৮০ দিনে ভূপ্রদক্ষিণ

মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Rajendralal Acharya (†1961) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন

মাস্তুলের অর্দ্ধপথে সাঙ্কেতিক পতাকা উড়িল।

মিঃ ফগ কহিলেন, “এইবার আগুন দাও।” গুড় গুড় গুড়ম্—বুম্! তঙ্কাদিরির ক্ষুদ্র কামান সেই জলরাশি কম্পিত করিয়া ডাকিয়া উঠিল গুড়ুম্ বুম্!

দ্বিতীয় খণ্ড

প্রথম পরিচ্ছেদ

বিনা সম্বলে পথ চলিও না

র্ণাটিক পোত ৭ই নভেম্বর হংকং ছাড়িয়াছিল। মিঃ ফগ যে দুইটা কামরা ভাড়া লইয়াছিলেন তাহা শূন্যই গেল। প্রভাতে কর্ণাটিকের নাবিকগণ দেখিল, ডেকের উপর একজন আরোহী হতবুদ্ধি হইয়া বসিয়া আছে। তাহার পরিচ্ছদ অসংযত বিন্যস্ত। আরোহী আর কেহই নহে, আমাদের পূর্ব্বপরিচিত ফরাসীভৃত্য জিয়েন।

জিয়েন! সে কিরূপে কর্ণাটিক জাহাজে আসিল! জাহাজ যে দিন হংকং হইতে যাত্রা করে, সে ত সে দিন হংকংএর এক গুলির আড্ডার অচেতন অবস্থায় পড়িয়াছিল। সে কিরূপে নির্দ্দিষ্ট সময়ে জাহাজে আসিল।

কিরূপে আসিল বলিতেছি। ফিক্স গোয়েন্দা জিয়েনকে হতচেতন করিয়া রাখিয়া প্রস্থান করিবার পরই আড্ডার দুই জন ভৃত্য আসিয়া তাহাকে কক্ষতল হইতে তুলিয়া শয্যার উপর স্থাপিত করিল। তিন ঘণ্টা পর তাহার ঈষৎ জ্ঞান-সঞ্চার হইল। তাহার তখন আর কিছুই মনে পড়িল না—কেবল মনে পড়িল “কর্ণাটিক”। তখন প্রায় সন্ধ্যা হইয়াছে। সে টলিতে টলিতে গৃহ প্রাচীর ধরিয়া রাজপথে বাহির হইল এবং যেন স্বপ্নঘোরে “কর্ণাটিক কর্ণাটিক” বলিয়া চীৎকার করিতে করিতে জেটীর দিকে চলিল। জেটী অধিক দূরে ছিল না। নাবিকগণ তখন কর্ণাটিক পোতের সিঁড়ি উঠাইতেছিল। জিয়েন কাঁপিতে কাঁপিতে কর্ণাটিকের ডেকে যাইয়া উঠিল এবং “কর্ণাটিক কর্ণাটিক” বলিয়া কয়েকবার চীৎকার করিয়াই তৎক্ষণাৎ অচেতন হইয়া পড়িয়া গেল। হংকং বন্দরে যাত্রীদিগের মধ্যে এরূপ ঘটনা দেখিয়া জাহাজের নাবিকগণ অভ্যস্ত হইয়াছিল। তাহারা বিশেষ বিস্মিত হইল না, চেতনাহীন জিয়েনকে ডেক হইতে তুলিয়া একটা কামরার মধ্যে রাখিয়া আসিল।

প্রভাতে সমুদ্রের শীতল বাতাসে ধীরে ধীরে জিয়েনের বুদ্ধি স্থির হইল। তাহার তখন সকল কথা মনে পড়িল। সে ভাবিল, “আমি এমন মাতাল হ’য়েছিলেম দেখলে মিঃ ফগ কি বল্‌বেন! যা’হোক্‌ আমি যে জাহাজে উঠেছি এই ঢের। ফিক্স গোয়েন্দা নিশ্চয়ই এখানে আসতে সাহস পায় নাই। কি আশ্চর্য্য! আমার অমন প্রভুকেও দস্যু সন্দেহ করে’ সঙ্গে সঙ্গে গোয়েন্দা ফিরছে! এ কথা কি এখনই তাঁর কাছে প্রকাশ করে’ বলব? না এখন থাক্। গোয়েন্দা পুলিশ আগে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীটা ঘুরুক্, তারপর লণ্ডনে যেয়ে তা’কে নিয়ে বেশ একটা মজা করা যাবে।”

জিয়েন মন স্থির করিয়া ডেক হইতে উঠিল এবং মিঃ ফগের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য তাঁহার কামরার সন্ধানে চলিল। সমস্ত জাহাজ তন্ন তন্ন করিয়া অনুসন্ধানের পর যখন সে ফগের সাক্ষাৎ পাইল না, তখন তাহার মনে হইল সুরার মত্ততায় সে বুঝি অন্য কোন জাহাজে উঠিয়াছে—এ বুঝি কর্ণাটিক নহে। সে কাপ্তানকে জিজ্ঞাসা করিল—

“এ কোন্ জাহাজ?”

“কর্ণাটিক।”

“ইয়োকোহামা যাচ্ছে?”

“হাঁ।”

তখন তাহার ভরসা হইল মিঃ ফগ নিশ্চয়ই জাহাজে আছেন। হয় ত বা কোথাও বসিয়া হুইষ্ট খেলিতেছেন। জিয়েন জাহাজের আরোহীদিগের নামের তালিকা দেখিল। কৈ ইহাতে ত তাঁহার নাম নাই!

জিয়েন হতবুদ্ধি হইয়া একখানি চেয়ারে বসিয়া পড়িল। তখন তাহার মনে পড়িল, জাহাজ ছাড়িবার সময় যে পরিবর্ত্তিত হইয়াছিল, সে সংবাদ ত মিঃ ফগকে দেওয়া ঘটে নাই! অনুতাপে তাহার হৃদয় দগ্ধ হইতে লাগিল। সে মনে মনে ভাবিল, “হায় আমার জন্যই তাঁর আজ সর্ব্বনাশ ঘটিল। আমার জন্যই তিনি আজ সর্ব্বস্বান্ত, পুলিশের হস্তে বন্দী, হয়ত বা কারারুদ্ধ হ’য়ে থাক্‌বেন!”

জিয়েন যদিও নিজের ত্রুটি বুঝিতে পারিতেছিল, কিন্তু গোয়েন্দার অপরাধই তাহার নিকট আরো গুরুতর বলিয়া প্রতীয়মান হইল। ক্রোধে জিয়েনের সর্ব্বাঙ্গ কম্পিত হইতে লাগিল। তখন যদি সে মুহূর্ত্তের জন্যও গোয়েন্দাকে নিকটে পাইত!

সুরার মত্ততাও যেমন ধীরে ধীরে গিয়াছিল, ক্রোধও তেমনি ধীরে ধীরে অন্তর্হিত হইল। জিয়েন তখন নিজের অবস্থার আলোচনা করিতে লাগিল। ইয়োকোহামা পর্য্যন্ত তাহার আর জাহাজ ভাড়া লাগিবে না সত্য, কারণ পূর্ব্বেই টিকেট ক্রয় করা হইয়াছিল। জাহাজে ভোজ্য ও পেয়ের অভাব ছিল না। সুতরাং ইয়োকোহামা পর্য্যন্ত আহারেরও কোন কষ্ট হইবে না তাহা সে জানিত। কিন্তু তারপর! সে যে তখন কপর্দ্দকহীন! জিয়েন আর অধিক ভাবিতেও পারিল না, অদৃষ্টকে সম্বল করিয়া ভবিষ্যতের দিকে চাহিয়া রহিল।

নির্দ্দিষ্ট দিন প্রভাতে কর্ণাটিক আসিয়া বন্দরে লাগিল। জিয়েনকে আজ জাহাজ হইতে অবতরণ করিতে হইবে। সে প্রস্তুত হইল। সে দিন আর আহার মিলিবে কি না কে জানে। জিয়েন তাই জাহাজেই যথাশক্তি আহার করিয়া তীরে নামিল। নামিয়াই দেখিল সম্মুখে সুবিস্তৃত রাজপথ। রাজপথে কত দেশের নরনারী ভ্রমণ করিতেছে। লক্ষ্যহীন জিয়েন একটী রাজপথ বহিয়া সম্মুখে অগ্রসর হইল।

সে স্থির করিল অন্য কোন উপায় নিতান্তই করিতে না পারিলে, ইংরাজ কিংবা ফরাসী কন্‌সালের নিকট তাহার অবস্থা জানাইবে। তাঁহারা হয়ত কিছু একটা উপায় করিয়াই দিবেন। কিন্তু স্বাবলম্বন সর্ব্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট ও বরেণ্য বলিয়া জিয়েন বিপদের মধ্যেও স্বাবলম্বন-ব্রত গ্রহণ করিল।

ইয়োকোহামার সাহেব-পল্লী ভ্রমণ করিয়া সে জাপানীপল্লীতে প্রবেশ করিয়া দেখিল, দেবদারু ও ফার্ বৃক্ষের কি মনোরম কুঞ্জবন, অতি দীর্ঘ সিডার বৃক্ষবেষ্টিত কি বিরাট বৌদ্ধমন্দির। সুদীর্ঘ ও পরিচ্ছন্ন রাজপথে সুন্দর সুন্দর বালক বালিকারা যেন জাপানী শিল্পীর এক একটা মনোহর চিত্র। কেহ বা পুত্তলিকা লইয়া, কেহ বা লাঙ্গুলহীন পীতবর্ণ মার্জ্জারশিশুর সহিত ক্রীড়ায় মত্ত। কোথাও কোন পুরোহিত, কোথাও কোন পুলিশ, কোথাও কোন রাজকর্ম্মচারী আপন আপন পদোচিত পরিচ্ছদে বিভূষিত হইয়া ক্ষিপ্রচরণে গন্তব্য স্থানে গমন করিয়াছে। তাহাদিগের নয়নে ও বদনে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য ফুটিয়া বাহির হইয়াছে। কোন স্থানে বীর যোদ্ধৃপুরুষগণ অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত হইয়া ঐক্যতান-বাদ্যের তালে তালে পদবিন্যাসপূর্ব্বক অগ্রসর হইয়াছে। দেখিতে কি সুন্দর! তপনকিরণে তাহাদিগের কিরীট ও কৃপাণ, বর্ম্ম ও চর্ম্ম ঝক্ ঝক্ করিতেছে। কোথাও শিবিকা, কোথাও দোলা, কোন স্থানে বা কতকগুলি শকট অপেক্ষা করিতেছে। সুন্দরী রমণীরা কেহ চটের, কেহ বেত্রের পাদুকায় চরণ আবৃত করিয়া ধীর পাদবিক্ষেপে ইতস্ততঃ বিচরণ করিতেছে। তাহাদিগের অপেক্ষাকৃত অনায়ত লোচন, প্রশস্ত বক্ষ, মসিবর্ণ দশন জিয়েনের নয়নপটে এক নূতন জগৎ চিত্রিত করিয়া দিল। রেশমী ওড়নায় সজ্জিত, পশ্চাতে গ্রন্থিবিশিষ্ট তাহাদিগের সুবিন্যস্ত জাতীয় পোষাকগুলি জিয়েনকে ফরাসী ললনার কথা স্মরণ করাইয়া দিতে লাগিল। সে দেখিল ফরাসী রমণীগণ জাপান হইতেই এই প্রকার পরিচ্ছদের অনুকরণ করিয়াছে।

জিয়েন এইরূপে ভ্রমণ করিতে করিতে ইয়োকোহামার বাজারে আসিয়া উপস্থিত হইল। জহরতের দোকানে কত হীরা মতি আলোকসম্পাতে জ্বলিতেছে, মিষ্টান্নের দোকানে কত সুন্দর সুন্দর রসনাতৃপ্তিকর ভোজ্য সজ্জিত রহিয়াছে, চা’র দোকানে জাপানীরা বসিরা স্বচ্ছন্দ চিত্তে ‘সাকি’ নামক সুরাপান করিতেছে। কেহ কেহ বা ধূমপানশালায় বসিয়া অতি মনোহর তামাকু পানে চিত্ত বিনোদন করিতেছে।

ক্রমে সন্ধ্যা হইয়া আসিল। অর্থহীন জিয়েন তখন ধীরে ধীরে ধীবরদিগের মশালের আলোকে উজ্জ্বল একটা জেটীর দিকে গমন করিল। তাহার আহারের বিশেষ ইচ্ছা ছিল বটে, কিন্তু অর্থাভাবে সে সুযোগ ঘটিল না। জিয়েন এখন বুঝিল যে গৃহের বাহির হইলেই কিছু অর্থ সঙ্গে না থাকিলে চলে না।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

জগন্নাথের রথ

কলের রজনীই প্রভাত হয়, জিয়েনেরও হইল। প্রভাতে সে দেখিল ক্ষুধা তাহাকে অত্যন্ত দুর্ব্বল ও শ্রান্ত করিয়াছে, কিছু আহার না করিলে আর চলে না।

অর্থ নাই—দেশ অপরিচিত—কে তাহাকে আহার দিবে। তখনো তাহার ঘড়িটা সঙ্গেই ছিল। কিন্তু উহার উপর জিয়েনের এতই মমতা হইয়াছিল যে, সে স্থির করিল বরং অনাহারে মরিবে, তবুও ঘড়িটী বিক্রয় করিবে না।

সে দেখিল তাহার বর্ত্তমান অবস্থায় পরিচ্ছদটী পরিবর্ত্তন করিলে বিশেষ আসিয়া যায় না—বরং পকেটে কিছু আসিতেও পারে। জিয়েন অবিলম্বে একজন পুরাতন-পোষাক-বিক্রেতার দোকান অন্বেষণ করিয়া বাহির করিল এবং নিজের পরিচ্ছদের পরিবর্ত্তে একটী পুরাতন জাপানী পরিচ্ছদ ও কিঞ্চিৎ অর্থ সংগ্রহ করিয়া হৃষ্ট চিত্তে রাজপথে বাহির হইল। সম্মুখেই একটা পান্থনিবাস ছিল। তথায় কিঞ্চিৎ আহার করিয়া জিয়েন জাহাজঘাটার দিকে অগ্রসর হইল। ইচ্ছা, যদি আমেরিকাগামী কোনো জাহাজের বাবুর্চ্চি বা ভৃত্য হইয়া জাপান ত্যাগ করিতে পারে।

সুপারিস ভিন্ন দাসত্বের সৌভাগ্যও ঘটে না! জিয়েনের তাহা ছিল না। সুতরাং কেহ তাহাকে গ্রহণ করিল না। সে তখন ক্ষুণ্ণ মনে নগরমধ্যে প্রবেশ করিতেছিল, অকস্মাৎ একখানি প্রকাণ্ড বিজ্ঞাপন তাহার নয়নে পতিত হইল। জিয়েন পাঠ করিতে লাগিল—

সুবিখ্যাত উইলিয়ম্ বাটুল্‌কারের জাপানী বাজীকরের দল!

আমেরিকা গমনের পূর্ব্বে শেষ রজনী!

অদ্যই শেষ রজনী।

দীর্ঘনাসা! দীর্ঘনাসা! দীর্ঘনাসা!

ভগবান্ টিঙ্গুর প্রীত্যর্থে অভিনয়!

আসুন! আসুন!! আসুন!!!

বিজ্ঞাপন দেখিয়াই জিয়েন ভাবিল, বেশ হইয়াছে। ইহারা যখন আমেরিকায় যাইবে, তখন সুবিধাই হইয়াছে। একবার চেষ্টা করিয়া দেখা যাউক। জিয়েন অবিলম্বে সেই বিজ্ঞাপনবাহকের পশ্চাদনুসরণ করিয়া অল্পকাল মধ্যেই উইলিয়ম বাটুল্‌কারের নিকট উপস্থিত হইল।

মিঃ বাটুল্‌কার জিজ্ঞাসা করিলেন—

“তুমি কি চাও?”

“আপনাদের কি ভৃত্যের প্রয়োজন আছে?”

“ভৃত্য!” তাঁহার সুদীর্ঘ শ্মশ্রু নাড়িতে নাড়িতে, বাটুল্‌কার কহিলেন, “ভৃত্যে আমার প্রয়োজন নাই। আমার দু’জন আছে। তাদের মাহিয়ানাও দিতে হয় না—আহারও দিতে হয় না। কিন্তু তারা সর্ব্বদা আজ্ঞাকারী। আজ পর্য্যন্ত কখনো আমাকে ছাড়ে নাই। দেখবে তাদের? এই দেখ”—মিঃ বাটুল্‌কার সগৌরবে তাঁহার দুইখানি সফল বাহু প্রসারিত করিয়া দিলেন।

বেগতিক দেখিয়া জিয়েন কহিল, “তা হলে দেখছি, আমি আপনার কোন কাজেই লাগতে পারি না।”

“কোন কাজেই না।”

“যদি আমি আপনাদের সঙ্গে আমেরিকা যেতে পারতেম তা’হ’লে বড় উপকার হ’তো।”

“তোমাকে দেখে বোধ হচ্ছে তুমি এ দেশের নও। তুমি এমন পোষাক পরেছ যে?”

“যার যেমন সাধ্য সে তেমনি পোষাক পরে।”

“সে কথা ঠিক। তুমি একজন ফরাসী নও কি? দেখে যেন তাই-ই বোধ হয়।

“আপনি ঠিকই ধরেছেন।”

“কেমন করে’ মুখভঙ্গী কর্‌তে হয়, সে টা তা হ’লে তোমার ভাল রকম জানা থাকারই কথা।”

এ কথায় জিয়েন একটু বিরক্ত হইল বটে, কিন্তু নিরুপায় হইয়া কহিল,―“ফরাসীরা যে মুখভঙ্গী কর্‌তে পারে এ কথা কে না জানে? কিন্তু আমেরিকাবাসীদের মত অমন পারে না!”

“তা’ ঠিক্। তা’ দেখ, আমার চাকর ক’রে আমি তোমাকে রাখতে পারি না। কিন্তু আমার দলের ভাঁড় করে’ রাখতে পারি। থাক্‌বে? ছোকরা! তুমি রাগ ক’রোনা। ফ্রান্স দেশের সার্কাসে তারা অন্য দেশের লোককে ভাঁড় সাজায়। কিন্তু নিজের দেশ ছেড়ে অন্যত্র গেলে ফরাসীকেও আবার ভাঁড় সাজতে হয়।”

“এখন ত তাই দেখতে পাচ্ছি।”

“তোমার গায়ে একটু জোর-টোর আছে বলে’ বোধ হয়—কেমন?”

“খেতে পেলেই আমার জোর হয়।”

“তুমি গাইতে জান?”

“জানি।”

“এ গানের মধ্যে কথা আছে। মাটিতে মাথা রেখে পা দু’টো তুল্‌তে হ’বে। তোমার বাঁ পায়ের তেলোর উপর একটা লাটিম ঘুরবে আর ডা’ন পায়ের উপর একখানা তরোয়াল এমন করে রাখতে হবে যে না পড়ে। সেই অবস্থায় গান গাইতে হ’বে। পার্‌বে?”

“ওসব কিছু কিছু জানা আছে বৈ কি।”

“তবে ত বুঝলেই—এই তোমার কাজ। যদি পার তবে এস।”

জিয়েন তন্মুহূর্ত্তেই সেই বাজীকরের দলে চাকুরি লইল। ভগবান্ টিঙ্গুর দীর্ঘনাসা ভক্তগণ অন্য জগন্নাথের রথ দেখাইবে। অভিনয়মণ্ডপে লোকারণ্য হইয়াছে, মধ্যে মধ্যে ঐক্যতান বাদন চলিতেছে। অভিনয় আরম্ভ হইল।

পৃথিবীর মধ্যে জাপানীরাই সর্ব্বোৎকৃষ্ট বাজীকর বলিয়া সুপরিচিত। একজন কতকগুলি কাগজের টুকরা লইয়া তাহা দ্বারা পাখার বাতাসে প্রজাপতি ও পুষ্প প্রস্তুত করিতে লাগিল। আর একজন তাহার মুখনিঃসৃত চুরুটের ধূমে শূন্যে স্বাগত বাক্য রচিত করিয়া দর্শকদিগকে অভিনন্দন করিল। কেহ বা অন্যান্য কলা-কৌশল প্রদর্শন করিতে করিতে অলক্ষিতে অনেকগুলি আলোকবর্ত্তিকা নির্ব্বাপিত করিয়া দিল। আবার সেগুলি প্রজ্বালিত করিল। আর একজন বাজীকর কয়েকটা লাটিম ঘুরাইতে লাগিল। লাটিমগুলি নলের উপর উঠিতে লাগিল, কখনো বা নীচে নামিতে লাগিল—আবার তরবারির ধারের উপর দিয়া চলিতে আরম্ভ করিল। দেখিতে না দেখিতে কখনো লৌহতারের উপর দৌড়াইতে লাগিল, এমন কি একগাছি সুক্ষ্ম কেশের উপর দিয়া পর্য্যন্ত নড়িয়া চড়িয়া বেড়াইতে আরম্ভ করিল! কতকগুলি লাটিম সারিবিন্যস্ত স্ফটিক পাত্রের চতুর্দ্দিকে বন্ বন্ করিয়া ঘুরিতে লাগিল। আবার কতকগুলি নানাবিধ মধুর শব্দ করিতে করিতে রঙ্গমঞ্চের চতুর্দ্দিকে ভ্রমণ করিতে আরম্ভ করিল। বাজীকরগণ সেই ঘূর্ণিত লাটিমগুলি শূন্যে নিক্ষেপ করিল। মাকুর ন্যায় দক্ষিণে ও বামে চালাইতে লাগিল—কখনো বা পকেটের মধ্যে রাখিয়া দিল, আবার পরক্ষণেই বাহির করিয়া দেখাইল যে সেগুলি তখনো ঘুরিতেছে!

মধ্যযুগে প্রচলিত পরিচ্ছদে সজ্জিত হইয়া কতকগুলি পক্ষবিশিষ্ট বাজীকর তখন রঙ্গমঞ্চে আসিয়া দেখা দিল। ইহারাই ভগবান্ টিঙ্গুর দীর্ঘনাসা ভক্তবৃন্দ। তাহাদিগের অভিনয়-কৌশল দেখিবার জন্য দর্শকগণ সোৎসুকচিত্তে অপেক্ষা করিতেছিল। বাজীকরদিগের সুদীর্ঘ নাসিকা রঙ্গমঞ্চে এক অভিনব দৃশ্যের সৃষ্টি করিল। কাহারো নাসিকা ৮ হস্ত পরিমিত দীর্ঘ। নাসারন্ধ্র বক্র। কাহারো বা ৪ হস্ত, কাহারো বা ৫ হস্ত দীর্ঘ নাসিকা নানাবর্ণে রঞ্জিত। কাহারো নাসা মসৃণ, কাহারো বা তরঙ্গায়িত, কাহারো সরল, কাহারো বা অতিমাত্র বক্র। নাসিকাগুলি বংশদণ্ডে নির্ম্মিত। দ্বাদশ জন দীর্ঘনাসা চিৎ হইয়া রঙ্গমঞ্চে শয়ন করিল। তাহাদিগের কয়েক জন সঙ্গী অদ্ভুত পরিচ্ছদে সজ্জিত হইয়া, শায়িত ভক্তদিগের দীর্ঘনাসিকার উপর সুকৌশলে নানাবিধ উল্লঙ্ঘন-ক্রীড়া প্রদর্শন করিতে লাগিল।

তখন ৫০ জন দীর্ঘনাসা ভক্ত আসিয়া উপস্থিত হইল। ইহারাই পরস্পর পরস্পরের নাসিকার উপর অবস্থান করিয়া জগন্নাথের রথের অনুকরণ করিবে। জিয়েন এই দলের মধ্যে ছিল। সে নিতান্ত ক্ষুব্ধচিত্তে নানা বর্ণানুরঞ্জিত পক্ষদ্বয় লাগাইল। চারি হস্ত পরিমিত বংশদণ্ড সুকৌশলে তাহার নাসিকার সহিত সংযুক্ত করিয়া সে ভগবান্ টিঙ্গুর ভক্ত সাজিল। কয়েকজন দীর্ঘনাসা তখন রঙ্গমঞ্চের উপর শয়ন করিল। তাহাদিগের নাসিকার উপর আর কয়েকজন শয়ন করিল। তাহাদিগের নাসিকার উপর আবার আর একদল স্থান পাইল! এইরূপে সেই মনুষ্য-মন্দির―সেই জগন্নাথের রথ থাকে থাকে ঊর্দ্ধে উঠিতে লাগিল। উঠিতে উঠিতে মন্দির-চূড়া অবশেষে অভিনয়-মণ্ডপ স্পর্শ করিল! দর্শকগণ আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া ঘন ঘন করতালি দিতে লাগিল—গভীর শব্দে ঐক্যতানবাদ্য বাজিয়া উঠিল!

এ কি? মনুষ্য-মন্দির কাঁপিতেছে না? সকলে সবিস্ময়ে চাহিয়া দেখিল সত্যই ত কাঁপিতেছে। ওই যে সর্ব্বনিম্ন তলের একটী নাসিকা খুলিয়া গেল! অমনি অবিলম্বে জগন্নাথ দেবের রথ ভাঙ্গিয়া ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়িল! ভক্তগণ কে কোথায় আছাড় খাইয়া পড়িল তাহা কে বলিবে!

জিয়েনের জন্যই এই বিভ্রাট ঘটিল। পতনকালের সেই গণ্ডগোলের ভিতর হইতে কোনমতে বাহির হইয়া জিয়েন এক লম্ফে ‘ফুট লাইট’ অতিক্রম করিল এবং দৌড়াইয়া গিয়া দর্শকদিগের মধ্যে এক জনের পদতলে পড়িয়া আবেগপূর্ণ বাষ্প নিরুদ্ধ কণ্ঠে কহিল, “প্রভু, ক্ষমা করুন—ক্ষমা করুন।”

“এ কি! জিয়েন যে।”

“আজ্ঞা হাঁ, আমি।”

“যাও, জাহাজে ওঠগে।”

জিয়েন তখন মিঃ ফগ ও রাণী আউদার সহিত অভিনয়-মণ্ডপ পরিত্যাগ করিল। দ্বারদেশেই দলের অধিকারী মিঃ বাটুল্‌কার নিতান্ত রুষ্ট হইয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। জগন্নাথের রথ অকালে ভাঙ্গিয়া দিবার জন্য তিনি জিয়েনকে আবদ্ধ করিয়া তাহার নিকট ক্ষতিপূরণ চাহিলেন। মিঃ ফগ দ্বিরুক্তি না করিয়া এক তাড়া নোট বাটুল্‌কারের সম্মুখে নিক্ষেপ করিলেন এবং অবিলম্বে সে স্থান ত্যাগ করিয়া আমেরিকাযাত্রী ডাকজাহাজ ‘জেনেরাল গ্রাণ্টে’ যাইয়া উঠিলেন।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

গোয়েন্দার শিক্ষালাভ

ঘাই বন্দরে কি ঘটিয়াছিল পাঠকগণ তাহা সহজেই অনুমান করিতে পারিবেন। তঙ্কাদিরির সঙ্কেত দেখিতে পাইয়া, তাহার কামানের ধ্বনি শুনিয়া ডাকজাহাজ থামিল। মিঃ ফগ মাঝি বুন্‌স্‌বিকে প্রতিশ্রুত অর্থাদি প্রদান করিয়া অবিলম্বে জাহাজে যাইয়া উঠিলেন এবং ১৪ই তারিখে ইয়োকোহামায় পৌঁছিলেন।

ইয়োকোহামায় পৌঁছিয়াই কর্ণাটিক জাহাজে যাইয়া শুনিলেন, জিয়েন নামক একজন ফরাসী সেই জাহাজেই ইয়োকোহামা আসিয়াছে। সেই দিন রাত্রেই মিঃ ফগের সান্‌ফ্রান্সিস্‌কো যাত্রা করিবার কথা। তিনি ইয়োকোহামার কন্‌সাল্ আফিসে গিয়া জিয়েনের সন্ধান করিলেন। হঠাৎ যদি সাক্ষাৎ হয় এই মনে করিয়া নগরের নানা রাজপথে ভ্রমণ করিয়া বেড়াইলেন। যখন অনেক চেষ্টাতেও ভৃত্যের কোনো সংবাদ পাওয়া গেল না, তখন তিনি ও রাণী আউদা দুঃখিত চিত্তে জাহাজে প্রত্যাবর্ত্তন করিতেছিলেন। পথিমধ্যে বাজীকরের মণ্ডপ-সান্নিধ্যে বহুলোক-সমাগম দেখিয়া, ক্রীড়াদর্শনমানসে তথায় গিয়াছিলেন। সুদীর্ঘ নাসা এবং পক্ষবিশিষ্ট ভক্তবৃন্দের মধ্যে যে জিয়েনও থাকিতে পারে, আদৌ তাঁহার এ ধারণা ছিল না। তিনি নিশ্চিন্ত চিত্তে ক্রীড়া দর্শন করিতেছিলেন।

জগন্নাথের রথ প্রস্তুত করিতে করিতে জিয়েন দেখিল, অদূরে মিঃ ফগ ও রাণী আউদা দর্শকদিগের মধ্যে বসিয়া রহিয়াছেন। সে আর স্থির থাকিতে পারিল না। তাহার দীর্ঘনাসা নড়িয়া উঠিল এবং অকস্মাৎ স্থানচ্যুত হইল! একটা নির্ভর-স্তম্ভ ভাঙ্গিবামাত্রই সেই বৃহৎ রথও মুহূর্ত্তে খসিয়া পড়িয়াছিল।

রাণী আউদার নিকট জিয়েন তাহার প্রভুর সমুদ্রযাত্রার কাহিনী শ্রবণ করিল। সে আরও শুনিল যে ফিক্স নামে একজন ইংরাজ ভদ্রলোকও তাঁহাদিগের সঙ্গেই ইয়োকোহামায় আসিয়াছেন। গোয়েন্দার নাম শুনিয়া জিয়েন কিছুমাত্র চাঞ্চল্য প্রকাশ করিল না। সে ভাবিল উপযুক্ত সময়ে সমস্তই প্রকাশ করিয়া দিবে। আত্মকাহিনী বর্ণনকালে সে শুধু বলিল যে অহিফেন তাহাকে অচৈতন্য করাতেই তাহার এত দুর্দ্দশা ঘটিয়াছে। মিঃ ফগ সমস্ত শুনিয়া কৃপাপরবশ হইয়া তাহাকে পরিচ্ছদাদি ক্রয় করিবার অর্থ প্রদান করিলেন।

ফিক্স গোয়েন্দাও ‘জেনেরাল গ্রাণ্ট’ জাহাজেই ছিলেন। ইয়োকোহামা পৌঁছিয়াই তিনি দেখিলেন সেই প্রত্যাশিত পরোয়ানা বিলাত হইতে আসিয়াছে। কিন্তু তাহার বলে তখন আর মিঃ ফগকে ধৃত করিবার কোনো সম্ভাবনা ছিল না! ইংরাজের রাজ্যের বাহিরে আসামীকে ধরিতে হইলে বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন। সাধারণ গ্রেপ্তারী পরোয়ানায় কোন ফল হয় না। বিশেষ ব্যবস্থা করিবার সময় তখন ছিল না। ফিক্স ভাবিলেন, “যাহোক্ পরোয়ানা ত এসেছে, এখানে না হয় দস্যুকে না-ই ধরিলাম, ইংলণ্ডে যাওয়ামাত্রই ধরিব। তখন কে রাখে দেখিব। সেখানে যেতে যেতেই মিঃ ফগ বোধ হয় অবশিষ্ট অর্থ খরচ করে ফেল্‌বেন! তার আর উপায় কি। ফগ যাহাতে সত্বর ইংলণ্ডে যেতে পারেন এখন তারই ব্যবস্থা করতে হ’বে।”

যখন মিঃ ফগ জিয়েনকে লইয়া জাহাজে উঠেন, ফিক্স গোয়েন্দা তখনই উঠিতেছিলেন। তিনি সবিস্ময়ে দেখিলেন, অদ্ভুত পক্ষবিশিষ্ট জিয়েনও সেই জাহাজেই উপস্থিত! তিনি তাড়াতাড়ি নিজের কামরায় প্রস্থান করিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাঁহাকে সেই রজনীতেই জিয়েনের সম্মুখে আনিয়া উপস্থিত করিল!

তাঁহাকে দেখিবামাত্রই জিয়েন আর বাক্যব্যয় না করিয়া তাঁহার কণ্ঠ চাপিয়া ধরিল এবং মুহুর্ম্মুহুঃ মুষ্ট্যাঘাত করিতে লাগিল! নিদারুণ প্রহারে গোয়েন্দা ফিক্স জাহাজের ডেকের উপর পতিত হইলেন। নাবিক এবং যাত্রীদিগের মধ্যে অনেকে চতুর্দ্দিকে দাঁড়াইয়া হো হো করিয়া হাসিতে লাগিল!

মিঃ ফিক্স যখন কাতর কণ্ঠে কহিলেন, “আর কেন জিয়েন, ঢের হয়েছে।” তখন জিয়েন তাঁহাকে ছাড়িয়া দিয়া বলিল,—

“হাঁ, এখনকার মত হয়েছে বটে।”

“এস তবে, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।”

“কিন্তু—”

“আমি এখন যা বল্‌বো, তা’ তোমার মনিবের মঙ্গলের জন্যই বল্‌বো জান্‌বে।”

“বেশ!”

উভয়ে জাহাজের অন্য দিকে গমন করিলেন। মিঃ ফিক্স বলিতে লাগিলেন,—

“তুমি ত আমাকে খুব শিক্ষা দিলে দেখছি। বেশ ভালই। এমন যে ঘটরে তা’ কতকটা আমার জানাই ছিল। কিন্তু আমার কথাগুলো এখন মন দিয়ে শোন। এতদিন পর্য্যন্ত আমি মিঃ ফগের বিরুদ্ধাচরণ করেছি। কিন্তু এখন থেকে আমি তাঁর পক্ষাবলম্বন কর্‌বো।”

“তা’ হ’লে দেখছি আপনি এখন বিশ্বাস করেন যে আমার প্রভু নির্দ্দোষ?”

“না—তা’ নয়। আমার এখনো বিশ্বাস তিনিই দস্যু! অত ব্যস্ত হ’য়ো না―আমি বলি শোন। মিঃ ফগ যতদিন ইংরাজ-রাজত্বের মধ্যে ছিলেন, ততদিন আমি তাঁকে আটক কর্‌তে অনেক চেষ্টা করেছি। তাঁর পেছনে বোম্বাইয়ের পুরোহিতদের আমিই লাগিয়েছিলেম, হংকংএ আমিই তোমাকে হতজ্ঞান করে রেখেছিলেম। মিঃ ফগ সেই জন্যই ইয়োকোহামার জাহাজ ধরতে পারেন নাই।”

জিয়েন শুনিতে শুনিতে ক্রোধে অগ্নি-শর্ম্মা হইতেছিল। সে তাঁহার অজ্ঞাতে মুষ্টিবদ্ধ করিল। তাহার নয়নদ্বয় জ্বলিতে লাগিল। গোয়েন্দা কহিলেন,―

“রাগ করো না—ঠাণ্ডা হ’য়ে কথা শোন। আমার বোধ হচ্ছে মিঃ ফগ এখন ইংলণ্ডে ফিরবেন। আমিও তাঁর অনুসরণ করবো। কিন্তু তিনি যাতে নির্ব্বিঘ্নে ইংলণ্ডে যেতে পারেন, আমাকে সেই চেষ্টাই করতে হ’বে। ইংলণ্ডেই জানা যাবে তিনি দোষী কি নির্দ্দোষ! ততদিন তুমিও যেমন তাঁর মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী, আমিও তাই।”

ফিক্স গোয়েন্দা এরূপ দৃঢ়ভাবে কথাগুলি বলিলেন যে জিয়েনের বিশ্বাস হইল। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন,―

“কেমন জিয়েন, তবে আজ থেকে আমরা বন্ধু!”

“বন্ধু! কখনো না! আমরা বন্ধু ত হ’তেই পারি না। তবে আজ থেকে আমরা মিঃ ফগের সহযোগী। কিন্তু একটা কথা—যে মুহূর্ত্তে দেখবো আপনি তাঁর অনিষ্ট-চেষ্টায় অঙ্গুলি হেলনমাত্র করেছেন, সেই মুহূর্ত্তেই আপনার ঘাড় মুচড়ে ভেঙ্গে দিব। আমি যে তা’ পারবো সে পরিচয় বোধ হয় একটু আগেই পেয়েছেন! এ কথা যেন মনে থাকে।”

স্থির ভাবে গোয়েন্দা কহিলেন, “তাই, বেশ তাই হ’বে।”

উভয়ে তখন জাহাজের ভিন্ন দিকে গমন করিলেন। ‘জেনারেল গ্রাণ্ট’ বেশ দ্রুতগামী ছিল। মিঃ ফগ হিসাব করিয়া দেখিলেন যে তিনি ২রা ডিসেম্বর সান্‌ফ্রান্সিস্‌কো, ১১ই নিউইয়র্ক এবং ২০শে লণ্ডনে পৌঁছিতে পারিবেন।

প্রশান্ত মহাসাগর—নামেও প্রশান্ত, কার্য্যেও তাহাই ছিল। অচঞ্চল বারিরাশি ভেদ করিয়া ‘জেনারেল গ্রাণ্ট’ ঘণ্টায় ১২।১৩ মাইল করিয়া চলিতে লাগিল। আরোহিগণ নিরুদ্বেগে পান ভোজন ও নিদ্রায় মনোনিবেশ করিল। উল্লেখযোগ্য বিশেষ কোন ঘটনা জাহাজে ঘটিল না। যাহা কিছু ঘটিয়াছিল, তাহাও রাণী আউদার হৃদয়ে, পৃথিবীর সহিত তাহার বিশেষ সম্বন্ধ ছিল না।

সে কোমল হৃদয় ক্রমেই মিঃ ফগের দিকে অলক্ষিতে আকৃষ্ট হইতেছিল। সে আকর্ষণের কারণ যে শুধু কৃতজ্ঞতা, রাণী আউদা তাহা ভাবিলেও সকলে স্বীকার করিবে না। কৃতজ্ঞতা অপেক্ষাও অনেক অধিক শক্তিশালী কি একটা ভাব কি একটা আকর্ষণ যেন রাণী আউদাকে ক্রমেই ফগের পক্ষপাতিনী করিয়া তুলিতেছিল। মিঃ ফগের হৃদয়ে কোন চাঞ্চল্য উপস্থিত হইয়াছিল কি না তাহার প্রমাণ নাই।

জাহাজ যেমন চলিতেছিল, চলিতেই লাগিল।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

আমেরিকার সভা

কাদশ দিবস পরে ‘জেনেরাল গ্রাণ্ট’ সান্‌ফ্রান্সিস্‌কোর সুবর্ণদ্বারে আসিয়া লাগিল। প্রভাতে মিঃ ফগ আমেরিকার তীরে পদার্পণ করিলেন, নামিয়াই শুনিলেন নিউইয়র্কের ট্রেণ সন্ধ্যার সময় ছাড়িবে। তাঁহারা একটা পান্থনিবাসে গমন করিলেন।

সান্‌ফ্রান্সিস্‌কোর সুপ্রশস্ত রাজপথ, সুবিস্তৃত উদ্যান, উচ্চ সৌধমালা, অগণিত ধর্ম্মমন্দির সকল, রাজপ্রাসাদতুল্য গুদাম ঘর, অসংখ্য শকট, অগণিত ওম্‌নিবাস্ এবং নিয়ত ভ্রাম্যমাণ ট্রামগাড়ী প্রভৃতি জিয়েনকে লণ্ডনের কথা স্মরণ করাইয়া দিল। কে এখন বলিবে যে এই স্থানেই একদিন নরশোণিতলোলুপ দস্যু দিগের পধান কেন্দ্র ছিল। কে বলিবে যে গৃহদাহকারী হিতাহিত জ্ঞানশূন্য লুণ্ঠনকারী নরপিশাচের দল এক হস্তে পিস্তল এবং অপর হস্তে সুশাণিত ছুরি লইয়া একদিন এখানে নির্ভয়ে বিচরণ করিত। তাহাদিগকে বাধা দিবার কেহ ছিল না, ধৃত করিবার কেহ ছিল না—তাহাদিগের সম্মুখে পড়িলে মুক্তি লাভেরও উপায় ছিল না!

সান্‌ফ্রান্সিস্‌কো এখন বাণিজ্য-কেন্দ্র। আমেরিকা, ইউরোপ, চীন, ভারতবর্ষ প্রভৃতি কত দেশের লোক সান্‌ফ্রান্সিস্‌কোতে বাস করিতেছে। রাজপথ সর্ব্বদা কোলাহল-চঞ্চল—নাগরিকগণ সর্ব্বদা কর্ম্মে ব্যস্ত।

মিঃ ফগ যে পান্থশালায় উঠিলেন তাহা বেশ পরিচ্ছন্ন। সেখানে কোনো দ্রব্যেরই অভাব ছিল না। প্রাতরাশের পর তিনি রাণী আউদাকে লইয়া ইংরাজ কন্‌সালের আফিসে গমন করিলেন। ছাড়পত্রখানিতে কন্‌সালের স্বাক্ষর লইবার আবশ্যক ছিল। জিয়েন কহিল, “শুনেছি আমেরিকার রেলপথে অনেক দস্যু-তস্করের ভয় আছে। তাহারা চলন্ত ট্রেণে লুণ্ঠন করে। গোটাকতক রিভলভার কিনে নিলে হয়।”

মিঃ ফগ কহিলেন, “ইচ্ছা হয় কিনতে পার। পথে হয় ত কোন আবশ্যকই হবে না।”

মিঃ ফগ কিয়দ্দূর অগ্রসর হইতেই অকস্মাৎ রাজপথে ফিক্স গোয়েন্দার সহিত সাক্ষাৎ হইল। তাঁহাকে দেখাইয়া ফগ কহিলেন, “বড় আশ্চর্য্যের কথা ত আমরা এক জাহাজেই এসেছি, অথচ আপনার সঙ্গে জাহাজে একটা দিনও দেখা হয়নি!”

গোয়েন্দা পূর্ব্বকথা উল্লেখ করিয়া কৃতজ্ঞতা জানাইলেন এবং কহিলেন “আপনার মত লোকের সঙ্গে একত্রে ভ্রমণ করা সৌভাগ্যের কথা। আমিও কার্য্যের খাতিরে ইউরোপেই যাচ্ছি। যদি বাধা না থাকে, আমরা এক সঙ্গেই যেতে পারি।”

“সে কি কথা! আপনার সঙ্গে ভ্রমণ করা ত আমারই সৌভাগ্যের কথা। বেশ ত, আমরা একত্রেই ইউরোপে যাব।”

ফিক্সের উদ্দেশ্য সফল হইল।

তাঁহারা মণ্টোগুমরী স্ট্রীট্‌ দিয়া গমন করিতেছিলেন। সম্মুখেই দেখিলেন বিপুল জনতা। সে জনস্রোত ভেদ করিয়া সম্মুখে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব। তথায় কেহ বা চীৎকার করিতেছে, কেহ বা প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড মুদ্রিত বিজ্ঞাপন লইয়া ছুটাছুটি করিতেছে। কোথাও নিশান উড়িতেছে, কোন স্থানে বা শতকণ্ঠে জয়ধ্বনি নিনাদিত হইতেছে! কেহ বলিতেছে “জয় কামের্‌ফিল্ড”, কেহ বা বলিতেছে “মডিবয়ের জয় হোক্।”

গোয়েন্দা ফিক্স ব্যাপার দেখিয়া অনুমান করিলেন, এ নিশ্চয়ই কোনো রাজনৈতিক সভা। তাই তিনি কহিলেন, “আসুন, আমরা সরে পড়ি। এখানে দাঁড়ালে হয় ত একটা বিপদ্ ঘটিতে পারে।”

মিঃ ফগ সম্মত হইলেন। তিনিও কহিলেন, “রাজনৈতিক হিসাবে আঘাত করিলেও লাগে। চলুন সরাই যাক্।

তখন অন্যদিকে যাইবার আর উপায় ছিল না। তাঁহারা মটোগুমারি স্ট্রীটের প্রান্ত সীমায় অবস্থিত একটী মঞ্চের কতকগুলি সোপানশ্রেণী আরোহণ করিয়া অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। তাঁহাদিগের সম্মুখেই আর একটী প্রকাণ্ড মঞ্চ ছিল। সেই জনসঙ্ঘ তখন মঞ্চের দিকে অগ্রসর হইতেছিল। মিঃ ফগ ভাবিলেন, হয় ত আমেরিকার জাতীয় অধিবেশনের সভাপতি নিযুক্ত হইবেন, কিম্বা কোন প্রাদেশিক শাসনকর্ত্তা মনোনীত হইবেন—এ সভা সেই জন্যই আদ্ভুত হইয়া থাকিবে।

কোলাহল বাডিয়া উঠল। মুষ্টি বন্ধ সহস্র বাহু উর্দ্ধে উৎক্ষিপ্ত হইল, যেন সকলে হস্ত উত্তোলনপূর্ব্বক মনোনয়নে সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছিল। সেই জন-সমুদ্র দুলিতে লাগিল—কাঁপিতে লাগিল। পতাকাগুলি ঊর্দ্ধে উঠিবামাত্র লোকে উহা ছিন্ন করিয়া সহস্র খণ্ড করিতে লাগিল! কত টুপী পদস্পর্শে বিচূর্ণিত হইয়া গেল!

ফিক্স কহিলেন, “এ নিশ্চয়ই রাজনৈতিক সভা, নহিলে এমন হয় না!”

“তা’ হ’তেও পারে।”

“আমার বোধ হয় অনারেবল মিঃ কামের্‌ফিল্ড এবং অনারেবল মিঃ মডিবয় এখানেই আছেন।”

দেখিতে দেখিতে গণ্ডগোল কোলাহল গর্জ্জন অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পাইল। সেই বিশাল জনস্রোতঃ ভীষণ চঞ্চল হইল। সবলে নিক্ষিপ্ত বুট্ এবং জুতা চারিদিকে ছুটিতে লাগিল! অবিরাম মুষ্টির আঘাত চলিতে আরম্ভ হইল! রিভল্‌ভারের শব্দও যে কর্ণে না আসিতেছিল তাহা নহে। মিঃ ফগ সঙ্গিগণ সহ যে স্থানে ছিলেন, একদল নাগরিক মারামারি করিতে করিতে সেই দিকে অগ্রসর হইল।

গোয়েন্দা কহিলেন,—“চলুন এখান থেকেও সরা যাক্। যদি এদের মধ্যে ইংলণ্ডের কোনো কথা হয় আর আমাদের ইংরাজ বলে’ চিন্‌তে পারে, তা’ হ’লে দুই এক ঘা আমাদের পিঠেও পড়তে পারে।”

ফিলিয়াস্ ফগ কেবল বলিতে যাইতেছিলেন, “একজন ইংরাজ কি—” তাঁহার মুখের কথা মুখেই থাকিল। গণ্ডগোল এতই বৃদ্ধি পাইল যে কে কাহার কথা শুনিবে। নাগরিকগণ সমুদ্রগর্জ্জনের ন্যায় গর্জ্জন করিতে লাগিল। মুষ্টিপ্রহারের ত বিরামই ছিল না! একজন বলিষ্ঠ পুরুষ মিঃ ফগের মস্তক লক্ষ্য করিয়া ভীম বেগে যষ্টি উঠাইল। যদি গোয়েন্দা ফিক্স আপনার দেহে সে আঘাত না লইতেন, হয় ত ফিলিয়াস্ ফগ বিশেষরূপে আহত হইতেন। যষ্টির আঘাতে মিঃ ফিক্সের টুপী চূর্ণ হইয়া গেল।

ফগ ঘৃণাভরে কহিলেন,—“ওরে নীচাশয় ইয়াঙ্কি!”

রক্তরাঙ্গা শ্মশ্রুবিশিষ্ট আমেরিকান উত্তর দিল, “রে ইংরাজ পশু! মনে থাকে যেন, আবার আমাদের দেখা হবে!”

“আচ্ছা বেশ—যখন ইচ্ছা।”

“তোমার নাম কি?”

“ফিলিয়াস্ ফগ। তোমার?”

“কর্ণেল ষ্ট্যাম্প প্রক্টর।”

উন্মত্ত নাগরিকগণ কাহারো জন্য অপেক্ষা করিতেছিল না। ফিক্স গোয়েন্দা তাহাদিগের ধাক্কায় ভূশয্যা গ্রহণ করিলেন! তাহাকে মথিত করিয়া নাগরিকগণ চলিয়া গেল। কেহ কাহারো দিকে ফিরিয়াও চাহিল না।

গোয়েন্দা সৌভাগ্যবশতঃ অল্প আঘাতেই নিষ্কৃতি পাইলেন। তাঁহার পরিচ্ছদাদি শতখণ্ডে ছিন্ন হইয়া গেল। রাণী আউদাকে রক্ষা করিতে গিয়া মিঃ ফগের অবস্থাও তদ্রূপই হইয়াছিল। তাঁহারা তখন পান্থশালায় প্রত্যাবর্ত্তন করিয়া পুনরায় নূতন পরিচ্ছদ ক্রয় করিলেন।

জিয়েন ইতিপূর্ব্বেই ১২ টী ছয়-নালা রিভল্‌ভার ও তদুপযুক্ত গুলি লইয়া পান্থনিবাসে আসিয়া অপেক্ষা করিতেছিল। ফিক্স গোয়েন্দাকে দেখিয়াই তাহার ভ্রূ কুঞ্চিত হইয়া উঠিল। কিন্তু সে যখন শুনিল যে তাঁহার জন্যই মিঃ ফগ বিশেষরূপে আহত হইতে হইতে বাঁচিয়া গিয়াছেন, সে তখন অনেকটা শান্ত হইল। দেখিল, ফিক্স গোয়েন্দার সহিত জাহাজে তাহার যেরূপ বন্দোবস্ত হইয়াছিল, গোয়েন্দা সেইরূপই কার্য্য করিতেছেন।

সান্ধ্যভোজ শেষ করিয়া তাঁহারা ট্রেণে যাইয়া উঠিলেন। গাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিতে করিতে মিঃ ফগ কহিলেন, “সেই আমেরিকান্‌টার সঙ্গে আর দেখা হল না। ইংরাজকে অপমান করার প্রতিশোধ দিতে আর একবার তার সন্ধানে আমাকে এ দেশে আস্‌তে হ’বে।”

গোয়েন্দা ফিক্স মনে মনে হাসিলেন। ভাবিলেন, “একবার ইংলণ্ডে গেলে হয়, তা’ হ’লে আর তোমাকে ফিরতে হ’বে না! আমি তবে সঙ্গে আছি কেন।”

একজন রেলের কুলিকে নিকটে দেখিয়া মিঃ ফগ জিজ্ঞাসা করিলেন,—“আজ অত গোলযোগ হ’ল কিসের?”

“একটা সভা হচ্ছিল।”

“কি? কোন সেনাপতি মনোনীত হচ্ছিলেন বুঝি?”

কুলি হাসিয়া কহিল, “না—না। বাপ্‌রে সে কি আর একটা সহজ কথা! এখানে একজন বিচারক মনোনীত হচ্ছিলেন।”

আর অধিক কথা বলিবার সময় ছিল না। ট্রেণ ছাড়িল।

নিউইয়র্ক হইতে সান্‌ফ্রান্সিস্‌কো পর্য্যন্ত যে রেলপথ কত বন কত প্রান্তর কত শৈলশ্রেণী অতিক্রম করিয়া, শৈলগুহা ভেদ করিয়া নির্ম্মিত হইয়াছিল, তাহার দৈর্ঘ্য ৩৭৮৬ মাইল। এই সুদীর্ঘ পথ গমন করিতে এককালে অন্ততঃ ছয় মাস লাগিত। সেই ছয় মাসের পথ এখন এক সপ্তাহে দাঁড়াইয়াছে।

যে গাড়ীতে সঙ্গিগণ সহ মিঃ ফগ প্রবেশ করিলেন, তাহা একখানি দীর্ঘ ওম্‌নিবস্ গাড়ী। গাড়ীর ভিতর আর অন্য কোন কক্ষ ছিল না। উভয় পার্শ্বে যাত্রীদিগের বসিবার ব্যবস্থা এবং মধ্যস্থল দিয়া গমনাগমনের পথ। সেই পথেই চলন্ত ট্রেণেও এক গাড়ী হইতে অন্য গাড়ীতে যাতায়াত করা যাইত। দুইখানি গাড়ীর মধ্যবর্তী স্থান অতি অল্পই ছিল। ট্রেণেই বসিবার কক্ষ, চুরুট খাইবার কামরা, আহারের কক্ষ প্রভৃতি সমস্তই ছিল। পুস্তক পত্রিকা ভোজ্য পেয় প্রভৃতি ট্রেণে কিছুরই অভাব ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে একটা ক্ষুদ্র মুদ্রাযন্ত্র পর্য্যন্ত চলিয়াছিল। সেই মুদ্রাযন্ত্র হইতে সংবাদপত্রও প্রচারিত হইত!

ট্রেণের বসিবার আসনগুলি এইরূপ কৌশলে প্রস্তুত ছিল যে, তাহাদের পশ্চাতের অংশগুলি খুলিয়া দিলেই চমৎকার শয্যা বাহির হইত। সেই শয্যাগুলি পরিচ্ছন্ন ও কোমল আস্তরণে আচ্ছাদিত। তাহার উপর কোমল উপাধান! কেহ কাহাকেও দেখিতে না পায় সেই জন্য আবার প্রত্যেক শয্যার সঙ্গেই পর্দ্দার ব্যবস্থাও ছিল। যে গাড়ীতে যতগুলি শয্যা, সেই গাড়ীতে তাহার অধিক যাত্রী থাকিবার রীতি ছিল না। এই শয্যা রচনা করিবার এবং রচিত শয্যা খুলিয়া দিবার জন্য স্বতন্ত্র কর্ম্মচারীর বন্দোবস্ত ছিল। তাহারা রাত্রি ৮টার সময় শয্যা খুলিয়া দিত এবং প্রভাতে বন্ধ করিয়া রাখিত!

সময় মত সেই কর্ম্মচারী আসিয়া শয্যা বাহির করিয়া দিল। যাত্রিগণ একে একে শয়ন করিলেন। কালিফোর্নিয়ার স্বর্ণ-ভূমির উপর দিয়া ট্রেণ তখন হু হু করিয়া চলিতেছিল।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

আমেরিকানের দুঃসাহস

য়েক দিন ট্রেণ বেশ অবাধে চলিয়াছে। মিঃ ফগের যাত্রাপথে কোনরূপ বিঘ্ন আসিয়া উপস্থিত হয় নাই। আজ ৭ই ডিসেম্বর। ট্রেণ আসিয়া “গ্রীনরিভার” নামক ষ্টেশনে থামিল। পূর্ব্ব রাত্রে অত্যন্ত তুষারপাত হইয়াছিল। আজিও দারুণ শীতল বাতাস বহিতেছে। জিয়েন ভাবিতেছিল, ‘এমন সময়েও লোকে দেশ ভ্রমণে বাহির হয়! তার কিছু বেশী বরফ পড়িলেই ত ট্রেণ পর্য্যন্ত বন্ধ হইয়া যাইত!’

ট্রেণ থামিবামাত্র অনেকে অবতরণ করিল। রাণী আউদা সভয়ে দেখিলেন কর্ণেল প্রক্টরও নামিলেন। আউদার সান্‌ফ্রান্সিস্‌কোর সেই কথা মনে পড়িল,—“আবার দেখা হ’বে।” মিঃ ফগ নিদ্রা গেলেই মিঃ ফিক্স ও জিয়েনকে কর্ণেল প্রক্টরের কথা কহিলেন। কর্ণেলকে দেখিয়াই ভবিষ্যতের একটা বিপদের আশঙ্কায় রাণী আউদার হৃদয় বিচলিত হইয়া উঠে! তাঁহার হৃদয় এখন মিঃ ফগের বিপদে অতিমাত্র বিচলিত হইত, আবার তাঁহার সুখে হর্ষোৎফুল্ল হইত।

মিঃ ফিক্স কহিলেন, “আপনার কোন চিন্তা নাই। মিঃ ফগের সঙ্গে অস্ত্রপরীক্ষা করার পূর্ব্বেই কর্ণেলকে আমার সঙ্গে বোঝা-পড়া করতে হ’বে। আমিই ত তাদের হাতে বেশী অপমানিত হয়েছি!”

জিয়েনও গম্ভীর হইয়া বলিল—“তিনি যদিও একজন কর্ণেল, কিন্তু আমার সঙ্গেও তাঁর অল্প-বিস্তর হিসাব-নিকাশ আছে!”

রাণী আউদা শুধু এই কথায় তাঁহার হৃদয়কে শান্ত করিতে পারিলেন না। তিনি কহিলেন,— “মিঃ ফিক্স, আপনি কি জানেন না যে মিঃ ফগ আর কা’কেও তাঁর কলহ ঘাড়ে নিতে দিবেন না। তিনি ত বলেছেন, যে তাঁকে অপমান করেছে তাকে খুঁজে নিতে যদি আবার আমেরিকায় আসতে হয়, তা’ হ’লেও তিনি আসবেন! যদি তাঁর সঙ্গে কর্ণেলের এখানেই দেখা হয়, তা’ হ’লে না জানি কি একটা বিষম কাণ্ড ঘটবে! উভয়ের যাতে দেখা না হয়, আপনারা তাই করুন।”

মিঃ ফিক্স বলিলেন,—“আপনার কথাই ঠিক; দেখা হলেই সব পণ্ড হ’বে। মিঃ ফগ জয়ী হ’তে পারুন আর নাই পারুন, তাঁর দেরি হ’য়ে যাবে। তা হলেই—”

কটাক্ষপাত করিয়া জিয়েন কহিল, “তা’ হ’লেই সংস্কার-সমিতির একটা মস্ত সুবিধা জুটে গেল আর কি! নিউইয়র্ক যেতে এখনো আমাদের ৪ দিন। যদি মিঃ ফা এর মধ্যে গাড়ী ছেড়ে না নামেন, তা’ হ’লেই আর কর্ণেলের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হবে না। যা হোক্‌, যেমন করে পারা যায়, তাঁদের দেখা সাক্ষাৎটা বন্ধ করতেই হ’বে।”

মিঃ ফগের নিদ্রাভঙ্গ হইল দেখিয়া তাঁহারা নীরব হইলেন।

নিতান্ত মৃদু কণ্ঠে জিয়েন গোয়েন্দা ফিক্সকে কহিল,—“আপনি কি সত্যই মিঃ ফগের জন্য অস্ত্র ধরতে প্রস্তুত আছেন?”

“তাঁ’কে জীবিত অবস্থায় ইংলণ্ডে ফিরে নিয়ে যেতে যা’ কিছু সম্ভব আমি তাই করবো।”

গোয়েন্দার কথা শুনিয়া জিয়েনের আপাদমস্তক কম্পিত হইয়া উঠিল। কিন্তু মিঃ ফগের সাধুতার উপর তখনো তাহার অটল বিশ্বাস ছিল।

মিঃ ফগ যাহাতে গাড়ী হইতে না নামেন, তাহারই ব্যবস্থা করিবার জন্য গোয়েন্দা তাঁহাকে বলিলেন, “সময়টা যেন আর যাচ্ছে না।”

“একেবারে যে যাচ্ছে না, তা নয়, যাচ্ছে বৈ কি।”

“কিন্তু বড় ধীরে ধীরে!”

“জাহাজে ত আপনি হুইষ্ট খেলে অনেকটা সময় কাটিয়েছেন।”

“জাহাজে সে সুবিধা ছিল বটে। এখানে তাসও নাই, খেলার সঙ্গীও নাই।”

“তাস ত এখনই আনতে পারা যায়। ট্রেণেই কিনতে পাওয়া যাবে। আর খেলার সঙ্গী? যদি রাণী আউদা খেলেন―”

রাণী কহিলেন, “আমি অল্প অল্প জানি। হুইষ্ট খেলা ইংরাজি শিক্ষার একটা অঙ্গ বলে’ বাবা আমাকে শিখিয়েছিলেন।”

“আমিও একটু খেলতে পারি।”

আনন্দিত হইয়া মিঃ ফগ কহিলেন,―“বেশ ত।”

জিয়েন কাল বিলম্ব না করিয়া তাস ক্রয় করিয়া আনিল।

ট্রেণ নির্ব্বিবাদে চলিতে লাগিল। মিঃ ফগ নিশ্চিন্তে হুইষ্ট খেলিতে লাগিলেন। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ ট্রেন থামিয়া গেল। মিঃ ফগের সে দিকে বিশেষ দৃষ্টি ছিল না। তিনি হইষ্ট খেলাতেই বেশী মন দিয়াছিলেন।

জিয়েনের বিশেষ কোনো কার্যা ছিল না। ট্রেণ কেন থামিল, তাহার কারণ অনুসন্ধানের জন্য সে নামিল। নামিরাই দেখিল আরও অনেক যাত্রী ট্রেণের গার্ডকে ঘিরিয়া ধরিয়াছে এবং নানা প্রশ্ন করিতেছে। কর্ণেল প্রক্টরই সেই প্রশ্নকর্তাদিগের অগ্রণী ছিলেন।

মেডিসিন্ বো নামক ষ্টেশনের ষ্টেশনমাষ্টার একটা লোক পাঠাইয়া সংবাদ দিয়াছিলেন যে, সম্মুখের সেতু নিরাপদ নহে। উহার উপর দিয়া ট্রেণ চলিতে পারিবে না। এই সংবাদ পাইয়াই গার্ড গাড়ী থামাইয়া ছিলেন। যে স্থানে ট্রেন থামিয়াছিল, তথা হইতে একমাইল দূরেই সেই সেতুটী অবস্থিত। সেতুর তলদেশ দিয়া একটী পার্ব্বত্য-তরঙ্গিণী ভীম বেগে ছুটিয়া চলিতেছিল। জানা গেল সেতুর কয়েকটা নির্ভরস্তম্ভ ভাঙ্গিয়া গিয়াছিল।

সংবাদ শুনিয়া জিয়েন হতবুদ্ধি হইল। এরূপ দুঃসংবাদ মিঃ ফগের নিকট নিবেদন করিতেও তাহার সাহস হইল না। সে প্রস্তরগঠিতব‍ৎ থাকিয়া প্রায় রুদ্ধ নিশ্বাসে আরোহীদিগের আলোচনা শুনিতে লাগিল।

কর্ণেল বলিলেন “এত ভারি মজার কথা দেখ্‌ছি। আমরা কি তবে এই বরফের মধ্যে অনন্তকাল দাঁড়িয়ে থাক্‌বো? ট্রেণ কি আর কিছুতেই যেতে পারবে না?” উত্তরে গার্ড কহিলেন, “না। আর একখানা ট্রেণের জন্য আমি ওমাহা স্টেশনে তারে খবর দিয়াছি। কিন্তু ছ’ ঘণ্টার আগে সে গাড়ী মেডিসিন বা ষ্টেশনে আস্‌তে পারবে না।”

জিয়েন ভীতি-বিহ্বল চিত্তে কহিল “ছয় ঘণ্টা!” গার্ড কহিলেন, “এখান থেকে হেঁটে মেডিসিন বো-তে যেতেও প্রায় ছ’ঘণ্টাই লাগবে।”

একজন যাত্রী কহিল, “অত সময় লাগবে কেন? এক মাইল পথ বৈত নয়!”

“এক মাইল বটে, কিন্তু নদীটা পার হ’তে হ’বে ত?” কর্ণেল কহিলেন, “কেন, নৌকায় পার হওয়া যাবে। নৌকা মিলিবে না?”

“নৌকায় পার হওয়া এখন অসম্ভব। পাহাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। নদী এত ফুলে উঠেছে যে নৌকার সাধ্য নাই সাঁকোর কাছে পার হয়! পার হ’বার একটাই যায়গা আছে, সেও ১০ মাইল দূরে!”

যাত্রীদিগের মধ্যে তখন একটা বিষম গণ্ডগোল উপস্থিত হইল। মিঃ ফগ যদি খেলায় মত্ত না থাকিতেন, তাহা হইলে তিনিও নিশ্চয় গাড়ী হইতে অবতরণ করিতেন।

ড্রাইভার কহিল, “একটা উপায় আছে—চেষ্টা ক’রে দেখ্‌লে হয়।” সকলেই সমস্বরে কহিল “কি―কি? সাঁকো পার হ’তে পারা যাবে ত?”

“হাঁ।”

“ট্রেণ খানা সমেত না কি?”

“হাঁ, তা’ বৈ কি।”

গার্ড কহিলেন, “পাগলের কথা! সাঁকো যে ভেঙ্গে গেছে!”

“তা’ ভাঙ্গলোই বা। ভেঙ্গেছে।—প’ড়ে ত যায়নি?”

“না, তা যায়নি বটে, তবে গোটা দুই থাম্‌ ভেঙ্গে গেছে!”

“তাতে কি? আমি যদি খুব বেগে গাড়ী চালিয়ে দি’—তা’ হলে পলক ফেলতে না ফেলতে হয় ত ট্রেণ নিয়েই বেরিয়ে যেতে পারবো।”

জিয়েন মনে মনে ভাবিল, “লোকটা বলে কি!” কিন্তু কথাটা কতকগুলি যাত্রীর মনে ধরিল। কর্ণেল প্রক্টর সিদ্ধান্ত করিলেন, ‘এ আর একটা বেশী কথা কি। এ ত হতেই পারে।’ ড্রাইভারকে উৎসাহিত করিবার জন্য তিনি এইরূপ নানাবিধ দুর্ঘটনার উল্লেখ করিয়া বলিলেন, “এত তবুও সাঁকোটা দাঁড়িয়ে আছে—ভেঙ্গে পড়েনি। আমি একজন ড্রাইভারকে জানি, সে বিনা সাঁকোতেই একবার ছোট একটা নদী পার ক’রে ট্রেণ নিয়ে গিয়েছিল। সে যে তখন কি ভয়ানক বেগে গাড়ী চালিয়েছিল তা আর বলা যায় না! সমস্ত ট্রেণখানা রেল থেকে যেন লাফিয়ে উঠে নদী পার হয়ে গেল! আমাদের ট্রেণও সাঁকোর উপর দিয়ে যাবে!”

যাহা হউক, কিছুক্ষণ এইরূপ কথাবার্ত্তার পর অনেকগুলি যাত্রী ড্রাইভারের পক্ষ অবলম্বন করিল। একজন বলিল, “আমরা যে নির্ব্বিঘ্নে যেতে পারবো তার শতকরা ৫০ বার সম্ভাবনা।”

আর একজন অমনি বলিয়া উঠিল, “৫০ বার কি হে―৬০ বার।”

তৃতীয় ব্যক্তি উভয়কে সরাইয়া একটু অগ্রসর হইয়া কহিল, “হুঁ ৬০ বার! আরে ৮০ ৯০ বারই বল না।”

ইহাদের কথাবার্ত্তা শুনিয়া জিয়েনের বুদ্ধি বিলুপ্ত হইয়া গেল। সে কেবলই ভাবিতে লাগিল, ‘এরা বলে কি!’ অন্য একটা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ উপায় তাহার মনে আসিয়া উদয় হইল। সে একজন সহযাত্রীকে কহিল, “ড্রাইভারের ব্যবস্থাটা কিছু বিপজ্জনক ব’লে মনে হয়। কিন্তু—”

প্রত্যুত্তরে যাত্রীটী বলিল, “বিপজ্জনক কি? পার হবার ত শতকরা ৮০ বার সম্ভাবনা দেখাই গেল।” “তা আমি জানি, কিন্তু আমি একটা উপায়—” জিয়েনের মুখের কথা মুখেই থাকিল। তাহাকে বাধা দিয়া সেই আমেরিকান যাত্রী কহিল, “শুধু উপায় ঠাওরালেই ত কাজ হ’বে না। ড্রাইভার নিজেই বলছে যে যেতে পারবে―”

“তা’ পারতে পারে। কিন্তু আমি যা’ বলছিলাম সেইটেই বোধ হয় সমীচিন হ’তো—”

“সমীচিন! কি সমীচিন!” কর্ণেল ক্রুদ্ধ হইয়া কহিলেন “সমীচিন আবার কি! তুমি কি বুঝতে পারছ না যে, আমরা পূরো দমে চালিয়ে যাব। শুনছো হে? পূরো দমে—পূরো দমে—”

জিয়েন কহিল “হাঁ শুনছি বই কি। যা হোক সমীচিন শব্দটায় যদি আপনাদের অমত থাকে, তা হলে সেটা না বলে বরং স্বাভাবিক—”

চতুর্দ্দিক্ হইতে যাত্রীরা কোলাহল করিয়া উঠিল, “লোকটা কে হে―ও বলে কি! স্বাভাবিকের ও কি জানে!”

উত্তেজিত আরোহিবৃন্দ জিয়েনকে আর কথাই কহিতে দিল না। কর্ণেল প্রক্টর বিদ্রূপ করিয়া কহিলেন, “কি হে ছোকরা, ভয় পেয়েছ না কি?”

“ভয়! ভয় কাকে বলে জিয়েন তা’ জানে না”

গার্ড আদেশ দিলেন, “উঠুন—উঠুন—সকলে গাড়ীতে উঠুন। গাড়ী এখনই ছাড়বে।”

জিয়েন অনুচ্চস্বরে কহিল, “তা ওঠা যাচ্ছে, কিন্তু যাত্রীরা হেঁটে সাঁকো পার হ’লে পর গাড়ীখানা সাঁকোর উপর তুললে ভাল হ’তো।”

জিয়েনের যুক্তি কেহ শুনিল না। যদি কেহ শুনিত তাহা হইলেও উহা মানিতে চাহিত কি না সন্দেহ।

সকলে গাড়ীতে উঠিল। মিঃ ফগ তখনো নিবিষ্টচিত্তে হুইষ্ট খেলিতেছিলেন। ড্রাইভার বংশীধ্বনি করিয়া ট্রেণখানি এক মাইল পশ্চাতে লইয়া গেল এবং তথা হইতে ভীম বেগে সম্মুখে অগ্রসর হইল। সে বেগের পরিমাণ করিতে হইলে বলিতে হয় উহা ঘণ্টায় ১০০ মাইলের কম ছিল না! গাড়ীগুলি যেন রেললাইন স্পর্শ না করিয়াই ছুটিল!

বিদ্যুৎ যেমন এক নিমেষে আকাশের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্য্যন্ত স্পর্শ করে, ট্রেণখানিও তেমনি নিমেষ মধ্যে সেতু পার হইয়া গেল—যেন সেই পার্ব্বত্য তরঙ্গিণীর এক পার হইতে অপর পারে লম্ফ প্রদান করিল! পর মুহূর্ত্তেই একটা ভীষণ শব্দ শ্রুতিগোচর হইল। সকলে চাহিয়া দেখিল সেতুটী সহস্রখণ্ডে বিভক্ত হইয়া নদীগর্ভে নিমজ্জিত হইতেছে!

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

সিয়োক্স দস্যু

ণে তিন দিন, তিন রাত্রি কাটিয়া গিয়াছে। এই সময়ের মধ্যে মিঃ ফগ ১৮২ মাইল পথ অতিক্রম করিয়াছেন। ইভানস্ পাস্ নামক ষ্টেশনই সে পথের সর্ব্বোচ্চ রেল ষ্টেশন। সমুদ্র হইতে উহা ৮০৯১ ফিট উচ্চে। তাঁহারা সন্ধ্যার সময় ইভানস্ পাসে আসিয়া পৌঁছিলেন। এখন শৈলপৃষ্ঠ ত্যাগ করিয়া ট্রেণ ক্রমেই নিম্নাভিমুখে ধাবিত হইতে লাগিল।

প্রভাতে মিঃ ফগ হুইষ্ট খেলিতে আরম্ভ করিলেন। মিঃ ফিক্স এ পর্য্যন্ত অনেক বাজী জয় করিয়াছিলেন। কিন্তু এখন ক্রমে ক্রমে পরাজিত হইতে লাগিলেন। উভয়েই খেলিতে খেলিতে আত্মবিস্মৃত।

সেবার মিঃ ফগের পালা। তিনি যেই এক খানি চিড়াতন খেলিতে যাইবেন, অমনি শুনিলেন কে যেন পশ্চাৎ হইতে বলিয়া উঠিল “আমি হ’লে হরতন খেলতেম।”

তাঁহারা চমকিত হইয়া চাহিয়া দেখিলেন পশ্চাতে, কর্ণেল প্রক্টর! তিনিও মিঃ ফগকে চিনিলেন, মিঃ ফগও তাঁহাকে চিনিলেন। কর্ণেল কহিলেন “আপনি যে দেখছি সেই ইংরাজ—তাই ত আপনি চিড়াতন খেলতে যাচ্ছেন!”

“হাঁ তাই বটে। দেখুন না আমি খেলছিও তাই।” মিঃ ফগ তাস দিলেন।

নিক্ষিপ্ত তাস তুলিয়া লইবার চেষ্টা করিয়া কর্ণেল একান্ত ধৃষ্টের ন্যায় কহিলেন, “আমি হরতন খেলতে চাই। আপনি হুইষ্ট খেলার কিছুই জানেন না দেখছি!”

মিঃ ফগ আসন ত্যাগ করিয়া কহিলেন, “অন্যেও যেমন জানে, আমিও তেমনি জানি।”

কর্ণেল ব্যঙ্গ করিয়া কহিলেন, “তাই না কি! একবার খেলেই দেখুন না!”

ব্যাপার দেখিয়া রাণী আউদার মুখমণ্ডল বিবর্ণ হইয়া উঠিল। তিনি মিঃ ফগের হস্ত ধারণ করিয়া তাঁহাকে টানিয়া বসাইলেন। জিয়েন যেরূপ ঘৃণাভরে কর্ণেলের দিকে চাহিয়াছিল, তাহাতে বোধ হইল সে মুহূর্ত্তে তাঁহার উপর নিপতিত হইবে। ফিক্স গোয়েন্দা মিঃ ফগকে পক্ষা করিয়া কহিলেন,—

“আপনি ভুলে যাচ্ছেন যে, এঁর সঙ্গে আমাকেই আগে বোঝাপড়া করতে হ’বে। ইনি যে আমাকে শুধু অপমানই করেছেন তা নয়—আমাকে প্রহারও করেছেন।”

ফিলিয়াস্‌ ফগ শান্ত চিত্তে কহিলেন, “মিঃ ফিক্স মার্জ্জনা করুন। বোঝা-পড়াটা কেবল আমার সঙ্গেই হ’বে। ‘কেমন ক’রে, হুইষ্ট খেলতে হয় আমি তা জানি না’ এই কথা ব’লে কর্ণেল আমাকে অত্যন্ত অপমানিত করেছেন। তিনি অবশ্য তার সন্তোষজনক কৈফিয়ৎ দিবেন।”

কর্ণেল তীব্রভাবে বলিলেন “কৈফিয়ৎ! যখন—যেখানে ইচ্ছা―যেমন করে চান তাই পাবেন!”

রাণী আউদা মিঃ ফগকে ধরিয়া রাখিতে চেষ্টা করিলেন। গোয়েন্দা ফিক্স কর্ণেলের সঙ্গে সর্ব্বাগ্রে যুঝিতে চাহিলেন। জিয়েন কহিল, “আদেশ মাত্রেই আমি গাড়ীর জানালা দিয়া কর্ণেলকে মাঠের মধ্যে ফেলে দিতে পারি।”

কিন্তু মিঃ ফগ কিছুতেই শুনিলেন না—কোন বাধাই মানিলেন না। তিনি গাড়ী হইতে অবতরণ করিলেন। কর্ণেলও তাঁহার অনুসরণ করিলেন। ট্রেণ তখন একটা ষ্টেশনের নিকট দাঁড়াইয়াছিল।

প্ল্যাটফরমের উপর নামিয়া মিঃ ফগ বিনীত ভাবে বলিলেন “দেখুন মহাশয়, তাড়াতাড়ি ইউরোপে ফিরে যাওয়া আমার বিশেষ দরকার। এখানে দেরি হলে আমার অত্যন্ত স্বার্থহানি হ’বার সম্ভাবনা।”

কর্ণেল কহিলেন, “তাতে আমার কি?”

মিঃ ফগ পূর্ব্ববৎ বিনয়নম্র বচনে কহিলেন, “সানফ্রান্সিস্‌কোতে আপনার সঙ্গে কলহ হ’বার পর আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমার ইংলণ্ডের কাজ শেষ হ’লেই আমি আপনার সন্ধানে আবার আমেরিকায় আসবো।”

“বটে? তাই না কি?”

“আজ থেকে ছ’মাস পর আপনার সঙ্গে দেখা হ’বে কি?”

“ছ’মাসে আর কাজ কি! তবে ছ’বছরই বলুন না!”

“আমি ছ’মাসের কথাই বলছি। ছ’মাস পর আমি ঠিক নির্দ্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হ’ব।”

কর্ণেল চীৎকার করিয়া কহিলেন, “এ কি বাতুলতা! হয় এখনই, না হয় বোঝা গেল আর কখনো হবে না।”

“তাই হ’বে। আপনি কি নিউইয়র্কে যাচ্ছেন?”

“না!”

“সিকাগোতে?”

“না।”

“ওমাহায়?”

“আমি যেখানেই যাই না কেন, আপনার তাতে কি? আপনি প্লাম্‌ফ্রিক্ ষ্টেশন জানেন কি?

“না।”

“পরের ষ্টেশনই প্লাম্‌ফ্রিক্। গাড়ী সেখানে ১০ মিনিট দাঁড়াবে। গোটাকত বন্দুকের গুলি চালাতে সেখানে আর কতটুক সময় লাগবে?”

“আচ্ছা তাই হ’লো। আমিও প্লাম্‌ফ্রিকেই নামবো।”

তখন অসাধারণ ঔদ্ধত্যের সহিত কর্ণেল কহিলেন,―

“সেখান থেকে আর উঠতে হবে না!”

মিঃ ফগ ধীরভাবে আপনার গাড়ীতে উঠিতে উঠতে উত্তর দিলেন, “কে জানে কি হ’বে!”

গাড়ী ছাড়িল। তিনি রাণী আউদাকে আশ্বস্ত করিয়া বলিলেন, “বাচালের কাছে আবার ভয় কি? মিং ফিক্স এ যুদ্ধে আপনি বোধ হয় আমার দোসরের কাজ কর্‌বেন?”

ফিক্স স্বীকৃত হইলেন।

আবার হুইষ্ট খেলা আরম্ভ হইল। কিছুক্ষণ পরই যে মিঃ ফগ প্রাণান্তকর দ্বৈরথ সমরে লিপ্ত হইবেন, সে চিন্তা তাঁহাকে মুহূর্ত্তের জন্যও বিচলিত করিতে পারিল না।

বেলা ১১টার সময় টেনের বংশীধ্বনি প্লাম্‌ফ্রিক স্টেশনে আগমনবার্ত্তা বিজ্ঞাপিত করিল। মিঃ ফগ উঠলেন। জিয়ন ও মিঃ ফিক্স কয়েকটা রিভলভার লইয়া অনুগমন করিল। বিবর্ণমুখী রাণী আউদা মৃতের ন্যায় একাকিনী গাড়ীতেই রহিলেন। তাঁহার নিশ্বাস যেন এক একবার রুদ্ধ হইয়া আসিতে লাগিল।

পরমুহূর্ত্তেই পার্শ্বের গাড়ীর দ্বার খুলিয়া কর্ণেল প্রক্টর বাহির হইলেন। একজন আমেরিকান তাঁহার দোসর হইয়াছিল। তাঁহারা যখন ট্রেণ হইতে অবতরণ করেন তখন গার্ড কহিলেন—

“নামবেন না মশায়।”

“কেন?”

“গাড়ী ২০ মিনিট পিছিয়ে পড়েছে। আমি এখানে আর দাঁড়াব না।”

মিঃ ফগকে দেখাইয়া দিয়া কর্ণেল কহিলেন, “আমি এঁর সঙ্গে একটু দ্বৈরথ-যুদ্ধ করবো স্থির করেছি।” গার্ড কহিলেন, “কি করবো, বড় দুঃখিত হলেম। ওই শুনুন গাড়ীর ঘণ্টা হ’লো।”

ট্রেণ আর দাঁড়াইল না।

গার্ড বিনয়ের সহিত কহিলেন, “আমার অপরাধ মার্জ্জনা করবেন। অন্যদিন হ’লে আপনাদের জন্য আমি একটু অপেক্ষা করতে পারতেম যদি আপনারা একান্তই যুদ্ধ করেন, গাড়ী চল্‌তে চল্‌তেও তা হ’তে পারে।”

মিঃ ফগকে একটু বিদ্রূপ করিয়া কর্ণেল বলিলেন, “বোধ হয় ওঁর তাতে সুবিধা হ’বে না!” ফিলিয়াস্‌ ফগ উত্তব করিলেন, “আমার কোন অসুবিধাই হবে না! আপনার সুবিধা হ’লেই হ’লো।” গার্ড তখন তাঁহাদিগকে সঙ্গে লইয়া ট্রেনের পশ্চাৎ ভাগে গমন করিলেন। শেষ গাড়ীতে ১০-১২ জন মাত্র যাত্রী ছিল। গার্ড তাঁহাদিগকে বলিলেন, “এই দু’জন ভদ্রলোকের একটু হিসাব-নিকাশ আছে। আপনারা যদি এঁদের একটু জায়গা দিতে পারেন তা’ হলে ভাল হয়।”

তাঁহাদিগকে অনুগৃহীত করিবার জন্য যাত্রীরা নামিয়া গেল।

গাড়ীখানি ৫০ ফিট দীর্ঘ, সুতরাং বন্দুক লইয়া দ্বৈরথ-সমর করিবার অনুপযুক্ত ছিল না। ফিলিয়াস্ ফগ এবং কর্ণেল প্রক্টর গাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিলেন। উভয়ের নিকটেই ছয়নালা রিভল্‌ভার ছিল। গাড়ীর দ্বার বন্ধ করিয়া তাঁহাদিগের সহযোগিগণ অন্যত্র অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। এঞ্জিনের বাঁশী শুনিলেই যুদ্ধ আরম্ভ হইবে এবং দুই মিনিট পর্য্যন্ত চলিবে এইরূপ বন্দোবস্ত হইল।

এত সহজে এবং এত সত্বর সকল বন্দোবস্ত হইয়া গেল যে জিয়েন এবং ফিক্স গোয়েন্দা নির্ব্বাক্ হইয়া গেলেন।

এঞ্জিনের বংশীধ্বনি শুনিবার জন্য সকলেই অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত হইয়া অপেক্ষা করিতে লাগিল। এমন সময় চতুর্দ্দিকে ভীষণ গণ্ডগোল আরম্ভ হইল। সেই কোলাহলের মধ্যে ট্রেনের নানা স্থান হইতে বন্দুকের শব্দও শ্রুতিগোচর হইতেছিল। যাত্রিগণ গাড়ীর মধো চীৎকার করিতে লাগিল। চারিদিক্‌ হইতে আর্তনাদ শ্রুত হইতে লাগিল।

কর্ণেল প্রক্টর এবং মিং ফগ বিভলভার হস্তে ত্বরিতপদে সাহায্যার্থে অগ্রসর হইলেন এবং যেখানে গোলযোগ সর্ব্বাপেক্ষা অধিক সেই দিকে ধাবিত হইলেন।

লুণ্ঠনকারী দুর্বৃত্ত সিয়োক্স দস্যুগণ চলন্ত ট্রেণ আক্রমণ করিয়াছিল। আমেরিকার সেই নির্জ্জন পথে তাহারা অনেক সময়েই এইরূপ করিত। তরবারি এবং বন্দুক লইয়া তাহারা ক্ষিপ্রগতিতে রেলগাড়ীর পা-দানের উপর লাফাইয়া উঠিত এবং ভিতরে প্রবেশ করিরা আরোহীদিগের যথাসর্ব্বস্ব লুণ্ঠন করিত।

দস্যুদিগের মধ্যে একজন সর্ব্বপ্রথমে এঞ্জিনের উপর উঠিয়া ড্রাইভার এবং ফায়ারম্যানকে আহত করিল। তাহার ইচ্ছা ছিল যে, ট্রেন থামাইবে। কিন্তু কলের ব্যবহার না জানায় সে হঠাৎ বাষ্প নলের মুখ খুলিয়া ফেলিল। ট্রেণ তখন না থামিয়া আরো ভীষণ বেগে অগ্রসর হইতে লাগিল। তাহার সঙ্গিগণ ইতিপূর্ব্বেই গাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিয়াছিল। যাত্রীদিগের সহিত তাহাদিগের ভীষণ যুদ্ধ আরম্ভ হইল। রিভলভার এবং বন্দুকের শব্দে কর্ণে তালা ধরিল। তরবারির আঘাতে হু হু করিয়া রুধির-স্রোত ছুটিল। কতজন সিয়োক্স যে সেই চলন্ত ট্রেণের নিম্নে পতিত হইয়া প্রাণ হারাইল তাহা কে বলিতে পারে! যাত্রীদিগের মধ্যে অনেকেই আহত হইয়া গাড়ীর ভিতর পড়িয়া রহিল। রাণী আউদাও বীর-নারীর ন্যায় আত্মরক্ষা করিলেন। তাঁহার রিভলভারের আঘাতে ২০।২৫ জন দস্যুর জীবলীলা ফুরাইল।

ট্রেণ যেন উল্কার মত ছুটতেছিল। গার্ড বীরের ন্যায় যুঝিতে যুঝিতে মিঃ ফগকে কহিলেন, “যদি ট্রেণ না থামাইতে পারেন, তা’ হ’লে একজনও বাঁচবে না। ফোর্টকিয়ার্ণি ষ্টেশন আর মাত্র ৫।৬ মাইল দূরে। গাড়ী যদি ষ্টেশন ছেড়ে যায়, তা’ হ’লে দস্যুদের কাছে আত্মসমর্পণ করা ভিন্ন উপায় থাকবে না। তারাই তা হ’লে ট্রেণের কর্ত্তা হবে। পরের ষ্টেশন অনেক—”

গার্ড আরো কি বলিতে যাইতেছিলেন, কিন্তু দস্যুর একটী গুলি আসিয়া তাঁহার বক্ষ ভেদ করিল। তিনি অবিলম্বে মৃত্যুমুখে পতিত হইলেন!

মিঃ ফগ এতক্ষণ বীরদর্পে যুদ্ধ করিতেছিলেন। গার্ডের কথা শুনিয়াই যুদ্ধে ক্ষান্ত দিয়া ট্রেণ থামাইবার জন্য অগ্রসর হইলেন। এঞ্জিনে গমনের পথ যে শত্রু কর্ত্তৃক অবরুদ্ধ হইয়াছিল, তাহা তিনি দেখিয়াও গ্রাহ্য করিলেন না। জিয়েন তাঁহার পার্শ্বে থাকিয়াই যুদ্ধ করতেছিল। সে চীৎকার করিয়া কহিল, “আপনি যাবেন না―যাবেন না। এ একটা সামান্য কাজ―ভৃত্যেরই উপযুক্ত।”

মিঃ ফগ তাহাকে নিবারণ করিতে না করিতেই সে জানালা দিয়া একখানি গাড়ীর নীচে নামিয়া গেল এবং অতি সুকৌশলে ঝুলিতে ঝুলিতে এক গাড়ী হইতে অন্য গাড়ী, তাহার পর আর এক গাড়ী এই রূপে ট্রেণের সম্মুখভাগে যাইয়া উপনীত হইল। লগেজ গাড়ী এবং এঞ্জিনের মধ্যস্থিত একটী লৌহদণ্ড এক হস্তে ধারণ করিয়া জিয়েন অপর হস্তে সংযোজনশৃঙ্খল মুক্ত করিয়া দিল। যে লৌহদণ্ড দিয়া এঞ্জিনের সহিত লগেজগাড়ী আবদ্ধ ছিল, তাহা তখন মুহূর্ত্তে ভাঙ্গিয়া গেল! শূন্য এঞ্জিন বিদ্যুদ্বেগে সম্মুখে ছুটিতে লাগিল—ট্রেণের গতি প্রতিমুহূর্ত্তেই কমিতে আরম্ভ হইল। দেখিতে দেখিতে ট্রেণখানি আসিয়া ফোর্টকিয়ার্ণি ষ্টেশনের অনতিদূরে একেবারে পামিয়া গেল। দস্যুগণ তখন পলায়ন করিয়াছিল।

ট্রেন থামিলে যখন হতাহতের সংখ্যা করা হইল, তখন যাত্রীদিগের মধ্যে অনেককেই পাওয়া গেল না। ফরাসী জিয়েনের সন্ধানও কেহ দিতে পারিল না!

সপ্তম পরিচ্ছেদ

কর্ত্তব্য-পালন

রোহীদিগের মধ্যে অনেকেই আহত হইয়াছিল। কিন্তু কাহারো আঘাত তত সাংঘাতিক ছিল না। মৃতের সংখ্যাও যে খুব অধিক ছিল তাহা নহে। কর্ণেল প্রক্টর একটু বেশী আঘাত পাইয়াছিলেন। অন্যান্য আহত যাত্রীদিগের সহিত কর্ণেলকেও শুশ্রূষার জন্য ষ্টেশনে লইয়া যাওয়া হইল।

রাণী আউদা এবং ফিলিয়াস্ ফগ একেবারেই আহত হইয়াছিলেন না। ফিক্স গোয়েন্দার হস্তের মাংস খানিকটা কাটিয়া গিয়াছিল মাত্র। কিন্তু জিয়েনকে পাওয়াই গেল না! রাণী আউদা তাহার জন্য রোদন করিতে লাগিলেন। মিঃ ফগ যেমন প্রস্তরগঠিতবৎ দণ্ডায়মান ছিলেন সেইরূপই রহিলেন। তাঁহার চক্ষে পলক পর্য্যন্ত পড়িতেছিল না।

তখনো দূরে দুই একজন পলায়মান সিয়োক্স দস্যু দেখা যাইতেছিল। তুষারস্পর্শে শুভ্র রেলপথের উভয় পার্শ্ব রক্তরঞ্জিত হইয়া সেই লোমহর্ষণ হত্যা কাহিনীর কথা স্মরণ করাইয়া দিতেছিল—গাড়ীর চাকাগুলির সঙ্গে তখনো খণ্ড খণ্ড নিষ্পিষ্ট নরমাংস ঝুলিতেছিল!

রাণী আউদা কাতর দৃষ্টিতে ফগের দিকে চাহিলেন। সে দৃষ্টিত্ব অর্থ বুঝিতে ফগের মুহূর্ত্ত মাত্র বিলম্ব হইল না। তিনিও এতক্ষণ নিজ কর্ত্তব্যপথ স্থির করিতেছিলেন। রাণী আউদার দিকে চাহিয়া কহিলেন, “জীবিত হোক বা মৃত হোক আমি জিয়েনকে খুঁজিয়া বাহির করিবই করিব।”

রাণী আউদার হৃদয় কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ হইয়া গেল। তিনি আবেগভরে মিঃ ফগের করমর্দ্দন করিলেন। তাঁহার বিন্দু বিন্দু নয়নবারি সুগোল মুক্তার ন্যায় মিঃ ফগের হস্তের উপর পতিত হইতে লাগিল।

ফিলিয়াস্ ফগ দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করিলেন, যে প্রকারেই হউক ভৃত্যের সন্ধান না করিয়া যাইবেন না। তাহাতে যদি সর্ব্বস্বও যায়, তিনি তাহাও স্বীকার করিবেন। তিনি বেশ জানিতেন যে একদিন মাত্র বিলম্ব ঘটিলেই আর নিউইয়র্কে যাইয়া জাহাজ পাইবেন না। নিউইয়র্কে জাহাজ ধরিতে না পারিলে বাজীতে তাহার পরাজয় সুনিশ্চিত। কিন্তু তিনি কখনো কর্ত্তব্যপালনে পরাঙ্মুখ ছিলেন না। ভৃত্যের অনুসন্ধান, তিনি বর্ত্তমান অবস্থায় তাঁহার প্রধান কর্ত্তব্য বলিয়া মনে করিলেন।

ফোর্টকিয়ার্ণি একটী ক্ষুদ্র দুর্গ। দুর্গের সৈন্যগণ বন্দুকের শব্দ ও কোলাহল শুনিয়া ইতিপূর্ব্বেই ষ্টেশনে আসিয়াছিল। তাহাদিগের অধিনায়ককে সম্বোধন করিয়া মিঃ ফগ বলিলেন, “মহাশয় তিন জন যাত্রীর কোন সন্ধানই নাই!”

“তারা মরে গেছে না কি?”

“মরুক আর দস্যুর হস্তে বন্দীই হোক তাদের সন্ধান করতেই হবে। আপনি কি সৈন্য নিয়ে দস্যুদের অনুসরণ করতে চান?”

সেনাপতি কহিলেন, “সে বড় বিষম কথা! তারা যে পালাতে পালাতে কোথায় যাবে তার ঠিকানা কি? আমি কি আর দুর্গটী অরক্ষিত অবস্থায় রেখে যেতে পারি। কে জানে যে সুবিধা পেলে’ দস্যুরা এসে দুর্গই আক্রমণ করবে না!”

মিঃ ফগ বলিলেন, “কিন্তু ম’শায় তিনটী লোকের যে প্রাণ যায়!”

“তা ঠিক। কিন্তু তিন জনের জন্য কি আমি ৫০ জনের জীবন বিপদাপন্ন করিতে পারি! দস্যুর আক্রমণে অনেকেরই ত প্রাণ গিয়েছে। তার উপায় কি বলুন!”

“৫০ জনের জীবন বিপদাপন্ন করতে পারেন কি না তা জানি না, কিন্তু আমার বোধ হয়, আপনার করাই উচিত।”

কাপ্তান তীব্রস্বরে কহিলেন, “আমায় আমার কর্ত্তব্যাকর্ত্তব্য বুঝিয়ে দিতে পারে এমন লোক ত আমি এখানে দেখি না!”

অনুত্তেজিত কণ্ঠে ফগ কহিলেন, “আচ্ছা বেশ। আমি তা হ’লে একাই যাব!”

মিঃ ফিক্সের নিকট ফগের একা যাওয়ার প্রস্তাবটী ভালো লাগিল না। এতদূর অনুসরণ করিয়া কি তিনি শেষে দস্যুকে হারাইবেন! তিনি কহিলেন,—

“আপনি একাই দস্যুদের অনুসরণ কর্‌তে চান? না—না―তা হবে না।”

আপনি কি বলতে চান, যার জন্য আমরা আজ প্রাণ পেয়েছি, সেই অনুগত অকুতোভয় জিয়েনকে শত্রুকবলে ফেলেই আমি চলে যাব? তা’ কখনো হবে না। আমি নিশ্চয়ই তার খোঁজ কর্‌তে যাব।”

মিঃ ফগের কথা সেনাপতির হৃদয় স্পর্শ করিল। তিনি বলিলেন, “আপনাকে আর একা যেতে হবে না। আপনি দেখছি বীরপুরুষ।”

তিনি তখন সৈন্যদিগকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, “আমি ৩০ জন লোক চাই। কে কে যাবে এস।”

তাহারা সকলেই বীর—সকলেই নিকটে দণ্ডায়মান থাকিয়া সেনাপতির সহিত মিঃ ফগের কথা শুনিতেছিল। আসন্ন যুদ্ধের সম্ভাবনায় এবং একজন বীরের জীবনরক্ষা করিবার বীরোচিত আগ্রহে তাহাদিগের হৃদয় জ্বলিতেছিল। আহ্বান মাত্রেই তাহারা সকলেই অগ্রসর হইল। সেনাপতি তন্মধ্যে ৩০ জনকে যাত্রার জন্য আদেশ করিলেন। একজন স্থির ধীর বৃদ্ধ কর্ম্মচারী তাহাদিগের নায়ক-পদে বৃত হইলেন।

মিঃ ফগ কৃতজ্ঞ হৃদয়ে বলিলেন, “সেনাপতি মশায়, আপনাকে ধন্যবাদ।”

গোয়েন্দা ফিক্স অগ্রসর হইয়া কহিলেন, “আমাকে কি সঙ্গে নেবেন না?”

“আপনার যা ইচ্ছা করতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি রাণী আউদার রক্ষার ভার নিতেন, তা’হ’লেই আমার বেশী উপকার হ’ত। কি জানি, যদি আমার কোনো বিপদই ঘটে—”

গোয়েন্দার মুখ বিবর্ণ হইয়া উঠিল। এত শ্রমে এত বিপদের ভিতর দিয়া তিনি এতদিন যাহার অনুসরণ করিতেছেন, আজ কি না তাহাকে একা ছাড়িয়া দিতে হইতেছে—নয়নের অন্তরাল করিতে হইতেছে! গোয়েন্দা তীব্র দৃষ্টিতে মিঃ ফগের দিকে চাহিলেন। দেখিলেন সে বদনে কুটিলতার চিহ্নমাত্রও নাই। মিঃ ফগের নিতান্ত সরল দৃষ্টির নিকটে পরাজয় মানিয়া ফিক্স গেয়েন্দা রাণী আউদার রক্ষাভার গ্রহণ করিলেন।

ফিলিয়াস্ ফগ তাঁহার অর্থপূর্ণ ব্যাগটী রাণী অউদার হস্তে সমর্পণ করিয়া অগ্রসর হইলেন এবং যাত্রাকালে সৈন্যদিগকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন,—

“বন্ধুগণ! যদি আমরা বন্দীদের উদ্ধার করতে পারি, তাহ’লে আমি আপনাদের ১৫০০০ ৲ হাজার টাকা পুরস্কার দিতে অঙ্গীকার করছি!”

যতক্ষণ দেখা গেল রাণী আউদা সেই ক্ষুদ্র বীরদলকে দেখিতে লাগিলেন। তাহারা নয়নপথ হইতে অন্তর্হিত হইলে পর তিনি বিশ্রামকক্ষে প্রবেশপূর্ব্বক হতাশ হৃদয়ে উপবেশন করিলেন এবং মিঃ ফগের সাহস, মহত্ত্ব, দয়া প্রভৃতির কথা চিন্তা করিতে লাগিলেন। মিঃ ফগ তাঁহার নিকট দেবতার পূজা পাইলেন।

গোয়েন্দা ফিক্স তখন বাহিরে একখানি আসনে বসিয়া ভাবিতেছিলেন, ‘আমি কি গাধা! আমার পকেটে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাখানা থাকতে আমি দস্যুটাকে ছেড়ে দিলাম! আর কি সে ফিরে আসবে? বোধ হয় না। সে আমাকে নিশ্চয়ই ফাঁকি দিয়েছে।’

তিনি কখনো ভাবিতে লাগিলেন, ‘যাই, আমিও তার অনুসরণ করি। বরফের উপর পদচিহ্ন দেখেই পথ চিনে নিতে পারবো। কিন্তু যেতে যেতেই ত আরো বরফ পড়বে। পদচিহ্ন ত তা’হ’লে আর থাকবে না!’ গোয়েন্দা তাই অবশেষে সে সঙ্কল্প ত্যাগ করিয়া বৃশ্চিকদষ্টবৎ ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন।

দেখিতে দেখিতে বেলা ৩ টা বাজিল। চারিদিক্ তখন তুষারসমাচ্ছন্ন হইয়াছিল। প্রবল বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে তুষার তূলার ন্যায় উড়িয়া ষাইতেছিল। অকস্মাৎ ট্রেণের বংশীধ্বনি শ্রুত হইল! সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেল একটা অস্পষ্ট ছায়া যেন অগ্রসর হইতেছে। ছায়া ক্রমে কায়া লাভ করিল এবং অবশেষে ট্রেণের এঞ্জিনে পরিণত হইল।

জিয়েন যে এঞ্জিন ট্রেণ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া দিয়াছিল তাহা অনেক দূর পর্য্যন্ত দ্রুতবেগে গমন করিলে পর যখন বাষ্প ফুরাইয়া আসিল, কয়লার অভাবে অগ্নির উত্তাপ হ্রাস প্রাপ্ত হইল, তখন ধীরে ধীরে থামিয়া গেল। আহত ড্রাইভারের ইতিমধ্যে জ্ঞানসঞ্চার হইয়াছিল। সে তখন সকল অবস্থা বুঝিতে পারিল। বিপদ্ তুচ্ছজ্ঞান করিয়া সে পুনরায় অগ্নি প্রজ্বালিত করিল এবং বিচ্ছিন্ন ট্রেণখানির সন্ধানলাভের আশায় পুনরায় বিপরীত দিকে আসিতে লাগিল। এত অধিক তুষারপাত হইতেছিল যে, সামান্য কয়েক হস্ত মাত্র দূরেই আর কিছু দেখা যাইতেছিল না। ফোর্ট কিয়ার্ণি ষ্টেশন অতিক্রম করিয়া চলিয়া না যায় ড্রাইভার এইজন্য ঘন ঘন বংশীধ্বনি করিতেছিল।

এঞ্জিন আসিতে দেখিয়া যাত্রীরা পুলকিত হইল। যখন বিযুক্ত ট্রেণ পুনরায় এঞ্জিনের সহিত সংযুক্ত হইল, তখন আউদা গার্ডকে বলিলেন;—

“গাড়ী কখন্ ছাড়বে?”

“এখনই।”

“কিন্তু বন্দীরা—আমার হতভাগ্য সঙ্গীরা—”

“তা বলে ত আমি বসে’ থাকতে পারি না। আমি ৩ ঘণ্টা পিছিয়ে পড়েছি।”

“সান্‌ফ্রান্সিস্‌কো থেকে আবার কখন্ গাড়ী আস্‌বে?”

“কাল সন্ধ্যার সময়।”

“তা হলে ত বড় দেরি হবে দেখছি আপনি কি থাকতে পারবেন না?”

“অসম্ভব! যদি যেতে হয় তবে আসুন, আর বিলম্ব করবেন না।”

“আমি যাব না!”

আহত আরোহিগণ সকলেই গাড়ীতে উঠিয়া বসিল। ট্রেন ছাড়িয়া গেল।

ইতিপূর্ব্বেই যখন ট্রেণ পাইবার কোন সম্ভাবনাই ছিল না, মিঃ ফিক্স তখন দস্যুকে ধরিবার সকল আশা ত্যাগ করিয়া ট্রেণ পাইলেই চলিয়া যাইবেন স্থির করিয়াছিলেন। কিন্তু সত্য সত্যই যখন যাইবার সুযোগ ঘটিল তখন আর তিনি গেলেন না। ভাবিলেন, দেখা যাক্, আবার ত ট্রেণ পাওয়া যাইবে।

যেমন তুষারপাত হইতেছিল, তেমনি হইতে লাগিল। যেমন দারুণ শীতল বাতাস বহিতেছিল, তেমনি বহিতে লাগিল। সন্ধ্যা হইল; সন্ধ্যাসমাগমে সেই ভীষণ নীরবতা আরো অধিক ভীষণ হইয়া উঠিল! রাণী আউদা কত রকম আশঙ্কা করিতে লাগিলেন। তিনি মধ্যে মধ্যেই বিশ্রামকক্ষের বাহিরে আসিয়া প্ল্যাটফরমের প্রান্তসীমা পর্য্যন্ত অগ্রসর হইয়া সঙ্গীদিগের জন্য ব্যাকুল আগ্রহে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। সেই জনহীন প্রান্তর নীরব—অবিরাম তুষারপাতের জন্য দৃষ্টিও অধিক দূর চলিতেছিল না। এইরূপে ঘর এবং বাহির করিতে করিতেই রাণী আউদার রজনী প্রভাত হইয়া গেল। প্রভাতে আকাশের অবস্থা কথঞ্চিৎ পরিবর্ত্তিত হইল বটে, কিন্তু মিঃ ফগের কোন সংবাদ পাওয়া গেল না। রাণী আউদা এবং মিঃ ফিক্স উভয়েই অত্যন্ত ব্যস্ত হইলেন। সৈনিকদিগের জন্য সেনাপতি ক্রমশঃই চিন্তিত হইতে লাগিলেন। ভাবিলেন, তাহার ত গিয়াছেই—তাহাদের রক্ষার জন্য আর সৈন্য প্রেরণ করা বাতুলতা মাত্র!

ক্রমে বেলা অধিক হইতে লাগিল। সেনাপতির চিন্তাও বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। অবশেষে তিনি দুর্গের অবশিষ্ট সৈন্য পাঠাইয়া দিতেই সঙ্কল্প করিলেন। সৈনগণ প্রস্তুত হইল।

সহসা দূরে বন্দুকের শব্দ পাওয়া গেল। সৈন্যগণ হর্ষোৎফুল্ল হ‍ইয়া বন্ধুদিগের সহিত মিলিত হইবার জন্য ক্ষিপ্র পদে অগ্রসর হইল।

অল্পক্ষণ মধ্যেই মিঃ ফগ, জিয়েন এবং অন্যান্য সকলে ষ্টেশনে আসিয়া উপনীত হইলেন।

কিয়ার্ণি ষ্টেশন হইতে ১০ মাইল দূরে দস্যুদিগের সহিত তাঁহাদিগের সাক্ষাৎ হইয়াছিল। তাঁহারা দূর হইতে দেখিলেন, জিয়েন ও অপর দুইজন বন্দী বিপুল বিক্রমে দস্যুদিগের উপর নিপতিত হইয়াছে এবং জিয়েনের সুপরিচালিত অব্যর্থ সবল মুষ্ট্যাঘাতে তিনজন দস্যু আহত হইয়া ধরা-শয্যা গ্রহণ করিয়াছে! এমন সময় মিঃ ফগ সসৈন্যে তথায় উপস্থিত হইয়া বন্দীদিগকে উদ্ধার করিলেন।

জিয়েন ষ্টেশনে আসিয়াই মিঃ ফিক্সকে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ট্রেণ কোথায়?” তাহার ভরসা ছিল তাঁহাদিগকে এইরূপ বিপদের মধ্যে রাখিয়া ট্রেণ কখনই ছাড়া হইবে না।

মি: ফিক্স বিষণ্ণভাবে কহিলেন, “ট্রেণ নাই—চলে গেছে।”

মিঃ ফগ নিতান্ত শান্ত চিত্তে জিজ্ঞাসা করিলেন, “আবার কখন গাড়ী পাওয়া যাবে?”

“সন্ধ্যার পূর্ব্বে আর নয়।”

ফিলিয়াস্ ফগ উত্তর শুনিয়া কেবল কহিলেন, “তাই ত!”

অষ্টম পরিচ্ছেদ

স্লেজ বা স্থলের নৌকা

লিয়াস্ ফগের ২০ ঘণ্টা বিলম্ব হইয়া গেল। জিয়েন নিতান্ত দুঃখিত চিত্তে ভাবিতে লাগিল, “আমিই প্রভুর সর্ব্বনাশ ঘটাইলাম।”

গোয়েন্দা ফিক্স মিঃ ফগের নিকট আসিয়া কহিলেন, “সত্য সতাই কি আপনার তাড়াতাড়ি যাওয়া প্রয়োজন?”

“হাঁ।”

“তা হলে দেখছি ১১ই তারিখের আগেই আপনার নিউইয়র্কে পৌঁছা দরকার। ইংলণ্ডের ডাক জাহাজ ধরতে চান বুঝি?”

“হাঁ। ডাক-জাহাজের উপরই আমার সর্ব্বস্ব নির্ভর করছে?”

“যদি এ সব বাধা বিপত্তি না ঘটতো তা হলে ত আপনি ১১ই প্রভাতেই নিউইয়র্ক যেতে পারতেন।”

“তা হ’তো বৈ কি। তা হলে ত আমার হাতেই বরং আরো ১২ ঘণ্টা সময় অতিরিক্ত থাকতো।”

“আপনার ত মোট ২০ ঘণ্টা দেরি হয়ে গেছে। ২০এর মধ্যে ১২ বাদ দিলে থাকে ৮ ঘণ্টা। এই ৮ ঘণ্টার বিলম্বে যাতে আপনার কোন ক্ষতি না হয় তা কি আপনি করতে প্রস্তুত আছেন?”

“আছি বৈ কি! আপনি বোধ হয় হেঁটে যাওয়ার কথা বলছেন?”

“না না হেঁটে নয়। যখন বরফ পড়েছে তখন স্লেজ গাড়ী বেশ চলবে। হাওয়াও আছে, পাল তুলে’ দিলে রেলের মত যাবে।

“এখানে কি স্লেজ পাওয়া যাবে?”

“একটা লোক তার স্লেজ ভাড়া দিতে পারে বলছিল।”

ষ্টেশনের নিকটে স্লেজওয়ালার কুটীর। মিঃ ফগ স্লেজ দেখিতে গেলেন। গাড়ীখানি মন্দ নহে। ৫।৬ জন লোক অনায়াসে আরোহণ করিতে পারে। গাড়ীর ঠিক মধ্যস্থলে একটী উচ্চ গুণবৃক্ষ লৌহতারে আবদ্ধ হইয়া দণ্ডায়মান ছিল। সেই গুণবৃক্ষের সঙ্গে একটী সুবৃহৎ পাল ঝুলিতেছিল। গাড়ীর একটী হাইলও ছিল। শীতসমাগমে যখন তুষারপাতে রেলপথ ডুবিরা যায়, তখন লোকে স্লেজে আরোহণ করিয়া এক ষ্টেশন হইতে অন্য ষ্টেশনে গমনাগমন করে।

স্লেজওয়ালা কহিল, “পশ্চিম থেকে বাতাসে বেশ জোর দিয়াছে। বরফও খুব শক্ত হয়ে জমে গেছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমরা ওমাহা ষ্টেশনে যেতে পারবো। ওমাহা থেকে নিউইয়র্ক এবং সিকাগো যাবার যথেষ্ট ট্রেণ পাওয়া যায়।”

তখন বেলা ৮টা। মিঃ ফগ অবিলম্বে যাত্রা করিবার ব্যবস্থা করিলেন। তাঁহার ইচ্ছা ছিল রাণী আউদা সেই দারুণ শীতে তাঁহার সহিত স্লেজে না যাইয়া ট্রেণে জিয়েনের সহিত ইংলণ্ডে গমন করেন। কিন্তু আউদা তাহাতে সম্মত না হওয়ায় সকলেই স্লেজে উঠিয়া বসিলেন।

স্লেজওয়ালা পাল টানিয়া দিল। প্রবল বাতাসে পাল ফুলিয়া উঠিল, স্লেজ দুলিতে লাগিল। দেখিতে না দেখিতে তাঁহার সেই মসৃণ অথচ কঠিন বরফরাশির উপর দিয়া তীরবেগে ছুটিতে লাগিলেন। হিসাব করিয়া দেখা গেল স্লেজ ঘণ্টায় ৪০ মাইল যাইতেছে।

কিয়ার্ণি ষ্টেশন হইতে ওমাহা ষ্টেশন সরল ভাবে ২০০ মাইলের অধিক নহে। কোন বিঘ্ন না ঘটিলে তাঁহারা বেলা ১টার মধ্যেই ওমাহা যাইতে পারিবেন বলিয়া অনুমান করিলেন।

নিদারুণ শীত। শীতে তাঁহাদিগের শোণিত পর্য্যন্ত যেন জমিয়া যাইতে লাগিল। কাহারো বাক্যস্ফূর্ত্তি হইল না। সেই মুক্ত প্রান্তরমধ্যে সেই অনন্ত বিস্তৃত তুষাররাশির উপর দিয়া, সেই কলঙ্ক-হীন কঠিন শুভ্র তরঙ্গবিহীন দৃঢ় সাগরের উপর গড়াইতে গড়াইতে—নদীর মধ্যে যেমন পালের নৌকা চলে—স্লেজও তেমনি অনায়াসে চলিতে লাগিল। স্লেজওয়ালা সুদক্ষ ছিল। সে দৃঢ় মুষ্টিতে হাইল ধরিয়া সরল পথে স্লেজ চালাইয়া দিল। স্লেজ যেন উড়িয়া চলিল। যে সকল লৌহরজ্জু দ্বারা গুণবৃক্ষ আবদ্ধ ছিল, বাতাস লাগিয়া তাহারা কাঁপিতে লাগিল। সেই কম্পনে এক অশ্রান্ত করুণ সুর বাজিয়া উঠিয়া নীরব শীতল শুভ্র কঠিন তুষারপ্রান্তরকে ধ্বনিত করিয়া তুলিল।

সমস্ত পৃথিবী যেন তুষারমগ্ন হইয়াছিল। যে সকল পার্ব্বত্যতরঙ্গিণী সেই প্রান্তর বিধৌত করিয়া ফুলিয়া ফাঁপিয়া নৃত্য করিয়া চলিত, তাহারা এখন তুষার রাশিতে পরিণত হইয়াছিল। স্লেজ অনায়াসে সেই সকল নদী অতিক্রম করিয়া চলিতে লাগিল। কদাচিৎ কতকগুলি বন্য পক্ষী তাঁহাদের মস্তকের উপর দিয়া উড়িতে লাগিল। কোথাও বা কতকগুলি ক্ষুধিত নেকড়ে ব্যাঘ্র আহারের সন্ধানে স্লেজের পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইতেছিল। জিয়েনের ইচ্ছা হইতেছিল অবিলম্বে গুলি করিবে। কিন্তু সে যখন শুনিল তাহাতেই বিপদের আশঙ্কা অধিক, ব্যাঘ্রগণ তাহা হইলে কিছুতেই আর প্রতিনিবৃত্ত হইবে না, তখন সে বন্দুক রাখিয়া নীরবে বসিয়া রহিল।

দ্বিপ্রহর কালে স্লেজওয়ালা পাল নামাইয়া কহিলেন, “ওই যে ওমাহা দেখা যায়।”

মিঃ ফগ দেখিলেন দূরে কতকগুলি তুষারমণ্ডিত গৃহচূড়া দেখা যাইতেছে। স্লেজ সেই স্থানে যাইয়া উপনীত হইবা মাত্রই তাঁহারা অবিলম্বে অবতরণ করিলেন এবং সিকাগোর একখানি ট্রেনে উঠিয়া বসিলেন। আর ৫ মিনিট বিলম্ব হইলেই সে ট্রেণ চলিয়া যাইত।

সমস্ত রজনী নির্ব্বিঘ্নে ট্রেণে কাটিয়া গেল! পরদিন ১০ই ডিসেম্বর অপরাহ্ন ৪টার সময় সিকাগোতে পৌঁছিয়াই তাঁহারা শুনিলেন নিউইয়র্কগামী একখানি ট্রেণ ছাড়িবার জন্য প্রস্তুত হইয়াছে। মিঃ ফগ সঙ্গিগণ সহ তৎক্ষণাৎ নিউইয়র্ক যাত্রা করিলেন। দ্রুতগামী ট্রেণ জল স্থল কম্পিত করিয়া ঊর্দ্ধশ্বাসে অগ্রসর হইল

পরদিন বেলা ১১টার সময় ট্রেণ আসিয়া নিউইয়র্কের জাহাজ ঘাটে থামিল। ট্রেণ হইতে অবতরণ করিয়া তাঁহারা শুনিলেন লিভারপুলের জাহাজ “চায়না” ৭৫ মিনিট পূর্ব্বেই বন্দর ছাড়িয়াছে!

‘চায়না’র সঙ্গে সঙ্গে মিঃ ফগের সকল আশাই ভাসিয়া গেল। লিভারপুলে যাইবার আর কোনো জাহাজ ছিল না!

জিয়েন ক্ষোভে ক্ষিপ্তপ্রায় হইল। রাণী আউদা যেন একেবারে ভাঙ্গিয়া পড়িলেন। মাত্র ৪৫ মিনিটের জন্যই শেষে সব গেল! এত পরিশ্রম এত অর্থব্যয় সমস্তই বৃথা হইল! জিয়েন আপনাকে ধিক্কার দিতে লাগিল। সে জানিত যে তাহার জন্যই এ সকল ঘটিল।

মিঃ ফগ তাহাকে তিরস্কার করিলেন না। তাঁহার সর্ব্বস্ব নষ্ট হইতে বসিয়াছিল দেখিয়াও বিরক্তি বা চাঞ্চল্য প্রকাশ করিলেন না। বরাবর নিকোলাস হোটেলে আসিরা আশ্রয় লইলেন। সে রাত্রিতে উৎকণ্ঠায় কাহারো নিদ্রা হইল না। কেবল মিঃ ফগের নিদ্রার ব্যাঘাত ঘটিল না!

নবম পরিচ্ছেদ

বোর্ভোঁ যাত্রা

রদিন ১২ই ডিসেম্বর। মিঃ ফগের তখন আর মোট নয় দিন তের ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় ছিল। তিনি যদি “চায়না” জাহাজ ধরিতে পারিতেন, তাহা হইলে নিশ্চয়ই নির্দ্দিষ্ট সময় মধ্যে লণ্ডনে পৌঁছিয়া বাজী জয় করিতেন! জিয়েন এই সকল চিন্তা করিয়া নিজের মস্তকের কেশ টানিয়া ছিঁড়িতে লাগিল।

মিঃ ফগ সঙ্গীদিগকে কহিলেন, “আমি যতক্ষণ না আসি, আপনারা এখানেই থাকবেন। ডাকা মাত্রই যা’তে রওনা হ’তে পারেন তার বন্দোবস্ত রাখবেন। যাবার কোনো উপায় হয় কি না আমি একবার দেখে আসি।”

ফগ হাড্‌সন নদীর তীরে আসিয়া উপনীত হইলেন। দেখিলেন অনেক পোতই বন্দর ছাড়িবার বন্দোবস্ত করিতেছে, কিন্তু সেগুলি সমস্তই পালে চলে—কলে নহে। সুতরাং তাঁহার সুবিধা হইল না। এদিক্ ওদিক্ দেখিতে দেখিতে হেন্‌রিয়েটা নামক এক খানি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র অর্ণব পোত তাঁহার নয়নে পড়িল। জাহাজের নালামুখে তখন অনর্গল মসিবর্ণ ধূম্র বিনির্গত হইয়া দিঙ্‌মণ্ডল আচ্ছন্ন করিতেছিল। মিঃ ফগ একখানি তরণী যোগে জাহাজে যাইয়া উঠিলেন।

কাপ্তান জাহাজেই ছিলেন। মিঃ ফগ তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,—

“আপনি কি কাপ্তান?”

“হাঁ—আমি কাপ্তান।”

“আমার নাম ফিলিয়াস্ ফগ। আমার বাড়ী লণ্ডনে।”

“আমার নাম আন্দ্রু সিপার্ডি। আমার বাড়ী কার্ডিফে।”

“আপনি বুঝি এখনই জাহাজ ছাড়ছেন?”

“এক ঘণ্টার মধ্যেই ছাড়ব।”

“কোথায় যাচ্ছেন?”

“বোর্ভোঁতে।”

“কি বোঝাই নিয়েছেন?”

“জাহাজ খালি।”

“কোন যাত্রী আছে কি?”

“আমি যাত্রী লই না। তারা সর্ব্বদাই বিরক্ত করে!”

“আপনার জাহাজ কি বেশ দ্রুত চলে?”

“ঘণ্টায় ১৩।১৪ মাইল যায়। হেন্‌রিয়েটা জাহাজের নাম এ অঞ্চলে সকলেই জানে।”

“আপনি কি অনুগ্রহ করে আমাকে আর আমার তিনটী বন্ধুকে লিভারপুল নিয়ে যেতে পারবেন?”

বিদ্রূপের সুরে কাপ্তান কহিলেন—

“লিভারপুল! আমি যে যাচ্ছি বোর্ভোঁ। বলুন না কেন একদম চীন দেশেই নিয়ে যাই!”

“চীন দেশে নয়―লিভারপুলে।”

“না।”

“পারবেন না?”

“আমি ত বলছি পারব না। আমি বোর্ভোঁতে যাব স্থির করেছি, সেখানেই যাব।”

“যদি অনেক টাকা দি।”

“টাকায় কি হ’বে!”

“এ জাহাজ কার?”

“আমার।”

“আমি যদি জাহাজখানা ভাড়া চাই?”

“ভাড়া! আমি ভাড়া দিব না।”

“যদি না দেন, বিক্রয় করুন!”

“তা’ও না!”

সম্মুখে দুস্তর বিপদ্‌সাগর দর্শন করিয়াও মিঃ ফগ তিলমাত্র হতাশ্বাস হইলেন না। তিনি দেখিলেন, এতদিন অর্থের সাহায্যে অসাধ্য সাধন করিয়াছেন, কিন্তু এখন অর্থও যেন সে শক্তি হারাইয়াছে!

যেমন করিয়াই হউক আটলাণ্টিক মহাসাগর উত্তীর্ণ হইয়া লিভারপুলে যাইতেই হইবে। মিঃ ফগ মনে মনে একটা মতলব স্থির করিয়া কাপ্তানকে পুনরায় কহিলেন, “আপনি কি আমাকে বোর্ভোঁতে নিয়ে যাবেন?”

“আপনি যদি আমাকে হাজার টাকাও দেন, তবুও আমি যাত্রী নিব না!”

“আমি যদি সাত হাজার দি?”

“প্রত্যেক যাত্রীর জন্য?”

“হাঁ—প্রত্যেকের জন্য?”

“আপনারা ৪ জন আছেন, কেমন না?”

“হাঁ।”

কাপ্তান সাহেব মাথা চুলকাইতে লাগিলেন! এক সঙ্গে ২৮ সহস্র মুদ্রা, অথচ তার জন্য একটা পয়সাও ব্যয় নাই! কাপ্তান কহিলেন―

“আমি ঠিক ন’টায় ছাড়ব। যদি সময় মত উপস্থিত হ’তে পারেন, জাহাজে স্থান হ’বে।”

“আমরা ঠিক সময় মতই আস্‌ছি।”

মিঃ ফগ সঙ্গীদিগকে লইয়া উপযুক্ত সময়েই জাহাজে আসিয়া উঠিলেন। জাহাজ বোর্ভোঁ অভিমুখে যাত্রা করিল।

ফিক্স গোয়েন্দা ভাবিতে লাগিল, ‘এ কি! যাব ইংলণ্ডে, চলেছি চীনে! কোথায় বোর্ভোঁ, আর কোথায় লিভারপুল! এর রহস্য ত’ বুঝতে পারছিনে!’

দশম পরিচ্ছেদ

বোমা ফাটিল না

ন্‌রিয়েটা জাহাজের নাবিকদিগের সহিত পোতাধ্যক্ষের বিশেষ সদ্ভাব ছিল না। মিঃ ফগ জাহাজে উঠিয়াই তাহা বুঝিতে পারিলেন। তাহাদিগের দুঃখে সহানুভূতি প্রদর্শন করিয়া এবং প্রচুর পরিমাণ অর্থ বিতরণ করিয়া ফগ দুই একদিন মধ্যেই নাবিকদিগকে বশ করিয়া ফেলিলেন।

যেমন করিয়াই হউক জাহাজখানি যাহাতে লিভারপুল যায় তাহা করিতেই হইবে! মিঃ ফগ নাবিকদিগের সাহায্যে পোতাধ্যক্ষকে তাঁহার কক্ষমধ্যে বন্দী করিয়া রাখিলেন এবং নিজেই লিভারপুলের দিকে জাহাজ চালাইতে লাগলেন!

তাঁহার কার্য্য দেখিয়া ফিক্স গোয়েন্দা হতজ্ঞান হইলেন। তিনি পরিতাপ করিতে লাগিলেন, ‘হায়, কেন এই দস্যুর সঙ্গে আসিলাম! ফিলিয়াস্ ফগ কখনো লিভারপুলে যাইতেছে না। ফগ নিশ্চয়ই একজন জল-দস্যু—আপনার গুপ্ত আড্ডায় যাইতেছে! সেখানে না জানি কত বিপদই ঘটিবে!”

মিঃ ফগ যেরূপ ভাবে জাহাজ চালাইতে লাগিলেন, তাহাতে বোধ হইল তিনি নৌবিদ্যায় অতিমাত্র দক্ষ। জিয়েন অবাক্‌ হইয়া গেল! নাবিকগণ নুতন অধ্যক্ষের সদ্ব্যবহারে ও অর্থে এতই প্রীত হইয়াছিল যে প্রাণপণে আপন আপন কর্ত্তব্য সম্পাদন করিতে লাগিল।

জাহাজ অবাধে চলিতে লাগিল। হেন্‌রিয়েটা দ্রুতগামী বটে। ১৩ই পর্য্যন্ত কোনো বাধাবিঘ্ন ঘটিল না। সেই দিনই ঝড়ের লক্ষণ সকল দেখা গেল। রাত্রিতে এমন শীতল বাতাস বহিল যে, কাহার সাধ্য কক্ষের বাহিরে আইসে। কিন্তু নাবিকগণ তখনো কর্ত্তব্যপালন করিতেছিল―নূতন অধ্যক্ষ অম্লানবদনে আপনার নির্দ্দিষ্ট স্থানে থাকিয়া জাহাজ চালাইতেছিলেন।

ঝড় উঠিল। আটলাণ্টিক মহাসাগরের ঝড় অতি প্রবল। মিঃ ফগ পাল নামাইলেন। হেন্‌রিয়েটা কাঁপিতে কাঁপিতে দুলিতে দুলিতে তরঙ্গের উপর গড়াইতে গড়াইতে নক্ষত্রবেগে ছুটিতে লাগিল। তিনি জাগজের গতি শিথিল করিলেন না। এক এক সময় মনে হইতে লাগিল, হেনরিয়েটা আর থাকিবে না! এই ডুবিল—এইবার নিশ্চয় ডুবিল!

“চালাও চালাও—বাষ্পনলের মুখ যেমন খোলা আছে, তেমনি থাকুক—জাহাজের গতি যেন মন্দ না হয়।” নবীন অধ্যক্ষের নির্ভীক আদেশ ধ্বনিত হইল।

মিঃ ফগ কিছুতেই জাহাজের গতি মন্দ করিলেন না। ভীমকায় শৈল প্রমাণ তরঙ্গগুলি জাহাজের ডেকের উপর আসিয়া পড়িতে লাগিল। ডেক-বিধৌত করিয়া নাবিক দিগকে সিক্ত করিয়া ডেকে যে সকল দ্রব্যাদি ছিল তৎসমুদায় ভাসাইয়া লইয়া তরঙ্গের উপর তরঙ্গ এক দিক্‌ হইতে অপর দিকে গড়াইয়া যাইতে লাগিল। নুতন পোতাধ্যক্ষের আদেশ, “চালাও—চালাও—জাহাজ যেন কোন মতে শিথিলগতি না হয়!”

অদ্য ১৬ই ডিসেম্বর। অদ্য ৭৫ দিন পূর্ণ হইল। এখনো আটলাণ্টিক মহাসাগরের পথে অনেক দূর যাইতে হইবে। জিয়েন ভাবিতে লাগিল, যদি জাহাজের বাষ্প কমিয়া না যায়, তাহা হইলে হয়ত হেন্‌রিয়েটা আটলাণ্টিক মহাসাগর অতিক্রম করিতে পারিবে। দুর্ভাগ্য মিঃ ফগের সঙ্গে সঙ্গেই ছিল। হেন্‌রিয়েটার কলের অধ্যক্ষ আসিয়া সংবাদ দিল,—“কয়লা ফুরাইয়া আসিয়াছে!”

মিঃ ফগ কহিলেন, “তুমি ঠিক জান?”

“হাঁ, ঠিক জানি। যেদিন থেকে আমরা জাহাজ ছেড়েছি, সেইদিন থেকেই সমানে আগুন রেখেছি। লিভারপুলে যাবার মত অত কয়লাও জাহাজে ছিল না। আমরা বোর্ভোঁ যাবার মত কয়লা নিয়েছিলাম।” ফগ নিশ্চিন্তভাবে আদেশ দিলেন, “আচ্ছা যাও—যতক্ষণ কয়লা চলে, পূরা দমে চালাও। আমি ভেবে দেখি কি করা যেতে পারে।”

এঞ্জিনিয়ার প্রস্থান করিল।

জিয়েন এই আকস্মিক বিপদের সংবাদে একান্ত বিচলিত হইল এবং সহানুভূতি-লাভের প্রত্যাশায় মিঃ ফিক্সের নিকট এ সংবাদ জ্ঞাপন করিল। ফিক্স কহিলেন, “জাহাজ যে লিভারপুল যাচ্ছে এ কথা কি তুমি বিশ্বাস কর?”

“করি।”

“তুমি একটা মস্ত বোকা দেখছি!”

১৮ই তারিখে এঞ্জিনিয়ার পুনরায় আসিয়া কহিল, “কয়লায় আর চলে না!” মিঃ ফগ তখনো একান্ত অবিচলিত। তিনি জিয়েনকে আদেশ কারলেন, “হেন্‌রিয়েটার বন্দী অধ্যক্ষকে এখানে আন।”

এআই অনুবাদ · মূল