রোবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম

মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Kanti Chandra Ghosh (†1949) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন

রোবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম

শ্রীকান্তিচন্দ্র ঘোষ

প্রকাশক শ্রী শচীন্দ্র লাল মিত্র কমলা বুক ডিপো লিমিটেড ১৫, কলেজ স্কোয়ার কলিকাতা

মূল্য সাড়ে তিন টাকা

মুদ্রাকর শ্রী রবীন্দ্র নাথ মিত্র শ্রীপতি প্রেস ৩৮, নন্দকুমার চৌধুরী লেন, কলিকাতা

প্রকাশকের নিবেদন

গত নয় বৎসরের মধ্যে শ্রীযুক্ত কান্তিচন্দ্র ঘোষের ‘রোবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম’ নামক ক্ষুদ্র পুস্তকখানির এতগুলি সংস্করণ নিঃশেষিত হইয়াছে, যাহাতে মনে হয় বঙ্গদেশের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে এখন এমন কেহ নাই যিনি এই কবিতাগুলির সহিত পরিচিত নহেন।

এতদিন পরে ইহার চিত্রিত সংস্করণ প্রকাশিত হইল। ইহার জন্য পাঠক সাধারণের নিকট কোনও কৈফিয়ৎ দিবার প্রয়োজন আছে বলিয়া মনে হয় না, কেননা ইহা তাঁহাদেরই একান্ত আগ্রহ এবং সনির্ব্বন্ধ অনুরোধের ফল। তাঁহাদের নিকট এই চিত্রিত সংস্করণ আদৃত হইলে আমাদের যত্ন শ্রম এবং অর্থব্যয় সার্থক মনে করিব।

এই সংস্করণে যে সকল চিত্র প্রকাশিত হইল, তাহার অধিকাংশ উদীয়মান শিল্পী শ্রীযুক্ত মনীষী দের অঙ্কিত। এ কার্য্যে তাঁহার উৎসাহ এবং প্রেরণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাকিগুলি শ্রীযুক্ত সিদ্ধেশ্বর মিত্র, শ্রীযুক্ত চঞ্চলকুমার বন্দোপাধ্যায় ও শ্রীযুক্ত বসন্তকুমার গঙ্গোপাধ্যায়ের অঙ্কিত। ইঁহারা সকলেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে শিল্পীগুরু অবনীন্দ্রনাথের শিষ্য। শেষোক্ত দুইজন ফরাসী দেশে তাঁহাদের শিল্পশিক্ষা সমাপ্ত করিয়াছেন। আশা করি এই চিত্রগুলি সাধারণের নিকট উপযুক্ত সমাদর লাভ করিবে।

‘বিচিত্রা’ সম্পাদক শ্রীযুক্ত উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় এবং তাঁহার কলাভিজ্ঞা ভ্রাতুষ্পুত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা এই গ্রন্থ পরিকল্পন বিষয়ে গ্রন্থকারকে তথা আমাদিগকে অনেক বিষয়ে সাহায্য করিয়া কৃতার্থ করিয়াছেন। ইতি,

শ্রী শচীন্দ্র লাল মিত্র ম্যানেজিং ডিরেক্টর, কমলা বুক ডিপো লিঃ

কুঞ্চিকা

ভূমিকা

ফার্সি আমরা জানি নে, কিন্তু ও ভাষার বড় বড় কবিদের নাম আমাদের সকলেরই নিকট সুপরিচিত। হাফিজ ও সাদীর নাম ভদ্রসমাজে কে না জানে? ওমার খৈয়ামের নাম কিন্তু দু’দিন আগে এদেশে কেউ শোনে নি, এমন কি ফার্সিনবিশেরাও নয়। যদিচ এ যুগের সমজদারদের মতে তিনিই হচ্ছেন ইরানদেশের সব চাইতে বড় কবি।

আজকের দিনে ওমার যে আমাদের একজন অতিপ্রিয় কবি হয়ে উঠেছেন, সে ইউরোপের প্রসাদে। ওমার প্রায় হাজার বছর আগে পারস্য দেশের নৈশাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তারপর তাঁর কবিত্বের খ্যাতি কালক্রমে বৃদ্ধি পাওয়া দূরে থাক্—সাহিত্যসমাজে তাঁর নাম পর্য্যন্ত লুপ্ত হয়ে এসেছিল। কিছুদিন পূর্ব্বে জনৈক ইংরাজ কবি ওমারকে আবিষ্কার করেন, এবং সেই সঙ্গে তাঁর কবিতা ইংরাজিতে অনুবাদ করে ইউরোপের চোখের সমুখে ধরে দেন।

আকাশ-রাজ্যে একটি নূতন জ্যোতিষ্ক আবিষ্কৃত হলে বৈজ্ঞানিক সমাজ যেমন চঞ্চল ও উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন, মনোরাজ্যে এই নব নক্ষত্রের আবিষ্কারে ইউরোপের কবি-সমাজ তেমনি চঞ্চল ও উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। ফলে এযুগে ইউরোপের এমন ভাষা নেই যাতে ওমারের একাধিক অনুবাদ নেই, ইউরোপের এমন সহর নেই যেখানে এই নবকাব্যরসের ঐকান্তিক চর্চ্চার জন্য একাধিক কাব্যগোষ্ঠী গঠিত হয়নি। এই নব নক্ষত্রের একটি নব উপাসক-সম্প্রদায়ও সে দেশে গড়ে উঠেছিল, শুনতে পাই গত যুদ্ধে সে সম্প্রদায় মারা গেছে। সে যাই হোক সেকালের এসিয়ার কবিতা একালের ইউরোপের হাতে রূপান্তরিত হয়ে আমাদের কাছে এসে উপস্থিত হয়েছে, এবং আমরাও তার অপূর্ব্ব রস দেখে চমৎকৃত ও মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি।

এ কবিতার জন্ম হৃদয়ে নয়, মস্তিষ্কে। ওমার খৈয়াম ছিলেন একজন মহা পণ্ডিত। তিনি সারাজীবন চর্চ্চা করেছিলেন শুধু বিজ্ঞানের, কাব্যের নয়। অঙ্কশাস্ত্রে ও জ্যোতিষে তিনি সেকালের সর্ব্বাগ্রগণ্য পণ্ডিত ছিলেন। তিনি এই জ্ঞান-চর্চ্চার অবসরে গুটিকয়েক চতুস্পদী রচনা করেন, এবং সেই চতুস্পদী কটিই তাঁর সমগ্র কাব্যগ্রন্থ। এত কম লিখে এত বড় কবি সম্ভবত এক ভর্ত্তৃহরি ছাড়া আর কেউ কখন হন নি। ভর্ত্তৃহরির সঙ্গে ওমারের আরও এক বিষয়ে সম্পূর্ণ মিল আছে। উভয়েই জ্ঞানমার্গের কবি, ভক্তিমার্গের নন।

ওমারের সকল কবিতার ভিতর দিয়ে যা ফুটে উঠেছে, সে হচ্ছে মানুষের মনের চিরন্তন এবং সব চাইতে বড় প্রশ্ন:—

“কোথায় ছিলাম, কেনই আসা, এই কথাটা জান্‌তে চাই

যাত্রা পুনঃ কোন্ লোকেতে?— * * ”

* * * *

এ প্রশ্নের জবাবে ওমার খৈয়াম বলেন:—

“সব ক্ষণিকের, আসল ফাঁকি, সত্য মিথ্যা কিছুই নাই।”

ওমার যে সেকালের মুসলমান সমাজে উপেক্ষিত হয়েছিলেন, এবং একালের ইউরোপীয় সমাজে আদৃত হয়েছেন, তার কারণ তাঁর এই জবাব। যাঁরা মুসলমান ধর্ম্মে বিশ্বাস করেন, তাঁদের কাছে এ মত শুধু অগ্রাহ্য নয়—একেবারে অসহ্য; কেননা এ কথা ধর্ম্ম মাত্রেরই মূলে কুঠারাঘাত করে। অপর পক্ষে এ বাণী মেনে নেবার জন্য এ যুগের ইউরোপের মন সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল। ইউরোপের মন একান্ত বিজ্ঞান-চর্চ্চার ফলে, খ্রীষ্টধর্ম্মের উপর তার প্রাচীন বিশ্বাস হারিয়ে বসেছিল, কিন্তু তার পরিবর্ত্তে কোনও নূতন বিশ্বাস খুঁজে পায় নি। সুতরাং ওমারের কবিতায় বর্ত্তমান ইউরোপ তার নিজের মনের ছবিই দেখতে পেয়েছিল। এই হচ্ছে প্রথম কারণ, যার দরুণ ওমারের বাণী ইউরোপের মনকে এতটা চঞ্চল করে তুলেছিল।

এস্থলে কেউ বলতে পারেন যে “Vanity of vanities—all is vanity” এসিয়ার এই প্রাচীন বাণী ত দু’হাজার বৎসর পূর্ব্বে ইউরোপের কানে পৌঁচেছিল। বাইবেলের একটা পুরো অধ্যায়ে (Ecclesiastes) ত ঐ কথাটারই বিস্তার করা হয়েছে, প্রচার করা হয়েছে; অতএব ওমারের বাণীর ভিতর কি এমন নূতনত্ব আছে যাতে করে সে বাণী ইউরোপের মনকে অনেকটা পেয়ে বসেছে?

নূতনত্ব এই যে—ওমারের মতে, যে প্রশ্ন মানুষে চিরদিন করে আসছে, বিশ্ব কোন দিনই তার উত্তর দেয় না, কেননা দিতে পারে না। তাঁর চোখে এই সত্য ধরা পড়েছিল যে, এ বিশ্বের অন্তরে হৃদয় নেই, মন নেই, এ জগৎ অন্ধ নিয়তির অধীন, সুতরাং তার ভিতর-বাহির দুই সমান অর্থহীন, সমান মিছা। তিনি আবিষ্কার করেছেন যে—

“ঊর্দ্ধে অধে, ভিতর বাহির, দেখ্‌ছো যা সব মিথ্যা ফাঁক,

ক্ষণিক এ সব ছায়ার বাজী, পুতুল-নাচের ব্যর্থ জাঁক।”

* * * *

“সদ্য ফলের আশায় মোরা মরছি খেটে রাত্রিদিন,

মরণ পারের ভাবনা ভেবে আঁখির পাতা পলকহীন;

মৃত্যু-আঁধার মিনার হ’তে মুয়েজ্জিনের কণ্ঠ পাই—

মূর্খ তোরা, কাম্য তোদের হেথায় হোথায় কোথাও নাই।”

অপরপক্ষে আমাদের দেশের রাজকবি ভর্ত্তৃহরির মত জেরুজিলামের রাজকবিরও মুখে “Vanity of vanities—all is vanity”, এ বাক্যের অর্থ “জগৎ মিথ্যা, ব্রহ্ম সত্য”। অর্থাৎ সংস্কৃত ও ইহুদি কবি দুইজনেই এই বিশ্বের অন্তরে এমন একটি সার সত্য, এমন একটি নিত্য বস্তুর সন্ধান পেয়েছিলেন, যেখানে মানুষের মন দাঁড়াবার স্থান পায়, এবং যার সাক্ষাৎকার লাভ করলে মানুষ চির শান্তি চির আনন্দ লাভ করে। ওমার খৈয়ামের মতে, ও হচ্ছে মানুষের মন-ভোলানো কথা—আসল সত্য এই যে, জগৎও মিথ্যা, ব্রহ্মও মিথ্যা। পূর্ব্বোক্ত রাজকবিরা মানুষের চোখের সুমুখে একটী অসীম আশার মূর্ত্তি খাড়া করেছিলেন, ওমার খৈয়াম করেছেন অনন্ত নৈরাশ্যের। ওমারের বাণী আমাদের মনকে জাগিয়ে তোলে, কেননা এ যুগে আমরা কেউ জোর করে বলতে পারি নে যে, আমরা সৃষ্টির গোড়ার কথা আর শেষ কথা জানিই জানি।

এতক্ষণ ধরে ওমারের দর্শনের পরিচয় দিলুম এই কারণে যে, এই দর্শনের জমির উপরই তাঁর কবিতার ফুল ফুটে উঠেছে। যাঁদের মতে “জগৎ মিথ্যা ব্রহ্ম সত্য”, তাঁরা আমাদের উপদেশ দেন—

“মায়াময়মিদং অখিলং হিত্বা

প্রবিশাশু ব্রহ্মপদং বিদিত্বা।”

ওমারের মতে কিন্তু “মায়াময়মিদং অখিলং” হচ্ছে একমাত্র সত্য—অবশ্য সার সত্য নয়, অসার সত্য। তিনি তাই উপদেশ দিয়েছেন—

“এক লহমা সময় আছে সর্ব্বনাশের মধ্যে তোর,

ভোগ-সায়রে ডুব দিয়ে কর্ একটা নিমেষ নেশায় ভোর।”

বলা বাহুল্য ওমারের মুখে এ কথা হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের বাণী। এ জীবনের যখন কোন অর্থ নেই, তখন যা ইন্দ্রিয়গোচর আর যা অনিত্য তাকেই বুকে টেনে নিয়ে আসা যাক, তাকেই উপভোগ করা যাক। ওমারের পূর্ব্বেও অনেকে মানুষকে এই উপদেশ দিয়েছেন কিন্তু তাঁদের কথার সঙ্গে ওমারের কথার অনেকটা প্রভেদ আছে। যাঁরা বলতেন “eat, drink and be merry, for to-morrow we die”, তাঁরা বিশ্ব-সমস্যার দিকে একেবারেই পিঠ ফিরিয়েছিলেন। আর প্রাচীন গ্রীসের Epicurean-র যা-কিছু ইন্দ্রিয়-গোচর তাকেই সন্তুষ্টচিত্তে গ্রাহ্য করে নিয়ে ইন্দ্রিয় সুখের চর্চ্চাটা একটি সুকুমার বিদ্যা করে তুলে নিয়েছিলেন। এস্থলে বলা আবশ্যক যে, তাঁরা ইন্দ্রিয় অর্থে বহিরিন্দ্রয় ও মানসেন্দ্রিয় দুই বুঝতেন। তাঁরা ছিলেন শান্তিতে, কিন্তু ওমারের হৃদয়-মন চির অশান্ত। ব্রহ্মজিজ্ঞাসা যে ব্যর্থ—এ সত্য ওমার সন্তুষ্ট মনে মেনে নিতে পারেন নি, এর বিরুদ্ধে তাঁর সকল মন বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল। তাঁর কবিতার ভিতর দিয়ে বিশ্বের বিরুদ্ধে মানবাত্মার এই বিদ্রোহ, উপহাস ও বিদ্রূপের আকারে ফুটে বেরিয়েছে, কিন্তু তাঁর সকল হাসিঠাট্টার অন্তরে একটা প্রচ্ছন্ন কাতরতা আছে, এইখানেই তাঁর বিশেষত্ব। ওমার খৈয়ামের কবিতা যে আমাদের এতটা মুগ্ধ করে তার প্রধান কারণ, তিনি দার্শনিক হলেও কবি, এবং চমৎকার কবি। দর্শন তাঁর হাতে জ্যামিতির প্রতিজ্ঞার আকার ধারণ করেনি, ফুলের মত ফুটে উঠেছে। এবং সে ফুল যেমন হাল্‌কা, যেমন ফুরফুরে, তেমনি সুন্দর, তেমনি রঙীন। এর প্রতিটি হচ্ছে ইরানদেশের গোলাপ,—এ গোলাপের রঙের সম্বন্ধে ওমার জিজ্ঞাসা করেছেন—

“কার্ দেওয়া সে লাল্‌চে আভা, হৃদয়-ছ্যাঁচা শোণিত-ছাপ”—

উত্তর অবশ্য—ওমার! তোমার। অথচ এই রক্তে-নাওয়া গোলাপগুলির মুখে একটি সহাস্য don’t care ভাব আছে। আর তাদের বুকে আছে একাধারে অমৃত ও হলাহলের মিশ্রগন্ধ—এক কথায় মদিরগন্ধ। ওমারের কবিতার রস ফুলের আসব, সে রস পান করলে মানুষের মনে গোলাপী নেশা ধরে, সে অবস্থায় আমাদের মন থেকে ইহলোক পরলোক সকল লোকের ভাবনাচিন্তা আপনা হতে ঝরে পড়ে।

শ্রীযুক্ত কান্তিচন্দ্র ঘোষ এই মন-মাতানো কাজ ভোলানো কবিতাগুলি বাঙলা করে বাঙালী পাঠক সমাজের হাতে ধরে দিচ্ছেন; আশা করি সেগুলি সকলের আদরের ও আনন্দের সামগ্রী হবে, কেননা এ অনুবাদের ভিতর যত্ন আছে, পরিশ্রম আছে, নৈপুণ্য আছে, প্রাণ আছে। ওমার খৈয়ামের এত স্বচ্ছন্দ ও স-লীল অনুবাদ আমি বাঙলা ভাষায় ইতিপূর্ব্বে কখনো দেখিনি।

শ্রীপ্রমথ নাথ চৌধুরী—

—— কোন্ বিরহের তীব্র সুরা পান করিলে কবি?

পেয়ালা মাঝে জাগ্‌ল কাহার দীপ্ত মুখের ছবি!

ছন্দেতে কার্ পায়ের নূপুর বাজ্‌ল তালে তালে—

কণ্ঠটী কার্ জড়িয়ে এল তোমার সুরের জালে!——

—— বৃথাই খোঁজা? বন্ধু, তোমার পেয়ালাটুকুর মাঝে,

তন্বী সাকীর কটাক্ষেতে বিরল মধুর সাঁঝে—

কিছুই কি নাই? জীবন-সুরা অশ্রু দিয়ে মেশা?

প্রণয়-মিলন—আর কিছু নয়—মুহুর্ত্তেকের নেশা?——

কবি-প্রশস্তি

কোন্ বিরহের তীব্র সুরা পান করিলে কবি?

পেয়ালা মাঝে জাগ্‌ল কাহার দীপ্ত মুখের ছবি!

ছন্দেতে কার্ পায়ের নূপুর বাজ্‌ল তালে তালে—

কণ্ঠটী কার্ জড়িয়ে এল তোমার সুরের জালে!

নিমেষটীরে ধন্য ক’রে গাইলে তুমি গাথা,

নিমেষ তরে ভুলিয়ে দিলে বিশ্ব মনের ব্যথা।

একটী নিমেষ—মরুর মাঝে একটী জলের ধারা,

একটী নিমেষ—অন্ধকারে উজল সন্ধ্যা তারা।

চাইলে না তো বিত্ত কোনো বিশ্ব সভার মাঝে—

কোন্ গরবীর কণ্ঠমালা শিরে তোমার রাজে!

নৈশপুরের কোন্ দেবী সে যার রূপেরি ছটা

উজল্ ক’রে রাখলে আয়ুর দীর্ঘ বরষ ক’টা।

গোলাপ বনের মাঝখানেতে ছোট্ট কুটীর খানি,

উদাস হাওয়ায় মিশ্‌ত যেথায় স্রোতস্বিনীর বাণী,

সেই খানেতে তোমার রচা হৃদয়-ছ্যাঁচা গান

তুল্‌লে কাহার কণ্ঠ বীণায় তীব্র করুণ তান!

রাজসভাতে ব’স্‌তে তুমি সবার শেষে আসি’—

বাদসাজাদীর মুখের ’পরে খেল্‌ত নাকি হাসি!

চিকের পারে কাঁকনটী তার বাজ্‌ত মধুর বোলে,

অলক্‌-খসা ফুলটী এসে পড়্‌ত নাকি কোলে?

⁕ ⁕ ⁕

কোন্ সাহারায় রাত্রি শেষে গাঁথ্‌ছ তারার মালা?

নিজের বোনা তাঁবুর মাঝে জাগে সে কোন্ বালা?

পেয়ালা হাতে কাট্‌বে রাতি? সুর্‌মা-পরা আঁখি

পিয়াস-আকুল পথ্-চাওয়া তার সফল হবে নাকি!

আস্‌বে না কো ঝড়ের সাথে সর্ব্ব-নাশের দায়—

শেষ প্রহরের জের্‌টা টেনে ব্যগ্র-ত্বরিৎ পায়?

মিলন-তৃষা উঠ্‌বে জ্ব’লে বিদ্যুতেরি সনে,

রক্ত বুকের উঠ্‌বে নেচে নিবিড় আলিঙ্গনে!

পাগল-করা চুম্বনে তার ওড়্‌না রবে মুখে!

কাঁচল খানি টুট্‌বে নাকো তুষার-সাদা বুকে!

অন্তরেতে ঝড়ের খেলা, বাইরে পড়ে বাজ—

শিথিল তনু, নীবির বাঁধন—আকুল পেশোয়াজ!

ওমর কবি! ওমর কবি! সেই নিমেষের নেশা

নিশ্বাসেরি মতই আজও বিশ্ব প্রাণে মেশা!

আজিও সে নিমেষটুকু পাগল হাওয়ার মত

মিলন রাতের গোপন কপাট খুলিয়ে দেখায় কত!

চুম্বনাকুল ঠোঁটের কাঁপন, বিদায়-চোখে চাওয়া,

দুই বিরহের মধ্যে মিলন নিবিড় ঘন পাওয়া,

সজল দুটী মেঘের মাঝে বিদ্যুতেরি হাসি—

নিমেষটী সেই বিশ্বে ফোটায় সত্যে পরকাশি!

⁕ ⁕ ⁕

সুখের তুমি নও তো শুধু আপন-ভোলা কবি,

ভাগ্য দেবীর হাতের আঁকা শোনিত্-রাঙ্গা ছবি

হৃদয়-পটে ফেল্‌লে ছায়া সত্য আভাষ মত—

জ্ঞানের আলো ফুটলো না তো পুঁথির মধ্যে যত!

ব্যাকুল হৃদি বৃথাই ঘুরে শান্তি কোথা মাগি,

চিরন্তণী প্রশ্ন রহে বিশ্বমনে জাগি;—

চিতার পারে, গোরের মাঝে—চক্রপাণির ডাকে

জীবন সে কি দিচ্ছে সাড়া মৃত্যু দুয়ার ফাঁকে!

কোথায় আলো? জ্ঞানের ভাতি অন্ধকারে ঘেরা,

ভাগ্যদেবীর রুদ্ধ দুয়ার—রিক্ত হাতে ফেরা;

বৃথাই শুধু হস্ত জুড়ে আকাশ পানে চাওয়া—

আছেন তিনি? থাকুন তিনি—বিফল তাঁরে পাওয়া

বৃথাই খোঁজা? বন্ধু, তোমার পেয়ালাটুকুর মাঝে,

তন্বী সাকীর কটাক্ষেতে বিরল মধুর সাঁঝে—

কিছুই কি নাই? জীবন-সুরা অশ্রু দিয়ে মেশা?

প্রণয় মিলন—আর কিছু নয়—মুহুর্ত্তেকের নেশা?

মর‍্মি মনের হুতাশ বহে বিশ্বে চিরতরে—

শান্তিবারি কোথায় সে কার্ পেয়ালা হ’তে ঝরে!

তীব্র ফেনিল কামের সুরা—প্রেমের নাহি দিশা—

ভণ্ডামিতে বিশ্ব মেটায় ক্ষুদ্র প্রাণের তৃষা!

হাজার বছর পরে সে এক বাংলা দেশের কবি,

নিজের মাঝে দেখ্‌ছে তোমার দুঃখ সুখের ছবি,

বেহেস্তে কি জাহান্নমে, শূন্যে, যেথায় থাকো—

অর্ঘ্য রচা তাহার আজি ব্যর্থ হবে নাকো!

শ্রীকান্তিচন্দ্র ঘোষ

ওঁ

কল্যাণীয়েষু—

বাংলা ছন্দে তুমি ওমর খৈয়ামের যে তর্জ্জমা করেছ তা গ্রন্থ আকারে প্রকাশের পূর্ব্বেই আমি দেখেচি। এ-রকম কবিতা এক ভাষা থেকে অন্য ভাষার ছাঁচে ঢেলে দেওয়া কঠিন। কারণ এর প্রধান জিনিষটা বস্তু নয়, গতি। ফিট্‌জ্‌জেরাল্‌ড্‌ও তাই ঠিকমত তর্জ্জমা করেন নি—মূলের ভাবটা নিয়ে সেটাকে নূতন করে সৃষ্টি করেচেন। ভাল কবিতা মাত্রকেই তর্জ্জমায় নূতন করে সৃষ্টি করা দরকার।

তোমার তর্জ্জমা পড়ে আমার একটা কথা বিশেষ করে মনে উঠেচে। সে হচ্ছে এই যে বাংলা কাব্যভাষার শক্তি এখন এত বেড়ে উঠেচে যে, অন্য ভাষার কাব্যের লীলা অংশও এ-ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব। মূল কাব্যের এই রস-লীলা যে তুমি বাংলা ছন্দে এমন সহজে বহমান করতে পেরেচ এতে তোমার বিশেষ ক্ষমতা প্রকাশ পেয়েচে। কবিতা লাজুক বধূর মত এক ভাষার অন্তঃপুর থেকে অন্য ভাষার অন্তপুরে আস্‌তে গেলে আড়ষ্ট হয়ে যায়। তোমার তর্জ্জমায় তুমি তার লজ্জা ভেঙ্গেচ, তার ঘোমটার ভিতর থেকে হাসি দেখা যাচ্চে। ইতি—২৯ শ্রাবণ, ১৩২৬।

শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

—— রাত পোহালো—শুন্‌ছ সখি, দীপ্ত ঊষার মাঙ্গলিক? লাজুক তারা তাই শুনে কি পালিয়ে গেছে দিগ্বিদিক? পূব্ গগনের দেব্-শিকারীর স্বর্ণ-উজল কিরণ-তীর প’ড়ল এসে রাজ-প্রাসাদের মিনার যেথা উচ্চশির॥

রাত পোহালো—শুন্‌ছ সখি,

দীপ্ত ঊষার মাঙ্গলিক?

লাজুক তারা তাই শুনে কি

পালিয়ে গেছে দিগ্বিদিক!

পূব্ গগনের দেব্-শিকারীর

স্বর্ণ-উজল কিরণ-তীর

প’ড়ল এসে রাজ-প্রাসাদের

মিনার যেথা উচ্চশির॥ ১

স্বপ্নে যেন কণ্ঠ শুনি—

রাত্রি জানি শেষ প্রহর—

পান্‌শালে মোর দৈববাণী—

কর্ণেতে কার্ বাজ্‌ল স্বর!

ব’লছে হেঁকে—ওঠ্‌রে বাছা,

ভরিয়ে নে তোর পোয়ালাটুক,

জীবন-সুরা শুকিয়ে না যায়,

আপশোষে ফের ফাটবে বুক!॥ ২

রুদ্ধ-দুয়ার পান্‌শালাটির

সামনে সে কি হট্টগোল,

ভোরের ডাকে ব’ল্‌ছে কারা

—খোল্‌রে, ওরে দুয়ার খোল্!

কতক্ষণ বা রইব হেথা,

ছুটছে আয়ু ব্যস্ত পায়,

বিদায় নিলে ফিরব না আর—

অন্তহীন যে সেই বিদায়।॥ ৩

—— নওরোজেতে সেই পুরাতন ব্যর্থ যত মনের আশ,

উঠছে কত ভাবুক হৃদে, দিচ্ছে মোড়া স্মৃতির পাশ।

কোন্ দুখেতে যায় সে চ’লে কোন্ নিরালা বনের মাঝ,

ঈশার শ্বাসে গুল্মলতার নবীন যেথা পত্র-সাজ।——

নওরোজেতে সেই পুরাতন

ব্যর্থ যত মনের আশ

উঠছে কত ভাবুক হৃদে,

দিচ্ছে মোড়া স্মৃতির পাশ।

কোন্ দুখেতে যায় সে চলে’

কোন্ নিরালা বনের মাঝ,

ঈশার শ্বাসে গুল্মলতার

নবীন যেথা পত্র-সাজ।॥ ৪॥

ঈরাম্ নিয়ে পালিয়েছে তার

গর্ব্ব যা’ সব গুল্-বাহার,

জাম্‌শিয়েদের খাস্-পেয়ালা—

কোথায় গো আজ চিহ্ন তার।

দ্রাক্ষা বুকে তেমনি তবু

জ্ব’লছে আজও চুনীর হার,

খুঁজলে না কোন্ মিলবে আজও

ফুল-বাগিচা নদীর ধার।॥ ৫॥

দায়ুদ সাথে ফুরিয়েছে আজ

সব পুরাতন ছন্দ-ফের,

বুলবুলেরি কণ্ঠে শুধু

বাজছে ভাষার সাবেক জের।

সেই সুরেতে চাইছে সে আজ

গোলাপ সখীর বর্ণ লাল—

রক্ত-রাঙা দ্রাক্ষাসারে

রাঙিয়ে নিতে হলুদ গাল।॥ ৬

আজ ফাগুনের আগুন-জ্বালে

হুতাশ-বোনা শীতের বাস—

পুড়িয়ে সে সব ছাই ক’রে দাও—

দাও আহুতি দুখের শ্বাস!

আয়ু-বিহগ্—খোঁজ রাখো কি—

মেলিয়ে ডানা উড়্‌ল হায়,

পেয়ালাটুকু শেষ ক’রে নাও

—এক চুমুকেই—ফাগুন যায়!॥ ৭

—— আজ ফাগুণের আগুণ-জ্বালে হুতাশ-বোনা শীতের বাস—

পুড়িয়ে সে সব ছাই করে দাও—দাও আহুতি দুখের শ্বাস!

আয়ু-বিহগ্—খোঁজ রাখো কি—মেলিয়ে ডানা উড়্‌ল হায়,

পেয়ালাটুকু শেষ করে নাও—এক চুমুকেই—ফাগুণ যায়!——

কতই না আজ ফুল ফুটেছে,

অযুত বরণ, ঊষার মাঝ,

লক্ষ ফুলের সমাধি’পর—

তাদের স্মৃতি তুচ্ছ আজ!

এই ফাগুনের ফুলের বাসে

দেখবে কোথা তলিয়ে যান

জাম্‌শিয়েদের অতীত্ স্মৃতি,

কৈকোবাদের জীবন গান।॥ ৮॥

ভাগ্যলিপি মিথ্যা সে নয়—

ফুরোয় যা’ তা ফুরিয়ে যাক্;

কৈকোবাদ আর কৈখস্‌রুর

ইতিহাসেই নামটা থাক।

রুস্তম আর হাতেম-তায়ের

কল্পকথা—স্মৃতির ফাঁস—

সে সব খেয়াল ঘুচিয়ে দিয়ে

আজকে এসো আমার পাশ।॥ ৯॥

আমার সাথে আসবে যেথায়—

দূর সে রেখে সহর গ্রাম

এক ধারেতে মরু তাহার,

আর এক দিকে শষ্প শ্যাম।

বাদ্‌শা-নফর নাইকো সেথা—

রাজ্যনীতির চিন্তাভার;

মামুদ শাহ?—দূরে থেকেই

ক’রব তাঁরে নমস্কার।॥ ১০

সেই নিরালা পাতায়-ঘেরা

বনের ধারে শীতল ছায়,

খাদ্য কিছু, পেয়ালা হাতে

ছন্দ গেঁথে দিনটা যায়!

মৌন ভাঙ্গি মোর পাশেতে

গুঞ্জে তব মঞ্জু সুর—

সেই তো সখি স্বপ্ন আমার,

সেই বনানী স্বর্গপুর!॥ ১১॥

—— সেই নিরালা পাতায়-ঘেরা বনের ধারে শীতল ছায়,

খাদ্য কিছু, পেয়ালা হাতে ছন্দ গেঁথে দিনটা যায়!

মৌন ভাঙ্গি মোর পাশেতে গুঞ্জে তব মঞ্জু সুর—

সেই তো সখি স্বপ্ন আমার, সেই বনানী স্বর্গপুর!——

রাজ্যসুখের আশায় বৃথা

কেউবা কাটায় বরষ মাস,

স্বর্গসুখের কল্পনাতে

প’ড়ছে কারুর দীর্ঘশ্বাস।……

নগদ যা’ পাও হাত পেতে নাও,

বাকীর খাতায় শূন্য থাক—

দূরের বাদ্য লাভ কি শুনে?—

মাঝখানে যে বেজায় ফাঁক।॥ ১২

সদ্য-ফোটা এই যে গোলাপ,

গন্ধ-প্রীতি-উজল মুখ,

বল্‌ছে না কি—মিথ্যা এ সব,

এই ক্ষণিকের দুঃখ সুখ!

পৃথ্বী-বুকে উঠ্‌ছি ফুটে

গর্ব্বে পরি’ রঙীন সাজ—

পাপড়ি টুটে ছড়িয়ে মোদের

জীবন-রেণু পথের মাঝ!॥ ১৩॥

—— সদ্য-ফোটা এই যে গোলাপ, গন্ধ-প্রীতি-উজল মুখ,

ব’লছে না কি—মিথ্যা এ সব, এই ক্ষণিকের দুঃখ সুখ!

পৃথ্বী-বুকে উঠ্‌ছি ফুটে গর্ব্বে প’রি রঙীন সাজ—

পাপড়ি টুটে ছড়িয়ে মোদের জীবন-রেণু পথের মাঝ!——

কুহক-রাণী আশার পিছে

দিল্‌টা ফিরে সর্ব্বদাই,

স্বপ্ন কারু সত্য বা হয়,

কার্ ভাগে বা উঠ্‌ছে ছাই!

সব ক্ষণিকের—আসল ফাঁকি—

সত্য মিথ্যা কিছুই নয়—

মরুর ’পরে তুষার মত

চিক্‌মিকিয়ে পায় সে লয়।॥ ১৪॥

জীবন-জমির ’পরে যারা

যত্নে বোনে সোনার বীজ,

হাওয়ায় বুনে ফুৎকারেতে

ক’র্‌ছে যারা সব খারিজ;—

খতম্ সে সব এইখানেতেই—

বীজ না ফলে পুনর্ব্বার,

গোরের ভিতর যে জন, সে কি

জীবন নিয়ে ফিরবে আর!॥ ১৫

জীর্ণ ভাঙ্গা সরাই-খানার

রাত্রি দিবা দুইটি দ্বার,

তারির ভিতর আনাগোনা—

দুনিয়াদারি চমৎকার!

রাজার পরে আসছে রাজা,

সজ্জা কতই বাদ্য ধূম—

তুচ্ছ সে সব—কয়দিনই বা—

তার পরে তো সব নিঝুম!॥ ১৬॥

জাম্‌শিয়েদের সুরায় পিছল্

খাস-দেওয়ানের খিলান মাঝ

বাস বেঁধেছে আজকে সেথায়

টিক্‌টিকি আর সিংহরাজ!

রাজার সেরা রাজ-শিকারী

বহ্রাম্ কোথায় ঘুমিয়ে রয়—

আজকে তো তার মাথার ’পরে

চাট্ মেরে যায় বন্য-হয়!॥ ১৭

—— দীর্ণ-হিয়া কোন্ সে রাজার রক্তে নাওয়া এই গোলাপ—

কার্ দেওয়া সে লাল্‌চে আভা, হৃদয়-ছ্যাঁচা শোণিত ছাপ।

ফুল-বাগিচায় ওই যে ফোটে রঙ্গের বাহার আশ্‌মানির—

কোন্ রূপসী সীমন্তিনীর আঁখির দিঠি করুণ, স্থির!——

দীর্ণ-হিয়া কোন্ সে রাজার

রক্তে নাওয়া এই গোলাপ—

কার্ দেওয়া সে লাল্‌চে আভা,

হৃদয়-ছ্যাঁচা শোণিত ছাপ!

ফুল-বাগিচায় ওই যে ফোটে

রঙের বাহার আশ্‌মানির—

কোন্ রূপসী সীমন্তিনীর

আঁখির দিঠি করুণ’ স্থির!॥ ১৮

এই যে কোমল দূর্ব্বা যাহার

বুকের ঘেরা আঁচলটুক

সদ্য শীতল শয়ন মোদের—

সব্‌জিয়েছে নদীর মুখ—

আস্তে সখি পাশ ফিরে নাও—

কী জানি এর ব্যথার ফের্—

কোন্ রূপসীর পাৎলা ঠোঁটের

জিয়ান্-রসে জন্ম এর!॥ ১৯॥

—— এই যে কোমল দূর্ব্বা যাহার বুকের ঘেরা আঁচলটুক

সদ্য শীতল শয়ন মোদের সবজিয়েছে নদীর মুখ—

আস্তে সখি পাশ ফিরে নাও—কী জানি এর ব্যথার ফের—

কোন্ রূপসীর পাৎলা ঠোঁটের জিয়ান্ রসে জন্ম এর!——

অতীত যা’ তার দুখের স্মৃতি,

ভবিষ্যতের ভাব্‌না ঘোর—

দিল্-পিয়ারা সাকী গো আজ

পেয়ালা ভ’রে ঘুচাও মোর।

আসছে যে কাল—তার কথা থাক—

মিশব গিয়ে হয়ত আজ

তুচ্ছ স্মৃতির সৌরভেতে

লক্ষ অতীত কালের মাঝ!॥ ২০॥

—— অতীত যা’ তার দুখের স্মৃতি, ভবিষ্যতের ভাব্‌না ঘোর—

দিল্-পিয়ারা সাকী গো আজ পেয়ালা ভ’রে ঘুচাও মোর,

আসছে যে কাল—তার কথা থাক—মিশব গিয়ে হয়ত আজ

তুচ্ছ স্মৃতির সৌরভেতে লক্ষ অতীত কালের মাঝ!——

গর্ব্বে যারা বইত শিরে

ভাগ্যদেবীর আশীষ-ভার,

বক্ষে যাদের দুলিয়েছিনু

সর্ব্ব স্নেহ প্রীতির হার;—

আজ দুনিয়ার কোথায় তারা?—

পেয়ালাটুকু আর সবার

একটু আগে শূন্য ক’রে

ঘুমিয়ে ঘোচায় শ্রান্তি-ভার!॥ ২১

স্ফূর্ত্তি যে আজ কর্‌ছি মোরা

সেই পুরাতন ঘরের মাঝ,

বসন্ত এই দিচ্ছে বাহার—

নূতন ফুলের রঙীন্ সাজ;—

ভাগ্যে সবার সেইতো লেখা—

মাটীর নীচে মরণ-পুর,

মোদের পরে ক’র্‌বে কারা

সেই পুরেতে শ্রান্তি দূর!॥ ২২

মিশ্‌ব ধূলোয়—তার আগেতে

সময়টুকুর সদ্-ব্যাভার

স্ফূর্ত্তি ক’রে নাই করি কোন?—

দিনকয়েকেই সব কাবার!

পঞ্চভূতে মিলিয়ে যাব

মৃত্যু-পারের কোন্ সে দেশ—

নাইকো সরাব, সুরব সেথা—

সেই অজানার নাইকো শেষ!॥ ২৩॥

সদ্য ফলের আশায় মোরা

ম’রছি খেটে রাত্রি দিন,

মরণ পারের ভাবনা ভেবে

আঁখির পাতা পলকহীন।

মৃত্যু-আঁধার মিনার হ’তে

মুয়েজ্জিনের কণ্ঠ পাই—

মূর্খ তোরা, কাম্য তোদের

হেথায় হোথায় কোথাও নাই!॥ ২৪

তর্ক তুলে ক’র্‌ত যারা

দ্যুলোক ভূলোক নস্যসাৎ—

কোথায় তাদের কণ্ঠ আজি—

এক পলকে কিস্তিমাৎ?

বিধান তাদের ফুৎকারেতে

উড়িয়ে সবাই দিচ্ছে আজ,

মুখটি তাদের ধূলোয় ঠাসা—

বন্ধ এখন জিভের কাজ!॥ ২৫॥

বচন-বাগীশ পণ্ডিতেরা

বিজ্ঞভাবে নাড়ুন শির,

স্মরণ রেখো বন্ধু আমার—

জীবন কভু নহে স্থির।

এই কথাটাই সত্য ভবে,

বাকী যা সব মিথ্যা, ভুল;

সৃজন-বোঁটায় আর ফোটে না

ঝ’র্‌লে পরে আয়ুর ফুল!॥ ২৬॥

—— বচন-বাগীশ পণ্ডিতেরা বিজ্ঞভাবে নাড়ুন শির,

স্মরণ রেখো বন্ধু আমার—জীবন কভু নহে স্থির।

এই কথাটাই সত্য ভবে, বাকী যা সব মিথ্যা, ভুল;

সৃজন-বোঁটায় আর ফোটে না ঝ’র্‌লে পরে আয়ুর ফুল!——

কতই না সে মাড়িয়ে আসা

পণ্ডিতেদের টোলের দোর,

বয়স তখন নেহাৎ কাঁচা—

কাজটা শোনা তর্ক ঘোর;

বিচার-ঘটে বিশ্ব পোরা—

মুণ্ডমাথা নাইকো যার—

তর্ক-ধাঁধার ফির্‌তি-দুয়ার—

ঠিক্ যেথা তার প্রবেশ দ্বার!॥ ২৭

তাদের সাথে ক’রনু রোপণ

বীজটী গোপন জ্ঞান-তরুর,

জলটী সেচন আপন হাতে—

ফ’ল্‌ল ফসল হৃদ্-মরুর;

যত্নে সে মোর চয়ন করা

জ্ঞান-ফসলের অর্থ-জের:—

স্রোতের মতই ভাসতে আসা,

হাওয়ার মতই উধাও ফের।॥ ২৮

কেনই বা মোর জন্ম নেওয়া

এই যে বিপুল বিশ্বমাঝ,

আসছি ভেসে কিসের স্রোতে—

হেথায় বা মোর কিসের কাজ?

কোথায় পুনঃ—কেই বা জানে—

ফির্‌তে হবে একটী দিন—

উধাও সে কোন্ মরুর ’পরে

হাওয়ার মতই লক্ষ্যহীন!॥ ২৯॥

—— কেনই বা মোর জন্ম নেওয়া এই যে বিপুল বিশ্বমাঝ,

আসছি ভেসে কিসের স্রোতে—হেথায় বা মোর কিসের কাজ?

কোথায় পুনঃ—কেই বা জানে—ফির্‌তে হবে একটী দিন—

উধাও সে কোন মরুর ’পরে হাওয়ার মতই লক্ষ্যহীন!——

কোথায় ছিলাম, কেনই আসা—

এই কথাটা জান্‌তে চাই,

জন্মকালে ইচ্ছাটা মোর

কেউ তো কেমন সুধায় নাই!

যাত্রা পুনঃ কোন্ লোকেতে?

প্রশ্নটা মোর মাথায় থাক—

ভাগ্যদেবীর ক্রূর পরিহাস

পেয়ালা ভ’রে ভোলাই যাক্!॥ ৩০

পৃথ্বী হ’তে দিলাম পাড়ি,

নভঃগ্রহে মনটা লীন—

সপ্ত-ঋষি যেথায় বসি

ঘুমিয়ে কাটান রাত্রিদিন।

বিদ্যাটা মোর উঠ্‌ল ফেঁপে,

কাট্‌লো কত ধাঁধার ঘোর—

মৃত্যুটা আর ভাগ্য-লিখন—

ওই খানে গোল রইল মোর।॥ ৩১

রুদ্ধ-দুয়ার জীবন-ঘরের

কুঞ্চিকাটীর নাইকো খোঁজ

দেখ্‌তে না পাই ভাগ্য-বধূর

ঘোম্‌টা-ঢাকা মুখ্-সরোজ;

বারেক দুবার কণ্ঠে কাহার

শুন্‌ছি শুধু নামটা মোর—

কয় দিনই বা?—সাঙ্গ তো হয়

সর্ব্ব-নামের নেশার ঘোর!॥ ৩২॥

তিমির-পথের যাত্রী মোরা—

দীপ্ত আশার রশ্মি কই?

মর্ত্ত্যে হ’য়ে লক্ষ্যহারা—

স্বর্গ পানে তাকিয়ে রই।

কর্ণে পশে দৈববাণী—

কোথাও সে নেই আলোক-পথ,

অন্ধ-নিয়ত্ চালিয়ে বেড়ায়

ভাগ্যদেবীর বিশ্বরথ!॥ ৩৩॥

তখন ফিরে মুখটী চুমি

মাটীর গড়া পেয়ালাটির,

সুধাই তারে—রহস্যটার

অর্থ সে কি খুব গভীর?

অধর’পরে রাখ্‌তে অধর,

বাজ্‌ল কানে অফুট্ স্বর—

যদিন বাঁচো পান ক’রে নাও,

ফির্‌বে না আর মরণ পর!॥ ৩৪

—— তখন ফিরে মুখটী চুমি মাটীর গড়া পেয়ালাটীর,

সুধাই তারে—রহস্যটার অর্থ সে কি খুব গভীর?

অধর’পরে রাখ্‌তে অধর, বাজ্‌ল কানে অফুট স্বর—

যদিন বাঁচো পান ক’রে নাও, ফির্‌বে না আর মরণ পর।——

এই যে আমার পেয়ালা-বঁধু

জীবন-সাড়া দিচ্ছে আজ—

কোন্ অতীতের সাক্ষী এ জন

কোন্ সেকালের স্ফূর্ত্তিবাজ!

আজ পরিচয় ভিন্ন রূপে—

মৃত্যু-শীতল মাটির চাপ—

স্মৃতির নিশান নাই কি তবু

ওই অধরে চুমোর ছাপ!॥ ৩৫॥

সাঁঝের ঝোঁকে দেখ্‌নু সেদিন

হাটের মাঝে কুম্ভকার

নিঠুর হাতে ঠাস্‌ছে সে এক

পিণ্ড ভিজা মৃত্তিকার।

মাটীর ঠোঁটে ফুট্‌ল বাণী—

আওয়াজটা তার বেজায় ক্ষীণ—

আস্তে ভায়া আস্তে পেশো,

নেহাৎ এ জন ভাগ্যহীন।॥ ৩৬॥

পেয়ালাটুকু ভরিয়ে নে গো,

এতই কিসের চিন্তা তোর?

সময়টা সব কাট্‌ছে বৃথা—

ভাবনা কি তাই দিনটা ভোর!

একটা ‘কাল’তো মরণ-পারে,

আস্‌ছে যে ‘কাল’ কোথায় আজ?

তাদের কথা ভাব্‌বি ব’সে

এই ক্ষণিকের স্ফূর্ত্তি মাঝ!॥ ৩৭॥

—— পেয়ালাটুকু ভরিয়ে নে গো, এতই কিসের চিন্তা তোর?

সময়টা সব কাট্‌ছে বৃথা—ভাবনা কি তাই দিনটা ভোর!

একটা ‘কাল’ তো মরণ-পারে, আসছে যে ‘কাল’ কোথায় আজ?

তাদের কথা ভাব্‌বি ব’সে এই ক্ষণিকের স্ফূর্ত্তি মাঝ!——

এক লহমা সময় আছে

সর্ব্বনাশের মধ্যে তোর—

ভোগ্-সায়রে ডুব দিয়ে কর্

একটা নিমেষ নেশায় ভোর!

আয়ুর তারা প’ড়ছে খ’সে

মরণ-ঊষার চরণ’পর—

যাত্রা যে কাল্ ক’র্‌তে হবে,

ফুরিয়ে নে সব ত্বরিৎ কর্।॥ ৩৮

—— এক লহমা সময় আছে সর্ব্বনাশের মধ্যে তোর—

ভোগ্-সায়রে ডুব দিয়ে কর্ একটা নিমেষ নেশায় ভোর!

আয়ুর তারা প’ড়ছে খ’সে মরণ-ঊষার চরণ’পর—

যাত্রা যে কাল্ ক’র্‌তে হবে—ফুরিয়ে নে সব ত্বরিৎ কর্।——

কোন্ সে রসের আশায় বঁধু

ম’র্‌ছ ঘুরে রাত্রিদিন—

ঘূর্ণী পথের নাইকো সীমা,

অনন্ত সে কোথায় লীন।

সে সব ছেড়ে স্ফূর্ত্তি করো,

দ্রাক্ষারসে হও বিভোর,

ব্যস্ত তুমি যে রস আশে—

মিথ্যা, না হয় তিক্ত ঘোর!॥ ৩৯

জানিস্‌তো সব বন্ধু তোরা—

কাণ্ডটাই বা কয়দিনের—

বাস্তুভিটায় কাট্‌ল যে মোর

নূতন বিয়ের স্ফূর্ত্তি-জের।

বন্ধ্যা বধূ যুক্তিদেবী—

সেই রাতে তার নির্ব্বাসন,—

সেই বাসরে নূতন বধূ

আঙুরলতার সম্ভাষণ!॥ ৪০॥

—— জানিস্‌তো সব বন্ধু তোরা—কাণ্ডটাই বা কয়দিনের—

বাস্তুভিটায় কাট্‌ল যে মোর নূতন বিয়ের স্ফূর্ত্তি-জের।

বন্ধ্যা বধূ যুক্তিদেবী—সেই রাতে তার নির্ব্বাসন,—

সেই বাসরে নূতন বধূ আঙুরলতার সম্ভাষণ!——

অস্তি-নাস্তি শেষ ক’রেছি,

দার্শনিকের গভীর জ্ঞান,

বীজগণিতের সূত্র-রেখা

যৌবনে মোর ছিলই ধ্যান।

বিদ্যারসে যতই ডুবি,

মনটা জানে মনে স্থির—

দ্রাক্ষারসের জ্ঞানটা ছাড়া

রস-জ্ঞানে নই গভীর!॥ ৪১॥

এই তো সেদিন সাঁঝের বেলা,

পেয়ালা হাতে গোপন পায়,

স্বর্গ-দূতী এল সে মোর

মুক্ত-দুয়ার পানশালায়;

ব’ল্‌লে মোরে—পাত্র-সুধায়

চুমুক দে’ নাও একটি বার—

দেখ্‌নু চেখে—আর কিছু নয়,

সেই পুরাতন দ্রাক্ষাসার!॥ ৪২॥

—— এই তো সেদিন সাঁঝের বেলা, পেয়ালা হাতে গোপন পায়,

স্বর্গ-দূতী এল সে মোর মুক্ত-দুয়ার পানশালায়।

ব’ল্‌লে মোরে—পাত্র-সুধায় চুমুক দে’ নাও একটি বার—

দেখ্‌নু চেখে—আর কিছু নয়, সেই পুরাতন দ্রাক্ষাসার!——

সেই পুরাতন দ্রাক্ষা—তাহার

ন্যায়-বিধানের হউক জয়,

অমোঘ যাহার সূত্রেতে হয়

সর্ব্ব ধর্ম্ম সমন্বয়।

আঙুর-চোয়া অল্‌কিমিয়া—

রসের সেরা রসান-ভূপ,

জীবন-কাঁসার পাত্রখানা

স্পর্শে ধরে সোনার রূপ!॥ ৪৩॥

সেই পুরাতন দ্রাক্ষাবঁধু—

মামুদ শাহের মতন যেই,

দুঃখ-কাফের মূর্ত্তিগুলোয়

বীরের দাপে তাড়ায় সেই;

ঐন্দ্রজালিক অস্ত্রটী যার

দীর্ণ করে সকল ভাণ,

আত্মারে যে করায় পুনঃ

স্ব-স্বরূপে অধিষ্ঠান!॥ ৪৪॥

বিজ্ঞ যিনি বিজ্ঞ আছেন—

তর্ক নিয়ে থাকুন ঘোর,

সৃষ্টি-বিচার, তত্ত্বকথা—

ঘুচিয়ে এস সঙ্গে মোর;

একটি কোণে ব’সব দোঁহে,

হট্টগোলের ঢের তফাৎ,

ভাগ্য—যাহার খেল্‌না মোরা—

ক’র্‌ব তারেই পাত্রসাৎ!॥ ৪৫॥

—— একটি কোণে ব’সব দোঁহে, হট্টগোলের ঢের তফাৎ ভাগ্য—যাহার খেল্‌না মোরা—ক’র্‌ব তারেই পাত্রসাৎ। ——

ঊর্দ্ধে, অধে, ভিতর, বাহির,

দেখ্‌ছ যা’ সব মিথ্যা ফাঁক,

ক্ষণিক এ সব ছায়ার বাজী

পুতুল-নাচের ব্যর্থ জাঁক;

পৃথ্বীটা তো মায়ার খেয়াল—

সূর্য্য বাতির ফানুস-খোল্—

ছায়ার পুতুল আমরা সবাই

চৌদিকে তার ক’র্‌ছি গোল!॥ ৪৬॥

রক্ত অধর এই যে চুমি,

পান করি লাল মদির টুক—

মিথ্যা এ সব শূন্য স্বপন—

আপশোষে তাই ফাট্‌বে বুক?

কাল্‌টা অসীম শূন্যে ঘোরে,

শূন্যে ঘেরা মায়ার জাল—

শূন্যে খেলা শেষ ক’রে আজ

মিশ্‌ব না হয় শূন্যে কাল।॥ ৪৭॥

নদীর ধারে ফুট্‌বে যবে,

ফুট্‌বে গোলাপ রঙ্-বাহার—

পান কর’সে কবির সাথে

রক্ত-রাঙা দ্রাক্ষাসার।……

কাল্-সাকীটী পেয়ালা ভ’রে

আস্‌বে যবে সর্ব্বশেষ—

বরণ ক’রো হাস্য মুখে,

বিনা দ্বিধার চিহ্নলেশ।॥ ৪৮॥

—— নদীর ধারে ফুট্‌বে যবে, ফুটবে গোলাপ রঙ-বাহার,

পান কর’সে কবির সাথে রক্ত-রাঙা দ্রাক্ষাসার;

কাল সাকীটি পেয়ালা ভ’রে আসবে যবে সর্ব্বশেষ—

বরণ কোরো হাস্যমুখে বিনা দ্বিধার চিহ্নলেশ।——

ছক্‌টি আঁকা সৃজন-ঘরের

রাত্রি দিবা দুই রঙের,

নিয়ৎ দেবী খেল্‌ছে পাশা,

মানুষ ঘুঁটি সব ঢঙের;

প’ড়্‌ছে পাশা, ধ’র্‌ছে পুনঃ,

কাট্‌ছে ঘুঁটি, উঠ্‌ছে ফের—

বাক্সবন্দী সব পুনরায়,

সাঙ্গ হ’লে খেলার জের।॥ ৪৯

নাইকো পাশার ইচ্ছা স্বাধীন—

যেই নিয়েছে খেলার ভার,

ডাইনে বাঁয়ে ফেল্‌ছে তারে,

যখন যেমন ইচ্ছা তার।

মানুষ নিয়ে ভাগ্য-খেলায়

করেন যিনি কিস্তিমাৎ—

সবটা জানেন তিনিই শুধু—

জয়-পরাজয় তাঁরই হাত।॥ ৫০॥

ললাট’পরে নিয়ৎ দেবীর

ভাগ্যলিপির হস্তছাপ

উঠ্‌বে না সে—চেষ্টা বৃথা—

মিথ্যা এ সব মনস্তাপ;

দীর্ঘ-নিশাস উঠুক না হয়

ক’ল্‌জে-ফাটা অশ্রুধার—

ভাগ্যদেবীর হস্তটি না

ধ’র্‌বে লেখন পুনর্ব্বার।॥ ৫১॥

মাথার ’পরে উপুড়-করা

পেয়ালা—যারে স্বর্গ কয়,

যার নীচেতে চুপ্‌টি ক’রে

চক্ষু বুজে দিনটা বয়,

হস্ত জুড়ে তার কাছেতে

চাইছ কিবা ভাগ্য-দীন?

নিয়ৎ-সূতোয় বদ্ধ ও যে,

তোমার মতই শক্তিহীন!॥ ৫২॥

মৃত্তিকাতে তৈরী যেদিন

মূর্ত্তমানব পৃথ্বীতল,

সেই মাটিতেই বীজটি বপন—

ভবিষ্যে যা ধ’র্‌বে ফল।

সেই সৃজনের প্রথম ঊষার

ভাগ্যলিপির অঙ্কপাত

ফুট্‌বে পুনঃ শেষ বিচারের

প্রলয় ঊষার জন্মসাথ!॥ ৫৩॥

তোমায় নাহয় ব’লেই রাখি—

প্রথম যেদিন যাত্রা মোর—

চোখের জলে বিদায় নিয়ে

পেরিয়ে এনু স্বর্গ-দোর;—

কোন্ পাপেতে হেথায় আসা

ভাগ্য-দেবীর অনুজ্ঞায়—

আস্‌তে পথে দেখ্‌নু যে মোর

অস্থিতে কার্ চিহ্ন ভায়।॥ ৫৪॥

দ্রাক্ষালতার শিকড় সেটী

তার না জানি কতই গুণ—

জড়িয়ে আছেন অস্থিতে মোর

দরবেশী-ভাই যাই বলুন—

গগন-ভেদী চীৎকারে তাঁর

খুল্‌বে নাকো মুক্তি দ্বার,

অস্থিতে এই মিল্‌বে যে খোঁজ

সেই দুয়ারের কুঞ্চিকার।॥ ৫৫

এই তো জানি বন্ধু আমার—

সত্য জ্যোতির প্রকাশটুক

—রাগেই কিম্বা প্রেমেই ফুটে—

ভরায় যা’ মোর আঁধার বুক,

নিমেষ তরে পাই যদি তার

আভাষটা মোর পানশালায়,

আঁধার-ঘেরা মন্দিরেতে

কেনই যাব—কোন্ জ্বালায়!॥ ৫৬॥

তুমিই প্রভু পথটীতে মোর

গর্ত্ত-বোঝাই রাখ্‌লে পাপ,

ক’রলে সেটী সুরায় পিছল—

তুমিই প্রভু ক’রবে মাপ;

আপন হাতেই খুলবে না কোন্

ভাগ্য-সুতোর পাকটা ঘোর,

পতনটা সেই পাপের ফলে—

ব’ল্‌বে কিগো দেব্‌তা মোর?॥ ৫৭॥

—— তুমিই প্রভু পথটিতে মোর গর্ত্ত-বোঝাই রাখ্‌লে পাপ,

ক’রলে সেটি সুরায় পিছল—তুমিই প্রভু ক’রবে মাপ!

আপন হাতেই খুলবে না কোন্ ভাগ্য-সূতোর পাকটা ঘোর,

পতনটা সেই পাপের ফলে—ব’লবে কিগো দেব্‌তা মোর?——

মানব সৃজন ক’রলে দিয়ে

মৃত্তিকাতে পাপের ছাপ,

মহান্ তোমার বিশ্ব-বাগে

খেলাও পঞ্চ-রিপুর সাপ;

পাপের কালো মূর্ত্তি নিয়ে

জীব জগতে ঘুরছে হায়—

মানুষ তোমায় ক’রছে ক্ষমা—

তুমিও, দেব, ক্ষমিও তায়!॥ ৫৮

শুন্‌ছ বঁধূ—উপোস ভেঙে,

রাত্রি যবে এক প্রহর,

রম্‌জানেরি পর্ব্বশেষে

উঠনু গিয়ে কুমোর-ঘর,

চাঁদের দেখা নাই আকাশে,

ঘরটীতে কেউ নাইকো আর—

শুধুই কেবল তৈরী ভাঙ্গা

সুরাই যত মৃত্তিকার॥ ৫৯॥

হবে—

সেই সাজানো মাটীর তাল—

তার মাঝে কেউ চুপ্‌টী শোনে,

কেউবা বোনে কথার জাল;

ব’ল্‌লে কে এক হঠাৎ রোষে,

ব্যস্তবাগীশ কণ্ঠ তার—

কেইবা এ সব কুম্ভ মোরা,

কেইবা সেজন কুম্ভকার?॥ ৬০

ব’ল্‌লে সে এক কুম্ভ ধীরে—

নয় বৃথা এ জীবন-শ্বাস,

ক’র্‌লে যে জন বুদ্ধি খরচ—

সৃষ্টি আপন ক’র্‌বে নাশ?

এ সব কি আর অম্‌নি যাবে—

ফিরতে হবে পুনর্ব্বার,

সেই পুরাতন মাটীর ঘরে,

সেই কবেকার জন্মাগার!॥ ৬১॥

ব’ল্‌লে আর এক পেয়ালা তারে—

তত্ত্ব এটা খুব গভীর,

বালক—সেও পানের পরে

খোঁজটা রাখে পাত্রটীর;

গ’ড়্‌লে যে জন আপন হাতে

কতই স্নেহ-কল্পনায়—

আর কি পারে রাগের ভরে

নষ্ট কভু ক’রতে তায়!॥ ৬২

সেই কথাতেই শান্ত হ’ল

উঠ্‌ছিল যা তর্কজাল;

মৌন ভেঙে ব’ল্‌লে পরে

বিশ্রী সে এক কাদার তাল—

বক্র ব’লে সই পরিহাস,

চিন্তে না পাই দিগ্বিদিক,

গড়ন-কালে কুম্ভকারের

হস্তটা কি প’ড়তো ঠিক?॥ ৬৩॥

ব’ল্‌লে আর এক—কেউ বা তারে

ব’ল্‌ছে পাজী যাচনদার,

মুখখানা তার আঁকছে দিয়ে

নরক-ধোঁয়ার অন্ধকার;

যাচাই মোদের ক’র্‌বে সে জন?

কথার কথা ফক্কিকার—

লোকটা নেহাৎ মন্দ সে নয়,

মন্দ কি হয় তার বিচার!॥ ৬৪॥

কোণ্‌টী হ’তে সুরাই সে এক

ব’ল্‌লে ফেলে নিশাস-ভার—

মাটীর দেহ শুকিয়ে গেছে—

অনেক দিন তো নেই ব্যাভার,

মোর পুরাতন দ্রাক্ষা-বঁধু—

পাই যদি আজ পরশ তার,

হ’চ্ছে মনে—জীর্ণ দেহে

বল্‌টা ফেরে পুনর্ব্বার।॥ ৬৫॥

পাত্রগুলো কথার মাঝে

আকাশ’পরে দেখ্‌তে পায়

চন্দ্র নবীন—যাহার লাগি’

সবাই ছিল প্রতীক্ষায়;

কে কার্ ঘাড়ে প’ড়ল তখন,

ব’ললে দিয়ে টিপ্‌নি এক—

খাদ্যেতে আর মদ্যে বোঝাই

মুটিয়াগুলোর কাণ্ড দ্যাখ!॥ ৬৬॥

চেতিয়ে তুলো মরণ কালে

দ্রাক্ষাসুধায় প্রাণটা মোর,

মদির-স্নানটা করিয়ে দিও,

ঘুচ্‌বে যবে মায়ার ঘোর;

পরিয়ে দিও যত্নে স্নেহে

আঙুর-পাতার বহির্বাস,—

গোর দিও এক বাগান-ধারে,

সজীব যেথায় ফুলের চাষ।॥ ৬৭

সৌরভেতে ক’র্‌বে আকুল,

থাক্‌বে যা’ মোর ভস্মসার—

জাল পেতে সে থাকবে ব’সে,

হাওয়ায় বুনে গন্ধ তার;

ভণ্ড যত ভক্ত বিটেল্

প’ড়বে ধরা চ’লতে পথ,

মদিরগন্ধ পাগল হাওয়ায়

উল্টোবে তার বিধান-রথ।॥ ৬৮

খেয়াল-পূজোয় পুতুল-খেলায়

কাট্‌ল কতই দিন যে মোর,

লোকের চোখে দোষের ভাগী—

র’ট্‌ল খারাপ নামটা ঘোর;

মূর্ত্ত খেয়াল-দেবতা গুলোই

খাতির ডোবায় সুরার মাঝ—

সুনামটা মোর সস্তা বিকোয়

শুন্‌লে মিঠে সুরের ভাঁজ!॥ ৬৯॥

দিব্যি দিয়ে ত্যাগ করিনু—

চক্ষুজলও প’ড়ল ঢের—

শপথ কালে সব্‌টা তবে

যায়নি কেটে নেশার জের!

তারপরে যেই ফাগুন এল

বাড়িয়ে গোলাপ-রঙীন্ হাত

কোথায় গেল ক্ষীণ অনুতাপ

গন্ধ-আকুল মলয় সাথ!॥ ৭০॥

খাতির খিলাৎ কাড়লে সে মোর—

খেয়াল মাফিক কার্য্য তার,

দ্রাক্ষাদেবীর নাই মহিমা—

কাফের্ মতই সব ব্যাভার!

প্রশ্ন তবু উঠছে মনে—

দ্রাক্ষাফলের চাষটা যার—

কোন্ মহার্ঘ পণ্য লোভে

বিকোয় এমন সুধার ভার॥ ৭১

—— গোলাপ সাথে প’ড়বে খ’সে বসন্তেরি সব বাহার,

মিশবে কোথা যৌবনেরও পাগল-করা গন্ধ ভার,

পাতার মাঝে চ’মকে ওঠে আজ পাপিয়ার উচ্চতান—

কোন্ বিদেশের কণ্ঠটী ওই কোথায় সে কাল গাইবে গান।——

গোলাপ সাথে প’ড়বে খ’সে

বসন্তেরি সব বাহার,

মিশ্‌বে কোথা যৌবনেরও

পাগল-করা গন্ধভার!

পাতার মাঝে চ’ম্‌কে ওঠে

আজ পাপিয়ার উচ্চতান—

কোন্ বিদেশের কণ্ঠটী ওই—

কোথায় সে কাল্ গাইবে গান!॥ ৭২॥

—— নিয়ত-দেবীর চর্‌কা-সূতোর ধ’রতে পারি খেইটা আজ,—

ভাগ্য সাথে ষড়্ ক’রে তার ঢুকতে পারি দুয়ার মাঝ;—

নিঠুর পায়ে চূর্ণ করি বিশ্ব-সৃজন-কল্পনায়,

নূতন সৃষ্টি গ’ড়্‌তে প্রিয়া পার্‌ব নাকি দুই জনায়!——

নিয়ৎ-দেবীর চর্‌কা-সূতোর

ধ’র্‌তে পারি খেইটা আজ

ভাগ্য সাথে ষড়্ ক’রে তার

ঢুকতে পারি দুয়ার মাঝ,

নিঠুর পায়ে চূর্ণ ক’রি

বিশ্ব-সৃজন-কল্পনায়,

নূতন সৃষ্টি গ’ড়্‌তে, প্রিয়া,

পার্‌ব নাকি দুই জনায়!॥ ৭৩॥

দেখ্‌ছ প্রিয়া—পূব গগনের

পূর্ণ-কিরণ চাঁদটী আজ

দিচ্ছে উঁকি পাতার ফাঁকে

মোদের মিলন-কুঞ্জ মাঝ;

তোমার কবি সেই যেদিনে

ভুল্‌বে ধরার মিলন-সুখ,

কার্ খোঁজে ওর প’ড়্বে হেথায়

অস্ত মলিন দৃষ্টি-টুক্!॥ ৭৪॥

বিভোর প্রাণে আসবে যেদিন—

আকুল মিলন প্রতীক্ষায়

তৃণাসনে অতিথ্-সভা

ছড়িয়ে যেথা তারার প্রায়;

উজল পায়ে আসবে যখন

আমার যেথায় ছিল স্থান,

উপুড় ক’রে রেখো সেথায়

আমার শূন্য পাত্রখান!॥ ৭৫॥

—— উজল পায়ে আসবে যখন আমার যেথায় ছিল স্থান,

উপুড় ক’রে রেখো সেথায় আমার শূন্য পাত্রখান!——

এআই অনুবাদ · মূল