মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Muktaram Vidyabagish (†1860) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন
প্রস্পারো কোপাবেশে বলিলেন মিরান্দা বৃথা বাক্য ব্যয় করিও না, পুনর্ব্বার এপ্রকার কথা কহিলে যথোচিত ভর্ৎসনা করিব। কি আশ্চর্য তুমি প্রতারকের পক্ষপাতিনী হইতেছ? তুমি ইহাকে এবং এতদ্ব্যতিরিক্ত কেলিবান্কে অবলোকন করিয়া মনে করিতেছ এতাদৃশ সুরূপ পুরুষ আর নাই। কিন্তু অয়ে অবোধ বালিকে কেলিবান্ অপেক্ষা যদ্রূপ এই পুরুষকে রূপবান দেখিতেছ ইহা হইতেও তদ্রূপ ভূরি২ সুন্দর পুরুষ আছে। তিনি কেবল কন্যার প্রণয়ের তথ্য পরীক্ষা নিমিত্ত এবম্প্রকার উক্তি করিলেন। কিন্তু তাঁহার দহিতা ইহাতে এই উত্তর দিলেন তাত আমার স্নেহ অতি নীচগামী, কেননা ইহা অপেক্ষা সুশ্রী পুরুষের মুখ সন্দর্শনে বাঞ্ছামাত্র হইতেছে না।
প্রস্পারো কন্যার বাক্যে মনোযোগ না করিয়া রাজতনয়কে কহিলেন আমার সমভিব্যাহারে আগমন কর, তুমি কি আমার আজ্ঞা লঙ্ঘন করিতে সক্ষম হইবে?
ফার্ডিনেণ্ড উত্তর করিলেন যথার্থ বটে সংপ্রতি অক্ষম হইলাম। কিন্তু মন্ত্র প্রভাবে যে স্বাভাবিক বল বীর্য্য বিহীন ও বিরুদ্ধাচরণে বাধিত হইলেন তাহা অনুভব করিতে পারিলেন না সুতরাং বিস্ময়ান্বিত হইয়া প্রস্পারোর পশ্চাৎ২ গমন করিলেন। এবং গহ্বরে প্রবেশ পর্য্যন্ত মিরান্দা যাবৎ তাহার দৃষ্টিপথে রহিলেন তাবৎ গ্রীবা বক্র করিয়া তদীয় রূপ লাবণ্য অবলোকন পুরঃসর চিত্ত চকোর চরিতার্থ করত অন্তঃকরণ মধ্যে এই আন্দোলন করিতে লাগিলেন স্বপ্ন দশায় যাদৃশ দেহের তেজোভাগ স্তম্ভিত থাকে আমার শরীর তদ্রূপ স্তব্ধতেজঃ হইয়াছে, যাহা হউক, এই মনুষ্যের তর্জ্জন গর্জ্জন ও ভয় প্রদর্শনে অথবা মদীয় দৈহিক দৌর্বল্যে এই অসুলভ রূপ নিধান ললনা নিধান দর্শনে বঞ্চিত হইলাম, কারাগারে প্রবেশ করিয়া দিনান্তে যদি একবারো এই মনোহারিণী রমণীর রূপ দেখিতে পাই তাহা হইলেও জীবন রক্ষা হইতে পারে।
প্রস্পারো অত্যল্প কাল রাজ কুমারকে গহ্বর মধ্যে রাখিয়া তথা হইতে বহিষ্কৃত করত কতিপয় সুকঠিন কর্ম্ম নির্ব্বাহের আদেশ করিলেন এবং আপন তনয়াকে জ্ঞাপন করিলেন সেই যুবার প্রতি শ্রম সাধ্য কিয়ৎ কার্য্যের ভারার্পণ করিলাম। পরে যুবক যুবতী এতদ্বিষয়ে পরস্পর কি রূপ ব্যবহার করে তদববোধার্থ ছল করিয়া কন্যাকে কহিলেন আমি এক্ষণে পুস্তকালয়ে চলিলাম। কিন্তু তিনি অলক্ষ্য রূপ ধারণ করিয়া তাহাদের অদূরেই দণ্ডায়মান রহিলেন।
প্রস্পারো রাজকুমারের প্রতি ভূরি২ বৃহৎ কাষ্ঠ সংগ্রহ করিতে অনুমতি করিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি সুকুমার প্রযুক্ত মহায়াস সাধ্য সেই কার্য্য সমাধায় সাতিশয় শ্রান্ত হইলেন। মিরান্দা পরিশ্রমে তাহার কমল লপন ম্লান দেখিয়া পরিতাপ প্রকাশ পূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন প্রিয় কিয়ৎকাল আয়াস করণে ক্ষান্ত হও আমার পিতা পুস্তকালয়ে গ্রন্থ পাঠ করিতে গিয়াছেন তিন ঘটিকা মধ্যে প্রত্যাগমন করিবেন না, নাথ তাবৎ পর্য্যন্ত বিশ্রাম কর।
ফার্ডিনেণ্ড কহিলেন, প্রিয়ে বসিয়া থাকিতে আমার সাহস হয় না। কর্ম্ম সম্পন্ন না করিয়া বিশ্রাম করিতে পারিব না।
মিরান্দা তাঁহার আয়াস দর্শনে অসহিষ্ণু হইয়া কহিলেন প্রিয়তম তুমি আসন পরিগ্রহ পুরঃসর একবার শ্রান্তি দূর কর আমি তোমার পরিবর্তে ইন্ধন বহন করিতেছি, কিন্তু রাজকুমার সম্মত হইলেন না অতএব মিরান্দা তদীয় কার্যে আনুকূল্য না করিয়া বরং প্রতিবন্ধকতা করিতে লাগিলেন এবং পরস্পর বহুক্ষণ কথোপকথন করাতে কাষ্ঠ বহনে শৈথিল্য হইল।
প্রস্পারো কেবল তনয়ার প্রতি নৃপতনয়ের প্রণয়ানুবন্ধ পরীক্ষা নিমিত্ত তাহাকে তাদৃক উৎকট কর্ম্ম নির্ব্বাহ করিতে আদেশ করিয়াছিলেন, অতএব তিনি পুস্তকাগারে প্রবেশাপদেশে অদৃশ্য হইলে রাজনন্দন ও আপন নন্দিনী বিশ্রব্ধ চিত্তে পরস্পর যে সমস্ত কথোপকথন করিতে লাগিলেন অলক্ষ্য শরীর হইয়া তৎ সমুদায় স্বকর্ণে আকর্ণন করিলেন।
রাজকুমার স্বীয় প্রণয়াস্পদ সেই নবযৌবনাকে জিজ্ঞাসা করিলেন সুন্দরি তোমার কি নাম? যদিও মিরান্দা জনক কর্তৃক পরিচয় প্রদানে নিষিদ্ধ হইয়াছিলেন তথাপি পিত্রাজ্ঞা উল্লঙ্ঘন পূরঃসর অবাধে প্রিয়তমের প্রশ্নে উত্তর দান করত আপনার আখ্যা ব্যক্ত করিলেন।
প্রস্পারো দুহিতার এই অবাধ্যতার লক্ষণ দর্শনে ঈষদ্ধাস্য করিলেন, কেননা তিনি স্বয়ং মন্ত্র প্রভাবে তাঁহাকে রাজকুমারের প্রতি প্রেমাসক্তা করিয়াছিলেন অতএব নন্দিনী মদন বাণে বিদ্ধ হৃদয় হইয়া ব্যাকুলতা বশতঃ আদেশাতিক্রম করিলে ক্রোধান্বিত হইলেন না। অনন্তর রাজকুমার সুমধুর বচনে বক্তৃতা করিয়া আপনার মনের ভাব প্রকাশ পরঃসর কহিতে লাগিলেন হে মনোভাবিনি আমি তোমার ভাবের নিতান্ত বশম্বদ হইয়াছি। প্রস্পারো অন্তরালে থাকিয়া এতদ্বচন শ্রবণ করত হর্ষে রোমাঞ্চিত হইলেন।
পরে রাজনন্দন মিরান্দাকে কহিলেন হে বরবর্ণিনি অবনি মণ্ডলে তোমার অপরূপ রূপ লাবণ্যের উপমা নাই, তুমি রমণী শ্রেষ্ঠ। ইহাতে মিরান্দা উত্তর দিলেন অয়ি প্রাণপ্রিয় অপর রামার বদনশশধর কীদৃশ আমার স্মরণ হয় না, আমি পুরুষের মধ্যে কেবল জনকের ও তোমার আননাবলোকন করিয়াছি ফলতঃ নরাকৃতি কি প্রকার তাহা আমার বিদিত নাই। একারণ তোমা ব্যতীত ত্রিভুবন মধ্যে অন্য কোন ব্যক্তির সহবাস করিতে আমার প্রবৃত্তি হয় না। সুতরাং এক্ষণে আপনার মনোমধ্যে তোমা ভিন্ন অন্য কোন ব্যক্তির আকৃতি মনোরঞ্জক বলিয়া কল্পনা করিতে পারি না। আপনি আমার এই নিবেদন যথার্থ জানিবেন। পরন্তু হে প্রিয়তম শঙ্কায় আমার হৃদয় কম্পিত হইতে লাগিল আমি স্বেচ্ছাক্রমে তোমার সহিত এই কথোপকথন করিয়া পিতার আজ্ঞা উল্লঙ্ঘন করিলাম।
প্রস্পারো নন্দিনীর এতদ্বচন শ্রবণে সানন্দ হইয়া সহস্য বদনে শিরোবনমন পুরঃসর মনে২ কহিতে লাগিলেন বৎসে মদীয় অভিমতানুযায়ি কার্য্যই হইতেছে তুমি নেপল্স রাজের পট্টমহিষী হও ইহাই আমার বাসনা।
তদনন্তর রাজ তনয় রসিক নায়ক ন্যায় সভঙ্গি সম্ভাষণ পুরঃসর সুমধুর বচনে নয়নানন্দ দায়িনী মিরান্দাকে বলিলেন হে সুন্দরি আমি নেপল্স রাজাধিপতির উত্তরাধিকারী, তুমি মদীয় রমণী হইলে পরে রাজমহিষী হইবে।
মিরান্দা বলিলেন আমার যাহাতে পরিতোষ জন্মিবে তাহা প্রাপ্ত হইলে যদি রোদন করি তবে আমা অপেক্ষা নির্বোধ কেহ নাই। হে প্রাণাধিক প্রিয়তম, আমি ধর্ম্ম প্রমাণ মুক্ত কণ্ঠে ব্যক্ত করিতেছি তুমি আমার কর গ্রহণ করিলে কৃতার্থম্মন্যা এবং চির ক্রীতা হইয়া থাকিব।
রাজকুমার প্রিয়তমার এতদ্বচন আকর্ণন করিয়া হর্ষোৎফুল্ল মনে তাঁহাকে নমস্কার করিবার উদ্যম করিতেছেন ইত্যবসরে প্রস্পারো আত্ম প্রকাশ পুরঃসর তাঁহাদের সম্মুখীন হইয়া তাহাতে ভঙ্গ দিলেন। এক্ষণে প্রস্পারো তনয়ার ভয় ভঞ্জন পূর্ব্বক তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিতে লাগিলেন হে প্রিয় কুমারি শঙ্কা পরিহার কর, তোমাদের সমস্ত কথোপকথন আমার কর্ণগোচর হইয়াছে এবং তাহাতে আমি সর্ব্বতোভাবে সম্মত আছি। হে নৃপনন্দন তোমার প্রতি যে নিষ্ঠুর ব্যবহার করিয়াছি। এক্ষণে তাহার পরিশোধ নিমিত্ত এই কন্যারত্ন পুরস্কার স্বরূপে প্রদান করিব। কেবল প্রণয় পরীক্ষা নিমিত্ত ঐ সকল উৎপাত কৃত হইয়াছিল, কিন্তু তুমি মহাত্মার তুল্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছ, অতএব অকৃত্রিম প্রণয় সূত্রে আবদ্ধ। অশেষ গুণ শালিনী সর্ব্বাঙ্গ সুন্দরী মদীয় তনয়ার পাণি গ্রহণ পুরঃসর তাঁহাকে গ্রহণ কর। হে প্রিয় পুত্র আমার এই শ্লাঘাবাক্য শ্রবণে হাস্য করিও না। তদনন্তর কার্য্যান্তর ব্যপদেশে সে স্থান হইতে প্রস্থান করত তাঁহাদিগকে অনুমতি করিলেন যদবধি প্রত্যাগমন না করি তাবৎ পর্যন্ত তোমরা পরস্পর কথোপকথন কর। মিরান্দা পূর্ব্বে পিত্রাজ্ঞা যে প্রকার অবহেলা করিয়াছিলেন এতদাদেশ তদ্রূপে উল্লঙ্ঘন করিবার সম্ভাবনা ছিল না।
প্রস্পারো তাঁহাদের নিকট হইতে গমন করিয়া আপনার অনুজ ও নেপল্সাধিপতির বিবরণ জিজ্ঞাসায় এরিএল্ ভূতকে আহ্বান করিলেন। সে স্মরণমাত্রে উপস্থিত হইয়া সম্মুখবর্ত্তী হইলে আজ্ঞা করিলেন ওহে এরিএল্ তুমি আমার অনুজ ও নেপল্সাধিপতিকে কি কহিয়াছিলা অনুপূর্ব্বিক বর্ণন কর। এরিএল্ নিবেদন করিল আমি তাঁহাদিগকে বিবিধ অদ্ভুত দর্শন ও শ্রবণ করাইলে তাঁহারা ভয়ে বিহ্বল হন। পরে অশন বিনা শীর্ণ তনু হইয়া ইতস্ততে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন এবং আমি তাঁহাদের সম্মুখে সুস্বাদু খাদ্য ও সুরস পানীয় সহসা উপস্থিত করিয়া দিলে অভ্যবহারের উপক্রম করিলেন কিন্তু অব্যবহিত পরক্ষণে অমি প্রকাণ্ড পক্ষবান বুভুক্ষু রাক্ষসের আকার ধারণ পূর্ব্বক তাঁহাদের অগ্রে গিয়া উপস্থিত হইলাম তাহাতে সমুদায় অদনীয় ও পানীয় অদৃশ্য হইল। অনন্তর আমি তাঁহাদিগকে কহিলাম তোমাদিগের কর্ত্তৃক প্রস্পারো কন্যা সহ রাজ্য হইতে দূরীকৃত হইয়াছেন, তোমরা ঐ হত ভাগ্য ব্যক্তির ক্রোড়ে অতি শিশু দুগ্ধপোষ্যা দুহিতা প্রদান করত তাঁহাকে জলসাৎ করণাশয়ে সাগর সলিলে ভাসাইয়া দিয়াছ তন্নিমিত্ত এক্ষণে ঈদৃশী বিভীষিকা ও যন্ত্রণা দর্শন হইতেছে।
হে প্রভো, অনন্তর নেপল্সাধিপতি এবং ভবদনুজ আপনার প্রতি নৃশংস ব্যবহার ও অধর্ম্মাচরণ নিমিত্ত স্ব২ মনঃ পীড়া প্রকাশ পুরঃসর বিস্তর বিলাপ করিতে লাগিলেন। তখন আমি মনে২ কহিলাম ইঁহাদের এখন এ পরিতাপ বোধ হয় কাল্পনিক নহে কেননা এক্ষণে ঈদৃশী দুর্গতি প্রাপ্ত হইয়াছেন যে তদ্দর্শনে ভূতযোনি প্রাপ্ত আমারও বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ ও চিত্ত দয়ার্দ্র হইতেছে।
প্রস্পারো এরিএলের প্রমুখাৎ এতাবদ্বিবরণ অবগত হইয়া তাহাকে সকাতরে কহিলেন তবে তাহাদিগকে এখানে আনয়ন কর। তুমি ভূতযোনি হইয়া যদিস্যাৎ তাহাদের দুঃখ দর্শনে দুঃখিত হইয়া থাক তবে আমি তাহাদের সজাতি অর্থাৎ নরলোক, আমার হাতে কীদৃশ পরিতাপ জন্মিতে পারে বিবেচনা কর। অতএব হে সুশীল শীঘ্র প্রস্থান কর।
এরিএল্ প্রস্পারোর নির্দ্দেশক্রমে তদীয়ানুজ এন্তোনিও ও তাহার বৃদ্ধ অমাত্য গঞ্জেলো এবং নেপল্সাধিপতির অবস্থিতি স্থলে গমন পূর্ব্বক তাঁহাদের পুরোবর্ত্তী হইল এবং তাঁহাদিগকে আনয়ন নিমিত্ত বায়ুর উপর অলক্ষ্যে কলরব করিতে লাগিল। তাহাতে তাঁহার বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া সেই শব্দানুসারে পদ সঞ্চার করাতে ক্রমে প্রস্পারোর সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। নির্দয় এন্তোনিও অগ্রজকে জলসাৎ করিবার মানসে ক্ষুদ্র তরণী যোগে যৎকালে বারিনিধির প্রবাহে ভাসাইয়া দেয় তদানীং যিনি করুণান্বিত হইয়া গোপনে পোত মধ্যে খাদ্য সামগ্রী ও পুস্তকাদি সমর্পণ করিয়া যান্ এই গঞ্জেলো সেই মহাত্মা।
উল্লেখিত ব্যক্তি ত্রয় শোক ও ভয়ে এবম্বিধ বিহ্বল ও বাহ্য জ্ঞান বিহীন হইয়াছিলেন যে তাঁহারা প্রস্পারোর সমক্ষে উপনীত হইয়া প্রথমতঃ তাঁহাকে অপরিচিত জ্ঞান করিতে লাগিলেন। পরে প্রস্পারো বৃদ্ধামাত্য গঞ্জেলোকে জীবন রক্ষক বলিয়া সম্বোধন পূর্ব্বক নিজ পরিচয় দিলে তাঁহার সহোদর ও নেপল্সাধিপতির চৈতন্যোদয় হইল তখন তাঁহারা চিনিতে পারিলেন যাঁহার প্রতি অত্যাচার করিয়াছিলেন ঐ ব্যক্তি সেই প্রস্পারো।
তদনন্তর এন্তোনিও আত্মাপরাধ নিমিত্ত অশ্রুপূর্ণ লোচনে অনুতাপ করিতে২ অগ্রজের চরণ তলে নিপতিত হইয়া ক্ষমা প্রার্থনা করিতে লাগিলেন। এবং নেপল্সাধিপতি প্রস্পারোকে রাজ্যচ্যুত করিবার নিমিত্ত তদনুজের সাহায্য করিয়াছিলেন তদর্থ আপনার দোষ স্বীকার করিলেন। তাহাতে প্রস্পারো উভয়ের প্রতি অকপট সদ্ভাব প্রদর্শন পূর্ব্বক তাঁহাদের অপরাধ মার্জ্জনা করিলেন। পরে তাঁহারা তদীয় সাম্রাজ্য প্রত্যর্পণ করণের অঙ্গীকার করিলে তিনি নেপল্সাধিপের প্রতি দৃষ্টি করিয়া কহিলেন আমিও আপনাকে এক মহামূল্য রত্ন প্রতিদান করিব। এতদুক্তি করত নিকটস্থ এক দ্বার মুক্ত করিয়া তাঁহাকে দেখাইলেন তাঁহার নন্দন ফার্ডিনেণ্ড মিরান্দার সহিত একত্র বসিয়া শতরঞ্চ ক্রীড়া করিতেছেন।
নেপল্সাধিপতির পরম প্রেমাস্পদ প্রিয়তম তনয়ের সহিত এবম্প্রকারে মিলন হইলে তাঁহার পিতা পুত্রে আনন্দ সাগরে নিমগ্ন হইলেন। তাঁহারা পরস্পর অনুমান করিয়াছিলেন অপর ব্যক্তি জলসাৎ হইয়াছেন অতএব এক্ষণে পরস্পরের সাক্ষাৎ হওয়াতে মৃতের জীবন লাভ বোধে পরমাহ্লাদিত হইলেন।
মিরান্দা এই সমস্ত ব্যক্তিকে অবলোকন করিয়া আশ্চর্য্য প্রকাশ করত কহিতে লাগিলেন আহা ইহারা কি মহৎ জীব, ধন্য সেই জগৎ, যেখানে এবম্বিধ জনগণ বসতি করেন।
নেপল্সাধিপতি মিরান্দার ভুবনমোহন রূপ অসামান্য লাবণ্য এবং স্বর্ণলতা তুল্য মনোহর অঙ্গ যষ্টি অনিমিষ নয়নে নিরীক্ষণ করিয়া স্বীয় তনয়ের ন্যায় বিস্ময়াপন্ন হইলেন এবং কিয়ৎ ক্ষণ পরে জিজ্ঞাসা করিলেন বৎস এই সুরূপা শশিবদনা কে? দেব কন্যা মানবী মূর্ত্তি ধারণ করিয়া মর্ত্ত্যলোকে অবতরণ পুরঃসর কি আমাদিগকে পৃথক্ করণানন্তর পুনর্ব্বার মিলন করিয়া দিলেন? ফার্ডিনেণ্ড জনকের এবম্প্রকার সবিস্ময় বচন শ্রবণ করিয়া অনুমান করিলেন পিতা আমার তুল্য ভ্রান্ত ও মুগ্ধ হইয়া থাকিবেন, অতএব সহাস্য বদনে উত্তর করিলেন তাত ইনি দেবকন্যা নহেন, নারী, ইদানীং পরম পরাৎপর পরমেশ্বরানুকম্পায় আমার সহধর্মিণী হইয়াছেন। আমি অনুমান করিয়াছিলাম আপনি ইহলোক পরিত্যাগ করিয়াছেন সুতরাং ইহাঁর পরিগ্রহে ভবদীয় অনুমতির অপেক্ষা করি নাই। পিতঃ এই মহাত্মা প্রস্পারো মিলান দেশের অধিপতি, ইহাঁর খ্যাতি প্রতিপত্তি ও মহানুভবতার কথা আমার কর্ণগোচর ছিল অদ্য চাক্ষুষ করিয়া চরিতার্থতা প্রাপ্ত হইয়াছি, এই মনোরমা রামা ইহাঁরই তনয়া। হে মহাশয় এই মহানুভব কর্ত্তৃক আমি নবীন জীবন প্রাপ্ত হইয়াছি, ইনি এই ললিত ললনা প্রদান পূর্বক আমার জীবন রক্ষা করাতে দ্বিতীয় জনক হইয়াছেন।
নেপল্সাধিপতি পুত্রের বাক্যে সেই মনোহারিণী ভামিনীকে স্নুষা জানিয়া আনন্দ গদ্গদ বচনে কহিলেন তবে আমি এই যুবতীর পিতা হইলাম। পরন্তু হে বৎস একটা শ্রবণ বৈষম্য রহিল যে সন্তানের সন্নিধানে ক্ষমা প্রার্থনা করিতে হইবেক।
প্রস্পারো বলিলেন সে সকল কথা আর উত্থাপন করি-
বেন না আমাদিগের উপর যে সমস্ত দুর্ঘটনা ঘটিয়াছিল এক্ষণে তৎ সমস্ত স্মৃতি পথ হইতে অতিক্রান্ত হইয়াছে, কেননা পরিণামে পরম সুখোদয় হইল। পরে অনুজের অঙ্গ স্নেহ ভরে আলিঙ্গন করিয়া সপ্রণয় বচনে নিশ্চয় করিয়া কহিতে লাগিলেন ভ্রাতঃ ত্বদীয়াপরাধ মার্জ্জনা করিলাম তোমার দোষ কি? পরমেশ্বরেচ্ছায় আমি স্বরাজ্য হইতে তাড়িত হইয়াছিলাম পরন্তু এক্ষণে আমার কন্যা তাঁহার করুণায় নেপল্সাধিরাজের উত্তরাধিকারিণী হইলেন, অনুমান করি এতদর্থই এই ঘটনা হইয়া থাকিবেক, যেহেতুক এই উপদ্বীপে মিরান্দার সহিত রাজকুমারের সাক্ষাৎ হওয়াতেই তিনি ইহাঁর প্রেম বাগুরায় পতিত হইয়াছেন।
প্রস্পারো সহোদরের শান্ত্বনা নিমিত্ত শিষ্টাচার করিয়া যে সকল মিষ্ট বাক্য কহিলেন তাহাতে এন্তোনিও সাতিশয় লজ্জিত ও বিশেষ অনুতাপান্বিত হইলেন এবং নিস্তব্ধ হইয়া অধোবদনে রোদন করিতে লাগিলেন। বৃদ্ধ গঞ্জেলোর এই আহ্লাদ জনক মিলন দর্শনে নয়ন হইতে আনন্দাশ্রু নির্গত হইল এবং পরম পরিতুষ্ট চিত্তে যুবক যুবতীকে আশীর্ব্বাদ করিলেন।
অনন্তর প্রস্পারো কহিলেন তোমাদিগের অর্ণবতরি এবং কর্ণধার ও নাবিক বিনষ্ট হয় নাই, সকলই সমুদ্র তটে নিরাপদে আছে। আগামি দিবসে সেই তরণীযোগে তোমাদের সমভিব্যাহারে আমিও জামাতা ও দুহিতা সঙ্গে লইয়া স্বদেশে যাত্রী করিব। এক্ষণে আমার এই গহ্বরালয়ে সঞ্চিত খাদ্য সামগ্রী সকলে কিঞ্চিৎ২ গ্রহণ পূর্ব্বক অভ্যবহার কর। এই অরণ্যময় উপদ্বীপে পদাপর্ণাবধি যে২ দুর্ঘটনা পরিভুক্ত হইয়াছে সায়ং কালে একত্র উপবেশন করত তোমাদের চিত্ত বিনোদ নিমিত্ত বর্ণন করিব। তদনন্তর তিনি কেলিবান্কে আহ্বান করিয়া গহ্বর সজ্জা করিতে আজ্ঞা দিলেন। তাহাতে আগত ব্যক্তিরা সেই রাক্ষসের বিকটাকার নিরীক্ষণে সাশ্চর্য্য হইলে প্রস্পারো বলিলেন এতদ্ব্যতীত আমার দ্বিতীয় দাস নাই।
পরদিন প্রাতঃকালে প্রস্পারো আত্মীয় স্বজন সমভিব্যাহারে উপদ্বীপ পরিত্যাগ করিবার অগ্রে এরিএল্ ভূতের দাসত্ব মোচন করিলেন, তাহাতে সে সাতিশয় সন্তুষ্ট হইল। যদিও ঐ ভূত বিশ্বস্ত ও প্রভুভক্ত ভৃত্য ছিল তথাপি বন্য বিহঙ্গমের তুল্য স্বাধীন হইয়া অবাধে শূন্য মার্গে গমনাগমন, সুরভি কুসুম সমাঘ্রাণ ও তরুপংক্তি মধ্যে ভ্রমণ করিতে সতত অভিলাষান্বিত হইত, সুতরাং অভিলষিত লাভে পরমাপ্যায়িত হইল। প্রস্পারো তাহাকে মুক্তি প্রদান কালে কহিতে লাগিলেন এরিএল্ এক্ষণে আমি তোমাকে হারাইব কিন্তু তুমি স্বপ্রধান হইলে। এরিএল্ বিনয় প্রহ্ব হইয়া নিবেদন করিল প্রভো আপনকার শ্রীচরণে কোটি২ প্রণাম করি। কিন্তু এ দাসের সেবায় উপেক্ষা করিবার অগ্রে সুবায়ু দ্বারা আপনাদের তরণী স্বদেশে উপনীত করণার্থ কিঙ্করকে সমভিব্যাহারি করিতে আজ্ঞা হউক, আপনাকে আলয়ে রাখিয়া তথা হইতে মুক্তি লাভ পূর্ব্বক বিদায় হইলে কৃতার্থ বোধে পরমানন্দে কাল যাপন করিতে পারিব। এই কথা কহিয়া একটা গান করিতে লাগিল।
মধুকর মধু পানে আপ্যায়িত যথা।
স্থির জানি সুধা লাভ নিত্য হয় তথা॥
কমল কণিকা মধ্যে আবাস সতত।
পেচকের রব কালে হই শয্যাগত॥
গ্রীষ্ম ঋতু গত মাত্র অনিন্দিত মনে।
শূন্য মর্গে ভ্রমি আমি বাদুড় বাহনে॥
সেই সুখ কাল এই হইল ঘটন।
শাখাগ্র মুকুলে স্থিতি করিব এখন।
পরিশেষে প্রস্পারো যাদুকরী বিদ্যার গ্রন্থ সকল মৃত্তিকা মধ্যে প্রোথিত করত প্রতিজ্ঞা করিলেন আর এ বিদ্যার চালনা করিব না। তিনি স্বীয় বিদ্যা প্রভাবে উল্লেখিত প্রকারে বৈর নির্যাতন ও সহোদর এবং নেপল্সাধিপতির সহিত পুনর্ব্বার মিলন করিয়া স্বদেশ দর্শন রাজ্যাধিকার পুনর্গ্রহণ এবং রাজ তনয় ফার্ডিনেণ্ডের সহিত আপন তনয়ার পরিণয়োৎসব সম্পাদন নিমিত্ত সাতিশয় উৎসুক হইতে লাগিলেন ফলতঃ তাঁহার সুখ সম্পত্তি সম্পূর্ত্তির এতত্রিতয় ব্যতীত অন্য কিছুই অবশিষ্ট রহিল না। নেপল্সাধিপতিও স্বীয় সাম্রাজ্যে প্রত্যাগমন পূর্ব্বক সমারোহে আত্মজের উদ্বাহ ক্রিয়া সমাধা করিতে সমুৎসুক হইলেন। পরে তাঁহারা এরিএল্কে সঙ্গে লইয়া অর্ণব যানারোহণ করিলে অনতিবিলম্বে স্বদেশে গিয়া উপনীত হইলেন। প্রস্পারো তথা হইতে আজ্ঞাবহ এরিএল্কে স্বাধীনতা দান পুরঃসর বিদায় করিয়া রাজ্যাভিষিক্ত হইলে দুই রাজা কন্যা পুত্রের বিবাহে সমারোহ করিয়া পরস্পর আত্মীয় স্বজন সমভিব্যাহারে পরম সুখে কাল যাপন করিতে লাগিলেন ইতি।
ওথেলো
সেক্সপিয়র।
ওথেলোর উপাখ্যান।
বেনিস্ দেশের বিচার সংক্রান্ত মহাসভার সভ্য মহাধন সম্পন্ন ব্রাবান্সিও নামা কোন ব্যক্তি ছিলেন। তাঁহার দেস্দেমনা নাম্নী পরম সুন্দরী এক কুমারী হয়। সেই কন্যার বয়োধর্ম্মক্রমে ক্রমশঃ প্রবর্ত্তমান অনুপম রূপ লাবণ্য, কোমল নির্ম্মল প্রকৃতি, এবং প্রচুর অর্থ সম্পত্তি অবলোকনে লালসান্বিত হইয়া ভূরি২ সুরূপ সুশ্রী যুবক পাণি গ্রহণ নিমিত্ত যৎপরোনাস্তি যত্ন করিতে লাগিল। কিন্তু সর্ব্বাঙ্গ শোভনা দেস্দেমনা স্বদেশীয় অথবা শারীরিক সৌন্দর্য্য রমণীয় কোন ব্যক্তির গলে বর মাল্য দান পূর্ব্বক তদীয় অঙ্ক লক্ষ্মী হইতে অভিলাষিণী হইলেন না, স্বামি বরণ বিষয়ে এবম্বিধ অপূর্ব্ব বর্ত্ম অবলম্বন করিলেন যাহার প্রশংসা ব্যতীত অনুকরণ করিতে কেহই সমর্থ হয় না। সেই গুণবতী যুবতীর চিত্ত মানব জাতির বাহ্য সৌষ্ঠবাপেক্ষা আন্তরিক গুণ রত্নে সমধিক অনুরক্ত হইত। অতএব এক জন কুৎসিত কুরূপ কাফ্রির বরেণ্য গুণে বিমুগ্ধা হইয়া সাতিশয় প্রণয়ানুবন্ধন পূর্ব্বক তাহাকেই স্বকীয় নায়ক রূপে গ্রহণ করিবার মানস করিলেন। তরুণীর পিতা ঐ কাফ্রির যথেষ্ট আদর করিতেন সুতরাং তাঁহাদিগের নিকেতনে ঐ ব্যক্তির সর্ব্বদা গতিবিধি ছিল।
দেস্দেমনা কুরূপ পাত্রকে স্বয়ং বরণ পূর্ব্বক পতিত্বে পরিগ্রহ করিতে স্বীকার করিলেন বটে কিন্তু ইহাতে লোকতঃ নিতান্ত নিন্দনীয়া হইলেন না, যেহেতু তাঁহার প্রেমাধিকারী কাফ্রি প্রসিদ্ধ ওথেলো বিশ্রী ও বিকটাকার হইলেও আন্তরিক সুমহদ্গুণ বহুল পরিমাণে ধারণ করিতেন, সুতরাং গুণাভিলাষিণী বরবর্ণিনী কামিনীর কমনীয় কান্ত হইবার একান্ত অযোগ্য নহেন। মহাবীর ওথেলো সমরপ্রিয় এবং অসম সাহসী যোদ্ধা ছিলেন, বেনিস্ দেশের প্রধান সেনানী হইয়া কত শত বার তুরকী দিগের সহিত তুমুল সংগ্রাম করেন। অপর রাজ্যস্থ সমস্ত লোকের সম্মান ভাজন এবং পরম বিশ্বাস ভূমি ছিলেন।
ওথেলো বহু২ দেশ পর্য্যটন এবং ভূরি২ ঘটনা দর্শন করাতে আপন প্রণয়িনী সহ একত্র উপবেশন পূর্ব্বক সময়ে২ তত্তাবতের বিবরণ উপন্যাস রূপে বর্ণন করিতেন, এবং তাঁহার প্রেমাভিলাষিণীও কামিনীদিগের রীত্যনুসারে সাতিশয় তৃষিত চিত্তে অবহিতা হইয়া সহর্ষে সে সমস্ত শ্রবণ করিতেন। তিনি শৈশবাবস্থার বিচিত্র জীবন বৃত্তান্ত, যৌবন সময়ের রণ পাণ্ডিত্য, জলপথে ও স্থলবর্ত্মে উৎপন্ন বিপৎ পুঞ্জ, আগ্নেয়াস্ত্র কৃত দুর্গান্তর্গত দুর্বিগাহ গর্ত্ত রূপ মৃত্যুদ্বারে নিপাতানন্তর কৌশলে নিস্তার, বিপক্ষ পক্ষ কর্ত্তৃক বন্দী রূপে আত্ম বন্ধন ও দাসত্বে বিক্রয়, এবং আপনার তাদৃশী দুরবস্থা বিমোচন, এ সকল বিষয়ের কথা প্রেয়সীর সমীপে কহিতেন। অপর দেশ বিদেশ পর্য্যটন কালে যে সকল ভীম পরাক্রম ভীষণ শরীর সিংহ শার্দ্দুলাধিষ্ঠিত নিবিড় অরণ্য, মনোহর ধরাধর কন্দর, গগণ স্পর্শি গিরি শেখর, বিস্ময়কর রত্নাকর প্রভৃতি অবলোকন করেন এবং যে সমস্ত অসভ্য বর্ব্বর নরজাতি, মনুষ্য ভক্ষক রাক্ষস, আর আফ্রিকাস্থ বিপরীত কন্ধর জন্তু নয়ন গোচর হয় তৎসমুদায়ের বৃত্তান্ত গল্প চ্ছলে চমৎকার রূপে বর্ণন করিতেন সুতরাং তরুণীর মন তাহাতে সাতিশয় আকৃষ্ট হইয়াছিল। ফলতঃ সেই কামিনী আপন প্রণয়ির জীবন চরিত শ্রবণে এতাদৃশ অনুরাগিণী হন যে উপন্যাস কথন সময়ে যদিস্যাৎ প্রয়োজন বশতঃ গৃহ কর্ম্ম সাধনে বাধ্য হইতেন সত্বর সমাপন পূর্ব্বক পুনর্ব্বার আসিয়া দ্বিগুণ শুশ্রূষা সহকারে শুনিতে বসিতেন। দেস্দেমনা এবম্প্রকারে মনোনীত নায়কের জীবন বিবরণ পৃথক্২ শ্রবণ করিয়া এক দিন শুভক্ষণে সবিনয় বচনে নিবেদন করিলেন প্রিয়তম আমি যে সমস্ত উপন্যাস ভিন্ন২ সময়ে শ্রবণ করিলাম এক কালে তদখিল বর্ণন করিলে আনুপূর্ব্বিক আকর্ণন করিয়া কর্ণদ্বয়ের কৃতার্থতা সম্পাদন করিতে পারি। ওথেলো তদীয় রূপ লাবণ্য দর্শনাবধি কন্দর্প পীড়িত হৃদয় প্রযুক্ত সাতিশয় বশম্বদ হইয়াছিলেন তৎক্ষণাৎ প্রেয়সীর প্রার্থনায় সম্মত হইলেন এবং যথাক্রমে বর্ণন পুরঃসর বলিতে লাগিলেন। কিন্তু যখন আপনার যৌবন দশার দারুণ দুঃখময় বিবরণ বলিতে প্রবৃত্ত হইলেন তখন তাহার প্রণয়িনীর নয়ন দ্বিতয় হইতে অজস্র করুণাশ্রূ বিনিঃসৃত হইতে লাগিল।
প্রেম ভাজন প্রিয়তম আত্ম অতীত বৃত্তান্ত উপন্যাস রূপে আনুপূর্ব্বিক কহিয়া সমাপন করিলেও কামিনী বারম্বার দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন এবং প্রিয় সম্ভাষণ পুরঃসর বলিলেন এ গল্পের অধিকাংশ অদ্ভুত ও করুণ রসে পূর্ণ। অনন্তর দয়ার্দ্র হৃদয় হইয়া মুক্তকণ্ঠে সবিষাদ বচনে আক্ষেপ পূর্ব্বক কহিলেন ঈদৃশী উপকথা না শুনিলে ভাল হইত। পরন্তু পরক্ষণে পরমাকূত সহকারে আপনার আন্তরিক বাসনা এই উক্তি করিয়া ব্যক্ত করিলেন আহা পরমেশ্বর আমাকে এতাদৃশ মানব করিয়া সৃজন করিলে কৃতার্থ হইতাম। অবশেষে কমনীয় কান্তকে কর শিরোযোগে নমস্কার করত সেঙ্গিত বাক্যে কহিতে লাগিলেন হে রসিক নাগর যদি তোমার কোন মিত্র আমার প্রীতিপাত্র হইতে অভিলাষুক হয় সে কেবল ভবদীয় বাগ্ভঙ্গি অভ্যাস করুক তাহা হইলেই আমাকে অনায়াসে প্রেমপাশে বন্ধন করিতে পারিবে। নবযৌবন রমণীয়া দেস্দেমনা হাব ভাব প্রকাশ পূর্ব্বক ঈষৎ লজ্জা সহযোগে এরূপ ইঙ্গিত করিলে ওথেলো তাঁহার অভিপ্রায় বুঝিয়া তৎক্ষণাৎ মহোৎসুকতা সহকারে আপনার প্রণয়ানুরাগ ব্যক্ত করিলেন তাহাতে চারু দশনা দেস্দেমনা শুভক্ষণে তাঁহাকে হৃদয়েশ বলিয়া স্বীকার করিলেন।
ওথেলোর শারীরিক সৌন্দর্য্য অথবা অর্থ সম্পত্তি ঈদৃশী ছিল না যে দেস্দেমনার পিতা ব্রাবান্সিও তাঁহাকে জামাতৃত্বে বরণ করিতে পারেন। এই ধনাঢ্য সভ্য স্বীয় তনয়াকে স্বাধীনাবস্থায় রক্ষা করিয়া সম্পূর্ণ প্রত্যাশা করিতেন কুমারী আপনার রূপ লাবণ্য ও কুল মর্য্যাদার অনুরূপ ধন্য মান্য বংশের কোন সুশ্রী সুরূপ পুরুষকে পতিত্বে বরণ করিবেন। কিন্তু তাঁহার সে আশা বিফল হইল কেননা রুচিরবর্ণা কন্যা কৃষ্ণবর্ণ কাফ্রির প্রতি প্রণয়িনী হইলেন এবং তদীয় শৌর্য বীর্য্যাদি আর্য্য গুণেই আপন প্রাণ মনঃ তাঁহাতে সমপর্ণ করিলেন। ফলতঃ সুন্দরী কাফ্রির ভাবে এতাদৃশ অভিভূত হইলেন যে তাঁহার শরীরের বর্ণ আত্ম সুবর্ণ বর্ণ তুলনায় সাতিশয় ঘৃণাস্পদ হইতে পারে কিন্তু তাহাও স্বদেশীয় সম্ভ্রান্ত বংশ জাত রূপ গুণান্বিত যুবক বর্গের বর্ণ অপেক্ষা মনোহর ও পরমোৎকৃষ্ট বলিয়া গণ্য করিতে লাগিলেন।
তাঁহাদের পরিণয় ব্যাপার যদিও গোপনে সম্পন্ন হইল তথাপি অধিক কাল অপ্রকাশ রহিল না। বৃদ্ধ ব্রাবান্সিও এতদ্বিষয় বিদিত হইলে রোষ পরবশ হইয়া উঠিলেন এবং বিচারাগারে প্রবেশ পুর্ব্বক ওথেলোর নামে এই অভিযোগ উপস্থিত করিলেন কাফ্রি আমার সম্মতি বিনা কুহক যোগে কৃতঘ্নতা পূর্ব্বক সুকুমারী কুমারীর পাণি পীড়ন করিয়াছে।
এই সময়ে দৈব ঘটনাক্রমে বেনিস্ রাজ্য মধ্যে ওথেলোর সাহায্য নিতান্ত অপেক্ষণীয় হইয়াছিল যেহেতুক রণ কুশল তুরকী জাতীয়েরা অসংখ্য সেনা সংগ্রহ পুরঃসর সমুদ্র পথে বেনিস্ দেশাধিপের অধিকারস্থ সাইপ্রস্ দ্বীপ অধিকার করিতে আসিতেছিল। এই বিপদ্ অবলোকনে রাজসভা রাজ্য রক্ষা নিমিত্ত ওথেলোকে লক্ষ্য করিতেছিলেন কেননা তদানীং ঐ বীর ব্যতিরেকে তুরকীদের পরাভব করণে অপর কেহই পারক ছিল না। অতএব ওথেলো বিচার সভায় আনীত হইয়া এককালীন দুইটী গুরুতর দায়ে পতিত হইলেন অর্থাৎ সুমহৎ রাজকার্য্যের ভার গ্রহণ এবং ব্রাবান্সিওর অভিযোগানুসারে মহা অপরাধী হওন নিমিত্ত দণ্ডায়মান হইলেন।
ব্রাবান্সিও অতি প্রাচীন এবং সম্ভ্রান্ত পদস্থ ছিলেন, এতৎ প্রযুক্ত বিচারক মণ্ডলী বিশেষ অবধান পুরঃসর ধীরতা সহকারে তদীয় আবেদন শ্রবণ করিতে লাগিলেন। বৃদ্ধ ক্রোধান্ধতা প্রযুক্ত এরূপ দুষ্টতা করত স্বপক্ষ পোষক প্রমাণ প্রয়োগ করিলেন যে ওথেলো স্বীয় অপবাদ নিরাকরণ নিমিত্ত আহূত হইয়া প্রণয় ঘটনার একটী সরল উপন্যাস ব্যতীত অন্য কোন প্রত্যুক্তি করিতে পারিলেন না। তিনি সকলের সম্মুখে মুক্ত কণ্ঠে দেস্দেমনাকে প্রেমপাশে বদ্ধ করিবার প্রাগুক্ত ইতিহাস অকৃত্রিম বাক্পটুতার সহিত এবম্প্রকারে বর্ণন করিলেন এবং তাহার সঙ্গে সুশীলতা প্রদর্শন পুরঃসর এতাদৃশী বক্তৃতা করিতে লাগিলেন যে বিচারক বর্গকে তদ্দণ্ডে আত্মমুখে স্বীকার করিতে হইল অভিযোক্তার দুহিতা উপন্যাস শ্রবণ প্রভাবে স্বয়ং প্রীতি শৃঙ্খলে বদ্ধা হইয়াছেন। অতএব অভিযুক্ত কুহক যোগে কন্যা হরণের আরোপিত অপবাদ হইতে মুক্ত হইলেন। এই বিচারে স্পষ্ট প্রকাশিত হইল যে প্রেমার্থি লোকের অব্যাজ স্তুতি করণক নায়িকার গুণপ্রবণ চিত্ত যদ্রূপে হৃত হয় ওথেলো তদ্রূপে দেস্দেমনার মনোহরণ করিয়াছেন।
ওথেলো বিচারস্থলী মধ্যে আপনার অপবাদ বিমোচন নিমিত্ত যাহা কহিলেন দেস্দেমনার সাক্ষ্যদ্বারা তাহা সপ্রমাণ হইল। ঐ সুধীরা রমণী ধর্ম্মাধিকরণে উপস্থিত হইয়া অকপট বাক্যে কহিলেন জন্ম দান ও পরম স্নেহে আজন্ম লালন পালন নিমিত্ত জনক সন্নিধানে চির বাধ্যতা স্বীকার করিব কিন্তু জননী যেমন আপন পিতাকে পরিত্যাগ করিয়া পতির আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন আমিও তদ্রূপে ওথেলোর অনুগত হইয়াছি।
বৃদ্ধ ব্রাবান্সিও স্বপক্ষ রক্ষণে অক্ষম হইয়া সাতিশয় ক্ষুব্ধ হইলেন এবং অসন্তুষ্ট চিত্তে অগত্যা ওথেলোকে কন্যা সম্প্রদান করিলেন। কিন্তু সকলের সম্মুখে স্পষ্ট রূপে কহিতে লাগিলেন ব্যবস্থানুসারে আপন তনয়াকে নিষেধ করিয়া রাখিবার ক্ষমতা থাকিলে এতাদৃশ কুরূপ পাত্রে কদাপি কন্যা সমর্পণ করিতাম না। পরে নন্দিনীকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন বৎসে আমার পরম সৌভাগ্য যে অন্য সন্তান সন্ততি নাই, অপর অপত্য বর্ত্তমান থাকিলে তোমার এই আচরণে নির্দয় হৃদয় হইয়া তাহাদিগের প্রতি কতই অত্যাচার করিতাম।
মহাবল পরাক্রম ওথেলো এই উৎপাত হইতে উত্তীর্ণ হইয়া সাইপ্রস্ দ্বীপে যুদ্ধ করিতে অনুরুদ্ধ হইলেন এবং কিয়দ্দিন মধ্যে রণতরি সুসজ্জিত করিয়া যাত্রা করিলেন। তাঁহার অভিনব পরিণীতা বনিতা অন্যান্য রমণীদিগের ন্যায় আবাসে বসিয়া স্বামিসহ বিহারাভিলাষিণী ছিলেন না সুতরাং পতির সমর নিমিত্ত প্রস্থানে কোন প্রকার প্রতিবন্ধকতা করিলেন না, হর্ষোৎফুল্ল চিত্তে আপনিও তাঁহার সমভিব্যাহারিণী হইতে প্রস্তুত হইলেন।
ওথেলো যুদ্ধযাত্রা করিয়া সহধর্ম্মিণী সহিত সাইপ্রস্ দ্বীপে অবতীর্ণ হইবামাত্র শ্রবণ করিলেন প্রবল পবন বেগে অরাতি দিগের রণতরি সাগর মধ্যে ভগ্ন হওয়াতে অনীকিনী গণ উৎসন্ন প্রোৎসন্ন হইয়া গিয়াছে, বিপক্ষ পক্ষ সহসা তদ্দ্বীপআক্রমণে সাহস করিতে সক্ষম হইবেক না। অতএব তাঁহাকে সমরের আয়াস গ্রহণ করিতে হইল না কিন্তু অচিরে অপর একটা ঘোরতর নিদারুণ যন্ত্রণা সহ্য করিবার সূত্র হইল। তিনি অকারণ শঙ্কাপিশাচীর প্রাদুর্ভাবে আপন অন্তঃকরণবর্ত্তি যে সকল রিপুর বশম্বদ হইয়া স্বীয় প্রেয়সীর বিদ্বেষী হইয়া উঠিলেন তাহারা বিদেশীয় বৈরি তুরকীদিগের অপেক্ষা ভয়ানক হইয়া পরিণামে সংহারক রূপে প্রকাশমান হইতে লাগিল।
সেনাপতি যাবতীয় বন্ধুবর্গ মধ্যে ফ্লোরেন্স দেশীয় মাইকেল ক্যাশিও নামা এক ব্যক্তিকে অতিশয় বিশ্বাস করিতেন। সেই যুবা অতি সুশ্রী, সুরূপ, বাক্পটু, সদাশয়, এবং সুরসিক ছিলেন। তাঁহার বাগ্মাধুর্য্য এবং রসিকতায় অনাআসে রমণী গণের মনোহরণ হইতে পারিত। যুবজানি সেনানীর মনে যদিস্যাৎ স্বীয় যুবতী যোষার ব্যভিচারাশঙ্কা আবির্ভূতা হইত তবে তাদৃশ পুরুষের প্রতিই সন্দেহ হইবার সম্পর্ণ সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সেনাধ্যক্ষ যদ্রূপ উদার স্বভাব, তদ্রূপ অসন্দিগ্ধ চিত্ত ছিলেন এবং স্বয়ং যেমন নীচ কর্ম্ম করিতে পারিতেন না, অন্যেরও তাদৃশ জঘন্য প্রবৃত্তির সন্দেহ করিতেন না। তিনি দেস্দেমনার সহিত প্রণয় সাধন ব্যাপারে ঐ বিশ্বস্ত মিত্রকে মধ্যস্থরূপে নিযুক্ত করিয়াছিলেন কেননা স্বয়ং মহিলার মনোহারি ললিত মৃদু ভাষা ব্যবহার করিতে পারিতেন না সুতরাং অনুনয় নিমিত্ত বনিতার নিকট সর্ব্বদা তাঁহাকে প্রেরণ করিতেন। অতএব তাঁহাদিগের দম্পতীর পরস্পর প্রীতি সমাধানে ক্যাশিও এক প্রকার মধ্যস্থতা অবলম্বন করেন। মহাবল বিক্রমান্বিত কাফ্রির এবম্প্রকার সারল্য ব্যবহারে তদীয় মহোদার চরিত্র কলঙ্কাঙ্কিত না হইয়া বরং গৌরবান্বিত হইয়াছিল। অপর তাঁহার সুশীলা ললনা এই ঘটনায় ক্যাশিওকে ক্রমাগত চিরকাল অন্তঃকরণ সহিত ভাল বাসিতেন ইহা অসম্ভব বা আশ্চর্য্য নহে। ফলতঃ যুবক যুবতীর বিবাহ নির্ব্বাহ হইলে ঐ ব্যক্তির প্রতি তাহাদের উভয়ের মনোভাব ভিন্ন ভাব প্রাপ্ত হয় নাই ইহাতে তিনি নিরন্তর তাঁহাদিগের সদনে গমনাগমন করিতেন এবং গল্প উপন্যাসাদি কহিয়া আমোদ প্রমোদ করিতেন। সেনাপতি গম্ভীর প্রকৃতি প্রযুক্ত কদাপি তাহাতে বিরক্ত হইতেন না বরং আমোদিত হইতেন। অপর আপনার প্রিয়তমা পরিণয়ের পূর্ব্বে ঐ ব্যক্তির সহিত যে প্রকার হাস্য পরিহাস করিতেন পাণি গ্রহণের পরেও তদ্রূপ রহস্য কৌতুক করিতেন তাহাতেও কোন প্রকার দোষ বোধ করিতেন না।
এই সময়ে ওথেলো প্রধান সেনানীর সহকারিত্ব পদে বিশ্বাসপাত্র প্রিয় মিত্র ঐ ব্যক্তিকে স্থাপিত করিলেন তাহাতে ইয়াগো নামা এক জন প্রাচীন সেনাপতি সাতিশয় রোষান্বিত হইল কেননা সে ব্যক্তি আপনাকে ঐ পদ প্রাপ্ত হইবার উপযুক্ত বোধ করিত, অতএব ঈর্ষা পরবশ হইয়া বিবিধ ব্যঙ্গোক্তি পূর্ব্বক ক্যাশিওকে উপহাস করত সর্ব্বত্র কহিতে লাগিল ক্যাশিও কেবল কামিনী কুলের সঙ্গে কৌতুক করণে কুশল, সেনানীর কার্য্য কি জানে, যুদ্ধ বিগ্রহ অথবা ব্যূহরচনা ইত্যাদি ব্যাপারে অব্রুবাণ বালকাপেক্ষা তাহার অধিক বোধ নাই। বিদূষক বৃদ্ধ ইয়াগো যত্র তত্র এই প্রকারে কুৎসা করত ক্যাশিওকে ঘৃণা করিতে লাগিল এবং ওথেলো ক্যাশিওকে ভাল বাসেন বলিয়া তাঁহারও নিন্দায় প্রবৃত্ত হইল। অবশেষে আপন প্রণয়িনী এমিলিয়ার সহিত সেনানীর আসক্তি আছে এমত অপবাদ উত্থাপন করিয়া তাহাকে ঘৃণাস্পদ করিবার চেষ্টা করিতে আরম্ভ করিল। অপিচ ঐ করাত্মা শোক রোষাবহ এই সমস্ত বিষয়ের কল্পনা করিয়া বৈর নির্যাতনের এবম্প্রকার ভয়ঙ্কর ষড়্যন্ত্র করিল যে তাহাতে ক্যাশিও ওথেলো এবং দেস্দেমনার সর্বনাশ সম্ভাবনা হইল।
দুরাত্মা ইয়াগো মানব প্রকৃতি বিষয়ে বিশেষ জ্ঞানাপন্ন প্রযুক্ত নিশ্চয় জানিত দৈহিক যাতনাপেক্ষা মানসিক ক্লেশ শত গুণ প্রবল, এবং রমণীর ব্যভিচারাশঙ্কা মর্মান্তিক যন্ত্রণাদায়ক অতএব মনে২ মন্ত্রণা করিতে লাগিল ক্যাশিওর প্রতি যদিস্যাৎ ওথেলোর জায়া জারাশঙ্কা জন্মাইয়া দিতে পারি তবে কৌশলে বৈর প্রতীকার হইবে অর্থাৎ তাহা হইলে বিপক্ষ ও বিপক্ষপক্ষ উভয়ের পরস্পর রোষ বশে স্বতো বিনাশ সম্ভাবনা।
এই সময়ে সাইপ্রস্ উপদ্বীপে সপত্নীক সেনাপতির অধিষ্ঠান এবং সাগরোপরি প্রবলতর তরঙ্গে অরিদিগের রণতরি ভগ্ন হইয়া জলমগ্ন হইবার সংবাদ প্রযুক্ত মহা মহোৎসব আরম্ভ হইল তাহাতে আপামর সাধারণ সকলে পান ভোজনের আমোদ করিতে লাগিল এবং কৃষ্ণবর্ণ সেনানীও তাঁহার গৌরাঙ্গী প্রেয়সীর স্বাস্থ্য জনিত আনন্দে অপর্য্যাপ্ত সুরা পান করিলেন।
এই উৎসবের নিশামুখে সেনাধ্যক্ষ আপনার সহকারি ক্যাশিওকে শান্তি রক্ষার কার্যে নিযুক্ত করিয়া আদেশ করিলেন সেনাগণ যেন অপরিমিত মদ্য পান দ্বারা মত্ত হইয়া কোলাহল উপস্থিত করণ পুরঃসর দ্বীপবাসিদিগের উপর উপদ্রব বা ভয়োৎপাদন না করে। সেনানীর এই নিদেশ দুরাত্মা ইয়াগোর শ্রুতি গোচর হইলে সে সেই নিশাভাগেই আপনার দুষ্ট সঙ্কল্প সাধনের সূত্রপাত করিতে প্রবৃত্ত হইল। সে প্রতারণা পূর্ব্বক সেনাপতির প্রতি কপট ভক্তি প্রকাশ করিয়া ক্যাশিওকে সমধিক সুরাপানে প্রবৃত্তি দিতে লাগিল অথচ শান্তি রক্ষকদিগের অপর্যাপ্ত পানই মহৎ দোষ। ক্যাশিও প্রথমতঃ অনিষ্ট সম্ভাবনা মনে করিয়া তাহার কথানুসারে পানামোদী হইতে স্বীকার করিলেন না। কিন্তু ঐ ধূর্ত্ত বারম্বার সাহস দান পুরঃসর প্ররোচক বাক্য বলিতে আরম্ভ করিলে বাগ্জালে মুগ্ধ হইয়া পান পাত্র গ্রহণ করিলেন এবং কিঞ্চিন্মত্ততা জন্মিলে শেষে দুরাত্মা যত উৎসাহ দিতে থাকিল ততই পুনঃ২ পান পাত্র সুরা পূর্ণ করণ পূর্ব্বক পান করিতে লাগিলেন আর দেস্দেমনার গুণানুবাদ করিতে২ কহিলেন ঐ যুবতীর তুল্য গুণবতী ও রূপবতী রমণী ভূমণ্ডলে অবলোকন করি নাই। পরন্তু অপর্য্যাপ্ত পান দ্বারা অনতিবিলম্বে তাঁহার সাতিশয় মত্ততা জন্মিবাতে চিত্ত বিক্ষিপ্ত হইল। অনন্তর শঠাগ্রণী ইয়াগো তাঁহার তদবস্থায় ক্রোধোৎপাদন দ্বারা কলহ উপস্থিত করিবার অভিপ্রায়ে কোন ব্যক্তিকে ভর্ৎসনার্থ প্রেরণ করিল। সে আসিয়া সেনাপতিকে তিরস্কার করিবামাত্র সুরাপানে সোষ্ম ক্যাশিও কোপে প্রজ্বলিত হইলেন এবং তৎক্ষণাৎ শিরশ্ছেদোদ্যত হইয়া করে করবাল ধারণ করিলেন সুতরাং সেনামধ্যে মহা কলরব উপস্থিত হইল। মণ্টানো নামা এক জন সম্ভ্রান্ত কর্মচারী গোলযোগ নিবারণ নিমিত্ত আগমন করিয়া অস্ত্রাহত হইলেন এবং ক্রমে বাগ্যুদ্ধে বিবাদের নিষ্পত্তি না হওয়াতে বাহু যুদ্ধের সূত্র হইল। দুরাত্মা ইয়াগো স্বয়ং এই উৎপাত উত্থাপন করিয়া অবশেষে প্রধান সেনানীর সুগোচর নিমিত্ত স্বয়ং ভয়ধ্বনি প্রচারার্থ ঘণ্টানিনাদ করিতে লাগিল। তাহাতে সকলের বোধ হইল যেন কোন ভয়ঙ্কর ব্যাপার ঘটিয়াছে। ওথেলো অকালে ঘণ্টারব শ্রবণমাত্রে সচকিত হইয়া ত্বরায় পরিচ্ছদ পরিধান পুরঃসর কোলাহল স্থলে আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং ব্যস্ত সমস্ত হইয়া ক্যাশিওকে কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন। সেনানীকে অবলোকন করিবামাত্র ত্রাসে ক্যাশিওর মত্ততার কিঞ্চিৎ হ্রাস হইল এবং চৈতন্যোদয়ে সাতিশয় লজ্জিত হইলেন সুতরাং কিছই উত্তর দিতে পারিলেন না তাহাতে ধূর্ত্ত ইয়াগো গোলযোগের নিদান আপন দোষ গোপন পুরঃসর সেনাপতিকে কৌশলক্রমে এরূপ ভঙ্গিতে সমুদায় বৃত্তান্ত বিজ্ঞাপন করিল যেন ক্যাশিওর কুৎসা কথনে তাহার ইচ্ছা নাই কেবল সেনানী কলহের হেতু জিজ্ঞাসু হইলেন তন্নিমিত্ত ব্যক্ত করিতেছে। অপিচ ঐ বঞ্চক ক্যাশিওর যে অপরাধ অল্প বলিয়া বর্ণনা করিল বাগ্ভঙ্গি দ্বারা তাহা বস্তুতঃ ঘোরতর ও অতি গুরুভাবে প্রকাশ পাইল। ক্যাশিও তৎকালীন ইয়াগোর দোষবার্ত্তা প্রকাশে অক্ষম ছিলেন অতএব এবিষয়ের শেষ নিষ্পত্তি এই হইল যে কঠিন দণ্ড বিধায়ক সেনানী তৎক্ষণাৎ ক্যাশিওকে পদচ্যুত করিলেন।
ধূর্ত্ত ইয়াগো এবম্প্রকারে আপনার প্রথম কামনা পূর্ণ করিল অর্থাৎ কৌশলে বৈর নির্যাতন পূর্ব্বক বিপক্ষ ক্যাশিওকে অপদস্থ করিয়া তাহার মহাপকার করিল। পরন্তু এই কাল রাত্রির ব্যাপার সকল ভবিষ্যতে ঐ দুরাত্মার অন্যান্য মানস সিদ্ধির বিষয়েও সম্যক্ উপযোগী হইবার উপক্রম হইল।
হতভাগ্য ক্যাশিও অপমানিত ও পদভ্রষ্ট হইয়া শোকাকুলান্তঃকরণে আপনার কপট মিত্র ইয়াগোর সন্নিধানে গমন পূর্ব্বক সবিষাদ বচনে বলিতে লাগিলেন আমি অতি নির্ব্বোধ, আত্ম কুবুদ্ধিতে পশুবৎ কার্য্য করিয়া স্বীয় মহা সম্ভ্রম নষ্ট করিলাম। হায় আমি একেবারে উৎসন্ন হইলাম, আর কি কখন পদস্থ হইবার নিমিত্ত সেনানীর নিকট প্রার্থনা করিতে পারিব? আমি সমীপস্থ হইলেই সেনানায়ক কোপে কহিবেন এই মদিরা মত্ত আইল। এবম্প্রকারে আপনাকে ধিক্কার প্রদান পূর্ব্বক সাতিশয় পরিতাপ করিলে নির্দয় ইয়াগো তদুপরি দুর্দশা উত্থাপনের অভিপ্রায়ে কপট স্নেহ প্রকাশ পূর্ব্বক কহিল ওহে তুমি মদ্য পান করিয়াছিলে এতাবন্মাত্র তোমার দোষ। কিন্তু সময় বিশেষে যদি আসব নিষেবন করাযায় তাহাতে ক্ষতি কি? যাহা হউক, তোমার অদৃষ্টে যাহা ছিল হইয়াছে এক্ষণে তাহা হইতে পরিত্রাণ পাইবার চেষ্টা করা উচিত। অনন্তর তাহাকে এই পরামর্শ দিল সম্প্রতি সেনাপতি বনিতার বশম্বদ হওয়াতে দেস্দেমনাই কর্ত্রী স্বরূপা হইয়াছেন। তিনি যাহা কহিবেন সেনানী তাহাই করিবেন অতএব তুমি দেস্দেমনার নিকট গিয়া প্রার্থনা কর। ঐ দয়ালু মহিলা করুণা বিনম্র হইয়া অবশ্য স্বামির সমীপে তোমার নিমিত্ত অনুরোধ করিবেন। আমার বোধ হয় তিনি যত্ন করিলে তোমার প্রতি সেনাপতির পূর্ব্বাপেক্ষা অধিক স্নেহ উৎপাদন করিতে সমর্থা হইবেন। দুরাত্মা ইয়াগো যদিস্যাৎ দুষ্টাভিসন্ধি পরাঙ্মুখ হইয়া এই পরামর্শ প্রদান করিত তাহা হইলে ক্যাশিওর উপকার দর্শিতে পারিত, কিন্তু তাহার মনঃ দুশ্চিকীর্ষায় আচ্ছন্ন ছিল এবং তাহা সিদ্ধ করিবার অভিপ্রায়ে সত্বর হইল সুতরাং তাহাতে অধিক অনিষ্ট ঘটিল, পশ্চাৎ তাহা বিদিত হইবেক।
ক্যাশিও কপট মিত্রের মন্ত্রণানুসারে দেস্দেমনার সদনে গমন পূর্ব্বক আপনার দুর্দশার বিষয় নিবেদন করিলে ঐ সুশীল অবলা করুণার্দ্র হইয়া অঙ্গীকার করিলেন তোমার নিমিত্ত প্রাণ পণ করিয়া আপন পতি সেনাপতির সমীপে প্রার্থনা করিব। পরে ধর্ম্মপরায়ণা সুচরিত্রা রমণী স্বামির সহিত সাক্ষাৎ করণ পুরঃসর ক্যাশিওকে পুনর্ব্বার পদস্থ করিবার নিমিত্ত যৎপরোনাস্তি ব্যগ্রতার সহিত অনুরোধ করিলেন তাহাতে ওথেলো কহিলেন এবম্প্রকার অপরাধিকে কিরূপে আশু মার্জ্জনা করা যাইতে পারে? দেস্দেমনা তাহার কথায় কর্ণপাত না করিয়া কাতরতা প্রকাশ পূর্ব্বক পুনর্ব্বার উপরোধ করত কহিতে লাগিলেন আগামি নিশাতে অথবা পরশ্বঃ প্রাতে কবে ক্ষমা করিবেন কহুন্? পরিশেষে নিবেদন করিলেন ক্যাশিও দুষ্কর্ম্ম করিয়া অনুতাপান্বিত ও বিনীত হইয়াছে অধিকন্তু লঘু পাপে গুরু দণ্ড কর্ত্তব্য হয় না। ওথেলো এ কথাতেও পুনঃ২ অস্বীকার করিলে ঐ অঙ্গনা মহা বিষণ্ণা হইয়া কহিলেন আহা মহাশয় ক্যাশিও যখন আপনার প্রতিনিধি হইয়া আমার নিকট গমনাগমন করিত তখন আমি আপনার নিন্দা করিলে আপনকার পক্ষ হইয়া আমার সঙ্গে কতই বচসা করিত, এক্ষণে তাহার নিমিত্ত আপনার নিকট আমাকে এত কহিতে হইল? যাহা হউক অধুনা আমি আপনার সমীপে এই সামান্য বিষয়ের প্রার্থনা করিলাম কিন্তু যখন আপনকার অনুরাগ পরীক্ষা করিব তখন এতদপেক্ষা গুরুতর প্রার্থনা করিব। ওথেলো প্রেয়সীর এতাদৃশ অনুযোগে সলজ্জ হইয়া তাহার প্রার্থনায় পুনঃ২ অস্বীকার করিতে পারিলেন না, অগত্যা কহিলেন উপযুক্ত সময় বুঝিয়া ক্যাশিওর প্রতি অনুগ্রহ চিহ্ন প্রকাশ করা যাইবেক।
অনন্তর এই ঘটনা হইল, ক্যাশিও দেস্দেমনার সন্নিধানে আগমন পূর্ব্বক অনুগ্রহ বিতরণ নিমিত্ত অনুনয় করিয়া যখন বহির্গত হয় তৎকালে হঠাৎ ওথেলো এবং ইয়াগো আসিয়া উপস্থিত হইল। দুরাশয় ইয়াগো স্বীয় দুরভিসন্ধির সূত্র করণার্থ ব্যগ্র ছিল। ক্যাশিওকে অবলোকন করিয়া ঈষদ্বিরক্তি প্রকাশ পূর্ব্বক সেনাপতির কর্ণগোচর হয় এমত স্বরে আপনাআপনি মৃদুভাবে এই উক্তি করিতে লাগিল এ সকল ব্যবহার আমার ভাল লাগে না। সেনানীর তৎকালে ঐ কথায় বিশেষ মনোযোগ হইল না কেননা তিনি বনিতার বেশ্মে প্রবেশ করিয়া তাঁহার সহিত ক্যাশিওর বিষয়েই কথোপকথন করিতেছিলেন। সুতরাং ইয়াগোর ইঙ্গিত বাক্য শ্রবণ গোচর হইলেও বিস্মৃত হইলেন কিন্তু অনতি বিলম্বে আপনা হইতে তাহা স্মরণ করিতে হইল। দেস্দেমনা স্থানান্তরে প্রস্থান করিলে দুরাত্মা ইয়াগো বৃত্তান্ত শ্রবণৌৎসুক্য প্রকাশ পুরঃসর ওথেলোকে জিজ্ঞাসা করিল আপনকার দার পরিগ্রহের অগ্রে আপনি যখন ঠাকুরাণী সমীপে গমনাগমন করিতেন তখন কি ক্যাশিও আপনকার প্রীতির বিষয় অবগত ছিল? ওথেলো উত্তর করিলেন হাঁ ক্যাশিওই মধ্যস্থ হইয়া আমাদের পরস্পর প্রণয় বন্ধনের ব্যাপার নির্ব্বাহ করিয়া দেয়। ইয়াগো এত শ্রবণে আত্ম মনোমধ্যস্থ আশঙ্কা যেন সপ্রমাণ হইল এতদ্রূপ ভঙ্গি করিল এবং সাতিশয় বিস্ময় প্রকাশ পুরঃসর ভ্রূকুটী করিয়া কহিল তজ্জন্যই বটে। দুরাত্মার এই ভাব ভঙ্গি দর্শন ও বাক্য শ্রবণে সেনানীর মনে সংশয় স্পর্শ হইল এবং মহিলার আলয় প্রবেশ কালে সে ক্যাশিওকে কান্তার সহিত কথা কহিতে দেখিয়া আপনাআপনি যাহা কহিয়াছিল তাহাও স্মৃতিপথে আসিয়া উদিত হইল। অতএব বিবেচনা করিতে লাগিলেন ইয়াগো অতি সজ্জন, দুষ্ট নয়, সুতরাং তদ্দ্বারা ছলনা সম্ভাব্যা নহে, বোধ হয় তাহার মনে কোন গুরুতর দোষাবহ অকথ্য বিষয় উদিত হইয়া থাকিবে সুশীলতা বশতঃ প্রকাশ করিতে পারে নাই। পরে প্রকাশ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন তোমার অন্তঃকরণে কি কোন অসদ্ভাবের উদয় হইল? দুরাত্মা সবিষাদ বচনে বলিল মহাশয় কোন দুর্ভাবনা যদ্যপি আমার অন্তঃকরণে আবির্ভূত হইয়া থাকে তাহা বলিয়া কি করিব, অপবিত্র ব্যাপারে নিতান্ত নিঃসংশ্রব এতাদৃশ রাজগৃহ অবনীমণ্ডলে কোথায় আছে? তৎপরে কপট সাধুতা প্রকাশ পূর্ব্বক কহিতে লাগিল আমি যাহা সম্পূর্ণরূপে অবগত নহি তাহা শুনিলে মহাশয়ের মনে অসুখ জন্মিতে পারে অতএব শুনিবার আবশ্যক নাই, ক্ষমা করুন। আমার দুর্ভাবনার বিষয় বিদিত হইলে আপনার আনন্দ বা মঙ্গল হইবার সম্ভাবনা নাই অপর সামান্য সংশয় দ্বারা যশশ্চন্দ্র কলঙ্কাঙ্কিত হয় না। এই সকল ইঙ্গিত বাক্যে ওথেলোর অন্তঃকরণ সন্দেহ পূর্ণ ও সাতিশয় ক্ষুব্ধ হওয়াতে যখন বিজাতীয় ক্রোধ ও শোকের আবেগ প্রকাশ হইতে লাগিল তখন দুরাত্মা তাহার শান্ত্বনা নিমিত্ত কপট ভাবে কহিল আমার এ সমস্ত বাক্যে সন্দিহান হইবেন না। পরে এরূপ চাতুর্য্য সহকারে সংশয় নিরাকরণ নিমিত্ত কথা কহিতে লাগিল যে তাহাতে উত্তরোত্তর অধিক সন্দেহ উৎপন্ন হইল। অতএব ওথেলো সন্দেহাকুলিত চিত্তে কহিলেন আমি জানি আমার রমণী পরমা সুন্দরী, লোক সংসর্গ এবং আমোদ প্রমোদ ভাল বাসে, স্বাতন্ত্র্যাবলম্বন পূর্ব্বক সকলের সঙ্গে কথা কহে, এবং নৃত্য গীত ক্রীড়াতে অনুরাগিণী। আন্তরিক ধর্ম্ম জ্ঞান থাকিলেই এই সমস্ত গুণ বলিয়া গণ্য হয় নচেৎ এ সকল অনিষ্টের আলয়। যাহাহউক বনিতার ব্যভিচার অবধারণ করিবার অগ্রে অবশ্য প্রমাণ অনুসন্ধান করিব। ইয়াগো ওথেলোর প্রমাণের কথায়, মৌখিক আহ্লাদ প্রকাশ করিয়া কহিল বস্তুতঃ এতদ্বিষয়ের কোন নিদর্শন নাই তবে আপনি স্বীয় সহধর্ম্মিণীর চরিত্র পরীক্ষা করিতে পারেন, যদি তাহা করেন ক্যাশিও যখন তাহার নিকটে থাকে তখন করিবেন। কিন্তু আমি একটা সার কথা কহিয়া রাখি আপনি স্ত্রীলোকের বিষয়ে নিতান্ত সন্দিগ্ধ চিত্ত হইবেন না এবং একান্ত নিশ্চিন্তও থাকিবেন না। আমি স্বদেশীয় অঙ্গনাগণের রীতি প্রকৃতির বিষয় আপনা অপেক্ষা ভাল জানি। বেনিস্দেশীয় সীমন্তিনীরা ভূরি২ ক্রীড়া স্বামিকে দর্শাইতে অসমর্থা কিন্তু পরমেশ্বরকে নির্ভয়ে দর্শাইয়া থাকে। মহাশয় মনে করুন্ দেখি দেস্দেমনা জনককে কিরূপ প্রবঞ্চনা করিয়া আপনাকে বর মাল্য দান করিয়াছিলেন। এবম্প্রকার গোপনে পরিণয় সমাধা করেন যে তাহাতে তদীয় প্রাচীন পিতা আপনাকে মায়াবী বলিয়া নিশ্চয় করিলেন। এই সকল বাক্যে ওথেলোর চিত্ত একেবারে বিকৃত হইয়া উঠিল এবং তিনি ক্রোধমূর্চ্ছিত হইয়া প্রগাঢ় সন্দেহান্বিত হইলেন। শেষে মুক্তকণ্ঠে কহিলেন আমার বনিতা স্বীয় পিতাকে প্রতারণা করিয়াছে একথা যথার্থ অতএব পতিকে প্রবঞ্চিত করিবে অসম্ভব নয়।
ইয়াগো অন্তর্হৃষ্ট হইয়া বাহ্য বিষাদ প্রদর্শন পুরঃসর কহিল আমি আপনার ক্রোধের হেতু হইলাম আমাকে ক্ষমা করুন্। তাহার বাক্যে ওথেলো যদিও মনোমধ্যে মহা সন্তাপ প্রাপ্ত হইতে লাগিলেন তথাপি আকৃতি বিকৃতি দ্বারা সে ভাব প্রকাশ না করিয়া কহিলেন এতদ্বিষয় সংক্রান্ত অন্য কোন বিবরণ যদি জ্ঞাত থাক বর্ণনা করিয়া বল! ইয়াগো স্বীয় বয়স্য ক্যাশিওর কুৎসা করিতে যেন কোন প্রকারেই ইচ্ছুক নহে এতাদৃশ ভাব প্রদর্শন পূর্ব্বক তাহার দোষ খণ্ডনের অনেক কথা কহিয়া ওথেলোর স্মরণ করিয়া দিল দেস্দেমনা কেমন প্রাগল্ভ্যাবলম্বন পূর্ব্বক স্বদেশীয় সুরূপ পুরুষ দিগকে অবজ্ঞা করত আপনাকে (কাফ্রিকে) পরিণয় করিল। ঐ অবলার মনে সদসদ্বিবেচনার বল থাকিলে কি এরূপ হইতে পারিত? গুণাগুণ বিবেচনা থাকিলে কদাপি আপন দেশের মনোহর রূপ লাবণ্য সম্পন্ন যুবকগণকে আপনকার সঙ্গে তুলনা করিয়া অগ্রাহ্য করিতে পারিতেন না। খল ইয়াগো এতৎ কথনাবসানে সেনানীকে এই মন্ত্রণা দিল আপনি ক্যাশিওর প্রতি অনুগ্রহ করিতে স্বীকার করিয়াছেন, কিয়ৎ কাল বিলম্ব করুন, তাহা হইলে দেখিতে পাইবেন দেস্দেমনা তাহার নিমিত্ত কি প্রকার আগ্রহ সহকারে আপনকার নিকট প্রার্থনা করেন এবং তাহাতেই উল্লেখিত বিষয় সপ্রমাণ হইবেক। অনন্তর ঐ দুরাত্মা ক্যাশিওর সহিত সাক্ষাৎ করিয়া স্বীয় অভিসন্ধি সিদ্ধির আশয়ে পরামর্শ দিল তুমি আপনার প্রার্থনা সুসিদ্ধি নিমিত্ত দেস্দেমনার শরণাপন্ন হও। তিনি সর্ব্বদা তোমার প্রশংসা করত বিশেষ যত্ন করিলে সেনাপতি সানুকূল হইয়া ত্বরায় তোমার প্রতি অনুগ্রহ বিতরণ করিবেন। কিন্তু ঐ পাপাত্মা সুশীলা দেস্দেমনার এই মধ্যস্থতাতেই দোষারোপণ দ্বারা আত্ম সংকল্প সাধনের এরূপ ষড়যন্ত্র করিল যে ঐ মহানুভবা মহিলার কারুণ্য প্রকৃতি তাঁহার কলঙ্কের নিদান ও মহদ্গুণ সকল বিনাশের হেতু হইল।
ইয়াগো ক্যাশিওকে উক্তরূপ পরামর্শ প্রদানানন্তর ওথেলোর সান্নিধানে গিয়া কহিল মহাশয় তখন যে বিষয়ে কথোপকথন হইতেছিল সে বিষয়ের যাবৎ প্রকৃষ্ট প্রমাণ প্রাপ্ত না হন তাবৎ পর্য্যন্ত স্বীয় প্রেয়সীকে নির্দোষা বিবেচনা করা উচিত। ওথেলো তাহার উপদেশানুসারে ধৈর্য্যাবলম্বন স্বীকার করিলেন কিন্তু সাতিশয় বিক্ষুব্ধচিত্ততা প্রযুক্ত অন্তঃসন্তাপে জর্জ্জরিত হইতে লাগিলেন কোন প্রকারে কিঞ্চিন্মাত্র শান্তি লাভ করিতে পারিলেন না। পূর্ব্বে প্রিয়া সমভিব্যাহারে পানীয় মাত্র পানে যেরূপ আপ্যায়িত হইতেন এক্ষণে পীয়ূষ নিষেবণ, রাকা নিশাকর সন্দর্শনেও তাদৃশ আনন্দ বোধ হইল না। অপিচ বৈষয়িক ব্যাপার নির্ব্বাহেও তাঁহার বৈরক্তি হইতে লাগিল। অগ্রে অস্ত্র শস্ত্র নয়ন গোচর হইলে উল্লাসিত হইতেন ইদানীং ধনু ধারণ করিয়াও বিমনস্কতা বশতঃ আমোদিত হইলেন না। অপর ব্যূহী কৃত সেনা ও প্রোড্ডীয়মানা জয়পতাকা সন্দর্শনে এবং রণ তুরীর নিনাদ ও সমর তুরঙ্গমের হ্রেষারব শ্রবণে চিত্ত প্রফুল্লতা জন্মিয়া তাঁহার কতই উৎসাহ হইত এক্ষণে সমুদায় নির্ব্বাণ প্রাপ্ত হইয়া গেল। ফলতঃ সর্ব্বপ্রকার বিষয়ে ঔৎসুক্য অপগত হওয়াতে তিনি ক্ষিপ্ত প্রায় হই লেন। কখন বনিতাকে পতিতা বলিয়া বিবেচনা করিতে লাগিলেন কদাচিৎ বা ব্যভিচারিণী বোধে ঘৃণা করিলেন। কোন সময়ে ইয়াগোকে সরল বিবেচনা করিলেন কখনবা খল বলিয়া তাহার উত্থাপিত বিষয়ের অলীকতা সন্দেহ করিতে লাগিলেন। কদাচিৎ মনে২ বিবেচনা করিলেন তাদৃশী কথাকে কর্ণ কুহরে স্থান দান না করিলেই ভাল হইত, কদাচিৎ বা আপনা আপনি মীমাংসা করিলেন যাবৎ বিশিষ্ট প্রমাণ প্রাপ্ত না হওয়া যায় তাবৎ দেস্দেমনা যে আমা অপেক্ষা ক্যাশিওর প্রতি সাতিশয় সন্তুষ্ট এমত অনুমান করা অযুক্ত। মহানুভব সেনাপতি অন্তঃকরণের বৈকল্য বশতঃ এই রূপ ব্যাকুল হইয়া কালক্ষেপ করিতে লাগিলেন। এক দিন ইয়াগোকে আহ্বান করিয়া প্রীতি প্রদর্শন নিমিত্ত তাহার গলে হস্তার্পণ পূর্ব্বক পদ বিহার করিতে২ জিজ্ঞাসা করিলেন দেস্দেমনার দোষ বিষয়ে কি২ প্রমাণ আছে কহ দেখি। পরে প্রণয়িনীর প্রণয় স্মরণ হওয়াতে কহিলেন যদি মিথ্যা হয় তবে তৎক্ষণাৎ তোমাকে শমন সদনের অতিথি করিব। এই কথায় ইয়াগো কৃত্রিম কোপ প্রকাশ পূর্ব্বক ধূর্ত্ততা করিয়া বলিল আমি সততা করিয়া দোষী হইলাম, আপনি কখন স্বীয় রমণীর করে একখান বিচিত্র করবসন অবলোকন করিয়াছেন কি না? ওথেলো বলিলেন আমিই একখণ্ড সুরঙ্গ রুমাল গৃহিণীকে প্রদান করি এবং তাহাই আমার প্রণয় বন্ধনের আদ্য উপায়ন। ইয়াগো বলিল মহাশয় সেই রুমাল দিয়া ক্যাশিওকে মুখ মার্জ্জনা করিতে দেখিয়াছি। ওথেলো কহিলেন তোমার একথা যদি সত্য হয় তবে তাহাদের পরস্পর আসক্তি স্পষ্ট প্রকাশ হইবে পরন্তু এরূপ হইলে সেই দুরাচার ও দুরাচারিণী দুই জনের বিশেষ দণ্ড না করিয়া ক্ষান্ত হইব না। প্রথমতঃ তিন দিনের মধ্যেই ক্যাশিওকে কৃতান্তের করাল দশনে নিক্ষেপ করিব। পরে সেই নীচ প্রকৃতি পাপীয়সীর মৃত্যু সাধনার্থ উপায় করিব।
বনিতার পাতিব্রত্যে সন্দেহ জন্মিলে চিত্ত সর্ব্বদা শঙ্কা কুল হয় এবং যৎসামান্য বিষয়কেও উপনিষদের তুল্য বলবৎ প্রমাণ করিয়া বোধ করে। পত্নীর এক খান করবসন ক্যাশিওর করে দেখিয়াছে এতাবন্মাত্র শ্রবণেই ওথেলো তাহাকে জায়ার জার নিশ্চয় করিয়া তদীয় অসু বিনাশে উদ্যত হইলেন। সে ব্যক্তি তাঁহার পরম সুহৃদ্, কিপ্রকারে তাহা পাইল, একবার জিজ্ঞাসা করিবারও অপেক্ষা করিলেন না। ফলতঃ পতি পরায়ণা দেস্দেমনা স্বামির প্রণয় বন্ধনের নিদর্শন রূপ করবসন ক্যাশিওকে কেন প্রদান করিবেন? ভ্রষ্টতা ব্যতীত তদ্রূপে পতির বিপ্রিয় করণেচ্ছা হয় না। তিনি এবং ক্যাশিও উভয়ে নির্দোষ ছিলেন কাহারো মনে কদাপি কুভাবের আবির্ভাব হয় নাই। দুরাত্মা ইয়াগো আপনার কথা সপ্রমাণ করিয়া কৃতকার্য হইবার আশয়ে ষড়যন্ত্র করিয়া স্বীয় বনিতাকে দেস্দেমনার নিকট প্রেরণ করে এবং তাহাকে এই বলিয়া দেয় তুমি সেনানীর রমণীর সন্নিধানে গমন পূর্ব্বক প্রার্থনা কর আপনার সেই অপূর্ব্ব রুমালের চিত্র দেখিয়া এক খান করবসন প্রস্তুত করিতে বাসনা করিয়াছি। অতএব কিয়ৎ দিনের নিমিত্ত প্রদান করুন। সরলা দেস্দেমনা তাহার হস্তে সেই রুমাল প্রদান করিলে গোপনে অপহরণ পুরঃসর ধূর্ত্ত ইয়াগো ক্যাশিওর আবাসে তাহা স্থাপন করিয়াছিল ঐ ব্যক্তি অজ্ঞানতঃ তাহা গ্রহণ করাতে দুরাত্মার বাক্য পাকতঃ সপ্রমাণ হইল।
ওথেলো করবসনের কথা শ্রবণানন্তর পত্নীর নিকট গমন পূর্ব্বক শিরঃপীড়ার ব্যপদেশে কহিলেন আমি মস্তকের বেদনায় অস্থির হইয়াছি সেই রুমাল খান আন দেখি তদ্বারা শিরোবন্ধন করি। দেস্দেমনা পতির পীড়ার কথা শ্রবণে ব্যস্ত সমস্ত হইয়া তৎক্ষণাৎ একখান রুমাল আনিয়া দিলে তিনি কহিলেন এ নয়, আমি তোমাকে যে খানা দিয়াছিলাম সেই খানা দাও। কিন্তু দেস্দেমনা সে রুমাল কোথায় পাইবেন হস্তান্তর করিয়া তাহা হারাইয়া ছিলেন, সবিনয় বচনে তদ্বিবরণ নিবেদন করিলেন। ইহাতে ওথেলো জাত ক্রোধ হইয়া কহিলেন সে কি? তবে তুমি গুরুতর অপরাধ করিয়াছ। সে রুমাল সামান্য বসন নয়, মিসর দেশীয়া এক ডাকিনী আমার জননীকে তাহা প্রদান করিয়াছিল। সেই স্ত্রী মনুষ্যের মনের কথা কহিতে পারিত, আমার মাতাকে রুমাল দিয়া বলিয়াছিল যাবৎ যত্ন পূর্ব্বক রক্ষা করিবে তাবৎ তোমার স্বামী তোমাকে ভাল বাসিবেন কিন্তু রুমাল নষ্ট অথবা কাহাকেও বিতরণ করিলে ব্যতিক্রম জন্মিবে অর্থাৎ পূর্ব্বে যত অনুরাগ করিবেন পরে ততই বিরাগ দর্শাইবেন। জননী ঐ অদ্ভুত কর বসন মৃত্যুকালে আমার করে সমর্পণ করিয়া আজ্ঞা করিয়া যান যদি কখন দার পরিগ্রহ কর স্বীয় প্রমদাকে এই রুমাল প্রদান করিও। আমি মাতার অনুমতি ক্রমে পরম যত্নে সেই বস্ত্র খণ্ড নয়ন তুল্য অমূল্য নিধি বোধে রক্ষা করিয়াছিলাম এখন তুমি তাহা হারাইলে আপনিই ইহার ফল অনুভব করিবে। দেস্দেমনা এতদ্বচন শ্রবণ করিয়া ভয়ে কম্পিত কলেবরা হইলেন এবং বিস্ময় ও বিষাদ প্রকাশ পুরঃসর জিজ্ঞাসা করিলেন নাথ এ কথা কি সত্য? ওথেলো কোপাবেশে উত্তর দিলেন আমি কি অলীকামোদ করিতেছি? অবনি মণ্ডলে এক ভবিষ্যদ্বক্ত্রী আবির্ভূত হইয়া দ্বিশত বর্ষ জীবিতা ছিলেন। তিনি নানাবিধ দুরূহ দৈব কর্ম্মের অনুষ্ঠান পূর্ব্বক ঐ মায়াময় রুমাল নির্ম্মাণ করেন। দেস্দেমনা এ সমস্ত শ্রবণে ভয়ে কম্পান্বিতা হইলেন এবং সেই অদ্ভুত রুমাল হৃত হওয়াতে মনে করিলেন বুঝি করবসনের সঙ্গে স্বামির স্নেহও হারাইলাম। ওথেলো রুমালের বৃত্তান্ত বর্ণনানন্তর কোপে কম্পান্বিত হইয়া তাহার নিমিত্ত বনিতাকে পুনশ্চ উত্তেজনা করিতে লাগিলেন এবং অপহৃত হওয়ার কথায় অবিশ্বাস করত বাহির করিয়া আনিতে বারম্বার বলিলেন। দেস্দেমনা কান্তের কোপ শান্তি করণাশয়ে নানা প্রকার স্তবস্তুতি ও প্রবোধ বাক্য কহিলেন তৎপরে পরিহাস ও আমোদ দ্বারা চিত্ত প্রসন্নতা সাধনের মানসে সহাস্য বদনে বলিলেন নাথ ক্যাশিওর প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ নিমিত্ত আমি বার ম্বার ব্যগ্রতা করিয়া থাকি তাহাতে আপনার আন্তরিক ইচ্ছা নাই তন্নিমিত্ত কি এই বিভীষিকা ও ভর্ৎসনা হইতেছে। ইহা কহিয়া ক্যাশিওর প্রতি প্রসন্নতা সাধনার্থ তাহার প্রশংসা করিতে লাগিলেন। ওথেলো ঐ ব্যক্তিতে জাতাশঙ্ক হইয়াছিলেন তাহারই গুণানুবাদ বনিতার বদন হইতে অনর্গল বিনির্গত শুনিয়া ক্রোধে প্রজ্বলিত হওত সমুচিত বিরাগ প্রদর্শন পুরঃসর তৎক্ষণাৎ গৃহ হইতে বহির্গত হইলেন। তখন দেস্দেমনা মনে করিলেন স্বামী আমার প্রতি সন্দিহান অথবা বিরক্ত হইয়াছেন সংশয় নাই।
কিন্তু তিনি ওথেলোর নিকট কি নিমিত্ত অপরাধিনী হইলেন বিবেচনা করিয়া স্থির করিতে পারিলেন না। তৎপরে মনে করিলেন আমি স্বীয় অন্তঃকরণ মধ্যে একবার পতি নিন্দার সঙ্কল্প করিয়াছিলাম তাহারই বুঝি এই ফল হইল। তদনন্তর বিতর্ক করিতে লাগিলেন বোধ হয় বেনিস্ হইতে কোন কুসংবাদ আসিয়া থাকিবে অথবা রাজ সংক্রান্ত কোন বিপদ ঘটিয়া থাকিবে কেননা স্বামিকে সাতিশয় চিন্তাকুল দেখিতেছি, ইহাঁতে পূর্ব্বকার মাধুর্য্য ভাবের লেশ মাত্র নাই। আর বার বিবেচনা করিলেন মনুষ্যদের ভাব দেববৎ চিরকাল সমান থাকে না, বিবাহের অগ্রে যেরূপ সমাদর ও ভাব ভক্তি দেখায় পরিণয় সম্পন্ন হইলে তাহার অন্তর্ধান হয় তাহাই বুঝি হইল পরন্তু স্বামির নির্দয়তা দর্শনে আপনাকে অভিশপ্ত জ্ঞান করিলেন।
ওথেলো পুনর্ব্বার পত্নীর সহিত সাক্ষাৎ করিয়া তিরস্কার করত স্পষ্টরূপে কহিলেন তুই পাপীয়সী অতি কৃতঘ্না, পর পুরুষে প্রণয়িনী হইয়াছিস্। এই রূপ ভর্ৎসনানন্তর স্বয়ং বিলাপ করিতে লাগিলেন। কিন্তু পরপুরুষ কে? তাহার নাম গ্রহণ করিলেন না। দেস্দেমনা স্বামির কর্কশ বচন শ্রবণ ও কার্য্য অবলোকন করিয়া বলিলেন এ কি অদ্ভুত কাণ্ড আপনি কেন বিলাপ করেন? ওথেলো কহিলেন অরে দুশ্চারিণি আমার মহতী সহিষ্ণুতা, আমি সেই শক্তিতে সর্ব্ব প্রকার রোগ দরিদ্রতা অপমান সহ্য করিতে পারি কিন্তু তোর বিশ্বাসঘাতকতায় চিত্ত একেবারে ভগ্ন হইয়াছে। অরে কলঙ্কিনি তরুর মনোহর প্রসূন সন্দর্শনে ও তদীয় সৌরভ আঘ্রাণেই লোকে লালসান্বিত হইয়া থাকে তুইও কি তদ্রূপ লোভনীয় হইলি, তোর জন্ম না হইলে যে শ্রেয়ঃ সম্ভাবনা ছিল। এবম্প্রকারে ঘৃণা করিয়া ক্রোধভরে স্থানান্তর গমন করিলে দেস্দেমনা চমৎকৃতা ও অপমানে ম্রিয়মাণ হইলেন। স্বামির এই অমূলক সন্দেহ এবং তন্নিমিত্ত বিমাননায় কি করিবেন কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হইলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে দুর্ভাবনা বশতঃ নিদ্রা তাঁহার নেত্রদ্বয় আকর্ষণ করিলে সহচরীদিগকে শয্যা প্রস্তুত করিতে কহিয়া তদুপরি আপনার বিবাহের বসন বিস্তীর্ণ করিতে অনুমতি করিলেন আর এই বলিয়া বিলাপ করিতে লাগিলেন লোকে বালকদিগের শিক্ষা নিমিত্ত উৎকৃষ্ট উপায় অবলম্বন পূর্ব্বক ভর্ৎসনা করিয়া থাকে ওথেলো আমাকে তদ্রূপে তিরস্কার করিলে ভাল হইত কেননা এ পক্ষে আমি বালিকা ব্যতীত প্রবীণ নহি।
দেস্দেমনার শয়ন করিবার তাৎপর্য্য এই যে তিনি শয্যাগতা হইলে ওথেলোও শয়ন করিবেন কিন্তু সেনাপতির মনে প্রণয়ের সঞ্চার মাত্র ছিল না, কেন পুনর্ব্বার তাঁহার সংস্পর্শে যাইবেন? অতএব ঐ অবলা বহু ক্ষণ প্রতীক্ষা করিয়া চিত্তের ব্যাকুলতা নিমিত্ত ক্রমে নিদ্রাভিভূত হইলেন। পরে ওথেলো বনিতার ব্যভিচারের প্রতিফল প্রদানাশয়ে জিঘাংসায় গৃহ মধ্যে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন ভার্য্যা গভীর নিদ্রায় অচেতন হইয়া শয়ানা রহিয়াছে ইহাতে তদবস্থায় করবালাঘাত দ্বারা শোণিতোৎপাদন অথবা সুবর্ণ বর্ণ শরীর বিক্ষত করিতে ইচ্ছা হইল না কিন্তু তাঁহার এই ক্ষণিক করুণোদয়েও দ্রঢ়ীয়সী প্রতিজ্ঞা ভগ্না হইল না যেহেতু কহিতে লাগিলেন যদিস্যাৎ বিনষ্ট না করিয়া পরিত্যাগ করি তাহা হইলে আমার ন্যায় অন্যের প্রতি বিশ্বাস ঘাতকতা করিবে। পরে জন্মের মত দয়িতার আশ্লেষ সমাপন মানসে তদীয় নির্ম্মল বদন চুম্বন করিলেন। তাহাতে মাধুর্য্য রসের আস্বাদ হওয়াতে পুনঃ২ চুম্বন আরম্ভ করিলেন অবশেষে শোকাভিভূত হইয়া রোদন করিতে২ কহিলেন প্রিয়ে এ আমার প্রেমাশ্রু নহে।
ওথেলোর বারম্বার চুম্বনে দেস্দেমনার নিদ্রাভঙ্গ হইল। তিনি জাগরিত হইয়া চক্ষুরুন্মীলন পূর্ব্বক অবলোকন করিলেন স্বামী সম্মুখে বিকট দশনে স্বীয়াধর দংশন এবং লোহিত নয়ন ঘূর্ণায়মান করত করাল কাল প্রায় দণ্ডায়মান। পতির এবম্প্রকার ভয়ানক আকার নিরীক্ষণ মাত্রে নিশ্চয় করিলেন এই আমার সংহারক মূর্ত্তি। তদনন্তর ওথেলো গভীর স্বরে গর্জ্জন করিতে২ কহিলেন অরে পাপীয়সি মরণার্থ প্রস্তুত হইয়া পরমেশ্বরের নাম গ্রহণ কর, এখনি তরবারি প্রহারে তোর প্রাণ সংহার করি। ইহাতে পতিপ্রাণা দেস্দেমনা প্রাণ ভয়ে সাতিশয় কাতরতা পুরঃসর অনুগ্রহ প্রার্থনা করিলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন কি অপরাধে প্রাণ দণ্ড কর। জিঘাংসু সেনানী উত্তর করিলেন এক্ষণে ক্যাশিও তোর প্রণয় ভাজন হইল, আমার প্রদত্ত রুমাল প্রেম বশতঃ তাহাকে প্রদান করিয়াছিস্। দেস্দেমনা এতৎ শ্রবণে বিস্ময় প্রকাশ পূর্ব্বক আত্ম অনপরাধ সপ্রমাণ করিতে উদ্যম করিতেছেন ইত্যবসরে ওথেলো শয্যা বসন দ্বারা তদীয় বদন বন্ধন পূর্ব্বক শ্বাসাবরোধ করিয়া গ্রাণ সংহার করিলেন।
অনন্তর ক্যাশিও আঘাত প্রাপ্ত হইয়া শোণিতাক্ত শরীরে ওথেলোর সন্নিধানে ঐ ভবন মধ্যে আনীত হইলেন। দুরাত্মা ইয়াগো তাহার জীবন বিনাশ নিমিত্ত এক ব্যক্তিকে নিযুক্ত করিয়াছিল। সে জীবন সংহার বিষয়ে কৃতকার্য্য হইতে পারে নাই অস্ত্রাঘাতে ক্যাশিওর শরীর ক্ষত বিক্ষত করিয়া শেষে শান্তিরক্ষকদিগের ভয়ে আপনার নিযোক্তা কর্ত্তৃক স্বয়ং নিহত হয়। ঐ ব্যক্তির অঙ্গবস্ত্র হইতে একখান লিপি বহির্গত হওয়াতে তদ্দ্বারা পরে প্রকাশ হইল ক্যাশিও নিতান্ত নির্দোষ, দুরাত্মা ইয়াগোর দুর্মন্ত্রণা বশতঃ সেনানীর অলীক আশঙ্কা ও নানা দুর্ঘটনা ঘটিল। সে যাহা হউক। ক্যাশিও শোণিতাক্ত দেহে ওথেলোর সমীপে আনীত হইলে আদৌ প্রাণ পরিক্ষণ নিমিত্ত ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া পরে জিজ্ঞাসা করিলেন আমি কি অপরাধ করিলাম যে আমার প্রাণদণ্ড নিমিত্ত ইয়াগো আদিষ্ট হইয়াছিলেন।
অনন্তর দুরাত্মা ইয়াগোর ষড়যন্ত্র প্রকাশিত হইলে ওথেলোর হৃদয় অকস্মাৎ বজ্রাঘাত তুল্য অনুতাপের আবেগে বিদীর্ণ হইতে লাগিল। তখন স্পষ্ট দেখিতে পাইলেন বিনা অপরাধে ধর্ম্মপরায়ণা পতিব্রতা পত্নী হত্যা করিয়া মহা পাপী হইলাম। এবং পরম প্রেয়সীর পরিগ্রহাবধি সদ্ভাব ও প্রণয় স্মরণ পথে আবির্ভূত হওয়াতে দারুণ শোকানলে দগ্ধ হইতে লাগিলেন। পরিশেষে প্রাণ ধারণে অসহিষ্ণু হইয়া প্রিয়তমার মৃত শরীরের উপরি শয়ান হইলেন এবং স্বহস্তে আত্ম গ্রীবায় তীক্ষ্ণ তরবারি আঘাত করত ক্লেশের শেষ করিলেন।
নিকটস্থ লোকেরা এই সমস্ত ভয়ানক ব্যাপার নিরীক্ষণ করিয়া ভয়ে কম্পান্বিত এবং বিস্ময়ে ব্যাকুল হইল কেননা যে ওথেলোর সুখ্যাতি পৃথিবী মণ্ডল ব্যাপিয়াছিল তাঁহার এই দুর্দশা ঘটিল। ফলতঃ ঐ মহাবীর সেনাপতি স্বীয় সারল্য স্বভাব প্রযুক্ত ধূর্ত্তের আচরণ অনুসন্ধান করেন নাই। যাবৎ শঠের প্রবঞ্চনা জালে বদ্ধ না হইয়াছিলেন তাবৎ তাঁহার পরম প্রেমাস্পদ বনিতা ও অকৃত্রিম প্রণয় পবিত্র মিত্র ক্যাশিওর প্রতি স্নেহ এবং অনুরাগ সম্পূর্ণ ছিল কিন্তু সমীক্ষ্য কারিতা না থাকাতে হঠাৎ শঠের শঠতায় পড়িয়া তাহা বিনষ্ট করিয়া শেষে আত্মহত্যা করিলেন। পরন্তু তাঁহার যে বীর্য্যবৎ নয়ন হইতে জন্মাবধি কদাপি অশ্রুবিন্দু বিনির্গত হয় নাই ভ্রান্তি প্রতীত হইলে তাহা হইতে অনর্গল বারি ধারা নিঃসৃত হইয়াছিল। যাহা হউক এবম্প্রকারে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইলেও তাহার শৌর্য বীর্য্যাদি গুণ নিকর লোক মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল এবং যে পাপাত্মার দুর্মন্ত্রণা প্রভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটে সে ব্যক্তিও বিনা দণ্ডে নিষ্কৃতি পায় নাই। সেনানীর উত্তরাধিকারী ব্যবস্থানুসারে বিবিধ যন্ত্রণা দিয়া তাহার প্রাণ দণ্ড করত সমুচিত প্রতিফল দেন, অনন্তর বেনিস্ রাজ্যে মহানুভব সেনাপতির পরিদেবনীয় মৃত্যু সংবাদ প্রেরণ করেন ইতি।
সেক্সপিয়র।
শীতকালের উপন্যাস।
শিশিলী উপদ্বীপের লিয়নিতিস্ নামা নরপতি স্বীয় ধর্ম্ম পরায়ণা মনোহর রূপ বরবর্ণিনী সহধর্ম্মিণী হারমিয়নী সহ পরম কৌতুকে কাল যাপন করিতেন এবং প্রণয়িনীর সঙ্গে প্রেম রঙ্গে অনির্ব্বচনীয় সুখানুভব হওয়াতে কৃতার্থম্মন্য হইয়া হৃদয়ঙ্গম মিত্রকে আপনার ভার্য্যা ভাগ্য প্রদর্শন পূর্ব্বক চিত্ত চকোর পরিতৃপ্ত করিবেন এতদর্থ সতত সমুৎসুক ছিলেন। অতএব আবালবন্ধু বোহিমিয়াধিরাজ, পলিক্সেনিস্কে আপন ভবনে আনয়ন নিমিত্ত বারম্বার আহ্বান করিতেন। শৈশবকালে তাঁহাদের এক সঙ্গে বিদ্যাভাস এবং সর্ব্বদা একত্র সহবাস থাকাতে উভয়ে পরস্পর স্নেহ সূত্রে দৃঢ়রূপে বদ্ধ ছিলেন কিন্তু তদনন্তর দুই জনেরই পিতৃ বিয়োগ হওয়াতে স্ব২ পৈতৃক রাজ্যে প্রত্যাগমন পূর্ব্বক সিংহাসনাধিরূঢ় হন সুতরাং তদবধি বহুকাল যাবৎ অন্যোন্যের সাক্ষাৎ লাভ হয় নাই। লিপিযোগে ও দূতদ্বারা পরস্পর সমাচার গ্রহণ এবং সময়ে২ উপহার প্রেরণ করিতেন।
বোহিমিয়াধিপতি পলিক্সেনিস্ পরম সুহৃৎ লিয়নিতিসের বারম্বার অভ্যর্থনায় বাধ্য হইয়াছিলেন। বন্ধুর অনুরোধ রক্ষা না করা মূঢ়ত্বের চিহ্ন বিবেচনা করিয়া কিয়দ্দিনানন্তর তাহার সহিত সাক্ষাৎ করণার্থ স্বরাজ্য হইতে যাত্রা করত শিশিলীর রাজধানী নগরে গিয়া উপস্থিত হইলেন।
পলিক্সেনিস্ শিশিলীর রাজধানীতে উপনীত হইবামাত্র লিয়নিতিস্ পরমসমাদর সহকারে তাহার প্রত্যুদ্গমন করিলেন এবং পরস্পর সাক্ষাৎকারলাভে সাতিশয় সন্তোষান্বিত ও মহা হর্ষিত হইলেন। পরে শিশিলীরাজ আপন প্রেয়সী মহিষীকে বন্ধুর অভ্যর্থনা করিতে অনুরোধ করিয়া মিত্রের আগমন নিমিত্ত আনন্দোৎসব করিলেন এবং উভয়ে একাসনে অধিবেশন পুরঃসর কথোপকথন করত অনির্বচনীয় সুখানুভব করিতে লাগিলেন। উভয়েই পাঠাবস্থার বৃত্তান্ত সকল বিশেষতঃ বাল্য কালের লীলা স্মরণ পুরঃসর কথোপকথন করিতে কৌতুকী হইলেন। লিয়নিতিস্ সে সমস্ত বিষয় আপন প্রিয়তমা হারমিয়নীর নিকট ইতিপূর্বে সবিশেষ বর্ণন করিলেও তিনি ঐ কথোপকথনের মধ্যে থাকিয়া হর্ষে পুলকিত হইতে লগিলেন।
বোহিমিয়াধিপতি পলিক্সেনিস্ মিত্রের সহিত পরমামোদে কিয়ৎ কাল শিশিলীতে অবস্থিতি করিয়া স্বদেশে প্রত্যাগমনের উদ্যোগ করিলেন। তাহাতে লিয়নিতিস্ এবং তাঁহার বনিতা বিমর্ষান্বিত হইলেন এবং উভয়ে একত্র হইয়া বয়স্যকে যথেষ্ট বিনয় সহকারে কহিতে লাগিলেন আরো কতক দিন অবস্থান করিলে অপর্যাপ্ত তৃপ্তি প্রাপ্ত হই।
কিন্তু অতঃপর নৃপাঙ্গনা হারমিয়নীর অকস্মাৎ অসৌভাগ্যোদয়ের উপক্রম হইল কেননা পলিক্সেনিস্ স্বদেশ গমনে সাতিশয় সমুৎসুক হইয়াছিলেন মিত্র বারম্বার অবস্থিতি করিতে অনুরোধ করিলেও জিগমিষা পরিত্যাগ করিলেন না কিন্তু যখন ঐ মহিলা সুমধুর ও প্ররোচক বচনে বিনয় পুরঃসর কিয়ৎকাল অবস্থিতি করিতে উপরোধ করিতে লাগিলেন তখন তদীয় সুশীলতা ও বিনয়ৌদার্য্যে বিশেষতঃ পরমার্য্য চরিত্রে সন্তুষ্ট থাকাতে তাঁহার কথায় স্বীয় যাত্রা রহিত করিলেন। লিয়নিতিস্ মিত্রের সচ্চরিত্র ও জিতেন্দ্রিয়তা যদিও উত্তমরূপে অবগত ছিলেন এবং আপন বনিতারও পাতিব্রাত্য ও ধর্ম্মনিষ্ঠার প্রমাণ সর্ব্বদা প্রাপ্ত হইতেন তথাপি এই ব্যাপারে তাঁহার অন্তঃকরণে উৎকট সন্দেহ ও দারুণ ঈর্ষার উদয় হইল। হারমিয়নী কেবল স্বামির সন্তোষ নিমিত্ত তদীয় সুহৃৎ পলিক্সেনিসের প্রতি বিশেষ যত্ন করিয়াছিলেন কিন্তু তাহাতে এক্ষণে বিপরীত ফল ফলিবার উপক্রম হইল। তাঁহার পরম প্রণয়ি পতির চিত্ত স্নেহশূন্য হইয়া ঈর্ষানলে দগ্ধ হইতে লাগিল। এবং অকৃত্রিম প্রণয়ানুরক্ত প্রিয় ভর্ত্তা নিতান্ত নির্দয় দুরাত্ম বৈরিবৎ ব্যবহারে প্রবৃত্ত হইলেন কেননা তিনি কেমিলো নামক এক জন পারিষদের নিকট আপনার মনের সন্দেহ ব্যক্ত করত বিষ প্রদান দ্বারা পলিক্সেনিসের প্রাণ বিনাশ করিতে আজ্ঞা দিলেন।
কেমিলো অতি সাধু ও সদ্বিবেচক পুরুষ ছিলেন। পরিনাম দর্শিনী মনীষা দ্বারা বিবেচনা করিয়া নিশ্চয় করিলেন লিয়নিতিসের সন্দেহ সমূলক নহে। অতএব তাঁহার আজ্ঞাক্রমে পলিক্সেনিস্কে বিষপান করাইলেন না গোপনে রাজার জিঘাংসার মানস প্রকাশ করিয়া অবিলম্বে শিশিলী হইতে পলায়ন পরায়ণ হইতে পরামর্শ দিলেন এবং আপনিও তৎসমভিব্যাহারে প্রস্থান করিতে উদ্যত হইলেন। পলিক্সেনিস্ সন্দিগ্ধ চিত্ত মিত্রের এবম্প্রকার বৈর পারবশ্য বিদিত হইয়া বিস্ময়াপন্ন হইলেন এবং প্রাণ ভয়ে ব্যাকুল হইয়া শশব্যস্ত হওত তৎক্ষণেই কেমিলো সমভিব্যাহারে প্রস্থান করিয়া কিয়দ্দিন মধ্যে আপনার রাজ্যে গিয়া উত্তীর্ণ হইলেন। কেমিলো বিদ্রোহি মিত্রের হস্ত হইতে রাজাকে রক্ষা করাতে রাজ সভার প্রধান পারিষদ ও নৃপতির পরম প্রণয় ভাজন বন্ধু হইয়া মহাসুখে সেই স্থানেই কাল যাপন করিতে লাগিলেন।
পলিক্সেনিস্ পলায়ন করিলে লিয়নিতিস্ তাহার সহিত অপিন বনিতার ব্যভিচার নিশ্চয় করিয়া ক্রোধে প্রজ্বলিত হইলেন এবং কোপ কম্পিত কলেবরে অন্তঃপুর প্রবেশ পূর্ব্বক মহিষীর আবাসে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন রাণী স্বতনয় মেমিলসের সঙ্গে একত্র উপবিষ্টা আছেন এবং কুমার আপন প্রসূতির প্রমোদ নিমিত্ত উপন্যাস কহিতেছে। তিনি অনিবার্য্য ক্রোধের বশম্বদ থাকাতে সন্তানকে স্থানান্তরে রাখিয়া হঠাৎ সহধর্মিণীর কেশাকর্ষণ পুরঃসর কারারূপ এক কুৎসিত অলিয়ে লইয়া গিয়া তাঁহাকে অবরুদ্ধ করিলেন।
মেমিলস্ যদিও অতি শিশু, তথাপি জননীর প্রতি সাতিশয় অনুরক্ত ও যথেষ্ট স্নেহবান থাকাতে সমক্ষে তাঁহাকে তদ্রূপে অপমানিত হইয়া কারাগারে প্রেরিত হইতে অবলোকন করিয়া মনোমধ্যে যৎপরোনাস্তি ব্যথিত হইল এবং অন্তঃকরণের অসুখে অহরহ তাহার শরীর শীর্ণ হইতে লাগিল আর তাহার ক্ষুধা তৃষ্ণা সকলই অন্তর্ধান হইল তাহাতে সকলে অনুমান করিতে লাগিল মাতৃ শোকে তাহার ঈদৃশী দশা হইয়াছে শেষে প্রাণ বিনাশের সম্ভাবনা।
লিয়নিতিস্ রাজা প্রেয়সী মহিষীকে ব্যভিচারাশঙ্কায় কারাবদ্ধ করণানন্তর এপলো দেবের মন্দিরস্থ বিখ্যাত বিজ্ঞ মহান্তের নিকট তদীয় পাতিব্রাত্য ও চরিত্রানুসন্ধান নিমিত্ত শিশিলী দেশের ক্লিয়মিনিস্ ও দাইয়ন্ নামক দুই জন মর্য্যাদাবান্ পুরুষকে দেল্ফস্ নগরে প্রেরণ করিলেন।
এদিকে হারমিয়নী রাণী বন্ধনালয়ে থাকিয়া কিয়ৎকাল গতে পরম রূপবতী এক কুমারী প্রসব করিলেন। বালিকার রূপ লাবণ্য অবলোকনে রাজ মহিষীর অকারণ ক্লেশ দুষিত চিত্তের যথেষ্ট শান্ত্বনা হইল। তিনি কন্যাকে সম্বোধন পুরঃসর সকরুণ বচনে কহিতে লাগিলেন অরে হতভাগ্য নন্দিনি তুমি যদৃিশ দোষ লেশের সম্পর্ক শূন্যা, আমিও তাদৃশী।
শিশলী নিবাসী আন্তিগোনসাভিধ এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির ললনা পালিনা নামিকা কোন দয়ালু অবলা হরমিয়নীর সখী ছিলেন। সেই রমণী দুঃখিনী রাণীর প্রসব সংবাদ প্রাপ্তি মাত্রে কারাগারে গমন পূর্বক রাজমহিষীর এমিলিয়া নাম্নী সহচরীকে কহিল। এমিলিয়া তুমি আমার নাম গ্রহণ পুরঃসর রাজ্ঞীকে জিজ্ঞাসা কর তাঁহার সদ্যঃ প্রসূতা সুতাটী আমাকে বিশ্বাস করিয়া অর্পণ করিতে পারেন কি না? আমার বাসনা এই যে কুমারীকে রাজ সাক্ষাৎকারে লইয়া যাই, নন্দিনী সন্দর্শনে নৃপতির আনন্দ সহকারে করুণোদয় হইবেক কি না নিশ্চয় কহিতে পারি না। কিন্তু বোধ হইতেছে অপত্য স্নেহ অবশ্যই তাঁহাকে আক্রমণ করিবে। রাণীর সহচরী এমিলিয়া এতৎ শ্রবণে হর্ষান্বিত হইয়া অতিমাত্র ব্যগ্রতা সহকারে উত্তর করিল আর্য্যে আপনকার এই আর্য্যাভিপ্রায় অধুনাই রাজ মহিষী সন্নিধানে গমন পূর্ব্বক বিজ্ঞাপন করি, তিনি অদ্য কহিতেছিলেন তাঁহার কোন আত্মীয় স্বজন অথবা বন্ধু বান্ধব সাহস করিয়া যদিস্যাৎ বালিকাটী নৃপাল সমক্ষে লইয়া যায় তাহা হইলে ভাল হয়। পালিনা বলিলেন তবে রাণীকে বিজ্ঞাপন কর তাঁহার সতীত্বের প্রতি সংশয় করিয়া রাজা যে অলীক কলঙ্কারোপ করিয়াছেন তন্নিরাকরণ নিমিত্তও আমি নৃপতি সমক্ষে ভীতি পরিহার পুরঃসর বক্তৃতা করিব। এমিলিয়া কহিল ঠাকুরাণি আপনি রাণীর প্রতি করুণান্বিতা হইয়া এই প্রকারে যে স্নেহ প্রকাশ করিতেছেন এতজ্জন্য পুণ্য পুঞ্জে পরিতুষ্ট হইয়া পরমেশ্বর আপনার মঙ্গল করিবেন। তদনন্তর মহিষীর সদনে গমন পূর্ব্বক তদীয় অকপট সৌহার্দ্য সমন্বিত সখীর সমস্ত উক্তি ব্যক্ত করিল। তাহাতে রাণী আপন নন্দিনী দ্বারা দুর্ভাগ্য দমনাশয়ে ব্যস্ত সমস্ত হইয়া পালিনাকে সম্বোধন পুরঃসর সানন্দ মনে কন্যাটী তাঁহার ক্রোড়ে সমর্পণ করিলেন। তিনি অব্যবহিত পূর্ব্ব ক্ষণে মনে করিতেছিলেন তাঁহার দুরদৃষ্ট বশতঃ কেহ ঐ বালিকাকে ভূপাল সাক্ষাৎকারে লইয়া যাইতে সাহস করিবে না।
পালিনা রাজ কুমারীকে অঙ্কে আরোপণ পূর্ব্বক নৃপ সমীপে গমনোদ্যতা হইলে তাহার স্বামী রাজার ক্রোধাবেগ আশঙ্কায় স্ত্রীকে নিষেধ করিলেন কিন্তু তিনি শুনিলেন না, রাজসম্মুখে উপস্থিত হইয়া দুগ্ধপোষ্যা কন্যাটীকে স্বক্রোড় হইতে অবতারণ পুরঃসর ভূপতির চরণতলে নিক্ষেপ করিলেন। পরে হারমিয়নীর নির্দোষিতা সুচক এক বক্তৃতা এবং নিষ্ঠুরতার নিমিত্ত রাজার অনুযোগ করিয়া অপত্য কলত্রের প্রতি দয়া প্রার্থনা করিলেন। পালিনার এরূপ সাহসিক আচরণে লিয়নিতিস্ রাজার ক্রোধ বৃদ্ধি হইল, ভূপতি ঐ অবলার পতি আন্তিগেনিসের প্রতি আদেশ করিলেন তোমার বনিতাকে আমার দৃষ্টি হইতে দূর করিয়া দাও।
পালিনা গমন কালে এই আশ্বাসে রাজার চরণতলে বালিকাটী রাখিয়া গেলেন যে রাজা নির্জন হইলে নির্দোষ নিরাশ্রয় শিশুর প্রতি দৃষ্টিপাত পূর্ব্বক স্নেহান্বিত হইবেন।
কিন্তু সুশীলা পালিনার উক্ত প্রকার অশ্বাস পরিণামে কেবল ভ্রমময় বোধ হইল যেহেতু তিনি গমন করিবা মাত্র নির্দয় নৃপতি তৎপতি আন্তিগোনসের প্রতি আদেশ করিলেন এই বালিকাটাকে সমুদ্র পারে কোন অরণ্যানী মধ্যে নিক্ষেপ করিয়া আইস যেখানে অবিলম্বে গতাসু হইয়া পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইতে পারে।
আন্তিগোনস্ রাজমন্ত্রি কেমিলোর তুল্য সদ্বিবেচক বা সচ্চরিত্র ছিল না সুতরাং রাজাজ্ঞা প্রাপ্তি মাত্রে অসংশয়ে তাহা পালন করিতে উদ্যত হইল এবং কন্যাটী গ্রহণ পুরঃসর অর্ণব তরি আরোহণ করিয়া সাগর পার স্থিত বিপিন মধ্যে নিক্ষেপ করিতে প্রস্থান করিল।
ভূপতির অন্তঃকরণে আপন বনিতা হারমিয়নীর অরোপিত ব্যভিচারাশঙ্কা বদ্ধমূল হওয়াতে তিনি ঈদৃশ বিদ্বেষ বশম্বদ হইলেন যে এপলো দেবের পরোক্ষদর্শি বিজ্ঞ মহান্তের সমীপে তদ্বিষয়ক অনুসন্ধান নিমিত্ত ক্লিয়মিনিস্ ও দাইয়ন্ নামক যে দুই ব্যক্তিকে প্রেরণ করেন তাহাদের প্রত্যাগমন প্রতীক্ষায় অসমর্থ হইয়া কন্যা বিয়োগে শোকাকুলা রাণীর সূতিকাবস্থাতেই তদীয় কল্পিত কলঙ্কের পরীক্ষা নিমিত্ত প্রাজ্ঞ ও মর্য্যাদাবন্ত পারিষদ গণকে অনুমতি করিলেন। অতএব বিচারক বর্গ ও রাজ্যের সমস্ত সম্ভ্রান্ত মানব নিকর রাজ্যাধিপতি মহিষীর দোষ বিচার নিমিত্ত সভা করিয়া অধ্যাসীন হইলে দুর্দৈবোপহতা রাণী কারাগার হইতে নীতা হইয়া অশ্রুপূর্ণ নয়নে তাঁহাদের সমক্ষে দণ্ডায়মান হইলেন। এতদবসরে এপলো দেবের মন্দির হইতে ক্লিয়মিনিস্ ও দাইয়ন্ মহান্তের লিপি হস্তে করিয়া প্রত্যাগমন পূর্ব্বক সেই সভায় আসিয়া উপস্থিত হইল এবং সানন্দ মনে নরনাথের হস্তে আনীত পত্রী প্রদান করিল। রাজা পত্রী প্রাপ্তে বিকসিত করিয়া উচ্চৈঃস্বরে পাঠ করিতে আদেশ করিলেন। সেই লিপি হইতে মহান্তের এই কথা ব্যক্ত হইল। যথা হারমিয়নী পরম পবিত্রা, তাহাতে দোষ লেশের সম্পর্কও নাই, পলিক্সেনিস্ সম্পূর্ণ নির্দোষ, কেমিলো অতি ধার্ম্মিক প্রজা, লিয়নিতিস্ অলীক শঙ্কা পিশাচীর পরবশ হইয়াছে। যাহা হউক স্বদোষে যাহা হারাইয়াছে তাহা পুনঃপ্রাপ্ত না হইলে উত্তরাধিকারি বিহীন হইবেক। কিন্তু মহীপতি মহান্তের এতাবদ্বচনে বিশ্বাস না করিয়া কহিলেন এ সমস্ত কল্পিত কথা, রাণীর সুহৃদ্বর্গ কৃত্রিমতা পূর্ব্বক এই লিপি বিরচিত করিয়া থাকিবেক। অতএব বিচারক গণকে পরীক্ষায় প্রবৃত্ত হইতে আজ্ঞা দিলেন। রাজা যৎকালে ঐ প্রকার উক্তি করিতেছিলেন তখন এক ব্যক্তি উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিল ভূপালবালক মেমিলস্ জননীর পরীক্ষা সংবাদ শ্রবণে ত্রপা ও পরিতাপে সন্তাপিত হইয়া আত্মহত্যা পূর্ব্বক প্রাণত্যাগ করিলেন।
নৃপ রমণী হারমিয়নী পরম স্নেহাস্পদ প্রিয় তনয়ের শোকাবেগে প্রাণ বিয়োগের কথা কর্ণ কুহরে প্রবিষ্ট হইবামাত্র ব্যাকুলা হইয়া ছিন্ন তরুর তুল্য ধরায় নিপতিতা ও মূর্চ্ছাপন্না হইলেন। রাজাও নন্দনের নিধন শ্রবণে হৃদয় মধ্যে শল্য বিদ্ধ প্রায় হইয়া সাতিশয় কাতর হইলেন। তদনস্তর রাণীর প্রতি করুণোদয় হওয়াতে পালিনা ও অন্যান্য সমভিব্যাহারিণী নারী দিগকে অনুমতি করিলেন স্থানান্তরে লইয়া রাজ্ঞীর শুশ্রূষা কর। কিন্তু পালিনা নৃপমহিলাকে বিরলে লইয়া অনতি বিলম্বে প্রত্যাগমন পূর্ব্বক ভূপ সমীপে তাহার মৃত্যু সংবাদ জ্ঞাপন করিলেন।
নরপতি পত্নীর পঞ্চত্ব প্রাপ্তির সমাচার প্রাপ্ত হইলে ক্ষণকাল স্তব্ধ প্রায় হইয়া তাঁহার প্রতি নৃশংসাচরণ স্মরণ করত শোক পরীতান্তঃকরণে বিস্তর বিলাপ করিতে লাগিলেন এবং স্পষ্ট বাক্যে কহিলেন আমার নিপীড়নে রাণীর হৃদয় বিদীর্ণ হইয়াছিল অবশেষে অবশিষ্ট জীবন মাত্রের শেষ হইল। তদানীং রাণীর আচারে ব্যভিচারাশঙ্কা বিসর্জন পূর্ব্বক অসংশয় চিত্তে বলিতে লাগিলেন সেই বরবর্ণিনী রমণীর চরিত্রে দোষলেশের সম্পর্ক মাত্র নাই, মহান্তের লিপিগত সকল কথাই যথার্থ, পরোক্ষ দর্শী মহাপুরুষ আপনার দৈবী শক্তি দ্বারা অগ্রে অবগত হইয়া কহিয়াছিলেন হৃত বস্তু পুনঃ প্রাপ্ত না হইলে উত্তরাধিকারির অভাব হইবেক এক্ষণে সে কথার সত্যতা প্রত্যক্ষ হইল, যুবরাজ মেমিলসের অকালে মৃত্যু হইল, যদিস্যাৎ নির্বাসিতা রাজকুমারী পুনঃ প্রাপ্ত না হই সুতরাং বংশ লোপ হইবেক। রাজা এবম্প্রকার চিন্তা করত ব্যাকুলতা পূর্ব্বক বহু বিলাপ করিলেন এবং কন্যার অনুসন্ধান পুরঃসর পুনঃপ্রাপ্তি নিমিত্ত রাজ্য ত্যাগে উদ্যত হইলেন। পরন্তু আন্তিগোনস্ কোন্ দিক্ দিয়া তাঁহাকে বনবাস দিতে গিয়াছিল উদ্দেশ না পাওয়াতে শোকে উন্মত্ত প্রায় হইয়া নিরন্তর কেবল বিলাপ ও পরিতাপ করত মহা কষ্টে কাল যাপন করিতে লাগিলেন।
আন্তিগোনস্ রাজ পুত্রীকে গ্রহণ পুরঃসর যে তরি আরোহণে সাগর যাত্রা করে দৈবগত্যা সমুদ্র মধ্যে অকস্মাৎ ভয়ানক ঝটিকা উপস্থিত হওয়াতে সেই তরণী পবন বেগে পলিক্সেনিসের বোহিমিয়া রাজ্যের কূলে গিয় উপনীত হইয়াছিল। আন্তিগোনস্ সেই স্থানেই পোত হইতে তটে অবতরণ পুরঃসর বালিকাটীকে তত্রস্থ অরণ্যানী মধ্যে ফেলিয়া দেয়। কিন্তু শিশিলী রাজ লিয়নিতিস্ জানিতে পরিলেন না আন্তিগোনস্ কোন্ স্থানে নন্দিনীকে নিক্ষেপ করিয়াছিল যেহেতু সে ব্যক্তি সেই অব্রুবাণা বালিকাকে বিজন বনে পরিত্যাগ পূর্ব্বক অর্ণব পোতে যখন প্রত্যাগমন করিতেছিল তদবসরে এক ভয়ানক ভল্লুক বিপিন হইতে বহির্গত হইয়া আক্রমণ পুরঃসর প্রখর নখরাঘাতে তদীয় বক্ষঃস্থল বিদীর্ণ করে। সুতরাং বিবিধ যন্ত্রণা সহকারে তাহার প্রাণ প্রয়াণ হওয়াতে নিদারুণ নৃশংস রাজাজ্ঞা পালনের প্রতিফল সঙ্গে২ হইয়াছিল।
রাজকুমারী যদিও দুগ্ধপোষ্যা শিশু তথাপি তাঁহার অঙ্গে বহু মূল্য পরিচ্ছদ ও বিবিধ রত্নালঙ্কার ছিল যেহেতু রাজমহিষী তাঁহাকে নৃপতি সমক্ষে প্রেরণ করিবার নিমিত্ত নানা ভূষণে ভূষিত ও মহার্হ বসনে সুসজ্জিত করিয়াছিলেন। আন্তিগোনস্ যৎকালে তাঁহাকে বনবাস দিতে লইয়া যায় তখন তদীয় পরিচ্ছদের উপর ক্ষুদ্রাক্ষরে পরিদিতা এই নাম এবং মহাকুলে উৎপত্তি অথচ পরম দুর্ভাগ্যের কথা সঙ্কেতে লিখিয়া দিয়াছিল।