মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Muktaram Vidyabagish (†1860) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন
এই কথোপকথনের কালে ব্যাপ্তিস্তা তথায় আসিয়া উপস্থিত হইলে পেত্রুসিও সন্তোষ প্রকাশ পুরঃসর তাঁহাকে কহিতে লাগিলেন আপনকার কন্যা যথোচিত অভ্যর্থনা করিয়া অঙ্গীকার করিলেন আগামি রবিবারে আমার গলে বরমাল্য প্রদান করিবেন। কামিনী এতদ্বাক্যে বৈরক্তি ব্যক্ত করত জনক সন্নিধানে নিবেদন করিলেন তাত ইহার সকল কথাই অলীক, এ ব্যক্তিকে বরণ করা অন্তরে থাকুক বরং আমার এবম্বিধ বাসনা ভাবি ভানু বাসরে যেন ইহাকে উদ্বন্ধনে লম্বমান দেখিতে পাই। হে পিতঃ এ অতি দুরাচার উন্মত্ত, আপনি আমার জনক হইয়া কি বিবেচনায় ইহাকে বরপাত্র করিতে অবধারিত করিয়াছেন? পেত্রুসিও সীমন্তিনীর ঈদৃশ সরোষ বচন শ্রবণেও নির্বিকার আকারে তদীয় তাত সমক্ষে কহিতে লাগিলেন মহাশয় আপনি নিজ অঙ্গজার এই অনুযোগে মনোযোগ করিবেন না, আপনার কন্যা আমাকে কহিয়াছেন আপনকার সমক্ষে পরিণয়ে অনিচ্ছা প্রকাশ করিবেন। আপনি এখানে পদার্পণ করিবার পূর্ব্বে আমরা দুই জন যখন নির্জ্জনে ছিলাম আপনার তনয়া আমার প্রতি কতই প্রেমানুরাগ ব্যক্ত করিতেছিলেন। পরে প্রেয়সীর প্রতি কোমল সম্বোধন পূর্ব্বক উক্তি করিলেন অয়ি কেত তোমার নিমিত্ত সুশোভন বৈবাহিক বসন ক্রয় করিতে সংপ্রতি বেনিস্ নগর গমন করি, পাণি প্রদান পূর্ব্বক বিদায় দাও। অনন্তর ব্যাপ্তিস্তাকে বলিলেন মহাশয় কন্যাযাত্রিদিগকে নিমন্ত্রণ এবং ভোজের আয়োজন করুন। আমি বসন ভূষণ সঙ্কলন পুরঃসর ত্বরায় প্রত্যাগমন করিতেছি আপনকার কন্যাকে স্বলঙ্কৃতা করিব। পরে পুনর্ব্বার প্রিয়তমার প্রতি সস্পৃহ নয়ন নিক্ষেপ করত কহিতে লাগিলেন প্রিয়ে একবার চুম্বন প্রদান কর আর কি, আমাদের শুভ বিবাহ আদিত্য দিবসে সম্পন্ন হইবেক। এই বলিয়া স্বয়ং তদীয় অধর চুম্বন পূর্ব্বক প্রস্থান করিলেন।
অনন্তর দিনকর দিন সমাগত হইলে উপযমের সমাজ সুসজ্জীভূত হইল। নিমন্ত্রিত ব্যক্তিরা সমাগমন পুরঃসর যথাস্থানে অধিষ্ঠান করিলেন এবং অনেক ক্ষণ পর্য্যন্ত বর পাত্রের আগমন প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। কিন্তু কেথারিন্ পরিষদ্ মধ্যে পদার্পণাবধি এই ভাবিয়া অনবরত বাষ্প বিসর্জ্জন করিতেছিলেন পেত্রুসিও তাঁহার সহিত পরিহাস করিয়া গিয়াছেন। সে যাহাহউক। কিয়ৎ ক্ষণ পরে বর বিবাহের সভায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। কিন্তু পাণি গ্রহণ নিমিত্ত অঙ্গীকৃত বসন ভূষণ কিছুই তাঁহার সঙ্গে ছিল না এবং আপনিও বিবাহার্থির তুল্য বহুমূল্য পরিচ্ছদ পরিধান করেন নাই, সামান্য বস্ত্রে কলেবর আবরণ পুরঃসর পরিষদে প্রবেশ করিলেন। অপর তাঁহার যে কএক জন কিঙ্কর শকটোপরি আরোহণ করিয়া সমভি ব্যাহারে আসিল তাহারাও যৎকুৎসিত বেশ ধারণ করিয়াছিল।
পারিষদ্ পুরুষেরা পরিচ্ছদ পরিবর্ত্তন নিমিত্ত পেত্রুসিওকে অনেক অনুরোধ করিলেন কিন্তু কোন প্রকারে তদ্বিষয়ে তাঁহার প্রবৃত্তি হইল না। বসনের কথায় পরিহাস পূর্ব্বক সভ্যদিগকে কহিলেন কেথারিন্ আমাকে বিবাহ করিবেন পরিচ্ছদ পরিণয় করিবেন না অতএব অপকৃষ্ট বস্ত্র অঙ্গে থাকিলে হানি কি? অনন্তর সভাসদ্গণ তাঁহার সহিত বসন পরিবর্ত্তনের বিতণ্ডা বিফল দেখিয়া আশু শুভ কর্ম্ম সম্পাদন মানসে বর কন্যা সমভিব্যাহারে ধর্ম্মশালায় প্রবেশ করিলেন। পেত্রুসিও সেখানে গিয়া ক্ষিপ্তের ন্যায় আচরণ করিতে লাগিলেন। পুরোহিত যখন তাঁহার প্রতি প্রশ্ন করিলেন কেথারিন্ কি তোমার বনিতা হইবেন? তখন অত্যুচ্চ কর্কশ স্বরে উত্তর দিলেন হাঁ ইনি আমার ভাবি বনিতা। তাঁহার অকস্মাৎ গগণ স্পর্শি নীরস চীৎকার শ্রবণে সকলে সাতিশয় বিস্ময়াকুল হইল এবং পুরোহিতের কর হইতে পরিণয় পুস্তক ভূতলে পড়িয়া গেল। অনন্তর যাজক হস্ত ভ্রষ্ট পুস্তক পুনর্ব্বার গ্রহণ নিমিত্ত যেমন নত হইতেছিলেন তৎকালে বরপাত্র তাঁহার উপরি এরূপ একটা মুষ্টি প্রহার করিলেন যে তদাঘাতে পুরোহিত ভূমিতলে পড়িয়া অবলুণ্ঠন করিতে লাগিলেন। অপর যাবৎ উদ্বাহের ব্যাপার সমাধা হইতে ছিল তাবৎ পর্য্যন্ত বরপাত্র বাতূলতা প্রকটন পুরঃসর এবম্প্রকারে অবনীর উপর পদাঘাত ও উচ্চস্বরে মন্ত্রোচ্চারণ করিতেছিলেন যে তদীয় ভাব ভঙ্গি অবলোকনে সাহসি কেথারিনেরও অন্তঃকরণ ভয়ে ব্যাকুল এবং কলেবর কম্পমান হইতে ছিল। সে যাহা হউক পাণিগ্রহণ ব্যাপার সমাধা হইলে বরপাত্র পানপাত্র গ্রহণ পুরঃসর সুরা সেবন করিতে বসিলেন এবং হস্তে চষক গ্রহণ পূর্ব্বক চীৎকার স্বরে সভাস্থ সকলের কুশল প্রার্থনা করিলেন। অনন্তর পান করিয়া চষকের অবশিষ্ট আসব ধর্ম্মশালাস্থ পরিচারকদিগের বদনে নিক্ষেপ করত কহিলেন তোমাদের শ্মশ্রুলোম সূক্ষ্মরূপে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়াছে এবং সুধা সেবন সময়ে আমার অনুমান হইয়াছিল যেন এই চষকের তলস্থ বস্তুতে তোমরা স্পৃহান্বিত অতএব অবশিষ্ট অংশ তোমাদিগকে প্রদান করিলাম। এতদ্রূপে ঈদৃক্ বাতুলতা প্রকাশ করিলেন যে বিবাহের সমাজে কেহ কদাপি তাদৃশ অদ্ভুত উন্মত্ততা অবলোকন করেন নাই। কিন্তু পেত্রুসিও কেবল প্রেয়সীর কর্কশ প্রকৃতির দমন মানসে এই সমস্ত অভব্য ব্যবহার করিলেন।
ব্যাপ্তিস্তা দুহিতার বিবাহোপলক্ষে বন্ধু বান্ধব বর্গের ভোজের আয়োজন করিয়াছিলেন কন্যা ও জামাতাকে আলয়ে লইয়া তাঁহাদের সমক্ষে ঐ উৎসব করিবেন ঈদৃশ সংকল্প ছিল কিন্তু পেত্রুসিও বিবাহ সংস্কার সমাধা হইলে পর ধর্ম্মশালা হইতে বহির্গমন সময়ে পত্নীর পাণি ধারণ পূর্ব্বক কহিলেন সুন্দরি বৈবাহিক ব্যাপার সম্পন্ন হইল চল এক্ষণে আপনাদের ভবনে গমন করি। ব্যাপ্তিস্তা উক্ত কারণে তৎক্ষণেই বিদায় দিতে অনিচ্ছুক হইয়া জামাতাকে নিষেধ করিলেন এবং তাহাদিগকে স্বীয় আবাসে লইয়া যাইবার নিমিত্ত যত্ন করিতে লাগিলেন। অপর কেথারিন্ কোপে কম্পমানা হইয়া বিবিধ কটূক্তি করিল। কিন্তু পেত্রুসিও শ্বশুরের অনুরোধ রক্ষণ অথবা অধীরা রমণীর সরোষ পরুষ বচন শ্রবণ করিলেন না, ভার্য্যার উপর ভর্ত্তার যে ক্ষমতা আছে তন্মাত্র প্রার্থনা করিলেন। পরে এক্ষণে আমি স্বীয় সীমন্তিনীর সহিত যথেচ্ছ ব্যবহার করিব এই কহিয়া কেথারিনের করাকর্ষণ পূর্ব্বক প্রস্থান করিলেন। তাঁহার স্থির প্রতিজ্ঞতা ও সাহস দর্শনে দর্শকগণ বিস্ময়াপন্ন হইল কাহার ভরসা হইল না যে নিবৃত্ত করণার্থ গমনে বাধা দেয়।
পেত্রুসিও নব দারকে আগারে লইয়া যাইবার নিমিত্ত একটা কুৎসিত কৃশ ঘোটক নির্ব্বাচন পূর্ব্বক সমভিব্যাহারে আনয়ন করিয়াছিলেন সেই অশ্বে অভিনব পরিণীতা বনি তাকে আরোহণ করাইলেন এবং আপনিও ভৃত্য সহ তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট তুরঙ্গে আরূঢ় হইলেন না সুতরাং সকলেই বাহন দোষে অসমান ও পঙ্কিল পথে গমন করিতে লাগিলেন অধিকন্তু কেথারিনের দুর্ব্বল ঘোটক বারম্বার স্খলিত পদ হইতে লাগিল। পেত্রুসিও সেই অকর্মণ্য পশুর উপলক্ষে কল্পিত কোপ প্রকাশ পুরঃসর বিবিধ ভর্ৎসন ও তর্জ্জন করিতে আরম্ভ করিলেন অথচ সেই তুরঙ্গ স্বয়ং মনোনীত করিয়া আনেন। সে এবম্প্রকার ক্ষীণ ও দুর্ব্বল ছিল যে আপনার দেহের ভার বহনেই অশক্ত হইয়া সহজে ধীরে২ পদক্ষেপ করিত।
যাহা হউক বাহন দোষে বর্ত্ম মধ্যে মহাকষ্ট হইলেও পেত্রুসিও পরিশেষে ভৃত্য কলত্র সমভিব্যাহারে স্বাবাসে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাঁহার নবোঢ়া নায়িকা বিশেষ ক্লান্তিযুক্ত এবং সেই ক্লান্তির সঙ্গে অনবরত কান্তের ও কিঙ্করের তুরগোপলক্ষে তর্জ্জন গর্জ্জন শ্রবণ করাতে সাতিশয় খিন্ন হৃদয়া হইয়াছিলেন। পেত্রুসিও স্বভাবতঃ শিষ্ট প্রকৃতি ও মিষ্ট ভাষী অতএব জায়াকে আলয়ে প্রবেশ করাইয়া অভ্যর্থনা করত একবার তাহার সহিত শিষ্টালাপ করিলেন। কিন্তু সে দিবস সীমন্তিনীকে দিবাভাগে ভোজন অথবা নিশা সময়ে শয়ন পূর্ব্বক বিশ্রাম করিতে দিলেন না। আহারীয় দ্রব্য সামগ্রী প্রস্তুত হইলে যখন ভোজন স্থানে সে সকলের পরিবেশন হইল তখন আসনে বসিয়া আদৌ আপনি প্রত্যেক পাত্রস্থ ভক্ষ্য পেয়ে হস্তার্পণ পূর্ব্বক কিঞ্চিৎ মুখে দিলেন পরে কপটতা পূর্ব্বক অপকৃষ্ট বলিয়া ক্রমশঃ সমুদায় ভূমিতে নিক্ষেপ করিয়া দিতে লাগিলেন শেষে কিঙ্কর দিগকে সেই সমস্ত খাদ্য স্থানান্তর করিতে আদেশ করিয়া কহিলেন অদ্য আহারীয় দ্রব্য কিছুই উত্তমরূপে প্রস্তুত হয় নাই প্রিয়াকে ঈদৃশ বিরস সামগ্রী ভোজনার্থ প্রদান করিতে পারি না। কেথারিন্ একে অধ্বখিন্না ছিলেন তাহাতে আবার বুভুক্ষার সময় আহার পাইলেন না সুতরাং যৎ পরোনাস্তি শীর্ণ ও ম্লান হইলেন এবং অবসন্ন হইয়া কিয়ৎ ক্ষণ বিলম্বে শয়নার্থ গমন করিলেন। পেত্রুসিও ভোজন কালে যদ্রূপ ছল করিয়া প্রিয়ার অবসাদ বৃদ্ধি করিলেন শয়ন সময়েও তাদৃশ আচরণে প্রবৃত্ত হইলেন। পত্নীর সহিত শয়নার্থ গমন করিয়া পর্য্যঙ্কোপরি আরোহণ পুরঃসর শয্যার দোষ আরোপ করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে তন্নিমিত্ত কিঙ্করদিগকে অপরাধি করিয়া অনল্প রোষ প্রকাশ পূর্ব্বক তল্প ছিন্ন ভিন্ন করত উপধান আস্তর প্রভৃতি নিম্নে নিক্ষেপ করিয়া দিলেন সুতরাং কামিনীকে কাষ্ঠময় খট্টায় বাহুলতা বালিশ করিয়া শয়ন পূর্ব্বক যামিনী যাপন করিতে হইল। তথাপি শ্রান্তি ও ক্ষুধা জন্য অবসাদে তাহার নয়ন দ্বয় নিদ্রায় আকৃষ্ট হইতে লাগিল, কিন্তু পেত্রুসিও নবোঢ়া ভার্য্যার কদর্য্য শয্যা নিমিত্ত ভৃত্যবর্গের প্রতি অনবরত কপট তর্জ্জন করাতে সমস্ত নিশা বিনিদ্র হইয়া রহিল।
রজনী প্রভাতা হইলে পেত্রুসিও প্রেয়সীর সহিত পূর্ব্বদিনের ব্যবহার করিলেন অর্থাৎ অন্য সময়ে মধুরালাপ করিয়া প্রীতি দর্শাইলেন কিন্তু যখন তাহার সহিত আহার করিতে গেলেন তখন গত রাত্রিতে যদ্রূপ অভ্যবহারের দ্রব্য সামগ্রী ফেলিয়া দিয়াছিলেন সেই প্রকারে সকল খাদ্য জঘন্য বলিয়া ভূতলে বিস্তীর্ণ করিয়া দিলেন সুতরাং পরদিনেও কেথারিনের ভোজন হইল না। তিনি বুভুক্ষায় একেবারে নির্জীব হইয়া পড়িলেন এবং ভৃত্যদের নিকট গোপনে কিঞ্চিৎ অভ্যবহারের দ্রব্য প্রার্থনা করিতে লাগিলেন। কিন্তু তাঁহার স্বামির শিক্ষানুসারে একে২ সকল কিঙ্কর কহিল কর্ত্তার অগোচরে একটী তিল কাহাকেও প্রদান করিতে আমাদের সামর্থ্য নাই। অতএব কর্কশা নৈরাশ্যাপন্না হইয়া বিষাদ করত কহিতে লাগিলেন হায় পেত্রুসিও কি উপোষণ দ্বারা দেহ শোষণ পুরঃসর সংহার করিবার নিমিত্ত মদীয় পাণি পীড়ন করিলেন। আহা আমার জনকের পুরদ্বারে কত শত দীন দরিদ্র লোক অনায়াসে অন্ন পাইতেছে আমি এখানে কিঞ্চিৎ খাদ্য দ্রব্যের নিমিত্ত কাতর। আমি ধনি বদান্য পিতার নন্দিনী, আহারীয় সামগ্রীর নিমিত্ত কি প্রকার বিনয় করিতে হয় কখন জানি না। আহা অন্নাভাবে দুর্বল ও নিদ্রাভাবে ক্ষীণ হইয়া মৃতপ্রায় হইলাম। স্বামী শয়ন সময়ে শয্যার দোষ উদ্ভাবন পূর্ব্বক ভৃত্যেরদের প্রতি আক্রোশ করত চীৎকারে যামিনী যাপন করেন, ভোজন কালে আহারীয় সামগ্রী প্রস্তুত করণের ত্রুটি প্রদর্শন পূর্ব্বক সকল খাদ্য নষ্ট করিয়া ফেলেন, কিঞ্চিন্মাত্র অশন করিতে দেন না। আমার সহিত অহোরাত্র এতদ্রূপ নিষ্ঠুর ব্যবহার করিতেছেন অথচ মুক্তকণ্ঠে বলিয়া থাকেন আমাকে অতিশয় ভাল বাসেন ও চতুরতা প্রকাশ করিয়া ব্যঙ্গ করেন। কামিনী এবম্প্রকারে আক্ষেপ করিতেছেন ইত্যবসরে পেত্রুসিও অসিয়া উপস্থিত হওয়াতে তাঁহাকে অবলোকন করিয়া মৌনাবলম্বন করিলেন। অনাহারে ললনার প্রাণ বিনাশ করিবেন পেত্রুসিওর ঈদৃশ মানস ছিল না অতএব কিঞ্চিৎ আহারীয় সামগ্রী সমভিব্যাহারে আনয়ন করিলেন এবং তাহা বহিষ্করণ পূর্ব্বক আপনার করতলে লইয়া প্রেয়সীর সম্মুখবর্ত্তী হওত জিজ্ঞাসা করিলেন ভাবিনি কেমন্ আছ, এ দিকে একবার কটাক্ষ পাত হউক, আমি কীদৃক্ কর্ম্মঠ নিরীক্ষণ কর স্বহস্তে তোমার নিমিত্ত খাদ্য প্রস্তুত করিয়া আনিলাম। প্রিয়ে আমি তোমার প্রেমে আসক্ত হইয়া এবম্প্রকার স্নেহবান্ ইহাতে অসংশয় তোমার ধন্যবাদাস্পদ হইতে পারি, বাঙ্নিষ্পত্তি করিতেছ না কেন? এ আহারীয় দ্রব্য কি মনোনীত হইল না? কামিনী এতাবৎ উক্তিতে কোন উত্তর না দেওয়াতে কিয়ৎ ক্ষণ পরে নিকটস্থ ভৃত্যকে আজ্ঞা করিলেন তবে ভক্ষ্য সামগ্রীর পাত্র স্থানান্তরিত কর। কেথারিন্ জঠর জ্বালায় অধীরা এবং বুভুক্ষায় বিগত গর্ব্বা হইয়াছিলেন যদিও পরিণেতার অত্যাচারে অন্তঃকরণ কোপে পরিপূর্ণ ছিল তথাপি ক্ষুধার ক্লেশ অসহিষ্ণু হইয়া জীবন রক্ষণ মানসে মৃদুস্বরে বলিলেন নিবেদন করি খাদ্য স্থাপনে অনুমতি হউক। পেত্রুসিও প্রেয়সীর মুখে এবম্বিধ বিনয়গর্ভ বচন শ্রবণ করিয়া যদিও অন্তর্হৃষ্ট হইলেন তথাপি প্রিয়াকে তাবন্মাত্র পরিমাণে সুধীরা করণের অভিপ্রায় না থাকাতে অশন সামগ্রী পুনঃ স্থাপনের আদেশ করিবার পূর্ব্বে তাহাকে কহিলেন সামান্য উপকার করিয়াও লোকে ধন্যবাদ প্রাপ্ত হয়, আমি স্বহস্তে তোমার নিমিত্ত এই খাদ্য প্রস্তুত করিয়াছি অতএব স্পর্শ করণের অগ্রে আমাকে নমস্কার করা উচিত। কেথারিন্ ক্ষুধার দায়ে অগত্যা সবিনয় বাক্যে বলিলেন মহাশয় আপনাকে অভিবাদন করি। পরে পেত্রুসিও সেই যৎ সামান্য অদনীয় তাঁহার বদনে প্রদান পূর্ব্বক বলিলেন কেত এ উপকারি খাদ্য শীঘ্র ভোজন কর। প্রিয়ে চল অতঃপর অমরা পরিচ্ছন্ন পরিচ্ছদ পরিধান পূর্ব্বক তোমার পিত্রালয়ে গমন করি। তদনন্তর বসন ভূষণে ভূষিত করিবার প্রতিজ্ঞায় বনিতার বিশ্বাসাধান নিমিত্ত ইতি পূর্ব্বে যে সূচিজীবি ও বস্ত্র বিক্রয়ি দিগকে নূতন বসন প্রস্তুত করিতে আদেশ করিয়াছিলেন তাহাদিগকে আহ্বান করিতে লোক প্রেরণ করিলেন। তৎপরে ক্ষুধার্ত্তা কেথারিনের অর্দ্ধাশন না হইতে২ সম্মুখ হইতে ভোজন পাত্র অপসৃত করিয়া কিঙ্করের করে সমর্পণ করিলেন এবং আজ্ঞা দিলেন স্থানাস্তরে রাখিয়া আইস। অনন্তর প্রেয়সীর প্রতি প্রিয় বচনে প্রশ্ন করিলেন কেমন্ তোমার আহার হইয়াছে? ইত্যবসরে বসনবিক্রয়ী আসিয়া উপস্থিত হইল এবং সমভিব্যাহারে আনীত অভিনব শিরোবসন সম্মুখে ধারণ করিল। পেত্রুসিও সেই শিরোবসন করে ধারণ পূর্ব্বক চতুর্দিক নিরীক্ষণ করিয়া বলিলেন এ সুদৃশ্য হয় নাই লইয়া আপনার আলয়ে গমন কর বৃহদাকারে পুনর্বার প্রস্তুত করণানন্তর আনিয়া দিও। কেথারিন্ সেই শিরোবসন দর্শন করিয়া কান্তকে কহিলেন অমি ইহা গ্রহণ করিতে অভিলাষ করি ইদানী ভদ্র কুলাঙ্গনাগণ এতাদৃশ বস্ত্র ধারণ করিয়া থাকেন। পেত্রুসিও প্রিয়ার এই প্রার্থনায় প্রতিবচন প্রদান করিলেন তুমিও যখন ভদ্র হইবে তখন এপ্রকার বস্ত্র প্রাপ্ত হইবে কিন্তু যাবৎ স্বভাবের সংশোধন না কর তাবৎ ঈদৃশী আশা অন্তরে রাখ। কেথারিন্ যদিও বুভুক্ষা নিবৃত্তি পূর্ব্বক আহারীয় সমস্ত দ্রব্য অভ্যবহার করিতে পান্ নাই তথাপি যৎকিঞ্চিৎ অশনে বলাধান হইয়াছিল অতএব নৈসর্গিক পরুষ প্রকৃতি ধারণ পূর্ব্বক বলিলেন মহাশয় আমাকে কথা কহিতে অনুমতি করুন অথবা আমি অবশ্যই উত্তর প্রত্যুত্তর করিব কেননা অব্রুবাণা নহি, আপনি বা কি বিজ্ঞতার অভিমান করেন, আপনা অপেক্ষা মান্য সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা সুস্থির হইয়া আমার কথা কত বার আকর্ণন করিয়াছেন, যদিস্যাৎ আপনি শ্রবণে অসহিষ্ণু হন্ বাধির্য্য অবলম্বন করুন্, আমি কথা কহিতে প্রবৃত্তা হই। পেত্রুসিও রমণীর এই সরোষ কর্কশ বচনে প্রণিধান করিলেন না কেননা বনিতার সহিত বিতণ্ডা না করিয়া বশীভূতা করিবার অন্য পন্থা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন অতএব সহজ কথায় উত্তর প্রদান করত কহিলেন তুমি যাহা কহিলে যথার্থ বটে কিন্তু এ আচ্ছাদন খানা বিজাতীয় বিশ্রী, ইহা মনোনীত না করিলে তোমার প্রতি সাতিশয় প্রীত হইব। কামিনী এতৎ শ্রবণে কর্কশ স্বরে কহিতে লাগিলেন ঐ বসনে আমার মনো মোহিত হইয়াছে অবশ্যই গ্রহণ করিব তদ্ভিন্ন অন্য লইতে চাহি না। পেত্রুসিও যেন পত্নীর সমস্ত কথা বুঝিতে পারিলেন না এবম্বিধ ভাব প্রদর্শন পূর্ব্বক কহিলেন প্রিয়ে তুমি কি অধোংশুক দর্শনের বাসনা করিতেছ এতদবসরে সূচিজীবী আসিয়া উপস্থিত হইল এবং পরিপাটী রূপে প্রস্তুতীকৃত হস্তাবরণ আর একটা ঘাঘরা আনিয়া তাঁহাদের সম্মুখে স্থাপন করিল। পেত্রুসিও সে সময় কোন সামগ্রী সীমন্তিনীর করে অর্পণ করিতে মানস করেন নাই এ কারণ ঐ২ পরিচ্ছদে দোষারোপ করত কহিলেন হাঃ পরমেশ্বর এ কি বসন, ওহে সৌচিক তুমি কি ইহাকে হস্তাবরণ বল, এ কি? ইহা যে যৎপরোনাস্তি কুৎসিত হইয়াছে। সৌচিক নিবেদন করিল মহাশয় অধুনাতন রীত্যনুসারে প্রস্তুত করিবার আদেশ হইয়াছিল তন্নিমিত্ত এবম্প্রকার করিয়াছি। কেথারিন্ কহিলেন কেন এতো উত্তম হইয়াছে, এতদপেক্ষা উৎকৃষ্ট কদাপি দৃষ্ট হয় নাই। পেত্রুসিও সূচিজীবির লাঞ্ছনা দ্বারা পত্নীর অপমান করিবার মানসে পূর্ব্বে ভৃত্যবর্গকে বলিয়া রাখিয়াছিলেন আমি সৌচিককে ভর্ৎসনা করিয়া বাটী হইতে বহিষ্কৃত করিয়া দিলে তোমরা বসনের প্রকৃত মূল্য প্রদান পূর্ব্বক তাহার নিকট হইতে বস্ত্র গ্রহণ করিও এবং অকারণে বিমাননা নিমিত্ত ক্ষমা প্রার্থনা করিও অতএব কামিনী বসনের গুণ বর্ণনে উদ্যম করিলে আপনি তাহা জঘন্য বলিয়া ঘৃণা করত সৌচিককে তিরস্কার পূর্ব্বক দূর করিয়া দিলেন। অনন্তর অঙ্গনার প্রতি কটাক্ষ নিক্ষেপ পূর্ব্বক বলিলেন প্রিয়ে চল আমাদের যে সামান্য বসন আছে তাহাই পরিধান পুরঃসর তোমার পিত্রালয়ে গমন করি। পরে অশ্ব পালক দিগকে বাজি সুসজ্জিত করিতে আজ্ঞা দিয়া কহিলেন এখন বেলা সপ্তম ঘণ্টামাত্র, শ্বশুর মহাশয়ের আগারে ভোজন সময়ে অনায়াসে উপনীত হইতে পারা যাইবেক। বস্তুতঃ যখন তিনি শ্বশুরালয়ে গমনের প্রসঙ্গ করেন তখন প্রাতঃকাল নয়, দ্বিতীয় প্রহর অতীত হইয়াছিল। কেথারিনের পরুষ প্রকৃতি স্বামির এবম্বিধ উগ্র স্বভাবে পরাভূত হইল। মহিলা সুশীলতা অবলম্বন পূর্ব্বক ললিত বচনে আপনার নাথকে নিবেদন করিলেন মহাশয় মধ্যাহ্ণের উপর বরং পাঁচ দণ্ড অতীত হইয়াছে অতএব আমার পিতৃ ভবনে দিবা ভোজনের মানস পরিত্যাগ করুন বরং নিশার অশন হইবে। কিন্তু পেত্রুসিও মনে সঙ্কল্প করিয়াছিলেন কান্তাকে তদীয় জনক নিকেতনে লইয়া যাইবার অগ্রে এবম্প্রকার বশতাপন্ন করিবেন যে কোন প্রস্তাবে অমত বা বিতণ্ডা করণে তাহার কদাপি প্রবৃত্তি না হয় অতএব কামিনীর বেলার কথায় আপনি যেন দিবাকরের কর্ত্তা এবম্বিধ ভঙ্গি করত কহিলেন যত ইচ্ছা করিব যাত্রার অগ্রে তাবন্মাত্র বেলা হইবে, আমি যাহা বলি ও করি এখনও তাহা খণ্ডন করিতেছ, এই ক্ষণেই তথায় গমন করিব যাত্রাকালীন যত দণ্ড দিবামান কহিব তাহাই হইবেক। কেথারিন্ এক দিন আপনার প্রাক্তন প্রকৃতির দমন পূর্ব্বক নবপ্রকাশিত শান্ত স্বভাবের আচরণ করিয়াছিলেন কিন্তু যাবৎ তদীয় গর্ব্ব সম্পূর্ণ রূপে খর্ব্বতাপন্ন না হইল এবং সকল কথায় বাদ বিতণ্ডা করণাভ্যাস বিস্মৃতা না হইলেন তাবৎ পর্য্যন্ত পেত্রুসিও তাঁহাকে পিত্রালয়ে প্রেরণ করেন নাই। পরে যখন আপনি সমভিব্যাহারে লইয়া গমন করিলেন তখন পথিমধ্যে দিবা দ্বিপ্রহরের সময় প্রিয়াকে সম্বোধন করত কহিলেন সুন্দরি অবলোকন কর নিশাকর আকাশ মণ্ডলে উদিত হইয়া কেমন স্নিগ্ধ উজ্জ্বল প্রভা বিতরণ করিতেছেন। কেথারিন্ এ কথায় কান্তকে কহিলেন সে কি এখন যে দিবস, দিবাকর প্রখর করে অবনির রসাকর্ষণ করিতেছেন। পেত্রুসিও পত্নীর এই প্রকৃত উক্তিতেও কোপ প্রকাশ করিলেন এবং তাঁহার এই প্রাতিকূল্যাচরণাপরাধে তদীয় পিত্রালয় গমনে বিরতি অবলম্বন পূর্ব্বক আপন ভবনের প্রতি প্রতিনিবৃত্ত হইতে উদ্যত হইয়া কহিলেন কি আমার বাক্যে অন্যথা আশঙ্কা কর আমি আত্ম শপথ করিয়া বলিতেছি তোমার পিতৃ নিলয়ে গমনের অগ্রে চন্দ্র অথবা নক্ষত্র যাহা কহিব তাহাই হইবেক। অনন্তর এরূপ ভঙ্গি করিলেন যেন সদনে প্রত্যাগমন করেন তাহাতে কান্তা কেথারিন্ কর্কশ স্বভাব পরিহার পুরঃসর সুশীলা মহিলার তুল্য হইয়া সবিনয়ে নিবেদন করিলেন প্রভো অধিক পথ আসিয়াছি এখন এখান হইতে নিবৃত্ত হওয়া কর্ত্তব্য হয় না আমি করপুটে বিনয় করিতেছি চলুন অগ্রসর হই আপনি নভোমণ্ডলো দ্দীপক ঐ জ্যোতির্ময় পদার্থকে চন্দ্র বা সূর্য্য যাহা কহেন তাহাই বটে আপনি যদিস্যাৎ উহাকে প্রদীপ কহেন এক্ষণ অবধি তাদৃশোক্তিও সপ্রমাণ বোধ করিব। পেত্রুসিও প্রেয়সীর মুখ হইতে এবম্প্রকার বাক্য নির্গত হইতে কদাপি শ্রবণ করেন নাই যদিও এই উক্তিতে অন্তঃকরণ মধ্যে আকূত পূর্ণ হইলেন তথাপি প্রেয়সীর প্রকৃতির সম্পূর্ণরূপ পরিবর্ত্তন হইল কি না পরীক্ষা করিতে অভিলাষী হইয়া পুনর্ব্বার তাঁহাকে সম্বোধন করত কহিলেন প্রিয়ে আমি বলি ঐ গোল উজ্জ্বল বস্তু চন্দ্রমণ্ডল। কেথারিন্ কান্তের ছন্দানুবর্ত্তিনী হইয়া তৎক্ষণাৎ কহিলেন উহা হিমকর বটে আমারও বিদিত আছে। কামিনীর এই কথায় পেত্রুসিও বলিলেন তুমি অলীক কহিতেছ উহা চন্দ্র কেন? দিনমণি। কেথারিন্ স্বামির প্রাগল্ভ্যে বিনির্জিত হইয়াছিলেন তৎক্ষণাৎ তদীয় মনোরঞ্জনাশয়ে নিবেদন করিলেন তবে তাহাই বটে। হে নাথ যদি আপনি এখন এই পদার্থকে অসূর্য্য বলেন আমি আপনকার সহিত একবাক্য হইয়া তাহাই স্বীকার করিব। আপনি যে পদার্থের যে নামধেয় বিধান করিবেন তাহা তন্নামাই হইবে এবং আমি চিরকাল সেই সংজ্ঞাতে তাহা ব্যবহার করিব। পেত্রুসিও প্রেয়সীর এই কথা শুনিয়া মনোমধ্যে মহা হর্ষিত হইলেন এবং তাঁহাকে অগ্রসর হইতে অনুমতি করিলেন। কিন্তু বনিতার স্বভাব সম্পূর্ণ রূপে বিশোধিত হইল কি না এবং এবম্বিধ ছন্দানুবৃত্তি অবিচ্ছেদে প্রবর্ত্তমান থাকিবেক কি না এতদ্বিষয়ের পরীক্ষা নিমিত্ত যাইতে২ বর্ত্ম মধ্যে এক স্থবির পুরুষ নয়ন গোচর হওয়াতে তাহাকে কামিনী সম্বোধন করিয়া কহিলেন অয়ি সুশীলে ললনে তোমাকে নমস্কার করি। পরে সমভিব্যাহারিণী নিজ রমণীকে জিজ্ঞাসা করিলেন কেমন প্রিয়ে ঈদৃশী সুশ্রী যোষা কখন দর্শন করিয়াছিলে? অনন্তর সেই বৃদ্ধ পুরুষের আতাম্র গণ্ডস্থল এবং ঈষৎ শোণিত নয়ন দ্বয় নক্ষত্র নিকরের সহিত তুলনা করিয়া বিস্তর প্রশংসা করিলেন এবং পুনর্ব্বার বিলাসিনি বলিয়া সম্বোধন পূর্ব্বক কহিলেন তোমাকে নমস্কার। শেষে স্বীয় প্রেয়সীর প্রতি কটাক্ষ নিক্ষেপ পুরঃসর বলিলেন মধুরিকে কেত, এই সুন্দরীর রূপ লাবণ্য কেমন চমৎকার? অগ্রসর হইয়া ইহাঁকে আলিঙ্গন কর। কেথারিন্ পতির অনুপম প্রগল্ভতায় সম্পূর্ণ রূপে পরাজিত হইয়াছিলেন কান্তের অসঙ্গত কথায় বাঙ্নিষ্পত্তি না করিয়া তৎক্ষণাৎ বর্ষিষ্ঠের সন্নিকর্ষে গমন পূর্ব্বক মিষ্ট ভাষায় তাহার সহিত শিষ্টালাপ করত কহিলেন হে নবীন তরুণি আহা তোমার তারুণ্য লাবণ্য কি মনোহর। হে সুন্দরি কোথা হইতে আগমন করিতেছ? কোন স্থানে তোমার আবাস? যাহা হউক ধন্য তোমার পিতা মাতা, বুঝি তাঁহারদের পুণ্যের ইয়ত্তা নাই, আহা এতাদৃশী রূপ লাবণ্যান্বিতা কন্যা লাভ করিয়াছিলেন। অনন্তর পেত্রুসিও বশম্বদা যোষাকে সম্বোধন পূর্ব্বক কহিলেন কেত তোমার এ কীদৃশ আলাপ, তুমি কি ক্ষিপ্ত হইয়াছ কেননা এ সকল যে উন্মত্ত প্রলাপ। মুগ্ধে যাহার সহিত কথোপকথন করিলে ইনি লোলিত কায় প্রাচীন পুরুষ, কুমারী নহেন, তোমার কি দৃষ্টি বিভ্রম হইয়াছে, সমক্ষে নিরীক্ষণ করিতেছ না? কেথারিন্ কান্তের এই কথা শুনিয়া তৎক্ষণাৎ আপনার ভ্রম স্বীকার করিলেন পরে প্রাচীনকে সম্মান করত কহিলেন হে সম্ভ্রান্ত মহাশয় ক্ষমা করুন তপনের উত্তপ্ত আতপে মদীয় নেত্রের জ্যোতিঃ বিকৃত হইয়াছে সকলি ধূমবৎ দর্শন করি এই নিমিত্ত ভ্রান্ত হইয়া উক্ত প্রকার উক্তি করিয়াছি। এখন বিশেষ পর্য্যালোচনায় ভ্রান্তি দূর হইল এবং জানিতে পারিলাম আপনি আমার পিতৃ তুল্য মর্য্যাদাবান পুরুষ। অতএব অনুগ্রহ বিতরণ পুরঃসর অপরাধ মার্জ্জনা করুন। তৎপরে পেত্রুসিও প্রাচীনকে জিজ্ঞাসা করিলেন মহাশয় আপনি কোন দিকে গমন করিবেন আমরা যে পথে গমন করিতেছি আপনকার যদিস্যাৎ এই পন্থা হয় পরম হর্ষে সমভিব্যাহারে যাত্রা করিব। স্থবির তাহাদিগের উভয়কে সম্বোধন করিয়া কহিলেন হে তরুণ হে তরুণি তোমরা আমার উপলক্ষে কি বাক্কলহ করিতেছিলে? তোমাদের দুই জনের বাগ্বিতণ্ডা শ্রবণে সাতিশয় চমৎকৃত হইয়াছি। হে যুবক আমার নাম ভিন্সেন্সিও, আমার পুত্র পাদুয়া পুরে রহিয়াছেন, তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার নিমিত্ত তথায় যাইতেছি। ইহাতে পেত্রুসিও প্রচীনের পরিচয় পাইলেন যে ব্যাপ্তিস্তার কনিষ্ঠা কন্যা বাএন্কার সহিত যে সম্ভ্রান্ত লিউসেন্সিওর পরিণয় নির্ণীত হয় এই ব্যক্তি তাঁহার জনক। অতএব বর্ষিষ্ঠকে যথেষ্ট সমাদর করত এই শুভ সংবাদ জ্ঞাপন করিলেন মহাশয় আপনার আত্মজের অত্যুত্তম বিবাহ সম্বন্ধ হইয়াছে। বৃদ্ধ এই শুভ সমাচার অবগত হইয়া হর্ষে পুলকিত হইলেন এবং সপত্নীক পেত্রুসিও সমভিব্যাহারে পরম কৌতুকে কথোপকথন করিতে২ গমন করিয়া ব্যাপ্তিস্তার সদনে উপনীত হইলেন। সে দিবস সেখানে বাএন্কা ও লিউসেন্সিওর উদ্বাহ ব্যাপার নির্ব্বাহ নিমিত্ত মহতী সভা এবং ভূরি লোকের সমাগম হইয়াছিল। ব্যাপ্তিস্তা জ্যেষ্ঠা তনয়াকে পাত্রস্থ করণানন্তর প্রীতি ফুল্ল চিত্তে কনিষ্ঠা নন্দিনীর বিবাহের সমারোহ করিয়াছিলেন।
অতএব বৈবাহিক এবং জামাতৃ সমভিব্যাহারিণী জ্যেষ্ঠা দুহিতা আলয়ে আসিয়া উপস্থিত হইলে কন্যাসম্প্রদাতা ব্যাপ্তিস্তা অসীম সন্তোষ প্রকাশ পুরঃসর আহ্লাদিত হইয়া উদ্বাহোৎসবে মিলিত হইবার নিমিত্ত তাঁহাদের অভ্যর্থনা করিলেন। এই সময়ে আর দুইটী অভিনব কৃতোদ্বাহ যুবক যুবতী তথায় উপস্থিত ছিলেন।
বিবাহের ব্যাপার শেষ হইলে বাএন্কার স্বামী লিউসেন্সিও এবং উল্লেখিত নব বিবাহিত যুবক হার্তেন্সিও এই দুই জনে পেত্রুসিওর প্রণয়িনীর পরুষ প্রকৃতির প্রতি লক্ষ্য করিয়া ব্যঙ্গ করিতে আরম্ভ করিলেন এবং পরিহাস পূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন স্ত্রী ভাগ্য সুকৃত সাপেক্ষ, আমরা কেমন সুশীলা সরলা মহিলা লাভ করিলাম, পেত্রুসিওর অদৃষ্টে অধীরা রমণী ঘটিয়া গিয়াছে। যে সকল ললনা পরিণয় দর্শন নিমিত্ত অগমন করিয়াছিলেন তাঁহারা যাবৎ তথায় অবস্থিতি করিলেন পেত্রুসিও তাবৎ ঐ কথা কর্ণগোচর হইলেও মৌনাবলম্বন পুরঃসর বসিয়া রহিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে ভোজন সমাপনানন্তর অঙ্গনাগণ স্ব২ ভবনে প্রস্থান করিলে পেত্রুসিও দেখিতে পাইলেন যে শ্বশুর ব্যাপ্তিস্তাও উক্ত দুই যুবকের সহিত পরিহাস রসে কৃতাদর হইয়াছেন কেননা যখন পেত্রুসিও এই দুই ব্যক্তির প্রতি উক্তি করিলেন মদীয় কান্তা কেথারিন্ তোমাদের বনিতাপেক্ষা বিনীতা ও সৎস্বভাবা তখন ব্যাপ্তিস্তা অব্যাজে বলিলেন বৎস কর্কশা কেথারিন্কে তোমার কলত্র করিয়া দিয়া আমি সাতিশয় শঙ্কিত আছি। পেত্রুসিও বলিলেন মহাশয় সে কি? আমার বনিতা অতি বিনীতা কার্কশ্য বা প্রাতিকূল্য কদাপি তাঁহার দৃক্পথেও পতিত হয় নাই, আপনি যদিস্যাৎ আমার কথায় প্রত্যয় না করেন আমি পণ প্রতিজ্ঞা পূর্ব্বক ইহার সত্যতা সপ্রমাণ করিতে পারি। আজ্ঞা করুন আমরা তিন জনে স্ব২ জায়াকে এই স্থানে আহ্বান করি যাহার প্রেয়সী সঙ্কেত মাত্রে আসিয়া পার্শ্ববর্ত্তিনী হইবেক তিনি বশীকৃত কলত্রতা নিমিত্ত পণ জয় করিবেন। পেত্রুসিওর এই কথায় ঐ দুই তরুণ কৌতুকাবিষ্ট হইয়া সম্মত হইলেন, কেননা তাহাদের স্ব২ সীমন্তিনী কর্কশা কেথারিন্ অপেক্ষা শীলাদি সম্পন্না ও আজ্ঞানুবর্ত্তিনী এতদ্বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল অতএব তাঁহারা তৎক্ষণাৎ বিংশতি মুদ্রা পণ স্থাপনের প্রস্তাব করিলেন। পেত্রুসিও উপহাস করত কহিলেন আমি আপন পালিত পক্ষি ও পশুর উপর ঈদৃশ পণ রাখিতে পারি পত্নীর উপলক্ষে এতদপেক্ষা বিংশতি গুণ পণ স্থাপন না করিলে শোভা পায় না। তাহাতে সেই দুই যুবক তৎক্ষণাৎ পণের মুদ্রা বৃদ্ধি করিয়া এক শত করিলেন এবং আদৌ লিউসেন্সিও আপন প্রমদার বশম্বদতা প্রদর্শন নিমিত্ত তাঁহাকে আহ্বান করিতে কিঙ্কর প্রেরণ করিলেন। কিন্তু অবিলম্বে তাঁহার ভৃত্য প্রতিনিবৃত্ত হইয়া নিবেদন করিল কর্ত্রী আদেশ বার্ত্তা শ্রবণে উত্তর দিলেন সংপ্রতি গৃহকার্য্যে ব্যাপৃতা আছেন সুতরাং আসিতে পারেন না। পেত্রুসিও বিস্ময় প্রকাশ পুরঃসর জিজ্ঞাসিলেন ইহাঁর গৃহিণী কি বলিলেন কর্ম্মে নিবিষ্টতা প্রযুক্ত আসিতে পারেন না? ভার্য্যা হইয়া ভর্ত্তার অনুমতিতে এরূপ উত্তর দেওয়া কি উচিত হয়? ইহাতে তাঁহারা হাস্য করত বলিলেন কেথারিন্ যদিস্যাৎ তোমার নিদেশে এতদপেক্ষা নিকৃষ্ট প্রতিবচন প্রেরণ না করেন তাহা হইলে একথা শোভা পাইবেক। অনন্তর হার্তেন্সিও আদেশমাত্রে স্বীয় সীমন্তিনীকে সমীপে আনয়নার্থ ভৃত্য প্রেরণ করত তাহাকে বলিয়া দিলেন গৃহিণীকে ত্বরায় আসিবার নিমিত্ত বিনীতি বিজ্ঞাপন পূর্ব্বক নিবেদন করিও। পেত্রুসিও এতৎ শ্রবণে চমৎকার প্রকাশ করত কহিতে লাগিলেন হায় এ কি আশ্চর্য্য পরিণীতা বনিতার আহ্বান নিমিত্ত বিনয়গর্ভ বিজ্ঞাপন পাঠাইতে হইল তবে আপনার নিকট তাহার আগমন অযুক্ত। হার্তেন্সিও একথায় প্রত্যুক্তি করিলেন মহাশয় আমি এই সভামধ্যে মুক্তকণ্ঠে কহিতেছি আপনকার জায়ার সমীপে আপনি গিয়া বিনয় করিলেও কিছু হইবেক না। তাঁহার এই বচনের অবসানেই প্রেষিত দাস গৃহিণী সমভিব্যাহারে না আসিয়া একাকী প্রত্যাগমন করিল তাহাতে বিস্ময়াপন্ন হইয়া ভৃত্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন কি রে কর্ত্রী কোথায়? কিঙ্কর নিবেদন করিল মহাশয় ঠাকুরাণী কহিলেন বোধ হয় আপনি কোন কৌতুক করিবেন একারণ আসিলেন না আপনাকে সমীপে যাইতে আজ্ঞা করিলেন। পেত্রুসিও বলিলেন আপনকার বনিতা অধিক বশীভূতা বটে দেখা গেল। পরে আপনার কিঙ্করকে ডাকিয়া আদেশ করিলেন অরে তোর কর্ত্রীর সন্নিধানে গিয়া বল্ আমি তাহাকে এখানে আগমন করিতে আজ্ঞা করিতেছি। পেত্রুসিওর ভৃত্য প্রভুর নিদেশ গ্রহণ পূর্ব্বক প্রস্থান করিলে সকলের মনে কেথারিন্ আদেশ পালন করেন কি না এই চিন্তার উদয় না হইতে২ ব্যাপ্তিস্তা দূর দৃষ্টি করিয়া আশ্চর্য্য প্রকাশ পূর্ব্বক উচ্চ স্বরে বলিলেন আ দেখ২ আমার ধন্যা কন্যা কেথারিন্ দ্রুতগতি আগমন করিতেছেন। পরে রমণী সভাগারে প্রবেশ করিয়া নম্র ভাবে পতিকে নিবেদন করিলেন কি নিমিত্ত আহ্বান হইল? পেত্রুসিও তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন তোমার সহোদরা এবং হার্তেন্সিওর কান্তা কোথায়? কেথারিন্ উত্তর করিলেন তাঁহারা বহিঃ প্রকোষ্ঠে উপবিষ্ট হইয়া অগ্নিসেবন করিতে২ কথোপকথন করিতেছেন। পেত্রুসিও বলিলেন তুমি তথায় গিয়া তাহাদিগকে এখানে আনয়ন করিতে পার? কামিনী একথায় উত্তর না দিয়া সত্বর স্বামির আদেশ পালন নিমিত্ত তৎক্ষণাৎ সে স্থান হইতে প্রস্থান পূর্ব্বক ভগিনীর সন্নিধানে গমন করিলেন। তদনন্তর লিউসেন্সিও বিস্ময় প্রকাশ পুরঃসর বলিতে লাগিলেন যদি চমৎকারের কথা হয় তবে এতদপেক্ষা চমৎকার নাই। হার্তেন্সিও তাঁহার বাক্যে পোষকতা করিয়া কহিলেন সত্য এ অলৌকিক চমৎকার, দেখিয়া শুনিয়া অবাক্ হইলাম কিন্তু এ ব্যাপারে কি পতিপত্নীর মুখ্য প্রয়োজন সম্বদ্ধ আছে? পেত্রুসিও বলিলেন ইহা দম্পতীর পরম মঙ্গলের লক্ষণ। ইহাতে পরস্পরের প্রণয় স্থৈর্য্য এবং সুখ সম্ভাবনা প্রকাশ পাইতেছে। ব্যাপ্তিস্তা জ্যেষ্ঠা তনয়ার রীতি প্রকৃতির এবম্প্রকার পরিবর্ত্তন অবলোকনে আনন্দ প্রবাহে নিমগ্ন হইলেন এবং হর্ষ গদ্গদ স্বরে জামাতাকে আশীর্ব্বাদ করত কহিলেন বৎস পেত্রুসিও তোমার মঙ্গল হউক তুমি পণ জয় করিয়াছ। আমি তনুজার যৌতুকার্থ আর বিংশতি সহস্র মুদ্রা প্রদান করিতেছি। আহা আমার সেই কর্কশা কেথারিন্ ঈদৃশ কোমল প্রকৃতি হইয়াছেন, তাঁহাকে যেন পুনর্জাতা দেখিলাম। পেত্রুসিও সম্মান প্রদর্শন পূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন মহাশয় যে বিষয়ের পণে জয়ী হইলাম তাহার আরো ভূরি২ নিদর্শন আছে মহিলার সুশীলতা ও বশবর্ত্তিতার অনেক চিহ্ণ দেখাইব। ইত্যবসরে আপন প্রেয়সীকে দুই যোষা সমভিব্যাহারে আসিতে দেখিয়া বনিতা নিমিত্ত গর্ব্বকারি সেই দুই ব্যক্তিকে বলিলেন ঐ দেখুন কেথারিন্ আপনাদের সীমন্তিনী সঙ্গে লইয়া পুনর্ব্বার আসিতেছে। পরে বশম্বদা প্রমদা আসিয়া উপস্থিত হইলে তাহাকে কহিলেন কেথারিন্ তোমার শিরোভূষণ উত্তম দৃষ্ট হইতেছে না উন্মোচন পূর্ব্বক পদতলে নিক্ষেপ কর। কেথারিন্ স্বামির আদেশমাত্রে তৎক্ষণাৎ মস্তক হইতে আভরণ অবতারণ পুরঃসর ভূমিতে নিক্ষেপ করিলেন। ইহাতে হার্তেন্সিওর রমণী অসন্তোষ প্রকাশ করত কহিলেন পরমেশ্বর যেন এতাদৃশ নির্বোধের কর্ম্ম করিতে প্রবৃত্তি না দেন। বাএন্কা বলিলেন ভগিনি ছি এ কি ক্ষিপ্তের ন্যায় কর্ম্ম করিলে? তখন বাএন্কার স্বামী তাঁহাকে বলিতে লাগিলেন সুন্দরি তুমিও এইরূপ উন্মত্তের ন্যায় আচরণ করিলে আমার সন্তোষ হইত, বাএন্কা তুমি ঈদৃশ জ্ঞানের কার্য্য করিয়াছ যে তাহাতে ভোজনানন্তর আমার একশত মুদ্রা দণ্ড হইল। বাএন্কা বলিলেন তুমি অতি নির্বোধ, আমার কার্য্যের বিষয়ে কেন পণ রাখিয়াছিলে? পেত্রুসিও এই কথা শুনিয়া আপনার কান্তাকে কহিলেন কেথারিন্ এই অবাধ্য অবলা দিগকে উপদেশ দেও পতির প্রতি পত্নীর কি কর্ত্তব্য। তাহাতে নব সুশীলা মহিলা স্বামির প্রতি স্ত্রীলোকের কর্ত্তব্য বিষয়ের বর্ণনা পূর্ব্বক এবম্প্রকার সদ্বক্তৃতা করিলেন যে তৎশ্রবণে সকলে চমৎকৃত হইয়া বোধ করিতে লাগিলেন ইনি স্বেচ্ছাক্রমে পেত্রুসিওর আজ্ঞাবহ হইয়াছেন। অতএব তাঁহার কর্কশা সংজ্ঞা বিলুপ্ত হইল এবং পাদুয়া নগর মধ্যে সুশীলা মহিলা বলিয়া প্রতিষ্ঠিত হইতে লাগিলেন ইতি।
হামলেত্।
সেক্সপিয়র।
দেন্মার্কীয় যুবরাজ হাম্লেত।
দেন্মার্ক দেশে হাম্লেত নামা এক নরপতি ছিলেন। তাঁহার অকালে কালধর্ম্ম প্রাপ্তি হইলে রাজমহিষী শোক সন্তাপ না করিয়া দুই মাসাভ্যন্তরে দেবরের গলে বরমাল্য প্রদান পূর্ব্বক তদীয় পুনর্ভূ হইলেন। রাণীর প্রণয় ভাজন দেবর স্বামির সমান সুশ্রী বা সুজন ছিল না। তাহার কুৎসিতাকৃতির ন্যায় নীচাশয়তা নানা বিষয়ে নিরন্তর প্রকাশমান হইত। অপর মহীপতির মৃত্যুর পরে রাজ্যমধ্যে এই জনাপবাদ হইয়াছিল যে ঐ ব্যক্তি মৃত ভূপতির পত্নীর পাণিগ্রহণ এবং রাজার উত্তরাধিকারি কুমার হাম্লেতের অধিকার নিরাকরণ পুরঃসর স্বয়ং সিংহাসনাধিরোহণ মানসে গোপনে ভূপতির প্রাণ সংহার করিয়াছে। অতএব পতি বিয়োগের অনতিবিলম্বে তাহার অঙ্কলক্ষ্মী হওয়াতে নৃপরমণীর চরিত্রে কলঙ্ক ও লোক সমাজে যৎপরোনাস্তি অপযশঃ হইল।
রাজকুমার অতি সুশীল সদাচার বিশেষতঃ ধর্ম্মনিষ্ঠ ছিলেন এবং পিতার প্রতি সাতিশয় ভক্তিমান্ থাকাতে সর্ব্বদা দেববৎ জনকের স্মরণ করিতেন। মাতার এই অবিজ্ঞতাচরণ দর্শন করিয়া মনোমধ্যে সাতিশয় খিন্ন হইতে লাগিলেন। জনকের অকাল মৃত্যু জন্য পরিতাপ এবং জননীর পরিণয় জনিত লজ্জায় অবসন্ন হওয়াতে তাঁহার দৈহিক মানসিক স্ফূর্ত্তি একেবারে বিলীন হইয়া গেল। যৌবন কালের ক্রীড়া কৌতুকে তদীয় মানস নিরুৎসুক হইল এবং শাস্ত্রালোচন অথবা অন্যপ্রকার সচ্চিন্তনেও চিত্তের অপ্রবৃত্তি হইতে লাগিল। অপর সংসার তত্ত্ব বিচারে তৎপ্রতি মহতী ঘৃণা জন্মিল সুতরাং সংসারাশ্রম জীবিতাবস্থার সুখোদ্যান জ্ঞান না করিয়া ক্লেশকর কানন ও তত্রস্থ বিষয় নিকর সুরম্য কুসুমের সদৃশ সুখকর না জানিয়া অরণ্য তৃণ তুল্য জঘন্য বোধ করিলেন। তরুণ রাজনন্দন দিগের অন্তঃকরণ ক্রমাগত রাজ্যাধিকার ভ্রংশ হইবার সম্ভাবনা দেখিলে গুরুতর ক্ষতিবোধে মহা বিষণ্ণ এবং অপমান জ্ঞানে নিরন্তর চিন্তাকুল হইয়া থাকে যুবা হামলেতও জননীর পাণিগ্রাহি পিতৃব্য দ্বারা পৈতৃক রাজত্বে পরিভ্রষ্ট হইবার আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ হইতে পারিতেন। কিন্তু প্রসূতির তাতপ্রতি অসদ্ব্যবহারে যাদৃশ ক্ষোভ প্রাপ্ত হইতে লাগিলেন রাজ্যাধিকার বিনাশের ভাবনায় তাদৃশ ভাবিত হইলেন না। বিমনা হইয়া সাশ্চর্য্যচিত্তে নিয়ত কেবল এই চিন্তা করিতে লাগিলেন জনক জীবদ্দশায় জননীর প্রতি স্নেহবান্ ছিলেন এবং নিরন্তর সদ্ব্যবহার করিতেন মাতাও তৎকালে অনুরাগ বা প্রেমের নিদর্শন দর্শাইতে ক্রটি করেন নাই, কিন্তু এ কি চমৎকার ব্যাপার, পিতার মৃত্যুর পর এখনও দুই মাস অতীত হইল না, জননী ইতিমধ্যে তাঁহার সমুদয় প্রণয় ও সদ্ব্যবহার বিস্মৃতা হইয়া গেলেন। সম্বন্ধের সন্নিকর্ষ প্রযুক্ত যাহার সহিত পরিণয় যুক্তি বিরুদ্ধ ও শাস্ত্র নিষিদ্ধ, অবিলম্বে অবলীলাক্রমে তাহাকে বিবাহ করিলেন? ফলতঃ মহারাজ হামলেতের মৃত্যুর পর সাতিশয় ত্বরা সহকারে রাজ লক্ষণ বিহীন ব্যক্তিকে স্বামির সিংহাসন ও শয্যার অধিকারি করাতে নৃপ জায়ার যে অপযশঃ হয় তাহাতেই যুবরাজের অন্তঃকরণ যৎপরোনাস্তি পরিমান হইল এবং প্রসূতির অপ্রতিষ্ঠা রাজ্য বিনাশাপেক্ষা দশ গুণ দুঃখদায়ক হইয়া তাঁহাকে ব্যাকুল করিতে লাগিল।
নৃপবনিতা এবং তদীয় পৌনর্ভব ভর্ত্তা ক্লাদিয়স্, কুমার হাম্লেতের শোকাবেগ নিবারণ নিমিত্ত নানা উপায় কল্পনা করিলেন। কিন্তু কিছুতেই রাজনন্দনের খিন্ন অন্তঃকরণ শান্ত হইল না। যুবরাজ মহারাজের আকস্মিক পরলোক প্রাপ্তি জন্য দুঃখে সতত সন্তাপিত রহিলেন, পিতার মৃত্যুর পর বিষাদ সূচক যে অসিত বসন পরিধান করেন নিরন্তর তাহাই ধারণ করিয়া থাকিলেন এবং সেই বেশেই রাজ সভায় যাতায়াত করিতে লাগিলেন। পিতৃব্যের সহিত জননীর পরিণয় দিবসে তাঁহার সম্ভ্রমার্থও সে পরিচ্ছদের পরিবর্ত্তন করিলেন না। রাণীর পুনর্ব্বার বিবাহোপলক্ষে মহা২ উৎসব হইল তাহাতে অনেকে গিয়া অমোদ আহ্লাদ করিলেন কিন্তু রাজতনয় ঐ ব্যাপার বিজাতীয় অপমান জনক জ্ঞান করিতে লাগিলেন সুতরাং তাহার সংস্রবেও গেলেন না।
যুবরাজ জনকের অকস্মাৎ নিধন প্রাপ্তির কারণ নির্দ্দিষ্ট না হওয়াতেই সাতিশয় পরিতাপান্বিত হন্। রাজসহোদর ক্লাদিয়স্ রাজ্যমধ্যে জনরব করিয়া দিয়াছিল ভূপাল হাম্লেত ভুজঙ্গ দংশনে কৃতান্তের করাল দশনে পতিত হইলেন। কিন্তু রাজনন্দন তদ্বিষয়ে সন্দিহান হইয়া মনে২ বিতর্ক করিতে লাগিলেন বুঝি পিতৃব্যই খল সর্প, রাজ্যলোভে আমার জনককে দংশন করিয়াছেন। বস্তুতঃ জন প্রবাদানুসারে যে অহি মহীপাল হাম্লেতের জীবন বিনষ্ট করে সেই ব্যক্তিই রাজ বিয়োগানন্তর সিংহাসনে উপবিষ্ট হয়।
রাজকুমারের এই সন্দেহ জননীর ব্যবহার দর্শনে প্রগাঢ় হইতে লাগিল। তাঁহাকে দেবরের প্রতি অনুরক্তা দেখিয়া এক২ বার মনে করিলেন নৃপতির প্রাণ নাশের ষড়্যন্ত্রে ইহাঁরও যোগ থাকিবে। ফলতঃ এই বিষম ব্যাপার মাতার জ্ঞাতসার এবং তাঁহার সম্মতি ক্রমে ঘটিয়াছে কি না এই সংশয়ও কুমারের হৃদয়ে আস্পদ করিয়াছিল।
কিয়দ্দিনানন্তর রাজনন্দন একটা কিম্বদন্তী শুনিলেন দুই তিন দিবস অবধি নিশীথ সময়ে নৃপসদনের সম্মুখ স্থিত মঞ্চে মৃত মহীপতির আকৃতি বিশিষ্ট এক ভূত আবির্ভূত হইতেছে এবং বিভাবরীর প্রহরিগণ প্রত্যক্ষ করিয়াছে যে লোকান্তরস্থ রাজা জীবদ্দশায় সর্ব্বদা যাদৃশ পরিচ্ছদ ধারণ করিতেন ঐ দেবযোনির অবিকল সেই সজ্জা। যে সকল ব্যক্তি ভূত দর্শন করিয়াছিল তাহাদের মধ্যে রাজতনয়ের হোরেসিও নামা এক জন প্রিয় মিত্র ছিলেন অতএব ঐ জনরবে নৃপকুমারের বিশ্বাস জন্মিল। অনন্তর দর্শকেরা জিজ্ঞাসিত হইয়া ভূতের আকৃতি প্রকৃতি এবং প্রকাশের সময় বর্ণনা করত কহিল দ্বিতীয় প্রহর রাত্রি অতীত হইবামাত্র মঞ্চোপরি ভূতের আবির্ভাব হয়। তাহার বর্ণ চিক্কণ, লপন কোপাপেক্ষা চিন্তার লক্ষ্মে বিলক্ষণ লক্ষিত, শ্মশ্রু সাতিশয় ভয়ানক। ফলতঃ লোকান্তর প্রাপ্ত পৃথ্বীপাল জীবদ্দশায় যদ্রূপ অঙ্গ ভঙ্গি ও মানসিক ভাব প্রকাশ করিতেন আবির্ভূত ভূত অবিকৃত তদ্রূপ ভাব ভঙ্গি সম্পন্ন। আমরা তাহাকে কত প্রকার প্রশ্ন করিয়াছিলাম কিন্তু এক বিষয়েও উত্তর দিল না। বোধ হয় একবার যেন প্রতি বচন প্রদান নিমিত্ত মস্তক উত্তোলনের উপক্রম করিয়াছিল হঠাৎ সেই সময় কুক্কুটে প্রভাতীয় রব করাতে দ্রুতগতি প্রস্থান পূর্ব্বক দৃষ্টি পথের বহির্ভূত হইল।
যুবরাজ দর্শকদিগের প্রমুখাৎ দেবযোনির বিবরণ শ্রবণ করিয়া অতিশয় চমৎকৃত হইলেন এবং মনো নিবেশ পুরঃসর তদ্বিষয়ের চিন্তা করত বিবিধ তর্ক বিতর্ক করিয়া মীমাংসা করিলেন প্রহরিদের দৃষ্ট পদার্থ আমার পিতার ছায়া বটে বোধ হয় তাঁহার কিছু জ্ঞাপ্তব্য থাকিবেক, অনর্থক আবির্ভাব হয় নাই, যাহা হউক অদ্য যামিনীযোগে প্রহরিগণ সমভিব্যাহারে প্রহরিতা করিয়া স্বচক্ষে নিরীক্ষণ করিতে হইল। অপর আপনা আপনি বিবেচনা করিলেন যদিও সেই অপচ্ছায় এপর্য্যন্ত কাহারো কথায় প্রত্যুক্তি করে নাই তথাপি আমি সন্তান, অপত্যস্নেহে আমার সহিত আলাপ করিতে পারেন অতএব রাত্রি আগমনের প্রতীক্ষায় অধৈর্য্য হইতে লাগিলেন।
অনন্তর সর্ব্বরী সমাগত হইলে যুবরাজ হোরেসিও এবং মার্সেলস্ প্রহরির সমভিব্যাহারে প্রহরিতা করত ভূতের আবির্ভাব স্থানে গমন পূর্ব্বক দণ্ডায়মান হইয়া রহিলেন। নিশায় শিশির পতন এবং প্রবল পবনের বহনে সাতিশয় ক্লেশানুভব হওয়াতে রাজকুমার সঙ্গিগণ সঙ্গে শীতলতার প্রসঙ্গে কথোপকথন করিতে আরম্ভ করিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে দেবযোনির ছায়া প্রকাশমানা হইল তাহাতে হোরেসিও নৃপনন্দনকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন ঐ দেখ ভূত অসিতেছে সুতরাং তাহাদের অন্যালাপ স্থগিত হইল।
রাজতনয় সমক্ষে প্রকাশমানা লোকান্তরস্থ পিতার ছায়া অবলোকনে বিস্ময় ও সন্ত্রাসে ক্ষণকাল ব্যাকুল হইলেন এবং উপস্থিত আকৃতি সৎ বা অসৎ, শ্রেয় বা অশ্রেয়ের লক্ষণ, এতন্নির্ণয় করণে অক্ষমতা প্রযুক্ত ঈশ্বরীয় দূত ও স্বর্গীয় কর্ম্মচারিদিগের স্তব করত আত্ম রক্ষার প্রার্থনা করিতে লাগিলেন কিন্তু বারম্বার অনিমিষ নয়নে নিরীক্ষণ করাতে ক্রমে তাঁহার ভীতি নিরাকৃত ও সাহস সঞ্জাত হইল। অনতিবিলম্বে বোধ করিলেন দেবযোনি যেন দয়া দৃষ্টি বিস্তার করিতেছে এবং তাঁহার সহিত স্নিগ্ধালাপ করিতে যেন সমুৎসুক। রাজকুমার দেবযোনির ছায়ায় জনকের অনুরূপ আকার এবং স্নেহ ও কারুণ্যের লক্ষণ প্রত্যক্ষ করিয়া সাহসে নির্ভর করত আপনার বক্তব্য ব্যক্ত করিবার উপক্রম করিলেন এবং পরম ভক্তিভাবে বিনয়গর্ব্ভ এই বাক্য কহিতে লাগিলেন হে পিতঃ মহারাজ হাম্লেত, আপনকার অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া যথাবিধি সম্পন্ন হইলেও আপনি কি পৃথিবীর কৌতুক ও নিশাকরের কর অবলোকন নিমিত্ত পুনর্ব্বার শ্মশান হইতে গাত্রোত্থান করিয়াছেন? আপনকার আত্মার সুস্থিরতা নিমিত্ত কর্ত্তব্য কর্ম্মের যদিস্যাৎ কিঞ্চিৎ অবশেষ থাকে আজ্ঞা করুন। দেবযোনি যুবরাজের এতদ্বচন শ্রবণে প্রীতি প্রকাশ পুরঃসর কর প্রসারণ করিয়া সঙ্কেত করিলেন আমরা দুই জন নির্জনে কথোপকথন নিমিত্ত স্থানান্তরে যাই চল। কুমার অভিনয় দর্শনে ভূতের অভিপ্রায় বুঝিয়া তৎক্ষণাৎ একাকী তাহার অনুবর্ত্তী হইতে প্রবৃত্ত হইলেন তাহাতে সমভিব্যাহারী মিত্র হোরেসিও এবং প্রহরী মার্সেলস্ নিবারণ করত তাঁহার হস্ত ধারণ করিল এবং ভয় প্রদর্শন পুরঃসর কহিতে লাগিল ভূতযোনি বিশ্বাস্য নয়, দুর্জ্জনতা পুর্ব্বক নিকটবর্ত্তি সাগর নীরে নিমগ্ন অথবা ভয়ঙ্কর ভৃগু হইতে নিক্ষেপ করিয়া অজ্ঞান করিতে পারে অতএব একাকী ইহার সহিত গমন করিও না। রাজনন্দন জননীর অসদাচরণ বিলোকনাবধি আপন জীবনে ঘৃণা করিতেন সুতরাং তদ্বিনাশের সম্ভাবনায় ভীত হইতেন না। অপর আত্মা অনশ্বর, ভূতে তাহার কোন ক্ষতি করিতে সমর্থ নহে স্বীয় বুদ্ধি ও বিবেক বলে এতদ্বিষয় নির্ণয় করিয়াছিলেন। অতএব সমভিব্যাহারি প্রহরিদের নিবারণ বচনে মনোনিবেশ করিলেন না। আপনার জিজ্ঞাসা নিবৃত্তি নিমিত্ত পুরুষসিংহের তুল্য স্থিরপ্রতিজ্ঞ হইলেন। সঙ্গিরা অনিষ্টাশঙ্কায় ধারণ করিয়া রাখিবার চেষ্টা করিলে বলে তাহাদের হস্ত উন্মোচন পুরঃসর দেবযোনির পশ্চাৎ গমন করিলেন।
আবির্ভূত ভূত কুমার সমভিব্যাহারে বিরল স্থান প্রাপ্ত হইলে আপনার মৌন ভঙ্গ করিয়া স্নেহান্বিত বচনে কহিতে লাগিল হে প্রিয় তনয়, আমি তোমার জনক, দেন্মার্কাধিপতি মৃত হাম্লেতের ছায়া, দুরাত্ম সোদরের নিষ্ঠুরতায় হত হইয়াছি, তাহার বিবরণ বর্ণন করি অবধান কর। হে পুত্র আমার প্রাণ বিয়োগের বিষয়ে তুমি যে সন্দেহ করিয়াছ তাহাই যথার্থ, তোমার পিতৃব্য ক্লাদিয়সই আমার জীবন বিনাশক। বৎস আমি জীবদ্দশায় অভ্যাসানুসারে এক দিন উদ্যানস্থ ভবনের শয়নাগারে অপরাহ্ণ সময়ে শয়ান হইয়া নিদ্রা যাইতেছিলাম আমার সুষুপ্তি দশা উপস্থিত হইলে সেই বিশ্বাসঘাতী পাপিষ্ঠ সহোদর বিষ লতার রস আনয়ন পূর্ব্বক আমার কর্ণ কুহরে নিক্ষেপ করে। বিষ রস মানব জীবনের মহা বৈরী, সুতরাং শ্রবণ রন্ধ্র যোগে শরীর মধ্যে প্রবেশ মাত্র পারদের গতির ন্যায় সমস্ত শিরায় সঞ্চারিত হইয়া শোণিত শোষণ করিয়াছিল। তাহাতে অবিলম্বে দেহের উপরিস্থ চর্ম্ম কুষ্ঠরোগাবির্ভাবের ন্যায় গলিত ও প্রাণ বিনির্গত হয়। আমার সহোদর সিংহাসন ও রাজ মহিষী পরিগ্রহ করণাশয়ে এই রূপে আমার জীবন বিনাশ করিয়াছে। অতএব হে পুত্র যদিস্যাৎ তোমার পিতৃভক্তি থাকে আমি তোমাকে দিব্য দিয়া কহিতেছি সেই দুরাত্মার জিঘাংসা কর। পরে খেদ প্রকাশ পুরঃসর কহিতে লাগিল বৎস তোমার জননীও সদাচারী নহে, তাহার ধর্ম্মাধর্ম্ম বোধ নাই, আমার সহিত প্রথম পরিণয়ের নিয়ম উল্লঙ্ঘন পূর্ব্বক মদীয় অসুবিনাশককে অক্ষোভে বিবাহ করিল। যাহা হউক হে বৎস সে তোমার মাতা পরম গুরু, তাহার শরীরে তুমি হস্ত উত্তোলন করিও না, তাহার নিজ ধর্ম্মই পরকালে সমুচিত দণ্ড বিধান করিবে। তুমি কেবল কৃতঘ্ন পিতৃব্যের দুরাচারের প্রতিক্রিয়ার্থ যত্ন কর। অনন্তর যুবরাজ লোকান্তরস্থ পিতার প্রতিকৃতির সন্নিধানে কৃতাঞ্জলি হইয়া প্রাণ পণে আজ্ঞাপালনাঙ্গীকার করিলে দেবযোনি তৎক্ষণাৎ তিরোহিত হইল।
ভূত অন্তর্ধান করিলে যুবরাজ নির্জনেবসিয়া মনে২ বিবেচনা করিলেন পুস্তক পাঠে এবং দর্শনযোগে যে সকল বিষয়ের শিক্ষা প্রাপ্ত হইয়াছি তাহা সর্ব্বদা স্মৃতিপথে আবির্ভূত হইলে ভূতের আদেশ পালনে যদি কোন ব্যাঘাত জন্মে অতএব সে সকল বিস্মরণ পূর্ব্বক কেবল দেব যোনির বচন ও নিদেশ মনোমধ্যে জাগরূক করিয়া রাখিব। অনন্তর সমভিব্যাহারি দিগের সন্নিধানে আগমন পূর্ব্বক আপনার প্রিয় মিত্র হোরেসিওকে গোপনে সমস্ত বিষয় কহিলেন। তদ্ব্যতীত অপর কেহই ভূতের বৃত্তান্ত জানিতে পারিল না। পরে মার্সেলস্ এবং হোরেসিও দুই জনকেই নিষেধ করিলেন অদ্য রাত্রিযোগে যে ব্যাপার হইল কাহার নিকট প্রকাশ করিও না।
যুবরাজ হাম্লেতের চিত্ত পূর্ব্বাবধি ক্ষুণ্ণ ও বিকৃতিভাবাপন্ন ছিল, ভূত দর্শনের পর অধিক উদ্বেগান্বিত হইতে লাগিল। কিন্তু অন্তঃকরণের বৈক্লব্য অবলোকনে পাছে পিতৃব্য আপনার মানস জানিতে পারে এবং পিতার মৃত্যুর বিষয়ে যৎকিঞ্চিৎ যাহা প্রকাশ ছিল তদপেক্ষা অধিক বিবরণ অবগত হইবার কথা শুনিয়া পাছে সাবধান হয় এই নিমিত্ত মনে২ পরামর্শ করিয়া স্থির করিলেন আমি আপন মানসিক এই উদ্বেগ উন্মাদ রূপে প্রকাশ করি। ফলতঃ যদি উন্মত্তের তুল্য আচার ব্যবহার করি তাহা হইলে পিতৃহন্তা পিতৃব্য আমার মনস্থ অবগত হইতে পারিবেক না মনের চাঞ্চল্য কৃত্রিম উন্মাদে আচ্ছন্ন হইলে তজ্জন্য সন্দেহই জন্মিবেক না যদি হয় সামান্য ভাবে হইবেক।
অতএব নৃপতনয় তৎকালাবধি বাতুলের বেশ ধারণ পুরঃসর তদ্রূপ আচার ব্যবহার করিতে আরম্ভ করিলেন তাহাতে অপন সংকল্প সিদ্ধি করিয়া কৃতকার্য্য হইবার সম্ভাবনাও হইল কেননা ক্লাদিয়স্ ও নৃপজায়া ভূতের আবির্ভাব বৃত্তান্ত জানিতে পারে নাই সুতরাং জনকের অকালে করাল কাল করে নিপাত নিমিত্ত যুবরাজের শোকাবেগ এবং তজ্জন্য চিত্ত বিক্ষেপ অনুমান করিতে অক্ষম হইয়া মনে করিল কুমার কন্দর্প বাণে বিদ্ধ মনাঃ হইয়া প্রেম পীড়ায় পীড়িত হইয়াছেন।
যুবরাজ হাম্লেত উক্ত প্রকারে উন্মত্তের আকার ধারণ করণের অগ্রে রাজমন্ত্রির পরম সুন্দরী ওফিলিয়া নাম্নী কন্যার সহিত প্রণয়াভিলাষী হইয়াছিলেন এবং সেই কামিনীর প্রতি প্রেমানুরাগ প্রকাশ পূর্ব্বক অঙ্গুরী প্রদান করিয়া সর্ব্বদা লিপি প্রেরণ করিতেন। মন্ত্রি কন্যাও কুমারের গুণে আকৃষ্ট মনা হইয়া অনুরাগিণী হন্ এবং বিবিধ প্রকারে আপনার প্রণয়চিহ্ণ প্রকাশ করেন সুতরাং তাঁহাদের পরস্পর পরিণয় অবধারিত হয়। কিন্তু কুমার যদবধি জনকের মৃত্যু বিবরণ অবগত হইলেন তদবধি শোকে ব্যাকুল হওয়াতে নায়িকা প্রণয় বিসর্জ্জন দিলেন এবং সেই সময় হইতে কামিনীর সহিত প্রণয়ি ব্যবহার না করিয়া বরং অসদাচরণ করিতে লাগিলেন। মন্ত্রি কন্যা অতিশয় গুণবতী এবং বুদ্ধি বিবেকে বিভূষিতা ছিলেন প্রণয়ির হঠাৎ এবম্বিধ ভাব অবলোকন করিয়া মনে করিলেন নৃপনন্দনের মনঃ অবশ্য অন্য কোন মানসিক ক্লেশে বিক্ষিপ্ত হইয়া থাকিবে যেহেতু তাল লয় বিহীন বাদ্য যাদৃশ কর্কশ ধ্বনি তুল্য বোধ হয় চিত্ত ক্ষোভ হেতু এক্ষণে প্রণয়ালাপও প্রিয়তমের শ্রবণপথে তদ্রূপ নীরসবৎ ভাসমান হইতেছে অতএব নায়কের এই অন্তঃকরণ বিকারে কারণান্তর থাকিবেক সুতরাং প্রণয়ির বিপরীত ব্যবহারে আপনি ক্ষুব্ধ হইলেন না এবং তাঁহাকেও কিছু অনুযোগ করিলেন না।
নৃপনন্দন হাম্লেত সেই সময় পিতৃহন্তার প্রতি হিংসা করণার্থ ব্যস্ত সমস্ত থাকাতে যদিও প্রণয়িনীর সহিত সপ্রণয় ব্যবহার করিলেন না বরং অন্তঃকরণের উদ্বেগ জন্য কখন২ বিপরীতাচার করিতে লাগিলেন তথাপি কামিনীর প্রতি অনুরাগ তাঁহার অন্তর হইতে একেবারে অন্তর হইল না। শোকাবেগে অপ্রণয়ির কর্ম্ম করিয়া অব্যবহিত পরেই মনোমধ্যে অনুতাপ করিতেন রমণীর প্রতি অন্যায় অসদাচরণ বা কাঠিন্য ব্যবহার করিলাম। অতএব কৃত্রিম উন্মাদের অনুসারে অসঙ্গতার্থ শব্দ বিন্যাস পূর্ব্বক মধ্যে২ প্রণয়িনীর নিকট যে পত্র প্রেরণ করিতেন তাহাতে স্নেহ প্রকাশক দুই এক পদও থাকিত। যুবতী সেই লিপি দর্শনে আপন মনোমধ্যে প্রবোধ দিতে পারিতেন যুবরাজ তাঁহার প্রণয় বিস্মৃত হন নাই। রাজকুমার একবার প্রিয়তমার প্রতি লিপিযোগে এই প্রকার অসঙ্গতার্থ বাক্যে প্রেম প্রকাশ করেন যথা হে সুন্দরি নভোমণ্ডলোদ্দীপক নক্ষত্রমণ্ডল অনল পদার্থ কি না এবং দিবাকর ভ্রমণ করেন কি না অপর সত্য পদার্থ মিথ্যা কি না ঈদৃশ সংশয়কে আপন মনে স্থান দান করিও কিন্তু আমি তোমার প্রেমাসক্ত কি না এমত সন্দেহ যেন ত্বদীয় মানসে কদাপি স্থান প্রাপ্ত না হয়। মন্ত্রিসুতা ওফিলিয়া ঐ লিপি প্রাপ্ত হইয়া আপনার পিতাকে দেখাইলেন। মন্ত্রী তাহা রাজসদনে লইয়া গিয়া কৌতুক করত রাণী ও তদীয় নায়ক ক্লাদিয়সের জ্ঞাতসার করিলেন। অতএব তাঁহাদের দৃঢ় প্রতীতি হইল যুবরাজ হাম্লেত কেবল প্রেম পীড়ায় পীড়িত এবং তজ্জন্যই তাঁহার উন্মাদ। নৃপমহিষী মন্ত্রির প্রমুখাৎ শুনিয়া আহ্লাদ প্রকাশ করত কহিলেন ওফিলিয়ার রূপ লাবণ্য দর্শনে পুত্রের উন্মত্ততা হইয়া থাকিলে ভাল বটে পরিণয় হইলেই সন্তান সুস্থ হইবে এবং এ বিবাহে উভয়ের গৌরব আছে।
কিন্তু যুবরাজের চিত্তবিক্ষোভ বাস্তবিক প্রেম পীড়ায় জন্মে নাই সুতরাং নৃপাঙ্গনা প্রতীকারের যে উপায় মনে করিলেন তাহাতে শান্তির সম্ভাবনা ছিল না। পিতৃভক্ত রাজতনয় জনকের আকার বিশিষ্ট দেবযোনির দর্শনাবধি তাহার আদেশে যে চিন্তায় চিন্তিত হন্ তাহাই তাঁহার অন্তঃকরণকে ব্যাকুল করিয়া রাখিয়া ছিল। যাবৎ পিতৃহন্তার প্রতিহিংসা না করিলেন তাবৎ মনের উদ্বেগ দূরীভূত হইল না। বরং যত কাল বিলম্ব হইতে লাগিল ততই পিত্রাজ্ঞায় অবজ্ঞা করিলাম বলিয়া পাপভয়ে সমধিক বিক্ষিপ্ত হইতে লাগিলেন। জনকের বৈরি ক্লাদিয়স্ যখন বাহিরে বসিতেন তখন তদীয় শরীর রক্ষার নিমিত্ত প্রহরিগণ চতুর্দিকে দণ্ডায়মান থাকিত এবং অন্তঃপুরস্থ হইলে আপনার জননী নৃপমহিষী তাহার পার্শ্বে অবস্থিতি করিতেন সুতরাং কুমার পিতৃদ্বেষির অসু বিনাশ পূর্ব্বক বৈর নির্যাতন করিয়া সংকল্প সিদ্ধ করা সুযোগ বিরহে কঠিন কর্ম্ম জ্ঞান করিতে লাগিলেন। অপর যদিও ক্লাদিয়স্ তাঁহার পৈতৃক রাজ্যাধিকার বিনষ্ট করিয়াছিলেন তথাপি গর্ব্ভধারিণীর পৌনর্ভব ভর্ত্তা হওয়াতে সহসা সংকল্পিত সাধনে শঙ্কাও হইতে লাগিল বিশেষতঃ কোমল প্রকৃতি প্রযুক্ত একটা সহযোগি জীবের জীবন বিনাশ মহা ভয়ানক ও ঘৃণাকর বোধ হইল। ফলতঃ রাজনন্দন বহু দিবসাবধি পিতৃব্যের প্রতি সন্দিহান হইয়া ক্ষুণ্ণমনা ছিলেন বটে কিন্তু বিশেষ প্রমাণ কিছুই প্রাপ্ত হন্ নাই কেবল দেবযোনির প্রমুখাৎ তদ্বিবরণ শ্রবণ করিলেন। ভূতে সকল আকার ধারণ করিতে পারে তদ্বিষয় অবগত থাকাতে সেই অপচ্ছায় বস্তুতঃ জনকের ছায়া কিনা তাহাতেও সংশয় হইল সুতরাং কখন২ মনে করিলেন জন্মদাতার আকৃতি ধারণ পুরঃসর কোন ভূত বুঝি ঘোর প্রাণিহত্যার পাপে প্রবৃত্তি দিয়া গেল। অপর এক২ বার ঈদৃশী আশঙ্কা করিতে লাগিলেন দেবযোনির ছায়া দর্শন স্বপ্ন ও ভ্রান্তি যোগেও হইতে পারে অতএব পিতার আকৃতি ধারি ভূতের বিষয়ে সংশয়ান্বিত হইয়া অবশেষে নিদ্ধার্য্য করিলেন প্রবল প্রমাণ না পাইলে সংকল্পিত কার্য্য সমাধা করণে অগ্রসর হইব না।
যুবরাজ আপনার কর্ত্তব্য বিষয়ে উক্ত প্রকার মত স্থির করিয়া কিঞ্চিৎ শান্ত হইলে কিয়দ্দিন পরে কতিপয় নট নাট্যক্রিয়া করিবার আশয়ে রাজসভায় আসিয়া উপস্থিত হইল। কুমার সেই নটদিগের নাট্য ইতিপূর্ব্বে একবার অবলোকন করিয়াছিলেন। তাহাদের মধ্যে এক জন ত্রয় দেশের অধিপতি প্রায়েমের মৃত্যুর পর তদীয় মহিষীর শোক সন্তাপ অপূর্ব্ব ভাব ভঙ্গি সহকারে বক্ততা পূর্ব্বক যে অভিনয় করে তাঁহার স্মরণ পথে তাহা জাগরূক ছিল। অতএব পরিচিত চারণ গণের যথেষ্ট সমাদর করিয়া সেই নাট্যের পুনর্বার অভিনয় করিতে অনুরোধ করিলেন। সুশিক্ষিত নট রাজনন্দনের আদেশে অবিকল ভাব ভঙ্গি সহিত সেই নাট্যের অভিনয়ে প্রবৃত্ত হইল এবং ত্রয়ের প্রাচীন রাজা নিষ্ঠুরতা পূর্ব্বক নিহত ও প্রজাপুঞ্জ ছিন্ন ভিন্ন এবং অগ্নিদ্বারা নগর দাহ হইলে রাজমহিষী শোকে ব্যাকুল হইয়া যে প্রকারে বিলাপ করেন অর্থাৎ নৃপরমণী আপনার যে মস্তকে মহার্হ মণিময় মুকুট ধারণ করিতেন তাহাতে আচ্ছাদন মাত্র নিমিত্ত ছিন্ন বসন এবং যে কটিদেশে রাজপরিচ্ছদ অহর্নিশ শোভা পাইত তাহাতে জীর্ণ এক খণ্ড কম্বল মাত্র অর্পণ পূর্ব্বক রিক্ত পদে প্রাসাদের নিম্নদেশে অবিশ্রান্ত পর্য্যটন করত যদ্রূপে শোক প্রকাশ করেন তাহা আশ্চর্য্য প্রকারে অভিনয় করিয়া দেখাইল। নটের ভাব ভঙ্গি দর্শনে দর্শক গণের অনুভব হইতে লাগিল যেন ত্রয়ের রাজমহিষীর শোক সন্তাপ সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ করিতেছি সুতরাং সকলের নয়ন বাষ্পে পরিপূর্ণ হইল নাট্যকারীও ভাবে গদ্গদ হইয়া আপনাকে যথার্থ রাজাঙ্গনা জ্ঞানে তাদৃক্ দুঃখ প্রকাশ করত লোচন নীরে ভাসিতে লাগিল। এই নাট্য সমাপন হইলে রাজতনয় স্বীয় মনোমধ্যে বিতর্ক করিতে লাগিলেন এ নট ত্রয় দেশীয় রাজমহিষীকে কদাপি নয়ন গোচর করে নাই, কত শত বৎসর অতীত হইল সেই মহিলার মৃত্যু হইয়াছে, এ ব্যক্তি তাহার দুরবস্থার বিষয় অভিনয় করিতে প্রবৃত্ত হইয়া আপন কল্পনায় আবির্ভূত তদীয় দুঃখ অনুভব করত মহা বিষণ্ণ হইল এবং তন্নিমিত্ত অজস্র অশ্রুপাত করিল। আঃ আমার অন্তঃকরণ কি পাষাণময়, আমার জনককে এক জন প্রাণে নিহত করিল আমি তজ্জন্য শোক সন্তাপ পরিত্যাগ করিয়া নিশ্চিন্ত বসিয়া আছি, পিতৃহন্তাকে প্রতিফল প্রদানের অভিপ্রায় অন্তর হইতে অন্তর হইয়া গিয়াছে ফলতঃ সে মানসকে সংপ্রতি যেন শয্যাগত বা পঙ্কিল হ্রদে নিমগ্ন করিয়া নিরুদ্বেগ আছি। তদনন্তর নাটকে বর্ণিত অন্যান্য মহোদয়ের জীবন চরিত্র স্মৃথিপথে উদিত হইল এবং তদ্বিষয় চিন্তা করিতে২ সাক্ষাৎ দর্শন কারির ন্যায় মনোমধ্যে তত্তৎ ভাবের উদয় হইতে লাগিল। তৎপরে এক জন প্রাণ হন্তার ব্যাপার স্মৃতি পথারূঢ় হইল, সে ব্যক্তি নাটক দর্শন করিতে গিয়া প্রাণহন্তার বেশধারি নটের ভাব ভঙ্গি বিলোকনে আত্মবিস্মরণ পূর্ব্বক স্বয়ং স্বীয় কুক্রিয়া স্বীকার করিয়াছিল। অতএব হাম্লেত পিতৃহন্তার প্রতিহিংসার্থ পুনর্ব্বার ব্যস্ত হইয়া তদ্বিষয়ে সন্দেহ নিরসন নিমিত্ত যুক্তি পূর্ব্বক উপায় স্থির করিলেন এই চারণ গণকে গোপনে উপদেশ দিয়া রাজসভায় পিতৃব্য সমক্ষে একটা হত্যার ব্যাপার বর্ণন পূর্ব্বক এক দিন নাট্য ক্রিয়া করাই, তাহা হইলে নাট্য দর্শনে পিতৃব্যের কিরূপ ভাবোদয় হয় আকার ইঙ্গিতে অবশ্য প্রকাশ পাইবে তাহাতে তিনি আমার পিতৃহন্তা কি না নিশ্চয় করিতে পারিব। রাজকুমার মনোমধ্যে এই পরামর্শ করিয়া পিতৃহত্যার ব্যাপারের তুল্য এক গল্প রচনা পূর্ব্বক তদুপলক্ষে অপূর্ব্ব নাটক প্রস্তুত করাইলেন এবং তাহার অভিনয়ার্থ চারণ দিগকে অনুমতি দিয়া রাজসিংহাসনাধিষ্ঠিত পিতৃব্য এবং রাজমহিষীকে দর্শনের নিমন্ত্রণ করিলেন।
এই নূতন নাটকে বায়না দেশীয় এক জন সম্ভ্রান্ত মনুষ্যের হত্যার ব্যাপার কল্পিত হইয়াছিল, সেই মান্য পুরুষের নাম গঞ্জেগ, তাহার বনিতা ব্যাপ্তিস্তা নাম্নী। নটেরা এই নবীন নাট্যে সেই মর্য্যাদাবান্ পুরুষ লুসিয়ানস্ নামক এক জন আত্মীয় ব্যক্তির দ্বারা সম্পত্তি হরণ মানসে উদ্যান ভবনে বিষলতার রস যোগে যে প্রকারে নিহত হন্ এবং তদীয় মহিলা স্বল্প কাল মধ্যে স্বামি শোক বিস্মরণ পূর্ব্বক যদ্রূপে তাহার প্রণয়িনী হয় অবিকল ভাব ভঙ্গি প্রদর্শন পূর্ব্বক অভিনয় করিতে আরম্ভ করিল।
নৃপকুমার এই নাট্য যোগে আপনার সংশয় নিরাকরণ নিমিত্ত যে বাগুরা বিস্তার করিলেন রাজা ক্লাদিয়স্ তাহা জানিতে পারেন নাই, সুতরাং নূতন নাট্য দর্শন নিমিত্ত কৌতূহলাক্রান্ত হইয়া স্বীয় প্রেয়সী এবং সভাসদ্গণ সমভিব্যাহারে পরিষন্মধ্যে আসিয়া অধ্যাসীন হইলেন। নাট্য অবলোকনে পিতৃব্যের মুখে কি প্রকার ভাবের চিহ্ণ আবির্ভূত হয় তন্নিরীক্ষণ নিমিত্ত রাজতনয় তাঁহার অদূরে উপ বেশ করিলেন। অনন্তর নাট্য ক্রিয়ার আরম্ভ হইলে গঞ্জেগ ও তাহার বনিতা ব্যাপ্তিস্তায় কিয়ৎক্ষণ পরস্পর প্রণয়ালাপ হইতে লাগিল তাহাতে ব্যাপ্তিস্তা বল্লভের প্রতি সাতিশয় অনুরাগ প্রকাশ পূর্ব্বক দৃঢ় প্রণয়ের প্রমাণ নিমিত্ত প্রতিজ্ঞা করিল নাথ ঈশ্বর না করুন যদিস্যাৎ দুরদৃষ্ট বশতঃ অথবা কাল সহকারে কদাচিৎ তোমাবিহীন হইয়া বিধবা হই, তথাপি অন্য পুরুষকে আর পাণি দান করিব না। তোমার সাক্ষাৎ শপথ করিলাম যদি পুরুষান্তর গামিনী হই যেন পাপের নিষ্কৃতি না হয়। হে প্রিয়তম যে সকল দুঃশীলা মহিলা পতি ঘাতিনী, তাহাদেরই ঐ রূপ ব্যবহারে প্রবৃত্তি হয়। যুবরাজ হাম্লেত এই সময়ে পিতৃব্যের প্রতি নেত্রপাত করাতে নিরীক্ষণ করিলেন কনিষ্ঠ তাতের বদন বিবর্ণ এবং জননীর বৈরক্তি ভাবের আবির্ভাব হইতেছে। তদনন্তর নাট্য প্রতিপাদ্য উপন্যাসানুসারে যখন এক জন নট লুসিয়ানসের রূপ ধারণ পূর্ব্বক উদ্যান সদনে পর্য্যঙ্কোপরি সুখ সুপ্ত গঞ্জেগের শরীরে বিষলতার রস সংযোগ নিমিত্ত গমনের অভিনয় করিল তখন প্রাচীন রাজা হাম্লেতকে বিষ প্রয়োগ পুরঃসর বিনষ্ট করণের ব্যাপার ক্লাদিয়সের স্মৃতিপথারূঢ় হওয়াতে বিজাতীয় চাঞ্চল্য হইল অতএব নাট্যশালায় অধিক কাল অবস্থিতি করিতে অসমর্থ হইয়া ভৃত্যদিগকে শয়নাগারে আলোক দানের আজ্ঞা দিলেন এবং পীড়ার ছলে ঝটিতি নাট্যশালা হইতে বহির্গত হইয়া গেলেন। রাজা সভা হইতে উত্থান করিলে সুতরাং নাটক্রিয়া স্থগিত হইল। কুমার পিতৃব্যের এই ভাব অবলোকন করিয়া এক্ষণে ব্যপেতসন্দেহ হইলেন এবং বন্ধু হোরেসিওর নিকট কহিতে লাগিলেন দেবযোনির প্রমুখাৎ যাহা২ শুনিয়াছি সকলই সত্য, আমার ভ্রম বিলসিত নহে, অতএব কোন বিষয়ে সংশয় নিরাস হইলে অন্তঃকরণ মধ্যে যাদৃক্ সন্তোষ জন্মে, তাদৃশ সন্তোষান্বিত হইয়া ব্যক্ত করিলেন যাহা হউক ভূতের দর্শনে আমার যথেষ্ট লভ্য হইয়াছে। পরে বিবেচনা করিতে বসিলেন এখন পিতৃহন্তা পিতৃব্যের প্রতিফল প্রদান নিমিত্ত কি উপায় করি। যুব হাম্লেত একাকী এতদ্বিষয়ে তর্ক বিতর্ক করিতেছেন, ইত্যবসরে রাজমহিষী কথোপকথন করণার্থ আপনার নিভৃতালয়ে তাঁহাকে আহ্বান করিয়া পাঠাইলেন।
ক্লাদিয়স্ ঐ নাট্যে রাজকুমারের ষড়যন্ত্র জানিতে পারিয়া শঙ্কান্বিত হইয়াছিলেন একারণ রাণীকে সঙ্কেত করেন তনয়কে সন্নিধানে আহ্বান পূর্ব্বক সকোপ বাক্যে অনুযোগ করিয়া বিজ্ঞাপন কর তোমার আচরণে আমাদের ক্রমশঃ সাতিশয় অসন্তোষ জন্মিতেছে। রাজ্ঞী প্রিয়ের আজ্ঞা পালন নিমিত্ত কথোপকথন করিবার ছলে কুমারকে নিকটে ডাকেন। ক্লাদিয়স্ ঐ বিষয়ে তাঁহাদের মাতা পুত্রে কি প্রকার কথাবার্ত্তা হয় শ্রবণের নিমিত্ত যৎপরোনাস্তি উৎসুক হইলেন যদিও রাণীর প্রণয়ানুরাগ তৎকালাবধি দেদীপ্যমান দেখিয়া তাঁহার প্রমুখাৎ যুবরাজের সকল বাক্য শ্রবণের সম্পূর্ণ আশ্বাস করিতেন তথাপি সংশয়াকুলতা প্রযুক্ত বিতর্ক করিতে লাগিলেন অপত্যস্নেহ স্বভাবতঃ বলবান্, কি জানি রাণী যদি স্নেহপরবশ হইয়া তনয়ের প্রতি পক্ষপাতিতাচরণ পুরঃসর অবিকল সকল ব্যক্ত না করেন অতএব মাতাপুত্রের তাবৎ কথোপকথন গোপনে শ্রবণ পূর্ব্বক জ্ঞাপন নিমিত্ত রাজ্যের প্রাচীন মন্ত্রি পোলোনিয়স্কে রাজ জায়ার ভবনান্তর্ব্বর্ত্তি যবনিকার ব্যবধানে অবস্থিতি পূর্ব্বক শুনিতে পাঠাইয়া দিলেন। পোলোনিয়স্ মন্ত্রী ধূর্ত্ত শিরোমণি, এতাদৃশ ব্যাপারে ব্যাপৃত হইবার উপযুক্ত ছিল। সে ব্যক্তি ক্রমাগত রাজ্যসংক্রান্ত ব্যাপারের বিপর্যয় করিয়াও চাতুর্য্য প্রভাবে বিশিষ্ট নীতিজ্ঞ বলিয়া বিখ্যাত হয়। অতএব রাজার ইঙ্গিত মাত্রে রাজ্ঞীর আলয়ান্তর্ব্বর্ত্তি তিরস্করিণীর অন্তরালে গমন পুরঃসর দণ্ডায়মান হইয়া রহিল।
যুবরাজ গৃহাভ্যন্তরে আসিয়া উপস্থিত হইলে রাজমহিষী তাহার অসদাচরণ নিমিত্ত ভর্ৎসনা করিয়া কহিলেন হাম্লেত তুমি তোমার পিতার নিকট অতিশয় অপরাধী হইয়াছ। রাণী প্রিয় দেবর ক্লাদিয়সের পুনর্ভূ হইয়া তদবধি তাহাকে হাম্লেতের পিতা বলিয়া আহ্বান করিতেন। কিন্তু কুমার পিতৃহন্তা ব্যক্তিকে পিতা বলিয়া কদাপি গণ্য করেন নাই অতএব নৃপাঙ্গনাকে আপনার পক্ষ হইয়া তাহার প্রতি ঐ রূপ সম্মানান্বিত বচন প্রয়োগ করিতে দেখিয়া অন্তর্ব্যথিত এবং কোপে কম্পিত কলেবর হইয়া উত্তর করিলেন জননি আপনি আমার জনক সন্নিধানে বিস্তর ত্রুটি করিয়াছেন। রাজ্ঞী ঈষৎ কোপাবেশে বলিলেন এ কি উত্তর হইল? যুবরাজ কহিলেন প্রস্তাবের উপযুক্ত প্রতিবচন হইয়াছে। পরে নৃপরমণী রোষ প্রকাশ পুরঃসর জিজ্ঞাসিলেন যাহার সহিত কথা কহিতেছ ইহাকে কি ভুলিয়া গিয়াছ? নৃপনন্দন সাক্ষেপ বচনে উত্তর করিলেন আঃ বিস্মরণ হইলেই তো ভাল হইত, ভুলিয়াছি কোথায়? তুমি আমার মাতা, মৃত মহারাজের পট্ট মহিষী, এক্ষণে দেবরের পুনর্ভূ হইয়াছ, এ সকল বিষয় আমার মনোমধ্যে সতত প্রকাশ পাইয়া যৎপরোনাস্তি যাতনা দিতেছে। রাণী এই কথা আকর্ণন করিয়া কহিলেন কি আমাকে অবজ্ঞা করিলে? এই দণ্ডে গমন করিয়া তোমার অনুরূপ ব্যক্তি দিগকে এখানে পাঠাইয়া দিতেছি, তাহারাই তোমার সঙ্গে উচিত আলাপ করিবে। ইহা কহিয়া মন্ত্রি পোলোনিয়স্ অথবা রাজা ক্লাদিয়স্কে যুবরাজ সন্নিধানে প্রেষণ নিমিত্ত ক্রোধভরে বহির্গমনোদ্যত হইলেন। কুমার এক্ষণে জননীকে নির্জ্জনে পাইয়া ছিলেন অসদাচরণ নিমিত্ত পুনঃ২ অনুযোগ করিলে যদি মাতার মনোমধ্যে ঘৃণা এবং চৈতন্যের উদয় হয় এতদাশয়ে তাঁহাকে গৃহ হইতে নির্গমন করিতে দিলেন না, প্রস্থানের উপক্রম দেখিয়া বলে বাহু ধারণ পূর্ব্বক বসাইলেন। রাণী তনয়ের কাঠিন্যাচরণ দর্শনে ভীতা হইলেন এবং মনে করিতে লাগিলেন পুত্র একবার ক্ষিপ্ত হইয়াছিল, বুঝি পুনর্বার উন্মাদের উদয় হইল, পাছে আর কোন উৎপাত করে, অতএব সাতিশয় আর্ত্তস্বরে চীৎকার করিলেন। তাহাতে যবনিকার পশ্চাদ্ভাগ হইতে এই শব্দ হইতে লাগিল রাজ্ঞীকে রক্ষা কর, রাজ্ঞীকে রক্ষা কর। এই শব্দ কর্ণগোচর হইবা মাত্র রাজনন্দন মনে করিলেন ক্লাদিয়স্ তিরস্করিণীর অন্তরালে লুক্কায়িত হইয়া আছেন অতএব তৎক্ষণাৎ তূণ হইতে তীক্ষ্ণ বাণ নিষ্কাসন পূর্ব্বক শরাসনে সন্ধান করিয়া সেই শব্দের দিকে লক্ষ্য করত নিক্ষেপ করিলেন এবং তদনন্তর আর কোন শব্দ শ্রুতি গোচর না হওয়াতে অনুমান করিলেন দুরাত্মা ক্লাদিয়স্ বাণে বিদ্ধ হইয়া গত প্রাণ হইয়াছে। কিন্তু পরে যখন পর্দ্দার বাহিরে গমন পূর্ব্বক শব আকর্ষণ করত সম্মুখে আনিলেন তখন দেখিতে পাইলেন মৃতব্যক্তি ক্লাদিয়স্ নহে, পোলোনিয়স্ মন্ত্রী পরাধিকার চর্চ্চা করিয়া গোপনে যবনিকার ব্যবধানে ছিল, বাণে বিক্ষত হইয়া, পঞ্চত্ব পাইয়াছে। নৃপভামিনী সম্মুখে শব দর্শনে চমৎকৃতা হইয়া কহিলেন হা কপাল এ কি? হাম্লেত তুমি অপরিণাম দর্শী হইয়া বাণ মোচন করত একটা মহাপ্রাণি বিনষ্ট করিলে। যুবরাজ এক্ষণে রোষ পরবশতা প্রযুক্ত অক্ষান্তি দ্বারা আক্রান্ত হৃদয় হইয়াছিলেন অতএব স্পষ্ট বাক্যে কহিতে লাগিলেন মা আমি একটী মানবের প্রাণ হত্যা করিয়া কুকর্ম্ম করিলাম সত্য বটে, কিন্তু তুমি অবনীপতির জীবন বিনাশ পূর্ব্বক তদীয় বিশ্বাস ঘাতি সোদরকে বর মাল্য দিয়া যে জঘন্য কার্য্য করিয়াছ এ তত্তুল্য ঘৃণ্য নহে।
যদিও মহাগুরু পিতামাতার দোষের কথা সন্তানদিগের বাচ্য নহে তথাপি গুরুতর অপরাধে উগ্রতাবলম্বন পূর্ব্বক তাহাদের প্রতি কঠিন বচন প্রয়োগ অবিধেয় নয় কেননা তাহাতে কুৎসিত বর্ত্ম হইতে প্রত্যানয়নের সম্ভাবনা, সুতরাং তাহা জনক জননীর হিতার্থ ব্যতিরিক্ত অপবাদার্থ বলা যায় না। অতএব নৃপকুমার ধার্ম্মিক হইয়াও মাতার প্রতি ঐ রূপ কটূক্তি করিলেন এবং তাঁহার আচরণের জঘন্যতা দর্শাইয়া অনুযোগ পূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন তুমি আমার জনককে কি একেবারে বিস্মরণ করিয়াছ কেননা তাঁহার পরলোক প্রাপ্তির পর অত্যল্প কাল মধ্যে তদীয় প্রাণ হিংসকের লোকবিগীতা বনিতা হইলে? আমার জনকের সহিত প্রথম পরিণয় সময়ে কি২ প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলে স্মরণ কর দেখি। তোমার ইদানীন্তন ব্যবহার দেখিয়া অবলা কুলের সকল প্রতিজ্ঞাতেই সন্দেহ জন্মায় এবং তাবৎ ধর্ম্ম ভণ্ডতাচ্ছন্ন রূপে সপ্রমাণ হয়। অপর বিবাহের শপথ দ্যূতকারির দিব্যের তুল্য অস্থির এবং ধর্ম্ম কথা কেবল কথার কথা বোধ হয়। মা তুমি যে কর্ম্ম করিয়াছ তাহাতে স্বর্গ সলজ্জ এবং ধরণী ভারাক্রান্তা হইয়াছেন। আমার মহাত্মা পিতা এবং দুরাত্মা পিতৃব্যের এই দুই খানি প্রতিমূর্ত্তি সম্মুখে আছে, নয়ন উন্মীলন পূর্ব্বক অবলোকন করিয়া বিবেচনা কর দেখি, উভয়ের মধ্যে কত প্রভেদ। এই মূর্ত্তির ভ্রূলতা কেমন শোভান্বিতা, দেবতার ন্যায় কি সুন্দর মনোহর রূপ, আহা ইহার শিরস্য কেশ সরস্বতীর চিকুরের সদৃশ অতি রমণীয়। ললাট বৃহস্পতি তুল্য কেমন চিক্কণ, নয়নের তারা মঙ্গল গ্রহের ন্যায় কি সুন্দর উজ্জ্বল। আহা শৈলোপরি উত্থিত বুধ নামা নক্ষত্র যেমন স্বর্গাভিমুখে গমন করেন তাঁহার সমান এই আকৃতি যেন শোভন গমন করিতেছেন। মা তোমার প্রথম পরিণেতার এই প্রতিকৃতি, নিরীক্ষণ করিয়া স্মরণ কর। তদনন্তর ক্লাদিয়সের প্রতিমূর্তি প্রদর্শন করত কহিলেন এক্ষণে যাহার অঙ্কলক্ষ্মী হইয়াছ এই তাহার আকৃতি, অবলোকন কর, এ দুরাত্মা স্বভাবতঃ কুৎসিতাকার, তেজস্বি সহোদরের প্রাণ সংহার করিয়া কীদৃশ পরিম্লান ও নিষ্প্রভ হইয়াছে দেখিলে? রাজমহিষী সন্তানের অনুযোগ শ্রবণ এবং স্বামি দেবরের প্রতিকৃতি অবলোকন করিয়া গভীর ভাবে চিন্তা করত এক্ষণে বুঝিতে পারিলেন যৎপরোনাস্তি কুক্রিয়া করিয়াছি এবং আপনার গর্ব্ভজ পুত্র তদ্বিষয়ে চৈতন্যোদয় করিয়া দেওয়াতে লজ্জিত হইলেন। তদনন্তর কুমার জিজ্ঞাসা করিলেন মা যে দুরাত্মা তোমার পরিণেতার প্রাণ হত্যা পূর্ব্বক চোরের তুল্য চাতুর্য্য করিয়া রাজসিংহাসন হরণ করিয়াছে এখনও কি গৃহিণী হইয়া তাহার সহিত সহবাসের বাসনা করিবে? এই সময়ে যে দেবযোনি মৃত মহারাজ হাম্লেতের জীবদ্দশার আকৃতি ধারণ পূর্ব্বক পূর্ব্বে যুবরাজকে দর্শন দিয়াছিল সেই দেবযোনির ছায়া রাণীর ভবনাভ্যন্তরে প্রকাশমানা হইল। রাজনন্দন অবলোকন মাত্রে সাশঙ্ক হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন কি আদেশ হয়? ভূত কহিল আমার অসুবিনাশকের প্রতি হিংসা করিতে অঙ্গীকার করিয়া বিস্মৃত হইয়াছ এতাদৃক্ বোধ হওয়াতে স্মরণ করিয়া দিবার জন্য আগমন করিলাম। হে পুত্র তোমার জননীর সহিত কথোপকথন কর নচেৎ শোক ও সন্ত্রাসে ইহার প্রাণ নাশের সম্ভাবনা। সেই অপচ্ছায় রাণীর দৃষ্টিপথ পরিত্যাগ পূর্ব্বক তনয়ের নয়ন গোচরে দণ্ডায়মান হইয়াছিল সুতরাং কুমার চিহ্ণ অথবা বাক্য দ্বারা বর্ণনা করিয়া দেবযোনিকে জননীর পরিচিত করিতে পারিলেন না। রাজ্ঞী কুমারকে অদৃষ্ট ব্যক্তির সহিত কথোপকথন করিতে দেখিয়া সভয়ান্তঃকরণে বিবেচনা করিতে ছিলেন এখনও বুঝি পুত্রের উন্মাদ শান্তি হয় নাই। যুবরাজ জননীর অভিপ্রায় বুঝিয়া তাঁহাকে কহিলেন মা এমত বিবেচনা করিও না যে আমার এই সমস্ত বাক্য উন্মত্ত প্রলাপ, তোমার দুষ্ক্রিয়া জন্য জনক মহাশয়ের ছায়া অবনী মধ্যে প্রকাশমানা হইয়া এ সকল কথা কহিলেন, আমার হস্ত ধারণ পূর্ব্বক নাড়ী নিরীক্ষণ কর কোন ধাতুর বৈষম্য হয় নাই, আমি সজ্ঞানাবস্থায় আছি, ক্ষিপ্ত নহি। পরিশেষে বাষ্পাকুল লোচন হইয়া নিবেদন করিলেন মা আপনার অতীত কুক্রিয়া নিমিত্ত এক্ষণে জগদীশ্বর সন্নিধানে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং দুরাত্মা ক্লাদিয়স্কে পরিত্যাগ পূর্ব্বক অসৎ সংসর্গ হইতে নিবৃত্ত হও। তুমি আমার জনকের প্রতি সম্মান দর্শাইলে আমিও তোমাকে শ্রদ্ধেয় মাতা জানিয়া তোমার নিমিত্ত পরমেশ্বরের নিকট অনুগ্রহ প্রার্থনা করিব। রাজ্ঞী পুত্রের সদুপদেশে প্রবোধ প্রাপ্ত হইলেন এবং তাঁহার অভিপ্রায়ানুসারে ব্যবহার করিতে অঙ্গীকার করিলেন অতএব মাতাপুত্রের কথোপকথন সমাপ্ত হইল।
অনন্তর রাজনন্দন হাম্লেত অবকাশ লাভে বিবেচনা করিতে লাগিলেন অপরিণাম দর্শী হইয়া তখন্ কাহার প্রাণ হত্যা করিলাম। তাহাতে স্মরণ হইল যে ওফিলিয়া তাঁহার প্রেমভাজন, নিহত ব্যক্তি তাহার পিতা পোলোনিয়স্। অতএব অনুতাপ করিতে২ সেই শবটী এক দিকে স্থাপন পূর্ব্বক আপনার কার্য্যের উপলক্ষে বিলাপ ও রোদন আরম্ভ করিলেন।
এদিকে ক্লাদিয়স্ রাজকুমার দ্বারা অনিষ্ট সম্ভাবনা দেখিয়া তাহার প্রাণ বিনাশের উপায় চিন্তা করিতেছিলেন কিন্তু প্রজাজন সকলেই যুবরাজকে ভাল বাসে এবং সন্তান শত২ অপরাধ করিলেও তাহার প্রতি মাতার স্নেহ নিবৃত্ত হয় না। সুতরাং রাণীও আপন নন্দনের জীবন সংহার করিতে দিবেন না এই সমস্ত বিবেচনা করাতে শমন ভবন প্রেষণের কোন পন্থা দেখিতে পাইলেন না। এতদবসরে কুমারের বাণে মন্ত্রির মৃত্যু সংবাদ প্রাপ্ত হওয়াতে মনে করিলেন এই অপদেশে রাজত্বের কণ্টকোদ্ধার করিতে পারিব। অন্যায় হত্যার অপরাধে হাম্লেতকে এতদ্রাজ্য হইতে বহিষ্করণ পুর্ব্বক নির্ব্বাসিত করি। অনন্তর মন্ত্রিবর্গ দ্বারা কুমারকে আজ্ঞা করিলেন পোলোনিয়সের হত্যাবিষয়ক অভিযোগ রাজসভায় উপস্থিত হইলে বিচারে তোমার উপর বিপদ্ ঘটিবার সম্ভাবনা, অতএব দুই জন সভাসদ্ সমভিব্যাহারে অবিলম্বে ইংলণ্ডে প্রস্থান কর। তৎকালে ইংলণ্ডীয় রাজা দেন্মার্কাধিপের করপ্রদ থাকাতে নবীন রাজা ধূর্ত্ততা পূর্ব্বক স্বীয় অভিলাষ পূর্ণ করিতে মানস করিলেন, অতএব তদ্দেশীয় বিচারালয়ে সমর্পণ নিমিত্ত গোপনে সেই দুই সভাসদের হস্তে এক খানি বিজ্ঞাপনী লিপি দিলেন তাহার মর্ম্ম এই, হাম্লেত রাজ্য মধ্যে ভয়ানক কুক্রিয়া করাতে ইহাকে ইংলণ্ডে প্রেরণ করিলাম সেখানে উপস্থিত হইলে প্রাণদণ্ড করিবে। যুবরাজ দুরাত্ম পিতৃব্যের প্রকৃত অভিপ্রায় অবগত হইতে পারেন নাই অতএব অকারণে মানব বিনাশের অভিযোগে দোষী হইবার ভয়ে ত্বরায় দুই জন পারিষদ সমভিব্যাহারে বৃহৎ পোতারোহণ পূর্ব্বক ইংলণ্ড যাত্রা করিলেন। কিন্তু পিতৃব্যের চরিত্র স্মৃতিপথে নিরন্তর জাগরূক থাকাতে হঠাৎ সন্দিগ্ধ মনা হইয়া পথিমধ্যে এক দিন বিতর্ক করিতে লাগিলেন দুরাত্মা কি প্রতারণা পূর্ব্বক আমাকে দেশ হইতে নিষ্কাসিত করিল? পরে রজনী উপস্থিত হইলে গোপনে সমভিব্যাহারি সভাসদ্দিগের বস্ত্র হইতে লিপি খানি উন্মোচন করিয়া লইলেন এবং বিকসিত করণানন্তর বাচনাবসানে জানিতে পারিলেন যে বিষয়ের সন্দেহ করিতে ছিলেন দুরাত্মা তাহারই অনুষ্ঠান করিয়াছে। কিন্তু ধূর্ত্তের উপরি ধূর্ত্ততা প্রকাশ করিতে স্থির করিয়া সেই লিপি মধ্যস্থ আপন নাম মোচন পূর্ব্বক সেই স্থলে ক্লাদিয়সের প্রিয় পাত্র সঙ্গি দুই জনের নাম লিখিয়া দিলেন এবং পুনর্ব্বার মুদ্রিত করণ পুরঃসর যথা স্থানে বান্ধিয়া রাখিলেন। কিয়দ্দিন পরে সমুদ্র পথে যাইতে২ তাঁহাদের অর্ণব তরি নাবিক তস্করদিগের হস্তে পতিত হইল। তাহাতে সাগরোপরি দস্যুগণের সঙ্গে সংগ্রাম উপস্থিত হওয়াতে যুবরাজ বীরত্ব প্রকাশ পুরঃসর করে করবাল ধারণ করিলেন এবং বৈরিদিগের রণতরি আক্রমণ করিয়া সাহস প্রদর্শন পূর্ব্বক একাকী তন্মধ্যে প্রবিষ্ট হইলেন। তাঁহার সমভিব্যাহারিরা ভীরুতা প্রযুক্ত ঐ অবসরে আপনাদের পোত লইয়া পলায়ন করিল সুতরাং রাজতনয় তস্কর দিগের তরিতে যাহা ঘটিবে একাকী তাহা ভোগ করিবার নিমিত্ত উপস্থিত রহিলেন। কিন্তু সেই অনুচরদের সঙ্গে ক্লাদিয়সের ঐ লিপি খানি গেল যাহাতে যুবরাজ আপনার নাম মোচন পূর্ব্বক তাহাদের সংজ্ঞা অঙ্কিত করিয়া দিয়াছিলেন।
রাজনন্দন একাকী নাবিক দস্যু দিগের হস্তে পড়িলে তাহারা বিদ্রোহাচরণে ক্ষান্ত হইয়া সদ্ব্যবহার করিল এবং অসহায় নৃপতনয় দেন্মার্কাধিপতির সকাশে থাকিলে অবশ্য কোন প্রকার আশ্রয় প্রাপ্ত হইবেন এতদ্বিবেচনায় দয়ার্দ্র হইয়া দেন্মার্কের দিকে যাত্রা করত তদ্দেশের এক ঘাটে তাঁহাকে নামাইয়া দিয়া আপনারা স্বস্থানে প্রস্থান করিল। যুবরাজ পুনর্ব্বার পিতৃরাজ্যে উপস্থিত হওয়াতে সাতিশয় আহ্লাদিত হইলেন এবং তরি হইতে অবতরণের পরেই যে রূপ বিস্ময়াবহ ঘটনা ক্রমে স্বদেশ পুনঃপ্রাপ্ত হইলেন তত্তাবতের বিবরণ তথা আগামি দিবসে রাজসভায় উপস্থিত হইবার অভিপ্রায় লিপি যোগে ক্লাদিয়সের সুগোচর করিলেন।
অনন্তর রাজবেশ্ম প্রবেশের বর্ত্ম অবলম্বন পূর্ব্বক পদব্রজে আগমন করিতে লাগিলেন। কিয়ৎ পথ আসিলে পর এক স্থানে একটা শোকাবহ ব্যাপার দেখিতে পাইলেন, এ ব্যাপার ওফিলিয়ার অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া। সেই মহিলা আপনার পিতা পোলোনিয়সের মৃত্যুতে খেদান্বিতা হইয়া নিরন্তর পরিতাপ করিতেন হায় যে ব্যক্তির প্রতি আমার সাতিশয় অনুরাগ ছিল তাঁহারই হস্তে আমার জনক প্রাণে বিনষ্ট হইলেন। এই পরিতাপ ভাবনা সহকারে উত্তরোত্তর বৃদ্ধিশীল হওয়াতে যুবতীর জ্ঞান বিগম এবং ক্রমে পূর্ণ উন্মাদ উপস্থিত হয়। রমণী পিতৃশোকে উন্মত্ত হইয়া কখন২ রাজসদনের অঙ্গনে পর্য্যটন পূর্ব্বক পুরস্থ মহিলা গণকে এক২টী কুসুম প্রদান পূর্ব্বক কহিতেন আমার জনকের স্বর্গার্থ তোমাদিগকে এই উপহার দিলাম। বায়ুর বিচিত্র প্রভাবে কখন বা প্রেম কখন বা করুণ রস পূর্ণ সুললিত গীত বিরচিত করিয়া উচ্চ স্বরে গান করিতেন। সেই সংগীত মধ্যে কোন২ পদ নিরর্থক প্রযুক্ত হওয়াতে শ্রোতৃমণ্ডলী অনুমান করিত ওফিলিয়া পূর্ব্ব ঘটনা সকল বিস্মরণ হইয়াছে। যুবতীর আবাস ভূমির অনতিদূরে কতক গুলা বেতস লতা ছিল তাহার অনেক শাখা লম্বমান হইয়া নিকটস্থ নদী স্রোতে পড়িয়া ছিল তাহাতে স্রোতস্বীর সলিল পত্রের প্রতিবিম্বে সুশোভিত হইত। এক দিন রমণী রক্ষক বিহীন হইয়া থাকাতে বন্য কুসুমের হার গ্রন্থন করিতে২ কাল প্রেরিতের ন্যায় অকস্মাৎ ঐ বেতসের মূলে গিয়া উপস্থিত হইলেন এবং উন্মত্ততা প্রযুক্ত এক ছড়া পুষ্পের মালা সেই লতার উপরি অর্পণ পূর্ব্বক দোলায়মান করিতে মানস করিলেন। কিন্তু ঊর্দ্ধবাহু হইয়া উল্লম্ফন করত যেমন শাখা ধারণ করিলেন তৎক্ষণাৎ বিটপ ভগ্ন হওয়াতে আপনার পরিধেয় মধ্যে স্থিত দ্রব্য সামগ্রী সহিত স্রোতোজলে পতিতা হইলেন। স্রোতে পড়িয়াও শুষ্ক ও লঘু বসনাদি নিমিত্ত কিয়ৎ ক্ষণ জলের উপরি ভাসিতে লাগিলেন কিন্তু অপ্রকৃতিস্থতা প্রযুক্ত বিপদ্ অনুধাবনে অক্ষম হইয়া প্রাণ রক্ষার্থ কিঞ্চিন্মাত্র যত্ন করিলেন না বরং সেই অবস্থাতেও সংগীতে রতা রহিলেন সুতরাং কিয়ৎ ক্ষণানন্তর বসনাদি জল প্রবেশে আর্দ্র হওয়াতে ভারাক্রমণে নিমগ্না ও তরঙ্গিণীর পঙ্কিল তলে বিলীনা হইলেন। কিয়দ্দিন পরে সেই সুন্দরীর শব জলের উপর ভাসিয়া উঠাতে তাহার সহোদর লেয়ার্তিস্ শ্মশানে লইয়া অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া করিল এবং তদুপলক্ষে ক্লাদিয়স রাজা তদীয় প্রেয়সী ও সভাসদ্গণ তথায় দণ্ডায়মান ছিলেন। রাজকুমার এ সমস্ত ব্যাপার কিঞ্চিন্মাত্র অবগত ছিলেন না। অতএব বৃত্তান্ত জিজ্ঞাসায় অধীর হইতে লাগিলেন কিন্তু আপনার জিজ্ঞাসা নিবৃত্তি করিতে গেলে পাছে শব সৎকার ব্যাপারে কোন ব্যাঘাত জন্মে এই আশঙ্কা মনোমধ্যে উদিত হওয়াতে কাহাকেও কোন প্রশ্ন করিলেন না, একান্তে দাঁড়া ইয়া রহিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে নিরীক্ষণ করিলেন অপরিণীত স্ত্রীলোকের অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়ার নিয়মানুসারে রাজমহিষী শ্মশানের চতুষ্পার্শ্বে পরিক্রমণ পূর্ব্বক পুষ্প বিকিরণ করিতে২ কহিতেছেন বৎসে মনে করিয়াছিলাম তুমি আমার তনয়ের গৃহিণী হইবে বিবাহের কুসুম তোমার শয্যায় অর্পণ করিব, হায় তোমার শ্মশানে পুষ্প প্রক্ষেপ করিতে হইল। অপর দেখিলেন কুমারীর সহোদর ভগিনীর সমাধি স্থল হইতে কুসুমোদ্গমের প্রার্থনা করিয়া শোকাবেগ বশতঃ লম্ফ প্রদান পূর্ব্বক শ্মশান মধ্যে পড়িয়া ভৃত্যদিগকে আদেশ করিতেছে আমার উপর মৃত্তিকা রাশি নিক্ষেপ কর আমিও অনুজার সঙ্গে মানব লীলা সম্বরণ করি। মৃত কুমারীর প্রতি তদীয় সোদর লেয়ার্তিসের ঈদৃশ স্নেহ প্রবৃত্তি সন্দর্শনে রাজনন্দনের প্রেমানল উদ্দীপ্ত হইয়া উঠিল যে প্রেয়সীকে অধিক ভাল বাসিতেন তাহারই অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া হইতেছে অবগত হইয়া কহিতে লাগিলেন কি যুবতীর অকাল মৃত্যুতে আমা অপেক্ষা ভ্রাতার শোক অধিক হইল আমি যে ইহাকে চত্বারিংশৎ সহস্র সোদর অপেক্ষা অধিক ভাল বাসিতাম। পরে লেয়ার্তিসের শোক প্রকাশ দর্শনে অশক্ত হইয়া তদপেক্ষা আপন শোকের গুরুত্ব প্রদর্শন মানসে যেখানে লেয়ার্তিস্ পড়িয়াছিল সেই স্থানে লক্ষ্য প্রদান পূর্ব্বক হঠাৎ পতিত হইলেন। মন্ত্রি নন্দন তাঁহাকে পিতৃহন্তা ও সহোদরার জীবনান্তক বলিয়া জানিত অতএব বৈরশুদ্ধি করণ দ্বারা শোকাবেগ নিবারণ মানসে তাঁহাকে ধারণ পূর্ব্বক ঘোরতর আঘাত করিতে লাগিল যাবৎ ভৃত্যবর্গ দুই জনকে পৃথক্ করিয়া না দিল তাবৎ তাঁহাকে ত্যাগ করিল না। অনন্তর শব সৎক্রিয়া সমাপন হইলে যুবরাজ সৌজন্য প্রকাশ পূর্ব্বক লেয়ার্তিসের নিকট ত্রুটি স্বীকার করিয়া বলিলেন ওফিলিয়ার অকাল মরণে সর্ব্বাপেক্ষা আমার অধিক বিষাদ হইয়াছে রোষ বশম্বদ হইয়া আমি ক্রূরাচরণ করিয়াছিলাম ইহাতে তাহাদের দুই জনের পুনর্ব্বার সম্প্রীতি হইবার উপক্রম হইল।