মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Rajendralal Acharya (†1961) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন
অবিলম্বে একজন মাহুত সংগ্রহ করিয়া মিঃ ফগ তাঁহার ভৃত্য ও সার ফান্সিস্কে লইয়া এলাহাবাদ অভিমুখে যাত্রা করিলেন।
মাহুত একজন পার্শী। পথ-ঘাট তাহার ভালই জানা ছিল। দশ ক্রোশ পথ সংক্ষেপ করিবার জন্য সে বনের মধ্য দিয়া অগ্রসর হইল।
মিঃ ফগ এবং সার ফান্সিস্ দুইজনে দুইটী ছোট হাওদায় বসিলেন। জিয়েন দুই হাওদার মধ্যবর্ত্তী স্থানে আশ্রয় লইল। এইরূপে দুই ঘণ্টা অতীত হইলে পর সকলে বিশ্রামের জন্য হস্তী হইতে অবতরণ করিলেন। তখন সকলেই একান্ত শ্রান্ত। দুলিতে দুলিতে সকলেরই সর্ব্বাঙ্গ বেদনা জর্জ্জরিত হইয়াছে। কিন্তু মিঃ ফগের ভ্রূক্ষেপও ছিল না। সার ফ্রান্সিস্ অবাক হইয়া কহিলেন, “মিঃ ফগ যেন লোহায় গড়া।” প্রত্যুত্তরে জিয়েন কহিল, “শুধু লোহায় নয়—পেটা লোহায়!”
প্রাতর্ভোজন শেষ করিয়া মাহুতের নির্দ্দেশ মত সকলে আবার হস্তিপৃষ্ঠে উঠিলেন। হেলিতে হেলিতে দুলিতে দুলিতে মাহুতের ইঙ্গিতে সেই বিশালকায় কিউনি ধীরে ধীরে বনভূমি অতিক্রম করিয়া খর্জ্জুর ও তালকুঞ্জের পার্শ্ব দিয়া চলিতে লাগিল। তাহার পরই অতি বিস্তৃত শুষ্ক উদ্ঘাতিনী ভূমি। তাহার স্থানে স্থানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঝোপ এবং মধ্যে মধ্যে প্রকাণ্ড এক একটা প্রস্তর স্তূপ। এই প্রদেশের নাম বুন্দেলখণ্ড। একদল উন্মও হিন্দু তখন সেখানে বাস করিত। দেশীয় নৃপতিবর্গই বলিতে গেলে তখন বুন্দেলখণ্ডের সর্ব্বময় কর্ত্তা ছিলেন।
আরোগী সমেত দ্রুতগামী হস্তী দেখিয়া, কোন কোন স্থানে কতকগুলি লোক নিতান্ত ক্রুদ্ধ ভাবে অঙ্গভঙ্গী করিতে লাগিল, যেন নিকটে পাইলেই বিপদ ঘটাইবে! ইহারাই বুন্দেলখণ্ডের দস্যুসম্প্রদায়!
এই বৈচিত্র্যময় সুদীর্ঘ পথ অতিবাহিত করিতে করিতে জিয়েন ভাবিতে, লাগিল;―‘এলাহাবাদে পৌঁছিয়া মনিব মহাশর হাতীটার কি ব্যবস্থা করিবেন। কিউনি কি তাঁহার সঙ্গেই যাইবে? না—সম্ভব নয়। হাতীর দাম এবং সঙ্গে লইবার ব্যয় যে অনেক টাকা হইবে। বোধ হয় বিক্রয় করিবেন। কিনিবে কে? আমার ত মনে হয় কিউনির যেরূপ শ্রম হচ্ছে, তাতে একে মুক্তিই দিবেন। আর যদি আমাকেই বখ্শিস স্বরূপ দিয়ে ফেলেন? তা হ’লে ত বড় মুস্কিলেই পড়বো দেখছি!”
তখন প্রায় সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছে। বিন্ধ্যপর্ব্বতের কতকগুলি দুরারোহ উৎরাই অতিক্রম করিয়া হস্তী আসিয়া একটী ভগ্ন জীর্ণ গৃহের সম্মুখে দণ্ডায়মান হইল। তাঁহারা হিসাব করিয়া দেখিলেন, অর্দ্ধেক পথ মাত্র আসিয়াছেন। রজনী অন্ধকার ও অপেক্ষাকৃত শীতল। পার্শী মাহুত যে অগ্নিকুণ্ড প্রজ্বালিত করিয়াছিল, তাহারই চতুর্দ্দিকে বসিয়া সকলে নৈশ ভোজন শেষ করিলেন।
জিয়েন ব্যতীত সকলেরই বেশ সুনিদ্রা হইয়াছিল। ক্কচিৎ বন্য পশুপক্ষীর চিৎকারধ্বনি রজনীর নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিতে লাগিল, কিন্তু যাত্রীদিগের কোন অসুবিধা করিল না। সমস্ত দিন হস্তিপৃষ্ঠে দুলিয়া দুলিয়া, পড়ি—পড়ি—পড়িলাম করিয়া পথ চলিয়া জিয়েন রাত্রিতেও স্বপ্নঘোরে সেই রূপই করিতে লাগিল—তাহার আদৌ নিদ্রা হইল না। সার ফ্রান্সিস্ যোদ্ধৃপুরুষ। সমর-প্রাঙ্গণে পরিশ্রান্ত সৈনিকের ন্যায়ই বিশ্রাম করিতে লাগিলেন। আর ফিলিয়াস্ ফগ? তিনি নির্ব্বিকার চিত্ত, সর্ব্বসময়ে সকল অবস্থায় অবিচলিত। তিনি নিতান্ত নিশ্চিন্তচিত্তে নিদ্রার ক্রোড়ে আশ্রয় লইলেন—যেন তাঁহার সেভিল্রোর গৃহে আপন কক্ষমধ্যেই সুখ-শয্যায় শায়িত রহিয়াছেন!
প্রভাত ছয়টা বাজিল। পুনরায় তাঁহারা করিপৃষ্ঠে আরোহণ করিলেন। মাহুত কহিল, “সন্ধ্যার মধ্যেই এলাহাবাদ পৌঁছানো যাবে।”
মধ্যাহ্নসমাগমে পর্য্যটকগণ একটী নিবিড় বনমধ্যে প্রবেশ করিলেন। মাহুত লোকালয় ত্যাগ করিয়া বনপথেরই আশ্রয় লইয়াছিল। বৃক্ষের পর বৃক্ষ, তাহার পর আবার বৃক্ষ; বনপথ বৃক্ষের ছায়ায় সুশীতল। সুতরাং পথ চলিতে কষ্ট হইল না।
এ কি, এখন কেবল অপরাহ্ণ ৪টা—এখনই কিউনি থামিল যে! সার্ ফ্রান্সিস্ মাহুতকে জিজ্ঞাসা করিলেন,—“থামলে যে, কি হয়েছে?”
পার্শী ভীতচিত্তে কহিল, “কি জানি―ঠিক বুঝতে পারি না—কি যেন আস্ছে।”
তখন দূরাগত মৃদু মৃদু অস্পষ্ট বাদ্যধ্বনি সেই নিবিড় বৃক্ষশ্রেণীর পত্রবহুল শাখা-প্রশাখার ভিতর দিয়া পত্রমর্ম্মরের সহিত মিশিয়া কর্ণে আসিয়া বাজিতে লাগিল। সে ধ্বনি ক্রমেই নিকটে আসিতে লাগিল—ক্রমেই স্পষ্ট হইতে স্পষ্টতর হইল।
কিউনিকে একটী বৃক্ষকাণ্ডের সহিত বন্ধন করিয়া মাহুত অদূরবর্ত্তী ঘনসন্নিবিষ্ট ঝোপের অন্তরালে গমন করিল এবং অল্পক্ষণ পরেই প্রত্যাবর্ত্তন করিয়া ব্যস্তভাবে কহিল,—“ব্রাহ্মণদের একটা শোভাষাত্রা আস্ছে—আসুন আমরা পালাই পালাই!”
মাহুত হস্তী লইয়া গহনবনমধ্যে প্রবেশ করিল।
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
সতী
ক ঢোল ও কণ্ঠনিনাদ সংমিলিত একটী পরস্পর-বিসংবাদী ধ্বনি ক্রমেই নিকটে আসিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে শোভাযাত্রার একাংশ নয়নপথের পথিক হইল। উষ্ণীষ ও সুদীর্ঘ আল্খাল্লায় সজ্জিত হইয়া পুরোহিতগণ সেই শোভাযাত্রার অগ্রভাগে চলিয়াছেন। বালক যুবক বুদ্ধ সমবেত কণ্ঠে এক করুণ শ্মশানসঙ্গীত গাহিতে গাহিতে পুরোহিতদিগকে ঘিরিয়া চলিয়াছে। নানাবিধ বাদ্য-যন্ত্রের শব্দে সে গীতধ্বনি মধ্যে মধ্যে অস্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে।
ইহাদিগের পশ্চাতেই একখানি রথ। রথের সুবৃহৎ চক্র ও চক্রের পাখিগুলি সর্পানুকৃতিতে গঠিত। বহুমূল্য রশ্মিবল্গা প্রভৃতিতে সুসজ্জিত সবলকায় অশ্বগুলি ঘর্ঘর নিনাদে সেই রথ টানিয়া লইয়া যাইতেছে। রথের অধিষ্ঠাত্রী দেবী চতুর্ভুজা রক্তরাগরঞ্জিতা বিলোলরসনা। তাঁহার আলুলায়িত কুন্তল নিবিড় জলদজালের ন্যায় শোভ পাইতেছে। নরকঙ্কালমালিনী ভীমার কটিদেশে অগণিত নরবাহু বিলম্বিত! তাঁহার অধরপ্রান্তে রুধির ধারা ঝরিতেছে। এক জন বিরাট্ পুরুষের বক্ষের উপর দেবী খড়্গহস্তে দণ্ডায়মানা!
মূর্ত্তি দেখিয়া সার্ ফ্রান্সিস চিনিলেন। কহিলেন, “ইহাই হিন্দুদের কালীমূর্ত্তি—ইহাই তাদের একাধারে প্রেম ও মৃত্যুর প্রতিমা।”
জিয়েন বলিয়া উঠিল। “উঃ কি ভীষণ মূর্ত্তি! এ মূর্ত্তি মৃত্যুর বটে, কিন্তু প্রেমের কদাচ নহে!”
মাহুতের ইঙ্গিতে সে নীরব হইল।
মূর্ত্তিটী বেষ্টন করিয়া সন্ন্যাসিগণ তাণ্ডব নৃত্য করিতে লাগিল। উহারা সকলেই বিভূতিবিভূষিত, উহাদের অঙ্গ বহুক্ষতে পূর্ণ। সেই সকল ক্ষতমুখে বিন্দু বিন্দু রুধিরধারা ঝরিতেছিল।
ইহাদিগের পরই চাক্চিক্যময় পরিচ্ছদে শোভিত কতকগুলি ব্রাহ্মণ দেখা দিলেন। তাঁহারা একটী রমণীকে সবলে টানিয়া আনিতেছিলেন। রমণী প্রতি পাদবিক্ষেপে ভূমিতলে লুটাইয়া পড়িতেছিলেন।
আহা! কি সুন্দর নারীমূর্ত্তি! তাঁহার বর্ণ উজ্জল—এত গৌর যে দেখিলে মনে হয় যেন একটী ইউরোপীয় মহিলা। মস্তক কণ্ঠ কর্ণ বাহু প্রকোষ্ঠ মণিবন্ধ সমস্তই মণি-কাঞ্চনে বিভূষিত। তাঁহার পরিধানে সুবর্ণখচিত বসন, তদুপরি সুচিক্কণ মসলিনের দেহাবরণ,—তাহার ভিতর দিয়া অঙ্গের লাবণ্য ও দেহের গঠন ফুটিয়া বাহির হইতেছে।
মহিলাটীর পশ্চাতে বিকটবদন রক্ষিগণ উলঙ্গকৃপাণ ও পিস্তল হস্তে একখানি শিবিকা মধ্যে মৃতদেহ বহন করিয়া আনিতেছে। শবটী একজন বৃদ্ধের। মূল্যবান্ রাজপরিচ্ছদে আচ্ছাদিত। উষ্ণীষ মুক্তাখচিত, অঙ্গাবরণ সুবর্ণ ও রেশমে রচিত, কটিবন্ধ কিংখাবের উপর হীরকগ্রথিত। শবপার্শ্বে আর্য্যনৃপতির সুন্দর সুন্দর অস্ত্র-শস্ত্র। সর্ব্ব পশ্চাতে কতকগুলি উন্মত্ত মনুষ্য বিকট চীৎকার করিতে করিতে অগ্রসর হইতেছে। গীতবাদ্য সমস্তই সেই চীৎকারে ডুবিয়া গিয়াছে।
সার ফ্রান্সিস্ মাহুতের দিকে চাহিয়া কহিলেন, “ইহাই বুঝি সতী?”
মাহুত ওষ্ঠে অঙ্গুলি স্থাপন করিয়া সকলকে নীরব থাকিতে ইঙ্গিত করিল।
সেই জনসঙ্ঘ তখন কাননপথে ঘুরিতে ঘুরিতে ফিরিতে ফিরিতে গভীর অরণ্য মধ্যে প্রবেশ করিতেছিল। ধীরে ধীরে বাদ্যধ্বনি অস্পষ্ট হইয়া আসিতে লাগিল। তখনো মধ্যে মধ্যে বিকট চীৎকার শ্রুতিগোচর হইতেছিল। অবশেষে বনভূমি নীরব হইল।
ফিলিয়াস্ ফগ জিজ্ঞাসা করিলেন, “সতী কি?”
সার ফ্রান্সিস উত্তর করিলেন, “এ এক প্রকার নরবলি। তবে প্রভেদ এই যে, যে নিহত হয়, সে স্বেচ্ছায় প্রাণ দেয়। এখনই যে রমণীকে দেখলেন, কাল প্রত্যুষে অগ্নিকুণ্ডে তার প্রাণ যাবে।”
উত্তেজিত কণ্ঠে জিয়েন কহিল, “সর্ব্বনাশ! এরা রাক্ষস না কি?”
মিঃ ফগ কহিলেন, “ও শবটা কার?”
মাহুত কহিল “ওই রমণীর বৃদ্ধ স্বামীর। উনি এ অঞ্চলের এক জন স্বাধীন রাজা ছিলেন।”
“ইংরাজের আমলেও এই অসভ্য প্রথা জীবিত আছে?”
সার ফ্রান্সিস্ উত্তর করিলেন “ভারতের অধিকাংশ স্থানেই এ প্রথা আর প্রচলিত নাই। তবে বুন্দেলখণ্ড এখনো অসভ্যই আছে। এই অসভ্য প্রদেশে আমাদের শাসন প্রণালী এখনো সুপ্রতিষ্ঠিত হয় নাই। বিন্ধ্যগিরিশ্রেণীর উত্তরে যে বিপুল প্রদেশ অবস্থিত, তা’ এখনো লুণ্ঠন ও নরহত্যার জন্য প্রসিদ্ধ।”
জিয়েন নিতান্ত ক্ষুব্ধচিত্তে কঠিল “হায়, অসহায়া নারী! সে জীবন্ত দগ্ধ হ’বে।”
সার ফ্রান্সিস বলিলেন, “হাঁ জীবন্তই দগ্ধ হবে। তা’ না হ’লে তার কপালে আজীবন কত দুঃখ আছে তা’ কি তুমি জান? সমাজ তার মাথা মুড়িয়ে দেবে―তাকে একঘরে করবে—তার ছায়া পর্য্যন্ত স্পর্শ করবে না। কিছুদিন আগে আমি যখন বোম্বাইতে ছিলাম, তখন একবার একটী বিধবা তার স্বামীর সঙ্গে পুড়ে’ মরবার জন্য গবরণরের অনুমতি চেয়েছিল। গবরণর অবশ্য সে অনুমতি দিলেন না। বিধবাটী নিতান্ত ক্ষুব্ধ হ’য়ে নগর ছেড়ে অন্যত্র গেল। সেখানে একজন রাজার সাহায্যে শেষে আগুনে ঝাঁপ দিলে।”
মাহুত মাথা নাড়িয়া এ কথার সত্যতা স্বীকার করিয়া বলিল, “কাল যে সতী হবে সেটা কিন্তু স্বেচ্ছায় নয়!”
“তুমি কেমন ক’রে জান্লে?”
“বুন্দেলখণ্ডে এ কথা কে না জানে।”
“কৈ স্ত্রীলোকটিকে ত কোন বাধা দিতে দেখলেম না।”
“কেমন করে’ বাধা দিবে? আফিং আর ধোঁয়ায় তার কি আর এখন জ্ঞান আছে?”
“রমণীকে ওরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?”
“পিল্লাজির মন্দিরে। এখান থেকে সে মন্দির দু’মাইল দূরে। আজ রাত্রে সকলে সেখানে থাকবে। কাল সতী হবে।”
“কখন্ হবে?”
“খুব ভোরে।”
মাহুত তাহার কথা শেষ করিয়া সেই হস্তীটা চালাইতে যাইবে অমনি মিঃ ফগ কহিলেন “রাখ—রাখ। সার ফান্সিস্, যদি আমরা স্ত্রীলোকটীকে রক্ষা করি—”
বিস্মিত হইয়া সার ফান্সিস্ কহিলেন, “রক্ষা কর্বেন!”
মিঃ ফগ কহিলেন, “এখনো আমার হাতে ১২ ঘণ্টা সময় আছে। ততক্ষণ পর্য্যন্ত চেষ্টা করে দেখতে পারি।”
সার ফ্রান্সিস্ আবেগভরে কহিলেন, “আমি এতক্ষণে বুঝ্লেম আপনার হৃদয় আছে। সে হৃদয় ঠিক যায়গায় সাড়া দেয়।”
মিঃ ফগ কহিলেন, “কখনও কখনও সাড়া দেয় বৈ কি? যখন আমার সময় থাকে তখন দেয়।”
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ
জিয়েনের দুঃসাহস
পারটী যেমন গুরুতর, তেমনি দুঃসাহসিক—অসম্ভব বলিলেও বলা চলে। এ কার্য্যে লিপ্ত হইলে কে বলিবে যে মিঃ ফগ বিপক্ষের হস্তে জীবন দান করিবেন না, কে বলিবে যে অন্ততঃ চিরতরে বন্দী রহিবেন না। তাহা হইলেই ত তাঁহার সব ফুরাইল। যে জন্য এত শ্রম করিয়া তিনি এতদূর আসিয়াছেন, তাহা ব্যর্থ হইল! কিন্তু তাঁহার হৃদয় কোন বাধাই মানিল না। তিনি দেখিলেন এই কার্য্যে সার ফান্সিস্ একজন শক্তিশালী সহযোগী। জিয়েনও আজ্ঞা মাত্রেই যথোচিত সাহায্য করিবে। এক চিন্তা মাহুতের জন্য। সে যদি সাহায্য না করে? না করে না করিবে। কিন্তু সে যাহাতে বিপক্ষের দলে না যার তাহা করিতেই হইবে। সার ফ্রান্সিস্ তাই মাহুতকে স্পষ্টবাক্যে সে কথা জিজ্ঞাসা করিলেন। মাহুত কহিল—
“হুজুর, আমিও পার্শী, আপনারা যাঁকে উদ্ধার করতে চান তিনিও পার্শী! আপনারা যা বলবেন, আমি তাই করবো।”
“উত্তম।”
মাহুত কহিতে লাগিল, “আপনারা মনে রাখবেন, আমাদের সম্মুখে মস্ত একটা বিপদ পাহাড়ের মত দাড়িয়ে রয়েছে! এ কার্য্যে শুধু যে আমাদের জীবনের আশঙ্কা আছে, তা নয়। যদি আমরা ধরা পড়ি, যন্ত্রণার একশেষ পেতে হবে!”
ফিলিয়াস্ ফগ বলিলেন, “সে সব বিপদ্ ঘাড়ে নিতে আমরা প্রস্তুত হয়েছি। আমার বিবেচনায় সন্ধ্যা পর্য্যন্ত অপেক্ষা করা যাক্। রাত্রে কার্য্যারম্ভ। মাহুত! রমণীটী কে তা’ তুমি জান?”
“জানি হুজুর! উনি বোম্বাইয়ের একজন প্রধান ধনাঢ্য বণিকের কন্যা। ভারতের রমণীকুলে একজন শ্রেষ্ঠ সুন্দরী। উনি রীতিমত ইংরাজি শিক্ষা পেয়েছেন। আচারে ব্যবহারে কথায় বার্ত্তায় ঠিক্ মেমসাহেবদের মত।”
সার ফ্রান্সিস্ কহিলেন, “বটে! মহিলাটীর নাম কি?”
“নাম আউদা। আউদা পিতৃমাতৃহীনা। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেই বৃদ্ধ রাজার সঙ্গে আজ তিন মাস হ’ল আউদার বিবাহ হয়েছিল। ভীষণ দুরদৃষ্টের কথা বুঝতে পেরে উনি পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ধরা পড়লেন। রাজার কতকগুলি আত্মীয় আছেন। আউদা জীবিত থাকলে তাঁদের সুবিধা হয় না বলে’ তাঁরা জোর ক’রে ওঁকে পুড়িয়ে মারছেন।”
মাহুতের কথা শুনিয়া মিঃ ফগ ও তাঁহার সঙ্গীর দৃঢ়সঙ্কল্প আরও সুদৃঢ় হইল। তাঁহারা মাহুতকে আদেশ দিলেন, “কোন রকম গোলমাল না করে’ পিল্লাজির মন্দিরের যত কাছে পার তত কাছে চল।”
কিউনি অর্দ্ধঘণ্টা মধ্যে তাঁহাদিগকে লইয়া মন্দির হইতে প্রায় অর্দ্ধ মাইল দূরে যাইয়া দাঁড়াইল। বৃক্ষশ্রেণীর অন্তরাল হইতে তখন সেই উন্মত্ত-কোলাহল শ্রুত হইতে লাগিল।
মাহুত কহিল, “রাণী আউদা নিশ্চয়ই মন্দিরমধ্যে বন্দিনী আছেন!”
সকলেই চিন্তা করিতে লাগিলেন কিরূপে তাঁহার উদ্ধার সাধন করিবেন। যখন পুরোহিত, রক্ষী, সন্ন্যাসী প্রভৃতি সকলেই মাদক সেবনে রজনীর মত চৈতন্যহীন হইবে, তখনই কি মন্দিরমধ্যে প্রবেশ করা সঙ্গত? না, প্রাচীর কাটিয়া, সেই গর্ভমুখে প্রবেশ করিলে সুবিধা হইবে? মন্দিরে না গেলে এ প্রশ্নের মীমাংসা অসম্ভব।
তাঁহারা উদ্গ্রীব হইয়া রজনীর অপেক্ষায় বসিয়া রহিলেন। সন্ধ্যা ছয়টার সময় কাননভূমি অন্ধকার-সমাচ্ছন্ন হইয়া উঠিল। রক্ষীদিগকে অতিক্রম করিয়া মন্দিরসান্নিধ্যে গমন করিবার সেই একমাত্র সুসময় মনে করিয়া, মাহুত তাঁহাদিগকে পথ দেখাইয়া লইয়া চলিল। তাঁহারা ধীরে ধীরে,—অতি সাবধানে বৃক্ষাদিসমাচ্ছন্ন কাননপথে হামাগুড়ি দিয়া অগ্রসর হইলেন। অল্পদূর যাইতে না যাইতেই একটী ক্ষুদ্রশরীরা পার্ব্বত্যতরঙ্গিণীর নিকটবর্ত্তী হইলেন। মশালের আলোকে দেখিলেন, দূরে গন্ধ-তৈল-নিষিক্ত রাশি রাশি চন্দনকাষ্ঠে প্রস্তুত একটী চিতা সজ্জিত রহিয়াছে। সেই শ্মশান-শয্যায় বৃদ্ধ রাজার মৃতদেহ রক্ষিত হইয়াছে। রাণী আউদার সহিত উষা প্রভাতেই ভস্মে পরিণত হইবে। চিতা হইতে মন্দিরটী শত হস্তের অধিক দূরে ছিল না। মন্দিরের উচ্চচূড়া মন্দিরপার্শ্ববর্ত্তী বৃক্ষাদির মস্তকের উপর দিয়া সন্ধ্যার অন্ধকারে অস্পষ্টভাবে দৃষ্টিগোচর হইতেছিল।
মাহুত অনুচ্চে কহিল, “আসুন।”
সুদীর্ঘ ঘাসের অন্তরালে লুকাইয়া লুকাইয়া তাঁহারা তখন আরও সাবধানে একান্ত নিঃশব্দে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। কেবল মুক্ত পবন বৃক্ষপত্রের ভিতর দিয়া সর্ সর্ করিতে করিতে বহিয়া যাইতেছিল।
মাহুত থামিল। তাহার সম্মুখেই মুক্ত ক্ষেত্র। তথায় সিদ্ধিপানে বিভোর রক্ষীরা দলে দলে ভূমিশয্যা গ্রহণ করিয়াছিল। নিকটেই কতকগুলি মশাল কাঁপিয়া কাঁপিয়া জ্বলিতেছিল। মনে হইতেছিল যেন সমর প্রাঙ্গণে মৃত যোধৃগণ চিরনিদ্রায় অভিভূত। কেহ কেহ বা তখনো টলিতে টলিতে এদিক্-ওদিক্ ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল।
মশালের আলোকে তাঁহারা বিস্ময়বিস্ফারিত নেত্রে দেখিলেন বলবান্ রাজপুতরক্ষিগণ উলঙ্গ তরবারিহস্তে পাদচারণ করিতে করিতে মন্দিরের বাহিরে প্রহরিকার্য্যে নিযুক্ত!
মাহুত আর অগ্রসর হইল না। সে বুঝিল বিনা বাধায় এ পথে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব, সার ফ্রান্সিস্ এবং মিঃ ফগেরও সেইরূপই ধারণা হইল। তাঁহারা মৃদুস্বরে পরামর্শ করিতে লাগিলেন। সার ফ্রান্সিস্ কহিলেন, “আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা যাক্। এই ত কেবল ৮টা বেজেছে। বেশী রাত্রে প্রহরীরা নিদ্রা যাইতে পারে।”
তাঁহারা তখন একটী বৃক্ষতলে শয়ন করিয়া উত্তেজিত হৃদয়ে সুযোগের অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। সমর যেন আর যাইতে চাহে না। মাহুত মধ্যে মধ্যে এদিক্-ওদিক্ যাইয়া সন্ধান লইতে লাগিল। দেখিল, প্রহরীরা পূর্ব্ববৎ পাহারায় রত। মশালের আলোক পূর্ব্ববৎ সমুজ্জ্বল। মন্দিরের ভিতর হইতেও তখন জানালা দিয়া কম্পিত আলোকরেখা দেখা যাইতেছিল।
রজনী দ্বিপ্রহর হইল। তখনো অবস্থার কিছুমাত্র পরিবর্ত্তন ঘটিল না। প্রহরীরা তখনো বিনিদ্র নয়নে কর্ত্তব্য পালন করিতেছিল! বোধ হইল যেন তাহারা সমস্ত রাত্রিই এইরূপে কাটাইয়া দিবে। এ পথ পরিহারপূর্ব্বক মন্দিরের প্রাচীর কাটিয়া প্রবেশ করার চেষ্টাই তখন আবশ্যক বলিয়া বোধ হইল।
মাহুত পুনরায় অগ্রসর হইল। মিঃ ফগ, সার ফ্রান্সিস্ ও জিয়েন পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলেন।
রজনী তমসাচ্ছন্ন। কৃষ্ণপক্ষের চন্দ্র তখনো আকাশপথে অধিকদূর উঠিতে পারে নাই। আকাশও মেঘলিপ্ত। বৃক্ষের মাথায় মাথায়, বৃক্ষশাখার গায়ে গায়ে বৃক্ষপত্রের ভিতরে ভিতরে পুঞ্জীভূত অন্ধকার জমাট হইয়া প্রেতের মত দাঁড়াইয়া রহিয়াছে। তাহাতেই চারিদিকের অন্ধকার যেন আরো বাড়াইয়া তুলিয়াছে। তাঁহারা ভাবিলেন, আর কিছু চাহি না—কোন মতে মন্দির-প্রাচীরের সন্ধান পাইলেই হয়। প্রবেশ পথ থাকে ভাল; যদি না থাকে, করিয়া লইতে হইবে।
অবিলম্বে মন্দিরের ইষ্টক প্রাচীর গায়ে ঠেকিল। সে দিকে কোন দ্বার বা গবাক্ষ ছিল না। মিঃ ফগ ও সার ফ্রান্সিস্ অন্য অস্ত্রের অভাবে পকেট-ছুরি দ্বারায় প্রাচীর কাটিতে লাগিলেন। মাহুত ও জিয়েন সেই বন্ধনমুক্ত ইষ্টকগুলি ধীরে ধীরে খুলিয়া লইতে লাগিল। এক দুই তিন―ইষ্টকগুলি অল্পায়াসেই খুলিয়া আসিতে লাগিল।
অকস্মাৎ মন্দির মধ্যে কে যেন চীৎকার করিয়া উঠিল! সেই ধ্বনি মিলাইতে না মিলাইতেই বাহিরেও চীৎকার শুনিতে পাওয়া গেল। জিয়েন ও মাহুত নিবৃত্ত হইল। সে স্থানে আর অপেক্ষা করা সঙ্গত নহে মনে করিয়া, সার ফ্রান্সিস্ সকলকে লইয়া দূরে সরিয়া গেলেন। ভাবিলেন, যদি সুযোগ হয়, পুনরায় প্রত্যাবর্ত্তন করিবেন। কিন্তু সুযোগ আর ঘটিল না। রক্ষিগণ অবিলম্বে মন্দিরটী বেষ্টন করিয়া দাঁড়াইল!
সার ফ্রান্সিস্ ক্রোধে মুষ্টিবদ্ধ করিলেন। জিয়েন অত্যন্ত উত্তেজিত হইয়া উঠিল। এমন কি পার্শী মাহুত পর্য্যন্ত অনেক চেষ্টায় আত্মসম্বরণ করিল। ফিলিয়াস্ ফগ তখনো অচঞ্চল!
সার ফ্রান্সিস্ কহিলেন, “আর কেন? চলুন ফিরে যাওয়া যাক্।”
মিঃ ফগ ধীরভাবে উত্তর করিলেন, “অত ব্যস্ত হবেন না। আমি যদি কাল দুপুরবেলাও এলাহাবাদ পৌঁছিতে পারি তা’ হলেই চলবে।”
“এখানে থেকে আর লাভ কি? আর দু’ঘণ্টার মধ্যেই ত রজনী প্রভাত হ’বে। তারপর—”
“শেষ মুহূর্ত্তেও আমাদের কোন একটা সুযোগ ঘটতে পারে।”
সার ফ্রান্সিস্ এই অসীম ধৈর্য্য দেখিয়া বিস্মিত হইলেন। তিনি ভাবিলেন, শেষ মুহূর্ত্তে মিঃ ফগের কি সুযোগ ঘটবে? উনি কি তবে প্রজ্বলিত চিতার উপর লাফিয়ে পড়ে’ রাণী আউদাকে উদ্ধার করবেন?
এরূপ চেষ্টা যে নিশ্চয়ই বিফল ও বিপজ্জনক হইবে তাহা সকলেই বুঝিয়াছিল। মিঃ ফগের মত ধীর স্থির ইংরেজ যে অবোধের এমন একটা কার্য্য করিবেন, ইহা সার ফ্রান্সিসের আদৌ বিশ্বাস হইল না। তথাপি এই ভীষণ দৃশ্যের যবনিকা পতন পর্য্যন্ত তিনি অপেক্ষা করিতে সম্মত হইলেন। মাহুত আবার পথ দেখাইয়া তাঁহাদিগকে কানন হইতে সেই মুক্ত ক্ষেত্রের সন্নিকটে লইয়া গেল। তাঁহারা তথায় গোপনে অবস্থিতি করিয়া সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পূর্ব্ব ব্যবস্থাগুলি দেখিতে লাগিলেন।
মনে মনে একটা মতলব স্থির করিয়া জিয়েন সকলের অলক্ষিতে স্থানত্যাগ করিল। ভাবিল, কুসংস্কার ভারতবাসীর মজ্জাগত। সেই মজ্জাগত কুসংস্কার যদি রাণীকে উদ্ধার করিতে পারে, তবেই উদ্ধার সম্ভব—নতুবা এই শেষ। জিয়েন অন্ধকারের আশ্রয়ে পত্রবহুল বৃক্ষশাখার তলদেশ দিয়া অতি সাবধানে সেই শ্মশানশয্যার দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল।
ধীরে ধীরে রজনী শেষ হইয়া আসিল। ধীরে ধীরে ঊষার প্রথম আলোক-রেখা আকাশপ্রান্তে ক্ষীণ হাসির মত ফুটিয়া উঠিল। মন্দিরের চতুর্দ্দিকে তখনো অন্ধকাররাশি ঘনাইয়া রহিয়াছিল। এই আলোক ও অন্ধকারের মিলনকালই সেই নারীবলির উপযুক্ত সময় বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়াছিল। নিদ্রামগ্ন জনসঙ্ঘ জাগরিত হইয়া উঠিল। তাহাদিগের চীৎকারে ও গীতে এবং ঢাক-ঢোলের বিপুল নিনাদে বনভূমি আলোড়িত হইতে লাগিল।
বলির সময় আসিরা উপনীত হইল!
অকস্মাৎ মন্দির-দ্বার মুক্ত হইল। সেই মুক্ত দ্বার দিয়া মন্দির মধ্য হইতে তীব্র আলোকরাশি বাহির হইয়া চতুর্দ্দিকে বিচ্ছুরিত হইয়া পড়িল। দেখা গেল, দুই জন পুরোহিত দুই দিক্ হইতে ধরিয়া সেই মরণপথগানিনী রমণীকে মন্দিরের বাহিরে আনিল। বোধ হইল তখন যেন তাঁহার বুদ্ধি স্থির ছিল—মাদকের শক্তি অন্তর্হিত হইয়াছিল। রমণী তখনো পলায়নের জন্য চেষ্টা করিতেছিলেন। অহিফেনের ধূমে পুনরায় তাঁহার বুদ্ধিবৃত্তি শিথিল হইরা গেল—পুনরায় মোহ তাঁহাকে আচ্ছন্ন করিল। অদূরে সন্ন্যাসিগণ উন্মত্তের ন্যায় চাঁৎকার করিতেছিল। পুরোহিতেরা রাণী আউদাকে লইয়া চিতার দিকে অগ্রসর হইল। ঊষার অস্পষ্ট আলোকে ফিলিয়াস্ ফগ সেই লোমহর্ষণ দৃশ্য দেখিতে লাগিলেন।
তখনো চিতার উপর সেই মৃত রাজার শব বর্ত্তমান ছিল। রাণী আউদা তাঁহার মৃত স্বামীর পার্শ্বে রক্ষিতা হইলেন। গন্ধ-তৈলনিষিক্ত কাষ্ঠরাশিমধ্যে তখন প্রজ্বলিত অগ্নি নিক্ষিপ্ত হইল। অবিলম্বে চতুর্দ্দিক্ ধূম-সমাচ্ছন্ন হইয়া উঠল! ঘোর রোলে বাদ্য বাজিতে লাগিল!
মিঃ ফগ উন্মুক্ত ছুরিকাহস্তে সেই অগ্নিকুণ্ডের দিকে ধাবমান হইলেন। কিন্তু সার ফ্রান্সিস্ ও মাহুত বহু আয়াসে তাহাকে ধরিয়া ফেলিলেন। ফিলিয়াস্ ফগ মুহূর্ত্তমধ্যে তাঁহাদিগকে সরাইরা দিয়া যেই পুনরায় অগ্রসর হইবেন, অমনি এক অভাবনীয় দৃশ্য দর্শনে একান্ত বিস্মিত হইরা মূকের ন্যায় দণ্ডায়মান রহিলেন!
সতীদাহকারী নরনারীগণ অতিমাত্র ভীত হইয়া চীৎকার করিয়া উঠিল এবং নিতান্ত শঙ্কিত চিত্তে পুনঃপুনঃ ভূমিষ্ট হইয়া প্রণাম করিতে করিতে দেখিল, বৃদ্ধ রাজা নবজীবন লাভ করিয়াছেন। যুবতী পত্নীকে বক্ষে ধারণ করিয়া সেই প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ডমধ্যে স্থির ভাবে দণ্ডায়মান রহিয়াছেন! সন্ন্যাসিগণ, রক্ষিসমূহ, ব্রাহ্মণগণ ও পুরোহিতগণ ভয়ে তাহাদের পুনরুজ্জীবিত রাজার দিকে আর চাহিতে পারিল না। সাষ্টাঙ্গে প্রণত হইয়া ভূমির উপর পড়িয়া রহিল!
প্রজ্বলিত চিতা মুহূর্ত্তমধ্যে ত্যাগ করিয়া রাজার প্রেতাত্মা ফিলিয়াস্ ফগের নিকট আসিয়া কহিল, “আর দেরি নয়—চলুন্—চলুন্—”
এ কি! সংজ্ঞাহীনা আউদাকে স্কন্ধে লইয়া এ যে ফরাসীভৃত্য জিয়েন! সে চিতাধূমের আশ্রয়ে সেই কাষ্ঠস্তূপের উপর উঠিয়া মরণোন্মুখিনীকে রক্ষা করিয়াছিল!
* * * * * *
তাঁহারা আর কাল বিলম্ব না করিয়া তৎক্ষণাৎ ঘোর বনমধ্যে প্রবেশ করিলেন। ক্ষিপ্রচরণ কিউনি তাঁহাদিগকে লইয়া এলাহাবাদ অভিমুখে ছুটিল।
সেই স্তব্ধ অরণ্য অল্পকাল মধ্যেই কোলাহল-চঞ্চল হইয়া উঠিল। গুড়ুম্ গুড়ুম্ করিয়া বন্দুকের শব্দ হইতে লাগিল। রক্তরাঙ্গাগুলি সোঁ সোঁ করিয়া হস্তীর পার্শ্ব দিয়া চলিয়া যাইতে লাগিল। বৃক্ষ কাণ্ডে বা বৃক্ষশাখায় প্রহত হইয়া কতক বা ভূমিতলে পতিত হইল। সতীদাহকারিগণ ভ্রম বুঝিতে পরিয়া উন্মত্তের ন্যায় পশ্চাদ্ধাবন করিল বটে, কিন্তু সেই ঘোর বনে হস্তী বা তাহার আরোহীদিগকে আর ধরিতে পারিল না।
* * * * * *
তাহার এই দুঃসাহসিক কৌশল ফলপ্রসূ হইল দেখিয়া জিয়েন হস্তিপৃষ্ঠে বসিয়া উচ্চরবে হাসিতেছিল। সার ফ্রান্সিস্ প্রীত হইয়া তাহার সহিত কর মর্দ্দন করিলেন। মিঃ ফগ বলিলেন, “বেশ করেছ।” তাঁহার ন্যায় গম্ভীর প্রকৃতির লোকের নিকট হইতে এই ক্ষুদ্র প্রশংসাবাক্যই যথেষ্ট পুরস্কার। জিয়েন সে পুরস্কার লাভ করিয়া কৃতার্থ হইল, এবং নম্রস্বরে কহিল, “এ কার্য্যের জন্য যাহা কিছু গৌরব, যাহা কিছু প্রশংসা, সে সমস্তই আমার প্রভুর।”
মৃত্যুর কবল হইতে রক্ষিতা সুন্দরী আউদা তখনো সংজ্ঞাহীনা। তাঁহার দিকে চাহিয়া সার ফান্সিস্ কহিলেন, “এঁর বিপদের এইখানেই শেষ নয়। যতদিন ইনি ভারতবর্ষে থাকবেন, ততদিন এঁর জীবন নিরাপদ নয়। ভারতের যে প্রদেশেই কেন থাকুন না, উন্মত্ত শত্রুরা এঁর সন্ধান করবেই করবে, আর সুযোগ পেলেই আবার পুড়িয়ে মারবে। ইংরাজের আইন, ইংরাজের পুলিশ কিছুতেই এঁকে রক্ষা করতে পারবে না। অল্পদিন আগেই এমন একটা ঘটনা হয়ে গেছে। ইনি যদি ভারতবর্ষের বাহিরে যেতে পারেন তবেই নিরাপদ্ হ’তে পারবেন।”
মিঃ ফগ বলিলেন, “এ কথার উত্তর একটু চিন্তা-সাপেক্ষ।”
বেলা ১০টার সময় তাঁহারা এলাহাবাদে আসিয়া পৌঁছিলেন। রাণী আউদার তখন অল্পে অল্পে জ্ঞানসঞ্চার হইতেছিল। তিনি ধীরে ধীরে নয়ন উন্মীলন করিলেন—মুদিত কমল যেন একটু একটু করিয়া বিকশিত হইল। তাঁহাকে সযত্নে বিশ্রামাগারে রাখিয়া মিঃ ফগ তাঁহার জন্য কতকগুলি আবশ্যক দ্রব্যাদি ক্রয় করিবার জন্য জিয়েনকে বাজারে পাঠাইলেন।
এলাহাবাদ হইতে ট্রেণ ছাড়িবার সময় হইল। ফিলিয়াস্ ফগ পার্শী মাহুতকে তাহার পাওনা-গণ্ডা বুঝাইয়া দিয়া কহিলেন, “পার্শী, তুমি আমাদের যথেষ্ট উপকার করেছ। তুমি ভক্তের মত কর্ত্তব্য পালন করেছ। তার জন্য আমি তোমাকে হাতীটাই দিতে চাই। তুমি নিবে কি?”
মাহুতের নয়নদ্বয় উজ্জ্বল হইয়া উঠি। সে কৃতজ্ঞতাভরে কহিল, “হুজুর, আপনি আমাকে সাত রাজার ধন দিলেন।”
ট্রেণে উঠিতে উঠিতে মিঃ ফগ কহিলেন, “হাতীটা তুমি নিয়ে যাও কিন্তু এতেও আমি তোমার ঋণ শোধ করতে পারলেম না।”
ট্রেণ ছাড়িল। রাণী আউদার তখন সম্পূর্ণরূপে জ্ঞানসঞ্চার হইয়াছিল। আপন ভাগ্যবিবর্ত্তন-কাহিনী শ্রবণ করিয়া তিনি নয়নজলে হৃদয়ের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিলেন। কিন্তু পরক্ষণেই ভবিষ্যতের চিন্তা তাঁহাকে আকুল করিয়া তুলিল। তিনি শিহরিয়া উঠিলেন।
মিঃ ফগ তাঁহার হৃদয়ের ভাব বুঝিয়াছিলেন। কহিলেন, “আপনার ভয় নাই। আমি ভারতবর্ষ ছেড়ে হংকংএ যাচ্ছি। বাধা না থাকলে আপনাকেও সেখানে নিয়ে যেতে পারি।”
কৃতজ্ঞ হৃদয়ে আউদা কহিলেন, “হংকংএ আমার একজন ধনাঢ্য আত্মীয় বাণিজ্য করিতেন। বোধ হয় তিনি সেখানেই আছেন।”
“বেশ ভাল। আমরা তাঁকে খুঁজে বা’র করবো।”
চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ
বন্দী
জ ২৫শে অক্টোবর। ফিলিয়াস্ ফগ প্রভাতে কলিকাতায় আসিয়া পৌঁছিলেন। বেলা ১টার সময় হংকংএর জাহাজ ছাড়িবে, সুতরাং তখনো কয়েক ঘণ্টা সময় ছিল। তিনি রোজ নামচাটা বাহির করিয়া দেখিলেন, ২৫শে তারিখেই তাঁহার কলিকাতায় আসিবার কথা। আজ ২৩ দিন তিনি লণ্ডন পরিত্যাগ করিরাছেন। জাহাজ সত্বর আসায় তিনি যে দুই দিন সময় পাইয়াছিলেন, রাণী আউদার রক্ষাকার্য্যেই তাহা কাটিয়া গিয়াছিল। সময়ের হিসাব করিয়া ফগ বুঝিলেন, তাঁহাকে ১টার জাহাজেই হংকং যাত্রা করিতে হইবে।
হাবড়া ষ্টেসনে ট্রেণ থামিতে না থামিতেই জিয়েন গাড়ী হইতে অবতরণ করিল। তাহার ইচ্ছা ছিল, পূর্ব্বাহ্ণেই হংকংগামী জাহাজে গিয়া তাহার প্রভু ও রাণী আউদার নির্মিত্ত সকল বন্দোবস্ত করিয়া রাখিবে।
এমন সময় একজন ইংরাজ দারোগা আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “আপনার নামই কি মিঃ ফিলিয়াস্ ফগ?”
“হাঁ, আমারই নাম।”
“এইটা বুঝি আপনার ফরাসী ভৃত্য?”
“হাঁ।”
“আপনারা কি অনুগ্রহ করে আমার সঙ্গে একটু আসবেন?”
মিঃ ফগ তিলমাত্র বিচলিত হইলেন না। তিনি জানিতেন পুলিশ দেশের আইনের প্রতিমূর্ত্তি। ইংরাজের চক্ষে আইন অতি পবিত্র। কিন্তু জিয়েন ফরাসী। সে ফরাসীর ন্যায় তর্কবিতর্ক করিতে যাইতেছিল, ফিলিয়াস্ ফগ তাহাকে নিরস্ত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন―
“এই মহিলাটী কি আমাদের সঙ্গে আসতে পারেন?”
দারোগা কহিলেন, “অনায়াসে।”
তাঁহারা তখন একখানি অশ্বযানে উঠিয়া বসিলেন। গাড়ীখানি ঘুরিয়া ফিরিয়া কলিকাতার “কালো সহর” ছাড়াইয়া ইংরাজটোলার একটী গৃহের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। দারোগা তাঁহার বন্দীদিগকে লইয়া একটী কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিলেন এবং তথায় তাঁহাদিগকে রাখিয়া প্রত্যাবর্ত্তনকালে বলিয়া আসিলেন, “ম্যাজিষ্ট্রেট ওবাদিয়ার কাছে সাড়ে এগারটার সময় আপনাদের বিচার হবে।”
কক্ষদ্বার রুদ্ধ করিয়া দারোগা প্রস্থান করিলেন। রাণী আউদা নয়নজলে ভাসিতে ভাসিতে মিঃ ফগকে কহিলেন, “এই হতভাগিনীর জন্যই আপনাদের এ বিপদ। আমাকে রক্ষা করেই আপনারা বন্দী হলেন।”
মিঃ ফগ শান্তভাবে বুঝাইয়া বলিলেন, “ইংরাজের রাজত্বে সতীদাহ নিবারণ করলে কোন অপরাধই হয় না। বোধ হয় ভুলবশতঃ আর এক জনকে ধরতে পুলিশ আমাদেরই ধরেছে। তা’ যা’ হোক, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি যেমন করেই হোক্ আপনাকে হংকংএ নিয়ে যাব।”
প্রভুর কথা শুনিয়া জিয়েন কহিল, “জাহাজ যে বেলা ১টার সময় ছাড়বে!”
“তা’ ছাড়ুক না—তার আগেই আমরা জাহাজে যাব।” কথাটা এমন দৃঢ়তার সহিত বলা হইয়াছিল যে জিয়েন আপনার অজ্ঞাতে অনুচ্চস্বরে বলিয়া উঠিল, “তবে আর ভাবনা কি! আমরা তা’ হ’লে ঠিক্ সময়েই জাহাজে যেতে পার্বো।” তাহার হৃদয় কিন্তু তখন শঙ্কায় কম্পিত হইতেছিল!
সাড়ে এগারটার সময় কক্ষের রুদ্ধদ্বার মুক্ত হইল। দারোগা আসিয়া তাঁহাদিগকে বিচারমণ্ডপে লইয়া গেলেন। ইহাই ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেট ওবাদিয়ার বিচারালয়। বিচারশালায় তখন বহু ইংরাজ ও বাঙ্গালী সমবেত হইয়াছিল। প্রথম নম্বর মোকদ্দমার ডাক হইল।
পেশকার ডাকিলেন, “আসামী ফিলিয়াস্ ফগ হাজির?”
“হাজির।”
“জিয়েন?”
“হাঁ, হাজির।”
ডেপুটী সাহেব বলিলেন, “বেশ কথা। আজ দু’দিন থেকে আমি আপনাদের অপেক্ষায় আছি।”
জিয়েন অধীর হইয়া কহিল, “আমাদের অপরাধটা কি?”
“এখনই জান্তে পাবে।”
মিঃ ফগ কহিলেন, “ধর্ম্মাবতার, আমি ব্রিটিশ প্রজা। আমার—” বাধা দিয়া ম্যাজিষ্ট্রেট বলিলেন, “কেন—আপনাকে কি ব্রিটিশ প্রজার আইনতঃ প্রাপ্ত সকল সুযোগ দেওয়া হয় নি?
“হাঁ, তা’ হয়েছে বৈকি। তবে—”
“তবে আর কি। বাদীদের ডাক।”
হাকিমের আদেশমাত্রই এক জন চাপরাসী তিন জন পুরোহিতকে সম্মুখে আনিয়া উপস্থিত করিল। ইহারা তিন জনই বোম্বাই-বাসী।
জিয়েন বিড়্ বিড়্ করিয়া আপন মনে বলিতে লাগিল, “এ দেখছি শেষে তাই! এরাই ত আউদা রাণীকে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল!”
পেশকার অপরাধের বিবরণ পাঠ করিয়া আসামীদিগকে শুনাইতে লাগিলেন। তিনি বলিলেন, “হিন্দুর চক্ষে পবিত্র একটা মন্দিরকে অপবিত্র করিবার জন্য মিঃ ফগ ও তাঁহার ভৃত্যের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ হইয়াছে।”
বিচারক তখন ফিলিয়াস ফগের দিকে চাহিয়া কহিলেন, “আপনার অপরাধ কি তা’ শুনলেন?”
নিজের পকেট-ঘড়ির দিকে চাহিতে চাহিতে ফগ বলিলেন, “হাঁ ধর্ম্মাবতার, শুনেছি। আমি অপরাধ স্বীকার করছি।”
“আপনি স্বীকার করছেন?”
“হাঁ। পিল্লাজির মন্দিরে পুরোহিতরা যে কাণ্ড করেছেন, সে সম্বন্ধে তাঁরা কি বলিতে চান, আমি তারই জন্য বাস্ত হয়েছি।”
পুরোহিতেরা পরস্পর পরস্পরের মুখের দিকে চাহিতে লাগিলেন। মিঃ ফগ কোন্ কথার উল্লেখ করিতেছেন, তাহা তাঁহারা বুঝিতে পারিলেন না।
উদ্ধতভাবে জিয়েন কহিল, “ঠিক তাই। পিল্লাজির মন্দিরের কথাই জান্তে চাই। সেই মন্দির—যেখানে এঁরা এক জন নিরপরাধিনী রমণীকে জীবন্ত দগ্ধ করার আয়োজন ক’রেছিলেন!”
কথা শুনিয়া পুরোহিতেরা কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় হইলেন। তাঁহাদের বাক্যস্ফূর্ত্তি হইল না। বিচারক একান্ত বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোন্ রমণী? কাকে পুড়িয়ে মারবার আয়োজন হয়েছিল? সে কোথায়?―বোম্বাই-এ না কি?”
জিয়েন কহিল, “হাঁ বোম্বাই―।”
“আমরা পিল্লাজির মন্দিরের কথা বল্ছি না। মালাবার পর্ব্বতের মন্দিরের কথা বল্ছি।”
তখন পেশকার কহিলেন, “অপরাধের প্রমাণস্বরূপ, সেই মন্দির-অপবিত্রকারীর জুতা এখানে আনা হয়েছে।”
জুতা দেখিয়াই জিয়েন বলিয়া উঠিল “ও যে আমার জুতা!”
বোম্বাই-এর রেলষ্টেশনে ফিক্স গোয়েন্দা যখন দেখিলেন ব্যাঙ্ক-দস্যু পলায়ন করিতেছে, তখন তিনি মালাবার শৈলের পুরোহিতদিগের সহিত পরামর্শ করিয়া তাহাদিগকে যথেষ্ট পুরস্কারের লোভ দেখাইয়া মন্দির অপবিত্র করিবার অভিযোগে মোকদ্দমা করিতে স্বীকার করাইলেন। পুরোহিতদিগের মধ্যে কেহ কেহ পরবর্ত্তী ট্রেণেই মিঃ ফগের অনুসরণ করিল।
ফিক্স গোয়েন্দা কলিকাতায় আসিয়া দেখিলেন মিঃ ফগ অনুপস্থিত। তখনই তিনি বুঝিলেন নোট-চোর ফাঁকি দিবার অভিপ্রায়ে মধ্যবর্ত্তী কোন স্থানে নামিয়াছে—দুই এক দিন মধ্যে নিশ্চয়ই আসিবে। গোয়েন্দা হাবড়া ষ্টেশনেই অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। তথায় ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করিবার পর ২৫শে প্রভাতে যেই দেখিলেন ফগ ও তাঁহার ভৃত্য রেল গাড়ী হইতে অবতরণ করিতেছেন, অমনি তাঁহার ইঙ্গিতে কলিকাতার দারোগা তাঁহাদিগকে গ্রেপ্তার করিলেন। জিয়েন যদি ক্ষণেকের জন্যও আত্মচিন্তা বিস্তৃত হইরা বিচারগৃহের চতুর্দ্দিকে চাহিয়া দেখিত, তাহা হইলে দেখিতে পাইত সেই কক্ষের এক প্রান্তদেশে বসিয়া গোয়েন্দা ফিক্স বিপুল আগ্রহে এই মোকদ্দমা শুনিতেছিলেন। ব্যাঙ্কের নোটচোরকে ধরিবার সাধ তখনো তাঁহার ছিল। তিনি বিলাতের গ্রেপ্তারী পরোয়ানা কলিকাতায় পাইবার প্রত্যাশা করিতেছিলেন।
হাকিম পুনরায় কহিলেন, “তা হ’লে ঘটনাটা আসামী স্বীকার করছে?”
ফগ ধীরভাবে কহিলেন, “হাঁ।”
“ইংরাজ সরকার ভারতবর্ণের সকল ধর্ম্মই বিশেষভাবে রক্ষা করেন। জিয়েন গত ২০শে অক্টোবর বোম্বাইয়ের অন্তর্গত মালাবার শৈলস্থিত মন্দিরে প্রবেশ করিয়া উহা অপবিত্র করিয়াছে। সে এই অপরাধ স্বীকারও করিতেছে। দণ্ডস্বরূপ তাহার একমাস কারাবাস ও সাড়ে চারি সহস্র মুদ্রা অর্থদণ্ড হইল।”
একান্ত বিহ্বল হইয়া জিয়েন বলিয়া উঠিল, “সাড়ে চার হাজার!” চীৎকার করিয়া চাপরাশী কহিল, “চুপ্ চুপ্―।” হাকিম রায় পাঠ করিতে লাগিলেন―
“যদিও দেখা যাইতেছে যে দণ্ডিত ভৃত্যের প্রভু কোন ক্রমেই এই ধর্ম্মবিগর্হিত কার্য্যের সহিত সংশ্লিষ্ট ছিলেন না, কিন্তু যখন ভৃত্যের অপরাধের জন্য তাহার প্রভুও সম্পূর্ণরূপে দায়ী, তখন তাঁহার প্রতি এক সপ্তাহের কারাবাস ও ১২৫০ ৲ টাকা অর্থদণ্ডের আদেশ হইল। ২ নম্বর মোকদ্দমা ডাক।”
কক্ষ প্রান্তে বসিয়া গোয়েন্দা ফিক্স আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া উঠিলেন। ফিলিয়াস্ ফগ ত কলিকাতায় অস্ততঃ সপ্তাহকালের জন্য অবরুদ্ধ হইলেন! ইহার মধ্যেই বিলাত হইতে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা আসিয়া পৌঁছিবে। জিয়েন নিজের নির্ব্বুদ্ধিতার জন্য অদৃষ্টকে ধিক্কার দিতে দিতে কহিল, “হায় হায় আমি কি করলেম! আমার জন্যই প্রভুর সর্ব্বনাশ হ’লো!” কিন্তু ফিলিয়াস্ ফগ একেবারে অবিচলিত রহিলেন—যেন কিছুই ঘটে নাই! তিনি দৃঢ়স্বরে ম্যাজিষ্ট্রেটকে জানাইলেন, “আমি জামিন চাই।”
“তা পেতে পারেন। এক একজন ১৫ হাজার টাকা। এখানে কেউ আপনাদের চেনে না। কাজেই বেশী জামিন না হলে চলবে না।”
ফিক্স গোয়েন্দার বুকের ভিতর ধড়ফড় করিতেছিল। কি হয়, কি হয়। ফগ কি এতই বুদ্ধিহীন যে মুহূর্ত্তে এত টাকা নষ্ট করিবে!
ফিলিয়াস্ ফগ বাক্য ব্যয় না করিয়া ব্যাগ হইতে এক তাড়া নোট বাহির করিয়া পেশকারের টেবিলের উপর রাখিয়া কহিলেন, “টাকাটা আমি এখনই দাখিল করতে চাই।”
বিচারক কহিলেন, “আপনারা মুক্তি লাভ করলেই এ টাকা ফেরত পাবেন। এখনকার মত আপনারা জামিনে খালাস হলেন।”
গোয়েন্দা অবাক্! জিয়েনও অবাক্!
মিঃ ফগ গম্ভীর স্বরে কহিলেন, “চলে এস জিয়েন।”
জিয়েন সক্রোধে কহিল, “আমার জুতা জোড়াটা বোধ হয় ফেরত পাব। এ জুতার এক এক খানার দাম এখন ১৫ হাজার টাকা!”
তখন ১টা বাজিতে অর্দ্ধ ঘণ্টা মাত্র বিলম্ব ছিল। ফিলিয়াস্ ফগ একখানি গাড়ীতে উঠিয়া জেটীর দিকে ছুটিলেন।
ফিক্স গোয়েন্দা মনে মনে একাস্ত অপ্রতিভ হইলেন। কিন্তু কাল বিলম্ব না করিয়া ফগের অনুসরণ করিলেন। তখনো তাঁহার ভরসা ছিল ফগ নিশ্চয়ই সময় মত আসিয়া উপস্থিত হইবেন—অত টাকা কিছুতেই জলে ফেলিবেন না। কিন্তু যখন তিনি দেখিলেন, ফিলিয়াস্ ফগ তাঁহার সঙ্গিনী ও ভৃত্যকে লইয়া রেঙ্গুন জাহাজে উঠিলেন, তখন তিনি ক্ষোভে ও রোষে ভূমিতে পদাঘাত করিয়া কহিলেন—
“উঃ কি ভয়ানক লোক! ঠিক দস্যুর মতই অর্থের উপর মমতাহীন! এক মুহূর্ত্তে এত টাকা নষ্ট করলে! যদি আবশ্যক হয়, আমি ফিলিয়াসের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর প্রান্তসীমা পর্য্যন্ত যাব—দেখি কি হয়! কিন্তু যেমন ভাবে খরচ করছে, তাতে যে পুরস্কারের জন্য বেশী কিছু অবশিষ্ট থাকবে এমন ত বোধ হয় না!”
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ
গোয়েন্দার চিন্তা
ঙ্গুন পোত মঙ্গোলিয়ার মতই দ্রুতগামী ছিল। কিন্তু আরোহীদিগের থাকিবার বন্দোবন্ত মঙ্গোলিয়াতেই ভাল ছিল। যাহাতে রাণী আউদার কোনরূপ অসুবিধা না হয়, সেজন্য মিঃ ফগ বিশেষ বন্দোবস্ত করিলেন।
আউদা ক্রমে ক্রমে ফিলিয়াস্ ফগের সহিত বিশেষ পরিচিতা হইয়া উঠিলেন। তাঁহার প্রাণরক্ষাকর্ত্তা বলিয়া সর্ব্বদাই কৃতজ্ঞতা জানাইতেন। একদিন রাণী আউদা কথাপ্রসঙ্গে কহিলেন যে, বোম্বাইয়ের শ্রেষ্ঠ বণিক্ স্যার জেম্সেট্জি জিজিভয়ের সহিত তাঁহার আত্মীয়তা আছে। স্যার জেম্সেট্জির ভাগিনেয় হংকংএ থাকেন। আউদা তাঁহারই আশ্রয়ে যাইতে চাহেন। কিন্তু তিনি আউদাকে গ্রহণ করিবেন কি না কে জানে। যদি গ্রহণ না করেন, তাহা হইলে নিজের দশা যে কি হইবে সেই চিন্তাতেই আউদা অত্যন্ত ব্যাকুলা হইয়াছিলেন। মিঃ ফগ কহিলেন, “সে জন্য চিন্তা কি, সবই ঠিক হ’য়ে যাবে।”
রেঙ্গুন জাহাজে সমুদ্র-যাত্রার প্রথম ভাগটা বেশ স্বচ্ছন্দেই কাটিয়া গেল। ওই অনতিদূরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ। ওই তাহাদের রমণীয় স্যাডল্ লিকের ২৪০০ ফিট উচ্চ শৃঙ্গ সগর্ব্বে শির উত্তোলন করিয়া দণ্ডায়মান রহিয়াছে। জাহাজখানি বেলাভূমির অতি নিকট দিয়া যাইতে লাগিল। সম্মুখে অনন্তবিস্তারি বনশ্রেণী—তাল, খর্জ্জুর, শেগুন প্রভৃতি বৃক্ষের সারি। সেই কাননের পশ্চাদ্ভাগে গিরিশিখরগুলি তরঙ্গের পর তরঙ্গের মত দেখাইতেছিল।
দেখিতে দেখিতে রেঙ্গুন পোত আন্দামান পশ্চাতে ফেলিয়া অগ্রসর হইতে লাগিল। গোয়েন্দা ফিক্স তখন কোথায় ছিলেন?
তিনি যখন দেখিলেন, শিকার সত্য সত্যই পলায়ন করিল, তখন অনন্যোপায় হইয়া বিলাতের পরোয়ানা হংকংএ পাঠাইবার উপদেশ দিয়া রেঙ্গুন জাহাজেই হংকং যাত্রা করিলেন। পাছে জিয়েনের সহিত জাহাজের উপর তাঁহার সাক্ষাৎ ঘটে, এই ভয়েই তিনি অতি সাবধানে থাকিতে লাগিলেন। তিনি দেখিলেন, জাহাজ যখন সিঙ্গাপুরে অধিকক্ষণ থাকিবে না, তখন হংকংই তাঁহার শেষ ভরসার স্থল। দস্যুকে হংকংএ ধরিতে না পারিলে আর ধরা যাইবে না। হংকং এর পরই ত চীন, জাপান এবং আমেরিকা। সাধারণ একখানা গ্রেপ্তারী পরোয়ানা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাহিরে চলিবে না। এ সকল স্বাধীন দেশে দস্যুকে ধরিবার জন্য বিশেষ পরোয়ানা আনাইতেও অনেক সময় লাগিবে। ততদিন ফিলিয়াস্ ফগ কোথায় যে লুক্কায়িত হইবেন তাহা কে বলিতে পারে!
গোয়েন্দা ফিক্স বড় বিপদেই পড়িলেন। তিনি ভাবিতে লাগিলেন, ‘আমার যত কল কৌশল সবই ত প্রয়োগ করিয়াছিলাম। বোম্বাই এবং কলিকাতা দুই স্থানেই পরাজিত হইয়াছি। হংকংএ যদি দস্যুকে ধরিতে না পারি, তাহা হইলে আমার সুনাম পর্য্যন্ত কলঙ্ক-মলিন হইবে। যেমন করিয়াই হউক, হংকংএ উদ্দেশ্য সাধন করিতেই হইবে। জিয়েনকে কি সকল কথা প্রকাশ করিয়া বলিব? বলিলে সে হয় ত দস্যুর সঙ্গ ত্যাগ করিয়া আমাকেই সাহায্য করিবে।’
‘কি করি? বলি—কি বলিব না? এ যে বড় বিষম সমস্যা! যদি জিয়েন তাহার প্রভুকে সকল কথা বলিয়া দেয়! তবেই ত আমার সকল শ্রম পণ্ড হইল! না—নিতান্ত দায়ে না ঠেকিলে কোন কথা প্রকাশ করা হইবে না।’
‘মিঃ ফগের সঙ্গিনীটীই বা কে? আগে ত ইহাকে দেখি নাই। বোম্বাই হইতে কলিকাতার পথে ইনি জুটিয়াছেন বলিয়া বোধ হয়। স্ত্রীলোকটী সুন্দরী বটে। বুঝি ইঁহার জন্যই মিঃ ফগ টাকা চুরি করিয়া পলাইতেছেন! এখন ঠিক বুঝিয়াছি। টাকা চুরি করিয়া এই স্ত্রীলোকটীকে লইয়া মিঃ ফগ দেশত্যাগী হইতেছেন।’
‘স্ত্রীলোকটী কি বিবাহিতা? তা’ হউক বা না হউক, আমার তাহাতে কিছু আসিয়া যায় না। মিঃ ফগ যে ইঁহাকে হরণ করিয়া লইয়া যাইতেছেন, ইহাতে ত আর সন্দেহ নাই। এই ত বেশ সুযোগ জুটিয়াছে! রমণী-অপহরণের জন্য মিঃ ফগকে আটকাই না কেন!’
‘কি বিপদ্! রেঙ্গুন জাহাজ যে আবার একদম হংকং যাইবে। মিঃ ফগ যেমন জাহাজ হইতে জাহাজে, রেল হইতে রেলে, ঝম্পপ্রদান করিতে করিতে চলিয়াছেন, হংকংএ কি তিনি বেশী বিলম্ব করিবেন? ভরসা ত হয় না।’
‘এক কাজ করা যাউক। সিঙ্গাপুর হইতে হংকংএর পুলিশকে তারে খবর পাঠাই। তাহারা প্রস্তুত থাকিলেই যেমন জাহাজ হংকংএ যাইবে, অমনি মিঃ ফগ ধৃত হইবেন। কিন্তু আগে জিয়েনকে ‘ধাপ্পা’ দিয়া ভিতরের সংবাদটা নিতেই হইতেছে।’
এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে ফিক্স গোয়েন্দা জাহাজের ডেকের উপর আসিয়া দেখিলেন জিয়েন তথায় পাদচারণ করিতেছে। তাহাকে দেখিবামাত্রই গোয়েন্দা বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করিয়া সম্মুখে যাইয়া কহিলেন, “এ কি, রেঙ্গুন জাহাজে তুমি যে?”
“মিঃ ফিক্স! আপনিও যে দেখছি এখানে! সেই বোম্বাইতে আপনার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়েছিল―না? আপনিও কি পৃথ্বী-পর্য্যটনে বেরিয়েছেন না কি?”
“না—ও সব খেয়াল আমার নাই। আমি কিছুদিন হংকং এ থাক্বো ভাবছি।”
“ও তাই না কি! আপনাকে ত এতদিন ডেকের উপর দেখতে পাইনি। সেই কবে আমরা কলিকাতা ছেড়েছি—”
“আমার একটু অসুখ হয়েছিল তাই বাহিরে আসিনি। কি জান, এই বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগর এ দু’টো আমার সয় না। তা যাক্। তোমার মনিব কেমন আছেন?”
“তিনি ভালই আছেন। ঠিক্ ঠাক্ সময় মত তাঁর সব কাজ হয়ে যাচ্ছে। মিঃ ফিক্স, আপনি বোধ হয় জানেন না যে এখন আমাদের সঙ্গে একটী মহিলা আছেন।”
গোয়েন্দা আত্মগোপন করিয়া কহিলেন, “মহিলা? সুন্দরী যুবতী! কৈ না? অনেকদিন তোমাদের সঙ্গে দেখা নাই, আমি আর কেমন করে’ জান্ব বল।”
জিয়েন তখন গোয়েন্দার নিকট আদ্যোপান্ত সমস্ত বর্ণনা করিতে লাগিল। মালাবার মন্দিরে তাহার দুর্দ্দশা, খোল্বিতে হস্তী ক্রয়, পিল্লাজির মন্দিরে সতীদাহ, কলিকাতার বিচারশালায় বিচার ও দণ্ড—এ সমস্তই সে গোয়েন্দা ফিক্সের নিকট একে একে বর্ণনা করিল। ফিক্স গোয়েন্দা ইহার কতক কতক ভালই জানিতেন। তথাপি অজ্ঞতার ভাণ করিয়া বিশেষ মনোযোগের সহিত সমস্ত শুনিলেন এবং মধ্যে মধ্যে সহানুভূতি দেখাইয়া করিলেন,―
“মিঃ ফগ কি এখন এই মহিলাটীকে ইউরোপে নিয়ে যাবেন না কি?”
“না—তা’ কেন? সে কি কখনো সম্ভব? হংকংএ রাণী আউদার আত্মীয় আছেন। আমরা তাঁরই কাছে ওঁকে রাখতে চাচ্ছি। শুনেছি তিনি হংকং এর একজন বড় মহাজন।”
সকল কথা শুনিয়া গোয়েন্দার মন দমিয়া গেল। তিনি হতাশ হৃদয়ে ভাবিলেন ‘এ পথে দেখছি কিছু হবে না।’ তারপর প্রকাশ্যে বলিলেন, “এস এক গ্লাস জিন্ খাওয়া যাক্—অনেক দিন পর দেখা হ’ল!” জিয়েন হর্ষ প্রকাশ করিয়া কহিল, “চলুন—দুইএক গ্লাস জিন ভিন্ন আর রেঙ্গুন জাহাজে কি করে’ সময় কাটানো যাবে!”
ষোড়শ পরিচ্ছেদ
দে দোল্—দে দোল্!
দিনের পরও রেঙ্গুন জাহাজে জিয়েনের সহিত গোয়েন্দার অনেকবার সাক্ষাৎ হইয়াছিল। রকম-সকম দেখিয়া গোয়েন্দা আর তাহার নিকট হইতে সংবাদ সংগ্রহের চেষ্টা করিলেন না।
জিয়েন ভাবিতে লাগিল, ‘আমরাও যেখানে যাই, ফিক্সকেও সেই খানেই দেখিতে পাই। ব্যাপারখানা কি! মিঃ ফিক্স নিশ্চয়ই সংস্কারসমিতির প্রেরিত গুপ্তচর। মিঃ ফগ সত্য সত্যই দেশ ভ্রমণ করছেন কি না, তাই গোপনে দেখে যাচ্ছে।’
জিয়েনের বড় রাগ হইল। ফিলিয়াস্ ফগের ন্যায় সজ্জনের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গুপ্তচর প্রেরণ! সে মনে মনে বলিল, ‘ইহার জন্য সংস্কারসমিতির সঙ্গে বোঝা-পড়া করতে হ’বে।’ পাছে মিঃ ফগ দুঃখিত হন সেই জন্য সে তাঁহার নিকট কিছু প্রকাশ করিল না।
রেঙ্গুন তাহার নির্দ্দিষ্ট সময়ের ১২ ঘণ্টা পূর্ব্বেই সিঙ্গাপুরে নোঙ্গর করিয়া কয়লা তুলিতে লাগিল। মিঃ ফগ রাণী আউদাকে সঙ্গে লইয়া নগরভ্রমণে বাহির হইলেন।
গোয়েন্দাও তাঁহাদের পশ্চাদনুসরণ করিলেন। জিয়েন ইহা দেখিল, দেখিয়া হাসিল। বেলা ১১টার সময় সিঙ্গাপুর হইতে জাহাজ ছাড়িল। তখনো হংকং ১৩০০ মাইল দূর। এতদিন পর্য্যন্ত আকাশ বেশ ভালই ছিল। সহসা অল্প অল্প তুফান আরম্ভ হইল। জাহাজের কাপ্তান পাল টানিয়া দিলেন। রেঙ্গুন গুণমুক্ত সায়কের মত অগ্রসর হইতে লাগিল।
মধ্যে মধ্যেই ফিক্সের সহিত জিয়েনের সাক্ষাৎ হইত। একদিন কথোপকথন করিতে করিতে গোয়েন্দা কহিলেন,―
“হংকংএ পৌঁছিবার জন্য তোমরা বড় বেশী ব্যস্ত হয়েছ বলে বোধ হয়?”
“হাঁ, একটু হয়েছি বৈ কি।”
“মিঃ ফগ বুঝি সেখানে ইয়োকোহামার জাহাজ ধরবেন?”
“হাঁ। সেই জন্মই তিনি উদ্বিগ্ন হয়েছেন।”
“পৃথ্বী-ভ্রমণের এই ব্যাপারটা কি তুমি সত্য সত্যই বিশ্বাস কর?”
“করি বৈ কি। কেন, আপনি কি করেন না?”
“মোটেই না।”
“আপনি ত দেখছি বড় ধূর্ত্ত!”
জিয়েনের কথা শুনিয়া ফিক্স গোয়েন্দা একটু বিচলিত হইলেন। ভাবিলেন, ‘আমি যে গোয়েন্দা এ কথা কি তবে প্রকাশ হ’য়ে পড়েছে না কি?’
সে দিনের মত তিনি আর সাহস করিয়া অন্য কোন কথা জিজ্ঞাসা করিলেন না।
জিয়েন ছাড়িবার পাত্র ছিল না। কথা প্রসঙ্গে অন্য একদিন সে নিজেই জিজ্ঞাসা করিল, “মিঃ ফিক্স, হংকং এর পর কি আর আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে না?”
কিছু বিব্রত হইয়া ফিক্স কহিলেন, “হাঁ―তা’ কি জান, এখনাই সে কথা ঠিক বল্তে পারা যায় না।” প্রত্যুত্তরে জিয়েন কহিল, “আপনি যদি বরাবর আমাদের সঙ্গে থাকেন তা’ হ’লে আমার বড় আনন্দ হ’বে। কোম্পানীর কর্ম্মচারীর পক্ষে কি অর্দ্ধপথেই থেমে যাওয়া ভাল দেখাবে? গোড়ায় বলেছিলেন, আপনি শুধু বোম্বাই পর্য্যন্তই আসবেন। এখন ত দেখছি প্রায় চীনে এসে পড়েছেন। আমেরিকা ত আর বেশী দূর নয়। আর আমেরিকা থেকে পা বাড়ালেই ত ইউরোপ!”
গোয়েন্দা তখন নিতান্ত বিব্রত হইয়া জিয়েনের দিকে তীব্র কটাক্ষ পাত করিলেন। জিয়েন কথাটী বলিয়া নিতান্ত সরলভাবে হাসিতে লাগিল। সে হাসিতে হাসিতে বলিল, “এ ব্যবসায়ে আপনার বেশ দু’ পয়সা থাকে। কেমন না?”
অবিচলিত ভাবে ফিক্স উত্তর করিলেন, “হাঁ, কখন-কখনো কিছু থাকেও, আবার থাকেও না। আমাদের কাজেরও একটা মরসুম আছে। মরসুমের সময় একরকম মন্দ চলে না। তবে আমার যাতায়াতের খরচ-পত্র কিছু নিজের লাগে না।” জিয়েন আর একটু হাসিয়া কহিল, “সেটা ত বেশ বোঝাই যাচ্ছে।”
মিঃ ফিক্স আর কোনো কথা না কহিয়া নিজের কামরায় প্রত্যাবর্ত্তন করিলেন। সহস্র চিন্তা তাঁহাকে আকুল করিয়া তুলিল।
ইতিপূর্ব্বেই অল্প অল্প তুফান আরম্ভ হইয়াছিল। এখন তাহা প্রবল-হইয়া উঠিল। প্রতিকূল বাতাসে রেঙ্গুনের গতি অপেক্ষাকৃত শিথিল হইয়া পড়িল। মিঃ ফগ সেই চঞ্চল জলরাশির দিকে চাহিয়া দেখিলেন, কিন্তু তাঁহার বদনে চিন্তার রেখা মাত্র লক্ষিত হইল না। জিয়েন অত্যন্ত অস্থির হইয়া উঠিল। যদি তাহার ক্ষমতা থাকিত, তাহা হইলে সে পবনদেবকে তীব্র কষাঘাত করিতে ছাড়িত না। সে রেঙ্গুন জাহাজের নাবিকদিগকে যথাশক্তি সাহায্য করিতে লাগিল। তাহার কর্ম্মপটুতা দেখিয়া সকলে বিস্মিত হইয়া গেল।
দে দোল্—দে দোল্! প্রবল তরঙ্গের আঘাতে রেঙ্গুন দুলিয়া দুলিয়া কাঁপিতে লাগিল। মিঃ ফিক্স মনে মনে অত্যন্ত প্রীত হইলেন। তিনি পবনদেবকে ডাকিয়া বলিতে লাগিলেন, ঝড় যেন থামে না। তিনি জানিতেন, আর দুই একদিন এইরূপ চলিলেই রেঙ্গুন সময় মত হংকংএ পৌঁছিতে পারিবে না—ইয়োকোহামার জাহাজ ছাড়িয়া চলিয়া যাইবে! জিয়েন যখন একান্ত উদ্বিগ্ন হইয়া তাহাদের বিপদের কথা মিঃ ফিক্সকে জানাইল, তথন তিনি মৃদু মৃদু হাস্য করিয়া সমবেদনা জ্ঞাপন করিলেন!
ঝড় অবশেষে থামিল বটে, কিন্তু রেঙ্গুনপোত নির্দ্দিষ্ট সময়ের ২৪ ঘণ্টা পর যাইয়া বন্দরে পৌঁছিল! ইয়োকোহামার জাহাজ বুঝি ছাড়িয়া গিয়াছে। তবে উপায়? জিয়েন বড় অধীর হইল। কি দুঃসংবাদ না জানি শুনিতে হইবে, এই শঙ্কায় সে বন্দরের আড়কাঠিকে কিছু জিজ্ঞাসা করিতে সাহস পাইল না। রাণী আউদা মিঃ ফগের বিপদে অত্যন্ত দুঃখিতা হইলেন। কিন্তু মিঃ ফগ যেন পাষাণ-গঠিত। তিনি একান্ত নিরুদ্বেগে কঠিলেন, “কোন চিন্তা নাই।” আড়কাঠিকে জাহাজের উপর দেখিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “ইয়োকোহামার জাহাজ কি চলে গেছে?”
“না—যায় নাই। জাহাজের বয়লার খারাপ ছিল বলে যেতে পারে নাই।”
“কখন্ যাবে?”
“কাল সকালে জোয়ার এলেই ছাড়বে।”
“জাহাজের নাম কি?”
“কর্ণাটিক।”
“ধন্যবাদ”
আড়কাঠি বিদায় হইতেছিল, জিয়েন আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া তাহার কর মর্দ্দন করিয়া কহিল, “আপনি অতি ভাল মানুষ―আপনাকে ধন্যবাদ।” জিয়েনের ইচ্ছা হইতেছিল সে আড়কাঠিকে বুকে জড়াইয়া ধরে। অকস্মাৎ একজন অপরিচিত লোকের নিকট এইরূপে প্রশংসিত হইবার কোন কারণ বুঝিতে না পারিয়া আড়কাঠি বিস্মিত হইল এবং কারণ অনুসন্ধানের জন্য অপেক্ষা না করিরা শিশ্ দিতে দিতে জাহাজ হইতে নৌকায় অবতরণ করিল। বেলা ১টার সময় রেঙ্গুন-পোত জেটীতে আসিয়া লাগিল।
এবার মিঃ ফগের শুভাদৃষ্ট তাঁহাকে রক্ষা করিল। তিনি যদি কর্ণাটিক জাহাজ ধরিতে না পারিতেন তাহা হইলে পরবর্ত্তী পোতের জন্য তাঁহাকে ৮ দিন অপেক্ষা করিতে হইত! মিঃ ফগ দেখিলেন তাঁহার ২৪ ঘণ্টা বিলম্ব হইয়াছে, কিন্তু সে জন্য বিশেষ কোন ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল না। যে জাহাজ ইয়োকোহামা হইতে সান্ ফ্রান্সিস্কো যাতায়াত করিত, হংকংএর জাহাজ না পৌঁছিলে তাহার ছাড়িবার নিয়ম ছিল না। যদিও এই ৩৫ দিনে তিনি ২৪ ঘণ্টা পিছাইয়া পড়িলেন বটে, কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগর পার হইতেই সেটুকু সারিয়া লইবার ভরসা করিলেন।
জাাজ জেটীতে লাগিবামাত্রই তিনি রাণী আউদাকে লইয়া হংকংএর একটী পান্থনিবাসে গমন করিলেন এবং তথায় জিয়েনকে তাঁহার পরিচর্য্যায় নিযুক্ত করিয়া স্বরং সার জেম্সেট্জি জিজিভয়ের ভাগিনেয়ের অনুসন্ধানে বহির্গত হইলেন।
আউদার দুরদৃষ্ট! তাঁহার দেখা মিলিল না। তিনি তখন হংকংএ থাকিতেন না। দিনেমার বণিক্দিগের সহিত তাঁহার কারবার অধিক ছিল বলিয়া, দুইবৎসর পূর্ব্বেই চীন হইতে হলাণ্ডে প্রস্থান করিয়াছিলেন। সেইখানেই থাকিতেন।
সংবাদ শুনিয়া রাণী আউদার বাক্যস্ফুর্ত্তি হইল না। তিনি কপোলদেশে হস্ত বিন্যস্ত করিয়া চিন্তামগ্ন হইলেন। তাঁহার বদনমণ্ডল পাণ্ডুর হইয়া উঠিল। অবশেষে ধীরে ধীরে কম্পিতকণ্ঠে কহিলেন, “মিঃ ফগ, এখন আমার উপায়!”
“চলুন ইউরোপে যাওয়া যাক্।”
“আপনার ঘাড়ের উপর একটা ভারি বোঝার মত আমি আর কত দিন থাক্বো।”
“কিছু না―কিছু না! জিয়েন―!”
“আজ্ঞা।”
“কর্ণাটিক জাহাজে যেয়ে তিনখানা টিকেট কিনে রাখ।”
জিয়েন অবিলম্বে প্রস্থান করিল।
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ
গোয়েন্দার কাণ্ড
কং একটী দ্বীপমাত্র। ১৮৯৩ সালে ন্যান্কিনের সন্ধিসূত্রে হংকং ইংরাজের অধিকারে আসিয়াছিল। ইংরাজের ঔপনিবেশিক স্পৃহা অল্পকাল মধ্যেই হংকংকে একটী ইউরোপীয় নগরে পরিবর্ত্তিত করিয়া দিল। ক্যাণ্টন নদীর মুখেই দ্বীপটী অবস্থিত। চৈনিক বাণিজ্যের অধিকাংশ পণ্য সম্ভারই এই পথে যাতায়াত করিত। তাই অল্প সময়েই হংকং বন্দর একটা শ্রেষ্ঠ বন্দররূপে প্রতিষ্ঠালাভ করিল। দেখতে দেখিতে জেটী, চিকিৎসালয়, মালগুদাম, গির্জ্জা, কর্ম্মশালা প্রভৃতি হংকংএর সৌন্দর্য্য বাড়াইয়া তুলিল। প্রশস্ত রাজপথগুলি নগরের গৌরবস্বরূপ শোভা পাইতে লাগিল।
জিয়েন পান্থশালা হইতে বিদায় হইয়া তাহার কোটের দুই পকেটে দুই হস্ত দিয়া নগর সন্দর্শন করিতে করিতে অগ্রসর হইল। ক্যাণ্টন নদীর মুখে ভিক্টোরিয়া বন্দরে নানাদেশের বিশালকায় অর্ণবপোত সকল ভাসিতেছিল। রাণিজ্যপোত, রণতরী, ধীবরদিগের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরণী, সেম্পা, তঙ্কা প্রভৃতি কত প্রকারের জলযান বন্দরে অপেক্ষা করিতেছিল। কুসুমসজ্জিত তরণী পর্য্যন্ত সেই নদীর মুখে ভাসমান উদ্যানের ন্যায় শোভা পাইতেছিল।
যে বন্দর হইতে কর্ণাটিক পোত ছাড়িবার কথা ছিল জিয়েন তথায় যাইয়া উপনীত হইল। দেখিল, ফিক্স গোয়েন্দা চিন্তাকুলচিত্তে জেটীর উপর ভ্রমণ করিতেছেন। জিয়েন হাস্য করিয়া আপন মনে বলিল, “সংস্কারসমিতির পক্ষে এটা শোভা পায় না!”
তখনো বিলাতের পরোয়ানা আসিয়া পৌঁছিয়াছিল না। নিকট ভবিষ্যতে উহা আসিবার সম্ভাবনাও ছিল না। হংকংএ দস্যু ধৃত না হইলে তাহাকে ধরিবারও আর সুযোগ ছিল না। সুতরাং গোয়েন্দার হৃদয়মধ্যে যে কি ভীষণ চিন্তাতরঙ্গ উদ্বেলিত হইতেছিল, কি বিষম অস্থিরতা যে তাঁহাকে ব্যস্ত করিয়া তুলিয়াছিল, তাহা সহজেই অনুমেয়। জিয়েন সে দিকে লক্ষ্য না করিয়া হাসিয়া কহিল, “কি মিঃ ফিক্স, আপনিও কি তবে আমাদের সঙ্গেই আমেরিকা যাচ্ছেন?”
দন্তে দন্তে ঘর্ষণ করিয়া ফিক্স কহিলেন,—
“হাঁ যাচ্ছি বৈ কি।”
উচ্চ হাস্য করিয়া জিয়েন বলিল, “তা’ বেশ ত আসুন না। আমি ত আগেই জানি, আপনি আমাদের ছাড়তে পারবেন না! আসুন―আসুন টিকেট কেনা যাক্।”
উভয়ে তখন টিকেটঘরে গিয়া ৪ খানি টিকেট লইল। কেরাণী জানাইলেন, জাহাজের আবশ্যক সংস্কার শেষ হইয়াছে। প্রভাতে জাহাজ ছাড়িবার কথা ছিল বটে, কিন্তু সে সময় পরিবর্ত্তিত হইয়াছে। জাহাজ সেই সন্ধ্যাকালেই ছাড়া হইবে।
“বেশ তা’তে আর অসুবিধা কি, যাই―মনির ম’শায়কে খবর দিগে,” এই বলিয়া জিয়েন অগ্রসর হইল। মিঃ ফিক্স দেখিলেন, ‘হয় এখনই—না হয় এ জীবনে আর নহে।’ তিনি একটী দুঃসাহসিক পন্থা অবলম্বন করিলেন। রাজপথে বাহির হইয়া জাহাজ ঘাটের নিকটে একটী দোকান দেখিয়া তিনি কহিলেন, “এস জিয়েন, কিছু জলযোগ করা যাক।” জিয়েনের তাহাতে বিশেষ আপত্তি ছিল না। উভয়ে দোকানে প্রবেশ করিলেন।
দোকানটী বেশ বড়। তাহার একটা সুসজ্জিত বৃহৎ কক্ষের একপার্শ্বে একটা সুবিস্তৃত শয্যা রচিত ছিল। জিয়েন দেখিল কতকগুলি লোক সেই শয্যার উপর নিদ্রামগ্ন। প্রায় ৩০ জন লোক ছোট ছোট টেবিলের চতুর্দ্দিকে বসিয়া কেহ বিয়র, কেহ বা পোর্টার, কেহ বা ব্র্যাণ্ডি, কেহ বা অন্যপ্রকার সুরা পান করিতে করিতে গল্প করিতেছিল। অনেকে আবার রক্তাভ মৃত্তিকার সুদীর্ঘ নলে গোলাপজলে সিক্ত অহিফেনের ধূমপানে ব্যস্ত ছিল। যাহারা অহিফেন-ধূমপানে হতজ্ঞান হইয়া টেবিলের নিম্নে পতিত হইতেছিল, পরিচারকগণ তাহাদিগকে সযত্নে তুলিয়া সেই সুবিস্তৃত শয্যার উপর রক্ষা করিতেছিল।
মিঃ ফিক্স অবস্থা দেখিয়াই বুঝিলেন যে তাঁহারা চীন দেশের একটী গুলির আড্ডায় আসিয়াছেন। নরসমাজে যত প্রকার কদভ্যাস বর্ত্তমান আছে, তন্মধ্যে অহিফেন-সেবনই সর্ব্বাপেক্ষা অনিষ্টকারী। আমরা যে সময়ের কথা বলিতেছি, তখন এই বদভ্যাস চীনের রাজপ্রাসাদ হইতে দরিদ্রের পর্ণকুটীরে পর্য্যন্ত বিস্তার লাভ করিয়া একটী সমগ্র জাতিকে দুর্ব্বল ও অকর্ম্মণ্য করিয়া তুলিয়াছিল! এমন কি রমণীরা পর্য্যন্ত ইহার কবল হইতে মুক্তি পাইয়াছিল না!
মিঃ ফিক্সের আদেশে দুই বোতল পোর্ট সুরা আসিল। তাঁহারা পান করিতে লাগিলেন। ধীরে ধীরে বোতল নিঃশেষিত হইতে লাগিল, ধীরে ধীরে গল্পের স্রোত চলিতে লাগিল। জিয়েনের হঠাৎ মনে হইল কর্ণাটিক জাহাজ ছাড়িবার সময় পরিবর্ত্তিত হইয়াছে। সে উঠিল। কহিল―
“জাহাজ সন্ধ্যার সময় ছাড়বে। মনির মশায়কে খবর দিতে হবে। আমি উঠি।”
তাহাকে বাধা দিয়া গোয়েন্দা কহিলেন, “আহা আর একটু বসো না। এত তাড়াতাড়ি কি― এখনো ঢের সময় আছে।”
“কেন? কিছু দরকার আছে কি?”
“তোমার সঙ্গে একটা গুরুতর কথা আছে।”
“গুরুতর কথা! কি কথা? আজ ত সময় নাই, কাল শুনলেই চল্বে। আপনিও ত কর্ণাটিকেই যাবেন।”
“কাল শুনলে চল্বে না—আজই শুনতে হবে। আর একটু বসো! কথাটা তোমার মনিবের সম্বন্ধেই।”
জিয়েন তীব্র দৃষ্টিতে গোয়েন্দার মুখের দিকে চাহিয়া কহিল, “আমার প্রভুর সম্বন্ধেই! কি কথা—”
সে পুনরায় একখানি চেয়ারে উপবিষ্ট হইল। আবার মদ্য আসিল। আবার উভয়ে পান করিলেন। মিঃ ফিক্স জিয়েনের বাহুমূল স্পর্শ করিয়া অনুচ্চস্বরে কহিলেন,—
“আমি যে কে তা’ বোধ হয় তুমি বুঝতে পেরেছ?”
“কতকটা পেরেছি বৈকি।”
“তবে আর কি। এখন আমি সব কথাই তোমাকে খুলে বল্তে পারি।”
“আমি যখন আপনাকে চিনে ফেলেছি, তখন আর বলতে বাধা কি—বলে ফেলুন। কিন্তু আমি আগেই জানিয়ে রাখি তাঁরা আপনাকে পাঠিয়ে মিছামিছি কেবল হয়রাণ করছেন।”
“এতেই বেশ বোঝা যাচ্ছে, টাকাটা যে কত, সে খোঁজ তুমি রাখ না।”
“রাখি না! রাখি বৈ কি। তিন লক্ষ টাকা।”
ফরাসীর বাহু সজোরে ঝাঁকাইয়া দিয়া মিঃ ফিক্স কহিলেন, “তিন লক্ষ কি হে! সাড়ে আট লক্ষ!”
“কি বল্লেন—সাড়ে আট লক্ষ! তবে কি মিঃ ফগ সাড়ে আট লক্ষ টাকার বাজী ধরেছেন! তা’ হ’লে দেখছি এখানে সময় নষ্ট করা আমার নিতান্তই অন্যায় হচ্ছে।”
জিয়েন পুনরায় উঠিয়া দাঁড়াইল। মিঃ ফিক্স তাহাকে টানিয়া বসাইয়া বলিতে লাগিলেন,—
“বুঝেছ—৩।৪ লাখ নয়—সাড়ে আট লাখ! এই যে ব্রাণ্ডি আছে—আর একটু খাও না।”
জিয়েন পুনরায় পান করিল। গোয়েন্দা কহিলেন—
“সাড়ে আট লক্ষ—বুঝেছ ত! আমি যদি সফলকাম হই তা’লে আমি ত্রিশ হাজার পাব। তুমি যদি আমাকে সাহায্য কর, তাহলে তোমাকেও তিন হাজার দিব।”
“আপনাকে সাহায্য করবো!” গোয়েন্দার দিকে উন্মত্তের ন্যায় চাহিয়া উচ্চস্বরে জিয়েন কহিল, “আপনাকে সাহায্য করবো!”
“হাঁ আমাকেই সাহায্য করবে। যাতে মিঃ ফগের এখানে কয়েক ঘণ্টা বিলম্ব হয় তাই করতে হ’বে!
“আপনি বলেন কি মশায়? আমার প্রভুর পশ্চাতে গোয়েন্দা পাঠিয়েও কি তাঁদের তৃপ্তি হয় নি! এখন আবার তাঁরা প্রভুর যাত্রাপথটীও বিঘ্নসঙ্কুল করে’ দিতে চান? ছি ছি! ধিক্ তাঁদের!
“তোমার কথা ত আমি বুঝতে পারছিনে।”
“এর চেয়ে ছোট নজর আর নাই। তাঁরা ত দেখছি তা’ হ’লে রাহাজানি করে’ মিঃ ফগের পকেট মারতেও পারেন!”
“আমরা ত ঠিক তাই-ই করতে চাই!”
অগ্নিতুল্য ব্রাণ্ডি ক্রমেই জিয়েনকে উত্তেজিত করিতেছিল। সে কহিল, “তা হ’লে ত দেখছি এ একটা ভয়ানক ষড়যন্ত্র! কেমন তাই নয় কি? নিশ্চয়ই তাই! তাঁরাই আবার বন্ধু বলে’―ভদ্রলোক বলে’ পরিচয় দেন!
ফিক্স বড় গোলমালে পড়িলেন। জিয়েন বলিতে লাগিল, “এঁরাই বন্ধু! এঁরাই আবার সংস্কার-সমিতির সদস্য! মিঃ ফিক্স আপনি কি জানেন না যে আমার প্রভু অতি সাধু সদাশয় মহৎ লোক। তিনি যে বাজী ধরেছেন, সদুপায়েই তা’ জিতে নেবেন।”
জিয়েনের দিকে এক দৃষ্টে চাহিয়া মিঃ ফিক্স কহিলেন, “আমি যে কে তা’ কি তুমি কিছু বুঝতে পেরেছ?”
“আপনি আর কে! সংস্কার-সমিতির একজন গোয়েন্দা! আমার মনিবকে পদে পদে বাধা দিতেই এতদূর পর্য্যন্ত এসেছেন। আমি ত অনেক দিনই আপনাকে চিনেছি, কিন্তু মনে দুঃখ পাবেন বলে মিঃ ফগের কাছে এ কথা ভাঙ্গি নাই।”
ফিক্স তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করিলেন, “তা’ হলে তিনি এর বিন্দুবিসর্গও জানেন না?”
ব্রাণ্ডির গ্লাসটা এক নিশ্বাসে শেষ করিয়া জিয়েন কহিল, “কিছু মাত্র না।”
গোয়েন্দা ফিক্স দুই হস্তে চক্ষুর্দ্বয় আবৃত করিয়া ক্ষণিকের জন্য আপন কর্ত্তব্য চিন্তা করিলেন। তিনি দেখিলেন, জিয়েন নিতান্ত সরল। সে নিশ্চয়ই ব্যাঙ্ক-দস্যুতায় মিঃ ফগের সহযোগী ছিল না। গোয়েন্দ ভাবিল যদি তাই হয়, তা’ হ’লে অবশ্যই সে আমাকে সাহায্য করবে। অধিকক্ষণ চিন্তা করিবার সময়ও আর তখন ছিল না। যেমন করিয়া হউক মিঃ ফগকে হংকংএ ধরিয়া রাখাই তখন একান্ত প্রয়োজন হইয়াছিল। তিনি কহিলেন, “শোন—তুমি যা’ ভাবছ, আমি তা’ নই।”
বিস্মিত হইয়া জিয়েন কহিল, “সে কি!”
“লণ্ডন পুলিশের বড় কর্ত্তা আমাকে পাঠিয়েছেন। আমি একজন গোয়েন্দা পুলিশ!”
“আপনি গোয়েন্দা পুলিশ!”
“বিশ্বাস হচ্ছে না? এই তার প্রমাণ দেখ।” ফিক্স মুহূর্ত্ত মধ্যে তাঁহার নিয়োগ-পত্র প্রভৃতি বাহির করিয়া সেই কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় নিরুদ্ধবাক্ ফরাসীর সম্মুখে ধরিয়া বলিতে লাগিলেন, “বাজী ধরার একটা মিথ্যা-কাহিনী রচনা করে মিঃ ফগ তোমাকেও ঠকিয়েছেন, আর সংস্কার-সমিতির সদস্যদেরও ফাঁকি দিয়েছেন! তুমি যাতে কিছু বুঝতে না পেরে তাঁর সহায়তা কর, এটাও তাঁর একটী মতলবের মধ্যে।”
“কেন? তাঁর লাভ কি?”
“লাভ?―এই দেখ না, গত ২৮শে সেপ্টেম্বর ইংলণ্ডের ব্যাঙ্ক থেকে সাড়ে আট লক্ষ টাকা চুরি যায়। সৌভাগ্যক্রমে দস্যুর মুর্ত্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। মিঃ ফগের সঙ্গে সে মূর্ত্তির ঠিক মিল আছে!”
হস্তদ্বারা টেবিলে সজোরে আঘাত করিয়া জিয়েন কহিল, “এ হ’তেই পারে না―এ কথা একেবারে অসম্ভব! আমার মনিবের মত একজন সজ্জন পৃথিবীতে দুর্লভ।”
“তুমি তার কি জানবে! যেদিন মিঃ ফগ এই একটা পাগলামীর খেয়াল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন, তুমি ত সবে সেই দিনই তাঁর কর্ম্মে নিযুক্ত হয়েছিলে। মনে করে’ দেখ দেখি সে দিন তাঁর সঙ্গে কি ছিল। কোন জিনিষ-পত্র ছিল কি? কেবল ছিল একটা কার্পেটব্যাগ আর তার মধ্যে কতকগুলো ব্যাঙ্ক নোট! এখনো কি তুমি বলতে চাও যে তিনি একজন সাধু পুরুষ?”
যন্ত্রচালিতবৎ জিয়েন কহিল, “হাঁ হাঁ, তার পর!”
“দস্যুর সহযোগী বলে’ তুমিও কি গ্রেপ্তার হ’তে চাও?”
জিয়েন উভয় হস্তে আপন মস্তক চাপিয়া ধরিল, সমস্ত পৃথিবী যেন তাহার সম্মুখে ঘুরিতে লাগিল। তাহার বাক্য-স্ফুর্তি হইল না। সে ফিক্স গোয়েন্দার দিকে চাহিতে পর্য্যন্ত পারিল না। ভাবিতে লাগিল, ‘কি অসম্ভব কথা! ফিলিয়াস্ ফগ একজন দস্যু! সেই অকুতোভয় মহৎ ব্যক্তি―রাণী আউদার সেই বীর রক্ষাকর্ত্তাও একজন চোর! না―না―অসম্ভব। কিন্তু বাহ্য অবস্থা যে সমস্তই তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ দিচ্ছে! তা দিক, এ কথা অবিশ্বাস্য—ইহা একান্ত অসম্ভব! জিয়েন ইহা বিশ্বাস করিতে পারিল না। সে অর্দ্ধাবরুদ্ধ কণ্ঠে কহিল, “আপনি আমাকে কি করতে বলেন?”
“আমি এতদূর পর্য্যন্ত মিঃ ফগের অনুসরণ করেছি। লণ্ডন থেকে আমি যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চেয়েছি, আজও সেখানা হস্তগত হয় নাই। যাতে মিঃ ফগ হংকং থেকে যেতে না পারেন, তোমাকে তাই করতে হবে।”
“কিন্তু আমি—”
বাধা দিয়া ফিক্স কহিলেন, “যদি পার, ব্যাঙ্কের প্রতিশ্রুত পুরস্কারের অর্দ্ধেক তোমার।”
“কখনো না। আমাকে দিয়ে এ কাজ হবে না।” জিয়েন উন্মত্তের ন্যায় উঠিতে চেষ্টা করিল কিন্তু পারিল না। বিবশ হইয়া পুনরায় চেয়ারে বসিয়া পড়িল! “মিঃ ফিক্স!” সে বিজড়িত কণ্ঠে কহিল, “মিঃ ফিক্স! আপনার কথা যদি সত্যও হয়—আপনি যে দস্যুর সন্ধানে ফিরছেন, মিঃ ফগই যদি সে দস্যু হ’ন―আপনার কথা হাজার বার সত্য হ’লেও আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না। আমি এখনো বলছি, তিনি নির্দ্দোষ—তিনি সাধু―তিনি মহৎ। আমি আজও তাঁর নূন খাচ্ছি, বিশ্বাসহন্তা হ’তে পারব না।”
“তা’ হ’লে তুমি অসম্মত?”
“নিশ্চয়ই অসম্মত।”
“বেশ ভাল। তা হ’লে আমাদের মধ্যে যে সব কথাবার্তা হ’ল, সে সব ভুলে যাও। এস, তার চিহ্নস্বরূপ আর এক গ্লাস করে’ খাওয়া থাক।”
সুরা তখন জিয়েনকে বিবশ করিয়াছিল। ফিক্স স্থির করিলেন যে উপায়েই হউক ভৃত্যকে আর প্রভুর নিকটে যাইতে দেওয়া হইবে না। টেবিলের উপরেই অহিফেনপূর্ণ সেই রক্তাভ নলগুলি পড়িয়াছিল! মিঃ ফিক্স কিন্তু তাহারই একটা তুলিয়া লইয়া জিয়েনের হস্তে দিলেন। সুরাপ্রমত্ত্ব জিয়েন কয়েকবার নলে টান দিবামাত্রই অচেতন হইয়া কক্ষতলে পতিত হইল। মিঃ ফিক্স সেই হতচেতন জিয়েনের মুখের দিকে চাহিয়া বলিলেন “যা’ হ’ক এত দিনে পেয়েছি! কর্ণাটিক জাহাজ ছাড়ার সময় যে বদল হয়েছে সে কথা আর মিঃ ফগ জানতে পাচ্ছে না!”
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ
তঙ্কাদিরি
দিকে যখন এইরূপে মিঃ ফগের ভবিষ্যৎ আকাশ ঘনঘটাচ্ছন্ন হইতেছিল, তখন তিনি নিশ্চিন্ত চিত্তে রাণী আউদাকে সঙ্গে লইয়া বাজারে বাহির হইয়াছিলেন। রমণীর নিত্য আবশ্যক দ্রব্যসম্ভার সঙ্গে না থাকিলে রমণী পথ চলিতে পারে না। তাই মিঃ ফগ আউদার সনির্ব্বন্ধ নিষেধ সত্ত্বেও তাঁহার জন্য কতকগুলি অত্যাবশ্যক দ্রবাদি ক্রয় করিতেছিলেন।
পান্থনিবাসে প্রত্যাবর্ত্তন করিয়া ফিলিয়াস্ ফগ আহার করিলেন এবং আহারান্তে সচিত্র “লণ্ডন নিউজ” এবং “টাইমস্” পাঠে মনোনিবেশ করিলেন। যাহাকিছু ঘটিলেই বিস্মিত হইবার লোক হইলে, মিঃ ফগ দেখিতেই পাইতেন যে তাঁহার ভৃতা তখনো ফিরিয়া আসে নাই।
প্রভাতে যখন তিনি জিয়েনকে ডাকিলেন তখনো তাহার কোন সাড়া পাওয়া গেল না। ফগ তখনই প্রথম শুনিলন যে, পূর্ব্বরাত্রেও সে আসে নাই। তিনি বিনা বাক্যব্যয়ে জিনিষপত্র গুছাইয়া লইলেন এবং কর্ণাটিক জাহাজে যাইবার জন্য রাণী আউদাকে সঙ্গে করিয়া শিবিকা আরোহণে যাত্রা করিনে। জেটীতে উপস্থিত হইয়া শুনিলেন পূর্ব্বদিন সন্ধ্যার সময় জাহাজ ছাড়িয়া গিয়াছে। রাণী আউদার দিকে চাহিয়া তখন মিঃ ফগ কেবল কহিলেন, “তার জন্য ভাববেন না! পথে-ঘাটে চলতে গেলে এ সব গোলযোগ একটা হয়েই থাকে!”
অদূরে দাঁড়াইয়া গোয়েন্দা ফিক্স এ সমস্ত দেখিতেছিলেন। তিনি নিকটে আসিয়া মিঃ ফগকে জিজ্ঞাসা করিলেন,―“আপনিই না কাল আমাদের সঙ্গে রেঙ্গুন জাহাজে এসেছিলেন?”
“হাঁ। তা’ আপনার সঙ্গে ত আমার সাক্ষাৎ—”
“ক্ষমা করবেন। আপনার ভৃত্যের সঙ্গে এখানে দেখা পাব বলেই এসেছিলাম।”
রাণী আউদা তাড়াতাডি জিজ্ঞাসা করিলেন, “তার সন্ধান কি আপনি দিতে পারেন?”
বিস্ময়ের ভাণ করিয়া গোয়েন্দা উত্তর করিলেন, “আমি? না। সে কি আপনাদের সঙ্গে আসে নাই! এ ত বড় আশ্চর্যা কথা!”
“না সে ত আসে নাই। কাল থেকেই সে অনুপস্থিত। হয় ত বা সে কর্ণাটিক জাহাজে চলেই গেছে।”
“সে কি আপনাদের রেখেই চলে’ যাবে? আপনারাও বুঝি ঐ জাগজে যেতে চেয়েছিলেন?”
“হাঁ।”
“আমিও যাব মনে করেছিলেম। জাহাজখানা চলে যাওয়াতে বড় অসুবিধা হয়েছে। আমি খবর নিয়েছিলেম, শুনলেম যখন ছাড়ার কথা তার ১২ ঘণ্টা পূর্ব্বেই জাহাজখানা ছেড়ে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল। ১২ দিনের মধ্যে ত আর অন্য জাহাজ পাওয়া যাবে না। বড়ই অসুবিধা হ’ল!”
কথা বলিতে বলিতে ফিক্সের নয়নের কোণে অধরের প্রান্তে একটু মৃদু হাসি দেখা দিল। সে হাসি সরল হাসি নহে—তাহা সয়তানের হাসি। সে মনে মনে ভাবিতেছিল, আর ৮ দিন—তাহা হইইে ত পরোয়ানা হস্তগত হইবে। আর ভয় কি?
মিঃ ফগ তাঁহার স্বভাবসিদ্ধ ধৈর্য্যের ও গাম্ভীর্য্যের সহিত বলিলেন “কর্ণাটিক ছাড়াও হংকং বন্দরে আরো অনেক জাহাজ ত দেখা যাচ্ছে!” তিনি আর কালবিলম্ব না করিয়া রাণী আউদাকে সঙ্গে লইয়া জাহাজ ঘাটার দিকে চলিলেন।
গোয়েন্দা অবাক্! ভাবিলেন ‘এরা বলে কি!’ তিনিও ফগের পশ্চাদনুসরণ করিলেন।
ঘুরিতে ঘুরিতে তিন ঘণ্টা কাটয়া গেল, একখানি অর্ণবপোতও সংগৃহীত হইল না। কোন জাহাজে পণ্যাদি বোঝাই হইতেছিল, কোন জাহাজ হইতে বা ভারে ভারে নামিতেছিল। কেহই ইয়োকোহামায় যাইতে সম্মত হইল না! অদৃষ্টলক্ষ্মী কি ফিলিয়াস্ ফগকে পরিত্যাগ করিয়াছিলেন?
গোয়েন্দা ফিক্স প্রফুল্ল হইলেন।
মিঃ ফগ তখনো ঘাটে ঘাটে অনুসন্ধান করিতেছিলেন। পথিমধ্যে একজন নাবিকের সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হইল। নাবিক কহিল, “হুজুর কি যানের সন্ধানে ফিরছেন?”
“এখনই ছাড়তে পার, তোমার এমন কোন তরণী আছে?”
“আছে হুজুর। ৪৩ নম্বর আড়কাটীর নৌকাই আমার। এ বন্দরে ওর চেয়ে ভাল নৌকা আর পাবেন না।”
“বেশ দ্রুত যেতে পারবে ত?”
“ঘণ্টায় ৮।৯ মাইল করে’ চলে। আসুন না একবার দেখবেন চলুন।”
“চল।”
“দেখলেই আপনার মনে ধরবে। বুঝি সমুদ্রের মধ্যে একটু বেড়ানো-চেড়ানোর জন্যই নৌকাখানা চাই?”
“হাঁ তাই বটে। তবে ঠিক বেড়ানো নয়, তার চেয়ে একটু বেশী। এই ধর না—সমুদ্র―যাত্রা।”
“সমুদ্র―যাত্রা!”
“আমি ইয়োকোহামা যেতে চাই।”
নাবিক হতবুদ্ধি হইয়া মিঃ ফগের মুখের দিকে চাহিয়া কহিল, “হুজুর ঠাট্টা করছেন না ত?”
“না ঠাট্টা কেন। আমি কর্ণাটিক জাহাজ ধরতে পারি নাই। ১৪ই তারিখের মধ্যেই আমাকে ইয়োকোহামা পৌঁছিতে হ’বে। দেরি হ’লে চলবে না। সেখানে যেয়ে সান্ফ্রান্সিস্কোর জাহাজ ধরা চাই।”
“বড় দুঃখিত হচ্ছি―সেটা অসম্ভব।”
“আমি দিন ১০০০ টাকা ভাড়া দিব। আর যদি ঠিক সময়মত যেতে পায়, তাহ’লে আরো তিন হাজার টাকা পুরস্কার পাবে।”
“আপনি সত্যই যাবেন ত?”
“নিশ্চয়ই যাব।”
নাবিক একবার আকাশের দিকে চাহিল, আবার সেই অপার লবণাম্বুরাশির দিকে দৃষ্টিপাত করিল। শেষে চিন্তামগ্ন হইয়া ইতস্ততঃ পদচারণ করিতে লাগিল। একদিকে প্রভূত ধনরাশি, অপর দিকে জীবনের আশঙ্কা। তাহার মনের ভিতর একটা যুদ্ধ চলিতে লাগিল।
গোয়েন্দা ফিক্স তখন যেন কাঁটার উপর ঝুলিতেছিলেন! মিঃ ফগ আউদার দিকে চাহিয়া কহিলেন, “ছোট নৌকা, আপনার ভয় হ’বে না ত?”
“না। আপনার সঙ্গে যেতে আর ভয় কি।”
অনেক চিন্তার পর মাথার টুপী খুলিয়া ছড়ির অগ্রভাগে ঘুরাইতে ঘুরাইতে নাবিক আসিয়া কহিল, “আমার ছোট নৌকা, আমি অতদূর যেতে সাহস করি না। কি জানি—বলা যায় না—এখন ঝড়-তুফানের সময়। সকলেরই প্রাণ যেতে পারে। ইয়োকাহামাও কম দূর নয়—এখান থেকে ১৬৫০ মাইল। সময় মত বোধ হয় যেতেও পারা যাবে না।”
“১৬৫০ মাইল ত নয়, ১৬০০ মাইল।”
“ও একই কথা।”
এতক্ষণে ফিক্স গোয়েন্দা নিশ্বাস ফেলিয়া বাঁচলেন! নাবিক বলিতে লাগিল, “তবে এক কাজ করা যেতে পারে―”
এই সর্ব্বনাশ! নিরুদ্ধ নিশ্বাসে মিঃ ফিক্স নাবিকের মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন। ভাবিলেন, এ আপদ্ জুটিল কোথা হইতে!
মিঃ ফগ কহিলেন, “কি করতে চাও?”
“নাগাসিকি এখান থেকে ১১০০ মাইল, সাংঘাই ৮০০। সাংঘাই গেলে আমরা অনেকটা তীরের কাছ দিয়েই যেতে পারব। স্রোতের টানটাও পাব।”
“কিন্তু আমাকে যে ইয়োকোহামার আমেরিকার ডাক জাহাজ ধরতে হ’বে?”
“বেশ ত তাই হ’বে। সান্ফ্রান্সিস্কোর জাহাজ ত আর ইয়োকোহামা থেকে ছাড়ে না―সাংঘাই থেকেই ছাড়ে। যেতে যেতে ইয়োকোহামা আর নাগাসিকিতে দাঁড়ায়।”
“তুমি ঠিক জান ত?”
“ঠিক জানি।”
“কবে সাংঘাই থেকে ছাড়বে?”
“১১ই তারিখ সন্ধ্যাবেলা। তা’ হ’লেই ৪ দিন এখনো আছে। অর্থাৎ ৯৬ ঘণ্টা। যদি ঘণ্টায় ৮ মাইল করে’ যেতে পারি আর বাতাস থাকে, তা’ হ’লে আমরা ঠিক সময় মতই সাংঘাই পৌঁছিতে পারব।”
“তোমরা কখন রওনা হ’তে পারবে?”
এক ঘণ্টার মধ্যে। কিছু খাবার কিনে নিব আর নৌকার পালটা বাঁধব—এই যা দেরি।”
“তবে কথা ঠিক হ’ল? তোমারই ত নৌকা?”
“হাঁ আমারই নৌকা। আমার নাম জন্ বুন্স্বি। আমার নৌকার নাম তঙ্কাদিরি।”
“তুমি কি কিছু আগাম চাও?”
“যদি হুজুরের সুবিধা হয় দিতে পারেন।”
“এই ধর—তিন হাজার টাকা আছে।” মিঃ ফগ নাবিকের হস্তে কতকগুলি নোট দিলেন।
মিঃ ফিক্স নিকটেই ছিলেন। তাঁহার দিকে চাহিয়া ফগ কহিলেন, “মশায়, যদি ইচ্ছা করেন তা’ হলে—”
“ধন্যবাদ, ধন্যবাদ। আমিও আপনাকে বলব মনে করিয়াছিলাম।”
“তা হ’লে আধঘণ্টার মধ্যেই প্রস্তুত হচ্ছি।”
রাণী আউদা বিমর্ষ ভাবে কহিলেন, “আহা, চাকরটার কি করা যাবে?”
তাঁহাকে আশ্বস্ত করিয়া মিঃ ফগ বলিলেন, “আমার যা’ সাধ্য তা’ করব।”
তাঁহারা তখন পুলিশ আফিসে যাইয়া জিয়েনের চেহারার বর্ণনা লিপিবদ্ধ করাইলেন এবং তাহার অনুসন্ধানের ব্যয় ও গৃহে যাইবার পাথেয় বলিয়া কিছু অর্থও দিয়া আসিলেন।
বেলা তিনটার সময় তঙ্কাদিরি সমুদ্রযাত্রার অন্য প্রস্তুত হইল। নৌকা খানি ক্ষুদ্র বটে ৬০০ মণ বোঝাই লয়, কিন্তু খুবই দৃঢ় ও দ্রুতগামী। দেখিতেও বেশ পরিষ্কার, যেন একটী সমুদ্রবিহারী শ্বেতপক্ষী দুলিয়া দুলিয়া নৃত্য করিতেছে। নৌকার বাইচে তঙ্কাদিরিই ইতিপূর্ব্বে অনেক পুরস্কার পাইয়াছিল। বুন্স্বির অধীনে আরো ৪ জন মাল্লা ছিল। বুন্স্বি বেশ দৃঢ়কায়,উৎসাহী এবং দক্ষ মাঝি! তঙ্কাদিরি তাহার গৌরবের কারণ ছিল।
মিঃ ফগ ও রাণী আউদা জিনিষপত্র লইয়া নৌকায় উঠিলেন। ফিক্স গোয়েন্দা ইতিপূর্ব্বেই আসিয়াছিলেন। তাঁহাকে দেখিয়া ফগ কহিলেন। “আমি বড় দুঃখিত হচ্ছি যে এ নৌকায় আপনার থাকার ভাল বন্দোবস্ত করতে পারছিনে। কোন রকম করে’ এর মধ্যেই কাটাতে হ’বে।”
গোয়েন্দা মনে মনে বড়ই লজ্জিত হইলেন। দস্যুর আতিথ্য গ্রহণ করিয়া নিজেকে বড়ই খাটো বলিয়া মনে করিতে লাগিলেন। আপন মনে বলিলেন, “লোকটা দস্যুই হোক্, আর ফগই হোক, কিন্তু একান্ত বিনয়ী ও ভদ্র।” প্রতিমুহূর্ত্তেই তাঁহার আশঙ্কা ইতে লাগিল যদি হঠাৎ জিয়েন আসিয়া উপস্থিত হয়, তবেই ত সকল ভূর ভাঙ্গিয়া যাইবে!
গোয়েন্দার অদৃষ্ট সুপ্রসন্ন ছিল। বুন্স্বি তাহার তঙ্কাদিরির পাল তুলিয়া দিল। বাতাসে পাল ফুলিয়া উঠিল। দেখিতে দেখিতে তঙ্কাদিরি বন্দর ছাড়িয়া তীরের ন্যায় ছুটিতে লাগিল।
ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ
গুড়ুম্ গুড়ুম্ বুম্
মন একখানি ক্ষুদ্র তরণী আরোহণ করিয়া ৮০০ মাইল সমুদ্র-ভ্রমণ একান্ত বিপজ্জনক ছিল সন্দেহ নাই। বিশেষ তখন আবার ঝড়-তুফানের সময়। জন বুন্স্বি অর্থের লোভে এবং মিঃ ফগ বাজী জিতিবার প্রত্যাশায় সে বিপদ্ তুচ্ছ জ্ঞান করিলেন। ফগ কহিলেন, “মাঝি, যত তাড়াতাড়ি পার চালিয়ে যেতে হ’বে।”
“সেজন্য হুজুরের চিন্তা নাই। বুন্স্বি মাঝির উপর আপনি নির্ভর করে’ থাকতে পারেন। আমার যতদূর সাধ্য তার ত্রুটী হ’বে না।”
তঙ্কাদিরি বেশ বেগেই যাইতেছিল। মিঃ ফগ ডেকের উপর বসিয়া সেই সফেন তরঙ্গমালা দেখিতে লাগিলেন। রাণী আউদাও এক পার্শ্বে বসিয়া একটু ভীতচিত্তে সমুদ্র দর্শন করিতেছিলেন।
কিছুক্ষণ পরই সন্ধ্যা হইল। এদিকে আকাশেও তখন অল্প অল্প মেঘ-সঞ্চার হইতেছিল। বাতাস অপেক্ষাকৃত প্রবলবেগে বহিতে লাগিল। তঙ্কাদিরি যেন বাতাসকে পশ্চাৎ করিয়া তরঙ্গ হইতে তরঙ্গান্তরে ঝম্প দিতে দিতে অগ্রসর হইতেছিল। মিঃ ফগ তরণীর বেগ দেখিয়া আশ্বস্ত হইলেন। নাবিকগণ পুরস্কারের লোভে প্রাণপণে পরিশ্রম করিতে লাগিল।
প্রথম দুই দিবস নির্ব্বিঘ্নেই অতিবাহিত হইল। তৃতীয় দিন প্রভাত হইতেই আকাশের অবস্থা আশঙ্কাজনক হইয়া উঠিল। সমুদ্রের সুদূর দক্ষিণাংশে বিপুল জলোচ্ছ্বাস লক্ষিত হইতে লাগিল। মাঝি বুন্স্বি অনেকক্ষণ ধরিয়া চতুর্দ্দিক্ পর্য্যবেক্ষণ করিয়া মিঃ ফগকে কহিল—
“হুজুর, আমি একটা কথা বলতে চাই।”
“কি?”
“আমার আশঙ্কা হয় প্রবল ঝড় হ’বে।”
“কোন্ দিক্ থেকে? উত্তর, না দক্ষিণ?”
“দক্ষিণ থেকেই হবে বলে বোধ হয়। একটা ঘূর্ণি বাতাস আসছে।”
“ভালই হয়েছে। দক্ষিণের ঝড়ে আরো বেগে উত্তরে যাওয়ার সুবিধাই হবে!”
“হুজুর যদি সে কথা বলেন, তা হলে আমার আর কিছু জানাবার নাই।”
মাঝির সন্দেহ সত্য হইল। রাত্রি ৮ টার সময় দক্ষিণ হইতে প্রবল ঝড় বহিল। যেমন ভীষণ ঝড়, তেমনি মুষলধারে বৃষ্টি! তঙ্কাদিরি বাত্যাতাড়িত হইয়া এত বেগে চলিতে লাগিল যে, এক এক বার তরঙ্গস্পর্শ ত্যাগ করিয়া শূন্যে উত্থিত হইতে লাগিল। পর্ব্বত প্রমাণ তরঙ্গ আসিয়া সেই ক্ষুদ্র তরণীকে গ্রাস করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। কখনো বা তঙ্কাদিরি দুইটা বিশাল তরঙ্গের মধ্যে পড়িয়া নিমজ্জমান হইতে চলিল! কিন্তু ধন্য বুন্স্বির নৌচালন-কৌশল! তরঙ্গের পর তরঙ্গ আসিয়া তঙ্কাদিরিকে স্পর্শ করিতে লাগিল, তরণীগাত্রে ভীমবেগে আঘাত করিতে লাগিল, ক্ষুদ্র কুটার ন্যায় উহাকে শূন্যে উৎক্ষিপ্ত করিয়া পুনরার অতল-তলে টানিয়া লইতে চাহিল! কিন্তু তঙ্কাদিরি ডুবিল না, তুফানে নক্ষত্রবেগে অগ্রসর হইতে লাগিল।
ফিক্স গোয়েন্দা চতুর্দ্দিকের অবস্থা দেখিয়া ভাবিতে লাগিলেন, “কেন আসিলাম।” আউদা যদিও একান্ত ভীতা হইয়াছিলেন, কিন্তু ফিলিয়াস্ ফগের দিকে চাহিয়া সাহস সঞ্চয় করিতে লাগিলেন। মিঃ ফগ ভাবিতেছিলেন, “এমন না হ’লে, নৌকা বেগে যাইবে কিরূপে!”
এতক্ষণ ঝড়ের বেগ উত্তর দিকে ছিল, সন্ধ্যাসমাগমে উত্তর-পশ্চিম হইল। নিশাকালে সেই প্রবল ঝড় এত প্রবল হইল যে, বুন্স্বি অন্য নাবিকদিগের সহিত পরামর্শ করিয়া মিঃ ফগকে কহিল, “আমার বোধ হয় নিকটবর্ত্তী কোন বন্দরের দিকে যাওয়া উচিত। নতুবা বিপদ্ ঘটিবে।”
“আমারও তাই ভাল বলে’ বোধ হচ্ছে।”
“উত্তম। কোন্ বন্দরে যাওয়া যাবে হুজুর?”
“আমি ত শুধু একটাই চিনি।”
“সেটা কোথায় হুজুর?”
“সাংঘাই!”
উত্তর শুনিয়া মাঝি বুন্স্বি কিছুক্ষণ স্তম্ভিত ভাবে অপেক্ষা করিল, তাহার পর বলিল, “তাই হবে। আমরা সাংঘাই বন্দরেই যাব।”
তঙ্কাদিরি যেমন যাইতেছিল, তেমনি চলিল। রাত্রি যত অধিক হইতে লাগিল, তুফান ততই বাড়িতে আরম্ভ করিল। এমন দুর্য্যোগ বুঝি কেহ আর কখনো দেখে নাই। এমন বিকট জলভঙ্গরব, তরঙ্গের এমন ভীষণ পৈশাচিক নৃত্য, সাগরের এমন প্রলয়কারী রূপ বুঝি কেহ কখনো আর দেখে নাই! উন্মত্ত পবনের এমন বিকট হা হা ধ্বনি বুঝি কেহ কখনো আর শোনে নাই! তঙ্কাদিরি যে কেন নিমজ্জিত হইল না ইহাই বিস্ময়ের বিষয়।
তঙ্কাদিরি দুইবার ডুবিতে ডুবিতে বাঁচিয়া গেল বটে, কিন্তু উহার ছাদ প্রভৃতি সমস্তই উড়িয়া গেল! প্রভাতে বাতাসের বেগ কথঞ্চিৎ কমিল, কিন্তু উহা দক্ষিণপূর্ব্ব দিকে বহিতে লাগিল। বিপরীত তরঙ্গের আঘাতে তরীখানি টলমল করিতে লাগিল। মধ্যাহ্নে তুফান অনেক কমিয়া গেল—আকাশ অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার হইল। রাত্রি একরূপ মন্দ কাটিল না। প্রভাতে বুন্স্বি কহিল, “সাংঘাই এখনো ১০০ মাইল।” একদিনে এই শত মাইল পথ অতিক্রম করিতে না পারিলে জাহাজ ধরা অসম্ভব। বুন্স্বি চিন্তিত হইল।
ক্রমে বাতাস একেবারেই থামিয়া গেল। কয়েকদিনের অবিরাম সমরের পর একান্ত শ্রান্ত হইয়া সমুদ্র যেন সুপ্তিমগ্ন হইল। পালে আর বাতাস লাগে না! মধ্যাহ্নে দেখা গেল সাংঘাই ৪৫ মাইল দুরে! মিঃ ফগ হিসাব করিয়া দেখিলেন, আমেরিকার জাহাজ সাংঘাই বন্দর ছাড়িতে আর ছয়ঘণ্টা মাত্র বিলম্ব আছে।
বাতাস—বাতাস—আর একটু বাতাস! কাল এত ঝড় বহিয়াছিল, এত তরঙ্গ ছুটিয়াছিল, সেই ক্ষিপ্তসাগর এত গর্জ্জিয়াছিল, আজ কি তার কিছু থাকিতে নাই! তঙ্কাদিরি অত্যন্ত মন্দগতি হইয়া পড়িল। ফিলিয়াস্ ফগের যথাসর্ব্বস্ব তখন তঙ্কাদিরির উপর নির্ভর করিতেছিল। তিনি নির্ব্বাক্ নিস্পন্দ নিরুদ্বেগ হইয়া বসিয়া রহিলেন।
দেখিতে দেখিতে সন্ধ্যা ছয়টা বাজিল। আরক্তিম রবি সমুদ্রগর্ভে ঢলিয়া পড়িল। সাংঘাই তখনো তিন মাইলের পথ! মাঝি বুন্স্বি ক্ষোভে আর্ত্তনাদ করিয়া উঠিল, “আর হইল না―পুরস্কার পাইয়াও হারাইলাম।” সে তখন মিঃ ফগের দিকে কাতর দৃষ্টিতে চাহিল। মিঃ ফগ মাঝির মুখের দিকে একবার তাকাইলেন বটে, কিন্তু সে দৃষ্টি ধীর স্থির রোধকলঙ্কশূন্য—সে দৃষ্টির মধ্যে উদ্বেগের চিহ্ন পর্য্যন্ত ছিল না!
ওই যে একখানি জাহাজের ধূমোদ্গীরণ-নল দেখা যাইতেছে—ওই ত সেই নলমুখে ঘোরকৃষ্ণ ধূমরাশি বিনির্গত হইয়া বাতাসে ভাসিয়া যাইতেছে! এ তবে কোন্ জাহাজ বন্দর ছাড়িল! জাহাজ দেখিয়াই বুন্স্বি চিনিল উহা আমেরিকাযাত্রী জাহাজ! সে রোষে ও ক্ষোভে বলিয়া উঠিল, “জাহাজ অতল জলে ডুবিয়া যাক্।”
মিঃ ফগ নিতান্ত শান্তভাবে কহিলেন, “জাহাজকে ডাক।”
কুয়াসার মধ্যে সঙ্কেত করিবার জন্য তঙ্কাদিরির মুখের উপর একটী ক্ষুদ্র পিত্তলকামান সংযুক্ত ছিল। বুন্স্বি ক্ষিপ্রহস্তে বারুদ ঢালিয়া কামানের নল পূর্ণ করিল। সে তৎক্ষণাৎ বারুদে অগ্নিসংযোগ করিতে যাইতেছিল, তাহাকে বাধা দিয়া মিঃ ফগ কহিলেন “আগে বিপদ্জ্ঞাপক নিশান তোল।”