ধানের প্রয়োজন হইল এবং প্রকাশ পাইল যে উভয়ে অন্যের আরোপিত প্রণয়ে পরস্পর বদ্ধপ্রেম হইয়াছেন বস্তুতঃ আদৌ কাহারো মনে স্নেহ সঞ্চার হয় নাই অপরে কৌতুক করিবার আশয়ে উভয়ের যে প্রণয় কল্পনা করেন তাহাতেই অন্যোন্যানুরাগ জন্মিয়াছিল এবং তদ্বারা ক্রমে স্নেহপ্রবৃত্তি হওয়াতে সেই আরোপিত প্রেমই বদ্ধমূল হইয়াছিল সুতরাং পরে অনুসন্ধান দ্বারা কৃত্রিমতা প্রকাশ হইলেও তাহার উন্মূলন হইল না। অনন্তর বেনিদিক্ আপন প্রণয়িনীর পাণিগ্রহণে উদ্যত হইয়া মুক্তকণ্ঠে কহিলেন ইদানী যদিস্যাৎ অবনীমণ্ডলস্থ সমস্ত মানব এই পরিণয়ের অন্যায়তা স্থাপন পূর্ব্বক আপত্তি করেন তথাপি তাহা গ্রাহ্য করিব না পরে অপরাপর কৌতুকে কিয়ৎক্ষণ যাপন করিয়া বলিলেন আমি আন্তরিক স্নেহ পরবশ হইয়া বিয়েত্রিশের পাণি গ্রহণ করিতেছি যেহেতু শ্রবণ করিয়াছিলাম প্রেয়সী প্রেমের নিমিত্ত মৃতকল্প হইয়া ছিলেন। বিয়েত্রিশও অকপট বচনে বলিতে লাগিলেন আমার কর্ণগোচর হইয়াছিল বেনিদিক্ মৎ প্রতি বদ্ধানুরাগতা হেতু ক্ষিপ্ত ও মৃত প্রায় হইয়া বহু ক্লেশ পাইয়াছেন, তাঁহার প্রাণ রক্ষা নিমিত্ত স্নেহান্বিত হইয়া পাণি দানে প্রবৃত্ত হইতেছি। অতএব ক্লাদিওর সহিত তদীয় হৃদয় বল্লভ হীরোর পরিণয় সমাধা হইলে বেনিদিকের সহিত তাঁহার প্রণয়িনী বিয়েত্রিশের বিবাহ সম্পন্ন হইল এবং রসিক রসিকা পূর্ব্ব ভাব বিস্মরণ পূর্ব্বক প্রণয়ে কাল হরণ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। পরে হীরোর প্রতি ক্লাদিওর অনুরাগ দর্শনে অসহিষ্ণু হইয়া তাহার উন্মূলন নিমিত্ত দঞ্জন্ নামা যে দুরাত্মা ষড়যন্ত্র করিয়াছিল সে পথিমধ্যে ধৃত হইয়া মেসিনা নগরে আনীত হইল এবং তাহার মাৎসর্য্যের এই প্রতিফল হইল যে রাজসদনে হীরোর সহিত ক্লাদিওর সম্মিলন নিমিত্ত মহামহোৎসব তাহাকে স্বচক্ষে নিরীক্ষণ করিতে হইল ইতি।
কর্কশার ধীরতা।
সেক্সপিয়র।
কর্কশার ধীরতা।
পাদুয়া নামক প্রসিদ্ধ নগর মধ্যে ব্যাপ্তিস্তা নামা এক জন সম্ভ্রান্ত ধনী বসতি করিতেন। তাহার কেথারিন্ ও বাএন্কা নামিকা দুই কন্যা হয়। জ্যেষ্ঠা কেথারিন্ কর্কশ প্রকৃতি, কলহ প্রিয়া, এবং স্বর পারুষ্যে পুরবাসি সকলের সাতিশয় বিরাগভাজন হওয়াতে শৈশবাবধি কর্কশা কেথারিন্ নামে বিগীতা হইল সুতরাং তদীয় আত্মীয় স্বজন মনে২ সন্দেহ করিতে লাগিলেন কোন বিশিষ্ট সন্তান সস্পৃহ হইয়া তাহার পাণি পীড়ন বা না করেন। ফলতঃ কালক্রমে তাহার বয়ঃক্রম প্রবৃদ্ধ হইল তথাচ কেহ আসিয়া বিবাহের প্রসঙ্গ করিল না। তদীয়া কনীয়সী ভগিনীর পাণি গ্রহণ নিমিত্ত ভূরি২ যোগ্য বর আসিতে লাগিল কিন্তু ব্যাপ্তিস্তা কনিষ্ঠার পরিণয়ে অনুমতি দিতে শৈথিল্য করিলেন এবং বরপাত্রদিগের নিকট তদ্বিষয়ের এই হেতু দর্শাইলেন যে বাএন্কার অগ্রজা অপরিণীতা আছেন আদৌ তাঁহাকে পাত্রসাৎ করা যাউক পশ্চাৎ ইহাঁর বিবাহের কথা হইবেক।
কিয়ৎ কালানন্তর পেত্রুসিও সংজ্ঞক কোন সম্ভ্রান্ত পুরুষ দার পরিগ্রহার্থ আগ্রহান্বিত হইয়া পাদুয়া নগরে আগমন করিলেন এবং কেথারিনের রীতি প্রকৃতি অবগত হইলেও তাহাকেই বিবাহ করিবার নিমিত্ত ব্যগ্র হইলেন। ঐ কামিনীর কমনীয় রূপ লাবণ্য ও প্রচুর ঐশ্বর্য্য সম্পত্তির বিষয় বিদিত হওয়াতে তাঁহার দৃঢ়তর প্রতিজ্ঞা হইল পাণি পীড়নানন্তর স্ববশে অনিয়া দুঃশীলার স্বভাব সংশোধন পুরঃসর তাঁহাকে নিজ প্রণয়িনী করিব। বস্তুতঃ এই দুরূহ ব্যাপার সাধনে ব্যক্তিরই বিশেষ যোগ্যতা ছিল কেননা তিনি কেথারিনের তুল্য পরুষ প্রকৃতি না হইলেও বাগ্বিভঙ্গি ও আকৃতি বিক্রিয়া দ্বারা বিবিধ স্বভাব প্রকাশ করিতে পারিতেন। সাতিশয় সুস্থিরতার সময় যখন কোপারোপ করিলে আপনারই হাস্যোদয় হয় তাদৃশ অবসরেও রোষ পরবশ প্রকৃতির কল্পনা পূর্ব্বক তাদৃক্ আকার দর্শাইতে পারিতেন। অপর তাঁহার চরিত্র বিনয়ৌদার্য্য ধৈর্য্যে স্বভাবতঃ স্বলঙ্কৃত থাকিলেও কেথারিনের ভর্ত্তা হইয়া অবধি তদীয় প্রকৃতির পরাভব নিমিত্ত আরোপিত কোপন মূর্ত্তি ধারণ পুরঃসর সতত অধীরতা প্রদর্শন করিতেন। ফলতঃ তাঁহার এই কৌশলেই পরে কর্কশা কেথারিনের রীতি প্রকৃতি বিচিত্ররূপে পরিবর্ত্তিত হয়।
পেত্রুসিও বিবাহার্থী হইয়া পাদুয়া নগরে প্রবেশ পূর্ব্বক কেথারিনের প্রণয়োৎপাদন নিমিত্ত প্রথমতঃ তদীয় তাত ব্যাপ্তিস্তার নিকট প্রার্থনা করিলেন আমি আপনার দুহিতার পাণি পীড়ন করিতে বাসনা করি অতএব তাহার সহিত রহস্যালাপে স্বাতন্ত্র্য প্রদানাজ্ঞা হয়। পরে আপনার পরিচয় প্রদান চ্ছলে সশ্লেষ বচনে নিবেদন করিলেন কামিনীর সুনীতি বিনীতি এবং সৎ প্রকৃতির বিষয় পরম্পরায় অবগত হইয়া তাঁহার প্রেমাভিলাষে বেরোনা নগর হইতে আসিয়াছি। ব্যাপ্তিস্তা যদিও তনয়ার পরিণয় নির্ব্বাহ নিমিত্ত ব্যস্ত সমস্ত ছিলেন তথচ তাহার পরিচয় দিয়া আত্মমুখে ব্যক্ত করিতে বাধ্য হইলেন আমার কন্যা সুশীলা নহেন কেননা তৎক্ষণেই তাহার অসৎ স্বভাবের একটা লক্ষণ সকলের সমক্ষে প্রকাশমান হইল। কেথারিনের বাদ্যশিক্ষক সাতিশয় বেগে ধাবমান হইয়া নিকটে আগমন পূর্ব্বক ম্লানমুখে বিমর্ষ প্রকাশ করত কহিতে লাগিল মহাশয় আমার শিষ্যা কীদৃশী সুশীলা অবলোকন করুন্ বাদ্য বিষয়ে দোষানুভব করিয়া বীণাঘাতে আমার মস্তক ভগ্ন করিয়া দিল। পেত্রুসিও বাদ্যোপদেশকের প্রমুখাৎ এতাব্দৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া ব্যাপ্তিস্তাকে কহিলেন আহা যুবতীর কি সাহস? মহাশয়, প্রণয়ানুবন্ধন নিমিত্ত কামিনীর সহিত কথোপকথন করিতে আমার আরো মহৎ ঔৎসুক্য জন্মিল। পরে প্রার্থিত বিষয়ে আশু প্রত্যুত্তর প্রাপ্তির প্রত্যাশায় নিবেদন করিলেন মহাশয় আমি কর্ম্মান্তরে ব্যস্ততা প্রযুক্ত প্রত্যহ আপনকার সন্নিধানে আগমন করিতে পারিব না। আমার জনকের সহিত আপনার আলাপ পরিচয় ছিল সম্প্রতি তাঁহার লোকান্তর প্রাপ্তি হইয়াছে আমি তদীয় স্থাবরাস্থাবর সমুদায় বিভবে অধিকারী হইয়াছি। আপনকার তনয়ার প্রণয়েৎপাদন পুরঃসর যদিস্যাৎ তাহাকে পরিণয় করি তবে আপনি দুহিতাকে কি যৌতুক প্রদান করিবেন অঙ্গীকার করুন। ব্যাপ্তিস্তা মনোমধ্যে বিতর্ক করিতে লাগিলেন এ ব্যক্তি প্রেম পদার্থ কি, বোধ হয় অবগত নহে, যাহা হউক, দুহিতাকে পাত্রসাৎ করা আবশ্যক, এ ব্যক্তি স্বতঃ পাণি গ্রহণে আগ্রহান্বিত অতএব আর কাল বিলম্ব বিধেয় নহে। এই বিবেচনা করিয়া উত্তর করিলেন আমি কন্যাকে আপাততঃ বিংশতি সহস্র মুদ্রা যৌতুকস্বরূপে প্রদান করিব পরে পরলোক যাত্রা কালে সমস্ত ধন সম্পত্তির অর্দ্ধাংশ দিয়া যাইব। পেত্রুসিও ইহাতে সম্মত হওয়াতে বিবাহ সম্বন্ধ অবধারিত হইল। অনন্তর ব্যাপ্তিস্তা সানন্দ মনে নন্দিনীর সদনে গমন পূর্ব্বক তদীয় প্রণয়ার্থির আবেদন জ্ঞাপন করিলেন এবং পেত্রুসিওর সহিত প্রেমালাপ করণার্থ তাহাকে পাঠাইয়া দিলেন।
ব্যাপ্তিস্তা গমন করিলে পর পেত্রুসিও একাগ্রচিত্তে চিন্তা করিতেছিলেন কামিনীর সহিত কিরূপে আলাপ করিব এবং তদর্থ বিবিধ বিষয়ের আন্দোলন করত মনোমধ্যে কহিতেছিলেন কর্কশা আগমন করিবা মাত্র তদীয় প্রণয়োৎপাদন নিমিত্ত অগ্রে আমি সুমধুর বচনে কথোপকথন আরম্ভ করিব। তাহাতে যদিস্যাৎ তিনি স্বভাব দোষে অসন্তোষ প্রকাশ পূর্ব্বক তিরস্কার করেন ক্ষুব্ধ বা ভগ্নচিত্ত হইব না বরং সহাস্য আস্যে প্রশংসা পুরঃসর কহিব প্রিয়ে বুলবুল পক্ষিণীর তুল্য কি চমৎকার স্বরে মধুর গান করিতেছ। প্রেয়সী যদি রোষ পরবশ হন তবে ললিত বচনে এতাবন্মাত্র বলিব আহা তোমার বদনের শোভা অভিনব বিকসিত শিশির রসাভিষিক্ত গোলাব কুসুমের তুল্য কি চমৎকার হইল। যদি আমার সহিত আলাপ না করেন বিনা প্রসঙ্গেই তদীয় বক্তৃতা শক্তির ভূরি২ প্রশংসা করিব। অপর প্রিয়া আসিয়া উপস্থিত হইলে আমি স্বয়ং তাঁহার সন্নিধানে উপবেশন করিব তাহাতে যদি অন্তরে যাইবার আদেশ করেন তবে এতাদৃক্ ভঙ্গি করিয়া অগণ্য ধন্যবাদ প্রদান করিব যেন তাহার সহিত সপ্ত দিবস ব্যাপিয়া সহবাস করিবার অনুমতি দিলেন। প্রণয়ানুবন্ধনের নিমিত্ত মনে এই সকল উপায় কল্পনা করিতেছেন ইতিমধ্যে কর্কশা কেথারিন্ আসিয়া সম্মুখে দণ্ডায়মানা হইলেন কিন্তু বাঙ্নিষ্পত্তি করিলেন না। পেত্রুসিও প্রেয়সীর সহিত আলাপ নিমিত্ত স্বয়ং সম্ভাষণ পুরঃসর কহিলেন কেত নমস্কার। সুন্দরি আমি তোমার এই সংজ্ঞা শ্রবণ করিয়াছি। কর্কশা তদীয় অভ্যর্থনায় আনন্দ প্রকাশ না করিয়া অশ্রদ্ধা পূর্ব্বক কর্কশ বাক্যে কহিলেন যাহারা আমার সঙ্গে কথা কহে তাহারা কেথারিন্ বলিয়া সম্বোধন করিয়া থাকে। পেত্রুসিও সরস বচনে উত্তর করিলেন হে সুলোচনে তোমার এ কথা অলীক, কেননা তোমাকে কেহ কেবল কেত কেহবা কান্ত কেত বলিয়া আহ্বান করিয়া থাকে এবং অনেকের নিকট কর্কশা কেথারিন্ বলিয়াও বিখ্যাত আছ। যাহা হউক হে কেত খ্রীষ্টিয়ান রাজ মধ্যে তোমার রূপ লাবণ্য ও সুশীলতার গৌরব প্রচরদ্রূপ। আমি তোমার রূপ গুণের খ্যাতি নগরে২ শ্রবণ করত ত্বদীয় পাণি পীড়নাশয়ে এখানে আসিয়াছি।
অনন্তর তাঁহাদের পরস্পর প্রণয়ালাপ আশ্চর্য্য প্রকারে প্রবর্ত্তমান হইল। কেথারিন্ রোষ প্রকৃতির পরবশতা প্রযুক্ত পরুষ বচন প্রয়োগ পূর্ব্বক উচ্চস্বরে সম্ভাষণ করিতে আরম্ভ করিলেন তাহাতে তাঁহার কর্কশা উপাধি প্রাপ্তির হেতু স্বতঃ প্রকাশমান হইতে লাগিল। কিন্তু সুরসিক পেত্রুসিও তাঁহার পারুষ্যে রুষ্ট বা বিরক্ত না হইয়া সরস বচনে কথোপকথন করিতে থাকিলেন এবং মধ্যে২ বারম্বার বিলাসিনীর বাক্যের প্রশংসা করত কহিতে লাগিলেন আহা সুন্দরি তোমার বাক্য কি মধুর। ত্বদীয় বচন শ্রবণে আমার শ্রবণেন্দ্রিয় যেন সুধাভিষিক্ত হইতেছে। কিয়ৎ কাল বিলম্বে সংবাদ পাইলেন কামিনীর পিতা তথায় আগমন করিতেছেন অতএব পরিণয়ের বিষয় অবধারিত করিবার আশয়ে সুন্দরীকে সম্বোধন পূর্ব্বক বলিলেন প্রিয়ে এখন অনর্থক কথা বার্ত্তা ত্যাগ কর তুমি আমার পরিণীতা বনিতা হও এতদ্বিষয়ে তোমার পিতার সম্পূর্ণ মত আছে এবং তন্নিমিত্ত যৌতুকের বিষয় ধার্য্য করিয়াছেন, এক্ষণে তোমার মত হউক বা না হউক আমি তোমাকে বিবাহ করিব।