মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Rajendralal Acharya (†1961) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন
জিয়েন পোতাধ্যক্ষকে লইয়া আসিল। তিনি ক্ষুধিত ব্যাঘ্রের মত মিঃ ফগের নিকট আসিয়া উপস্থিত হইলেন। যেন একটা ভীষণ বোমা সহসা তথায় পতিত হইল, এখনই ফাটিয়া সর্ব্বনাশ ঘটাইবে!
নিকটে আসিয়াই অধ্যক্ষ বজ্র-গম্ভীর স্বরে মিঃ ফগকে জিজ্ঞাসা করিলেন—
“আমরা এখন কোথায় আছি?”
“লিভারপুল থেকে ৭৭০ মাইল দুরে।”
উত্তর শুনিয়াই অধ্যক্ষের আপাদ-মস্তক জ্বলিয়া উঠিল। তিনি গর্জ্জন করিয়া কহিলেন,—
“তবে রে জলদস্যু!”
“মশায়, আমি ত আগেই বলেছিলাম লিভারপুল চলুন।”
অধ্যক্ষ আরো ভীষণ কণ্ঠে কহিল,—
“দস্যু কোথাকার!”
মিঃ ফগ শান্তভাবে বলিলেন,—
“আপনার জাহাজখানা আমার কাছে বিক্রয় করুন।”
“কখনো না।”
“যদি বিক্রয় না করেন তা’ হ’লে আমি বাধ্য হয়েই জাহাজখানা পুড়িয়ে ফেলবো!”
“কি! আমার জাহাজ পোড়াবেন?”
“পোড়াব বই কি? অন্ততঃ উপরকার যা’ কিছু কাঠের জিনিষ আছে সবই পোড়াতে হবে। জাহাজের কয়লা ফুরিয়েছে! আমার ত যাওয়া চাই!”
অধ্যক্ষ পরুষকণ্ঠে কহিলেন, “আমার জাহাজ পোড়াবেন! জাহাজের দাম কত জানেন? নগদ একলাখ টাকা!
“এই নিন, আমি দেড় লাখ দিচ্ছি!” মিঃ ফগ অবিলম্বে কতকগুলি ব্যাঙ্কনোট কুপিত অধ্যক্ষের পকেটের মধ্যে ফেলিয়া দিলেন।
নগদ দেড় লক্ষ মুদ্রা! অধ্যক্ষের হৃদয়মধ্যে তরঙ্গ উঠিল। রোষ, ক্ষোভ, অসন্তোষ সমস্তই মুহূর্ত্তে ভাসিয়া গেল। তিনি দেখিলেন, হেন্রিয়েটার বয়স প্রায় বিংশবর্ষ অতিক্রম করিয়াছে। ইহার পরিবর্ত্তে যদি এত অর্থ হস্তগত হয় তবে আর চিন্তা কি। অধ্যক্ষ সম্মত হইলেন কোমল কণ্ঠে কহিলেন,―
“খোলটা বোধ হয় আমারই থাকবে?”
“হাঁ। খোল এবং এঞ্জিন আপনার। কেমন রাজি ত?”
“রাজি।”
জিয়েন ও ফিক্স গোয়েন্দা অবাক্! কি ভয়ানক কথা! চক্ষের নিমেষে দেড় লক্ষ মুদ্রা উড়িয়া গেল—অথচ জাহাজের খোল এবং কল অধ্যক্ষেরই রহিল! গোয়েন্দার দৃঢ় বিশ্বাস হইল ইংলণ্ডের ব্যাঙ্ক হইতে নিশ্চয়ই সাড়ে আটলক্ষ টাকা চুরি হইয়াছে। মিঃ ফগই সেই দস্যু!
অধ্যক্ষ নোটগুলি গণনা করিয়া পকেটে রাখিলে পর মিঃ ফগ কহিলেন, “কাপ্তান! আমার কার্য্যে বিস্মিত হবেন না। যদি আমি ২১শে ডিসেম্বর লণ্ডনে পৌঁছিতে না পারি, তা হ’লে তিন লক্ষ মুদ্রার বাজি হারব। আপনি ত জানেন আমি নিউইয়র্কে লিভারপুলের জাহাজ ধরতে পারি নাই। আপনিও প্রথমে আমাকে লিভারপুল নিয়ে যেতে সম্মত হলেন না—”
বাধা দিয়া কাপ্তান বলিলেন, “আমি ত ভালই করেছিলাম। যদি বাধা না দিতাম তা হ’লে কি আর আজ দেড় লাখ টাকা পাই! তবে কি জানেন কাপ্তান—”
আমার নাম ফগ। তবে জাহাজখানা এখন আমার?”
“নিশ্চয়ই আপনার। ওর যত কাঠ-পাট আছে সবই আপনার।”
“উত্তম। অনুগ্রহ করে কাঠ গুলো সব কাটতে আরম্ভ করুন।”
জাহাজের শুষ্ক কাষ্ঠগুলি তখন কয়লার পরিবর্ত্তে ব্যবহৃত হইতে লাগিল। সেই দিনই হেন্রিয়েটার কামরাগুলি, ডেকের কতকাংশ এবং পশ্চাতের ডেক প্রভৃতি পুড়িয়া ভস্ম হইয়া গেল!
পরদিন ১৯শে ডিসেম্বর। সে দিন জাহাজের মাস্তুল এবং দীর্ঘকাঠ গুলি সমস্তই দগ্ধ করা হইল! নাবিকগণ প্রাণপণে জাহাজ চালাইতে লাগিল। জিয়েন বিপুল উৎসাহে একাই দশজনের কাঠ কাটিতে আরম্ভ করিল। মিঃ ফগ আদেশ দিলেন,—
“চালাও চালাও—জাহাজ চালাও!”
পরদিন হেন্রিয়েটার উপরাংশের যাহা কিছু কাঠ সমস্তই নিঃশেষিত হইল—কেবল খোলটি মাত্র অবশিষ্ট রহিল! আর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লিভারপুলে যাওয়াই চাই! নারিকগণ যথাশক্তি চেষ্টা করিতে লাগিল।
দূরে কুইন্স্ টাউনের আলোক দেখিয়া কাপ্তেন কহিলেন, “মিঃ ফগ, আমি ত আর কোনো ভরসা দেখি না? এই সবে আমরা কুইন্স্ টাউন ছাড়ছি। এখনো অনেক দূর যেতে হবে। আপনার গ্রহ অপ্রসন্ন―কি করবো বলুন!”
মিঃ ফগ বলিলেন, “ওই যে আলোকমালা দেখা যাচ্ছে, ওই কি কুইন্স্ টাউনের আলোক?”
“হাঁ।”
“আমরা কতক্ষণে বন্দরে যেতে পারবো?”
“তিনটার আগে নয়। জোয়ার চাই।”
কোনরূপ চাঞ্চল্য প্রকাশ না করিয়া মিঃ ফগ কহিলেন, “তবে এখন অপেক্ষা করা যাক্।”
একাদশ পরিচ্ছেদ
বিনা মেঘে বজ্রাঘাত
ইন্স্ টাউন বন্দরে আমেরিকার ডাক নামিত। একখানা অতি দ্রুতগামী ট্রেণে সেই ডাক ডব্লিন নগরে প্রেরিত হইত। ডব্লিনে ডাক লইবার জন্য লিভারপুলের ষ্টীমার প্রস্তুতই থাকিত। মিঃ ফগ হিসাব করিয়া দেখিলেন, সেই পথে গেলে তিনি নির্দ্দিষ্ট কালের দ্বাদশ ঘণ্টা পূর্ব্বেই লিভারপুলে যাইতে পারিবেন, এবং অনায়াসে আটটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটের সময় লণ্ডনে পৌঁছিবেন।
রাত্রি একটার সময় হেন্রিয়েটা কুইন্স্টাউন বন্দরে নোঙ্গর করিল। মিঃ ফগ কাল বিলম্ব না করিয়া ট্রেণে উঠিলেন এবং পরদিন বেলা এগারটা চল্লিশ মিনিটের সময় লিভারপুলে উপনীত হইলেন।
লিভারপুল হইতে লণ্ডন ছয় ঘণ্টার পথ। ট্রেণেরও অভাব ছিল না। মিঃ ফগ বুঝিলেন, বিজয় সুনিশ্চিত। জিয়েন আনন্দে নৃত্য করিয়া উঠিল। গোয়েন্দা ফিক্স সেই সময়ে মিঃ ফগের স্কন্ধে হস্ত স্থাপন করিয়া কহিলেন—
“সত্যই কি আপনার নাম ফিলিয়াস্ ফগ?”
“হাঁ।”
“তবে রাজার নামে আমি আপনাকে গ্রেপ্তার করলেম!”
ফিলিয়াস্ ফগ বন্দী হইলেন। তাঁহার মস্তকে আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল! গোয়েন্দা ফিক্স তাঁহাকে কাষ্টম্স্ গৃহের কারাকক্ষে আবদ্ধ করিয়া রাখিলেন!
যদি পুলিশে বাধা না দিত তাহা হইলে জিয়েন নিশ্চয়ই তন্মুহূর্ত্তে গোয়েন্দাকে আক্রমণ করিত। তাহার হৃদয় ক্ষোভে ভাঙ্গিয়া পড়িল। হায় হায়! সে যদি পূর্ব্বেই মিঃ ফগকে গোয়েন্দার পরিচয় দিত, তাহা হইলে ত এমন ঘটিত না! জিয়েন ভাবিতে লাগিল, মৃত্যুই আমার উপযুক্ত প্রায়শ্চিত্ত। রাণী আউদাকে দেখিয়া মনে হইতে লাগিল তিনি যেন এইমাত্র শ্মশান-শয্যা হইতে উঠিয়া আসিলেন।
যখন নিশ্চিন্তে বাজি জিতিয়া মিঃ ফগ গৌরবের জয়মাল্য কণ্ঠে ধারণ করিতে যাইতেছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্ত্তেই তাঁহার সর্ব্বনাশ ঘটিল! ধন, সম্পদ, যশঃ সমস্তই এক নিমিষে ভাসিয়া গেল! ফিলিয়াস্ ফগ ভিখারী হইলেন! হায় হায়! তখনো ৮ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট সময় ছিল। লণ্ডনে পৌঁছিতে ছয় ঘণ্টার অধিক লাগিত না! বিনামেঘে নিদারুণ বজ্রাঘাত হইল!
মিঃ ফগ তাঁহার কারাকক্ষের মধ্যে নীরবে বসিয়া রহিলেন। তাঁহার হৃদয়মধ্যে যে তরঙ্গ খেলিতেছিল তাহা বাহিরে আত্ম-প্রকাশ করিল না। সঙ্গীরা দেখিলেন, মিঃ ফগ যেমন শান্ত, যেমন অবিচলিত, যেমন দৃঢ়, ঠিক তেমনই আছেন। এই ভীষণ দুর্ঘটনাতেও কেহ তাঁহার কোন পরিবর্ত্তন লক্ষ্য করিতে পারিল না! তবে কি তখনো তিনি ভাবিতেছিলেন যে বাজি জয় করিবেন!
সকলেই দেথিল তিনি তাঁহার ঘড়িটা সম্মুখস্থিত টেবিলের উপর রাখিয়া একদৃষ্টে উহার দিকে চাহিয়া আছেন। যেন একমনে সেকেণ্ড, মিনিট প্রভৃতি গণনা করিতেছেন। তাঁহার নয়নদ্বয় তখন অত্যন্ত উজ্জ্বল দেখাইতেছিল। সে নয়নে কি যে একটা ভাব প্রকাশিত হইতেছিল তাহা কেহ বলিতে পারে না। কিন্তু ইহা নিশ্চিতই যে তাহা অস্বাভাবিক এবং ভীষণ! তিনি কি তবে পলায়ন করিবার সুযোগ সন্ধান করিতেছিলেন? তাহা হইতে পারে। নতুবা আসন পরিত্যাগ করিয়া পুনঃ পুনঃ উঠিবেন কেন? তিনি কি বুঝিতে পারেন নাই যে, সে কক্ষের দ্বার—সে গৃহের গবাক্ষ ভগ্ন করিয়া পলায়ন মনুষ্য-সাধ্যাতীত!
ঘুরিতে ঘুরিতে ক্লান্ত হইয়া ফিলিয়াস্ ফগ একখানি চেয়ারে উপবেশন করিলেন এবং পকেট হইতে রোজ নামচার পাতাখানি বাহির করিয়া পাঠ করিলেন—“২১শে ডিসেম্বর, শনিবার—লিভারপুল।”
মিঃ ফগ তন্নিম্নে লিখিলেন—
“৮০ দিনের দিন বেলা ১১টা ৪০ মিনিট।”
ফিলিয়াস্ ফগ নির্ব্বাক্ হইয়া নীরবে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। কাষ্টম্স্ গৃহের ঘড়িতে টং করিয়া বেলা ১টা বাজিল। মিঃ ফগ দেখিলেন তাঁহার নিজের ঘড়ী ২ মিনিট অগ্রগামী।
দুইটা বাজিল। যদি তখনো তিনি মুক্তি পাইতেন এবং একখানি দ্রুতগামী এক্সপ্রেস ট্রেণ ধরিতে পারিতেন, তাহা হইলেও তাঁহার জয় হইত!
পনের মিনিট গেল—কুড়ি মিনিট গেল—অর্দ্ধঘণ্টা অতীত হইল! আর ভরসা নাই!
অকস্মাৎ ও কিসের শব্দ হইল! ঝন্―ঝন্—ঝনাৎ! কারাকক্ষের রুদ্ধদ্বার সহসা মুক্ত হইল। রাণী আউদা গোয়েন্দা ফিক্স ও জিয়েন দৌড়াইয়া কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিলেন।
গোয়েন্দা ব্যগ্র ভাবে কহিলেন “মিঃ ফগ, ক্ষমা করুন—ক্ষমা করুন। ভুলে আপনাকে ধরা হয়েছিল! আসল চোর ধরা পড়েছে! আপনার চেহারার সঙ্গে তার চেহারার মিল ছিল বলেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে! আপনি মুক্ত―আপনি মুক্ত! “
ফিলিয়াস্ ফগ কারামুক্ত হইলেন। তিনি ধীর পদবিক্ষেপে মিঃ ফিক্সের দিকে অগ্রসর হইয়া একবার মুহূর্ত্তের জন্য তাঁহার মুখের দিকে চাহিলেন। পরক্ষণেই তাঁহার একটা ভীষণ মুষ্ট্যাঘাতে গোয়েন্দা ফিক্স কক্ষতলে পতিত হইলেন!
বাক্য বিনিময় না করিয়া মিঃ ফগ সঙ্গিগণ সহ একখানি গাড়ীতে উঠিলেন এবং অবিলম্বে রেলষ্টেশনে উপনীত হইলেন।
মিঃ ফগের দুর্ভাগ্য! ষ্টেশনে পৌঁছিয়াই শুনিলেন লণ্ডনের ট্রেণ ২টা ৫ মিনিটের সময় চলিয়া গিয়াছে! তখন আর কোনো ট্রেণও ছিল না!
ফিলিয়াস্ ফগ অবিলম্বে একখানি স্পেশাল ট্রেণের বন্দোবস্ত করিলেন। ট্রেন প্লাটফরমে আসিয়া দাঁড়াইল। ফগ ড্রাইভারকে পুরস্কারের লোভ দেখাইয়া গাড়ীতে উঠিলেন।
ড্রাইভার চেষ্টার ত্রুটি করিল না। কিন্তু ট্রেণ যখন লণ্ডনে আসিয়া পৌঁছিল তখন ষ্টেশনের ঘড়ীতে ৮টা বাজিয়া ৫০ মিনিট হইয়া গিয়াছে!
সমস্ত পৃথ্বী পর্য্যটন করিয়া প্রত্যাবর্ত্তন করিতে ফিলিয়াস্ ফগের অবশেষে ৫ মিনিট বিলম্ব হইয়া গেল!
তাঁহার পরাজয় ঘটিল!
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
রাণী আউদা
ণ্ডনে পৌঁছিয়া ফিলিয়াস্ ফগ আপনার গৃহে প্রস্থান করিলেন, ক্লাবে গেলেন না। এই সুদীর্ঘ পর্য্যটন নির্ব্বিঘ্নে সম্পন্ন করিয়া, শতবাধা শতবিঘ্ন অনায়াসে অতিক্রম করিয়া শেষ মুহূর্ত্তে অপরের দোষে পরাজয় যে কি ভীষণ মর্ম্মচ্ছেদী তাহা অন্যে বুঝিতে পারিবে না। কিন্তু মিঃ ফগ ধৈর্য্য অবলম্বন করিলেন। তাঁহার যথাসর্ব্বস্ব তখন বারিংএর গদিতে গচ্ছিত ছিল। সে অর্থ তখন আর তাঁহার নহে, উহা তখন সংস্কার-সমিতির সদস্যদিগের। খরচ-পত্র বাদে তাঁহার হস্তে যাহা কিছু সামান্য অর্থ ছিল, মিঃ ফগ দেখিলেন তাহা লইয়াই কোন প্রকারে জীবন যাপন করিতে হইবে।
তিনি তাঁহার গৃহের একটী কক্ষ রাণী আউদার জন্য ছাড়িয়া দিলেন।
জিয়েন শুনিয়াছিল অনেক সময় এরূপ দুর্দ্দশায় পতিত হইলে নিরাশ মানব আত্মহত্যা করিয়া সকল যন্ত্রণার হস্ত হইতে মুক্তিলাভ করে। পাছে মিঃ ফগ তেমন একটা কিছু করিয়া বসেন এই জন্য সে সর্ব্বদা সতর্ক থাকিতে লাগিল।
তাহার কক্ষের গ্যাসের আলোক তখনো জ্বলিতেছিল, সে আর কাল বিলম্ব না করিয়া বাতিটা নির্ব্বাপিত করিল।
ক্রমে রাত্রি আসিল। রজনী গভীরা হইল। সকলেই শয়ন করিলেন। মিঃ ফগ নিদ্রা গিয়াছিলেন কি না কেহ বলিতে পারে না। রাণী আউদা সমস্ত রাত্রি ভাবিয়া জাগিয়া কাঁদিয়া কাটাইয়াছিলেন। আর জিয়েন? সে অনুরক্ত ভৃত্যের ন্যায় প্রভুর দ্বারদেশে বিনিদ্র-নয়নে বসিয়া ছিল।
পরদিন প্রভাতে মিঃ ফগ ভৃত্যকে ডাকিয়া কহিলেন; “রাণী আউদার প্রাতরাশের বন্দোবস্ত কর। বলে এসো আজ সন্ধ্যার সময় আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই।”
জিয়েনের হৃদয় তখনো বেদনায় মথিত হইতেছিল। তাহার কর্ত্তব্যবুদ্ধি তাহাকে কেবলই বলিতে লাগিল ‘রে হতভাগ্য! তোর দোষেই ত সোনার সংসার শ্মশান হ’লো! মিঃ ফগকে আগে একটু সতর্ক করলেই ত এমন ঘটিত না।’ জিয়েন আর নীরব থাকিতে পারিল না। বাষ্পনিরুদ্ধ কণ্ঠে কহিল, “প্রভু, আপনার দুর্দ্দশার জন্য আপনি আমাকে অভিসম্পাত করুন। আমার দোষেই ত—”
গম্ভীর অথচ শান্ত কণ্ঠে মিঃ ফগ উত্তর করিলেন, “আমার দুর্দ্দশার জন্য আমি কাহাকেও দোষী করি না। তুমি আপনার কাজে যাও।”
জিয়েন প্রস্থান করিল এবং রাণী আউদার নিকট যাইয়া সকল কথা নিবেদন করিতে করিতে দুঃখে বালকের মত রোদন করিতে লাগিল। কহিল, “আমি কিছুতেই প্রভুর মন শান্ত করতে পারলেম না। আপনি একটু বুঝিয়ে বল্লে তিনি হয়ত শুনবেন।”
“তুমি বল্লে না, আজ সন্ধ্যার সময় তিনি আমার সঙ্গে দেখা করবেন বলেছেন?”
“হাঁ তাই ত তিনি বলেছেন। বোধ হয় আপনার ইংলণ্ডে থাকা সম্বন্ধেই কথা হবে।”
“তা হ’তেও পারে।”
জিয়েন কার্য্যান্তরে বিদায় হইল। রাণী আউদা নীরবে অশ্রু বিসর্জ্জন করিতে করিতে নিজের ও মিঃ ফগের বিষয় চিন্তা করিতে লাগিলেন। মিঃ ফগের পরাজয়ের সকল দোষ নিজের উপর আরোপ করিয়া তিনি আরো বেদনা-পীড়িত হইলেন। মনে মনে ভাবিলেন মিঃ ফগের উপর একটা বোঝার মত না থাকিলে, ফগ হয়ত অবলীলাক্রমে বাজি জয় করিতে পারিতেন। তাঁহার জন্যই ত বোম্বাইয়ের পথে দুই দিন বিলম্ব হইয়াছিল!
মিঃ ফগ সেদিন আর সংস্কার-সমিতিতে গেলেন না। কেনই বা যাইবেন? তিনি সমস্ত দিন কক্ষদ্বার রুদ্ধ করিয়া আপনার ভবিষ্যৎ কর্ত্তব্য স্থির করিতেছিলেন। জিয়েন মুহূর্ত্তের জন্যও সে রুদ্ধদ্বার ত্যাগ করিল না। কক্ষমধ্যে সামান্য একটু শব্দ হইবা মাত্রই সে উৎকর্ণ হইয়া শুনিতেছিল—বুঝি বা কোন দুর্ঘটনা ঘটিল। দ্বারসংলগ্ন তালার ছিদ্রপথে সে মধ্যে মধ্যে গৃহের ভিতর দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া মিঃ ফগকে দেখিয়া লইতেছিল।
ক্রমে সন্ধ্যা হইল। সাড়ে সাতটার সময় মিঃ ফগ রাণী আউদার কক্ষমধ্যে আসিয়া প্রজ্বলিত অগ্নির পার্শ্বে একখানি চেয়ারে উপবেশন করিলেন। যে দিন তিনি আপন গৃহদ্বার রুদ্ধ করিয়া, কত আশা কত উৎসাহ হৃদয়ে লইয়া পৃথিবী-পর্য্যটনে বহির্গত হইয়াছিলেন, সে দিনও তিনি যেমন ছিলেন—পর্য্যটনে পরিশ্রান্ত ভগ্নহৃদয় বিনষ্টসর্ব্বস্ব মিঃ ফগ আজিও ঠিক তেমনিই দেখাইতেছিলেন। তেমনি ধীর—তেমনি স্থির—তেমনি শান্ত—শৈলসদৃশ তেমনি অটল!
কিছুক্ষণের জন্য নীরব থাকিয়া তিনি রাণী আউদাকে কহিলেন—“আপনাকে ইংলণ্ডে এনে বড় অপরাধ করেছি। সে জন্য ক্ষমা ভিক্ষা করছি।”
আউদার হৃদয় অতিমাত্র চঞ্চল হইয়া উঠিল। মিঃ ফগের মুখে―তাঁহার জীবনদাতা রক্ষাকর্ত্তার মুখে―মার্জ্জনা ভিক্ষা? তিনি কোন প্রকারে হৃদয়বেগ রুদ্ধ করিয়া কহিলেন, “কে ক্ষমা ক’রবে? আমাকে বল্ছেন?”
“আমার আর একটু বলতে বাকি আছে—অনুগ্রহ করে’ শুনুন। আমি যখন আপনাকে এখানে আসতে বলি, তখন আমার অর্থের অভাব ছিল না। আমি ভেবেছিলাম সেই অর্থের একাংশ আপনার জন্য ব্যয় করবো। আপনি তা’ হ’লে স্বাধীনভাবে স্বচ্ছন্দে থাকতে পারতেন। আপনি ত জানেন এখন আমার সব গেছে!”
“মিঃ ফগ, আমি সবই জানি। আপনার সঙ্গে সঙ্গে একটা ভারি বোঝার মত আসাটাই আমার অন্যায় হয়েছে! আমিই সে জন্য আপনার নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করছি। আমিই ত আপনার ক্ষিপ্রগতির অন্যতম বাধা ছিলাম। পথে আপনার কত বিলম্বই না ঘটিয়েছি। তা না হ’লে আজ কি এমন দুর্দ্দশা হয়! আমি তপ্ত অনলে পুড়ে মরছিলেম—সেই ছিল ভাল!”
“আপনার জন্য আমার একদিনও বিলম্ব ঘটে নাই। সে জন্য আপনি দুঃখিত হবেন না। আপনি ভারতবর্ষে নির্ব্বিঘ্নে থাকতে পারতেন না। একবার যারা আপনাকে জীবন্তে বন্ধ করতে চেয়েছিল, তারাই আবার আপনাকে খুঁজে বাহির করতো!”
“আপনি পরম দয়ালু, তাই সেই বিপদ্ থেকে আমাকে উদ্ধার ত করেইছিলেন, অপরিচিত দেশে এসে আমি যাতে স্বাধীনভাবে সুখে দিন কাটাতে পারি, তারও আবার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন?”
“চেয়েছিলাম সত্য, কিন্তু আমার অদৃষ্ট সব ওলট-পালট করে’ দিলে! যা হোক্ আমার যা কিছু এখনো আছে তাই আমি আপনার হাতে দিতে চাই।”
“তা হলে আপনার কি করে’ চলবে?”
“আমার জন্য ভাববেন না। আমার অভাব কিসের?”
“আপনি বোধ হয় আপনার ভবিষ্যতের দিকে তেমন করে তাকাচ্ছেন না?”
“আমি সকল অবস্থাকেই যে চক্ষে দেখতে অভ্যস্ত, আমার ভবিষ্যৎকেও সেই চক্ষেই দেখছি।”
আপনার কোন অসুবিধা বা অভাব হয়, আপনার বন্ধু-বান্ধবেরা তেমন কিছু আপনাকে করতে দিবেন কেন?”
“আমার কোন বন্ধু-বান্ধব নাই।”
“না থাকতে পারে। আত্মীয়-স্বজন?”
“এখন আর আমার কোন আত্মীয়-স্বজনও নাই।”
“মিঃ ফগ, আপনার জন্য আমার বড় দুঃখ হচ্ছে। জীবনে একা―এ বড় কষ্টের কথা! দুঃখের অশ্রুটী মুছিয়ে দিতে পারে এমন কি আপনার কেউ নাই?”
“না।”
“লোকে কথায় বলে, দুঃখের বোঝা নেবার যদি অংশীদার থাকে তা হ’লে, সে বোঝা যতই কেন ভার হোক্ না, অনায়াসে ঘাড়ে নিতে পারা যায়।”
“আমিও সে কথা শুনেছি।”
রাণী আউদা সহসা আসন ত্যাগ করিয়া উঠিলেন এবং আপন দক্ষিণ কর বাড়াইয়া দিয়া বলিলেন, “মিঃ ফগ, একাধারে আত্মীয়া এবং বন্ধু পেতে কি আপনার সাধ হয়? আপনি কি আমায় স্ত্রী বলে গ্রহণ করবেন?”
মিঃ ফগও আসন ত্যাগ করিয়া উঠিয়াছিলেন। তাঁহার ওষ্ঠদ্বয় ঘন ঘন কম্পিত হইতে লাগিল— নয়নদ্বয় অসাধারণ ঔজ্জ্বল্য লাভ করিল। আউদা তাঁহার দিকে স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন। সে দৃষ্টির ভিতর দিয়া রমণীর প্রেম, বাঞ্ছিতের জন্য সর্ব্বস্ব দানের সুদৃঢ় পণ যেন ফুটিয়া বাহির হইতেছিল। সে দৃষ্টি কত কোমল কত সুন্দর কত সরল।
মিঃ ফগ আর আউদার দিকে চাহিতে পারিলেন না। তাঁহার, নয়নদ্বয় মুদ্রিত হইয়া আসিল। তাঁহার কণ্ঠ বাক্য বিস্মৃত হইল। কিছুক্ষণ পরে ধীর অথচ দৃঢ় কণ্ঠে কহিলেন, “রাণী আউদা, ধর্ম্ম সাক্ষী করে বলতে পারি, আমি আপনাকে প্রাণাপেক্ষা অধিক ভালবাসি। জীবনে মরণে আমি আপনার।”
* * * *
মিঃ ফগ ডাকিলেন, “জিয়েন!”
জিয়েন কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিয়াই সমস্ত বুঝিতে পারিল। তখনো মিঃ ফগ আবেগপূর্ণ হৃদয়ে আপন করমধ্যে রাণী আউদার সুকোমল কর রক্ষা করিতেছিলেন। ফিলিয়াস্ ফগ ডাকিলেন, “জিয়েন!”
“আজ্ঞা।”
“মেরিলি বোন গির্জ্জার পুরোহিতকে এখনই বিবাহের সংবাদটা দিতে হবে। এখনো বেশী রাত হয় নি।”
হৃষ্টচিত্তে জিয়েন কহিল, “এ সংবাদের কি আর সময় অসময় আছে! এই ত সবে ৮টা বেজে পাঁচ মিনিট। কাল সোমবার। কালই কি বিবাহ হবে?”
মিঃ ফগ আউদার দিকে চাহিলেন।
ব্রীড়া-বিনম্র ভাবে রাণী উত্তয় দিলেন, “তাই হোক্।”
জিয়েন মুক্ত মৃগের ন্যায় ক্ষিপ্রচরণে পুরোহিতের নিকট গমন করিল।
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ
“আমি এসেছি”
তেরই ডিসেম্বর যখন এডিনবরা নগরে ইংলণ্ডের ব্যাঙ্কদস্যু ধৃত হইল, তখন পুনরায় একটা হৈ চৈ পড়িয়া গেল। তিন দিন পূর্ব্বেই মিঃ ফগের নাম কলঙ্কমলিন হইয়াছিল। তিনি একজন সাধারণ দস্যু বলিয়া সর্ব্বত্র পরিচিত হইয়াছিলেন। মুহূর্ত্তে সে কলঙ্ক-লেখা বিলুপ্ত হইয়া গেল। তখন আবার ফিলিয়াসের নাম লোকের মুখে মুখে ফিরিতে লাগিল। ফিলিয়াসের পৃথিবী পর্য্যটনের উপর পুনরায় বাজি ধরা আরম্ভ হইল। সকল সংবাদপত্রেই নিয়মিতরূপে তাঁহার সম্বন্ধে আলোচনা হইতে লাগিল।
সংস্কার সমিতির সদস্যগণ বিশেষ উদ্বিগ্ন হইয়া কাল কাটাইতেছিলেন। মিঃ ফগ কি আর প্রত্যাবর্ত্তন করিবেন? কৈ তাঁহার ত কোন সংবাদই পাওয়া যায় না। তাঁহার যাত্রাপথের সকল স্থানেই ত টেলিগ্রাফের বন্দোবস্ত আছে। তিনি ইচ্ছা করিলেই ত তারে সংবাদ দিতে পারিতেন। তবে বুঝি তিনি ৮০ দিনে পৃথিবী-পর্য্যটনের চেষ্টা ত্যাগ করিয়া থাকিবেন! এমন অসম্ভব ব্যাপার কখনও সম্ভব হইবে না বুঝিতে পারিয়া তিনি হয় ত সাধারণ পর্য্যটকের ন্যায় ধীরে ধীরে দেশ ভ্রমণ করিয়া বেড়াইতেছেন!
আমেরিকা, এসিয়া, চীন, জাপান, ভারতবর্ষ প্রভৃতি নানাস্থানে প্রতিদিন টেলিগ্রাম প্রেরিত হইতে লাগিল, কিন্তু মিঃ ফগের কোন সন্ধান হইল না। পুলিশ-বিভাগ হইতে গোয়েন্দা ফিক্সের অনুসন্ধান আরম্ভ হইল—কিন্তু তাহার কথাও কেহ বলিতে পারিল না।
ফগ এবং ফিক্স তবে কোথায় গেলেন! ইংলণ্ডের প্রতি ভোজনাগারে, পানাগারে, প্রতি সংবাদপত্রে, চা-পানের কক্ষে এই একই কথাই আলোচিত হইতে লাগিল। তাঁহারা যেখানেই থাকুন, মিঃ ফগের উপর বাজি ধরা বন্ধ হইল না। বাজির পণ অতি-মাত্রায় বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইল।
শনিবার। ২১শে ডিসেম্বর। সন্ধা হইতে না হইতেই শত সহস্র লোক পল্মলে সমবেত হইল। কত লোক সংস্কার-সমিতির গৃহ ঘিরিয়া ধরিল। সকলেরই মুখে এক কথা, “আজ মিঃ ফগের আসিবার দিন।” রাজপথে এমন জনতা হইল যে, গাড়ী, ঘোড়া, ট্রাম সমস্তই বন্ধ হইয়া গেল! তখনো লোকে বিবাদ, বিচার, বিতর্ক করিতে ক্ষান্ত হইয়াছিল না। তখনো বাজি ধরা সমানেই চলিতেছিল! রাজপথে কাহার কোন্ বিপদ্ ঘটে, সেই জন্য পুলিশ হইতে বিশেষ বন্দোবস্ত করা হইল। লোকের উপর লোক—তাহার উপর আবার লোক! চারিদিকে গণ্ডগোল, কোলাহল এবং ছুটাছুটি! তখন সন্ধ্যা হইয়াছিল।
সংস্কার-সমিতির সদস্যগণ সন্ধ্যার প্রাক্কালেই সমিতির কক্ষমধ্যে সমবেত হইয়াছিলেন। আটটা বাজিয়া কুড়ি মিনিটের সময় এঞ্জিনিয়ার আন্দ্রু ষ্টুয়ার্ট কহিলেন, “ভদ্রমহোদয়গণ! আর ২৫ মিনিট পরেই ত নির্দ্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হইবে। কৈ মিঃ ফগ ত এখনো আসিলেন না?”
ফ্ল্যামাগেন জিজ্ঞাসা করিলেন, “লিভারপুলের শেষ ট্রেণ ক’টায় লণ্ডনে আসে?”
রাল্ফ কহিলেন, “সাতটা তেইশ মিনিটে। তার পরের ট্রেণ দ্বিপ্রহর রজনীর পূর্ব্বে আসে না।” মিঃ ষ্টুয়ার্ট তখন বলিতে লাগিলেন,—
“তা হলেই দেখুন, মিঃ ফগ যদি সেই ৭ টা ২৩ মিনিটের ট্রেণেই আসতেন, তা হলে এতক্ষণ আমরা তাঁকে নিশ্চয়ই এখানে পেতাম। কাজেই বাজিটা আমারই জিত।”
ফলেন্টিন্ কহিলেন, “অত ব্যস্ত হবেন না। মিঃ ফগের রীতিনীতি ত আপনাদের জানাই আছে। তাঁর মাথাটা তেমন ঠিক থাকে না বটে, কিন্তু তিনি যে সকল কাজই ঠিক নির্দ্দিষ্ট সময়ে করেন সেটা ত আমাদের জানাই আছে। তিনি যদি ঠিক শেষ মুহূর্ত্তেও এসে হাজির হ’ন, আমি ত আদৌ বিস্মিত হ’ব না।”
মিঃ ষ্টুয়ার্ট বলিলেন, “যদি তাঁকে দেখিও, তা’হলেও আমার বিশ্বাস করতে সাহস হবে না যে সত্যই মিঃ ফগ এসেছেন।”
ফ্ল্যানাগেল কহিলেন, “মিঃ ফগের প্রস্তাবটাই একটা পাগলামী। যতই কেন তিনি ঘড়ীর কাঁটায় কাঁটায় কাজ করুন না, পথে বার হলেই, কোন রকমে না কোন রকমে দুই একদিন বিলম্ব হবেই হবে। একদিন দু’দিন দেরি হলেই ত ফগের সকল বন্দোবস্ত উল্টে যাবে।”
সলিভান বলিলেন “আরো দেখুন, পৃথিবীর সকল স্থানেই টেলিগ্রাফ আছে। আজ পর্য্যন্ত কি মিঃ ফগের কাছ থেকে আপনারা এক খানা টেলিগ্রামও পেয়েছেন?”
প্রত্যুত্তরে সকলেই কহিল, “না।” আজ ষ্টুয়ার্ট বিদ্রূপের ভাবে বলিতে লাগিলেন, “আমার বোধ হয় মিঃ ফগ এই বিপুলা পৃথিবীর মধ্যে হারিয়ে গেছেন! যে ষ্টীমারে তাঁর আসার সম্ভাবনা ছিল, সে ত হ’লো ‘চায়না’। চায়না ত কালই এসেছে। এই দেখুন চায়নার আরোহীদের তালিকা। এতে ত মিঃ ফগের নাম নাই! আর যে সব জাহাজ আছে তার একখানাও ঠিক সময়ে আসে নাই। খুব বেশী কাছে এসে থাকলেও মিঃ ফগ নিশ্চয়ই এখনো আমেরিকা ছাড়াতে পারেন নি। এখনো তাঁর আসতে আরো ২০ দিন লাগবে!”
হর্ষোৎফুল্ল হইয়া মিঃ রাল্ফ বলিলেন, “তবে আর কি! কালই বারিংএর গদী থেকে মিঃ ফগের টাকাগুলো আনা যাক্।”
ঘড়ির দিকে চাহিয়া মিঃ ষ্টুয়ার্ট কহিলেন, “আর পাঁচ মিনিট!”
বন্ধুগণ তখন পরস্পর পরস্পরের মুখের দিকে চাহিতে লাগিলেন। তাঁহাদিগের হৃদয়ের স্পন্দন-ধ্বনি যেন বাহির হইতে শ্রুত হইতে লাগিল।
উঃ পাঁচ মিনিট এত দীর্ঘ―যেন আর যায় না!
মিঃ ফলেন্টিন্ কহিলেন,—“আর কেন? জয় ত আমাদেরই হ’লো, আসুন এখন খেলা যাক। ওই দেখুন, পাঁচ মিনিটের দুই মিনিট গেল!”
তাঁহারা খেলিবার জন্য তাস তুলিয়া লইলেন। কিন্তু কক্ষপ্রাচীরসংলগ্ন ঘড়ী হইতে চক্ষু কিছুতেই ফিরিতে চাহিল না! তাঁহারা মনে মনে বুঝিয়াইছিলেন যে বাজিতে তাঁহাদিগেরই জয় সুনিশ্চিত, তবুও সময় যেন আর যাইতেছিল না! তিন মিনিট ত নয়—যেন তিন বৎসর!
তাস কাটিতে কাটিতে রাল্ফ কহিলেন, “আর দু’মিনিট!”
সহসা গৃহের বাহিরে—যেখানে বিশাল লোকসমাগম হইয়াছিল, তথা হইতে একটী হল্হলা রব সমুত্থিত হইল। সকলে মোহিত হইলেন। সদস্যগণ তখন সেকেণ্ডের টক্ টক্ শব্দ পর্য্যন্ত গণনা করিতেছিলেন।
কম্পিত কণ্ঠে সলিভান কহিলেন, “আর এক মিনিট!” ফ্ল্যানাগেন হস্তস্থিত তাস টেবিলের উপর রাখিয়া গণিতে লাগিলেন,—
“এক-দুই—তিন—চার—পাঁচ”—
ত্রিশ সেকেণ্ড গেল! মিঃ ফগ আসিলেন না। চল্লিশ গেল―পঞ্চাশ গেল—তখনো মিঃ ফগ আসিলেন না! আর দশ সেকেণ্ড মাত্র। ফ্ল্যানাগেন পুনরায় গণিতে লাগিলেন—
“এক—দুই-তিন——চার―” ও কি! বাহিরে অত কোলাহল হইতেছে কেন? মিলিত জনসঙ্ঘের বিপুল আনন্দোচ্ছাস―ও কিসের জন্য!
মিঃ ফ্ল্যানাগেল পুনরায় গণিতে লাগিলেন।
“পাঁচ—ছয়—সা—ত!”
তাঁহার মুখের কথা মুখের মধ্যেই মিলাইল। কক্ষদ্বার অকস্মাৎ উন্মুক্ত হইয়া গেল। উত্তেজিত উন্মত্ত হর্ষোৎফুল্ল জনসঙ্ঘের অগ্রে অগ্রে মিঃ ফগ বিজয়গর্ব্বে কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিয়া গম্ভীর স্বরে সহাস্যবদনে কহিলেন,
“বন্ধুগণ! আমি এসেছি।”
চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ
“আউদা—প্রাণাধিকে—”
বে কি সত্যই মিঃ ফগ আসিলেন? সকলে সবিস্ময়ে চাহিয়া দেখিলেন সত্যই ফিলিয়াস্ ফগ আসিয়াছেন!
পাঠকদিগের বোধ হয় স্মরণ আছে যে সেইদিন রাত্রি ৮টা ৫ মিনিটের সময়—অর্থাৎ মিঃ ফগের লণ্ডনে আসিবার প্রায় ২৫ ঘণ্টা পর—জিয়েন বিবাহের বন্দোবস্ত করিবার জন্য পুরোহিতের নিকট প্রেরিত হইয়াছিল।
পুরোহিতের বাটীতে যাইয়া জিয়েন শুনিল, তিনি বাহিরে গিয়াছেন। সে তাঁহার অপেক্ষায় প্রায় ২০ মিনিট বসিয়া রহিল।
৮টা ৩৫ মিনিটের সময় জিয়েন উন্মত্তের ন্যায় পুরোহিতের গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইল। দৌড়াইতে দৌড়াইতে তাহার টুপী পথিমধ্যে কোথায় পড়িয়া গেল! তাহার সহিত ধাক্কা লাগিয়া কয়েকজন পথিক রাজপথে আছাড় খাইয়া পড়িল এবং চিৎকার করিয়া তাহার উদ্দেশে গালাগালি দিতে লাগিল! জিয়েনের সে দিকে লক্ষ্য ছিল না। দৌড়—দৌড়―দৌড়! সে প্রাণপণে দৌড়াইতেছিল,―
তিন মিনিটের মধ্যে জিয়েন গৃহে আসিয়া উপনীত হইল এবং নিরুদ্ধ নিশ্বাসে মিঃ ফগকে কহিল,―
“বিবাহ হ’তে পারে না।”
“হ’তে পারে না—কেন?”
“কাল হ’তে পারে না”
“কেন?”
“কাল রবিবার।”
“না—সোমবার।”
“আজ শনিবার।”
“শনিবার? হ’তেই পারে না!”
“আজ শনিবার—শনিবার। আপনার ভুল হয়েছে। আমরা নির্দ্দিষ্ট সময়ের ২৪ ঘণ্টা পূর্ব্বেই এসেছি! আর ১০ মিনিট মাত্র সময় আছে। আপনি উঠুন!
জিয়েন মিঃ ফগকে আর কথা কহিতে দিল না। সবলে তাঁহার হস্ত ধারণ করিয়া টানিয়া লইয়া চলিল। মিঃ ফগ উর্দ্ধশ্বাসে ছুটিলেন। রাজপথে আসিয়া একখানি গাড়ীতে উঠিয়া চালককে কহিলেন,―
“জলদি চালাও পল্মল্—হাজার টাকা বখশিস্!”
নক্ষত্রবেগে গাড়ী ছুটিল। দুইটা কুক্কুর গাড়ীর নীচে পড়িয়া মরিয়া গেল—পাঁচ খানা বিপরীত গামী গাড়ী ধাক্কা লাগিয়া উল্টাইয়া পড়িল! মিঃ ফগ বলিতে লাগিলেন, “চালাও চালাও—হাজার টাকা বখশিস্!”
৮টা ৪৫ মিনিটের সময় গাড়ী আসিয়া সংস্কার-সমিতির দ্বারদেশে থামিল। মিঃ ফগ গৃহমধ্যে প্রবেশ করিলেন।
ফিলিয়াস ফগের ন্যায় সুদক্ষ হিসাবী পর্য্যটকের কেন এরূপ ভুল হইল? তিনি কি দিবস গণনা করিতেই ভুল করিয়াছিলেন? ইহার উত্তর অত্যন্ত সহজ। তিনি অজ্ঞাতে অল্পে অল্পে মোটের উপর ২৪ঘণ্টা সময় অগ্রবর্ত্তী হইয়াছিলেন। লণ্ডন হইতে যাত্রা করা অবধি বরাবর তিনি পূর্ব্বমুখেই আসিতেছিলেন, কাজেই মোটের উপর একদিন বাড়িয়াছিল। তিনি যদি পশ্চিমাবর্ত্তনে পৃথ্বী পর্য্যটন করিতেন তাহা হইলে তাঁহাকে একদিন পশ্চাদ্বর্ত্তী হইতে হইত।
বরাবর পূর্ব্বমুখে যাইতে যাইতে তিনি ক্রমেই দক্ষিণ মেরুর নিকটবর্ত্তী হইতেছিলেন। কাজেই দিনগুলি প্রত্যেক ডিগ্রীতে ৪ মিনিট করিয়া ছোট হইতেছিল। সুতরাং ৬০ ডিগ্রীতে মোটের উপর ২৪ ঘণ্টা ছোট হইয়াছিল। মিঃ ফগ সেই জন্যই ২৪ ঘণ্টা কাল অগ্রবর্ত্তী হইয়াছিলেন।
অন্যভাবে বলিতে গেলে, বলিতে হয়, মিঃ ফগ পূর্ব্বদিকে অগ্রসর হইতে হইতে মোটের উপর সূর্য্যদেবকে ৮০ বার মধ্যাহ্ন গগনে দর্শন করিয়াছিলেন। অথচ সেই কাজের মধ্যে তাঁহার বন্ধুগণ লণ্ডনে বসিয়া ৭৯ বার দেখিয়াছিলেন! ইহাতেই একদিনের গোলযোগ ঘটিয়াছিল।
বিজয়লক্ষ্মী অবশেষে ফিলিয়াস্ ফগের কণ্ঠেই জয়মাল্য অর্পণ করিলেন। তিনি বাজি জয় করিয়া তিন লক্ষ টাকা পাইয়াছিলেন বটে, কিন্তু এই অদ্ভুত পর্য্যটন ব্যাপারে তাঁহার প্রায় সমুদয় অর্থই ব্যয়িত হইয়াছিল। যাহা অবশিষ্ট ছিল, মিঃ ফগ তাহা ফিক্স গোয়েন্দা ও জিয়েনকে সমান ভাগে ভাগ করিয়া দিলেন। গোয়েন্দার উপর তাঁহার কোন বিদ্বেষভাব ছিল না।
জিয়েনের অংশ হইতে মিঃ ফগ গ্যাসের দাম কাটিয়া লইতে বিস্মৃত হইলেন না। কারণ তাহার অনবধানতাবশতঃ গ্যাস ১৯২০ ঘণ্টা অনর্থক জ্বলিয়াছিল!
বাজি জয় করিবার পর মিঃ ফগ রাণী আউদাকে কহিলেন, “আমাদের বিবাহের প্রস্তাবে কি আপনি এখনো সম্মত আছেন?”
“এ কথা আমারই জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল। প্রথম যখন বিবাহের কথা হয় তখন আপনি একেবারে নিঃসম্বল ছিলেন, এখন আপনি ধনসম্পদে বিজয়গৌরবে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত।”
“এ ধন-সম্পদ সমস্তই আপনার। আপনি যদি বিবাহের প্রস্তাব না করতেন তা হ’লে জিয়েনও পুরোহিতের কাছে যেত না, আমার ভ্রমও ধরা পড়ত না।”
রাণী আউদা আবেগভরে কহিলেন, “মিঃ ফগ—প্রিয়তম”—প্রেমপূর্ণ কণ্ঠে ফিলিয়াস ফগ ডাকিলেন, “আউদা-প্রাণাধিকে।”
ইহার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শুভোদ্বাহ সুসম্পন্ন হইয়া গেল। জিয়েন কন্যা সম্প্রদান করিয়া কৃতার্থ হইল।