মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Muktaram Vidyabagish (†1860) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন
বালেন্তাইন্ বয়স্যের আন্তরিক ভাব বুঝিতে পারিলেন না, পূর্ব্ববৎ বিশ্বস্ত জ্ঞানে আপনার প্রণয়ের আনুপূর্ব্বিক সমস্ত বৃত্তান্ত বর্ণন করিয়া কহিলেন মিত্র আমাদের পরস্পর প্রেমাসক্তির কথা মিলানাধিপতি মহারাজের কর্ণগোচর হয় নাই। পরন্তু এতদ্বিষয় অবগত হইলে নৃপতি সম্মতি দিবেন এতাদৃশী সম্ভাবনা দেখি না। অতএব সিল্বিয়া সুন্দরীর মতানুসারে এই পরামর্শ স্থির করিয়াছি অদ্য রজনী যোগে রাজসদন হইতে পলায়ন পূর্ব্বক তাঁহার সহিত মেন্তুয়া নগরে প্রস্থান করিব। অনন্তর রজ্জুনির্মিত একটা সোপান প্রদর্শন পুরঃসর কহিলেন বয়স্য নিশাগমে অন্ধকারাচ্ছন্ন হইলে রাজভবনের কোন গবাক্ষ দ্বার দিয়া এই সোপান যোগে প্রণয়িনী বহির্ভূত হইবেন।
প্রোতিয়স্ বালেন্তাইনের এই সকল গোপনীয় বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া মনোমধ্যে বিবেচনা করিল এ বিষয় প্রকাশ করিয়া দিতে পারিলেই ইহাকে নিরাশ করিতে পারা যায় অতএব বিশ্বাস ঘাতকতা পূর্ব্বক নৃপতি সন্নিধানে প্রকটন করিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করিল।
অনন্তর মিলানাধিপতির সমীপে গমন পূর্ব্বক ঐ সমস্ত বৃত্তান্ত ব্যক্ত করণাশয়ে চতুরতার সহিত বক্ত্তৃতা আরম্ভ করিল মহারাজ আমি যে বিষয় প্রকাশ করিতে উপস্থিত হইলাম মিত্রতাধর্ম্মে তাহা গোপন রাখাই উচিত কিন্তু আপনি আমার প্রতি যথেষ্ট অনুগ্রহ করিয়াছেন যদিস্যাৎ জানিয়া শুনিয়া আপনার সাবধানার্থ অগ্রে অনিষ্ট সম্ভাবনার সংবাদ জ্ঞাপন না করি কৃতঘ্ন হইতে হইবেক অতএব কেবল কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন নিমিত্ত আমাকে কহিতে হইল। হে নরনাথ আমি শপথ করিয়া বলিতে পারি যে বিষয় নিবেদন করিব তাহাতে আমার সাংসারিক কোন প্রকার লাভাকাঙ্ক্ষা নাই। এই রূপে ভূমিকা করিয়া বয়স্যের নিকট যে২ বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়াছিল এবং বালেন্তাইন রজ্জু নির্মিত সোপান যে প্রকারে স্বীয় পরিচ্ছদের মধ্যে লুকাইয়া রাখিয়াছিল সমুদায় প্রকাশ করিয়া কহিল।
মিলানাধিপতি প্রোতিয়স্কে স্বীয় বয়স্যের অন্যায় ও দুষ্ট প্রবৃত্তি এবম্প্রকারে প্রকাশ করিতে দেখিয়া বিবেচনা করিলেন এ ব্যক্তি অতি সজ্জন, অকর্ত্তব্য বিষয়ে মিত্রেরও অনুরোধ রক্ষা করে না। অতএব যথেষ্ট প্রশংসা করিয়া তাহাকে বিশ্বস্ত জ্ঞান করিতে লাগিলেন। অধিকন্তু তাহার নিকট স্বীকার করিলেন এ সকল সমাচার কি প্রকারে প্রাপ্ত হইলাম দুরাত্মা বালেন্তাইনের নিকট ব্যক্ত করিব না, তাহার গুপ্তাভিপ্রায় যাহাতে স্বতঃ প্রকাশ পায় তদুপায় করিতেছি। অতএব সন্ধ্যা কালাবধি নৃপতি সতর্ক হইয়া বালেস্তাইনের আগমন প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন। কিয়দ্বিলম্বে দৃষ্টিগোচর হইল ঐ ব্যক্তি নৃপ নিকেতনে আসিয়াছে এবং তদীয় পরিচ্ছদে একটা দ্রব্য লুক্কায়িত রহিয়াছে। রাজা তাহাকে অবলোকন করিবামাত্র স্থির করিলেন বসনান্তর্ব্বর্ত্তি বস্তু রজ্জু নির্ম্মিত সোপান ব্যতীত অন্য কিছ নহে।
মিলানাধিপতি বালেন্তাইন্কে নিরীক্ষণ করিয়া গতিরোধের মানসে উচ্চ স্বরে আহ্বান পুর্ব্বক জিজ্ঞাসা করিলেন বালেন্তাইন্ ব্যস্তসমস্ত হইয়া কোথায় যাইতেছ? বালেন্তাইন্ রাজাকে দেখিয়া সচকিত হইলেন এবং আপনার অভিপ্রায় গোপন পূর্ব্বক সম্মান করিয়া উত্তর করিলেন মহারাজ আমার বাটীতে একখান লিপি লইয়া যাইবার নিমিত্ত একজন বার্ত্তাবহ ঐ স্থানে দণ্ডায়মান রহিয়াছে তাহার হস্তে পত্র প্রদান নিমিত্ত সত্বর গমন করিতেছি। প্রোতিয়স্ জনকের নিকট অলীক কথা কহিয়া যে প্রকার বিপদে পড়িয়াছিল বালেন্তাইনের এই মিথ্যা কথনেও তাদৃশী দশা ঘটিল।
নৃপতি জিজ্ঞাসা করিলেন পত্রে কি কোন বিশেষ সংবাদ আছে?
বালেন্তাই উত্তর দিলেন, না মহারাজ, লিপিতে এতাবন্মাত্র লিখিয়াছি আমি আপনকার আশ্রয়ে পরম সুখে কাল যাপন করিতেছি।
রাজা কহিলেন এত ব্যস্ত কেন? আমার নিকট কিঞ্চিৎ কাল অবস্থিতি কর একটা বিষয়ের পরামর্শ করি। অনন্তর তদীয় গুপ্তাভিপ্রায় প্রকাশ নিমিত্ত চতুরতা পূর্ব্বক একটা কথার প্রসঙ্গ করিয়া বলিলেন ওহে তোমার বিদিত আছে আমি তনয়ার পরিণয় দান নিমিত্ত থুরিওকে বরপাত্র অবধারিত করিয়াছি কিন্তু আমার কন্যাটা অতিশয় অবাধ্যা, আমাকে পিতা বলিয়া সম্মান বা ভয় করে না, তাহার এই অহঙ্কার নিমিত্ত তৎপ্রতি আমার যে স্নেহ তাহা আর নাই, মনে করিয়াছিলাম আমার প্রাচীনাবস্থায় পুত্রের ন্যায় ব্যবহার করিবে কিন্তু তাহার প্রকৃতি দেখিয়া এক্ষণে পুনর্বার সংসার ধর্ম্মে প্রবেশ পুরঃসর দার পরিগ্রহ করিবার মানস করিয়াছি। আমি আর তাহার নিমিত্ত বরপাত্রের অনুসন্ধান করিব না যে তাহাকে জিঘৃক্ষু হইবে তাহাকেই প্রদান করিব। তাহার রূপ লাবণ্যই তাহার বিবাহের যৌতুক হইবে, আমি কিছু দিব না, কেননা আমার সম্পত্তি তাহার লক্ষ্য হয় না।
বালেন্তাইন্ বিবেচনা করিয়া নৃপতির এই সমস্ত উক্তির তাৎপর্য্য কিঞ্চিন্মাত্র বুঝিতে পারিলেন না, আশ্চর্য্য প্রকাশ পুরঃসর এতাবন্মাত্র নিবেদন করিলেন মহারাজ এতদ্বিষয়ে আমার প্রতি কি আদেশ হইবেক?
ভূপাল বলিলেন আমি যে অঙ্গনার পাণিগ্রহণ করিতে বাসনা করিয়াছি সেই কামিনী পরমা সুন্দরী ও অতিশয় লজ্জা শীলা। আমি জরাগ্রস্ত এ প্রযুক্ত আমার কথোপকথন তাঁহার মনোনীত হয় না। ফলতঃ যৌবনাবস্থায় যুবতীদের সহিত যে প্রকারে কথা বার্ত্তা কহিতাম এক্ষণে তাহার অনেক পরিবর্ত্তন হইয়াছে অতএব উপদেশ কর দেখি আমার প্রতি সেই তরুণীর প্রীতি কি রূপে জন্মিতে পারে।
তদানীন্তন তরুণ পুরুষেরা তরুণীর মনোহরণ নিমিত্ত যে প্রকারে প্রেমালাপ করিত অনুপূর্ব্বিক তদ্বিষয়ের বর্ণনা করিয়া বালেন্তাইন্ বলিলেন মহারাজ, সর্ব্বদা সন্দর্শন ও উত্তমোত্তম দ্রব্যাদি প্রদান করিলে কামিনীগণ অসংশয় প্রণয় বাগুরায় পতিত হয়।
ভূপাল বলিলেন ওহে বালেন্তাইন আমি কামিনীর সন্নিধানে অনেক বার অনেক প্রকার উপায়ন প্রেরণ করিয়াছিলাম কিন্তু তিনি গ্রহণ করেন নাই। অপর তাঁহার পিতা তাঁহাকে সর্ব্বদা কঠিনতার সহিত রক্ষা করেন ইহাতে তাঁহার সহিত দিবাভাগে সাক্ষাৎ হওয়া সুকঠিন।
বালেন্তাইন কহিলেন রজনীযোগে সুন্দরীর আবাস সমীপে গমন পূর্ব্বক তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করুন না?
রাজা কথা প্রসঙ্গেই স্বীয় অভীষ্ট সাধন মানসে বলিলেন নিশাভাগে সেই যোষার শয়নাগারস্থ দ্বার রুদ্ধ থাকে সে সময় কি রূপে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিব?
তদনন্তর দুর্ভাগ্য বশতঃ বালেন্তাইন্ অসাবধানতা পূর্ব্বক এই প্রস্তাব করিলেন মহারাজ রজ্জু নির্মিত সোপান অবলম্বন করিলে অনায়াসে শূন্যে২ আপন প্রেয়সীর শয়নাগারে প্রবেশ করিতে পারিবেন আমি এতদ্বিষয়ে সাহায্যার্থে একটা দড়ির সিঁড়ি আনাইয়া দিব। পরিশেষে নৃপতিকে পরামর্শ দিলেন যদি সেই সিঁড়ি গোপনে রাখিবার বাসনা হয় আমি যাদৃশ বসন পরিধান করিয়াছি এপ্রকার পরিচ্ছদ ধারণ করিলে তন্মধ্যে লুক্কায়িত করিয়া রাখিতে পারিবেন। বালেন্তাইনের পরিচ্ছদ মুক্ত করিয়া তন্মধ্যে কি আছে দেখিবেন এতন্মানসেই ভূপাল একটা প্রসঙ্গ কল্পনা করিয়া তাহার সহিত কথোপকথন করিতেছিলেন, পরিচ্ছদ মধ্যে সিঁড়ি গোপন করিয়া রাখিবার কথা শ্রবণ মাত্রে কহিলেন তবে তোমার অঙ্গাবরণ একবার আমাকে দাও দেখি, কিপ্রকারে লুকাইয়া রাখিব বুঝিয়া লই। এই কথা বলিয়া বালেন্তাইনের অঙ্গ বসন উন্মোচন করিবা মাত্রে তদভ্যন্তরে রজ্জু নির্ম্মিত সোপান এবং সিল্বিয়ার নামাঙ্কিত এক খান লিপি দেখিতে পাইলেন। রাজকন্যা বালেন্তাইন্ সমভিব্যাহারে যেপ্রকারে পলায়ন করিবেন তত্তাবদ্বৃত্তান্ত সেই পত্র মধ্যে লিখিয়াছিলেন। মিলানাধিপতি এক্ষণে কোপ কম্পিত কলেবর হইয়া সাতিশয় তর্জ্জন পূর্ব্বক ভর্ৎসনা করিতে লাগিলেন অরে দুরাচার কৃতঘ্ন তুই বিশ্বাস ঘাতকতা পূর্ব্বক আমার তনয়াকে লইয়া গোপনে পলায়নের মানস করিয়াছিস্। এবম্প্রকার ভূরি২ তিরস্কার করিয়া যৎপরোনাস্তি অপমান পূর্ব্বক স্বীয় রাজধনী মিলান্ নগরী হইতে দূর করিয়া দিতে আদেশ করিলেন। অতএব বালেন্তাইন্ আপনার পরম প্রণয়িনী রাজনন্দিনী সিল্বিয়ার লোভে নিরাশ হইয়া সেই দিবস নিশা ভাগে সে স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন।
প্রোতিয়স্ যৎকালে প্রণয় পরাধীনতা প্রযুক্ত মিত্রদ্রোহী হইয়া বয়স্য বালেন্তাইনের এই রূপ অনিষ্ট করিতেছিল সে সময় তাহার পূর্ব্ব প্রণয়িনী জুলিয়া বেরোন নগরে বিরহ ব্যাকুলা হন। কামিনী নিরন্তর নায়কের অনুধ্যানে নিমগ্না হওয়াতে উন্মত্ত প্রায়া হইলেন। শেষে অধীরতা প্রযুক্ত হিতাহিত বিবেচনা বিসর্জ্জন করিয়া স্বদেশ পরিত্যাগ পূর্ব্বক মিলান নগরে প্রিয়তমের অন্বেষণ নিমিত্ত প্রস্থান করিতে সংকল্প করিলেন। সুন্দরী আপনার এই মানস সিদ্ধি নিমিত্ত অবিলম্বে স্বীয় কিঙ্করী লুসেতার সহিত যাত্রা করিলেন এবং বর্ত্মোপরি উত্তীর্ণ হইয়া উভয়ে পুরুষের পরিচ্ছদ ধারণ পূর্ব্বক ছদ্মবেশে মিলান নগরে গিয় উপনীত হইলেন। তাঁহার সে স্থানে উপস্থিত হইবার কিয়ৎকাল পূর্বে বালেন্তাইন্ বন্ধুর অবিশ্বস্ত ব্যবহার নিমিত্ত তথা হইতে পলাইয়া আসেন।
জুলিয়া মিলানে উত্তীর্ণ হইয়া এক গৃহস্থের সদনে বাস স্থল গ্রহণ করিলেন এবং কিয়ৎকাল বিশ্রামানন্তর অন্তঃকরণের ব্যাকুলতা প্রযুক্ত বাটীর কর্ত্তার সহিত কথোপকথন করিতে লাগিলেন।
গৃহাধিকারী জুলিয়াকে যুবা পুরুষ বোধ করিয়াছিলেন এবং তাঁহার রূপ লাবণ্য ও অবয়ব সৌষ্ঠব অবলোকনে মনে করিতেছিলেন এ ব্যক্তি কোন সম্ভ্রান্ত সন্তান, সন্দেহ নাই। অতএব সাতিশয় সন্তুষ্ট চিত্তে মিত্র ভাবে তাঁহার সহিত কথা বার্ত্তা কহিতে লাগিলেন। অধিকন্তু গৃহস্থ অতিশয় সুশীল ও সচ্চরিত্র ছিলেন, অভ্যাগত তরুণকে বিষন্ন বদন দেখিয়া তদীয় চিত্তের বিনোদন মানসে কথাবসরে প্রস্তাব করিলেন অদ্য আমাদের এতন্নগরী মধ্যে এক স্থানে এক বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রেমাস্পদ প্রমদার মনোরঞ্জন নিমিত্ত তৌর্য্যত্রিক হইবে, কেমন, শ্রবণে বাসনা হয়? আমার সমভিব্যাহারে চল শুনিয়া আসি।
জুলিয়ার আস্য কমল ম্লান থাকিবার কারণ এই, তিনি বিরহ যন্ত্রণায় অধীর হইয়া আপন ভবন বিসর্জ্জন পুরঃসর ছদ্ম বেশে বিদেশে আসিয়া অনুক্ষণ এই চিন্তা করিতেছিলেন প্রিয়তম প্রোতিয়স্ আমার পলায়ন ব্যাপার অবগত হইয়া কি মনে করিবেন? নিষ্কলঙ্ক কৌমার ও গৌরবান্বিত প্রকৃতি নিমিত্তই আমার প্রতি তাঁহার অতিশয় আস্থা হয়, এখন পাছে কামুকী বোধে হেয় জ্ঞান করেন। যুবতী এই উদ্বেগে মনোমধ্যে সতত ব্যাকুলা ছিলেন সুতরাং তাঁহার আকৃতিও বিষাদের চিহ্ণে আচ্ছন্ন হইয়াছিল।
অতএব বাটীর অধ্যক্ষ তৌর্য্যত্রিক দর্শনাদি নিমিত্ত সমভিব্যাহারে লইয়া যাইবার প্রসঙ্গ করিলে কামিনী অন্তঃকরণের বিনোদন মানসে তৎক্ষণাৎ তাহাতে সম্মতা হইলেন। অপর মনোমধ্যে তাঁহার আশা হইল যাইতে২ পথের মধ্যে প্রিয়তমের সহিত সাক্ষাৎ হইলেও হইতে পারিবেক।
অনন্তর গৃহাধিকারির সঙ্গে গমন করিয়া রাজসদনে উপনীত হইলেন এবং সংগীত সভা মধ্যে প্রবেশ পূর্ব্বক ইতস্ততো নয়ন নিক্ষেপ করাতে দেখিতে পাইলেন আপনার প্রেমাস্পদ প্রোতিয়স্ রাজকন্যা সিল্বিয়ার প্রমোদ নিমিত্ত গীত বাদ্য এবং মধ্যে২ প্রেমালাপ করিতেছেন। জুলিয়া এতদবলোকনে অন্তঃকরণ মধ্যে আরো অধীরা হইলেন সুতরাং গৃহাধ্যক্ষ যে অভিপ্রায়ে তাঁহাকে সমভিব্যাহারে লইয়া গিয়াছিলেন তাহার বিপরীত ঘটিল। পরন্তু যুবতী গোপনে শ্রবণ করিলেন রাজকুমারী আপনার আগারের গবাক্ষদ্বারে বসিয়া প্রোতিয়স্কে এই বলিয়া ভর্ৎসনা করিতেছেন অরে নির্দয় বিশ্বাসঘাতক তোকে ধিক ধিক, তুই একজন অবলাকে প্রেমশৃঙ্খলে বদ্ধ করিয়া পরে পরিত্যাগ করিয়াছিস্ এবং তোর পরম বিশ্বস্ত মিত্র বালেন্তাইনের সঙ্গে তাদৃশ বিশ্বাসঘাতকতা ব্যবহার করিলি, তুই আমার সহিত সংপ্রীতি করিতে যত্ন করিস কি? রাজকন্যা বারম্বার এই সকল তিরস্কার বাক্য কহিতেছিলেন তাহার গীত বাদ্যে মনোযোগ দেন নাই এবং কিয়ৎ ক্ষণ পরেই সে স্থান হইতে অন্তরে গেলেন। বস্তুতঃ নৃপ নন্দিনী বালেন্তাইনের গুণে তৎপ্রতি অত্যন্ত আসক্তা হইয়াছিলেন সুতরাং তদীয় কৃত্রিম মিত্র প্রোতিয়সের কৃতঘ্নতায় তাঁহার সহিত বিচ্ছেদ হওয়াতে ঐ ব্যক্তিকে বিজাতীয় ঘৃণা করিতেন ইহাতে প্রেমের সম্ভাবনা কি?
জুলিয়া যদিও প্রিয়তমের ব্যবহার প্রত্যক্ষ নিরীক্ষণ করিয়া আপনার আশায় নিরাশ্বাস হইলেন তথাপি চিত্ত তদীয় অনুরাগে বিমুগ্ধ থাকাতে তাহার সহিত প্রণয় বাসনা পরিত্যাগ করিতে পারিলেন না। ঐ সময়ে প্রোতিয়স্ আপনার একজন কর্ম্মচারিকে বিদায় দিয়াছিল যুবতী অবগত হইয়া গৃহপতির সাহায্যে তাহার নিকট সেই কার্য্যে নিবিষ্ট হইবার প্রার্থনা করিলেন। প্রোতিয়স্ পুরুষ বেশধারিণী রমণীকে চিনিতে পারিল না সুতরাং গৃহপতির অনুরোধে তাঁহাকে ভৃত্যের কার্য্যে নিযুক্ত করিল। তরুণী কিঙ্কর হইলে প্রোতিয়স্ তদ্বারা স্বীয় নব প্রণয়ভাজন সিল্বিয়ার সন্নিধানে সর্ব্বদা উপায়নাদি প্রেরণ করিতে আরম্ভ করিল। অধিকন্তু কামিনী তাহার সহিত প্রণয় বন্ধন করিয়া বেরোনা নগর হইতে বিচ্ছেদ সময়ে যে অঙ্গুরীয়ক তাহাকে সমর্পণ করিয়াছিলেন এক দিন তাহা ঐ যুবতীর হস্তে নৃপনন্দিনীর নিকট পাঠাইয়া দিল।
জুলিয়া যে দিবস অঙ্গুরী গ্রহণ পূর্ব্বক রাজবালা সিলবিয়ার সন্নিধানে গমন করিলেন সে দিন নৃপনন্দিনী প্রোতিয়সের প্রার্থনা সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য করাতে ছদ্মবেশ ধারী কিঙ্কর বিমর্ষ না হইয়া বরং সাতিশয় আনন্দিত হইলেন। জুলিয়া পুরুষের বেশে সিবাস্তিন্ নাম ধারণ পূর্ব্বক দাসত্ব স্বীকার করিয়াছিলেন প্রোতিয়সের প্রতি নৃপকুমারীর কোপ দেখিয়া আপনিও স্বীয় প্রভুর উপরে বৈরক্তি ভাব ব্যক্ত করত তৎ প্রসঙ্গে কথোপকথন করিতে বসিলেন। অন্যান্য আলাপের পর আপনার পক্ষে একটা কথার উত্থাপন পূর্ব্বক বলিলেন জুলিয়ার সহিত আমার বিলক্ষণ পরিচয় আছে আমি তাহাকে বিলক্ষণ রূপে জানি। তদনন্তর জুলিয়া প্রোতিয়সের প্রতি কিরূপ প্রেম করিতেন এবং ঐ যুবা তাঁহাকে অবজ্ঞা করাতে সেই কামিনী কি প্রকার ব্যাকুল হইয়া বেড়ায় আনুপূর্ব্বিক সমুদায় বিবরণ ব্যক্ত করিলেন। পরে সন্দিগ্ধ বচনে রাজতনয়াকে জুলিয়ার অবয়ব সৌষ্ঠবের পরিচয় দিয়া বলিতে লাগিলেন সেই তরুণী দেখিতে প্রায় আমারই তুল্য, আমার ও তাঁহার শরীরের বর্ণ প্রায় এক প্রকার। জুলিয়া পুরুষের পরিচ্ছদ পরিধান করিলেও তাঁহার রূপ লাবণ্যের বৈলক্ষণ্য হয় নাই অতএব ভূপালবালা সিল্বিয়া কিঙ্করের সৌন্দর্য্য সন্দর্শন করিয়া জুলিয়ার শরীরের ভাব অনুভব করিলেন এবং তাদৃশী সুরূপা অঙ্গনার প্রতি নায়কের অসদ্ব্যবহারের কথা শুনিয়া অতিশয় দয়ার্দ্র হইলেন। অতএব ভৃত্য যখন তাঁহার করে অঙ্গুরী প্রদান করিল তখন গ্রহণে অস্বীকার করিয়া কহিলেন এ আরো লজ্জার বিষয়, জুলিয়া যে অঙ্গুরী আপনার প্রিয়তমকে প্রদান করিয়াছিলেন প্রোতিয়স্ সেই অঙ্গুরী আমার নিকট পাঠাইয়া দিয়াছে আমি কদাপি গ্রহণ করিব না। আমি তাহারই প্রমুখাৎ কত দিন শুনিয়াছি তাহার অঙ্গুলি পর্ব্বে জুলিয়ার প্রদত্ত একটী অঙ্গুরীয়ক আছে, এ জুলিয়ারই অঙ্গুলি ভূষণ। হে সুশীল ভৃত্য তোমার প্রতি আমার যথেষ্ট স্নেহ হইল কেননা তুমি সেই অভাগিনী রমণীকে ভালবাস। আহা সেই বিরহিণী অবলা অতি দুঃখিনী, আমি তোমার হস্তে তাহার নিমিত্ত এক তোড়া টাকা দিতেছি লইয়া যাও। নৃপসুতা সিলবিয়ার এতাদৃশ শান্তনা বচনে ছদ্মবেশি কিঙ্কর অতিশয় আহ্লাদ প্রকাশ করিলেন এবং চির বিরহ দুঃখে মুদিত তদীয় হৃদয় কমল আনন্দে বিকসিত হইল।
এক্ষণে বালেন্তাইনের বৃত্তান্ত বর্ণনা করি। তিনি যৎপরোনাস্তি অপমান সহকারে তাড়িত হওয়াতে স্বালয়ে আসিতে অনিচ্ছু হইলেন। কোথায় যাইবেন ভাবিয়া চিন্তিয়া স্থির করিতে পারিলেন না। মনোহারিণী সিলবিয়ার রূপ লাবণ্য ও প্রণয়ের বিষয় ভাবিতে২ এক দিকে গমন করিয়া মিলান নগরের নিকটস্থ একটা অরণ্য মধ্যে প্রবেশ করিলেন। সেখানে বিমনস্কভাবে ইতস্ততো ভ্রমণ করিতেছেন ইত্যবসরে কতিপয় দস্যু আসিয়া উপস্থিত হইল এবং তাঁহাকে ধারণ পূর্ব্বক ধন প্রার্থনা করিল।
বালেন্তাইন্ তাহাদিগকে আত্ম অবস্থা বিজ্ঞাপন পূর্ব্বক কহিলেন আমি দেশ হইতে নিষ্কাসিত হইয়াছি আমার নিকট টাকা কড়ি কিছুই নাই, সম্বলের মধ্যে কেবল পরিহিত বসন মাত্র আছে, তোমরা কি লইবে?
দস্যুরা তাঁহার দুর্দশার কথা শুনিয়া দয়ান্বিত হইল এবং মহৎ মনুষ্যের আকৃতি ও ভদ্র সন্তানের তুল্য প্রকৃতি দেখিয়া প্রস্তাব করিল তুমি আমাদের সহিত একত্র অবস্থান পূর্ব্বক অস্মদাদির সম্প্রদায়ের অধ্যক্ষ স্বীকার কর আমাদের সম্পূর্ণ অভিলাষ। তাহা হইলে তোমার মঙ্গল হইবে আমরা আজ্ঞাবহ হইয়া থাকিব কিন্তু যদি এ বিষয়ে অঙ্গীকার না কর অবিলম্বে শমন ভবনে প্রেরণ করিব।
বালেন্তাইন্ দস্যুদের প্রদর্শিত ভয়ে ভীত না হইয়া এতাবন্মাত্র উত্তর করিলেন যদিস্যাৎ তোমরা অবলা এবং দীন দরিদ্র পান্থ জনের প্রতি কখন কোন প্রকার অত্যাচার না কর তাহা হইলে তোমাদের সম্প্রদায়ে প্রবেশ পূর্ব্বক অধ্যক্ষতা স্বীকারে সম্মত হইতে পারি।
এইরূপে সম্ভ্রান্ত বংশীয় মহান বালেন্তাইন বিখ্যাত দস্যু রবিন্হুদের ন্যায় সাহসিক তস্কর দলের অধিপতি হইলেন। কিয়ৎ কালানন্তর ঐ অবস্থায় সিলবিয়ার সহিত তাঁহার সাক্ষাৎ হইল। তাহার বিবরণ নিম্নে লিখিতেছি।
মিলানাধিপতি থুরিওর সহিত স্বীয় তনয়া সিলবিয়ার পরিণয় সম্পাদন নিমিত্ত অতিশয় যত্ন করিতেছিলেন। কামিনী নিরন্তর তাহাতে বাধা দিতে অসমর্থা হইয়া উপায় বিরহে প্রতিজ্ঞা করিলেন মেন্তুয়া নগরে প্রণয়ি বালেন্তাইন লুকাইয়া আছেন গোপনে পলায়ন পুরঃসর তাঁহার নিকট গমন করি। কিন্তু প্রিয়তমের বাসস্থলের বিষয়ে ভূপালবালা সটীক সংবাদ প্রাপ্ত হন নাই কেননা সে সময় বালেন্তাইন দস্যুদের দলপতি হইয়া বিপিন মধ্যে সাহসিক তস্কর সমভিব্যাহারে অবস্থিতি করিতেছিলেন। তিনি অধ্যক্ষতা করিয়া দস্যুদিগের অপহার ব্যাপারের কোন সংশ্রবে থাকিতেন না কেবল যে সময় তাহারা অনাথ পথিকদের উপর আক্রমণ পূর্ব্বক অত্যাচার করিবার উপক্রম করিত তৎকালে ক্ষমতা বিস্তার পুর্ব্বক করুণা বিতরণ করিয়া বিপন্ন জনের ক্লেশ নিবারণ করিতেন।
সিল্বিয়া পিত্রালয় হইতে পলায়ন পূর্ব্বক বর্ত্ম মধ্যে যদি কোন বিপদ ঘটে এই ভয়ে এগ্লামোর নামক এক জন সম্ভ্রান্ত বৃদ্ধ পুরুষ সমভিব্যাহারে গমন করিতে লাগিলেন। অনন্তর যে বিপিন মধ্যে বালেন্তাইন দস্যু সম্পদায়ের প্রধান হইয়া রাজত্ব করিতেছিলেন সেই বনে প্রবেশ করিলেন। তাহাতে উক্ত দলের এক জন দস্যু ভয়ানক বেশ ধারণ পূর্ব্বক তাঁহাকে ধৃত করিল। সঙ্গি এগ্লামোরও তাহাদের হস্তে পতিত হইতেন চতুরতা পূর্ব্বক পলায়ন করাতে রক্ষা পাইলেন।
দস্যু সিল্বিয়ার কলেবর ভয়ে কম্পিত দেখিয়া আশ্বাস প্রদান পুরঃসর বলিল সুন্দরি ভীত হইও না, চল, তোমাকে আমাদের অলিয়ে লইয়া যাই। সেখানে অস্মদাদির প্রধানাধ্যক্ষ আছেন, তিনি অতিসজ্জন, বিশেষতঃ কামিনীগণের প্রতি নিরন্তর করুণা বিতরণ করিয়া থাকেন। তোমার কোন চিন্তা নাই। রাজকুমারী তস্করের এতাদৃশী শান্ত্বনা বাক্যেও অধিক শান্তা হইতে পারিলেন না বন্দীভূতা হইয়া দস্যুদলপতির সমীপে নীতা হইতেছি এই ভাবিয়া সাতিশয় বিষাদ প্রকাশ পূর্ব্বক উচ্চস্বরে কহিতে লাগিলেন হা বালেন্তাইন্ কোথায় গেলে তোমার নিমিত্ত ঈদৃক্ দুঃখ সহ্য করিতেছি।
অনন্তর দস্যু সিল্বিয়া সমভিব্যাহারে স্বীয় প্রভুর সন্নিধানে গমন করিতে উদ্যত হইলে প্রোতিয়স আসিয়া তাহাতে বাধা দিল। এই ব্যক্তি নৃপবালার পলায়ন বার্ত্তা শ্রবণাবধি ছদ্মবেশি জুলিয়া ভৃত্যের সহিত তাহার অনুসন্ধান করিতে ছিল। রাজকুমারীর পদ চিহ্ণ লক্ষ্য করত যাইতে২ ঐ অরণ্য মধ্যে গিয়া উপস্থিত হইল এবং রাজতনয়াকে দস্যু হস্তে পতিতা দেখিয়া শৌর্য্য বীর্য্য প্রকাশ পূর্ব্বক উদ্ধার করিল। যদিও নৃপনন্দিনী তাহার বিদ্বেষিণী ছিলেন তথাপি বিপদ্ সময়ে ঈদৃক্ আনুকূল্য করাতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতে পারিতেন কিন্তু তিনি তাহার ধন্যবাদ না করিতে২ সে আপনার প্রণয়ের কথার উত্থাপন করিল সুতরাং যুবতী মহতী যন্ত্রণায় পড়িলেন। প্রোতিয়স কামিনীকে একাকিনী পাইয়া আপনার গলে বরমাল্য প্রদানে অঙ্গীকার করাইবার নিমিত্ত সাতিশয় উত্তেজনা করিতে লাগিল এই সময়ে তাহার ছদ্ম বেশী কিঙ্কর অর্থাৎ জুলিয়া সোদ্বেগান্তঃকরণে নিকট দণ্ডায়মান হইয়া রহিলেন এবং আপনার মনে এই আশঙ্কায় ব্যাকুল হইতে লাগিলেন রাজকুমারী উপকারে বাধ্য হইয়া যদি তাহার প্রতি দয়ার্দ্রা হন তাহা হইলে বিপদ ঘটিবে। কিন্তু নৃপনন্দিনী প্রোতিয়সের উত্তেজনায় কেবল উত্ত্যক্ত হইতেছিলেন তাঁহার অন্তঃকরণে তৎপ্রতি স্নেহ বা দয়ার সঞ্চার মাত্র হয় নাই। ইতিমধ্যে বালেন্তাইন্ সহসা তথায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন তাহাতে সকলেই সাতিশয় বিস্ময়াপন্ন হইল। যে তস্কর নৃপতনয়াকে ধৃত করিয়াছিল সে প্রোতিয়স কর্ত্তৃক নিরাকৃত হইয়া আপনার প্রভু সন্নিধানে গমন পূর্ব্বক সংবাদ প্রদান করিয়াছিল সুতরাং বালেন্তাইন অবলার উদ্ধার নিমিত্ত স্বয়ং আগমন করিলেন।
প্রোতিয়স আপন বয়স্যের প্রেয়সী রাজকুমারীর নিকট প্রণয় যাচ্ঞা করিতেছিল মিত্র হঠাৎ আসিয়া ঐ কথা শ্রবণ করাতে সাতিশয় লজ্জিত হইল। পরে স্বীয় অসদাচরণ নিমিত্ত অনুতাপ করিয়া বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করিতে লাগিল। বালেন্তাইন্ অতিশয় সদাশয় ছিলেন এ প্রযুক্ত তাহার কিয়ৎক্ষণের বিনয়ে মহা২ বিদ্রোহ বিস্মরণ করিলেন এবং পুনর্ব্বার সৌহৃদ্য করিয়া মহানুভবতা প্রকাশ পুরঃসর বলিলেন প্রোতিয়স্ আমি তোমাকে ক্ষমা করিলাম অকপটে কহিতেছি সিলবিয়ার উপর আমার যে অধিকার আছে তুমি গ্রহণ কর, তোমাতে অপর্ণ করিলাম। জুলিয়া দাস বেশে স্বীয় প্রণয়াস্পদ প্রোতিয়সের পার্শ্বে দণ্ডায়মান ছিলেন নায়কের বয়স্য বালেন্তাইনের এতাদৃশী অদ্ভুত বদান্যতার কথা শুনিয়া চমৎকৃত হইলেন এবং আপনার মনোনীত পতি এই অভিনব সৌহৃদের অনুরোধে রাজকুমারীর করগ্রহণে বুঝি স্বীকার করিবেন এতদাশঙ্কায় ক্ষণ কাল মধ্যে সেই স্থলে মূর্ছান্বিত হইয়া পড়িলেন। তাহাতে সকলে আশ্চর্য্যান্বিত হইয়া তাঁহাকে সুস্থ করিতে লাগিল। যদিস্যাৎ এই ঘটনা না হইত তাহা হইলে রাজকুমারী বালেন্তাইনের বন্ধুর প্রতি তাদৃশ সদ্ব্যবহার দর্শনে তদীয় প্রতিজ্ঞায় বিশ্বাস করিতেন এবং প্রোতিয়সের হস্তে পতিত হইলাম ভাবিয়া একেবারে ভগ্নচিত্তা হইতেন। জুলিয়া মূর্চ্ছাভঙ্গ হইলে একটী অঙ্গুরী অঙ্গুলী হইতে উন্মোচন পুরঃসর সিলবিয়া সুন্দরীকে দেখাইয়া কহিতে লাগিলেন প্রভু এই অঙ্গুলি মুদ্রা আপনকার হস্তে সমর্পণ নিমিত্ত আমাকে দিয়াছিলেন আমি আপনাকে দিতে বিস্মৃত হইয়াছি। প্রোতিয়স ঐ অঙ্গুলি ভূষণ অবলোকন মাত্রে চিনিতে পারিয়া মনেই বিবেচনা করিতে লাগিল আমি জুলিয়াকে যে অঙ্গুরী প্রদান করিয়াছিলাম এ যে সেই অঙ্গুরী দেখিতে পাই। রাজকুমারীর নিকট এ অঙ্গুরী প্রেরণ করি নাই, সে অন্য অঙ্গুলি ভূষণ, অনন্তর ভৃত্যকে জিজ্ঞাসা করিল ওহে তুমি এ অঙ্গুরী কোথায় কি প্রকারে পাইলে? আমি পূর্ব্ব প্রণয়িনী জুলিয়াকে ইহা প্রদান করিয়াছিলাম। এ অঙ্গুরী যে তাহার অঙ্গুলি পর্ব্বে শোভমানা ছিল। ভৃত্য অব্যক্ত বচনে প্রতিবচন প্রদান করিল জুলিয়া স্বয়ং ইহা এ স্থলে আনয়ন করিয়া আমাকে দিলেন।
প্রোতিয়স্ ভৃত্যের তদ্রূপ উত্তরে সংশয়াকুল হইয়া মনোযোগ পূর্ব্বক তাহার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া রহিলেন। অনেক ক্ষণ নিরীক্ষণ করিয়া নিশ্চয় করিলেন সেবক সিবাস্তিনই জুলিয়া। অতএব প্রিয়তমার অকৃত্রিম প্রণয়ের প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়াতে তাহার মনে কামিনীর প্রতি পূর্ব্বে যে প্রেম উৎপন্ন হয় তাহা পুনর্বার আবির্ভূত হইল। তৎক্ষণাৎ কামিনীর কর গ্রহণ পুরঃসর প্রণয়ির ব্যবহার করত বন্ধু বালেন্তাইনকে বলিল মিত্র নব নায়িকা সিলবিয়া রাজনন্দিনী, তুমিই তাঁহার উপযুক্ত বরপাত্র, আমিও তোমার হস্তে তাঁহাকে প্রত্যর্পণ করিলাম।
অতএব প্রোতিয়স্ ও বালেন্তাইন্ স্ব২ চির প্রণয়িনী প্রমদালাভে সাতিশয় সন্তুষ্ট হইয়া পরস্পর সুখানুভব করিতে লাগিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ বিলম্বে মিলানাধিপতি ও থুরিও সিলবিয়ার অন্বেষণ করিতে২ হঠাৎ সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন তাহাতে সকলে বিস্মিত ও অতিশয় সন্ত্রস্ত হইল।
থুরিও সিলবিয়াকে বালেন্তাইনের পার্শ্বে অবলোকন করিয়া ক্রোধে প্রজ্বলিত হইলেন এবং তাঁহার নিকট গমন পুর্ব্বক বলে কর ধারণের উপক্রম করিয়া কহিলেন রাজকুমারী মদীয় বনিতা। ইহাতে বালেন্তাইন বিভীষিকা প্রদর্শন পূর্ব্বক বলিতে লাগিলেন থুরিও মানে২ নিবৃত্ত হও, পুনর্ব্বার যদি কহ সিলবিয়া তোমার মহিলা, অবিলম্বে শমন সদনে প্রেরণ করিব। এখানে নৃপনন্দিনী দণ্ডায়মানা রহিলেন ইহার অঙ্গ স্পর্শ কর্ দেখি, আমার প্রেয়সীর গাত্রে হস্তাপর্ণ করিলে কি হয় এখনি দৃষ্টি গোচর হইবে। থুরিও স্বভাবতঃ ভীত এ প্রযুক্ত বালেন্তাইনের এই সমস্ত শৌর্য্য বচনে মনে২ মহা শঙ্কিত হইলেন কিন্তু মুখে কহিতে লাগিলেন আমি এ রমণীকে গ্রহণ করিতে চাহি না। আমি এতাদৃশ উন্মত্ত হই নাই যে নিঃস্নেহা প্রমদা নিমিত্ত সংগ্রাম করিব।
মিলানাধিপতি মহাবল পরাক্রান্ত ও অতিশয় সাহসী ছিলেন থুরিওকে নিবৃত্ত হইতে দেখিয়া ক্রোধ প্রকাশ পূর্ব্বক তিরস্কার করিতে লাগিলেন তুই এমন কাপুরুষ, আপন প্রেয়সীর উদ্ধার নিমিত্ত কিঞ্চিন্মাত্র সাহস প্রকাশ করিতে পারিলি না, ছি তুই অতি অপদার্থ, কোন কর্ম্মের নহিস্। অনন্তর বালেন্তাইনের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ পূর্ব্বক তাঁহাকে সম্বোধিয়া কহিলেন তোমার সাহস অতিশয় প্রশংসনীয়, তুমিই মদীয় নন্দিনীর আনন্দ বর্দ্ধন নায়কের উপযুক্ত পাত্র। ওহে বালেন্তাইন্ আমি তোমাকেই স্বীয় কন্যা সম্প্রদান করিব। বালেন্তাইন্ মিলানাধিপতির কোপাবসানে ঈদৃক্ কোমলান্তঃকরণ দর্শনে হর্ষে পুলকিত হইয়া বিনয় প্রকাশ পুরঃসর তাঁহার কর চুম্বন করিলেন। পরে রাজনন্দিনীর কর গ্রহণ করিয়া নৃপসন্নিধানে যথোচিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতে লাগিলেন। অবশেষে এই আনন্দের সময় অরণ্য নিবাসি দস্যুগণের প্রতি মহারাজের অনুগ্রহ প্রার্থনা করিয়া তাহাদিগকে ক্ষমা করিতে অনুরোধ করিয়া কহিলেন মহারাজ ইহাদের প্রতি করুণা বিতরণ পুরঃসর লোকালয়ে বসতি করিবার আদেশ হয় আমি নিঃসন্দেহ বলিতে পারি তাহা হইলে ইহাদের রীতি প্রকৃতির সংশোধন হইবে। অধিকন্তু ইহাদের বৃত্তান্তানুসন্ধান পুরঃসর বিবেচনা করিলে মহারাজের বিদিত হইতে পারিবে যে অনেকে আমার ন্যায় রাজবিদ্রোহপরাধে দূরীকৃত হইআছে। মিলানেশ্বর বালেন্তাইনের শৌর্য্য বীর্য্য ও গুণের পরিচয় পাওয়াতে যৎপরোনাস্তি সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন অতএব তাঁহার প্রস্তাবে তৎক্ষণাৎ সম্মত হইলেন। তদনন্তর মহারাজ প্রোতিয়সের মিত্র দ্রোহ নিমিত্ত এতাবন্মাত্র দও বিধান করিলেন সে নব নায়িকার সহিত স্বীয় প্রণয় বাসনায় যে সমস্ত প্রতারণা ব্যবহার করে তাহার সমক্ষে উল্লেখ করিলেন। তাহাতে প্রোতিয়স্ জন সমাজে বিজাতীয় লজ্জা প্রাপ্ত হইল। পরিশেষে প্রণয়ি চতুষ্টয় স্ব২ চির প্রেমাসক্ত নায়ক নায়িকা সহ মিলিত হইয়া পরমাহ্লাদে মিলান নগরে প্রত্যাগমন করিলেন এবং নৃপতি সমক্ষে অতিশয় সমারোহ পূর্ব্বক তাঁহাদের পরিণয় ব্যাপার সম্পন্ন হইল ইতি।
যেমন কর্ম্ম তেমন ফল।
যেমন কর্ম্ম তেমন ফল।
বায়ানা নামক প্রসিদ্ধ নগর মধ্যে এক রাজা ছিলেন। তাঁহার অন্তঃকরণ নিরন্তর এবম্প্রকার করুণায় আচ্ছন্ন থাকিত যে প্রজাজন রাজনিয়মাতিক্রম করিলেও দণ্ড বিধান করিতেন না। রাজ্য মধ্যে পারদার্য্য ব্যাপারের শাসন নিমিত্ত পূর্ব্বাবধি একটী সুকঠিন দণ্ড ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল অর্থাৎ পরযোষা সঙ্গে সহবাস করিলে প্রাণ দণ্ডের বিধান হইত। কিন্তু নৃপতির কৃপা পরবশতা প্রযুক্ত সেই ব্যবস্থানুসারে শাসন না হওয়াতে পরিণয় ব্যবহার ক্রমে উন্মূলিত হইবার উপক্রম হইল। অধিকারস্থ যুবতী রমণী দিগের জনক জননী অহরহ রাজদ্বারে আসিয়া অভিযোগ করিতে লাগিল অকৃতদার পুরুষেরা কন্যাগণকে ছলে বলে আলয় হইতে বহির্গত করিয়া তাহাদের কৌমার হরণ করিতেছে।
নৃপতি রাজ্যমধ্যে পারদার্য্য দোষের আতিশয্য দ্বারা প্রজাপুঞ্জের দুর্গতি দেখিয়া মনোমধ্যে যৎপরোনাস্তি বিষণ্ণ হইলেন তথাপি দয়াবশতঃ ব্যবস্থাপিত দণ্ড বিধানে উন্মুখ হইতে পারিলেন না। বিবেচনা করিলেন এতাবৎ কাল পর্য্যন্ত প্রজাদের প্রতি করুণা বিতরণ পুরঃসর কোমল ব্যবহার করিয়া আসিতেছি এক্ষণে যদিস্যাৎ সুকঠিন দণ্ড প্রণয়নে প্রবৃত্ত হই সকলে নির্দয় উপদ্রবি জ্ঞান করিবে অথচ পর স্ত্রী হরণের সুকঠিন দণ্ড বিধান না করিলেও প্রজাদের কন্যা কলত্রাদির সতীত্ব রক্ষা হয় না। অতএব রাজ্যের ব্যবস্থানুসারে দণ্ড প্রণয়ন পুরঃসর শাসন নিমিত্ত এক ব্যক্তিকে প্রতিনিধি রাখিয়া কিয়ৎকাল স্থানান্তরে গিয়া অবস্থান করিতে মনস্থ করিলেন।
সে সময় বায়ানা নগর মধ্যে পুণ্যশীল অথচ কঠোর প্রকৃতি এঞ্জিল নামে এক জন বসতি করিতেন। মহারাজ তাঁহাকে উপদ্রুত রাজ্যের শাসন নিমিত্ত উপযুক্ত পাত্র জ্ঞান করিয়া প্রতিনিধি স্বরূপে স্থাপন নিমিত্ত মনোমধ্যে স্থির করিলেন। অনন্তর প্রধান মন্ত্রি ইস্কেলস্কে আহ্বান করিয়া এতদ্বিষয়ের পরামর্শ জিজ্ঞাসা করিলে অমাত্য কহিলেন মহারাজ বায়ানা নগরাভ্যন্তরে সুশীল এঞ্জিল ব্যতীত কোন ব্যক্তিকে এ বিষয়ে উপযুক্ত দেখি না। মন্ত্রির সহিত আত্ম মতের ঐক্য হওয়াতে রাজা আপনার অবর্ত্তমান কাল পর্যন্ত ব্যবস্থাপিত দণ্ডনীত্যনুসারে রাজ্য শাসন নিমিত্ত ঐ ব্যক্তিকে প্রতিনিধি স্বরূপে নিযুক্ত করিলেন এবং আপনি পোলান্দ দেশে পর্য্যটনের ছলে রাজ্য হইতে বহির্গত হইয়া গেলেন। কিন্তু স্বদেশ হইতে অধিক দূরবর্ত্তী হইয়া থাকিতে ভূপালের মানস হইল না যে ব্যক্তিকে প্রতিনিধি করিলেন তাঁহাকে পুণ্যাত্মা বলিয়া জানিতেন বস্তুতঃ তাঁহার রীতি চরিত্র কীদৃক্, তাহা বিদিত হইবার নিমিত্ত উদাসীনের বেশ ধারণ পূর্ব্বক গোপনে বায়ানা নগরে পুনর্ব্বার আগমন করিলেন।
এঞ্জিল রাজসিংহাসনে অধিবেশন করিলে পর ক্লাদিও নামা এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি প্রতারণা দ্বারা কোন একটী নবীনা ললনা হরণাপরাধে অভিযুক্ত হইল। রাজপ্রতিনিধি তৎক্ষণাৎ তাহাকে কারাবরোধের আদেশ করিলেন। অনন্তর তদ্বিষয়ের বিচার হইলে পুরাতন দণ্ড ব্যবস্থার মর্ম্মানুসারে তাহার শিরচ্ছেদার্থ অনুমতি হইল। এই অপরাধির প্রতি ক্ষমা বিধান নিমিত্ত রাজ সভাস্থ সকলে সাতিশয় যত্ন করিতে লাগিল। রাজমন্ত্রী ইস্কেলস কাতরতা প্রকাশ পুরঃসর কহিতে লাগিলেন ধর্ম্মাবতার এ ব্যক্তি অতি সম্ভ্রান্ত সন্তান, একারণ অনুরোধ করিতেছি ইহার অপরাধ মার্জ্জনা হয়। কিন্তু এঞ্জিল ক্ষমার কথায় সকলকে কহিতে লাগিলেন দণ্ডনীতিকে বিহঙ্গকুলের ভয় প্রদর্শনার্থ কল্পিত প্রতিমূর্ত্তির তুল্য করা উচিত হয় না পক্ষিগণ যেমন নির্ম্মিত মূর্ত্তিকে অহিংসক দেখিয়া ক্রমে নির্ভয় চিত্তে তদুপরি আরোহণ করে দণ্ড ব্যবস্থা ফলতঃ প্রচলিত না হইলে তাহাতেও প্রজাজনের সন্ত্রাসমাত্র থাকিবে না, অতএব অপরাধি ক্লাদিওর প্রাণদণ্ড অবশ্যই হইবেক।
ক্লাদিও যৎকালে কারাগারে অবরুদ্ধ ছিল সে সময় লুসিও নামা তদীয় এক জন মিত্র তাহার সহিত সাক্ষাৎ করণাশয়ে তথায় গমন করেন। ক্লাদিও অন্যান্য আলাপের পর বয়স্যকে কহিল বন্ধো কৃপা পকাশ পূর্ব্বক একটী কর্ম্ম করিতে হইবে। আমার ভগিনী ইজাবেল অদ্য সেণ্ট ক্লারের ধর্ম্মশালায় প্রবেশ করিবেন। তাঁহার নিকট গিয়া মদীয় বিপদের বার্ত্তা জ্ঞাপন পূর্ব্বক এই কথাটা বল যদিস্যাৎ রাজপ্রতিনিধির সহিত সাক্ষাৎ করিয়া তাঁহার প্রণয়োৎপাদন কর তাহা হইলে তোমার সহোদরের জীবন রক্ষা হইতে পারে। মিত্র আমার ভগিনী সুচতুর, চাতুর্য্য প্রকাশ পূর্ব্বক কথোপকথন করিয়া আমার প্রতি ক্ষমা করণের প্রবৃত্তি লওয়াইতে পারিবেন, কেননা তরুণীদিগের সবিষাদ বচনের অভ্যর্থনায় পুরুষের হৃদয় সহজে দয়ার্দ্র হইয়া থাকে |
ক্লাদিওর সহোদরা ইজাবেল লুসিওর আগমনের অগ্রে ধর্ম্মশালায় প্রবেশ পূর্ব্বক নিয়মানুসারে অবগুণ্ঠন ধারণ মানসে তত্রস্থ এক উদাসীন ললনার নিকট তদ্বিষয়ের রীতিবর্ত্ম জিজ্ঞাসা করিতেছিলেন। তৎকালে লুসিও ধর্ম্মালয়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ পূর্ব্বক উচ্চস্বরে বলিলেন কুশল হউক। ইজাবেল মনুষ্যের কণ্ঠ শব্দ শ্রবণে সচকিতা হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন ও কে কথা কহিতেছে? উদাসীনা কহিলেন পুরুষের স্বর বোধ হইতেছে, ইজাবেল তুমি ঐ স্থানে গিয়া জিজ্ঞাসা করিয়া আইস দেখি কি নিমিত্ত আসি যাছে, হে সুশীলে তুমি এখনও বালিকা আছ, অবগুণ্ঠন ধারণ কর নাই, পুরুষের সমক্ষে অনায়াসে যাইতে পার আমি গমন করিতে পারি না। তুমিও যখন মুখাবরণ ধারণ করিবে তখন তপস্বিনীর সাক্ষাৎ ব্যতীত পুরুষের সহিত বাক্যালাপ করণে নিষিদ্ধ হইবে। তখন যদ্যপি অলাপ করিতে হয় সাক্ষাৎ করিও না, হঠাৎ সন্দর্শন হইলে আর আলাপ করিবা না। ইজাবেল বলিলেন আপনাদের এতদ্ব্যতীত আর অধিক ক্ষমতা নাই? উদাসীন কহিলেন কেন এ কি অধিক ক্ষমতা নয়? ইজাবেল বলিলেন হাঁ অধিক বটে কিন্তু আমি এতদপেক্ষা সমধিক বাসনা করি। আমার ইচ্ছা এই যে সেণ্ট ক্লারের উপাসিকাগণ কঠিন রূপে বদ্ধ থাকেন। এই সময়ে লুসিওর কণ্ঠ শব্দ পুনর্ব্বার তাহাদের কর্ণগোচর হইল। তাহাতে উপদেশিনী বলিলেন বৎসে ঐ ব্যক্তি পুনশ্চ চীৎকার করিতেছে একবার গিয়া তাহার অভ্যর্থনা শুনিয়া আইস। এতদ্বচন শ্রবণে ইজাবেল আপনাদের উপবেশন গৃহ হইতে বহির্গত হইয়া লুসিওর নিকট গমন পূর্ব্বক মৃদু ভাষায় জিজ্ঞাসা করিলেন তুমি কে? বারম্বার কেন চীৎকার করিতেছ? লুসিও তাঁহার সমীপবর্তী হইয়া সম্মান প্রদর্শন পুরঃসর কহিলেন আপনকার বদনারবিন্দ দর্শনে বোধ হইতেছে আপনি কুমারী হইবেন যদি কুমারী হয়েন তদনুরূপ নমস্কার করিয়া এই প্রার্থনা করি অনুগ্রহ বিধান পুরঃসর এই ধর্ম্মশালার শিষ্যা হতভাগ্য ক্লাদিওর ভগিনী ইজাবেল সন্নিধানে একবার আমাকে লইয়া যাইতে পারেন? ইজাবেল জিজ্ঞাসা করিলেন আপনি ক্লাদিওকে দুর্ভাগ্য কহিলেন কেন, কারণ কি? আমি তাঁহার সহোদরা। তখন লুসিও কহিলেন হে সুশীলে তোমার সহোদর কারাবদ্ধ হইয়াছেন আমার দ্বারা আপনার সমীপে সমাচার পাঠাইয়া দিলেন। ইজাবেল এতৎ শ্রবণে বিষাদ প্রকাশ পূর্ব্বক কহিলেন হায় কি দুঃখ, ভ্রাতা কি জন্য কারারুদ্ধ হইলেন? লুসিও বলিলেন তিনি এক নবীনা ললনা হরণাপরাধে কারাবদ্ধ হইয়াছেন। ইজাবেল কিঞ্চিৎ চিন্তা করিয়া আশঙ্কা পূর্ব্বক কহিলেন বোধ হয় ঐ কামিনী আমার ভগিনী সেই জুলিএট্ হইবে। তাহার সহিত আমার কোন নৈকট্য সম্পর্ক নাই শৈশব সময়ে একত্র অধ্যয়ন করিতাম তন্নিমিত্ত অদ্যাবধি পরস্পর ভগিনী সম্বোধন করিয়া থাকি। আমার সহোদর বহু কালাবধি তাহার প্রতি অনুরাগ প্রকাশ করিতেন অতএব সেই বুঝি এক্ষণে প্রেমাসক্ত হইয়া ভ্রাতার এই বিপদ্ ঘটাইয়াছে। লুসিও কহিলেন, হাঁ জুলিএটই ঐ ব্যাপারের মূল বটে। ইজাবেল জিজ্ঞাসা করিলেন আমার ভ্রাতা তাহার পাণিগ্রহণ করিলেন না কেন? লুসিও উত্তর প্রদান করিলেন ক্লাদিও বিবাহ করিতে প্রস্তুত আছেন কিন্তু রাজপ্রতিনিধি তাহাকে ত্যাগ করেন না, পরস্ত্রী সংগ্রহণাপরাধে তাহার প্রাণ দণ্ডের আজ্ঞা করিয়াছেন। অতএব আপনি যদি একবার এঞ্জিল সন্নিধানে গমন পুরঃসর মিষ্ট বাক্য দ্বারা তাহাকে সন্তুষ্ট করিয়া ক্ষমা করাইতে চেষ্টা করেন তাহা হইলে আপনকার সোদরের প্রাণ রক্ষা হইতে পারে। আপনকার ভ্রাতা এ বিষয়ের জন্য আপনাকে অনুরোধ করিতে আমাকে পাঠাইয়া দিলেন। ইজাবেল ভগ্ন চিত্ততা প্রকাশ পুরঃসর বলিলেন আমি কি ভ্রাতার জীবন রক্ষা করিতে পারিব? অনুমান করি এঞ্জিলকে তুষ্ট করিয়া এতদ্ব্যাপার হইতে নিবৃত্ত করা সুকঠিন কর্ম্ম। লুসিও বলিলেন অয়ি চতুরে সন্দেহ এক প্রকার প্রতারক স্বরূপ, কেননা মঙ্গল চেষ্টায় নিরস্ত রাখিয়া তাহার ফল লাভে বঞ্চিত করে অতএব সংশয়কে স্থান দিয়া এ বিষয়ে নিরুৎসাহ হইবেন না। এঞ্জিল সমীপে গমন করুন। আমার বিলক্ষণ বিদিত আছে যুবতীগণ জানুপাতন পুরঃসর উপবেশন করিয়া সজল নয়নে পুরুষ সন্নিধানে কোন বিষয় যাচ ঞা করিলে পুরুষেরা করুণার্দ্রচিত্ত হইয়া কল্প তরু তুল্য সর্ব্বতোভাবে তাহাদের প্রার্থনা পূর্ণ করেন। ইজাবেল বলিলেন দেখি কি করিতে পারি ধর্ম্মশালার উপদেশিনীকে এতদ্বিষয় জানাইয়া এঞ্জিলের নিকট যাই। তুমি এক্ষণে বিদায় হও, ভ্রাতাকে গিয়া কহিও নিশাভাগে এ বিষয়ের সমাচার পাইতে পারিবেন।
তদনন্তর ইজাবেল দেশাধিপের প্রাসাদে প্রবেশ করিলেন এবং এঞ্জিলের সম্মুখে পতিত জানু হইয়া উপবেশন পুরঃসর সবিনয় বচনে বলিলেন মহারাজ এ দীনা কিঞ্চিৎ নিবেদন করিতে প্রার্থনা করে কৃপাবলোকন পুর্ব্বক শ্রবণাজ্ঞা হউক। এঞ্জিল বলিলেন কি প্রার্থনা কর? ইজাবেল স্তুতি নতি পূর্ব্বক নিবেদন করিলেন মহারাজ এই দুঃখিনী সহোদরের জীবন দান প্রার্থনা করে। রাজপ্রতিনিধি কহিলেন কুমারি তোমার ভাতার প্রতি পরস্ত্রী গ্রহণাপরাধে ব্যবস্থানুসারে প্রাণ দণ্ডের আদেশ হইয়াছে তাহাকে অবশ্যই সেই দণ্ড ভোগ করিতে হইবে এক্ষণে আর কোন উপায় নাই। ইজাবেল শাসন কর্ত্তার এ কথায় আর কিছু কহিতে না পারিয়া সাতিশয় পরিতাপ প্রকাশ পূর্ব্বক এতাবন্মাত্র কহিলেন ধর্ম্মাবতার এ রাজশাসন অতি সুকঠিন। হায় আমার একমাত্র সহোদর ছিল তাহাকেও হারাইলাম। ভাল পরমেশ্বর আপনার মান রক্ষা করুন। কুমারী এতাবদুক্তি করিয়া বিষণ্ণ বদনে নৃপসদন হইতে বহির্গমন পূর্ব্বক স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। পথিমধ্যে ভ্রাতৃবন্ধু লুসিওর সহিত সাক্ষাৎ হইল। ঐ ব্যক্তি তাহার প্রমুখাৎ নৈরাশ্যের কথা শুনিয়া বলিলেন এত ত্বরায় আপনার প্রার্থনায় নিরাশ হওয়া উচিত হয় না, পুনর্বার এঞ্জিলের সন্নিধানে গমন পূর্ব্বক বিনীতভাবে উপবেশন করিয়া তাহার চরণ ধারণ করত সোদরের জীবন দান প্রার্থনা করুন। অনুমান হয় আপনি প্রার্থনা করিবার রীতি জানেন না এপ্রকার গুরুতর বিষয়ে যৎসামান্যরূপ প্রার্থনা করিলে সহসা কৃতকার্য্য হওয়া যায় না। কোন বস্তু যাচঞা করিতে হইলে অতি তুচ্ছ হইলেও তদ্বিষয়ে অযত্ন করা উচিত হয় না। আপনি যত্ন পূর্ব্বক প্রার্থনা করুন অবশ্য অভীষ্ট সিদ্ধি করিতে পারিবেন অতএব ইজাবেল পুনর্বার নৃপ নিকেতনে গমন পূর্ব্বক ভূপতির প্রতিনিধি সমক্ষে জানুপরি বসিয়া করপুটে সবিনয় বচনে কহিতে লাগিলেন ধর্ম্মাবতার অনাথার প্রার্থনায় অবধান হউক। এঞ্জিল বলিলেন কুমারী অনর্থক কেন ক্লেশ পাও, দণ্ডাজ্ঞা প্রচার হইয়াছে, এখন আর অনুগ্রহের সময় নাই, করুণার কাল অতীত হইয়াছে। ইজাবেল বলিলেন ধর্ম্মাবতার এখনও সময় আছে কৃপা কটাক্ষ হইলেই আমার প্রার্থনা সিদ্ধ হইতে পারে। প্রভো রাজমুকুট অস্ত্রশস্ত্র শৌর্য্য বীর্য্য এবং বিচারপতির পরিচ্ছদ এ সকল পদার্থ করুণাপেক্ষা শোভাকর নহে, মহদ্ব্যক্তির ক্ষমাই ভূষণ, ক্ষমাতেই লোকে প্রতিষ্ঠা পায়, অতএব ক্ষমা করিতে আজ্ঞা হউক। ইহাতে এঞ্জিলের অন্তঃকরণ নম্র না হওয়াতে পুনর্বার প্রত্যাখ্যান করত কহিলেন তুমি এস্থান হইতে প্রস্থান কর। ইজাবেল তাহা শুনিয়া পুনর্বার সবিনয় বচনে বলিতে লাগিলেন মহাশয় আমার ভ্রাতা যদিস্যাৎ আপনকার ন্যায় ক্ষমতাবান এবং আপনি তাহার তুল্য কুকর্ম্ম করিয়া তদ্রূপ দুর্দশাপন্ন হইতেন তাহা হইলে তিনি আপনার প্রতি কদাচ ঈদৃক্ নির্দয় হইতেন না। আহা পরমেশ্বর কেন আমাকে আপনকার ক্ষমতা প্রদান করেন নাই, আপনাকে ইজাবেল কেন করিলেন না? তাহা হইলে আমার অন্তঃকরণের ক্লেশ বুঝিতে পারিতেন, এবম্প্রকারে বারম্বার নিরাকৃত করিতেন না। এঞ্জিল কহিলেন কুমারী বৃথা কেন বিলাপ করিতেছ? আমি তোমার সহোদরের দণ্ড বিধান করি নাই, ব্যবস্থানুসারে দণ্ডিত হইয়াছে। ক্লাদিও যদিস্যাৎ আমার আপনার তনয়, সহোদর অথবা কোন আত্মীয় ব্যক্তি হইত তাহা হইলেও দণ্ড নীত্যনুসারে তাহাকে ঈদৃশ দণ্ড ভোগ করিতে হইত অতএব বৃথা কেন বাক্য ব্যয় কর আপনার আলয়ে যাও, কল্য তোমার ভ্রাতার অবশ্যই প্রাণ দণ্ড হইবেক। ইজাবেল বিস্ময় প্রকাশ পূর্ব্বক বলিলেন কি কল্য? আহা অকস্মাৎ আমার ভ্রাতার মৃত্যু নিবন্ধন করিলেন। ধর্ম্মাবতার বিনয় পূর্ব্বক নিবেদন করি কিয়ৎ দিন রক্ষা করুন এখনও অভাগিনীর ভ্রাতা মরণের নিমিত্ত প্রস্তুত হয় নাই। প্রভো আমরা আত্ম সেবার নিমিত্ত পক্ষিদিগকেও কাল বিশেষে বধ করিয়া থাকি যখন তখন নষ্ট করি না অতএব আপনাদের সেবায় যদিস্যাৎ কাল বিশেষ অপেক্ষিত হইল তবে দণ্ডনীতির অনুসরণ করণক পরমেশ্বর সেবায় কি কাল বিশেষের অপেক্ষা করা উচিত হয় না? কৃপানিধান স্মরণ করিয়া দেখুন অনেকেই আমার সোদরের সদৃশ অপরাধ করিয়াছেন কিন্তু কাহারও কদাপি প্রাণ দণ্ড বিহিত হয় নাই। রাজব্যবস্থা পুর্ব্বাবধি আছে বটে কিন্তু তদনুসারে এই প্রথম কঠিন দণ্ডাজ্ঞা হইল এবং আমার ভ্রাতাকেই সর্ব্বাগ্রে তাহা ভোগ করিতে হইল। প্রভো ধর্ম্মতঃ বলুন দেখি আমার সহোদরের তুল্য দোষ ভূরি২ লোকের আছে কি না? পরন্তু যদিস্যাৎ আপনকার অন্তঃকরণ আমার ভ্রাতার তুল্য স্বভাবতঃ দোষাঘ্রাত হয় তাহা হইলে এ প্রকারে তাহার জীবনের বিরোধি হওয়া নিতান্ত অনুচিত। কুমারী সুমধুর বচনে বিবিধ যুক্তি প্রদর্শন পুরঃসর এবম্প্রকার বক্তৃতা করিলে এঞ্জিলের মত পরিবর্ত্তন হইবার উপক্রম হইল। কুমারীর রূপ লাবণ্য অবলোকনাবধি তাহার আপনার অন্তঃকরণে অসৎ প্রবৃত্তির উদয় হইতেছিল এবং ক্লাদিও যে ব্যাপারে দোষী হয় মনে তাদৃশ ব্যাপারের উপায় চিন্তায় ব্যাকুল হইতেছিল অতএব কামিনীর প্রতি কেবল মৌখিক বিমুখতাচরণ করিতে আরম্ভ করিল। অনন্তর ইজাবেল নৃপতির প্রতিনিধিকে সম্বোধন করিয়া পুনর্ব্বার কহিলেন প্রভো বিমুখ হইবেন না আমি আপনাকে যথাশক্তি পুরস্কার প্রদান করিব। এঞ্জিল এতৎ প্রস্তাবে রোষ প্রকাশ পূর্ব্বক কহিল কি আমি উৎকোচগ্রাহী? ইজাবেল বিনয় করিয়া বলিলেন ধর্ম্মাবতার আমি সুবর্ণ রজতাদি প্রদান করিব না আপনকার নিমিত্ত নিয়মানুসারে জগদীশ্বর সন্নিধানে প্রার্থনা করিব। প্রভো আপনি তাহার ফল স্বর্গে দেবগণের সঙ্গে অনুভব করিবেন। হে মহানুভব যে সকল কুমারীর অন্তঃকরণ সাংসারিক ব্যাপারে লিপ্ত হয় নাই তাহারআ উপবাস পুরঃসর উপাসনা করিয়া যে আশীর্ব্বাদ বদন হইতে নির্গত করে তাহা অমূল্য ও অক্ষয় ধন। অনন্তর এঞ্জিল সদয় হইয়া কহিল ভাল তুমি অদ্য প্রস্থান কর কল্য আসিও দেখা যাইবে। ইজাবেল কিয়ৎ ক্ষণের নিমিত্ত ভ্রাতার জীবন রক্ষা হওয়াতে সাতিশয় সন্তুষ্টচিত্তা হইলেন অধিকন্তু বিচারপতি পুনশ্চ প্রার্থনা শ্রবণ করিবেন বিদায় গ্রহণ কালে এতদাভাস প্রাপ্ত হওয়াতে মনে আশা করিতে লাগিলেন দণ্ড প্রণেতার মত পরিবর্ত্তন করিতে পারিব। অতএব প্রস্থান সময়ে যথোচিত সম্মান প্রদর্শন পুরঃসর এই শুভাবহ বচন বলিয়া গেলেন পরমেশ্বর আপনাকে ধন মান সহিত রক্ষা করুন। এঞ্জিল এতৎ শ্রবণে মনে কহিতে লাগিল পরমেশ্বর তাহাই করুন। আমি তোমার চিন্তা হইতে নিস্তার পাই, তাহা হইলে প্রাণ মান সকলই থাকিবে। অনন্তর সৎ প্রবৃত্তির প্রাদুর্ভাবে আপনা আপনি বলিয়া উঠিলেন এ কি? এ কি? ঐ কামিনীর উপর আমার মনঃ প্রেম প্রবণ হইল না কি? তাহার বাক্য পুনর্বার শ্রবণ করিতে ও সুলোচন অবলোকন করিতে আমার অভিলাষ হয় কেন? আমি কি স্বপ্ন দেখিতেছি? স্বপ্নই মানব জাতির দুর্জ্জয় বৈরী, সাধু লোকের অনিচ্ছাতেও অন্তঃকরণ মধ্যে অসদ্ভাবের আবির্ভাব করিয়া দেয়। কি আশ্চর্য্য কোন নির্লজ্জা বার যোষাও কদাপি আমার মনে কুপ্রবৃত্তি জন্মাইয়া দিতে পারে নাই ধর্ম্ম শীলা মুগ্ধা বালিকাকে অবলোকন করিয়া ঈদৃশ চাঞ্চল্য হইল। আমি এই কিয়ৎ ক্ষণ পূর্বে প্রেমাকাঙ্ক্ষি ব্যক্তিদিগের প্রতি পরিহাস করিতেছিলাম এক্ষণে আমার চিত্ত কুমারীর প্রণয় বাসনায় ব্যাকুল হইল এ কি চমৎকার ব্যাপার?
এঞ্জিল নায়িকানুরাগ বশতঃ এবম্প্রকার ব্যাকুল হইয়া দোষাদোষ পর্য্যালোচনা করাতে কারারুদ্ধ ক্লাদিও অপেক্ষা সমস্ত নিশা সাতিশয় যন্ত্রণা ভোগ করিতে লাগিল। ফলতঃ বায়ানাধিপতি মহারাজ সেই রজনীযোগে উদাসীনের বেশে কারাগারে উপস্থিত হইয়া ক্লাদিওর সহিত সাক্ষাৎ করত অনুতাপ পূর্ব্বক তাহার মনের শান্ত্বনা নিমিত্ত নানাবিধ ধর্ম্মোপদেশ করিতে ছিলেন ইহাতে তাহার যাতনা বরং খর্ব্ব হইয়াছিল। কিন্তু এঞ্জিল প্রণয়ানুরাগে একেবারে অস্থির হইল, কখন ইজাবেলকে ভুলাইয়া ধর্ম্মভ্রষ্ট করিবার অভিলাষ করিল কখন বা চৈতন্যোদয়ে ঐ ব্যাপার পাপজনক বোধ করিয়া তাদৃশ প্রবৃত্তির নিমিত্ত অনুতাপ করিতে লাগিল। পরন্তু পরিশেষে কুপ্রবৃত্তিই প্রবলা হইয়া উঠিল তাহাতে পূর্ব্বে যে উৎকোচের কথা শ্রবণে চমৎকৃত হইয়াছিল এক্ষণে স্বয়ং কুমারীর কৌমার হরণ নিমিত্ত তদপেক্ষা ঈদৃক্ গুরুতর উৎকোচ প্রদান করিতে সংকল্প করিল যে কুমারী তাহার লোভ সম্বরণ করিতে না পারে অর্থাৎ তাহার সহোদরের জীবন রক্ষা করিতে স্থির করিল।
অতএব পর দিবস প্রাতঃকালে ইজাবেল রাজসভায় প্রবেশ করিলে এঞ্জিল তাহাকে নির্জ্জনে আপনার সমীপে আহ্বান করিল। কুমারী রাজ প্রতিনিধির নির্দেশ ক্রমে একাকিনী তন্নিকটে উপনীতা হইলে এঞ্জিল বিরলে তাহাকে কহিতে লাগিল হে সুন্দরি তোমার রূপ লাবণ্য অবলোকনাবধি আমার অন্তঃকরণ তোমার প্রণয়াকাঙ্ক্ষি হইয়া অত্যন্ত অস্থির হইয়াছে। জুলিএট যদ্রূপ ক্লাদিওর সহিত ব্যবহার করিয়াছে তুমি যদিস্যাৎ কৌমার প্রদান পুরঃসর আমার সহিত তাদৃক্ আচরণ কর তাহা হইলে এখনি তোমার সহোদরের জীবন রক্ষা করি। ইজাবেল এ কথা শ্রবণ মাত্রে অতিশয় বিস্ময়াকুলআ হইলেন এবং বিনয় প্রকাশ পূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন ধর্ম্মাবতার আমার ভ্রাতা আপনার ন্যায় জুলিএটের সহিত প্রণয় ব্যবহার করিয়াছেন তবে আপনি কি বিচারে তাহার প্রাণ দণ্ডাজ্ঞা করিলেন? এঞ্জিল এতদ্বচনে মনোযোগ না করিয়া পুনশ্চ কহিল যুবতি যে রূপে জুলিএট পিত্রালয় হইতে নিশাভাগে বহির্গত হইয়া ক্লাদিওর সন্নিধানে আগমন করে তুমি যদি তদ্রূপে গোপনে আসিয়া আমার সহিত সাক্ষাৎ কর তাহা হইলে তোমার সহোদর ক্লাদিওর রাজদণ্ডে কদাপি মৃত্যু হইবেক না। ইজাবেল এ সকল কথায় মনোমধ্যে বিবেচনা করিয়া কহিলেন কি আশ্চর্য্য রাজপ্রতিনিধি যে দোষের নিমিত্ত আমার ভ্রাতার প্রাণদণ্ডাজ্ঞা করিয়াছে স্বয়ং সেই দোষ করিবার নিমিত্ত বারম্বার আমার প্রবৃত্তি জন্মাইতে লাগিল। পরে সাতিশয় বিষাদ প্রকাশ পুরঃসর বলিলেন যদিস্যাৎ ভ্রাতার পরিবর্ত্তে আমার প্রতি প্রাণদণ্ডাজ্ঞা হইত তাহা হইলে আমি স্বীয় অঙ্গে আভরণ ন্যায় বেত্রাঘাত গ্রহণ করত শমন সদনে গমন করিতাম কিন্তু ভ্রাতার জীবন রক্ষা নিমিত্ত আপনি যে প্রস্তাব করিতেছেন তাহা অতিশয় লজ্জাকর কদাপি স্বীকার করিতে পারি না। পরে ঐ প্রস্তাব রাজপ্রতিনিধির বাস্তব অভিপ্রেত কি না এতদ্বিষয় জিজ্ঞাসু হইয়া আশঙ্কা করত কহিলেন বোধ করি আপনি আমার সতীত্ব পরীক্ষা নিমিত্ত ঐ কথা কহিলেন। এঞ্জিল কুমারীর বিশ্বাস নিমিত্ত কহিল সুন্দরি আমি স্বীয় মর্য্যাদার শপথ করিয়া বলিতেছি আমার আন্তরিক অভিলাষ ব্যক্ত করিয়াছি। রাজপ্রতিনিধি ঈদৃশ অসদভিপ্রায়ের প্রসঙ্গে আপনার মর্য্যাদার শপথ করিলে কুমারী অন্তঃক্রুদ্ধা হইয়া সাতিশয় বিস্ময় প্রকাশ পুরঃসর বলিলেন কি আপনার এতাদৃশ কুৎসিত সংকল্প? আপনি ঈদৃক্ অসৎ কার্য্যে রত, আমি এ কথায় প্রত্যয় করিতে পারি না, ইহাতে বিশ্বাস করিলে আপনার মানহানি হইবেক। এঞ্জিল কহিল কি করি তোমার রূপে মোহিত হওয়াতে এবম্বিধ অভিলাষ জন্মিয়াছে। পরে ইজাবেল ভয় প্রদর্শন পূর্ব্বক তাহাকে এই অসদাগ্রহ হইতে নিবৃত্ত করিবার মানসে কহিলেন আমার ভ্রাতার নিমিত্ত ক্ষমা পত্র লিখিয়া এখনি তাহাতে স্বাক্ষর করিয়া দাও নচেৎ তোমার রীতি চরিত্রের কথা সর্ব্বত্র প্রচার করিব। এঞ্জিল কহিল সুন্দরি তোমার কথায় কে প্রত্যয় করিবে? আমার খ্যাতি সর্ব্বত্র প্রচরদ্রূপ আছে। আমি অতি ন্যায় শীল এবং অত্যন্ত কঠোর জীবন ধারণ করি সকলেই জানে তুমি আমার চরিত্রের বিরুদ্ধে কোন কথা কহিলে কেহই তাহাতে বিশ্বাস করিবে না। বৃথা কেন গোলযোগ কর আমার অভিলাষ পূর্ণ করিয়া ভ্রাতাকে কৃতান্তের করাল কবল হইতে রক্ষা কর না কেন? যদি সম্মত না হও কল্য সহোদরের নিধন দর্শন করিতে হইবে। আমি তোমার অপবাদের কথায় ভীত হই না আমার বিরুদ্ধে যাহা কহিতে চাহ কহিও তোমার সত্য কথা অপেক্ষা আমার অলীক বাক্যে লোকে অধিক বিশ্বাস করিবে। এখন আমার প্রার্থনায় সম্মত হইলা না কল্য দেখিতে পাইবে। অতএব ইজাবেল সহোদরের জীবনে নিরাশ হইয়া এই ভাবিতে২ ভ্রাতার নিকট কারাগারে গমন করিলেন আহা কাহার নিকট গিয়া শরণ প্রার্থনা করিব। যদি রাজপ্রতিনিধির কথা প্রকাশ করি কেহ তাহাতে প্রত্যয় করিবে না। পরে কারালয়ে প্রবেশ পূর্ব্বক সোদরের সমক্ষে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন সহোদর ক্লাদিও এক জন উদাসীন পুরুষের সহিত ধর্ম্ম বিষয়ে কথোপকথন করিতেছে সেই ব্যক্তি বস্তুতঃ উদাসীন নহেন, তিনি বায়ানাধিপতি। মহারাজ আকৃতি গোপন পূর্ব্বক তথায় গিয়াছিলেন। নৃপতি দণ্ডনীত্যনুসারে রাজ্য শাসন নিমিত্ত এঞ্জিলকে প্রতিনিধি রূপে নিযুক্ত করিয়া আপনি ছদ্মবেশে সমস্ত বিষয় অনুসন্ধান করিতেছিলেন। স্ত্রীসংগ্রহণাপরাধে ক্লাদিওর প্রাণ দণ্ড বিধান হইলে তাহার দোষের বিবরণ অন্বেষণ করেন তাহাতে জুলিএটের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া নায়ক নায়িকার মনের ভাব জানিতে পারিয়াছিলেন। অভাগিনী জুলিএট সজল নয়নে নরপতির সন্নিধানে অনুতাপ পূর্ব্বক স্বীকার করেন ক্লাদিও অপেক্ষা আমিই অধিক দোষী কেননা ইচ্ছা পূর্ব্বক অসৎ প্রার্থনায় সম্মত হইয়াছিলাম।
ইজাবেল সহোদরের উদ্দেশ নিমিত্ত কারালয়ে প্রবেশ করিয়া কহিলেন এস্থানে কুশল হউক, সুখে থাক। ছদ্মবেশী নৃপতি শব্দ শুনিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন কে তুমি? অভ্যন্তরে আগমন কর, অত্রত্য দুর্ভগ লোকদিগের মঙ্গল প্রার্থকেরা সর্ব্ব প্রকারে অভ্যর্থনীয় হইয়া থাকেন। ইজাবেল আলয় মধ্যে প্রবেশ করিয়া বলিলেন ক্লাদিওর সহিত বিশেষ কথা আছে। ইহাতে ভূপাল তাহাদের ভ্রাতা ভগিনীকে একত্র রাখিয়া আপনি সে স্থান হইতে নির্গত হইলেন। কিন্তু অন্যত্র প্রস্থান না করিয়া কারাগারের রক্ষককে বলিলেন আমাকে এখানে এমত কোন স্থলে লুক্কায়িত করিয়া রাখ যেখানে থাকিয়া ইহাদের কথোপকথন শুনিতে পাই।
ক্লাদিও ভগিনীকে নিরীক্ষণ করিয়া জিজ্ঞাসা করিল সমাচার কি? ইজাবেল বিষাদ প্রকাশ পুরঃসর উত্তর দিলেন আর সংবাদ কি, কল্য মৃত্যু হইবে, প্রস্তুত হও। ক্লাদিও জীবন নিমিত্ত কাতর হইয়া কহিল ভগিনি কোন উপায় কি নাই? ইজাবেল কহিতে লাগিলেন ভ্রাতঃ একটা অতি ঘৃণাকর জঘন্য উপায় আছে তাহাতে যদি সম্মত হওয়া যায় তবে তোমার জীবন রক্ষা হইতে পারে কিন্তু সে জীবন অপমানে জীবন নাশাপেক্ষা অতিশয় ক্লেশদায়ক হইবেক। ক্লাদিও কহিল কি আমাকে বল দেখি। ইজাবেল বলিলেন ভ্রাতঃ বলিতে ভয়ে আমার হৃৎকম্প হইতেছে, কি জানি যদি অনিত্য জীবন স্বল্প কাল রক্ষা করিবার নিমিত্ত পুরুষ পরম্পরায় সমাগত মহা সম্ভ্রমে অনাদর কর। ভ্রাতঃ তোমার কি মরিতে সাহস হয়? মৃত্যু চিন্তাও অতি ভয়ানক, মহাবীর পরাক্রান্ত পুরুষের মৃত্যু যাতনা যদ্রূপ, যে সকল ক্ষুদ্র২ কীটের উপর আমরা অহরহ পদাপর্ণ করি তাহাদিগের মরণ ক্লেশও তদ্রূপ। ক্লাদিও কহিলেন ভগিনি তুমি কি নিমিত্ত লজ্জা দিতে লাগিলে? তুমি জান কি না আমার প্রকৃতি কুসুমের তুল্য সুকুমার বটে কিন্তু আমি মনে করিলে তাহাতে কাঠিন্য উৎপাদন করিতে পারি? যদি ঘৃণাকর উপায় হয় তাহাতে সম্মত হইব কেন? বাহুপ্রসারণ পুরঃসর নবোঢ়া নায়িকা বোধে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিব। ইজাবেল প্রাণ সংশয়ে পতিত সহোদরের এবম্প্রকার সাহসিক বাক্য শ্রবণ করিয়া বিষাদেও হর্ষ প্রকাশ পূর্ব্বক কহিলেন ভ্রাতঃ আমার সনাভির ন্যায় কথা কহিলে। শুনিতে পাও আমাদের জনকের সমাধি স্থান হইতে যেন এই সকল বাক্য উচ্চারিত হইতেছে এক দিন অবশ্য মরিতে হইবে এমত কি মনে করিতে? ভাই এ কি বলিবার কথা? আমাদের রাজপ্রতিনিধি আমাকে কহিলেন কি যদি কৌমার প্রদান কর তাহা হইলে তোমার ভ্রাতার জীবন রক্ষা করি। দুরাত্মা যদিস্যাৎ তোমার মোচন নিমিত্ত আমার কুমারীত্বের পরিবর্ত্তে জীবন যাচঞা করিত অবিলম্বে তুচ্ছ প্রাণ সমর্পণ করিতাম কিন্তু সে কৌমার হরণ করিতে চাহে তাহাতে সম্মত হইয়া কলঙ্কিত জীবন লইয়া কি করিব? ক্লাদিও আহ্লাদ পূর্ব্বক কহিল ভগিনি এতন্নিমিত্ত তোমাকে অবশ্য ধন্যবাদ করি। ইজাবেল তাহার তাৎপর্য্য বুঝিতে না পারিয়া বলিলেন তবে কল্য প্রাণ দণ্ড স্বীকারে প্রস্তুত হও। ক্লাদিও এখন আপনার অভিপ্রায় ব্যক্ত করত কহিতে লাগিল ভগিনি মৃত্যু যন্ত্রণা অতিশয় ভয়ঙ্করী। ইজাবেল বলিলেন ভ্রাতঃ অপমানগ্রস্ত ঘৃণিত জীবন তদপেক্ষা ভয়ানক। ক্লাদিওর স্বভাব এক্ষণে মরণ ভয়ে অন্য ভাবান্বিত হইল এবং বধদণ্ডাজ্ঞা প্রচার হইলে দোষি ব্যক্তিরা যে ভাবনায় ব্যাকুল হয় ক্লাদিওর অন্তঃকরণে সেই রূপ চিন্তা প্রবলা হইয়া উঠিবাতে উচ্চ স্বরে বলিল ভগিনি প্রাণ অতি প্রিয় পদার্থ, তাহা রক্ষা করিতে চেষ্টা কর। ভ্রাতার জীবন রক্ষা নিমিত্ত যে পাপ করিবে অনেকে স্বভাবতঃ তদ্রূপ কিল্বিষ করিয়া থাকে। তোমার এ বিষয়ে অধর্ম্ম হইবেক না বরং বিপন্নের প্রাণ পরিত্রাণ নিমিত্ত কলুষের বিনিময়ে নিরতিশয় সুখসাধন পুণ্য হইবে। ইজাবেল সহোদরের ভীরুতা প্রযুক্ত এই নীচ প্রকৃতির কথা শ্রবণে কোপাবেশে বলিলেন অরে পাপাত্মা কাপুরুষ তুই ভগিনীর সতীত্ব নষ্ট করিয়া আপনার অনিত্য অধম জীবন রক্ষা করিতে বাসনা করিস্, ছিঃ তোরে ধিক্, তোর জীবনেও ধিক্, আমি মনে করিয়াছিলাম তোর একটা মুণ্ড কি বিংশতি মস্তক থাকিলে তাহাও আমার সতীত্ব রক্ষা নিমিত্ত স্বয়ং বধযন্ত্রে সমর্পণ করিতে স্বীকার করিবি, তোর ঈদৃক্ নীচ প্রবৃত্তি। ক্লাদিও কহিল অগিনি আমার কথার শেষ পর্য্যন্ত না শুনিয়া অকারণ কেন ক্রোধ কর? এই বাক্য কহিয়া ভীরু স্বভাব প্রযুক্ত পুণ্যবতী ভগিনীর ব্যভিচার দ্বারা স্বীয় জীবন রক্ষার নিমিত্ত অন্য প্রকারে প্রবৃত্তি লওয়াইতে বচনারম্ভ করে ইত্যবসরে মহারাজ তথায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং তাহাদিগকে কহিলেন আমি গোপনে থাকিয়া তোমাদের সমুদায় কথোপকথন শ্রবণ করিয়াছি। আমার জ্ঞাত আছে পণ্যশীলা কুমারীর কৌমার হরণ নিমিত্ত এঞ্জিলের বাস্তবিক মানস নাই কেবল সতীত্ব পরীক্ষার্থ তাদৃক্ উক্তি করিয়াছিলেন, যুবতী সতী এতজ্জন্য অবশেষে তাঁহার যথেষ্ট সন্তোষ জন্মিয়াছে। অতএব ওহে ক্লাদিও তোমার ক্ষমা প্রাপ্তির কোন সম্ভাবনা দেখি না পরমেশ্বরের স্মরণ করত মৃত্যু নিমিত্ত প্রস্তুত হও। ক্লাদিও দুর্ব্বল স্বভাব এ প্রযুক্ত ঐ কথা শ্রবণে খেদ করিয়া কহিল ভগিনি তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমার আর জীবন ধারণে বাসনা নাই তাহাতে আশ্রদ্ধা জন্মিয়াছে এক্ষণে আশু নিষ্কৃতি পাইবার অভিলাষ করি। এতাবন্মাত্র উক্তি করিয়া লজ্জিত হওত বিষণ্ণ বদনে সে স্থান হইতে প্রস্থান করিল।
অনন্তর ছদ্মবেশী নৃপতি ইজাবেলকে একাকিনী পাইয়া সতীত্ব রক্ষণে তাঁহার সুদৃঢ় যত্নের বিষয়ে বিস্তর প্রশংসা করত কহিতে লাগিলেন অয়ি কুমারি যে হস্ত তোমাকে রূপবতী করিয়াছে সেই কর দ্বারা তোমার অন্তঃকরণ মধ্যে অনুপম গুণ রত্ন নিহিত হইয়াছে সন্দেহ নাই। ইজাবেল এঞ্জিলের বিষয় উত্থাপন পূর্ব্বক কহিলেন আহা বায়ানাধিরাজ দুরাত্মা এঞ্জিল কর্ত্তৃক ঈদৃক্ প্রবঞ্চিত হইয়াছেন যদি কদাচিৎ স্বদেশে প্রত্যাগমন করেন এবং আমি তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া বাক্যালাপ করিতে পাই তাহা হইলে তাঁহার সুশীল প্রতিনিধি কি প্রকারে ন্যায়ানুবর্ত্তন পুরসর রাজত্ব করিতেছে নিবেদন করি। কুমারী কোন ক্রমে জানিতে পারিলেন না যে যাহা প্রকটিত করিতে বাসনা করিতেছেন তখনই প্রকাশ হইল। ছদ্মবেশী কহিলেন মহারাজের সহিত সাক্ষাৎ হইবার অসম্ভাবনা কি? কিন্তু তোমার যাদৃশী অবস্থা তাহাতে অনুমান করি তুমি যে অপবাদ আরোপ করিবে এঞ্জিল অবলীলাক্রমে তাহা হইতে উত্তীর্ণ হইতে পারিবেক। অতএব আমি একটা পরামর্শ বলি শ্রবণ কর। তুমি একটী দুঃখিনী রমণীর হিত চেষ্টা কর তাহা হইলে তোমার যথেষ্ট পুণ্য হইবে এবং স্বীয় সহোদরকে রাজ প্রতিনিধির নিদারুণ কোপ হইতে পরিত্রাণ করিতে পারিবে অথচ তোমার চরিত্রে কোন প্রকার কলঙ্ক স্পশ হইবারও সম্ভাবনা নাই। যদিস্যাৎ বায়ানাধিরাজ কখন স্বদেশে প্রত্যাগমন করেন তদ্বিষয়ের কথা বার্ত্তা শ্রবণে তাঁহার যৎপরোনাস্তি আনন্দ জন্মিবেক সন্দেহ নাই। ইজাবেল কহিলেন যদিস্যাৎ কোন প্রকার কুক্রিয়ার সংশ্রব না থাকে তাহা হইলে আপনকার নিয়োগানুসারিণী হইতে প্রস্তুত আছি। নরনাথ কহিলেন ধর্ম্মের পরাক্রম অতিশয় প্রবল। পরে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন সমুদ্রে নিমগ্ন মহাবীর ফ্রেদ্রিকের এক ভগিনী ছিলেন তাঁহার নাম তোমার শ্রুত আছে? ইজাবেল বলিলেন হাঁ শুনিয়াছি সেই তরুণীর আখ্যা মেরিয়ানা। তাঁহার সুখ্যাতির বিষয়েও অনেক কথা শুনা আছে। ভূপাল কহিলেন সেই মহিলা এঞ্জিলের পরিণীতা ভার্যা। সেই দুর্ভগা অবলার ভ্রাতা যে অর্ণবতরি সহিত জলসাৎ হন্ তাহার মধ্যে অঙ্গনার পরিণায্য ধন থাকাতে সে সকলও সাগরের উদরে নিক্ষিপ্ত হয়। ইহাতে সেই হতভাগ্য ভামিনীর যৎপরোনাস্তি দুর্গতি হইল। প্রিয় সহোদর হারাইলেন। যৌতুক ধন হঠাৎ বিনষ্ট হওয়াতে তাঁহার স্বামী ভাক্ত ধার্মিক এঞ্জিল নিঃস্নেহ হইয়া সাতিশয় ঘণা করিতে লাগিল এবং ক্রমে সুশীলা অবলার অখ্যাতি রটনা করিয়া তাঁহাকে পরিত্যাগ করিল। পরিত্যাগের কারণ কেবল ধন বিনাশ। দুর্গা ভামিনী এই রূপে পতি কর্ত্তৃক ত্যক্ত হইয়া নিরন্তর পরিতাপ করত সজল নয়নে রোদন মাত্র পরায়ণা হইলেন। তাঁহার পতি দেখিয়া শুনিয়াও কিঞ্চিত্র করুণান্বিত হইল না। তাহার মুখ হইতে কদাপি শান্ত্বনা বাক্য উচ্চারিত হয় নাই। কিন্তু দুরাত্মা এবম্প্রকার নির্দয় ব্যবহার করিলেও সচ্চরিত্রা যুবতীর মনঃ নিরন্তর তাহাতেই প্রণয় প্রবণ হইয়া রহিল। প্রথম মিলন কালে স্বামির প্রতি যদ্রূপ স্নেহ প্রকাশ করিয়াছিলেন নিরন্তর তদ্রূপ ভক্তি করিতেছিলেন। অনন্তর নৃপতি আপনার অভিপ্রায় ব্যক্ত করত কহিলেন ইজাবেল তুমি এঞ্জিলের নিকট গমন পুর্ব্বক তাহার অভিলষিতানুসারে অদ্য যামিনীর দ্বিতীয় যামে তদীয় আলয়ে উপস্থিত হইতে স্বীকার করিয়া ভ্রাতার নিমিত্ত ক্ষমা প্রার্থনা কর। মেরিয়ানা তোমার পরিবর্ত্তে নিরূপিত সময়ে তাহার নিকট গমন করিবেন। সে অন্ধকারে চিনিতে পারিবেক না, তুমি অঙ্গীকারানুসারে উপস্থিত হইয়াছ বোধ করিয়া সাতিশয় ঔৎসুক্য সহকারে তাঁহার সহিত মিলিত হইবেক। বৎসে এতদ্ব্যাপারানুষ্ঠানে কিঞ্চি ন্মাত্র সঙ্কুচিত হইও না। এঞ্জিল মেরিয়ানার পাণিগ্রাহ স্বামী, তাহাদের উভয়ের এইরূপে সংঘটন করিয়া দিলে তাহাতে অধর্ম্ম হইবেক না। ইজাবেল এই পরামর্শে হর্ষান্বিত হইয়া তদনুরূপ অনুষ্ঠান নিমিত্ত তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করিলেন এবং রাজাও এই বৃত্তান্ত মেরিয়ানার সুগোচর করিতে সত্বর তাঁহার সদনে গেলেন। মহারাজ ইতিপূর্ব্বে দুর্ভগা মেরিয়ানার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া তাঁহার প্রমুখাৎ পতির অসদাচরণের বিবরণ শ্রবণ করিয়াছিলেন এবং সেই সুশীলা অবলাকে নানা প্রকার সদুপদেশ দিয়া শান্ত্বনা করেন অতএব তিনি পুনর্ব্বার অঙ্গনার আলয়ে উপস্থিত হইবামাত্র সেই সীমন্তিনী পরম সমাদর পুরঃসর তাঁহার অভ্যর্থনা করিলেন এবং উপদেশানুসারে কর্ম্ম করিতে তৎক্ষণাৎ সম্মত হইলেন।
অনন্তর ইজাবেল এঞ্জিলের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া যামিনীযোগে তদীয় অভিলষিত সিদ্ধির বিষয় অবধারিত করিলেন। পরে উদাসীনের বেশধারি মহারাজের নির্দেশনুসারে মেরিয়ানার নিকেতনে উপনীত হইলেন। সে স্থানে মহারাজ উপস্থিত ছিলেন। যুবতীকে দেখিয়া সহর্ষে বলিলেন ভাল হইল উপযুক্ত সময়ে সাক্ষাৎ হইয়াছে প্রতিনিধির সমাচার কি বল দেখি? ইজাবেল রাজপ্রতিনিধির অভিলষিত বিষয় সম্পাদন নিমিত্ত যে রূপ অবধারিত করিয়া আসিলেন আনুপূর্ব্বিক কহিতে লাগিলেন হে উদাসীন মহাশয় এঞ্জিলের এক উদ্যান আছে তাহার চতুর্দিকে ইষ্টকময় প্রাচীর। পশ্চিমাংশে দ্রাক্ষা ক্ষেত্রের নিকটস্থ একটা বৃহৎ দ্বার দিয়া তন্মধ্যে প্রবেশ করা যায়। তৎপরে এঞ্জিলের প্রদত্ত দুইটা চাবি দেখাইয়া কহিলেন এই বড় চাবিতে দ্রাক্ষা ক্ষেত্রের দ্বার মুক্ত করা যায়, আর ক্ষুদ্রটীতে উদ্যানের কপাট উদ্ঘাটিত হয়। আমি অদ্য রজনী যোগে ঐ দ্বার দিয়া উদ্যান মধ্যে গমন পূর্ব্বক তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে অঙ্গীকার করিলে সে আমার ভ্রাতার জীবন রক্ষার্থ সত্য করিল। যে স্থানে গোপনে আমার সহিত সম্মিলিত হইবার বিষয় ধার্য্য করিল আমি বিলক্ষণ রূপে চিনিয়া আসিয়াছি। নৃপতি কহিলেন কোন সঙ্কেত কি অবধারিত হইয়াছে? হইয়া থাকে বল মেরিয়ানা অবগত হইয়া থাকুন তদনুসারে কার্য্য করিবেন। ইজাবেল বলিলেন, না, কোন সঙ্কেত কহে নাই, রাত্রি অন্ধকারাচ্ছন্ন হইলে যাইতে হইবেক। আমি তাহাকে কহিয়াছি কিয়ৎ ক্ষণ মাত্র সহবাস করিতে পারিব কেননা আমার সমভিব্যাহারে এক জন কিঙ্কর আসিয়া থাকে সে জানে আমি ভ্রাতার কার্য্যোপলক্ষে যাতায়াত করি। ভূপাল ইজাবেলের এবস্প্রকার প্রজ্ঞতা ব্যবহারে সাতিশয় সন্তুষ্ট হইয়া যথেষ্ট প্রশংসা করিতে লাগিলেন। অনন্তর ইজাবেল মেরিয়ানার প্রতি নেত্রপাত করিয়া তাঁহাকে সম্বোধন করত কহিলেন, ভগিনি যদিও এঞ্জিল তোমার পাণিগ্রাহ তথাপি পরকীয়া ভাবে অত্যল্প কথোপকথন করিবে এবং বিদায়াবসরে মৃদুস্বরে কহিবে এক্ষণে আমার সহোদরের বিষয় যেন স্মরণ থাকে।
অনন্তর নিশাগমে দিনমণির কিরণ বিরহে সমস্ত জগৎ অন্ধকারাবৃত হইলে ইজাবেল মেরিয়ানা সমভিব্যাহারে নির্দিষ্ট উদ্যান দ্বারের নিকট গমন করিলেন এবং দুরাচার প্রতিনিধির পরিণীতা বনিতাকে তাহার নিকট পাঠাইয়া দিয়া স্বীয় সতীত্বের অবিরোধে সোদরের জীবন রক্ষা হইল ভাবিয়া মনেই যৎপরোনাস্তি আনন্দিত হইলেন। কিন্তু বায়ানাধিরাজ ইজাবেলের সহোদরের জীবন তখনও নিরাপদ জ্ঞান করিলেন না। ঐ বিষয়ে তাঁহার সংশয় প্রবল হওয়াতে রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর সময়ে পুনর্বার কারাগারে গমন করি লেন। মহারাজ যদিস্যাৎ দীনবাৎসল্য প্রযুক্ত হঠাৎ তথায় গিয়া উপস্থিত না হইতেন তাহা হইলে সেই বিভাবরী ভাগেই অনাথ ক্লাদিওর শিরশ্ছেদ হইত। রাজা বন্দিশালায় প্রবেশ করিলে পর কারা রক্ষকের প্রতি রাজপ্রতিনিধির এই আদেশ আসিল ক্লাদিওর জীবন সংহার পূর্ব্বক ছিন্ন মস্তক কল্য প্রত্যুষে পাঠাইয়া দিবে। কারালয়ের অধ্যক্ষ প্রভুর আদেশক্রমে ক্লাদিওর শিরশ্ছেদনে উদ্যত হইলে নৃপতি তাহাকে নিবারণ করত কহিতে লাগিলেন কেন একটা মহাপ্রাণি হিংসা করিবে প্রতারণা অবলম্বন পূর্ব্বক রাজপ্রতিনিধির নির্দেশ পালন কর। অদ্য প্রাতঃকালে এক ব্যক্তি এই কারালয়ে নিধন প্রাপ্ত হইয়াছে তাহার মস্তক ছেদন পূর্ব্বক এঞ্জিলের সন্নিধানে পাঠাইয়া দাও। কারারক্ষক ছদ্মবেশধারি নৃপতিকে বাস্তবিক উদাসীন জ্ঞান করিয়াছিল যদিস্যাৎ উদাসীনের প্রস্তাবে সম্মত না হয় একারণ রাজা তাহার সম্মতি নিমিত্ত কৌশল করিয়া বায়ানাধিপের স্বাক্ষর ও মুদ্রাঙ্কিত এক লিপি প্রদর্শন করাইলেন। কারাধ্যক্ষ লিপি অবলােকন করিয়া সবিস্ময় চিত্তে বিবেচনা করিতে লাগিল বােধ হয় এই ব্যক্তি অনুপস্থিত স্বামির গুপ্তাদেশ প্রাপ্ত হইয়া থাকিবেক অতএব ক্লাদিওর প্রাণ রক্ষণে সম্মত হইল এবং মৃত বন্দির মুণ্ড ছেদন পূর্ব্বক এঞ্জিলের সমীপে পাঠাইয়া দিল।
তদনন্তর ভূপাল কারালয়ের এক প্রদেশে অবস্থিতি পূর্ব্বক গােপনে বাহক দ্বারা প্রতিনিধি এঞ্জিল সন্নিধানে এই আদেশ পত্র প্রেরণ করিলেন আমি অদ্য রাজধানী প্রত্যাগমন করিতাম দৈবী দুর্ঘটনা বশতঃ গমন স্থগিত হইল। কল্য পূর্ব্বাহ্ণে নগরীর অভ্যন্তরে গিয়া উপস্থিত হইব। পুরপ্রবেশাবসরে পথিমধ্যে সাক্ষাৎ করিয়া আমার রাজকীয় ক্ষমতা প্রত্যর্পণ করিও। অপর অন্য লিপিযযাগে প্রজাগণ মধ্যে এই ঘােষণা প্রদানের আজ্ঞা করিলেন রাজ্যমধ্যে কেহ যদি অবিচারের ক্ষোভ নিবারণ নিমিত্ত কোন প্রকার অভিযােগ করিতে বাসনা করে রাজার পুর প্রবেশ কালে পথিমধ্যে আবেদন পত্র অর্পণ করিলে তাহাতে মনােযােগ বিধান হইবেক।
ছদ্মবেশি বায়ানাধিরাজ একটা কৌশল করিবার আশয়ে ইজাবেলের নিকট তদীয় সহোদরের শিরশ্ছেদের কথা ব্যক্ত করিতে মনস্থ করিয়া কারালয়ে তাঁহার আগমন প্রতীক্ষা করিতেছিলেন ইত্যবসরে ভ্রাতৃবৎসলা যুবতী ব্যস্ত সমস্ত হইয়া তথায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং ব্যগ্রতা পূর্ব্বক উদাসীনের বেশধারি মহারাজকে জিজ্ঞাসা করিলেন আমার সহোদরের মুক্তির বিষয়ে রাজপ্রতিনিধির সকাশ হইতে কোন সমাচার আসিয়াছে কি না? রাজা বিষণ্ণতা প্রকাশ পুরঃসর প্রতিবচন প্রদান করিলেন। বৎসে এঞ্জিল তোমার ভ্রাতাকে একেবারে পৃথিবীমণ্ডল হইতে উদ্ধার করিয়াছে, কিয়ৎ ক্ষণ মাত্র গত হইল তাহার ছিন্ন মুণ্ড রাজপ্রতিনিধির সমীপে পাঠান গেল। ইজাবেল এতচ্ছ্রবণে অচেতন হইয়া চীৎকার করিতে লাগিলেন হাঃ দুর্ভাগ্য ক্লাদিও, হাঃ জগৎদ্বেষ্টা এঞ্জিল, হাঃ দুঃখিনী ইজাবেল। ছদ্মবেশী নৃপতি অবলার এইরূপ করুণাকর বিলাপ কালে বিবিধ প্রকার প্রবোধ প্রদান করিলেন এবং যুবতীর শোকাবেগ কিঞ্চিৎ শান্ত হইলে তাঁহাকে কহিলেন বৎসে বায়ানাধিপতি মহারাজ অবিলম্বে রাজধানী মধ্যে প্রত্যাগমন করিবেন তাঁহার নিকট রাজপ্রতিনিধি এঞ্জিলের নামে অভিযোগ করিও। যদিও এ বিষয়ে অমঙ্গল সম্ভাবনা হয় তথাপি ভীত হইও না, নির্ভয়ে তাহার আচরণের বিষয় ব্যক্ত করিও। উদাসীনের বেশধারী মহারাজ এইরূপে ইজাবেলকে উপদেশ দিয়া মেরিয়ানার সন্নিধানে গমন করিলেন এবং দুরাশয় এঞ্জিলের দমনার্থ তাহাকে যে কার্য্য করিতে হইবে তদ্বিষয়ে সৎ পরামর্শ দিলেন।
তদনন্তর মহারাজ উদাসীনের বেশ পরিত্যাগ পুরঃসর রাজপরিচ্ছদ গ্রহণ করিলেন এবং রাজ দর্শনে হৃষ্ট প্রজাজনে বেষ্টিত হইয়া রাজধানী প্রবেশ করিলেন। এঞ্জিল নৃপতির আগমন সংবাদ প্রাপ্ত হইয়া প্রত্যুদ্গমন পূর্ব্বক পথিমধ্যে সাক্ষাৎ করত রাজকীয় শক্তি প্রত্যর্পণ করিল। ইজাবেলও এই সময় বিচার প্রার্থিনীর ন্যায় উপস্থিত হইয়া উচ্চ স্বরে আবেদন করিতে লাগিলেন মহারাজ বিচারাজ্ঞা হউক আমি ক্লাদিও নামক এক ব্যক্তির ভগিনী, আমার ভ্রাতা অবিবাহিতা এক যুবতীর সহিত ব্যভিচার করণাপরাধে দোষী হওয়াতে রাজ প্রতিনিধি তাহার শিরশ্ছেদাজ্ঞা করে। মহারাজ আমি স্বীয় সহোদরের প্রতি রাজপ্রতিনিধির করুণা উৎপাদন নিমিত্ত যে প্রকার কাতরোক্তি বিনতি করিয়া ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং রাজপ্রতিনিধি যদ্রূপে তাহাতে উপেক্ষা করে সে সকল বিষয়ের পুনরুক্তি করা নিষ্পয়োজন, এতদ্বিষয়ের জন্য শেষে যে শোকাবহ ও ঘৃণ্য ঘটনা হয় তাহাই প্রকাশ করি অবধান হউক। মহারাজ বলিতে লজ্জা হইতেছে রাজপ্রতিনিধি এঞ্জিল আমার প্রার্থনায় কহিয়াছিল কি, যদিস্যাৎ আমি তাহার সহিত ব্যভিচার করিতে স্বীকৃতা হই, তাহা হইলে আমার ভ্রাতাকে মুক্ত করিবে। ধর্ম্মাবতার রাজ প্রতিনিধির এতদ্বাক্যে যদিও আমার অন্তঃকরণে সাতিশয় ঘৃণা জন্মিয়াছিল তথাপি ভ্রাতৃ বাৎসল্য প্রবল হওয়াতে বিবিধ বিতণ্ডার পর স্বীয় সতীত্ব ধর্ম বিসর্জ্জন পুরঃসর তদীয় কুৎসিতাভিলাষ সম্পাদনে সম্মত হইয়াছিলাম। কিন্তু দুরাত্মা এঞ্জিল এক প্রকার অঙ্গীকার করিয়া আপনার ঘৃণ্য কামনা পূর্ণ করিয়াছে অথচ এ দুঃখিনীর সোদরের প্রাণ দণ্ড বিধানে ক্ষান্ত হয় নাই অতএব আপনার প্রতিনিধি হইতে অন্যায়তঃ আমার সতীত্ব ও সহেদরের প্রাণ বিনাশ হইয়াছে বিচারা হউক। মহারাজ এতচ্ছ্রবণে ছল করত এবম্প্রকার ভাব ব্যক্ত করিলেন যেন অবলার বাক্যে তাঁহার বিশ্বাস হয় না। অতএব এঞ্জিল কহিতে লাগিল মহারাজ ব্যবস্থানুসারে এই স্ত্রীলোকের সহোদরের প্রাণ দণ্ড করা গিয়াছে এ অবলা ভ্রাতৃশোকে ব্যাকুলা ইহার বুদ্ধিভ্রংশ হইয়াছে সন্দেহ নাই এ সকল কেবল প্রলাপ বাক্য। তদনন্তর অন্য এক মহিলা অর্থাৎ মেরিয়ানা মহীপতি সন্নিধানে উপস্থিতা হইয়া নিবেদন করিতে লাগিলেন মহারাজ যথার্থ জ্ঞান সত্যের অভ্যন্তরে অবস্থিতি করে এবং সত্যতেই ধর্ম্ম বিরাজমান হয় আমি সত্য বাক্য কহিতেছি শ্রবণে অবধান হউক। আমি এই পুরুষের পরিণীতা বনিতা। ধর্ম্মাবতার ইজাবেল আমার স্বামির চরিত্রে দোষারোপ পূর্ব্বক যাহাই কহিলেন সকলি অলীক, কেননা ইনি যে নিশাভাগে এঞ্জিলের সহিত সহবাসের কথা কহিলেন সে রাত্রি উদ্যানালয়ে আমি স্বামির সহিত যাপন করিয়াছিলাম। হে নরনাথ আমি এ বিষয়ে শপথ করিতে পারি, যে সকল কথা কহিলাম যদি সত্য হয় যেন এ স্থান হইতে নির্বিঘ্নে উত্থান করিতে পারি আর যদি মিথ্যা হয় এখানেই যেন আমার শ্মশান ভূমি হয়। তৎপরে ইজাবেল স্বীয় কথার সত্যতা প্রমাণ নিমিত্ত উদাসীন লাদোইককে সাক্ষী মানিলেন। নৃপতি ছদ্মবেশাবস্থায় ঐ নাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। ইজাবেল এবং মেরিয়ানা উভয়েই উদাসীনের উপদেশানুসারে স্ব২ পক্ষে বাদ বিতণ্ডা করিতেছিলেন। ফলতঃ মহারাজের এই অভিসন্ধি ছিল যে তাহাদিগের বাক্য কৌশল দ্বারা ইজাবেলের সতীত্ব বায়ানা নগরবাসিদের সমক্ষে প্রমাণ হয়। কিন্তু এঞ্জিল কিছুই বুঝিতে পারিল না যে কামিনীদ্বয় কি কারণে এবম্বিধ বাগিতণ্ডা করিতেছে। রমণীদ্বয়ের উত্তির অনৈক্য দ্বারা তাহার মনে প্রত্যাশা হইল ইজাবেলের অপবাদ হইতে আপনাকে মুক্ত করিতে পারিব অতএব কিয়ৎ ক্ষণ পরে নির্দোষির ন্যায় ভাব প্রকাশ পুরঃসর বলিল আমি এই দুই প্রমদার কথোপকথনে এত ক্ষণ পর্যন্ত কেবল হাস্য করিতেছিলাম কিন্তু হে মহারাজ আর ধৈর্য্যাবলম্বন করিয়া থাকিতে পারি না, আমার বোধ হইতেছে এই দুই অবলা কেবল যন্ত্রমাত্র, কোন মহৎ ব্যক্তি যন্ত্রী হইয়া মন্ত্রণা প্রদান করত ইহাদিগকে এবার বাগ্বিতণ্ডায় নিযুক্ত করিয়া থাকিবেন। অতএব হে নরনাথ ঐ মন্ত্রণা কি? প্রকটন করিতে মানস করি, এতদ্বিষয়ের উপায়ান্বে ষণার্থ অনুমতি হউক। নৃপতি কহিলেন আমি সর্ব্বান্তঃকরণে আজ্ঞা দিলাম তুমি এ বিষয় অনুসন্ধান কর যাহার কুমন্ত্রণী প্রকাশ করিয়া দিবে তাহার প্রতি তোমার ইচ্ছানুসারে দণ্ড বিধান করিব। অনন্তর ইস্কেলস্কে বলিলেন হে সম্ভ্রান্ত পুরুষ তুমিও এঞ্জিলের সহিত একত্র হইয়া এ বিষয়ের তত্ত্বানুসন্ধান করিতে যত্ন কর। যে উদাসীন এই দুই অবলাকে রাজ প্রতিনিধির গ্লানি করণে প্রবৃত্ত করিয়াছে তাহাকে আনয়ন নিমিত্ত লোক পাঠান গিয়াছে, সে ব্যক্তি আসিয়া উপস্থিত হইলে তাহার দোষের বিষয়ে প্রমাণ লইয়া যে দণ্ড বিবেচনা সিদ্ধ হয় তাহাই বিধান করিও। আমি কিয়ৎ ক্ষণের নিমিত্ত স্থানান্তরে গমন করি। কিন্তু এঞ্জিল তোমাকে একটী কথা কহিয়া রাখি যাবৎ এই গ্লানিকর বিষয়ে কোন একটা স্থির না হয় তাবৎ তুমি এ স্থান হইতে অন্যত্র যাইতে পারিবে না। বায়ানাধিপতি এই জঘন্য ঘৃণ্য বিষয়ের বিচার নিষ্পত্তি নিমিত্ত এঞ্জিলকেই বিচারপতি ও মধ্যস্থ রূপে নিযুক্ত করিয়া পুনর্বার রাজধানী হইতে প্রস্থান করিলেন। কিন্তু ভূপাল কেবল রাজপরিচ্ছদ পরিত্যাগ পূর্ব্বক উদাসীনের বেশ ধারণ নিমিত্ত অন্তর্ধান হইলেন। রাজধানীর বাহিরে গিয়া এক নিভৃত স্থানে বেশ পরিবর্ত্তন পূর্ব্বক উদাসীন ভাবে পুনর্বার পুরী প্রবেশ পূর্ব্বক এঞ্জিল ও ইস্কেলসের সম্মুখে আসিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। ইস্কেলস্ অতি সুশীল ও প্রবীণ পুরুষ, রাজপ্রতিনিধি এঞ্জিল যে অপবাদ গ্রস্ত হন তাহা সর্ব্বতোভাবে অলীক বোধ করিয়াছিলেন, সেই উদাসীন পুরুষ সম্মুখীন হইবা মাত্র তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন তুমি কি এই দুই অবলাকে প্রভু এঞ্জিলের প্রতি কলঙ্কারোপ করিতে নিযুক্ত করিয়াছ? উদাসীন আত্ম গোপনচ্ছলে কহিলেন মহারাজ কোথায়? তাঁহার সমক্ষে কহিতে বাসনা করি। ইস্কেলস্ বলিলেন ভূপতি আমাদিগের দেহাভ্যন্তরে বর্ত্তমান আছেন আমরা তোমার বাক্য শুনিলেই রাজার শ্রুতি গোচর হইবেক। উদাসীন বলিলেন তবে অভয় দান কর নির্ভয়ে অবিকল বিবরণ নিবেদন করি। অনন্তর ইজাবেল যাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন তাহার প্রতি বিচার নিষ্পত্তির ভার হইলেও তাহার যে সমস্ত জঘন্য ব্যবহার বায়ানা নগরীমধ্যে অবলোকন করিয়াছিলেন মুক্তকণ্ঠে সমুদায় ব্যক্ত করিয়া কহিলেন। ইস্কেলস্ উদাসীন ব্যক্তির প্রমুখাৎ রাজপ্রতিনিধির গ্লানিকর বাক্য শ্রবণ করিয়া সাতিশয় বিরক্ত হইলেন এবং এ পুরুষ মহারাজের চরিত্রে দোষারোপ করিতেছে এই কথা বলিয়া ভয় প্রদর্শন করত তাহাকে কারালয়ে অবরোধ করিবার আদেশ দিলেন। পরন্তু রাজসভায় উপস্থিত সমস্ত ব্যক্তি তাঁহার কথা শুনিয়া সাতিশয় চমৎকৃত হইল এবং এঞ্জিলের মুখ ম্লান হইয়া গেল। অধিকন্তু সে বিস্ময় ও বিষাদে হতবুদ্ধি হইল কেননা উদাসীনের শরীর হইতে কল্পিত বেশ হঠাৎ পড়িয়া গেল সুতরাং উপস্থিত সকলে প্রকৃতাকৃতি অবলোকন করাতে রাজা বলিয়া সমুচিত ভক্তি প্রকাশ করিতে লাগিলেন।
এক্ষণে নৃপতি ইজাবেলকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন বৎসে নিকটে আইস, তোমার প্রমাণীকৃত সাক্ষী সেই উদাসীন পুরুষ সংপ্রতি রাজা হইলেন কিন্তু উদাসীনের পরিচ্ছদ পরিত্যাগ হইল বটে আমার অন্তঃকরণ পরিবর্ত্তন করি নাই তোমার উপকার সাধন নিমিত্ত সর্ব্বথা প্রস্তুত আছি। ইজাবেল বিনতি পুরসর বলিতে লাগিলেন প্রভো অপরাধ ক্ষমা করুন আমি অজ্ঞানতঃ আপনাকে বিস্তর ক্লেশ দিলাম। নৃপতি যুবতীর সতীত্বের পুনঃ পরীক্ষা নিমিত্ত তদীয় সহোদর ক্লাদিওর জীবন সংবাদ তখনও ব্যক্ত না করিয়া কহিলেন আমি তোমার ভ্রাতার প্রাণ দণ্ড নিষেধ করি নাই এতন্নিমিত্ত তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। এক্ষণে এঞ্জিল বুঝিতে পারিল মহারাজ গোপনে আমার কুকর্মের তাবদ্বৃত্তান্ত অবগত হইয়াছেন অতএব সে আত্ম মুখে স্বীয় দোষ স্বীকার পূর্ব্বক কহিল হে পরাক্রান্ত প্রভো আমি অতিশয় অপরাধী, মনে করিয়াছিলাম আমার কুব্যবহার প্রকাশ পাইবেক না কিন্তু এক্ষণে বুঝিলাম আপনার দেব তুল্য প্রভাব সমক্ষে কিছুই অপ্রকাশ নাই, অতএব হে দয়াময় মহারাজ আর দীর্ঘ কাল আমাকে লজ্জা দিবেন না। আমার অপরাধ সপ্রমাণ হইয়াছে আমি আত্ম মুখে স্বীকার করিতেছি করুণাবলোকন পুরঃসর অবিলম্বে প্রাণ দণ্ডাদেশ হউক। মহারাজ বলিলেন এঞ্জিল যথার্থ বটে তোমার দোষ স্পষ্টরূপে সপ্রমাণ হইল। ক্লাদিও যাদৃক্ দোষে দোষী তুমিও তদ্রূপ অপরাধে অপরাধী ত্বরায় বধ দণ্ড স্বীকারে প্রস্তুত হও। পরে তদীয় সীমন্তিনী মেরিয়ানাকে বলিলেন হে সুশীলে তোমার দুর্বিনীত পতির প্রাণ নাশ করিয়া তোমাকে তদীয় সকল সম্পত্তির অধিকারিণী করিব তুমি পরে দুরাত্ম এঞ্জিল অপেক্ষা সম্ভ্রমান্বিত স্বামী প্রাপ্ত হইতে পারিবে। মেরিয়ানা এতৎ শ্রবণে কাতরা হইয়া বিনয় পুরঃসর নিবেদন করিতে লাগিলেন প্রভো আমি এঞ্জিল ভিন্ন অন্য পতি প্রার্থনা করি না। তদনন্তর ইজাবেল যদ্রূপে ভ্রাতার নিমিত্ত বিবিধ বিনয় করিয়াছিলেন ঐ রমণী স্বামির জীবন রক্ষা নিমিত্ত তদ্রূপে জানুপরি উপবেশন পুরঃসর এই প্রকারে প্রার্থনা করিতে লাগিলেন হে সুশীল অধিরাজ, হে করুণানিধান, কৃপাকটাক্ষ নিক্ষেপ হউক। পরে সাতিশয় বিনয় সহকারে ইজাবেলকে বলিতে লাগিলেন ভগিনি তুমিও আমার নিমিত্ত মহারাজ সন্নিধানে প্রার্থনা কর। তুমি আমার প্রার্থনায় সাহায্য করিলে আমি যাবজ্জীবন তোমার দাস্যে নিযুক্ত থাকিব। নৃপতি বলিলেন মেরিয়ানা এ বিষয়ের জন্য ইজাবেলকে অনুরোধ করা অতিশয় অন্যায়। যদিও ইনি তোমার নিমিত্ত পাতিত জানু হইয়া প্রার্থনা করেন তথাপি ইহাঁর সহোদর স্নেহ আবির্ভূত হইয়া হঠাৎ ইহাকে অবশ করত এস্থান হইতে অন্যত্র লইয়া যাইবে। মেরিয়ান এ কথা শুনিয়া ব্যগ্রতা সহকারে বলিতে লাগিলেন হে সুশীল ইজাবেল আমার প্রতি অনুকম্পা প্রকাশ পূর্ব্বক এক বার কেবল অঞ্জলি বন্ধন কর তোমাকে কিছু কহিতে হইবেক না, যাহা বক্তব্য আমি বলিব। অয়ে ইজাবেল লোকে বলিয়া থাকে সদ্ব্যক্তিরা দোষ করণক সৃষ্ট হইয়াছে এবং তাহাদের শরীরে দোষ আছে বলিয়া তাহাদের হইতে অধিকাংশ ভাল হয়, আমার স্বামীও তদ্রূপ হইতে পারেন অতএব তুমি আমার অনুরোধে জানু পাতিয়া উপবেশন কর। মহারাজ বলিলেন মেরিয়ানা তোমার এ কেমন অনুরোধ? ইজাবেলের ভ্রাতা তোমার স্বামী হইতে নিধন প্রাপ্ত হইয়াছে তাহার প্রাণ রক্ষার্থ কি বিবেচনায় ইহাকে অনুরোধ করিতেছ? পরন্তু ইজাবেল যখন বিনীত ভাবে উপবেশন পূর্ব্বক করপুটে বলিতে লাগিলেন হে দয়াময় অধিরাজ আমার সহোদর যেন জীবিত আছে ঈদৃক্ বোধ করিয়া এই দোষি ব্যক্তির প্রতি করুণা করিতে আজ্ঞা হয়, কেননা যাবৎ পর্যন্ত আমি ইহার নয়নপথবর্ত্তিনী না হইয়াছিলাম তাবৎ এ ব্যক্তি ন্যায়ানুসারে কর্ম্ম করিয়াছিল। অতএব ইহার নিধন নিবারণে অনুমতি হউক। আমার সোদর কুক্রিয়া করিয়াছিল দণ্ড নীত্যনুসারে হত হইয়াছে উপায় কি? তখন মহারাজ মনে২ মহা আনন্দিত হইলেন যেহেতু ঈদৃশ করুণাকর ও গৌরবান্বিত প্রার্থনা স্বয়ং অভিলাষ করিতেছিলেন।
মহানুভব ইজাবেল এবম্প্রকারে আপনার বৈরির জীবন দান প্রার্থনা করিলে মহারাজ তাঁহার সমুচিত পুরস্কারার্থ তৎক্ষণাৎ কারাগার হইতে তদীয় সহোদর ক্লাদিওকে আনয়ন পুরঃসর তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত করিলেন এবং সুশীলা যুবতীকে কহিতে লাগিলেন ইজাবেল তোমার হস্ত প্রদান কর, তোমার নিমিত্ত ক্লাদিওকে ক্ষমা করিলাম, তুমি আমার হইবে স্বীকার কর, ক্লাদিও আমার ভ্রাতৃতুল্য হইল। এক্ষণে এঞ্জিল মনে২ আশ্বাস করিতে লাগিল বিপদ্ হইতে পরিত্রাণ পাইলাম। মহারাজও তাহার লোচনদ্বয় যৎকিঞ্চিৎ প্রফুল হইতে দেখিয়া প্রসন্নভাবে বলিলেন এঞ্জিল তুমি এই গুণবতী ভার্য্যার সহিত প্রণয় কর ইহার গুণেই মহা সঙ্কট হইতে নিস্তার পাইলে। পরে মেরিয়ানাকে সস্নেহ বচনে বলিলেন পতিদেবতে যাও স্বামি সহ স্বচ্ছন্দে কাল যাপন কর। পরিশেষে এঞ্জিলকে পুনবার বলিলেন সাবধান, অতঃপর কেবল মেরিয়ানাতে অনুরাগী হইও, আমি ইহাঁর কথোপকথন দ্বারা সচ্চরিত্রের বিশেষ প্রমাণ প্রাপ্ত হইয়াছি ঈদৃশী সুশীলা ধর্মিষ্ঠা পত্নীর বিমাননা পুনশ্চ কদাপি যেন না হয়। এঞ্জিল কিয়ৎকালমাত্র রাজকীয় শক্তি প্রাপ্ত হইয়াছিল কিন্তু তখন দয়া যে কি পদার্থ, হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে নাই এক্ষণে মহারাজের অনুকম্পায় জীবন রক্ষা হওয়াতে তাহার মর্ম্ম বুঝিতে পারিল।