মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Rajendralal Acharya (†1961) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন
৮০ দিনে ভূ-প্রদক্ষিণ
প্রথম পরিচ্ছেদ
পরিচয়
ষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম পাদে যে গ্রন্থে ভূবনবিখ্যাত বাগ্মী সেরিডানের জীবলীলা শেষ হইয়াছিল, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পাদে সেই গৃহেই সংস্কার-সমিতির অন্যতম সদস্য ফিলিয়াস্ ফগ বাস করিতেন।
ফগের বিপুল অর্থ ছিল সন্দেহ নাই, কিন্তু কি উপায়ে যে অর্থাগম হইত তাহা কেও বলিতে পারে না। তিনি কোনও চাকুরি করিতেন না, কোনও ব্যবসায়-বাণিজ্যে লিপ্ত ছিলেন না, মহাজনী তেজারতী প্রভৃতি কিছুই তাঁহার ছিল না। সংস্কার-সমিতির সদস্য ভিন্ন তিনি আর কিছুই ছিলেন না। অথচ তাঁহার অর্থেরও অভাব ছিল না।
ফিলিয়াস্ ফগ মিতভাষী, মিতব্যয়ী ও সংযমী ছিলেন। তিনি যে কৃপণ ছিলেন, এ কথাও কেউ বলিতে পারে না। আবশ্যক বুঝিলেই তিনি হৃষ্টচিত্ত দান করিতেন। বিলাস কাহাকে বলে তাহা ফিলিয়াস্ ফগ জানিতেন না। তিনি সাধারণ বেশ-ভূষাতেই তুষ্ট থাকিতেন। আপন বলিতে পৃথিবীতে যে তাঁহার আর কেহ কোথাও ছিল, এ পরিচয়ও পাওয়া যায় না। কিন্তু তাঁহার সাংসারিক কর্ম্ম ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় সম্পন্ন হইত—তাহার এক মিনিট এ দিক্ ও দিক্ হইবাব উপায় ছিল না।
ভূগোল সম্বন্ধে ফিলিয়াসের যেরূপ জ্ঞান ছিল তাহা দেখিলেই মনে হইত, তিনি নানা দেশ পরিভ্রমণ করিয়াছেন। কবে কোন্ পর্য্যটক কোথায় কিরূপে গিয়া আর প্রত্যাবর্ত্তন করেন নাই, ফিলিয়াস্ তাহা পর্য্যন্ত জানিতেন। অথচ লণ্ডন নগরের বাহিরে যাইতে কেহ তাঁহাকে কখনো দেখে নাই। যাঁহারা তাঁহাকে ভালরূপে জানিতেন, তাঁহারা দেখিতেন, আপন গৃহ হইতে সংস্কার-সমিতির মিলন-মন্দিরে (ক্লাবে) এবং তথা হইতে পুনরায় আপন গৃহে ভিন্ন ফিলিয়াস্ আর কোথাও যাইতেন না। রকম সকম দেখিয়া কেহ কেহ মনে করিত যে তাঁহার মাথার ঠিক ছিল না।
বাজী রাখিয়া তাসক্রীড়া ভিন্ন ফিলিয়াসের আর কোনো ব্যসন ছিল না। সমিতির কক্ষে বসিয়া তিনি কেবল সংবাদপত্র পাঠ করিতেন এবং বন্ধুদিগের সহিত তাস খেলিতেন। ক্রীড়ায় সর্ব্বদা তাঁহারই জয় হহত। বাজীৱ টাকা ফিলিয়াস্ দানেই বায় করিতেন—নিজে লইতেন না। তিনি যে অর্থের লোভে তাস খেলিতেন তাহা নহে। দক্ষতার সহিত হুইষ্ট খেলিতে যে কৌশল আবশ্যক হইত, শুধু তাহারই পরীক্ষার জন্য তিনি তাস খেলিতেন। সে যেন তাঁহার নিকট একটা যুদ্ধ বলিয়া মনে হইত। সে সমরে রক্তপাত ছিল না—ক্লান্তি ছিল না—তেমন বেশী পরিশ্রমও ছিল না।
পূর্ব্বেই বলিয়াছি, ফিলিয়াসের পুত্ত্র-কলত্র কিছুই ছিল না। সেভিল্রোর একটা নির্জ্জন গৃহে তিনি একাকী বাস করিতেন। কেহ যে সেখানে তাঁহার সহিত কখনো সাক্ষাৎ করিতে গিয়াছে, ইহার কোনও প্রমাণ নাই। তিনি সংস্কার-সমিতির মিলন-মন্দিরে একাকীই আহার করিতেন। তাঁহার সহিত এক টেবিলে বসিয়া খাইতে কেহ কখনো কাহাকেও দেখে নাই।
চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে যে দশ ঘণ্টাকাল তিনি বাড়ীতে থাকিতেন, তাহার কতকটা নিদ্রায় এবং অবশিষ্ট বেশ-ভূষার কাটিয়া যাইত। যখন তিনি আহারে বসিতেন, তখন ক্লাবের দাসগণ বিশেষ সতর্ক হইয়া তাঁহার পরিচর্য্যায় নিযুক্ত হইত। সর্ব্বোৎকৃষ্ট সামগ্রী ভিন্ন তিনি কখনো আহার করিতেন না। উৎকৃষ্ট চীনামাটীর পরিচ্ছন্ন পাত্রে উৎকৃষ্ট ভোজ্য এবং সুন্দর ও অদ্ভুত আধারে বরফমিশ্রিত উৎকৃষ্ট শেরা ভিন্ন আর কিছুই ফিলিয়াস্ ফগের খানার টেবিলে স্থান পাইত না।
ফিলিয়াসের গৃহটি আড়ম্বরশূন্য অথচ বড় আরামদায়ক ছিল। তাঁহার একটি মাত্র ভৃত্য ছিল; প্রভুর মেজাজ বুঝিয়া তাহাকেও ঠিক ঘড়ির কাঁটার মত নির্দ্দিষ্ট সময়ে সকল কার্য্য করিতে হইত। আমরা যে দিনের কথা বলিতেছি, সেই দিন ভৃত্য জেমস্ ক্ষৌরকার্য্যের জন্য যে গরম জল দিয়াছিল, তাহা ৮৬ ডিগ্রী না হইয়া ৮৪ ডিগ্রী ছিল বলিয়া তৎক্ষণাৎ তাহার চাকুরি গেল।
ফিলিয়াস্ একখানি আরাম-চৌকিতে বসিয়া একদৃষ্টে তাঁহার ঘড়ির দিকে চাহিয়া আছেন। ঘড়িটি বেশ ভাল; ঘণ্টা, মিনিট, সেকেণ্ড, বারের নাম, মাস এবং বৎসর পর্য্যন্ত উহাতে পাওয়া যাইত। ঠন্ করিয়া সাড়ে এগারটা বাজিয়া গেল। প্রতিদিন ঠিক এই সময়েই তিনি ক্লাবে যাইতেন।
পুরাতন ভৃত্য আসিয়া সংবাদ দিল,—“নূতন চাকর এসেছে।”
অবিলম্বে ত্রিংশৎবর্ষবয়স্ক একজন ফরাসী কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিল।
ফিলিয়াস্ ফগ কহিলেন, “তুমি দেখ্ছি একজন ফরাসী। তোমার নামই না জন?”
“না, জন্ নয়। আমাকে জিয়েন্ ব’লবেন। আমি পরিবর্ত্তনের পক্ষপাতী নই ব’লে লোকে আমাকে পাসে পার্ত্তুত্ বলে। আমার বিশ্বাস, আমি অসৎ নই। এ পর্য্যন্ত আমি অনেক রকম কাজ করেছি। কিছু দিন পথে পথে গান গেয়ে বেড়াতেম; এক সার্কাসের দলে ঘোড়-সওয়ারও কিছুদিন ছিলাম। আমি সেখানে সুদক্ষ লিওটার্ডের মত ট্রাপিজে বাজী দেখাতেম আর সুনিপুণ ব্লণ্ডিনের মত অনায়াসে দড়ীর উপর দিয়ে হেঁটে বেড়াতেম। তার পর কিছুদিন এক কুস্তির আখড়ার সর্দ্দার হই। শেষে এক দিন মনে করলেম, দেশের একটা কাজে লাগাই উচিত। তাই প্যারিসের ফায়ারম্যান হয়েছিলেম। আজও আমার পিঠে অনেক অগ্নিক্ষতের চিহ্ন বর্ত্তমান আছে। আমি পাঁচ বৎসর ফ্রান্স ছেড়েছি। ঘর-সংসারের সুখ-সুবিধার আশায় ইংলণ্ডে একজনের চাকুরি গ্রহণ করেছিলেম। কিন্তু তাঁর কাছে কাজ করা আমার পোষালো না। এখন তাই বেকার ব’সে আছি। শুনলেম, আপনার একজন চাকর চাই। আপনিও শুন্লেম্—সংযমী এবং ঠিক নিয়মিত সময়েই সকল কাজ করেন। আপনার কাছে সুখে শান্তিতে থাকতে পারবো ভরসায় এসেছি। দেখি, যদি আমার পাসে পার্ত্তুত্ অপবাদটা এতদিনে মুছে যায়।”
মিঃ ফগ উত্তর করিলেন, “আমিও পাসে পার্ত্তুত্ই চাই। তোমার সাধুতার কথা আমি শুনেছি। তোমার প্রশংসাপত্রও আমি দেখেছি। এ চাকুরির সর্ত্তগুলো সব জান ত?”
“আজ্ঞা হাঁ, জানি।”
“বেশ। এখন ক’টা বেজেছে?”
জিয়েন তাহার পকেট হইতে একটি প্রকাণ্ড ঘড়ি বাহির করিয়া কহিল, “এগারটা বাইশ মিনিট।”
“তোমার ঘড়ি ত ঠিক নয়―বড় ধীর।”
“ক্ষমা ক’র্বেন—তা অসম্ভব!”
“তোমার ঘড়ি ৪ মিনিট কম আছে। তা যাক্, ভুলটা সংশোধন করলেই হ’লো। আজ ১৮৭২ সালের ২রা অক্টোবর। বেলা ১১টা বেজে ২৬ মিনিটের সময় তুমি আমার কাজে ভর্ত্তি হ’লে?”
কথা বলিতে বলিতেই ফিলিয়াস্ ফগ আরাম-চৌকি ত্যাগ করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন। ঠিক একটা যন্ত্রচালিত পুত্তলিকাবৎ টুপীটা লইয়া মাথায় দিলেন এবং বিনা বাক্যব্যয়ে কক্ষ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন।
প্রভুর সম্মুখে দাঁড়াইয়া জিয়েন এতক্ষণ তাঁহার সর্ব্বাঙ্গ নিরীক্ষণ করিতেছিল। সে দেখিল, ফিলিয়াসের বয়স চল্লিশের অধিক হইবে না। তাঁহার মুখখানি সুন্দর, দেহ সুদৃঢ় ও দীর্ঘ, কেশদাম নিবিড় না হইলেও বিরল নহে। তাঁহার ভ্রূযুগ সুস্পষ্ট, দশনপংক্তি মনোরম। আকৃতি দেখিলেই মনে হয়, ইনি শুধু কথার লোক নহেন—কাজের লোক। স্থির, ধীর, গম্ভীর চক্ষুর্দ্বয় অচঞ্চল ও দৃঢ়তাব্যঞ্জক।
যাহারা বিশেষ লক্ষ্য করিয়াছিল, তাহারা জানিত, ফিলিয়াস্ কখনো বৃথা কোন কাজ করিতেন না। যেখানে এক পা ফেলিলেই চলে, সেখানে কেহ তাঁহাকে দুই পদ অগ্রসর হইতে দেখে নাই। যে পথে গেলে অপেক্ষাকৃত অল্প সময়েই গন্তব্য স্থানে উপনীত হওয়া যায়, ফিলিয়াস্ সর্ব্বদা সেই সহজ পথই অবলম্বন করিতেন। অকারণে একটা অঙ্গ-সঞ্চালন—এমন কি, একটা দৃষ্টি নিক্ষেপ করাও তাঁহার অভ্যাস ছিল না। বিপাকে বা হর্ষে অবিচলিত, বিপদে অচঞ্চল, সর্ব্বদা শান্ত, সর্ব্বকার্য্যে ধীর, স্থির ও দৃঢ় ফিলিয়াস্ ফগ একটি আশ্চর্য্য প্রকৃতির লোক ছিলেন। ব্যস্ত হইয়া একান্ত উৎকণ্ঠিতচিত্তে কোথাও যাইতে কেহ তাঁহাকে দেখে নাই। অথচ গন্তব্য স্থানে পৌঁছিতে কখনো তাঁহার বিলম্বও ঘটে নাই। তিনি একাকী থাকিতেন; এমন কি সমাজ-সীমার বাহিরেরে বাস করিতেন বলিলেই হয়। তিনি জানিতেন, জীবনে সংঘর্ষের অবধি নাই। সংঘর্ষেই শক্তির ক্ষয়। তিনি তাই কাহারও সহিত সংঘর্ষে আসিতেন না।
জিয়েন পাসে পার্ত্তুত্ লোকটিও ছিল বেশ। মুখখানি স্নেহ-কোমল, উজ্জ্বল নীল নয়নদ্বয়, স্থূল দেহে সুদৃঢ় মাংসপেশী, সবল শরীর। লক্ষ্যহীন যৌবনকাল নানা স্থানে অতিবাহিত করিয়া সে ক্লান্ত হইয়াছিল। তাই দুই দণ্ডের আরামের জন্য দুই দিন শান্তিতে কাটাবার মানসে সে ফিলিয়াস্ ফগের দ্বারে আসিয়া দণ্ডায়মান হইল। জিয়েন তাহার নবীন প্রভুকে তুষ্ট করিতে পারিবে কি না, কে বলিতে পারে?
জিয়েন তাহার ঘর-কন্না দেখিয়া লইতে লাগিল। সে দেখিল, যেখানে যেটি থাকা উচিত, এ গৃহে ঠিক তাহাই আছে। গৃহের কোন বিলাসিতার চিহ্নমাত্রও নাই, অথচ কোন অভাবও নাই। জিয়েন মনে মনে বড় প্রীত হইল। সে দেখিল, প্রভুর সজ্জাকক্ষে পরিচ্ছদাদির অভাব নাই। সেগুলি সুচারুরূপে সজ্জিত রহিয়াছে। প্রত্যেক কোট, প্রতি ওয়েষ্টকোট, প্রত্যেক প্যাণ্টালুন, এমন কি, জুতার পর্য্যন্ত এক একটা নম্বর আছে। একখানি খাতায় তাহাদের তালিকা। কবে কোন্টি ব্যবহার করা হইল, কতদিন বাহিরে থাকিল, কবে উহা পুনরায় সজ্জাকক্ষে রক্ষিত হইল, তাহা পর্য্যন্ত খাতায় লেখা রহিয়াছে! দেখিতে দেখিতে সে ভৃত্যদিগের থাকিবার কক্ষে যাইয়া উপস্থিত হইল। সে কক্ষটিও বেশ বাসোপযোগী। কক্ষের এক প্রান্তে টেলিফোন এবং বৈদ্যুতিক ঘণ্টা আছে। আগুন জ্বালিবার চিমনীর আলিশায় একটি বৈদ্যুতিক ঘড়ি টক্ টক্ করিয়া চলিতেছে। প্রভুর শয়নকক্ষের ঘড়ি ও এই ঘড়িতে ঠিক একই সময় রাখিতেছে। ঘড়ির শিরোদেশে একখণ্ড কাগজে ভৃত্যের দৈনিক করণীয় কার্য্যগুলির তালিকা রহিয়াছে। জিয়েন সেই তালিকা পাঠ করিতে লাগিল—আট্টা বাক্তিরা ২৩ মিনিটের সময় চা ও টোষ্ট, নয়টা ৩৭ মিনিটে ক্ষৌরকর্ম্মের জন্য গরম জল, ১০টা বাজিতে ২০ মিনিটের সময় স্নানাদি কার্য্যের আয়োজন ইত্যাদি। কোন্ সময়ে কি করিতে হইবে, এই তালিকায় সে সকল কথাই লেখা ছিল। জিয়েন হৃষ্টচিত্তে তালিকা পাঠে মনোনিবেশ করিল।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
ভীষণ চুরি
লিয়াস্ ফগ বেলা ঠিক সাড়ে এগারটার সময় গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইলেন, তাহার পর ঠিক ৫৭৫ বার দক্ষিণ পদ এবং তৎপশ্চাৎ ৫৭৫ বার বামপদ ক্ষেপণ করিয়া সংস্কার-সমিতির মন্দিরে যাইয়া উপনীত হইলেন। ভোজন কক্ষে তাঁহার প্রাতরাশ্ সজ্জিত ছিল। মিঃ ফগ বিনা বাক্যব্যয়ে সেই চিরপরিচিত খানার টেবিলে বসিয়া আহার করিতে লাগিলেন।
১২টা ৪৭ মিনিটের সময় আহার শেষ করিয়া তিনি সমিতির বৈঠকখানায় আসিবামাত্রই ভৃত্য তাঁহার হস্তে এক খণ্ড “টাইমস্” পত্রিকা প্রদান করিল। ফিলিয়াস্ চিরাভ্যস্ত ক্ষিপ্রহস্তে উহা খুলিয়া ভাঁজ করিয়া লইলেন এবং পাতা কাটিয়া পাঠ করিতে লাগিলেন। “টাইমস” এবং তৎপরে “ষ্টাণ্ডার্ড” পত্রিকা পড়িতে পড়িতেই নৈশভোজনের পূর্ব্ব পর্য্যন্ত কাটিয়া গেল। ভোজন সমাপ্ত করিয়া ফিলিয়াস্ ফগ এক খণ্ড “মর্নিং ক্রেনিকেল” হস্তে সমিতির সেলুনকক্ষে প্রবেশ করিলেন।
অর্দ্ধ ঘণ্টা অতীত হইতে না হইতেই তাঁহার বন্ধু-বান্ধবে কক্ষটা পূর্ণ হইয়া উঠিল। ইঁহারা সকলেই অতিমাত্রায় তাসক্রীড়ারত ছিলেন। আন্দ্রু ষ্টুয়ার্ট, মহাজন জন সলিভান ও স্যামুয়েল ফলেণ্টিন্ মদ্য প্রস্তুতকারী টমাস্ ফ্ল্যানাগেন, ইংলণ্ডের প্রধান ব্যাঙ্কের অন্যতম অধ্যক্ষ গথিয়ার রাল্ফ, ইঁহারা সকলেই ধনকুবের ছিলেন। ইঁহাদের সহিতই ফিলিয়াস্ ফগের হুইষ্ট যুদ্ধ চলিত।
চিমনির মধ্যে অবস্থিত প্রজ্বলিত অগ্নির চতুর্দ্দিকে বসিয়া ইঁহারা নানারূপ গল্প করিতে লাগিলেন। টমাস্ ফ্ল্যানাগেন কহিলেন, “মিঃ রাল্ফ, এই যে ডাকাতিটা হয়েছে, এর কিছু খবর হ’ল কি?”
ষ্টুয়ার্ট কহিলেন, “আর খবর হবে! ব্যাঙ্কের টাকাগুলো গেল আর কি!”
রাল্ফ কহিলেন, “আমার ত ভরসা হয় যে, চোর ধরা পড়বে। আমেরিকা, ইউরোপ, এসিয়া সকল দেশেই আমাদের গোয়েন্দা দারোগা আছে। প্রত্যেক বড় বড় বন্দরেই তারা সন্ধান নিচ্ছে। এদের ফাঁকি দিয়ে পালানো বড় সহজ নয়।”
ষ্টুয়াট কহিলেন, “তা হ’লে দেখছি, চোরের চেহারা কেমন, তা আপনারা জানেন।”
কথাটা শুনিরা রাল্ফ দৃঢ়স্বরে বলিলেন, “টাকাটা যে নিয়েছে, সে ত চোর নয়।”
“সে কি! সাড়ে আট লক্ষ টাকার নোট নিয়ে যে সরে পড়্তে পারে, সেও চোর নয়!”
“না, চোর নয়।”
সলিভান বিদ্রূপ করিয়া কহিলেন, “না না, সে কেন চোর হ’তে যাবে? সে একজন খাঁটি কলির চেলা—বিশেষ কার্য্যপটু লোক!”
তখন পত্র-পত্রিকার পর্ব্বত প্রমাণ প্রাচীরের অন্তরাল হইতে মস্তক উত্তোলন করিয়া ফিলিয়াস্ ফগ কহিলেন, “মর্নিং ক্রণিকেলে প’ড়ছিলেম যিনি নোটগুলো নিয়েছেন, তিনি না কি একজন ভদ্রলোক।”
আলোচনা চলিতে লাগিল।
তিন দিন পূর্ব্বেই ইংলণ্ডের ব্যাঙ্ক হইতে সার্দ্ধ অষ্টলক্ষ মুদ্রার নোট অপহৃত হইয়াছিল। এত অনায়াসে বুঝি আর কখনো টাকা চুরি হয় নাই। ব্যাঙ্কের অন্যতম অধ্যক্ষ মিঃ রাল্ফ সকলকে বুঝাইতে লাগিলেন, “এ চুরিতে খাজাঞ্চী বেচারার কোন দোষ নাই। সে কি ক’রবে? সে তখন মনোযোগ দিয়ে ব্যাঙ্কের একটা পাওনা ২৷৷৵৹ আনা খাতার জন্য ক’রছিল। একটা লোক চারিদিকেই ত আর চোখ রাখতে পারে না।”
ইংলণ্ডের ব্যাঙ্কে যে সকল লোক কাজ-কর্ম্ম করিতে আসিতেন, ব্যাঙ্কের কর্ত্তৃপক্ষগণ তাঁহাদের সাধুতা সম্বন্ধে কখনো সন্দেহ করেন নাই। কেহ নোট দেখিতেছেন, কেহ সোনা পরীক্ষা করিতেছেন, কেহ বা জহরত হস্তে লইরাছেন। পরীক্ষান্তে সকলেই আবার সেই নোট বা স্বর্ণ বা মূল্যবান্ প্রস্তরাদি প্রত্যর্পণ করিতেছেন। এই রূপেই কার্য্য চলিত। কিন্তু সে দিন যিনি নোট লইয়াছিলেন, তিনি আর উহা প্রত্যর্পণ করিলেন না। বেলা পাঁচটার সময় যখন ব্যাঙ্ক বন্ধ হইল, তখন হিসাব নিকাশ করিয়া জানা গেল, ব্যাঙ্কের সার্দ্ধ অষ্টলক্ষ মুদ্রা অপহৃত হইয়াছে!
অমনি চারিদিকে সুনিপুণ গোয়েন্দা পুলিশ ছুটিল। কেহ লিভারপুল, কেহ গ্ল্যাস্গো, কেহ বা অন্যান্য বন্দরে দস্যুর সন্ধানে গমন করিল। সুদূর সুয়েজ, ব্রিন্দিসি, নিউইয়র্ক প্রভৃতি পর্য্যন্ত বাদ গেল না। ব্যাঙ্কের কর্ত্তা প্রকাশ করিলেন, চোর ধরিতে পারিলে ৩০ সহস্র মুদ্রা পুরস্কার ত মিলিবেই, তদ্ভিন্ন অপহৃত অর্থের যে পরিমাণ উদ্ধার হইবে, তাহার উপর শতকরা ৩০ মুদ্রা হিসাবে কমিশন পর্য্যন্ত প্রদত্ত হইবে।
“মর্নিং ক্রণিকেল” পাঠে জানা গেল যে, ঘটনার দিন ভদ্রবেশধারী, আচারে ব্যবহারে সুমার্জ্জিত একটি লোককে ব্যাঙ্কের নোট পরীক্ষা করিতে দেখা গিয়াছিল। তাহার পরিচ্ছদ ও আকৃতির বর্ণনা গোয়েন্দাদিগকে দেওয়া হইয়াছিল বলিয়াই, ব্যাঙ্কের কর্ত্তাগণ বিশ্বাস করিয়াছিলেন, চোর অবশ্যই ধরা পড়িবে। সংবাদপত্রসমূহে এই বিষয় লইয়া তখন নানারূপ আন্দোলন চলিতেছিল।
মিঃ রাল্ফ ভাবিয়াছিলেন, পুরস্কারের লোভে গোয়েন্দাগণ নিশ্চয়ই প্রাণপণে চেষ্টা করিবেন। তাহা হইলেই দস্যু ধৃত হইবে। আল ষ্টুয়ার্টের যুক্তি-তর্ক অন্যরূপ ছিল। হুইষ্ট খেলিতে খেলিতে তাই তাঁহাদিগের মধ্যে এই বিষয়ের আলোচনা চলিতেই লাগিল। ষ্টুয়ার্ট কহিলেন—“চোর যে একজন চতুরচূড়ামণি, তা’ বেশ বোঝাই যাচ্ছে। আমার ত বিশ্বাস, সে নিশ্চয়ই পালাবে।”
রাল্ফ কহিলেন, “পালাবে ত—কিন্তু কোথায় যাবে বলুন দেখি?”
“হুঁ! কোথায় আবার যাবে, স্থানের কি অভাব আছে!”
“আচ্ছা, বলুনই না, কোথায় যাবে।”
“তা আমি জানি না। তবে পৃথিবীটা ত আর এতটুকু নয়! পালাবার স্থানের আবার ভাবনা।”
ফিলিয়াস্ ফগ ফ্ল্যানাগানের হস্তে তাস দিয়া কহিলেন, “কাটুন,” তাহার পর মিঃ ষ্টুয়ার্টের কথার উত্তরে অনুচ্চস্বরে কহিলেন, “এককালে পৃথিবীটা বড়ই ছিল―এখন আর সে দিন নাই।”
কেহ সে কথা তখন ততটা গ্রাহ্য করিলেন না। এক বাজী শেষ হইলে পর ষ্টুয়ার্ট কহিলেন, “এক কালে বড় ছিল মানে কি? পৃথিবী কি এখন ছোট হ’য়ে গেছে না কি?”
রাল্ফ কহিলেন, “নিশ্চয়ই তাই। একবার পৃথিবীটা ঘুরে আসতে এখন যে সময় লাগে, আগে তার দশগুণ বেশী লা’গত। তবেই ত পৃথিবী ছোট হয়েই গেল। এই জন্যই এখন চোরের সন্ধান সকালে সকালে হবে। সে পালাবে কেমন ক’রে?”
ফগ কহিলেন, “মিঃ ষ্টুয়ার্ট! খেলুন, এবার আপনার পালা।”
ষ্টুয়ার্টের তখন খেলার দিকে মন ছিল না। তিনি কহিলেন, “মিঃ রাল্ফ, এখন তিন মাসে পৃথ্বী ভ্রমণ সম্ভব ব’লেই কি পৃথিবীটা এতই ছোট হয়েছে যে, আপনি নিশ্চিন্ত হ’য়ে বসে আছেন?”
বাধা দিয়া ফগ বলিলেন, “তিন মাসে নয়—৮০ দিনে!” জন্ সলিভান কহিলেন “এ কথা ঠিক। রোটাস্ থেকে এলাহাবাদ পর্য্যন্ত গ্রেট ইণ্ডিয়ান পেনিন্সুলার রেলপথ খুলেছে। এখন ৮০ দিনেই পৃথিবী পর্য্যটন করা যায়। এই দেখুন না, “মর্নিং ক্রণিকেলে” লিখেছে—
মন্ট সেনিস্ এবং ব্রিন্দিসি দিয়া রেল ও ষ্টীমারে
দিনের হিসাব করিতে করিতে খেলার কথা বিস্মৃত হইয়া মিঃ ষ্টুয়ার্ট একখানি ভুল তাস খেলিয়া বলিলেন, “হাঁ ৮০ দিনই বটে! কিন্তু ঝড়-তুফান, জাহাজডুবি, রেল-সংঘর্ষ, মুখোড় বাতাস এ সব ত আর ও হিসাবে, ধরা নাই।”
থেলিতে খেলিতে মিঃ ফগ কহিলেন, “সে সব ধ’রে বৈ কি।”
“সে সব ধ’রেই! মনে করুন, যদি আমেরিকাবাসী ইণ্ডিয়ানেরা পথ থেকে রেল উঠিয়ে রাখে, কি ট্রেণ থামিয়ে লুট-পাট করে, কি চলন্ত ট্রেণে লাফিয়ে উঠে যাত্রীদের আক্রমণ করে, তা’ হলেও—
ধীরভাবে মিঃ ফগ উত্তর করিলেন, “হাঁ, তা হ’লেও বৈ কি! এই দেখুন, দুখানা রং আমার হাতে! এ বাজী আমার।”
মিঃ ষ্টুয়ার্ট কহিলেন, “কি জানেন মিঃ ফগ, কাগজপত্রের হিসাবে হয় ত আপনার কথাই ঠিক হতে পারে। কিন্তু হাতে কলমে করতে গেলে—”
“মিঃ ষ্টুয়ার্ট হাতে কলমেও ঐ হিসাব ঠিক।”
“আমার ইচ্ছা হয় যে, আপনি একবার করে দেখান।”
“সে ত আপনার উপরেই নির্ভর করে। চলুন না, দু’জনে এক সঙ্গেই যাই।”
“ধর্ম্ম রক্ষা করুন! এমন একটা অদ্ভুত পর্য্যটন বর্ত্তমান অবস্থায় অসম্ভব। আপনি যদি ক’রতে পারেন, আমি ৬০ হাজার টাকা দিব।”
“আপনার বড় ভুল হচ্ছে মিঃ ষ্টুয়ার্ট, এ পর্য্যটন খুবই সম্ভব!”
“বেশ ত। আপনিই তবে করুন না কেন?”
“৮০ দিনে পৃথিবীটা ঘুরে আসা—কেমন এই ত?”
“হাঁ।”
“বেশ, আমিই যাব।”
“কবে?”
“এই দণ্ডেই—তবে আগে বলে রাখি সমস্ত খরচ আপনার।”
ফগের দৃঢ়তা দেখিয়া ষ্টুয়ার্ট একটু বিরক্ত হইতেছিলেন। বলিলেন,—“এ সব বাজে কথা! আসুন, খেলা যাক।”
আপনিই তবে আরম্ভ করুন—সেবারে আপনি ভুল তাস দিয়েছিলেন।”
আন্দ্রু ষ্টুয়ার্ট খেলিবার জন্য তাস কুড়াইয়া লইয়াই পুনরায় উহা টেবিলের উপর রাখিয়া কহিলেন, “দেখুন মিঃ ফগ, আপনি যদি প্রস্তুত থাকেন, আমি সত্যই ৬০ হাজার টাকা বাজী ধ’রবো।”
কথা শুনিয়া ফলেণ্টিন্ কহিলেন, “ষ্টুয়ার্ট ভায়া, আর হাসিয়ো না। এ যে ঠাট্টা তা কি বুঝ্তে পারছো না?”
সুদৃঢ়কণ্ঠে ষ্টুয়ার্ট কহিলেন, “আমি যখন বলেছি—বাজী ধরবো, তখন কিছুতেই সে কথা মিথ্যা হবে না।”
ফগ কহিলেন, “বেশ ভাল। আমিও পশ্চাৎপদ নই। বারিংএর গদীতে আমার তিন লক্ষ টাকা জমা আছে। আমিও তবে সেই টাকাই বাজা ধরচি।” সলিভান্ আশ্চর্য্যান্বিত হইয়া কহিলেন, “তিন লক্ষ টাকা বাজী! একটু সামান্য কিছু গোলযোগ ঘটলেই ত আপনার সমস্ত টাকা যাবে। পথে কত বিঘ্ন আছে। এখন বুঝতে পারা যাচ্ছে না, কিন্তু তেমন সামান্য কিছু একটা—”
প্রত্যুত্তরে মিঃ ফগ কেবল কহিলেন, “অদৃষ্টপূর্ব্ব এমন কিছুই ঘটতে পারে না।”
“এই যে ৮০ দিনের হিসাব, এর চেয়ে কমে কিন্তু পৃথিবী ভ্রমণ সম্ভব নয়।”
“বেশ ত। ঠিক মত ধরতে পারলে কমেই কার্য্য সিদ্ধি হয়।”
“আপনাকে বহুবার ট্রেণ থেকে ষ্টীমারে, ষ্টীমার থেকে ট্রেনে উঠানামা ক’রতে কবে । একটু দেরি হলে ত চলবে না।”
“আমার দেরিই হবে না!”
“আপনি নিশ্চয়ই ঠাট্টা কর্ছেন।”
“ঠাট্টা! একজন খাঁটী ইংরাজ বাজী ধরে’ কখনো ঠাট্টা করে না। আপনাদের যাঁর-তাঁর সঙ্গে আমি তিন লাখ টাকা বাজী ধ’র্তে প্রস্তুত আছি যে, আমি ৮০ দিনে কিংবা তার চেয়েও কমে পৃথিবী পরিভ্রমণ কর্বো। ৮০ দিনে অর্থাৎ ১৯২০ ঘণ্টায় কিংবা ১১৫২০০ সেকেণ্ডে ! আপনারা স্বীকার আছেন?”
সকলে পরামর্শ করিয়া কহিলেন, “হাঁ স্বীকার।”
“বেশ, ডোভার মেল ৮.৪৫ মিনিটে ছাড়ে। আমি তাতেই যাত্রা করবো।”
ষ্টুয়ার্ট কহিলেন, “কি, আজই সন্ধ্যায়?”
“হাঁ আজই, সন্ধ্যায়। আজ ২রা অক্টোবর, বুধবার। ২১ ডিসেম্বর শনিবার পৌনে ন’টার সময় আমি লণ্ডনের এই কক্ষে এসে উপস্থিত হব। যদি না পারি, তবে বারিংএর গদীতে আমার যে তিন লক্ষ টাকা গচ্ছিত আছে, সে সমস্তই আপনাদের হবে। এই নিন, সে টাকার চেক রাখুন।”
তন্মুহূর্ত্তেই বাজীর সর্ত্তগুলি লিপিবদ্ধ করা হইল। উভয় পক্ষেই সেই পত্রে স্বাক্ষর করিলেন।
ফিলিয়াস্ ফগ তখনো ধীর, স্থির, অচঞ্চল। তিনি জানিতেন, তাঁহার যথাসর্ব্বস্ব ছয় লক্ষ মুদ্রা। এই অদ্ভুত ভ্রমণ-ব্যাপারেই তাহার অন্ততঃ অর্দ্ধেক বার হইয়া যাইবে; তাই তিনি তিন লক্ষ মুদ্রা বাজী ধরিয়াছিলেন। তাঁহার বন্ধুগণ অত্যন্ত চঞ্চল হইয়া উঠিলেন। সে চাঞ্চল্য অর্থের জন্য নহে। এমন অবস্থায়, এমন বিষয়ে বাজী ধরিলে আপনা হইতেই যেন বক্ষ কম্পিত হয়।
মিঃ ফগ তখনও তাসই খেলিতেছিলেন! দেখিতে দেখিতে সাতটা বাজিল। সকলে বলিলেন, “আর না, এখন খেলা বন্ধ হোক্। মিঃ ফগকে পৃথিবী পর্য্যটনের জন্য প্রস্তুত হ’তে হ’বে।”
খেলিতে খেলিতে ফগ কছিলেন, “আমি ত প্রস্তুতই আছি।”
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
যাত্রা
তটা বাজিয়া ২৫ মিনিটের সময় ফিলিয়াস্ ফগ তাস পরিত্যাগ করিয়া উঠিলেন। হুইষ্টের বাজী জিতিয়া যে তিন শত মুদ্রা পাইয়াছিলেন, তাহা ওয়েষ্টকোটের পকেটে রাখিয়া তিনি বন্ধুদিগের নিকট বিদায় লইলেন এবং ৮টা বাজিবার দশ মিনিট পূর্ব্বেই গৃহে পৌঁছিলেন।
প্রভুকে অসময়ে প্রত্যাগত দেখিয়া জিয়েন বিস্ময়াপন্ন হইল। তাঁহার ত দ্বি প্রহর রজনীর পূর্ব্বে গৃহে ফিরিবার কথা নহে!
ফিলিয়াস্ ফগ আপন কক্ষে প্রবেশ করিয়া টেলিফোনে ডাকিলেন, “জিয়েন—।” এখন ত সময় নহে—অসময়ের আহ্বানে জিয়েন কোন উত্তর দিল না। মিঃ ফগ পুনরায় পূর্ব্ববৎ ডাকিয়া কহিলেন, “জিয়েন, এই দ্বিতীয়বার আমি তোমাকে ডাকছি, মনে রেখ!”
জিয়েন নিকটে আসিয়া পকেট হইতে ঘড়ি বাহির করিয়া কহিল, “এখনও ত দুপুর রাত হয়নি।”
“তা’ আমি জানি। সে জন্য আমি তোমার দোষ দিচ্ছি না। দশ মিনিটের মধ্যেই আমাদের ডোভার ও ক্যালের দিকে যেতে হবে।”
ফরাসী ভৃত্যের বদনমণ্ডল যেন সহসা কুঞ্চিত হইয়া উঠিল। প্রভুর আদেশের মর্ম্ম সে ঠিক বুঝিয়া উঠিতে পারিল না। কহিল, “আপনি কি বাহিরে যাচ্ছেন?”
“হাঁ। আমরা একবার পৃথ্বী-পর্য্যটনে যাচ্ছি।” কথাটা শুনিবামাত্রই জিয়েনের নয়নদ্বয় বিস্ফারিত হইয়া উঠিল। সে কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ়ের মত দাঁড়াইয়া আপন মনে বলিল,—
“পৃথ্বী-পর্যাটনে!”
“হাঁ, ৮০ দিনে; চল, আর সময় নাই।”
“জিনিষ-পত্র?”
“বিশেষ কিছু আবশ্যক নাই। একটা কার্পেটের ব্যাগ নিলেই চল্বে। দুটো কামিজ আর তিন জোড়া মোজা ব্যাগের মধ্যে নাও। তোমার নিজের জন্যও তাই নিও। যা কিছু আবশ্যক হবে, পথে যেতে যেতে কিনে নিলেই চলবে। আমার ম্যাকিণ্টস আর বড় কোটটা নিও। আমাদের বড়-বেশী হাঁটতে হবে না। তবুও জোড়া দুই মজবুত বুট যেন সঙ্গে থাকে। এ কি! চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলে যে! স্ফুর্ত্তি কর!”
জিয়েন অবাক্! সে তাড়াতাড়ি আপন কক্ষে প্রবেশ করিয়া হতাশের মত একখানা চেয়ারে বসিয়া পড়িল। আপন মনে বলিতে লাগিল, ‘আমার অদৃষ্টে দেখছি বেশ হ’ল। দু’দিন একটু শান্তিতে থাকব ভেবেছিলেম, তা ত খুবই ঘট্লো।’
সময় নাই। ৮০ দিনে পৃথ্বী-পরিভ্রমণ! জিয়েন যন্ত্রচালিত পুত্তলিকার ন্যায় জিনিষ-পত্র গুছাইতে লাগিল। শত সহস্র চিন্তা তাহাকে অত্যন্ত চঞ্চল করিয়া তুলিল। ৮০ দিনে পৃথিবী-পর্য্যটন! তবে কি আমি উন্মাদের চাকুরি লইলাম? না——না—এটা কখনো সম্ভব নয়। ও সবই তামাসা মাত্র। পাঁচ বৎসর দেশ ছেড়েছি, পাঁচ বৎসর পর আবার স্বদেশের মুখ দেখতে পাব। সে হিসাবে ডোবার এবং ক্যালে পর্য্যন্ত যাওয়াটা একরকম ভালই। প্যারিস নগরটা দেখতে প্রভু নিশ্চয়ই একবার যাবেন। প্যারিসে গেলেই দু’দিন কি আর সেখানে থাকবেন না, নিশ্চয়ই থাকবেন। তা’ই বা বলি কেমন করে? যিনি কখনো ঘরের বাহির হন নি, তিনি যখন পৃথ্বী ভ্রমণে যাচ্ছেন—এইটেই ত ভাবনার কথা!
৮টার মধ্যেই জিয়েন জিনিষ-পত্র ব্যাগে তুলিয়া প্রস্তুত হইল এবং একান্ত অস্থিরচিত্তে নিজের কক্ষদ্বার রুদ্ধ করিয়া প্রভুর সম্মুখীন হইল। মিঃ ফগ ইতিপূর্ব্বেই প্রস্তুত হইরা ব্রাডস কৃত একখানা “কণ্টিনেণ্টাল গাইড” হস্তে লইয়া বসিয়াছিলেন। জিয়েনের নিকট হইতে ব্যাগটি লইয়া তন্মধ্যে কতকগুলি নোট রাখিয়া বলিলেন, “কোন জিনিষ ত ভুলে গেলে না?”
“না।”
“আমার ম্যাকিণ্টস আর বড় কোটটা?”
“সঙ্গে নিয়েছি।”
“ব্যাগটা নাও। এটা বেশ সাবধানে রেখো। এর মধ্যে কিন্তু তিন লক্ষ টাকা থাকলো।”
তিন লক্ষ মুদ্রা! কত ভার! ব্যাগটা জিয়েনের নিকট অকস্মাৎ অত্যন্ত ভার বলিয়া বোধ হইতে লাগিল। সে বুঝি আর উহা ধরিয়া রাখিতে পারিতেছে না। ব্যাগটা বুঝি এবার নিশ্চয়ই হস্তচ্যুত হইল!
উভয়ে তখন সোপানাবতরণ করিয়া নীচে নামিলেন। গৃহের দ্বারে দুইটি তালা পড়িল। ফিলিয়াস্ ফগ একখানি গাড়ী ডাকিয়া ভৃত্যের সহিত আরোহণ করিলেন। গাড়ী চ্যারিংক্রশ্ ষ্টেশনাভিমুখে ছুটিল।
৮টা ২০ মিনিটের সময় ফিলিয়াস্ ফগ যখন ষ্টেশনমধ্যে প্রবেশ করিতেছিলেন, তখন জীর্ণচীরপরিহিতা এক অনাথিনী তাহার শিশু পুত্ত্রটিকে ক্রোড়ে লইয়া ভিক্ষার জন্য তাঁহার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। মিঃ ফগ হুইষ্ট খেলিয়া যে টাকা পাইয়াছিলেন তাহা পকেটেই ছিল। সেই ২০টা গিনি ভিখারিণীকে দান করিয়া কহিলেন, “তোমার সঙ্গে দেখা হ’য়ে বড় খুসী হলেম। আজকের মত এই নাও।”
জিয়েন মুগ্ধের ন্যার এই নীরব দান অবলোকন করিল। তাহার নয়নপ্রান্তে বারি-বিন্দু দেখা দিল। ফিলিয়াস্কে সে তন্মুহূর্ত্তেই তাহার হৃদয়মধ্যে উচ্চ আসনে স্থাপিত করিল।
ফিলিয়াস্ যখন ভৃত্যকে প্যারিসের দুইখানি প্রথম শ্রেণীর টিকিট ক্রয় করিতে আদেশ দিতেছিলেন, তখন তাঁহার বন্ধুগণ ষ্টেশনে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাঁহাদিগকে দেখিয়াই ফগ কহিলেন, “এই দেখুন, আমি ত এখনই যাত্রা করছি। আমার ছাড়-পত্রে কন্সালের স্বাক্ষর দেখলেই আপনাদের আর সন্দেহের কারণ থাকবে না।”
গথিয়ার রাল্ফ বিনয়নম্রবচনে কহিলেন, “সে কি কথা! সে কি কথা! আমরা ত সকলেই জানি যে আপনার মুখের কথাই যথেষ্ট―ছাড় পত্রের আবশ্যক কি?”
প্রত্যুত্তরে ফগ কহিলেন, “বেশ, আরো ভাল।” মিঃ ষ্টুয়ার্ট বন্ধুকে সতর্ক করিয়া দিয়া বলিলেন “কবে যে ফিরে আস্তে হ’বে, সেটা যেন ভুল না হয়।”
৮০ দিনের মধ্যেই―১৮৭২ সালের ২১শে ডিসেম্বর—রাত্রি ৮টা ৪৫ মিনিট। তবে এখন বিদায় হই।” ফিলিয়াস্ ফগ ভৃত্যের সহিত ট্রেণে উঠিয়া বসিলেন! ঠিক ৮টা ৪৫ মিনিটের সময় বংশীধ্বনি করিয়া ডোভার মেইল ছাড়িল।
রজনী ভীষণ অন্ধকার। অল্প অল্প বৃষ্টি হইতেছিল। ফগ নীরবে এক প্রান্তে বসিয়া আরামে বিশ্রাম করিতে লাগিলেন। জিয়েন দৃঢ়মুষ্টিতে সেই ব্যাগটি ধরিয়া বসিয়া থাকিতে থাকিতে একবার অকস্মাৎ করুণস্বরে চীৎকার করিয়া উঠিল। মিঃ ফগ জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি হয়েছে?”
“হায় হায়! তাড়াতাড়িতে ভুলে—”
“কি?”
“আমার কক্ষের গ্যাসের বাতিটা নিবিয়ে দিতে ভুলে এসেছি।”
কিছুমাত্র চাঞ্চল্য প্রকাশ না করিয়া ফগ কহিলেন, “তা’ বেশ। আমরা যতদিন না ফিরি, বাতিটা ততদিন জ্বলতেই থাকবে। খরচ কিন্তু তোমার!”
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
ফিক্স গোয়েন্দা
লিয়াস্ ফগ যে দিন লণ্ডন পরিত্যাগ করেন, তিনি সেই দিনই বুঝিয়াছিলেন, বিলাতে একটা হৈ চৈ পড়িয়া যাইবে। এই অদ্ভূত বাজীর কথা যখন সংস্কার-সমিতির মন্দির হইতে জনসাধারণের মধ্যে প্রচারিত হইয়া পড়িল, তখন সমগ্র ইংলণ্ড ও আয়ারল্যাণ্ডে একটা তুমুল আন্দোলন উপস্থিত হইল।
যে শুনিল, সে-ই নানা ভাবে নানা যুক্তি-তর্ক দিয়া এই দুঃসাহসিক পর্য্যটন-ব্যাপারের পরিণাম আলোচনা করিতে লাগিল। কেহ কেহ সিদ্ধান্ত করিল, ফিলিয়াস্ ফগ নিশ্চয়ই কৃতকার্য্য হইবেন। কিন্তু অধিকাংশ লোকই মনে মনে বুঝিল, এ অসম্ভব ব্যাপার কখনও সম্ভব হইবে না—ফিলিয়াসের পরাজয় সুনিশ্চিত। কেহ কেহ বলিল, “এটা একটা পাগলামী ভিন্ন আর কিছুই নহে।” “টাইমস্,” “ষ্টাণ্ডার্ড,” “মর্নিং ক্রনিকেল” প্রভৃতি সুবিখ্যাত ২০ খানি পত্র-পত্রিকা সমন্বরে কহিল, ‘কখনো হবে না―কখনো হবে না―ফিলিয়াসের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।” একমাত্র “ডেইলি টেলিগ্রাম” পত্র কতকাংশে ফিলিয়াসের পক্ষাবলম্বন করিল। সাধারণে কহিল ‘ফিলিয়াস্ ফগ একটা উন্মাদ মাত্র।” এমন একটা অসম্ভব ব্যাপারে বাজী ধরিয়া লিপ্ত হইবার জন্য কেহ কেহ বা সংস্কার-সমিতির সদস্যদিগকে পর্য্যন্ত নিন্দা করিয়া বলিতে লাগিল, “এ কথা যিনি প্রথমে প্রস্তাব করিয়াছিলেন, তাঁহার মস্তিষ্কও বিকৃত হইয়াছে।”
সচিত্র লণ্ডন নিউজ পত্রে যখন ফিলিয়াস্ ফগের চিত্র প্রকাশিত হইল, তখন কোন কোন দুঃসাহসিক লোক—বিশেষতঃ কতকগুলি রমণী ফগের কার্য্যের সমর্থন করিল। কেহ কেহ এমনও বলিল, পৃথিবীতে কত আশ্চর্য্য ব্যাপার ঘট্ছে—তা এটা আর হবে না?”
৭ই অক্টোবর তারিখে রয়াল ভৌগোলিক সমিতির পত্রে একটি সুদীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশিত হইল। লেখক এই ভ্রমণ বৃত্তান্তের সমালোচনা করিয়া দেখাইলেন, ইহার সাফল্য একান্ত অসম্ভব। তিনি কহিলেন, ইহার পদে পদে বাধা—সে বাধা দুরতিক্রম্য। জাহাজ ও ট্রেণ যদি সর্ব্বদা ঠিক সময়মত যাতায়াত করে তবেই কৃতকার্য্য হওয়া সম্ভব। ইউরোপে হয় ত এরূপ ঘটিতে পারে, কিন্তু আমেরিকা এবং ভারতবর্ষে ইহা অসম্ভব। ট্রেণ ও ষ্টিমারের কল খারাপ হইয়া যাইতে পারে, রেল-লাইন হইতে গাড়ী নামিয়া পড়িতে পারে। রেল-সংঘর্ষ ঘটাও অসম্ভব নহে। ঝড়-তুফান, ভাসমান তুষারস্তূপ প্রভৃতি সমস্তই ফিলিয়াস্ ফগের বিষম অন্তরায়। খুব দ্রুতগামী ভাল জাহাজেরও অনেক সময় পথিমধ্যে ২।৩ দিন বিলম্ব হইয়া যায়। শীতকাল—ঝড়ের সময়। একদিন বিলম্ব হইলেই ত ফিলিয়াস্ ফগের সব মিটিল! কোন কারণে একখানা ষ্টিমার ধরিতে না পারিলেই অগ্রসর হইবার পথ রুদ্ধ হইয়া গেল—পরবর্ত্তী ষ্টিমার যে কবে ছাড়িবে, কে জানে?
প্রবন্ধ প্রকাশিত হইবামাত্রই উহা ইংলণ্ডের সকল পত্র-পত্রিকায় উদ্ধৃত হইয়া দেশমধ্যে প্রচারিত হইয়া পড়িল। ইতিপূর্ব্বেই এই ব্যাপার লইয়া বহু উচ্চ পণে যে বাজী ধরা আরম্ভ হইয়াছিল, সে পণের মুল্য পর্য্যন্ত অবিলম্বে কমিতে লাগিল। সপ্তাহ অতীত হইতে না হইতেই ফগের দল একান্ত দুর্ব্বল হইয়া পড়িল। এমন সময় লণ্ডন পুলিসের বড় কর্ত্তা তার যোগে নিম্নলিখিত সংবাদটি পাইলেন—
“ব্যাঙ্কের নোট-চোর ফিলিয়াস্ ফগের সন্ধান পাইয়াছি। তাহাকে বোম্বাই নগরে গ্রেপ্তার করিবার জন্য পরোয়ানা চাই। ফিক্স গোয়েন্দা। সুয়েজ বন্দর।”
এই সংবাদ মুহূর্ত্তমধ্যে চতুর্দ্দিকে প্রচারিত হইয়া পড়িল। যিনি এতদিন সাধু ও সজ্জন বলিয়া সুপরিচিত ছিলেন, মুহূর্ত্তমধ্যে তিনি ভণ্ড দস্যু বলিয়া ঘৃণার্হ হইলেন! সংস্কার-সমিতির সদস্যদিগের আলোকচিত্রের মধ্যে ফিরিয়াসের যে চিত্র ছিল, লোকে উৎসুক হইয়া সেই চিত্রের সহিত দস্যুর মূর্ত্তি মিলাইয়া লইতে লাগিল। এ কি! এ যে ঠিক সেই চক্ষু! সেই নাসিকা! সেই ভ্রুযুগ! সেই উন্নত কপোল! সব সেই, সব সেই! ফিলিয়াস্ ফগ তবে নিশ্চয়ই দস্যু! সর্ব্বনাশ! লোকটা কি ধুর্ত্ত! কেহ কেহ বলিল, “ফিলিয়াস্ ফগ যে সৎলোক নহে, তাহা পূর্ব্বেই জানা গিয়াছিল। দস্যু না হইলে কি কেহ অমন একাকী থাকে—ত্রিসংসারে কাহারও সহিত মেলা-মেশা করে না!” কেহ কেহ বা বলিল,—“দেখেছ কাণ্ড! যেই ব্যাঙ্কের টাকাটা হাতে পড়েছে, অনি দেশভ্রমণের নাম ক’রে একটা মিথ্যা হুজুগ তুলে দিয়ে সরেছে—পুলিশে যেন আর তার কোন খোঁজ-খবর না পায়! উঃ! ফিলিয়াস্ ফগ কি ভয়ানক লোক!”
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
অসম্ভব সংঘটন
দৃষ্ট সঙ্গে সঙ্গে থাকে। ফিলিয়াস্ ফগের অদৃষ্টও তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে ছিল, ফিক্স গোয়েন্দার অদৃষ্টও তাঁহার সঙ্গ ছাড়া হয় নাই। ভবিষ্যতের গর্ভে কি নিহিত রহিয়াছে, তাহা কে বলিতে পারে?
পি এণ্ড ও কোম্পানীর যতগুলি জাহাজ ছিল, তাহার মধ্যে মঙ্গোলিয়াই সর্ব্বাপেক্ষা অধিক দ্রুতগামী। আজ ২৯শে অক্টোবর—বুধবার। সুয়েজ বন্দরে মঙ্গোলিয়া জাহাজের আসিবার দিন। জাহাজের প্রতীক্ষায় জাহাজ-ঘাটে লোকারণ্য হইয়াছে। সকলের মুখেই এক কথা—“ওই আসিল, ওই আসিল।”
জাহাজের জন্য অপেক্ষা করিতে করিতে শ্রান্ত হইয়া দুইটি ভদ্রলোক সেই জনতা ঠেলিয়া জেটীর ধারে পাদচারণ করিতেছিলেন। ইঁহাদের মধ্যে একজন সুয়েজের ইংরাজ কন্সাল। তাঁহার সঙ্গীটি অপেক্ষাকৃত খর্ব্বকায় ও শীর্ণ। তাঁহার নয়নদ্বয় তীক্ষ্ণবুদ্ধিব্যঞ্জক, উজ্জ্বল ও চঞ্চল। কিসের যেন একটা চিন্তা তাঁহাকে এতই অধীর করিয়াছিল যে, তিনি ক্ষণমাত্রও এক স্থানে স্থির থাকিতে পারিতেছিলেন না। ইনিই গোয়েন্দা পুলিশ ফিক্স—ব্যাঙ্কের নোট-চোর ধরিবার জন্য সুয়েজ বন্দরে প্রেরিত হইয়াছিলেন।
আগতপ্রায় জাহাজের অপেক্ষায় জেটীতে যে সমস্ত লোক অপেক্ষা করিতেছিল, মিঃ ফিক্স বিশেষ মনোযোগের সহিত তাহাদের প্রত্যেকের মূর্ত্তি অবলোকন করিতেছিলেন। ইনিই কি সেই চোর! না ইনি নহেন। উনি বুঝি—না উনিও ত নহেন! ফিক্স বিশেষ ব্যস্ত হইয়া ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। ব্যাঙ্ককর্ত্তৃপক্ষদিগের প্রতিশ্রুত পুরস্কারের লোভ তাঁহাকে উৎসাহিত করিতে লাগিল। তিনিও অন্যের ন্যায় ব্যাকুল আগ্রহে মঙ্গোলিয়া জাহাজের জন্য অপেক্ষা করিতে করিতে তাঁহার সঙ্গীকে কহিলেন,—“আপনি তবে বল্তে চান, মঙ্গোলিয়ার কখনো দেরি হয় না?”
“না, কখনো দেরি হয় না। মঙ্গোলিয়া কাল সৈয়দ বন্দর ছেড়েছে। অত বড় একখানা জাহাজের কাছে সুয়েজের এই খালটা আর কতটুকু পথ? ঠিক নির্দ্দিষ্ট সময়ের আগে জাহাজ পৌঁছিলে সরকার বাহাদুর প্রত্যেকবার ৩৭৫ ৲ টাকা পুরস্কার দিয়ে থাকেন। আমি ত জানি, মঙ্গোলিয়াই সর্ব্বদা সে পুরস্কার পায়।”
“মঙ্গোলিয়া কি বরাবর ব্রিন্দিসি থেকে আসে?”
“হাঁ! ভারতবর্ষের ডাক ব্রিন্দিসিতেই জাহাজে উঠে। শনিবার বিকাল পাঁচটায় জাহাজ ছেড়েছে—এই এলো ব’লে। আপনি বেশী ব্যস্ত হবেন না। আচ্ছা, মনে করুন, ব্যাঙ্ক-দস্যু যদি জাহাজে থাকেই, আপনি দস্যুর চেহারার যে বর্ণনা পেয়েছেন, তা থেকেই কি তাকে চিনে নিতে পারবেন? আমার ত সন্দেহ হয়।”
“চেহারা কি! আমার মন তাকে চিনিয়ে দিবে। চোখে না দেখে যেমন কখন কখনও গায়ের গন্ধে মানুষ চেনা যায়, এও ঠিক তেমনি। এ বয়সে আমি হাজার হাজার চোর দেখলেম। যদি সে এই জাহাজে থাকে, তা হ’লে আমাকে আর ফাঁকি দিতে হবে না!”
“উঃ! এ একটা মস্ত চুরি! ভগবান্ করুন, আপনি যেন দস্যুকে ধরতে পারেন।”
“মস্ত বলে’ মস্ত! এমন চুরি ক’টা হয়? ভাবুন দেখি, নগদ সাড়ে আট লক্ষ টাকা! এ কি কম কথা! যদি ধরতে পারি তা হ’লে পুরস্কারও পাব অনেক। এমন সুযোগ জীবনে ক’বার ঘটে? আজকাল যে কেমন হয়েছে, এমন জাঁহাবাজ চোর আর বড় দেখতে পাওয়া যায় না। এখন কেবল ছেঁচ্ড়া চোরের দিন হয়েছে—দু’টাকা, চারটাকা পেলেই তারা খুসি।”
“আপনার কথাগুলো বড় উত্তেজনা পূর্ণ। আপনি যদি ধরতে পারেন, তা হ’লে ত ভালই হয়। কিন্তু আমার আশঙ্কা হচ্ছে—কাজটা বড় সহজ হবে না। আপনি যার চেহারার বর্ণনা পেয়েছেন, হয় ত হ’তে পারে, তিনি আদৌ চোর নন। সে চেহারা হয় ত একজন নির্দ্দোষী সাধু ভদ্রলোকের।”
“কি জানেন, বড় বড় চোরেরা বাহিরে ঠিক সাধু-সজ্জনের মতই থাকে। দস্যুর মত চেহারা যার, সে কি আর সাহস ক’রে চুরি করতে পারে? চেহারা দেখেই যে লোকে আগে তাকেই সন্দেহ করবে। ভণ্ড সাধুতার জীর্ণ আবরণ উন্মোচন করাই ত আমাদের কাজ। কাজটা খুব কঠিন বটে, কিন্তু ওতেই ত বাহাদুরী!”
এ দিকে জেটীর উপর লোকসমাগম বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইল। নানা দেশের নাবিক, মহাজন, ভারবাহী মুটে-মজুর প্রভৃতি সমবেত হইতে লাগিল।
দিনটি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন ছিল। লবণাম্বুস্পর্শশীতল মন্দ মন্দ পবন ধীরে ধীরে পূর্ব্বদিক্ হইতে বহিতেছিল। দুরে নগরমধ্যবর্ত্তী গম্বুজগুলির চূড়া তপনকিরণে ঝক্মক্ করিতেছিল। ধীবরদিগের সহস্র সহস্র ক্ষুদ্র তরণী লোহিত সাগরমধ্যে বিন্দুবৎ প্রতীয়মান হইতেছিল। প্রাচীন প্রথায় গঠিত দুই একখানি অর্ণবপোতও যে সেই বিন্দুগুলির সন্নিকটে না ছিল, তাহা নহে।
জেটীর ঘড়িতে সাড়ে দশটা বাজিয়া গেল।
ফিক্স নিতান্ত বাগ্র হইয়া কহিলেন, “না—এ জাহাজ আর আজ আস্বে না দেখছি।”
কন্সাল কহিলেন, “আর বেশ বিলম্ব নাই।”
“সুয়েজে কতক্ষণ নোঙ্গর করবে?”
“ঘণ্টা চারেক। এই খানেই জাহাজে কয়লা তোলে। সুয়েজ থেকে এডেন বন্দর ১৩১০ মাইল—বুঝতেই পারছেন, কত কয়লা প্রয়োজন।”
“সুয়েজ থেকেই বুঝি বরাবর বোম্বাই যায়?”
“হাঁ, একদমে বোম্বাই―পথে আর কোথাও দাড়ায় না।”
ফিক্স কহিলেন, “তাই ত! দস্যু যদি এই পথেই মঙ্গোলিয়া জাহাজে এসে থাকে, তা হ’লে ইংরাজ পুলিশকে ফাঁকি দেওয়ার মতলবে সে সুয়েজেই নামবে। তারপর এখান থেকে দিনেমার কি ফরাসীদের কোন একটা নিকটবর্ত্তী উপনিবেশে যাবার চেষ্টা করবে। ভারতবর্ষ ইংরাজের রাজত্ব। সেখানে গেলে যে কোন সুবিধা হবে না, তা সে বিলক্ষণই জানে।”
“লোকটা যে তেমন চালাক চতুর, আমার তা’ বোধ হয় না। চালাক হ’লে সে এতদূর আসবে কেন? লণ্ডনেই ত লুকিয়ে থাকা সহজ।”
কন্সাল এই কথা বলিয়া নিজ কর্ম্মস্থানে প্রস্থান করিলেন। তাঁহার কথায় গোয়েন্দার চিন্তা আরও বাড়িয়া উঠিল।
অবিলম্বে অদূরে ঘন ঘন তীব্র বংশীধ্বনি শ্রুতিগোচর হইল। যে যেখানে ছিল, সকলেই উর্দ্ধশ্বাসে জেটীর দিকে ছুটিল। তীরের নৌকাগুলি মুহূর্ত্তমধ্যে নোঙ্গর তুলিয়া বাঁধন খুলিয়া মঙ্গোলিয়া জাহাজের দিকে অগ্রসর হইল। ঠিক এগারটার সমন্ন মঙ্গোলিয়া নির্দ্দিষ্ট স্থানে নোঙ্গর নিক্ষেপ করিয়া হু হু শব্দে বাষ্প উদ্গীরণ করিতে লাগিল।
জাহাজে অনেক যাত্রী ছিল। কেহ কেহ জাহাজে থাকিয়াই চতুর্দ্দিকের মনোরম দৃশ্যাবলী দর্শন করিতে লাগিল, কেহ বা তরী আরোহণে তীরে আসিল। ফিক্স গোয়েন্দা অতি যত্নে প্রত্যেক আরোহীকে দেখিতে লাগিলেন। তিনি যখন এইরূপে ব্যাঙ্ক-দস্যুর সন্ধানে ব্যস্ত, তখন একজন যাত্রী জনতা ঠেলিয়া নিকটে আসিয়া তাঁহাকেই জিজ্ঞাসা করিল, “ম’শায়, বল্তে পারেন কন্সাল আফিস্টা কোথায়?” কথা কহিতে কহিতে আগন্তুক পকেট হইতে একখানি ছাড়-পত্র বাহির করিয়া বলিল, “আমি তাঁর সহি নিতে চাই।”
ফিক্স গোয়েন্দা ছাড়-পত্রখানি লইয়া পাঠ করিলেন। তাঁহার হস্ত কম্পিত হইতে লাগিল। কি অসম্ভব সংঘটন! ইহা যে সেই দস্যুরই ছাড়-পত্র? ইহাতে পত্রাধিকারীর আকৃতির যে বর্ণনা রহিয়াছে, দস্যুর আকৃতিও যে সেইরূপ! ফিক্স আগন্তুকের দিকে চাহিয়া কহিলেন—“এটা ত তোমার ছাড়-পত্র নয়?”
“না। এটা আমার মনিবের।”
“তিনি কোথায়?”
“জাহাজে আছেন।”
“তাঁকেই কন্সাল আফিসে যেতে হবে, তুমি গেলে চলবে না।”
“তিনি না গেলে কি চলবেই না?”
“না।”
“আফিস্টা কোথায়?”
অদূরে একটী গৃহ দেখাইয়া গোয়েন্দা কহিলেন “ওই যে সম্মুখের মোড়টা—ওইখানে।”
“তা হ’লে আমি যাই, মনিব ম’শায়কেই আনিগে।”
আগন্তুক পুনরায় জাহাজে প্রত্যাবর্ত্তন করিল।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
সুয়েজ বন্দরে
ক্স গোয়েন্দা কাল বিলম্ব না করিয়া কন্সালের নিকট যাইয়া কহিলেন—
“আমি আপনাকে বিরক্ত ক’রছি ব’লে ক্ষমা ক’রবেন। নোট-চোর যে মঙ্গোলিয়া জাহাজে আছে, আমি তার বিশেষ প্রমাণ পেয়েছি।”
তখন উভয়ের মধ্যে অনেক কথাবার্ত্তা হইল। আগন্তুকের সহিত সাক্ষাৎ, ছাড়-পত্র দর্শন প্রভৃতি সকল কথাই তিনি কন্সালের নিকট বর্ণনা করিলেন। কন্সাল কহিলেন—“উত্তম। তা হ’লে সে এখানেই আস্ছে। একটা পাপিষ্ঠের মুখদর্শন ক’রতে হ’বে ব’লে আমি দুঃখিত নই; কিন্তু সত্যই যদি সে চোর হয়—আর আপনি যেমন ব’লছেন, তাতে ত তাকে চোর ব’লেই বোধ হচ্ছে—তা হ’লে সে কখনো এখানে আসবে না। কোন্ দস্যু ইচ্ছা করে যে, তার পলায়ন-পথের রেখা বর্ত্তমান থাকে। ছাড়পত্রে দস্তখৎ নিয়েই বা কি হবে—আজকাল ত আর দরকার হয় না।”
“যদি তার কিছুমাত্র বুদ্ধি থাকে, তা হ’লে সে নিশ্চয়ই এখানে আস্বে।”
“কেন? তার ছাড়-পত্রখানা পাঁচজনকে দেখাতে না কি?”
“তা বৈ কি? দস্যুর পলায়নপথ নিষ্কণ্টক করা আর ভালমানুষকে অনর্থক জঞ্জালে ফেলা—এ ছাড়া ছাড়পত্রের আর কি কোনো উপকারিতা আছে, ব’লতে পারেন? এর ছাড় পত্রখানা যে ঠিকই আছে, তাতে আমার সন্দেহ নাই। ভরসা করি, আপনি ওতে স্বাক্ষর ক’রবেন না।
“কেন? যদি পত্রে কোন গোলযোগ না থাকে, তা হ’লে আমাকে ত বাধ্য হয়েই স্বাক্ষর ক’রতে হবে।”
“তা হোক্। আমি যতক্ষণ লণ্ডন থেকে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা না পাচ্ছি, ততক্ষণ ত দস্যুকে এখানে আট্কে রাখতে হবে।”
“মিঃ ফিক্স, সেটা হ’ল আপনার কাজ। আপনি তার ব্যবস্থা ক’রবেন কিন্তু আমার—”
কন্সালের মুখের কথা মুখেই রহিয়া গেল। উভয়ে শুনিলেন দ্বারে করাঘাত হইল। করাঘাতের সঙ্গে সঙ্গেই ভৃত্য আসিয়া দুই জন অপরিচিত লোককে তথায় রাখিয়া প্রস্থান করিল। ইহাদের মধ্যে একজন একখানা ছাড়-পত্র লইয়া স্বাক্ষর করিবার জন্য কন্সাল সাহেবের হস্তে প্রদান করিলেন। কন্সাল ছাড়-পত্রখানি বিশেষরূপে পরীক্ষা করিতে লাগিলেন, এ দিকে গোয়েন্দা ফিক্স এক কোণে নীরবে বসিয়া আগন্তুকের কেশাগ্র হইতে জুতার অগ্রভাগ পর্য্যন্ত অত্যন্ত আগ্রহের সহিত নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। ছাড়পত্র পাঠ করিয়া কন্সাল কহিলেন—“আপনার নাম ফিলিয়াস্ ফগ?”
“হাঁ।”
“এই লোকটি কি আপনার ভৃত্য?”
“হাঁ। ওর বাড়ী ফরাসী দেশে। নাম জিয়েন পাসে পার্ত্তুত।”
“আপনি লণ্ডন থেকে আস্ছেন?”
“হাঁ, লণ্ডন থেকে।”
“কোথায় যাবেন?”
“বোম্বাই।”
“আপনি বোধ হয় জানেন, এ সব কথা না জিজ্ঞাসা করলেও চল্তো। ছাড়-পত্রখানা দেখলেই যথেষ্ট হতো।”
“তা আমি জানি। আমি যে সুয়েজে এসেছি, আপনার স্বাক্ষর নিয়ে তার প্রমাণ রাখতে চাই।”
“আচ্ছা, বেশ।”
কন্সাল দ্বিরুক্তি না করিয়া উহাতে স্বাক্ষর করিলেন। মিঃ ফগ তাহার পাওনা-গণ্ডা বুঝাইয়া দিয়া অভিবাদন করিয়া প্রস্থান করিলেন। জিয়েন প্রভুর পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিয়া গেল।
ফিক্স গোয়েন্দা ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন―
“এখন আপনার কি মনে হয়?
“চেহারা দেখে ত মনে হয় লোকটা নিতান্ত ভালমানুষ।”
“তা হ’তে পারে। সে কথা হচ্ছে না। আপনার কি বোধ হয় না এই গম্ভীর প্রকৃতির ভদ্রলোকটীর মূর্ত্তি সেই দস্যুর মূর্ত্তির সঙ্গে ঠিক-ঠাক মিলে যাচ্ছে?”
“হাঁ মিল্ছে বৈ কি। কিন্তু সব সময় চেহারার বর্ণনা”―গোয়েন্দা বাধা দিয়া কহিলেন, “সে আমি দেখে নিচ্ছি। আমার বোধ হয় প্রভু অপেক্ষা ভৃত্যের কাছে ঘেঁসা অনেকটা সহজ হবে। লোকটাও যখন ফরাসী, তখন কিছুতেই মুখ খুঁজে থাক্তে পারবে না। তবে আমি বিদায় হই। এখনই আবার আস্ছি।”
ফিক্স গোয়েন্দা অবিলম্বে জিয়েনের সন্ধানে বহির্গত হইলেন।
কন্সালের অফিস হইতে বহির্গত হইয়া মিঃ ফগ জেটীতে প্রত্যাবর্ত্তন করিলেন এবং ভৃত্যকে কতকগুলি কার্য্যের ভার দিয়া তরণীযোগে জাহাজে গমন করিলেন।
ফিলিয়াস্ ফগের রোজনামচার খাতায় ২রা অক্টোবর হইতে ২১ ডিসেম্বর পর্য্যন্ত প্রত্যেক দিনের জন্য নির্দ্দিষ্ট স্থান ছিল। কোন্ মাসে কোন্ তারিখে কোন্ বারে কোন্ সময়ে তাঁহাকে প্যারিস, ব্রিন্দিসি সুয়েজ, বোম্বাই প্রভৃতি প্রধান প্রধান স্থানগুলিতে পৌঁছিতে হইবে সেই খাতায় তাহা লিখিত ছিল। কোন্ স্থানে পৌছিতে নির্দ্দিষ্ট সময় অপেক্ষা কত অধিক বা কত অল্প সময় লাগিল, তিনি তাহাও লিখিয়া রাখিতেছিলেন।
ফিলিয়াস্ ফগ জাহাজে প্রত্যাবর্ত্তন করিয়া তাঁহার খাতা বাতির করিলেন। তাহাতে লেখা ছিল;—
২রা অক্টোবর, বুধবার সন্ধ্যা ৮টা ৪৫ মিনিটের সময়―লণ্ডন ত্যাগ।
বৃহস্পতিবার প্রভাত ৮টা ৪০ মিনিটের সময়―প্যারিস।
শুক্রবার ৪ঠা অক্টোবর, প্রভাত ৬টা ৩৫ মিনিটের সময়—মণ্ট সিনেইএর পথে তুরীন নগরে আগমন।
শুক্রবার প্রভাত ৭টা ২০ মিনিটের সময়—তুরীন পরিত্যাগ।
শনিবার ৫ই অক্টোবর অপরাহ্ন ৪টার সময়—ব্রিন্দিসি।
শনিবার অপরাহ্ন ৫টার সময়—মঙ্গোলিয়া জাহাজে যাত্রা।
খাতার পৃষ্টায় মিঃ ফগ লিখিলেন—বুধবার ৯ অক্টোবর বেলা ১১টার সময় সুয়েজ বন্দরে আগমন। এ পর্য্যন্ত মোট ১৫৮ ১ / ২ ঘণ্টা অথবা ৬ ১ / ২ দিন লাগিয়াছে।
সপ্তম পরিচ্ছেদ
সংবাদ-সংগ্রহ
ক্স গোয়েন্দা অল্পকাল মধ্যেই জেটীর উপর জিয়েনের সহিত মিলিত হইলেন। জিয়েন তখন চতুর্দ্দিকের শোভা দেখিয়া তৃপ্ত হইতেছিল। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন—
“কি গো তোমাদের ছাড়পত্র ঠিক সহি করা হয়েছে ত।”
“আপনি যে! ধন্যবাদ। হাঁ, সবই ঠিক হয়েছে।”
“তুমি বুঝি চারিদিকের শোভা দেখে বেড়াচ্ছ?”
“হাঁ। আমরা যেমন তাড়াতাড়ি চলেছি, তাতে সবই যেন আমার কাছে স্বপ্ন বলে’ মনে হচ্ছে। এটাও ত সুয়েজ—কেমন নয়?”
“হাঁ সুয়েজ।”
“তা হ’লে আমরা মিসর দেশে এসেছি দেখছি।”
“নিশ্চয়ই।”
“মিসরে―তা হ’লে ত আমাদের আফ্রিকাতেই আসা হয়েছে।”
“হাঁ, আফ্রিকাতে ত বটেই।”
“তাই ত! আফ্রিকা! সত্য সত্যই কি আমরা এখন আফ্রিকায়? একবার ভাবুন দেখি ব্যাপারখানা কি? আমার ত ধারণাই ছিল না যে, আমরা কখনো প্যারিস নগরের বাহিরে যাব। সেখানেই বা কতটুকু সময় ছিলাম! সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিট থেকে ৮টা ৪০ মিনিট পর্য্যন্ত―এক ঘণ্টা। আমরা যখন আসি তখন ভয়ানক বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির মধ্যেই একখানা গাড়ীর জানালা দিয়ে যা’ একটু দেখেছি। আমার এখন বড় আপশোষ হচ্ছে। প্যারিসের সে সব সুন্দর সুন্দর স্থান আবার দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে।”
“তা হ’লে দেখছি তোমাকে বড়ই তাড়াতাড়ি যেতে হচ্ছে।”
“না—আমার আবার তাড়াতাড়ি কিসের? আমার মনিবেরই যত তাড়াতাড়ি। ভাল কথা দেখুন, আমাকে কয়েকটা কামিজ আর এক জোড়া জুতা কিনতে হবে। আমরা যখন লণ্ডন থেকে আসি তখন আমাদের সঙ্গে একটা ছোট কার্পেট-ব্যাগ ভিন্ন আর কিছুই ছিল না।”
“চল না, এখনই তোমাকে বাজারে নিয়ে যাচ্ছি। সেখানে যা’ চাবে তা’ই পাবে।”
জিয়েন সবিনয়ে কহিল, “আপনি একান্ত সজ্জন। আচ্ছা চলুন তবে। জাহাজখানা ছাড়ার আগেই আবার আমাকে ফিরে আস্তে হবে।”
উভয়ে গল্প করিতে করিতে নগরমধ্যস্থ বিপণির দিকে যাত্রা করিলেন। যাইতে যাইতে গোয়েন্দা কহিলেন, “এখনো জাহাজ ছাড়ার দেরি আছে। এই ত সবে ১২টা বেজেছে।”
জিয়েন তাহার প্রকাণ্ড ঘড়িটা পকেট হইতে বাহির করিয়া কহিল, “বারটা বেজেছে! আমার ঘড়িতে ত ৯টা বেজে ৫২ মিনিট।”
“তা হলে তোমার ঘড়ি ভুল।”
“ভুল—আমার ঘড়ি ভুল! আমার ঠাকুরদাদার আমল থেকে ঘড়িটা, ঠিক সময় দিয়ে আস্ছে, আর আজ ভুল হ’য়ে গেল! আমি উত্তরাধিকার সূত্রে এই ঘড়ি পেয়েছি। এতে ঠিক সময় থাকে—বছরে পাঁচ মিনিটও এদিক ওদিক্ হয় না। এ কি আমার সাধারণ ঘড়ি―এ যেন একটা ক্রনমিটার।”
“কেন যে সময়ের অত তফাৎ হয়েছে, তা আমি বুঝতে পেরেছি। তোমার ঘড়িতে লণ্ডনের সময় আছে। সুয়েজের সময় আর লণ্ডনের সময় এক নয়। সুয়েজে যখন ১২টা বাজে তখন লণ্ডনের বড়িতে প্রায় ১০টা। যেখানেই যাও বেলা ঠিক ১২টার সময় সেই দেশের ঘড়ির সঙ্গে নিজের ঘড়ি মিলিয়ে নিও। তা হ’লে সময় ঠিক থাকবে।”
“কখনো না—আমার ঘড়ি যেমন আছে তেমনি থাক্।”
“বেশ, সূর্য্যের সঙ্গে তা হ’লে ও ঘড়ির মিল থাকবে না।”
“না থাকলে আমি নিরুপায়। তাতে আমার কিছু ক্ষতি নাই—সূর্য্যেরই ক্ষতি―ঠিক সময়টা দিতে পারবে না! আমার ঘড়ি কি ভুল হ’তে পারে ম’শায়।”
জিয়েন গর্ব্বিত চিত্তে তাহার ঘড়িটা পকেটের মধ্যে রাখিয়া দিল।
গোয়েন্দা জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমরা বোধ হয় বড় তাড়াতাড়ি লণ্ডন থেকে বেরিয়েছ?”
“হাঁ খুবই তাড়াতাড়ি। গত বুধবার রাত্রি ঠিক ৮টার সময় আমার মনিব তাঁর ক্লাব থেকে ফিরে এলেন। তারপর ৪৫ মিনিটের মধ্যেই আমাদের বেরিয়ে পড়তে হ’লো।”
“তোমার মনিব কোথায় যাচ্ছেন?”
“বরাবর সম্মুখে—দুই চক্ষু যে দিকে চলেছে। তিনি পৃথিবীটা পরিভ্রমণ করতে বেরিয়েছেন।”
“পৃথ্বী-পরিভ্রমণ!”
“হাঁ পৃথ্বী পরিভ্রমণ—তা’ও আবার মাত্র ৮০ দিনে! তিনি বলেন যে একটা বাজী ধরেই এ কাজে হাত দিয়েছেন। কিন্তু আপনাকে বলতে বাধা কি, আমি ত এ কথার বিন্দুমাত্রও বিশ্বাস করি না। মাথার ঠিক থাকলে কি আর কেউ এমন কাজে হাত দেয়? আমার ত বোধ হয় এর অন্য কারণ আছে।
“তোমার মনিব ত বড় আশ্চর্য্য লোক দেখছি। ওঁর জোড়া মেলা ভার।”
“কতকটা তাই বটে”
“উনি কি একজন বড় লোক?”
“নিশ্চয়ই। ওঁর সঙ্গে টাকা কত। সবই ব্যাঙ্কের টাটকা নোট! খরচ-পত্র করতে মুনিব মহাশয়কে কখনো কুণ্ঠিত দেখি না। নির্দ্দিষ্ট সময়ের আগে মঙ্গোলিয়া জাহাজ বোম্বাই পৌছিলে মঙ্গোলিয়ার কলওয়ালাকে বিশেষ পুরস্কার দিতে চেয়েছেন।
“তুমি কি অনেকদিন থেকে এর চাকুরি করছ?”
“অনেক দিন ত দূরের কথা যে দিন আমরা লণ্ডন ছেড়েছি, ঠিক সেই দিন থেকেই আমার চাকুরির আরম্ভ।”
ভৃত্যের কথা শুনিয়া ফিক্স গোয়েন্দার চিত্ত যে কিরূপ উদ্বেলিত হইয়াছিল, তাহা সহজেই অনুমেয়। ব্যাঙ্কে দস্যুতা হইবার পর পরই অত তাড়াতাড়ি লণ্ডন পরিত্যাগ, সঙ্গে অত ব্যাঙ্ক নোট, একটা বাজীর ভাণ করিয়া ভারতবর্ষে পৌছিবার জন্য এত বাগ্রতা এ সমস্তই গোয়েন্দা ফিক্সের পূর্ব্ব সন্দেহকে আরও সুদৃঢ় করিয়া তুলিল। তিনি মনে মনে সঙ্কল্প করিলেন দস্যুর এই ফরাসী ভৃত্যের নিকট হইতে আরও সংবাদ সংগ্রহ করিতে হইবে।
তিনি জিয়েনের সহিত গল্প আরম্ভ করিলেন। কথা প্রসঙ্গে বুঝিতে পারিলেন যে ফিলিয়াস্ ফগ লণ্ডনে একাকী বাস করেন। লোকে বলে তাঁহার অর্থের অভাব নাই—কিন্তু কিরূপে কোন্ স্থান হইতে উহা আইসে তাহা কেহ জানে না। মিঃ ফগের জীবন কুহেলিকা-সমাচ্ছন্ন। সে অন্ধকার যবনিকার অন্তরালে যে কি লুক্কায়িত আছে তাহা কেহই জানে না—ভৃত্যটাও সে কথা বলিতে পারে না।
তাঁহার চিন্তা-স্রোতকে বাধা দিয়া জিয়েন জিজ্ঞাসা করিল—
“বোম্বাই কি এখান থেকে অনেক দূর?”
“নিতান্ত কম দূর নয়। জাহাজে ১০ দিনে যাওয়া যায়।”
“বোম্বাই কোন্ দেশে?”
“ভারতবর্ষে।”
“ভারতবর্ষে? তবে বুঝি এসিয়ায়?”
“হাঁ—এসিয়ায়। হায় কপাল! বাতিটার কথাই আমার দিনরাত মানে হচ্ছে?”
“বাতি! কিসের বাতি!”
“যখন আমি লণ্ডন থেকে আসি তখন আমার কক্ষের গ্যাসের বাতিটা নিবিয়ে দিতে ভুলে এসেছি। বাতিটা আমারই খরচে আজ পর্য্যন্তও জ্বলছে। বাতির জন্য আমার প্রতিদিন দেড়টাকা করে’ লোকসান হচ্ছে—আনার দৈনিক মাহিনার চেয়েও রোজ ছয় আনা করে’ বেশী কাটা যাচ্ছে! যদি আমরা সকালে সকালে লণ্ডনে ফিরতে না পারি—”
ফরাসী জিয়েনের দুর্দ্দশার কাহিনী শুনিবার অবসর তখন মিঃ ফিক্সের আদৌ ছিল না। সম্মুখেই মঙ্গোলিয়া অর্ণবপোত। সেই পোতেই ব্যাঙ্কদস্যু ফিলিয়াস্ ফগ স্বচ্ছন্দচিত্তে বোম্বাই প্রস্থান করিতেছে— অথচ তাহাকে ধরিবার উপায় নাই! ব্যাঙ্ক-প্রতিশ্রুত পুরস্কাররাশি গোয়েন্দা সাহেবের মুষ্টি মধ্যে আসিয়াও যেন হাতের বাহির হইয়া যাইতেছে! হায় হায়! এ কি বিড়ম্বনা! দস্যুকে ধরিবার উপায়ও নাই, বিলম্ব করিবারও সময় নাই! মিঃ ফিক্স জিয়েনকে একটা দোকানের নিকট রাখিয়া ত্বরিত পদে কন্সালের নিকট আসিয়া কহিলেন—
“ফিলিয়াস্ ফগই যে দস্যু তাতে আর আমার সন্দেহ নাই। সে প্রচার করেছে যে ৮০ দিনে পৃথিবী ভ্রমণ করতে বেরিয়েছে। ভূ-প্রদক্ষিণের ভাণ ক’রে সে এখন সরে’ পড়ার চেষ্টায় আছে।”
“লোকটা ত দেখছি খুবই ধূর্ত্ত। পৃথিবীর সমস্ত পুলিসকে ফাঁকি দিয়ে শেষে নিশ্চয়ই লণ্ডনে ফিরে যাবে।”
“যত দিন আমি আছি, তা আর যেতে হবে না! দেখা যাক কে হারে কে জিতে।”
“কিন্তু মিঃ ফিক্স, আপনার ত ভুল হয় নাই? সতাই কি ফিলিয়াস ফগই সেই দস্যু?”
“আমার দৃঢ় বিশ্বাস ফিলিয়াস্ ফগই দস্যু।”
“সে যে সুয়েজে এসেছিল, ছাড়পত্রে আমার স্বাক্ষর নিয়ে তার প্রমাণ রাখার কারণ কি বলতে পারেন?”
“হাঁ-—তা—সে কথাটার উত্তর আমি এখন ঠিক দিতে পারছি না। তবে আমি যে সংবাদ সংগ্রহ করেছি তাও বলি শুনুন।”
জিয়েনের সহিত গোয়েন্দা সাহেবের যে কথাবার্ত্তা হইয়াছিল তিনি, সে সমস্তই কন্সালের নিকট বর্ণনা করিলেন। সকল অবস্থা শুনিয়া কন্সাল সাহেব কহিলেন—
“তা বটে—বাহ্য অবস্থা যে সমস্তই লোকটীর বিরুদ্ধে, এ কথা আর অস্বীকার করা যায় না। আপনি এখন কি করবেন স্থির করেছেন?”
“একখানা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার জন্য আমি এখনই লণ্ডনে তারে সংবাদ পাঠাচ্ছি। পরোয়ানা বোম্বাইতে এলেই চলবে। আমাকেও ত এই জাহাজেই বোম্বাই যেতে হচ্ছে। বোম্বাই ইংরাজের রাজত্ব—সেখানে দস্যুকে গ্রেপ্তার করতে আর মুস্কিল কি।”
মঙ্গোলিয়া ছাড়িবার অল্প সময়ই বাকি ছিল দেখিয়া গোয়েন্দা বিদায় হইলেন এবং লণ্ডনে তারে সংবাদ দিয়া একেবারে আসিয়া জাহাজে উঠিলেন।
তিনি যে লণ্ডনে কি সংবাদ দিয়াছিলেন তাহা আমরা ইতিপূর্ব্বেই দেখিয়াছি।
অষ্টম পরিচ্ছেদ
মঙ্গোলিয়া অর্ণবপোত
য়েজ হইতে এদেন বন্দর ঠিক ৩১০ মাইল। সাধারণ জাহাজ ১৩৮ ঘণ্টাতেই এই পথ অতিক্রম করিতে পারে। কিন্তু মঙ্গোলিয়া যেরূপ বেগে অগ্রসর হইতেছিল তাহাতে সকলেই বুঝিয়াছিল যে নির্দ্দিষ্ট দিনের অনেক পূর্ব্বেই জাহাজ গন্তব্য স্থানে পৌঁছিবে।
ব্রিন্দিসি হইতে যে সকল আরোহী জাহাজে উঠিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে অনেকেই ভারতবর্ষে আসিতেছিলেন। কেহ বা কলিকাতায় যাইবেন, কেহ বা বোম্বাই থাকিবেন। ভারতবর্ষের পেনিন্সুলার রেল পথ খোলা হইয়াছিল বলিয়া তখন আর লঙ্কা ঘুরিয়া কলিকাতায় যাইতে হইত না। যাত্রীদিগের মধ্যে সামরিক ও অন্যান্য বিভাগের উচ্চপদস্থ অনেক রাজকর্ম্মচারী ছিলেন। জাহাজে বন্দোবস্তের কোনো ত্রুটি ছিল না। প্রভাতে প্রাতরাশ, অপরাহ্ন দুইটায় জলযোগ, সাড়ে পাঁচটায় সান্ধ্যভোজ, ৮টায় নৈশ আহার। নানাবিধ সুন্দর সুন্দর ভোজ্য ও পেয় মঙ্গোলিয়ার ভোজনাগারে খানার টেবিলে শোভা পাইত। রমণীগণ দিবসে দুইবার করিয়া বেশ পরিবর্ত্তন করিতেন। নৃত্য ও গীতে মঙ্গোলিয়া জাহাজ মুখরিত হইয়া উঠিত।
লোহিত সাগর বড় চঞ্চল ও প্রারই তরঙ্গসমাকুল। যখনই প্রবহমান বেগশালী বায়ু আসিয়া জাহাজকে স্পর্শ করিত তখনই মঙ্গোলিয়া কাঁপিত, দুলিত, তরঙ্গে তরঙ্গে নৃত্য করিত। কাহার সাধ্য দাঁড়াইয়া থাকে! পিয়ানোর কোমল মধুর স্বর-লহরী তখন নীরব হইত, রমণীর লীলাচঞ্চল চরণ সংঘাতে তখন আর নৃত্যশালা কম্পিত হইত না। কিন্তু মঙ্গোলিয়া পোত সেই তুফান ঠেলিয়া তরঙ্গ ভাঙ্গিয়া নক্ষত্রবেগে ছুটিতেছিল।
সম্মুখে তরঙ্গভঙ্গময় অনন্ত সমুদ্র, নৃত্যশীল তরঙ্গের শিরে নৃত্যশীল অর্ণবপোত। চারিদিকে জলোচ্ছ্বাস—অবিরাম বিকট জলভঙ্গরব, মধ্যে মধ্যে বেগশালী পবনের ভীষণ হাহাধ্বনি―ফিলিয়াস্ ফগ কি এই সকল দেখিয়া হতাশ হইতেছিলেন? তাঁহার চরিত্র সেরূপ ছিল না। যদি বা কখনো মুহূর্ত্তের জন্য এ সকল চিন্তা তাঁহার হৃদয়ে আসিত, কিন্তু বাহিরে উহা প্রকাশিত হইত না। কিছুই তাঁহাকে বিচলিত করিতে পারিত না।
তিনি কদাচিৎ জাহাজের ডেকের উপর আসিতেন, কদাচিৎ উচ্ছৃঙ্খল অথচ সুন্দর লোহিত সাগরের দিকে চাহিয়া দেখিতেন; মানব ইতিহাসের কোন্ পৃষ্ঠা এই সাগরের কাহিনীর সহিত বিজড়িত থাকিয়া গৌরবময় হইয়াছিল কদাচিৎ সে চিন্তা তাঁহার হৃদয়ে স্থান পাইত। কোন্ অতীত যুগের কোন্ বিরাট ঘটনা, যাহা পৃথিবীর ইতিহাসের কায়া পরিবর্ত্তিত করিয়াছিল, যাহা লোহিত সাগরকে চিরস্মরণীয় ও চিররমণীয় করিয়া রাখিয়াছে, তাহা কদাচিৎ তাঁহার চিন্তার বিষয়ীভূত হইত।
দূরে নীলাকাশের গাত্রে যে সকল নগর আলেখ্যবৎ প্রতিভাত হইত, কদাচিৎ তিনি সে দিকে চাহিয়া দেখিতেন। ষ্ট্রাবো, এরিয়ান, আর্টিমিডরাস, প্রভৃতি প্রাচীন পর্য্যটকগণ যে ভীষণ আরব্য সাগরের ভীষণ বর্ণনা করিয়া যাত্রীদিগের ভীতি ও চিন্তার কারণ ঘটাইয়া গিয়াছেন, যে আরব্য সাগর অতিক্রম করিবার পূর্ব্বে এককালে শঙ্কিত নাবিকগণ সমুদ্র-দেবতার পূজা না করিয়া কখনো জাহাজ ছাড়িত না—ফিলিয়াস্ ফগ সে বিষয়েও নিতান্ত নিশ্চিন্ত ছিলেন। এমন কি মঙ্গোলিয়া পোত পূর্ব্ববৎ দ্রুতবেগে যাইতেছে কি তুফানে শ্লথগতি হইয়াছে সে চিন্তাও তাঁহার হৃদয়ে স্থান পাইত না।
ফিলিয়াস্ ফগ কি তবে তাঁহার কক্ষমধ্যে বদ্ধ থাকিয়া কার্য্যহীন সময় নিদ্রায় অতিবাহিত করিতেন? তাহা নহে। জাহাজেই তাঁহার তিন জন সঙ্গী জুটিয়াছিল। তাঁহারাও ফিলিয়াসেরই ন্যায় তাসক্রীড়ায় মত্ত ছিলেন। মঙ্গোলিয়া কম্পিতই হউক আর তরঙ্গের শিরে নৃত্যই করুক; ফিলিয়াসের তাহাতে কিছু আসিয়া যাইত না। তিনি নিরূপিত সময়ে ভোজন করিতেন এবং সঙ্গিত্রয়ের সঙ্গে হুইষ্ট খেলিতেন। তাঁহার সময় কাটিতে সময় লাগিত না।
জিয়েনও বেশ স্বচ্ছন্দ চিত্তেই সময় অতিবাহিত করিতেছিল। চতুর্দ্দিকের নানা দৃশ্যাবলী, উচ্ছ্বসিত সাগরের উদ্দাম লীলা-ভঙ্গ এবং জাহাজের সুস্বাদু ভোজ্য ও পেয়ঃ প্রভৃতি তাহাকে সর্ব্বদা পরিতৃপ্ত রাখিত। তাহার মনে মনে বিশ্বাস হইয়াছিল বোম্বাই গেলেই তাহাদিগের ভ্রমণব্যাপার পরিসমাপ্ত হইবে, নতুবা এ অস্বাভাবিক পর্য্যটন আর কতদিন চলিতে পারে!
জাহাজের ডেকে পাদচারণ করিতে করিতে জিয়েন দেখিল তাহার সুয়েজের সেই সজ্জন বান্ধবটীও একজন সহযাত্রী। তাঁহাকে দেখিয়াই সে কহিল—
“আমি ত আপনাকে সুয়েজে দেখেছি না? সেখানে আপনি অনুগ্রহ করে আমার জন্য কত শ্রম করেছিলেন।”
“ও তাই ত! তুমিই ত সেই! সেই মাথা-পাগলা ইংরেজ ভদ্রলোকের ফরাসী ভৃত্য—কেমন না?”
“হাঁ। আপনি ঠিকই ধরেছেন মিষ্টার—”
গোয়েন্দা কহিলেন, “আমার নাম ফিক্স।”
“মিঃ ফিক্স, জাহাজে আপনাকে দেখে বড় সন্তুষ্ট হলেম। আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”
“তোমাদেরই মত বোম্বাই নগরে।”
“বেশ বেশ ভালই হ’ল। আপনি কি আর কখনো বোম্বাই গিয়েছিলেন?”
“আমি প্রায়ই যাই। পি এণ্ড ও কোম্পানীর আমি একজন এজেণ্ট।”
“ও তা’ হলে দেখছি আপনি নিশ্চয়ই ভারতবর্ষ বেশ চিনেন!”
আত্মগোপন করিয়া গোয়েন্দা কহিলেন, “হাঁ কতকটা জানি বৈ কি?”
পৃথিবীর মধ্যে ভারতবর্ষ একটা আশ্চর্য্য দেশ। কেমন নহে কি?”
“খুব আশ্চর্য্য দেশ। সেখানে কত মস্জেদ, কত মিনার, কত মন্দির আছে। কত বাঘ, কত সাপ, কত ফকির, আর কত নর্ত্তকী সেখানে দেখতে পাওয়া যায়।”
“বটে! বটে!”
“তোমরা বোধ হয় ঘুরে ফিরে দেশটা একবার দেখেই যাবে?”
“আমার ত তাই ইচ্ছা। ৮০ দিনে পৃথিবী পরিভ্রমণ করার দোহাই দিয়ে সমস্ত জীবনটা কি এই রকম করে জাহাজ থেকে রেল-গাড়ীতে আর রেলগাড়ী থেকে জাহাজে লাফিয়ে লাফিয়ে কাটানো যায়! এ সব কুস্তি আর বেশী দিন চল্বে ব’লে বোধ হয় না। ভরসা হয় বোম্বাই গেলেই সব থেমে যাবে।”
“মিঃ ফগ ভাল আছেন ত?”
“ধন্যবাদ। তিনি বেশ সুস্থ আছেন। আমিও ভালই আছি। আমি ঠিক রাক্ষসের মত খাচ্ছি। সমুদ্রের হাওয়ায় বোধ হয় ক্ষুধা বাড়ায়।”
“কৈ তোমার মনিব ত কখনো ‘ডেকে’ আসেন না!”
“না। তাঁর কোন বিষয়েই কৌতূহল নাই।”
“মিষ্টার জিয়েন, আমার বোধ হয় এই ৮০ দিনে পৃথিবী-পরিভ্রমণের ব্যাপারটা একটা ভাণ মাত্র। এর অন্তরালে বিশেষ কোনো একটা গুরুতর বিষয় লুকানো আছে। হয়ত কোনো রাজনৈতিক ব্যাপারও হ’তে পারে। কি বল?”
“শপথ ক’রে বল্তে পারি, আমি এ সব কথার কিছুই জানি না। জানার জন্য আমার কোন আগ্রহও নাই।”
সে দিনের মত কথাবার্ত্তা এইখানেই সমাপ্ত হইল। কিন্তু পরে সুযোগ পাইলেই ফিক্স গোয়েন্দা এই ফরাসী ভৃত্যের নিকট হইতে সংবাদ সংগ্রহ করিতে চেষ্টা করিতেন। সে জন্য তিনি মধ্যে মধ্যেই জিয়েনকে দুই এক গ্লাস মদ্যপান করিবার নিমিত্ত নিমন্ত্রণ করিতেন। জিয়েন ভাবিত, বাঃ, লোকটা কি অমায়িক—এমন ভদ্রলোক দেখা যায় না।
জাহাজ যেন চলিতেছিল চলিতেই লাগিল। ওই অদূরে ভগ্ন জীর্ণ প্রাচীরবেষ্টিত মোসা নগর। প্রাচীরের উপর দিয়া কতকগুলি খর্জ্জুর বৃক্ষ শির উত্তোলন করিয়া সমুদ্র দর্শনে আত্মহারা। দূরে অতি বিস্তীর্ণ কফির ক্ষেত্র। মোসার দিকে চাহিলে মনে হয় যেন ইহার আকৃতি একটা প্রকাণ্ড চা’র পেয়ালা ও রেকাবের মত।
দ্রুতগামী মঙ্গোলিয়া মোসা ছাড়িল, বেবেলমণ্ডেব ছাড়িল, এদেন বন্দরের উত্তরে অবস্থিত ষ্টীমার পইণ্ট ছাড়িল। তখনো বোম্বাই ১৬৫০ মাইল। ১৫ই তারিখে এদেন বন্দরে না আসিয়া মঙ্গোলিয়া ১৪ই সন্ধ্যাকালেই তথায় পৌছিয়াছিল। ফিলিয়াস্ ফগ মোটের উপর ১৫ ঘণ্টা সময় হাতে পাইলেন।
ষ্টিমার পইণ্টে অবতরণ করিয়া ফিলিয়াস্ ফগ ছাড়পত্র স্বাক্ষর করাইয়া আনিলেন। গোয়েন্দা ফিক্স অলক্ষিতভাবে তাঁহার পশ্চাদনুসরণ করিতে ছাড়িল না।
সন্ধ্যা ছয়টার সময় জাহাজের নোঙ্গর উঠিল। মঙ্গোলিয়া বিপুল ভারত মহাসাগরে ভাসিতে ভাসিতে বোম্বাই অভিমুখে যাত্রা করিল। তখনো বোম্বাই বন্দর ১৬৮ ঘণ্টার পথ ছিল।
আকাশ নির্ম্মল ও উজ্জ্বল। ধীরে বায়ু বহিতেছিল। মঙ্গোলিয়ার কাপ্তান সুযোগ বুবিয়া পাল তুলিয়া দিলেন। কলে ও পালে জাহাজের বেগ বর্দ্ধিত হইয়া উঠিল। জাহাজের কম্পন থামিল। রমণীগণ পুনরায় বেশভূষা করিয়া নৃত্যগীতে মন দিলেন। মরালের মত জল কাটিরা মঙ্গোলিয়া অগ্রসর হইল।
নবম পরিচ্ছেদ
জিয়েনের দুর্দ্দশা
ঙ্গোলিয়া নির্দ্দিষ্ট তারিখের দুই দিন পূব্বেই বোম্বাই আসিয়া উপনীত হইল। সন্ধ্যা ৮টার সময় কলিকাতার ট্রেন ছাড়িবে। মিঃ ফগ হুইষ্ট খেলা শেষ করিয়া তীরে অবতরণ করিলেন। ভৃত্য সঙ্গেই ছিল। তাহাকে কতকগুলি আবশ্যক দ্রব্যাদি ক্রয় করিবার আদেশ দিয়া এবং সময়মত রেলষ্টেশনে উপস্থিত হইতে বলিয়া তিনি কন্সাল-আফিসে গমন করিলেন।
নগরের শোভা সন্দর্শন করিবার ইচ্ছা তাঁহার আদৌ ছিল না। বোম্বাইয়ের সুবৃহৎ পুস্তকাগার, সুরক্ষিত দুর্গ, সুবিস্তৃত জাহাজ-ঘাটা, সুবিশাল মস্জেদ, ভারতবর্ষের বাজার এ সমস্ত তাঁহার কৌতূহল উদ্দীপিত করিতে পারিল না। এমন কি এলিফেণ্টার গুহা পর্য্যন্ত ফিলিয়াস্ ফগকে আকর্ষণ করিতে অক্ষম হইল।
কন্সাল-আফিস পরিত্যাগ করিয়া তিনি স্টেশনে আসিয়া আহার করিলেন।
ফিক্স দারোগা অল্পক্ষণ পরেই জাহাজ হইতে অবতরণ করিয়া পুলিশ-আফিলে গেলেন এবং তথায় আত্ম পরিচয় দিয়া দস্যুর পশ্চাদ্ধাবনের কাহিনী বর্ণনা করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “লণ্ডন থেকে কোন পরোয়ানা এসেছে কি?” উত্তরে শুনিলেন, “না, আসে নাই।” পরোয়ানাখানা লণ্ডন হইতে বোম্বাইয়ে পৌঁছিবার উপযুক্ত সময় তখনো হইয়াছিল না। গোয়েন্দা হতাশ হইয়া পড়িলেন। তিনি পুলিশ কমিশনারের নিকট একখানি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রার্থনা করিলেন। পুলিশ কমিশনার কহিলেন, “এ পরোয়ানা বিলাত হইতে দিবে। আমার দিবার কোন অধিকার নাই।”
মিঃ ফিক্স নিরুপায় হইয়া বিলাতের পরোয়ানার অপেক্ষার রহিলেন এবং দস্যু যাহাতে পলায়ন করিতে না পারে, সে জন্য তাঁহার উপর খর দৃষ্টি রাখিলেন। তাঁহার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, মিঃ ফগ অন্ততঃ দুই চারিদিন বোম্বাই নগরে থাকিবেনই। ইহার মধ্যেই পরোয়ানা আসিয়া উপস্থিত হইবে।
জিয়েনেরও ধারণা ছিল যে, তাহারা কিছুকাল বোম্বাই নগরে থাকিবে কিন্তু তাহার স্বপ্ন ভাঙ্গিয়া গেল। সে দেখিল, অন্ততঃ কলিকাতা পর্য্যন্ত যাইতেই হইতেছে। কে বলিতে পারে আরো অধিক দূর যাইতে হইবে না। তাহার ধীরে ধীরে বিশ্বাস হইতে লাগিল, ‘তবে বুঝি পৃথ্বী-ভ্রমণের বাজীর কথা মিথ্যা নহে।’ সে তাহার পোড়া অদৃষ্টকে ধিক্কার দিতে লাগিল।
প্রভুর আদেশমত জিনিষপত্র ক্রয় করিয়া জিয়েন রাজপথে ভ্রমণ করিতে লাগিল। ইংরাজ, ফরাসী, সিন্ধিয়, আরমেনিয়—কত দেশের লোক নানাপ্রকার বেশভূষা করিয়া পথে বাহির হইয়াছে। ভ্রমণ করিতে করিতে জিয়েন দেখিল পার্শীদিগের একটা শোভাযাত্রা আসিতেছে। চিক্কণ রঙ্গীন গোলাপী বসনে সজ্জিতা কতকগুলি নর্ত্তকী নিপুণতা সহকারে নৃত্য করিতে করিতে সেই শোভাযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে যাইতেছে। উদ্দাম স্বরলহরী তুলিয়া যন্ত্রী যন্ত্র বাজাইতেছে। জিয়েন বিপুল আনন্দে সেই শোভাযাত্রা দেখিতে লাগিল। যন্ত্রের কোমল রাগিণী তাহার কর্ণে মধু বর্ষণ করিতে লাগিল। সে আত্মহারা হইয়া বিশ্ববিস্ফারিত নেত্রে শোভাযাত্রার দিকে চাহিয়া রহিল।
জিয়েন যতই ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে লাগিল, তাহার কৌতূহলও ততই বর্দ্ধিত হইতে আরম্ভ করিল। রেলওয়ে ষ্টেশনের পথে আসিতে আসিতে সে দেখিল, অদূরে মালাবার শৈল-শৃঙ্গে একটা সুন্দর দেউল দেখা যাইতেছে। জিয়েন ভাবিল, ‘এমন সুন্দর মন্দিরটা একবার দেখিব না?’ সে অগ্রসর হইল।
ফরাসী জিয়েন জানিত না যে কতকগুলি মন্দিরে, এমন কি মন্দিরের প্রাঙ্গণে পর্য্যন্ত খ্রীষ্টানের প্রবেশাধিকার নাই। যাহারা প্রবেশ করিবার অধিকারী, তাহাদিগকেও প্রাঙ্গণোপ্রান্তে পাদুকা পরিত্যাগ করিয়া প্রবেশ করিতে হয়। এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাইলেই ইংরাজের রাজদণ্ড ব্যত্যয়কারীর শিরে নিপতিত হয়।
অনভিজ্ঞ জিয়েন যখন নিঃসন্দিগ্ধচিত্তে পাদুকাসহ মন্দির-প্রাঙ্গণে প্রবেশ করিয়া একান্ত উল্লাসের সহিত মনে মনে মন্দিরের কলাকৌশলের প্রশংসা করিতেছিল, তখন কে যেন আসিয়া মুহূর্ত্তমধ্যে তাহাকে ভূপাতিত করিল! সে চক্ষু চাহিয়া দেখিল, তিন জন ক্রুদ্ধ হিন্দু তাহার নিকটে দাঁড়াইয়া একান্ত দুর্ব্বোধ্য ভাষায় তীব্র ভাবে শাসন করিতেছে। একজন বলপূর্ব্বক তাহার পাদুকা খুলিয়া দূরে নিক্ষেপ করিল এবং অপর দুইজন মুহূর্ত্তমধ্যে তাহাকে আক্রমণ করিয়া ভীমবেগে প্রহার করিতে লাগিল!
সেই চটুল ফরাসী চক্ষের নিমেষে উঠিয়া দাঁড়াইল এবং দুই চারিটা সুপরিচালিত অভ্যস্ত মুষ্ট্যাঘাতে বিপক্ষদলকে পরাজিত করিয়া নক্ষত্রবেগে গলায়ন করিল। চারিদিকে শব্দ উঠিল—ধর্ ধর্, মার্ মার্! ক্ষিপ্ত হিন্দুগণ ছুটিতে লাগিল—ধর্ ধর্, মার্ মার্! পলায়মান জিয়েন অল্পক্ষণ মধ্যেই রাজপথের লোক-সমুদ্রে মিশিয়া গেল—আর কেহ তাহার সন্ধান পাইল না।
ট্রেণ ছাড়িবার ৫ মিনিট পূর্ব্বে জিয়েন হাঁপাইতে হাঁপাইতে ষ্টেশনে আসিয়া উপস্থিত হইল। তখন তাহার পরিচ্ছদ ছিন্ন, মস্তক অনাবৃত, চরণদ্বয় নগ্ন। প্রভুর জন্য সে যে সকল দ্রব্যাদি ক্রয় করিয়াছিল, সেগুলি পর্য্যন্ত সে গোলমালে হারাইয়া ফেলিয়াছিল। ফিক্স গোয়েন্দা তখন ষ্টেশনের প্লাটফর্ম্মে ফিলিয়াস্ ফগের অনতিদূরে অলক্ষিতে অপেক্ষা করিতেছিলেন। তিনি জিয়েনের অবস্থান্তর দেখিয়া রিস্মিত হইলেন। জিয়েন তাহার দুর্দ্দশার কাহিনী সংক্ষেপে মিঃ ফগের নিকট বর্ণনা করিল। মিঃ ফগ যেমন শান্তভাবে গাড়ীতে উঠিতেছিলেন, তেমনি উঠিতে উঠিতে বলিলেন, “ভরসা করি, এমন কাজ আর কখনো কর্বে না।” টুপীহীন পাদুকাবিহীন হতবুদ্ধি জিয়েন আর দ্বিরুক্তি না করিয়া গাড়ীতে উঠিয়া বসিল।
ফিক্স গোয়েন্দাও দস্যুর পশ্চাদ্ধাবন করিবার জন্য সেই ট্রেণেই যাইবেন স্থির করিয়াছিলেন, কিন্তু জিয়েনের কাহিনী শুনিয়া ক্ষান্ত হইলেন—ভাবিলেন, দেখা যাক্ কি হয়। বাঁশী বাজিল। বোম্বাই মেল কলিকাতা অভিমুখে যাত্রা করিল।
দশম পরিচ্ছেদ
বিপদে কিউনি
গাড়ীতে ফিলিয়াস্ ফগ তাঁহার ভৃত্যকে লইয়া উঠিয়াছিলেন, সেই গাড়ীতেই জেনেরল্ সার ফ্রান্সিস্ ক্রোমাটি ছিলেন। মঙ্গোলিয়া জাহাজে ইঁহার সহিতই মিঃ ফগ হুইষ্ট খেলিতেন। সার ফ্রান্সিস্ সিপাহী যুদ্ধের সময় যথেষ্ট বীরপণার পরিচয় দিয়াছিলেন। তাঁহার জীবনের অধিকাংশ কাল ভারতবর্ষেই কাটিয়াছিল। তিনি ইতিপূর্ব্বেই মিঃ ফগের পাগলামী লক্ষ্য করিয়াছিলেন। তাঁহার রকম-সকম দেখিয়া অনেক সময় সার ফ্রান্সিসের সন্দেহ হইত, বুঝি এই রক্তমাংসের দেহের ভিতর প্রাণ নাই—যে হৃদয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করিতে সর্ব্বদা লালায়িত, বুঝি ফিলিয়াসের দেহে সে হৃদয় নাই। কর্ম্মক্ষেত্রে ফ্রান্সিসের সহিত কত রকম লোকের সম্বন্ধ ঘটিয়াছিল, কিন্তু মিঃ ফগের মত লোক তিনি আর কখনও দেখেন নাই।
ট্রেণ যেমন চলিতেছিল, তেমনি চলিল। তাঁহারা দেখিতে দেখিতে পশ্চিমঘাট পর্ব্বতমালার গুহাগুলি অতিক্রম করিলেন। কথাপ্রসঙ্গে সার ফ্রান্সিস্ কহিলেন―
“আর কিছুদিন আগে হ’লে আপনাকে বিফলমনোরথ হ’তে হ’তো—৮০ দিনে পৃথ্বী-ভ্রমণ সম্ভব হ’তো না।”
“কেন?”
ঘাটপর্ব্বতমালার পাদদেশ পর্য্যন্তই তখন রেল ছিল। তারপর আর রেলপথ ছিল না। তখন সেখান থেকে পাল্কীতে কিম্বা অশ্বারোহণে যেতে হতো।”
“ও সব সামান্য বিঘ্নে আমার যে বিশেষ কিছু অসুবিধা হ’তো তা বোধ হয় না। পথে যে মধ্যে মধ্যে বাধাবিঘ্ন এসে উপস্থিত হ’বে, সেটা ত জেনে শুনেই বেরিয়েছি।”
“যা হোক্ মিঃ ফগ, আজই ত আপনার সব গিয়েছিল আর কি। আপনার চাকরটাই সব মাটি করতে বসেছিল!” যখন এই সকল কথা হয়, তখন জিয়েন একখানা কম্বল জড়াইয়া নিশ্চিন্তে নিদ্রা যাইতেছিল। সার ফ্রান্সিস্ বলিতে লাগিলেন,—
“ব্রিটিশ-রাজত্বে এ সব অপরাধ অত্যন্ত গুরুতর বলে গণ্য হয়। এ দেশের প্রজাসাধারণের ধর্ম্মবিশ্বাসের উপর যা’তে আঘাত লাগে, ইংরাজের আমলে তেমন কিছু ঘটতে পারে না। আজ যদি আপনার চাকরটী ধরা পড়তো―”
“তা হ’লে আর কি হ’তো বলুন। এ দেশের আইন অনুসারে না হয় তার দণ্ড হ’তো, দু’দিন পরই সে আবার ইউরোপে ফিরে যেত। চাকরের জন্য কি আর আমাকে পর্য্যন্ত এখানে আট্কে বসে থাকতে হতো! তা নয়। আমি তা হ’লে একাই চলে যেতেম।”
ক্রমেই রজনী গভীরা হইতে লাগিল—সকলে নিদ্রিত হইয়া পড়িলেন। ট্রেণ যেমন তীরবেগে যাইতেছিল, তেমনি চলিল।
প্রভাত—অতি সুন্দর প্রভাত। মেঘশূন্য নির্ম্মল নীল আকাশ সূর্য্য-কিরণে হাসিতেছে। দূরে ধূসরবর্ণ গিরিশ্রেণী মেঘের ন্যায় শোভা পাইতেছে। রেলপথের উভয় পার্শ্বে সুবিস্তৃত কর্ষিত ভূমি―মধ্যে মধ্যে দুইকখ এানি খণ্ড গ্রাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের বৈচিত্র্য ঘটাইতেছে মাত্র। কোথাও বা গ্রামপ্রান্তে অবস্থিত দুই একটী ক্ষুদ্র মিনার বা মন্দিরের চূড়া ক্ষণেকের জন্য দেখা যাইতেছে। গোদাবরী নদীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শাখাপ্রশাখাগুলি বান্দেশের এই বিশাল প্রান্তর ধৌত করিরা নানাস্থান দিয়া বহিয়া চলিয়াছে।
জিয়েন মনোযোগের সহিত চতুর্দ্দিক্ দেখিতে লাগিল। এই কি সেই নদীমেখলা কাননকুন্তলা শৈলকিরীটিনী ভারতভূমি? ওই কি তাহার বাতান্দোলিত তরঙ্গায়িত শ্যাম সমুদ্র? ওই না দূরে দূরে কফি, তূলা ও লবঙ্গের ক্ষেত্র দেখা যাইতেছে। না, এ বুঝি ভারতবর্ষ নহে! সে দেখিতে লাগিল, কোথাও সুদীর্ঘ তালবৃক্ষগুলি উন্নতশিরে দণ্ডায়মান রহিয়াছে। এঞ্জিনের মুখনিঃসৃত কুণ্ডলীকৃত মসিবর্ণ ধূমরাশি তাহাদের মস্তক স্পর্শ করিয়া ক্ষণিকের জন্য আবৃত করিয়া—উড়িয়া যাইতেছে। কোথাও বা হরিৎ ক্ষেত্রের মধ্যে মনোহর গৃহগুলি চিত্রলেখাবৎ শোভা পাইতেছে, কোথাও বা পরিত্যক্ত ধর্ম্মমন্দিরগুলি ভারতীয় স্থাপত্যের জীর্ণ জয়পতাকা শিরে বহন করিয়া এখনও মৌনে দণ্ডায়মান রহিয়াছে। কোন স্থানে রেলপথ দুর্ভেদ্য কাননভূমি অতিক্রম করিয়া চলিয়াছে। ভীষণকায় শার্দ্দূল, বিষাক্ত সর্পাদি রেলগাড়ীর অবিরাম ঘর্ঘর নিনাদে ভীত হইয়া এদিক ওদিক্ পলায়ন করিতেছে, কোন স্থানে দুই একটী সুবৃহৎ মাতঙ্গ উন্নতশুণ্ড হইয়া দূর হইতে দ্রুতগামী গাড়ীর দিকে চাহিয়া রহিয়াছে।
ট্রেণ তখন মল্লিগ্রাম প্রদেশ অতিক্রম করিতেছিল। শক্তিপূজার নরশোণিতে আর্দ্র হইয়া যে ভূমি একদিন শাক্তদিগের নিকট পবিত্র হইয়াছিল, ইহা সেই ভূমি। ওই সুদূরে ইলোরার ভুবনবিখ্যাত মন্দিরাদির উন্নত শৈলশৃঙ্গ তপ্ত তপনকিরণে ঝলসিতেছে। এই বুঝি ঔরঙ্গাবাদ। এখানেই একদিন শাহান্শাহ বাদশাহ ঔরঙ্গজেব রাজধানী নির্ম্মাণ করিয়াছিলেন। এই প্রদেশেই ত একদিন ঠগীসর্দ্দার ফেরিঙ্গিয়া পাশবরাজ্য বিস্তার করিয়াছিল। এমন একদিন ছিল, যখন এ অঞ্চলের প্রতি গ্রামে, প্রতি ক্ষেত্রে, প্রতি অরণ্যে ঠগীহস্তে নিহত বালক যুবক বৃদ্ধ, এমন কি রমণীর পর্য্যন্ত মৃতদেহ পতিত থাকিতে দেখা যাইত। ইংরাজের শাসনে ঠগীদিগের সে ভীষণ অত্যাচার এখন একেবারেই বিলুপ্ত হইয়াছে।
বেলা সাড়ে বারটা বাজিল। ট্রেন বহরমপুর ষ্টেশনে আসিয়া দাঁড়াইল। ঝুঁটা মতি বসানো এক জোড়া চটি জুতা ক্রয় করিয়া জিয়েন একটু গর্ব্বভরে তাহার নগ্নপদ আবৃত করিল!
মালাবারের দুর্ঘটনার পর হইতেই জিয়েনের মতি ফিরিয়াছিল। বোম্বাই আসিবার পূর্ব্ব পর্য্যন্ত তাহার বিশ্বাস ছিল, এ বিকট ভ্রমণ সেই স্থানেই শেষ হইবে। কিন্তু ভারতবর্ষের চিত্তাকর্ষক দৃশ্যাবলী তাহার সুপ্ত পর্য্যটন-স্পৃহাকে পুনরায় জাগ্রত করিয়া দিল। তাহার যৌবনের উদ্দাম ভাব সকল পুনর্ব্বার আসিয়া দেখা দিল। সে এখন বিশ্বাস করিল যে তাহার প্রভুর বাজী ধরার কাহিনী সম্পূর্ণ সত্য। যেমন করিয়াই হউক ৮০ দিনের মধ্যে পৃথিবী ঘুরিয়া আসিতেই হইবে। সে জন্য ফিলিয়াস্ ফগ অপেক্ষা এখন তাহার চিন্তাই অধিক হইল। ঠিক সময় মত যাওয়া যাইবে ত? পথে ত কোন বিঘ্ন ঘটিবে না? কোন কারণে বিলম্ব হইবে না ত? বাজীটা জয় করিতে পারিলে কত গৌরব! পূর্ব্বদিন যে তাহার নির্ব্বুদ্ধিতার জন্যই সমস্ত নষ্ট হইতে বসিয়াছিল, সেই কথা স্মরণ করিয়া এখন তাহার হৃৎকম্প হইতে লাগিল। কোন ষ্টেশনে একটু অধিক ক্ষণ ট্রেণ দাঁড়াইলেই জিয়েন বিরক্ত হইতে লাগিল! সে অবশেষে ট্রেণের ড্রাইভারকে পর্য্যন্ত উদ্দেশে গালি দিতে আরম্ভ করিল এবং মনে মনে বলিতে লাগিল, আমার মনিবও যেমন—ড্রাইভারকে কিছু দিলেই ত সে আরও বেগে গাড়ী চালাইত!
২২শে তারিখ প্রভাত ৮ টার সময় ট্রেণ আসিয়া রোখাল হইতে ১৫ মাইল দূরে থামিয়া গেল। গার্ড সাহেব চীৎকার করিয়া কহিল নাম—নাম—গাড়ী থেকে নাম এখানে বদল হইবে।”
ফিলিয়াস্ ফগ এ কথার তাৎপর্য্য বুঝিতে না পারিয়া সার ফ্রান্সিসের মুখের দিকে চাহিলেন। জিয়েন মুহূর্ত্তমধ্যে অবতরণ করিয়া সংবাদ আনিল, ট্রেণ আর চলিবে না—পথ নাই।
সার ফান্সিস্ বলিলেন, “তুমি কি বল্ছো! ট্রেণ আর চল্বে না মানে কি?”
“আমি বল্ছি যে ট্রেণ আর এক হাতও যাবে না!” কথা শুনিয়াই ফিলিয়াস্ ফগ ও জেনেরল ক্রোমাটি অবতরণ করিলেন এবং সম্মুখেই গার্ডকে দেখিয়া জেনেরল সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন―
“আমরা কোথায় এসেছি?”
খোল্বি গ্রামে!”
“এখানে এতক্ষণ দাঁড়াবার কারণ কি?”
“ওদিকে এখনো রেলপথ প্রস্তুত হয় নাই।”
“প্রস্তুত হয় নাই! সে কি কথা?”
“এখান থেকে এলাহাবাদ ৫০ মাইল। এ ৫০ নাইল রেলপথ এখনো হয় নাই। এলাহাবাদ থেকে আবার ট্রেণ পাওয়া যাবে।”
“আমরা ত সংবাদপত্রে দেখেছি লাইন শেষ হয়ে গেছে।”
“তার আর আমি কি কর্ব বলুন। সংবাদপত্রের সেটা ভুল!”
সার ফ্রান্সিস্ ক্রমশঃ কুপিত হইতেছিলেন। তিনি রুক্ষস্বরে কহিলেন, “লাইন হয় নাই, অথচ বরাবর কলিকাতার টিকিট দেওয়া হ’ল কেন?”
“টিকিট ত বরাবরই দেওয়া হচ্ছে। সকলেরই এটা জানা আছে যে যাত্রীরা নিজেদের বন্দোবস্তে খোল্বি থেকে এলাহাবাদ যায়!”
গার্ডের কথা শুনিয়া সার ফান্সিসের ক্রোধ সীমা অতিক্রম করিল। যদি পারিত তাহা হইলে জিয়েন অবিলম্বে গার্ড সাহেবকে উত্তম মধ্যম লাগাইয়া দিত, কিন্তু ফিলিয়াস্ ফগের দিকে চাহিবার সাহসই তাহার ঘটিল না!
ফিলিয়াস্ ফগ কহিলেন, “সার ফ্রান্সিস্ চলুন। যেমন করেই হোক্ এলাহাবাদ ত যেতে হ’বে। দেখা যাক্ কোন উপায় হয় কি না।”
“এখন আর কি বন্দোবস্তই বা করা যাবে? এখানে যত বিলম্ব হওয়ার সম্ভাবনা দেখ্ছি, আপনার বাজীর এখানেই শেষ হ’বে বোধ হচ্ছে!”
“ও কিছু নয়! ওর জন্য ভাব্বেন না! বিলম্ব যে হ’বে সেটা আগেই ভেবে রেখেছি।”
সার ফ্রান্সিস্ সবিস্ময়ে কহিলেন—“লাইন যে প্রস্তুত হয় নাই, সেটা কি তবে আগেই আপনার জানা ছিল?”
“না—তা ছিল না। তবে আমার যাত্রাপথে যে অনেক বাধাবিপত্তি এসে দাঁড়াতে পারে, সে সম্বন্ধে আমার কখনো সন্দেহ ছিল না।”
“কলিকাতার ট্রেণ ধরতে না পারলে যে এখন আপনার সর্ব্বস্ব যায়!”
“ট্রেণ ধরতে পার্ব বৈ কি। ২৩শে দ্বিপ্রহরের আগে কলিকাতা থেকে হংকংএর জাহাজ ছাড়বে না। আজ ত কেবল ২২শে। এখনো অনেক সময় আছে!”
এমন স্থির নিশ্চিন্ত উত্তরের আর প্রত্যুত্তর ছিল না! অন্যান্য যাত্রীরা অনেকেই ইহা জানিত যে খোল্বি হইতেই গাড়ী বদল করিতে হয়। প্রত্যেকেই নিজের নিজের বন্দোবস্ত রাখিয়াছিল। কাহারও অশ্ব, কাহারও শিবিকা, কাহারও বা গো-শকট অপেক্ষা করিতেছিল। যাত্রীরা আপন আপন যান-বাহন লইয়া প্রস্থান করিল। মিঃ ফগ এবং সার ফ্রান্সিস্ কোন প্রকার যানই পাইলেন না! ফিলিয়াস্ ফগ কহিলেন, “যখন কোন যান নাই, তখন আর উপায় কি? আমি হেঁটেই যাব!”
জিয়েন এই কথা শুনিয়া তাহার অকর্ম্মণ্য ঝক্ঝকে চটি জুতার দিকে চাহিয়া একটা অর্থপূর্ণ মুখভঙ্গী করিল।
একাদশ পরিচ্ছেদ
বিন্ধ্যারণ্যে
ল্পক্ষণ পর জিয়েন আসিয়া সংবাদ দিল, —
“আমাদের যাবার উপায় হয়েছে।”
“কি উপায়?”
“একটা হাতী এখানে আছে।”
“চল দেখে আসা যাক্।”
ষ্টেশনের অনতিদূরেই সেই হস্তীর অধিকারী বাস করিত। জিয়েন তাহার প্রভু ও সার ফ্রান্সিসকে লইয়া তথায় গমন করিল। হস্তীটা সবলকায়। ফিলিয়াস্ ফগ মনে মনে বুঝিলেন, উহা তাহাদিগকে এলাহাবাদ লইয়া যাইতে পারিবে। তিনি অধিকারীকে জিজ্ঞাসা করিলেন―
“তোমার হাতীর নাম কি?”
“কিউনি।”
“হাতীটা চলে কেমন?”
“বেশ চলে।”
“আমরা এলাহাবাদ যাব, হাতীটা চাই।”
“আমার হাতী ‘গরম’ হয়েছে। এ হাতী ভাড়া দিব না।”
“ফিলিয়াস্ ফগ ছাড়িবার পাত্র নহেন। কহিলেন,―
“আমি ঘণ্টায় ১৫০ ৲ টাকা ভাড়া দিব।”
“আমি ভাড়া চাই না।”
“তিন শ টাকা?”
“না।”
“চার শ?”
“না সাহেব! আপনারা অন্যত্র চেষ্টা দেখুন।” জিয়েনের মুখ বিবর্ণ হইল। সার ফ্রান্সিস্ বুঝিলেন পৃথ্বী ভ্রমণের এইখানেই শেষ।
ফিলিয়াস্ ফগ একান্ত অবিচলিত। তিনি কহিলেন, “আচ্ছা ভাড়া না দাও, বিক্রয় কর।”
“বিক্রয়?”
“হাঁ বিক্রয়। আমি ১৫০০০ ৲ টাকা দিব।”
অধিকারী মাথা নাড়িল। ভাবিল সাহেবটা, পাগল নাকি! ব্যাপার দেখিয়া সার ফ্রান্সিস্ মিঃ ফগকে অন্তরালে লইয়া গিয়া দর বাড়াইতে নিষেধ করিলেন। কহিলেন, “অনেক দাম হয়েছে। এর ঢের কমেই এদেশে হাতী পাওয়া যায়।”
প্রত্যুত্তরে ধীর ভাবে মিঃ ফগ বলিলেন—“উত্তেজনার বশবর্ত্তী হ’য়ে আমি কোন দিন কিছু করি না। ঠিক সময়ে এলাহাবাদ ত যেতেই হ’বে। তার উপরই তিন লাখ টাকার বাজী নির্ভর করছে! যেমন করেই হোক্ হাতীটা চাই-ই চাই।”
পরক্ষণেই তিনি অধিকারীর নিকটে আসিয়া কহিলেন, “পনর হাজারে হ’বে না? আচ্ছা, আঠার হাজার? বিশ হাজার? বাইশ হাজার? পঁচিশ হাজার? তা’ও না! আচ্ছা, ত্রিশ হাজার দিব!”
ত্রিশ হাজার! জিয়েনের রক্তাভ বদনমণ্ডল অবিলম্বে পাণ্ডুবর্ণ হইয়া উঠিল! সার ফ্রান্সিস্ হতবুদ্ধি হইয়া গেলেন! অধিকারী দেখিল আর অধিক প্রত্যাশা করা ভাল নহে—কি জানি যদি সাহেবের মন ঘুরিয়া যায়! সে হস্তীটী বিক্রয় করিতে সম্মত হইল।