সেক্সপিয়র কৃত গ্রন্থ হইতে উদ্ধৃত অপূর্ব্বোপাখ্যান

মানুষের করা অনুবাদ · অনুবাদ: Muktaram Vidyabagish (†1860) · উৎস: Wikisource · পাবলিক ডোমেইন

অনন্তর ইয়াকিমো ব্রিটনে যাত্রা করিয়া কিয়ৎ কাল মধ্যে তথায় উত্তীর্ণ হইল এবং কৌশল ক্রমে ইমোজেনের সহিত সাক্ষাৎ করিল। ইমোজেন তাহার সহিত আলাপে স্বামি মিত্র বলিয়া পরিচয় পাওয়াতে আদৌ যথেষ্ট সমাদর ও সৎকার করিলেন কিন্তু ইয়াকিমো যখন ক্রমে২ প্রণয়ানুবন্ধনের সূত্রপাত করিবার উপক্রম করিল তখন মহা ক্রোধে ঘৃণা পূর্ব্বক তাহাকে দূরীভূত করিয়া দিলেন। এক্ষণে ইয়াকিমোর বোধ হইল আপনার জঘন্য মানস সিদ্ধ হওয়া সুকঠিন।

অতএব সরলভাবে কামিনীর প্রণয় ভাজন হইতে অসমর্থ হইয়া প্রতারণা দ্বারা মনোভীষ্ট সিদ্ধ করিতে সচেষ্ট হইল। এক দিন যুবতীর সহচরীদিগকে কিঞ্চিৎ উৎকোচ দিয়া কহিল আমাকে এক রাত্রি কোন কৌশলে ইমোজেনের শয়নাগারে থাকিতে দাও। সঙ্গিনীগণ অর্থ গৃহ্ণু এপ্রযুক্ত টাকার লোভ সম্বরণ করিতে পারিল না, ধন লাভ লালসায় তাহাকে ম্ঞ্জুষা নিবদ্ধ করিয়া গোপনে রাজকন্যার শয়নাগারে রাখিয়া আসিল। ইয়াকিমো রাজনন্দিনীর নিদ্রাগম পর্য্যন্ত তদবস্থায় থাকিল। পরে নৃপকুমারী সুপ্ত হইলে পেটারা হইতে বাহির হইল এবং কুঠরীর সমুদায় দ্রব্য সামগ্রী বিশেষতঃ ইমোজেনের গণ্ডদেশ স্থিত একটা মাংসরুহ অর্থাৎ আঁচিল লিপ্যঙ্কিত করিয়া লইল। পরে ভূপালবালার হস্ত হইতে সেই কেয়ূরাভরণ গ্রহণ পূর্ব্বক পুনর্বার পেটিকা মধ্যে প্রবেশ করিল। এই রূপে প্রতারণা ও চৌর্য্য দ্বারা কৃতকার্য্য হইয়া পর দিবস হর্ষোৎফুল্ল লোচনে ব্রিটনে যাত্রা করিল এবং সেখানে উপস্থিত হইয়া পস্থিউমসকে কহিল তোমার বনিতা আমার সহিত প্রণয়ানুবন্ধন করিয়া অনুরাগের চিহ্ণ স্বরূপ কেয়ূর প্রদান করিয়াছেন, আমাকে এক রাত্রি স্বীয় শয়নাগার মধ্যে শয়ন করিতে দিয়াছিলেন। দুরাত্মা প্রত্যয়ার্থ ইহাও কহিল যে যুবতীর শয়ন মন্দির বিচিত্র কৌষেয় ও অদ্ভুত চিত্র পটে মণ্ডিত, তন্মধ্যে একটা চিত্র এই ভাবে লিখিত যেন গর্ব্বান্বিতা ক্লিওপেত্রী আন্তোনিওর সহিত সাক্ষাৎ করিতেছে, সেই পট অতি চমৎকার, তাহাতে বিশেষ শিল্প নৈপুণ্য প্রকাশ হইতেছে।

পস্থিউমস্ কহিলেন এ বিষয় সত্য বটে কিন্তু তুমি স্বচক্ষে নিরীক্ষণ কর নাই, লোক মুখে শুনিয়া থাকিবে।

ইয়াকিমো বলিল সেই গৃহের দক্ষিণ দিকে একটা ধূম নির্গম পথ আছে। অগ্নি স্থানের উপরে দিয়ানা দেবীর চমৎকার একটি প্রতিমূর্ত্তি রহিয়াছে স্বয়ং অবলোকন না করিলে ইহা কি রূপে জানিলাম?

পস্থিউমস উত্তর করিলেন এ বিষয়ের কথাও লোকপ্রমুখৎ শুনিয়া থাকিবে, অনেকে সর্ব্বদাই তাহার গল্প করিয়া থাকে।

পরে ইয়াকিমো গৃহের ছাদের বিবরণ করত কহিল আমি কুঠরীর চূড়ার উপরিস্থ দুইটী দণ্ডের বিষয় বর্ণনা করিতে বিস্মৃত হইতেছি, আহা তাহা অবলম্বন করিয়া মদনের অর্দ্ধনিমীলিত নয়ন একপদে দণ্ডায়মান দুইটী কি চমৎকার প্রতি মূর্ত্তি দেখিয়া আসিলাম। তদনন্তর কেয়ূর প্রদর্শন পূর্ব্বক কহিল তুমি এ আভরণ কখন দেখিয়াছিলে? সুন্দরী স্বীয় বাহু হইতে উন্মোচন করিয়া আমাকে প্রদান করিয়াছেন। এই অলঙ্কার যোগে আমি যেন সর্ব্বদাই তাঁহাকে দেখিতেছি তাঁহার এই সদ্ব্যবহারে আমার পরম পরিতোষ জন্মিয়াছে। তরুণী এই ভূষণ আমাকে প্রদান করত কহিয়াছেন এক সময়ে ইহা বহুমূল্য জ্ঞান করিতেন। পরিশেষে কহিল আমি তাঁহার গণ্ডদেশে একটা আঁচিল দেখিয়াছি।

পস্থিউমস এত ক্ষণ পর্য্যন্ত তাহার গল্প শুনিয়া মনে সন্দেহ করিতেছিলেন এক্ষণে জাতপ্রত্যয় হওয়াতে প্রেয়সীর প্রতি সাতিশয় অশ্রদ্ধান্বিত হইলেন এবং ক্রোধ সম্বরণে অসহিষ্ণু হইয়া মুক্তকণ্ঠে তাঁহাকে ভর্ৎসনা করিতে লাগিলেন। শেষে প্রতিজ্ঞানুসারে পণের রত্নাঙ্গুরী ইয়াকিমোর হস্তে সমর্পণ করিলেন।

অনন্তর আপনার পরম বন্ধ এবং ভ্রষ্টাচার বনিতার সহচর পিসানিও নামক এক ব্যক্তির নামে এক লিপি লিখিয়া ব্রিটন দেশে পাঠাইয়া দিলেন। সেই পত্রে মিত্রকে এই অনুরােধ করিলেন আমার পত্নী ইমেজেন বিশ্বাস ঘাতকতা ব্যবহার করিয়াছে, তাহার জীবন অস্মৎ পক্ষে ঘৃণা ও লজ্জা জনক অতএব কৌশলক্রমে তাহাকে ওএলস দেশীয় সমুদ্র সন্নিহিত মিলফোর্দ স্থানে নীত করত প্রাণে বিনষ্ট করিবেন। অপর প্রতারণা পূর্ব্বক ইমােজেনকেও এই বলিয়া পত্র লিখিলেন প্রিয়ে তােমার অদর্শনে আমার জীবন সংশয়াপন্ন হইয়াছে আমি তােমার চন্দ্রানন অবলােকনার্থ ব্রিটনে যাইতে পারি না পদার্পণ করিবামাত্র প্রাণদণ্ড হইবে, যদি মিলফোর্দ স্থানে আসিয়া দর্শন দাও তাহা হইলে প্রাণ রক্ষা পায়। ইমােজেন অতি সরলা বিশেষতঃ পতিভক্তি পরায়ণা, পত্রী প্রাপ্ত মাত্রে পিসানিও সমভিব্যাহারে স্বামি সহ সাক্ষাৎ করণার্থ গমন করিলেন।

পিসানিও যদিও পস্থিউমসের অকৃত্রিম মিত্র এবং অতিশয় বিশ্বাস ভূমি তথাপি তাঁহার ঐ ভয়ঙ্করাদেশ পালনে সম্মত হইলেন না, ইমােজেনের সহিত যাত্রা করিয়া মিলফোর্দে আগমনানন্তর তাঁহাকে তদীয় স্বামির নিষ্ঠুর অনুমতির বিষয় জ্ঞাপন করিলেন।

যুবতী প্রিয়তম সহ সাক্ষাৎকার নিমিত্ত হৃষ্ট মনে আগমন করিয়াছিলেন এক্ষণে দর্শন দানের পরিবর্ত্তে প্রাণ বিনাশের অনুমতি দিবার কথা শ্রবণে মর্ম্মান্তিক বেদনা প্রাপ্তা হইলেন এবং নানা প্রকারে শােক সন্তাপ প্রকাশ করিতে লাগিলেন।

পিসানিও বিবিধ প্রবােধ বাক্যে শান্ত্বনা করিয়া কহিলেন সুন্দরি কিয়ৎ কাল ধৈর্য্যাবলম্বন পূর্ব্বক সহিষ্ণতা করিয়া থাক, তােমার পতি এই অন্যায় অনুমতি নিমিত্ত অনতি বিলম্বে অনুতাপিত হইবেন। অনন্তর ইমােজেন খেদ করত কহিলেন আর পিত্রালয়ে গমন করিতে আমার ইচ্ছা নাই। তাহাতে পিসানিও এই পরামর্শ দিলেন তবে পুরুষের পরিচ্ছদ পরিধান পুরঃসর দেশ পর্য্যটন করিয়া বেড়াও। তরুণী তাহাতে সম্মত হইলেন এবং বেশান্তর গ্রহণ পূর্ব্বক রোমে গিয়া স্বামির সহিত সাক্ষাৎ করিবার মনস্থ করিলেন। পস্থিউমস্ যদিও যুবতীর প্রতি সাতিশয় নির্দয় ব্যবহার করিয়াছিলেন তথাপি আপনার অন্তর হইতে তাঁহাকে অন্তর করেন নাই অনুক্ষণ অনুধ্যান করিতেন।

পিসানিও ইমোজেনকে নূতন পরিচ্ছদ আনিয়া দিয়া স্বয়ং রাজ সদনে প্রত্যাগমনার্থ বিদায় লইলেন এবং যাত্রা করিবার অগ্রে একটা ক্ষুদ্র পাত্রস্থ একপ্রকার ঔষধ তাঁহার হস্তে প্রদান পূর্ব্বক কহিলেন এই ঔষধে সকল রোগের শান্তি হয় রাজ্ঞী আমাকে দিয়াছিলেন।

রাজমহিষী পিসানিওকে ইমোজেন এবং পস্থিউমসের সুহৃৎ জানিয়া বিষবোধে ঐ দ্রব্য তাহার হস্তে প্রদান করিয়াছিল। রাণী রাজবাটীস্থ বৈদ্যের নিকট এই ছলে বিষ প্রার্থনা করে যে কালকূটের কেমন প্রভাব একটা পশুকে পান করাইয়া দেখিব। রাজভিষক্ রাজ্ঞীর ক্রূর প্রকৃতি অবগত ছিলেন, প্রকৃত বিষ পাইয়া যদি স্বভাব দোষে কোন মনুষ্যের প্রাণ হিংসা করে এই বিবেচনায় তাহাকে গরল প্রদান না করিয়া এক প্রকার ঔষধ দিয়াছিলেন লোকে তাহা উপযোগ করিলে তৎক্ষণে মৃতবৎ অচৈতন্য হইয়া ঘোর নিদ্রায় অভিভূত হয় কিন্তু জীবনের কোন বিপদ ঘটে না বরং উত্তম রূপে ধাতু পুষ্ট হয়। পিসানিও এ সকল বৃত্তান্ত কিছুই জানিতেন না রাণী যেমন কহিয়া দিয়াছিল সেইরূপ বলিয়া ইমোজেনের হস্তে প্রদান পূর্ব্বক বলিলেন পথিমধ্যে যখন শ্রান্তি বোধ হইবে এই অগদ সেবন করিও। পরে আশীর্ব্বচন প্রয়োেগ পুরঃসর রক্ষণার্থ প্রার্থনা করিয়া প্রস্থান করিলেন।

ইমোজেন দেশ পর্য্যটনে যাত্রা করিয়া ভ্রমণ করিতে করিতে দৈবযোগে এক নির্জন প্রদেশে গিয়া উপনীত হই লেন। সেই স্থানে তাঁহার দুই সহোদর শৈশব সময়ে অপহৃত হইয়া বসতি করিতেছিলেন। সিম্বেলিনের রাজ সভায় অতি উচ্চপদস্থ বেলারিয়স নামা এক জন সম্ভ্রান্ত মনুষ্য ছিলেন, লোকে রাজবিদ্রোহী বলিয়া তাঁহার প্রতি অপবাদারোপ করাতে রাজা নির্বাসন দণ্ড বিধান করেন। অতএব সেই পুরুষ বিনা অপরাধে নির্বাসিত হওয়াতে জাতক্রোধ হইয়া বৈরশুদ্ধির মানসে কুমার দ্বয়কে অপহরণ পূর্ব্বক ঐ গুপ্ত স্থানে আনয়ন করিয়াছিলেন তথায় এক গহ্বর খনন পূর্ব্বক তাঁহাদের সহিত একত্র অবস্থিতি করিতেন। তিনি ভূপতির অত্যাচারের প্রতিক্রিয়ার্থ নৃপতনয় দিগকে হরণ করিয়া আনিয়াছিলেন বটে কিন্তু তাঁহাদের উপরে কোন বিদ্বেষিত প্রকাশ করেন নাই বরং স্নেহ ভাবে পুত্রবৎ লালন পালন পূর্ব্বক বিবিধ বিদ্য। শিক্ষা দিয়াছিলেন। সেই দুই কুমার ক্রমে বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়া শৌর্য্য বীর্য্যে ভূষিত ও নানা বিদ্যায় অলঙ্কৃত হন, মৃগয়া তাঁহাদের এক প্রকার জীবিকা হইয়াছিল। সর্ব্বদা বল বিক্রম প্রকাশ পূর্ব্বক আপনাদের সৌভাগ্য সঞ্চয় নিমিত্ত পালক পিতার নিকট অনুমতি প্রার্থনা করিতেন।

ইমোজেন যে গহ্বর সন্নিধানে গিয়া দণ্ডায়মান হন তাহার অভ্যন্তরে ঐ দুই সহোদর বাস করিতেন। তরুণী মিলফোর্দ স্থানের নিকট দিয়া রোমে গমনের মানস করিয়াছিলেন বিশেষ বর্ত্ম জ্ঞান না থাকাতে দিগ্‌ভ্রম হইয়াছিল তাহাতে একটা অরণ্যানীর পথে চলিতে আরম্ভ করেন। প্রান্তর মধ্যে ভক্ষ্য পেয় কোথায় পাইবেন, ক্ষুধা তৃষ্ণায় অত্যন্ত ক্লান্ত হইয়া মৃতকল্প হন। ফলতঃ একে সুকোমলা অবলা তাহাতে পানাশন নাই, পুরুষের পরিচ্ছদ ধারণ করিয়াছেন বলিয়া কি পথশ্রান্তি ও বুভুক্ষা পিপাসার ক্লেশ সহ্য করিতে পারিবেন? সে যাহা হউক, অধ্ব মধ্যে গহ্বর দেখিয়া এক্ষণে তাঁহার আশা হইল ঐ স্থানে অবশ্য মনুষ্যের বসতি আছে ভিক্ষা করিয়া কিঞ্চিৎ ভক্ষ্য লাভ করিতে পারিব। গুহামধ্যে প্রবেশ করিয়া দেখেন ভিতরে জন মানব নাই কিন্তু ইতস্ততঃ অন্বেষণ করাতে এক প্রদেশে কিঞ্চিৎ খাদ্য দেখিতে পাইলেন। ক্ষুধায় নিতান্ত অধীরা হওয়াতে কাহার অনুমতির অপেক্ষা করিতে পারিলেন না, স্বহস্তে গ্রহণ পুরঃসর আহার করিতে বসিলেন। তৎকালে দুঃখবেগে তাহার বদন হইতে এই খেদ প্রকাশক বাক্য বিনির্গত হইল, হায়, পুরুষের জীবন কি ক্লেশ জনক, পুম্বেশ ধারণে কএক দিনের মধ্যে কত কষ্ট পাইলাম, ক্রমাগত দুই রাত্রি ভূমি মাত্র আমার শয্যা হইয়াছে। আমার যথেষ্ট সহিষ্ণুতা তাহাতেই এখনও অক্ষিণ্ণ আছি নচেৎ গুরুতর পীড়ায় অবসন্ন হইতাম। পিসানিও পর্বত শিখরে আরোহণ পূর্ব্বক তথাহইতে যখন আমাকে মিলফোর্দ প্রদেশ দেখাইয়াছিলেন তখন অতি নিকট বোধ হইয়াছিল, এ কি এত পথ আসিলাম এখনও তাহার সীমায় উপস্থিত হইতে পারিলাম না? তদনন্তর স্বামির নিষ্ঠুর অনুমতির কথা স্মরণ হইল তাহাতে বিশেষ পরিতাপ প্রকাশ পূর্ব্বক কহিলেন হা প্রিয়তম মিথ্যা প্রণয় স্থাপন করিয়াছিলে।

তরুণী এইরূপে একাকিনী আপনা আপনি খেদ বিষাদ করিতেছেন ইত্যবসরে তদীয় দুই সহোদর বেলারিয়সের সহিত মৃগয়া করিয়া গৃহে প্রত্যাগমন করিলেন। রাজকুমরেরা সেই ব্যক্তিকে পিতা বলিয়া সম্বোধন করিতেন, তিনিও স্নেহ প্রকাশ পূর্ব্বক তাহাদিগকে পলিদোর এবং কাদ্বাল বলিয়া আহ্বান করিতেন। কিন্তু কুমার দয়ের প্রকৃত নাম গাইদেরিয়স্ এবং আর্ব্বিরাগস্।

বেলারিয়স আদৌ গহ্বর মধ্যে প্রবেশ করিলেন কিঞ্চিদভ্যন্তরে প্রবিষ্ট হইয়াই অপরূপ এক তরুণকে অবলোকন করাতে চমৎকৃত হইলেন এবং দেবযোনি জ্ঞানে সভয় হইয়া চীৎকার পূর্ব্বক বালক দ্বয়কে সহসা ভিতরে আসিতে বারণ করত কহিলেন ওহে তোমরা কিঞ্চিৎ বিলম্ব কর হঠাৎ এখানে আসিও না, কে এক জন আমাদের খাদ্য দ্রব্য ভোজন করিতেছে, আমি যদি ইহাকে অভ্যবহার করিতে দেখিতাম নিঃসন্দেহ পরীজাত বলিতে পারিতাম।

যুবারা এই কথা শুনিয়া বিস্ময় প্রকাশ পূর্ব্বক কহিলেন সত্য না কি মহাশয়? বেলারিয়স্ উত্তর দিলেন জুপিতর দেবের দিব্য, সত্য কহিতেছি, আমার বোধ হইতেছে ইনি কোন দেবতা অথবা পৃথিবীর মধ্যে অনুপম রূপবান। ফলতঃ পুরুষের পরিচ্ছদ পরিধান করাতে ইমোজেনের অনির্বচনীয় সৌন্দর্য্য হইয়াছিল।

যুবতী মনুষ্যের বাক্য শ্রবণ করিয়া তৎক্ষণাৎ বাহিরে আসিলেন এবং সাতিশয় বিনয় প্রদর্শন পূর্ব্বক কহিতে লাগিলেন হে মহাশয় গণ আমার প্রতি করুণা প্রকাশ করুন, বিনা আদেশে গহ্বরের অভ্যন্তরে প্রবেশ নিমিত্ত আমার হিংসা করিবেন না। আমি অনুমান করিয়াছিলাম আপনারা ভিতরে আছেন কিঞ্চিৎ খাদ্য সামগ্রী যাচ্‌ঞা অথবা মূল্যদ্বারা ক্রয় করিয়া লইব। আমি গর্ত্ত মধ্যে গিয়াছিলাম বটে কোন দ্রব্য অপহরণ করি নাই, এ গুহা যদিস্যাৎ স্বর্ণে পরিপূর্ণ থাকিত তাহা হইলেও কিঞ্চিন্মাত্র গ্রহণ করিতাম না। আত্যন্তিক ক্ষুধা হইয়াছিল কিঞ্চিৎ ভক্ষ্য ভোজন করিয়াছি তাহার মূল্য গ্রহণ করুন। যদিস্যাৎ আপনারা আসিয়া উপস্থিত না হইতেন আমি আহারান্তে এই সকল খাদ্য সামগ্রীর অধিকারি মহাশয়দিগের আশীর্ব্বাদ করত প্রকৃত মূল্য এখানে রাখিয়া যাইতাম। এই বলিয়া মূল্য দিতে উদ্যত হইলেন কিন্তু তাঁহারা কোন ক্রমে গ্রহণ করিলেন না। ইহাতে তরুণী অবলা স্বভাব প্রযুক্ত সন্ত্রাস যুক্তা হইয়া কহিলেন আপনারা কি আমার উপরে ক্রোধান্বিত হইলেন? হে মহোদয় গণ যদি রোষ বশতঃ আমার প্রাণ বিনাশ করেন তাহা হইলে নিশ্চয় জানিব বিনা অপরাধে আমাকে মরিতে হইল।

বেলারিয়স জিজ্ঞাসা করিলেন তুমি কোথায় গমন করিবে? তোমার নাম কি?

ইমোজেন বিনম্র ভাবে প্রতিবচন প্রদান করিলেন মহাশয় আমার নাম ফাইদিলি, এক জন কুটুম্ব ইতালি গমন করিতেছেন মিলফোর্দের বন্দরে পোত রহিয়াছে ত্বরায় আরোহণ করিবেন তাঁহার নিকট যাইতেছিলাম পথিমধ্যে আহারীয় দ্রব্যাভাবে ক্ষুধায় অত্যন্ত কাতর হইয়া এস্থানে আগমন করি, তাহাতে এই অপরাধ ঘটিল।

বেলারিয়স কহিলেন ওহে যুবক ভয় পাইতেছ কেন এবং মূল্যই বা বাহির করিলে কেন? তুমি কি আমার দিগকে নীচ প্রকৃতি জ্ঞান করিলে? আমাদের বাস স্থান ক্ষুদ্র দেখিয়া অন্তঃকরণকে লঘুতর বোধ করিও না। তুমি সৌভাগ্য ক্রমে এস্থানে উপস্থিত হইয়াছ উত্তম রূপে রক্ষিত হইবে। যাহা হউক সায়ং কাল নিকটবর্ত্তী হইল অদ্য কোথায় যাইবে? এস্থানে অবস্থিতি কর, উত্তমোত্তম ভক্ষ্য প্রদান করিব। পরে আপনার বালক দ্বয়কে সম্বোধন করিয়া বলিলেন হে বৎস এই তরুণের যথোচিত অভ্যর্থনা কর।

দুই সহোদর আদেশক্রমে আতিথ্য করিয়া স্বাভাবিক স্নেহোদয়ে ভ্রাতৃ সম্বোধন পূর্ব্বক ইমোজেনকে কহিলেন তুমি নির্ভয়ে অবস্থিতি কর আমরা ভ্রাতার তুল্য তোমাকে ভাল বাসিব। ইমোজেন স্নিগ্ধ বচনে আশ্বস্ত হইলেন এবং তাঁহাদের সমভিব্যাহারে পুনর্বার গহ্বর মধ্যে প্রবেশ করিলেন। মৃগ মাংস অবলোকনে তরুণীর স্বয়ং রন্ধন করিতে বাসনা হইল। তাঁহাদের সম্মতি ক্রমে পাকে প্রবৃত্তা হইয়া এবম্প্রকার সুস্বাদ করিয়া রান্ধিলেন যে আহার করিয়া সকলের অনির্ব্বচনীয় তৃপ্তি জন্মিল। ইদানীন্তন সময়েরই সম্ভ্রান্ত লোকের কন্যারা পাক ক্রিয়ায় অনভিজ্ঞা, প্রাচীন কালে সকল পরিবারের অবলারাই রন্ধন করিতে জানিতেন, বিশেষতঃ ইমোজেন এই শিল্প বিদ্যায় সুনিপুণ ছিলেন। সে যাহা হউক। দুই সোদর পরস্পর কহিতে লাগিলেন কি উত্তম ব্যঞ্জন প্রস্তুত হইয়াছে, মনোদেবী পীড়িত হইলে ফাইদিলি যেমন বন্য ফলমূলে তাহার নিমিত্ত পথ্য প্রস্তুত করেন সকল সামগ্রীতে তদ্রূপ সুস্বাদ অনুভব হইল। অনন্তর তরুণীর সঙ্গীত শ্রবণে যৎপরোনাস্তি পরিতোষ প্রকাশ পূর্ব্বক কহিলেন আহা দেবদূতের কণ্ঠ স্বরের ন্যায় কি সুমধুর গীত?

কিয়ৎ ক্ষণ পরে দুই সহোদরে সেই সুলোচনার লোচন লপন বিশেষ মনোযোগের সহিত অবলোকন করিয়া পুনর্বার পরস্পর কহিতে লাগিলেন হে ভ্রাতঃ এই নবীন যুবা সুধাস্রাবি হাস্য করিতেছেন বটে কিন্তু ইহাঁর আস্যে কোন একটা আন্তরিক অসুখের চিহ্ণ প্রকাশ পাইতেছে বোধ হয় ইহাঁর অন্তঃকরণ শোক ও ঔদাস্যে পরিপূর্ণ আছে।

ইমোজেন এই রূপে স্বীয় নিরুপম গুণে অথবা স্বভাবতঃ প্রবৃত্ত সনাভি স্নেহে তাঁহাদিগের অতিশয় প্রীতি ভাজন হইলেন। যুবতী তাঁহাদের প্রতি আপন সহোদর স্নেহের আবির্ভাব দেখিয়া মনে২ বিবেচনা করিলেন যদিস্যাৎ চিত্তমধ্যে পস্থিউমসের চিন্তাকে স্থানদান না করিতাম এই অরণ্যে অবস্থান পূর্ব্বক এই যুবক দ্বয়ের সহিত পরম সুখে কাল যাপন করিতে পারিতাম, প্রণয় করিয়া প্রাণাপদে পড়িতে হইত না। যাহা হউক, মিলফোর্দে গমন নিমিত্ত যাবৎ যথেষ্ট সামর্থ্য না হয় তাবৎ এই স্থানে অবস্থান পূর্ব্বক ইহাঁদের সহিত আলাপে চিত্ত বিনোদন করি।

তাঁহারা মৃগয়া দ্বারা যে মাংস আনয়ন করিয়াছিলেন তাহা ভোজনে নিরবশেষ হইল অতএব পুনর্বার হরিণ ধারণার্থ অরণ্য প্রবেশের উদ্‌যোগ করিলেন। ইমোজেন ফাইদিলি নামে পরিচয় দেওয়াতে ঐ সংজ্ঞায় তাঁহাকে সম্বোধন পূর্ব্বক কহিলেন চল মৃগবধার্থ গমন করি। কিন্তু তিনি শারীরিক অসুস্থতার উল্লেখ করত সমভিব্যাহারে গমনে অনিচ্ছা প্রকাশ করিলেন। বস্তুতঃ স্বামির নির্দয় ব্যবহারের ভাবনা এবং পথ শ্রান্তি হেতু তরুণী যৎপরো নাস্তি খিন্না ছিলেন কোন মতে মনোমধ্যে স্বাস্থ্য লাভ করিতে পারেন নাই।

অতএব বেলারিয়স সেই দুই বালক সমভিব্যাহারে মৃগয়ার্থ বহির্গত হইলে ইমোজেন গহ্বর মধ্যে একাকিনী থাকিলেন। তাঁহারা তিন জনে যাইতে২ কেবল ঐ তরুণীর সুশীলতা ও সদ্‌গুণের বিষয়ে কথোপকথন করত প্রশংসা করিতে লাগিলেন।

ইমোজেন একাকিনী হইয়া আপনার দুর্ভাগ্যের বিষয় ভাবিতে আরম্ভ করিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ চিন্তা করিতে২ হঠাৎ পিসানিওর দত্ত ঔষধ মনে পড়িল অতএব তাহা পান করিয়া গভীর নিদ্রায় অভিভূত হইলেন।

কিয়দ্ঘটিকানন্তর বেলারিয়স্ এবং সেই দুই সহোদর মৃগয়া হইতে প্রত্যাগমন করিলেন। পলিদোর প্রথমতঃ গহ্বরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন ফাইদিলি স্বাপাবেশে রহিয়াছেন। পদ শব্দে পাছে তাঁহার নিদ্রাভঙ্গ হয় এই বিবেচনা করিয়া পলিদোর পাদুকা উন্মোচন করিলেন। ফলতঃ অরণ্য স্থিত রাজনন্দন দুয়ের মনে অতিশয় স্নেহ জন্মিয়াছিল এবং দুই জনেই তাহা প্রকাশ করিতে কোন প্রকারে ত্রুটি করেন নাই। সে যাহা হউক, পলিদোর কতক ক্ষণ পরে নিকটবর্ত্তী হইয়া আকৃতি নিরীক্ষণ পূর্ব্বক বিবেচনা করিতে লাগিলেন শব্দদ্বারা নিদ্রাভঙ্গ হইবেক না, ইনি মহা নিদ্রা প্রাপ্ত হইয়াছেন। পরে তিনি সাতিশয় শোক প্রকাশ পুরঃসর বিলাপ করিতে লাগিলেন তাহাতে এমত বোধ হইল শৈশবাবধি যেন একত্র ছিলেন নিষ্ঠুর কাল সেই সময় বিচ্ছেদ ঘটাইল।

বেলারিয়স্ পলিদোরকে শান্ত্বনা করত কহিলেন হে বৎস আর বিষাদ করিলে কি হইবে? এখন রীত্যনুসারে সঙ্গীত পূর্ব্বক ইহার সৎকার সমাধা কর।

এক্ষণে দুই সহোদর ইমোজেনের দেহ খট্টায় আরোপণ পুর্ব্বক প্রান্তরে ছায়াবিশিষ্ট এক স্থানে লইয়া গেলেন। তথায় তৃণের উপরি ধীরে২ শয়ন করাইয়া সন্নিকটে উপবেশন পূর্ব্বক শোক সুচক সঙ্গীত করিতে লাগিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ বিলম্বে পলিদোর বিবিধ পত্র পুষ্প চয়ন পুরঃসর ইমোজেনের গাত্রে অর্পণ পূর্ব্বক কহিলেন হে ফাইদিলি গ্রীষ্মঋতু পর্যন্ত এখানে অবস্থিতি করিয়া প্রত্যহ তোমার শরীরে এইরূপে কুসুমাবকিরণ করিব। প্রফুল্ল কমল তোমার আস্য সদৃশ, অপরাজিতা লতা ত্বদীয় কোমল গাত্রের পরিচ্ছন্ন শিরার ন্যায়, অপর মল্লিকা পুষ্প ভবদধর তুল্য সুগন্ধি ও সুখাবহ, এই সকল কুসুম তোমার গাত্রে নিরন্তর বিকীর্ণ করিব। শীতকালে যখন কোন নব প্রসূন প্রাপ্ত না হইব তখন শৈবাল দ্বারা মনোহর কলেবর আচ্ছাদন করিয়া দিব।

অনন্তর সৎকার সমাপন পূর্ব্বক দুই সহোদরে বিষন্ন বদনে বাসস্থলী প্রত্যাগমন করিলেন।

ইমোজেন প্রান্তরে একাকিনী পড়িয়া রহিলেন। কিয়ৎ ক্ষণ পরে ঔষধের তেজঃ শান্ত হইল। যুবতী ক্রমে চৈতন্য প্রাপ্ত হইয়া গাত্রের উপরিস্থ কুসুবরণ অপসরণ পূর্ব্বক উঠিয়া বসিলেন। তাঁহার বোধ হইল অদ্ভুত স্বপ্ন সন্দর্শন করিতেছিলেন, কহিতে লাগিলেন এ কি? এক গহ্বরে সুশীল লোকদিগের সূপকার ছিলাম এখানে কি প্রকারে আসিলাম? আমার গাত্রে পুষ্পবকিরণ কোথা হইতে হইল? অনন্তর উত্থান পূর্ব্বক সে স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন কিন্তু সেই গহ্বরের কোন্ পথ নির্ণয় করিতে পারিলেন না। অনেক ক্ষণ ইতস্তত ভ্রমণ করিয়া কহিলেন গহ্বরে যে ব্যাপার হয় তাহাও বুঝি স্বপ্নাবস্থার কর্ম্ম। পরে ইতালি গমন মানসে মিলফোর্দ বন্দরে পোতারোহণ নিমিত্ত অশেষ ক্লেশানুভব করিতে২ সেই দিকে চলিলেন। তখন পুরুষ বেশে স্বামির সহিত সাক্ষাৎ করিবার চিন্তা তদীয় চিত্তে পুনর্বার প্রবল হইয়া উঠিল।

এই সময়ে ব্রিটনাধিপতির সহিত রোমীয় সম্রাট্ সিজরের এক সমর উপস্থিত হইয়াছিল, তাহাতে রোম দেশীয় সেনাগণ ব্রিটন জয় করিবার নিমিত্ত যাত্রা করিয়া পথ ঘটিত সেই বনে আগত হইল যেখানে ইমোজেন যূথভ্রষ্টা হরিণীর ন্যায় ব্যাকুল হইয়া ভ্রমণ করিতেছিলেন। রোমীয় অনীকিনী সমভিব্যাহারে পস্থিউমস্‌ও আসিয়াছিলেন। কিন্তু ইমোজেন এ সকল ঘটনার কিছুই জানিতেন না।

পস্থিউমস্ যদিও মহারাজের সৈন্য মধ্যে গণ্য হইয়া ব্রিটনে আগমন করিলেন তথাপি ঐ দেশ তাঁহার জন্মভূমি, এ প্রযুক্ত তত্রস্থ লোকদিগের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করিতে তাঁহার উৎসাহ হইল না, অতএব সিম্বেলিনের সপক্ষতা অবলম্বন পূর্ব্বক স্বদেশীয় যোদ্ধৃবর্গের সহিত মিলিত হইবার মানস করিলেন।

তিনি খলের প্রতারণায় বঞ্চিত হইয়া প্রিয়তমা ইমোজেনের প্রতি বিশ্বাস ঘাতিতার যে সন্দেহ করেন যদিও তৎকাল পর্য্যন্ত তাহার অপনোদন হয় নাই তথাপি আপনার অনুমতি ক্রমে পিসানিও দ্বারা প্রেয়সীর প্রাণ সংহার হইয়াছে এ সংবাদ প্রাপ্তি অবধি মনোমধ্যে সাতিশয় দুঃখিত ছিলেন, অতএব এই বিবেচনা করিয়া রোমীয় সৈন্য সমভিব্যাহারে আগমন করেন আর মনস্তাপ সহিষ্ণুতা করিতে পারি না, যুদ্ধযাত্রা করি সমর করিয়া রণশায়ী হইতে পারিব, যদিস্যাৎ আমার অদৃষ্টে তাহাও না ঘটে সিম্বেলিন রাজা আমাকে নির্বাসিতাবস্থায় স্বদেশে প্রত্যাগত দেখিলে প্রাণ বিনষ্ট করিবেন তাহাতে প্রিয়তমার চির বিচ্ছেদ জন্য মনঃপীড়া হইতে পরিত্রাণ পাইব।

রোমীয় অনীর্কিনীগণ বর্ত্মমধ্যে পুরুষবেশধারিণী ইমোজেনকে অবলোকন করিয়া সেনাপতি সন্নিধানে লইয়া গেল। সৈন্যাধ্যক্ষ লুসিয়স তাঁহার আকৃতি প্রকৃতি এবং সভ্য ভব্যতা দর্শনে সন্তুষ্ট হইলেন এবং তাঁহাকে আপনার ভৃত্যতায় নিযুক্ত করিলেন।

এ দিকে ব্রিটনাধিপতির সেনাগণ শত্রু দলের প্রতিকূলে যাত্রা করত অগ্রসর হইয়া আসিল। যোদ্ধারা বিপক্ষের উদ্দেশে অরণ্য মধ্যে প্রবেশ করিলে রাজার অপহৃত দুই পুত্র পলিদোর এবং কাদ্বাল স্বাভাবিক সমরোৎসাহিত প্রযুক্ত যুদ্ধের কথা শুনিয়া বৈরি বিজয়ার্থ তাহাদের সহিত মিলিত হইলেন কিন্তু পিতার সেনার সহিত একত্র হইয়া পৈতৃক রাজ্য রক্ষার্থ যে যুদ্ধ করিবেন এ বিষয় কিছুই তাঁহাদের বিদিত হইল না। বেলারিয়স্ যৌবনাবস্থায় এক জন মহা শূর ছিলেন যদিও বয়োবাহুল্য প্রযুক্ত শক্তি হ্রাস হইয়াছিল তথাপি রাজার সেনাগণকে বৈরি বিনাশ নিমিত্ত যাত্রা করিতে দেখিয়া মনে করিলেন ভূপতির তনয়দ্বয় অপহরণ করিয়া অবধি মনস্তাপে সন্তাপিত আছি। এক্ষণে নরপালের কিঞ্চিদুপকার করি অতএব তিনিও ঐ সৈন্যব্যুহ সহিত মিলিত হইয়া রণযাত্রা করিলেন।

অনন্তর দুই পক্ষের সেনাগণ পরস্পর সম্মুখীন হওযাতে তুমুল সংগ্রাম আরম্ভ হইল তাহাতে ব্রিটনাধিপের যোদ্ধৃবর্গকে পরাভব স্বীকার পূর্ব্বক পলায়ন পরায়ণ এবং রাজাকে নিহত হইতে হইত কেবল পস্থিউমস্ বেলারিয়স্ এবং রাজকুমার দ্বয়ের অসাধারণ শৌর্য্য বীর্য্য প্রভাবে হইতে পারিল না। উক্ত চারি জন রণ কৌশল প্রকাশ পুরঃসর নরপালের প্রাণ রক্ষা করিলেন। রোমানেরা জয়ী হইবেক কি, তাহাদের বিক্রমে পরাজয় মানিয়া আপনারাই যুদ্ধে ভঙ্গ দিল।

পস্থিউমস্ আপন জীবন বিনাশ মানসেই অকুতোভয়ে রণ করিলেন, সমরাবসানে যখন দেখিলেন যুদ্ধে মৃত্যু হইল না তখন ব্রিটনাধিপ সিম্বেলিনের এক জন সেনাপতির নিকট আত্ম পরিচয় প্রদান পূর্ব্বক কহিলেন আমি নির্বাসিত হইয়া ছিলাম রাজাজ্ঞা লঙ্ঘন পূর্ব্বক স্বদেশে প্রত্যাগমন করিয়াছি অতএব বধ দণ্ডার্হ। নৃপতিকে বলিয়া আমার প্রাণ দণ্ড কর।

ইতিপূর্ব্বে ইমোজেন স্বীয় প্রভুর সহিত বন্দীরূপে ধৃত হইয়া ব্রিটনাধিরাজের নিকট আনীত হন্, তাঁহার প্রাচীন বৈরী রোমীয় সেনানী ইয়াকিমোও ঐ সমভিব্যাহারে ধৃত হইয়াছিল। সেই সকল ব্যক্তিরা রাজ সম্মুখে দণ্ডায়মান আছে ইত্যবসরে সেনাপতি প্রাণ দণ্ড বিধান নিমিত্ত পস্থিউমসকে তথায় আনয়ন করিলেন। এই সময়ে বেলরিয়স পলিদোর এবং কাদ্বাল নামক দুই বালক সহিত সংগ্রাম জয়ের পুরস্কার জন্য মহা সমাদরে সেই স্থানে আনীত হইলেন, পিসানিও রাজার অনুচর সুতরাং ভূপতি সমীপে বর্ত্তমান ছিলেন।

অতএব পস্থিউমস্, ইমোজেন, রোমীয় সেনাপতি, পিসানিও, ইয়াকিমো এবং সিম্বেলিন রাজার চির প্রনষ্ট দুই সন্তান, তথা বেলবিয়স্ ইহাঁরা প্রত্যেকে স্ব২ অন্তঃকরণ মধ্যে এক ভাবনায় পূর্ণ হইয়া রাজ সমক্ষে দণ্ডায়মান হইলেন।

রোমীয় সেনানী প্রথমতঃ ভূপতির সমক্ষে আত্মাভিপ্রায় প্রকাশ করিবার উপক্রম করিলেন। যদিও সকলেই মনে২ তদর্থ উৎসুক হইতেছিলেন তথাপি তাঁহাকে দেখিয়া নীরব হইলেন।

পস্থিউমসের পরিচ্ছদ যদিও জঘন্য ছিল তথাপি ইমোজেন অবলোকন মাত্রে তাঁহাকে চিনিতে পারিলেন কিন্তু তাঁহা কর্ত্তৃক স্বয়ং অভিজ্ঞাত হইলেন না। তরুণী ইয়াকিমোকেও চিনিলেন এবং তাহার হস্তে আপনার অঙ্গুরী দেখিতে পাইলেন। এই ব্যক্তিই তাঁহার এই সমস্ত দুর্গতির নিদান। যাহা হউক, যুবতী কাহাকেও কিছু না কহিয়া পিতৃ সম্মুখে বন্দীস্বরূপে দণ্ডায়মানা রহিলেন।

রাজানুচর পিসানিও আপনি রাজনন্দিনীকে পুরুষের বেশ পরিধান করাইয়াছিলেন অতএব দেখিবামাত্র নৃপকুমারীকে চিনিতে পারিলেন এবং মনে২ এই বাক্য কহিলেন ইনিই আমার ঠাকুরাণী বটেন, ইহাঁকে জীবিত দেখিলাম এই পরম লাভ, অদৃষ্ট বশতঃ ইহাঁর অবস্থা ভাল মন্দ যাহা হউক আমার মনের উদ্বেগ দূর হইল। বেলারিয়সও তরুণীকে নিরীক্ষণ করিয়া পূর্ব পরিচিত জ্ঞান করত অনুদাত্ত স্বরে কাদ্বালকে জিজ্ঞাসা করিলেন বৎস এই না সেই বালক? পুনর্ব্বার জীবিত হইয়াছিল না কি? কাদ্বাল উত্তর দিলেন মহাশয় একটা বালুকা কণা হইতে অন্য শৈকত কণিকার বরং ভিন্নতা বোধ করিতে পারা যায়, ফাইদিলি হইতে এই তরুণের কিঞ্চিন্মাত্র বৈলক্ষণ অনুভব হয় না। পলিদোর কহিলেন মহাশয় মৃত ফাইদিলি বাঁচিয়া উঠিয়াছে দেখিতেছেন কি? বেলারিয়স্ অনুচ্চ স্বরে বলিলেন নীরব হও, সে নয়, ফাইদিলি হইলে অবশ্য আমারদিগের নিকট আত্ম পরিচয় দিত। পলিদোর কহিলেন তাহাও তো বটে, আমরা যে তাহাকে গতাসু দেখিয়াছিলাম। বেলারিয়স বলিলেন চুপ্ কর, এখন আর তর্ক বিতর্কে কাজ নাই।

পস্থিউমস্ ধৈর্য্যাবিলম্বন পূর্ব্বক দণ্ডায়মান হইয়া আপনার প্রাণ দণ্ডাজ্ঞার প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। যুদ্ধে রাজার জীবন রক্ষা করিয়াছেন প্রকাশ করিলেন না, বেবেচনা করিলেন তাহা ব্যক্ত করিলে নরনাথ ক্ষমা করিবেন।

রোমীয় যে সেনানী ইমোজেনকে আশ্রয় প্রদান পুরঃসর ভৃত্যস্বরূপে নিকটে রাখিয়াছিলেন আদৌ তিনিই নৃপসমীপে কথা কহিতে আরম্ভ করেন। আপনি সাহসিক এবং মহা সম্ভ্রান্ত এ প্রযুক্ত অকুতোভয়ে বক্ষ্যমাণ বচন প্রয়োগ করিতে লাগিলেন।

মহারাজ, আমি শুনিয়াছি আপনি অর্থ লইয়া বন্দিদিগকে মুক্তি দেন না, সকলেরই প্রাণ দণ্ড করিয়া থাকেন। আমি এক জন রোমীয় বন্দী, অবশ্যই বধদণ্ডে দণ্ডিত হইব। আপনি রোমীয় সাহসের সহিত তাহা সহ্য করিতে প্রস্তুত আছি। পরে ইমোজেনকে অগ্রে করিয়া বলিলেন কিন্তু হে নরনাথ আমার নিবেদন এই, এ বালকটী ব্রিটন দেশীয়, ইহাকে মার্জ্জনা করুন্। এ আমার ভৃত্য, অতি সুশীল, কার্য্য দক্ষ এবং প্রভুভক্ত, বোধ করি এতাদৃশ কর্ম্মকর কেহ কখন প্রাপ্ত হন নাই। হে রাজন্ এ ব্যক্তি এক জন রোমানের সেবামাত্র করিয়াছে, আপনার রাজ্য ব্রিটন দেশের পক্ষে কোন বিপক্ষতাচরণ করে নাই, অতএব ইহার জীবন রক্ষা করিতে আজ্ঞা হয়।

ব্রিটনাধিপতি অতিশয় মনোযোগের সহিত ইমোজেনকে নিরীক্ষণ করিতেছিলেন ছদ্মবেশ প্রযুক্ত নিশ্চয় চিনিতে পারিলেন না বটে কিন্তু মনোমধ্যে যেন অপত্যস্নেহের আবির্ভাব হইল অতএব রোমীয় সেনানীর কথাবসানে বলিলেন আমারও বোধ হইতেছে এই বালকটীকে যেন কখন দেখিয়াছি ইহার মুখ যেন আমার সুপরিচিত, এ বিষয়ে সন্দেহ মাত্র হইতেছে না, অধিকন্তু ইহার জীবন দান করিতে আমার অন্তঃকরণ অত্যন্ত ব্যগ্র হইতেছে। যাহা হউক, ইহার প্রাণ দণ্ডে ক্ষান্ত হইলাম। অনন্তর সেই বালককে সম্বোধন পুরঃসর বলিলেন অরে আমি তোর জীবন দান করিলাম, তোর যদি কিছু প্রার্থয়িতব্য থাকে বল্ তাহাও প্রদান করি, যদিস্যাৎ বন্দিরদের প্রধান ব্যক্তির জীবন প্রার্থনা করিস্ তাহাও স্বীকার করিব।

ইমোজেন বিনীত ভাবে নিবেদন করিলেন মহারাজ আমার প্রতি যে অনুগ্রহ হইল তদর্থ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পূর্ব্বক আপনাকে কোটি প্রণাম করি।

হে দয়াময়, যে ব্যক্তির প্রতি স্বামিপাদের প্রসন্নতা হয় সে যাহা প্রার্থনা করে তাহাকে তৎপ্রদানে অঙ্গীকার করিলেই তাহার প্রতি বর হয়। আপনি আমার প্রতি প্রার্থয়িতব্য প্রার্থনার আদেশ করাতে বুঝিতেছি বর প্রদান করিবেন। বালক বক্ত্তৃতা করণে প্রবৃত্ত হইলে পর সকলেই একাগ্র চিত্তে শুশ্রূষু হইয়া রহিল দেখি এ কি প্রার্থনা করে। তাহার প্রভু রোমীয় সেনানী তদীয় বচনারম্ভে কহিলেন হে প্রিয় বালক, আমার জীবনে আবশ্যক নাই। বোধ করি তুমি আমারই প্রাণ দান চাহিবে। ইমোজেন বিনয় প্রদ র্শন পুরঃসর তাঁহাকে নিবেদন করিলেন মহাশয় আমার কিঞ্চিদ্‌গুরুতর বিষয় প্রার্থনীয় আছে, এ কারণ আপনকার জীবন রক্ষা প্রার্থনা করিতে পারি না।

রোমীয় সেনানী বালককে ভৃত্য মধ্যে নিযুক্ত করিয়া অবধি নিরন্তর তদীয় প্রভুভক্তির প্রমাণ প্রাপ্ত হইতেছিলেন অধুনা ঈদৃশী অকৃতজ্ঞতার কথা শ্রবণে চমৎকৃত হইয়া রহিলেন।

অনন্তর ইমোজেন ইয়াকিমোর প্রতি নেত্রপাত করিয়া নৃপতিকে নিবেদন করিলেন মহারাজ আমার প্রার্থনা এই, ঐ ব্যক্তি এই ধর্ম্মাধিকরণ মধ্যে ধর্ম্মাবতার সমক্ষে অকপটে ব্যক্ত করুক্ উহার অঙ্গুলীস্থ অঙ্গুরীটী কোথায় পাইয়াছে।

ব্রিটনাধিপতি কহিলেন তোমার এ প্রার্থনা এখনই সিদ্ধ করিয়া দিতেছি। পরে ইয়াকিমোকে ভয় প্রদর্শন পূর্ব্বক আজ্ঞা দিলেন অরে এ অঙ্গুরী কোথা পাইয়াছিস্ যথার্থ বর্ণন কর্, যদি সত্য না বলিস্ তোর বিপদ্ ঘটিবে।

ইয়াকিমো রাজার কোপ দেখিয়া ভীত হইল এবং পস্থিউমসের সহিত যে রূপ পণ হয় ও যে প্রকার প্রতারণা করিয়া অঙ্গুরী গ্রহণ করে সমুদায় বিষয় অবিকল বর্ণন করিয়া আপনার খলতা আপনি স্বীকার করিল।

পস্থিউমস্ অদূরে উপস্থিত থাকিয়া স্বকর্ণে স্বীয় পত্নীর নির্দোষতার বিবরণ যখন শ্রবণ করিলেন তখন তাঁহার অন্তঃকরণ যে কি প্রকার হইল তাহা বর্ণন করা যায় না। তৎক্ষণাৎ নৃপতির সম্মুখীন হইয়া মুক্তকণ্ঠে ব্যক্ত করিলেন আমি নির্দয়তার সহিত সেই নির্দোষ যোষার প্রাণ সংহারার্থ প্রিয় মিত্র পিসানিওকে আদেশ করিয়াছিলাম। পরে শোকাবেগ সম্বরণে অসহিষ্ণু হইয়া এই বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিলেন হা ইমোজেন, হা হৃদয়েশ্বরি, হা প্রিয়ে, আমি অতি নৃশংস।

পতিব্রতা ইমোজেন স্বচক্ষে স্বামির এতাদৃশ কাতর্য্য নিরীক্ষণ করিয়া আর আত্ম গোপন পূর্ব্বক থাকিতে পারিলেন না, অবিলম্বে ছদ্মবেশ পরিহার পুরঃসর প্রকৃত আকারে প্রকাশ পাইলেন। পস্থিউমস্ যে সরল অবলার প্রতি নৃশংসতাচার করিয়া পাপ ভারে খিন্ন হইতেছিলেন সমক্ষে সেই প্রেয়সীর অচিন্তনীয় দর্শন লাভে বাক্‌পথাতীত বিস্ময় ও আনন্দে আন্দোলিত হইতে লাগিলেন।

ব্রিটনাধিরাজ সিম্বেলিন আত্মা তনয়ার পুনঃ প্রাপ্তি ও তদীয় চরিত্রের বিবরণ শ্রবণে আহ্লাদ সাগরে মগ্ন হইলেন এবং সাতিশয় স্নেহ ও পরম সমাদর সহকারে তাঁকে গ্রহণ করিলেন। পস্থিউমস্ রাজপ্রাসাদে কেবল প্রাণে রক্ষিত হইলেন এমত নহে জামাতৃ স্বরূপে পরিগৃহীত হইয়া অভিনন্দিত হইতে লাগিলেন।

ভূপতির এই আহ্লাদের সময় বেলারিয়স্ আত্ম পরিচয় প্রদান পূর্ব্বক আপনার দোষ স্বীকার করিতে মানস করিলেন। অতএব নৃপতির সম্মুখে পলিদোর এবং কাদ্বাল নামক দুই কুমারকে নীত করিয়া নিবেদন করিলেন মহারাজ এই দুই নৃপনন্দন গাইদেরিয়স এবং আর্ব্বিরাগস, আমাকর্ত্তৃক শৈশবকালে অপহৃত হয়েন।

রাজা এই আনন্দের সময় তনয় লাভ হওয়াতে অপরিসীম সন্তোষ প্রাপ্ত হইলেন। বেলারিয়স পূর্ব্বে অপরাধ করিয়া দণ্ডার্হ হইয়া ছিলেন বটে কিন্তু তখন সে কথাকে উল্লেখ করিবে? মন্ত্রী কেবল ক্ষমাপ্রাপ্ত হইলেন না, বিশেষ সমাদরে গৃহীত হইলেন। ভূপতি পলায়িত দুহিতা পুনঃ প্রাপ্ত হইলেন, সন্তান দ্বয় শৈশব সময়ে হৃত হইয়া বহু কালান্তে আসিল, এবং তাঁহাদের অসামান্য শৌর্য্য বীর্য্যে সমর বিজয় ও আপনার জীবন রক্ষা হইল অতএব এতাদৃশ হর্ষের সময় ঐ বিষয়ের আনুকুল্যকারির পূর্ব্বাপরাধ মার্জ্জনা এবং সম্মান হইবার অসম্ভাবনা কি?

ইমোজেন এক্ষণে অবকাশ পাইয়া আপনার প্রতিপালক রোমীয় সেনাপতির প্রত্যুপকার করিতে ব্যর্থ হইলেন। জনক সন্নিধানে আপনার প্রতি সেনানীর স্নেহ ও আনুকূল্যের বিষয় বর্ণন পুরঃসর তাঁহার প্রাণ রক্ষা করিতে অনুরোধ করিলেন। তাহাতে সেই সেনাধ্যক্ষের বন্দিভাব হইতে মুক্তি হইল। পরে তাঁহার মধ্যস্থতা দ্বারা সন্ধি প্রসঙ্গ হওয়াতে ব্রিটন ও রোম রাজ্যের চিরবিরোধের রোধ হইল।

রাজা সিম্বেলিনের দুষ্টা মহিষী স্বীয় মনোভীষ্ট সিদ্ধি নিমিত্ত যে সমস্ত ষড়্‌যন্ত্র করিয়াছিল কোন অংশে কিঞ্চিন্মাত্র সফল হইল না বরঞ্চ পর হিংসার প্রতিফল অবিলম্বে ফলিল। তাহার নির্বোধ তনয় কোন একটা সামান্য বিবাদে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল এবং তজ্জন্য মনোবেদনায় সে আপনিও অচিরে প্রাণ ত্যাগ করিল। ব্রিটনাধিপতির পরম সুখাবহ চরম সময়ের উপন্যাস বর্ণনা কালে সে সকলের উল্লেখে প্রয়োজন নাই এস্থলে এতাবন্মাত্র কহিলেই পর্য্যাপ্ত হইবে যে নির্ম্মল স্বভাব লোকে উপযুক্ত সময়ে কদাপি সুখে বঞ্চিত হয় না, আর খল প্রকৃতির উচিত প্রতিফল অবশ্যই হয়। ইয়াকিমো যদিও শঠতা করিয়া দৈবোপহত হয় নাই তথাপি অবিলম্বে আপনার আত্ম প্রকৃতির পরিচয় দিতে বাধিত হইয়া রাজসভা হইতে তাড়িত হইল ইতি।

ম্যাক্‌বেথ্‌

ম্যাকবেথের উপাখ্যান।

স্কত্‌লন্দ দেশে দন্‌কেন নামক নরপতির অধিকার কালে ম্যাকবেথ নামা এক জন সম্ভ্রান্ত মনুষ্য বাস করিতেন। নৃপতির সহিত নৈকট্য সম্বন্ধ এবং শৌর্য্য বীর্য্যের খ্যাতি থাকাতে রাজসভায় তাঁহার যথেষ্ট সম্মান ছিল। অপর নরওএ দেশের সংগ্রামে রণ পাণ্ডিত্য প্রকাশ পুরঃসর বিপক্ষ পক্ষের পরাভব করাতে মহা যশস্বী হন।

নরওএর সমর সমাপ্ত হইলে ম্যাক্‌বেথ বেন্‌কো নামক স্কত্‌লন্দীয় সেনানী সমভিব্যাহারে একটা প্রান্তর উত্তীর্ণ হইয়া স্বদেশে প্রত্যাগমন করিতেছিলেন ইত্যবসরে তিনটা স্ত্রী মূর্ত্তি সম্মুখে উপস্থিত হইয়া তাঁহাদের বর্ত্মাবরোধ করিল। উক্ত আকৃতি ত্রয়ের অস্নিগ্ধ বর্ণ এবং অসভ্য পরিচ্ছদে বোধ হইল তাহারা অবনীমণ্ডলের কোন প্রকার জীব নহে। ম্যাক্‌বেথ সম্ভাষণ নিমিত্ত প্রথমতঃ তাহাদিগকে সম্বোধন করিলেন তাহাতে তাহারা বৈরক্তি ভাব ব্যক্ত করত প্রত্যেকে স্ব২ ওষ্ঠে সচ্ছিদ্র অঙ্গুলী অর্পণ পূর্ব্বক সঙ্কেতে মৌনাবলম্বন করিতে কহিল। পরে অগ্রবর্ত্তিনী স্ত্রীপ্রকৃতি ম্যাক্‌বেথকে গ্লামিস দেশাধিপ বলিয়া অভ্যর্থনা করত অভিবাদন করিল। সেনাপতি ম্যাক্‌বেথ এই সম্বোধনে ঐ অদ্ভুত স্ত্রীজাতির নিকট আপনি কি প্রকারে পরিচিত হইলেন ভাবিয়া বিস্ময় প্রকাশ করিতে লাগিলেন, বিশেষতঃ দ্বিতীয় আকৃতি যখন তাঁহাকে কাদরাধীশ বলিয়া এবং তৃতীয়া মূর্ত্তি ভাবি মহারাজ শব্দ প্রয়োগ পূর্ব্বক সম্ভাষণ করিল তখন তাঁহার বিস্ময়ের পরিসীমা রহিল না, ফলতঃ রাজা সপুত্রে বর্ত্তমান থাকাতে সিংহাসনাধিরোহণের সর্ব্বথা অসম্ভাবনা ছিল। তদনন্তর উক্ত মূর্তিত্রয় একবাক্যে বেনকোর প্রতি ভঙ্গিক্রমে কহিতে লাগিল আপনি ম্যাক্‌বেথাপেক্ষা ক্ষুদ্র ও প্রধান দুই প্রকার হইতে পারেন, তদপেক্ষা সুখী নহেন বটে কিন্তু অধিক সৌভাগ্যান্বিত বোধ করিলেও করিতে পারিবেন। এতদুক্তির তাৎপর্য্য এই যে তিনি স্বয়ং রাজা হইবেন না বটে কিন্তু তাঁহার সন্তানেরা তদবসানে স্কতলন্দের সিংহাসনারোহণ করিবেন। এতাবন্মাত্র উক্তি করিয়া তাহারা তাঁহাদের সমক্ষেই অন্তর্ধান হইল। অতএব সেনাপতিরা নিশ্চয় করিলেন ইহারা দেবযোনি ডাকিনী, কোন সন্দেহ নাই।

সেনাপতি দ্বয় এই অদ্ভুত ঘটনায় বিস্ময়ান্বিত হইয়া সেই স্থানে দণ্ডায়মান হওত চিন্তা করিতেছেন ইতিমধ্যে কতিপয় রাজ দূত তথায় আসিয়া সংবাদ দিল সম্রাট ম্যাক্‌বেথের প্রতি কাদর দেশের আধিপত্য প্রদান করিয়াছেন। তাঁহাকে কাদরাধিপতি বলিয়া সম্ভাষা করিতে আমাদিগকে প্রেরণ করিলেন। এই ব্যাপারে ডাকিনী ত্রয়ের ভবিষ্যদ্বাণীর প্রত্যক্ষ ফল দৃষ্ট হওয়াতে ম্যাকবেথের বিস্ময়ের পরিচ্ছেদ রহিল না। তিনি কিয়ৎ ক্ষণ বিমুগ্ধ প্রায় হওয়াতে দূতদিগকে প্রতি বচন প্রদানে অক্ষম হইলেন। মনোমধ্যে এই আশা প্রবলা হইয়া উঠিল তবে তৃতীয় ডাকিনীর ভবিষ্যদ্বাণীও সফলা হইতে পারে, কোন্ দিন বা স্কতলন্দ দেশের সম্রাট হইয়া পড়ি।

অনন্তর বেনকোকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন মিত্র দেবযোনিরা যাহা২ কহিয়া গেল তাহার একটা যে এখনই পূর্ণ হইল অতএব তোমার পুত্রগণ রাজা হইবে এ আশা তোমার অন্তঃকরণে স্থান লাভ না করে কেন? বেনকো উত্তর করিলেন তুমি সিংহাসনের প্রতি লক্ষ্য করিয়া থাক ইহাতে ঐ প্রকার আশয়ে তোমার মন উৎসাহান্বিত হইতে পারে, আমার তাদৃশ বিষয়ে বিশ্বাস হয় না। সখে আমার বোধ হয় ঐ কুহকিনীরা কোন গুরুতর বিষয়ে আমাদিগকে বঞ্চনা করিবার নিমিত্ত দুই একটা সামান্য বিষয়ে সত্য বাক্য কহিয়া গেল।

কিন্তু ম্যাকবেথের মনে ডাকিনীদের প্রদত্ত আশা বদ্ধমূল হইল। সুবিজ্ঞ বেনকো ঐ দুরাশা পরিত্যাগ করাইবার নিমিত্ত তাঁহাকে বিস্তর প্রবোধ ও সৎপরামর্শ দিলেন কিন্তু তিনি কিছুই শুনিলেন না, কি রূপে স্কতলন্দ দেশের রাজসিংহাসনে অভিষিক্ত হইবেন অহর্নিশ তদুপায় চিন্তায় নিমগ্ন রহিলেন।

পরে গৃহে প্রত্যাগমন করিয়া বনিতার নিকট ডাকিনীদের ভবিষ্যদ্বাণীর বিষয় ব্যক্ত করিলেন এবং সহাস্য বদনে সংবাদ দিলেন প্রিয়ে এই দৈব বাক্যের কিয়দংশ ইতিমধ্যে পূর্ণ হইয়াছে। তাঁহার মহিলা দঃশীলা এবং ধনলুব্ধা, স্বামির উচ্চ পদাভিষিক্ত হইবার কথা শ্রবণাবধি তদর্থ যে কোন উপায় সম্ভাব্য চিন্তা করিতে প্রবৃত্তা হইল। অতএব ম্যাকবেথ যখন সম্রাটের প্রাণনাশের বিষয় ভাবিয়া তর্ক বিতর্ক করিতে লাগিল তৎকালে ঐ নিষ্ঠুর অঙ্গনা নানাপ্রকারে পতির প্রবৃত্তি জন্মাইয়া দিয়া কহিল প্রশংসনীয় ভবিষ্যদ্বাণীর পূরণার্থ মহারাজের জীবন বিনষ্ট করা নিতান্ত আবশ্যক।

সম্রাট স্বীয় নম্রতা ও কৃপালু স্বভাব প্রযুক্ত সর্ব্বদা সম্ভ্রান্ত সভাসদ্গণের সহিত সাক্ষাৎ করিতেন। অতএব সেনানী ম্যাক্‌বেথ সমর বিজয়ানন্তর প্রত্যাগমন করিলে তাহার অভ্যর্থনা নিমিত্ত মাল্‌কম ও দোনালবেন নামক দুই রাজকুমার এবং বহু সংখ্যক মান্য লোক সমভিব্যাহারে তদীয় আলয়ে গমন করিলেন।

ম্যাকবেথের নিকেতন অতি সুরম্য স্থানে স্থাপিত ছিল। অট্টালিকার চতুর্দিকের প্রান্তভাগে যে২ স্থল উৎকৃষ্ট, তথায় চাতক বিহঙ্গ সকল নীড় নির্মাণ পূর্ব্বক অবস্থিতি করিত। যেখানে পক্ষি সকল উৎপন্ন হয় এবং সতত গমনাগমন করে সেখানকার সমীরণ অতি নির্ম্মল ও সুখস্পর্শ হইয়া থাকে। অতএব সেনানীর ভবন অতি নির্বৃতিকর ছিল। মহারাজ স্বগণ সমভিব্যাহারে সেই সদনে প্রবেশ করিলে সেনাপতির মহিলা অবলোকন করিয়া তাঁহার যথার্থ অভ্যর্থনা করিল। সম্রাট স্বীয় সদাশয়তা প্রযুক্ত ঐ দুর্ললিতা ললনার দুরাশয়ের বিষয় বিতর্ক করিলেন না, মৌখিক মধুর বচনেই যথেষ্ট সন্তুষ্ট হইলেন। ফলতঃ তাহার মানস তর্ক করা সুকঠিন ব্যাপার ছিল, সে সহাস্য আস্যে আপন বিশ্বাস ঘাতকতার মানস গোপন করিতে পারিত সুতরাং অন্তঃকরণে বিষধরের তুল্য খলতা দেদীপ্যমান থাকিলেও দৃশ্যে নির্দোষ কুসুমের ন্যায় স্বচ্ছাশয়তা প্রকাশ করিত।

অনন্তর নিশা সমাগত হইলে সমাট অধ্বশ্রান্ততা হেতু অনতিবিলম্বে শয়নার্থ শয্যারোহণ করিলেন। রাজনিয়মানুসারে দুই জন ভৃত্য তাঁহার রক্ষণাবেক্ষণ নিমিত্ত শয়নাগারের এক পার্শ্বে শয়ান রহিল। মহারাজ সেনানীর আতিথ্যে যথেষ্ট সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন, নিদ্রার্থ গমন করিবার পূর্ব্বে তাহার পুরস্কার নিমিত্ত বহুমূল্য বসন ভূষণ প্রসাদ দান করিয়া অন্যান্য সম্ভ্রান্ত জনগণকে যথোচিত পারিতোষিক প্রদান করিয়াছিলেন। অপর সেনাপতির বনিতাকে বহুমূল্যের একখান চমৎকার হীরক প্রদান পূর্ব্বক তদীয় সচ্চরিত্র ও আতিথেয়তার বিশেষ প্রশংসা করেন।

নৃপতি পর্য্যঙ্কোপরি শয়নানন্তর নিদ্রিত হইলে যখন রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর হইল, যে সময় জগতের জীবজন্তু নিদ্রাগমে অচেতন হইয়া মৃত প্রায় হয়, সুপ্ত মানবগণের মনে অধম স্বপের আবির্ভাব হইতে থাকে, এবং ব্যাঘ্র ও হিংস্র ব্যতীত অন্য প্রাণী গৃহ হইতে নির্গত হয় না, সেই কালে ম্যাকবেথের গৃহিণী নিদ্রা পরিহার পূর্ব্বক গাত্রোত্থান করিল এবং কি রূপে ভূপতির প্রাণ বধ করিবে উপায় চিন্তা করিতে লাগিল। স্ত্রীজাতির পক্ষে ঈদৃশ ভয়ঙ্কর ঘৃণা জনক জঘন্য কর্ম্ম অসম্ভাবনা বটে কিন্তু সে আপনার পতির সদয় স্বভাব বিবেচনা করত মনে করিল এতাদৃশ ভয়ানক ব্যাপারে প্রবৃত্ত হইতে স্বামির উৎসাহ হইবে না, তিনি অতিশয় লোভী বটেন কিন্তু অত্যন্ত সন্দিগ্ধচিত্ত, নরপতির প্রাণ বিনাশ পূর্ব্বক সাম্রাজ্য গ্রহণ মহা সাহসের কর্ম্ম, তাঁহা হইতে এ কার্য্য সমাধা হওয়া সুকঠিন অতএব আমাকেই এ বিষয়ে প্রবৃত্ত হইতে হইল। সেনানীর নির্দয়া দয়িতা ঐ বিষয়ে পতিকেই প্রবৃত্ত হইতে অনেক প্রকারে প্রবৃত্তি দিয়াছিল তাহাতে স্বামী এক প্রকার সম্মতিও প্রকাশ করে কিন্তু তাহার স্থির প্রতিজ্ঞার বিষয়ে সন্দেহাপগম হয় নাই সুতরাং আপনি একখান তীক্ষ্ণধার খড়্‌গ ধারণ পূর্ব্বক সমাটের শয্যা সন্নিকটে গিয়া উপস্থিত হইল। সে এই নিষ্ঠুর ব্যাপার বিনা বাধায় সম্পন্ন করিবার অগ্রে রাজকিঙ্করদিগকে অতিরিক্ত মদ্যপান করাইয়াছিল। সুতরাং তাহারা অচেতন হইয়া স্ব২ কর্ত্তব্য বিস্মরণ পূর্ব্বক ভয়ানক নিদ্রায় অভিভূত হইয়াছিল। পথশ্রান্তি হেতু শয়নানন্তর নৃপতিরও সংজ্ঞা ছিল না। ম্যাকবেথপত্নী সমীপবর্ত্তিনী হইয়া অগ্রে নৃপতির বদন নিরীক্ষণ করিতে লাগিল তাহাতে ভূপালের মুখমণ্ডলে তাহার জনকের আস্য সাদৃশ্য প্রকাশ হইল অতএব খড়্‌গোদ্যম করিলেও সহসা তাঁহার অসু বিনাশে সেই দুষ্টা যোষার সাহস হইল না।

সে স্বামির সহিত কথোপকথন পূর্ব্বক ঐ বিষয়ের পরামর্শ নিমিত্ত আপন শয়নাগারে প্রত্যাগমন করিল কিন্তু এক্ষণে তাহার পতিও ঐ কল্পনা জঘন্য বলিয়া সন্দেহ করিতে লাগিল। পরিশেষে বিবেচনানন্তর স্থির করিল সম্রাটের প্রাণ হিংসা করা অনুচিত কর্ম্ম, আমি রাজার এক জন প্রজা এবং আমার সহিত তাঁহার সৌহৃদ্য আছে, বিশেষতঃ অদ্য তাঁহার প্রতি অতিথি সৎকার করিয়াছি, অন্য ব্যক্তি অতিথির উপর হিংসা করিতে আসিলে তাহা হইতে রক্ষা করিতে হয়, আতিথেয় স্বয়ং কি প্রকারে তাহার প্রাণ সংহার করিবে? অপর এই মহারাজ অতিশয় দয়াবান, যাবতীয় প্রজাজনের অনুরাগ ভাজন। সম্ভ্রান্ত সমস্ত সভাসদকে বিশেষতঃ আমাকে যথেষ্ট স্নেহ করিয়া থাকেন। আমি অধুনা সাম্রাজ্য লোভের পরতন্ত্র হইয়া যদিও কৃতঘ্নতা পূর্ব্বক সেই স্নেহ বিস্মরণ করি তথাপি আমাকর্ত্তৃক রাজা নিহত হইলে রাজ্যের সমুদায় লোক আমার প্রতিহিংসা করিবে। অতএব মহীপতির প্রাণ বিনষ্ট করিলেই বা কি সুখোৎপত্তি? কিছুই দেখিতে পাই না, এক্ষণে নৃপালের অনুগ্রহ হেতু সর্ব্ব সন্নিধানে সম্মান আছে, ঐ ঘৃণিত ব্যাপারে প্রবৃত্ত হইলে তাহা দূরীভূত এবং রাজবিদ্রোহে আপনার বংশ ক্ষয় মাত্র হইবে।

ম্যাকবেথের নির্দয়া দয়িতা যখন দেখিল স্বামী অকস্মাৎ চিন্তামগ্ন হইল এবং তাহার হৃদয়ে দয়ার সঞ্চার হওয়াতে প্রস্তাবিত মন্ত্রণায় উৎসাহ নিবৃত্তি পাইল তখন পতিকে নানা প্রকারে বুঝাইতে লাগিল এবং বাক্ কৌশলে পুনর্ব্বার তাহার প্রবৃত্তি জন্মাইয়া দিবার চেষ্টা করিল। ভর্ত্তাকে কহিল যে কল্পনা করিলে তাহা হইতে কেন ক্ষান্ত হইতেছ? তোমার অদৃষ্টে রাজ্যলাভ আছে, অবিলম্বে অতি সহজে সম্পন্ন হইতে পারে, কেন বিমুখ হইয়া কাল বিলম্ব করিবে? এক রাত্রির যৎকিঞ্চিৎ পরিশ্রমে রাজপদ ও রাজকীয় ক্ষমতা প্রাপ্ত হওয়া যায় ইহাতেও নিরুৎসাহ হইতেছ? সেই দুঃশীলা এই সমস্ত প্রবোধ বাক্যে স্বামির মত পরিবর্ত্তন না দেখাতে মনে করিল এ রূপে কিছু হইল না এক্ষণে কোপোৎপাদন দ্বারা সংকল্পিত ব্যাপারে প্রবৃত্ত করিবার পন্থা দেখি। এই বিবেচনা করিয়া শেষে অতি ভীরু ও নিরুৎসাহ বলিয়া ঘৃণা করত কহিতে লাগিল তুমি এবিষয়ের নিমিত্ত যে প্রকার শপথ করিয়াছ আমি অবলা-আত্ম তনয়ের হত্যা নিমিত্ত যদি তদ্রূপ দিব্য করিতাম তাহা হইলে প্রতিজ্ঞা পালন নিমিত্ত দুগ্ধপোষ্য সন্তানকেও ক্রোড়ে লইয়া স্তন্য পান করাইতে২ তাহার মস্তক ভাঙ্গিয়া ফেলিতাম, ক্রোড়স্থ শিশুর প্রতি মাতার মহৎ স্নেহ হইয়াথাকে, প্রতিজ্ঞা রক্ষার অনুরোধে তাহার অপেক্ষা করিতাম না। ছি, তুমি পুরুষ হইয়া শপথ ভঙ্গে প্রবৃত্ত হইতেছ? তুমি এ বিষয়ে পরাঙ্মুখ কেন হও? রাজার প্রাণ সংহার করিলে তোমার অপবাদ হইবার সম্ভাবনা মাত্র নাই, ভূপতির কএক জন ভৃত্য শয়নাগারে সুপ্ত রহিয়াছে প্রভাতে তাহাদের উপরে অনায়াসে অপবাদারোপ হইতে পারিবে। এবম্বিধ বিবিধ বচন প্রয়োগ পুরঃসর সেই দুষ্টা বক্তৃতা করাতে ম্যাকবেথের পুনর্বার ঐ ভয়ঙ্কর ব্যাপারে প্রবৃত্তি হইল।

ম্যাকবেথ এক খান ক্ষুদ্র তরবারি ধারণ পূর্ব্বক নিদ্রাগত নৃপতির নিকট ধীরে২ গমন করিল। তথায় উপস্থিত হইলে দৃষ্টিগোচর হইল যেন আর একটা করবাল তাহার উপরি প্রহারার্থ আকাশ হইতে আসিতেছে সেই শস্ত্রের প্রান্তভাগে শোণিত কণিকা অঙ্কিতা রহিয়াছে। অবলোকন মাত্রে ধরিতে চেষ্টা করিল তাহাতে প্রকাশ পাইল বস্তুতঃ অস্ত্র নহে আপনার দুস্ক্রিয়া প্রবৃত্তি দ্বারা অন্তঃকরণ বিচলিত হওয়াতে তাদৃশ দর্শন হইয়াছিল।

অনন্তর নৃপতির পার্শ্বে গিয়া উপস্থিত হইল এবং ভয় ও সংশয় পরিহার পূর্ব্বক তরবারি প্রহারে নর পালের প্রাণ বিনাশ করিল। সেই সময় দৈবাৎ সেস্থানে সুপ্ত এক জন রাজকিঙ্কর স্বপ্নযোগে হাস্য করিয়া উঠিল এবং অপর এক ব্যক্তি হঠাৎ হত্যা এই শব্দ উচ্চস্বরে উচ্চারণ করিল। পরে দুই জনেই জাগ্রৎ হইয়া শয্যার উপরে উঠিয়া বসিল। এক ব্যক্তি বলিল পরমেশ্বর যেন মঙ্গল করেন, অন্য জন তথাস্তু বলিয়া প্রতিবচন প্রদান করিল। কিয়ৎ ক্ষণ পরে পুনর্ব্বার দুই জনে নিদ্রা গেল। ম্যাকবেথ অদূরে দণ্ডায়মান থাকিয়া মনোযোগ পূর্ব্বক তাহাদের বাক্য শ্রবণ করিতেছিল, যৎকালে একজন কিঙ্কর পরমেশ্বর যেন মঙ্গল করেন এই কথাটী কহে তখন স্বয়ং তথাস্তু বলিয়া প্রতিবচন প্রদানের উদ্যম করিয়াছিল, যদিও তাহার পক্ষে আশীর্ব্বাদ প্রার্থনা আবশ্যক বটে তথাপি বাক্‌রোধ হওয়াতে বদন হইতে ঐ বাক্য বিনির্গত করিতে পারে নাই

তৎপরে এই অলক্ষ্য বাণী ম্যাকবেথের কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল, যথা, আর নিদ্রা যাইও না, যে নিদ্রা জীবের প্রতিপালক, ম্যাকবেথ তাহাকে নিহত করিয়াছে। অনন্তর ভবনস্থ সমস্ত ব্যক্তির প্রতি যেন এই বাক্য উদীরিত হুইল নিদ্রাকে বিসর্জ্জন দাও, গ্লামিস্‌ তাহার বিনাশ করিল, সুতরাং কাদর আর স্বাপাবেশে থাকিবে না, ম্যাকবেথও আর সুপ্তি প্রাপ্ত হইবেক না।

ম্যাকবেথ এই সমস্ত অলক্ষ্য বাক্য শ্রবণে সভয় হইয়া স্বীয় শয়নাগারে বনিতা সন্নিধানে প্রত্যাগমন করিল। পতির প্রত্যাগমনে তাহার ললনা সন্দিহানা হইয়া মনে করিল বুঝি কার্য্য সফল হয় নাই কোন একটা ব্যাঘাত হইয়াছে। পরে স্বামির হস্তে শোণিতের চিত্ন অবলোকন করাতে মুখ্য কর্ম্মের সংসিদ্ধি জানিতে পারিল কিন্তু পতির চিত্ত বৈকল্য দেখিয়া যথোচিত ভর্ৎসনা করিতে লাগিল। অনন্তর ভর্ত্তাকে ক্ষত চিহ্ণ প্রক্ষালন করিতে কহিয়া স্বয়ং সেই ক্ষুদ্র খড়্‌গ ধারণ পূর্ব্বক রাজার শয়নমন্দিরে গমন করিল এবং নৃপ কিঙ্করদিগের উপর হত্যাপবাদ আরোপ করিবার মানসে তাহাদের বদন শোণিত কণিকায় অঙ্কিত করিয়া আসিল।

রজনী প্রভাতা হইলে হত্যার ব্যাপার প্রকাশ পাইল। যদিও ম্যাকবেথ এবং তাহার গৃহিণী কপট স্নেহ প্রকাশ পূর্ব্বক মুক্তকণ্ঠে শোক সন্তাপ সূচক বাক্য কহিতে লাগিল এবং কিঙ্করদিগের উপরে হত্যাপবাদ আরোপ পূর্ব্বক তাহাদের গাত্রে শোণিত চিহ্ণ দেখাইয়া দিয়া অপরাধী বলিয়া সপ্রমাণ করিবার উদ্‌যোগ করিল তথাপি পুরবাসি লোকেরা ম্যাকবেথের উপরই সন্দেহ করিলেন কেননা দীন ভৃত্যদের অপেক্ষা তাহারই ঐ বিষয়ে প্রবৃত্তির অধিক সম্ভা বনা। সে যাহা হউক নৃপতির তনয় দ্বয় এই ভয়ানক ঘটনায় ভীত হইয়া প্রাতঃকালে তথাহইতে পলায়ন করিলেন। জ্যেষ্ঠ রাজকুমার মালকম সত্বর প্রস্থান করিয়া ইংলন্দরাজের শরণাপন্ন হইলেন এবং কনিষ্ঠ দোলানবেন আয়রলন্দ দ্বীপে গমন করিলেন

রাজার যথার্থ উত্তরাধিকারী দুই কুমার এই রূপে প্রস্থান করিলে ম্যাকবেথ শূন্য সিংহাসনে অভিষিক্ত হইলেন সুতরাং ডাকিনী গণের ভবিষ্যদ্বাণী সম্পূর্ণ রূপে সিদ্ধ হইল।

ম্যাকবেথ এই উচ্চ পদ প্রাপ্ত হইল বটে কিন্তু তাহার এবং তদীয় মহিলার অন্তঃকরণে ডাকিনী গণের সেই বাণী জাগরূক রহিল অর্থাৎ ম্যাকবেথ রাজা হইবে কিন্তু তদীয় তনয়েরা তৎপদ প্রাপ্ত হইতে পারিবে না, তাহার পরে বেনকোর সন্তানেরা সিংহাসনাভিষিক্ত হইবেন। অতএব তাহারা স্ত্রী পুরুষে এক্ষণে নিরন্তর কেবল এই বলিয়া বিলাপ করিতে লাগিল হায় আমরা কি তাদৃশ গুরুতর অধর্ম্ম করিয়া বেনকোর সন্তানের নিমিত্ত এই রাজত্ব গ্রহণ করিলাম। পরে উপায় চিন্তনে প্রবৃত্ত হইয়া ভাবিয়া এই স্থির করিল বেনকো এবং তাহার পুত্রকে বিনষ্ট করিতে পারিলেই ডাকিনীদের ভবিষ্যদ্বাণীর খণ্ডন হইতে পারে অতএব তাহার পন্থা দেখা যাউক।

এই সংকল্প সিদ্ধির মানসে এক রাত্রি আপনাদের ভবনে ভোজর আয়োজন করিয়া পুরবাসি সমস্ত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদিগকে নিমন্ত্রণ করিল এবং বেনকো ও তদীয় তনয় ফ্লিয়ান্সকে যত্ন পূর্ব্বক আহ্বান করিয়া পাঠাইল। বেনকো যে পথ দিয়া পুত্রসহ রজনীযোগে ভোজনার্থ রাজবাটী আসিবেন সেই বর্ত্মের এক প্রান্তে কতিপয় ঘাতুক নিযুক্ত ছিল। অতএব তাঁহারা পিতা পুত্রে আপনাদের নিকেতন হইতে বহির্গত হইয়া অধ্বমধ্যে উপস্থিত হইবামাত্র ঘাতুকেরা অক্রমণ পূর্ব্বক বেনকোর প্রাণ সংহার করিল। তাঁহার পুত্র ফ্লিয়ান্স পশ্চাৎ২ আসিতেছিলেন, পিতার উপর দস্যুদলের আক্রমণ দেখিয়া গোলযোগের সময় প্রাণপণে পলায়ন করিলেন। এই ফ্লিয়ান্স হইতে রাজবংশের সৃষ্টি হয় এবং পরে ইহাঁর সন্তানেরা পুরুষানুক্রমে ক্রমাগত স্কতলন্দের রাজসিংহাসনে অভিষিক্ত হইয়াছিলেন। এই রাজবংশের শেষ পুরুষ স্কতলন্দের ষষ্ঠ রাজা, তিনি ইংলন্দেরও প্রথম ভূপতি হন, অর্থাৎ তাহার সময়েতেই ঐ দুই রাজ্য মিলিত হইয়াছিল।

সে যাহা হউক। এখানে ম্যাকবেথের পত্নী ভোজের সময় সদাশয়তা প্রকাশ পুরঃসর সমাগত নিমন্ত্রিত ব্যক্তিদিগের এবম্প্রকার আদর অভ্যর্থনা এবং স্তুতি বিনীতি করিতে লাগিল যে সকলেই তাহার প্রতি যথেষ্ট সন্তুষ্ট হইল। অপর ম্যাকবেথ মর্য্যাদাবন্ত লোকদিগের সহিত শিষ্টালাপ করত কহিল আমার সমস্ত রাজ্যের যে পরমোৎকৃষ্ট, সকলই ভাগ্যক্রমে অদ্য মদীয় আলয়ে উপস্থিত, কেবল পরম প্রিয়তম বন্ধু বেনকোকে অবর্ত্তমান দেখিতেছি। পরমেশ্বর সন্নিধানে প্রার্থনা করি তাঁহার যেন কোন বিপদ্ না ঘটিয়া থাকে, নিমন্ত্রণ রক্ষা না করণ জন্য যেন তাঁহার প্রতি অনুযোগ করিতে না হয়। এই কথা কহিয়া আপনার আসনে উপবেশন করিতে যায় ইত্যবসরে বর্ত্মমধ্যে নিহত বেনকোর আত্মা নৃপ নিকেতনে প্রবেশ পূর্ব্বক তদুপরি উপবিষ্ট হইল। ম্যাকবেথের যদিও সাহস এবং ভূতদিগের সম্মুখবর্তী হইবার ক্ষমতা ছিল তথাপি এই ঘটনায় চিত্ত অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হইল, এবং ভয়ে মুখ শুষ্ক ও পাণ্ডর বর্ণ হইয়া গেল। চিত্রপুত্তলিকার ন্যায় নিস্পন্দ দণ্ডায়মান হইয়া বেনকোর আত্মার দিকে স্থির দৃষ্টি করিয়া রহিল। রাণী এবং সমাগত জনগণ অন্য কিছু দেখিতে পাইল না, এই মাত্র অবলোকন করিল রাজা নিস্তব্ধ হইয়া শূন্য সিংহাসনের প্রতি এক দৃষ্টে চাহিয়া রহিয়াছে। সকলে বিতর্ক করিতে লাগিল অকস্মাৎ ইহার উন্মাদ সঞ্চার হইল না কি? কিন্তু তাহার বনিতা বুঝিতে পারিয়া ভর্ৎসনা করত কর্ণকুহরে কহিল ও কি? কি দেখিতেছ? উহা কিছুই নয়, সম্রাট দনকেনকে হত্যা করিবার সময় যেমন শূন্যোপরি দোলায়মান খড়্‌গ নিরীক্ষণ করিয়াছিল এক্ষণেও সেই রূপ দেখিল, ফলতঃ যাহা দৃষ্টিগোচর হইতেছিল তাহা মনের উদ্বেগে কল্পিত মাত্র। ম্যাকবেথ দয়িতার ঐ সকল কথা কিছুই শুনিল না, অনিমিষ নয়নে সেই দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া ক্রমে বিহ্বল হইল পরে মুক্ত কণ্ঠে চীকার করিয়া উঠিল। তাহার ভার্য্যা ভীতি বিহ্বলতা প্রযুক্ত স্বামির বদন হইতে রহস্য বাক্য সকল অনর্গল উদীরিত দেখিয়া গুপ্ত বিষয় ব্যক্ত হইবার আশঙ্কায় উপস্থিত লোকদিগকে কহিল রাজার পূর্ব্বাবধি একটা মহৎ রোগ আছে মধ্যে২ তাহার প্রাদুর্ভাব হইয়া থাকে বোধ হয় ক্ষীণতা প্রযুক্ত হঠাৎ সে টা উপস্থিত হইল এক্ষণে শুশ্রূষা করিতে হইবে। ছল পূর্ব্বক এতাবৎ কহিয়া নিমন্ত্রিত লোকদিগকে বিদায় করিয়া দিল।

পরন্তু ম্যাকবেথ উৎকলিকায় ব্যাকুল হইয়া রহিল। সমস্ত রাত্রি স্ত্রীপুরুষের নিদ্রা হইল না। এক বার তন্দ্রার আবির্ভাব হইয়াছিল তাহাতে কেবল ভয়ানক স্বপ্ন সন্দর্শন করিতে লাগিল। অনন্তর যখন সংবাদ পাইল বেনকোর পুত্র ফ্লিয়ান্স পলায়ন পরায়ণ হইয়া আত্মজীবন রক্ষা করিয়াছেন তখন তাহাদের পরিতাপের পরিসীমা রহিল না, কেননা তাহা হইতে রাজবংশের উৎপত্তি এবং আপনাদের সন্তানের সিংহাসন চ্যুতির সম্ভাবনা। তাহারা পতিপত্নীতে এই ভাবনায় অধীর হইয়া পড়িল, রাজ্য প্রাপ্ত হইয়াও কোন প্রকার সুখানুভব করিতে পারিল না। বিশেষতঃ ম্যাকবেথ আপনার অদৃষ্টে কি ঘটিবে এতদ্বিষয় বিদিত হইবার নিমিত্ত সাতিশয় উৎকণ্ঠিত হইল অতএব সেই ডাকিনীগণের সহিত সাক্ষাৎ করণাশয়ে তাহাদের অন্বেষণে বহির্ভূত হইল।

অনন্তর অনুসন্ধান করিতে২ পূর্ব্বোক্ত ক্ষেত্রের নিকটবর্ত্তি এক গহ্বরে সেই দেবযোনিদের দর্শন পাইল। তাহারা ম্যাকবেথের আগমনের অভিপ্রায় অগ্রে জানিতে পারিয়া তন্ত্র মন্ত্র বলে ভূতগণের দ্বারা ভাবি তাবদ্বিষয় অবগত হইবার নিমিত্ত তাহাদিগকে চালনা করিয়াছিল। অপর মোহিনী করিবার নিমিত্ত এই২ সামগ্রী সংগ্রহ করিয়া রাখিয়াছিল, যথা, শব্দায়মান ক্ষুদ্র ভেক, চর্ম্মচটিকা, ভুজঙ্গ, জলগোধিকার চক্ষু, কুকুর জিহ্বা, কুকলাসের পদনলী, কৃষ্ণ পেচকের পক্ষ, পক্ষ বিশিষ্ট সর্পের শল্‌ক, লবণোদধিস্থিত হাঙ্গরের উদরবর্ত্তি পাকস্থলী, বৃহদ্ব্যাঘের দশন, ডাকিনীর নিক্ষিপ্ত সুগন্ধি রস, বিষাক্ত বৃক্ষের মূল, ছাগীর পিত্ত, ইহুদীর হৃদয়, তাহার সমাধি স্থানে উৎপন্ন ক্ষুদ্র ঝাউগাছ, এবং মৃত বালকের অঙ্গুলী। এই সকল দ্রব্য একটা প্রকাণ্ড কটাহের মধ্যে নিক্ষেপ পূর্ব্বক একত্র সিদ্ধ করিল পরে বানরের শোণিত দিয়া উষ্ণতাপনোদন পুরঃসর তন্মধ্যে একটা শূকর শাবকের রক্ত ঢালিয়া দিল। এবম্বিধ মোহিনীয় বস্তুর গুণেই ডাকিনী গণ ভূতদিগকে আপনাদের প্রশ্নের উত্তর প্রদান করাইত।

ডাকিনীরা ম্যাকবেথকে অবলোকন করিয়া জিজ্ঞাসা করিল হে রাজন্ তুমি কি আপনার সন্দেহ আমাদের অথবা আমাদের কর্ত্তা ভূতদিগের দ্বারা ভঞ্জন করিতে চাহ? ম্যাকবেথ তাহাদের উক্ত প্রকার আয়োজন দর্শনে এবং ভূতের কথা শ্রবণে শঙ্কিত হইল না, সাহস পূর্ব্বক উত্তর করিল কই ভূতেরা কোথায়? আমাকে দেখাও দেখি। ডাকিনীরা তাহার এতদ্বচনে তিনটা বেতালকে তৎক্ষণাৎ নিকটে আহ্বান করিল। তাহাদের প্রথমটার সশস্ত্র মস্তক, সে উপস্থিত হইয়া ম্যাকবেথকে সম্বোধন করত কহিল ওহে তুমি সম্ভ্রান্ত ফাইফের অধিপতি হইতে সতত সাবধানে থাকিও। ঐ মর্য্যাদাবন্ত ব্যক্তির সহিত ম্যাকবেথের দ্বেষভাব ছিল কিন্তু তাহাকে গণ্য করিত না, শত্রুর উপেক্ষা অবিধেয় এ বিষয়ে এক্ষণে প্রবোধ পাওয়াতে ম্যাকবেথ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পুরঃসর সেই উপদেবকে নমস্কার করিল

তদনন্তর দ্বিতীয় ভূত রক্তাক্ত বালকের আকার ধারণ পুর্ব্বক ম্যাকবেথের দৃষ্টি পথের অতিথি হইল, এবং তাহাকে সম্বোধন পূর্ব্বক কহিতে লাগিল ভীত হইয়াছ কেন? পরে মানব জাতির প্রতি ঘৃণা করত কহিল মনুষ্যেরা অতি দুর্ব্বল, অহে, স্ত্রীলোকের গর্ব্ভাজাত কোন ব্যক্তি কদাপি তোমাকে আঘাত করিতে সমর্থ হইবে না অতএব তুমি সাহসাবলম্বন কর এবং স্থির প্রকৃতি হও। ম্যাকবেথ এতৎশ্রবণে সহর্ষ হইয়া উচ্চস্বরে কহিল তবে সে থাকুক না কেন, আর আমি ভয় করিব না, মলিন প্রকৃতি প্রযুক্ত আমারদিগকে শঙ্কা আক্রমণ করিয়াছিল এক্ষণে ঘোরতর মেঘ নিনাদেও ভয় না করিয়া সুখে নিদ্রা যাইব।

দ্বিতীয় উপদের বিদায় হইলে তৃতীয় ভূত একটী শিশু রূপী হইয়া মস্তকে দুই মুকুট এবং করে এক তরু ধারণ পুরঃসর আবির্ভূত হইল। সে ম্যাকবেথের নয়ন পথের পথিক হইয়া তাহাকে সম্বোধন পূর্ব্বক কহিতে লাগিল হে রাজন্ কোন কুন্ত্রণায় তোমাকে পরাভূত করিতে পারিবে না। যাবৎ পর্য্যন্ত বরনামের জঙ্গল দনসিনেন পর্ব্বতে তোমার বিরুদ্ধে আগমন না করিবে তাবৎ তোমার কোন শঙ্কা নাই। ম্যাকবেথ এতৎ শ্রবণে সানন্দ চিত্ত হইল এবং কহিল কোন্ ব্যক্তি মূল উৎপাটন পূর্ব্বক বন্য তরু সকলকে সঞ্চারিত করিতে পারে? মনুষ্য স্বভাবতঃ যত কাল জীবিত থাকে তত কাল নির্বিঘ্নে জীবন ধারণ করিতে পারিব অকাল মৃত্যু অথবা অত্যাচারে আমার প্রাণ বিনাশ সম্ভাবনা নাই। পরন্তু আমাকে একটা বিষয় অবগত হইতে হইবেক হে উপদেব যদিস্যাৎ তোমার বিদিত থাকে বল দেখি বেনকোর সন্তান কখন আমার রাজ্যে রাজত্ব করিবে কি না? এই সময়ে ডাকিনীদের যাদুকারি সেই কটাহ মৃত্তিকা মধ্যে মগ্ন হওয়াতে বাদ্য ধ্বনি হইল এবং রাজ পরিচ্ছদ ধারি অষ্ট মূর্ত্তি ম্যাকবেথের নিকট দিয়া গমন করিতে লাগিল, তাহাদিগের পশ্চাৎ বেনকোর প্রতিমূর্ত্তিও দৃষ্ট হইল, উহার হস্তে এক খানি দপর্ণ ছিল। তদনন্তর অন্য কতিপয় আকৃতি প্রকাশ পাইল। বেনকো শোণিতাক্ত দেহে হাস্য করত ম্যাকবেথের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করত ঐ সকল ব্যক্তিকে দেখাইয়া দিল। এক্ষণে ম্যাকবেথের নিশ্চয় জ্ঞান হইল বেনকোর সন্তানেরা পরে নিঃসন্দেহ স্কতলন্দে রাজত্ব করিবে। অনন্তর ডাকিনীরা বাদ্যোদ্যম এবং নৃত্য করত ম্যাকবেথকে বিদায় দিল। অতএব তাহার মনের উদ্বেগ নিবারিত না হইয়া বরং আরো ভয়ানক হইয়া উঠিল।

সে ডাকিনীদের নিবাস ভূমি হইতে নির্গত হইবামাত্র শ্রবণ করিল ফাইফ দেশীয় সম্ভ্রান্ত মেক্‌দফ স্বদেশ পরিত্যাগ পুরঃসর ইংলন্দে গমন করিয়াছেন। ফলতঃ মৃত মহারাজ দনকেনের জ্যেষ্ঠ তনয় এবং তদীয় যথার্থ উত্তরধিকারী মালকমকে পৈতৃক সিংহাসনে অভিষিক্ত করিবার নিমিত্ত যে এক দল সেনা আসিতেছিল মেক্‌দফ তাহাদের সহিত মিলিত হইয়াছিলেন। ম্যাকবেথ এতৎ বার্ত্তা শ্রবণে কোপে প্রজ্বলিত হইল, তৎক্ষণাৎ মেকদফের পুরী অক্রমণ পূর্ব্বক তাহার পুত্র কলত্র প্রভৃতি সন্নিকৃষ্ট জ্ঞাতি কুটুম্ব এবং বন্ধু বান্ধব পর্য্যন্ত সকলকে প্রাণে বিনষ্ট করিল।

ম্যাকবেথের এই দৌরাত্ম্য এবং অন্যান্য বিবিধ বিদ্রোহে রাজ্যস্থ সমস্ত সম্ভ্রান্ত জনগণ মহা ভীত হইল। কাহার মনে তাহার প্রতি স্নেহ ভাব রহিল না। কতিপয় ব্যক্তি পলায়ন দ্বারা স্ব২ প্রাণ রক্ষা করিল এবং মালকম ও মেকদফ যে সেনাদল সংকলন পুরঃসর ম্যাকবেথের পরাভব নিমিত্ত ইংলন্দ হইতে যাত্রা করিতেছিলেন তাঁহাদের সহিত গিয়া মিলিত হইল। মর্য্যাদাবন্ত মনুষ্যেরা যদিও ভীতি বশতঃ প্রকাশ্য রূপে ম্যাকবেথের প্রতিকূল্যাচরণ করিতে পারি লেন না, তথাপি মালকম ও মেকদফের যুদ্ধার্থ আগমন সংবাদ প্রাপ্তে মনোমধ্যে সকলেই প্রার্থনা করিতে লাগিলেন তাঁহারা যেন জয়ী হইয়া এই দুরাত্মার দমন করেন। ম্যাকবেথের পুরাতন অনীকিনী ছিল না, অভিনব সংগৃহীত সেনাগণ তৎকালে যুদ্ধ অভ্যাস করিতেছিল। তাহারাও তদীয় অত্যাচার হেতু স্নেহ হীন হইয়া তাহাকে অমান্য করিত। অতএব ম্যাকবেথ সমস্ত রাজ্যাঙ্গকে আপনার প্রতিকূল দেখাতে মহা বিষণ্ণ হইল এবং মনের অসুখে এক বার কহিতে লাগিল আমার বোধ হয় নিহত দনকেন এক্ষণে আমা অপেক্ষা স্বস্থাবস্থায় আছেন, আমি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া তাঁহাকে প্রাণে বিনষ্ট করিয়াছি বটে কিন্তু এখন তিনি মৃত্তিকার অভ্যন্তরে নিরুদ্বেগে মহা নিদ্রায় সুখ সুপ্ত আছেন। আমি জীবদ্দশায় প্রখর শর এবং পুরস্থ জনসমাজের ঈর্ষা ও বৈরিবৃন্দের বিরুদ্ধাচারে যে যন্ত্রণা পাইতেছি বোধ করি এ সকল সেখানে কিছুই নাই।

যকালে রাজ্যমধ্যে এই সমস্ত দুর্ঘটনা হইতেছিল সেই সময় ম্যাকবেথের ঐ সকল দুষ্ক্রিয়ার প্রবর্ত্তিকা সেই পাপীয়সী গৃহিণী আপনার দুষ্প্রবৃত্তি জন্য সন্তাপ ও লোকনিন্দা সহিষ্ণুতা করণে অসমর্থা হইয়া স্বহস্তে আত্ম হত্যা করিল। ম্যাকবেথ বিভাবরী ভাগে শয়নগত হইয়াও দুঃস্বপ্ন দর্শনে বিবিধ যন্ত্রণা পাইত, সে সময় মহিষীর সহিত আলাপে নিদ্রার বিরাম হইলে ক্ষণকাল সে ক্লেশ নিবারণ হইতে পারিত এক্ষণে পত্নী আত্মঘাতিনী হইয়া প্রাণ পরিত্যাগ করাতে তাহাতেও বঞ্চিত হইল। এখন স্নেহ করে এমত এক প্রাণীও রহিল না। অধিকন্তু বন্ধু বান্ধব কেহ থাকিল না যে তাহার নিকট আপনার যন্ত্রণার কথা কহিয়া আশ্বস্ত হইতে পারে।

ম্যাকবেথ এক্ষণে জীবনের সহচরীতেও বিরহিত হওয়াতে নৈরাশ্যে আপনার প্রতি হেয় জ্ঞান করত কেবল দেহপতি কামনা করিতে লাগিল কিন্তু অবিলম্বে যখন মালকমের সেনাগণ রাজ্য গ্রহণের মানসে সসজ্জ হইয়া আসিয়া উপস্থিত হইল তখন রোষবশতঃ তাহার প্রাক্তন সাহসের পুনর্ব্বার আবির্ভাব হইল। অতএব ভীত না হইয়া কবচ ও অস্ত্র শস্ত্র ধারণ পূর্ব্বক স্থির হইয়া রহিল এবং সমর ক্ষেত্রে শৌর্য্য প্রকাশ পুরসর প্রাণ ত্যাগ শ্রেয়স্কর জ্ঞান করিল। তাহার মনোমধ্যে এক২ বার ডাকিনীগণের উক্তি কল্পিত বোধ হইল। অপর ভূতেরদের সেই বাক্যও স্মৃতিপথে উদিত হইল যথা নারীগর্ভ হইতে নিঃসৃত কোন ব্যক্তি যন্ত্রণা দিতে পারিবে না। অধিকন্তু যাবৎ বরনাম বন দনসিনেন শৈলোপরি না আসিবে তাবৎ কদাপি তাহার পরাজয় নাই এ কথাও তাহার মনে পড়িল ইহাতে বনের আগমন সর্ব্বথা অসম্ভব ভাবিয়া বরং কখন২ আশ্বস্ত হইতে লাগিল। যাহা হউক, সে মালকমের আগমন প্রতীক্ষা করত স্বীয় দুর্গমধ্যে অবস্থিতি করিল। এক দিবস এক জন দূত ভয়ে কম্পিত কলেবর হইয়া সমীপে আগমন পূর্ব্বক নিবেদন করিল মহারাজ পর্ব্বতোপরি প্রহরিতা করিতে২ বরনাম বনের দিকে দৃষ্টি পাত হওয়াতে নিরীক্ষণ করিলাম সেই কানন যেন স্বস্থান ত্যাগ পূর্ব্বক গমনোপক্রম করিয়া আন্দোলিত হইল। ম্যাকবেথ এ বিষয় অসম্ভব বোধ করিয়া তাহার উপর রাগিয়া উঠিল এবং তর্জ্জন করত কহিল কি, আমার সাক্ষাতে অসত্য কহিস্? পরে রোষ বশতঃ প্রতিজ্ঞা করিল তোকে এ বিষয় সপ্রমাণ করিতে হইবে যদি তোর বাক্য অলীক হয় সেই অরণ্য মধ্যবর্ত্তি তরু শাখায় তোকে লম্বিত করিয়া রাখিব অশন পান বিরহে স্বতই মরিয়া যাবি কিন্তু যদিস্যাৎ সত্য বলিয়া থাকিস্, এবং তোর উল্লেখিত বিষয় যথার্থ হয়, স্বীকার করিতেছি আমাকে ঐ রূপ যন্ত্রণা দিলে আমিও তাহা সহ্য করিব। যাবৎ বরনাম বন দনসিনেনে না আইসে তাবৎ তাহার কোন ভয় সম্ভাবনা ছিল না বটে কিন্তু এক্ষণে মনোমধ্যে ভাবনার আবির্ভাব হও য়াতে ক্রমশঃ ভূতদের সেই বাক্যে সন্দেহ হইতে লাগিল এবং আপনার যে দৃঢ় প্রত্যয় ছিল তাহারও শৈথিল্য হইবার উপক্রম হইল। এখন দুর্ভাবনা বশতঃ আপন চক্ষে যেন সেই অরণ্যানীর গতিশক্তি দেখিতে পাইল, অধিকন্তু অন্তঃকরণ মধ্যে ঐ সমস্ত বিষয়ের আন্দোলন করিতে লাগিল অবশেষে আপনা আপনি কহিল দূতের বাক্য সত্য হউক আর না হউক সজ্জীভূত হইয়া দুর্গের বাহিরে যাওয়াই কর্ত্তব্য, এক্ষণে এ স্থানে অবস্থানে অথবা পলায়ন পূর্ব্বক প্রস্থানে শ্রেয়ঃ সম্ভাবনা নাই। বহুকাল পৃথিবীতে আছি আর অবনীমণ্ডলে সজীবন হইয়া থাকিতে বাসনা হয় না এখন আশু অসুবিগম হইলেই মঙ্গল। এই সময়ে বিপক্ষ পক্ষের অনীকিনীগণ দুর্গের অদূরে আসিয়া উপস্থিত হইল সেও তৎক্ষণে বহির্গমন পুরঃসর সাহসে নির্ভর করিয়া তাহাদের প্রতিকূলে সমর সজ্জা করিল।

দূত পুর্ব্বে কহিয়াছিল বরনাম বন আগমন করিতেছে সে সময় ম্যাকবেথ তাহার কথায় অপ্রত্যয় করে কিন্তু এক্ষণে সেই উক্তি সটীক বলিয়া মান্য করিতে হইল। মালকনের সেনাগণ ঐ বিপিনের মধ্য দিয়া আগমন করিতেছিল, রাজপুত্র বিজ্ঞ বহু দর্শি সেনানীর ন্যায় কৌশল করিয়া স্বীয় সৈন্য সংখ্যা দূর হইতে কেহ গণনা দ্বারা স্থির করিতে না পারে এতদভিপ্রায়ে প্রত্যেক ব্যক্তিকে সেই অরণ্যানী হইতে একটা তরু শাখা ছেদন পূর্ব্বক করে ধারণ করিয়া যাইতে অনুমতি করেন। অতএব ব্যূহীকৃত ভূরি সেনা ঐ রূপে আগমন করাতে দূত দূর হইতে বনেরই চলন মনে করিয়াছিল। বিপক্ষের যোদ্ধৃবর্গ ঐ রূপে আসিয়া ম্যাকবেথের নয়নপথবর্ত্তী হওয়াতে এক্ষণে বনের সঞ্চার প্রত্যক্ষ হইল। অধুনা তাহার সমুদায় আশা দুরে প্রস্থান করিল এবং স্বয়ং সর্ব্বতোভাবে সাহস হীন হইল।

অনন্তর সেনাগণ অগ্রসর হইলে সংগ্রাম আরম্ভ হইল। যদিও ম্যাকবেথের প্রজাজন ও বন্ধু বান্ধব তাহার পক্ষে মৌখিক যৎকিঞ্চিৎ সাহায্য করিল তথাপি সেই দুরাত্মার প্রতি সাতিশয় ঘৃণা থাকাতে মালকম এবং মেকদফের পক্ষ হইয়াই রণ করিল। কিন্তু ম্যাকবেথ স্বয়ং শৌর্য্য বীর্য্য প্রকাশ পুরঃসর মহা সাহসে যুদ্ধ করিতে লাগিল। যে ব্যক্তি তাহার উপরে আক্রমণ করিয়াছিল স্বীয় শানিত শস্ত্র প্রহারে তাহাদের সকলেরই শিরশ্ছেদ করত মেকদফের সম্মুখে গিয়া উপস্থিত হইল। সেই ব্যক্তিকে অবলোকন করিয়া আক্রমণের উপক্রম করে ইতিমধ্যে ভূতেরদের কথা স্মরণ পথে উদিত হইল, ভূতেরা তাহাকে কহিয়াছিল মেকদফ ভিন্ন সকলের সহিত যুদ্ধ করিও অতএব অন্যত্র গমনের মানস করিল। পরন্তু মেকদফ এতাবৎ কাল পর্য্যন্ত কেবল তাহারই অন্বেষণ করিতেছিলেন ঐ দুরাত্মা তদীয় পুত্র কলত্রের প্রাণ বিনাশ করে ইহাতে পূর্ব্বাবধি জাতক্রোধ হইয়াছিলেন সাক্ষাৎ পাইবামাত্র কোপপ্রজ্বলিত হইয়া কতকগুলা ভর্ৎসনা করিলেন। ম্যাকবেথ তদীয় পরিজনের শোণিতে আপনার পিপাসা নিবৃত্তি করে এতদর্থ সমর করিতে বিমুখ ছিল কিন্তু তিনি ক্রোধে অত্যাচারী, কুক্কুর ও প্রবঞ্চক বলিয়া ভূরি২ কটুক্তি করত তাহাকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইতে বাধ্য করিলেন।

অনন্তর ম্যাকবেথের স্মরণ হইল ভূত আমাকে কহিয়াছিল স্ত্রীলোকের গর্ব্ভ হইতে ভূমিষ্ট কোন ব্যক্তি যন্ত্রণা দিতে সমর্থ হইবে না, সেই বাক্যে দৃঢ় বিশ্বাস থাকাতে সহাস্য মুখে মেকদফকে বলিল আর বৃথা কেন পরিশ্রম করিবি তোর অস্ত্র যদিস্যাৎ বায়ুকে আঘাত করিতে পারে তবে আমাকেও বিনষ্ট করিবে। অরে আমার জীবন মোহনী প্রভাবে দৃঢ়ীভূত আছে নারী গর্ব্ভজ হইতে আমার বিনাশাশঙ্কা নাই।

মেকদফ রোষ প্রকাশ পূরঃসর প্রতিবচন প্রদান করিলেন এক্ষণে মোহনীর আশাকে বিসর্জ্জন দিতে হইবে। তুই মিথ্যাবাদি ভূতের কথায় প্রত্যয় করিয়া দাসত্ব স্বীকার করিয়াছিস্ হয় তো এখন তোকে সেই ভূতই বলিবেক মেকদফকে কোন অবলা প্রসব করে নাই। বস্তুতঃ মানব গণ যে রূপে মাতৃ গর্ব্ভ হইতে ভূমিষ্ঠ হইয়া থাকে মেকদফ সে প্রকারে জন্মেন নাই, অকালে জননী জঠর হইতে নিঃসৃত হইয়াছিলেন।

ম্যাকবেথ মেকদফের সাহস, দর্শনে নিরাস হইল এবং মুক্তকণ্ঠে কহিতে লাগিল যাহারা আমাকে ঐ রূপ কহিয়াছিল তাহাদিগের প্রতি আমার আর শ্রদ্ধা হয় না। আমি সকলকে কহিব কোন মানব যেন কখন ভূতের কথায় বিশ্বাস না করে। ঐ ব্যক্তিরা কেবল প্রতারণা করণার্থ দ্ব্যর্থ শব্দ প্রয়োগ পূর্ব্বক বাক্য বিন্যাস করে তাহাতে তাহাদের অঙ্গীকার প্রকারান্তরে সিদ্ধ হয় বটে কিন্তু যে মনুষ্য স্পষ্টার্থ গ্রহণ পুরঃসর কোন বিষয়ে আশা করে তাহাকে নৈরাশ্যে পড়িতে হয়। যাহা হউক ওহে মেকদফ আমি আর তোমার সহিত সংগ্রাম করিব না।

মেকদফ তাহার এ কথায় মনোযোগ করিলেন না, ক্রোধে তর্জ্জন করত কহিলেন অরে তুই থাক, লোকে রাক্ষস দিগকে যে ভাবে দর্শন করে আমরাও তোকে সেই রূপে অবলোকন করিব। এখনই তোকে পিঞ্জর বদ্ধ করণ পূর্ব্বক এই ঘোষণা ফলকারূঢ় করিয়া প্রকাশ্য স্থানে লম্বিত করিয়া দিব যথা অমুক স্থানে অত্যাচারী মানব দেখিতে পাওয়া যায়।

ম্যাকবেথ যদিও শুভাশায় সর্ব্বতোভাবে নিরাশ হইল তথাপি তাহার সহস সহসা বিনষ্ট হইল না, তখনও সাহঙ্কার বচনে বলিতে লাগিল ইহা কখন হইতে পারিবে না। আমি কি যুবা মাকলমের সম্মুখস্থ ভূমি চুম্বন এবং অধম লোকের ঘৃণা বাক্য শ্রবণ নিমিত্ত জীবন ধারণ করিব? তুই স্ত্রীলোকের গর্ব্ভ হইতে যথা কালে উৎপন্ন নহিস্ এ কারণ আমার উপর আক্রমণ করিয়াছিস্ তথাচ আমি রণে ভঙ্গ দিব না, শেষ পর্য্যন্ত দেখিব। এই বাক্য কহিয়া বাহ্বাস্ফোটন পূর্ব্বক মেকদফের উপর গিয়া পতিত হইল এবং কিয়ৎ ক্ষণ সাতিশয় দৃঢ়তা সহকারে যুদ্ধ করিল। কিন্তু মেকদফ কিঞ্চিদ্বিলম্বে পরাভব করত কোপে তদীয় মস্তক চ্ছেদন করিয়া মালকমের নিকট উপঢৌকন স্বরূপে পাঠাইয়া দিলেন। অতএব স্কতলন্দের রাজসিংহাসন এতাবৎ কাল পর্য্যন্ত উপদ্রবকারির অধীন থাকিয়া অবশেষে রাজ্যের যথার্থ অধিকারি মালকমের হস্তগত হইল এবং রাজ্যস্থ আপামর সাধারণ জনগণ পরামানন্দ সহকারে প্রাচীন রাজা দনকেনের পদে তাঁহাকে অভিষিক্ত করিল ইতি।

যাদৃক্‌ অভিরুচি

যাদৃক্ অভিরুচি।

ফ্রান্স দেশ কোন সময়ে পৃথক২ খণ্ডে বিভক্ত ছিল। এক প্রদেশের জনেক অন্যায়ী দুরাত্মা তথাকার প্রকৃত অধিপতি আপন অগ্রজ সোদরকে সিংহাসন চ্যুত করিয়া বনবাসে প্রেষণ পূর্ব্বক স্বয়ং রাজাধিকারী হইল।

পূর্ব্বাধিকারী পদভ্রষ্ট হইয়া নিবাস নিমিত্ত আর্দেন নামক দুর্গম বিপিনে গমন করিলে তদীয় কতিপয় সুস্নিগ্ধ মিত্র স্ব২ ঐশ্বর্য্য সম্পত্তি রাজ্য মধ্যে স্বয়ং বিসর্জন পূর্ব্বক সমভিব্যাহারী হইলেন। রাজ্যাপহারী দুরাত্মা তাহাদিগকে বারণ করিল না, বরং প্রস্থান করিবামাত্র তাঁহাদেরও বিষয় বিভব আপনি অধিকার করিয়া লইল। নৃপতি নির্ব্বাসিত হইয়াও সমভিব্যাহারে বন্ধুবর্গ প্রাপ্ত হওয়াতে মনের সুখে বনবাস করিতে লাগিলেন। ধৈর্য্য গাম্ভীর্য্য সহকারে আরণ্য বিষয় ভোগ করাতে ক্রমে তাঁহাদের সকলেরই বোধ হইল নগরীয় আড়ম্বরান্বিত বিভব অপেক্ষা বন্য বিষয় পরম নির্বৃতি কর। ফলতঃ ইংলন্দীয় প্রাচীন রবিন হুদের ন্যায় এই কানন নিবাসে তাঁহারা স্ব২ স্বান্তমধ্যে যৎপরোনাস্তি প্রীতি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। নিদাঘ কালে শীতলচ্ছায় বিশাল ছায়াতরু তলে সকলে একত্র উপবেশন পূর্ব্বক কুরঙ্গ গণের লীলা রঙ্গ দর্শন করিতেন। মৃগ কদম্ব তাঁহাদিগের ঈদৃশ করুণাস্পদ হইল যে আপনাদের স্বাভাবিক আহার নিমিত্ত দুই একটার প্রাণ বিনাশ করিতে হইলেও শোকে ব্যাকুল হইতেন। শিশির সময়ে হৃদয় বিদারক নীহার সহকারে পবন বহমান হইয়া দারুণ দুঃখের উদয় করিয়া দিত কিন্তু রাজা ধৈর্য্যাবলম্বন পূর্ব্বক তাহা সহিষ্ণুতা করিতেন। তজ্জন্য কোন প্রকার উদ্বেগ প্রকাশ না করিয়া বরং এই বাক্য কহিতেন এ উগ্র সমীরণ আমার অমিত্র নহে, যথার্থ উপদেশক বন্ধু, বোধ হয়, আমার অনর্থক সন্তোষ জন্মাইতে বাসনা করে না, উপস্থিত অবস্থা অবগত করাইয়া দিতেছে। যদিও নির্দয় আঘাত করিতেছে তথাপি কৃতঘ্ন নহে সুতরাং ইহার যাতনা অসহ্য বোধ হইতেছে না। মানবজাতি ইহার প্রাদুর্ভাব দেখিলে আপনাদের দুর্ভাগ্যের কথা কহিয়া থাকে বটে কিন্তু ইহা হইতে ভূরি২ সদুপদেশ গ্রহণ করিতে পারা যায়, ভেকের মস্তকস্থ বিষাক্ত মণি যেমন ঔষধ বিষয়ে মহোপযোগী হয় এই সমীরণে সেই রূপ আমাদেরও অবশ্য কোন প্রকার প্রয়োজন সিদ্ধির সম্ভাবনা আছে। নরপতি এবম্প্রকারে তৎকালিক দুঃখাবহ যাবতীয় বিষয় বিবেচনা করিয়া সে সমস্ত হইতে কিঞ্চিৎ২ সদুপদেশ সংগ্রহ করিতেন। এই অবস্থায় তিনি আপনার নীতিগ্রাহিতা শক্তির গুণে তরুকে রসনা, বেগবতী স্রোতস্বতীকে গ্রন্থ এবং প্রস্তর সকলকে ধর্ম্মোপদেশক জ্ঞান করাতে সে সকল হইতেও বিবিধ উপদেশ লাভ করেন; ফলতঃ স্বাভাবিক সমস্ত পদার্থের তত্ত্বান্বেষণে প্রীতি প্রাপ্ত হওয়াতেই বনবাসেও অক্ষিণ্ণমনা ছিলেন।

দুরাত্মা সহোদরের অন্যায়ে যে রাজা বনবাসী হইলেন তাঁহার রোজালিন্দ নাম্নী এক তনয়া ছিল। রাজ্যাপহারী ফ্রেদ্রিক অগ্রজকে নির্বাসিত করিয়া সেই কন্যাটীকে স্বীয় দুহিতা সেলিয়ার সহচরী করিয়া রাখিল। যদিও ঐ দুই কুমারীর জনকদিগের পরস্পর মহা অমিত্রতা ছিল তথাপি তাহাদের স্ব২ অন্তঃকরণে অন্যোন্যের প্রতি সাতিশয় প্রণয় জন্মিল। বিশেষতঃ সেলিয়া পিতৃব্যের প্রতি আপনার পিতার অন্যায়াচরণের বিনিময় স্বরূপে সহচরীকে যথেষ্ট স্নেহ করিতে লাগিলেন। যখন রোজালিন্দ জনকের দুঃখ এবং আপনার দুরবস্থা স্মরণ করিয়া শোকাকুল হইতেন তখন বিবিধ প্রবোধ বচনে তাঁহাকে শান্ত্বনা করিতেন।

এক দিন সেলিয়া সহচরীর সহিত একত্র উপবেশন পূর্ব্বক তাঁহাকে বিষণ্ণ দেখিয়া সদয় বচনে কহিতেছেন ভগিনি সর্ব্বদা শোক করিলে কি হইবে? ধৈর্য্যাবলম্বন কর, আহ্লাদ আমোদে মন দেও। এতদবসরে এক জন বার্ত্তাবহ সমাগত হইয়া সংবাদ দিল রাজসভা সন্নিধানে একটা মল্লযুদ্ধ হইবে যদিস্যাৎ কৌতুক দর্শনার্থ কৌতূহল থাকে শীঘ্র তথায় গিয়া অধিষ্ঠান করিবেন। সেলিয়া মনোমধ্যে বিবেচনা করিলেন রোজালিন্দ অনুদিন নিরানন্দ হইতেছেন মল্লক্রীড়া স্থলে লইয়া গেলে কৌতুক দেখিয়া অবশ্য কিয়ৎ ক্ষণ সানন্দ থাকিবেন অতএব দুতকে এই প্রতিবচন প্রদান পূর্ব্বক বিদায় করিলেন সহচরী সমভিব্যাহারে এখনই গমন করিতেছি।

বর্ত্তমান কালে পল্লীগ্রামে সামান্য জনগণের মধ্যে মল্লক্রীড়া হইয়া থাকে কিন্তু পূর্ব্বে রাজসভা ও সম্ভ্রান্ত কুলবালাগণের সম্মুখে মল্লযুদ্ধ হইবার প্রথা ছিল। অতএব তদ্দর্শনার্থ সেলিয়ার আহ্বান হয় এবং তিনিও সঙ্গিনীকে সঙ্গে লইয়া সেই রঙ্গ অবলোকনার্থ রঙ্গভূমি সন্নিধানে গমন করেন। কিন্তু সেখানে উপস্থিত হইলে তাঁহাদের অনুমান হইল এই মল্লযুদ্ধে কৌতুক হইবে না বরং একটা শোকাবহ ব্যাপার ঘটিবার সম্ভাবনা, কেননা সমক্ষে নিরীক্ষণ করিলেন এক জন দৃঢ়কলেবর বলবান্ নিপুণ মল্লের বিরুদ্ধে একটি অনিপুণ তরুণ বাহ্বাস্ফোটন পুরঃসর যুদ্ধার্থ অগ্রসর হইতেছিল। দর্শকেরা দুই মল্লের আকৃতি প্রকৃতি দেখিয়া কহিতেছিল এই যুবা কদাপি ইহার সহিত প্রতিযোগিতা করিতে পারিবে না অসমসাহসিক ব্যাপারে প্রবৃত্ত হইবার ফল অবিলম্বে প্রাপ্ত হইবে।

সেলিয়া স্বীয় সহচরী সহিত সভা সমীপে উপস্থিত হইলে রাজা তাঁহাদিগকে সমাদর পূর্ব্বক অভ্যর্থনা করিল এবং দুই জনকে সম্বোধন করিয়া জিজ্ঞাসিল তোমরা কি মল্লযুদ্ধ দেখিতে আসিয়াছ? এ মল্লক্রীড়ায় কৌতুক হইবে না, এই নবীন ব্যক্তির প্রতি আমার অতিশয় দয়া হইতেছে আমি ইচ্ছা করি এই দুঃসাহসিক ব্যাপার হইতে এ যুবা নিরস্ত হয়। তোমরা ইহাকে বুঝাইয়া বল দেখি যদি নিবৃত্ত করিতে পার।

রাজকন্যারা অতিশয় প্রীতিযুক্ত হইয়া তাঁহার সহিত কথোপকথন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। প্রথমতঃ সেলিয়া যুবাকে এই অসমসাহসিক ব্যাপার হইতে বিরত হইতে অনুরোধ করিলেন। পরে রোজালিন্দ সানুক্রোশ বচনে কহিতে লাগিলেন ওহে তরুণ তুমি আপন ইচ্ছায় কেন বিপদে পদক্ষেপ করিতেছ? কিন্তু সেই যুবা তাঁহাদের কথায় সংকল্পিত বিষয়ে নিবৃত্ত হইলেন না, তাঁহাদিগের সমক্ষে আপনার দুর্দ্ধর্ষ বিক্রম প্রকাশ করিতে মানস করিলেন। অগ্রে সুকোমল বচন প্রয়োগ পুরঃসর বিনয় করিয়া কহিলেন আমি তোমাদের এই অনুরোধ রক্ষা করিতে সক্ষম হইব না। তাহার বিনয়ৌদার্য্যে রাজনন্দিনী দ্বয়ের পরম সন্তোষ জন্মিল সুতরাং প্রার্থনা ভঙ্গে বিরক্ত না হইয়া বরং সাতিশয় প্রীতি যুক্ত হইলেন। সেই তরুণ হিতৈষিণী রাজনন্দিনীদিগের প্রতি শেষে এই কথা কহিলেন আপনাদিগের অনুরোধ রক্ষা করণে অক্ষম হওয়াতে যৎপরোনাস্তি দুঃখিত হইতেছি। পরন্তু আপনারা আমার হিতাকাঙ্ক্ষা করেন, এতন্নিমিত্ত কৃতজ্ঞতা স্বীকার পূর্ব্বক প্রার্থনা করি। স্বচক্ষে আমার এই পরীক্ষা নিরীক্ষণ করুন। আমি যদিস্যাৎ এই যুদ্ধে পরাস্ত হই তবে নিশ্চয় জানিবেন এবম্বিধ এক ব্যক্তি লজ্জিত হইল যে কস্মিন্ কালে দৃষ্ট হয় নাই। আর যদি এই রণে আমার মরণ হয় তাহাতেও জানিতে পারিবেন স্বেচ্ছাপূর্ব্বক নিধন যাতনা সহ্য করণে প্রস্তুত এক ব্যক্তি কাল গ্রাসে পড়িল। অপর আমি সমরশায়ী হইলে কাহারো কিছু অপকার হইবে না, আমার নিমিত্ত শোক করে সংসারমধ্যে এতাদৃশ এক প্রাণীও নাই। অধিকন্তু আমার মৃত্যুতে পৃথিবীরও হানি সম্ভাবনা বিরহ, কেননা অবনীর সহিত কোন সম্পর্ক রাখি না, বরং আমার বিনাশে পৃথিবীর উপকার আছে আমি ধরার যে স্থান ব্যাপিয়া রহিয়াছি অন্যের শুভাগমনের দ্বারা তাহা পূরিত হইতে পারিবে।

অনন্তর যুদ্ধারম্ভ হইল। সেলিয়া মনে২ প্রার্থনা করিতে লাগিলেন যুবা যেন কোন প্রকারে আহত না হন। রোজালিন্দও তদর্থ মর্ম্মান্তিক বেদনা প্রকাশ করিলেন এবং মনোমধ্যে এই বিবেচনা করিয়া দুঃখিত হইলেন আহা এ ব্যক্তি আমারই ন্যায় দুর্ভাগ্য, বন্ধু বান্ধব কেহই নাই, স্বতঃ মৃত্যু ক্লেশ স্বীকারে প্রবৃত্ত হইল। এই রূপে যৎকালে তাঁহার উপস্থিত বিপত্তি নিমিত্ত স্নেহ প্রকাশ পূর্ব্বক শোক করিতে লাগিলেন সেই সময়েই তদীয় প্রণয় নিগড়ে পতিত হইলেন এমত অনুভব হইল।

সে যাহা হউক, কিন্তু যুবা মান্যা মহিলাদিগের এবস্প্রকার করুণায় মহা সাহসী ও দ্বিগুণ বলান্বিত হইলেন এবং আশ্চর্য্য রূপে শৌর্য্য বীর্য্য প্রকাশ করিতে লাগিলেন তাহাতে তাঁহার বিপক্ষ পক্ষ পরাভূত হইল এবং ঘোরতর প্রহারে কিয়ৎ ক্ষণ অচেতন অস্পন্দ হইয়া রণক্ষেত্রে পড়িয়া রহিল।

রাজা এই তরুণের অসাধারণ সাহস এবং যুদ্ধ নৈপুণ্য অবলোকন করিয়া সাতিশয় প্রীত হইল এবং আশ্রয় প্রদান মানসে তাঁহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিল।

যুবা কহিতে লাগিলেন আমি স্যর রোলান্দ-দি-বএজের কনীয়ান সন্তান, আমার নাম অর্লান্দো।

স্যর রোলান্দ-দি-বএজ সে সময় পরলোক প্রবাসী হইয়াছিলেন কিন্তু জীবদ্দশায় সিংহাসন চ্যুত রাজার এক জন প্রিয় বন্ধু ছিলেন একারণ ফ্রেদ্রিক যখন শুনিল সমর বিজয়ী তরুণ অর্লান্দো তদীয় তনয়, তখন যুবার শৌর্য্য দর্শনে তৎপ্রতি তাহার যে অনুরাগ জন্মিয়াছিল তাহা বিরাগে পরিণত হইল, তৎক্ষণাৎ বৈরক্তি ভাব ব্যক্ত করত গাত্রোত্থান পূর্ব্বক সে স্থান হইতে প্রস্থান করিল। কিন্তু যদিও ভ্রাতৃদ্বেষ প্রযুক্ত তদ্বন্ধুবর্গের পর্য্যন্ত নাম শ্রবণে বিরক্ত হইত তথাপি অর্লান্দোর অনুপম বলবীর্য্যে চিত্ত সন্তোষ জন্মিবাতে গমন করিতে২ কহিতে লাগিল সেই যুবা অন্য কোন লোকের নন্দন হইলে মহা আনন্দের বিষয় হইত।

এআই অনুবাদ · মূল