মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Muktaram Vidyabagish (†1860) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন
রাজমন্ত্রিগণ টাইমনের মুখে এবম্প্রকার নির্দয় বচন শ্রবণ করিয়া আর্ত্তস্বরে রোদন আরম্ভ করিল তখনও তিনি পূর্ব্বোক্ত বাক্যমাত্র পুনরুক্তি করিলেন। তদনন্তর তাহারা বিষন্ন মনে বিদায় গ্রহণ করিলে এতাবন্মাত্র কহিলেন তোমরা নগরে প্রত্যাগমন পূর্ব্বক তত্রস্থ জনগণকে আমার বৃত্তান্ত জ্ঞাপন পুরঃসর কহিও তাহাদের পরিতাপ মোচন ও দুর্দান্ত সেনাপতির কোপ নিবারণের এক মাত্র উপায় আছে। ওহে মন্ত্রিবর্গ, স্বদেশীয় মানবদিগের প্রতি আমার এখনও যথেষ্ট স্নেহ আছে এবং দেহপাতের পূর্ব্বে সাধ্যানুসারে তাহাদের উপকার করিতে বাসনা করি অতএব এক উপায় কহিতেছি শ্রবণ কর। মন্ত্রিরা বিদায়কালে এবম্বিধ সানুকূল বাক্য শ্রবণ করিয়া মনে করিল ইহাঁর হৃদয়ে বুঝি দয়ার উদ্রেক হইল। কিন্তু টাইমন্ ব্যঙ্গোক্তি পূর্ব্বক সেই উপায়ের এইরূপ বিবরণ করত কহিলেন আমার কুটীর সন্নিকটে একটী প্রকাণ্ড তরু আছে ত্বরায় ছেদন করিতে হইবে অতএব এথেন্স দেশীয় ক্ষুদ্র মহৎ সর্ব্ব সাধারণ জনগণ এস্থানে আগমন পূর্ব্বক যদি সেই তরুর আশ্রয় গ্রহণ করে তাহা হইলে নিষ্কৃতি পাইতে পারে। এ কথার তাৎপর্য্য এই তাহারা যদিস্যাৎ স্ব২ গলে রজ্জু প্রদান করিয়া এই বৃক্ষে উদ্বন্ধন পুর্ব্বক দেহ ত্যাগ করে তাহা হইলে কৃতঘ্নতা হইতে নিস্তার পাইবেক।
টাইমন্ মানবগণের প্রতি বদান্যতা ও দয়া প্রকাশে যে অনুরাগ করিতেন তাঁহার অন্তর হইতে তাহা একেবারে অন্তর হইলে অবিলম্বে দেহপাত হইল। কিয়দ্দিনানন্তর কোন যোদ্ধা নদী তীর দিয়া গমন করত তাঁহার বাসস্থলী হইতে কিয়দ্দূরে একটা সমাধি স্থান অবলোকন করিল তাহাতে লেখা ছিল নরদ্বেষি টাইমনের এই সমাজ। টাইমন্ বিপিনবাসী হইয়া অবশিষ্ট জীবন নরদ্বেষে যাপন করেন বিশেষতঃ স্বদেশীয় রাজমন্ত্রিদিগের নিকট আপন মানস ব্যক্ত করেন দেশের মানববর্গ যেন দুঃখ ও দৈব উৎপাতে বিনষ্ট হয় অতএব তাঁহার সমাধিতে নরদ্বেষী টাইমন্ বলিয়া তাঁহার নাম অঙ্কিত হইয়াছিল।
টাইমন আত্মহত্যা দ্বারা দুঃখের অন্ত করেন অথবা দুঃখাবেগে তদীয় অসু বিনাশ হয় এতদ্বিষয়ের কোন বিবরণ প্রকাশ নাই, সমাধির উপরি কেবল পূর্ব্বোক্ত কথা মাত্র লিখিত ছিল। যাহা হউক ঐ কথাতে স্পষ্ট বোধ হয় মনুষ্যজাতির কৃতঘ্নতা দর্শনে তাহাদের প্রতি যে দ্বেষ ভাব উৎপন্ন হয় চরম কাল পর্য্যন্ত তাহা দেদীপ্যমান ছিল। কেহ২ অনুমান করিয়া বলেন তাঁহার সমাধি স্থান সিন্ধুতীরে নির্ণীত হইবার তাৎপর্য্য এই সমাধি অবলোকনে দুষ্ট ও শঠ লোকের নয়ন হইতে নিঃসৃত বারিবিন্দু অপেক্ষা প্রকাণ্ড বারিভাও সাগরের অনবরত তরঙ্গোৎক্ষেপণ দ্বারা সমাধির উপর অশ্রুধারা স্বরূপে জলাভিষেক মনোনীত করিতেন এই নিমিত্ত তদ্রূপ স্থলে সমাধি স্থাপন করিয়া যান্ ইতি।
নিদাঘ নিশীথের স্বপ্ন।
সেক্সপিয়র।
নিদাঘ নিশীথের স্বপ্ন।
এথেন্স নগরে কন্যাদান বিষয়ে এই নিয়ম প্রচলিত ছিল পিতা আপনার মতানুসারে পাত্র নির্দ্দিষ্ট করিয়া কন্যা সম্প্রদান করিতেন। কোন কুমারী যদিস্যাৎ জনকের মনোনীত বরকে কর প্রদানে অস্বীকার করিত তাহা হইলে ব্যবস্থানুসারে তাহার প্রাণদণ্ড হইতে পারিত। অপত্যস্নেহ স্বভাবতঃ প্রবল এ প্রযুক্ত কোন অঙ্গজা অবাধ্যা হইলেও পিতা প্রায় তাহার মৃত্যু বাঞ্ছা করেন না ইহাতে যদিও ঐ ব্যবস্থানুসারে দণ্ড বিধান প্রায় হইত না তথাপি জনকেরা ঐ ব্যবস্থার উল্লেখ করত সর্ব্বদা স্ব২ তনয়াদিগকে ভয় প্রদর্শন করিতেন।
একদা ইজিয়স্ নামা এক বৃদ্ধ এথেন্সের ভূপতি থিসিয়স্ সন্নিধানে উপস্থিত হইয়া বিনয় পুরঃসর আবেদন করিলেন মহারাজ হারমিয়া নাম্নী আমার এক তনুজা আছে। আমি কন্যাকে পাত্রসাৎ করিবার নিমিত্ত দেমিত্রিয়স নামক মহাকুলীন সম্ভ্রান্ত এক পাত্র স্থির করিয়া আজ্ঞা করিয়াছিলাম তাহার গলে বরমাল্য প্রদান কর। কিন্তু দুহিতা লাইসেন্দর সংজ্ঞক অপর এক যুবার প্রেমাসক্তা হওয়াতে আমার আজ্ঞা অবজ্ঞা করিয়াছে অতএব ধর্ম্মাবতার বিচার পূর্ব্বক দেশের নিয়মানুসারে অবাধ্যা পুত্রীর প্রাণদণ্ড বিধানে অনুমতি হউক। অনন্তর হারমিয়া ধর্ম্মাধিকরণে আনীত হইলেন। তাঁহাকে পিত্রাজ্ঞা হেলনের কারণ জিজ্ঞাসা করতে কহিতে লাগিলেন মহারাজ জনকের আদেশ লঙ্ঘন করিবার হেতু আছে, পিতা আমার নিমিত্ত যে বর পাত্র মনোনীত করিয়াছিলেন আমার প্রিয়সখী হেলেনা তাহার প্রতি আসক্তা হইয়া বিরহে উন্মত্ত প্রায় হইয়াছেন অতএব সহচরীর অনুরোধে আমি পিতার নির্দ্দিষ্ট বরপাত্রকে বিবাহ করিতে অস্বীকার করিয়াছি। ধর্ম্মাবতার কেবল সখ্য ধর্ম্ম পরিপালনার্থ অজ্ঞা লঙ্ঘন হইয়াছে এতন্নিমিত্ত পিতাকে যৎপরোনাস্তি অনুনয় করিয়াছি তাঁহার চিত্তে কোন মতে দয়ার সঞ্চার হয় নাই।
এথেন্সাধিপতি থিসিয়স্ যদিও সদয়ান্তঃকরণ ছিলেন তথাপি রাজ্যের নিয়মাতিক্রমে ক্ষমতা ছিল না। অতএব হারমিয়াকে সম্বোধন পূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন এতদ্দেশের আচার ও নিয়মানুসারে কন্যা সম্প্রদানে পিতার সম্পূর্ণ অধিকার, তোমার তাত যে বরপাত্র মনোনীত করিয়াছেন অবশ্য তাঁহার গলে বরমাল্য প্রদান করিতে হইবে, তোমাকে চারি দিবস অবকাশ দিলাম, বাটী গিয়া বিবেচনা কর, যদি পিতার নির্ণীত বরকে পতিত্বে বরণ করিতে একান্ত অস্বীকার কর ব্যবস্থানুসারে প্রাণদণ্ড হইবেক।
হারমিয়া নৃপতির এতদ্বচন শ্রবণানন্তর বিদায় গ্রহণ পূর্ব্বক আপনার প্রণয়াস্পদ লাইসেন্দরের সন্নিধানে আগমন করিলেন এবং উপস্থিত বিপদের বিষয় বিজ্ঞাপন করত তাঁহাকে কহিলেন প্রিয়তম তোমাকে পরিত্যাগ পূর্ব্বক দেমিত্রিয়স্কে পরিণয় অথবা বাসর চতুষ্টয়াবসানে প্রাণদণ্ড স্বীকার করিতে হয় এতদ্ব্যতীত গত্যন্তর নাই কর্ত্তব্য কি?
লাইসেন্দর প্রণয়িনীর প্রমুখ উক্ত বার্ত্তা শুনিয়া দুঃখার্ণবে নিমগ্ন হইলেন এবং বিবিধ প্রকারে বিষাদ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। অনন্তর উপায় চিন্তনে প্রবৃত্ত হইলে স্মরণ হইল তাঁহার পিতৃব্য পত্নী কিয়দ্দূরবর্ত্তি এক স্থানে বসতি করিতেছেন এথেন্স নগরীয় নিয়ম সেখানে প্রচলিত নাই। বিবেচনা করিয়া দেখিলেন সে স্থানে প্রস্থান করিলে উপস্থিত বিপদ্ হইতে হারমিয়া পরিত্রাণ পাইতে পারেন অতএব প্রেয়সীকে কহিলেন অদ্য নিশাভাগে তুমি পিত্রালয় হইতে পলাইয়া আইস, আমার পিতৃব্য পত্নী এস্থান হইতে কিয়দ্দূরে বাস করেন সেখানে পরিণয়ের এ নিয়ম চলিত নাই, তাঁহার মন্দিরে প্রত্যুষে দুই জনে পলায়ন পূর্ব্বক তথায় তোমার পাণি গ্রহণ করিব। নগরের বহির্ভাগস্থ যে ক্রীড়া কাননে বসন্ত কালে হেলেনার সহিত ভ্রমণ করিতাম সেখানে থাকিয়া তোমার প্রতীক্ষা করিব তথায় আসিয়া আমার সহিত সাক্ষাৎ করিও।
হারমিয়া এই পরামর্শে সাতিশয় আহ্লাদিত হইলেন, স্বীয় সহচরী হেলেনা ব্যতীত কাহার নিকটে ইহা প্রকাশ করিলেন না। কামিনীগণ প্রণয় পাশে নিবদ্ধ হইলে নায়কের নিমিত্ত উন্মত্ত প্রায় হয়, হেলেনা দেমিত্রিয়সের প্রেমে পড়িয়া তদ্রূপ হওয়াতে প্রিয়সখীর গুপ্ত কথা আপনার প্রিয় সন্নিধানে ব্যক্ত করিলেন। ইহাতে হেলেনার কোন প্রকার অভীষ্ট সম্ভাবনা ছিল না কেবল নায়কের আন্তরিক ভাবের পরীক্ষা নিমিত্ত সৌহৃদ্য ধর্ম্মের বিরুদ্ধাচরণ করিলেন কেননা মনে করিয়াছিলেন হারমিয়ার প্রতি দিমিত্রিয়সের আসক্তি থাকিলে এ সংবাদে অবশ্য তাঁহার পশ্চাদ্বর্ত্তী হইবেন।
সে যাহা হউক লাইসেন্দর যে কাননে হারমিয়ার সহিত মিলিত হইবার কল্পনা করিলেন সেখানে দেবযোনি পরী জাতির সতত সমাগম হইত।
পরীজাতির নৃপতি অবিরণ এবং তাঁহার মহিষী তিতেনিয়া আপনাদের অনুচর সমভিব্যাহারে নিশাযোগে সমাগমন পূর্ব্বক ঐ স্থানে আমোদ প্রমোদ করিতেন।
এই সময়ে রাজ্ঞীর সহিত পরীরাজ অবিরণের একটা কলহ উপস্থিত হইয়াছিল। চন্দ্রিকোজ্জ্বল নিশায় কাননাভ্যন্তর বর্ত্তি সুশোভিত তরু পংক্তির অভ্যন্তরে পরস্পর সাক্ষাৎ হইলে বিবাদে মত্ত হইতেন তাহাতে অধীনস্থ পরী সকল ত্রাসে শস্যাদির ত্বক্ মধ্যে লুক্কায়িত হইয়া থাকিত।
পরী দম্পতীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ঘটিবার কারণ এই, তিতেনিয়া একটী বালক প্রাপ্ত হইয়াছিলেন তাহাকে রাজা অবিরণের করে সমপর্ণ করিতে স্বীকার করেন নাই। ঐ শিশু রাজমহিষীর সখীগর্ব্ভজ। বয়স্যা সন্তান প্রসব করিয়া লোকান্তর প্রাপ্ত হইলে বালক ধাত্রী কর্ত্তৃক পালিত হইতেছিল। রাজ্ঞী তাহাকে দেখিয়া দয়ার আর্বিভাব হওয়াতে ধাত্রীর ক্রোড়ে তাদৃশ অন্য একটী বালক স্থাপন পূর্ব্বক হরণ করিয়া আনেন এবং লালন পালন করত বনের মধ্যে রাখিয়াছিলেন।
লাইসেন্দর হারমিয়ার সহিত পলায়ন নিমিত্ত যে সময় কাননে পরস্পর সম্মিলনের মন্ত্রণা করিয়াছিলেন তদবসরে পরীরাজের বনিতা তিতেনিয়া সহচরীগণ সমভিব্যাহারে বন বিহার করিতেছিলেন। সম্মুখে দেখিতে পাইলেন স্বামীও পাত্র মিত্র সহ তথায় অধিষ্ঠিত হইয়াছেন।
তিতেনিয়া নয়নগোচর হইলে পরীরাজ বিবাদ স্মরণ করত তাঁহাকে কহিলেন আঃ দুর্ললিতা তিতেনিয়া পূর্ণ নিশাকর কিরণোজ্জ্বল এই শুভ বিভাবরীভাগে তোর সহিত আবার অশুভ সাক্ষাৎ হইল। তাঁহার মহিলাও ঐ ভাবে কহিলেন হে দ্রোহি অবিরণ, তুমি কি এখানে ভ্রমণ করিতেছ? পরে রাজাচরদিগকে বলিতে লাগিলেন ওহে তোমরা আশু এস্থান হইতে প্রস্থান কর, আমি শরীরার্দ্ধ জায়া, আমিও শপথ পূর্ব্বক ইহার সহ বাস ত্যাগ করিলাম পরীরাজ মহিষীর এতদ্বচনে রোষ প্রকাশ করিলেন না, শান্তভাবে বলিলেন অয়ি অবোধ মহিষি, শপথ কর কেন? আমি কি তোমার স্বামী নহি? কি নিমিত্ত ত্যাগ করিবে? হে প্রেয়সি তোমার সেই ক্ষুদ্র বালকটী আমাকে দাও তাহাকে সহচর করিয়া সর্ব্বদা আপনার সন্নিধানে রাখিব।
রাজ্ঞী কহিলেন মহারাজ ধৈর্য্যাবলম্বন পূর্ব্বক সেই বালক প্রাপ্তির প্রয়াস পরিত্যাগ করুন সমুদায় রাজত্ব প্রদান করিলেও তাহাকে পাইতে পারিবেন না। ইহা কহিয়া রাজার রোষানল প্রদীপ্ত করত তাঁহার সম্মুখ হইতে গমন করিলেন। পরে পরীরাজ সরোষ বচনে কহিতে লাগিলেন ভাল এখন যাও, কিন্তু নিশাবসান না হইতে২ এই অবমাননার বিনিময়ে তোমার চিত্ত দাহ করিব।
তদনন্তর রাজা আপনার প্রিয়পাত্র পক্ নামক প্রধান মন্ত্রিকে আহ্বান করিয়া পাঠাইলেন।
ঐ মন্ত্রির অপর এক সংজ্ঞা রবিন্-গুড-ফেলো। সে অতি চতুর ধূর্ত্ত শিরোমণি দেবযোনি ছিল, নিকটস্থ গ্রাম সকলে গমন পূর্ব্বক সর্ব্বদা অদ্ভুত ও কৌতুক জনক ক্রীড়া করিত। কখন গোপদিগের গৃহে প্রবেশ পূর্ব্বক পাত্রস্থ দুগ্ধ অকস্মাৎ ফেণাবৃত করিত, কখন সুক্ষ্ম দেহ ধারণ পুরঃসর নবনীত পাত্র মধ্যে আপনার কল্পিতাকৃতি নিমগ্ন করত এবম্প্রকারে নৃত্য করিত যে গোপীগণের দধি মন্থন পূর্ব্বক নবনীতোদ্ধারের যত্ন বিফল হইয়া যাইত। গ্রামস্থ অন্যান্য লোকদিগের কর্ম্মেও এই রূপে সতত ব্যাঘাত করিত, কখন২ পানপাত্রের সহিত খেলা করিতে গিয়া সুরা নষ্ট করিয়া আসিত। অপর প্রতিবাসি লোকেরা অনেকে একত্র উপবেশন পুরঃসর আসব সেবনের উদ্যোগ করিলে দগ্ধ কর্কটাকার ধারণ পুরঃসর আসবাধার মধ্যে পতিত হইত, এবং কোন প্রাচীনা প্রমদা মদ্য পানার্থ উদ্যতা হইলে কুণ্ডলাকৃতি ধারণ পুরঃসর তাহার মদ্য পাত্রে পতিত হইয়া জিহ্বাগ্রে বাধা দিত তাহাতে মদ্য গলাধঃকৃত না হইয়া চিবুক দিয়া বিস্তৃত হইয়া পড়িত। অপর প্রবীণ স্ত্রীলোকে অঙ্গনাগণ মধ্যে উপবেশন পুরঃসর কোন বিষয় বর্ণন করিয়া গল্প করিতে আরম্ভ করিলে হঠাৎ উপস্থিত হইয়া তাহার আসন স্থানান্তরে লইয়া রাখিত তাহাতে সেই অবলা ভয়ে ভূতলে পতিত হইত। ইহাতে অন্যান্য প্রাচীন জল্পকেরা তাহার নিকট গমন পূর্ব্বক চতুর্দিগে বেষ্টন করিয়া হাস্য করিতে২ কহিত আর কোন সময় ঈদৃশ কৌতুকাবহ ঘটনা হয় নাই।
সেই কৌতুকাসক্ত রসিক অমাত্য আসিয়া উপস্থিত হইলে পরীরাজ তাহাকে সমীপে আহ্বান পূর্ব্বক কহিলেন কুমারীগণ যাহাকে প্রেম কুসুম বলে সেই পুষ্প একটা আনিয়া দাও দেখি। সেই কুসুম অতি ক্ষুদ্র বার্ত্তাকু পুষ্পের তুল্য, তাহার রস সুপ্ত ব্যক্তির নয়নে প্রদান করিলে নিদ্রা ভঙ্গে যাহার দিকে নেত্র পাত করে তাহার প্রতি প্রেমাসক্ত হয়, আমার মহিষী তিতেনিয়ার নিদ্রা সময়ে সেই কুসুমের রস তদীয় লোচনে প্রদান করিব তাহাতে তিনি সুপ্তোত্থিত হইয়া প্রথমতঃ যাহার প্রতি দৃষ্টি পাত করিবেন তাহারই প্রেমে আসক্ত হইবেন যদি নিদ্রাভঙ্গে দৈবাৎ সিংহ ভল্লুক অথবা চপল শাখামৃগের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন তাহার প্রতিই আসক্তা হইবেন। আমি অন্য এক দ্রব্যের দ্বারা তাঁহার নয়নেন্দ্রিয়ের এই মোহ নাশ করিতে পারি কিন্তু যাবৎ তাঁহার বালককে প্রাপ্ত না হইব তাবৎ পর্য্যন্ত করিব না সুতরাং অগত্যা বালক সমপর্ণ করিবেন।
পক্ মন্ত্রী নিরন্তর পরাপকারে রত থাকিত সুতরাং প্রভুর কুমন্ত্রণার মতে পোষকতা করিয়া সর্বান্তঃকরণে তৎক্ষণাৎ কুসুমান্বেষণ করিতে গেল। এই সময়ে দেমিত্রিয়স হারমিয়ার উদ্দেশে কানন মধ্যে প্রবেশ করিলেন। হেলেনা পশ্চাদ্গামিনী হইয়া আসাতে দেমিত্রিয়স তাঁহাকে যে সকল কথা কহিয়া ভর্ৎসনা করিতেছিলেন সমুদায় পরীরাজের কর্ণগোচর হইল। অনন্তর দেমিত্রিয়স্ কামিনীকে নানা প্রকার নিষ্ঠুর বাক্য কহিলেন তরুণী তাহাতে প্রত্যুক্তি না করিয়া বিনীতি প্রদর্শন পুরঃসর কেবল আপনার প্রতি তাঁহার পূর্ব্ব প্রণয় ও তদর্থ সত্য বন্ধনের বিষয় স্মরণ করিয়া দিতে লাগিলেন কিন্তু তাহাতে নির্দয় দেমিত্রিয়সের হৃদয়ে দয়ার সঞ্চার হইল না অবলাকে বিপিনে হিংস্র শ্বাপদের মধ্যে পরিত্যাগ পূর্ব্বক আপনি সে স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন। হেলেনা ভীষণ বনমধ্যে একাকিনী কোথায় কি আশ্রয় পাইবেন? নায়ক বিমুখতাবলম্বন পূর্ব্বক পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন পরায়ণ হইলে উর্দ্ধ শ্বাসে তাঁহার পশ্চাতে ধাবমান হইলেন।
পরীরাজ প্রেমাসক্ত ব্যক্তি দিগকে ভাল বাসিতেন, হেলেনার দুঃখ দর্শনে সাতিশয় দয়ার্দ্র হইলেন। লাইসেন্দর তরুণীকে পূর্ব্বে কহিয়াছেন চন্দ্রিকোজ্জ্বল রজনীতে আনন্দ দায়ক কানন মধ্যে ভ্রমণ করিতেন এক্ষণে বোধ হয় দেমিত্রিয়স্ যখন হেলেনার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন সেই সুখের সময়ে কামিনী বন বিহার করিয়া থাকিবেন এবং তদবস্থায় পরীরাজ অবিরণের দৃষ্টিগোচর হইয়াছিলেন। যাহা হউক রাজা যুবতীর কাতরতা দেখিয়া যৎপরোনাস্তি খিন্ন হইলেন এবং কুসুমানয়নার্থ প্রেরিত মন্ত্রী কখন্ আইসে ব্যস্ত সমস্ত হইয়া প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে অমাত্য পুষ্প গ্রহণ পূর্ব্বক প্রত্যাগত হইলে তাহাকে কহিলেন মন্ত্রিন্ এই কুসুমের কিয়দংশ লইয়া সত্বর ঐ দিকে গমন কর এথেন্স নগর বাসিনী একটী কামিনী এই বিপিন মধ্যে একটা ঘৃণ্য নায়কের প্রেমে আসক্ত হইয়া ব্যাকুলা হইয়াছেন উক্ত পুরুষ নিদ্রাগত হইলে এই কুসুমের রস তাহার নয়নে নিক্ষেপ করিও কিন্তু যখন তাহার সন্নিধানে তৎ প্রেমানুরক্ত নায়িকা থাকে সে সময় ঐ কর্ম্ম করিও তাহা হইলে ঐ ব্যক্তি নিদ্রাপগমে গাত্রোত্থান পূর্ব্বক অবশ্য সেই কামিনীকে অবলোকন করিবে। সেই পুরুষের অঙ্গে এথেন্স দেশীয় পরিচ্ছদ আছে তুমি দেখিলেই চিনিতে পারিবা। অমাত্য রাজার বচন শ্রবণানন্তর নিবেদন করিল মহারাজ চতুরতা প্রকাশ পুরঃসর আপনার সমুদায় আদেশ অবিলম্বে সম্পন্ন করিয়া আসিতেছি। অনন্তর মন্ত্রী প্রস্থান করিলে রাজা সংগোপনে স্বীয় মহিষী তিতেনিয়ার আবাসে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন অতি মনোহর নিকুঞ্জ, জাতী যূতি মল্লিকা মালতী প্রভৃতি নানাবিধ লতায় সুরঞ্জিত, নিকটবর্ত্তি নদীর শীকর বাহি সমীরণের বিবিধ সুরভি কুসুম সঞ্চালন পুরঃসর মন্দ২ বহনে চতুর্দ্দিক্ আমোদিত হইয়াছে, মধু গন্ধে লুব্ধ মধুকর নিকর মধুরাব্যক্ত কলরব করত পুষ্পে২ ভ্রমণ করিতেছে। সেই কুঞ্জান্তর্ব্বর্ত্তি কুটীরে দুগ্ধফেণনিভ শয্যার উপরি সর্ব্বাঙ্গ সুন্দরী পরীশ্বরী শয়ানা। শয়মের আচ্ছাদন বসন ভুজঙ্গের বিচিত্র কঞ্চুকময়, সেই আস্তরের ঈদৃশী বিস্তার যে তাহাতে রাণীর কলেবর সম্যক্ প্রকারে আচ্ছাদিত হইবার সম্ভব।
পরীরাজ অবিরণ রাণীর শয়ন সন্নিধানে দণ্ডায়মান হইয়া শ্রবণ করিলেন মহিষী নিদ্রার প্রাক্ কালে কর্ম্মকরীগণের মধ্যে কাহাকেও আজ্ঞা করিতেছেন গোলাপ পুষ্পের অভ্যন্তরবর্ত্তি কীট সকল বিনষ্ট করিও, কাহাকে কহিতেছেন অধীনস্থা পরীদিগের বেশ ভূষণ নিমিত্ত চর্ম্মচটিকার সহিত যুদ্ধ করিয়া পক্ষ আহরণ কর, কাহাকেও বলিতেছেন এখানে উপস্থিত থাকিয়া প্রহরিতা কর পেচক যেন নিশীথে নিকটে আসিয়া রব না করে। পরে সকলকে কহিলেন অগ্রে তোমরা নিকটে বসিয়া সংগীত করত আমার নিদ্রাকর্ষণ করাও পশ্চাৎ উপদিষ্ট স্ব২ কর্ত্তব্য সম্পাদন করিও ইহাতে সহচরীগণ সন্নিধানে উপবেশন পূর্ব্বক গান করিতে লাগিল। যথা।
দুই জিহ্বা ফণা ধারি ওহে অহি গণ।
গোধিক শল্লকী তথা হও অদর্শন॥
অহে অন্ধ কৃমি কীট না কর অনিষ্ট।
রাজ্ঞীর নিকটে কেহ না হও প্রবিষ্ট।
ওহে ফাইলোমেল তুমি কর সেই গান।
যোগ করি নিদ্রাকর সুললিত তান॥
নিদ্রা দেবি রাণী নেত্র কর আকর্ষণ।
কুহক কাপট্য মায়া যাও স্বভবন।
আসিও না পুনঃ কভু রাণী সন্নিধান।
আবির্ভব নিজে করি আমরা প্রস্থান॥
সহচরীগণ এবম্প্রকার সুললিত সংগীত দ্বারা রাজ্ঞীকে নিদ্রামগ্ন করিয়া গাত্রোত্থান পুরঃসর স্ব২ কর্ম্ম সম্পাদন নিমিত্ত গমন করিল। পরে রাজা মহিষীর পার্শ্বে অধিষ্ঠান করিয়া নিম্ন লিখিত মন্ত্রোচ্চারণ পুরঃসর তদীয় নয়নে প্রণয় কুসুমের কিঞ্চিৎ রস নিক্ষেপ করিলেন।
নিদ্রাভঙ্গে যার প্রতি পড়িবে নয়ন।
প্রেমাসক্ত হয়্যে তাকে করিও গ্রহণ।
ইদানী হারমিয়ার বৃত্তান্ত বর্ণনা করা যাইতেছে। হারমিয়া পিতৃ নির্দ্দিষ্ট সৎপাত্র দেমিত্রিয়সের গলে বরমাল্য দানে অস্বীকার করিয়া ব্যবস্থানুসারে প্রাণ দণ্ড হইবার আশঙ্কায় ভীত হইলেন এবং অবিলম্বে পিত্রালয় হইতে পলায়ন পুরঃসর নায়কের সঙ্কেতানুসারে বন মধ্যে প্রবেশ করিলেন। সেখানে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন প্রিয় লাইসেন্দর তৃষিত চাতক প্রায় তাঁহার পদবী অবলোকন করত অপেক্ষা করিতেছেন, মনে করিতেছেন প্রেয়সী আসিয়া উপস্থিত হইলেই তাঁহাকে লইয়া খুড়ীর আলয়ে গমন করি। অনন্তর তরুণী আসিয়া সম্মুখীন হইলে পরস্পর আনন্দ সাগরে নিমগ্ন হইলেন এবং মিলিত হইয়া যাত্রা করিলেন। কিন্তু অর্দ্ধেক বন উত্তীর্ণ না হইতে২ হারমিয়া অতিশয় ক্লান্তা হইয়া পড়িলেন আর পদবিক্ষেপে ক্ষমতা হইল না। হারমিয়া স্বীয় জীবন বিপদগ্রস্ত করিয়া লাইসেন্দরের প্রতি প্রণয় নিবন্ধন করিয়াছিলেন সুতরাং তাঁহার সুখস্বাচ্ছন্দ্য নিমিত্ত লাইসেন্দরও যৎপরোনাস্তি যত্ন করিতেন, সুকুমারী প্রেয়সীকে পথি শ্রান্তা দেখিয়া এক নদী তীরে লইয়া গেলেন এবং তথায় কোমল শৈবাল দ্বারা শয্যা রচনা করিয়া তদুপরি শয়ন পূর্ব্বক যামিনী যাপন করিতে অনুরোধ করিলেন। তরুণী অধ্ব শ্রান্তি হেতু নিতান্ত খিন্না থাকাতে তৎক্ষণাৎ শয়ন করিলে আপনিও নিকটে ভূমিশয্যায় শয়ান হইলেন, কিঞ্চিৎ বিলম্বে উভয়ের নিদ্রাকর্ষণ হইল। তদনন্তর পরীরাজের মন্ত্রী তথায় আগমন পূর্ব্বক অবলো কন করিলেন এথেন্স দেশীয় পরিচ্ছদ ধারী অতি মনোহর রূপবান্ এক পুরুষ, এবং তৎপার্শ্বে সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী এক রমণী ভূমিশয্যায় শয়ন করিয়া অচেতনে নিদ্রা যাইতেছেন। তাঁহাদের দুই জনকে দেখিয়া স্মরণ হইল পরীরাজ অবিরণ যে ঘৃণিত নায়ক ও তৎপ্রণয়সক্তা এথেন্স নগরী নিবাসিনী নায়িকার অন্বেষণ করিতে অনুজ্ঞা করিয়াছিলেন তাঁহারাই এই দম্পতী। অনন্তর বিবেচনা করিতে লাগিলেন এ স্থানে অন্য প্রাণির সমাগম সম্ভাবনা নাই, এ পুরুষ নিদ্রাভঙ্গে অবশ্য এই কামিনীরই মুখাবলোকন করিবে অতএব অধিপের আদেশানুসারে প্রেম কুসুমের রস ইহার নয়নে নিক্ষেপ করি। কিন্তু দৈবী বিড়ম্বনা কি বিচিত্র। পরীরাজের অমাত্য সেই প্রকার করিয়া প্রস্থান করিলে সে স্থানে হঠাৎ হেলেনা আসিয়া উপস্থিত হইলেন দৈবযোগে তৎকালে লাইসেন্দরের ও নিদ্রাভঙ্গ হইল সুতরাং তাঁহার লোচন হেলেনার প্রতি নিপতিতা হওয়াতে অদ্ভুত কুসুম রসের আশ্চর্য্য শক্তি দ্বারা হেলেনা তদীয় পরম প্রণয় ভাজন হইলেন, হারমিয়ার প্রতি যে প্রেম ছিল তাহা একেবারে অন্তর্দ্ধান হইয়া গেল।
লাইসেন্দর শয়ন হইতে গাত্রোত্থানানন্তর নয়ন দ্বয় বিনিদ্র করিবার সময় অগ্রে যদিস্যাৎ হারমিয়ার প্রতি নেত্রপাত করিতেন তাহা হইলে পরীরাজের অমাত্য ভ্রমবশতঃ যে কুহক করিল তাহাতে বিশেষ ফল দর্শিত না কেননা লাইসেন্দর তাঁহার প্রতি পূর্ব্বাবধি অনুরাগী ছিলেন। কিন্তু ইদানী মোহনীয় কুসুম রসযোগে জাগ্রৎ হইয়া হঠাৎ হেলানাকে অবলোকন করাতে তদাসক্ত হইলেন। একেবারে প্রেমের বশম্বদ হওয়াতে নিশীথে চির প্রণয়িনী সমভিবাহারিণী রমণীকে অরণ্য মধ্যে একাকিনী পরিত্যাগ পূর্বক নবানুরাগ ভাজন হেলেনার আনুগত্য করিতে উদ্যত হইলেন। সুতরাং হারমিয়া বিষম সঙ্কটে পড়িলেন, তাঁহার পরিতাপের পরিসীমা রহিল না।
দেমিত্রিয়স্ যখন হেলেনার নিকট হইতে বেগে পলায়ন করেন তখন এই দুঃখিনী কামিনী তাঁহার সঙ্গ হারাইবার ভয়ে পশ্চাদ্ধাবমানা হইয়াছিলেন কিন্তু অবলা অপেক্ষা পুরুষ স্বভাবতঃ সবল এপ্রযুক্ত বহু ক্ষণ পশ্চাৎ২ দ্রুত গমন করিতে পারেন নাই। কিয়ৎ ক্ষণ পরে নায়ক অদৃশ্য হওয়াতে বিরহে ব্যাকুলা হইয়া একাকিনী ইতস্ততো ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। শেষে লাইসেন্দর যে কাননে আপন প্রিয়তমা সহিত নিদ্রায় নিশা যাপন করিতেছিলেন হঠাৎ সে স্থানে গিয়া উপস্থিত হওয়াতে পূর্ব্ব পরিচিত দেখিয়া চিনিতে পারিলেন এবং তাঁহার অবস্থায় করুণান্বিত হইয়া বিস্ময় প্রকাশ পূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন এ কি এখানে লাইসেন্দর যে ভূমিশয্যায় শয়ান, ইহাঁর কি প্রাণ বিয়োগ হইয়াছে? অথবা নিদ্রাভিভাবে পড়িয়া আছেন? তদনন্তর ধীরে২ স্বীয় করশাখা দ্বারা তদীয় অধর ধারণ পুরঃসর কহিলেন হে যুবা যদি জীবিত থাক নিদ্রা পরিত্যাগ পূর্ব্বক সচেতন হও। লাইসেন্দর কামিনীর করস্পর্শে বিনিদ্র হইলেন এবং নয়ন দ্বয় উন্মীলন করত আদৌ তাঁহার বদন অবলোকিত করাতে প্রণয় পাশে পড়িলেন। নেত্রগত মোহনীয় কুসুম রসের প্রভাবে একে বারে বশম্বদ হইয়া প্রণয়লাপ নিমিত্ত বাহুল্য রূপে তদীয় রূপ লাবণ্যের বর্ণনা করত কহিলেন অয়ি এণনয়না হেলেনা বায়সাপেক্ষা পারাবত যদ্রূপ অধিক সুরূপ, হারমিয়া অপেক্ষা তুমিও তদ্রূপ রূপে গুণে সহস্রগুণে শ্রেষ্ঠ। তোমার নিমিত্ত আমার অন্তঃকরণ মোহিত হইয়াছে তোমাকে প্রাপ্ত হইবার নিমিত্ত সর্ব্বপ্রকার কষ্ট স্বীকারে প্রস্তুত আছি। এবম্বিধ বিবিধ চাটুবচনে আনতি উৎপাদনের চেষ্টা করিতে লাগিলেন। হেলেনা আপনার প্রণয় ভাজন পরম প্রিয়তম হারমিয়ার প্রতি তাঁহার আসক্তি অবগতা ছিলেন যুবা তাঁহার পাণি গ্রহণ নিমিত্ত যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেন তাহাও তাঁহার অবিদিত ছিল না। অতএব এক্ষণে লাইসেন্দরের ঐ সমস্ত প্রেমের কথা শ্রবণে সন্তুষ্ট না হইয়া বরং বিরক্ত হইলেন অধিকন্তু তাঁহার আশঙ্কা হইল যুবা বুঝি তাঁহার সহিত ব্যঙ্গ করিতেছেন অতএব পরিতাপ প্রকাশ পূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন হাঃ কপাল, লোকের অবজ্ঞা ও ঘৃণার ভাজন হইবার নিমিত্ত কি জন্মিয়া ছিলাম? ওহে তরুণ, আমার প্রেমাস্পদ দেমিত্রিয়স কদাপি আমাকে সপ্রণয় নয়নে অবলোকন করেন নাই কখন একটী মিষ্ট কথাও কহেন নাই, তন্নিমিত্ত সদা মনোদুঃখে কাল হরণ করিতেছি তুমি আবার ঈদৃশ ব্যঙ্গ বচনে ঘৃণা প্রকাশ করিয়া মৃত শরীরে খড়্গাঘাত কেন কর? ওহে আমি তোমাকে তদপেক্ষা সৎ ও সুশীল জ্ঞান করিতাম তাহার কি এই ফল? এতাবদুক্তি করিয়া কোপভরে সে স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন। লাইসেন্দর কুহক বশতঃ প্রেম বাগুরায় পড়িয়াছেন প্রকৃত বচনও প্রণয়ের্ষার কথা বোধ করিতে লাগিলেন কামিনী পরাঙ্মুখী হইয়া গমন করিলে সহচরী হারমিয়াকে নিদ্রিতাবস্থায় অরণ্য মধ্যে পরিত্যাগ পূর্ব্বক তাঁহার পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন।
অনন্তর হারমিয়ার নিদ্রাভঙ্গ হইল। নির্মনুষ্য অরণ্য মধ্যে আপনাকে একাকিনী দেখিয়া ব্যাকুলা হইলেন। প্রিয়তম লাইসেন্দর নিদ্রাবস্থায় পরিত্যাগ করিয়া কোথায় গেলেন কাতর হইয়া বনের চতুর্দ্দিকে অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। কুত্রাপি দর্শন পাইলেন না এবং কোথায় গেলে উদ্দেশ হইবে তাহাও স্থির করিতে পারিলেন না। এ দিকে দেমিত্রিয়স্ হারমিয়ার সহিত লাইসেন্দরের পলায়ন সংবাদ শ্রবণাবধি সর্ব্বত্র তাঁহাদের অনুসন্ধান করিতেছিলেন কোন স্থানে দেখিতে পান নাই, অনর্থক পর্য্যটনে শ্রান্ত ও নৈরাশ্যে খিন্ন হইয়া বিপিনের এক প্রান্তে তরুমূলে শয়ন করিলেন ক্রমে নিদ্রাকর্ষণে অচেতন হইয়াছেন এতদবসরে পরীরাজ অবিরণ তাঁহাকে দেখিতে পাইলেন। রাজা মন্ত্রিকে প্রেম কুসুমের বিষয়ে প্রশ্ন করাতে অবগত হইয়াছিলেন ভ্রমবশতঃ অন্য পুরুষের নয়নে তাহা প্রদত্ত হইয়াছে। অতএব যে মনুষ্যকে মুগ্ধ করিবার মানস করেন এক্ষণে তাঁহাকে সম্মুখে প্রাপ্ত হওয়াতে তাঁহার লোচনে সেই কুসুম রস তৎক্ষণাৎ নিক্ষেপ করিলেন। হেলেনা লাইসেন্দরকে পরিত্যাগ পূর্ব্বক ভ্রমণ করিতে২ দৈবাৎ ঐ সময়ে তথায় আসিয়া উপস্থিত হওয়াতে দেমিত্রিয়স্ নিদ্রাভঙ্গে নয়নোন্মীলনানন্তর তাঁহাকে অবলোকন করিলেন সুতরাং ইনিও এক্ষণে লাইসেন্দরের ন্যায় প্রেমাসক্ত হইয়া তরুণীর প্রণয়োৎপাদন নিমিত্ত বিবিধ চাটূক্তি করিতে লাগিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে লাইসেন্দর এবং তৎপশ্চাৎ হারমিয়া সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন কিন্তু হারমিয়ার প্রতি এক্ষণে কোন নায়কের স্নেহ নাই যেহেতু পরীরাজের অমাত্যের ভ্রম বশতঃ তাঁহার মনোনীত নায়ক হেলেনার সহিত প্রণয়োৎপাদন নিমিত্ত মুগ্ধ হইয়াছেন, আর পরীরাজের বাসনায় দেমিত্রিয়সও হেলেনার নিমিত্ত সাতিশয় ব্যাকুল। দুই নায়ক অধুনা হেলেনার সহিত প্রণয়ালাপ করিতে লাগিলেন কেননা উভয়েই অপূর্ব্ব প্রণয় কুসুম রস প্রভাবে তদাসক্ত হইয়াছিলেন।
হেলেনা দেখিলেন দুই নায়ক আমার প্রতি প্রেম প্রকাশ করিতেছেন পরম প্রিয়সখী হারমিয়া মৌনাবলম্বন পূর্ব্বক দণ্ডায়মান হইয়া কৌতুক দেখিতেছেন অতএব কিয়ৎ ক্ষণ বিস্ময়াপন্ন হইয়া থাকিয়া মনে করিলেন তিন জনে পরামর্শ করিয়া আমার প্রতি শ্লেষোক্তি করিতে আসিয়াছেন।
হারমিয়াও হেলেনার ন্যায় বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন যেহেতু তাঁহার দৃঢ় প্রত্যয় ছিল লাইসেন্দর ও দেমিত্রিয়স্ উভয়ে তাঁহারই প্রেমাসক্ত, কিন্তু এক্ষণে দুই জনকে হেলেনার প্রতি সাতিশয় ব্যগ্রতা সহকারে প্রণয় প্রকাশ করিতে দেখিলেন। ফলতঃ তাঁহারা পূর্ব্বে হারমিয়ারই রূপ লাবণ্যের ভূরি২ প্রশংসা করিয়াছিলেন এবং হারমিয়াও তাহাতে কোন প্রকার শ্লেষ জ্ঞান করেন নাই এক্ষণে হঠাৎ উভয়ের এবম্প্র কার প্রীতির পরিবর্ত্তন হওয়াতে চমৎকৃত হইবেন বিচিত্র কি?
হারমিয়া ও হেলেনার পরস্পর পরম সৌহৃদ্য ছিল কিন্তু এই ঘটনায় এক্ষণে বিজাতীয় বিদ্বেষ জন্মিল, উভয়ে উভয়ের প্রতি গ্লানি ও কটূক্তি করিতে আরম্ভ করিলেন।
হেলেনা সকোপ বচনে কহিতে লাগিলেন প্রিয়সখি হারমিয়া তুমি কি একেবারে এত নির্দয় হইলে? উপহাস জনক প্রশংসা দ্বারা আমার অপমান করিতে লাইসেন্দরকে এবম্প্রকারে প্রবৃত্ত কর? তোমার প্রেমাস্পদ দেমিত্রিয়স নিরন্তর আমাকে ঘৃণা করিয়াছেন এক্ষণে ঈশ্বরী, অপ্সরা, কিন্নরী, দেবকন্যা, অমূল্য রত্ন, বলিয়া সম্বোধন করিলেন এ উপহাস কি তোমার মন্ত্রণা ব্যতীত সম্ভবে? তোমার ষড়যন্ত্র না থাকিলে আমার চির নিন্দক অকস্মাৎ কখন এরূপ প্রশংসা করিত না। যাহা হউক, আমি তোমাকে পরম সুহৃদ্ বলিয়া জানিতাম আমাকে দুঃখিনী দেখিয়া পুরুষের সহিত সম্মিলন পূর্ব্বক এ প্রকার অপমান করা উচিত হয় না। হারমিয়া তুমি কি বাল্যাবস্থায় পাঠশালার সৌহৃদ্য একেবারে বিস্মৃত হইয়াছ? মনে পড়ে না, দুই জনে একাসনে উপবেশ পর্ব্বক এক গীতের আলাপ করিতে২ বসনের উপর সূচি দ্বারা এক কুসুম নির্ম্মাণ করিতাম? উভয়ে সর্ব্বদা একত্র ভোজন শয়ন করিয়া এতদ্রূপ অভিন্ন ভাবে বর্দ্ধিত হইয়াছি যে কেহ হঠাৎ বুঝিতে পারে নাই আমরা পৃথক্ ব্যক্তি। এক্ষণে পুরুষের সহিত মিলিয়া হতভাগ্যা দেখিয়া সেই বয়স্যার প্রতি পরিহাস করিতেছ এ কি সৌহৃদ্য ধর্ম্ম?
হারমিয়া এ সমস্ত বাক্য শ্রবণে বিস্ময় প্রকাশ পূর্ব্বক কহিলেন হেলেনা তোমার কোপান্বিত কথায় আমার চমৎকার বোধ হইতেছে আমি তোমাকে ঘৃণা করি নাই বরং তুমি আমাকে অবজ্ঞা করিতেছ। ইহাতে হেলেনা সবিষাদ বচনে বলিলেন উপহাস করিয়া গম্ভীর আকৃতি ধারণ কর এ যে বিচিত্র ব্যাপার দেখি। আমি স্বচক্ষে নিরীক্ষণ করিলাম যখন বিমুখ হইলাম মুখভঙ্গি পূর্ব্বক পরস্পর নয়নেঙ্গিত দ্বারা ব্যঙ্গ করিলে, স্নেহ অথবা শীলতা থাকিলে কদাপি এবম্প্রকার ব্যবহার করিতে না।
এ দিকে হেলেনা ও হারমিয়া উক্ত প্রকার বাক্য দ্বারা পরস্পরের ক্রোধানল প্রজ্বলিত করিতে আরম্ভ করিলেন। ও দিকে দেমিত্রিয়স ও লাইসেন্দর উভয়ে একতরের পরাজয় পূর্ব্বক হেলেনা লাভার্থ পরস্পর সংগ্রাম করিতে রণ ক্ষেত্রে গেলেন।
কামিনী দ্বয় কলহে নিমগ্ন থাকাতে তাঁহারা কখন গেলেন জানিতে পারেন নাই কিয়ৎক্ষণ পরে বিবাদে শ্রান্ত হইয়া দেখিলেন স্ব২ নায়ক নিকটে নাই অতএব পৃথক্ হইয়া আপন২ প্রিয়তমের অন্বেষণ নিমিত্ত অরণ্যের চতুর্দিকে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন।
পরীরাজ এবং তদীয় মন্ত্রী তরুণী দ্বয়ের কলহ সমুদায় শ্রবণ করিয়াছিলেন। দুই জনে আপন২ নায়কের অনুসন্ধানার্থ গমন করিলে অমাত্যকে কহিলেন মন্ত্রিন তোমার অসাবধানতা হেতু কি এই উৎপাত ঘটিয়াছে কিম্বা তুমি স্বেচ্ছাপূর্ব্বক সেই কর্ম্ম করিয়াছিলে? মন্ত্রী নিবেদন করিল মহারাজ আমার ভ্রমবশতঃ সে ব্যাপার ঘটে। স্মরণ করিয়া দেখুন না, আমাকে কহিয়াছিলেন এথেন্স দেশীয় পরিচ্ছদ ধারির নয়নে কুসুম রস নিক্ষেপ করিও। কিন্তু হে পরীরাজ আমার ভ্রমবশতঃ যাহা ঘটিয়াছে তাহাতে দুঃখ বোধ হইতেছে না, দেখুন দেখি তাহাদের কলহে কেমন প্রমোদকর কৌতুক হইতেছে। পরীরাজ কহিলেন উৎপাতও ঘটিয়াছে। দেমিত্রিয়স ও লাইসেন্দর পরস্পরের পরাভব কারণ রণ ক্ষেত্রে সংগ্রাম করিতে গিয়াছেন অতএব এক্ষণে এক কর্ম্ম কর, এই রজনীকে ঘোরতর কুজ্ঝটিকায় আবৃত করণের চেষ্টা দেখ, রাত্রি নিবিড়ান্ধকারাচ্ছন্না হইলে বিরোধি যুবক দ্বয়ের দিক্ ভ্রম হইবেক, পরস্পরকে দেখিতে পাইবেন না। তুমি তাঁহাদের স্বরে কটুবাক্য প্রয়োগ পুরঃসর পরস্পরের অপমান করিও তাহা হইলে বৈরির বাক্যজ্ঞানে ক্রুদ্ধ হইয়া রোষবশতঃ শব্দানুসারে অন্যোন্যের অনুগমন করিবেন। যাবৎ চলিয়া২ শ্রান্ত না হন তাবৎ পর্য্যন্ত ক্রমাগত ঐ রূপ করিবে। পরে যখন দেখিবে দুই জনে ক্লান্ত হইয়া কোন স্থানে শয়ন পূর্ব্বক নিদ্রা গেলেন তখন লাইসেন্দরের নয়নে এই পুষ্পের রস প্রদান করিও তাহাতে তিনি নিদ্রা ভঙ্গের পর হেলেনার প্রণয় বিস্মরণ করিয়া হারমিয়ার পুরাতন প্রেমে আসক্ত হইবেন ইহা হইলেই এই দুই দুঃখিনী কামিনী স্ব২ নায়ক সহ সঙ্গতা হইয়া এ দুঃখের শেষ করত শেষে মহা সুখে কাল যাপন করিতে পারিবেন এবং এই সকল উৎপাত পরে তাঁহাদিগের স্বপ্নবৎ প্রতীয়মান হইবেক। অতএব মন্ত্রিবর সত্বর গমন পূর্ব্বক এই কার্য্যটী সমাধা করিয়া আইস। আমিও রাণী তিতেনিয়া সন্নিধানে প্রস্থান করিয়া দেখি তিনি কোন্ ব্যক্তিকে প্রণয় ভাজন পাইলেন।
তিতেনিয়া এ পর্যন্ত স্বাপাবেশে ছিলেন। পরীরাজ অবিরণ নিকটে গিয়া অবলোকন করিলেন রাণীর নিকুঞ্জঃ সন্নিধানে অধ্বশ্রান্ত একটা মূঢ় পুরুষ শয়ন করিয়া রহিয়াছে। তাহাকে দেখিয়া কহিলেন এই ব্যক্তিকে মদীয় গর্ব্বিণী বনিতার নায়ক করা যাউক। অনন্তর রাজা ঐ নিদ্রিত মূঢ়ের মস্তকোপরি একটা গর্দ্দভের মুণ্ড সংযোগ করিলেন। সেই মস্তক এতাদৃশ উপযুক্ত রূপে স্কন্ধ সংলগ্ন হইল যে স্পষ্ট বোধ হইতে লাগিল যেন স্কন্ধের উপর জন্মিয়াছে। যাহা হউক, যদিও পরীরাজ তাহা অতি ধীরে২ বসাইলেন তথাপি স্পর্শ মাত্রে সে ব্যক্তি জাগ্রৎ হইয়া গাত্রোত্থান করিল। কিন্তু পরীরাজ তাহার মুণ্ড কিরূপ করিয়াছেন বোধগম্য করিতে পারিল না, নিকুঞ্জের যে স্থলে রাজ মহিষী শয়ন করিয়াছিলেন তথায় গমন করিল।
রাণীর নিদ্রাভঙ্গে নয়নোন্মীলন হইবামাত্র তাহার প্রতি দৃষ্টিপাত হইল সুতরাং কুসুম রসের গুণ তৎক্ষণাৎ কার্য্য কারক হইল। রাজ্ঞী শয্যা হইতে গাত্রোত্থানানন্তর কহিতে লাগিলেন আহা মরি কি সুন্দর পরম সুশ্রী সুশোভন পুরুষ দর্শন করিলাম। ওহে চিত্ত হারক মনোমোহন তোমার যেমন রূপ লাবণ্য তেমনি কি বাক্যের লালিত্য, কতই পাণ্ডিত্য শিখিয়াছ।
মূঢ় পুরুষ রাণীর এ সকল বাণীর তাৎপর্য্য বুঝিতে পারিল না এতাবন্মাত্র কহিল ওহে যুবতি যদিস্যাৎ এ বল হইতে বহির্গত হইবার পথ প্রাপ্ত হই তাহা হইলে কৃতার্থতা বোধ করি।
পরীরাজ বনিতা কুহক বশতঃ প্রেমাসক্তা হইয়াছেন তাহার এই কথা শুনিয়া কহিলেন প্রাণনাথ অরণ্য হইতে নিষ্ক্রমণের বাসনা বিসর্জ্জন কর। আমি সামান্যা দেবযোনি নহি, তোমার প্রতি অনুরাগিণী হইয়াছি, কোথায় যাইবে? এখানে বসিয়া আমার সঙ্গে প্রেমালাপ কর তোমার সেবা নিমিত্ত দাস নিযুক্ত করিয়া দিব।
অনন্তর রাণী চারি জন কিঙ্করকে আহ্বান করিলেন তাহাদের নাম পিস্বোসম, কবওএব, মথ, এবং মস্তার্দসিদ।
ভূতেরা আসিয়া, সম্মুখীন হইলে রাজ্ঞী তাহাদিগকে আজ্ঞা করিলেন তোমরা এই সুন্দর পুরষের সেবায় নিযুক্ত হও সর্ব্বদা ইহাঁর সম্মুখে থাকিবে। ইনি যখন শয়ন করিবেন পদসেবা করিও। অপর ইহাঁর সম্মুখে নৃত্য করিয়া আমোদ করিও। আহার নিমিত্ত দ্রাক্ষাদি উত্তমোত্তম সুস্বাদু ফল আনিয়া দিও। যদি ইহাঁর মধু পানে ইচ্ছা হয় মধু মক্ষিকার নিকট হইতে মধুভাণ্ড আহরণ করিও। ভৃত্যদিগকে এই রূপ উপদেশ করিয়া পরে নায়কের প্রতি কহিলেন হে রূপনিধান, তোমার রাসভ মুণ্ড কি মনোহর, তুমি আমার পার্শ্বে আসিয়া উপবেশন কর, আমি তোমার লোমশ গণ্ডস্থলে হস্তার্পণ করিয়া ক্রীড়া করি। হে প্রমোদবর্দ্ধক, নিকটে আইস, তোমার সুশোভন দীর্ঘ শ্রবণ দ্বয় চুম্বন করি।
কিন্তু গদ্দর্ভ মুণ্ড ধারী মূঢ় পরীরাজ্ঞীর এ সমস্ত প্রণয় বচনে মনোযোগ করিল না, সে আজ্ঞাবহ দাস চতুষ্টয় প্রাপ্ত হওয়াতে অভিমানী হইয়া একজন কিঙ্করকে আহ্বান করিল। অরে পিস্ব্লোসম কোথায়?
পিসব্লোসম কহিল, এই যে আমি উপস্থিত আছি।
গর্দ্দভমুণ্ড মূঢ় তাহাকে আজ্ঞা করিল আমার মস্তক কণ্ডূয়ন কর। কবওএব কোথায়?
কব্ওএব নিকটে গিয়া কহিল মহাশয় এই আমি সম্মুখে দণ্ডায়মান, আজ্ঞা করুন। মূঢ় তাহাকে বলিল ওহে কবওএব ঐ দিকে কণ্টকময় গুল্মের উপর একটা লোহিত বর্ণ মক্ষিকা বসিয়া আছে তাহাকে বিনষ্ট করিয়া মধুচক্র আমার সন্নিধানে আনয়ন কর। এই ব্যাপার সাধনে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করিও না, সাবধানে উপদিষ্ট কর্ম্ম করিও, মধুভাণ্ড যেন ভগ্ন না হয়, মধুভাণ্ড ভাঙ্গিলে তদ্বারা তোমার সর্ব্ব শরীর প্লাবিত হইয়া যাইবে। পরে জিজ্ঞাসা করিলেন ওহে মস্তার্দসিদ কোথা গিয়াছে?
মস্তার্দসিদ আপনার নামোল্লেখমাত্রে সম্মুখে গিয়া নিবেদন করিল মহাশয় দাস উপস্থিত, আদেশদ্বারা প্রসাদ করিতে আজ্ঞা হয়।
মূঢ় কহিল তোমাকে এতাবন্মাত্র আজ্ঞা করি পিসব্লোসম আমার শিরঃ কণ্ডূয়ন করিতেছে ইহার সাহায্য কর। আমি একবার নাপিতালয়ে গমন করিব কেননা বোধ হইতেছে আস্যদেশে শ্মশ্রুগুলা সাতিশয় বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছে।
অনন্তর পরীরাজ মহিষী মূঢ়কে কহিলেন ওহে মনোমোহন কি ভোজন করিতে ইচ্ছা হয়? আমার এক জন সাহসী দাস আছে তোমার নিমিত্ত বৃক্ষ মার্জ্জারের সঞ্চিত ভাণ্ডার হইতে উত্তমোত্তম ফল আনয়ন করিতে তাহাকে পাঠাইয়াছি।
মূঢ় রাসভাস্য ধারণ করাতে খরের খাদ্যে সস্পৃহ হইয়া কহিল উত্তম ফলে কি প্রয়োজন? আমাকে একমুষ্টি শুষ্ক মটর দান করিও। কিন্তু এক্ষণে কিছুতেই কার্য্য নাই তোমাদিগকে বিনতি করি এখন আমাকে উত্ত্যক্ত করিও না। আমার নিদ্রাকর্ষণ হইতেছে।
রাণী সপ্রণয় বচনে কহিলেন তবে তুমি নিদ্রা যাও আমি আপন বাহুলতা দ্বারা তোমাকে গাঢ় আলিঙ্গন করি। ওহে আমি তোমাকে অন্তঃকরণ সহিত ভাল বাসি, তুমি যে প্রকারে আমার চিত্তরঞ্জন করিতেছ বাক্য দ্বারা বর্ণনা করিয়া ব্যক্ত করা অসাধ্য।
অনন্তর গর্দ্দভমুণ্ড মূঢ় রাণীর ক্রোড়ে শয়ন করিয়া নিদ্রাভিভূত হইলে পরীরাজ মহিষীর সম্মুখে প্রকাশমান হইয়া রাসভের প্রতি প্রণয় নিবন্ধন নিমিত্ত তাঁহাকে যৎপরোনাস্তি ভর্ৎসনা করিতে লাগিলেন।
রাণী এ বিষয় গোপন করিতে পারিলেন না কেননা সেই মূঢ়ের গর্দ্দভমুণ্ডে কুসুমের মুকুট প্রদান পূর্ব্বক তাহা আপনার ক্রোড়ে অর্পিত করিয়া রাখিয়াছিলেন রাজা স্বচক্ষে নিরীক্ষণ করিলেন।
পরীরাজ নানাপ্রকার তিরস্কার করিয়া শেষে কোপভরে তাঁহার সেই বালকটি যাচ্ঞা করিলেন। রাণীর অভিনব প্রণয়াস্পদ নায়ক স্বামির নিকট প্রকাশ পাইল ইহাতে সাতিশয় লজ্জিতা ও ভীতা হইলেন অতএব এক্ষণে আর বালকার্পণে অস্বীকার করিতে সাহস হইল না।
অবিরণ বহুকালাবধি বাসনা করিতেন সেই ক্ষুদ্র বালকটীকে লইয়া আপনার দাস করিবেন এত কাল বনিতার নিকট হইতে লইতে পারেন নাই এক্ষণে কৌশলে মনোভীষ্ট সিদ্ধ হইলে আপনার প্রেয়সী মহিষীর লজ্জা ও ভয় দেখিয়া তৎপ্রতি সদয় হইলেন অতএব রাজ্ঞীর নয়নে অন্য কুসুমের রস নিক্ষেপ পূর্ব্বক তাঁহার মোহ দূর করিলেন। রাণী মোহান্তে আপনার নূতন প্রণয়ের বিষয় স্মরণ করত বিস্ময়াবিষ্টা হইলেন এবং রাসভাস্য মূঢকে দেখিয়া কহিলেন এ টা কে, ঘৃণিত রাক্ষস।
অনন্তর পরীরাজ সে মূঢ়ের গর্দ্দভমুণ্ড তুলিয়া লইলেন তাহাতে সে স্বীয় স্কন্ধে আপনার নির্বোধের মুণ্ড ধারণ পুরঃসর নিদ্রা যাইতে লাগিল।
অবিরণ আপনার মহিষীর সঙ্গে সম্মিলন হইলে তাঁহার নিকট উল্লেখিত নায়ক নায়িকাদের সমুদায় বৃত্তান্ত বর্ণন করিলেন এবং শেষে কি হইয়াছে দেখিবার নিমিত্ত রাণীকে সমভিব্যাহারে লইয়া তাঁহাদের সন্নিধানে গমন করিলেন।
রাজা মহিষীর সহিত একত্র হইয়া প্রস্থান পূর্ব্বক কিয়দ্দূরে নিরীক্ষণ করিলেন সেই দুই নায়ক এবং তাঁহাদের নায়িকা দ্বয় পরস্পরের অদুরে ভূমি শয্যায় শয়ান রহিয়াছে। পক মন্ত্রী স্বীয় ভ্রান্তি শোধন নিমিত্ত বহু পরিশ্রমে তাহাদের অজ্ঞাত সারে সকলকে এক স্থানে উপনীত করিয়া নির্দেশানুসারে রাজদত্ত ওষধি রসে লাইসেন্দরের নয়ন হইতে মোহ বিমোচন করিয়াছে।
অনন্তর হারমিয়ার নিদ্রাভঙ্গ হইল। নেত্রদ্বয় উন্মীলন পূর্ব্বক অবলোকন করিলেন নিকটে লাইসেন্দর শয়ান। তাঁহাকে নিরীক্ষণ করিয়া সাশ্চর্য্যচিত্তে কহিতে লাগিলেন এ কি লাইসেন্দর যে, যাহা হউক, ইহাঁর চরিত্র অতি চমৎকার। পরে লাইসেন্দর জাগ্রৎ হইয়া নয়ন দ্বয় বিনিদ্র করত তাঁহার প্রতি দৃষ্টি করিলেন তাহাতে মোহন গুণ রূপ ঘন তিমির বিধ্বংস করিয়া জ্ঞান শশাঙ্ক উদিত হইল এবং হৃদয়ে যুবতীর নিমিত্ত যে প্রেমাঙ্কুর জন্মে পুনর্ব্বার লতা পল্লবান্বিত হইয়া পরিপুষ্ট হইল। উভয়ে একত্র উপবেশন পূর্ব্বক প্রণয়ালাপ ও রাত্রির ঘটনা বিষয়ে কথোপকথন করিতে লাগিলেন দুইজনেরই সংশয় হইল যে সমস্ত ব্যাপার ঘটিল তাহা স্বপ্ন কি না।
তদনন্তর দেমিত্রিয়স ও হেলেনার নিদ্রাভঙ্গ হইল। এই তরুণীর স্বীয় নায়ক প্রতি যে ক্রোধ ও বৈরক্তি জন্মে সুখসুপ্তির প্রভাবে তাহার শান্তি হইয়াছিল। সুপ্তোত্থিতা হইয়া সুস্থির চিত্তে আহ্লাদ পূর্ব্বক নায়কের সপ্রণয় বচন শ্রবণে অবহিতা হইলেন। অধুনা বিভাবরীভাগে ঘটনার বিষয় স্বপ্নবৎ প্রকাশমান হইল তদুপলক্ষে কথোপকথন করিয়া উভয়ে নানা কৌতুক ও আমোদ করিতে লাগিলেন।
যুবতী দ্বয়ের স্ব২ মনোভীষ্ট নায়ক সহ এই রূপে পুনর্বার সম্মিলন হইলে পরস্পরের মনোমালিন্য দুরীভূত হইল অগ্রে যাদৃক্ সৌহৃদ্য ছিল পুনশ্চ তাহার আবির্ভাব হইতে লাগিল। উভয়ে পরস্পর কটূক্তি ও গ্লানি করণ নিমিত্ত ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। তদনন্তর দুইজনে পরামর্শ করিতে বসিলেন এক্ষণে আমাদের কি করা উচিত? বিবেচনা করিয়া দেখিলেন দেমিত্রিয়স্ এক্ষণে আর হারমিয়ার প্রেমাকাঙ্ক্ষী নহেন অতএব যুক্তি পূর্ব্বক এই স্থির করিলেন দেমিত্রিয়স তাঁহার পিতার নিকট গমন পূর্ব্বক তাঁহাকে সানুনয় বচনে জ্ঞাপন করুন আপনার কন্যাকে বিবাহ করণের মত পরিবর্ত্তন করিয়াছি অতএব তাঁহার প্রাণদণ্ডে ক্ষান্ত হউন। দেমিত্রিয়স তাঁহাদের পরামর্শ ক্রমে এথেন্স নগরে যাত্রা করিবেন ইতিমধ্যে দেখিতে পাইলেন হারমিয়ার পিতা ইজিয়স পলায়িতা দুহিতার তত্ত্বে কাননমধ্যে তাঁহাদের সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত।
ইজিয়স্ যখন শ্রবণ করিলেন দেমিত্রিয়স কন্যাকে গ্রহণ করিবেন না দুহিতা তদীয় মনোনীত পাত্রের সহিত পরিণয়ে সম্মাতা হইয়াছেন তখন তনয়ার প্রতি সন্তুষ্ট হইয়া তাহাতে সম্মতি দিলেন অতএব রাজাজ্ঞা ক্রমে যে দিবস হারমিয়ার প্রাণ দণ্ড অবধারিত হইয়াছিল সেই দিনে তাঁহার শুভবিবাহ সম্পাদন স্থিরীকৃত হইল। হেলেনাও সেই বাসরে স্বীয় প্রিয় নায়ক দেমিত্রিয়সকে পরিণয় করিতে সম্মতা হইলেন।
উল্লেখিত নায়ক নায়িকা দিগের এই রূপে পুনর্ব্বার সম্প্রীতি কেবল পরীরাজ অবিরণের অনুকম্পায় সম্পাদিত হইল। রাজা স্বীয় মহিষী সহিত অলক্ষ্য রূপে তাঁহাদের এই সমস্ত কথোপকথন শ্রবণ করিয়া পরম প্রমুদিত হইলেন এবং আপনার রাজ্যমধ্যে তাঁহাদের পরিণয়োপলক্ষে সাতিশয় সমারোহ পূর্ব্বক উৎসব করিতে আজ্ঞা করিলেন।
পেরিক্লিস্।
পেরিক্লিসের উপাখ্যান।
টায়র নগরে পেরিক্লিস্ নামা এক নরপতি ছিলেন। একদা গ্রীশ দেশীয় সম্রাট্ দুরাচার কোপন স্বভাব আন্তিওকসের কোন রহস্য বিষয় প্রকাশ করিয়া অপরাধী হন। তাহাতে সম্রাট্ স্বভাব দোষে রোষ পরবশ হইয়া সমুচিত শাসন নিমিত্ত তাঁহার সর্ব্বনাশ করিতে প্রতিজ্ঞা করিলেন। পরাক্রান্ত লোকের দোষালোচনায় প্রায় অনিষ্ট ঘটিয়া থাকে। পেরিক্লিস্ ঐ বিষয়ের সংবাদ প্রাপ্তি মাত্রে সমাটের প্রবল প্রতাপে ভীত হইয়া স্বয়ং রাজ্যভোগ পরিত্যাগ পূর্ব্বক যাবৎ তাঁহার ক্রোধ শান্তি না হয় তাবৎ দূরবর্ত্তি দেশে অজ্ঞাত বাসের মানস করিলেন। অতএব আপনার রাজত্বের ভার কার্য্য কুশল ধর্ম্মপরায়ণ প্রভুভক্ত শচিব হেলিকেনসের হস্তে সমপর্ণ পূর্ব্বক অবিলম্বে পোতারূঢ় হইলেন।
অর্ণব যানারোহণ সময়ে শ্রবণ করিলেন থার্সস্ নগরের লোকেরা দুর্ভিক্ষ নিমিত্ত সাতিশয় ক্লেশ সহ্য করিতেছে অতএব তাহাদের সাহায্য নিমিত্ত যথেষ্ট খাদ্য সামগ্রী সমভিব্যাহারে লইয়া প্রথমতঃ ঐ নগরের অভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন। কিয়দ্দিন মধ্যে সেখানে উত্তীর্ণ হইয়া দেখিলেন তত্রত্য আপামর সাধারণ যৎপরোনান্তি কষ্ট পাইতেছে। সে দেশের অধিপতি তাঁহার আগমন সংবাদ শ্রবণে আহ্লাদিত হইয়া মনে করিলেন আমার রাজ্যের দুর্ভাগ্য দূরীভূত হইল পরমেশ্বর অত্রত্য মানব নিকরের উপর দয়া করিয়া ইহাঁকে প্রেরণ করিয়া থাকিবেন অতএব পাত্র মিত্র সমভি ব্যাহারে তাঁহার অভ্যর্থনা করিতে গেলেন এবং যথেষ্ট সমাদর পূর্ব্বক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিলেন। পেরিক্লিস্ থার্সস্ নগরে অবস্থিতি করিয়া অত্যল্প কাল মধ্যে স্বীয় বিশ্বস্ত মন্ত্রির এক লিপি প্রাপ্ত হইলেন তাহাতে অমাত্য লিখিয়াছিলেন থার্সস নগরে অবস্থান তাঁহার পক্ষে শ্রেয়স্কর নহে, সম্রাট্ আন্তিওকস চর দ্বারা তাঁহার বাসস্থল নির্ণয় করত প্রাণে বিনষ্ট করিবার অভিসন্ধি করিয়াছেন। পেরিক্লিস স্বীয় মন্ত্রির এই পত্রী প্রাপ্ত হইয়া অবিলম্বে থার্সস নগর পরিত্যাগার্থ পোতারোহণ করিলেন। তাহাতে সেখানকার লোকেরা তাঁহার নিমিত্ত দুঃখিত হইয়া কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও বিবিধ প্রকারে আশীর্ব্বাদ করিতে লাগিল।
পেরিক্লিস অর্ণবতরি আরোহণ করিয়া থার্সস হইতে কিয়দ্দূরে গমন করিয়াছেন ইতিমধ্যে দুর্দৈব বশতঃ হঠাৎ প্রবল ঝটিকা উত্থিতা হইল তাহাতে পোত ছিন্ন ভিন্ন হইয়া মগ্ন হওয়াতে সমুদায় আরোহি জলসাৎ হইয়াগেল কেবল তিনি সমুদ্রের প্রবল তরঙ্গাঘাতে বিবিধ ক্লেশ পাইয়া এক অপরিজ্ঞাত কূলে নিক্ষিপ্ত হইলেন। সাগরের ভয়ানক উর্ম্মি করণক নিতান্ত খিন্ন হইয়া কূলে বসিয়া আছেন এতদবসরে কতিপয় ধীবর নিকট দিয়া গমন করাতে তাঁহার দুরবস্থা দর্শনে দয়ার্দ্র হইল এবং তাঁহাকে আপনাদের সমভিব্যাহারে আলয়ে লইয়া গিয়া অশন বসন প্রদান করিল। পেরিক্লিস জালজীবিদের প্রমুখাৎ অবগত হইলেন ঐ দেশের নাম পেন্তাপোলিস, সেখানকার রাজা সাইমন্দিস প্রজাবাৎসল্য ও সুশীলতা পূর্ব্বক রাজ্য শাসন নিমিত্ত সাধু নামে বিখ্যাত। অপর সেই রাজার থৈসা নাম্নী পরম রূপবতী এক কন্যা আছেন আগামি দিবসে তদীয় বর্ষ বৃদ্ধির উপলক্ষে রাজসভা সন্নিধানে শস্ত্র ক্রীড়া হইবে। তৎকালে রাজকুমারীর মনোহরণ নিমিত্ত নানা দেশীয় সুকুমার রাজকুমার শৌর্য্য বীর্য্য ও রণ পাণ্ডিত্য প্রকাশ করিবেন তদর্থ অনেকের সমাগম হইয়াছে। এই সমস্ত বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া আপ নার মনোমধ্যে যৎপরোনাস্তি বিষাদ করিতে লাগিলেন যেহেতু স্বীয় অভেদ্য বর্ম্ম সাগরের উর্ম্মিতে বিনষ্ট হওয়াতে সমরোৎসাহি রাজতনয় দিগের শ্রেণিভুক্ত হইতে পারিবেন না। পরন্তু সেই সময় এক জন ধীবর সাগর মধ্যে প্রাপ্ত একটা কবচ গ্রহণ পুরঃসর নিকটে আসিয়া উপস্থিত হইল। পেরিক্লিস সেই বাণ বারণ হারাইয়াছিলেন, জালজীবির করে তাহা দেখিতে পাইয়া হর্ষ গদ্গদ স্বরে কহিতে লাগলেন হে অদৃষ্ট তোমাকে নমস্কার করি এতাবৎ দুঃখের পর অধুনা প্রতীকারের উপায় করিয়া দিলে। আমার পিতা পরলোক গমন কালে এই বর্ম্ম আমাকে প্রদান করিয়া যান এ নিমিত্ত ইহাকে পরম প্রিয় জ্ঞান করিয়া থাকি, সঙ্গে না লইয়া কুত্রাপি গমন করি না, প্রচণ্ড পবনোদ্ধূত সাগর তরঙ্গ ইহার সহিত আমার বিচ্ছেদ ঘটাইয়াছিলেন এক্ষণে করুণা হইয়া পুনর্বার প্রত্যর্পণ করিলেন অতএব সাগর চরণেও কোটি প্রণাম করি। আমি এক্ষণে পিত্র্য কবচ পুনঃ প্রাপ্ত হইলাম এখন পোত ভগ্ন ও সমুদ্রে নিমগ্ন হওয়াকে দুর্ভাগ্য বলিয়া গণনা করিব না।
অনন্তর পরম সমাদর পুরঃসর সেই বর্ম্ম গ্রহণ করিলেন এবং পর দিবস তাহার দ্বারা শরীরাবরণ পুর্ব্বক শৌর্য্য প্রকাশ মানসে সাইমন্দিসের সভায় গমন করিলেন। রাজকুমারীর পাণিগ্রহণ নিমিত্ত ভূরি২ রণ পুঙ্গব ও বীর্য্যবান রাজকুমার তথায় উপস্থিত ছিলেন। কল্পিত সমর ক্ষেত্রে তাঁহাদের সহিত সংগ্রাম করিয়া অনুপম যুদ্ধ নৈপুণ্য ও সাতিশয় শোর্য্য বীর্য প্রকাশ পুরঃসর সকলকেই পরাস্ত করিলেন। তৎকালে রাজকন্যা দিগের পরিণয় বিষয়ে এই নিয়ম চলিত ছিল বিবাহার্থি ব্যক্তিদের মধ্যে বল বিক্রম প্রকটন পূর্ব্বক যিনি সর্ব্বজয়ী হইতেন তাঁহারই গলে বরমাল্য প্রদান হইত। সাইমন্দিস্ নৃপনন্দিনী ঐ নিয়মের অতিক্রম করিলেন না, সমাগত সমুদায় রাজতনয় দিগকে বিদায় দিয়া পেরিক্লিস্কে পাণিদান পূর্ব্বক তদীয় অঙ্কলক্ষ্মী হইতে প্রতিজ্ঞা করিলেন। পেরিক্লিসও রাজকুমারীর রূপ লাবণ্যে মোহিত হইয়া প্রাণ মনঃ সমপণ পূর্ব্বক সর্বান্তঃকরণে তাঁহার প্রণয় উৎপাদন করিতে চেষ্টা করিলেন।
সর্ব্ব গুণাকর সকলবিদ্যাবিশারদ পেরিক্লিসের শৌর্য্য বীর্য্যে সাইমন্দিস্ নৃপতির বিশেষ সন্তোষ জন্মিল। পেরিক্লিস গ্রীশদেশীয় সমাটের ভয়ে আত্মগোপন পূর্ব্বক আপনাকে টায়র দেশের এক জন সাধারণ লোক বলিয়া পরিচয় দেওয়াতে সাইমন্দিস যদিও তাঁহার সম্ভ্রান্ত বংশ ও উচ্চ পদের বিষয় কিঞ্চিত্র অবগত হইতে পারিলেন না, তথাপি তদীয় গুণে মুগ্ধ হওয়াতে তাঁহাকে স্বীয় নন্দিনী সম্প্রদান করিতে কোন অংশে বিমত হইলেন না।
পেরিক্লিস এই রূপে স্ত্রীরত্ন লাভ করিয়া অত্যল্প কাল মধ্যে সমাচার পাইলেন পরম শত্রু আন্তিওকস্ কালবশতঃ কৃতান্তের করাল দশনান্তর্গত হইয়াছে এবং টায়র দেশীয় প্রজা নিকর তাঁহার সুদীর্ঘকাল অনুপস্থিতি হেতু রাজদ্রোহী হইয়া শূন্য সিংহাসনে হেলিকেনসকে অভিষিক্ত করিবার উদ্যোগ করিতেছে। হেলিকেনস অতিশয় ধার্ম্মিক ও প্রভুভক্ত এ প্রযুক্ত প্রজাদের দত্ত ঐ প্রকার উচ্চ পদ গ্রহণ না করিয়া আপনি পেরিক্লিসের নিকট ঐ সংবাদ প্রেরণ পূর্ব্বক লিপিযোগে প্রার্থনা করিয়াছিলেন ত্বরায় স্বদেশে প্রত্যাগমন পুরঃসর আপনার যথার্থ স্বত্ব অধিকার করুন। পেরিক্লিস এই বার্তা প্রাপ্ত হওয়াতে এক্ষণে শ্বশুর সন্নিধানে আত্ম পরিচয় দিলেন এবং অবিলম্বে স্বদেশে যাত্রা নিমিত্ত বিদায় প্রার্থনা করিলেন। সাইমন্দিস্ যদিও অজ্ঞাত কুলশীল জামাতাকে অধুনা টায়র নগরের বিখ্যাত মহীপতি জানিয়া আহ্লাদ সাগরে মগ্ন হইলেন তথাপি জামাতা এক দেশের রাজা, স্বদেশে প্রত্যাগমন সময়ে অবশ্য সস্ত্রীক হইয়া যাইবেন, কন্যা অন্তরাপত্যা, কি রূপে সমুদ্র পথে তাহাকে প্রেরণ করিব এই ভাবনার উদয় হওয়াতে বিষাদেরও আবি ভাব হইতে লাগিল। পেরিক্লিস শ্বশুরের অমত দেখিয়া সহধর্ম্মচারিণীকে কহিলেন প্রসব পর্য্যন্ত পিত্রালয়ে অবস্থিতি কর পরে লইয়া যাইব। কিন্তু তাঁহার বনিতা সঙ্গে গমনার্থ পুনঃ২ প্রার্থনা করিতে লাগিলেন সুতরাং তাঁহাকে সমভিব্যাহারে লইতে হইল। পরন্তু মনে আশা করিলেন প্রসব কালের পূর্ব্বে টায়র নগরে গিয়া উত্তীর্ণ হইতে পারিব।
অর্ণব যাত্রা করিলেই দুরদৃষ্ট বশতঃ পেরিক্লিসের এক২টা দুর্ঘটনা ঘটে। পোতারোহণ পুর্ব্বক গমন করিয়া টায়র নগরে উত্তীর্ণ না হইতেই পথিমধ্যে প্রবল বাত্যা উথিতা হইল, অর্ণবতরি মহাতরঙ্গে সাতিশয় আন্দোলিত হইতে আরম্ভ হইল। থৈসা তরণীর এক কুঠরী মধ্যে ধাত্রীসহ অবস্থিতি করিতেছিলেন প্রচণ্ড সমীরণ বেগে জলধির প্রবল কল্লোল ও তদ্বারা জাহাজের উন্মজ্জন নিমজ্জন দেখিয়া ভয়ে যৎপরোনাস্তি পীড্যমানা হইলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে ধাত্রী সদ্যোজাতা একটি বালিকা ক্রোড়ে করিয়া রোদন করিতে২ পেরিক্লিসের কুঠরী মধ্যে প্রবেশ পূর্ব্বক নিবেদন করিল আপনার অন্তরাপত্যা পত্নী বাত্যার ভয়ে এই অপত্য প্রসব করিয়া প্রাণ ত্যাগ করিলেন। হে নরপুঙ্গব এই ক্ষুদ্র জীবটী আপনকার অপত্য, অবলোকন করুন। পেরিক্লিস প্রাণপ্রতিমা পত্নীর জীবন বিনাশের বার্ত্তা প্রাপ্ত হইয়া শোকে মূর্চ্ছিতা হইলেন। অনেক ক্ষণ পর্য্যন্ত সংজ্ঞা রহিল না, বহু বিলম্বে চৈতন্য ও বাক্য শক্তির উদয় হইলে বিলাপ পূর্ব্বক বলিতে লাগিলেন হাঃ বিধাতঃ প্রিয় বস্তু প্রদান করিয়া অবিলম্বে প্রত্যাহরণ কর। ধাত্রী শান্ত্বনা করত কহিল মহারাজ আপনি ধীর, কলত্র শোকে এরস্প্রকার অধীর হওয়া উচিত হয় না, ধৈর্য্যাবলম্বন করুন, মহিষী ইহলোক পরিত্যাগ করিলেন বটে এই কন্যাকে রাখিয়া গিয়াছেন ইহার বদনারবিন্দ অবলোকন করিয়া মনুষ্যত্ব করুন। পেরিক্লিস ধাত্রীর বচন শ্রবণ করিয়া নব কুমারীকে ক্রোড়ে লইলেন এবং তাহাকে সম্বোধিয়া বলিতে লাগিলেন বৎসে এতদৃক ভয়ঙ্কর কালে কখন কোন শিশুর জন্ম হয় নাই, তুমি এমন দুর্যোগ সময়ে ভূমিষ্ঠ হইলা, দেখিও তোমার জীবন যেন নম্রশীল হয়। রাজার অপত্য পৃথিবীতে জন্মিয়া কস্মিন্ কালে অসৎকৃত হয় না তুমি যেন আদরণীয়া হইতে পার, তোমার ভাগ্য যেন ভাল হয়। পঞ্চভূত একত্র হইয়া তোমার জন্ম স্থানকে সাধ্যানুসারে ভয়ানক করিয়াছে ভবিষ্যতে আর যেন ভয়ানক অবস্থায় না পড়িতে হয়। অয়ি দুর্দৈবোপহতে পৃথিবীতে পদাপর্ণ মাত্রে তোমার যে ক্ষতি হইল সমগ্র পার্থিব সুখেও তাহার পূরণ হইবেক না।
অনন্তর বাত্যা ক্রমশঃ প্রবল হইতে লাগিল। নাবিক লোকদের ভ্রান্তিমূলক এই এক সংস্কার ছিল তরণী মধ্যে মৃত শরীর থাকিলে ঝটিকা নিবৃত্ত হয় না অতএব তাহারা মহিষীর শব পোত হইতে সলিলে নিক্ষেপ করিবার পরামর্শ দিতে পেরিক্লিসের সমীপে আগমন করিল। আদৌ এতাবন্মাত্র কহিল মহাশয় পরমেশ্বর আপনাকে রক্ষা করুন, সাহস হীন হইবেন না। পেরিক্লিস প্রতিবচন প্রদান করত কহিলেন আমার যথেষ্ট সাহস আছে, আমি ঝটিকাকে ভয় করি না, ইহাতে আমার যে ক্ষতি হইবার সম্ভাবনা ছিল তাহা হইয়া গিয়াছে। কেবল এই নিরাশ্রয় শিশুটার নিমিত্ত ইচ্ছা করি ঝড় নিবৃত্ত হয়। পোতবাহিরা বলিল মহাশয় তবে রাজ্ঞীর মৃতদেহ পোত হইতে নীরে নিক্ষেপ করিতে আজ্ঞা হউক। বাত্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধিশীল হইতেছে, পোত মধ্যে শব থাকিলে সামদ্রিক ঝঞ্ঝা বায়ু নিবৃত্ত হয় না। যাবৎ জাহাজে মৃত শরীর থাকিবে তাবৎ পর্য্যন্ত বাত্যা প্রবল থাকিবে। পেরিক্লিস যদিও বুঝিতে পারিলেন অর্ণবযানে শব থাকিলে ঝড় বাড়ে এ অমূলক ভ্রান্তি মাত্র, তথাপি অবস্থা বশতঃ নাবিকদের মতেই মত দিতে হইল। কহিলেন তোমাদের যাহা ইচ্ছা কর হতভাগ্যা রাণীর দেহ তরি হইতে অপসারিত হইলে যদি প্রচণ্ড পবন শান্ত হয়, কর। এই কথা বলিয়া প্রাণাধিক প্রিয়তমার সহিত চরম সাক্ষাৎ করিতে সেই কুঠরীমধ্যে গমন করিলেন এবং অশ্রু পূর্ণ নয়নে তদীয় কলেবর অবলোকন করত কহিতে লাগিলেন হায় তোমার কি কাল প্রসব কাল উপস্থিত হইয়াছিল, এ স্থান আলোক ও অনলে বর্জ্জিত, তদ্বারা যে কোন উপকার সম্ভাবনা ছিল তোমার ভাগ্যে তাহাও ঘটে নাই। আহা তোমার দেহের যথাবিধি সৎকার করিতেও আমার সাধ্য হইল না, বিনা সংস্কারে তোমার এই সুকোমল অঙ্গ সমুদ্রের সলিলে ফেলিয়া দিতে হইল। হাঃ বিধাতঃ, প্রিয়ার এ দেহ সমাধিস্থ হইয়া উপরি নির্ম্মিত সুশোভন স্তম্ভে সম্মানিত হইবার যোগ্য, এক্ষণে গভীর সাগর গর্ব্ভে শম্বূকাদির সহিত অবস্থিতি করিতে চলিল। তদনন্তর ধাত্রী লাইকোরিদাকে সম্বোধিয়া আদেশ করিলেন নেস্তরকে কাগজ কলম মসী গন্ধদ্রব্য এবং আমার সেই রত্ন পূর্ণ কৌটাটী আনিতে বল আর নিকান্দরকে সাটিনের বসনে কৃতাস্তরণ সিন্দুক আনয়নার্থি পাঠাও। শেষে লাইকোরিদাকে বলিলেন এই শিশুকে ধর, ইহার মস্তকে একটা ক্ষুদ্র উপাধান দিয়া এক বার শয়ন করাও, বিলম্ব করিও না, আমি প্রিয়তমার নিকট চিরকালের নিমিত্ত বিদায় লই।
কিয়ৎক্ষণ পরে তাঁহার সন্নিধানে একটা সিন্দুক আনীত হইল এবং কাগজ কলম ইত্যাদি যাহা২ চাহিলেন তাহাও প্রস্তুত হইল অতএব প্রেয়সীর শরীর শাটিন নির্ম্মিত শবাচ্ছাদনে আচ্ছাদিত করিয়া রত্নাদি দ্বারা ভূষিত করত সিন্দুক মধ্যে স্থাপন করিলেন এবং এক পত্রীতে প্রিয়ার পরিচয় লিখিয়া এই প্রার্থনা লিপিবদ্ধ করত তন্মধ্যে রাখিয়া দিলেন যদি দৈবাৎ কেহ এই সিন্দুক প্রাপ্ত হন অনুগ্রহ করিয়া এই অবলার দেহ যেন সমাধি মধ্যে স্থাপন করেন। তৎপরে সিন্দুক বন্ধ করিয়া আপনার হস্ত দ্বারা সিন্ধুমধ্যে নিক্ষেপ করিলেন। সমনন্তর ঝটিকা ক্রমে২ নিবৃত্তা হইল এক্ষণে নারিকদিগকে কহিলেন টায়র নগর যাইতে অনেক বিলম্ব হইবে তাবৎ পর্য্যন্ত এই বালিকার প্রাণ রক্ষা সুকঠিন অতএব থার্সস নগরাভিমুখে জাহাজ লইয়া চল সেখানে শিশুটী রাখিয়া আসি, সাবধানে লালন পালন প্রাপ্ত হইবে।
পেরিক্লিস্ যে নিশায় স্বীয় প্রেয়সীর শবাধার সাগর নীরে নিক্ষেপ করিলেন সেই রাত্রি প্রভাতা হইলে প্রত্যূযে এফিসস্ দেশীয় সেরিমন নামা একজন ভদ্র লোক একটী সুচিকিৎসক সমভিব্যাহারে জলধি কূলে ভ্রমণ করিতেছিলেন তদবসরে তাঁহার কতিপয় ভৃত্য একটা সিন্দুক লইয়া সমীপে আগমন পূর্ব্বক নিবেদন করিল সমুদ্রের ঊর্ম্মিতে এই সিন্দুক উৎক্ষিপ্ত হইয়া কূলে আসিয়া পড়িল। মহাশয় এতাদৃশ বৃহৎ তরঙ্গ কদাপি দৃষ্ট হয় নাই, কি আশ্চর্য্য, প্রকাণ্ড একটা সিন্দুক বীচিবেগে উপরে আসিয়া উঠিল। সেরিমন্ বিস্ময় প্রকাশ পুরঃসর কিঙ্করদিগকে আদেশ করিলেন এ সিন্দুক আমার আলয়ে লইয়া চল। সিন্দুক বাটীতে আনীত হইলে যখন তাহা উন্মুক্ত হইল তখন তন্মধ্যে এক পরমা সুন্দরী তরুণীর মনোহর কলেবর শয়ান দেখিয়া চমৎকৃত হইলেন। তত্রস্থ বিবিধ সুগন্ধি গন্ধদ্রব্যের সৌরভাঘ্রাণে এবং বহুমূল্য রত্নে পরিপূর্ণ কৌটা দর্শনে মনে২ অনুমান করিলেন ইনি কোন মহদ্ব্যক্তি হইবেন। অনন্তর সিন্দুকের মধ্যে চতুর্দ্দিকে দৃষ্টিপাত করাতে এক খান লিপি প্রাপ্ত হইলেন তাহা পাঠ করাতে জানিতে পারিলেন ঐ অবলা টায়র দেশীয় রাজা পেরিক্লিসের বনিতা। সেরিমন এই অদ্ভুত ঘটনায় সাতিশয় বিস্ময় প্রকাশ করিলেন। পরিশেষে পেরিক্লিসের দুর্ভাগ্যে খিন্ন হইয়া কহিতে লাগিলেন আহা পেরিক্লিস তুমি যদি জীবিত থাক তবে তোমার হৃদয় ইহার শোকে বিদীর্ণ হইতেছে সন্দেহ নাই। পরে সিন্দুক মধ্যে শয়ানা রমণীর বদনারবিন্দ মনোযোগ পূর্ব্বক অবলোকন করিতে গেলেন কিয়ৎ ক্ষণ এক দৃষ্টে নিরীক্ষণ করিয়া বিবেচনা করিলেন ইহাঁর মুখে মৃতের চিহ্ণ প্রকাশ পায় না, অবিকৃত লাবণ্য দেখিতে পাই। অতএব তাঁহাকে গতাসু জ্ঞান না করিয়া জীবিতা বলিয়া অবধারিত করত কহিলেন ইহার বন্ধু বান্ধব ত্বরান্বিত হইয়া সমুদ্রে নিক্ষেপ করিয়াছিলেন। যাহা হউক, সত্বর শুশ্রূষা করিয়া চৈতন্য উৎপাদনের চেষ্টা দেখিতে হইল। পরে কিঙ্করদিগকে আশু ইন্ধন আনয়ন পূর্ব্বক অনল প্রজ্বলিত করিতে আদেশ করিয়া ধাতু পোষক ঔষধ গৃহ হইতে বাহির করিয়া আনিলেন এবং তাহার বদনে অর্পণ পুর্ব্বক রসনায় সংযোগ করিয়া দিলেন। চতুর্দিকে অগ্নির উত্তাপ এবং জিহ্বাযোগে ঔষধ গলাধঃকৃত হওয়াতে ক্রমে মোহাপসরণ পুরঃসর চৈতন্যোদয়ের উপক্রম হইল। এতদবলোকনে যৎকিঞ্চিৎ আশ্বাস পাইয়া বাদকদিগকে আহ্বান পূর্ব্বক ব্যাকুল চিত্তের স্থিরতা নিমিত্ত মৃদুভাবে মধুর বাদ্য ধ্বনি করিতে আদেশ করিলেন। এই আশ্চর্য ব্যাপার পরিজ্ঞানার্থ মহা জনতা হইল। সকলে সমুৎসুক চিত্তে চতুর্দিক বেষ্টন করিয়া দাঁড়াইল। তাহাতে দয়ালু সেরিমন তাহাদিগকে সবিনয় বচনে বলিতে লাগিলেন তোমরা একবার কিঞ্চিৎ অন্তর হও, ইহাঁর গাত্রে বায়ু সংলগ্ন হউক, ইনি মরেন নাই, জীবিত আছেন, আমার অনুমান হয় চারি পাঁচ ঘটিকার অধিক কাল ইহাঁর এবম্প্রকার মোহ হয় নাই, ঐ দেখ প্রাণ বায়ুর সঞ্চার হইতেছে, বোধ হয় পুনর্জীবিতা হইলেন, কেমন নেত্রের পক্ষ্ম স্পন্দমান বোধ হইতেছে না? এখন তোমরা জনতা ভাঙ্গিয়া দাও, এই যুবতী কিঞ্চিৎ কাল পরেই সুস্থ হইয়া আপনার সমুদায় বিবরণ স্বয়ং বর্ণন করিবেন, বোধ করি তাহা আকর্ণন করিয়া আমরা নয়ন বারি ধারণ করিতে পারিব না। বস্তুতঃ তরুণীর প্রাণ বিয়োগ হয় নাই, আকস্মিক শঙ্কায় প্রসব করিয়া মোহবশতঃ সংজ্ঞা শূন্য হইয়াছিলেন। ধাত্রী তাঁহাকে প্রমীত জ্ঞান করিয়া তাঁহার স্বামি সন্নিধানে মৃত্যু সংবাদ দেয়। শোক বিহ্বলতা প্রযুক্ত তিনি বিশেষ অনুধাবন করেন নাই যথার্থ শব বোধে সাগর মধ্যে নিক্ষেপ করিয়াছিলেন। অধুনা করুণাকর সেরিমনের শুশ্রূষায় অবলার মূর্চ্ছা ভঙ্গ হইল, ক্রমে নয়নোন্মীলন পূর্ব্বক চতুর্দিকে দৃষ্টি করিয়া মৃদু স্বরে কহিলেন আমি কোথায় আসিয়াছি? আমার প্রভু পেরিক্লিস্ কোথায় গেলেন? এ আবার কোন জগৎ? সেরিমন তাঁহার এই বাক্য আকর্ণনানন্তর মৃদুস্বরে আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণন করিয়া শুনাইলেন। এবং তরুণীর দর্শন সামর্থ্য জন্মিয়াছে বোধ করিয়া কিঞ্চিৎ পরে পেরিক্লিসের লিখিত লিপি এবং রত্ন সকল তাঁহার করে সমপর্ণ করিলেন। যুবতী পত্রী নিরীক্ষণ করিয়া কহিলেন এ আমার স্বামির হস্তাক্ষর বটে কিন্তু আমি অর্ণব যানারোহণ করিয়াছিলাম এতাবত্র স্মরণ হয়, সন্তান প্রসব করিয়াছিলাম কি না দেবতা জানেন, মনে পড়ে না। এ কি? কোথায় আসিয়াছি? আর কি আমার স্বামির সহিত সাক্ষাৎ হইবে না? তোমরা আমাকে কেন বাঁচাইলে? এতদবস্থায় মৃত্যু যে শ্রেয়স্কর ছিল, যদি বাঁচিলাম যাবজ্জীবন ব্রহ্মচারিণী হই। সেরিমন্ অবলার বিলাপ শুনিয়া বলিলেন যাহা কহিতেছেন সত্য কিন্তু এক্ষণে কোন উপায় নাই যদি অভিলাষ হয় ঐ কর্ম্ম করুন, এ স্থানের কিয়দ্দূরে দিয়ানা দেবীর মন্দির আছে তথায় প্রবেশ পূর্ব্বক ব্রহ্মচর্য্য ব্রতেই কাল যাপন করুন, আপনার যদি ইচ্ছা হয় আমার একটী ভাগিনেয়ীকে নিকট থাকিয়া সেবা শুশ্রূষা করিতে বলিয়া দিব। থৈসা দেখিলেন অপরিচিত দেশে পড়িয়াছেন, সমুদ্রে জীবন নাশ হইল না, অগত্যা সেই দেবীর সদনেই জীবন যাপন করিতে সম্মত হইলেন এবং তদ্বিষয়ে সেরিমনের আনুকূল্য নিমিত্ত নানা প্রকারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিলেন। তদনন্তর সুস্থ হইয়া আদেশানুসারে মন্দিরে প্রবেশ পূর্ব্বক যাজিকাবস্থায় কাল হরণ করিতে প্রবৃত্তা হইলেন কিন্তু দৃঢ়তর পতিভক্তি থাকাতে বিরহে নিরন্তর মনোদুঃখের অতিশয্য হইতে লাগিল।
এ দিকে পেরিক্লিস কলত্রশোকে কাতর হইয়া থার্সস নগরাভিমুখে গমন করিলেন। কন্যা সাগরের উপরি জন্মিল একারণ তাহার নাম সাগরিকা রাখিলেন। কিয়দ্দিন মধ্যে তনয়া সহ থার্সসে উত্তীর্ণ হওয়াতে তাঁহার আশা হইল অত্রত্য প্রজা পুঞ্জকে দুর্ভিক্ষ হইতে রক্ষা করিয়াছি এখানকার অধিপতি ক্লিওন ও তদীয়া মহিলা দিওনাইজা অবশ্য এই মাতৃহীন শিশুর প্রতি দয়া করিবেন। অনন্তর তাঁহাদের ভবনে গিয়া উপনীত হইলে ক্লিওন মহোপকারি মিত্রকে পুনরাগত দেখিয়া আহ্লাদিত হইলেন কিন্তু যখন তাঁহার প্রমুখৎ দুঃসহ শোকাবহ সাগরীয় ঘটনার কথা। শ্রবণ করিলেন তখন পরিতাপের পরিসীমা রহিল না। বিবিধ প্রকারে বিষাদ প্রকাশ করিয়া কহিলেন আহা যদি আপনার প্রিয়তমা মহিষীকে এখানে আনয়ন করিতেন তদীয় আকৃতি অবলোকন করিয়াও চরিতার্থ হইতাম। পেরিক্লিস উত্তর করিলেন মহাশয় দৈব অপ্রতিসমাধেয়, আমার অদৃষ্টে যাহা ছিল হইয়াছে, আমার প্রাণ সমা প্রিয়তমা সমুদ্রের গর্ব্ভে আছেন, এখন চীৎকার বা আর্ত্তরব করিলে কিছুই হইবেক না। ভবিতব্য কে খণ্ডিতে পারে, ভাবিয়া কি করিব। সংপ্রতি আপনার নিকট আমার সানুনয় নিবেদন এই মাতৃহীনা তনয়াটীকে আশ্রয় দান পুরঃসর প্রতিপালন করুন, এ কন্যা হতভাগ্য রাজার ঔরসে জন্মিয়াছে তাহাতে যদিও ভাগ্যবতী হইবে এমত সম্ভাবনা দেখি না তথাপি রাজকন্যাদের উপযুক্ত শিক্ষা লাভে যেন বঞ্চিত না হয়। তদনন্তর ক্লিওনের বনিতা দিওনাইজাকে সম্বোধন পুর্ব্বক কহিলেন আমি এই সন্ততিটী আপনকার হস্তে সমপর্ণ করিতেছি ইহার প্রতি মনোযোগ রাখিবেন যত্ন পূর্ব্বক ইহার লালন পালন করিলেই আমি সুখী হইব। দিওনাইজা বিনয় পুরঃসর নিবেদন করিলেন মহারাজ এ কি আজ্ঞা করিতেছেন আপনি আদেশ করিবেন তবে আমি আপনার কন্যার প্রতি যত্ন করিব? ইনি আমার গর্ব্ভজা দুহিতা অপেক্ষা স্নেহাস্পদ। ক্লিওনও সানুনয় বচনে বলি লেন মহারাজ আপনি আমার রাজ্যের যে উপকার করিয়াছেন অত্রত্য সামান্য লোকেও অদ্যাবধি তাহা বিস্মৃত হয় নাই। আপনকার অনুদান স্মরণ করিয়া নিরন্তর সকলে উর্দ্ধ মুখে মঙ্গল প্রার্থনা করিয়া থাকে। আপনকার তনয়ার বিষয়ে মনোযোগ করণার্থ আমাকে নিয়োগ করিতে হইবে না। যদি আমি ইহাঁর লালন পালনে অবহেলা করি আমার প্রজারাই আমাকে মনোযোগের নিমিত্ত উত্তেজনা করিবে। মহারাজ প্রজাদের কথাতেও যদি আমি ঐ বিষয়ে ত্রুটি করি যাবৎ চন্দ্র দিবাকর থাকেন দেবতারা যেন চিরদিন আমার প্রতি বৈর নির্যাতন পুরঃসর বিবিধ যন্ত্রণা দেন। পেরিক্লিস এবম্প্রকারে আশ্বাস পাইয়া তনয়াকে তাহাদের হস্তে সমপর্ণ পূর্ব্বক বিদায় হইলেন। যাত্রা কালে অঙ্গজার সেবা নিমিত্ত ধাত্রী লাইকোরিদাকে তাহার নিকট রাখিয়া গেলেন। সাগরিকা দুগ্ধপোষ্যা, জ্ঞানোদয় হয় নাই, কে পিতা জানিতে পারিলেন না কিন্তু ধাত্রী রোদন করিতে লাগিল। পেরিক্লিস তাহাকে শান্ত্বনা করত কহিলেন বৎসে ক্রন্দন করিও না, তোমার ক্ষুদ্র ঠাকুরাণীর প্রতি মনোযোগ রাখিও, যদি বাঁচিয়া থাকে ইহার অনুগ্রহে তোমার পরম সৌভাগ্য হইবেক।
তদনন্তর স্বদেশাভিমুখে যাত্রা করিলেন এবং কিয়দ্দিন মধ্যে নির্বিঘ্নে আপনার রাজধানী টায়র নগরে উত্তীর্ণ হইয়া রাজ্যভার প্রত্যাদান পুরঃসর রাজত্ব করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। কল্পিতমরণা মহিষী থৈসা সিন্ধু কল্লোলে সিন্দুক সহিত কূলপ্রাপ্তা হইয়া এফিসস্ দেশে মনোদুঃখে কাল হরণ করিতে থাকিলেন। কন্যা সাগরিকা থার্সস নগরে পালিত হইতে লাগিল। থার্সসাধিপ ক্লিওন অতিশয় কৃতজ্ঞ ও পরম ধার্মিক এ প্রযুক্ত পেরিক্লিসের উপকার স্মরণ পূর্ব্বক তদীয় তনয়াকে বিবিধ গুণ শিক্ষা করাইতে যথেষ্ট চেষ্টা করিলেন তাহাতে সেই কন্যা চতুর্দশ বর্ষ বয়ঃক্রম কালে সর্ব্ব বিদ্যায় সুনিপুণা হইয়া উঠিলেন। নৃত্যগীতে ঈদৃশী দক্ষা হইলেন যে গান শ্রবণ এবং নৃত্য দর্শনে বোধ হইত যেন কোন বিদ্যাধরী অথবা দেবকন্যা শাপবশতঃ স্বর্গপুর চ্যুতা হইয়া মর্ত্যলোকে অবতীর্ণা হইয়াছেন। তিনি শিল্পজ্ঞান প্রকাশ নিমিত্ত সূচি দ্বারা যে সমস্ত পশু পক্ষি ফল পুষ্পের আকৃতি রচনা করিতেন তদ্দর্শনে বোধ হইত স্বভাবের অবিকল অনুকরণ করিয়াছেন। ফলতঃ সূচিদ্বারা পট্ট সূত্রযোগে যে কুসুম নির্ম্মাণ করিতেন তাহার নিকট যথার্থ সুরভি গোলাব পুষ্পও লজ্জা পাইত। তাহার বিদ্যা ও গুণের যশঃ ক্রমশঃ সর্ব্বত্র বিস্তীর্ণ হইল, সকলেই তাঁহার শিল্পাদি দেখিয়া সাশ্চর্য্য চিত্তে প্রশংসা করিতে লাগিল। এই সময়ে তিনি সর্ব সাধারণ লোকের পরম স্নেহ ভাজন হইলেন কিন্তু ক্লিওনের বনিতা দিওনাইজা স্বীয় দুহিতার তাদৃশ গুণ না থাকাতে ঈর্ষা প্রযুক্ত তাঁহার পরম রিপু হইয়া উঠিল। দিওনাইজার গর্ব্ভজা কন্যা এবং সাগরিকা উভয়ে সমান বয়স্কা এবং সমান যত্নে শিক্ষিতা হইয়াছিল কিন্তু সাগরিকা স্বীয় স্বাভাবিক বুদ্ধি প্রভাবে তদপেক্ষা অধিক গুণবতী হন। তজ্জন্য কেবল তাঁহারই সম্মান ও সুখ্যাতি হওয়াতে দিওনাইজা মনে২ বিবেচনা করিল যাবৎ সাগরিকা এ স্থান হইতে দূরীভূতা না হয় তাবৎ আমার তনয়ার যশঃ সম্ভাবনা নাই, আমার স্বামী ক্লিওন ইহাকে ভাল বাসেন তাড়াইয়া দিবার সুযোগ দেখি না অতএব কৌশল ক্রমে শমন সদনে প্রেরণের ষড়যন্ত্র করা যাউক। দিওনাইজার এই দ্বেষভাবের আবির্ভাব হইবার কিয়দ্দিন পরে সাগরিকার ধাত্রী লাইকোরিদা কাল বশতঃ লোকান্তর গমন করিল। দিওনাইজা দেখিল আপনার সংকল্প সিদ্ধির এই উপযুক্ত সময়, অতএব সাগরিকার প্রাণ সংহারার্থ লিওনাইন নামক এক ব্যক্তিকে নিযুক্ত করিল। একদা সাগরিকা ধাত্রীর নিমিত্ত রোদন করিতে ছিলেন নিষ্ঠুর দিওনাইজা সেই সময় লিওনাইনকে আদিষ্ট ব্যাপার সমাধানার্থ প্রবৃত্তি দিতে লাগিল। সে ব্যক্তি যদিও দুরাত্মা ও অধার্ম্মিক ছিল তথাপি সাগরিকার গুণ নিকর স্মরণ করিয়া সহসা তাঁহার সংহারে সাহস করিল না, রাজ্ঞীকে কহিল এই কুমারী পরম পবিত্রা। নির্দয়া দিওনাইজা এ কথায় উত্তর করিল তবে মর্ত্ত্য লোক পরিত্যাগ পূর্ব্বক সুরপুরে দেবতা সহ বাস করাই তাহার পক্ষে উচিত হয়। পরে কোপ প্রকাশ পুর্ব্বক কহিল অরে তুই আমার কথা শুনিবি, কি না, বল? ঐ দেখ, সাগরিকা ধাত্রীর নিমিত্ত ক্রন্দন করিতে২ এ দিকে আসিতেছে। লিওনাইন রাণীর ক্রোধ দর্শনে সভয় হইয়া কহিল আমি কিঙ্কর আপনকার আজ্ঞা শুনিব না? এই সংক্ষিপ্ত বচনেই গুণাকর সাগরিকার অচিরে চরম কাল উপস্থিত হইবার উপক্রম হইল। অনন্তর সাগরিকা বিবিধ পুষ্পে পরিপূর্ণ একটী পাত্র হস্তে লইয়া আগমন করিলেন এবং কুসুমগুলি ভূমির উপর বিকীর্ণ করত মৃতা ধাত্রীকে সম্বোধন পূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন হায় লাইকোরিদা কোথায় গেলে? আমি তোমার শ্মশান ভূমিতে প্রতিদিন এই রূপে পুষ্প বর্ষণ করিব। যাবৎ নিদাঘ কালের অবসান না হয় তাবৎ বাসন্তী কুসুম ও সুবর্ণ পুষ্পে শয্যা রচনা করিয়া দিব। হায় আমি কি দুর্ভাগ্যা, বন্ধু বান্ধব কেহ রহিল না, শুনিয়াছি অর্ণব মধ্যে প্রবল ঝটিকার সময় আমাকে প্রসব করিয়াই জননী পার্থিব লীলা সম্বরণ করেন। হে ধাত্রি তুমি কেবল আমার সহচরী ছিলে, কাল আমার কপালে প্রবল পবন স্বরূপ হইয়া তোমারও সহিত বিচ্ছেদ ঘটাইল। কুমারীর সকরুণ রোদন স্বকর্ণে আকর্ণন করিয়াও নির্দয়া দিওনাইজার হৃদয়ে দয়ার সঞ্চার হইল না, কপটতা পূর্ব্বক তাঁহাকে সম্বোধিয়া কহিল সাগরিকে ক্রন্দন করিতেছ কেন? আমার কন্যা কি তোমার সঙ্গে নাই? সে কোথায় গেল? লাইকোরিদা কাল বশতঃ ইহলোক ত্যাগ করিয়া গিয়াছে তাহার জন্য শোক করিলে কি হইবে? তোমার ভাবনা কি? আমি তোমার ধাত্রী স্বরূপা আছি। আহা অজস্র অস্রুপাতে বদন মলিন হইয়া গিয়াছে, রোদন করিও না, এ দিকে আইস, কুসুম গুলি আমাকে দাও, সাগর সম্বন্ধীয় সমীরণে শুষ্ক হইয়া যাইবে। যাও একবার লিওনাইনের সঙ্গে বেড়িয়া আইস। পরে পূর্ব্বোপদিষ্ট কিঙ্করকে কহিল অরে লিওনাইন এ দিকে আয়্, সাগরিকার কর ধারণ পূর্ব্বক ভ্রমণ করিয়া ইহাকে বায়ু সেবন করাইয়া আন্। সাগরিকা কহিল মা, তোমার সেবকে আমার প্রয়োজন নাই। পাপীয়সী দিওনাইজা লিওনাইনের সহিত তাঁহাকে বিরলে প্রেরণের মানস করাতে তাঁহার কথায় মনোযোগ করিল না। পুনর্ব্বার কপট স্নেহ প্রকাশ পূর্ব্বক নিকটে ডাকিয়া কহিল আমি তোমাকে প্রাণ তুল্য ভাল বাসি এবং তোমার পিতার প্রতিও যথেষ্ট ভক্তি করিয়া থাকি প্রতি দিন প্রার্থনা করি এখানে তোমার জনকের আগমন হয়, যদি ইতিমধ্যে হঠাৎ আসিয়া উপস্থিত হন তোমার অনুপম শরীরের লাবণ্য বিবর্ণ দেখিয়া মনে করিবেন আমরা তোমার প্রতি যত্ন করি না। অতএব ধাত্রীর নিমিত্ত শোক পরিত্যাগ কর, যাও, ইহার সমভিব্যাহারে ভ্রমণ করিয়া আইস। একবার হাস্য কর দেখি, আহা তোমার শরীরের সৌন্দর্য্য সন্দর্শনে আবাল বৃদ্ধ সকলের অন্তঃকরণ হর্ষে প্রফুল হয়, এ কান্তির গ্লানি করিও না, বরং বৃদ্ধিশীল রাখিতে যত্ন কর। সাগরিকা পালিকা মাতার কাপট্য বুঝিতে পারিলেন না যথার্থ স্নেহবাক্য জ্ঞানে কহিলেন আমার ইচ্ছা নাই, আপনি যত্ন করিতেছেন, ভাল, ইহার সমভিব্যাহারে গমন করি। ঐ ক্রূরস্বভাবা দিওনাইজা অচিরে কৃতকার্য্য হইবার বাসনায় তাহাদের গমন কালে লিওনাইনকে পূর্ব্বোপদেশ স্মরণ করিয়া দিবার ছলে সঙ্কেত করিল দেখিস্ যেন ভুলিস্ না;
পরে সাগরিকা লিওনাইনের সমভিব্যাহারে ভ্রমণ করিতে২ সাগরের কূলে গিয়া উপস্থিত হইলেন। আপনার জন্মস্থান জলনিধি জ্ঞানাবচ্ছেদে দেখেন নাই এক্ষণে সাক্ষাৎ নিরীক্ষণ করিলেন। কিয়ৎক্ষণ পরে সমুদ্রের উপর ভয়ানক শব্দে বায়ু বহিতে আরম্ভ হইল তাহাতে জিজ্ঞাসা করিলেন এ পবন কি পশ্চিম দিক্ হইতে প্রবহমান হইতেছে? লিওনাইন কহিল, না, এ সমীরণ নৈঋত কোণ হইতে আসিতেছে। সাগরিকা কহিলেন আমি শুনিয়াছি আমার জন্ম সময়ে উত্তর দিক্ হইতে বায়ু বহিয়াছিল। এই কথা কহিবা মাত্র তাঁহার অন্তঃকরণে তৎকালিক বাত্যার পরাক্রম, জনকের পরিতাপ, জননীর প্রাণ বিয়োগ, এই সমস্ত শ্রত বিষয়ের স্মরণ হওয়াতে শোকে ব্যাকুলা হইলেন। তদনন্তর সঙ্গিকে কহিতে লাগিলেন শুনিয়াছি আমার পিতা পয়োনিধির উপর প্রবল ঝটিকা দেখিলেও ভয় করিতেন না, পোত বাহিদিগকে কহিয়াছিলেন অরে আমার যথেষ্ট সাহস আছে। তিনি আপনার সুকোমল রাজকরে অর্ণবযান আকর্ষণ পূর্ব্বক আলিঙ্গন করত উত্তাল তরঙ্গ বেগ সহিষ্ণুতা করিয়াছিলেন। শ্রুত আছে সেই উর্ম্মির আঘাতে তরণী ভগ্ন প্রায় হইয়াছিল। লিওনাইন জিজ্ঞাসা করিল এ কত দিনের কথা? সাগরিকা উত্তর দিলেন আমার জন্ম কালে ঐ সকল ঘটনা হয়, বয়স দেখিয়া কাল নির্ণয় করতে পার। রত্নাকরের উপর সে প্রকার তরঙ্গ ও প্রচণ্ড পবনের বহা আর কখন হয় নাই। তদনন্তর বাত্যার বিবরণ পোত বাহকদের ব্যবহার এবং অর্ণবযানের দুর্গতি প্রভৃতির বৃত্তান্ত বর্ণন আরম্ভ করিলেন। সাগরিকার ধাত্রী বাল্যাবস্থায় তাঁহাকে সেই সমস্ত বিবরণ বারম্বার বর্ণন করিয়া শুনাইয়াছিল তাহাতে ঐ বিষয় সর্ব্বদা তাঁহার মনে জাগরূক ছিল। কিয়ৎক্ষণ পরে লিওনাইন তাঁহাকে কথা কহিতে বারণ করিয়া ঈশ্বরের নমোচ্চারণ করিতে কহিল। সাগরিকা যদিও এ কথার ভাব ঝটিতি বুঝিতে পারিলেন না তথাপি মনোমধ্যে আশঙ্কার উদয় হওয়াতে জিজ্ঞাসা করিলেন তোমার কোন মানস আছে না কি? লিওনাইন এতৎ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিল না, কহিল, যদি পরমেশ্বরের স্মরণ পূর্ব্বক আরাধনা নিমিত্ত কিঞ্চিৎ অবকাশ প্রার্থনা কর দিতেছি কিন্তু বৃথা সময় ক্ষেপ করিও না, দেবতাদের শ্রবণ করিতে বিলম্ব হয় না, আদিষ্ট কর্ম্ম সত্বর সম্পাদন করিতে প্রতিজ্ঞা করিয়া আসিয়াছি। কুমারী এক্ষণে তাহার অভিপ্রায় হৃদয়ঙ্গম করিয়া বিষাদ সাগরে মগ্ন হইলেন। লোচন দ্বয় হইতে অনর্গল জলধারা বহিতে লাগিল। জীবনের নিমিত্ত ব্যাকুল হইয়া বলিলেন তুমি কি এখনি আমাকে হত্যা করিবে? কেন? কি নিমিত্ত? লিওনাইন কহিল ঠাকুরাণীর সন্তোষ নিমিত্ত। সাগরিকা কহিলেন আমাকে বিনষ্ট করিতে কেন তাঁহার মানস হইল? আমি এ শরীরে কদাপি তাঁহার অনিষ্ট করি নাই, কখন একটা পরুষ বাক্য প্রয়োগ অথবা কোন জীবের হিংসা করি নাই, শপথ করিয়া বলিতে পারি জন্মাবচ্ছেদে একটা মূষিক কি মক্ষিকারও অপকার আমা হইতে হয় নাই। একবার একটা কৃমি দৈবাৎ আমার পদতলে পড়িয়া মর্দ্দিত হইয়াছিল তজ্জন্য ঠাকুরাণীর নিকটে অশেষ প্রকারে অনুতাপ করি। ইদানী কি অপরাধ করিলাম? নিষ্ঠুর লিওনাইন কুমারীর এবম্প্রকার সকরুণ বিনয়ান্বিত বচনে মনোযোগ করিল না, এতাবন্মাত্র কহিল আমি কার্য্যের ঔচিত্যানৌচিত্য বিচারার্থ নিযুক্ত হই নাই আজ্ঞা পালন নিমিত্ত আসিয়াছি। এই বলিয়া সংহারের উপক্রম করে ইত্যবসরে হঠাৎ কতিপয় সামুদ্রিক তস্কর সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইল এবং বলদ্বারা সুকুমারী কুমারীকে আপনাদের পোতে আরোপণ পূর্ব্বক পলায়ন করিল।
নৌতস্করের হতভাগ্যা সাগরিকাকে লুঠে পাইয়া মাইটিলিনি নাম্নী নগরীতে গেল এবং তত্রত্য এক জন গৃহস্থের নিকট তাঁহাকে দাসী স্বরূপে বিক্রয় করিল। সাগরিকা যদিও দাসী ভাবাপন্ন হওয়াতে ঐ স্থানে সাতিশয় জঘন্যাবস্থায় রহিলেন তথাপি তাঁহার অনুপম রূপ লাবণ্য ও অসামান্য গুণ নিচয় বহু দিন অমান্য হইয়া থাকিল না। ক্রেতা তাঁহার উপার্জ্জিত ধনে অনতিবিলম্বে ধনবান হইয়া উঠিলেন। সাগরিকা সেই নগরে তৌর্য্যত্রিক বিদ্যা ও সূচি কর্ম্মের শিক্ষা প্রদানে নিযুক্ত হইলেন। তদ্দ্বারা যে অর্থ উপার্জ্জিত হইত আপনার প্রভু এবং প্রভু পত্নীকে প্রদান করিতেন। সাগরিকার গুণনিচয়ের সুখ্যাতি ক্রমে২ মাইটিলিনি নগরীর অধিপতির শ্রুতিগোচর হইল। তাহাতে তদ্দেশাধীশ্বর লাইসিমাকস্ কৌতুকাবিষ্ট হইয়া স্বয়ং দেখিতে আসিলেন। কুমারীর সহিত প্রসঙ্গ সঙ্গতি ক্রমে কিয়ৎ ক্ষণ কথোপকথন হওয়াতে রাজার পরম পরিতোষ জন্মিল। নৃপতি লোক মুখে তাঁহার রূপ গুণের প্রশংসা শ্রবণ করিয়াছিলেন স্বচক্ষে নিরীক্ষণ ও আলাপ করিয়া তদ্বিষয়ের প্রমাণ পাইবেন ঈদৃশী প্রত্যাশা তদীয় মনোমধ্যে স্থান লাভ করে নাই। কিন্তু এক্ষণে দেখিয়া শুনিয়া রূপ গুণ বিদ্যা বুদ্ধির যথেষ্ট প্রতিষ্ঠা করিলেন এবং বিদায় সময়ে এই উপদেশ করিয়া গেলেন এবার সৎ পরিশ্রম ও ধর্ম্মানুশীলনে নিয়ত রত থাকিও। যদি আমার প্রমুখাৎ তোমার বিষয়ের কোন কথা কখন শুনিতে পাও তাহাতে পরম শ্রেয়ঃ জ্ঞান করিও। সাগরিকার বুদ্ধি কৌশল ও পরমোৎকৃষ্ট গুণের পরিচয়ে এবং মধুরাকৃতি ও নম্রতা অবলোকনে নরপালের মনঃ মুগ্ধ হইয়াছিল। তাহাতে যদিও দাস্যাবস্থায় তাঁহার পরিচয় পাইলেন না তথাপি আকৃতি প্রকৃতিতে সদ্বংশজাতা বলিয়া বিশ্বাস করত পাণিগ্রহণের মানস করিলেন। সাগরিকা রাজনন্দিনী বটেন কিন্তু তাঁহার পরিচয় পাইবার সম্ভাবনা মাত্র ছিল না, যদি কেহ জনক জননীর কথা জিজ্ঞাসা করিত কিয়ৎ ক্ষণ নিঃস্তব্ধ হইয়া শেষে কেবল বিলাপ করিতেন।
এ দিকে থার্সস নগরে সমুদ্রকূলে নাবিক তস্কর কর্ত্তৃক হঠাৎ সাগরিকা অপহৃতা হওয়াতে লিওনাইন মনোমধ্যে ক্ষুন্ন হইয়া কিয়ৎ ক্ষণ ভাবিতে লাগিল সাগরিকার প্রাণ সংহার হইল না দস্যুরা জীবন্ত ধরিয়া লইয়া গেল ঠাকুরাণী বা আমার উপর ক্রুদ্ধা হন্। পরে বিবেচনা পূর্ব্বক স্থির করিল তাঁহাকে গিয়া সাগরিকার মৃত্যু সংবাদ শুনাই, মলিমুচেরা কোথায় লইয়া গেল বোধ হয় আর কোন সন্ধান হইবেক না। এই স্থির করিয়া দিওনাইজার সন্নিধানে প্রত্যাগমন পূর্ব্বক সমাচার দিল সাগরিকার পঞ্চত্ব প্রাপ্তি হইল। সে শ্রবণমাত্র মনোমধ্যে সাতিশয় হৃষ্ট ও কৃতার্থম্মন্য হইল এবং সমারোহ পূর্ব্বক অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া সমাধা করিয়া শোক সূচক মৌখিক স্নেহ প্রকাশ নিমিত্ত একটি সুন্দর সমাধি নির্ম্মাণ করিয়া দিল। কিয়ৎ কালানন্তর পেরিক্লিস আপনার অঙ্গজাকে স্বদেশে আনয়ন করিবার মানসে ধার্ম্মিক মন্ত্রি হেলিকেনস্ সমভিব্যাহারে থার্সস নগরে যাত্রা করিলেন। কন্যাকে অতি শৈশব কালে বিদেশে ক্লিওন ও তাঁহার বনিতা দিওনাইজার হস্তে সমর্পণ করিয়া আসিয়াছিলেন তদবধি বহুকাল দেখিতে পান নাই পুনর্বার নিরীক্ষণ করিয়া চিত্তচকোর চরিতার্থ করিবেন এই আশয়ে মনোমধ্যে সাতিশয় উল্লাসিত হইয়াছিলেন অতএব থার্সসে উত্তীর্ণ হইয়া যখন শুনিলেন সাগরিকার লোকান্তর প্রাপ্তি হইয়াছে এবং স্বচক্ষে নিরীক্ষণ করিলেন স্মরণার্থ স্তম্ভ নির্মিত রহিয়াছে তখন মনস্তাপের পরিসীমা রহিল না। তাঁহার পরম প্রিয়তমা বনিতার একমাত্র চিহ্ণ থাসস নগরে ছিল তাহারও বিনাশ সংবাদ শ্রবণ করাতে শোকে ক্ষণকাল সেখানে তিষ্ঠিতে পারিলেন না, তৎক্ষণেই প্রস্থান পূর্ব্বক পোতে আসিয়া উঠিলেন। পোতারূঢ় হইলেও শোকে মনের এতাদৃশ বৈকল্য হইল যে সমভিব্যাহারি সঙ্গেও বাক্যালাপ ত্যাগ করিয়া কেবল বিলাপ করিতে লাগিলেন। চতুর্দিক্স্থ সমস্ত পদার্থে পরিপূর্ণ পৃথিবী একেবারে শূন্য বোধ হইল।
তাঁহার অর্ণবযান থার্সস পরিত্যাগ পূর্ব্বক টায়রে প্রত্যাগমন করিবার কালে পথ ঘটিত মাইটিলিনি নগরের নিকট দিয়া যাইতেছিল। দৈবাৎ সে সময় ঐ নগরীর অধিপতি সাগর তীরে ভ্রমণ করিতে আগমন করিলেন। একখান বৃহৎ পোত দৃষ্টি গোচর হওয়াতে তাহাতে কোন ব্যক্তি আরোহণ করিয়া কোথায় যাইতেছে অবগত হইতে উৎসুক হইলেন। পরে কৌতুকাবিষ্ট হইয়া একখানি ক্ষুদ্র তরণী যোগে গমন পূর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন এ কোন দেশের তরি? পেরিক্লিসের অমাত্য হেলিকেনস্ যথোচিত অভ্যর্থনানন্তর পরিচয় দিলেন এই তরি টায়র নগরীয়, তথাকার অধিপতি পেরিক্লিস এই তরণীতে আছেন। আমাদের রাজা পরম স্নেহাস্পদ বনিতার ও দুহিতার বিয়োগে সাতিশয় ব্যাকুল, প্রায় মাসত্রয় গত হইল জলগ্রহণ ও কাহারও সহিত বাক্যালাপ করেন নাই, নিরন্তর বিলাপ করিয়া কেবল শোকের বৃদ্ধি করিতেছেন। মাইটিলিনির অধিপতি এতদ্বচন শ্রবণে সাতিশয় দয়াবিষ্ট হইলেন এবং শোকার্ত্ত নৃপতির সহিত সাক্ষাৎ করিতে চাহিলেন। মন্ত্রী তাঁহাকে রাজার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া দিলে দেখিলেন ভূপতির বদন অজস্র অস্রপাতে মলিন, শরীর নিরন্তর পরিতাপে শীর্ণ, এবং বর্ণ বিবর্ণ হইয়াছে, শোকাবেগে এক২ বার অচেতন হইতেছেন। মাইটিলিনিরাজ কিয়ৎক্ষণ নিরীক্ষণ করিয়া সমুচিত সম্বোধন পুরঃসর কহিলেন কুশল হউক, পরে উচ্চস্বরে বলিলেন জগদীশ্বর কল্যাণ করুন, মহাশয় মঙ্গল হউক। কিন্তু তাঁহার চীৎকার বিফল হইল, যাঁহার প্রতি বাক্য প্রয়োগ করিলেন তিনি শূন্যহৃদয় হইয়া ছিলেন কে তাহাতে প্রতিবচন দিবে? ফলতঃ শোকাভিভব প্রযুক্ত পেরিক্লিসের বাহ্যজ্ঞান ছিল না, কে তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কথা কহিতেছে ইহাই জানিতে পারিলেন না মান্য ব্যক্তি দেখিয়া সমুচিত সমাদর কি করিবেন? মাইটিলিনিরাজ সম্ভ্রান্ত নরপতির শোক নিমিত্ত এবম্বিধ দুর্গতি দেখিয়া বিবেচনা করিলেন সাগরিকা অতি মধুরভাষিণী, তাঁহার কথা শুনিবামাত্র মনঃ আর্দ্র হয় অতএব তাঁহাকে আনয়ন করি তিনি মধুর বচন দ্বারা এই শোকাভিভূত ভূপতির দুঃখাবেগ নিবারণ পুরঃসর অবশ্য বাক্যস্ফূর্তি করাইতে পারিবেন। পরে সাগরিকার কথা হেলিকেনসকে কহিয়া উভয়ে পরামর্শ পূর্ব্বক তাঁহার আনয়ন নিমিত্ত লোক প্রেরণ করিলেন। দেশাধিপতির আদেশ শ্রবণ মাত্রে সাগরিকা সেই ব্যক্তির সমভিব্যাহারে তৎক্ষণাৎ আসিয়া উপস্থিত হইলেন। পোতস্থ লোকেরা তাঁহার আকৃতি প্রকৃতি অবলোকন করিয়া প্রশংসা করত কহিল ইনি বিশেষ ক্ষমতাবতী হইবেন সন্দেহ কি? মাইটিলিনির অধিপতি তাহাদের প্রতিষ্ঠা বচনে সন্তুষ্ট হইয়া কহিলেন ইহাঁর গুণবত্তার কথা কি কহিব যদি বংশের পরিচয় পাইতাম পাণি গ্রহণ পূর্ব্বক দিব্যাঙ্গনা লাভ বোধে আপনার স্ত্রীভাগ্য প্রশংসিত করিতাম? অনন্তর শিষ্টভাষায় সেই যুবতীকে যথোচিত সম্বোধন করিয়া কহিলেন সুন্দরি এই তরি মধ্যে একজন সম্ভ্রান্ত নরপতি শোকাভিভূত হইয়া আছেন শোকহর সুখকর স্বকীয় মধুর বচন দ্বারা তাঁহার সন্তাপ হরণ কর। সাগরিকা সবিনয় বচনে নিবেদন করিলেন মহাশয় যদিস্যাৎ আমি এবং আমার সঙ্গিনী ভিন্ন অন্য কেহ তাঁহার নিকট না যায় তাহা হইলে আদেশ পালনার্থ সাধ্যানুসারে যত্ন করি।